ডেকান অডিসি

মীর ওয়ালীউজ্জামান | ২২ জুলাই ২০১১ ৫:৩৩ অপরাহ্ন


তামিলনাড়ুর ভেলোরে ক্রিস্টিয়ান মেডিক্যাল কলেজের মূল ভবন

সেই ছেলেবেলায় ভূগোল বইয়ে পড়েছি, ভারতবর্ষের দক্ষিণ অংশ দাক্ষিণাত্য–ইংরেজিতে ‘দ্য ডেকান প্ল্যাটৌ’ নামে পরিচিত। ইতিহাসে দাক্ষিণাত্যের বীর টিপু সুলতান, শিবাজিরা বারবার আপন আপন মহিমায় বীরত্ব আর স্বাধীনতার মন্ত্র ও স্বপ্ন নিজ নিজ অনুসারীদের মধ্যে চারিয়ে দিয়েছেন। সেই দাক্ষিণাত্য–হালে যাকে আমরা তেলেঙ্গানা বলে জানছি, সেখানে ঘুরতে যাবার বাসনা তো সুপ্ত ছিলই, যেমন অপূর্ণ রয়েছে ভারতের ডেজার্ট সার্কিটে ভ্রমণের ঈপ্সা এখনো… । যে কাজের উপলক্ষ্যে যাওয়া হল, তার একটু ব্যাকগ্রাউন্ড সংক্ষেপে বাখান করি শুরুতে।

wdek_1.jpg………
শিশু হাসপাতালে বিছানায় রুবাই
………
আমাদের মেয়ে রুবাই যে একটি কানে কোন কারণে কম শোনে, সেটা বিশেষজ্ঞ ডা. আফজাল বুঝতে পেরেছিলেন যখন ওর বয়স পাঁচ বছর। রুবি এবং আমিও তার আগে জানতে পারিনি, কেন ওর কথাবার্তা একটু গার্বল্ড শুনতে–সকলে বোঝে না। প্রফেসর আফজল যথাসাধ্য চিকিৎসা করেন দীর্ঘদিন। নব্বই দশকের শুরুতে, যখন রুবাই আটে পড়ল, বিশেষজ্ঞ ডা. আলাউদ্দিন ওকে পরীক্ষা করে জানিয়ে দিলেন, হিয়ারিং এইড পরলে ও অন্য সবার মতোই শুনবে–দূরের, কাছের সব ধরনের শব্দ। আমি সুইৎস্যল্যান্ড থেকে এক জোড়া এইড আমদানির ব্যবস্থা করলাম। বিশ্বখ্যাত এইড নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি এক জোড়ার নিচে বিক্রি করে না–অনেকটা জুতোর মতো ব্যাপার। রুবাই কানে এইড পরতে কনভিন্সড না হওয়ায় আমরা ওকে নিয়ে তখন যেমন আমাদের মতো সীমিত সাধ্যের মানুষ ভারতের কোলকাতা-চেন্নাই যেত, তেমনি একবার দেখিয়ে আসবার সিদ্ধান্ত নিই। অর্থাৎ, দাক্ষিণাত্যে আমাদের যেতে হল, তবে শখ করে, রিল্যাক্সড্‌ মোডে যেমন ভ্রমণে যায় মানুষ, তেমন নয়।

পরামর্শের জন্য গেলাম বন্ধু হিরণের কাছে। সেই ষাটের দশকের কলেজি বন্ধু হিরণ জানালো, ওরা দু’তিন হপ্তার মধ্যেই ওখানে যাচ্ছে, তাও আবার ভাবির কানে ছোট্ট অস্ত্রোপচারের জন্যই–কাজেই, আমরা সঙ্গী হতে পারি অনায়াসে। কালই জানাব, আমি বলি, অফিসে গিয়ে আগামি মাসের কাজকর্মের ফোরকাস্ট দেখি আগে। মেয়ের কানের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাওয়া–কলিগদের কারো আপত্তির প্রশ্নই ওঠে না, ওরা বরং ‘ফরেন কারেন্সি কত লাগবে, বলেন, ব্যবস্থা করে দিচ্ছি’ ধরনের অভয়বাণী ও ভরসার কথা শোনাল। আমি তখন বিসিএএস অর্থাৎ বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড্‌ স্টাডিজের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার। একই সঙ্গে গোটা চারেক ত্রৈমাসিক নিউজ লেটার প্রকাশনার সার্বিক দায়িত্বও আমার কাঁধে। তখন পরিবেশ বিষয়ক বাংলা ও ইংরেজি দু’টি নিউজ লেটার প্রকাশ করতাম কেবল আমরাই–সেগুলিও আমার সন্তানের মতোই প্রিয়। হিরণ ফোনে জানালো, সপ্তাহ তিনেকের মতো দেরি হবে সব গোছগাছ করতে। ও এসে আমাদের পাসপোর্টগুলি নিয়ে যাবে। আমার কোনো অসুবিধে নেই তো? মনের কোণে কোথাও একটু খচ্ করে উঠলেও সেটাকে ধামাচাপা দিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বললাম, গৌ অ্যাহেড, ভাই।

অফিসে লাঞ্চ খেতে বসেছি সবাই। ড. ইউসুফ আলী–প্রাক্তন মৎস্য সচিব–জিজ্ঞেস করলেন, রুবাই কি কানে কম শুনছে? বুঝলাম, সবাই আমার মেয়ের বিপন্নতার বিষয়ে জেনে কনসার্নড্‌ হয়েছেন। গেল ডিসেম্বরে আমরা হৈ চৈ করে মেয়ের জন্মদিন পালন করেছি। অফিসের সবাইকে বলা হয়েছিল। ড. আলী তো রাত এগারোটা তক্ আড্ডা দিয়েছিলেন আমাদের সঙ্গে। জ্বি স্যর, একটু ভেলোর সিএমসিএইচ-এ দেখিয়ে আনি। শুনলাম, ওখানে সব ওয়র্ল্ড ক্লাস বিশেষজ্ঞের মেলা আর সবাই খুব ডেডিকেশ্যন নিয়ে রোগী দেখেন। সিএমসিএইচ মানে? আলী সাহেবের ঔৎসুক্য মেটাতে বলি, ক্রিস্ট্যন মেডিক্যাল কলেজ হসপিটাল। বাল্যসখা মামাতো ভাই, নট্‌র ডেইম কলেজ-ইউনিভার্সিটির সহপাঠী ও বিসিএএস-এর সিনিয়্যর ফেলো ইকবাল আস্তে করে বলল, তাহলে তুমি রিও যাচ্ছ না? আমার তো ধরিত্রী সম্মেলনে যাওয়ার ঠিক হয়নি কিছু, হয়েছে? আমি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিই। না, মানে তুই যদি ইন্ডিয়া যাস, তাহলে ঐ একই সময়ে রিও যাবি কী করে? তাকিয়ে দেখি, নির্বাহী পরিচালক সেলিম এবং পরিচালক আতিক মিটিমিটি হাসছে আর খাচ্ছে। আমি মানসিক দোলাচল কাটিয়ে এক সেকেন্ডে সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছে জানালাম উদারস্বরে, অল রাইট, আই ফোরগৌ মাই চান্স। তোমরা যাও ধরিত্রী সম্মেলনে। আমার পরিবর্তে নিরুকে নিয়ে যাও। ওকেই আমাদের পরিবেশ বার্তার এডিটর হিসেবে নমিনেশ্যন দিয়ে দাও। সৌ, দ্য ডেবাক্ল ইজ রিজলভ্ড, সেলিম বলে উঠে, এজন্যই আমাদের টপ ম্যানেজমেন্টে আরো ফৌজিলোকের ইনডাক্শ্যন হওয়া দরকার।

আরো সিদ্ধান্ত নিলাম, দাক্ষিণাত্য যাত্রার খরচাদি আমি উপার্জন করেই নিয়ে যাব, অফিস থেকে নেব না। ইউনিসেফের তথ্য কর্মকর্তা ক্লেয়ার ব্লেঙ্কিনসপ একটি কষ্টসাধ্য কনসালট্যান্সি অফার করেছিল দিন দুই আগে। ওকে ফোনে জানালাম, কাজটা আমি করে দেব। ক্লেয়ার যারপরনাই খুশি হয়ে পরদিন সকালে অ্যাসাইনমেন্ট বুঝে নেয়ার জন্য ওর অফিসে ডাকল। রুবিকে কেবল শুনিয়ে রাখলাম, আমরা জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে যাচ্ছি। প্রতিদিন বিকেলে অফিস থেকে ফিরে ইংরেজি টাইপরাইটারে বসতাম। বাংলা খবর কাগজের কাটিং, নানা রিপোর্ট–একবার কেবল পড়ে সঙ্গে-সঙ্গে ইংরেজি তর্জমা টাইপ করে যেতাম। আড্ডা মাথায় উঠল। মাঝে মাঝে যে আমিরুল হক চৌধুরির ঢাকা কফি হাউসে যেতাম সন্ধ্যায় গল্পগুজব করতে, কফি খেতে–সে পাট তখনকার মতো তোলা রইল।

দুই সপ্তাহে ৫০,০০০ ইংরেজি শব্দ টাইপ করে, একবারও রিভাইজ না করে ক্লেয়ারের হাতে সোপর্দ করে এসেছি। হিরণ আমাদের পাসপোর্ট আর ভিসার আবেদনপত্র সই করিয়ে নিয়ে গেছে। জমাও দিয়েছে। এক মাসের জন্য যা যা দরকার, রুবিকে গুছিয়ে নিতে বললাম। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রাক্তনী রুবি বিদেশ যাত্রার জন্য সোৎসাহে তৈরি হতে থাকে। দু’দিন বাদে বিকেলে অফিস থেকে বেরনোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। ক্লেয়ারের ফোন এল। জানালো, পরদিন সকালে আমি চেক নিয়ে ওখানেই গ্রীন্ডলেজ ব্যাঙ্কের মোবাইল ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে ভাঙিয়ে নিতে পারব। ধন্যবাদ জানিয়ে ফুরফুরে মেজাজে মোটর সাইকেলে চাপলাম। আজ আমিরুল ভাইয়ের ওখানে মাট্ন চাপ আর কফি সহযোগে আড্ডা দেব ঘণ্টা দুই।

আমিরুল ভাইকে বল্লাম, দাক্ষিণাত্যে যাচ্ছি এবার সপরিবারে। তাই নাকি? উনি সোল্লাসে আমাদের অজন্তা-এল্লোরা-ঔরঙ্গাবাদ-পুনে-বম্বে-গোয়া সার্কিটে মানস ভ্রমণে নিয়ে গেলেন। হবে, হবে, আপনার সঙ্গে আমি আর ওয়ালী যাব, সিরাজি বলে উঠল চৌধুরির স্বপ্নে ভ্রমণের মাঝে। খানিক বাদে হাসান ইমাম, আবৃত্তিকার গোলাম মোস্তফা এলেন আড্ডায়। সেই সকাল আটটায় বেরিয়েছি। আমি উঠলাম। রাতে হিরণ জানালো, কাগজপত্র রেডি। আমি অফিস থেকে ছাড়া পেলেই আমরা দু’তিন দিনের মধ্যে বেরিয়ে পড়তে পারি। তথাস্তু। মনে মনে বলি, জয় মা বলে তরী ভাসালেই হল।

ছুটি নিলাম ঐ এক মাসেরই, ভিসার মেয়াদ যদ্দিনের। রুবিকে, হিরণকে ফোনে জানিয়ে দিলাম। লাঞ্চের পরপরই সবার কাছে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পরদিন থেকেই ছুটি শুনে হিরণ একটু অবাক হয়েছে। আমাদের সংস্থায় কাজের সময় রাতদিন কাজ হয়, কেউ কোনো কাজে ছুটি চাইলে কখনো বিমুখ করা হয় না। যত গবেষক ও প্রোগ্র্যাম স্টাফ–আমি তাদের ছুটির আবেদন নামঞ্জুর করিনি কখনো। তেমনি যখন অনুরোধ করেছি, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও সবাই আমার সঙ্গে কাজ করে অ্যাসাইনমেন্ট তুলে দিয়েছে। কিছু কেনাকাটা সেরে বিকেল-বিকেল বাড়ি ফিরলাম। বেল টিপতে রুবাই ছুটে এসে মায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়েছে দরজার ওপাশে, টের পাই। উষ্ণ আবেগে বুকের ভেতরটা উথলে ওঠে। রুবি দরজা খুললে ব্যাগ আর চাবি ওর হাতে দিয়ে নিচু হই, মেয়েকে জাপটে ধরে তুলে নিই, সামনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। নানা আছছিল, রুবাই বলে। ঐ হলুদ গালি নানাকে দ্যাখাইছি। বলছে, কিনে দেবে আমাকে দুই টাকা দিয়ে।

তাই নাকি? আমিও ডিআইটি সড়কের উল্টো ফুটে পার্ক করা চক্চকে হলুদ রঙা টাউনি গাড়িটা দেখি।

গাড়ি কেনা যাবে সময় মতো, এখন বল তো মা, আজ তোমার স্কুল ঐ যে কী যে নাম, ভুলে যাই কেবল… ওখানে কী কী হল ?

শহীত পাপুল শিশু পিত্যালয়–তোমার মনে থাকে না কেন? রুবাই অসহিষ্ণুভাবে বর্ণনা করে যায়… আচ টিপিন পিরটে তোতালা থেকে মাঠে নামাথ্ থময়… অনেকে তো আমলা একথাথে নামি… আমাথ থামনে মেয়েটা পলে গিছিল, কানছিল … ওর মাল কাছে পলেছে, রুপাই থাক্কা তিয়েছে। ওল মা আমাতের পাশায় এসে আম্মুকে বলেছে… আম্মু ওল আম্মুকে তাকা তিয়েছে।

বেশ, বেশ, মেয়েটি পরে বেশি কাঁদেনি তো আর? আমি আশ্বস্ত হতে চাই। না, না, ওল মা তো তাকা নিয়ে ওষুত কিনেথে, মেয়ে আমাকে নিশ্চিন্ত করতে চায়। ঠিক আছে, আম্মু, তুমি এবার নামো কোল থেকে, রুবি পেছন থেকে বলে ওঠে, তোমার আব্বু কাপড় বদলে চা খাবেন এবার। আমরা বারান্দা থেকে বসার ঘরে আসি। মেয়ে নেমে দৌড়।

সন্ধেবেলা আমার ব্যাগটা গুছিয়ে নেবে, ওষুধপত্তর নিয়ে এসেছি; কাল সকাল আটটায় হিরণের ড্রাইভার এসে আমাদের তুলে নেবে, আমি জানাই। ভাবি ফোনে আমাকে বলেছে, বলে রুবি চায়ের কাপ তুলে দেয় হাতে। সেদিন আড্ডায় যেতে ইচ্ছে হল না। ব্যাগ গুছিয়ে, খেয়ে, শুয়ে পড়া গেল। ভোরে উঠে তৈরি হতে হতেই নিচে হিরণের ড্রাইভার হাজির। ফ্ল্যাট তালাবন্ধ করে দোতলায় খালাম্মার কাছে চাবি রেখে নিচে নামলাম। রুবাই উৎসাহে ফুটছে যেন। আমরা যশোরের বাসায় যাব, কীসে চড়ে যাবো আম্মু? গাড়িতে উঠে রুবির থুতনি ধরে জিজ্ঞেস করে। প্লেনে যাব, রুবি হেসে বলে, এখন চুপ করে বোস। প্লেনে উঠে চুপচাপ সিটে বসে থাকবে।

আকাশ দিয়ে উড়ে যাব, না? বলে রুবাই সত্যিই চুপ করে যায়, কী যেন ভাবে আপনমনে।

হিরণের কারখানা-কাম-বাসা কাছেই। আধ কিলোমিটার পথ। আমি নেমে দেখি, হিরণ বেরিয়ে আসছে সদর দরজার দিকে। এসে গেছেন? গুড, সে বলে, আমরা তাহলে উঠে পড়ি? কিন্তু… আমি ইতস্ততঃ করে বলি, সবার জায়গা হবে?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি চালাব, আপনি সামনে, আর ভাবিরা বাচ্চা নিয়ে ব্যাক সিটে! আমি থই পাই না সমস্যার।

ড্রাইভার অটোরিকশায় চলে যাবে, হিরণ শান্তভাবে বলে যায়, ও-ই গাড়ি এনে পার্ক করে চলে যাবে ছুটিতে। হল?

হ্যাঁ, তাহলে হয় বোধহয়, বলে আমি রিলিভ্ড হয়ে সিগ্রেট ধরাই। ক্যাজুয়্যল ধূমপায়ী বন্ধুও ধরায় ধূম্রশলাকা। দূর থেকেই ভাবি আমাদের বকতে বকতে সারা–সাথীকে নিয়ে আসছেন এদিকে, দেখতে পাই।

আমরা হাসি হাসি মুখ করে ওদের গ্রীট করি। মহিলা, বাচ্চারা গাড়িতে ঠিকঠাক মতো আসীন হলে, বুটে ওদের ব্যাগ তোলার পর হিরণ ড্রাইভারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে গাড়িতে উঠল। চালো মুসাফির, বাঁধো গাঠরি।

হিরণের ড্রাইভিং আমার খুব পছন্দ। এত ঠাণ্ডা মাথায় গাড়ি চালাতে আমি খুব কমসংখ্যক মানুষকে দেখেছি। যেতে যেতে হিরণ আমাকে প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থাদি বিষয়ে বিশদ জানাল। কোথায় কত টাকা খরচ হয়েছে, হবে, ফরেন কারেন্সির মজুদ–সব। আমার জন্য কত ডলার নিয়েছেন? আপনাকে বাংলাদেশি টাকাটা দিয়ে দিই এখন? ও জানায়, ডলার যা দরকার নেবেন। আমরা তো একসঙ্গেই যাচ্ছি, ঘুরছি-ফিরছি, আবার ফেরত আসছি। কেবল রিটার্ন ট্রিপের যশোর-ঢাকা ফ্লাইটের টিকিট কাটা হয়নি। অনেক দেরি আছে তো, তাই–হিরণ জানালো। বাংলাদেশি টাকা আপনার কাছেই থাক, দরকার পড়লে নিয়ে নেব। না, না, আপনার পাওনা দিয়ে আমি হাল্কা হতে চাই, এয়ারপোর্টে গিয়ে দেব, আমি জানাই। ও হাসে। কিছুই বলে না। এয়ারপোর্টে নেমে আমি ব্যাগ এবং মহিলা-বাচ্চাদের নামিয়ে ভেতরে ঢুকি। হিরণ চলে যায় গাড়ির চাবি হস্তান্তর করতে। আচ্ছা, যশোর এয়ারপোর্ট থেকে চুন্নু ভাইয়ের বাড়ি যাব কীভাবে? কিছুই তো জানাইনি ওদের। একটু বাদে আবার ভুলে যাই সেকথা। হিরণ এলে চেক-ইন করে ভেতরে ঢুকে পড়ি। টাকার প্যাকেট হিরণকে দিই। ও কিছু না বলে সেটা ওর ঢোলা প্যান্টের পকেটে ফেলে দেয়। অন্য পকেটে হাত ঢুকিয়ে সুন্দর একটি বিল ফোল্ডার বের করে এক গোছা একশো ডলারের নোট আমার হাতে তুলে দেয়। আমি গুণে নিই এবং অতিরিক্ত ডলার ওকে ফেরত দিই। ও হেসে বলে, আরো ডলার লাগলে নেবেন। ডোউন্ট হেসিটেইট।

সে আর বলতে, মনে মনে বলি, মাসে পাঁচ লাখ টাকা শুধু বিল্ডিং ভাড়াই জমা হয় ওর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। টাকার ভাবনা তো আমার মতো ছাপোষা জীবদের।

ভাবি আর রুবি গল্পে মত্ত। সারা-সাথী আর রুবাই কাচের বড় দেয়ালের এপাশে দাঁড়িয়ে প্লেন দেখছে। ফ্লাইট আধঘণ্টা দেরি করে ছাড়ল। একজন মন্ত্রী সপারিষদ আমাদের সহযাত্রী হলেন, তাই। যশোরে নেমে হিরণকে বল্লাম, আমার কাজিনকে ফোন করি, ও একটা গাড়ি নিয়ে আসুক। বাদ দেন, আমার ভায়রা লতিফ খুলনা থেকে একটা ভ্যান নিয়ে আসবে। ও এসে থাকলে সবাই একসঙ্গে যাব। আপনার ভাইয়ের বাড়িতে চা খেয়ে আমরা খুলনা যাব। কাল আবার ওখান থেকেই তুলে নিয়ে যাব সকালে। রুবি, ভাবি দু’জনেই বলে ওঠে, কোথায়? কেন, আপনারা কি ওপারে যাচ্ছেন না? বলে আমি চোখ কপালে তুলি। হঠাৎ-ই যেন মনে পড়ে গেছে কাজের কথা, এমনি ভঙ্গি করে ভাবি জানালেন, বোনের বাড়ি যাচ্ছি তো, ওটাই এখন কাছের অ্যাক্সাইটম্যন্ট।

তা তো বটেই, আমি তাল দিই, দূরের বাদ্য লাভ কী শুনে, মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক। ওই যে খালু, বলে চেঁচিয়ে ওঠে সারা আর সাথী। রুবাই চুপ করে আমার হাত ধরে হাঁটছে আর চারদিক দেখছে। গৌরবর্ণ, মাঝারি হাইটের উজ্জ্বল যুবক ড. লতিফ এদিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে।

গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে ঠিকানা বলে দিয়ে আলাপ জমালাম। লতিফ বিআইটিতে ফিজিক্সের প্রফেসর। ওর বাড়ি উত্তর চব্বিশ পরগণা, ভাবিদের বাড়ির কাছেই। বারান্দিপাড়ায় চুন্নু ভাইয়ের বাড়ির সামনে গাড়ি থামল। ভাই নেমে এলেন গাড়ি থামার শব্দে। হোয়াট আ সারপ্রাইজ অ্যান্ড ইট্স প্লেজ্যন্ট ট্যূ! ওপরে তাকাই, দেখি ভাবি হেসে হেসে হাত নাড়ছেন তিনতলার বারান্দা থেকে। চল, চল, কষ্ট করে তিনতলাতেই ওঠ, চুন্নু ভাই বলেন। আমার ব্যাঙ্কারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট সাড়ে এগারোটায়। তোমার ভাবির হাতে তোমাদের বুঝিয়ে দিয়ে যাই। আমি হেসে বলি, এরা একটু পরেই খুলনা চলে যাবেন। আর আমরা সবাই কোলকাতা যাচ্ছি কাল। আগে জানলে তোমার ভাবিকে নিয়ে আমিও যেতাম। যাও তোমরা, আরেকবারে হবে, বলে ভাই হাঁকডাক করে আমাদের থিতু করে দিয়ে হুড়মুড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যান আবার। ভাবি বসে হিন্দি ছবি দেখছিলেন ভিসিআর চালিয়ে। মীনাক্ষী শেষাদ্রি আর ওই নাচিয়ে নায়ক–কী যেন নাম–নেচে যাচ্ছে যথারীতি। ছেলেমেয়েরা কোথায়? জিজ্ঞেস করি। এপোলো কাজে গেছে। রুবা আর মুক্তো কলেজে। রবিন কোচিং-এ। ভাবি খতিয়ান পেশ করে চায়ের জোগাড়ে যান। চা এবং টা-য়ের সেবা করে হিরণ অ্যান্ড পার্টি ঘণ্টাখানেক পর খুলনা রওনা হয়ে যায়।

বিকেলে ভাইয়ের সঙ্গে ওর নেতাজি সুভাষ বসুর বোনের বাড়ি কনভার্টেড-ইনটু-আ-চাইনিজ-রেস্তোরাঁ দেখতে গেলাম। পুরনো দোতলা বাড়ি রং পাল্টে চক্চকে করে নিয়েছেন চুন্নু। রান্নাঘরে গেলাম। বনেদি বাড়ির রান্নাঘর যেমন হয়–বিশাল ঘরে কয়েকটি বড় বড় গ্যাসের চুলো শোঁ শোঁ করে জ্বলছে। পরিষ্কার ঝক্ঝকে, তকতকে সবকিছু। ভাল লাগল দেখে। বাড়ি ফিরে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে তৈরি হয়ে ব্যাগ প্যাক করে অপেক্ষায় রইলাম। গল্পগুজব চলল দুই পরিবারের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে। ন’টা বাজতেই হিরণদের গাড়ি হর্ন বাজালো নিচে। নেমে গেলাম আমরাও সঙ্গে সঙ্গে। হাত নাড়ানাড়ি করে বিদায় নিলাম। মিসেস লতিফের সঙ্গে আলাপ হল। বড় বোনের মতো সেও অত্যন্ত হাসিখুশি মেজাজের মেয়ে। ওদের দুটি বাচ্চা। সবাই কোলকাতা যাচ্ছে বলে বেশ স্ফূর্তিতে আছে। আমাদের মেয়ে রুবাইয়ের এটা প্রথম বিদেশ সফর। ওর মুখচোখ দেখে মনে হচ্ছে– সবকিছু ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। ঠিকই আছে, দেখে দেখে শিখুক, জানুক, বুঝুক। আমি মনে মনে বলি। ঝিকরগাছা বাজারে গাড়ি থামানো হল। হিরণের শ্বশুর সম্পর্কের কারো বাড়িতে সবাই মিলে যাওয়া হল। দেখা করাই মূল উদ্দেশ্য। অকৃত্রিম আদর-সোহাগ-সালাম বিনিময় হল। পরবর্তী গন্তব্য বেনাপোল স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশ্যন চেকপোস্ট।

কাগজপত্তরের কাজ সেরে ওপারে গিয়ে লতিফ অ্যামবাসাডার গাড়ি ভাড়া করল। তারপর পাঁচটি বাচ্চা ও আমরা ছ’জন কেমন করে যেন সার্ডিন-বোঝাই হয়ে গেলাম ওই গাড়িতে। হিরণের বক্তব্য হল, সবাই একসঙ্গে যাব। মনে মনে বলি, কোন পর্যন্ত বন্ধু? বারাসাত পেরিয়ে গাড়ি লতিফের নির্দেশে হাইওয়ে থেকে বাঁয়ে গ্রামের রাস্তায় চলে এক প্রাচীন গৃহের সামনে দাঁড়াল। লতিফের বাড়ি। বেলা গড়িয়ে গেছে। রান্নাবান্না করাই ছিল। শুধু গরম করে পরিবেশন করা হল। খেয়েদেয়ে বিদায় চাইলাম আমরা। এবারে গাড়িতে অপেক্ষাকৃত আরামে বসা গেল। কোলকাতা পৌঁছে নিউ মার্কেটের কাছাকাছি কিড স্ট্রিটে হোটেল ইডনে ওঠা হল। বড় বড় উঁচু সিলিংওয়ালা ঘর, খড়খড়ির জানালা। বাথরুমে কমোডের সিট কাঠের তৈরি। কিন্তু ভারি শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশ। বাচ্চাদের জন্য খাবারের অর্ডার দিয়ে আমি আর হিরণ গিয়ে ফেয়ারলি প্লেস থেকে করমণ্ডল এক্সপ্রেসের টিকিট নিয়ে এলাম। তারপর হালকা ডিনার খেয়ে বিছানা নিলাম। আহ্, কী স্বস্তি !

…….
এম. পি. বিড়লা তারামণ্ডল, কলিকাতা, ইন্ডিয়া
……….
ভোরে উঠে দুই বন্ধু হাঁটতে বের হলাম। গড়ের মাঠে হাওয়া খেয়ে সবার জন্য ব্রেকফাস্ট নিয়ে ফিরলাম। ঠিক হল, সেদিনটা আমরা ইচ্ছেমাফিক ঘুরে বেড়াব। ধীরেসুস্থে বিড়লা তারামণ্ডলে যাওয়া হল প্রথমেই। ওখান থেকে বেরিয়ে ট্র্যাম চেপে আলিপুর চিড়িয়াখানা গেলাম। ওখানে ঘুরেফিরে দেখে-শুনে লাঞ্চ খেয়ে ঘণ্টা দুই কাটল। আসা হল জাদুঘরে। বাচ্চারা বোর হচ্ছিল যদিও, আমি বলছিলাম, দেখে নাও, আমাদের দেশের ধারে কাছে এরকম জাদুঘর আর নেই। বন্ধুদের কাছে গল্প করবে। সারা লক্ষ্মী মেয়ের মতো মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। রুবাই, সাথী কিছু বলল না। সকলেই বিরসমুখ। হোটেলে ফিরে বিশ্রাম নিয়ে সন্ধের ঝোঁকে আবার বেরিয়ে আমরা নিউ মার্কেটে গেলাম। বাইরে ডিনার খেয়ে হোটেলে ফিরে ঘুমিয়ে পড়া গেল।

পরদিন সকালে উঠে তৈরি হলাম। দশটা নাগাদ ট্যাক্সি নিয়ে হাওড়া রেলস্টেশনের দিকে চললাম। বেশ লাগতো তখন হাওড়ার পুল পেরুতে। বিদ্যাসাগর সেতুর ওপর দিয়ে যাওয়া হয়নি তখন অবধি আমাদের। ওই সেতুর গল্প শুনেছি আর ছবি দেখেছি, গল্পে পড়েছি আগের ক’বছর ধরে এন্তার। মোটামুটি ওই দুপুরবেলা ছাড়ল ম্যড্রাসমুখী এক্সপ্রেস ট্রেইন। তার আগে ক’টা ডাকব্যাগ আর ডানলোপিলোর হাওয়া-বালিশ কেনা হল। গোটাকতক আমাদের জন্য। বাচ্চারা বালিশ মাথায় দিয়ে তখনই শুয়ে পড়তে চায়। বুঝিয়ে বললাম, সবাই যখন ঘুমোবে রাতে তখন আমরাও শোব যার-যার বার্থে। আমি, হিরণ পোশাক বদলে ঢিলেঢালা হয়ে বসে লাঞ্চের অর্ডার দিলাম। ভাত, রুটি, মাছ, মাংস, ভেজিটেবল আর ডিমের পুডিং। খাওয়ার পর হকারদের কাছ থেকে ফ্রুটির কার্টন, চিউয়িংগাম আর পট্যাটো চিপ্‌স নিলাম বেশি করে। ভাবি চোখ পাকালেন, আপনি বাচ্চাদের সব কথাই কানে তোলেন কেন, ভাই? যাতে বড়দের কথা তথা বকুনি বেশি বেশি কানে তুলে মন খারাপ করতে না হয়, আমার চটজলদি উত্তর। ভাবি ও রুবির ভ্রকুটি ও হাসি বিনিময়। হিরণ মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছে। ডায়াবেটিসে ধরার পর হিরণ অত্যন্ত চুপচাপ কেজো মানুষে রূপান্তরিত হয়েছে। কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় বসেও সে কথা কম বলে, তবে কর্তব্য সমাধা করে সুচারুভাবে। ওর অতিভদ্র আচরণ বন্ধুমহলে যেমন অ্যাপ্রিশিএইশ্যন পায়, তেমনি অনেকে হাসাহাসিও করে। আমি অবশ্য নিখাদ ভদ্রলোক হিরণকে পছন্দই করি।

ট্রেইন ছুটে যাচ্ছে। ওড়িশায় ঢোকার পর স্টেশ্যনগুলোর নাম পড়ে পড়ে আমি সবাইকে শোনাই। কিছু কিছু নাম সত্যিই মজার। শুনতে অদ্ভুতও বটে কোনো কোনোটা। সন্ধে হতে আলো জ্বলল ট্রেইনের কামরায়। হলদেটে উজ্জ্বল আলো। ডিনার এলে বাচ্চাদের খাইয়ে দেয়া হয়। ওরা আমাদের কোলে মাথা রেখে পা যেমন-তেমন চালিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। আমরাও খেয়ে নিলাম। তারপর মাঝের স্লিপার বার্থ ফিট করে, বড় আলো নিবিয়ে, নরম নীলচে আলোর রাতবাতি জ্বেলে সাতজনা ছ’টি শয্যায় শরীর ফেলে দিলাম। কী আরাম যে লাগল! আমি আর হিরণ সবার ওপর মুখোমুখি শুয়ে আমাদের তামিলনাড়ু পর্বের কাজকর্ম ছকে ফেললাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি। শেষরাতে জানালার কাচের ভেতর দিয়ে দূরাগত আলোর উদ্ভাস দেখে নিঃশব্দে নেমে পড়লাম। কুপের দরজা স্লাইড করে বেরিয়ে আবার টেনে বন্ধ করে দিলাম। দুই কম্পার্টমেন্টের মাঝের স্পেইসে আরো দু’জন রাতজাগা মানুষকে ধোঁয়া তাড়াতে দেখে এগিয়ে গেলাম। সৌজন্যের হাসি বিনিময় করে, সিগ্রেট ধরিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, চাচা, ঢাকা কতদূর? বলেই উদ্গত হাসি গিলে ইংরেজিতে আবার ক্যাজুয়্যলি বলি, আর উই এনিওয়্যার নিয়ার ভাইজ্যাগ? ওদের একজন বিস্মিতকণ্ঠে বলে, ওয়েল, দ্যাট’স বিসাখাপট্টনম, দ্য লার্জেস্ট ইন্ডিয়ান সী-পোর্ট দিস সাইড! ইউ গেস্ট্ রাইট!

ইয়েস, আ লিট্ল হোমওয়র্ক ইন ম্যাপরিডিং বিফোর আই বিগ্যান মুভিং টুওর্ড্জ ভেল্লোর… আমি ওদের সরলভাবে জানাই।

ফিরে এসে নিজের বার্থে উঠে চিৎ হয়ে চোখ বুঁজি আবার। ঘুম হয়ে গেছে। একটু বাদে ভোর হল। ট্রেইন থেমেছে। ভাবি আর রুবিও উঠেছে। হিরণ আর আমি নিচে নেমে মাঝের বার্থ নামিয়ে দিলাম। বাচ্চারা আরো ঘুমোক। দরজা একটু ফাঁক করতেই ‘চা-কফি-বিস্কিট চাহিয়ে’ এসে গেল। আমরা চা আর নোনতা বিস্কিট খেলাম। প্ল্যাস্টিক গ্লাসে টি-ব্যাগ চা ভালই লাগল। প্ল্যাটফর্ম থেকে একটু ঘুরে আসি, বলে হিরণ বেরিয়ে গেল। মিনিট কয়েক পরে ট্রেইন নড়ে উঠল। এবারে আমরা সবাই একসঙ্গে ব্যস্ত হলাম। ভাবি তো স্বাভাবিক ভাবেই প্যানিকড্ হয়ে বললেন, ভাই একটু দ্যাখেন না, ও গেল কোথায়? উঠতে না পারলে কী যে হবে! আমি তাকে বললাম, শান্ত হন, ভাবি, দেখছি আমি। বেরিয়ে এক হকারকে বিপদের কথা বলতে সে হেসে উড়িয়ে দিল, আপকা দোস্ত্–এতনা বাড়া আদমি–জরুর দুস্রা কোই ডাবা মে হোঙ্গে। আধা ঘান্টা বাদ্হি তো টিশ্যন আয়েগা ফির। সোচিয়ে মাত্। ওই বারতা অগত্যা পৌঁছে দিলাম অন্দরে আর আমি করিডোরে পায়চারি করতে লাগলাম। এ সময় গাড়ি আবার থেমে গেল। আমি দ্রুত দরজার কাছে এগিয়ে যাচ্ছি। হ্যান্ড্ল ঘুরিয়ে দরজা খোলার আগেই ওটা ভেতরে ঢুকে এল, উঠে এলেন আমার বন্ধু হিরণ, নিঃশব্দ হাস্যমুখে, হাতে মস্তবড় প্যাকেট! কীরে ভাই? বলে আমি ওর হাত থেকে খাবারের সুঘ্রাণ ছড়ানো গরম পোঁটলাটা নিই। চলেন জলদি, আজ আপনার কপালে যে কী…

গরম পুরি-তরকারি দেখে ভাবলাম নিয়ে যাই, সবাই খাব, হিরণ পুরি ছিঁড়ে তরকারি পুরে ছোট রোল তৈরি করে মুখে চালান করে। ব্যস, ব্যস, রুবি থামিয়ে দেয়, ভাগ্যিস বাচ্চারা বোঝেনি, আর ওরকম রিস্ক নেবার দরকার নেই হিরণ ভাই। মেয়েরা উঠে বসে ইতি-উতি দেখছিল। রুবি সবার হাতে কাগজের প্লেইটে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। ভাবি চুপ করে জানালায় থুতনি রেখে বসে আছেন। হিরণ খাবারের প্লেইট ভাবির দিকে এগিয়ে ধরতে উনি হাতের ঝাপটায় খাবারটা ফেলে দিতে চাইলেও সফল হলেন না। কোল্ড-ব্লাডেড বন্ধুটি আমার বিদ্যুৎবেগে হাত সরিয়ে এনেছে। তিন মেয়েই কাণ্ড দেখে হেসে কুটিপাটি। আমরাও ওদের সঙ্গে হাসি। হিরণ, অবশেষে ভাবিও। সারা আবার খুব আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করে, আম্মু, তুমি রাগ করছ কেন? আব্বু কি নাশতা আনতে দেরি করেছে অনেক? আবার সবাই উচ্চস্বরে হেসে উঠি। গুমোট তরল হল। খাওয়া শেষ হতে আমরা কফি নিলাম। রুবি বাচ্চাদের জন্য গরম দুধ করে দিল। সকালে এক কাপ, বিকালে আবার এক কাপ–আমরা যখন চা খাব, তোমরাও আমাদের মত অল্প অল্প করে চুমুক দিয়ে খাবে, কেমন? সারা বড় বড় চোখে রুবির দিকে তাকিয়ে শুনছিল। মায়ের কানে-কানে কী যেন বলল। ভাবি রুবিকে বললেন, আপনাকে আমার বড় মেয়ের খুব পছন্দ।

ওমা, কী ভাগ্য আমার, রুবি খুশি হয়ে বলে, আমার মেয়ে তো খালি আব্বু আব্বু… যাক, আরো দু’জন মেয়ে হল আমার এ যাত্রায়, সারা-সাথীর মাথায় সে চুমু খায় অতঃপর। আর আমি? রুবাই আহত স্বরে বলে। ভাবি সঙ্গে সঙ্গে রুবাইকে টেনে নিয়ে চুমোয় ভরিয়ে দেন ওর কপাল, কপোল। রুবাই লজ্জা পেয়ে জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়, জানলা দিয়ে বাইরে দেখে। দেখ আব্বু, আমার থুতনি ধরে ও জানলার দিকে ঘোরায়, ওই লোকগুলো আমাদের পাছা দেখাচ্ছে কেন? ছিঃ, ছিঃ, ন্যাংটা পুটু। কত বড় বড় মানুষ। সবাই বাইরে তাকিয়ে দেখে অপ্রস্তুত হই। তিন বাচ্চাই এগিয়ে গিয়ে জানালার কাচের ভেতর দিয়ে কালো কালো বড় বড় ন্যাংটা পুটু দেখছে মন দিয়ে। ভাল করে দেখে নিয়ে বুঝলাম, আকালমান্দ্ দক্ষিণীরা দলে-দলে মদ্দাপুরুষ, খোকাখুকু সব হাগতে বসেছে ভোর-ভোর। চোখাচোখি হলে দু’পক্ষই লজ্জা পাবে ভেবে আমাদের দিকে পশ্চাদ্দেশ তাগ্ করে বসা! আমাদের দেশে বহু এলাকায় এখনো গ্রামের মানুষ মাঠে যেতেই বেশি পছন্দ করেন। একটু পরেই পাবলিকলি টয়লেট সারতে আর কাউকে দেখা গেল না। পরিবর্তে দেখা গেল, রেলসড়কের দু’পাশেই অনতি উঁচু আমগাছের বাগান। আমের ভারে গাছগুলো নত হয়ে আছে যেন! এই যে ভাবি, আমি ডেকে মিসেস হিরণকে বলি, মদ্রদেশের লোকে আম খায় না, কিন্তু আপনাদের অর্থাৎ বঙ্গালীকে খাওয়াবার জন্য দেখেন কী বিপুল আয়োজন। আর আম ফলবে নাই বা কেন বলেন, যে উৎকৃষ্ট সার পাচ্ছে গাছগুলো… হিরণ হোঃ হোঃ হেসে ওঠে। অসভ্যতায় জুড়ি নেই, বলে ভাবি ভেংচি কাটেন।

অন্যদের দেখাদেখি আমিও একটু পরে টুথব্রাশ, সেইফটি রেজার ইত্যাদি হাতে, গামছা কাঁধে ওয়াটার ক্লজিটের দিকে এগোই। দাড়ি কামিয়ে, দাঁত মেজে ফিরে আসি। গোসলও করবে এখন, তাই না, রুবি ইয়ার্কির ছলে বলে। হিরণ সিরিয়াস মুখে জানাল, ওয়ালীর হলে আমি যাব। মহিলাদের জন্য উল্টো পাশে ব্যবস্থা রয়েছে। বিকেলে মাদ্রাজ রেলস্টেশনে নেমেও করতে পারো। রুবি বলল, আর সন্ধে সন্ধে ভেল্লোরে পৌঁছে হোটেলে গিয়ে যদি করি? তাহলে তো হলই, বল্লাম আমি, দুপুরে আবার মাথা গরম হলে আমাদের দুষো না বাপু। আমি চটি ফট্ফটিয়ে সিগ্রেট মুখে ওদিকে রওনা দিই। টয়লেট সেরে শাওয়ার নিয়ে ফেরার সময় কী যে স্বস্তিবোধ করছিলাম। হিরণ জিজ্ঞেস করল, কেমন? আহা, চোখ বুঁজে বলি, মশাই, পুত্রসন্তান লাভের তুল্য সুখ পেলাম গো! হিরণ হোঃ হোঃ করে হেসে বলল, তাহলে তাড়াতাড়ি গিয়ে লাইনে দাঁড়াই। ভাবি-রুবির চোখে মুখে স্পষ্ট ডিসএপ্রুভ্যল। আসলেই চমৎকার শাওয়ার। প্রচুর ভালো জল, সাবানও রয়েছে রেলের, আমি উৎসাহ দিই ওদের। যদিও জানি, ভবি ভোলবার নয়।

বাচ্চারা ভুলে গেছে, এটা ওদের বাড়ি বা স্কুল নয়–আপন মনে খেলা আর হৈ চৈ করে বেড়াচ্ছে সারা কম্পার্টমেন্টে আর ফিরে-ফিরে এসে মায়েদের জানাচ্ছে, কোন আঙ্কল বা আন্টি বা ভাইয়া-আপুরা ওদের কাকে ডেকে আদর করেছে, নাম জিজ্ঞেস করেছে…। স্কুলের নাম জিজ্ঞেস করেনি ওরা? আমার প্রশ্ন শুনে তিনজন একসঙ্গে মাথা হেলিয়ে বলে, হ্যাঁ-অ্যা-অ্যা। তুমি কী বলেছ মা, রুবাইকে শুধোই আবার। কেন, শহিত পাপুল শিশু শিক্ষালয় পলেছি, মেয়ে হেসে উত্তর দেয়। আমরা বড়রা সবাই একসঙ্গে হাসি এবার। ছোটরা আবার ছুট্টে বেরোয় সাফারিতে। খাবারের অর্ডার চলে গেছে আগেই। ডাইনিং কার থেকে ট্রলি বোঝাই হয়ে খাবারের ট্রে এল। কার কী হুকুম ছিল, রি-কনফার্ম করে এলুমিনিয়াম ফয়েলমোড়া ট্রেগুলি নামিয়ে দিল। খাবারের ট্রলি এগিয়ে চলল ঘড়ঘড় শব্দে। আমি হেসে উঠে সুর করে বললাম, চলল গাড়ি বোয়ালমারি…? ভাবি ধরে বসলেন, সে আবার কী, ওয়ালি ভাই? বাচ্চাদের ধরে নিয়ে আসি, বলছি, বলে আমি খুঁজে খুঁজে রুবাই-সারা-সাথীকে সঙ্গে নিয়ে ফিরলাম। সবার হাতে ট্রে পৌঁছেছে, আস্তে-আস্তে মোড়ক খুলে বাচ্চারা আবিষ্কারের ঔৎসুক্যে খাবার দেখছে, একটু একটু মুখে দিচ্ছে চামচে করে। বাহ্, ভালই শিখে যাচ্ছে তো সব সফরকালীন আচার আচরণ!

হ্যাঁ, নিশ্চিন্তে এবার আমি তথ্যঝুলির মুখ খুলি। শতবর্ষ আগে আমার নানাবাড়ি যেতে কালুখালি জংশনে ট্রেইন থেকে নেমে লোক্যাল ট্রেইনে চাপতে হত। ওই গাড়ি নাকি চলত অত্যন্ত ধীরে, লাইনে যত্ন করে পাথর ফেলা হত না, নাট-বল্টু হয়তো নিয়মিত টাইট দেয়া হত না। গাড়ি চলত ঘটাংঘট্ শব্দে, যাত্রীরা নিশ্চিন্তে ঢুলত, এ-ওর গায়ে গড়াতে গড়াতে ঘুমিয়ে পড়ত। আর ঐ কালুখালি-ভাটিয়াপাড়া লাইনে বোয়ালমারি নামে এক স্টেশ্যন ছিল, যেখানকার মানুষজনকে গয়ংগচ্ছ, ঢিলেঢালা স্বভাবের কারণে মেডেল দেয়া যেতো। তো আমাদের এই আধুনিক এক্সপ্রেস ট্রেইনে এই খাবারের ট্রলিটি একমাত্র বস্তু, আমি গতকাল থেকে যা দেখেছি–যাকে ঐ ‘চলল গাড়ি বোয়ালমারি’ যুগ থেকে আমদানিকৃত বলা যেতে পারে। লাইক আ ভিনটেইজ কার, তাই না ওয়ালী? হিরণের কথা শুনে সবাই হেসে উঠলে সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ভুল বলেছি? আমি চুপ করে গেলাম। হিরণ তো সবকিছুরই একটা পজিটিভ অ্যাসপেক্ট আবিষ্কার করে সেটা হাইলাইট করতে অভ্যস্ত, সেটা এ্যাপ্রিশিয়েইট করার মতো স্ট্যমাক আমাদের ক’জনের আছে বলুন?

বেলা পড়তে সাজ-সাজ রব পড়ে গেল কম্পার্টমেন্টের সর্বত্র। ম্যাড্রাস, যাকে আমার নানা বলতেন মান্দ্রাজ–সেই মাদ্রাজ স্টেশ্যনে গাড়ি ইন্ করবে আর আধঘণ্টার মধ্যে। পাঁচ মিনিটে ব্যাগ গুছিয়ে আমি আর হিরণ দুই কামরার মাঝে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড হাওয়ায় ধূমপান করতে গেলাম। যথাসময়ে মাদ্রাজে নেমে মালপত্তর নিয়ে বেরিয়ে এলাম। সামনেই ভেল্লোরের বাস দাঁড়িয়ে ভেঁপু বাজাচ্ছে। ওঠা হল তাতেই। হাত-পা ছড়িয়ে বসলাম। সন্ধের মুখে আমরা গন্তব্যে পৌঁছলাম। হোটেল নির্বাচনের দায়িত্ব হিরণ নিল স্বেছায়। ওরা এর আগেও এক-দুবার এ পর্যন্ত সফর করে গেছে। ওর পছন্দের হোটেলে উঠলাম। ঢাকা, কোলকাতার তুলনায় ভেল্লোর উষ্ণতর। দু’দিন ভ্রমণ করে আমরা বিষুবরেখার আরো কাছে এসেছি তো! আমার ব্যাখ্যা হিরণের কর্ণগোচর হতেই সে জিজ্ঞেস করল, এখান থেকে কোনদিকে আমাদের পরিচিত কোন এলাকার ওপর দিয়ে বিষুবরেখা গেছে, ওয়ালী? উৎসাহিত হয়ে আমার সাইডব্যাগ থেকে ম্যাপ বের করে পিনপয়েন্ট করি, এই যে দক্ষিণ-পশ্চিমে আন্দামানের ওপর দিয়েই গেছে! বাচ্চারাও উঁকি দিল। হিরণ খুশিমনে ওদের তিনজনের সঙ্গে ম্যাপরিডিং চালালো কিছুক্ষণ, তারপর উঠে দাঁড়ালো। বলল, চলেন, বাজার করে আনি। রান্না হবে তো। এখানে কিচেন আছে, বাসনপত্র ভাড়া পাওয়া যায়। নৌ ওয়ে, হিরণ! আমি হতবাক হয়ে প্রতিবাদ করি। বাড়ির বাইরে এসে রুবিকে আমি রাঁধতে বলতে পারব না, এদের রেস্টোর‌্যন্ট নেই? না, ওর ঠাণ্ডা উত্তর, ভাবি না পারলে সারার মা-ই রাঁধবে। নৌ প্রবলেম। ও সমাধান দিয়ে বেরনোর উদ্যোগ নেয়। যেমনি দেবা, তেমনি দেবী! ভাবি একটা পলিব্যাগ ওর হাতে ধরিয়ে দেয়।

রুবি বিব্রতমুখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে, রুবাই ওর আঁচল ধরে ঝুলছে আর পুট পুট করে সারার সঙ্গে কী সব বলছে। আমাদের ঘর দু’টি মাঝে একটি সংযোগ দরজা দিয়ে যুক্ত, সেটি খুলে দেয়ায় দুই ঘরের বাসিন্দারা এক ঘরেই জমায়েত হতে পেরেছে। আমরা বাইরেই খাব, হিরণ, আমি জানাই, যা মশা দেখছি এখানে, ফ্লাইপ্রুফিং করা উচিত ছিল এদের। এত সুন্দর ঘর, বাথরুম। মশারি দেবে তো রাতে? হিরণ অবিচলিত। বলে, তা হয়তো দেবে, না দিলে কিনে আনবো। রুবি বলল, তুমিও হিরণ ভাইয়ের সঙ্গে যাও। উনি তো বাজার করবেন। তুমি আমাদের জন্য খাবার এই হটকেইসে নিয়ে এস। এলে রুবাইকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেব। আর হ্যাঁ, মশারিটা নিশ্চিত করবে। অবশ্যই, বলে আমি কিছুটা হতোদ্যম হয়ে হিরণের সঙ্গ নিই। আমি এক্ষুনি পারলে ফেরত আসি ওখান থেকে। দেশের সেরা চিকিৎসকরা যেহেতু আমার মেয়ের কানের চিকিৎসা করতে অপরাগতা জ্ঞাপন করেছেন, সেক্ষেত্রে ভেল্লোরে কোন জাদুবলে সেটা সম্ভব হবে–এটা ভেবে আমরা আসিনি এতদূর চারদিন পথে-পথে কাটিয়ে। নতুন জায়গা, মানুষ দেখা, বাচ্চাটার আনন্দ বিধান, দৈনন্দিন দিনযাপনের শ্রান্তি ও গ্লানিমোচন ইত্যাদিও বিবেচনায় ছিল। তাছাড়াও, ‘এদিগরে চিকিচ্ছে যা ছেল, সবই চেষ্টা করিছি’–এরকম একটা কথা ভাবতে পারার জন্যও এখানে আসাটা জরুরি হয়ে পড়েছিল–বিশেষ করে, শুভানুধ্যায়ীরা সকলেই আমাদের একরকম ঠেলে পাঠিয়েছেন।

ভিড়বাজারে কেনাকাটার অভ্যাস আমার নেই। ঢাকায় আমি অফিস ফেরত সুবিধে মতো যেখানে যেটা সুন্দর তাজা, সুলভ দামে পাই, নিয়ে আসি বাসায়–ওই মোটরবাইকের ক্যারিয়ারে অথবা পলিব্যাগ হ্যান্ড্লবারে ঝুলিয়ে। হিরণ আমাকে নিয়ে গেল কাছের সান্ধ্যবাজারে। পাকা সড়কের দু’ধারে খোলা আকাশের নিচে নানা পণ্যের চুবড়ি নিয়ে বসেছেন তামিল মহিলারা। কেরোসিন ল্যাম্পের আলোয় ওদের কালো ত্বক চক্চক্ করছে, অধিকাংশেরই পরনে সাদা অথবা হালকা রঙের তাঁতের শাড়ি, শাদা ব্লাউজ বা চোলি, বেণীসম্বদ্ধ কেশরাজিতে টাট্কা সুগন্ধি গন্ধরাজ বা বর্ষাকালের ওরকম সাদা ফুল বা গোড়ে! থ্যাঙ্ক ইউ, হিরণ ফর আসকিং মি টু একমপ্যানি ইউ। আমার উচ্ছ্বাস দেখে হিরণ নিঃশব্দে হাসে। দেয়ার আর মোর থিংস, মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড… ওকে থামিয়ে দিয়ে বলি, ব্যস, ব্যস, হিরণ, আপনি মহাকবিকে তাই বলে কাঁচাবাজারে এনে নামালেন? ইতোমধ্যে সে মাছ-তরকারি কিনতে বসে পড়েছে। দামদর করছে। ভিড় নেই। একটু ফাঁকায় দাঁড়িয়ে আমি সিগ্রেট ধরাই। চারদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি। সড়কের দু’ধারে বড় বড় দোকান–ভিআইপি লাগেজ, গড্রেজের স্টীল প্রডাক্টস, হিরো সাইকেল, এমনকি হিন্দুস্থান মোটর্সের শোরুমও শোভা পাচ্ছে। ওগুলো সব ঝাঁপ নামানোর প্রক্রিয়ায়–বোঝা গেল, দিনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ওরা গুটিয়ে আনছে ধীরেসুস্থে।

বাজার সেরে আমরা ভেতরে ঢুকলাম। আমাদের হোটেলের আগের রাস্তায় পাশাপাশি তিন-চারটে রেস্তোরাঁ। এগুলো প্রায় সবই লোকাল খাবারের দোকান, হিরণ বলল, আপনারা তো ধোসা, ইডলি, সম্ভার খাবেন না–এই যে ভাতের দোকান, চলেন দেখি। গরম ভাত, চিকেন কারি, ভেজিটেবল আর আমার জন্য দু’টো রুমালি রুটি নিয়ে নিলাম হটকেইসে। হিরণ মুচকি হেসে বলল, যদি খেতে পারেন, তাহলে আর অসুবিধে রইল না। ওরা আবার সবকিছুর মাঝে একমুঠো কারিপাতা ছেড়ে দেয় কি না! আমিও ‘নতুন এসেছি, বেশি বোঝার দরকার নেই’ ভাব করে একটু হাসলাম। বড় মুদি দোকান থেকে একটা ‘বুড়ো সন্ন্যাসী’ নিয়ে মঞ্জিলে ফিরলাম। ঘরে ঢুকে দেখি মশারি লেগেছে। গুড, রুবাইকে খাইয়ে দাও, ভাত-রুটি সবই আছে এতে, বলে নিচু সেন্টার টেবিলে খাবারের কেইস রাখি। গেলাস ধুয়ে একটু রাম ঢেলে জল মেশাই। পোশাক বদলে আমার আরামের পিন্ধন বার্মুডাজ-টিশার্ট পরি। হাতমুখে জল দিয়ে এসে পাখার নিচে সোফায় বসি। রুবাই আমার পাশে জায়গা করে নিয়ে বসে। আব্বু, তুমি খাবে না? ওর প্রশ্ন শুনে আমি ওষুধের গেলাস মুখে তুলি। তুমি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়, আমরা তো বড়, একটু পরে খাই! কথা শুনে লক্ষ্মী মেয়ে ঘাড় নাড়ে আর খাবার নিতে মায়ের দিকে মুখ হাঁ করে এগিয়ে দেয়।

ভোরে ঘুম ভেঙে গেল। রাম পানের পর পেট ভরে খেলে ঘুম ভাল হয়, সকালে কোষ্ঠ পরিষ্কার হয় আরো ভাল। প্রাতঃকৃত্য সেরে ইন্টারকমে হিরণের পাত্তা লাগালাম। উঠে তৈরি হচ্ছে, পাঁচ মিনিট পরে নিচে লবিতে দেখা হচ্ছে জানালো। কেড্স, টুপি পরে দরজা টেনে লক্ করে দিয়ে বেরলাম। মহাসড়কে উঠে দু’জনে পশ্চিমমুখো হাঁটা শুরু করলাম। একটু বাদে বাঁয়ে এক বিস্তৃত কমপ্লেক্স নজরে এল। বড় ফটকের ওপরে আর্চওয়ে। তাতে লেখা সিএমসিএইচ। এই সেই মহাতীর্থ–অন্ততঃ ব্যাধিগ্রস্তদের জন্য তো বটেই। সে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। আমার প্রশ্নের ঢেউ হিরণকে অস্থির করে ফেলল। ও কেবল হেসে বলল, নাশতা খেয়ে তো সবাই এখানে আসছি আমরা। তখন সব দেখবেন, বুঝবেন। আপাততঃ হাঁটা যাক মন দিয়ে। কথা ঠিক। ডায়াবিটিসে আক্রান্ত হওয়ার পরে আলসে হিরণ হাঁটার অভ্যাস তৈরি করে নিয়েছে। বছর পাঁচ-ছয় আগে উচ্চ রক্তচাপের রোগী হিসেবে শনাক্ত হবার পর আমিও। ঠিক আধঘণ্টা হাঁটার পর আমরা ফেরার পথ ধরলাম। আমি রেস্তোরাঁ থেকে ক্যারি ব্যাগে পরোটা-তরকারি-ওমলিট নিলাম। ফিরে এলাম ঘর্মাক্ত শরীরে। রুবি উঠেছে, স্নানটান সেরে মেয়ের এ যাবৎকালের চিকিৎসার নথিপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে। খাবারটা রেখে আমি বাথরুমে ঢুকে গেলাম। ভেতর থেকেই মেয়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। আব্বু কোথায়?

নাশতা সেরে হিরণকে ফোনে জানালাম, আমরা তৈরি। নিচে নেমে যাই? হ্যাঁ, হ্যাঁ, পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যে আমাদেরও হয়ে যাবে, হিরণ নিশ্চিন্ত করল। পথে নেমে দেখলাম, রিকশা চলছে। কিন্তু সকালে হাঁটতে সবারই ভাল লাগছিল। হেঁটেই আমাদের মক্কায় পৌঁছনো গেল। জেনারেল রিসেপশ্যনে চারদিকের দেয়ালে বড় বড় সব বোর্ডে প্রয়োজনীয় যাবতীয় তথ্যনির্দেশ সাঁটা। ইংরেজিতে লেখা। রাষ্ট্রভাষা হিন্দির ঠাঁই নেই? আমার প্রশ্নের উত্তরে হিরণ জানালো, এটা শুধু বিদেশ থেকে আগত রোগীদের রিসেপশ্যন। মূলতঃ শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল, ভূটান থেকে বিদেশি যারা এখানে আসেন, তারা এই ইংরেজি ভাষাতেই যেহেতু সড়গড়, তাই…। অত্যন্ত প্র্যাকটিক্যাল আর হিসেবি এই দাক্ষিণাত্যের শিক্ষিত মানুষজন। পৃথিবীর নানা দেশে যত দক্ষিণ এশীয় অ্যাকাউন্ট্যান্টের দেখা পেয়েছি, তারা প্রায় সবাই কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ুর জাতক-জাতিকা। আমরা সবাই ইএনটি বিভাগের যাত্রী। বিভাগীয় রিসেপশ্যনে পৌঁছে আমাদের দুই পরিবার দ্বিধাবিভক্ত হল। ভাবির ছোট্ট সার্জারি হবে। রুবাইকে অবশ্য হিয়ারিং ইমপেয়ারমেন্ট টেস্ট্স অর্থাৎ ডায়াগ্নস্টিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিয়ে যেতে হবে। সবই পরিষ্কার লেখা রয়েছে। স্পষ্টভাবে, কেবল বসে একটু মাথা ঘুরিয়ে পড়ে নিলেই হল।

কী মেথডিক্যাল এই ক্রিস্টিয়্যন কম্যুনিটির সেবামূলক কাজে নিয়োজিত মানুষ-মানুষীরা। এরকম আমাদের দেশে করা যায় না? রুবির প্রশ্ন শুনে ওকে স্মরণ করিয়ে দিলাম, আমাদের দেশে রায়বাহাদুর রণদাপ্রসাদ সাহা মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালে এ ধরনের রোগীবান্ধব তথ্যনির্দেশনা ব্যবস্থা চালু করেছিলেন প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে আর তুমি-আমি দু’জনেই যেখানে কাজ করেছি, যেখান থেকে আমাদের যৌথযাত্রা শুরু… আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ও বলে উঠল, আবার সেখানেই ফিরে যেতে হবে? ডাস্ট টু ডাস্ট অ্যান্ড অ্যাশেজ টু অ্যাশেজ? হেসে ফেললাম! এতো দেখছি গুরুমারা বিদ্যেবতী হয়ে উঠছেন আমার অর্ধাঙ্গিনী! বলছিলাম যে, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র সাভারে জাফর ভাই যেটা করেছিলেন, আমরা শ্রীপুর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পত্তনকালে সেই আচার-অভ্যাসগুলোকে আরো বেশি বেশি গ্রামীণ মানুষবান্ধব করার চেষ্টা করেছি তো? রুবিকে মুহুর্মূহু মাথা ওপর-নিচ করতে দেখে ওর মেয়ে তো হেসে কুটিকুটি। মা, তুমি এরম পাতোলের মতো কত্তো কেন? আম্মু, বল না? বলে রুবাই ওর মায়ের থুতনি ধরে ঝাঁকাতে থাকে।

নির্দিষ্ট কাউন্টারে কাগজপত্র জমা দিলে ওরা সেগুলি পরীক্ষা করল সময় নিয়ে, হিসেব কষল মোট কত টাকা ফিজ লাগবে, কখন কোন চিকিৎসকের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ইত্যাদি সব তথ্য আমাকে লিখে-পড়ে দিল, তিন-চারটে পেশেন্ট কার্ডও তৈরি করল ভবিষ্যৎ রেফারেন্সের কাজে লাগতে পারে ভেবে। তিনটে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। মোট ফিজ বোধহয় শ’ আড়াই টাকা জমা দিলাম। একদিনেই ডায়াগনৌসিস হয়ে যাবে? আমার বিস্মিত প্রশ্ন শুনে সুশ্রী শ্যামলাঙ্গী জানালেন, উই হ্যাভ টু সার্ভ আ লট অব পিপল কামিং ফ্রম রিয়েলি ফার-অফ প্লেইসিজ। উই উড্ন্ট ওয়ান্ট দেম টু লয়টার অ্যারাউন্ড দিস স্মল টাউন ইনডেফিনিটলি!

বলি, হাউ থট্ফুল অব ইউ অল, মিজ! থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ। মেয়েটি ঝক্ঝকে দন্তকৌমুদী বিকশিত করে, ইউ’র অলওয়েজ ওয়েলকাম, স্যর।

চল মা, আমি রুবাইয়ের হাত ধরে এগোই। রুবি হাঁটতে হাঁটতে কার্ডগুলো উল্টে-পাল্টে দেখে, পড়ে। বাহ্, তিনজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখবেন আমাদের মেয়েকে এখানেই, একই দিনে, বিভিন্ন সময়ে। চমৎকার! এত সহজে সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে ভাবিনি আমি। রুবির মন্তব্য শুনে বলি, আমি এবারে সুড়ঙ্গের ওধারে আলোর রশ্মি দেখতে পাচ্ছি।

ভেল্লোর হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা এতই আদর্শ যে, আমরা আশা করতে শুরু করেছিলাম, বাংলাদেশের সেরা ডাক্তাররা যা পারেননি, সেই রোগ চিকিৎসা এখানে সম্ভব হলেও হতে পারে। প্রথম টেস্ট সাড়ে দশটায়। আমরা ঘুরে ঘুরে হাসপাতাল দেখে বেড়াচ্ছি। রুবাইয়ের পেশেন্ট আইডি, আমাদেরও গার্ডিয়ানের আইডি যথাস্থানে ঝুলছে। একজন মানুষকে অন্ততঃ খুঁজে বের করতে চাইলাম, যার কোনো কাজ নেই সিএমসিএইচে আজ সকালে, অথচ বিশেষ কোনো ক্ষমতা বা জাদুবলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন নাম পরিচয় বিহনে। হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু কোনো গুঁতোগুঁতি, ঠাসাঠাসি বা ভিড়, হৈ হল্লা নেই কোথাও। আশ্চর্য সভ্য মানুষ এই দক্ষিণীরা! আমি তো মুগ্ধ থেকে মুগ্ধতর। যথাস্থানে যথাসময়ে পৌঁছে রিসেপশ্যনে কাগজপত্তর সাবমিট করতে ওরা বসতে বলে ভেতরে গেলেন। ডাক এল মিনিট দুই পরে। জুতো খুলে ঢুকলাম। ভেতরে বাইরের কোনো শব্দের প্রবেশ নিষেধ। তিন-চারটে এরকম ঘর–কেবল মোটা কাচের দেয়াল দিয়ে ঘেরা–পেরিয়ে ল্যাবরেটরিতে পৌঁছলাম। রুবি, আমি একধারে চেয়ারে বসে রইলাম। রুবাই প্রথমতঃ একটু ঘাবড়ালেও যখন ওকে আমাদের মুখোমুখি একটা উঁচু গদিওয়ালা চেয়ারে বসানো হল, ও আশ্বস্তভাবে চিকিৎসকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। মিনিট বিশেক পরে হেডফোন-টোন থেকে মেয়ে মুক্তি পেল। আমরা বাইরে চলে এলাম। চিকিৎসক জানালেন, বাকি দুটো টেস্ট হয়ে গেলে ওগুলোর ফাইন্ডিংস নিয়ে তিনি আমাদের সঙ্গে বসবেন বিকেল সাড়ে-তিনটেয়। গুডলাক, বলে তিনি দরজা ঠেলে ভেতরে গেলেন।

দ্বিতীয় টেস্ট অন্য ল্যাবে ১২টায়। অতএব, এক জায়গায় বসে রুবাইয়ের চিপস চর্বণ ও আমাদের কফিসেবন চলল। হিরণকে দেখা গেল, হাতে সারার হাত। কী খবর? ও এগিয়ে এসে শুধোয়। কী খাবেন? বলে আমি হিরণের জন্য কফি নিয়ে আসি নেস্ক্যাফের সেল্ফ-সার্ভিস ম্যশিন থেকে। কেমন লাগছে? ও আবার আমাকে জিজ্ঞেস করে। বুঝতে পারি, রুবির কাছ থেকে ইতোমধ্যে সব তথ্য সংগ্রহের কাজ ওর সম্পন্ন। বেশ ভাল, এখন মেয়েটার যদি পজিটিভ কোন হিলিং-এর ব্যবস্থা হয়, হুইচ ইজ আ ফার-ফেচ্‌ড পসিবিলিটি, তাহলে সোনায় সোহাগা একেবারে! লেট’স প্রেই ফ’ দ্য বেস্ট, হিরণ বলে, আপনার ভাবির সার্জারি এতক্ষণে শেষ। ছোট অপারেশ্যন। ও এবারে হিয়ারিং এইড থেকে মুক্তি পাবে, আশা করছি। ওর হয়ে গেলে আমরা হোটেলে ফিরে যাব। এখানে বেশ কয়েকটা ক্যান্টিন রয়েছে। ওই ফরেনার্স রিসেপশ্যনের সঙ্গে যে ক্যাফিটেরিয়া, ওখানে আপনি ভাল লাঞ্চ পাবেন। আমিও খাবার প্যাকেট করে নিয়ে যাব আজ। অবশ্যই, আমি জোরালো সমর্থন জানাই, আজ আর হোমস্পান খাবারের জন্য ভাবি বেচারিকে কিচেনে পাঠাবেন না, প্লিজ। ও মৃদু হেসে ভেতরে যায়। সময়মতো দ্বিতীয় টেস্ট সেরে আমরা বিদেশিদের জন্য সংরক্ষিত রেস্তোরাঁয় খেতে গেলাম। বলাই বাহুল্য, শস্তা খাবারের দেশ ভারতে বসেও দামি খাবার খেতে চাইলেই কেবল ওরকম বিশেষায়িত জায়গায় যাওয়ার প্রয়োজন হয়–আমার মনে হল। সাদাসিধে স্টিম্‌ড রাইস, চিকেন স্ট্যূ, ভেজিটেবল সৌটেই আর খুশবুদার ফিরনি খেলাম। জায়গাটা বাতানুকূল, নিঃশব্দপ্রায় এবং পরিচারিকারা অতিথিপরায়ণ।

শেষ পরীক্ষায় হাজিরা দিয়ে বেরিয়ে মেয়ে বলল, আব্বু, ঘুম পাচ্ছে। ঠিক আছে, চল, ডাক্তারের ওয়েটিং রুমে গিয়ে একটু ঘুমিয়ে নেবে। আমি আর রুবি পাশাপাশি বসে রুবাইকে আমাদের কোলে শুইয়ে দিতে সে ঘুমিয়ে পড়ল। তিনটে পঁচিশে ভুবনখ্যাত ইএনটি বিশেষজ্ঞ কাল কফি আর ক্রীমক্র্যাকার খেতে খেতে এসে আমাদের সামনে দাঁড়ালেন। আই ক্যান ডিসমিস ইউ ফ্রম দিস ভেরি প্লেইস, উনি অল্প হেসে বললেন, আয়্যাম ডান উইথ রুবাই’জ ডায়াগনৌসিস। শি হ্যাজ টু উয়্যার আ হিয়ারিং এইড ফর অগমেন্টিং হার হিয়ারিং ক্যাপ্যাসিটি দিস সাইড, বলে ডান কান ছুঁয়ে দেখলেন। শি ওউন্ট নিড এনি আদার ট্রিটমেন্ট। দ্যাট্স অল। ইউ আর নাউ ফ্রি টু রৌম আওয়ার সাদার্ন কান্ট্রি ফর আ ফর্টনাইট অ্যাট লিস্ট। গুড লাক, সুইট বেঙ্গলি গার্ল, বলে ততক্ষণে উঠে বসা রুবাইয়ের থুতনি ছুঁয়ে আদর করে অ্যাবাউট টার্ন করলেন। আমরা তার ডিপার্টমেন্ট থেকে রুবাইয়ের ডায়াগনসিসের যাবতীয় নথিপত্র সংগ্রহ করে হোটেলে ফিরলাম।

wdek_2.jpg……..
দেশে ড. কাজী কামরুজ্জামান ও সহকারীর সঙ্গে রুবাই, ১৯৯২।
……..
থোড়-বড়ি-খাড়া, খাড়া-বড়ি-থোড়। সেই প্রফেসর আলাউদ্দিনের কথাই ঠিক। এবারে আমাদের কন্যারত্নটি হিয়ারিং এইড পরলেই সমস্যার সমাধান হয়। ডান কানের জন্য এইড ড. নাম্বুদিরিপাদ-ই তৈরি করে দেবেন। তার সহকারী মাপ রেখে দিয়েছে। একদিন পর ডেলিভারি। সে যাকগে। রুবাই ওর মায়ের কোলের কাছে গুটিসুটি মেরে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর সারাদিন বিশ্রাম হয়নি। কী ভাবছ? রুবির প্রশ্নের উত্তরে অনেক ভাবনা একসঙ্গে ভিড় করে এল। অনেক কিছু, বলে আমি জুতো খুলে চিৎ হয়ে শুয়ে ভাবি। একমাস ছুটির সবই তো পড়ে রইল। ফিরে যাব? এখন ফেরত গিয়ে কি আর রিও ডি জ্যানিরোর কাফেলায় সামিল হতে পারব? সেটা কি তাহলে আরেকজন, যে সম্ভবতঃ প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে যাবার জন্য, তার মনোবেদনার কারণ হবে না? ছি ছি, এতটা ছোটলোক তো তুমি নও হে, আরেক আমি সোচ্চার হয় এবার, এসেছিলে যে উদ্দেশ্য নিয়ে, সেটার শেষ অবধি যাও। পরশু মেয়ের হিয়ারিং এইড নিয়ে ক’দিন দাক্ষিণাত্যে ঘুরে ফিরে বেড়াও। আর কি কখনো কবে, এমনি সন্ধ্যা হবে… ঠিক, ঠিক, রবি ঠাকুরই তো আমাকে এরকম কিছু কিছু পরিস্থিতিতে পথ দেখিয়েছেন এ যাবৎকাল। উঠে পড়লাম শয্যা ছেড়ে। মা-মেয়ে পুটুর পুটুর আলাপ করছে। হাসপাতালে ওর কী কেমন লেগেছে, রুবাই সেসব সবিস্তারে মাকে শোনাচ্ছে। চল, ঘুরে আসি বাইরে, বলে কেডস পায়ে গলাই আমি। হিরণরা এ বেলা বিশ্রাম নেবে ঘরে, আগেই জেনেছি।

হাইওয়েতে উঠে রুবিকে দেখালাম, ওই দেখ, সান্ধ্য বাজার বসেছে। ও খুব আগ্রহের সঙ্গে মদ্রদেশীয় সাবার্বান ব্যবসামনস্ক নারীদের নিরীক্ষণ করতে লাগল। রুবাই মন্তব্য করল, মেয়েগুলি সুন্দর, একটু কালো। একটু নারে মা, বেশ, রুবি হেসে ফেলল, আমার চেয়েও, তোমার চেয়েও…।

আহ্, কী শুরু করলে তোমরা? আমি বিরক্ত হই। সামনে তাকাও, বলেই আমি হা। ওটা কে? ফিজিওথেরাপিস্ট সালাম না? হ্যাঁ, অবশ্যই, সালাম ভাই, রুবি কনফার্ম করে, উনি তো সিএমসিএইচ-এ হায়ার স্টাডিজের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন? মনে নেই তোমার? তুমিই তো বেলাল চৌধুরীকে অনুরোধ করে মাল্টিপল ভিসার ব্যবস্থা করে দিলে? ঠিক আছে, ঠিক আছে, এখন চুপ কর, ও এদিকেই এগোচ্ছে দু’হাত মেলে, হাসতে হাসতে, আমি বলি। হল কোলাকুলি। কী করে, কেন, কোথায়, কী হল–সবিস্তারে বললাম। পড়তে পড়তে মাথা ঝিমঝিম করছিল, আমিও হাওয়া খেতে বেরিয়েছি, চলেন এক জায়গায় নিয়ে যাই আপনাদের, বলে সালাম রুবাইকে কোলে তুলে নিতে চাইলেও সে উঠল না। এক আঙুল মুখে পুরে দিয়ে মায়ের হাত শক্ত করে ধরল আরো। সালাম কাউকে ডাকল, হে ব্রাদার, আটো, কাম হিয়ার। নোয়াখালির মানুষটি অতি ভদ্র, সজ্জন ও হাসিখুশি।

অটোওয়ালা গাড়ি ঘুরিয়ে এনে সামনে দাঁড়াল। সালাম তামিল বুলি কপ্‌চে দরদাম ঠিক করে চালকের পাশে উঠে পড়তে পড়তে বলল, ওঠেন আপনারা, রুবাই মা ওঠ। মিনিট পনেরো হাইওয়েতে চলে অটো প্রাচীন চেহারার পাথরে বাঁধানো রাস্তায় পড়ল। তেমন মসৃণ না হলেও ওয়েল মেইনটেইন্ড সড়ক। সে পথে আরো কুড়ি মিনিট চলে আমরা উঁচু মালভূমিতে নির্মিত এক মধ্যযুগীয় দুর্গের সামনে পৌঁছে গেলাম। ইট মাস্ট বি দ্যাট ফেইম্যস ভেল্লোর ফর্ট, আমি উচ্ছ্বসিত। ইউ আর রাইট, স্যর, সালাম নেমে টিকিট কাটতে গেল। আমরা ভাড়া মিটিয়ে এগোলাম প্রবেশপথের দিকে। দুর্গে প্রবেশ করে অবাক লাগল। ভেতরটা বেশ অক্ষত রয়েছে বলতে হবে। আর দশটা দুর্গের মতোই সব ব্যবস্থাদি–কামান বসানোর ফোকর, এটিতে বন্দুক বসানোর ফোকরও আছে, প্রহরীদের কক্ষ। দূরে ভেল্লোরের ঘনবসতিপূর্ণ ডাউনটাউন নজরে এল। সন্ধে ঘনাচ্ছে। বাতি জ্বলে উঠলে আমরা নিচে নেমে এলাম। বহু দর্শনার্থী তখনো ভেতরে। ফিরতি যাত্রায় অটোচালককে আমাদের হোটেলের ঠিকানায় যেতে বলা হল। সে শর্টকাট রুটে শহরতলীর দৃশ্যাবলী দেখিয়ে আমাদের জায়গামতো পৌঁছে দিল।

প্রোগ্রামে নেক্সট গন্তব্য? সালামের প্রশ্নের উত্তর তক্ষুনি দিতে না পারলেও আন্দাজ দিলাম, রুবাইয়ের এইড ডেলিভার করলে আমরা হয়তো কিছুদিন বেড়িয়ে যাব। নিশ্চয়, চলেন, আপনাকে আমার লোকাল ট্র্যাভেল এজেন্ট-কাম-বুকলেন্ডারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। সেই সঙ্গে দ্য ওনলি বাংলা ঈটিং হাউসের পরিচালকদের সঙ্গে আলাপ হবে। আসা-যাওয়ার মাঝে কয়েকদিন যাতে এখানে আরামে স্টেই করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা আর কি! আর, ভাল হোটেলের কথা যে বলছিলেন, সেখানেও নিয়ে যাচ্ছি। সেই ভাল, সব জেনেশুনে রাতের খাবারটা নিয়ে ফেরা যাবে, বলি আমি। রুবি কফি আর সামোসা আনিয়েছে। খেয়ে আমরা বেরলাম। এই রাস্তায় আলো তেমন নেই। এই শুনশান পরিবেশে খারাপ লাগতো না। কিন্তু এখানে হোটেলবাস আমার পছন্দ হচ্ছিল না। ইচ্ছে করছিল, একটু সদরে, আরো আলোকিত কোথাও শিফ্ট করি। তো সালামের সঙ্গে মোলাকাত হওয়াতে অনেক মুশকিল-আসান হয়ে গেল আধঘণ্টার মধ্যেই! বাংলা রেস্তোরাঁ গীতাঞ্জলি আবিষ্কার হল, চমৎকার হোটেল সোলাই দেখে এলাম আর সত্য বা সাতিয়া-র সঙ্গে আলাপ–যে তরুণ একই সঙ্গে শিক্ষিত লাইব্রেরি রক্ষক, রেল-বাস-বিমানযাত্রার সংগঠক ও রেন্ট-আ-কারের পরিচালক। আলাপ হতেই সাতিয়া একটি পুরনো, কাগজ লাল হয়ে যাওয়া বই ‘মেমোয়ার্স অব আ সৌলজা’ ধার দিল–পড়তে। অজস্র ধন্যবাদ জানিয়ে সালামকে ওর হাসপাতালের গেইটে ছেড়ে এলাম।

গীতাঞ্জলি রেস্তোরাঁ থেকে মা-মেয়ের জন্য ‘থালি’ আর নিজের জন্য রুটি-তরকারি-পাঁঠার মাংসের স্ট্যূ নিয়ে ফিরছি। মনটা খুশি খুশি। হাতমুখ ধুয়ে একপাত্তর রামজল নিয়ে একটা পত্রিকা নিয়ে বসলাম। দরজায় নক্ নক্। কাম ইন প্লীজ, ইট’স ঔপ্‌ন, হেঁকে জানান দিলাম। হিরণ এসে পাশের সিঙ্গল সোফায় আসীন হল। কাল কী করব আমরা? ওর প্রশ্নের উত্তরে জানালাম, কাল বিশ্রাম। কাজ নেই। গল্পের বই এনেছি ভেল্লোর রিডিং ক্লাব থেকে, এই দেখুন। পরশু রুবাইকে হিয়ারিং এইড পরিয়ে দেবে। তারপর ছুটি! হিরণ বিড়বিড় করে বলল, আপনার ভাবি আর বাচ্চারা ঘুরতে চায়। আরো চায়, আপনারাও আমাদের সঙ্গে থাকবেন। তা বেশ তো, কিন্তু কোথায় কোথায় যাবেন বলুন তো? আমি তো এবার ডেকান সার্কিট ঘুরে যাব একটুখানি, ঠিক করেছি–ব্যাঙালোর ,মাইসোর, ঊটি হয়ে ওপাশ দিয়ে নেমে ওয়েলিংটন, কুনুর, কোদাইকানাল হয়ে… আমার কথা শেষ হয় না, তার আগেই হিরণ বলে ওঠে, কিন্তু আমি যে দিল্লি-আগ্রা-আজমীর যাব ভাবছিলাম, তার কী হবে? কোনো ঝামেলা তো নেই তাতে, আমি সোজাসাপটা উত্তর দিই, ইউ গো নর্থওয়ার্ড অ্যান্ড আই মুভ অ্যারাউন্ড দ্য প্লেইসিজ আই জাস্ট মেনশ্যন্ড। মাই ট্রাভেল এইজেন্ট উইল বুক ইওর টিকিট্স টু এনিওয়্যার–হেভ্ন অর হেল! এক চুমুকে গেলাস খালি করে আবার পানীয় তৈরি করি। হিরণ মুখ কালো করে উঠে গেল। একটু পরেই ভাবি এলেন ঘরে। বিছানায় উঠে বসে রুবির সঙ্গে গুন গুন করে কী সব আলাপ করতে থাকলেন। আমি পাঠে মগ্ন হলাম।

ডিনার খেয়ে ছোট্ট রাইটিং টেবিলে টেবিলবাতি জ্বেলে সত্যর কাছ থেকে আনা উপন্যাস পড়তে বসলাম। সিপাহি বিপ্লবের অব্যবহিত পরেই পেশোয়ার ছাউনিতে পোস্টেড এক লে. ম্যাকগ্রথ কাহিনীর লেখক। অত্যন্ত রগরগে বর্ণনা। ভিক্টোরিয়ান যুগের রক্ষণশীলতার কোনো ছাপ লেখাতে নেই। শেষ করতে মাঝরাত পার হয়ে গেল। ঘুম আসতে আরো দেরি হল। সকালে দেরিতে উঠে বাইরে গিয়ে সেদিন গরম ধোসা আর সম্ভার নিয়ে এলাম। ওমলেটও এনেছি। ফ্লাস্কে গরম জল। রুবাইও দেরি করে উঠেছে। ভাগ্যিস্। ব্রেইকফাস্ট সেরে পাশের ঘরে গিয়ে হিরণকে জানালাম, আমি খাবার এনে খাওয়াতে খাওয়াতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। ঐ সোলাই-য়ে ভাল রেস্তোরাঁ রয়েছে, আমরা স্নান করে বিল মিটিয়ে ওখানে শিফ্ট করছি। হিরণ শুধু বলল, আমরা এখানেই রইলাম। ট্রেনের টিকিট পেলে চলে যাব। ট্যাক্সি ভাড়া করে ঘুরতে যাবেন তো? গাড়ির চাকা-ফাকা, ইঞ্জিন দেখে উঠবেন, নইলে দূরের পথে ঝামেলা হবে আবার। সে দেখা যাবে, অনেক ধন্যবাদ, হিরণ। আমি বেরিয়ে এলাম। রুবি-রুবাই ওদের ঘরে ঢুকল বিদায় নেবার জন্য।

সোলাই চমৎকার হোটেল। হঠাৎ গিয়ে পছন্দমতো ঘর পাওয়া গেল না। নিচের তলাতেই এক কোণে ঘরটিতে ঢোকার পর দেখলাম, দুই দেয়ালে চারটে জানালা। ফুলের বাগান ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসা আলো আর বাতাস–দুইই প্রচুর। ঠিক দশ পা হাঁটলেই রেস্তোরাঁ। একটা বড় ঝামেলা থেকে বাঁচলাম। এটা ব্যস্ত রাস্তার ওপরে বিধায় প্রচুর সংখ্যক রেস্তোরাঁ–সবই কাছাকাছি। গীতাঞ্জলি-ও। ঠিক হল, ডিনার এখানেই খাব, লাঞ্চ বাংলা ভোজনালয়ে আর ব্রেইকফাস্ট যত্রতত্র। মুক্তবিহঙ্গের মতো লাগছিল যেন। তেমনি মনের কোণে খচ্‌ খচ্ও করছিল। কোথাও। ফ্র্যন্ট অফিসের একজন এসে জানিয়ে গেল, এ ঘরটা মালিকের অতিথিদের জন্য সংরক্ষিত। আমরা বুকিং ছাড়া সকালে এসে উঠেছি বলে এবং সিএমসিএইচের ‘ওহ্ ডক্টর কে খাতির’ ম্যানেজার সাব এ বেলা আমাদের কষ্ট করে এখানেই তিষ্ঠোতে অনুরোধ করেছেন। লাঞ্চের পর আমাদের ঘর পাঁচতলায় ‘রেডি’ থাকবে টু বি অকিউপাইড। ধন্যবাদ জানালাম। কোন দুর্বোধ্য কারণে রুবির হঠাৎ হিন্দি চর্চার ইচ্ছে হল। ভদ্রলোক যখন দরজা বাইরে থেকে টেনে বন্ধ করছেন, রুবি হাতছানি দিকে তাকে ডাকতে লাগল এবং উচ্চারণ করল, এ বাই শুনো শুনো, থোরা পানি। বিমূঢ় যুবকটি ফের ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজার পাল্লা ফাঁক করে জিজ্ঞাসু ভঙ্গিতে তাকাল। আমি সামলে নিয়ে জানালাম, শি নিড্স আ ড্রিঙ্ক অব ওয়াটার প্রব্যবলি। উড ইউ সেন্ড সামব্যডি উইথ আ পিচার অব আইস্ট ওয়্যটার, প্লীজ?

শ্যূওর থিং স্যর, রাইট এওয়ে, বলে কোমর ঝুঁকিয়ে বাউ করে দরজা টেনে দিয়ে গেল। ঠোঁটের কোণ মুচড়ে একটু হাসি গিলল কি ছেলেটি? কত ধরনের কাস্টমার যে ওদের সামলাতে হয়!

অলস সকাল কাটিয়ে তিনজনে গীতাঞ্জলি ভোজনালয়ে লাঞ্চ খেতে গেলাম। চক্রবর্তী দম্পতি স্মিত হেসে অভ্যর্থনা জানালেন। জানলার ধারে বসলাম। নিচে ব্যস্ত রাস্তা, যানবাহন কম, মানুষজনের ভিড়। আমি ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে যা যা খাব বললাম। ক্যাশিয়ার তরুণীটি হিসেব কষে টাকা চাইল। পেমেন্ট করার পর প্ল্যাস্টিক টোকেন পেলাম একটা। প্লিজ গেট ব্যাক টু ইওর টেইব্‌ল অ্যান্ড ওয়েইট, স্যর। ইয়োর ফুড উইল বি সার্ভড বাই আওয়ার স্টাফ, মেয়েটি হেসে বলল।

বাট উই কুড ব্রিং ইট আওয়ারসেলভ্জ, আমি আপত্তি জানালাম।

ও আবার হাসল, মি. চাক্রাবার্টিজ অর্ডার, স্যর।

বুঝলাম, কিন্তু আমার খারাপ লাগল। প্রেফারেনশিয়াল ট্রিটমেন্ট এত প্রকাশ্যে আমার সয় না। ফিরে গিয়ে রুবিকে বললাম। একটা ছেলে ফ্রেশ স্যালাড দিয়ে গেল। শশার টুকরো কাঁটায় গেঁথে মুখে দিলাম। লেবুর রসে সিক্ত শশা। রুবি-রুবাইও কচকচিয়ে শশা, ট্যমাটো, পেঁয়াজের আংটি চিবোতে লাগল। খিদে পেয়েছে খুব, মা? রুবাইকে জিজ্ঞেস করতে সে বলল, হুঁ, ডাল-ভাত খাব। ছেলেটি খাবারের ট্রে নিয়ে এল। ডাল, ভাত, তরকারি, মাছ, মুরগি। রান্না চমৎকার। মশলাপাতির ঝাঁজ নেই। ঐ ছেলেটিই আবার পাঁপড় আর দৈ পরিবেশন করে গেল। একেবারে শাস্ত্রসম্মত বাঙালি খাবার। রকমফেরও রয়েছে, তবে সবই সেট মেনিউ।

ফেরার সময় কোয়ালিটির আইসক্রিম কিনেছিল রুবি। হোটেলে ফিরে লাউঞ্জে বসে আমি কফি চাইলাম। ওরা আইসক্রিম খেতে লাগল। রুমের চাবি চাইলাম। প্লিজ ওয়েট আ বিট, স্যর। ইওর ব্যাগজ আর অলরেডি গন আপস্টেয়ার্স। দ্য রুম মেকার্স উইল নোটিফাই অ্যাজ সুন অ্যাজ দেই আর ডান। একটুক্ষণ পরেই আমার হাতে চাবি দিয়ে গেল একজন। রুম ৬০১। লিফটে উঠে কয়েক সেকেন্ডে পৌঁছে গেলাম পাঁচতলায়। করিডোরের শেষে আমাদের ঘর। সামনের দরজা খুললে ছাদ। পট প্ল্যান্ট সাজিয়ে সুন্দর ফুল বাগান করেছে এরা সেখানে। রুবাই এক দৌড়ে ঘুরে এল। খুব সুন্দর বাগান, মা, কী সুন্দর সুন্দর ফুল! মেয়ে উচ্ছ্বসিত। ঘরে ঢুকে সে আরো খুশি। টিভি, ফ্রিজও আছে আম্মু, দেখ। এই বাসাটা ওই বাসার চেয়ে ভাল, না মা?

হ্যাঁ মা, এবার হাতমুখ ধুয়ে একটু শুয়ে থাকবে চল। বিকেলে বেড়াবো আমরা ছাদের বাগানে, কেমন?

আমি পোশাক বদলে একটা সাময়িকী নিয়ে আমার বিছানায় গড়িয়ে পড়ি। কখন ঘুমিয়েছি জানি না। পাঁচটায় উঠে জল খেয়ে, হাতমুখ ধুয়ে তৈরি হলাম। বেরতে হবে। ওরা গেল কোথায়? ওই ছাদ-বাগিচায় নিশ্চয়ই! ঠিক। রুবাই, রুবি দু’জনেই ছোটাছুটি করছে।

সত্যর বইটা ফেরত দিতে গেলাম। ম্যানেজার আমাদের বসাল। পাখা চালিয়ে দিল। নিজেই কফি বলে এল। আমি বারণ করিনি। এখানে সারাদিন কাটিয়ে দেয়া যায় বই ঘেঁটে। সত্য কি জানে, ওর এখানে কে কী রত্ন ফেলে গেছে থ্র্যোউ অ্যাওয়ে প্রাইসে? মনে মনে বলি। গত সন্ধ্যায় ও বলেছিল বটে, চেনা-অচেনা অনেকেই বাড়িতে জায়গা নেই বলে বাপ-পিতামোর পুরনো বইয়ের বান্ডিল এনে ওর এখানে নামিয়ে দিয়েছে। সত্য যাহোক লাম্প সাম কিছু টাকা তাদের দিয়ে দিয়েছে। যে বইটা পড়তে নিয়েছিলাম, সেটি আশি বছর আগে বিলেতের প্রকাশক ছেপেছিল। দাম এক শিলিং! আমি ক্যাজুয়্যালি ওটা বিক্রির জন্য কিনা জিজ্ঞেস করায় সে আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে একটু থেমে বলেছিল, টুয়েন্টি রুপিজ ওনলি। আমি বিস্ময় গিলে ফেলে আবার শুধিয়েছিলাম, আর রিডিং চার্জ? দো রুপেয়া, স্যর। বাট আই’ল নট চার্জ ইউ এনিথিং ফর রিডিং। ইউ হ্যাভ টু ডিপজিট রুপিজ টুয়েন্টি এজ শুয়র‌্যটি। ইন কেইস ইউ লিভ ট্যমরো মর্নিং উইদআউট টেলিং মি! আউট অ্যান্ড আউট আ বিজনিসম্যান, দিস গাই, মনে মনে বলেছিলাম এবং কুড়ি টাকা রেখে বইটা পড়তে নিয়েছিলাম। কিছু কিছু বইয়ের ব্যাপারে আমার মধ্যে অদ্ভুত অপত্য আবেগ কাজ করে। অঁদ্রে জিদের ‘স্ট্রেইট ইজ দ্য গেইট’, জন স্টাইনবেকের ‘ঈস্ট অব ঈড্ন’, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘আইল্যান্ড্জ ইন দ্য স্ট্রীম’–এরকম আরও কয়েকটি বইয়ের সংগ্রহযোগ্য কপি নজরে এলে আমি সেগুলি পার্সের সাধ্যে কুলোলে সংগ্রহ করে আরেকবার পড়ি। একান্ত প্রিয়জন ছাড়া কাউকে আমি এসব বই দেবার কথা ভাবি না।

সত্য এসেছে কখন, দেখিনি। আমার হাতে কফির গ্লাস গরম ঠেকছে না আর। সত্যর টেবিলে তিনটে তিন রঙের টেলিফোন সেট। একটা না একটা তো বাজছে প্রায়ই, মাঝে-মাঝে দু’টো ফোনেও কথা বলতে হয় ওকে, দেখলাম। স্যর, আই হ্যাভ চক্‌ট আউট আ ট্র্রাভেল প্ল্যান ফ’ ইউ লাস্ট নাইট, কাজের ফাঁকে সে আমাকে জানাল, উই’ল ডিস্কাস ইট হোয়েনএভার ইউ আর রেডি। সত্যর মস্ত দোকানের একপাশে পনব্রোকার্স কর্নার। সেখানে কাচের নিচু শোকেইসে নানাধরনের, রং-এর, বয়সের কৌতূহলোদ্দীপক দ্রব্যসামগ্রী রুবাইকে আটকে ফেলেছে। সে মৌচাকে মৌমাছির মতো কাচে নাক লাগিয়ে সেগুলি পর্যবেক্ষণে বুঁদ হয়ে আছে। কেবল রুবি চেয়ারে হেলান দিয়ে চুপ করে বসে। সে একবার আমাদের দেখে নিয়ে আবার পথের মানুষজনের দিকে অলস দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। বেচারি মনে মনে অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে নিশ্চয়ই।

বাতি জ্বলল দোকানে। আমি সত্যর সামনে এসে বসলাম। সে হেসে একটি নতুন ম্যাপের ভাঁজ খুলল। পর্যটনে নতুন জায়গায় গেলে আমি এরকম ম্যাপ কিনি। তাতে পুরো দাক্ষিণাত্য বিধৃত। প্রয়োজনীয় তথ্যাদি যেমন, সড়কপথ, রেলপথ, স্টেশন, বিমানবন্দর, পরিচিতিশুদ্ধ আঞ্চলিক বিভিন্ন হাইওয়ে, দ্রষ্টব্য ঐতিহাসিক নিদর্শন, লেইক, নদী ইত্যাদি ইত্যাদি। ম্যাপের ওপরে ফ্লুরেসেন্ট মার্কার দিয়ে আমাদের সম্ভাব্য ভ্রমণের রুট দাগানো হয়েছে। একটা টাইপ করা কাগজের গোছা আমার হাতে দিয়ে সে বলল, স্টাডি দ্য ইনফর্মেইশ্যন শীট্জ অ্যান্ড দ্য ম্যাপ ট্যনাইট অ্যান্ড কাম ব্যাক ট্যমরো আফটার ফিনিশিং বিজনিস অ্যাট সিএমসিএইচ। সৌ ইউ আর অ্যাট পীস উইথ ইওরসেল্ফ ট্যডেই, আই হৌপ, সিন্স ইউ লেফ্ট দ্যাট ধারাম্‌সালা অ্যান্ড চেক্‌ট ইন অ্যাট সৌলাই অ্যান্ড লাঞ্চ্‌ট অ্যাট গীতাঞ্জলি। ইয়েস, উই মাস্ট থ্যাঙ্ক ইউ অ্যান্ড ড. সালাম ফর অল দ্য ইউজফুল টিপস, আমি হেসে বলি, অ্যান্ড এনাদার থিং– আই’ম নট টেকিং ব্যাক দ্যাট শুয়ার‌্যটি এমাউন্ট আই ডিপজিটিড ফর দিস বুক। ডু ইউ মাইন্ড ইফ আই কিপ ইট? সত্য হেসে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে বলে, ঔকেই স্যর, সি ইউ ট্যমরো মনিং। টেলিফোন বেজে উঠল আবার।

হোটেলে ফিরে রেস্তোরাঁয় বসে ভেজিটেবল পকোড়া, রুবাইয়ের জন্য দুধ আর আমার জন্য ঔভ্যলটিন দিতে বললাম। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই ফ্যাসিলিটিতে সারাদিনই অতিথির যাতায়াত লক্ষ্য করেছি। অত্যন্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। পট প্ল্যান্টের সৌজন্যে জায়গাটাকে বাগানের মতো দেখাচ্ছে। বাগানে বসে খেতে ভাল লাগছে, আব্বু? রুবাই হেসে বলে, হ্যাঁ, খুব থুন্দর। এই বাসার সবই ভাল। হঠাৎ কী মনে পড়ায় ওদের বসতে বলে রিসেপশ্যনে গিয়ে হিরণদের হোটেলে কানেক্ট করতে বল্লাম। পাওয়া গেল সঙ্গে সঙ্গেই। জিজ্ঞেস করলাম, কাসেম সাহেব আছেন, না চলে গেছেন। ওরা জানাল, আগামীকাল সাহেব কোলকাতা যাচ্ছেন, টিকিট কাটা হয়েছে। ফোন রেখে রেস্তোরাঁয় ফিরে বিল মিটিয়ে আমরা ঘরে গেলাম। পোশাক বদলে, হাতমুখ ধুয়ে আমি বই নিয়ে বসলাম। ওরা টিভি দেখতে লাগল। ছাদে এদের ডিশ এ্যান্টেনা ফিট করা। স্যাটেলাইট কানেকশ্যনের বদৌলতে এখানে বিভিন্ন দেশী-বিদেশী চ্যানেলে টিভি প্রোগ্রাম উপভোগ করা যায়। মা-মেয়ের ব্যস্ত সময় কাটতে লাগল। ক্ষিদে পেলে বলবে, আমরা ওই বাগান রেস্তোরাঁয় বসে খাব গিয়ে। আমার কথায় মেয়ে নেচে উঠে সায় দিল, হ্যাঁ আব্বু। একটু পরে যাব। ফোন বাজল। রুবি ধরল না। অগত্যা আমি উঠলাম। হিরণ জানাচ্ছে, ওরা কাল কোলকাতা রওনা হবে। পরশু রাজধানী এক্সপ্রেসে নয়াদিল্লি যাবে। গুড্, আমি, বললাম অ্যান্ড গুড লাক্, মাই ফ্রেন্ড। আমাদের এখনো পরিকল্পনা চলছে, প্রক্রিয়াধীন। খেতে নেমে গেলাম। এদের রান্নাও ভাল, তবে ওই কারিপাতার অত্যাচার আছেই।

সকালে রুবাইয়ের ডাক্তার নিজ হাতে ওর ডান কানে এইড ফিট্ করে দিলেন। কতবড় চিকিৎসক! প্রায় ত্রিশ বছর আগে যখন উনি অ্যামিরিকায় তরুণ শল্যচিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করেছেন, সেই ১৯৬২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি যখন আততায়ীর আক্রমণে মৃত্যুপথযাত্রী, যে বিশিষ্ট চিকিৎসকেরা তাকে শেষ চিকিৎসা দিয়েছিলেন, ইনিও সেই টিমে ছিলেন। প্রবাদপ্রতিম দক্ষতার অধিকারী এই চিকিৎসক পরবর্তী জীবনে ইএনটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে ওদেশে বহুদিন চিকিৎসা করে বছর দুই আগে স্বদেশে ফিরেছেন। ঢাকাতেই আমি ওর সম্পর্কে শুনেছিলাম। প্রফেসর কাজী কামরুজ্জামান আমাকে বলেছিলেন, যদি রুবাইয়ের কানের কোনো চিকিৎসা থেকে থাকে, তাহলে ওর কাছে গেলেই আপনি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরামর্শ পাবেন, এ কথা নিশ্চিত। পকেটে হাত ঢুকিয়ে একমুঠো টফি বের করে রুবাইয়ের কাঁধে ঝোলানো ছোট্ট ঝোলায় ঢুকিয়ে দিয়ে বললেন, নাউ, মাই লিটল মার্মেইড, চিয়ার আপ অ্যান্ড উইন দ্য ওয়ার্ল্ড!

মেয়ে আমার সদাই চিয়ারফুল। ডাক্তারের কথায় রুবি আর আমি উৎফুল্ল হবার চেষ্টা করি। ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে আসি।

(কিস্তি ২)

m.waliuzzaman@gmail.com
আর্টস প্রোফাইল: মীর ওয়ালীউজ্জামান


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rabbani — জুলাই ২৪, ২০১১ @ ৪:০২ অপরাহ্ন

      বাহ্ মজা পেলাম। ভ্রমণকাহিনীতে ঘটনা তুলে ধরার সাথে সাথে লেখকের চিন্তা বা আদর্শের লেপন দেয়াটা খুব আর্টিস্টিক লেগেছে। রিপোর্ট লেখার কলম দিয়ে লেখা বলে কিছু কিছু প্রামাণিক বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে, যেটা হয়ত অভ্যাসগত। পরের টুকুর জন্যে হা করে থাকলাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ibrahim — জুলাই ২৬, ২০১১ @ ৯:১০ অপরাহ্ন

      ‘আরো সিদ্ধান্ত নিলাম, দাক্ষিণাত্য যাত্রার খরচাদি আমি উপার্জন করেই নিয়ে যাব, অফিস থেকে নেব না।’-অফিস থেকে নেওয়া টাকা কি নিজের উপার্জন করা টাকা নয়!

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com