হেমিংওয়ে: নতুন করে বিতর্কে

ফখরুজ্জামান চৌধুরী | ২৬ মে ২০১১ ১১:৫৪ অপরাহ্ন

বিশ শতকের অন্যতম সেরা এবং আলোচিত মার্কিন ঔপন্যাসিক, গল্পকার আর্নেস্ট হেমিংওয়েকে ঘিরে নানা রকম কল্পকাহিনী শোনা যেতো তার জীবদ্দশায়। ধনতান্ত্রিক দেশের লেখক হয়েও তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন প্রতিবেশি দেশ কিউবায়, যার শাসন ব্যবস্থা ছিলো পুরো দস্তুর সমাজতান্ত্রিক; তার দেশের চক্ষুশুল!

কিউবাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বরাবর জেনে এসেছে বিষফোঁড়া হিসেবে। ক্ষমতাদর্পী মার্কিন প্রশাসন বারবার সুযোগ খুঁজেছে যে কোনো ছলচাতুরিতে কিউবার ওপর হামলা চালাতে। যখন সোভিয়েত রাশিয়া ছিলো বিশ্বের দ্বিতীয় মহাশক্তি, কিউবা তার সমর্থন পেয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রায়শঃই বিরক্তি ও ক্ষোভের কারণ হয়েছে।

hemingway_fidel.jpg………
আর্নেস্ট হেমিংওয়ে এবং ফিদেল ক্যাস্ট্রো
………

এহেন বিশ্বরাজনীতির রেষারেষির মধ্যেও আর্নেস্ট হেমিংওয়ে আনন্দ খুঁজে পেতেন কিউবার সমুদ্র সৈকতে মাছ শিকার করে, তৎকালীন কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিডেল ক্যাস্ট্রোর সখ্য লাভ করে। দুই বন্ধু নাকি অবসর সময়ে কিউবার জাতীয় ‘এলকোহলিক পানীয় রম‘ খেতে খেতে বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে আনন্দ পেতেন।

১৯৫৪ সালে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন তার ক্ষীণতনু উপন্যাস ‘দি ওল্ড ম্যান ইন দি সি’-র জন্য, দারুণ হৈ চৈ পড়ে যায় বিশ্ব সাহিত্য জগতে। ‘মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বেশির ভাগ মতামতই ছিলো পুরস্কার প্রদানের বিরুদ্ধে!

এমনতরো বিতর্ক খুব উপভোগ করেছেন হেমিংওয়ে। বিতর্কের মধ্যে বসবাস করতেই বুঝি আনন্দ পেতেন তিনি।

এক বেহিসেবি বোহেমিয়ান জীবনের অধিকারী হেমিংওয়ে জন্ম সূত্রে মার্কিনী হলেও জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন বিদেশে–প্যারিসে, স্পেনে এবং কিউবায়।

প্যারিসের পটভূমিতে লেখা তার গল্প-উপন্যাস তাঁকে লেখক হিসেবে অধিক মান্যতা দিয়েছে। স্পেনের গৃহযুদ্ধের রিপোর্টিং করতে স্পেনে যাচ্ছেন তিনি। বন্ধু ডন পাসোসের সঙ্গে এই সময় তার সম্পর্কচ্যুতি ঘটে, রিপোর্টিং-এর বিষয়বস্তু নিয়ে। তিনি চেয়েছিলেন যুদ্ধে ফ্রাঙ্কো বাহিনীর নৃশংসতার কথা বেশি করে লিখতে। প্রজাতন্ত্রীদের প্রতি ছিলো তার দুর্বলতা।

আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে সারাজীবন বিতর্কের ছায়ার নিচে বসবাস করেছেন। ১৯৬১ সালের ২ জুলাই নিজের শট গানের গুলিতে সাইডাহোতে আত্মহননের মধ্য দিয়ে জীবনাবসান ঘটালে বিতর্ক চলে আনেক দিন। শেষ দিকে কী কারণে তিনি মানসিক দুশ্চিন্তায় ভুগতেন, মনোবৈকল্যের কারণে কেন মেয়ো হাসপাতালে তাকে বৈদ্যুতিক শক নিতে হয় নিয়মিত, এসব নিয়ে প্রচুর বিতর্ক দেখা দেয় হেমিংওয়ে ভক্ত ও গবেষকদের মধ্যে।

একটা সময়ে সব বিতর্কের ওপর বিস্মৃতির ধুলো জমে। মাত্র ৬১ বছরের জীবনে (জন্ম ২১ জুলাই, ১৮৯৯) সৃষ্ট তাঁর সাহিত্যকর্ম সময়ের প্রহার এড়িয়ে তার উজ্জ্বলতা ধরে রাখে।

সম্প্রতি আবার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন হেমিংওয়ে। এবারে বিতর্কের কারণ তার একটি উপন্যাসের নতুন এবং সংশোধিত সংস্করণ নিয়ে।

first-marriage-to-elizabeth-hadley-richardson.jpg
আর্নেস্ট হেমিংওয়ে এবং এলিজাবেথ হেডলি রিচার্ডসন

১৪ জুলাই ২০০৯ (মঙ্গলবার) আন্তর্জাতিক সার্কিটে তার একটি উপন্যাসের সংশোধিত, সংযোজিত সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার কথা জানা গেলো ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন ও আসাহি শিম্বুন যুক্ত প্রকাশনার ১৩ জুলাইয়ের সংস্করণে।

১৯২০ সালে পারিসে যাপিত জীবনের পটভূমিতে লেখা হেমিংওয়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দি মুভেবল ফিস্ট্’-এর সংযোজিত সংস্করণটি প্রকাশিত হওয়ার প্রেক্ষিতে এর নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

একটি ক্লাসিক ধরণের লেখায় পরিমার্জন, পরিশীলন কিংবা সংযোজন-বিযোজন করার অধিকার কারো আছে কিনা। বিতর্ক এই প্রশ্নে।

‘দি মুভেবল ফিস্ট্’ উপন্যাসটি এর প্রকাশক চার্লস স্ক্রিবনারস সন্স প্রকাশ করে হেমিংওয়ের মৃত্যুর তিন বছর পরে। পাণ্ডুলিপি জীবদ্দশায় প্রস্তুত করেছিলেন হেমিংওয়ে নিজেই। প্রকাশিত হওয়ার পঁয়তাল্লিশ বছর পর সংশোধিত সংস্করণটি প্রকাশ করছে চার্লস স্ক্রিবনারের উত্তরাধিকারী প্রকাশনা সংস্থা স্ক্রিবনার।

‘সংযোজিত’ সংস্করণ সম্পাদনা করেছেন হেমিংওয়ের দৌহিত্র স’ন। ভূমিকা লিখেছেন হেমিংওয়ের তিন সন্তানের (সকলেই পুত্র) মধ্যে একমাত্র জীবিত সন্তান প্যাট্রিক (১৯২৮–)।

এই নতুন সংস্করণ সংযোজন করা হয়েছে মূল সংস্করণে বাদ দেয়া নয়টি অনুচ্ছেদ এবং নতুন সমাপ্তি। নতুন নয় অনুচ্ছেদ পড়লে পাঠকেরা বুঝতে পারবেন, কোন পরিস্থিতিতে এবং কী কারণে প্রথম স্ত্রী এলিজাবেথ হেডলি রিচার্ডসনের (দাম্পত্যজীবন: ১৯২১-১৯২৭) সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিলো হেমিংওয়ের।

ernest_hemingway_300×300.jpg………
আর্নেস্ট হেমিংওয়ে এবং পউলিন ফেইফার, ১৯৩৪
………

প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পরে হেমিংওয়ে বিয়ে করেন প্যাট্রিকের মা এবং স’নের মাতাবহী পলিন ফেইফারকে (১৯২৭-১৯৪০)। ফেইফার সখ্য গড়ে তুলেছিলেন এলিজাবেথের সঙ্গে। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি হন বান্ধবীর ঘর ভাঙ্গার কারণ।

ফেইফারের বংশধররা হয়তো নতুন সংস্করণের প্রকাশনার তাগিদ বোধ করেছেন পারিবারিক কারণে। তাদের ধারণা, নতুন সংস্করণ পড়লে পাঠক-সাধারণ ফেইফার সম্পর্কে তাদের ধারণা পুনর্মূল্যায়ন করবেন। পারিবারিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার প্রয়োজনে ক্লাসিক রচনা পরিবর্তন কতোটা নৈতিক এবং যৌক্তিক এই বির্তক ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

টোকিওর প্রাণকেন্দ্র শিন্জুকুর বনেদি বইয়ের বাজার কিনোকুনিয়ায় প্রকাশনা-নির্দিষ্ট তারিখের পরের দিন, বুধবার (১৫ জুলাই), বইটি খোঁজ করেও পাইনি। বইয়ের দোকানের কর্তৃপক্ষ জানেন না, কবে বইটি আসবে, যদিও আন্তর্জাতিক সার্কিটে প্রকাশিত বই একই দিনে তারাও পেয়ে থাকেন। পেলে, দু’টি সংস্করণ মিলিয়ে দেখা যেতো, পারিবারিক প্রয়োজনে একটি ক্লাসিক উপন্যাসে কী পরিমাণ পরিবর্তন আনা হয়েছে!

ইমেইল: fzamanchow@gmail.com
লেখকের আর্টস প্রোফাইল: ফখরুজ্জামান চৌধুরী

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর — মে ২৭, ২০১১ @ ১২:২০ পূর্বাহ্ন

      এটি সর্বাংশেই অনৈতিক একটা কাজ। কোনো রচনাই লেখক বিহনে পরিবর্তন একটা বড়ো মাপের অপরাধ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফৌজিয়া খান — মে ৩১, ২০১১ @ ২:৪৭ অপরাহ্ন

      মরে গেলে আমি কী ভেবেছিলাম–তা আর কে মনে রাখবে?

      হেমিংওয়ের ছেলেরাও মনে রাখেননি। স্বার্থ হাসিলের জন্যে যা ইচ্ছে তা-ই তো করছে মানুষ। সে হেমিংওয়ে হোক কিংবা যদু-মধু-করিম হউক।
      কাজেই অনৈতিক যিনি বলছেন বা লেখক যে প্রশ্ন রেখে লেখা শেষ করেছেন–এইসব প্রশ্নের আদৌ কোনো দরকার আছে কি?

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com