সিডনির পথে পথে (৩)

আবু সুফিয়ান | ২৭ জুন ২০১১ ৮:৩০ অপরাহ্ন

সিডনির পথে পথে ১ | সিডনির পথে পথে ২
(গত সংখ্যার পর)

ব্লু মাউন্টেইন্স-এর তিন বোন
পশ্চিমা দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষ খোদার ওপর যত না বিশ্বাস করে, ইনশিওরেন্সের ওপর আস্থা রাখে তার চেয়ে বেশি।

কাকুদের বাসায় আমার প্রথম রাত কাটলো অস্ট্রেলিয়ান চোরের কথা চিন্তা করে। বাড়ির ইন্সুরেন্স করা আছে মূল্যবান দ্রব্যের জন্য। চোর দামি জিনিসই চুরি করবে। আমাদের কাছে ঐ অর্থে মূল্যবান কিছু নেই। আমাদের কাছে যা আছে তা অমূল্য-পাসপোর্ট।

তৃতীয় বিশ্বের মানুষ হিসাবে পৃথিবীর নানা এয়ারপোর্টে পাসপোর্ট নিয়ে বহু কিত্তিকাণ্ড দেখেছি। নিজেরও কিছু অভিজ্ঞতা আছে। একটা শেয়ার করি।
স্পেন গিয়ে কিছু বাঙালীর সাথে পরিচয় হলো। তারা বাংলাদেশের একটি ছোট জেলা থেকে সরাসরি ইউরোপ যাত্রা করেছে। মাঝে ট্রানজিট হচ্ছে ঢাকা এয়ারপোর্ট। কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয় করে বিশেষ ব্যক্তির মাধ্যমে তারা ইউরোপ যাওয়ার মহা মূল্যবান ভিসা জোগার করেছেন। বিমানে উঠে তাই অতিরিক্ত সতর্কতা স্বরূপ একজন পাসপোর্ট-ডলার ইত্যাদি প্যান্টের ভেতরে রেখে জিপারের হুক এবং বেল্টের লুবের মধ্যে তালা মেরে দিলো।

abus_25.jpg ………
থ্রি সিস্টারস-এর পাহাড়ের নিচে নামার পথের মুখে সাবৃনা।
………

প্লেন উড়ছে। দীর্ঘ ফ্লাইট। তার টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলো। এমন সময় দেখা গেলো তিনি চাবি খুজে পাচ্ছেন না। অস্থির হচ্ছেন। টয়লেটের প্রেশার প্রবল হচ্ছে। তালার কারণে প্যান্ট খোলার স্কোপ নেই। ভয়াবহ অবস্থা। তিনি চাবি খুজছেন এবং অস্থিরতা করছেন। উড়ন্ত জাহাজের যাত্রীরা বোঝার চেষ্টা করছে ঘটনা কী? প্রেশার, কিন্তু পরিধেয় খোলা যাচ্ছে না–এই যন্ত্রণায় তিনি ছটফট করছেন। তার দাপাদাপি দেখে বিমানের হোস্টেজরা ছুটে এলেন। ঘটনা জেনে দ্রুত প্লাস এনে তার জিপারের তালা ভাঙা হলো। মূল্যবান ভিসাযুক্ত পাসপোর্ট হাতে নিয়ে বেচারা প্রাকৃতিক কাজ সারতে গেলেন।

উপরঅলার দয়ায় আমাদের পাসপোর্টেও বহু সংখ্যক অমূল্য ভিসা রয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য টাকা দিয়ে দোকান থেকে দামি পণ্য কেনা যায়। কিন্তু পশ্চিমা দুনিয়ার ভিসা পাওয়া যায় না। ভিসা কঠিন জিনিস।

সকালে নাশতার টেবিলে কাকু জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় যেতে চাও?

অস্ট্রেলিয়া বিষয়ে আমার কোনো হোম ওয়ার্ক নেই। আপনারা ঠিক করেন।

যে কোনো জায়গায় যাওয়ার আগে আমি একটা হোম ওয়ার্ক করি। কী দেখবো, কী খাবো, কোথায় অবস্থান করবো ইত্যাদি। আস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে কোনো হোম ওয়ার্কই করিনি। এমন ঘটনা এই প্রথম। ইউরোপ-এশিয়া-আমেরিকা যাত্রা নিয়ে আমার আগ্রহ প্রবল। যতবার যাই ততবাবরই উৎফুল্ল হই। আনন্দিত হই। সেই তুলনায় অস্ট্রেলিয়ার প্রতি এক ধরনের অনীহা আছে। এর মূল কারণ হলো পৃথিবীতে ‘ভালো’ র যে ইতিহাস আছে, সেই তলিকায় অস্ট্রেলিয়ার নাম নেই। অস্ট্রেলিয়ানরাও নেই। বরং মিডিয়ায় প্রকাশিত তাদের বর্ণবৈষমমূলক মানসিকতার খবরগুলো পীড়া দেয়। উপরন্তু অস্ট্রেলিয়া ছিলো চোর ডাকাত আর দাগী আসামী ও দস্যুদের বসবাসের স্থান। ইউরোপের খারাপ লোকদের এখানে নির্বাসন দেওয়া হতো। তারাই অস্ট্রেলিয়ান। ফলে জাতি হিসাবে অস্ট্রেলিয়ানদের গৌরবান্নিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং বিশ্ববাসীর কাছে নানা জরীপে অহঙ্কারী, হিংসুটে এবং অবিশ্বাসী হিসাবে নিকৃষ্ট কিছু দোষের তকমা তাদের আছে।

অস্ট্রেলিয়াতে কালু কাকু-চাচীর বাসায় থাকার লিয়াজো করেছে সাবৃনা। সুতরাং কোথায় কখন কীভাবে যাবো তারা ঠিক করলেই ভালো।

চাচি বললেন, দুপুরের পরেই আমরা রওয়ানা হবো ব্লু মাউনটেইন্স। অর্থাৎ নীল পর্বতমালা দেখতে।

এই বাড়িতে বর্তমান লোকসংখ্যা সাতজন। ব্লু মাউন্টেইন্সে রওয়ানা হলাম পাঁচজন। দুজন আমাদের সঙ্গী হতে পারলো না। তন্ময় এবং নানা। নানা মানে তন্ময়ের নানা। নানা সম্পর্কে পরে অন্য লেখায় বিস্তারিত বলবো।

চাচি, সাবৃনা এবং শ্যারন জীপের পেছনে বসলো। আমি কাকুর সাথে সামনে বসেছি। চাচি সাবাইকে সিটবেল্টের কথা মনে করিয়ে দিলেন, সিটবেল্ট না বাঁধলে তিনশ ডলার ফাইন।

সাবৃনা ক্যামেরা এগিয়ে দিয়ে বললো, গাড়িতে আমাদের ছবি তুলে দাও।

ছবি তুললাম। ডিজিটাল ক্যামেরা। স্ক্রিন আছে। সাথে সাথেই ছবি দেখা যায়।

সাবৃনা ছবি দেখে বললো, চাচি কী দোষ করেছে? চাচিকে ছবি থেকে বাদ দিলে কেন?

চাচি বললেন, থাক।

আমি শরমে পড়ে গেলাম। স্ত্রীর কথায় মনে হচ্ছে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে চাচিকে ফ্রেম থেকে বাদ দিয়েছি। ঘটনা আসলে তা না।

কাকু গাড়ি স্টার্ট করেছেন। চলন্ত গাড়িতে কোনো কিছুতে একভাবে তাকালে আমার ঘুরানি ওঠে। ভেতরে পাক খায়। তবু স্ত্রীর মন ও মান রক্ষা করতে আবার তিনজনের ছবি তুললাম।

এবার সাবৃনা ছবি দেখে বললো, তুমি তো ছবি তোলাই ভুলে গেছো। এটা কোনো ফ্রেম হলো!
শ্যারন বাংলা কথা সব বোঝে না! এটা কী বুঝলো জানি না। সে উচ্চস্বরে হাসছে। চাচা-চাচি মজা পাচ্ছেন।

গাড়ি মটর ওয়েতে উঠেছে। উড়ে যাচ্ছে। মসৃণ পথ। স্পিড মিটার দেখলাম। একশ কিমির ওপরে স্পিড। চার লেনের বিশাল হাইওয়ে। চলতে চলতে হঠাৎ কুট করে একটা আওয়াজ হলো। কাকু বললেন, টোল কেটে নিলো। টোল কেটে নিলো মানে?

গাড়ির গ্লাসের উপর একটি বিশেষ যন্ত্র বসানো। টোল আদায় জোনের লাইনে ঢুকলে অটোমেটিক্যালি ফটোসেলের সাহায্যে টোল কেটে নেয়। ইউরোপ এবং এশিয়ায় কয়েক হাজার মাইল সড়ক পথ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে। এর আগে এই জিনিস দেখিনি।

গাড়ির পেছনে তিন জন কথা বলছে। বাতাসের কারণে সব কথা শেনা যায় না। চাচি জিজ্ঞাসা করলেন, ব্লু মাউনটেইন্স তো এতক্ষণ লাগার কথা না। এতক্ষণ লাগছে কেনা? রাস্তা ঠিক আছে তো?

কাকু মিহি স্বরে জবাব দিলেন, রাস্তা ঠিক নেই। পথ হারিয়ে ফেলেছি। অনেকদিন এদিকে আসা হয় না।

আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি। বলে কী!

চাচি ক্ষীণ গলায় জানালেন, তোমার চাচা এরকমই।

গাড়ি এগুচ্ছে। সিডনির রাস্তাঘাট খুবই হিলি–মানে পাহাড়ি। পাহাড় কেটে রাস্তা করা হয়েছে। রাস্তার স্ট্রাকচারও পাহাড়ের মতো। কোথাও উপড়ে উঠতে হয়। কখনো নিচে নামতে হয়।

কাকু রাস্তার ডিরেকশন খুজছেন। চাচি বললেন, জিপিএসটা বের করো।

জিপিএস মানে হচ্ছে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম। এটি একটি ছোট ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র। পথ নির্দেশিকা। সামনের বক্স থেকে জিপিএস বের করে দিলাম। গাড়ির সাথে কানেকশন দেয়া হয়েছে। জিপিএস থেকে ডিরেকশন আসা শুরু হলো, ডানে যাও…। আটশ মিটার পরে বায়ে যাও…। সোজা যাও… ইত্যাদি।

হঠাৎ রাস্তা খুব উঁচুতে ওঠা শুরু হয়েছে। কাকু বললেন, এসে গেছি।

গাড়ি উপড়ে উঠছে। ফোর হুইল ড্রাইভ কার ছাড়া এখানে ওঠা যায় না। আমাদের গাড়ি শ্যা শ্যা করে উঠে যাচ্ছে। অসম্ভব সুন্দর এক চত্বরে যেয়ে গাড়ি থামলো।
আমরা নেমেছি। অপূর্ব! মনোমুগ্ধকর চারিদিক। যেদিকেই দৃষ্টি যায় শুধু নীল। এ এক অদ্ভুত রূপ। অসাধারণ! স্পেনের বিলবাওতে একবার দেখেছিলাম বেগুনী প্রকৃতি। সেটা ছিলো শীতকাল। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ার মন ভরে উপভোগ করতে পারিনি। আজ ঝলমলা আলোর মাঝে দাঁড়িয়ে আছি। জায়গাটার নাম কেন ব্লু মাউনটেইন্স তার কোনো ব্যাখ্যার আর প্রয়োজন নেই। আকাশ, পাহাড়, দিগন্তের শূন্যতা সব কিছুই এখানে নীল। গাঢ় নীল! প্রকৃতির এই নীলের বিবরণ দেয়া কঠিন। এটি কেবল উপলব্ধি করার!

সাবৃনা বললো, ও-য়া-ও! কী সুন্দর!

সে ক্যামেরা গোছাচ্ছে।

গাড়ি যেখানে থামলো তার পাশেই ফ্রেশ হওয়ার জায়গা। সবাই গাড়ি থেকে নেমেছে। কাকু বললেন, গাড়িটা রেখে নেই। তারপর ছবি তোলা হবে।

আমি সামনে এগিয়ে গেলাম। জায়গাটা গোছানো। ঝকঝকা পরিষ্কার। এয়ারপোর্ট টার্মিনালের মতো করে বানানো ঝুলন্ত চত্বর। সামনে আদিগন্ত পাহাড়। খাদ! বিস্তীর্ণ আকাশ। সবই নীল কিংবা নীলাভ। টার্মিনালের শেষ প্রান্তে রেলিং দেয়া। ব্যাকুল করা রূপ। স্পট অনুপাতে ট্যুরিস্টের সংখ্যা কম।

কাক, চাচি, সাবৃনা ও শ্যারন এসে যুক্ত হলো। নীল দেখে অভিভূত গলায় সাবৃনা জানালো, এখানে ছবি খুব ভালোভাবে তুলতে হবে। আলতু-ফালতু ছবি তোলা যাবে না।

আমি আর কাকু মুখ-চাওয়াচাওয়ি করলাম।

abus_26.jpg ………
ব্লু মাউন্টেইন্স-এর টার্মিনালের শেষ প্রান্তে কাকু, চাচি, সস্ত্রীক লেখক ও শ্যারন। পেছনে নীল পাহাড়ের সারি।
………
সাবৃনার পরনে নীল গেন্জি এবং লং স্কার্ট। স্ট্রেইট হেয়ার। সিডনিতে আসার আগে কুয়ালালামপুর থেকে চুল রিবন্ডিং করা হয়েছে। প্রতিটি দেশে যাওয়ার আগে সে একটি বিশেষ লুক ঠিক করে। অস্ট্রেলিয়াতে তার গেটাপ হচ্ছে প্রীতি জিনতা লুক। দিল চাহতা হ্যায় ছবিতে প্রীতি যেমন সুইট লুকে ছিলো, সাবৃনার থিম গেটাপও এবার তাই। এটি আমার বিশেষ পছন্দের একটি নারী লুক । আনন্দের বিষয় হচ্ছে তাকে দিল চাহতা হ্যায়-এর প্রীতি জিনতার মতোই লাগছে।

এর মধ্যে কাকু পটাপট কয়েকটা ছবি তুললেন। ডিজিটাল ক্যামেরায় সেই ছবি দেখে সাথে সাথে সাবৃনা কিছু ছবি রিজেক্ট করলো। আমাকে বললো, তোমার ভুড়ি ঠিক করো। ভুড়ি ছবির বিউটি নষ্ট করে ফেলছে।

শ্যারন তার বোনের এমন আর্শ্চয কথা শুনে সেখানেই হাসতে হাসতে প্রায় গড়িয়ে পড়ার যোগাড়। এমন আজব কথা সে আগে শোনেনি। শ্যারনের হাসি থামাতে ছবি তুলতে খানিকক্ষণ দেরি হলো। আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে পরিস্থিতি সামাল দিলাম। এবার ধরা খেলেন কাকু। সাবৃনা স্ক্রীন দেখে বললো, এটা কী ফ্রেম করেছেন! ছবির প্রাণটাই তো নাই। কাকু যে কী ছবি তোলেন!

চাচিও গলা মিলালো, তোমার চাচা ওই রকমই।

কাকু বললেন, ডিরেকশন দিলে আমি ছবি তুলতে পারি না।

আমার নিজেরও একই অবস্থা।

সাবৃনা পুরুষকুলকে লক্ষ করে বললো, তোমরা স্মার্ট হতে পারলে না।

কথা সত্যি।

সম্প্রতি আমেরিকার ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা না-কি তেমন স্মার্ট না। বারাক ওবামা যদি স্ত্রীর কাছে স্মার্ট না হন, তাহলে বর্তমান পৃথিবীর কোনো স্বামীরই তার স্ত্রীর কাছে স্মার্ট হওয়ার কোনো কারণ নেই।

আনন্দচিত্তে আমি ও কাকু অভিযোগ মেনে নিলাম। ছবি তোলার দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি নিলাম।

এই ঘটনায়ও শ্যারন হাসা শুরু করলো। সে আমার কন্যা রুশমিয়ার মতো। ওর হাসি বড় মাধুর্যময়। বড় সুন্দর করে হাসে মেয়েটি। ইচ্ছে করে কোলে নিয়ে খানিকক্ষণ তার হাসি উপভোগ করি।

চাচি বললেন, ক্যামেরা আমার কাছে দাও। তোমরা দাঁড়াও।

বউ এবং শ্যালিকার মাঝখানে পোজ দিয়ে দাঁড়ালাম। চাচি বললেন, জামাই সাবধান! শালি–অর্ধেক ঘরওয়ালী!

আমি হাসছি। শ্যারন আমার শ্যালিকা না। সে আমার কন্যা।

abus_27.jpg ………
‘শালি-অর্ধেক ঘরওয়ালী’র সাথে সস্ত্রীক লেখক।
………

সামনে বামদিকে তিনটি পাহাড় দাঁড়ানো। তিনটিই আলাদা আলাদা। নীলের ভুবনে এদের রঙ ভিন্ন। বাদামি ও লালচে। এরাই হচ্ছে ব্লু মাউন্টেইন্স-এর বিখ্যাত থ্রি সিস্টার বা তিনবোন। এই তিন বোনের নাম মিহমি (Meehmi) উইমলাহ (Wimlah) এবং গুননেডু (Gunnedoo)। প্রথম জনের উচ্চতা ৯২২ মিটার, উইমলাহ ৯১৮ এবং গুননেডু ৯০৬ মিটার লম্বা। কথিত আছে এই তিনবোন প্রতিবেশি তিন উপজাতি পুরুষের প্রেমে পড়েছিলো। কিন্তু তাদের বিয়ের বিষয়ে বাধা ছিলো। এই নিয়ে লড়াই বাঁধে। তখন তাদের রক্ষা করার জন্য একজন বয়স্ক ব্যক্তি যাদুবলে তিন বোনকে পাহাড়ে রূপান্তর করে দেন। দুর্ভাগ্যক্রমে সেই ব্যক্তি লড়াইয়ে মারা যান। ফলে মিহমি, উইমলাহ এবং গুননেডু–তিন বোন পাহাড় অবস্থাতেই থেকে যায়। কেউ তাদের আর আগের রূপে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। এখনো সেই অবস্থাতেই আছে।

আরেক জায়গায় পড়লাম ঘটনা আরেক রকম।

অনেক কাল আগে ব্লু মাউনটেইন্স-এ তিন বোন মিহমি, উইমলাহ এবং গুননেডু থাকতো। তাদের বাবা ছিলো একজন তান্ত্রিক চিকিৎসক। যে তাইয়াওয়াহ (Tyawah) নামে পরিচিত ছিলো। বুনিপ (Bunyip) নামে সেখানে একটি ‘জিনিস’ (ভূত-প্রেত জাতীয় কিছু) ছিলো। সে সংলগ্ন গভীর গর্তের ভেতর বাস করতো। সবাই তাকে ভয় পেতো। তাইয়াওয়াহ বাইরে যাওয়ার সময় তার তিন কন্যাকে নিরাপদে রেখে বিদায় নিতো। এরকমই একদিন বাবা কন্যাদের কাছে বিদায় নিয়ে বুনিপের গর্ত পার হয়ে গেলো। হঠাৎ পাহাড়ের ওপর থেকে কিছু একটা আছড়ে পড়লো নিচে। মিহমি ভয় পেয়ে গেলো। ভীতি থেকে সে নিজেও পাহাড় থেকে পাথর তুলে ছুড়ে মারতে থাকলো। এক পর্যায়ে সমস্ত পাহাড় ভেঙেচুড়ে পড়তে লাগলো বুনিয়াপের গর্তে। বুনিয়াপ হ্মিপ্ত হয়ে বেরিয়ে এলো। তিন বোনকে দেখে ভীষণ ক্ষেপে গেলো সে। এবং তাদের শাস্তি দেয়ার জন্যে ছুটে গেলো।

দূর থেকে এই দৃশ্যটি দেখে ফেলে তিন বোনের বাবা তাইয়াওয়াহ। সে নিরুপায় হয়ে বুনিয়াপের অত্যাচার থেকে মেয়েদের রক্ষা করার জন্য তার হাতের জাদুর হাড্ডি দিয়ে তিন বোনকে পাহাড়ে পরিণত করে দিলো। ক্রুদ্ধ বুনিয়াপ এবার আক্রমণ করলো কন্যাদের বাবাকে। তাইয়াওয়াহ বুনিয়াপের হাত থেকে বাঁচার জন্য যাদু বলে পাখি হয়ে আকাশে উড়ে গেলো। সবাই নিরাপদ হলো। কিন্তু জাদুর হাড্ডি পড়ে গেলো তার হাত থেকে। এর মধ্যে বুনিয়াপ চলে গেলো। তাইয়াওয়াহ ফিরে এসে জাদুর হাড্ডি খোঁজা শুরু করলো। কিন্তু পেলো না।

অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের (Aborigional) মধ্যে কথিত আছে তাইয়াওয়াহ এখনো তার সেই জাদুর হাড়টি খুজে বেড়াচ্ছে। ওটা পেলেই তিন বোন আবার তাদের আগের রূপ ও সতেজ প্রাণ ফিরে পাবে। তারা অপেক্ষায় আছে।

ব্লু মাউন্টেইন্স এলাকাতে বেশ কিছু ট্যুরিস্ট স্পট আছে। ক্যাবল কারও আছে। আজ বন্ধ। তবে থ্রি সিস্টারসের কাছে যাওয়ার পথ আছে। অনেকেই সেখানে গেছে। আমরা ডান পাশের একটা পথ ধরে এক ফ্লোর নিচে গিয়ে ফিরে এলাম। রওয়ানা হলাম থ্রি সিস্টার-এর পথে। পথের ডিরেকশন দেয়া আছে। পনর মিনিট হেঁটে যেতে হবে। আলো কমে আসছে।

সাবৃনা বললো, এত দূর হাঁটবো? থ্রি সিস্টার এমন কী জিনিস যে কাছে গিয়ে দেখতে হবে।

কাকু-চাচিও একটু দ্বিধায় পড়ে গেলেন!

আমি বললাম, শুধু কাছে গিয়ে না, আমার একটু ছুঁয়ে দেখারও বড় ইচ্ছা। চলো।

আমি এবং শ্যারন যাওয়ার জন্য তৈরি। শ্যারন স্পোর্টস গার্ল। সে রওনা হলো আমার আগে।

মাটির কাঁচা পথ পাড় হয়ে থ্রি সিস্টারস-এর কাছে চলে এলাম। পরের ডিরেকশন হচ্ছে ৮০০ পা পাহাড়ের নিচে নামতে হবে। নিচে নামার সিঁড়ি আছে। তবে সেই সিঁড়ি ভয়াবহ। খুবই সরু। এবরোখেবড়ো। পুরাতন। একসাথে একজনের বেশি ওঠা বা নামা যায় না। খুবই খাড়া হয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। রেলিংগুলো দুর্বল। ভীতিকর।

নিচ থেকে কিছু ট্যুরিস্ট ওপরে উঠে আসছে। তাদের চোখমুখ লাল। ঘর্মাক্ত। কেউ কেউ হাঁপাচ্ছে।

মোটা মতো এক ছেলে বিড়ালের মতো হামাগুড়ি দিয়ে উপরে উঠছে। তার পেছনে আরো কয়েকজন আছে। তাদের জন্য আমরা সিঁড়ির কানেকশন রোডে দাঁড়ালাম। সবাই সতর্কভাবে নামছে। সিঁড়ির বিভিন্ন পয়েন্টে দাঁড়িয়ে কাকু কয়েকবার ছবি তুললেন। নামতে নামতেই সাবৃনা বললো, ওঠার সময় খবর আছে!

আমরা তিন বোনের পাহাড়ের বড় বোন মিহমিতে এলাম। এখানে বেঞ্চ আছে। ছোট একটা কানেকটিং পুল আছে। লোকজন ছবি তুলছে। কাকু সিঁড়ির ওপরে দাঁড়িয়েই ক্যামেরা তাক করলেন। সাবৃনা বললো, এদিকে তাকাও। তাকাও! ভুড়ি ভেতরে…।

শ্যারন বহু কষ্টে তার হাসি থামিয়ে পোজ দিলো। আলো কমে আসছে। এখানে জায়গা কম। আমরা ছবি পর্ব শেষ করে দ্রুত উপরে ওঠা শুরু করলাম। উঠতে যেয়ে সত্যি সত্যিই খবর হচ্ছে। সাবৃনা ভয় পাচ্ছে। চাচি বললেন, নিচের দিকে তাকিয়ো না।
abus_28.jpg ………
তিন বোনের দর্শন শেষে ফিরতি পথে লেখক ও সাবৃনা।
………

নিচের দৃশ্য ভীতিকর। গভীর খাদ। দুর্বল নার্ভের লোক অনায়াসে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যেতে পারে। আমরা নিরাপদে উপড়ে উঠে এলাম। সবাই ঘেমে গেছে। কাকু মুহূর্তে কোক এবং চিপস নিয়ে এলেন। আমরা বসলাম একটা গাছের কাছে ঘাসের মধ্যে।

abus_29.jpg ………
ব্লু মাউন্টেইন্স-এর নিচের ফ্লোরে সাবৃনা ও লেখক।
………

বাংলা ভাষায় ‘অপ’ শব্দটি মন্দ অর্থেই ব্যবহৃত হয়। যেমন অপরাধ, অপকার ইত্যাদি। শুধু এক জায়গায় এই ‘অপ’ ভালো অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং সেটি হয় তুলনাহীন। ব্লু মাইন্টেইন্স-এর সৌন্দর্যের উপমায় ‘অপ’ শব্দটি যায়। এর চারপাশটা সত্যিই অপরূপ সুন্দর। ছিমছাম। ধুলা নেই। বিশুদ্ধ নির্মল বাতাস বইছে। আকাশ নীল। পাহাড় নীল। নীল চরাচর। আমরা মহা আনন্দে চিপস খাচ্ছি। কোক খাচ্ছি। গল্প করছি। পৃথিবীর আপার সৌন্দর্য উপভোগ করছি। মনে হচ্ছে আমাদের আনন্দ কোনোদিনই যেন ফুরাবে না। কোনোদিনই না।

(কিস্তি ৪)

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: আবু সুফিয়ান
ইমেইল: abusufian18@gmail.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

প্রতিক্রিয়া (9) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নূরুল আনোয়ার — জুন ২৮, ২০১১ @ ৩:০৫ অপরাহ্ন

      প্রথম দিকে পড়ে হতাশ হয়েছিলাম। এখন মনে হচ্ছে লেখাটা প্রাণ ফিরে পেয়েছে। লেখার মধ্যে একটা গতি এসেছে। এটা ধরে রাখতে পারলে একটা উৎকৃষ্ট লেখা আমরা পাব।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শুকুর খান — জুন ২৮, ২০১১ @ ৫:৩৭ অপরাহ্ন

      লেখার ভিতর আসল ঘটনাই বেশি করে তুলে ধরা হয়েছে বলেই বেশ আনন্দ পেয়েছি। ধন্যবাদ, পরবর্তী সংখ্যার জন্য অপেক্ষা করছি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন rubel — জুন ২৮, ২০১১ @ ৭:৩৯ অপরাহ্ন

      “গাড়ির গ্লাসের উপর একটি বিশেষ যন্ত্র বসানো। টোল আদায় জোনের লাইনে ঢুকলে অটোমেটিক্যালি ফটোসেলের সাহায্যে টোল কেটে নেয়। ইউরোপ এবং এশিয়ায় কয়েক হাজার মাইল সড়ক পথ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে। এর আগে এই জিনিস দেখিনি।”
      ….ইউরোপে কয়েক হাজার মাইল ভ্রমণ করেও এই যন্ত্র দেখেননি, আমার তো মনে হয় লেখক তা হলে ইউরোপ ভ্রমণ করেননি। এটা ইউরোপের সব জায়গাতেই আছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Jahangir Habib — জুন ২৯, ২০১১ @ ১১:২৬ পূর্বাহ্ন

      ভালই জমছে, লিখে যান।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন nusrat — জুন ২৯, ২০১১ @ ৫:০২ অপরাহ্ন

      সব কিছুই ভাল কিন্তু লেখক তার পেশা কি জানান নি। তিনি এত দেশ ভ্রমণ করেছেন কিভাবে? আর লেখককে জানাতে চাই “দিল চাহতা হ্যায়” মুভিতে প্রিতির চুল স্ট্রেইট ছিল না, কার্ল ছিল। মূল কাহিনীর দিকে লেখকের বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহবুব — জুলাই ২, ২০১১ @ ১১:০৯ অপরাহ্ন

      অস্ট্রেলিয়ানদের প্রতি মন্তব্যগুলো জাতিবিদ্বেষের আচরণ বলে নিন্দা জানাচ্ছি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রুমিন — জুলাই ৪, ২০১১ @ ১০:২৮ অপরাহ্ন

      অনেক ভাল লাগল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Md. Shamsur Rahman — জুলাই ৬, ২০১১ @ ৮:৫১ পূর্বাহ্ন

      পড়ে অনেক মজা পেয়েছি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কামরুল — জুলাই ৬, ২০১১ @ ৪:২৭ অপরাহ্ন

      ইউরোপ এশিয়ার কয়েক হাজার মাইল পাড়ি দিয়েও আপনি কখনও টোল কেটে নেওয়া ওই যন্ত্র দেখতে পাননি?
      ভেরি স্যাড! মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর গিয়েছেন কখনও? গিয়েছেন তো নিশ্চয় কারণ, কুয়ালালমপুর থেকে চুল রিবন্ডিং করিয়েছেন যেহেতু। সেখানেই তো দেখার কথা…

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com