কিবরিয়ার অনুপস্থিতি ও তাঁর চিত্রভাষা

মোস্তফা জামান | ১৫ জুলাই ২০১১ ১২:৩৫ অপরাহ্ন

kiria_2004.jpg……..
মোহাম্মদ কিবরিয়া, ২০০৪
…….
গত ৭ জুন শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার অন্তর্ধানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিমূর্ত শিল্প আন্দোলনের প্রধান পুরুষের অনুপস্থিতি কলা অঙ্গনে কী প্রভাব ফেলবে তা আন্দাজ করতে না পারলেও এ কথা হলফ করে বলা যায়, ষাটের দশকের এই মগ্ন ও স্বল্পভাষী ব্যক্তিত্বের বিদায়ের মধ্য দিয়ে একটা যুগের সমাপ্তি ঘটল।

এই যুগের হাওয়া আমাদের শোকাহত হওয়া থেকে দূরে রাখবে হয়তো। কারণ নানান ডায়ভার্শনে লীন হয়ে আমরা শিল্পকলার ‘অরা’ বা আলোকবর্তিকা সম্পর্কে উদাসীন হয়ে উঠছি। মানুষের অনুপস্থিতিতেও আমরা আর তেমন ভাবিত হই না।

mk_1975.jpg……..
পেইন্টিং ইন ব্ল্যাক, তেল, ১২০X১২০ সেমি; ১৯৭৫
…….
বলতে গেলে কিবরিয়া ‘অরা’তে বিশ্বাসী শিল্পীদের অন্যতম প্রতিনিধিত্ব শীল ব্যক্তিত্ব। শিল্পের অটোনমিতে বিশ্বাসী হিসেবেও এই মৃদুভাষী (জীবন ও কর্ম উভয় অঙ্গনে) শিল্পী ব্যক্তিত্বকে চিহ্নিত করা যায়। বস্তুত, ষাটের দশকের তারুণ্যের বিলিফ সিস্টেমে এইটি ছিল অন্যতম বিশ্বাস। আধুনিকতার যে জোয়ার তিরিশের দশকের কবিদের একাকিত্ববাদিতার পিছনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে, তেমন ষাটের দশকের শিল্পাঙ্গনে ‘অটোনমি’ বা ‘স্বশাসন’ ছিল মূল ধারণা।

স্বশাসনের সূত্রেই ষাটের দশকে শিল্পের পরিসরের পরিবর্তন সাধিত হলো—শিল্পের বাইরের সমাজ, সংসার, মানব ও তার সম্পর্কবিষয়ক চিহ্ন ক্যানভাস থেকে দূরে রেখে শিল্পীরা বিমূর্ত ধারা জন্ম দিলেন। যে নব্য ধারার সূচনা হলো এতে—তার অনুপ্রেরণা ভিন্ন সমাজের ভিন্ন শিল্পের ধারণা থেকে এলেও এতে যোগ হলো ঢাকা শহরের দেয়ালের স্যাঁতাপড়া বিমূর্ত মানচিত্র। যে শিল্পীদ্বয় এই ধারায় বেশ কিছুটা সাহসের পরিচয় দেখিয়েছিলেন তাঁরা হলেন—মোহাম্মদ কিবরিয়া ও মূর্তজা বশীর।

mk_lightondust.jpg……..
লাইট অন ডাস্ট, তেল, ১২৭ X ৭৫ সেমি; ১৯৮০
……..
কথিত আছে কিবরিয়াই প্রথম বাংলাদেশী শিল্পী যিনি বিমূর্ত ভাষার শিল্পে হাতেখড়ি দেন জাপান প্রবাসকালে। অর্থাৎ ১৯৫৬ থেকে ১৯৬২ এই সময়কালের সম্ভবত অন্তিম পর্বে কিবরিয়ার হাতে বাংলাদেশী বিমূর্ততার জন্ম হয়। যদিও দেশী বিমূর্ততা বলে একেবারেই আলাদা কিছু চিহ্নিত করার দায় আমাদের আছে কিনা সেই প্রশ্ন মীমাংসার দাবি রাখে, তবে একই তরিকার ভিন্ন ভাষ্য দেশ-কাল-পাত্রের সূত্রে জন্ম নেয়—এ ধারণা অমূলক নয়। কিবরিয়া-ধর্মী বিমূর্ততাকে এই কারণে ‘ঢাকাই বিমূর্ততা’ নাম দিয়ে দেয়া যায়, সিরিয়াস-ধর্মী লেখকরা তা মানুন আর নাই মানুন।

এই ঢাকাই বিমূর্ততার যাত্রা শুরু ষাটের দশকের প্রথম থেকেই। আর এই আন্দোলনের ফলে পূর্বতন ঢাকাই ছবির যে বঙ্গদেশকেন্দ্রিকতা তাতে ছেদ পড়ছে না—এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কারণ সুলতান-কামরুলের বৃহৎ ব্যাপ্তির চিত্রভাষা বিমূর্ত চিত্রভাষার পাশে অনাধুনিক বলে অনেকে ভাবলেন। ভাবনাই মূল, ফলে কিবরিয়া ও তার সমসাময়িকের চিত্রকলা ‘অগ্রযাত্রার’ সোপান বলে পরিগণিত হলো। সঙ্গীদের ভিতর ঢাকায় জয়নুল-প্রবর্তিত চারুকলা প্রতিষ্ঠানের প্রথম বছরের ছাত্ররাই প্রধান। এদের মধ্যে সময়ের বিচারে অগ্রগণ্য মূর্তজা বশীর ও আমিনুল ইসলাম। একই পথে অগ্রসর হওয়ার তরে নিজস্ব মেজাজ ও তালিম অনুসরণ করে এরা দু’জনও বিমূর্ততার আন্দোলন ছড়িয়ে দিলেন। বর্তমান সময়ে যদি ওই চিত্রপ্রকল্পের অর্জন নিয়ে বিশেষ দৃষ্টিক্ষেপ সম্ভব করে তোলা হয়, তবে একনিষ্ঠ সাধকসুলভ বিমূর্ততাবাদী হিসাবে মোহাম্মদ কিবরিয়ার নাম প্রধান হয়ে উঠবে।

mk_boyswithflowers.jpg……..
বয়’জ উইথ ফ্লাওয়ারস, লিথোগ্রাফ, ৪৬ x ৬০ সেমি; ১৯৫৯
……..
তাঁর পথের আদ্যোপান্ত যদি উদ্ধারের চেষ্টা চলে, জানা যাবে চল্লিশের দশকের শেষের ভাগে তিনি যে কোলকাতার কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফ্‌টের ছাত্রত্ব গ্রহণ করেছিলেন—সেখানেও বিমূর্ততার ইঙ্গিত দেয়, এমন চিত্র তিনি এঁকেছিলেন। শিল্পী নিসার হোসেনের ভাষ্যমতে—জড়জীবন ক্লাসে কলাপাতায় চিংড়ি আঁকতে গিয়ে জলরঙে শিক্ষার্থী কিবরিয়া প্রথম বাস্তববাদী অঙ্কনরীতি ত্যাগ করেন আর বিষয়বস্তুর আবছা ইন্টারপ্রিটেশনের মধ্য দিয়ে মাছের ভেজা ভাবকেই পষ্টতা দিতে ব্রতী হয়েছিলেন। বোধগম্য হয় এই যে, শিল্পী হিসেবে কিবরিয়া কোন ভাষায় কথা বলবেন তা ছাত্রাবস্থায়ই ঠিক করে নিতে পেরেছিলেন।

১৯৫০-এ পাঠ চুকিয়ে দিয়ে কিবরিয়া চলে আসেন ঢাকায়। এখানেই তাঁর শিল্পকৃতির বিকাশ ঘটেছে। জন্ম যার বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে, কালক্রমে তিনি হাজির হলেন ঢাকায়, যোগ দিলেন জয়নুল ও তার সতীর্থদের গড়ে তোলা চারুকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিয়োগের সুযোগ ঘটে ১৯৫৪ সনে। যখন ঢাকা শিল্পকলার নতুন কেন্দ্র, যেখানে কোলকাতা থেকে চ্যুত মুসলমান বাঙালি শিল্পীরা নানান তৎপরতা শুরু করেছিলেন।

পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় তখন বাঙালি পরিচয় সন্ধান করাই প্রধান প্রকল্প, আর এর বিপরীত মেরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত কসমেটিক ইসলামীকরণ। কিবরিয়া এই দ্বন্দ্বের পথে এগোন নি। তিনি এবং তাঁর সমসাময়িক তরুণেরা আধুনিকতার পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বেশি মনোযোগী ছিলেন, আইডেনটিটি পলিটিক্স তাদের বাস্তবে ভাবালেও শিল্পসৃষ্টির ক্ষেত্রে তেমন অনুপ্রেরণা দেয় নি।
—————————————————————–
অখণ্ড ভারতে সংখ্যালঘু হিসেবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর আইডেনটিটির রাজনীতি তাদের ভিন্ন পথের সন্ধানী করে তুলছিল। যখন বাঙালি মহীরুহসম শিল্পীরা হিন্দু আখ্যানের আশ্রয়ে চিত্র রচনা করছেন, মুসলিমদের আধুনিক সেক্যুলার শিল্পের দিকে না তাকিয়ে অন্য উপায় ছিল না। কারণ তাদের তো শিল্পের দেশীয় কোনো ঐতিহ্য ছিল না।.. ফলে বাঙালি মুসলিমের ভরসা হয়ে ওঠে পাশ্চাত্যের আধুনিক ধারার কিছু নমুনা।
—————————————————————-

ষাটের দশকের শুরুতে যে শিল্পীরা নতুনত্ব সন্ধানী ছিলেন, তাদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ হলেন মোহাম্মদ কিবরিয়া। আমিনুল ইসলাম, মূর্তজা বশীর ও কাজী আব্দুল বাসেত—বিমূর্ততামুখী এই তিন শিল্পী ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকার আর্ট কলেজের প্রথম দিকের ছাত্র। কিবরিয়া ১৯৫০ সালে স্নাতক লাভের পর ঢাকা পাড়ি জমান। জাপানে বৃত্তির (১৯৫৯ থেকে ’৬২) সূত্রে তিনিই প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে বিমূর্ত ছবি অঙ্কন করেন। এর ঐতিহাসিক সত্যতা আছে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতও ব্যক্তি ও তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ঠিক করা যায়—ব্যাখ্যাও সম্ভব।

mk_1958.jpg……..
১৯৫৮-র কিবরিয়া
…….
অখণ্ড ভারতে সংখ্যালঘু হিসেবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর আইডেনটিটির রাজনীতি তাদের ভিন্ন পথের সন্ধানী করে তুলছিল। যখন বাঙালি মহীরুহসম শিল্পীরা হিন্দু আখ্যানের আশ্রয়ে চিত্র রচনা করছেন, মুসলিমদের আধুনিক সেক্যুলার শিল্পের দিকে না তাকিয়ে অন্য উপায় ছিল না। কারণ তাদের তো শিল্পের দেশীয় কোনো ঐতিহ্য ছিল না। মোগল রীতি অবনীন্দ্রনাথরা যতটা সহজে হিন্দু মিথের সাথে মিলিয়ে নিতে সচেষ্ট হয়েছিলেন, বাঙালি মুসলিম কোনো শিল্পীর পক্ষে তেমনটা সম্ভবপর হয় নি, কারণ ভারতীয় জাতীয়তা নামক যে বস্তু, যা বোধ জাগানিয়া তা তার স্বার্থে তৈরি হয় নি। ফলে বাঙালি মুসলিমের ভরসা হয়ে ওঠে পাশ্চাত্যের আধুনিক ধারার কিছু নমুনা। রিয়েলিজম এই নমুনার একটি। জয়নুলে এর লাগসই প্রয়োগ দেখা যায় তেতাল্লিশের মন্বন্তরের সময় কোলকাতার ফুটপাতে নিরন্ন মানুষের প্রামাণ্য দলিল তৈরির চেষ্টায়। শফিউদ্দিন ও কামরুলের পঞ্চাশ দশকের কাজে জ্যামিতিক কাঠামোর প্রয়োগেও ইয়োরোপের প্রভাব বিদ্যমান, যদিও জ্যামিতি বা কৌণিকতার মাত্রায় ইমেজকে ধরার চেষ্টা আফ্রিকার সূত্রে, অর্থাৎ ‘অসভ্য’ মারফত ‘সভ্য’ জগতে প্রবেশ করে। নিরীক্ষা-প্রবণতা কিবরিয়ার কাজেও কৌণিকতার প্রভাব পড়ে। কিউবিজম তখন দুনিয়া মাতাচ্ছে, যদিও এর জন্ম ১৯০৮ থেকে ’১০-এর মধ্যে। পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশে কিউবিজম যা ঘনকবাদ অবশেষ রূপে হাজির হয়। বিমূর্ত প্রকাশবাদে প্রয়োগের আগে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা প্রথমে এই ভাষার সরলীকৃত চর্চায় হাত পাকান। অর্থাৎ পিওর ফর্মাল ভাষা অনুপ্রবেশের আগে কম্পোজিশনের সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষাই তারা শ্রেয় বলে মেনে নেন। কিবরিয়াও এর ব্যতিক্রম নন। তার পূর্ণিমা (১৯৫৭), জলকেলী (১৯৫৩) এই মতো চর্চারই ফসল, যাতে ভীষণ খণ্ডিত, অর্থাৎ টুকরা টুকরা ফর্মের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত।

mk_watersport2.jpg
জলকেলি, তেল, ৯১ x ৬০ সেমি; ১৯৫৩

মানুষের রূপের বিমূর্তায়নের এই পর্যায়ের কাজে কিবরিয়ার সামগ্রিকতা ধরা দেয় নি। আর ফর্মের নিরীক্ষা যে মূলত ‘না’-বাদী অর্থাৎ শূন্যবাদী ছবির দিকেই অনিবার্য গমন, এই কথা ষাটের দশকের শুরু থেকেই বোঝা গেল। কিবরিয়াই হলেন এই আধুনিক সংকোচনবাদী (রিডাকটিভিস্ট) আচরণের প্রধান পুরুষ। এই ভাষার উদ্বোধন ঘটল তাঁরই হাতে জাপানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের কালে।

mk_foolmoon.jpg
পূর্ণিমা, তেল, ৯১ x ৬৫ সেমি; ১৯৫৭

কিবরিয়ার পরিপাশই শুধু তার ব্যক্তিত্ব তৈরি করে দেয় নি। সরল প্রতিবিম্ব তত্ত্ব দিয়ে মানবের মানসদর্পণ সম্ভব নয়। অর্থাৎ মগ্নতা, মৃদুকথন—এইসব আপ্ত গুণ তৈরির নানান জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক—সর্বোপরি ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্বের ইন্ধন রয়ে যায়, ফলে ব্যক্তি কিবরিয়া যুগ, হুজুগ কিংবা সমাজের প্রতিফলন নন। তবে অগ্রবর্তী ‘এক্সক্লু্সিভ’ যে সমাজ সমাজের ভিতর বিরাজ করে, সেই সমাজের প্রতিনিধি তিনি। বীরভূমের জেলাশহর শিউরিতে এবং পরবর্তীকালে কোলকাতার ক্রিয়েটিভ সার্কেল থেকে হয়তো বিদগ্ধ নাগরিক হয়ে ওঠার রসদ তিনি সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। তবে এর সাথে যে নিরাসক্তি আমরা তার ব্যক্তিত্বে লক্ষ্য করি, তা আত্মোপলব্ধির ফল ছাড়া অন্য কিছু নয়। শিল্পী শিল্পকে কী বস্তু হিসেবে জায়মান দেখতে চান, সেইটাও জরুরি বিষয়। মাহমুদুল হোসেন যেমন তার কাজের ‘অস্তিত্বের অর্থময়তা আবিষ্কারের প্রকল্প’ হিসেবে ধরে নিয়ে তার অস্তিত্ববাদী চরিত্র উদ্ঘাটন করেছেন। তবে নাস্তিবাদিতার সূত্রে যে বিমূর্ত চিত্রভাষার জন্ম ইয়োরোপে, যা অস্তিত্বের সংকটময় অবস্থা থেকে দূরে সরে আসবার প্রকল্প, তা হয়তো অবিশ্বাসের মাঝে মানবের সূক্ষ্ম ও সহজ অনুভূতিগুলো বাঁচিয়ে রাখার আয়োজন। ফলে অনিবার্য ছিল যে, কিবরিয়া বিমূর্ত ও মূর্ত—এই দুয়ের শাসনের মধ্যে প্রথম পদ্ধতিই প্রকল্পভঙ্গির সহায়ক মনে করবেন।
mk_composition-1961.jpg
কম্পোজিশন: ব্ল্যাক, লিথোগ্রাফ, ৪৬ X ৬০সেমি; ১৯৬১

উচ্চশিক্ষা লাভে জাপানগমন বিমূর্তায়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের প্রথম সোপান। তার সাবজেক্ট ছিল তেলরং ও ছাপচিত্র—দুই-ই। ছাপচিত্রের শিক্ষক হাদিও হাগিওয়ায়া যেমন তাঁকে ফর্মের সুমিতি-পরিমিতি বিষয়ে হদিস দিতে সক্ষম হন, তেমন কিবরিয়ার নাগরিক পরিশীলনমুখীনতা তাঁর শৈশবের শহর থেকে পাওয়া—শিউরি, বীরভূমের জেলা শহর শান্তিনিকেতনের সাথে সহজ যোগাযোগের সূত্রে যেথায় আধুনিক শিল্প-সাহিত্যের প্রভাবে একটি সংহত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল বর্তমান ছিল। রবীন্দ্রনাথের ছবি দেখার সুযোগ ছোটবেলাতেই ঘটেছে, এমনকি বিদ্যালয়ের ড্রইং শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের অনুপ্রেরণাতেই কিবরিয়ার শিল্পী হওয়ার প্রত্যয় দৃঢ়তর হয়। জানা যায়, কোলকাতার কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফ্‌টে কিবরিয়ার অনুপ্রবেশের ইন্ধন জুগিয়েছেন তার স্কুলের প্রধান শিক্ষক।

mk_sunrise-fp.jpg……..
সূর্যোদয়, তেল, ১২০ X ১০০ সেমি; ২০০৩
……….
কোলকাতায় ছাত্রাবস্থায় অনুশীলনের মধ্য দিয়েই প্রথম বিমূর্ততার ঝোঁক দর্শনীয় হয়ে ওঠে। নিসার হোসেনের বরাত দিয়া বলতে পারি যে, কলাপাতায় চিংড়ি মাছ সাবজেক্ট স্টাডি করার নিমিত্তে এমন জলরঙের কাজ করছিলেন যেখানে ‘ভেজা ভাব’-টাই ফুটিয়ে তুলছিলেন। বস্তুর হুবহু রূপ পাশ কাটিয়ে এসেন্স ধরার চেষ্টা এ ছবিতে স্পষ্ট ছিল।

এই এসেনসিয়ালিস্ট কিবরিয়াই পরবর্তী সময়ে জাপানে বসে প্রথম বিমূর্ত ছবি অঙ্কন করেন।

আশির দশকে আমরা যখন চারুকলার পাঠ নিতে ঢাকায় চারুকলা ইন্সটিটিউটে সব ডাকসাইটে শিল্পীদের মধ্যে ম্রিয়মাণ স্বরে নিজেদের শিল্প তৎপরতায় ব্যস্ত, তখন কিবরিয়া ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা আমাদের মোহিত করত। তাঁর ভাষণের স্বল্পতা একটা বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করত। প্রিন্ট-ম্যকিং ডিপার্টমেন্টে রঙের উজ্জ্বলতার বিরুদ্ধে আমাদের যে পজিশন, তা কিবরিয়া ও শফিউদ্দিন আহমেদের পরিশীলিত চিত্রভাষার সূত্রে পাওয়া। মূলত কিবরিয়ার কণ্ঠ অনুকরণ করাটাই আমাদের মধ্যে ধর্মবৎ আবেগের জন্ম দিত। এর ফল যে ভালো হয়েছে, তা বলা যায় না। রীতি মানার আনন্দ আছে, আবার তার থেকে শিক্ষাও নেয়া যায়—শেষের বিষয়টাই আমাদের শিল্পী হিসেবে আবির্ভূত হবার পিছনে ইন্ধন জুগিয়েছে।
—————————————————————–
আশির দশকে আমরা যখন চারুকলার পাঠ নিতে ঢাকায় চারুকলা ইন্সটিটিউটে সব ডাকসাইটে শিল্পীদের মধ্যে ম্রিয়মাণ স্বরে নিজেদের শিল্প তৎপরতায় ব্যস্ত, তখন কিবরিয়া ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা আমাদের মোহিত করত। তাঁর ভাষণের স্বল্পতা একটা বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করত। প্রিন্ট-ম্যকিং ডিপার্টমেন্টে রঙের উজ্জ্বলতার বিরুদ্ধে আমাদের যে পজিশন, তা কিবরিয়া ও শফিউদ্দিন আহমেদের পরিশীলিত চিত্রভাষার সূত্রে পাওয়া। মূলত কিবরিয়ার কণ্ঠ অনুকরণ করাটাই আমাদের মধ্যে ধর্মবৎ আবেগের জন্ম দিত। এর ফল যে ভালো হয়েছে, তা বলা যায় না।
—————————————————————-
বলাবাহুল্য, শিল্পকলার পরিসরে কিবরিয়ার প্রভাব অনস্বীকার্য, কিন্তু এর সুফল যে আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারছি না, তার একটা কারণ তাঁর অনুসারীদের যোগ্যতা না থাকা, অন্য আরেকটি হলো বিমূর্ত প্রকাশবাদের নতুন সম্ভাবনার উন্মোচন অসম্ভব বলেই মনে হয়। রঙের, টেক্সচারের যে ধরন শিল্প-তলকে পদার্থ হিসেবে দেখিয়েও আবার প্রকৃতির তল ও নগরের দেয়ালের ছাপছোপের প্রতিফলন ঘটিয়ে এক প্রকারের এসেনসিয়ালিস্ট বোধের উদ্‌ঘাটন করার যে কিবরিয়া-ধর্মী পদ্ধতি তার অনুসরণ তোলাটি আসলে বৃথা চেষ্টা। ভিন্ন পথে ওঁর সমান্তরাল ভাষা তৈরির কাজটা হয়তো ফলদায়ক, যেমনটা নব্বই দশকে আবির্ভূত ওয়াকিলুর রহমানের কাজে এবং অপর বিমূর্ত শিল্পী ফখরুল ইসলামে দেখা যায়।

kiria_arazzak.jpg
১৯৯৬ সালে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে মোহাম্মদ কিবরিয়া।

কিবরিয়া একনিষ্ঠ বিমূর্ততাবাদী। ষাটের দশকে তাঁর সাথীরা বিমূর্ততার পর্ব শেষ করে আরো নানান কর্মে নিজেদের প্রতিভার ধার পরীক্ষা করে দেখেছেন। কিবরিয়ার এমন দোমনা মনোভঙ্গির কখনোই প্রকাশ পায় নি। পঞ্চাশের হালকা চালের ফিগারেটিভ শিল্প ছেড়ে দিতে তিনি বিমূর্ততায় প্রবেশ করে ষাটের দশকে আর কখনো পিছনে ফিরে তাকান নি। এদিক থেকে তার অর্জন লিনিয়ার। আবার তাঁর সমসাময়িকদের ননলিনিয়ারিটিও যে শিল্পাঙ্গনে নব ভাষা যোগ করতে পারছে, তেমন দাবি করা যায় না।

কিবরিয়ার আকস্মিক মৃত্যুতে একটি যুগের সমাপ্তি হলো বলা যায়। আরো বলা প্রয়োজন, অন্য আধুনিকদের পাশে তাঁর ভাষার শিল্পজ মাত্রাটা যাচাই করে দেখা। জয়নুল, কামরুল, শফিউদ্দিন ও সুলতানের আধুনিকতার পাশে কিবরিয়ার আপন অর্জনসমূহের মূল্য যাচাই করাও জরুরি। এটা এখনও ভবিষ্যতের কাজ।

আর্টস প্রোফাইল: মোস্তফা জামান
ইমেইল: mustafa.zaman21@gmail.com

—-
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আসমা সুলতানা মিতা — জুলাই ২৮, ২০১১ @ ৯:২০ পূর্বাহ্ন

      মোহাম্মদ কিবরিয়া স্যারের জন্য শ্রদ্ধা।
      লেখককে ধন্যবাদ!

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com