নিউ ইয়র্কে কয়েকদিন

মোহাম্মদ আসিফ | ১১ জুলাই ২০১১ ৮:৩৩ অপরাহ্ন

bangladeshi-people-area-jac.jpg
নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অধ্যুষিত এলাকা

আমাদের হলুদ ট্যাক্সিক্যাব যখন হাডসন নদী পার হবার জন্য ব্রিজের উপর উঠল, সেদিন শনিবার হলেও ব্রিজে বেশ যানজট। অপর প্রান্তের শহরের চেয়েও শক্ত ইস্পাতের তৈরি, প্রায় শতবর্ষ পুরানো কুইনস্ বোরো ব্রিজটির কারুকার্য, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা মনোযোগ কাড়ছিল। তদুপরি নদীর অপর পারে সারি সারি বিভিন্ন আকারের, জড়াজড়ি করে থাকা শত শত ভবন দেখে বুঝতে বাকি রইল না যে ছোটবেলা থেকে ছবিতে, টিভি পর্দায় দেখা নিউ ইয়র্ক শহরে প্রবেশ করেছি।

শহর মঞ্জরী: নিউ ইয়র্ক প্রদেশের নিউ ইয়র্ক শহরটির গুরুত্ব বোঝাতে শহরটিকে কেন্দ্রীয় স্নায়ু ব্যবস্থার সাথে তুলনা করা হয়। ঢাকার মতই প্রায় চার’শ বছরে গড়ে ওঠা এই বিখ্যাত শহরটি ব্যবসা-বাণিজ্য, কল-কারখানা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে এক পূর্ণাঙ্গ শহর। মার্কিনীদের শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল, নানান ঐতিহাসিক বৈচিত্রের দর্শনীয় স্থান, পর্যটকদের প্রধান ভ্রমণ স্থল। নিউ ইয়র্ক স্টক একচেঞ্জ ও জাতিসংঘের সদর দপ্তর এখানে থাকায় নিউ ইয়র্ক শুধু মার্কিনীদের কাছে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষেরও গন্তব্যস্থল। শহরে শতবর্ষের পুরানো ইমারত যেমন আছে, চল্লিশ, পঞ্চাশ তলা বা আরও সুউচ্চ নতুন ভবনও গড়ে উঠেছে।

asif-at-jackson-heights-1.jpg
জ্যাকসন হাইটস্-এ লেখক

শহরের সর্বোচ্চ এম্পায়ার এষ্টেট ভবন ও ৪০০ মিটার উচু ব্যাংক অব আমেরিকা ভবন দু’টি নির্মাণ শৈলী কম বিস্ময়মকর নয়। প্রাচীন ভবনগুলোর নির্মাণ কাঠামো, কারুকার্যে ঐতিহ্যের ছাপ মুগ্ধ করে। রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার কারণেই ভবনগুলোকে ভাঙা বা বেরঙা মনে হয় না। বিভিন্ন জাতির সহাবস্থান বলেই হয়তো নিউ ইয়র্কে মানুষগুলোর সহজতা ও আন্তরিকতা বেশি। ইন্টারনেট, ক্রেডিট কার্ড আর পিৎজা-বার্গার নির্ভর অতি আধুনিকতা আর খোলামেলা জীবন আচরণের মাঝেও মানুষের আশা আকাঙ্খা ও মানবিক সম্পর্কের মৌলিক বিষয়গুলো একই রকম। স্বামী-স্ত্রী (বন্ধুও হতে পারে) রাস্তায় যেতে যেতে খুনসুঁটি করা, বয়সের ভারে ক্লান্ত বৃদ্ধের ছোট দোকান সাজিয়ে গ্রাহকের অপেক্ষায় ঝিমানো কিংবা নিউ জার্সির তরুণী রোজমেরী যার সাইকোলজিতে, সাহিত্যে প্রবল আগ্রহ অথচ তার মা তাকে চাপ দিচ্ছেন ব্যবসায় প্রশাসন বা কম্পিউটারে পড়ার জন্য–এই দোটানার ভাবনায় ব্যস্ত সে—এ রকমই খণ্ড খণ্ড জীবন চিত্র নিউ ইয়র্কবাসীদের।

টাইম স্কায়ার ম্যাজিক: দুপুরে খেতে বের হয়ে প্রথম যখন টাইম স্কয়ারে এসে দাঁড়ালাম, খানিকটা গোলকধাঁধার মত মনে হল। টাইম স্কয়ারকে বলা হয় পৃথিবীর মোড় (Crossroad)। চত্বরটি খুব একটা বড় নয়, অন্য যেকোন, চারদিক থেকে আসা চারটি রাস্তার সংযোগস্থলের মতই। মোড়ের একপাশে নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্চ (NASDAQ) অপর পাশে প্যারামাউন্ট ভবন।

asif-at-time-square-nw.jpg
টাইম স্কয়ারে লেখক

রাস্তার একেবারে মাঝে একপাশে নিউ ইয়র্ক পুলিশের একটি স্টেশন, অপর পাশে ইউএস আর্মির নিয়োগ কেন্দ্র। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ স্থানটিকে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করেছে। আমার কলিগ অমি আজাদ, যিনি দেশে বাবার অসুস্থতায় ক’দিন ধরে দুশ্চিন্তায় ছিলেন, এখানে এসে পুলকিত হলেন, সানন্দে ছবি তুলতে লাগলেন। চত্বরটিতে দাঁড়ালে সবচেয়ে বিস্মিত হতে হয় এখানে আসা নানান জাতির মানুষ দেখে। সাদা, কালো, হিস্পানী, ককেশীয়, পাকিস্তানি, আরব, ভারতীয়, চীনা, বাঙালি—কেউ ছবি তুলছে, কেউ বসে আড্ডা দিচ্ছে, কেউ কবুতরকে খাওয়াচ্ছে, কেউ শুধু শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাতের টাইম স্কয়ার এক ধরনের হ্যালুসিনেশন তৈরি করে। বিশাল আয়তনের সব টিভি পর্দা আর নিয়ন সাইনের ঝলমলে বিশ্ববিখ্যাত সব ব্রান্ডের রঙিন বিজ্ঞাপন, পর্যটকদের কলকাকলী, ব্রডওয়ে থিয়েটারের বাইরে এবং খাবার দোকানগুলোতে ভীড়, গাড়ির শব্দ—সবকিছু মিলিয়ে চেনা-অচেনা এক ভুবনে অবস্থানের অনুভূতি হয়।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: নিউ ইয়র্কে পর্যটকদের অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

asif-at-statue-of-liberty.jpg
………..
স্ট্যাচু অব লিবার্টি’র সামনে লেখক
………..

এক সকালে দীর্ঘ দু’ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কড়া নিরাপত্তা তল্লাশী পার হয়ে প্রায় সাত’শ পর্যটকের সাথে আমিও ষ্টিমারে উঠলাম স্ট্যাচু অব লিবার্টি দ্বীপটির উদ্দেশ্যে। নদীর মাঝখানে এলিস আইসল্যান্ডের পাশে জ্বলন্ত মশাল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা নারী মূর্তিটি মার্কিনীদের স্বাধীনতার ও জ্ঞানের প্রতীক। মূর্তিটি আপাদমস্তক যাজকদের মত পোষাক, বুদ্ধিদীপ্ত, দৃঢ়, স্বল্প হাস্য মুখশ্রীর অভিব্যক্তি মুগ্ধ করে। স্ট্যাচুর চারপাশের চত্বর জুড়ে মিউজিয়াম, স্যুভেনিরের দোকান, ফুডকোর্ট আর চারদিকে সবুজ চত্বর।

বাঙালির বাঙালিয়ানা: টাইম স্কয়ারের মত জায়গায় বাংলাদেশিদের দেখা পাব ভাবিনি। ব্যস্ত রাস্তার মোড়েই রীতিমত কয়েকটি বড় দোকান যেগুলোর কয়েকটি বাঙালি মালিকানার এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোক কাজ করেন। দেখা হতেই বুঝতে পারেন, এগিয়ে আসেন, আন্তরিকভাবে কথা বলেন এবং দেশি ভাই বলে পণ্যের মূল্য কম রাখার আশ্বাস দেন। নিউ ইয়র্কে বাঙালিদের মূল জায়গা জ্যাকসন হাইটসে গিয়ে চারপাশে বাঙালিদের দেখে মনে হবে ঢাকা বা কোন ছোট মফস্বল শহরে এসেছি। আলাউদ্দিনের মিষ্টির দোকান, আড়ং, সাদাকালো, হাটবাজারের বা অন্যান্য অনেক রকম দোকান যেমন আছে, ফুটপাতের কোথাও কোথাও বাঙালি সবজি বিক্রেতাও দেখা যাবে। সাইত্রিশ এভিনিউতে দোতলায় মুক্তধারার বেশ বড় বইয়ের দোকান।

asif-at-muktodhara-jakson-h.jpg
নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস্-এ মুক্তধারার বইয়ের দোকানে অমি আজাদের সাথে লেখক

পুরানো, নতুন বইয়ের সাথে সিডি, ডিভিডি, পত্রিকা, ম্যাগাজিন পাওয়া যায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাট্যতত্ত্বে পড়াশুনা করা আজাদ ভাই মুক্তধারার ম্যানেজার, জানালেন বেশিরভাগ বাঙালি চাকুরী করেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে ভারতীয় ও পাকিস্তানিদের আধিপত্য বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান, প্রায় ১৮ বছর নিউ ইয়র্কে আছেন। আমাকে পেয়ে গল্প জুড়ে দিলেন, জানালেন বাঙালিদের নানান সমস্যা, সাফল্য ও সম্ভাবনার কথা। উনি একসময় বিটিভিতে অভিনয় করতেন, সেসব গল্প করলেন, সাথে ছবি তুললেন। পান বিতান নামের দোকানের মালিক বেলাল হোসেন (যার পদবী প্রেসিডেন্ট) ক্ষোভের সাথে জানালেন কিভাবে ভারতীয়রা ভাল চাকুরী, ব্যবসা করে এগিয়ে যাচ্ছে অথচ বাঙালিদের খুব কমই উচ্চশিক্ষিত, সম্মানজনক পেশায় আছেন। জ্যাকসন হাইটসের পাশের এলাকা কুইনসে দেখা মিলল দু’জন বাঙালি ভাইয়ের যারা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক কন্ট্রোল করছেন। আমাকে একটি ঠিকানা চিনিয়ে দিতে দু’জনই কাজ ফেলে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। অতিথিপরায়ন বাঙালি কাউকে আতিথেয়তার সুযোগ ছাড়েন না। এজি অফিসের সাবেক কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম, বারো বছর নিউ ইয়র্কে আছেন, আমাকে তার গাড়ি দিতে চাইলেন ঘুরে বেড়ানোর জন্য, তার স্ত্রী অনুরোধ করলেন তার বাসায় উঠতে। ভাল লাগল নিউ ইয়র্কের মাটিতে বাঙালির আন্তরিকতার, বাঙালিয়ানার পুনঃপরিচয় পেয়ে।

asif-with-colleagues-at-bur.jpg
নিউ ইয়র্কে কলিগদের সাথে লেখক

সেন্টাল পার্কের একটি ছোট্ট ঘটনা দিয়ে শেষ করছি। স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখার জন্য লাইনে দাঁড়ানো পর্যটকদের গান শোনাচ্ছিলেন এক আফ্রো-আমেরিকান বৃদ্ধ। যে যার মত করে পয়সা ফেলছিলো তার বাটিতে। আমি খুব কাছাকাছি আসতে জিজ্ঞেস করলেন, আমি ভারত থেকে কিনা। আমি বাংলাদেশি বলতেই তার গিটারে চমৎকার সুর তুললেন “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি”। জিজ্ঞেস করতে জানালেন, কিছুদিন ভারতে ছিলেন সেখানেই সুরটা শিখেছেন। সুদূর আমেরিকায় ভিনদেশী এই অপরিচিত বৃদ্ধের কাছে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের সুর শুনে চমৎকৃত হয়েছি। এক সময় নিউ ইয়র্কের অনেক অভিজ্ঞতাই হয়তো স্মৃতির ধুলোয় মুছে যাবে। কিন্তু এই বৃদ্ধের গিটারে বাজানো সুরটি কখনোই মুছে যাবে না।

হাটখোলা, ঢাকা।

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: মোহাম্মদ আসিফ
ইমেইল: asfmd@hotmail.com

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মহসীন ঢালী — জুলাই ১৫, ২০১১ @ ২:০৬ পূর্বাহ্ন

      “শোনাচ্ছিলেন এক আফ্রো-আমেরিকান বৃদ্ধ। যে যার মত করে পয়সা ফেলছিলো তার বাটিতে। আমি খুব কাছাকাছি আসতে জিজ্ঞেস করলেন, আমি ভারত থেকে কিনা। আমি বাংলাদেশি বলতেই তার গিটারে চমৎকার সুর তুললেন “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি”। জিজ্ঞেস করতে জানালেন, কিছুদিন ভারতে ছিলেন সেখানেই সুরটা শিখেছেন। সুদূর আমেরিকায় ভিনদেশী এই অপরিচিত বৃদ্ধের কাছে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের সুর শুনে চমৎকৃত হয়েছি। এক সময় নিউ ইয়র্কের অনেক অভিজ্ঞতাই হয়তো স্মৃতির ধুলোয় মুছে যাবে। কিন্তু এই বৃদ্ধের গিটারে বাজানো সুরটি কখনোই মুছে যাবে না।”
      ‍অনেক দিন মনে থাকবে।
      মহসীন ঢালী
      চাঁদপুর

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরিফুর রহমান — জুলাই ৩১, ২০১১ @ ৭:৫০ পূর্বাহ্ন

      একটু একটু করে পুরাটাই পরে ফেললাম, অনেক সুন্দর হইছে, মনে হইছে আমিও যেন শহরটা ঘুরে আসলাম।
      ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com