সুফিয়া কামালের স্মৃতিকথা

একালে আমাদের কাল

| ২০ জুন ২০১১ ১১:০০ অপরাহ্ন

7-web.jpg ………
একালে আমাদের কাল বইয়ের প্রচ্ছদ
………

[নিজের জীবনস্মৃতি নিয়ে সুফিয়া কামাল ‘একালে আমাদের কাল’ লেখেন। বই হিসেবে এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে, ‘জ্ঞান প্রকাশনী’ থেকে। ২০০২ সালে, সুফিয়া কামালের মৃত্যুর তিন বছর পরে এটি বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘সুফিয়া কামাল রচনাসংগ্রহ’-এ সংকলিত হয়।
সুফিয়া কামালের জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জন্ম ১৯১১ সালে, বঙ্গভঙ্গ রদ হবার বছরে। পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন ও সাহিত্যচর্চা বাদেও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করেছেন, কোলকাতায় দাঙ্গাপীড়িতের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করেছেন, সদ্য জন্ম নেয়া পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন করেছেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন, প্রতিবাদ হিসেবে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জাহানারা ইমাম এবং সুফিয়া কামাল একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়ে গণআন্দোলন করেছেন।
সুফিয়া কামালের জীবনস্মৃতি তাই বাংলাদেশের ইতিহাসের কথা, নিছক কিছু ঐতিহাসিক তথ্য নয়, সাহিত্যিকের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির উন্মোচন। সুফিয়া কামালের একশতম জন্মদিনে তাঁর স্মৃতিকথা পুনঃপ্রকাশিত হলো।–বি.স.
]
————————–

একালে আমাদের কাল

কবি, সাহিত্যিক, সঙ্গীতকার সিকান্‌দার আবু জাফর আমাকে অনুরোধ করেছেন সেকালের কথা কিছু কিছু লিখে যেতে। আমি যা লিখতে পারি লিখে যাব। কিন্তু সে লেখা যেন আত্মজীবনী বলে কেউ মনে না করেন। আত্মজীবনী মহাত্মা গান্ধীই সার্থকভাবে লিখেছেন। অন্য মানুষের তা অসাধ্য। আমি মাত্র সেকালে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, দেশীয় প্রচলিত বিধি-ব্যবস্থার যতটুকু জানতে পেরেছি তা-ই লিখে রাখবার চেষ্টা করব। জানিনা বর্তমানকালে সে লেখার মান কতটুকু হবে। শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও এই শেষ বয়সের চিত্রপট-পরস্পরকে আজকের পাঠকসমাজের কাছে তুলে ধরবার মত চিত্রণক্ষমতা দাবী করতে আমি পারিনা; তাছাড়া যতখানি স্মৃতিশক্তি ও ধৈর্যের প্রয়োজন তাও আমার নেই। তবু যা আমার মনে বাঁধা পড়েছে, তা বলে যাবার যথাসাধ্য প্রয়াস করে যাব।

তীব্র সংঘাতময় এ জীবনে আমাকে অনেক কিছু হারাতে হয়েছে, তাই ভাল লেখার শক্তিও আজ আর নেই। তবুও হারানো ছড়ানো-ছিটানো কথা কণা কণা করে আমি সংগ্রহ করে নেবার চেষ্টা করব। ভাবব:

জীবনে যত পূজা হলনা সারা
জানি হে জানি তাও হয়নি হারা।

১৯১১ সালের ২০শে জুন আমার জন্মদিন। বাংলা আষাঢ় মাস। সেকালের জমিদার বাড়ীতে পুণ্যাহ বলে একটি পর্ব অনুষ্ঠিত হত। আনন্দ-কলরবে আমার জন্মক্ষণটি উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল বলে শুনেছি। কিন্তু তারপর!

সারা বাংলাদেশে বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদ নওয়াব পরিবারের তখন খ্যাতি। মাতামহ সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেনের কনিষ্ঠা কন্যা সৈয়দা সাবেরা খাতুন আমার মা। ত্রিপুরা জেলার শিলাউর গ্রামের সৈয়দ আবদুল বারী বি.এল. আমার বাবা। আমরা এক ভাই এক বোন।

আমার ভাই সৈয়দ আবদুল ওয়ালী আমার তিন বছরের বড়। আমরা মাতামহের গৃহে আদর-যত্নে লালিত-পালিত। শায়েস্তাবাদ পরিবার তখন মানে-সম্মানে ধনে-জনে ঐশ্বর্যে-শিক্ষায়-সোহ্‌বতে তাজিম-তওজ্জায় বিখ্যাত। অন্দরমহলে পুরোপুরি মোগলাই আদব-কায়দা, হালচাল, শিক্ষা-সংস্কৃতি। বাইরে ইঙ্গ-বঙ্গ ফ্যাশন, কেতাদুরস্ত হালচাল। মামারা ব্যারিস্টার, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, নিমকের দেওয়ান, পুলিশের বড় কর্তা। কিন্তু ছয় মাস, বছর—বড় জোর বছর দুই চাকরীর পর ‘গোলামীর মুখে ঝাড়ু মারি’ বলে হাতি, ঘোড়া, বজরা-বাইচ, গাড়ী, পাল্কী, বাইজী শোভিত প্রাসাদে ফিরে এসে, সুবৃহৎ পাঠাগার স্থাপন করে আরাম-আয়েশে থাকতে থাকতে হঠাৎ শ্রাবণ-রাতের প্লাবন ধারার মত একে একে অনন্তের ডাকে পরিণত অপরিণত বয়সে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে কিছুমাত্র দ্বিধাবোধ করেননি।

1-web.jpg

আমার প্রথম স্মরণে জাগে ঐশ্বর্যের সমারোহ। বর্তমানের পাঁচতলা সমান উঁচু দোতলা বাড়ীর বিরাট দরওয়াজা, আবলুস কাঠের চিক্কন সূক্ষ্ম কারুকাজের উপর রোদের আলো পড়ে চক চক করে উঠত। ছাদভর্তি টানা পাখার আওতা বাঁচিয়ে বিরাট বিরাট ঝাড় ফানুস, হাওয়ায় তার টুংটাং আওয়াজ। টানা পাখাগুলো খস-এর পাল্লা দেওয়া, গরমের দিনে তাতে পিচকারী দিয়ে পানি দিত বাঁদীরা। দুপুরবেলা ছায়াছায়া, অন্ধকারের মধ্যে সেই পাখার হাওয়া, খস-এর খুশ্‌বু; চারিদিকে বাঁদী-খেলাই। আতুজী মোগলানীরা বসে আছে, আর মামানী, খালাআম্মারা, মা-বোনেরা শুয়ে-বসে পান খেতে খেতে বাঁ হাতে-পায়ে মেহেদী লাগাতে লাগাতে, কেউবা সেলাই হাতে, কেউবা সরু সুন্দর সুপারি কাটার অভ্যাস করতে করতে ‘আমীর হামজা’ বা ‘হাতেমতাই’-এর পুঁথি পড়া শুনছেন—পড়ছেন বসে আমার আম্মা—টুকটুকে ঠোঁট নেড়ে রূপে অপরূপা, গুণে অতুল্যা, ধৈর্যে অনিন্দিতা—সেই আমার মা।

মাটিকে বাদ দিয়ে ফুলগাছের যেমন কোন অস্তিত্ব নেই, আমার মাকে বাদ দিয়ে আমারও তেমন কোন কথা নেই। আমি জন্ম নেবার আগেই মায়ের মুখে ‘হাতেমতাইয়ের কেচ্ছা’ শুনে আমার নানীআম্মা আমার নাম রেখেছিলেন হাসনা বানু। আমার নানা প্রথম বয়সে সদর আলা থেকে জজগিরি পর্যন্ত সারা করে শেষ বয়সে সাধক-‘দরবেশ’ নাম অর্জন করেছিলেন। শুনেছি যে-দিন আমি হলাম, নিজের হাতে আমার মুখে মধু দিয়ে তিনি আমার নাম রেখেছিলেন সুফিয়া খাতুন। কিন্তু আমার ডাকনাম হাসনা বানুটাই আমাদের পরিবারে প্রচলিত। সুফিয়া বললে এখনও কেউ কেউ আমাকে হঠাৎ চিনতে পারেন না। আমার ভাইয়া ছোটবেলায় আমাকে ডাকতেন ‘হাচুবানু’ বলে; কেউ কেউ বলতো ‘হাসুবানু’।

মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে—সুখ-স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন। দুঃস্বপ্নে আসে একটা আতঙ্কিত ভাব; সুখ-স্বপ্নের মধুর আবেশে মন ভরে থাকে। আমারও শৈশবের সুখ-স্বপ্ন মধুময়। অফুরন্ত ঐশ্বর্যের মধ্যে, শিক্ষিত পরিবারের আওতায়, ধর্মীয় পরিবেশের মধ্যে বেড়ে উঠেছি।

মক্তব-মসজিদ-লঙ্গরখানা, স্কুল-পাঠাগার, হিন্দু কর্মচারীদের পূজা-পার্বন অনুষ্ঠান-উৎসব আনন্দ ছড়ানো একটি পরিবেশ। ছোটবেলায় এসব আনন্দ-উৎসবে শরীক হতে বাধা ছিল না। বারো মাসে তেরো পার্বণ লেগেই থাকতো। তখনকার জমিদারেরা শাসন করতেন কড়া হাতে আবার পালন করতেন উদার মন নিয়ে। ঈদে-বকরীদে সারা রাজ্যের প্রজারা এসে নামাজের পর জড়ো হয়ে জমিদারের সাথে কোলাকুলি করত। মামারা ঘেমে যেন বেহুঁশ হয়ে পড়তেন। তবুও গলা মিলাবার পালা ক্ষান্ত হতনা। সবাই খেতে বসত। একসাথে হাজার হাজার মানুষ খাচ্ছে। শুধু দুই ঈদেই নয়। শবে মেরাজ, শবে বরাত, শবে কদরেও এধরনের উৎসব অনুষ্ঠিত হত। আমাদের নবী করিমের জন্মদিন ‘বারে ওফাত’ ঈদ-ই মিলাদুন্নবী বড়ই সমারোহের সাথে সম্পন্ন হত; আলোতে জেয়াফতে ধনী-দরিদ্র বারো দিন ধরে মিলাদ মহফিলে সমবেত হত। বারো দিনের দিন জেয়াফত খাওয়ানো হত সকলকে একসাথ করে। আখেরী চাহার শোম্বা—হজরতের আরোগ্যস্নানের দিনটিতে সকলে দোয়া লেখা পানি মাথায় দিয়ে গোসল করে বৎসরের মত রোগের হাত থেকে বাঁচবার আরামের নিঃশ্বাস ফেলতো। বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য তো এ দিনটি প্রত্যেক মায়ের প্রতীক্ষার দিন ছিল। এসব হল বিশ্বাসের, আশ্বাসের, ঈমানের কথা। মোহরমের দশদিন এলাকার প্রজারা বাড়ীতে রাঁধত না। সারাদিন রোজা-রাখার পর খিচুরী ও শরবত খাবার জন্য দলে দলে আমাদের বাড়ীতে সমবেত হত। সন্ধ্যায় কোরআন তেলাওয়াত, দরুদ পাঠ আর মর্সিয়া জারী গানের সুরে আকাশ বাতাস বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে উঠত। ‘শহীদে কারবালা’ ‘জঙ্গনামা’ পুঁথিও পড়া হত। নিকটের-দূরের গাঁয়ের ‘পণ্ডিতেরা’ এসে সরকারী বাড়ীতে পুঁথিপড়া শুনিয়া ইনাম বখশিস নিয়ে যেতেন। জমিদার বাড়ীকে সবাই বলত ‘সরকারী বাড়ী’ বা ‘নওয়াব বাড়ী’। আমার নানা নওয়াব ছিলেন। কিন্তু নওয়াব বাড়ী কথাটা তিনি পছন্দ করতেন না। বলতেন এটা সবার বাড়ী—তাই ‘সরকারী বাড়ী’ কথাটাই চালু ছিল।

আমলা-কর্মচারী, ডাক্তার-কবিরাজ এঁরা ছিলেন হিন্দু। তাঁদের পালাপার্বণ-পূজায় জমিদারের খরচায়ই উৎসব হত। ভোজও তাঁরা জমিদারকে দিতেন ‘সম্মানী’ নজর সহ। তাদের দেয়া উপহার পায়েস ‘পরমান্ন’-নাড়ু-মণ্ডা-মিষ্টি যে কত খেয়েছি। আবার তাদেরকেও দিতে হত সম্মানী টাকা। সাহেব, বেগম সাহেবা, ফুফুজান, খালাআম্মা, আপাজান, দুলাভাই সাহেবদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ পেতেন সেলামী বাবদ। এঁদের বেতন ছিল মাসিক ৮, ১০, ১৫ টাকা; কিন্তু বাড়ী-ঘর, জমি, খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন ছিল যথেষ্ট। পুকুর-দীঘির মাছ, বাগ-বাগিচার ফল, পান-সুপারি, তরকারী এরা পয়সা দিয়ে কিনতেন না। এঁদের বৌ-ঝিরা অনেক সোনার গয়না পরতেন। আমাদের খানদানে সোনা কেউ বড় একটা পরতেন না। সাচ্চা পাথরের ‘জড়াও’ গয়না এবং সাধারণতঃ মোতির ব্যবহার বেশী ছিল! মুরুব্বীরা বলতেন, সোনা যদি আমরা পরব তবে বাঁদী-চাকরানী-দাই-খেলাইরা কি পরবে?

তাই ওদের সকলের হাতে-নাকে-কানে-গলায় যে পরিমাণ সোনা দেখতাম, আজকাল তা আমাদের নেই, হীরা-মোতি তো দূরের কথা। কাপড়-চোপড়েও ঢাকাই শাড়ী, থানের উপর চিকনের কাজ করা, আবেরওযাঁ আর আসল মসলিন না হলেও নামে মসলিনের উপর চিকনের কাজ করানো কাপড়ের ব্যবহার ছিল। পুরুষদেরও কুরতা, বেনিয়ান, শেরওয়ানী তাই দিয়ে তৈরী হত। বিয়ে-সাদীতে সাচ্চা কাজ করা সিল্কের কাপড়ে পেশোয়াজ, ওড়না, পাজামা এবং জোড়া বদলাইয়ের জন্য বেনারসী শাড়ীর প্রচলন ছিল। তারপর এল বোম্বাই শাড়ী। গয়নাপত্র ঢাকা, লক্ষ্ণৌ, কলকাতার হ্যামিল্টনের দোকানে অর্ডার দিয়ে আমদানী করা হত। চিকনের কাজ, বদনার কাজ মোগলানীদের সাথে বসে ঘরের বৌ মেয়েরাই পছন্দমত তৈরী করে নিতেন। ছোট থাকতে কাপড় দরজী সেলাই করবে; কিন্তু একটু বড় হয়ে উঠলে ঘরের মেয়েদের গায়ের মাপ অন্য পুরুষ জানবে—এটা বড় বেহায়াপনা ও শরমের কথা ছিল। নিজেদের নিমা নিজেরাই তৈরী করে নিতে হবে। তার উপর ঢিলা কুর্তা ও কলিদার পায়জামা এবং তার সাথে ওড়না ব্যবহার করার রেওয়াজ ছিল। আমাদের পরিবারে শালওয়ার কামিজের প্রচলন হয়নি। উৎসবে খুশীতে শাড়ী পরতে বড় ভাল লাগত। বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত মেয়েরা পায়জামা কুর্তা পরত। অবিবাহিত মেয়েদের সিঁথি করে চুল আঁচড়ানো বা সাজগোজ করা, পানখাওয়া ইত্যাদি একদম নিষিদ্ধ ছিল। আমাদের যুগে আমরা সাবান পাউডার ব্যবহার করেছি। কিন্তু নানী, খালা, মামানী, মা—এঁরা সাবান, পাউডার ব্যবহার করতেন না। তাঁরা মুসুরের ডাল পেষা, উপটন ও সেন্দা মেথি গিলা, একাঞ্চী পেষা ইত্যাদি ব্যবহার করতেন। অদ্ভুত সুন্দর একটা গন্ধ তাঁদের ঘর-বিছানা ভরে থাকতো। মেহেদী পরার ব্যাপারটাও একটা ললিতকলার মত অনুষ্ঠান ছিল। প্রথম কোন শিশু রোজা রাখলে তার রোজা রাখার দিন পহেলা রমজান একটি আনন্দ উৎসব হত। রোজাদার শিশুকে সকাল থেকে নানা ধর্মকথা শোনানো হত। তাকে মেহেদী লাগিয়ে সেন্দা-মেথির খুশবু মাখিয়ে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হত।

যে কয়জনই এ-ভাবে একসাথে রোজা রাখত, সবাইকেই একরকম ভাবে তোয়াজ করা হত। তারপর আসত ইফতার তৈরী করার পালা। মুরুব্বীরাও গোসল নামাজ সেরে জোহরের পর থেকেই ইফতারের আয়োজনে লেগে যেতেন। কতরকম ইফতার যে তৈরী হত। আসরের নামাজ পড়ে সেই ইফতারের অংশ মসজিদে দিয়ে এসে তবে মাসুম বাচ্চাদের নিয়ে বাচ্চা রোজাদার অপেক্ষা করত ইফতারের সময়ের জন্য। মসজিদের মুয়াজ্জিন আযান দিলেই রোজা খোলা হত। গরীব বাচ্চারা থাকত আশে পাশে তারাও খেতে পেত। আর পেত পয়সা। ধনী গৃহের অনুষ্ঠানটি দরিদ্রদেরও ভাগ্যে ভাল খাবার জোটবার একটা উপায় ছিল।

আমাদের সু-বৃহৎ পরিবারে বাচ্চার অভাব ছিল না। প্রত্যেক বছরই দু-চার জনের রোজা খোলাই হত। এমনি এক রোজা খোলাই হচ্ছিল আমার মামাত বোনের মেয়েদের। মামাত বোনের মেয়ে হলেও আমার চেয়ে তারা ছিল বয়সে বড়। তাদের রোজা রাখা দেখে আমিও নাকি জেদ ধরেছিলাম রোজা রাখব বলে; আমার বয়স নাকি তখন ছ’ বৎসর পূর্ণ হয়নি। অবশ্য পরে আমি একথা সকলের কাছে শুনতে পেয়ে জেনেছি। আমার জেদ দেখে আম্মারা নাকি বলেছিলেন: থাকুক কতক্ষণ; না খেয়ে খিদে পেলে বা পিয়াস লাগলে আপনি খেতে চাইবে। কিন্তু আমি নাকি সারাদিন ধরে কিছুই খেতে রাজী হয়নি। তাই আমাকেও মেহেদী উপটন লাগানো হল, গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হল। সন্ধ্যায় আযান দেবার অল্পক্ষণ আগে নাকি বলেছিলাম; আর রোজা রাখব না, পানি খাব। তখন নাকি একেবারে সন্ধ্যা। তাই আমাকে কোলে করে ভুলিয়ে ভালিয়ে আযান দেয়া পর্যন্ত এটা সেটা করে সময় কাটিয়ে দেয়া হয়।

আযান হওয়া মাত্র মুখে শরবত দেবার সাথে সাথেই নাকি আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। তারপর হুলুস্থূল কাণ্ড। আমাকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত। কোথায় কি করবে—মসজিদের বড় হাফেজ সাহেব আম্মার ওস্তাদজী, তিনি এসে আম্মাকে খুব বকলেন, আর আমাকে কোলে করে বসে দোয়া-দরূদ পড়তে শুরু করলেন। ডাক্তার-কবিরাজ সবাই মুখের ফাঁকে ওষুধ দিতে লাগলেন। রাত তিনটায় আমার হুঁশ হতেই বলে উঠলাম যে পানি খাব। কিন্তু পরে সাত বছর থেকে রোজা রেখে আর কখনও বেহুঁশ হইনি।

মানুষের বুদ্ধি হয় কখন জানিনা। নানা-নানী যে ইন্তেকাল করেছেন আমা দেড় বছর বয়সেই। তখন আমি দুঃখ-শোক বোধের অতীত। এই সাত বছর বয়সের সময় একদিন আমার এক মামাত বোনের স্বামী ঘোড়ায় চড়ে বরিশাল থেকে বাড়ীতে আসছেন। মামাত বোনের মেয়ে চান্দ বিবি আমার চেয়ে বছর দেড়েকের বড়। সে বলল চল চল খালা, আমার আব্বু আসছেন দেখি গিয়ে। দৌড়ে গেলাম সেই অন্দর বাড়ী থেকে বাইরের প্রকাণ্ড দেউরির কাছে। দুলাভাই দেউরির কাছে ঘোড়া থেকে নামলেন। এগিয়ে এসে আমাদের দু’জনকেই আদর করে দুই কোলে নিয়ে বাড়ীর মধ্যে নিজের ঘরে গেলেন। আর একদিনের কথা, আমার আম্মা তখন আসরের নামাজ পড়ে নামাজের চৌকি থেকে নামছেন। আমি গিয়ে বললাম, পরশুদিন সুলতানা আপার (আমার এক মামাত বোন) আব্বা এলেন। আমার আব্বা আসেনা কেন আম্মা? আম্মা, নির্বাসিতা হাজেরার মত মহীয়সী আমার মা, আমাকে জড়িয়ে ধরে বাণবিদ্ধা কপোতীর মত লুটিয়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। সবাই দৌড়ে এলেন, আমি ত সেই কালের অন্ধ শিশুমন নিয়ে বিস্ময়ে অবাক। কী হল বুঝতে পারলামনা কেঁদে উঠলাম। কি হল। কি হল? সবার মুখে একই প্রশ্ন। গোলাপ পানি স্মেলিং সল্ট দিয়ে আম্মার হুঁশ ফিরিয়ে আনা হল। সকলের জিজ্ঞাসার উত্তরে আম্মা আমার প্রশ্ন করার কথাটি বললেন। দেখলাম সকলেই চোখে আঁচল দিচ্ছেন। সুলতানা আপাই আমাকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন আসবে আপু তোমার আব্বাও আসবেন একদিন। কিন্তু সেই ‘একদিন’ আমার জীবনে আর আসেনি। আমার আব্বাও কখনও আর ফিরে আসেননি।

এই না আসার কারণ আমি পরে জেনেছিলাম। তিনি বিদ্বান মানুষ ছিলেন। একসাথে নয়টি ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন। দীওয়ান-ই-হাফেজ তার কণ্ঠস্থ ছিল। এস্‌মে আজম জপ্‌ করতে যেয়ে তিনি উন্মাদ হয়ে যান; আমার নানা অনেক দোয়া-দরুদ করে তাকে সুস্থ করে তোলেন। পরে তিনি সাধকদের অনুসরণ করে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। আমার ভাইয়া তখন সাড়ে তিন বছরের। আর আমি সাত মাসের। অনেক খোঁজখবর নেবার পর আমার প্রায় সাত-আট বছর বয়সের সময় আমার এক মামাত ভাই হজ্ব থেকে ফিরে এসে খবর দিলেন যে আমার আব্বা এখন পুরোপুরি দরবেশ হয়ে গেছেন। হাতে পায়ে ধরে কান্নাকাটি করেও মাতাত ভাই তাঁকে আর দেশে ফিরিয়ে আনতে পারলেন না। উপরন্তু তিনি মামাত ভাইয়ের মারফত সকলের কাছে মাফ চেয়েছেন এবং বলেছেন যে আল্লাহ যখন তাঁকে এই পথেই এনেছেন, তখন তার আর সংসারে ফিরবার সাধ্য নেই।

আমার প্রশ্নে মায়ের সেই কাতরতার কথা আজও মনে রয়েছে। আমার শিশুমনে বেদনার দুঃখের সেই প্রথম বোধ, উপলব্ধি। সে-দিন থেকে আমার মনের বয়স যেন বেড়ে গিয়েছে। দুনিয়া তখনও আমার অচেনা, কিন্তু বেদনার সাথে যেন সেই শৈশবেই, সেই দিন থেকেই—নিবিড় পরিচয় হল আমার। চিরকাল আমি সংসারানাভিজ্ঞা, বুদ্ধিহীনা—তবু সেদিন মায়ের যে কতখানি ব্যথা; অত ঐশ্বর্যের ক্রোড়েও যে মা কত রিক্তা—একথাটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলাম। সেই ব্যথাই আজও হয়ত আমাকে দুঃস্থ মানবমনের সংস্পর্শে আসার প্রেরণা দেয়।

আমাদের পরিবারটি ছিল সুবৃহৎ। মা, মামা-খালাআম্মারা মিলে ছয় ভাই ছয় বোন। আমার আম্মা বোনদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠা। মামা সৈয়দ ফজলে রাব্বী এককালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এ. টি. এম. মোস্তাফার শ্বশুর। ১৯৬৩ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর সন্তানরাই এখন শায়েস্তাবাদ বংশের অবশিষ্ট বংশধর।

আমার শৈশব-কৈশোর আমাদের পরিবারেরই গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ। বিশাল প্রাচীরের ভিতর বিরাট ভবন। বাগবাগিচায় শোভান্বিত শ্যামল ভিতর-বাড়ীতে দুই পুকুর—একটি গোসলের, অন্যটি রান্না করা, কাপড় ধোয়ার কাজের। অন্দরের পুকুরের সাথে প্রাচীরের তলা দিয়ে গেট করা, খাল থেকে নদীতে যাওয়ার পথ। জোয়ারের পানি নববর্ষায় উচ্ছ্বসিত হয়ে গেটের তলা দিয়ে পুকুরে আসত আর আসত অসংখ্য মাছ। বেগম-বিবিরা সেই মাছ ধরতেন অবসরের আনন্দে। অন্দর বাড়ীতে পুরুষের প্রবেশ ছিল না; তাই বিবিরা সকলেই সাঁতার কেটে নৌকা বেয়ে আনন্দ-উৎসব করার সুযোগ পেতেন। গরমের দিনে দুপুরে থাকবার জন্য ঠাণ্ডা আটচালা বাংলোর সিঁড়ি ধাপে ধাপে নেমে গেছে বৃহৎ পুকুরের মধ্যে। দুই ধারে মেহেদী গাছের বেড়ার মধ্যে অজস্র ফুলের গাছ। রঙ্গন গাছের কুঞ্জ বেয়ে লতিয়ে উঠেছে লতা-বেলী, জুঁইয়ের ঝাড়, কামিনী, শেফালী, জবা, সূর্যমুখী। শিউলি বোঁটার রঙে কাপড় রাঙ্গিয়ে পরার জন্য প্রচুর ফুল সংগ্রহ করে বোঁটা শুকিয়ে রাখা হত। এসব কাজে ছেলে-মেয়ে বৌ-ঝিদের উৎসাহ ছিল প্রচুর। ভোর-সকালে ফুল কুড়াবার পাল্লা দেওয়া হত, কে কত ফুল কুড়াতে পারে। বাইরে থেকে মালীরাও ফুল পাঠাত অন্দর মহলে। ফুল বাছানিয়ারা তা থেকেও বোঁটা সংগ্রহ করত। আম, জাম, লিচু, আতা, বাতাবি, সপেটা, লেবু, তুঁত, পেয়ারা, তাল, খেজুর, কলা, কামরাঙ্গা, করমচা, চালতা, আমরুল, আঁশফল, সুপারির গাছ প্রাচীরের পাশে বহু বিস্তৃত সীমানার মধ্যে থাকায় তাজা টাটকা ফল পেতে পরিবারের অভাব হত না। বরিশালের কালবৈশাখী যে না দেখেছে বৈশাখের রুদ্র রূপই তার যেন অদেখা রয়েছে বলে আমার ধারণা। সেই কালবৈশাখীর দিনে ঝড়ের মধ্যে আম কুড়াবার আনন্দ আমার সন্তানরা কেউ পেলনা বলে আমার দুঃখ হয়।

পশ্চিমের বালাখানার সামনে প্রকাণ্ড গোলাকার ময়দান। তার উপর লোহার গেট, প্রকাণ্ড দেউড়ীর সীমানা ছাড়িয়ে দু-তিন বিঘা জমির উপর বৃত্তাকার লাল সুরকীর পথ। তারই বৃত্ত ঘিরে কেয়ারী করা ফুলের বাগান। নয়জন মালী তার দেখাশুনা করত। গোলাপ যে কত রকম ছিল তার হিসেব নেই। আমার একজন দূরসম্পর্কের মামা ডাক্তার ছিলেন। রেঙ্গুন ঘুরে এসে বাড়ীতে সখের ডাক্তারী আর এই বাগান নিয়ে তিনি এতই মশ্‌গুল হয়ে গেলেন যে রাত্রে সবাই ঘুমালেও তিনি ঘুরে ঘুরে দেখতেন ফুল গাছে কোন ফুলটা ফুটল, না বুঝি কী কথাটা কয়ে উঠল। তিনি নানারূপ ভেষজ বৃক্ষলতার চাষও করতেন। কোন পাতার কি গুণ কোন গাছের হাওয়ায় কত উপকার তিনি তা আমাদের বলতেন। একে ত আমাদের পরিবারের ভাষা ছিল উর্দু, তারপর বহুদিন তিনি বিদেশে কাটিয়ে নানা ভাষার জগাখিচুড়ি করে মালীদের যখন বকতেন তখন আমরা খুব মজা পেতাম। এই ডাক্তার মামা ছিলেন ঢাকারই এক প্রসিদ্ধ পীর বংশের সন্তান। তার পূর্বপুরুষ নাকি এসেছিলেন বাগদাদ থেকে। তিনি একটি দোয়া জানতেন, পানিতে সেই দোয়া পড়ে ফুঁক দিয়ে যে কোন কলেরা রোগীকে খাওয়ালে সে ভাল হয়ে যেত। আমি ছোটবেলায় নিজেই তা দেখেছি। বৈজ্ঞানিক যন্ত্রযুগে একথা হয়ত পাগলের প্রলাপ বলে ধরা হবে।

ফাল্গুন মাস পড়লেই কাপড় রাঙ্গাবার ধুম পড়ে যেত। সেও যেন এক উৎসব। শেফালী ফুল, কুসুম ফুল, বাসন্তী রং গুলাই আনার রং, হালকা নীল সবুজ গোলাপী রং ঘরেই তৈরী হত। কুসুম ফুলই চোলাই করে সোডা সাজিমাটি লেবুর রস দিয়ে নীল সবুজ রং করা হত। গোসল-অজু করে পাকসাফ হয়ে তবে রং চোলাইয়ের ঘরে ঢুকতে হত। কাপড় রং করা হয়ে গেলে সবাই মিলে সেই রং নিয়ে খেলে হাসি কলরবে মেতে উঠতেন। ঠাট্টার সম্পর্কের দুলাভাই নানা-নাতীরাও এতে অংশ নিতে পারতেন। রং করা শাড়ীতে-কাপড়ে আবার আতর লোবানের ধোঁয়া দিয়ে ‘বাসাও’ করা হত। সারাদিনের পর আসরের নামাজের সময় সেই শাড়ী পরে সবাই যখন একসাথ হতেন, তখন সত্যিই স্বপ্নপুরীর শাহজাদীদের কথা মনে পড়ত। আমার আম্মার চুল ছিল পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত। সেই চুল আলনায় হাওয়া করে শুকিয়ে নেয়া হত। তারপর চুল বাঁধার পালা, কত যে মানুষ ছিল, একজন একজনের খোঁপা বেণী এক এক রকম করে বেঁধে দিতেন। গরমের দিনে ঘাটের সানের উপরই সবাই সারাদিন নামাজ সেরে নিতেন। তারপর চলত চা পানের পালা। সারাদিন যে-সব পিঠা, হালুয়া মোরব্বা তৈরী হত বাইরে খানসামারা আর ভিতরে চাকরানীরা বড় বড় রূপার ছেনি ভরে তা পৌঁছাত। কিন্তু মেহমান এলে বেগম-বিবিদের এ আয়েশ আর থাকত না। সে সন্ধ্যাই হোক আর রাতই হোক। খালি বাবুর্চির হাতের খানা-নাশতা মেহমানকে দিতে বে-ইজ্জতি মনে হত বলে তখনি আবার নতুন করে খাবার তৈরী করতে হত। চা-শরবত পান এ সবই অন্দর মহল থেকে যাওয়া চাই।

বাড়ীতে অন্দর মহলে বিস্কুট রুটি কেকও তৈরী হত। কিন্তু আমার বড় মামার বিস্কুট রুটি কেক চিনি নুন চা গোলমরিচের গুঁড়া আসত কলকাতার আর্মি নেভী স্টোরস থেকে। পাউরুটি তিনি খেতেন না। ঘরের তৈরী রুটি, পরাটা, হালুয়া নিমকি সবই তিনি খেতেন। কিন্তু অতি সামান্য পরিমাণে। টেবিল চামচের এক চামচ সরু চালের ভাত খেতেন, কিন্তু উপকরণ থাকত সতেরো রকম। আর খেতেন সাত সের দুধকে ঘন করে এক সের করে। ১৯৩১ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন; কিন্তু সেই আশি বছর বয়সেও তিনি ছ’মাইল হাঁটতেন। শিকার করতেন। কুড়াল দিয়ে কাঠ চিরে এক্সারসাইজ করতেন।

তাঁর ছিল সর্বভারতে প্রসিদ্ধ নিজস্ব লাইব্রেরী। খোদা বখ্‌শ সাহেব ছাড়া এতবড় নিজস্ব লাইব্রেরী আর কেউ প্রতিষ্ঠা করেননি বলে আমরা বহুজনের মুখে শুনেছি। কিন্তু সে সব কথা এখন একান্তই অবান্তর বলে মনে হয়। রাক্ষসী পদ্মার অন্য বাহু ‘কালাবদর’ সমস্তই গ্রাস করেছে। আজ উত্তাল তরঙ্গ সেই স্বর্ণভূমির উপর দিয়ে প্রবাহিত। কীর্তিপাশা গ্রাস করে পদ্মা ‘কীর্তিনাশা’ হয়েছে। শায়েস্তাবাদ গ্রাস করে হয়েছে ‘কালাবদর’। দশমাইল দূরে নদীর পারে হাওয়াখানা ছিল। পাল্কি করে সেখানে যাওয়া হত। আর বর্ষার দিনে বোটে করে। নদীর পানি সেই হাওয়া খানার তলায় ছলাৎ ছলাৎ করত। বোট থেকে একেবারেই ঘরে ওঠা হত। আর নদীতে বসে নদী দেখার জন্য উঁচু করে গোলমিনার তৈরী করা হয়েছিল। তার সাথে ছিল প্রশস্ত চিলা ছাদ। গোল ঘুরানো সিঁড়ি দিয়ে সেই ছাদে সন্ধ্যায় উঠতেন বিবিরা, নামাজ পড়া হত, পান খাওয়া হত। তারপর সাহেবও কখনো-কখনো সেখানে গেলে নীচের তলায় তামাকুদার পেচোয়ানে তামাক দিয়ে তার নল বাঁদীর হাতে দিয়ে সেই গোল চাবুতরার ছাদে পৌঁছিযে দিত। সাহেব সেখানে বসে তামাক খেতেন।

এসব আমার নানার আমলের কথা। কিন্তু আমি সেই পেচোয়ানের বিরাট নল জড়ানো অবস্থায় দেখেছি। কত কারুকার্যকরা সেই পেচোয়ানের নল। আর কত লম্বা। ১৯৫০ সন পর্যন্ত আমার সেই খালু বেঁচেছিলেন। তিনি একদিন বলেছিলেন “এই নল তোমার শ্বশুরবাড়ী চাঁটগা থেকে এনে লক্ষ্ণৌ-এর কারচুবিদার দিয়ে জরির কাজ করানো হয়েছিল।” তখনকার দিনের মানুষেরা অন্য রকম মন মেজাজের ছিলেন। শখ, ঝোঁক, জেদ বা নেশার জন্য তাঁরা সব কিছুই করতে পারতেন বে-পরোয়া হয়ে। তাঁদের উত্থান বা পতন তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিতেন, তাই বোধ হয় পরিণাম পরিণতির ভাবনা ভেবে তারা দুঃখ পেতে চাইতেন না। আল্লাহ যখন যা করেন, সবই তাঁর হাতে—এই বিশ্বাসেই তাঁরা অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে চাইতেন। হিসেবের খাতার ধার ঘেঁষতে চাইতেন না।

লোহা-পিতল মিলানো তৈরী দেউরীর বাইরে সোজা চলে গেছে পথ। ঝাউ দেওদার কৃষ্ণচূড়া নিম একটির পর একটি সারিবদ্ধ করে লাগানো। তার পর হাটখোলা। ইঁটে বাঁধানো দু’ধারের চালাঘরের উপর সেই তরুচ্ছায়া। তারপর খালের উপর দিয়ে কাঠের পুল। সেই পুলের দু’ধারে কতকালের প্রাচীন যে গুলমোরের দুটি গাছ। বসন্ত থেকে বর্ষা পর্যন্ত গোলাপী ফুলে ছেয়ে থাকত, আর বহুদূর নদীর পথ থেকেও সেই গাছ দেখে স্থান নির্ণয় করত মাঝিরা।—শায়েস্তাবাদ নওয়াব বাড়ীর ফুলগাছ। লঙ্গরখানা চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকত রাহ্‌গীর মুসাফিরের জন্য। ডালভাত, একটা মাছের সালুন। কাবুলী-পেশোয়ারীরা এলে চারজনের জন্য একটা ভেড়া জবেহ্ করে আটা ঘি সমেত দেয়া হত। ভোজপুরী দারওয়ান ও পশ্চিমা ছাতুখোররা এলেও যথাযথ আটা ইত্যাদি বরাদ্দ ছিল। অবস্থা বিশেষে ময়দা ও চাউলের গুঁড়ার পিঠাও হত। কাবুলী-পেশোয়ারী, খোরাসানী, তুর্কী, মিশরী কত যে মুসাফির ব্যবসায়ী, মৌলানা মৌলবীরা তখন আসতেন। আর কত রকমের মসলা-মশায়েল, হাদীস-কোরআনের ব্যাখ্যা যে হত, সে এক এলাহী কারবার! আর মিরাদও অনেক দেশের অনেক রকম হত। কেউ বসে সালাম পাঠ করবার ফতোয়া দিতেন, কেউ দাঁড়িয়ে। কেউবা আবার ওসব না-জায়েজ বলে প্রচার করতেন। কিন্তু আমাদের খানদানী মিলাদ মহফিল প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার হতই। এতে ছেলেরাও সব গজল-নাত-হাম্‌দ পড়া শিখত। আর আমার মামানী বলতেন সবচেয়ে আমাদের মিলাদই সুন্দর। চিকের আড়াল থেকে মেয়েরা সবাই যোগ দিতেন সেই মিলাদ মহফিলে। রমজানের সময় মেয়েরাও গিয়ে মসজিদে তারাবিহ্ নামাজে শামিল হতেন।

দারওয়ানরা বাড়ী পাহারা দিত। আমার মনে আছে আমরা বাচ্চারাও যেতাম আর মসজিদের জায়নামাজেই ঘুমিয়ে পড়তাম। সকালে দেখতাম ঠিক বিছানায়ই শুয়ে আছি। বড় মামা বলতেন ফেরেশ্‌তারা বাচ্চাদের সবাইকে ঘরে এনে শুইয়ে দিয়ে গেছেন।

খতম তারাবিহ্‌র রাত্রে খুব ধুমধামে খানাপিনা হত; আর শবে-কদরে সারারাত নামাজ পড়ার জন্য আমরা প্রাণপণে জেগে থাকতে চাইতাম। সেদিন মসজিদে ফজর হয়ে যেত, ফজরের নামাজ পড়ে সবাই ফিরে আসতেন। বড় মামা ভাইয়াদের জিজ্ঞাসা করতেন: কোন্ কোন্ ফেরেশতার সাথে দেখা হল বলত মিঞারা! তাঁর বিরাট দেহ আর গুরুগম্ভীর আওয়াজকে সবাই ভয় করত। কিন্তু আমি ছিলাম তাঁর বড় আদরের। তিনি আমাকে সযত্নে কোলে করে ঘরে নিয়ে আসতেন। কি সুন্দর যে তিনি ছিলেন আর কি বিদ্বানও যে ছিলেন! কিন্তু নারী শিক্ষার মোটেও পক্ষপাতী ছিলেন না তিনি। আমার প্রথম লেখা কাগজে বের হবার পর তিনি আমাকে হুকুম দিলেন বরিশাল থেকে শায়েস্তাবাদে যেয়ে থাকতে। অথচ তাঁরই এমন বিরাট লাইব্রেরীর আওতায় চুরি করে লেখাপড়া শেখা আমার—শুধুমাত্র আমার মায়ের উৎসাহ ও সহায়তায়। আর তাঁর মুখেই আমরা যত বাইরের দুনিয়ার খবর পেতাম। রাত্রে এশার নামাজের পর তিনি বাংলা উপন্যাস পড়ে মামানী-খালাআম্মাদের শোনাতেন। ভাল সংস্কৃত জানতেন তিনি। ‘মেঘদূত’ ‘রাজতরঙ্গিণী’ ‘রঘুবংশ’ পড়ে কি সুন্দর বাংলা করে শোনাতেন। আমি তখন খুবই ছোট, তবুও তাঁর পড়ার মাধুর্যটুকু এখনও যেন মনে গুঞ্জরণ করে। তার মুখে প্রথম প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘রত্নদীপ’ আমরা শুনি। আর যতরকম ইংরেজী বাংলা আরবী উর্দু ফার্সী গল্প কবিতা তিনি আবৃত্তি করে গল্প পড়ে শোনাতেন। সব রকমের খবরের কাগজ, মাসিক ত্রৈমাসিক সাপ্তাহিক দৈনিক পত্র-পত্রিকা তাঁর কাছে আসত। একবার বম্বে ক্রনিক্‌ল্‌ থেকে তিনি অদৃশ্য জানোয়ার ‘বূনিপ’-এর কথা শুনালেন, আর আমার শিশুমন বহুদিন ধরে সেই অদৃশ্য জানোয়ারের ভয়ে, বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিল। কি রকম ভয়ে ভয়ে যে থাকতাম!

আমার এক দুধ-মামা আমার এই ভাব লক্ষ্য করে অনেক করে তবে আমার কাছ থেকে সব কথা শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন: ওসব গল্পের কথা, ও রকম জানোয়ার আছে নাকি? আর থাকলেও এদেশে আসতে পারবে না। কেননা এটা সূর্যের দেশ, আলোর দেশ। ওসব জানোয়ার অন্ধকার দেশে হয়ত থাকতে পারে, আলোর দেশে নয়। ছোটবেলায় আমি খুব চাপা ছিলাম। কারুর কাছে কোন কথা বলা বা জিজ্ঞেস করার ইচ্ছা বা সাহসই হতনা। কিন্তু একা মনে মনে আমি বলতাম অনেক কিছু। দেখতাম ফুলপাখি চাঁদতারা আলো-আঁধার মেঘ-বৃষ্টি নদী-পুকুর। এরা আমার মনে কত অদ্ভুত ভাবের প্রশ্ন তুলত। এসব কেন? এসব কি? এরা কোথা থেকে আসে? কেন এল? কি হবে এদের? আর আমার অফুরন্ত আগ্রহ ছিল ফুল ফোটা দেখতে। কি করে একটির পর একটি পাপড়ি মেলে? কি করে এরা গন্ধ ছড়ায়? বহুরাত আমি এই নিয়ে ভেবিছি। এমনকি আমার প্রথম সন্তান হওয়ার পর ষোল সতেরো বছর বয়স পর্যন্ত এই এক নেশা আমার ছিল; রাত্রে উঠে বাইরে চলে যেতাম ফুল ফোটা দেখতে; আর সাথে সাথে কত যে কি কল্পনায় দেখেছি তা ভাবলে আমার নিজেকে নিজের এখন পাগল মনে হয়।

ধন-জন-বল যেন জোয়ারের জল—একথা আমার জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছি অতি কঠোর তিক্ত তীব্র এবং তীক্ষ্ণভাবে। জোয়ারের উপচানো সুখের দিন দুর্দিনের ভাটির টানে কখন যে সরতে শুরু করেছে তা টের পাইনি। অবশ্য টের পাওয়ার বয়স তখন হয়নি। শুধু দেখতাম ঢাকা-কলকাতা-বরিশাল থেকে লোকজন আসছে যাচ্ছে আর শুনতাম এর মৃত্যু সংবাদ, ওর মৃত্যু সংবাদ—আর বিরাট বাড়ীঘর লোকের বিষাদে বিমর্ষ ম্লান, চারিদিকে অঝোর কান্না, তুহিন শীতল স্তব্ধতা। নওয়াব শায়েস্তা খানের দুহিতার গোরস্থান তাঁর বংশধরদের গোরে গোরে ভরে উঠল, আর বিরাট প্রাসাদ শূন্য হতে লাগল। রাক্ষসী কালাবদরও এগিয়ে এল তার লোল জিহ্ববা বিস্তার করে। জমিদারী দেখাশোনায় লোকাভাব দেখা দিল। যে মামা বেঁচে ছিলেন তিনিও তাঁর বিরাট পাঠাগার ছেড়ে শহরে যেতে নারাজ; অন্য মামা তো একান্ত ছোট। নায়েব-পেশকার বা কে কি করছে কেউ দেখবার নেই। দোতলার কামরায় বসে পর্দার উপর পর্দা খাটিয়ে আমার মামানী জমিদারীর হিসাব-নিকাশ শুনছেন, আমার আম্মার সাথে আমিও এতে হাজির থাকতাম। আমার এই মামানী উর্দু ছাড়া বাংলা ইংরেজী পড়া মোটেও জানতেন না। বাংলা বলতে পারতেন অবশ্য। আর আম্মা তাঁকে নিকাশ নেবার বেলায় সাহায্য করতেন। কিন্তু তাতে আর কতখানি চলে? একদিন ধড়াধড় করে মালখানা বালাখানার দুয়ারে মস্ত বড় বড় তালা ঝুলল। মামানী বড় মামাকে জোর-জুলুম করে মস্তবড় বোটে করে ভেসে পড়লেন জমিদারী দেখাশুনা করতে। বৃহৎ প্রাসাদে আমার মা, আশ্রিতা-পোষ্য, আত্মীয়-কুটুম আর নাবালক আমরা রইলাম গোটা দশেক।

সেই অবকাশে মালী-পেয়াদা আর খেজুর গাছ কেটে রস বের করার ‘শিফালী’দের সাথে আমাদের মেলামেশা করার আর কোন বাধা রইল না। ভাইয়ারা জুবিলি স্কুল নামে আমার পারিবারিক স্কুলে পড়তেন আর বন্দুক, গুলাল, ক্যাটাপুলেট নিয়ে শিকারের হাত পাকা করতেন। আমরা দু-চার জন বালিকা মেয়েও এতে অংশ নিতে পারতাম। কেননা এসব শিকার আমাদের চারদেয়ালের মধ্যে অসংখ্য ছিল। শত শত কবুতর, শালিক, চড়ুই আমাদের গাছ ভরে কার্নিশ ভরে তো থাকতই; মসজিদ মক্তব ভরা জালালী কবুতর ছিল, কিন্তু সে কবুতর মারা সবার জন্য নিষিদ্ধ ছিল। আর ধর্মভীরু সেকালের লোকেরা নিষেধ অমান্য করার ধৃষ্টতা কখনও প্রকাশ করেননি।

মসজিদে গিয়ে সুর মিলিয়ে জোরে ‘কায়েদা বোগদাদী’ পড়তে হত। আমরা তিন-চার জন মেয়েও যেতাম। ভাইয়া যখন আরবী-ফারসী পড়তে শিখলেন, আমরা তখন জের-জবর-পেশ-তশ্‌দীদ শিখছি। তাঁরা সুর করে পড়তেন:

করীমা বেবখ্‌শা য়ে বর হালেমা
কে হাস্তম আলীরে কমন্দে হাওয়া
০ ০

নেগাহ্‌দার মারা-জারায়ে খাতা
খাতা দর্ গোজারো সওয়াবেন্নামা…

তখন কিছুই বুঝবার মত বিদ্যাবুদ্ধি হয়নি। কিন্তু কি জানি কেন আমার ভীষণ কান্না পেত। আর আমার চেয়ে বয়সে কিছু বড় এক বোনঝি আমার চোখ মুছিয়ে এসব আল্লাহ্‌র কথা, কাঁদতে নেই। সিপারের আমপারা পর্যন্ত মসজিদে আমাদের পড়া; তারপর কোরআনের সবক আম্মার কাছ থেকেই নিতে হয়েছে, কেননা তখন আমরা বড় হয়ে গিয়েছিলাম। তবে সেই জুবিলি স্কুলে প্যারীলাল মাষ্টার মশায়ের কাছে আমিও দু-এক সবক পড়েছি। পায়জামা-কুর্তা আবার আচকান—পায়জামা পরে গিয়ে তাও। বাল্য-শিক্ষা পর্যন্ত আমার বিদ্যা হবার পর ভাইয়ারা সব চলে গেলেন—কেউ বরিশাল, কেউ ঢাকা আর আমার ভাইয়া গেলেন কলকাতায়, আমার খালাআম্মা তাঁকে নিয়ে কলকাতার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। মামাত বোনেরা তাদের ছেলেমেয়ে নিয়ে শ্বশুরবাড়ী চলে গেলেন। শূন্য বিরাট ভবনে পক্ষীমাতার পক্ষতলে রইলাম আমি একা। আর রইল দাই-খেলাই বাঁদী খানসামা- পেয়াদাদের দল। তখন আমার বয়স সাত বছর। আর এই বয়সে নিরালা নিঝুম পুরীতে পাহারা দেবার পেয়াদাদের বেহালার মূর্ছনা অনেক রাত পর্যন্ত আমার কানে বাজত। আর আমার শিশুজীবনের সবচেয়ে প্রকৃত শিক্ষক-সাথী ছিলেন আমার ‘জামাই’, অর্থাৎ পুতুল মেয়ে তার সাথে বিয়ে দিয়ে আমি ‘শাশুড়ী’ হয়েছিলাম। তিনি ছিলেন আমার আম্মার দুধভাই, ভাইয়ারা সকলে তাঁকে ডাকত মামা। আমি ডাকতাম জামাই। সেই জামাইয়ের কোলে বসে বসে শুনতাম পুঁথি পড়া। শুনতাম গান। দেখতাম বেহালার তানে তানে ওস্তাদ বেহালাদারের ভাবোদ্বেল মুখ, কখনও হোসেনের বীরত্বে উচ্ছ্বসিত, কখনও সখিনার ব্যথায় ব্যথিত। আবার পালাগানও হত। ভাল ভাল পালা—সোনাভানের পালা ইত্যাদি—বানিয়ে ওরা অভিনয় করত। তখন তো আর অভিনয় কি জানতাম না। এখনও মনে হয় শিল্প সাহিত্য মানুষের অন্তরের সম্পদ। আল্লাহ্ তা সবাইকে দান করেছেন। সকলের অন্তরে এ স্বতঃস্ফূর্ত। কেউ এ নিয়ে বিশ্বজোড়া নাম করে, কেউ বা কোথায় ঢেউয়ে ভেসে তলিয়ে যায়—সাধনা সুযোগ-সুবিধা ও শিক্ষার অভাবে—তার আর পাত্তা থাকে না। শীতের দিনে খেজুর গাছের রস নামিয়ে নারিকেল, চাউল দিয়ে পেয়াদারা যে শির্নী রাঁধত আমিও জামাইয়ের কোলে বসে তা খেতে পেয়েছি। কত যে ভাল লাগতো। অনেক রাতে জামাইয়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়লে তবে গিয়ে আমাকে নিয়ে শুইয়ে দিতেন।

সেইত জীবন—সেই স্বপ্ন ছন্দ সুর ব্যথা, আর তার সাথে শুরু দুঃখ-অভাব-অনটনের। ব্যথার যে কত রূপ তা কি এখনও জানতে পেরেছি? হারিয়ে পাওয়া-পেয়ে হারানো। চাওয়া-পাওয়া-দেওয়া—এ সবই তো ব্যথা-বিজড়িত সুখ-দুঃখ অশ্রুজল সিক্ত, স্মৃতির সুরভিতে সুরভিত। কখনও কোন দূরান্ত থেকেও এরা ভেসে এসেছে। বোলাত যায় না, অথচ ধরেও কি রাখা যায়?

হঠাৎ কলকাতা থেকে টেলিগ্রাম এল আমার খালুর কাছে; আমার ভাইয়া বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন আম্মাকে নিয়ে কলকাতা যাবার জন্য। সেই দিনই খালু আমাদের নিয়ে রওয়ানা হলেন। পাল্কী করে জাহাজের ফার্স্ট ক্লাশের কামরার সামনে নিয়ে আম্মাকে তুলে দেয়া হল। তারপর সেই জাহাজ বরিশাল এসে আবার খুলনা মেলে যাত্রী তুলে তবে কলকাতা রওয়ানা। খুলনা এসে আবার রেলগাড়ী ধরা। সেই আমার প্রথম রেলগাড়ী চড়া। আম্মা মূর্ছিতের মত পড়ে ছিলেন। জাহাজের সারেং, বাবুর্চি, ক্যাপ্‌টেন সবাই তখন শায়েস্তাবাদ পরিবারটিকে চিনত, সম্মান করত। তাই অত তাড়াহুড়ার মধ্যেও আমার আদর-যত্নের জন্য লোকের অভাব হল না। বরং জাহাজের লোকদের অতি ঘনিষ্ঠতায় আম্মার কাছে সব সময় থাকতে না পেরে আমিই যেন অতিষ্ঠ বোধ করছিলাম। কতক্ষণ সময়ে যে কলকাতা পৌঁছলাম তা মনে নেই, তবে রাত হয়েছিল। আম্মা-খালাম্মা বোনভাইদের মিলিত ক্রন্দন আমাকে হতভম্ভ করে দিয়েছিল; আর আমার সবচেয়ে বেশী কষ্ট হল যে আম্মা আমাকে ফেলে রেখে ভাইয়ার রোগশয্যার পাশে চলে গেলেন। আমাদের বাড়ীসহ বাচ্চাদেরকে ছোঁয়াচ থেকে বাঁচবার জন্য কঠোর শাসনাধীনে অন্য মহলে পাঠানো হল। সেই প্রথম আমি আম্মার কোলছাড়া হলাম। হঠাৎ একটি আর্তনাদ করে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমার খালাত বোন ও দুলাভাই ডাক্তার সৈয়দ এহ্‌সান আমাকে বুকে তুলে নিলেন। তাঁদের প্রথম সন্তান প্রায় আমার সমবয়সী ছিল; কিন্তু আপার কোল খালি করে সে তখন অন্য জগতে চলে গেছে—মাত্র মাস খানেক আগে। তাই আপা তার শূন্য কোলে আমাকে পরম স্নেহে তুলে নিয়েছিলেন। আর যে পর্যন্ত বেঁচেছিলেন আমাকে স্নেহ-মমতায় আবৃত করেই চিরদিন রেখেছিলেন।

কলকাতার জীবন অন্য জীবন। একেত ভাইয়ার অসুখের জন্য উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ও ব্যস্ততা, তার উপর আম্মা ও আমার মধ্যে এই প্রথম ব্যবধান। পরিবেশও অনেকখানি অপরিচিত ও বিরূপ। বিরাট বাড়ী হলেও গাছ নেই, পুকুর নেই, পাখী নেই, ফুল নেই। আমি যেন হাঁপিয়ে উঠতাম। আমার চেয়ে বড় আমার খালাত ভাইয়ের মেয়েরা, আপার ননদেরা আমাকে খুব আদর করতেন, খেলার সাথীও জুটেছিল, কিন্তু সবাইত উর্দুভাষী—সবকিছুই যেন কেমন পোশাকী পোশাকী। আমার ‘নিজ’ দেশের সেই চাষীদেরও ঘরের পরিচারিকাদের মেয়েরা—জরি, ময়না, সোনাবানু; বড়দের মধ্যে সকিনা, জয়নাব, আঞ্জু, ফুলি, গেদি, রহিমা, মেহের, নূরী, বুড়ী কেউ নেই। টিয়া ময়নাগুলির গান নেই, পুতুলখেলা নেই। পৌষ মাসের শীত। কিন্তু খেজুর রস, পিঠা, আর সেই সব্জীবাগানের সোঁদা সোঁদা গন্ধ নেই—কী যে বেখাপ্পা লাগত। আর খালি কান্না পেত। খালুর বাড়ী ছিল ধর্মতলার কাছে, মট্‌স্‌ লেন-এ। সেই বাড়ী পরে সরকার নিয়ে ট্রেনিং কলেজ করেছিল। প্রকাণ্ড দোতলা বাড়ী। তিন মহল ভর্তি মানুষ, তবুও যেন কেমন লাগত। আপা-দুলাভাই ঘরের ঘোড়ার গাড়ীতে করে বেড়াতে নিয়ে যেতেন সেই নদীরে ধারে, গাড়ের মাঠে। কিন্তু বাড়ী ছেড়ে বাইরে যেতেই চাইতামনা আমি। ভাইয়া অসুখে পড়ে আছেন, আম্মা বাড়ীতে আছেন, তাই বাড়ীতেই আমি থাকতে চাইতাম। কত যে আত্মীয়স্বজনেরা আসতেন—আদর করতেন। লালমিঞা নানা জাস্টিস আকরাম সাহেবের আব্বা; আকরাম সাহেব ছিলেন আমার আম্মার মামাত ভাই। তারা এসে নিয়ে যেতেন তাঁদের বাড়ী। লাল নানী খুব আদর করতেন। বাদাম-পেশ্‌তা-পোস্তদানা-দুধ-কেওড়া দিয়ে ‘হাড়িয়া’ বানিয়ে খাওয়াতেন, বলতেন: আহা! মা-ভাইয়ের জন্য ভেবে ওর কলজে শুকিয়ে যাচ্ছে। সালু! ওকে রোজ হাড়িয়া খাইয়ো। আমার খালাআম্মার নাম সালেহা খাতুন। কিন্তু কলকাতায় থাকতেন বলে তাঁকে আমরা কলকাতার খালাআম্মা বলতাম। মেজ খালাআম্মার বিয়ের পর খালু বরোদার মহারাজার ছেলের গার্জিয়ান টিউটর হয়ে বরোদা চলে গিয়েছিলেন। তাই সেই খালাআম্মাকে বলতাম বরোদার খালাআম্মা। আমাদের ত বাবা ছিলেন না, কিন্তু এই কলকাতার খালাআম্মা যেন আমাদের পিতার অভাব পূর্ণ করেছেন, অভাব দূর করেছেন। খাওয়া-দাওয়া, কাপড়-চোপড়, খেলনাপাতি—এমন কি তেল সাবান তা ছাড়া সৌখিন কোন জিনিস তাঁর চোখে পড়লেই আমাদের দুই ভাই-বোনকে কলকাতা থেকে তা কিনে পাঠিয়েছেন। আর ভাইয়াকে পড়াশুনা করাবার জন্য নিজের কাছে নিয়ে এসে এই প্রাণান্তকর অসুখে ফেলেছেন বলে সে কি আর্তনাদ তিনি করতেন! তখন আমার পরম সহিষ্ণু সর্বংসহা ধরিত্রীমাতার মতই সবরদার মা সাবেরা খাতুন মৃত-প্রায় সন্তানের শিয়রে বসে বড় বোনকে সান্ত্বনা দিতেন। পরম নির্ভাবনায় তিনি আল্লাহ্‌র উপর সন্তানের ভার ছেড়ে দিয়েছিলেন। পঞ্চাশ দিন পর কবিরাজ যেদিন ভাইয়াকে অন্নপথ্য দিতে বললেন সেদিন সারা বাড়ীময় কী আনন্দ। কী মিলাদ পড়ার ধুম! গরীব-দুঃখীরা শিরনী খেল, পয়সা পেল। আবার আতর-লোবানের সুগন্ধে বাড়ীঘর ভরে উঠল। লাল মিঞা নানা-নানীরা এলেন, আকরম মামুরা চার ভাই দুই বোন এলেন। নওয়াব শামসুল হুদা (আমার আব্বার খালাত ভাইয়ের ছেলে) তখন কলকাতায় থাকতেন, তিনিও এলেন; আমার দুলাভাইয়ের আম্মার মামু স্যার আবদুল রহীম এলেন, আমাকে শিখিয়ে দেয়া হল তাঁকে নানা ডাকতে। কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসার বড় আলেম-ওলামারাও এসেছিলেন আমাদের বাড়ীতে। খালাআম্মা, আম্মা রোজা রেখে শোকরানা নামাজ আদায় করলেন। আর এতদিন পর দূর থেকে আমাকে দেখতে দেওয়া হল। বসন্ত রোগী যে কী সহ্য করে, কী হয় তার—আমার স্বাস্থ্যবান ভাইয়ের দশা দেখে আমি যেন প্রথম তা উপলব্ধি করলাম। আমার শিশুমন যেন এই প্রথম ভয়ঙ্করের রূপ দর্শন করল। ভাইয়া ভাল হলেন। দেখা শুরু হল কলকাতা। যাদুঘর, চিড়িয়াখানা, ইডেন গার্ডেনের বাজনা শোনা; বটানিক্‌স-এ যাওয়া। আম্মারা ঘরের পাল্কী গাড়ী করে যেতেন, নামতেন না। তখন সম্ভ্রান্ত ঘরের গাড়ী চিড়িয়াখানার ভিতরে ঢুকতে দেয়া হত। আমরা ছোটরা নেমে বেঁচে যেতাম। সবচেয়ে আমার ভাল লাগত বটানিক্‌সে প্রাচীন বটের তলায় দাঁড়াতে। আর ইডেন গার্ডেনের বাজনা শুনতে। হগ্ মার্কেটের পুতুল দোকান ছিল আকর্ষণীয় ও দ্রষ্টব্য স্থান। এই মার্কেটে এক রাত্রে আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পেয়ে আমার যে কী কান্না। সব পুতুলগুলো পুড়ে গেল—কী হবে। তখন সবাই বললেন দমকল দিয়ে আগুন নিভিয়ে দিবে এখনি, তুমি কেঁদো না। তার পরের দিন সকলে আমরা সেই পোড়া মার্কেট দেখতে গিয়েছিলাম।

সেই মার্কেটে আগুন লাগার একটা আধ্যাত্মিক গল্প আমরা শুনেছিলাম। সেই কাহিনীটাই বলি।

একালের হগ্ মার্কেট দেখলে সে কালের হগ্ মার্কেটের অবস্থা বোঝা দুষ্কর। তখনও এ মার্কেট এতবড় এত বিস্তৃত-পরিধির হয়নি, বাড়ান্তির মুখে মাত্র। সেই সময়ে আগুন লাগার আগের দিন নাকি এক অল্প বয়সী পাগল—পাগল ভাবে বিভোর লোক, হগ্ মার্কেটে বসে পড়ল। বাংলাদেশে—বিশেষ করে কলকাতায় হুজুগে লোকের অভাব নেই। লোক জমায়েত হতে দেরী হল না। হাসি হাসি মুখ সাধু প্রকৃতির এই লোকটির কাছেও ভিড় জমে উঠল। দু-একজনকে গালাগাল দিয়ে অতীতের দু-একটি কথা বলে দিতেই ভক্তদল বিরাট আকার ধারণ করল। কেউ খাবার নিয়ে এল, কেউ কেউ টাকা-পয়সা দিতেও দরাজহস্ত হয়ে উঠল। সাধু কিন্তু টাকা-পয়সা ছুঁলেন না। ছোট দোকানদারেরা ভক্তিতে বা ভয়ে কিছু বলল না। কিন্তু শোকেসওয়ালা দোকানের কোন দোকানদার চটে মটে সাধুকে ও ভক্তদলকে কড়া কথা শুনিয়ে দিলেন। দু’পক্ষে শেষ পর্যন্ত কথা কাটাকাটি হতে হতে দোকানদার পুলিশ ডেকে ভক্তদলসুদ্ধ সাধুকে বের করে দিতে বললেন। পুলিশ এসেও সাধুকে সম্মান দেখাল কিন্তু দোকানদারটি নাকি বললেন আমি নিজেই সাধুকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করব। সাধু তখন বললেন: আচ্ছা বেটা। আমি যাচ্ছি। কিন্তু তুমিও তো যাবে। বলে তিনি হেসে হেসে বের হয়ে গেলেন। সন্ধ্যার সময়ে ভক্তদলের সাথে সাধু বাবাজী রাস্তায় বের হলেন বটে। কিন্তু কোন্ গলিপথে যে তিনি উধাও হলেন, ভক্তেরা তা আর দিশা করতে পারল না। রাত্রে যখন হগ্ মার্কেটে আগুন লাগল, আর সকালে সে জায়গায় লোক জড়ো হল, তখন দেখা গেল যে সেই দোকানদারটিরই শো-কেসসুদ্ধ দোকান জ্বলেপুড়ে নিশ্চিহ্ন। আশেপাশের দোকানের তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। ভক্তদল তখন কি পেয়েছিলাম, কি হারালাম বলে হায় হায় করছে। অনেক অলিগলি খুঁজেও আর বাবাজীর দর্শন পাওয়া গেল না। তখনকার দিনের সব দৈব ঘটনা এবং আধ্যাত্মিক শক্তি সাধনার কথা লোকমুখে শুনে কত যে ভয়ভীতি ভরা ভক্তি শ্রদ্ধার ভাব উদয় হয়েছে। জানিনা এসব ঘটনায় সত্যি কতখানি। তবে সে-কালের মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে সাধু-সাধক জনকে অবহেলা করলে বা তাঁদের সাথে অশিষ্ট ব্যবহার করলে ভাল হয় না।

সাধু-সাধক, ফকীর দরবেশকে আমরা ছোটবেলা থেকে ভক্তিভাজন মাননীয় বলে মেনে এসেছি। আমাদের পরিবার আবার ছিল পীর পরস্তি বা মাজার পরস্তির বিরোধী। মাজার মানত করা, শিরনী দেওয়া, চাদর চড়ানো ইত্যাদি কর্ম ‘বেদাত’ বলে গণ্য হত। শুধু প্রতি চন্দ্র মাসের এগার তারিখে বড় পীর হজরত আবদুল কাদের জিলানীর নামে শিরনী হবেই। আমার নানা তাঁর নামে অনেক শের নাত গজল লিখেছেন বলে শুনেছি। বড় বড় মৌলানা মৌলবীরা আসতেন, তাঁদের সাথে এ সম্পর্কে আলোচনা হত। মামার আমলেও এই শিরনী করতে আমি বার বার দেখে এসেছি। আর কলকাতায় আমার খালুর বাড়ীতে তখন সেকালের প্রসিদ্ধ সুফী সাধক মৌলানা সফিউল্লাহ সাহেবের প্রভাব অত্যন্ত বেশী ছিল। খালুর খানদানসহ তাঁর মুরিদ ছিলেন। মৌলানা সাহেব প্রায়ই আসতেন খালুর বাড়ীতে, আর দোয়া দরূদ পড়তেন, তাবিজে ফুঁক দিতেন। বাড়ীসুদ্ধ ছেলেমেয়ে বুড়ো সবাই তাঁকে সালাম-শ্রদ্ধা জানাত। তিনিও সকলকে দোয়া দিতেন। এর অধিক বুজর্গ মহাপুরুষের সান্নিধ্য লাভ বা কোন অলৌকিক ঘটনা কখনও আমার জীবনে আসেনি।

সেকালে বড় পরিবার বিশেষ করে সৈয়দ পরিবারের বিয়ে-শাদী নিজেদের পরিবারের মধ্যে হওয়াই প্রথা ছিল। আজকাল যেমন মেয়ে দেখানোর রেওয়াজ চালু হয়েছে সেকালে সে কথা ত চরম অপমান ও বেইজ্জতি বলেই গণ্য হত। তাই মামাত চাচাত খালাত ফুফাত ভাইবোনের মধ্যেই বিয়ের ব্যাপার সীমাবদ্ধ ছিল। এতে করে সম্পত্তিও বাইরে যেত না অন্য কারুর হাতে। আরও থাকত বংশগত সৌন্দর্য ও সোহবত তাজিম আদব কায়দা রক্ষার ব্যবস্থা। অবশ্য এটা ভাল কি মন্দ তা তখনকার যুগে মোটেই বিচার করা হত না। এরই মধ্যে বংশে উপযুক্ত পাত্র বা পাত্রী না থাকলে অনেক সন্ধান অনেক বিবেচনা করে মেয়ে বা ছেলেকে বাইরে বিয়ে দিত। প্রাণান্ত হতে হত। আর তখন সৈয়দ বংশের ছেলে বা মেয়ের জন্য বড় বড় জমিদার ও চাকুরেরা হন্য হয়ে থাকত। সৈয়দ বংশের ছেলে পেলেত পায়ের ধুলা নিয়ে যেন ধন্য হত ছেলের শ্বশুরকুল। আর সৈয়দ বংশের মেয়ে নিয়েও বড় সম্মানে শ্বশুরকুল বৌকে প্রাধান্য দান করতেন। এতে তারা অপমান বোধ না করে বরং গৌরব বোধ করতেন।

এমনি করে আমার নানার কাছে ভিক্ষার মত চেয়ে নিয়ে আমার এক মামা সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে উলানিয়ার জমিদার তার মেয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন। সেই মামী-আম্মার ভাই-এর মেয়ের সাথে আবার আমার মামাত ভাই-এর বিয়ে করিয়েছিলেন। আমার মামাত ভাইয়ের স্ত্রীর ভাই সুলেখক ফজলুর রহিম চৌধুরী বিয়ে করেছিলেন মরহুম এ. কে. ফজলুল হক সাহেবের দ্বিতীয় কন্যাকে। নিঃসন্তান ফজলুর রহিম চৌধুরী ইন্তেকাল করেছেন। আমার মামাত ভাইয়ের ছেলেরাই এখন উলানিয়ায় আছে। মাদারীপুর, গোপালপুরের জমিদার আমার আম্মার ফুফুর বংশধর। গের্দ্দা, গঢ়ি, বামনা যশোর, আলোকদিয়ায় এখনও যত আত্মীয়রা রয়েছেন তাদের নামও আমার মনে নেই। দেখলেও চিনতে পারব কিনা জানিনা, সৈয়দা মোতাহেরা বানু কবি খ্যাতি লাভে স্বনামধন্যা। তিনিও আমাদের আত্মীয়া, তাঁর আম্মাকে খালাআম্মা বলে জানি। মেদিনীপুরে সোহ্‌রাওয়ার্দী পরিবারে স্বপ্নাদেশে হয়েছিল একটি সৈয়দের মেয়েকে বধূরূপে পরিবারে আনতে। আমার আম্মার এক চাচাত ভাইয়ের মেয়েকে বহু সাধ্য-সাধনায় বিয়ে করিয়ে নিয়েছিলেন। সে মাহমুদা আপা অনেক বয়স পর্যন্ত বেঁচেছিলেন। তিনি মেদিনীপুরে থাকতেন। বছর তিন হল ইন্তেকাল করেছেন। শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী সাহেবের খালাতো বোন জনাব আবুল হাশেম সাহেবের স্ত্রী। অন্য দুই বোনের বিয়ে হয়েছিল কলকাতার আলীমউদ্দিন স্ট্রীটে মরহুম এব্‌নে আহমদ সাহেবের দুই ছেলের সঙ্গে। এখন তাদের সন্তান-সন্ততি সেখানে রয়েছে। এব্‌নে আহমদ সাহেব আমার খালুর ভাই হতেন। পুরানো পরিবারের যারা বেঁচেছিলেন তাঁরা আমার আম্মা বেঁচে থাকার সময়ে কলকাতায় প্রায়ই আসতেন। কোথাও যেতে হলে মুরুব্বিদের সালাম করে যাওয়ার রেওয়াজ ছিল তাই তখন অনেকের সঙ্গে দেখা হত। দেশ বিভাগের পর কে কোথায় যে ছড়িয়ে আছি। মাঝে মাঝে হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। কিন্তু আসা-যাওয়া আর হয়না। দেখা হলে সুখের চেয়ে দুঃখটাই বোধ হয় বেশী হয়।

আগেই বলেছি এ আমার জীবনী নয়। শুধু বহুদিন বিস্মৃত স্মৃতি থেকে যা পারি সে কালের কথা বলেছি। সেকালের পরিবারের আচার-ব্যবহারের কথাই লিখব। আমার নানীরা ছিলেন চার বোন। সবারই বড় বড় বংশ; নওয়াব খানদানে বিয়ে-শাদী হয়েছিল, লক্ষ্ণৌ, মুঙ্গের, এলাহাবাদ, ঢাকা—এই বিরাট এলাকায় তাদের নিজেদের জাহাজ-বজরা চলত। আর সেই নদীপথের যাত্রার রোমাঞ্চকর কাহিনী আমরা মামুদের মুখে শুনতাম। তারাই ছোটবেলায়ই এ যাত্রাপথের পথিক ছিলেন। আর আমরাও অনেক ছোটবেলায় তাঁদের গল্পচ্ছলে বলা শুনেছি। কত ডাকাতির কথা, কত হজ্ব যাত্রীদের কথা, কত বরগীর কাহিনী, কত বোকা লোকের কথা, তাঁরা জানতেন। আমরা এখন মোটরে, ট্রেনে বা হাওয়াই জাহাজে হুশ করে উড়ে চলি, পাশের লোকের সাথে কথা বলার সময়-সুযোগও পাইনা। কত ফকির দরবেশ, পীর আউলিয়ার কথা তারা জানতেন, শিখতেন ও শিখাতেন। এখন শিখাতে চাইলেই কি কেউ শিখতে চাইবে?

আমরা বিজ্ঞানের যুগে বাস করি আর বিজ্ঞান যে দিনে দিনে আমাদের কাছে অদৃশ্য জগতের নিত্যনতুন খবর এনে দিচ্ছে সেটাও সত্য এবং তাতে করে অনেক অজানা, অন্ধকার, রোগ যন্ত্রণা, ভয়ানক বিভীষিকা থেকেও বিস্ময়করভাবে মানুষকে মুক্ত করছে তাও সত্য। তবু বিজ্ঞানের বাইরেও অনেক কিছু সেকালে যা ছিল একালেও তা আছে কিনা তা অনুসন্ধান কেউ করে বলে জানিনা। অলৌকিক ঘটনা বলতে যা বুঝায় আমার বাল্যজীবনে তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ বহুবার হয়েছিল। জানিনা এযুগে তা বিশ্বাস হবে কিনা।

আগেকার দিনে বড়লোকের ঘরে ছেলেমেয়ে হলে মায়ের নিজের বুকের দুধ না খাইয়ে অন্যকোন সন্তানবতীকে ‘দাই’ রেখে তার দুধ খাওয়ানো একটা আভিজাত্যের গৌরব বলেই বিবেচনা করা হত। অবশ্য আমরা মায়ের বুকের দুধেই পুষ্ট হয়েছি। আমার মেজ মামার এক দাই মা ছিলেন। তার সন্তানদেরও আমরা মামা, খালা বলতাম এবং তাদের সম্মান ও মর্যাদাও ছিল প্রচুর। সেইরকম দুধ-মামার স্ত্রীকে আমরা মামী বলতাম। সুন্দর কাঁথা সেলাই, পাটি বোনা, হোগলা বোনা, মুড়ি ভাজা, চিড়ে কোটা তিনি জানতেন। তিনি গ্রামের বাড়ীতে থাকতেন। একদিন রাত্রে তিনি ঘুম থেকে চিৎকার করে উঠে দেখলেন যে তার মাথার লম্বা চুল সমস্ত জট বেঁধে গেছে এবং কেউ তার গায়ে হাত দিতে গেলেই তিনি অসহ্য যন্ত্রণা পাচ্ছেন। হৈ হৈ কাণ্ড শুরু হল। গ্রামের মধ্যে বেশ আলোড়ন। আমাদের বাড়ীতে খবর এল। অনেকজন সেই রাত্রেই তাঁকে দেখে এলেন। সকালে সবার মুখে সেই কথা শুনা গেল।

আমি তখন ছোট। আমিও আমার জামাইয়ের কোলে চড়ে সে বাড়ী গেলাম। আগে সেখানে গেলে মামী আদর করে মুড়ি চিড়া খইয়ের মোয়া কত কি খেতে দিতেন, এখন দেখলাম তিনি বসে বসে কাঁপছেন। দোয়া দরূদ পড়ছেন, যেন চিনতেই পারছেন না। এরপর তিনি শুধু গোছল করতেন। নিজের হাতে রেঁধে খেতেন। স্বামী, ছেলে, ভাইবোন কেউ তার ঘরে ঢুকতে পারত না। চিৎকার করতেন।

প্রায় ৬ মাস এই অবস্থার পর সাংসারিক ক্ষতি এবং সামাজিক বা শারীরিক প্রয়োজনের জন্যই সেই দুধ-মামা স্ত্রীর ঘরে ঢুকে তার হাত ধরে সংসারের কাজে লাগাবার জন্য টানাহেঁচড়া করে বাইরে আনছিলেন জোর-জবরদস্তি করে, হয়ত কিছু মারপিটও করেছেন। সপ্তাহের মধ্যে রাত্রে হঠাৎ মামার গলা দিয়ে নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু হল। তিন দিন অজ্ঞান থেকে সেই দুধ-মামা মারা গেলেন।

এরপর সেই মামী আমাদের পরিবারে আশ্রয় নিয়ে এলেন। অত লম্বা চুল তার সব জট বেঁধে কি রকম যে হয়ে গেছিল। বহু বছর তিনি বেঁচে ছিলেন। আমাকে কাঁথা সেলাই করতে, পাখা বুনতে, হোগলা বুনতে শিখিয়েছিলেন। কাউকে ধরা-ছোঁওয়া দিতেন না। স্ব-পাকে খেতেন। ছোট বাচ্চাদের অসুখ-বিসুখ হলে সবাই তাকে ডাকত। ঝাড়ফুঁক দিয়ে দিলে ভালও হত। কিন্তু আরও আশ্চর্য কাণ্ড দেখতাম তিনি যাকে দেখে ঝাড়ফুঁক দিতেন না সে ভালও হত না। একে অলৌকিক বলব বা কি বলব, বিজ্ঞান কি এর সন্ধান রাখে?

এই রকম একজন মহিলাকে আমি দু’বছর আগে দেখলাম হোসেনী দালানে। তার স্বামীও এই রকম আকস্মিকভাবে মারা গেছেন। আজানুলম্বিত চুলে তারও সেই জটা বেঁধে আছে। তাকে দেখেই মামীর কথা আমার আরও বেশী মনে পড়ল। জানিনা এসব কি? বিজ্ঞান একে কি আখ্যা দেবে?

এখানে আর একটি ঘটনার উল্লেখ করি। আমার আম্মার বিয়ে হয়েছিল এক বছর বয়সে। বারো বছরে তিনি প্রথম সন্তানবতী হলেন। সে সন্তান তাঁর বছর দেড়েকের হয়েই মারা যান। পরে কয়েক বছর পর সন্তানবতী হওয়ার সময় সকলে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করেন। আমার নানা নওয়াব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন কনিষ্ঠা কন্যা আমার আম্মাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তাই খুব কাছে কাছে রাখতেন। এরই মধ্যে ঢাকার নওয়াব
সলিমুল্লাহর এক পারিবারিক অত্যন্ত জরুরী ব্যাপারে নানাকে ঢাকায় আসতে হল। সলিমুল্লাহর পরিবারে নানার মর্যাদা খুব বেশী ছিল। তিনি বাধ্য হয়েই শায়েস্তাবাদ থেকে ঢাকায় এলেন নওয়াব সলিমুল্লাহর নিজের জাহাজে করে। কিন্তু কথা থাকলো, শায়েস্তাবাদ থেকে রোজকার খবর রোজ আসা চাই। আম্মা কেমন থাকেন এসব কথা তাঁর রোজ জানাই চাই।

সেদিন সকালেও খবর এল আম্মা সুস্থ আছেন। রাত্রে খানা খেতে বসে হঠাৎ নানা বললেন, আমি এক্ষনি রওয়ানা হব। সলিম, তোমার জাহাজে খবর দাও। সবাই অস্থির ও আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন হঠাৎ আপনি যেতে চাইছেন। তখন নানা বললেন, আমার সাবুর জন্য মন অস্থির হচ্ছে। (আম্মাকে আদর করে সবাই সাবু বলে ডাকতেন। সাবেরা খাতুন তাঁর নাম ছিল।) সলিমুল্লাহ সাহেব বললেন, আজইত খবর পেলেন তিনি ভাল আছেন। নানা বললেন, ওরা আমাকে সত্যি খবর দেয়নি। সবাই বললেন, এখন আপনি কী করে খবর পেলেন? নানা অস্থির হয়ে বললেন, যে করেই পাই তুমি যাওয়ার ব্যবস্থা করবে কিনা বল, নয়ত অন্য উপায়ে আমার যেতে হবে। সলিমুল্লাহ সাহেব অগত্যা বাধ্য হয়ে তক্ষনি জাহাজে খবর দিলেন। রাত বারোটায় জাহাজে পৌঁছে দিতে এসে তিনি নানাকে বললেন, আপনি কী করে খবর পেলেন। শুধু সেইটুকু আমাকে বলে যান। নানা বললেন, আমার বন্ধু একজন অদৃশ্য জগতের, তিনিই খবর দিয়েছেন। সলিমুল্লাহ সাহেবও নানার সাথে এলেন শায়েস্তাবাদে কী ব্যাপার দেখতে।

পরের দিন এসে দেখা গেল আম্মা একটি মৃতা কন্যা প্রসব করে অজ্ঞান। মামারা নানাকে সে খবর না দিয়ে তিন দিন আগেই বরিশালের ডাক্তার-কবিরাজ থেকে শুরু করে কলকাতা থেকেও ডাক্তার আনিয়েছেন। প্রথম অসুস্থ অবস্থা দেখেই নানা এসে সবাইকে খুব বকাবকি করে গোসল করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে রাত বারোটা থেকে ফজরের নামাজ পর্যন্ত তিন রাত দোওয়া পড়ে পড়ে পানিতে ফুঁক দিয়ে আম্মাকে খাওয়ালেন, পরে আম্মার জ্ঞান হলে পরে সবাই তাঁকে কী করে খবর পেলেন জিজ্ঞাসা করতে তিনি তাঁর অদৃশ্য বন্ধুর কথাই বললেন। মামারা বললেন, আপনি জরুরী কাজে নওয়াব বাড়ী গেছেন বলে খবর দেইনি। কিন্তু ডাক্তার-কবিরাজ, সেবার কোন ক্রটিও রাখিনি। নানা বললেন, আমার বন্ধু আমাকে যে দোওয়া শিখিয়ে দিলেন সাবুর জন্য পড়তে, সে দোওয়া না পড়লে আর কখনো সে ভাল হত না। আম্মার সম্পূর্ণ সুস্থ হতে তিন মাস লেগেছিল।

আমার ভাইয়া ও আমি তার বহু বছর পরে জন্মলাভ করেছি। আমার নানা যখন মারা যান তখন আমার দেড় বছর বয়স। নানাকে দেখিনি বললেই হয়। তার ছবি দেখেছি অবশ্য। ছোটবেলায় আমার একটা অভ্যাস ছিল একা একা অতবড় বিরাটি বাড়ীতে অসংখ্য বন্ধ ঘরের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ানো। আর প্রায়ই পথ হারিয়ে ফেলতাম। তখন দেখতাম নানার মত দাড়িওয়ালা একজন আমাকে সে ঘুপচি পথ থেকে অন্দরের গেটে এক বারান্দায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে যেতেন। আম্মা বা অন্যরা খুঁজে খুঁজে হঠাৎ পেয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেন কোথায় গিয়েছিলাম। যদি বলতাম ওই কামরায় গিয়েছিলাম, সবাই আশ্চর্য হয়ে বলতেন ওখানে ত কেউ যায় না। কি করে গেলাম? এলামই বা কী করে? আমি নাকি বলতাম নানা দিয়ে গেলেন। শুনে সবাই হাসতেন। কিন্তু ভয় পেতেন না, বরং খুশী হতেন।

শুনতাম নানার সাথে নাকি জিন-এর বন্ধুত্ব ছিল এবং শর্ত ছিল নানার বংশধরদের উপকার ছাড়া কোন অপকার হবেনা কোন জিন-এর দ্বারা। শায়েস্তাবাদ পরিবারের আনন্দজনক ঘটনায় সে মূর্তি আনন্দ হাস্য জড়িত মুখে দেখা দিতেন। বিষাদে দুঃখে বিমর্ষ মলিন মুখ মূর্তিও অনেকে দেখেছেন। এসব এ যুগে হাস্যকর শুনাবে। কিন্তু আমি লিখে রাখলাম। হয়ত আগামী কোন যুগে আবার এ নিয়ে কেউ গভীর গবেষণাও শুরু করতে পারেন। দুনিয়ায় আশ্চর্য বলে কথা আছে। কিন্তু অসম্ভব বলে কোন কথা নেই।
সেকালে এই রহস্যময় অদৃশ্য জীবনকথা ছাড়াও বাস্তব জীবনের রহস্যই কি কম ছিল? বড় বড় জমিদার, রাজা বাদশা ধনীদের পরিবার কি হিন্দু কি মুসলমান সবার বংশ পরিবার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার রহস্যও বড় কম ছিলনা। কত সাধনা কত শ্রম, কত অনাচার অত্যাচার, আবার কত মহত্ত্ব কত সৎকাজ, কত উদারতায় এক একটি পরিবার ঐতিহাসিক হয়ে উঠেছে। সেসব কতকটা আজ কিংবদন্তি হয়ে আছে। ইতিহাসে নেই। কালের করাল গ্রাসে সে পরিবার, সে ঐশ্বর্য, সেস্থানও অবলুপ্ত হয়ে গেছে। তবুও লোকের মুখে মুখে গল্পচ্ছলে অনেক অংশ রয়ে গেছে। যেমন কীর্তিপাশা, বাহাদুরপুর, উজিরপুর, শায়েস্তাবাদ। আজ সে স্থান পদ্মার বিভিন্ন নামের প্রবাহে অতল তলে তলিয়ে গেছে। কিন্তু এককালে উপরোক্ত জমিদার বংশ এবং লাঘুটিয়া, মাধব পাশা, চন্দ্রদ্বীপ, হাটুরিয়ার জমিদার বংশ খুবই প্রসিদ্ধ ছিলেন। এইসব স্থানের প্রতিষ্ঠাকারীদের কাহিনীও কম চমকপ্রদ নয়।

শায়েস্তাবাদ নামকরণের কথাই বলি। তখনকার দিনে দিল্লী লক্ষ্ণৌ এলাহাবাদ বা যেকোন জায়গা থেকেই হোক নওয়াব সুবাদের আসা-যাওয়া নৌকাযোগেই চলত। নওয়াব শায়েস্তা খান দিল্লী থেকে ঢাকা আসার পথে এক সন্ধ্যায় ঝড়ের মুখে পড়ে অন্ধকার রাত্রে কোন রকমে একটি চরের উপর আশ্রয় নিলেন। সেখানে দেখলেন কয়েকজন মানুষ, তারা ‘নাইয়া’। তাদের নৌকা থাকে। সেই নৌকায় তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করে। তাই তাদের ‘নাইয়া’ বলে। সেই নাইয়াদের সাহায্যে সেই চরে আশ্রয় নিলেন। তখন ভোর হতে বেশী দেরী নেই। ভোর হতে সেখানে আজান দিয়ে লোকজনসহ নামাজ আদায় করলেন। পরে জানলেন, নাইয়ারাও ঝড়ের আভাস দেখে আশ্রয় নিয়েছে। নওয়াব শায়েস্তা খান নাইয়াদের ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে তাদেরকে সেখানে লাখেরাজ জমি দিলেন বসবাস করার জন্য। তাঁরই নামে নতুন সে চরের নাম হল শায়েস্তাবাদ। সেখানে একটি মসজিদ তৈরী করা ছিল। আমরাও তা দেখেছি। সেই আগের দিনের পাতলা ইট ও চুন সুরকি দ্বারা তৈরী ছিল সে মসজিদ।

পরে যখন আমার নানার পূর্বপুরুষের সঙ্গে তাঁর প্রথমা কন্যা পরীবানুর বিয়ে দেন, তখন মেয়েকে তিনি শায়েস্তাবাদ পরগনা যৌতুক দেন পানদান খরচা স্বরূপ। বরিশালের কালেক্টরীতে হয়ত সেসব দলিলপত্র আছে। তাঁর কন্যা পরীবানু বেগমের সন্তান-সন্ততিই শায়েস্তাবাদের প্রথম বাসিন্দা। এবং শায়েস্তাবাদের পারিবারিক গোরস্থানে করীবানু বেগমই প্রথম সমাধিস্থ হন। এখানে লালবাগে যে পরীবানুর সমাধি রয়েছে সেটি নওয়াব শায়েস্তা খান-এর কন্যার নয়। শ্রদ্ধেয় ড. এনামুল হক সাহেব সে বিষয়ে প্রামাণ্য প্রবন্ধ লিখেছেন।

ইংরেজ শাসনকালে বড় বড় মুসলিম পরিবারের নওয়াব আমীররা যে কীভাবে অত্যাচারিত হয়েছেন ইতিহাসে সেকথা লেখা আছে। তাই লাখেরাজ শায়েস্তাবাদ পরগনার জমিদারদের কাছ থেকেও খাজনা আদায় করে নিতে ইংরেজ সরকার দেরী করেনি। কিন্তু তবুও নদী পার হয়ে শায়েস্তাবাদে কোন ইংরেজ কর্মচারীর ঢুকবার অধিকার ছিলনা। আমরা ছোটবেলায় তা দেখেছি। জজ-ম্যাজিস্ট্রেট যেই আসুক আগে লোক পাঠিয়ে চিঠি লিখে জানিয়ে তবে আসতে পারত।

আমার নানা শান্ত দরবেশ প্রকৃতির লোক ছিলেন। কিন্তু তার ছোট ভাই দুটি সাহসী ছিলেন। খাজনা দাবী করার সময়ে তিনিই এই প্রথা প্রচলন করেন যে খাজনা দিবেন। কিন্তু ব্যাটাদের কেউ যেন এসে শায়েস্তাবাদের মাটিতে পা না দিতে পারেন। নদীর ওপারে একটি গাছের তলায় ধামা ভরে টাকা ঢেলে দেওয়াতেন নায়েবকে দিয়ে। সরকারী লোকেরা সে টাকা নিয়ে যেত। আমরা সেই নায়েব বাবুর বংশধর নায়েব বাবুর কাছে এ কথা শুনেছি।

সেকালে মুসলমান জামিদারদের বাড়ীতে ঈদ, বকর ঈদ, শবেকদর, শবেবরাত, মোহররম, ফাতেহা দোয়াজদহম, ফাতেহা-ইয়াজদহম-আখেরী চাহার শোম্বা সব কিছুরই যথারীতি সুসম্পন্ন হত। বাইরে থেকে অনেক অতিথি অভ্যাগত এসে শায়েস্তাবাদে এ উৎসব-আনন্দে যোগ দিতেন। এলাহাবাদ, লক্ষ্ণৌ, দেওবন্দ, কাশ্মীর, খোরাসান, তাস্‌কন্দ থেকেও মাওলানা, ক্বারি, আলেম, হাফেজ মৌলভীরা আসতেন। আমার ছোটবেলায় শায়েস্তাবাদ তার শেষ অবস্থায় পৌঁছেছে। নদীতে ভেঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। জমিদারীর আয় কমে গেছে। তখনও লঙ্গরখানা দিনরাত চলছে। অতিথি অভ্যাগতদেরও আনাগোনা, বিদায় করার শেষ নেই। লম্বাচুল, নেড়ামাথা, নিরামীশাষী, শুধু গোশত-রুটি খাওয়ার মানুষেরা তখনও আসতেন। বাহাস হত, ওয়াজ নসিহত হত। কত যে সে আলোকোজ্জ্বল রাত্রি ভোর হয়ে যেত!

বিরাট মসজিদের দুপাশে বালাখানায় অগুনতি তাল্‌ব এলেমরা মুসাফির, রাহ্‌গিররা খাচ্ছে থাকছে। কেউ মস্তানা, কেউ শরীয়তীতে পাক্কা মুসল্লি। আমাদের মসজিদের হাফেজ সাহেব মুয়াজ্জিন সাহেবরাও শিক্ষিত ছিলেন। মিশর দেশের এক মাওলানাও শায়েস্তাবাদেই ইন্তেকাল করেছিলেন। আর একজন ছিলেন কাবুলী, আতাউল্লাহ খান। তিনি কিশোর বয়সে ফল বিক্রি করতে এসে শায়েস্তাবাদেই থেকে গেলেন। আমার মামাত ভাইদের সাথে খুব মেলামেশা করে ঘরের লোকের মত হয়ে গেলেন। বিয়ে-শাদীও করলেন না। শায়েস্তাবাদ পরিবারের সকল উত্থান, পতন, জন্ম-মৃত্যু তিনি দেখলেন। পরে ফকির দরবেশের মত হয়ে গিয়েছিলেন। শায়েস্তাবাদ প্রাসাদ রাহাত মঞ্জিল থেকে মসজিদ, পারিবারিক গোরস্থান পর্যন্ত, যখন কালাবদরের করাল গ্রাসে তলিয়ে গেল তখনও তিনি শায়েস্তাবাদে টিনের ছাপরার তলায় থাকতেন। এবাদত বন্দেগী করে দিনরাত কাটাতেন। ১৯২৯ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। শায়েস্তাবাদের বিষয়ে অনেক ভবিষ্যৎ বাণীও তিনি করেছিলেন। শায়েস্তাবাদ পরিবারের কারুর ইন্তেকালের আগেই তিনি কেমন অস্থির উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতেন। এবাদতের মাত্রা বাড়িয়ে দিতেন। প্রায় বারো মাসই রোজা থাকতেন। তাঁর সমাধিও কালাবদরের অতল তলে তলিয়ে গেছে।

হিন্দু কর্মচারীর সংখ্যা অনেক ছিল। নায়েব, মুহুরি, পেশকার, ধোপা, নাপিত, কর্মকার, সোনারু, কামার, কুমার, দারোয়ানও ছিল। ভোজপুরী ছাপরা মুঙ্গেরের—এরা সব পরে বাঙালীদের মতই হয়ে গিয়েছিল। এদেরও পূজাপার্বণ সব বেশ ধুমধামে হত। পুণ্যাহ দিনে হিন্দু-মুসলমান রান্নাবান্না করে খেয়ে-দেয়ে হাসি-খুশীতে বেশ মেলামেশা করত। রংরেজরা কাপড় রাঙিয়ে দিত। মালীরা নিত্য অঢেল ফুলের যোগান দিত নানা সাজে ফুল সাজিয়ে। আবার মেয়েরাও নানা রকম ফুলের গহনা তৈরী করে সন্ধ্যায় পরতেন। বড় সুন্দর সুবাস সুষমাভরা সে সন্ধ্যাগুলোর স্মৃতি।

পাটনায় আলী ইমাম হাসান ইমাম সাহেবদের সাথে বড় নিগূঢ় বন্ধুত্ব ছিল। প্রায় আত্মীয়দের মতই। পাটনা থেকে বড় সুন্দর সুন্দর ছাপানো শাড়ী আসতো। নানান নামের গুলবদন, গুলে বকাউলি, চুন্দরী, চমকিলি, আমাদের ছোটদের জন্য আসত ওড়না। আর বছর বছর খালাআম্মা যেতেন আজমীর শরীফ। সেখান থেকে ফুলচন্দন, ছাপা শাড়ী, ওড়না আনতেন। সেখানের ডেকচিতে চড়ানো শিরনী ও তবারুক এনে ঘরে ঘরে সবাইকে দিতেন। আমার নানা ছিলেন বড়পীর সৈয়দ আব্দুল কাদের জিলানীর ভক্ত, তার নামে অনেক গজল তিনি লিখেছিলেন। নিজেও গাইতেন। ৬ মাস তিনি মক্কা, মদিনা, বাগদাদে হেঁটে সফর করেছিলেন। বড়পীর সাহেবের জন্মদিন রবিউসানীর ১১ তারিখে শিরনী হত। গোসল করে পাকসাফ হয়ে সে শিরনী রাঁধতে হত। সারা পাড়ার মানুষ সে শিরনী পাকসাফ হয়ে খেয়ে যেতো। প্রতি বৃহস্পতিবারে মাসুম বাচ্চাদের নিয়ে মিলাদের ‘ক্ষীর’ রান্না করে খাওয়াতে হত কোন কোন কিশোর-কিশোরীর দ্বারা। আমার সৌভাগ্য বহুদিন আমি সে ক্ষীর রান্না করেছি গোসল করে ধোওয়া কাপড় পরে মাটির হাঁড়ি করে। সে সকল শিরনী সালাতের দিন এখন আর নেই।

অবিবাহিতা মেয়েদের দিয়ে সেকালে অনেক পুণ্য কর্ম করানো হত, যেমন কোন কিছুর চুরি হলে বা হারিয়ে গেলে কাঁঠাল বা কলাপাতায় বাড়ীর বা সন্দেহজনক লোকদের নাম লিখে নিয়ে লোটা ভরে পানি নিয়ে দুটি কুমারী মেয়েকে ধরতে দিয়ে বসানো হত। কোরআন শরীফ থেকে সুরা ইয়াসিন বা সুরা রহমান কিম্বা আয়তাল কুরশী পড়া হত। সাথে সাথে নাম লেখা পাতা একটি করে সেই লোটার মধ্যে ফেলা হত। যে নামের পাতাটি লোটায় পড়লে লোটাটি ঘুরে উঠত তাকেই ধরা হত। আর এটি সত্যিই আশ্চর্যজনক রূপে চোর ধরিয়ে দিত। এখন কি আর সে প্রথা কেউ মানবে, না, সে পথ কেউ অবলম্বন করবে? কেউ পালিয়ে গেলে বা হারিয়ে গেলে আমাদের বড় হাফিজ সাহেব কলাপাতায় একটি দোওয়া লিখে দিতেন। তিন দিনের মধ্যে সে নিজেই ফিরে আসত কিংবা দূরে চলে গেলে চিঠি দিয়ে বা লোকমুখে সে নিজেই খবর দিত, কোথায় আছে এবং কেন চলে গিয়েছে। এসব অলৌকিক কাহিনী আজ আর কেউ বিশ্বাস করবে কি?

বৃষ্টি না হলে সবাই খালি মাথায় খালি পায়ে খোলা মাঠে নামাজ পড়তেন। মেয়েরা ভিজা কাপড়ে ভিজা চুলে দোওয়া-দরুদ পড়তেন। বৃষ্টি সত্যিই হত। আর খুব বেশী বৃষ্টি হলে ছোট ছেলেমেয়েরা সবাই মিলে আমরা একটা বড় মজার খেলা করতাম। রাতে মেঘের ফাঁকে ২/১টি তারা দেখা গেলে আমরা সুর করে তারা বাঁধতাম ছড়া কেটে। সে ছড়াটি ছিল এই—

একতারা, দুইতারা, তারারা কয় ভাই?
তারারা সাত ভাই
বেঁধে ফেল্লাম বড় ভাই
চন্দ্র গেলে সূর্যের বাড়ী বসতে দিল চৌকী সিঁড়ি
বসবেনা আর পিঁড়িতে
মানুষ মরে ভাতে, গরু মরে ঘাসে
কালকের রৌদ্রে যেন বসুমতী ফাটে।

একথা ফলপ্রসূ হত কিনা জানিনা। তবে ২/১ দিনের মধ্যে ঝলমলে রোদ দেখা দিলে আমাদের আর খুশীর সীমা থাকত না যে তা ঠিক। আরও একটা কাজ করতাম। একটা কাপড়ের ভিখারী পুতুল বানিয়ে তার কাঁধে একটা ভিক্ষার ঝুলিতে কিছু চাল, ডাল, মরিচ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, নুন, তেল, হলুদ, কুঁচি দিয়ে সেই পুতুলটাকে একটা কাঠিতে বেঁধে মাঝ আঙ্গিনায় পুঁতে দাঁড় করিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হত খুব হৈচৈ করে। তাতেও নাকি বৃষ্টি ধরে রোদ উঠত। এরপর এটা ‘বেদাত’ বলে নিষেধ হওয়ায় আর হতনা। এটা অবশ্য ছিল একটা খেলা।

এখন মনে পড়ে আমাদের শৈশবের দিনগুলি। একালের মত কচি বয়স হতেই স্কুল পড়া আর সময় মেনে চলার দিন ছিলনা বলে শিশুমনের কল্পনার বিকাশ হত নানা দিক দিয়ে। জীবনত ছিল জীবন্ত, আনন্দও যেন অফুরন্ত ছিল, খেলাধুলা, খাওয়া, পরা, গ্রাম্য পরিবেশ, ফুলঝরা, পাখীডাকা, ভোরে ফুলের গন্ধে, পাখীর গানে, রোদে বৃষ্টিতে ফুল-ফল কুড়ানো, নদী-পুকুরে সাঁতার কাটা। শরীর স্বাস্থ্য মন অন্তর যেন পরিপূর্ণতা লাভ করত। আকাশ মাটির সাথে মিতালী হত।

এখন যান্ত্রিক জীবন। সমস্যা বেড়েছে, বুদ্ধি-বিদ্যার চর্চা বেড়েছে। কিন্তু তাতে করে মানুষ প্রকৃতির সান্নিধ্য থেকে দূরে চলে গেছে। বিজ্ঞানের যুগ, উন্নত জগতের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে। আমাদের কালে যে বিজ্ঞানের উন্মেষ, এখন তা পরিণতির পথে।

আমরা জন্মেছিলাম পৃথিবীর এক আশ্চর্যময় রূপায়ণের কালে। প্রথম মহাযুদ্ধ, স্বাধীনতা আন্দোলন, মুসলিম রেনেসাঁর পুনরুত্থান, রাশিয়ান বিপ্লব, বিজ্ঞান জগতের নতুন নতুন আবিষ্কার, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নবরূপ সূচনা, এসবের শুরু থেকে যে অভাবের মধ্যে শৈশব কেটেছে তারই আদর্শ আমাদের মনে ছাপ রেখেছে সুগভীর করে। স্বাধীনতা চাই, শান্তি চাই, সাম্য চাই, এই বাণী তখনকার আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হত। এখনও মানুষ সেই সংগ্রাম করে চলছে, একতাবদ্ধ গণজাগরণ চিরকাল জয়ের পতাকা উড্ডীন করেছে। বিশ্বব্যাপী এ সংগ্রামেও একদা গণসংহতি জয়লাভ করবে। যুগে যুগে মানুষ এগিয়ে চলেছে অজানাকে জানতে, অদেখাকে দেখতে। এই জ্ঞান সন্ধানই মানবতা, সেকাল থেকে একালে এই সন্ধান একই পথের, চিরকাল ধরে চলবে এ সন্ধান।

১৯১০ বা তারও আগে থেকেই ভারতব্যাপী স্বাধীনতা আন্দোলন, বিপ্লবী কর্মপন্থা, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, মুসলীম লীগ-এর সূচনা। আমার জন্ম ১৯১১-তে। অন্তঃপুরবাসিনীদের মধ্যেও এ আন্দোলনের কথা ভাসা ভাসা রূপে পৌঁছেছিল বই কি। অমুসলমান নারীরা যে প্রত্যক্ষ কর্মসূচী তখন গ্রহণ করেছিলেন, মুসলিম মহিলারা সেকালে তাতে কোন অংশগ্রহণ করতে আর পারেননি। তবে আমাদের পরিবারে বিদেশী বর্জন কিছুটা হয়েছিল, কেননা বরিশাল জেলা স্বাধীনতার জন্য, শিক্ষা, সংস্কৃতির জন্য বহু দিন থেকেই প্রসিদ্ধ। অশ্বিনীকুমার দত্ত, মুকুন্দ দাস এরা বরিশালে যে আন্দোলন তুলেন তাতে আমার মামা ব্যারিস্টার সৈয়দ মোতাহার হোসেন সাহেব অগ্রণী ছিলেন। সৈয়দ আবদুর রসুল সাহেব এক সম্মেলনে বরিশালে যোগ দিয়েছিলেন, আর সে সময়ের সরকারী শাসন কার্যের তীব্র সমালোচনায় বরিশালের হিন্দু-মুসলিম যোগ দিয়েছিলেন, সেই সময়ে গান রচনা হয়েছিল:

“এই রবিশাল পুণ্যে বিশাল
হল লাঠির ঘায়ে।

শেরে-বাংলা ফজলুল হক সাহেব, হেমায়েত হোসেন তখন হয়ত সবেমাত্র শিক্ষা শেষ করার মুখে। সিপাহী বিদ্রোহের সময় আমার নানা অনেক ইংরেজদের প্রাণ রক্ষা করেছিলেন, নিজেদের প্রতি ইংরেজদের অত্যাচারের কথা ভুলে বা ক্ষমা ও দুঃস্থজনকে রক্ষা করা ইসলামের নীতি এই কথা মনে করেই। কিন্তু আবার এই স্বদেশী আন্দোলনে ইংরেজ সরকার শায়েস্তাবাদ পরিবারের উপর বিরূপ হয়ে কৈফিয়ৎ তলবও করেছিলেন। আমার মামারা তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বাড়ীতে চরকা তাঁত বসিয়েছিলেন। বিলাতী নুন চিনির বদলে দেশী নুন চিনি খাওয়া প্রচলিত করলেন। আর তখনকার শায়েস্তাবাদ সমৃদ্ধিতে শহরের সমানই ছিল। নিত্য সেখানে হিন্দু-মুসলমানদের সভা, সমিতি হত। বরিশাল শহরে ঢাকা থেকে সভা সমিতির লোকেরা যেতেন।

এই সময়ে একটা কাণ্ড হয়েছিল। আমার ব্যারিস্টার মামার দুটি পোষা বাঘের বাচ্চা ছিল। আমার ভাইয়ার তখন বছর তিনেকের মত বয়স। নওয়াব সলিমুল্লাহ শায়েস্তাবাদ থেকে আসরের নামাজের পর ঢাকা রওয়ানা হয়ে আসবেন। ভাইয়া জেদ ধরলেন যে আমিও ঢাকা যাব। অনেক ভুলিয়ে তাকে রাখা হল। কিন্তু সবার অলক্ষ্যে তিনি বালাখানা থেকে নেমে গেলেন। বাহির বাড়ীর প্রকাণ্ড গেট-এর উপরে নহবতখানা ছিল। তার কাছে বাঘের বাচ্চা দুটি জিঞ্জিরে বাঁধা ছিল। ভাইয়া গিয়ে তার কাছে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের সাথে হয়ত খেলাই করতে চেয়েছিলেন। কতক্ষণ খেলা করার পর বাঘের একটা বাচ্চা গর্জন করে ভাইয়াকে থাবা মেরে গলায় ঝাঁপিয়ে পড়তে চেষ্টা করছিল। মসজিদ থেকে আসরের নামাজ পড়ে তখন সবাই সামনের ময়দানে আসছিলেন। আবদুস সামাদ বলে আমাদের এক জ্ঞাতি ভাই তাড়াতাড়ি গিয়ে ভাইয়াকে ছাড়িয়ে আনেন। পেয়াদা-পাইক, লোকজনেরা হৈ-হল্লা করতে থাকে। ডাক্তার-কবিরাজ সবাই জড় হয়ে ওষুধপত্র দিলেন। সামান্য রক্তপাতও হয়েছিল। সারাবাড়ী, গ্রামময় হুলুস্থূল।

মামা সলিমুল্লাহ্ সাহেবকে পৌঁছে দিয়ে এসে ব্যাপার শুনে এক লাথিতে বাঘটাকে মেরে ফেললেন। ভাইয়ার বুকে ও গালে এখনও সামান্য একটু সে দাগ আছে। অন্য বাচ্চাটা মামার সাথে কুকুরের মত ফিরতো। একদিন মামা বসে আছেন। বাচ্চাটা পা চাটতে চাটতে হঠাৎ গর্জন করে উঠল হিংস্র হয়ে। সেটাকেও এমন জোরে মামা লাথি মারলেন যে থামের সঙ্গে লেগে তক্ষুনি মরে গেল। সে বাঘের বাচ্চার চামড়া দুটি বহু কাল ছিল। আমার জন্মের আগের ঘটনা। আমি সে চামড়া দেখেছি আর একথা সবার মুখে মুখে কত যে শুনেছি। এরপর আর জ্যান্ত বাঘ কেউ পালেননি। মামাদের খুব শিকারের সখ ছিল। সুন্দরবনের কত পশু পাখী কুমিরের বাইসনের ট্যান করা দেহ-মাথা ছিল।

বরিশালের হাশেম আলী সাহেব, হেমায়েত উদ্দীন সাহেব, ইসমাইল চৌধুরী, ব্যারিস্টার নলিনী ও তার দু’ভাই বিনয়ভূষণ গুপ্ত, ইন্দুভূষণ গুপ্ত, নলিনী রায়, রমণী রায় এরা আমাদের ঘরোয়া হিসাবে আপনজনের মত ছিলেন। ইসমাইল চৌধুরী ও শেরে-বাংলাও আমাদের আত্মীয় ছিলেন। তাছাড়া পি.এল.রায়., জার্ডিন রায়, কে.জি. গুপ্ত, কে.সি. দে এরাও মামাদের বন্ধু ছিলেন। প্রায়ই শায়েস্তাবাদে গিয়ে থাকতেন। ভুকৈলাশের রাজা বাহাদুর, ভাগ্যকুলের রাজা এরা যেতেন। তারা মামার সাথে কোরান-হাদিসের আলোচনা করতেন। সবেবরাত, শবইকদরের উৎসব দেখতেন, নিত্য-নতুন অতিথি আসা-যাওয়ায় নিত্য-নতুন বাইরের খবরও কিছুটা অন্দরমহলে গিয়ে পৌঁছাত। নতুন দুনিয়ার খবর কানে আসত। প্রথম মহাযুদ্ধের শেষ, স্বদেশী আন্দোলনের পূর্ণ জোয়ার। হিন্দু-মুসলমানের মিলিত স্বপ্ন দেশ স্বাধীন করা। নিজের অধিকার বুঝে নেওয়া। তখনও শৈশব কাটেনি। তবুও কিসের একটা আবেগ এসে মনকে দোলা দিত।

এমনি দিনেই কোন বর্ষামুখর দিনে মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘হেনা’ পড়ছিলাম বানান করে। প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ, মিলন এসবের মানে কি তখন বুঝি? তবুও যে কী ভাল, কী ব্যথা লেগেছিল তা প্রকাশের ভাষা কি আজ আর আছে? গদ্য লেখার সেই নেশা। এর পরে প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা (কোন কবিতাটা তা মনে নেই) চুরি করে করে প্রতিমাসের ওই পত্রিকা পড়তে পড়তে অদ্ভুত মোহগ্রস্ত ভাব এসে মনকে যে কোন অজানা রাজ্যে নিয়ে যেত!

এরপরই দেখতাম বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন লিখছেন, বেগম সারা তাইফুর লিখছেন। কবিতা লিখছেন বেগম মোতাহেরা বানু। মনে হল ওরা লিখছেন আমিও কি লিখতে পারিনা? শুরু হল লেখা লেখা খেলা। কী গোপনে, কত কুণ্ঠায় ভীষণ লজ্জার সেই হিজিবিজি লেখা, ছড়া, গল্প। কিন্তু কোনটাই কি মনের মত হয়। কেউ জানবে, কেউ দেখে ফেলবে বলে ভয়ে ভাবনায় সে লেখা কত লুকিয়ে রেখে আবার দেখে দেখে নিজেই শরমে সঙ্কুচিত হয়ে উঠি।

বারো বছর হতেই বিয়ে হয়ে গেল। তখনও কি আত্ম-প্রকাশের সাধ্য ছিল? শায়েস্তাবাদ ছেড়ে বরিশাল এলাম। বরিশালের অশ্বিনী বাবুর ভাইয়ের ছেলে ‘তরুণ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করলেন। লেখা চাই। আমার স্বামী সে পত্রিকার সাথে জড়িত ছিলেন। তখন তাঁর মনে হল আমিওত লিখি। ২/৩টা লেখা নিয়ে সম্পাদককে দেখাতে একটি গল্প ও কবিতা মনোনীত করলেন। আমার লেখা প্রথম গল্প ‘সৈনিক বধূ’ নামে তরুণ পত্রিকায় ছাপা হল। আশ্চর্য সেদিনের হিন্দু-মুসলমান সকলেই অত্যন্ত প্রশংসা করে আরও লেখার জন্য তাগাদা দিলেন। কিন্তু আমার বড় মামা শায়েস্তাবাদের বাড়ী বসেই সে লেখা দেখে আগুন হয়ে আমাকে শহর থেকে আবার শায়েস্তাবাদ নিয়ে গেলেন। অকথ্য গালি দিলেন তাঁর আপন ভাইয়ের ছেলে আমার স্বামীকে। কিন্তু আমাকে কিছুই বললেন না। মামা গেলেন ৬ মাসের জন্য কলকাতা। বরিশালে ফিরে এলাম। তখন লেখাও চলল আর শুরু হল সেই সময়েই সামান্য করে সমাজসেবার কাজ। সুকুমার দত্তের স্ত্রী বি-এ পাশ করে বরিশাল এলেন—মাতৃমঙ্গল, শিশুসদন, সমিতি করলেন। বরিশাল বালিকা বিদ্যালয়ের মধ্যে সভা হত, বোরখা পরে বন্ধ ঘোড়ার গাড়ী করে সাবিত্রী দিদির সাথে যেতাম। কী হাস্যকর সে যাত্রা। তবুও কী অসীম তৃপ্তি লাভ করতাম অসহায়া, অশিক্ষিতা মায়েদের শিশুদের সাথে। আরও হিন্দু মহিলারা ছিলেন। আমার তখনও কৈশোর কাটেনি। বন্ধু স্থানীয় ছেলেরা হাসত বলত, ওদের (সাবিত্রীদিরও তখন ছেলেমেয়ে হয়নি) নিজেদেরই ছেলেমেয়ে নেই, ওরা আবার শিশু মঙ্গল করে। আমরা জেদ করে আরও বেশী করে উৎসাহ দেখাতাম।

এরপরে গান্ধীজীর চরকা কাটার ধুম, চরকাও কাটলাম, গান্ধী এলেন বরিশালে। তাকে দেখবার কি আগ্রহ, কিন্তু প্রকাশ্য সভায় যাওয়া আমার পক্ষে যে কত অসম্ভব। রজনী কাকীমা, নলিনী কাকীমারা খুব পর্দানশীন না হলেও প্রকাশ্য সভায় যাওয়া নিয়ে বহু ভাবনা-চিন্তা করে আমাকেও তাদের মত কাপড় পরিয়ে সিঁদুর পরিয়ে সাথে নিয়ে গেলেন। তবে রক্ষা যে পর্দায় থাকতাম বলে বাইরের কেউ আমাকে চিনত না। দেখলাম সেই সময় গান্ধী মহাত্মাকে। নিজের হাতের কাটা সুতা তাঁর হাতে দিতে পেরে সেদিন কী যে আনন্দ ও গৌরব বোধ করেছিলাম। সেই দিনের সে সব স্মৃতি অক্ষয় সম্পদ আমার।

বেগম রোকেয়ার সাথে আমার যখন দেখা হয় তখনত আমি ছোট। ৬/৭ বছর বয়স, সাত বছর হয়ে গেছে। বেগম রোকেয়ার দারুণ প্রভাব আমার জীবনে। তাই তাঁর প্রসঙ্গে কিছু বিস্তারিত কথা বলবো। আম্মাকে ফুফু-আম্মা ডাকতেন বেগম রোকেয়া। রক্তের সম্পর্ক কিনা জানিনা তবে কুটুম্বিতা ছিল। তা কলকাতায় আমরা গেছি তখন আমি ছোট, ৭ বছর হবে। একদিন শুনি যে স্কুলের গাড়ী এসেছে ‘স্কুলকা গাড়ী আয়া’ বলে হাঁক। তা দেখি যে এক মস্ত গাড়ী এসেছে। আম্মা খালাআম্মা সবাই বারান্দায় বসে আছেন। দেখি যে ছোটখাট সুন্দর একটি মেয়েমানুষ উঠে আসছেন। তা উঠে এসে পরপর আম্মাকে খালাআম্মাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলেন। ‘রুকু’ তুমি কলকাতায় আছ, আসনা যে? জী হ্যাঁ, আমিত কলকাতায়ই আছি। আমিত আসিনা কিন্তু আপনারাই বা আমার কত খবর নেন? বললেন উনি হাসি মুখেই। উনি স্কুল-টিস্কুল করেছিলেন বলেত মুসলমান সমাজের যত বড় বড় ঘরের সাথে আত্মীয়তা উনার। প্রায় সবাই উনাকে আবিষ্কার করতে চাইত, এই রকম অবস্থা। তারপরে বসলেন। আমি ওখান দিয়ে যাচ্ছি—আম্মা বললেন, ‘সালাম কর, তোমার আপা হয়।’ আমিও সালাম করলাম। উনি আম্মাকে বললেন, ‘ফুফু আপনার মেয়ে?’ আম্মা বললেন, হ্যাঁ। তখন উনি বললেন, ‘আমার স্কুলত আমি করেছি, সেখানে অনেক মেয়ে পড়ে, হিন্দু-মুসলমান সব মেয়েরা পড়ে, কিন্তু আমার আত্মীয়স্বজনের কোন মেয়ে আমার স্কুলে পড়ে না।’

রওশন জাহান, খুরশীদ জাহান আমার চেয়ে বয়সে বড়, আমার খালাত ভাইয়ের মেয়ে। খালাআম্মার ছেলের মেয়ে। ওদের কথা বললেন যে, ওদেরকে লেখাপড়া শিখান না—, আমার স্কুলে যদি দেন। এইত পর্দা ঢাকাইত গাড়ী। গাড়ীতে পর্দার মধ্যেইত আসবে যাবে। অনেক মুসলমান মেয়েরা যখন আসছে। মেয়েদের দিলে খুশী হতাম। আম্মাকে বললেন ‘ওকে পড়াবেন?’ আম্মা বললেন, ‘আমিত কলকাতায় থাকিনা। আমিত এসেছি আবার কমাস পরেই চলে যাব। মাস দু-তিন থাকব। নয়ত তোমার স্কুলে দিতাম পড়তে।’ আমার খুবই ইচ্ছা তখন থেকে আমি যদি পড়তে পারতাম। কি জানি ছোটবেলা থেকে স্কুলেত কোনদিন যাই নাই। যাবার একটা ইচ্ছা ছিল। আমি আম্মাকে বলেছি, আম্মা স্কুলে যাব। আম্মা বললেন, আমরাত থাকবনা, না হলে তোমাকে স্কুলে দিতাম। তা আমরা আবার একদিন সেই বন্ধ গাড়ীতে চড়ে স্কুলে গিয়ে দেখেটেখে এলাম। তখন স্কুলটা ছিল লোয়ার সার্কুলার রোডে। এখনত সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল লর্ড সিনহা রোডে।

শুনলাম ওরা—আমার খালাত ভাইয়ের মেয়েরা স্কুলে যাবে। আমার ত এত দুঃখ লাগল যে ওরা স্কুলে যাচ্ছে কিন্তু আমি যেতে পারব না। আমরা যে চলে আসব শায়েস্তাবাদে। তারপর অবশ্য ওদেরও আর স্কুলে যাওয়া হল না। কারা কারা যেন বললো, হ্যাঁ, এখন আবার মেয়েরা স্কুলে যাবে, হেন যাবে, তেন যাবে। আমরা শায়েস্তাবাদে চলে এলাম। ওরা আর স্কুলে যায় নাই—একজন ইউরোপীয়ান গভর্নেস ওদের পড়াত। তা বেগম রোকেয়া বললেন যে, ইউরোপীয়ান গভর্নেস বাড়ীতে পড়ায়, কিন্তু আমার স্কুলে আমার আত্মীয়স্বজনের মেয়েরা নাই। এই কথাটা আমার এখনও মনে আছে। তারপরেত আমরা শায়েস্তাবাদে চলে এলাম। তারপরে যখন আবার কলকাতায় আসি তখনত আমি বড় হয়েছি, বিয়েটিয়ে হয়ে গেছে। তখন এসে আবার উনার সঙ্গে দেখা। তখন উনি বললেন ‘ফুলকবি’ তুইত লেখাপড়া শিখলিনা, কিন্তু কবি ত হয়ে গেলি। আম্মাকে বললেন, ফুফু এই মেয়েটাকে যদি পড়াতেন তবে আজকে এই মেয়েটা কত লায়েক হত। আম্মা বললেন, কি করব? আমাদের সময়ত আমরা শায়েস্তাবাদে থাকতাম। কলকাতায়ত থাকি নাই, কি করে পড়াব?

উনি আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম বলে একটা সমিতি করেছিলেন তাতে হিন্দু-মুসলমান সব মেয়েরা সেই সমিতির সভ্য ছিল। তা ওখানে আমিও সভ্য হলাম। মরিয়ম আপাও ছিলেন। বুলু ও আমি ত অবশ্য তখন বড় হয়ে গেছি। লেখাপড়া আর কি শিখব। প্রায়ই তবু আমরা যেতাম। উনিও আসতেন প্রায়ই আমাদের ওখানে। তা আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলামে সব বাংলা নাম দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের উপর, বাংলা ভাষার উপর, বাংলা জাতির উপরে কি রকম যে ওনার একটা টান ছিল। আজকালকার দিনে কয়টা মানুষের সে রকম আছে আমি জানিনা। সেই কালের উনি করলেন বাংলার মেয়েদের সমিতি, বাংলার খাওয়াতীনে ইসলাম, সব বাংলায় ওখানে। তবে ওনার যে স্কুলটা ছিল সেটা খালি স্কুল না। বেগম রোকেয়ার জীবনটা পড়লে দেখা যাবে ‘তারিণী ভবন’ বলে একটা কথা আছে তাতে। ‘পদ্মরাগ’ বলে একটা উপন্যাস উনি লিখেছেন। সেখানে, তারিণী ভবনের উল্লেখ আছে। ওনার স্কুলটাই ছিল সেই তারিণী ভবন। সেখানে হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান, ফার্সি সবরকম মেয়েরা পড়তো। কেউ শিক্ষয়িত্রী, কেউ সুপারিনটেন্ডেন্ট, কেউ পড়ছে, কেউ অনাথ, কেউ আসছে সেখানে থাকতে, কাজ করতে। এত সুন্দর প্রতিষ্ঠান আমি এখন পর্যন্ত আর কোথাও দেখি নাই। দেশে-বিদেশে এ দেশের মেয়েরা কিম্বা অন্যান্য দেশের মেয়েরা মহিলারা কত সুন্দর সুযোগ-সুবিধা পায়, গভর্ণমেন্টের সাহায্য পায়। কিন্তু উনিত সে সব পেতেনইনা বরঞ্চ তখনকার দিনের সেই ধর্মান্ধ সমাজ ওনাকে গালাগালি করেছে। কত উড়া চিঠি লিখেছে। কতকরম করে উনাকে নির্যাতন করেছে। ঢিল মেরেছে। কিন্তু ওই স্কুল নিয়েই উনি ছিলেন। তা উনি নিজেই বলেছেন, আর আমরাও জানি ওনার ভাগলপুরে বিয়ে হয়েছিল সাখাওয়াত হোসেনের সাথে। উনি মারা যাবার সময় ওনার কাবীনের টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন। ওই দশ হাজার টাকা দিয়ে উনি ভাগলপুরে প্রথমে একটা স্কুল করেন ওনার স্বামী মারার যাবার পরে।

উনি ছিলেন খলিল সাবের, ইব্রাহীম সাবেরের বোন। ওনার বাবার নাম ছিল জহীর উদ্দিন মুহম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের। পায়রাবন্দের সেই গ্রামের মধ্যে জমিদারের মস্ত বড় বাড়ী। ওখানেত মেয়েরা স্কুল-টিস্কুলে যেতনা। ওনার দুই ভাই ইব্রাহীম সাবের আর খলিল সাবের বাড়ীতে যেতেন, তাঁদের কাছে বেগম রোকেয়া পড়াশুনা দেখতেন, তাঁদের কাছে পড়াশুনা উনি শিখতে চাইতেন। মোমবাতি জ্বালিয়ে রাতে চুপচাপ করে—উনি সেখানে বসে পড়তেন।

তা ভাই দেখলেন যে উনি মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়ছেন। বললেন, রুকু তুমি কি পড়ছ? আর উনি একদম ভয়ে পেয়ে গেলেন যে হয়ত নিষেধ হবে। তবে ভাই দেখলেন যে তার পড়বার খুবই আগ্রহ। তখন উনি ভাইয়ের কাছে লেখাপড়া শিখতে লাগলেন। এখনত সব ভেঙ্গে গেছে পায়ারাবন্দ গ্রামের। কিন্তু ওইখানে আমি ওনার একটা স্মৃতিফলক রেখে এসেছি। যদি দেশের মেয়েরা ওনার স্মৃতিফলকটাকে বাঁচিয়ে রেখে সেইটির উন্নতি করে তা হলে তাঁর স্মৃতি রক্ষা সম্ভব হবে। ওনার জন্মভূমির একটা পাথর ওখানে বসিয়ে এসেছি। মিসেস আয়শা জাফর, আমি, আরও কয়েকজন মহিলা যাদের নিয়ে আমাদের ওই ‘বেগম রোকেয়া স্মৃতি কমিটি’; সেই সমিতি থেকে ওনার নামের একটা পাথর আমি ওখানে বসিয়ে এসেছি। তা যাক সে কথা, এখন দেশের মানুষ করবে। আমি যেটুক পেরেছি, করেছি।

সেই পায়রাবন্দ গ্রামে বসে, সেই মোমবাতির আলোতে সবার নিষেদের মধ্যে উর্দু, আরবী, ফার্সী, বাংলা শিখলেন, ইংরেজী শিখলেন। ওনার ইংরেজী লেখাওত আছে। ‘সুলতানার স্বপ্ন’। আরও অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন। অনেক কিছু লিখেছেন। ভাল ইংরেজীও শিখলেন। ভাল বাংলাতো শিখলেনই। আর ছেলেবেলাতে উর্দুই ওনাদের ভাষা ছিল। তারপরে বিয়ে করে উনি ভাগলপুরে গেলেন। কিন্তু শ্বশুরবংশ ওনাকে পছন্দ করল না। উলি লেখাপড়া জানা মেয়ে বলে। কিন্তু ওনার স্বামী সাখাওয়াত হোসেন সাহেব ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। খুব উৎসাহ দিতেন। উনি খুব উৎসাহ দিতেন মেয়েদের লেখাপড়ার বিষয়ে এবং বেগম রোকেয়াকেও খুব উৎসাহ দিতেন। ‘তুমি লেখ পড়।’ তার পরেত বেশিদিন বাঁচেন নাই। কয়েকটা বছর পরেইত উনি মারা গেলেন। সাখাওয়াত হোসেন মারা গেলেন। তখন বেগম রোকেয়া স্বামীর নামে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল বলে একটা স্কুল ভাগলপুরে করলেন। কিন্তু শ্বশুরবাড়ীর আত্মীয়স্বজন এত ক্ষেপলেন, এত নির্যাতন শুরু করলেন ওনার উপর যে উনি চলে এলেন। এসে উনি কলকাতায় ওয়ালী উল্লাহ লেনে ১৯২১ সালে এগারটা মেয়ে নিয়ে একটা স্কুল করলেন। এই ওনার স্কুলের শুরু। একদম বস্তীর মেয়েদের নিয়ে উনি কাজ শুরু করলেন। তখন কোন ভদ্রলোকের মেয়েরা স্কুলে যায় না। মুসলমান মেয়েরা এই বস্তীতে স্কুল করলো। হিন্দু মেয়েরা, খৃষ্টান মেয়েরা সব ওনার কাছে আসত এখানে। এইভাবে আস্তে আস্তে স্কুলটি বড় করলেন। খালি স্কুলটা বড় করা না—যদি উনি সেই সময় এরকম না করতেন তাহলে বোধকরি সমাজও জাগতনা। মুসলমান সমাজ কি হিন্দু সমাজ তখন অনেক অন্ধকারে ছিল। বিশেষ করে মুসলমান সমাজ, আমি বলব। হিন্দু মেয়েরা লেখাপড়া শিখে এগিয়ে গেছে। হিন্দু ভদ্রলোকেরা অনেকটা মুক্তবুদ্ধি শুভবুদ্ধি নিয়ে মেয়েদের উন্নতির জন্য অনেক কিছু করেছেন। কিন্তু মুসলমান সমাজ ত তখন ওনার একদম বিরোধী। তা সত্ত্বেও উনি সেই স্কুলটা করলেন। সেটাকে বোর্ডিং না বলে একটা অনাথ আশ্রম বলা যেতে পারে।

সেখানে যত হিন্দু মেয়ে, খৃষ্টান মেয়ে, নির্যাতিত মেয়েরা, যাদেরকে বাড়ী থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, যারা হিন্দু সমাজ থেকে বেরিয়ে গেছে, ইংরেজ সমাজে যাদের ঠাঁই নাই, তারা এসে ওনার কাছে আশ্রয় নিয়েছে। আর মুসলমান মেয়েদেরত কথাই নাই। ওই রকম আশ্রম করে উনি ওই নিজেদের মধ্যেই খুব লেখাপড়া জানা না হলেও ওদের দিয়েই স্কুল চালাতে শুরু করলেন। ওই আশ্রমটা চালাতে শুরু করলেন। আমরা নিজেরা দেখেছি। প্রায় ১৯২৭/২৮ সনে আমি আবার কলকাতায় এলাম তখন এসেই আমি ওনার সাথে দেখা করলাম। তখন গিয়ে দেখলাম সে বিরাট একটা আশ্রম করেছেন। অনেক মেয়ে ওখানে থেকেই লেখাপড়া করছেন। বাচ্চাদের লেখাপড়া শিখাচ্ছেন। তারপরেও নানান রকম কথা শুরু হল। হ্যাঁ, উনিত ভালরকম করে শিখান না, ওনার শিক্ষয়িত্রী যারা তারাত কিছুই লেখাপড়া জানেনা, তারাত বাপে খেদানো, মায় তাড়ানো। মানে যাদের কোন সমাজ নাই, সংসার নাই তারা সব ওখানে আছে। সেই জন্য উনি বি-এ পাশ করা, এম-এ পাশ করা ট্রেনিং নেওয়া মেয়েদের নিয়ে স্কুলে মাষ্টারীর কাজে লাগান। আগে কিন্তু উনি সব কাজ নিজে করতেন। আর ওইসব মেয়েদের দিয়ে স্কুল চালাতেন।

আমাকে বড় আদর করতেন। মায়াদি বলে একজন ছিলেন। তার নিজের কথাত কাউকে বলতেন না। কিন্তু আমরা জানি। হিন্দু সমাজের মেয়ে ডাকাতে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, পরে আর ওনাকে ঘরে নিতনা। বাবা, মা, শ্বশুরবাড়ীর কেউই ওনাকে আর গ্রহণ করলেন না। আগেত এই রকম ছিল সমাজ। সেই বেচারী ছিল সেই আশ্রমে। আমি দেখেছি তাকে আমরা মায়াদি বলতাম। এখনত মারা গেছেন। ওই সাখাওয়াত মেমোরিয়ালেই মারা গেছে। খবর দেওয়া হল রামকৃষ্ণ মিশনে, ওখান থেকে নিয়ে যাওয়া হল, দেখেছি আমরা। তা এই রকম কত যে নির্যাতিত হিন্দু-মুসলমান মেয়েরা ছিল।

আর একজন ছিলেন খৃষ্টান মহিলা—না দুইজন ছিলেন, তাদের স্বামী, তাড়িয়ে দিয়েছিল তাদের। ওদের মধ্যে আবার ডিভোর্স নিতে পারেনা। কত কি সব হাঙ্গামা-টাঙ্গামা আছে ডির্ভোস নিতে গেলে। কিন্তু স্বামী অত্যাচারী মাতাল মদখোর। বিলাতী মেয়ে, দেশী খৃষ্টান না। বৃটিশ এই দু’জন মহিলাও ওনার কাছে ছিল। বুড়ি হয়ে গিয়েছিল। মাথার চুল পেকে দেছে। একজন ইংরেজী শেখাতেন, আরেকজন শিখাতেন পিয়ানো। এই দু’জন মহিলাকেও আমি দেখেছি ওখানে। তারা বললেন যে, বেগম রোকেয়ার মত যদি আরও দু-চারজন মহিলা বাংলাদেশে থাকতেন তবে এই সমাজের খুব তাড়াতাড়ি উন্নতি হত।

ওই আদশর্টাইত আমার মনে আছে। কিন্তু ওই রকম কি আর আমি পারি। কোথায় বেগম বোকেয়া, আর কোথায় আমি। আমার সাধ্যে কি কুলায়? ওনার আদর্শ ত আমার জীবনের সাথে একদম লেপটে গেছে। আর ওই আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম যে উনি করলেন ওইটার কাজ নিয়ে কলকাতায় বস্তীতে বস্তীতে আমরা কাজ করেছি। সেই সমিতিতে তখন এলেন একদম লেডী গজনবী থেকে শুরু করে লেডী ফারুকী, মিসেস মোমেন, মিসেস গফফার, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ—আমরা সবাই তার সভ্য ছিলাম। খালি বলতেন, দেখ এই যে কাছে আসে যারা, বোরখা পরেই আসুন শাড়ী পরেই আসুন বা পায়জামা পরেই আসুন তারা যে এই মিটিংএ আসে এইটাই খালি উন্নতি না, আসলে আমাদের দেখতে হবে যে আরও যে আমাদের নির্যাতিত বোনেরা রয়েছে, ভাইয়েরা রয়েছে তাদেরকে। তোমরা যাও, তোমরা কাজ কর। এই স্কুলে যতক্ষণ তোমরা আমার সাথে কথা বলতে তার চেয়ে তোমরা যদি বস্তীতে গিয়ে আমার ভাইদের, বোনদের বুঝাও তাহলে আমাদের সমাজের উন্নতি হবে। ওরা যদি স্কুলে নাও আসতে চায় তবু ওদেরকে একটু লেখাপড়া শিখাও। আমরা তাই পাড়ায় পাড়ায় গেছি। কত মহিলারা আমাদের সাথে আগ্রহ করে লেখাপড়ার জন্য ঘরে ঘরে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র খুলতে চেয়েছেন। কত মহিলা আমাদের সাথে আগ্রহ করে মিশতে চেয়েছে, তা স্বামীরা বলেছে ‘ইয়ে লোগত খারাব আওরাত হ্যায়’, ‘ইয়ে লোগকো মাত আনে দো’, ‘ইয়ে লোগ বস্তী বস্তীমে ঘুমতা।’ এই কলকাতার বস্তীওয়ালারা। কিন্তু তবু আমরা গেছি। আবার কেউ কেউ আদর করে বসিয়েছে, বোন বসেন, চা খান। আপনারা কেন এসেছেন? এরকম করে আমাদের জিজ্ঞাসা করেছেন।

আমরা হিন্দু-মুসলমানদের বস্তীতে ঘুরেছি। ভদ্রলোকদের জন্যও স্কুল ছিল। তারা ত অনেক উন্নতি করেছে। কিন্তু হিন্দুদের মধ্যেও তখন বস্তীতে এত অনুন্নত সম্প্রদায় ছিল—অচ্ছ্যুৎ সম্প্রদায়ের ছিল বেশী। মুসলমানদের মধ্যেত অচ্ছ্যুৎ সম্প্রদায় নাই। কিন্তু আমার এখনও মনে আছে, আমার প্রথম জীবনে হিন্দু অচ্ছ্যুৎ সম্প্রদায় আমরা তখন দেখেছি, একদম বস্তীতে। ভদ্রলোকদের সাথে যাওয়া-আসা বা স্কুল-কলেজে তারা যেতে পারেনা। সেইসব জায়গায় বেগম রোকেয়ার আঞ্জুমান থেকে আমরা বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র, শিশু শিক্ষাকেন্দ্র করেছি। তবে সেটা কি বি-এ, এম-এ পাশ করবার জন্য? না—এই প্রাথমিক শিক্ষাটা অক্ষর পরিচয়, একটা চিঠি লেখা, একটু হিসাব লেখা, এই পর্যন্ত আমরা শেখাবার চেষ্টা করেছি।

ব্যাটাছেলেরা পর্যন্ত এসেছে। কিন্তু তখনত ওই পর্দা আর পর্দা। আমরাত তখন বোরখা ছাড়া বেরোতে পারিনা—তাহলে তো ঘরেই ঢুকতে দিবেনা। কিন্তু অনেক বস্তীর ব্যাটাছেলেরাত বলেছে—হ্যাঁ, এরাতো ভাল কাজ করছে। আমরাও যদি লেখাপড়া শিখতাম তাহলে আমাদের এরকম অবস্থা হতনা। চেতনা যদি আনতে হয়, তাহলে এরকম করে কাজ করতে হয়। খালি ওই কতগুলো স্কুল খুলে দিলেই হয়না। এই যে প্রচলিত শিক্ষা সেটা দিয়েত ওরা বড় বড় লোক হতে পারে বা জজ হতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজ কি সেটার ব্যবস্থা করছে? তাতনা। এক একটা সংসার আছে যেখানে অশিক্ষিত লোক আছে, কিন্তু তারা মানুষ হিসাবে ভাল। এম-এ পাশ করবেনা, কিন্তু পড়াশুনা জানলে দুনিয়ার খবর রাখতে পারবে, জানতে পারবে যে, দুনিয়াতে কি হচ্ছে, নিত্য পরিবর্তনশীল দুনিয়া। যা নাকি ইসলামে আছে যে, মেয়ে এবং পুরুষ দুজনকে সমান শিক্ষা দাও। নারী প্রগতির বিরুদ্ধবাদীরা বেগম রোকেয়াকে লম্বা লম্বা চিঠি দিয়েছে যে, তার স্কুলের ছাত্রীরা খৃষ্টান হয়ে যাবে, বেহায়া হয়ে যাবে, লেখাপড়া শিখিয়ে ঘরের বাইরে বের করে আনবে। কিন্তু উনিত তা চান নাই। উনিত নিজেও পর্দা করেছেন। এইত কথায় কথায় আসে সওগাতের সম্পাদক নাসিরউদ্দিন সাহেবের কথা। বেগম রোকেয়া সওগাতে লিখতেন।

নাসিরউদ্দিন সাহেব যখন ওনার সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইলেন তখন মাঝখানে পর্দা দিয়ে কথা হল। মাঝখানে পর্দা, নাসিরউদ্দিন সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন আপনিত পর্দার ব্যাপারে এইরকম করেন? মেয়েদের বলেন অবরোধ মুক্ত হতে। আপনি বোরখা ছাড়া বেরোননা কেন? তখন বললেন, তা আমি যদি তা করি, তবে স্কুলটাত থাকবেনা। পর্দা হয়েছে মানুষের মনের মধ্যে। খালি কি বোরখায় ঢাকা? আর কোন দেশে এ রকম বোরখা? তাছাড়া আমরা বাঙ্গালী—আমাদের দেশে কি বোরখা চলন ছিল? একটা চাদর নিয়ে বেরোলেইত যথেষ্ট। এরকম কথা উনি বলতেন। আমাকে ত বলেছেন, শামসুন্নাহার মাহমুদকেও বলেছেন। নাহার ত ওই সময়ই বোরখা ছাড়ে। নাহার ম্যাট্রিক পাশ করল চাটগাঁয় বসে ওরকম পর্দার মধ্যে বসে বসে। শুনে উনি নাহারকে একটা চিঠি লিখলেন। বড় সুন্দর সেই চিঠিটা : ‘নদীর পার দিয়ে আমি যাচ্ছিলাম নৌকা করে তখন জঙ্গল থেকে একটা কেয়া ফুলের খুশবু পেলাম। তা ভাবলাম যে একটা কেয়া ফুটেছে। তা তুমি চাটগাঁ থেকে ওরকম অবরোধবাসিনী হয়ে ম্যাট্রিক পাশ করেছ শুনে আমার কাছে খুব খুশী লাগল। তুমি যদি আস তবে তোমাকে নিয়ে সমাজের অনেক কাজ হতে পারে।’ এই কথা নাহারকে উনি লিখেছিলেন।

নাহারের জীবনী লিখেছে মোশফেকা মাহমুদ ওর মধ্যে বোধকরি ওটা আছে। এই নাহার কলকাতায় এল, তখন নাহার বোরখা পড়ত। ওই বেগম রোকেয়ার ওখানেই নাহারের সাথে আমার প্রথম দেখা। আজীবন আমরা দু’জনে বন্ধুভাবে একসাথে কাজ করেছি। শামসুন্নাহার মাহমুদকে, বেগম বোকেয়া একসময় দুঃখ করে আমার কথা বললেন যে, ওই মেয়েটিও যদি ম্যাট্রিকটা পাশ করত, তবে ওত কবি হয়ে গেছে—ওত ফুলকবি। আমাকে ডাকতেন ‘ফুলকবি’ বলে। তা ফুলকবি হয়েও সমাজের কাজ করতে হবে। এইটা উনি আমাকে বলেছিলেন। তিনি বলেছেন, দেখ, বেশী লেখাপড়া শিখবার দরকার নেই। ম্যাট্রিক পাশ করেছে নাহার, সে বি-এ পড়বে, এম-এ পড়বে, জজ ম্যাজিস্ট্রেট হবে, যাই হবে সেটাই আমরা আশা করি। কিন্তু তোর মধ্যে সেই আশাটা না করলেও তুই যে কবি হয়েছিস তুইও সমাজের কাজ করতে পারবি। তোর লেখার ভিতর দিয়ে তুই সমাজকে জাগিয়ে তোল। এই কথাটা উনি আমাকে বলেছিলেন। আমার চোখে পানি আসছে। এত সুন্দর করে কথাটা বলেছিলেন। বড় আদর করতেন। উনি বলতেন, আমরা এইটাত চাইনা যে, মেয়েরা স্বাধীন হবে, মানে ঘর ভাঙ্গবে। স্বাধীনতা মানে কি? যে স্বাধীনতা আমাদের ইসলাম দিয়েছে, সেই স্বাধীনতাটুকু আমাদের মেয়েদের থাকবে। লেখাপড়া শেখা একসাথে, মেয়েছেলের সমতা, সমান অধিকার থাকবে, সমান দায়িত্ববোধ, এইটাত ইসলামের কথা—এইটা আমরা চাই।

আমরাত বাইরে গিয়ে শরীয়তবিরোধী কোন কাজ করছিনা, এইটাই তোরা বুঝবি। এইটা তোরা বুঝবি আর হিন্দু সমাজে ওই অচ্ছ্যুৎ বলে, আমাদের ধর্মে অচ্ছ্যুৎ বলে কিছু নাই, তাদেরকেও তোরা কাছে টেনে নিবি। বড় বড় হিন্দুদের সাথেও তোরা মিলেমিশে সমিতি কর। ওখানে অল ইন্ডিয়া উইমেন্স এ্যাসোসিয়েশন ছিল—ওখানে উনিও মেম্বার ছিলেন। আমরাও ছিলাম—আমি, শামসুন্নাহার মাহমুদ।

আমরা আরও অনেককে আনলাম। মিসেস গফফারকে আনলাম, মিসেস টি আহমদকে আনলাম, মিসেস রেশাদকে আনলাম। মিসেস রেশাদ হলেন প্রথম মুসলমান ছেলে যে পাইলট ছিল মুরাদ, তার মা। এরা সবাই এই আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে এলেন। আবার ওই অল ইন্ডিয়া উইমেন্স এ্যাসোসিয়েশনেও সবাইকে নিয়ে গেলাম যে আমরা একসাথে সবাই মিলেমিশে কাজ করব। হিন্দু-মুসলমানে ওনার কাছে কোন ভেদাভেদ ছিলনা। উনি বলতেন কেন আমরা একসাথে কাজ করবনা? আমরা সবাই কলকাতায় আছি, সবাই আমরা ভারতবাসী, ভারতীয় মহিলাদের সাথে আমরা থাকব। আর এটাত হল আমার গরীবদের সমিতি। উনি এই কথা বলতেন। আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে হয়েছে গরীব মেয়েদের জন্য। আর ঐ সমিতিতে অনেক বড় বড় মেয়েরা সব আছেন। অনেক মেয়েরা তাতে ছিলেন। বিধান রায়ের ভাই সাধন রায়, তাঁর স্ত্রী ছিলেন ব্রহ্মকুমারী দেবী। উনি ছিলেন ওই এ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারী। ওনার সাথে আমাদের খুবই ভাব ছিল। ওয়েলিংটনে ওনাদের বাড়ীতে মিটিং করেছি। রেণু চক্রবর্তী ওনার মেয়ে। মস্কোতে দু’বার দেখা হয়েছে—খালাম্মা-খালাম্মা বলে জাড়িয়ে ধরেছে। এখনও খালাম্মাই ডাকে। খুব ভাল মেয়েটি। এখনত ওনারও বয়স হয়েছে। এখন আবার ঐ মৈত্রী সমিতির মেম্বার আছেন। কলকাতায় যে সোভিয়েত-ভারত মৈত্রী সামিতি আছে, তাতে উনি আছেন। আর এদিকে আমি বাংলাদেশ-সোভিয়েত মৈত্রী সমিতিতে আছি। মস্কোতে দু’বার দেখা হয়েছে, বুলগেরিয়ায় দেখা হয়েছে। যেখানে দেখা হয়েছে বলেছে যে, মা এখনও আপনার কথা মনে করেন।

যাই হোক, সেই সময় হিন্দু-মুসলমানেতে বেগম রোকেয়ার কাছে কোন ভেদাভেদ ছিলনা। সব সময় মেয়েরা একসাথে কাজ করেছে। নাহার ম্যাট্রিক পাশ করে এল, আর সেই সময় আমি প্রথমে এরোপ্লেনে চড়লাম। এরোপ্লেন চড়লাম বলে উনি আমাকে আর নাহারকে আর মিসেস রেশাদকে সম্বর্ধনা দিলেন একসাথে। ছেলেরাত চাইবেই যে তারা একটা বীরত্বসূচক কাজ করবে, কিন্তু মা যে ছেড়ে দিয়েছে ছেলেকে প্রথম এরোপ্লেন উড়তে এজন্য মিসেস রেশাদকে সম্বর্ধনা দিলেন। আর নাহারকে সম্বর্ধনা দিলেন এই জন্যে যে, এত বাধাবিপত্তির ভিতরে, পর্দার মধ্যে থেকে সে ম্যাট্রিক পাশ করেছে। আর আমাকে বললেন, ‘ফুলকবি’ তুইত এখন আসমানে উঠতে শিখেছিস, তোকে ত একটা মালা দিতে হয়, এই বলে আমার গলায় একটা মালা দিলেন। এই ওনার বাড়ীতে প্রথম সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান হয়। কত মানুষ ছিলেন, লেডী গজনবী ছিলেন, রেণু চক্রবর্তীর মা ছিলেন। এরা সবাই ছিলেন। সবাইকে দাওয়াত-টাওয়াত দিয়ে একত্রিত করে আমাদেরকে একেকজনকে মালা পরালেন উনি। বললেন যে আমার জীবনে যা পারি নাই তা তোরা করবি, আমি এইটা আশা করি।

তা উনি অবশ্য পরে এরোপ্লেনে চড়েছিলেন। উনি যা করেছেন তা কি আর আমরা করতে পারি? তবু উনি বলতেন, আমার স্বপ্ন তোদের মধ্যে থাকবে। আমি যা পারি নাই তোরা তাই করবি। তোরা মেয়েদের যা নিজস্ব স্বাধীনতা, মেয়েদের যে ব্যক্তিত্ব, মনুষ্যত্ব সেইটাকে জাগাবি। আমাদের দেশের মেয়েরা বড়ই নির্যাতিত, বড়ই উপেক্ষিতা। কেন মেয়েরা এরকম থাকবে? স্বামী, বাপ, ভাই, তাদেরকে নিয়ে আমাদের সংসার, আমরাত তাদেরকে বাদ দিয়ে চলতে পারিনা। সংসার ছেড়ে আমরা সমাজে যেতে পারিনা। সেই সংসারটা যাতে সুখের হয়, শান্তির হয় স্বচ্ছন্দের হয়, ভাইয়ের সাথে স্বামীর সাথে বাপের সাথে, বন্ধুত্বের ব্যবহার যাতে থাকে, সহযোগিতা যাতে থাকে, এই নিয়ে তোরা কাজ করবি। বলতেন, আমার স্বামী নাই, কিন্তু আমার স্বামী যখন ছিলেন আমি সহযোগিতা করে তার সাথে কাজ করেছি। এই কথা উনি বলেছেন। যখন মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায় তখন স্বামীর সঙ্গে যদি অন্তরঙ্গতা না থাকে, স্বামী-স্ত্রীর যদি একমত না থাকে, সেখানে বিরোধিতা হলেই সংসার নষ্ট হয়ে যায়। যতদিন বাপের সাথে থাকতে হয় ততদিন এরকম থাকতে হয় যাতে সংসার নষ্ট না হয়। ভাইয়ের কাছে থাকলে ভাইয়ের সঙ্গেও সেই। ভাই ছাড়া বাপ ছাড়া স্বামী ছাড়াত মেয়েদের সংসার-সমাজ নেই। সেই হিসাবে উনি বলতেন, বারবার এরকম করে যাতে সংসার নষ্ট না হয় তা দেখতে হবে। কিন্তু সমাজের কাজ করবে। সমাজ মানে কি? সংসার মানেইত সমাজ? সেই সমাজের উপেক্ষিত, অবহেলিত যে মেয়েরা তাদেরকে এইটা বুঝতে হবে যে, আমাদের আল্লাহতায়ালা পয়দা করেছেন সমান অধিকার দিয়ে। আমরাও মানুষ, এই মনুষ্যত্বটা জাগাবার জন্যই ওনার সমিতি ছিল।

উনি বলতেন যে বাপ ভাই না থাকলে সমাজের, সংসারের শান্তি কোথায়? বাপ থাকবে, ভাই থাকবে, স্বামী থাকবে, সন্তান থাকবে, তবেত একটা সংসার? সেই সংসার যাতে স্বচ্ছন্দে থাকে, সমাজ যাতে সুখী সমাজ হয়, সেটা গড়ার উদ্দ্যেশ্যেইত আমাদের কাজ। এইটা উনি বলেছেন। কত প্রবন্ধ উনি লিখেছেন, বারবার উনি এটা বলেছেন—নারী এবং পুরুষ সমাজের অঙ্গ। একটাকে ছাড়া আরেকটা কিভাবে চলে? একটা হাত-পা যদি পঙ্গু হয়ে যায় আরেকটা হাত-পা দিয়ে কি করতে পারে? কাজেই নারী এবং পুরুষ পাশাপাশি দু’জনেই তাদের মর্যাদা নিয়ে উঠে দাঁড়াবে। তবেইত একটা সংসার গড়ে উঠবে এবং সেই শান্তিপূর্ণ সংসার দিয়ে সমাজের কাজ করবে। আর নয়ত বিরোধিতা আর অশান্তি যেখানে আছে সমাজের কাজ করবে কি দিয়ে? আর এই নিয়ে উনি অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন, অনেক মিটিংএ অনেক বক্তৃতা দিয়েছেন। সভা-সমিতি করেছেন খালি এই কথা নিয়ে যে, নারী এবং পুরুষ যাতে একসঙ্গে থাকে এবং সংসারের মধ্য দিয়ে সমাজের সেবা করে। আর উনিত সেটাই করেছেন। ওনার স্কুলটাত তার পুরা সংসার ছিল। সেই সংসারের মধ্যে থেকে উনি সমাজের কাজ করেছেন। আর যে মেয়েরা, যে মহিলারা তার কাছে ছিল তাদেরকেত এই শিক্ষাটাই দিয়েছেন।

হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টানকে সেভাবেই দেখেছেন। আরেক টিচার ছিলেন সোগরা সবজেবাড়ী। আমরা সোগরাবাজী বলি। দিনরাত চিল্লাচিল্লি করতেন। ইয়ে সিগতি নেই—ওয়া সিখরাহী নেই—ওয়ো জবান আচ্ছা নেহি হ্যায়, উসকা লেখ আচ্ছা নেহি হ্যায়। তখন বেগম রোকেয়া বলতেন, বোন সব আস্তে আস্তে শিখবে। আর ওদেরকেত আমি জজ-ব্যারিষ্টার বানাতে চাইনা। আমার ইচ্ছা যে ওরা সংসারে শিক্ষিত হয়ে সংসারটাকে সুন্দর করে সমাজের কাজ করবেন।

বাঙ্গালীকে দুই চোখে দেখতে পারতেন না প্রথমে সেই মহিলা। শেষে বাঙ্গালীদের সাথে এত আপন। শিখাতে এসে নিজেও অনেক কিছু শিখলেন। শেষে আমাদেরকে কত আদর করলেন। আপন হয়ে শিখতেন আমাদের সাথে। তারপরে বেগম রোকেয়ার ছোট বোন হোমেরা। ওই হোমেরা আপার একটামাত্র ছেলে ছিল আমীর হোসেন। পঞ্চাশে যখন হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয় তখন একজন হিন্দুকে বাঁচাতে গিয়ে আমীর হোসেন প্রাণ দিলেন। ইনি নজরুলের কিছু লেখা ইংরেজীতে অনুবাদ করেছিলেন। কিন্তু হিন্দু-মুসলমানের যখন দাঙ্গা লাগল পঞ্চাশে, ঢাকায় সব গেল।

আমরা ছোট আপা বলতাম হোমেরা আপাকে। উনারা দুই বোনই ছিলেন। এক বোন দুই ভাইত আগেই মারা গেলেন। হোমেরা আপা বিধবা হয়ে বেগম বোকেয়ার কাছে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল-এ এলেন। উনি একটি মেয়ে ও একটি ছেলে নিয়ে বোনের কাছে থেকে ওই বয়সে লেখাপড়া শিখে ওইখানে আবার মাষ্টারী করতেন। তাঁর ছেলেকে উনি এমন শিক্ষা দিয়েছিলেন যে কলকাতায় দাঙ্গার সময়ত কাজ করেছেই, তারপরে যখন ঢাকায় এল হিন্দু-মুসলমানে আবার যখন পঞ্চাশ সালে দাঙ্গা লাগল, একজন হিন্দুকে বাঁচাতে গিয়ে সে নিজের প্রাণ দিল—এই নবাবপুরে রেলক্রসিং-এর ওখানে।

তা এই রকম শিক্ষা দিতেন উনি যে, মানুষ হিসাবে সবাইকে দেখবে। হিন্দু না, মুসলমান না, খৃষ্টান না, কিছু না। মেথর না, চামার না, সব মানুষ। উনার ঘর যে ঝাড়ু দিত, বাগান সাফ করত, ঐ জমাদারদের মেয়েকে, বউকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। বলতেন, ওরাওত মানুষ—শিখবেনা কেন? বিদ্যা সবার জন্য।

উড়িয়া মালীকে পর্যন্ত বাংলা শিখিয়েছেন। করহৌছি মৌছি বলত। বললেন আর বেটা আগে বল কি হয়েছে? হাসি-খুশী, এত হাসি-খুশীর মানুষ ছিলেন। উড়িয়া মালীর সঙ্গে বাংলায় বলতেন। কোন রাগ করে বলতেন না, হাসি-ঠাট্টা করে বলতেন। কারণ ওনার নিজেরও ত শ্রদ্ধা ছিল অন্য ভাষার প্রতি।

হ্যাঁ—উর্দু, ইংরেজী, বাংলা সব ভাল জানতেন। বলতেন ভাষা একটা শিখবোনা কেন? এত আন্দোলন হয়েছে, স্বদেশী আন্দোলন হয়েছে—কত মেয়েরা তখন তাঁর কাছে আশ্রয় পেয়েছে। উনি কত সাহায্য করেছেন। কিন্তু বলতেন যে, শিক্ষা কেন গ্রহণ করবনা? ওদেশে যা শিক্ষা আছে, উর্দু ভাষা বল, ইংরেজী ভাষা বল, বাংলা ভাষা বল—সব ভাষাতেহই ত শিক্ষার কিছু আছে।

উনি দেখতেন যে ভাষার মধ্যে দিয়ে কতদূর ওখান থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। ওদের কোনটা ভাল। এখনত আমাদের দেশে এসব অনেকটা এগিয়ে এসেছে। তখনকার দিনে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই যে লেখাপড়া শিখানো বা হাতের কাজ করা, এসবের চল ছিল না। তখন ইউরোপের যে মেয়েরা তাঁর কাছে আসতেন তারা হাতের কাজের, বয়স্কদের সেবা করা ইত্যাদি হোমের কথা বলতেন। তা উনি এসব নিয়ে নিজেও চিন্তা করতেন, বলতেন এসব ভাল কাজ। তারপর বিলাত থেকে তাঁর আত্মীয় যারা ফিরতেন তাদেরকে বলতেন। কি খালি টাই বাঁধতেই শিখেছ, বিলাতে আর কোন কাজ শিখে এসেছ কি? আর কিছু ওখান থেকে আনতে পার নাই। এ রকম করে উনি জিজ্ঞাসা করতেন। কি কি ভাল আছে, সমাজের অবস্থা কি? বলতেন যে, এই বয়সেত আর হজ্ব করতেও যেতে পারলাম না।

মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থার উপরে তাঁর খুবই আগ্রহ ছিল যে, মেয়েদের কিভাবে উন্নতি হতে পারে। আর পুরুষের মুক্তবুদ্ধি বিষয়ে বলতেন, পুরুষরাও যদি এগিয়ে দেয় তাহলে মেয়েদের অশিক্ষা দূর হয়। ভাই বলে উনি সম্বোধন করে বাবা বলে সম্বোধন করে বক্তৃতা দিয়েছেন, লিখেছেনওত। বলতেন, আমাদের আর বেঁধে রেখনা, শরীয়তের দোহাই দিয়োনা—শরীয়তে তোমরা দেখ, ধর্মের মধ্যে তোমরা দেখ যে, আমাদের কতখানি স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। এই ধর্মান্ধতার মোহে আমাদেরকে আর বন্দিনী করে রেখনা! মেয়েদেরকে আর বন্দিনী করে রেখনা। নিজের ধর্মের গূঢ়ার্থটা জান। ধর্মের দোহাই দেয়ার কথা শুনে মেয়েদের উপরে এরকম তোমরা অত্যাচার কোরোনা। কোরানে-হাদিসে আমাদের যতখানি স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে সেটা তোমরা আগে জান। ওই যে চারদেওয়ালের মধ্যে বন্ধ করে রাখা তাকে কি পর্দা বলে? পর্দা নিজের মনের মধ্যে। সারা দুনিয়ার মহিলারা কি করে চলাফেরা করছে? সারা দুনিয়ার মহিলারা কি করে এগিয়ে আসছে? তোমরা পথটাকে সুগম করে দাও। তোমাদের বাদ দিয়ে ত আমরা চলতে পারি না। এটা তিনি একশ বার বলতেন।

উনিও হঠাৎ করে মারা গেলেন। তাঁর জন্ম ১৮৮০-র ৯ ডিসেম্বর, আর মারাও গেলেন ১৯৩২-এর ৯ ডিসেম্বর তারিখেই। রোজা-নামাজে সবদিক দিয়ে খুব নিষ্ঠাবান ছিলেন। খুব পানও খেতেন। মিটিংএ গেলে, বলতেন, ‘এই আমি ত পান আনি নাই, তুই একটা পান আনিস নাই? দে একটা দে, চুপে চুপে খাই।’ কিন্তু ক্লাশে যাবার সময় বা বাচ্চাদের সামনে কোনদিন পান খেতেন না।

আর তখনত আমাদের টেলিফোনের অত ব্যবহার ছিলনা, তাই একটা স্লিপ লিখে পাঠিয়ে দিতেন। আজকে পিঠা বানিয়েছি, আসিস। নাহারকে আর আমাকে বড় ভালবাসতেন। আর ছুটির সময় সবাইকে নিয়ে কোন না কোন জায়গায় উনি যেতেন। যদি না বেড়ালে, দুনিয়া না দেখলে, একটা গণ্ডির মধ্যে থাকলে তবে তো কিছুই শিখবেনা। বলতেন, আগে শিখতে হবে প্রকৃতির কাছ থেকে। গ্রামে যেতেন, দার্জিলিং যেতেন, শিলং যেতেন, পায়রাবন্দ যেতেন। তবে পায়রাবন্দের মানুষ তাকে দুই চোখে দেখতে পারত না। উনি ত সমাজ ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন। তবে সমাজকে ত উনিই বড় করে তুললেন। এখন সেই পায়রাবন্দে তাঁর নামে স্কুলও হয়েছে, ইনশাল্লাহ্ চলছে ভাল।

তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে ডাকবাংলোর জন্য ওই জমিটা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এক হাজার টাকা দিয়ে কিনে দিয়েছে। যে দখল করে ছিল তাকে এক হাজার টাকা দিয়ে মহিলা পরিষদ থেকে আমরা জমিটা নিয়ে নিয়েছি। দেখি এখন তাঁর নামের একটা স্মৃতি যদি হয়। এরকম একজন মহীয়সী নারীর নাম কজনে জানে বাংলাদেশে? ডাকবাংলোটা বানালে অনেক লোক যাবে দেখতে, এখনও যায়। থাকবে একটা স্মৃতিসৌধ তাঁর পায়রাবন্দ গ্রামে, সবাই দেখবে যে ওখান থেকে একটা পায়রাবন্দের বন্দিনী পায়রা উড়ে এসে সারা দুনিয়াতে এখন ওনার নাম। উনি না হলে এই মেয়েরা আরও পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে থাকত।

আবার ফিরে আসি আমাদের পরিবারের কথায়। আমরা তখনও বরিশালে আছি। আমার ছোট মামা সৈয়দ ফজলে রাব্বী সাহেব তখন ঢাকায় পড়তে আসেন। এখানে তখন মোহাম্মদ কাশেম সম্পাদিত ‘অভিযান’ নামে একটি পত্রিকা বের হত। মামা আমার খাতাটা সাথে এনেছিলেন। তা থেকে কবিতা বেছে বেছে অভিযানে প্রকাশ করতে দিতেন। সেই সময়ে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকায় আসেন। অভিযানে লেখা দেখে তিনি নিজেই আমাকে উচ্ছ্বসিত ভাষায় প্রশংসা করে ও উৎসাহ দিয়ে চিঠি লেখেন। আরও লেখেন যে, কলকাতায় নাসিরউদ্দিন সাহেব ‘সওগাত’ বের করেছেন। সেখানে যেন অবশ্যই আমি লেখা পাঠাই। কবির স্নেহসিক্ত সে চিঠি আমার কাছে আজ আর নাই। কিন্তু সেই যে প্রথম লেখা কবিতা ‘সওগাত’-এ পাঠালাম, তা ছাপাও হল। তখনও, না নাসিরউদ্দীন সাহেব না কবি নজরুল ইসলাম কারো সাথে দেখা হয়নি।

এরপর আমরা চরভাঙ্গা, ঘরভাঙ্গা হয়ে কলকাতা এলাম। সেটা তিরিশের কথা। ‘সওগাত’-এ লেখা দিলাম। কাজী নজরুল ইসলাম কৃষ্ণনগরে থাকতেন। মাঝে মাঝে সওগাত অফিসে আসতেন। এসে শুনলেন আমি কলকাতায় আছি। হঠাৎ এক দুপুরে প্রাণোচ্ছ্বাসের প্লাবন ছড়িয়ে আমাদের বাসায় এসে উপস্থিত। বাসায় তখন আমার মা ও আমি ছাড়া কেউ ছিলনা। আর তাঁর ‘সুফিয়া’ ডাক শুনে আমরা ত হতভম্ব। কোনদিন বাইরের কোন পুরুষের সাথে দেখা করিনি। কিন্তু এঁর আহ্বানে সাড়া না দিয়ে কি থাকতে পারি? কী আনন্দে কী লজ্জায় বুক কাঁপা অবস্থায় তার সামনে আসতেই তিনি বল্লেন—আরে। এই তুমি। আমিত ভেবেছিলাম কী জানি এক মস্ত বড় লেখিকা। এ ত দেখি একটা পুতুল। তোমাকে আমি লুফব। কী ভয়ানক। আমি ত ভয়ে পিছিয়ে এলাম। নেবেন নাকি কোলেই তুলে। কী হাসি আর কী মমতা ভরা কণ্ঠে লেখার তারিফ করলেন। এর মধ্যে আমার স্বামীও বাইরে থেকে এসে গেলেন, নাশতা তৈরী করে দিলাম। তাতেও খুশী। বল্লেন, লেখার তারিফ বেশী করব না, নাকি রান্নার তারিফ বেশী করব বুঝতে পারছিনা। সুফু। আমার বোন নেই। তুমি আমাকে দাদু ডাকবে আর ‘তুমি’ বলবে। একদিনে এত অকপট স্নেহ মমতা উদারতায় কাছে টেনে নিলেন যিনি তাঁকে ভক্তি না করে পারি?

কবি দাদুর মাধ্যমেই সওগাত সম্পাদক নাসিরউদ্দীন সাহেবের বাড়ী ১১নং ওয়েলেসলী স্ট্রীটে যাওয়া-আসার সূত্রপাত। সেই থেকে নাসিরউদ্দীন সাহেব আমার সুখে-দুঃখে বিপদে-শোকে অগ্রজের ভূমিকা পালন করে সদাসতর্ক স্নেহ দৃষ্টি দিয়ে সাহিত্যসাধনায় আমাকে নিয়োগ রেখেছেন। একথা আমি কখনও ভুলব না। দুর্দিনে আরও যারা আমার কাছে এসেছিলেন, যেমন কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন, কবি বেনজীর আহমদ, এঁরা আমার দুঃখের দিনে আল্লাহর দেওয়া সাথী হয়েছিলেন। কবি বেনজীর আহমদ বেনুভাই আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ সাঁঝের মায়া ও কেয়ার কাঁটা প্রকাশ করে আমাকে যথেষ্ট উৎসাহিত এবং আর্থিক সহায়তা করেছেন। অকপট অমলিন তাঁদের স্নেহ-মমতার কথা আমার স্মৃতিতে অমূল্য রত্নের মত উজ্জ্বল।

কবিসম্রাট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহও কি কম পেলাম? তাঁর জন্মদিনে তাঁকে একটা কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলাম। তিনিও সুন্দর করে ক’টি কবিতার লাইন লিখে আমাকে পাঠালেন। সাদর আমন্ত্রণ জানালেন কলকাতায় তাঁর জোড়াসাঁকোর বাড়ীতে যেতে। গেলাম একদিন বোরখা পরে। সে মূর্তি দেখে তিনিও বলেছিলেন, তুমি এত ছোট, এত কচি, ভেবেছিলাম বেশ ভারিক্কি কোন মহিলা হবে তুমি। আর যখন শুনলেন বরিশালে আমার বাড়ী তখন বলেছিলেন, ‘তুমি আমার বেয়াইয়ের দেশের মানুষ। তোমার সঙ্গে আমার মধুর সম্পর্ক আর মধুর মিষ্টি তুমি।’

লজ্জায় আমার যে কি অবস্থা হয়েছিল। তিনি ছিলেন সুরসিক সুন্দর মনের মানুষ। কতবার তাঁর বাড়ী গিয়েছি। তাঁর নিজের অভিনয় করা নাটক দেখতে আমাকে ডেকেছেন। নিজে হাতে নাম লিখে তাঁর ‘গোরা’ বইখানা আমাকে উপহার দিয়েছেন। এ কি কম সৌভাগ্য! তাঁর বাড়ীতেই দেখা হয়েছে নেতাজী সুভাষ বোসের সঙ্গে। মৈত্রেয়ী দেবীর সঙ্গে। তাঁর পুত্রবধূর সঙ্গে। কত সুখস্মৃতি সেসব। অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন আমার লেখার, উৎসাহ দিয়েছেন। শান্তিনিকেতনে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু তখন কি আমার সে অবরোধ ঘুচিয়ে যাবার উপায় ছিল? বন্দিনী খাঁচায় পাখীর শুধু পাখা ঝাপটানোই সার হয়েছে। বাধার পর বাধা। কত যে নিগড় ভেদ করে এ জীবন মুক্তি লাভ করতে চেয়েছে। কিন্তু পারেনি। পারেনি বলেই আজ মনে হয়, যদি পারতাম লেখাপড়া করতে, যদি পারতাম মুক্ত ভুবনে বিচরণ করতে, তবে পারতাম লিখতে মনের মত সুন্দর করে। জীবনের শ্রেষ্ঠ দান রেখে যেতাম সবার জন্য। কিন্তু পারলাম না। সাধ থাকলেও সাধ্য হলনা কাউকে কিছু দেবার।

ভাগ্যের বিপর্যয়ে যখন বিত্তহীনা আশ্রয়হীনা সন্তানটিকে ও মাকে নিয়ে কলকাতা করপোরেশনে সামান্য মাইনেতে কাজ করি, তখন সহৃদয়া মরিয়ম আপার সাহায্য দান, আশ্রয় দান, সে কথা ভুলবনা। তখনই ফররুখ এসেছিল মা ডেকে; উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত অবুঝ এক কিশোর। কী করে আমাকে বাঁচাবে আমাকেই জিজ্ঞাসা করত। সান্ত্বনা দিয়ে আশা দিয়ে চিঠি লিখতো। সুসাহিত্যিক আবুল ফজল, সবার শ্রদ্ধেয় অদ্বিতীয় লেখক (মাহবুবুল আলম) মাহবুবদার কথা মনে পড়ে। কত স্নেহ প্রীতি মমতা ভরসা দানে ভরা সেসব আশ্বাসবাণী। হিন্দু-মুসলিম সাহিত্য রসিকজন সমবেদনা সহানুভূতি জানিয়েছেন। লেখা প্রকাশ করেছেন। কিছু পারিশ্রমিক দিয়েছেন। হয়ত দয়া করে মায়া করে। তখন তা না নিয়েও উপায় ছিলনা। সকৃতজ্ঞ চিত্তে আজও তাঁদের স্মরণ করি।

১৯৩১ থেকে ১৯৩৮ যে কী সর্পিল সংঘাত সংগ্রামময় জীবনধারা বয়ে চলেছিলাম দুঃস্বপ্নের মত। আবার ওরই মধ্য দিয়ে এসেছে স্নেহ, প্রেম, মমতা, ভালবাসা, সান্ত্বনা, কত হারানোর ব্যথা, কত পাওয়ার আনন্দ, বিচিত্র মানুষের মন ও জীবন। আবার সচেতন দৃষ্টি মেলে দেখলাম মারী মড়ক মন্বন্তর। যুদ্ধ-সংগ্রাম, মানুষের স্বাধীনতার প্রাণপণ প্রচেষ্টা, প্রতিটি মানুষ যোগ দেয় কর্মে, আত্মমর্যাদায় বাঁচতে চেয়ে। তাই দেখলাম, এল দুকূলপ্লাবী স্বাধীনতা-সংগ্রামের প্লাবন। নেতাজীর সংগ্রাম ‘দিল্লী চলো।’ স্লোগানে মুখরিত ভারত। এল যুদ্ধ। জাপানের হিংসাত্মক সংগ্রামে কত প্রাণাহুতির চিত্র। কত মানুষের নির্যাতন, অপমান, অত্যাচার, ধ্বংসলীলা। এল ‘পাকিস্তান’ আন্দোলন। কী বিরাট বিপুল প্রাণবন্ত সে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার দাবী।

সাইমন কমিশনের পর ক্রিপ্‌স কমিশনেরও কত আন্দোলন আলোচনায় কত প্রাণনাশ হত্যাকাণ্ড, রক্ত বিনিময়ে এল ‘পাকিস্তান’। মুসলমানদের সর্বহারার অসীম আশা-প্রত্যাশা ভরা পাকিস্তান। কিন্তু সে স্বপ্নের স্বর্গ, রক্তস্নাত লাখো শহীদের পুত্রহীনা পিতামাতা, স্বামীহীনা নারী, স্বজনহীন মানুষের হাহাকারের হাওয়ায় অধীনতা দূর করা পাকিস্তানও ছিলনা পথের দিশা। দেশ বিভাগের পর যারা দেশ গড়ার ভার নিলেন তারা মোহাচ্ছন্ন, ভ্রান্ত, স্বার্থ-কুটিলমনা। লোভ হিংসা পদমোহের জগদ্দল পাথরে চূর্ণ হয়ে গেল সে সাধের সৌধ। যারা প্রাণ দিল তাদের কথা ভুলে গেল শাসকগোষ্ঠী।

যখন ঢাকায় এলাম ‘নারী শিক্ষা মন্দির’-এর প্রতিষ্ঠাত্রী স্বনামধন্যা লীলা নাগ (লীলা রায়) আমাদের লীলাদি তখন হিন্দু-মুসলমান মহিলাদের নিয়ে গড়ে তুলছেন ‘শান্তি কমিটি’। তাঁর ডাকে তাঁর সাথে যোগ দিলাম। ‘তখনকার দিনের এম. এল. এ. আনোয়ারা খাতুন, ইনুদি, ডলিদি আরও অনেক মহিলা এসে ঢাকার শহরতলী ছাড়িয়ে দূর গ্রাম বন্দর গঞ্জে শান্তি কমিটির কাজে যোগ দিলেন। যারা যে দেশে আছেন, যখন নিজের দেশকে গড়ে তুলতে হিংসা দ্বেষ অভাব দুঃখ দারিদ্র্য ভুলে কাজে এগিয়ে আসেন, তখনই টের পাওয়া যায় শান্তি নিরাপত্তা স্থাপন করতে মেয়েদের মায়েদের ভূমিকাই প্রধান। সর্বহারা ঘরহারা স্বজনহীনা স্বামী পুত্রহীনা মায়েদের বুকের তপ্ত অভিশাপ আকুল কান্না কটু বাক্য সহ্য করতে হয়েছে। কান্নায় কান্না মিশিয়ে, হাসিতে হাসি মিশিয়ে দুঃখের কাহিনী শুনে শুনে কত প্রহর কত গভীর রাত হয়ে গেছে। অসীম ধৈর্য ছিল লীলাদির। বলতেন, ওদের সাথে না মিশলে, সমব্যথী না হলে ওরা আমাদের কথা শুনবে কেন? এই একটা শিক্ষা তাঁর কাছে পেয়েছি। এবং আজও সেই শিক্ষার জন্যই আমি আন্তরিকভাবে যেটুকু পারি সমাজসেবায় অংশ নিয়ে, দুঃখীদের সাথে দরিদ্রদের সাথে মিশতে পারি।

পাকিস্তানের শুরুতেই মাতৃভাষার উপর আঘাত এল। রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। অবশ্য শায়েস্তাবাদের আমাদের পরিবারেরও তখনকার ভাষা ছিল উর্দু। কিন্তু আমাদের রক্ত মাংস অস্থি মজ্জায় যে ভাষা মিশে গেছে তা বাংলা। বাংলার ভাষা, বাংলার আকাশ বাতাস মাটি পানিতে এ দেহ পুষ্ট। এর প্রকৃতির শোভায় চোখ জুড়ায়। এর গানে সুরে সংস্কৃতিতে আমাদের গৌরব, একে ছেড়ে কি বাঁচা যায়? বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন পৃথিবীর বুকে এক নতুন ইতিহাস। বিস্ময়। বাঙ্গালীর ছেলেমেয়েরা মরতে ভয় পায় না। বাংলার মা তার ঐতিহ্য বজায় রাখতে কুণ্ঠিত নয়।

এল ৮ই ফাল্গুন। ১৯৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারী, অমর একুশে। গৌরবোজ্জ্বল শহীদ দিবস। স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী দেখলো বাঙ্গালীর বিক্রম, তার আত্মত্যাগ, মেয়েরা মায়েরা বধূরা আর শুধু শোকাকুলা নন। তারা সাহসিকা। পথে পথে শোকমিছিল। নগ্নপদে কচি বাচ্চার হাত ধরে পুলিশের আক্রমণ তুচ্ছ করে পথে বের হলাম আমরা। হার মানতে বাধ্য হল পশুশক্তি নিষ্ফল আক্রোশে ফুঁসতে ফুঁসতে।

এল রবীন্দ্র শতবার্ষিকী। অজুহাত পেল মূর্খের দল। নিষেধ জারী করতে তৎপর হয়ে উঠেপড়ে লাগল রবীন্দ্র শতবার্ষিকী বন্ধ করার জন্য। রাজধানী ঢাকা থেকে গ্রামেগঞ্জে মফস্বলে ছড়িয়ে পড়ল অর্বাচীন দলের এ অবিশ্বাস্য আদেশের কথা। রাজধানীর গুণী সুধীজন তরুণ কিশোর দল বিক্ষুব্ধ, বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলো একান্ত অযোগ্য আমার কাছে তখনকার দিনের শিল্পী সাহিত্যিক সমাজসেবীরা এসে নানারূপ পরিকল্পনায় রবীন্দ্রজয়ন্তী অবশ্য পালন করার প্রতিজ্ঞা শপথ গ্রহণ করলেন। সরকার তা শুনে আমার বাড়ীতে তৎকালীন অনেক পদস্থ কর্মচারী, উপদেষ্টা, ধর্মীয় ব্যক্তি পাঠাতে লাগলেন। আমার স্বামী তখনও সরকারী চাকুরে। কিন্তু তিনিও উৎসাহিত হয়ে আমাদেরকে সমর্থন করলেন, কত যে বাধা-ব্যাঘাতের মধ্য দিয়ে অসম সাহসে ঝাঁপিয়ে পড়লাম সে আন্দোলনে। মহাসমারোহে পালিত হল রবীন্দ্র শতবার্ষিকী। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী সাহেবকে দিয়ে উদ্বোধন করানো হল সে অনুষ্ঠান। তারপর সারা বাংলাদেশে চট্টগ্রাম থেকে সিলেট, রংপুর দিনাজপুর বগুড়া থেকে বরিশাল পর্যন্ত চলল মাস ধরে সে উৎসব। তারপর থেকে বছরে বছরে প্রতিপালিত হয়েছে রবীন্দ্র জয়ন্তী, নজরুল জন্মতিথি।

সিলেটের আমীনুর রশীদ চৌধুরীর বাড়ীতে কাজী মোতাহার হোসেন সাহেব, গোবিন্দ দেবসহ এসেছি। দুইজন স্বভাবে শিশু, শ্রদ্ধেয় কাজী সাহেব সুটকেস এনেছেন, চাবি আনেননি। শ্রদ্ধেয় গোবিন্দ দেব পাঞ্জাবী একটা গায়ে দিয়ে এসেছেন মাত্র, আর ধুতিটি পরনে। কত গৌরবের কত যে আনন্দময় নির্ভয় উল্লাসময় সে দিন রাতগুলো কেটেছে। কত ছেলেরা কত মেয়েরা কাছে এসেছে, কত গুণী সুধীজন কাছে টেনে নিয়েছেন স্নেহের দানে। সাহস দিয়ে আশ্বাস দিয়ে উৎসাহ দিয়ে আমাকে ধন্য করেছেন তা কি কখনো ভোলা যায়? চট্টগ্রামে ৭ দিন ধরে রবীন্দ্রজয়ন্তী উৎসব হয়েছে। সেখানে প্রসিদ্ধ লেখক মাহবুব-উল-আলম সাহেব, ফজল সাহেব, বিনোদ দা এবং তখন সেখানে ছিলেন আবদুল বারি মালিক সাহেব, ফিরোজ বারী, এরা তৎপরতার সঙ্গে সরকারী বাধা-নিষেধ সত্ত্বেও বিপুল সমারোহে সে উৎসব পালন করেছিলেন।

এই সময়েই আমরা অনুভব করি কণ্ঠশিল্পীর রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, বিশেষত আমাদের বাংলাদেশের যে আসল পল্লীগীতি তারও সুষ্ঠুরূপ আমরা বেতারে বা শহরে গায়কদের কণ্ঠে পাইনি। তাই একটি সঙ্গীত বিদ্যায়তন ‘ছায়ানট’-এর প্রতিষ্ঠা হল। ঢাকার বাইরেও কত গুণী সুধীজন যে এর ব্যাপারে উৎসাহ দিয়ে, সাহায্য ও সহযোগিতা দিয়ে ‘ছায়ানট’ গড়ে তুলেছেন, আজ ভাবলে বেশ বিস্মিত প্রশ্ন জাগে সেই প্রাণবন্ত সুন্দর আনন্দঘন মনগুলি কোথায় গেল? এখন কেন হয় না তেমন নিষ্ঠায় একতায় আন্তরিকতায় একটি প্রতিষ্ঠান একটা সেবামূলক সংগঠন।

আগেই বলেছি এ আমার জীবনী নয়। সুদীর্ঘকাল পরিক্রমার সামান্য ইঙ্গিত। অহংকার মোহান্ধ ক্ষমতালোভী অর্বাচীন দলের সদর্প উত্থান আর ভয়াবহ রূপে তার পতনের ইতিহাস কত যে দেখতে হল। তারই মধ্যে বাংলাদেশের উপেক্ষিত অবহেলিত নারী সমাজ ও শিশু সকলে মিলে উয়ারী মহিলা সমিতি, চাঁদের হাট শিশু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে লাগল। আজকের প্রসিদ্ধ নৃত্যশিল্পী লায়না হাসান রোজী চাঁদের হাটের সৃষ্টি। দৌলতন নেছা, রাইসা হারুণ বহু সাধনায় উয়ারী মহিলা সমিতি গড়ে তুলেছিলেন। শিশু প্রতিষ্ঠানের জন্য মুকুল ফৌজ ঢাকায় আসার পর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। নতুন করে গড়ে উঠল কচি কাঁচার মেলা। আমি বহুদিক দিয়ে বহুজনের দানে ধন্য, কিন্তু কচি কাঁচার মেলা আমার গৌরবের। সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে তখনকার দিনে পাকিস্তান এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও পুরস্কার লাভে কচি কাঁচা আজ শিশুকল্যাণমূলক একটি বলিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান। আমাদের বাড়ীর আমগাছতলায় ক’টি শিশু নিয়ে যে চারাগাছটি রোপিত হয়েছিল আজ তা শাখা-প্রশাখায় বিরাট-বিশাল। রোকনুজ্জামান দাদাভাইয়ের অক্লান্ত চেষ্টা ও পরিশ্রমের এ ফসল।

পাকিস্তানী সামরিক শাসন, তার পতন, শেখ মুজিবের আগরতলা মামলা, তার উত্থান সর্বজন সর্বদেশময় মুজিব জয়গান, সেও আর রইলনা। হিন্দুস্তান পাকিস্তান কিছুই যাদের জানা ছিলনা, সেই মানুষেরা, নিরন্ন নিরস্ত্র মানুষেরা যুদ্ধ করল, প্রাণ দিল। মায়েরা বোনেরা ইজ্জত দিল। এল বাংলাদেশ, স্বাধীন বাংলাদেশ, কত গৌরব কত ব্যথার কত অশ্রুতে গড়া এ বাংলাদেশ। দেশের কৃতী সন্তানেরা জ্ঞানী গুণী শিল্পী প্রাণ দিল কাদের হাতে? আল বদর, আর শামসদের হাতে। লিখতে পারিনা। জানিনা বাংলার ইতিহাস কে লিখবে, কারা লিখবে। বন্যা দুর্ভিক্ষ মহামারী, পথে পথে কঙ্কালের মিছিল। মৃতের স্তূপ। যারা শত্রু ছিল তারা মিত্র, যারা মিত্র ছিল তারা শত্রু। ’৬৬ সন থেকে সোভিয়েত মৈত্রী সমিতির জন্য বাংলাদেশের গ্রামে, গ্রামে-গঞ্জে-বন্দরে ঘুরে বেরিয়েছি। মহিলা পরিষদের গ্রামবাংলার অশিক্ষিতা স্বল্পশিক্ষিতা মা-বোনেরা পথে পথে বুভুক্ষুর মুখে গ্রাস তুলে দিয়েছে, নিরক্ষরকে শিক্ষা দিয়েছে, এসেছে সেবায়। এগিয়ে এসে কাজের গুরুভার মাথায় তুলে নিতে দ্বিধা করেনি। এ সংগঠনের সভানেত্রী হয়েছি ’৬৯ সাল থেকে। আজও এই দায়িত্ব পালন করে চলেছি। নির্যাতিত মেয়েদের জন্য যদি পারি কিছু করতে। অত্যাচারিতা ধর্ষিতা লাঞ্ছিতা মা-মেয়েরা একটু আশ্রয়, একটু নিরাপত্তার জন্য এখনও মাথা কুটছে। একটু শান্তি আসুক। আবার বাংলার মানুষেরা মাথা তুলে দাঁড়াক, মানুষের মত বাঁচুক। রিলিফ সাহায্য ভিক্ষান্নে পুষ্ট মেরুদণ্ডহীন এই জাতি নিজের ঐতিহ্য নিয়ে বেঁচে উঠুক।

——–
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com