খসড়া

সাগুফতা শারমীন তানিয়া | ২৩ জুন ২০১১ ৯:১৯ অপরাহ্ন

খসড়া-১
কাল আমি বোটে বসে জানালার বাইরে নদীর দিকে চেয়ে আছি এমন সময় হঠাৎ দেখি, একটা কী পাখি সাঁতরে তাড়াতাড়ি ও পারের দিকে চলে যাচ্ছে আর তার পিছনে মহা ধর্-ধর্ মার্-মার্ রব উঠেছে। শেষকালে দেখি একটি মুরগি; তার আসন্ন মৃত্যুকালে বাবুর্চিখানার নৌকো থেকে হঠাৎ কী রকমে ছাড়া পেয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে পেরিয়ে যাবার চেষ্টা করছিল…আমি ফটিককে ডেকে বললুম, আমার জন্যে আজ মাংস হবেনা।…আমরা যে কী অন্যায় এবং নিষ্ঠুর কাজ করি তা ভেবে দেখিনে বলে মাংস গলাধঃকরণ করতে পারি। পৃথিবীতে অনেক কাজ আছে যার দূষনীয়তা মানুষের স্বহস্তে গড়া, যার ভালমন্দ-অভ্যাসপ্রথা দেশাচার লোকাচার সমাজনিয়মের উপর নির্ভর করে। কিন্তু নিষ্ঠুরতা সেরকম নয়, এটা একেবারে আদিম দোষ; এর মধ্যে কোনো তর্ক নেই, কোনো দ্বিধা নেই; হৃদয় যদি আমাদের অসাড় না হয়, হৃদয়কে যদি চোখ বেঁধে অন্ধ করে না রেখে দিই, তাহলে নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে নিষেধ একেবারে স্পষ্ট শুনতে পাই। অথচ ওটা আমরা হেসে-খেলে সকলে মিলে খুব অনায়াসে আনন্দ-সহকারে করে থাকি, এমনকি, যে না করে তাকে কিছু অদ্ভুত বলে মনে হয়…যতক্ষণ আমরা অচেতনভাবে থাকি এবং অচেতনভাবে হিংসা করি ততক্ষণ আমাদের কেউ দোষ দিতে পারেনা। কিন্তু যখন মনে দয়া উদ্রেক হয়, তখন যদি সেই দয়াটাকে গলা টিপে মেরে দশজনের সঙ্গে মিশে হিংস্রভাবে কাজ করে যাই, তা হলেই যথার্থ আপনার সমস্ত সাধুপ্রকৃতিকে অপমান করা হয়…

এই অব্দি পড়ে ক ছিন্নপত্র নামিয়ে রাখলো। অল্প বয়েসে রবিঠাকুরের বিসর্জন পড়বার সময়ও তার একরকম মনোভাব হয়েছিল। কিন্তু বেশিদিন টেঁকেনি। তখন মাংস খাওয়া ছেড়েছিল সে। ঈদুল আজহার সময় আব্বা যখন অনিবার্যভাবে ছেলেমেয়েদের ঠেলে দিচ্ছিলেন কোরবানি দেখার পূণ্যার্জনের জন্যে, তখন সে লুকিয়েছিল পর্দার আড়ালে।
—————————————————————–
সব পতিত জমি (!) তাই সবজিক্ষেত হতে হবে, সব দীঘি তাই তেলাপিয়ায় ভরে দিতে হবে, সব রসুইন্যাগাছের-কপিলা গাছের জঙ্গল কেটে সাফ করে ফলবান বৃক্ষ বা মেহগনি লাগিয়ে গোড়ায় চুনকাম করে দিতে হবে! সব জলাভূমি ভরাট করে শিল্পনগরী বা এয়ারপোর্ট গড়তে হবে! সব ত্যালঘাউরা পাখি আর বোঁচাহাঁস মেরে ফেলতে হবে!
—————————————————————–
ibergman.jpg…….
স্ট্রম্বোলিছবিতে ইনগ্রিড বার্গম্যান
……..

খ হেসে বলেছিল, “জগদীশচন্দ্র বসু কী বলেছিলেন আপা? তোমার বিকল্প খাদ্যের লিস্টিতে যারা আছে–এই ডাঁটাশাক-ফুলকপি-চালকুমড়া… এদের জীবন নাই? এদের মারতেছো যে?”

জীবে-জীবে খাদ্য-খাদক সম্বন্ধ অতি পুরাতন, সমগ্র জীবজগতের বাস্তু-সংস্থান দাঁড়িয়ে আছে এই সম্বন্ধের উপর–এত মৌলিক একটা বিষয় নিয়ে বেশিক্ষণ তর্ক চলে না। ক তখনকার মতো খ-এর পাশে কার্টুন দেখতে বসে গেলো। কিমবা দ্য হোয়াইট লায়ন। বনের পশুদের ভিতরে সম্প্রীতি রক্ষা করা কিমবার বিষম দায়িত্ব, সে দায়িত্বপালনের মূল অন্তরায় হচ্ছে–বন্যেরা এ ওকে খায়। হার্পি ঈগল বাঁদর-টাদর খায়, ভোঁদড়ে মাছ খেয়ে ফেলে, কুমীর কাউকে তার জল পেরুতেই দেয় না। এদিকে বনের রাজা কিমবা চায় সবার মধ্যে সদ্ভাব। খাদ্য এবং খাদকের মধ্যে তো প্রীতির বাঁধন দীর্ঘ হয় না। শেষ পর্যন্ত সমাধান পাওয়া গেলো। সবাই ফলমূল খাবে, আর বছরে একবার পঙ্গপালের উপদ্রব হলে তখন সকলে মিলে পঙ্গপাল (আমিষ) খাবে।

খ খি খি করে হাসতে লাগলো, সে ক-কে এখন থেকে কিমবা-আপা ডাকবে।

খসড়া-২
যুক্তরাজ্যের সুপারশপে লিন্ডা ম্যাকার্টনির অ্যাপেল-সসেজ দেখে ক জিজ্ঞেস করলো–আপেল দিয়ে সসেজ হয়?

গ বললো–পল ম্যাকার্টনি আর তার বউ লিন্ডা নিজেদের খামারবাড়িতে ভেড়াদের মৃত্যুচিৎকার শুনে এত মর্মাহত হয়েছিলেন যে সারাজীবন আর মাংস ছোঁননি। লিন্ডা এইসব বিকল্প-আমিষ বা আমিষগন্ধী নিরামিষের প্রবক্তা ছিলেন আমৃত্যু। কেন, চীনাপট্টিতে কালকে তুমি সয়া চিকেন-প্রণ সাবস্টিটিউট এইসব দিব্যি খেলে, মনে নেই?

গ-এর দিকে তাকিয়ে ক-এর চোখে সোনালী পরিহাসতরলের ভাণ্ড কাৎ হতে থাকে, সে গ-কে মনে করিয়ে দেয় সকালের বিনিপয়সার পত্রিকাগুলিতে বিগতযৌবন পল কত কত নিশাচর মেয়ের সাথে ছবিশিকারীদের হাতে ধরা পড়ছেন প্রতিদিন, পল যে সারাজীবন নিরামিষাশী ছিলেন একথা তো সত্যি নয়!

গ হেসে ফেললো। একটু চুপ করে থেকে বললো–আজ রাতে আমি রসোলিনির মুভি দেখবো, স্ট্রম্বোলি। তুমি দেখবে আমার সাথে?

–বার্গম্যান আছে ছবিতে?

–আছে। সমুদ্রের জেলেদের টুনামাছ ধরার একটা বিখ্যাত দৃশ্য আছে সিনেমাটায়। তুমি দেখবে সাধারণ মাছমারার দৃশ্য কেমন করে প্রাণীহত্যার দৃশ্য হয়ে ওঠে।

ক সেদিন রাত্রে স্ট্রম্বোলি দেখেছিল। দেখেছিল ইনগ্রিড বার্গম্যানের প্রফুল্ল মুখ কী করে এক দমকে আলোনেভা ভুতুড়ে লণ্ঠন হয়ে গেছিল–সমুদ্র উজাড় করার দৃশ্য দেখে।


স্ট্রম্বোলি ছবিতে সমুদ্রে মাছমারা, ইউটিউবে

খসড়া-৩
ক আর খ অফিস থেকে একসাথে ফিরছিল। কাঁচাবাজারের মোড়ে চৌরাস্তায় একটা গরুকে চার হাতপা বেঁধে রাস্তার উপরে শুইয়ে দেবার চেষ্টা করছে কসাই। জবেহ-দৃশ্যপ্রার্থী প্রায় জনাতিরিশেক লোক জড়ো হয়ে সেই দৃশ্য দেখছে। ক শিউরে উঠে চোখ সরিয়ে নেয়। বলে, “সভ্য দুনিয়ায় জবাই-এর কাজটা আর প্রকাশ্যে করা হয় না!”

খ সাথে সাথে জবাব দেয়–“সভ্য দুনিয়ায় বহু অসভ্য কাজই তো প্রকাশ্যে করা হয়!” (আপার চারপাশের বিলাতি বাতাসটা তার ভালো লাগে না!)

ক একটা শ্বাস ফেললো। তাকে তর্কটা তাহলে শুরু করতে হবে এক্কেবারে কলোসিয়াম থেকে, (ঐ যে এক বৃদ্ধ সন্ত উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন–“প্রাণীহত্যা দেখতে দেখতে তোমাদের সবার হৃদয় হন্তার হৃদয় হয়ে উঠছে, এই মনুষ্যমেধযজ্ঞ থামাও”, কে তিনি? সেবাস্টিয়ান? নাকি ইগনাতিউস?) প্রতিবার তাকে একেবারে মৌলিক বিতর্ক থেকে শুরু করতে হয় কেন?

–“তোমার কি মনে হয়, খ, কেন আগে প্রকাশ্যে ফাঁসি দিত, বলি দিত আর এখন কেন দেয়া হয় না? প্রাণীর মৃত্যুদৃশ্য একটা ভয়ানক দৃশ্য। একে দেখে শিক্ষা পাবার, পাপক্ষালন বা পূন্যবান হবার কিচ্ছু নাই।”

ক এর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে খ বলে–“সভ্যতার দাবিদাররা তো এসিরীয়-আক্কাদীয়-সুমের সভ্যতার সব চিহ্ন লুটপাট করে ফেলেছে… প্রকাশ্যে গণহত্যা চালাচ্ছে মুসলিম দেশগুলিতে, তখন সভ্য থাকা যায় আর মুসলিমরা জবাই করলেই অসভ্য হয়ে গেল, তাই না? যাদের কাছ থেকে আমাদের সভ্যতা শিখতে হবে তারা মহারাজা নন্দকুমারকে সর্বসমক্ষে ফাঁসি দেয় নাই?”

ক একটু বিচলিত বোধ করে মানুষহত্যা করা হচ্ছে অতএব জনসমক্ষে পশুহত্যা চলবে না কেন, এইসব যুক্তির সামনে। প্রতিটা ঘরে একটা বড়সড় জন্তু মারবার উপযোগী কর্তন ও ছেদনযন্ত্র আছে, (যে যেখানে চায় যখন চায় মুরগি-হাঁস-কবুতর-গরু-মহিষ-ছাগল-ভেড়া-শেয়াল সব জবাই করে চলেছে, পৌরসভার সাধ্য কি এই যথেচ্ছাচার ঠেকায়। রক্ত-অস্থি-অন্ত্রে স্নান করে ওঠে শহরের পর শহর…) প্রবাদে আছে, বিড়াল মেরে শুরু, মানুষ মেরে শেষ।

–“আপা, তুমি এমন করতেছ, যেন ঐ গরুটা একটা মানুষ…”

খসড়া-৪
ক আর ঘ ‘কজমো’তে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। ঘ হাসছিল খুব–যাকাত হৈল ফরজ, লোকে যাকাত ঠিকমতন দেয় না। কোরবানি ফরজ না। কোরবানির জন্যে লোকে পাগল… আরে, ওয়েইস্ট করা নিষেধ করা হয়েছে কতবার? কোরবানি তো অপচয়!”

ক জিজ্ঞেস করলো–“কোরবানি দেখার জন্যে আল্লাহর নবী বিবি ফাতেমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন। কোরবানির পশুর রক্তের প্রথম ফোঁটা ভূমিস্পর্শ করার সাথে সাথে নাকি দর্শকের সারাজীবনের গুনাহ মাফ হয়ে যায়?”

ঘ মশমশ করে ভাজাভুজি চিবাতে চিবাতে ইংরেজিতে প্রশ্ন করে–“তাইলে আমরা কোন জাতি? অ্যাজটেক?”

ধূমায়িত কফির পাত্রের উপর নুয়ে ক ভাবে–তার এক ছাত্রীর সাথে একটা ছেলে প্রেম করবার সময় অন্তরঙ্গ মুহূর্তের পর্ণোগ্রাফি বানিয়ে ফেলেছে, মেয়েটা এখন গভীর ডিপ্রেশানের রোগিনী। যা ভালবাসবার আদিমুদ্রা–তাকে পণ্যের প্রকাশমানতা দেয়া একটা ছেলে কি একখানা ছাগলে (তাও অনিচ্ছুক-বেচারি-বিরাগীমুখের-কাঁঠালপাতা আসক্ত ছাগল!) ভর দিয়ে পার হয়ে যাবে পুলসেরাত?

খসড়া-৫
ক আবারও টিভির সামনে। জিগুরাটের উপর পাথরের বেদীতে শুইয়ে মায়াসভ্যতার পুরোহিতরা কি করে জ্যান্ত মানুষের কলজে ছিঁড়ে আনতো, উত্তপ্ত শোনিতে পূজা চলতো দেবদেবীদের, তাই ব্যাখান করে দেখানো হচ্ছে।

সব্বাই তাহলে ‘আ পাউন্ড অফ ফ্লেশ’প্রার্থীই ছিলাম আমরা? ক বিমর্ষবোধ করে। “জীবের জীবনের কী ভয়ানক অপব্যয় এবং কী অল্প মূল্য।”

ছাত্রাবস্থায় একসময় সে ‘সভ্যদেশে’ বরফের মাছ কেটেছে। হিলহিলে রামধনুরঙ ট্রাউট। ইলিশগন্ধী হেরিং (আটলান্টিকে হেরিং কমে যাচ্ছিল বলে আয়ার্ল্যান্ডের জেলেদের হেরিং শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, আর হেরিং ধরা যাবে না এই আশংকায় আইরিশ জেলেরা এত হেরিং তুলে আনে যে মাছটা বিলুপ্তির কলামে চলে যায়।) কচকচে কাঁটার অভিজাত সী বাস আর সী ব্রীম। মাংসের মতন রঙ ইয়েলো ফিন টুনা, ধারালো ছুরির নিচে পাউরুটির মতন পুঁচিয়ে কাটতেই ফিনিক দিত রক্ত। ইয়েলো ফিন টুনা যেদিন থাকতো, সেদিন লোকে খুঁজতো ব্লু ফিন টুনা। স্যামন একটু বরফের ছোঁয়াচ লাগতেই ফ্যাকাসে। লোকে কিনতো না নীরক্ত মাছ। প্রায়ই পড়ে থাকতো মুয়াজ্জিনের সারা মাসের বেতনের সমান একটুকরো সোর্ডফিশ, পড়ে থাকতো বায়ূকারক কীপার। অর্গ্যানিক স্যামন না পেলে খিটখিটে খদ্দের চেয়েও দেখত না গোলাপি আলাস্কান স্যামন। শ্রীলঙ্কান টাইগার প্রন দুর্মূল্য বস্তু, কেউ না কিনলে দিনের শেষে সব যেত আবর্জনার বাক্সে। মহাসমুদ্র মন্থন করে উজাড় করে আনা ‘সবুজপেটিকার রজতমুদ্রা’ সেইসব মাছেরা দিনের শেষে বিনব্যাগে চলে যেত, বাসীমাছ খেয়ে খদ্দেরের যাতে পেট খারাপ না হয়। সুপারশপের আবর্জনার স্তূপে যত মাছ যেত, তা দিয়ে যীশুর সেই ‘পাঁচহাজার লোকের ভূরিভোজ’ চলতে পারে। দিনের শেষ একঘণ্টায় মাছের দাম কমে যেত, মৎস্যবিলাসী ভূমধ্যসাগরীয়রা ছেঁকে ধরতো মাছবাজার। গভীর দরিদ্র মোঙ্গলয়েড ছাত্ররা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনুনয় করতো–ঐ যে ফি’লে করা মাছের বাকি লেজ-মাথা-কাঁটা ফেলে দিচ্ছ, তা দিয়ে আমি ফিশস্যুপ বানাতে পারি, আমাকে দাও না! ফেলে দিও না!” নিয়ম ছিল না, এক খদ্দেরের অবশেষ আরেক খদ্দেরকে দেয়ার।

খসড়া-৬
স্থাপত্যের ছাত্রছাত্রীরা (তাদের পরবর্তী প্রজেক্ট হলিডে-রিসর্ট) যমুনা রিসর্টে এসেছে ক এবং তার সহকর্মীর সাথে। রিসর্টের সাথে যাদুঘর। প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। ভেতরে গিয়ে ক স্তব্ধ হয়ে যায়। শতসহস্র পোকামাকড় হিম-নীল চোখে ‘চিরযৌবনের তরল’-বন্দি হয়ে চেয়ে আছে। অজস্র পাখি এবং পশু ট্যাক্সিডার্মিস্টদের বিপুল হাতের কৌশলে জীবন এবং মৃত্যুর মাঝের স্তব্ধদ্বীপে দাঁড়িয়ে। পাখিগুলির ডানার রঙ কত! কাঁসা রঙ। তুঁতে রঙ। খড়কুটো রঙ। মরচে রঙ। জলঝাঁঝি রঙ।

–এখানে কতজাতের প্রাণী?”

–“প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রাণী। লোকাল প্রাণী ম্যাডাম!” ম্যানেজারগোছের লোকটা অমায়িক হেসে বলে।

–“সব মারা হয়েছে?”

–“না ম্যাডাম, পোকামাকড়গুলি মারছি, আর পাখিগুলি-বিলাইটিলাইগুলি নিজে নিজে মইরা গেলে পর এলাকাবাসীরা আমাদের দিয়া গেছে!”

ক চুপ করে থাকে। বনবেড়ালগোছের একটা চারপেয়ে প্রাণীর মুখে মৃত্যুভয় প্রায় স্ফটিকীকৃত হয়ে আছে। এরা মরবার আগে ‘এলাকাবাসী’দের মিসড কল না দিলে এতোগুলি প্রাণীদেহ পাওয়া কী করে সম্ভব!

–“ম্যাডাম, এখানে ডিসপ্লেতে প্রজাতির সংখ্যা আমরা আস্তে আস্তে আরো বাড়াব।”

ক কে উৎসাহী এক ছাত্রী জিজ্ঞেস করে–ম্যাডাম, ম্যাডাম, আমাদের প্রজেক্টেও কি আমরা এইরকম যাদুঘর সঙ্গে দিব?”

ক প্রায় আঁতকে উঠে মাথা নাড়ে–“না, না।”

খসড়া-৭
ক’দিন আগের পত্রিকায় এসেছে জলঢুপি টিলাগুলির ‘পতিত জমি’তে (যেখানে শেয়াল-বনবেড়াল-মেছোবাঘ-সরীসৃপের রাজত্ব ছিল) পাঁচ কিলোমিটার জুড়ে এখন ফলের বাগান। আম-কাঁঠাল-চালতা-আনারস-সাতকরা-সবেদা-তুঁতফল। আদা ক্ষেত। সবজি বাগান। ক পত্রিকার ছবিটা আরেকবার বের করে দ্যাখে।

পতিত টিলা-পতিত জলাভূমি যা কিছু চাষের আওতায় পড়ে না–তার প্রতি এই ভূমিধর্ষক মনোবৃত্তি তো যাবার নয়। বাংলাদেশের একজন প্রজননক্ষম নারী গড়ে কতবার সন্তান প্রসব করেন? ৫-৬-৭? এই মানুষগুলির অন্নসংস্থানের চেয়ে বড় আর তো কিছু হতে পারে না। সব পতিত জমি (!) তাই সবজিক্ষেত হতে হবে, সব দীঘি তাই তেলাপিয়ায় ভরে দিতে হবে, সব রসুইন্যাগাছের-কপিলা গাছের জঙ্গল কেটে সাফ করে ফলবান বৃক্ষ বা মেহগনি লাগিয়ে গোড়ায় চুনকাম করে দিতে হবে! সব জলাভূমি ভরাট করে শিল্পনগরী বা এয়ারপোর্ট গড়তে হবে! সব ত্যালঘাউরা পাখি আর বোঁচাহাঁস মেরে ফেলতে হবে!

ক, মরিচা নদীতে শেষবার দেখা গাঙশুশুক, সারেংবাড়ির উঠানে আটক দীঘলগ্রীব কোরা পাখি, আড়িয়ল বিলের ঝোপ আলো করা তেলাকুচার রোমশ ফুল, গতবছরের গুদামজাত চামড়ার পচনশীল স্তূপ আর অনিকেত মেছোবাঘ…এইসব কি তোমার মাথায় থই থই করে? প্রকৃতিকে-জলমণ্ডলকে-প্রাণীজগতের মহামাতৃকূলকে বুভুক্ষার দোহাই দিয়ে এই অবিরাম দোহন তোমাকে পীড়া দেয়? তোমার পীড়া কি তোমাকে সংখ্যালঘু করে দেয়?

২০০৮

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: সাগুফতা শারমীন তানিয়া
ইমেইল: shaguftania@yahoo.com

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Chanchal — জুন ২৬, ২০১১ @ ১২:২১ পূর্বাহ্ন

      লেখাটা ভাল লাগলো। লেখিকার মনের কথাগুলো যেন আমারই কথা। আমিও যেন ক্রমশঃ হতাশ হয়ে পড়ছি। কেননা আমিও যে এত বয়স পর্যন্ত দেখেছি শ্রীমান ল্যান্ডস্কেপগুলো কীভাবে শ্রীহীন হয়ে পড়ছে। গাছপালা কেটে বন-বাদার উজার করে দিয়ে আধুনিক শহর গড়ার একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে সবখানে। চলার পথের গরু-ছাগলগুলো দেখে মনে খুব মায়া জেগে উঠতো মনে হতো, ওরা তো বড় হচ্ছে জবাই হবার জন্য। মনে মনে বলি, বাছারা কী নিশ্চিন্ত মনে ঘাস খেয়ে যাচ্ছ, কিছুদিন পড়েই হয়তো জবাই হয়ে যাবে–একটা অস্ফূট দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে। স্মৃতি হাতড়াতে থাকি। মটর সাইকেল চড়ে চল্লিশ কি.মি. পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন আমাকে আশুলিয়া হয়ে অফিসে যেতে হতো। যেতে যেতে চোখে পড়তো অনেক কুকুর বেড়ালের শতচ্ছিন্ন লাশ, বাস বা ট্রাকের চাপায় ওদের তুলোর মতো নরম শরীর বিটুমিনের সাথে পেস্ট হয়ে গেছে, চোখের বাষ্পে হয়তো চশমার কাচ ভিজে যেত। কিন্তু সেটা কেউ যেন দেখে না ফেলে, সে জন্যে লুকিয়ে ফেলতে হতো। সে জন্য আমি পুরুষ হয়ে জন্মেও পুরুষ হতে পারিনি। কোন কালেও আমার পুরুষ হয়ে ওঠা হলো না। অনেক রাতে বাসায় ফিরছি তখন আশেপাশে কেউ জেগে নেই। কোনো এক বেড়াল বাচ্চা গর্তে পড়ে মিউ মিউ করে কাঁদছে। আমি গর্তে নেমে পড়লাম। পরম যত্নে তাকে কোলে তুলে নিয়ে বাসায় নিয়ে আসলাম। ইউনিভার্সিটিতে কুকুর নিধন দলের সাথে বচসা লাগিয়ে দিতাম। কেননা ওদের আমি আমি মাঝে মধ্যে খাওয়াতাম। ওদের সাথে একটা সখ্য গড়ে উঠেছিল। একটা সায়েন্টিফিক পেপার পড়ে বুঝলাম পশুপ্রেম এক ধরনের অসুস্থতা। কিন্তু আমার স্বজাতির জন্যও যে আমার অনেক মায়া। তাহলে আমি কি অসুস্থ, হয়তো বা। আমার মনে হয় এ লেখিকাও আমার মতো পাগল। পাগলদের দিয়ে নতুন নগর গড়া হবে না, তাদের দিয়ে ৫০০ প্রজাতির পাখির মিউজিয়াম হবে না। তাদের দিয়ে নগরবাসীর মনোরঞ্জনের জন্য সিটি পার্ক হবে না। তারা হতাশবাদী, স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানো মানুষ। তারা গভীর রাতে কাজ থেকে ফিরে লণ্ঠনের আলোয় পাওয়ার গ্লাস মুছে গভীর যত্নে পিপড়ার মতো দীর্ঘ লাইনে মমতাময়ী অক্ষরগুলো শুধু বসিয়ে যাওয়ারই যোগ্যতা রাখে। তারা তো আসলে মানুষই না, মানুষ নামের কলঙ্ক। লেখিকাকে তার প্রাঞ্জল লেখার জন্য ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com