আলাপচারিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এইচ. এন. ব্রেইলসফোর্ডের সঙ্গে

সাহানা মৌসুমী | ১২ মে ২০১১ ১১:২১ অপরাহ্ন

at-the-san-diego-exposition-1917.jpg
১৯১৭ সালে আমেরিকার সান দিয়েগো এক্সপোজিশনে রবীন্দ্রনাথ

[হেনরি নোয়েল ব্রেইলসফোর্ডের জন্ম ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে, ১৮৭৩ সালে; কিন্তু তিনি পড়ালেখা করেন স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ ও গ্লাসগোতে, তাঁর পিতার কর্মক্ষেত্রে। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যলয়ে গিলবার্ট ম্যুরে’র ছাত্র হিসাবে ক্লাসিক ও ইতিহাস পড়েন ব্রেইলসফোর্ড। পরে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগের স্বেচ্ছাসেবক প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন ১৮৯৫ সালে। ১৮৯৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে তিনি ফিলহেলেনিক লিজিয়ন-এ যোগ দেন। ফিলহেলেনিক লিজিয়ন হলো গ্রিকদের পক্ষে তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকা একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। এ সময় তিনি জেন এসডন ম্যালোচ-এর সাথে মিলে বিয়ে করেন। ১৯২১ সালে তাঁরা ডিভোর্স ছাড়াই স্থায়ীভাবে আলাদা হয়ে যান।

h-n-brailsfords-picture.jpeg……..
হেনরি নোয়েল ব্রেইলসফোর্ড (১৮৭৩–১৯৫৮)
………

ফিলহেলেনিক লিজিয়ন-এ থাকাকালে তিনি আহত হন। পরে তিনি ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান-এর রিপোর্টার হিসেবে ক্রিট, মেসিডোনিয়া ও বলকানে কাজ করেন। ১৯১২ সালে বলকান অঞ্চলে কাজ করার সুবাদে লেলিনসহ সোভিয়েত ইউনিয়নের বলশেভিকদের সাথে যোগাযোগ তৈরি হয়। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষের লোক ছিলেন, কিন্তু কখনো কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন না। এছাড়া ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল এবং ১৯৪৬ সালে ভারতে আসেন তিনি। এ সময় ব্রেইলসফোর্ড মহাত্মা গান্ধীর সাক্ষাৎকার নেন। ১৯৫৮ সালে ব্রেইলসফোর্ড মারা যান।

রবীন্দ্রনাথের সাথে ব্রেইলসফোর্ডের এই আলাপচারিতার সুনির্দিষ্ট স্থান-কাল জানা যায়নি। এটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন সাহানা মৌসুমী।–বি.স.]

—————————————————

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: ইয়োরোপ আমার মনে মূল যে ছাপ ফেলেছে সেটা অস্থিরতা আর নিরানন্দের। সর্বত্র দ্বন্দ্ব আর সন্দেহ। আলসেসের কাস্টমস হাউসের ঘটনাটা তারই নজির। সেখানে মানুষকে পশুর পালের মতো খাঁচার ভেতর ঠেসে দিয়ে আটকে রাখা হয়। আগের বার যখন জার্মানিতে আসি, ডার্মস্টাডে একই ধরনের জাতীয় দ্বন্দ্ব আরো প্রকটভাবে আমার চোখে পড়ে। বোঝা যায়, জাতিগত ঘৃণা এই মহাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে। ভিয়েনাতেও একই ঘটনা; একদিন শ্রমিকদের বিশাল মিছিল, তো পরের দিন মিছিল বিরোধীপক্ষের। বিরোধের কারণ বুঝতে পারিনি, কিন্তু এটুকু বুঝেছিলাম–এটা শ্রেণীযুদ্ধ। এই নিরানন্দ আর দ্বন্দ্ব সর্বত্র অনুভব করেছি।

germany-1930-rt.jpg
১৯৩০ সালে জার্মান যুবকদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ।

এইচ. এন. ব্রেইলসফোর্ড: তাহলে আপনি কি এই জাতিগত ঘৃণা আর শ্রেণীযুদ্ধকে একই নৈতিক মাপকাঠিতে বিচার করবেন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: না, হতে পারে শ্রেণীযুদ্ধ প্রয়োজন। এক অর্থে সঠিকও। সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রতিবাদ। কিন্তু ভিয়েনায় এই ধরনের বহিঃপ্রকাশের ঘটনা সভ্যতার অসুখী আর উদ্বিগ্ন চেহারাটাকেই প্রকট করে তোলে। আমার আরো মনে হয়েছে—আপনাদের সভ্যতায় আপনারা আর সন্তুষ্ট নন। সর্বত্রই অভিযোগের সুর। কয়েক শতাব্দীর মধ্যে এই প্রথম নিজেদের আর চারপাশের জগৎ সম্পর্কে ইংরেজদের ক্ষুব্ধ হতে দেখা গেল। এটি নতুন এবং বিস্ময়কর। এ দেশে এর আগে এরকম কখনো ঘটেনি। আপনাদের পুরনো আত্মতুষ্টি এখন আর নেই।

এইচ. এন. ব্রেইলসফোর্ড: হ্যাঁ, মার্কিনিরাই কেবল বাস করছে আশাবাদ আর সন্তুষ্টির ভেতর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: মার্কিনিদের কথা আর কী বলব। আপনাদের সভ্যতা সম্পর্কে আমাদের ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি আমার জীবদ্দশাতেই সম্পূর্ণ পালটে গেল। তরুণ বয়সে আমরা আপনাদের সভ্যতাকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতাম, ভালবাসতাম। বার্ক থেকে শুরু করে ম্যাথিউ আরনল্ড পর্যন্ত আপনাদের বড় বড় লেখকদের সাহিত্যকর্মে আমরা ডুবে থাকতাম। তাঁদের সভ্যতাকে বাড়াবাড়ি রকম শ্রদ্ধা করতাম। এখন বিষয়টা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। উল্টো প্রতিক্রিয়ার মাত্রাটাও হয়েছে চরম। তরুণ প্রজন্ম বিক্ষুব্ধ আর চরমভাবে বিদ্বিষ্ট। এরকম কেন হলো? আমার মনে হয় আপনাদের শিল্পবিপ্লবের বস্তুতান্ত্রিকতা এরই মধ্যে ভারতকেও গ্রাস করতে শুরু করেছে। সবখানে এর কালো ছায়া আমাদের আত্মাকে পিষে মারতে চাইছে। এখন আমরা আপনাদের এই বিত্ত-বৈভবের আরাধনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছি।

এইচ. এন. ব্রেইলসফোর্ড: ধন-লিপ্সার দিক থেকে এ শতাব্দীর অবস্থা কি আগের শতাব্দীগুলোর চেয়ে খারাপ?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: আমার তাই মনে হয়। প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্য আমরা জানি। গ্রামীণ সমাজেই এর প্রকৃত রূপ দেখা গেছে। ধন-সম্পদ অর্জন করা সেই জীবনের মূল উদ্দেশ্য ছিল না। যেমন গ্রামে কোনো পণ্ডিত বা গুরুমশাই এলেন, শিষ্যরা তখন তাঁকে ঘিরে বসত। তাঁরা ছিলেন কপর্দকহীন, কিন্তু সমাজের সচ্ছল মানুষেরা তাঁদের দেখাশোনা, খাওয়া-দাওয়ার ভার নিতে গর্ববোধ করত। সামাজিক বৈষম্য যে ছিল না তা নয়, তবে তা ছিল স্বাভাবিক বৈষম্যই। ধনীরা কখনোই তাদের ধন-সম্পদ কেবল নিজের কুক্ষিগত করে রাখত না। কেউ এরকম করলে তাকে সমাজচ্যুত হতে হতো। টাকাপয়সা সে সমাজে মোক্ষ হয়ে ওঠেনি।

এইচ. এন. ব্রেইলসফোর্ড: অগাধ সম্পদের মালিক হওয়াই যাদের লক্ষ্য–এ ধরনের মানুষ কি আমাদের সমাজেও হাতে গোনা ক’জন মাত্র নয়?

rabindranath-tagore-street-in-berlin.jpg…….
জার্মানির বার্লিন শহরে রবীন্দ্রনাথ-টেগোর-স্ট্রিট
……..
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: না, তবে আধুনিক সময়ে বিপুল সম্পদের কারণে একটা তফাত চোখে পড়ে। জাঁকজমক আর প্রাচুর্যের আড়ালে এর কদর্য রূপটি ঢাকা পড়ে যায়। এমনকি যাঁরা কখনো অনেক সম্পদের মালিক হওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবেনি, তাদেরও চোখ ধাঁধিয়ে, ভয় পাইয়ে দেয় এই বিত্ত-বৈভব। ঘুষের সঙ্গে এর ধরনধারনের অদ্ভুত মিল। কাউকে আপনি মাত্র পাঁচ ডলার ঘুষ নিয়ে সাধাসাধি করুন, সে রেগেমেগে তা প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু তাকে এক মিলিয়ন ডলার নিয়ে সেধে দেখুন। তাই আপনাদের সম্পদের বিশালতাই আসল ব্যাপার। এটা এক ধরনের আভিজাত্য এনে দেয়। তাই এটা শুধু ব্যক্তির অভিরুচির ব্যাপার নয়। আপনাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আপনাদের সমগ্র সভ্যতার লক্ষ্যই হচ্ছে দানবীয় হারে সম্পদ উৎপাদন করে যাওয়া। সবাই মরিয়া হয়ে এই লক্ষ্যের দিকে ছুটছে। মানুষ এ ব্যবস্থার শিকার তো হবেই। এরকম ঘটতে থাকলে অবস্থা তো এ-ই দাঁড়াবে। আমাকে বলুনতো, এ দেশে শ্রমিকরা কি চলমান ব্যবস্থার লক্ষ্য থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারবে? তারা ক্ষমতায় গেলে কি অন্যরকম ধ্যানধারনা পোষণ করতে পারবে?

এইচ. এন. ব্রেইলসফোর্ড: সমাজতন্ত্র একটা উঁচুদরের জটিল মতবাদ। বহু মানুষ এর পক্ষে রায় দিলেও বোঝে খুব কম লোকই। তারপরেও জনগণের আবেগ-অনুভূতি আমাদের বিবেচনায় রাখা দরকার, যেটা ধর্মঘটের সময় চোখে পড়েছিল। শ্রমিকদের যে অংশটা বেধড়ক দুর্ব্যবহারের শিকার, তাদের প্রতি সহমর্মিতাই ছিল এর পেছনের কারণ। সৌহার্দ্যের মনোভাব কতদূর যেতে পারে তার চমৎকার নজির ছিল ওটা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: আপনাদের সভ্যতা আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে তাতে মনে হয় যে বস্তুগত উন্নয়ন মানুষের নৈতিক অগ্রগতিকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। এর ব্যাপকতায় অভিভূত হয়ে মানুষ হার মেনেছে।

এইচ. এন. ব্রেইলসফোর্ড: অনেকটা শিশুর হাতে উড়োজাহাজের ভার পড়লে যেমন হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: আপনারা একটু বেশি সম্পদশালী। এতটাই যে আপনাদের সভ্যতা আক্রান্তদের কতটা ক্ষতি করছে তা বুঝে উঠতে পারছেন না। এ বোঝা কি দিনে দিনে আরো ভারী হয়ে উঠবে না?

এইচ. এন. ব্রেইলসফোর্ড: আপনি এটাকে বোঝা বলছেন? সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ এটাকে বোঝা বলে মনে করে না । জোর খাটানোতেই তার আনন্দ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: হ্যাঁ, শক্তির বিচারে আমরা আলাদা। আমাদের মতো গরম জলহাওয়ায় কোনো সভ্যতাই কয়েক শতাব্দীর বেশি তার প্রাণশক্তি ধরে রাখতে পারে না।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়ে আর্টস-এর আরো লেখা

  • ব্রুকলিনে রবীন্দ্রনাথ / এস এম রেজাউল করিম
  • ফ্রান্সে রবীন্দ্রনাথ / এস এম রেজাউল করিম
  • রবীন্দ্রনাথের অমূল্য রচনা সম্বন্ধে আমাদের উপলব্ধি / খোসে পাজ্ রড্রিগেজ
  • রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে এ সময়ের গল্পকাররা / প্রমা সঞ্চিতা অত্রি
  • রক্তমাংসের রবীন্দ্রনাথ / রাজু আলাউদ্দিন
  • তুলনাহীন রবীন্দ্রনাথ / কবীর চৌধুরী
  • বঙ্কিমচন্দ্র–রবীন্দ্রনাথ ধর্মতর্ক
  • ‘পারস্যে’: মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা / অদিতি ফাল্গুনী
  • গণশিক্ষায় কেসস্টাডি: ‘হৈমন্তি’র অপুরুষ বনাম ‘সমাপ্তি’র পুরুষ / এস এম রেজাউল করিম
  • উত্তরাধুনিকের চোখে রবীন্দ্রনাথ (সেমিনার) / আজিজ হাসান
  • (আমার) রবিভাব… ভাব ও অভাব / মানস চৌধুরী
  • একজন তৃতীয় সারির কবি”: রবীন্দ্রকবিতার বোর্হেসকৃত মূল্যায়ন / রাজু আলাউদ্দিন
  • রবি সান্নিধ্যে / মার্গারিট উইলকিনসন (অনুবাদ: প্রিসিলা রাজ)
  • অশেষ রবীন্দ্র প্রীতি / সাইমন জাকারিয়া
  • রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে ও গদ্যে মুসলমানের কথা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা / সাদ কামালী
  • ভাঙা গড়ার রবীন্দ্রনাথ: প্রাচ্যনাট-এর ‌’রাজা …এবং অন্যান্য’ / ব্রাত্য রাইসু
  • লেখকের আর্টস প্রোফাইল: সাহানা মৌসুমী
    ইমেইল: shahana.moushumi@gmail.com

    ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

    free counters

    সর্বাধিক পঠিত

    প্রতিক্রিয়া (1) »

      • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Razu Alauddin — মে ১৮, ২০১১ @ ৮:৫৮ অপরাহ্ন

        রবীন্দ্রনাথের এই সাক্ষাৎকারটি পড়লে আমাদের বুঝতে একটুও অসুবিধা হয় না যে তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিবিধি সম্পর্কে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন। যদিও রাজনীতি তাঁর চর্চার ক্ষেত্র ছিলো না। পশ্চিমের চরিত্রকে তিনি যে গভীরতা নিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন তা অসাধারণ।

        অনুবাদও অসাধারণ। এর ইংরেজি ‍রূপটা আমি দেখেছি। অনুবাদক সাহানা মৌসুমী কোনরকম স্বাধীনতা না নিয়ে মুলানুগ থাকার যে অনন্য দৃষ্টান্ত রেখেছেন তা সত্যি প্রশংসনীয়। অনুবাদককে (‘অনুবাদিকা’ বললাম না, শুনতে কেমন যেন লাগে।) আমার শুভেচ্ছা। আশা করবো তিনি আরও অনুবাদ করবেন।

    আর এস এস

    আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

     
    প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
    ১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
    ২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
    ৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
     

    
    Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

    © bdnews24.com