আর্টস বৈঠক

মেহেরজান বিতর্ক (কিস্তি ৫)

| ১ মে ২০১১ ১:১৮ অপরাহ্ন

কিস্তি ১-এর লিংক কিস্তি ২-এর লিংক কিস্তি ৩-এর লিংক কিস্তি ৪-এর লিংক

কিস্তি চার-এর পর

ব্রাত্য রাইসু: এখানে আমি একটু বলে নিই। আরও তিন জন বক্তা নতুন আসছে আমাদের মাঝে। জাকির হোসেন রাজু’র পর আসছেন সুমন রহমান এবং পিয়াস করিম। তো উনারা যেটা জানেন না–আমরা প্রথমেই যেটা শুরু করছিলাম সেটা হল যে, এই মেহেরজান ছবির ব্যাপারে যদি আপনাদের কারোর কোনো আপত্তি থাকে, এক ধরনের বা বিভিন্ন ধরনের আপত্তি গুলি আমরা এর মধ্যে আলোচনা করছি। আপনাদের নিজেদের কোনো আপত্তি আছে কিনা সেভাবে উচ্চারণ করার মত বা উপস্থাপন করার মত?

meher053.jpg
নীলা ও মেহের, মেহেরজান (২০১১)

সুমন রহমান: মানে কিসের প্রেক্ষিতে আপত্তি?

ব্রাত্য রাইসু: এই যে ছবিটা সম্পর্কে যে, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটা ব্যাপার, তারপর এই যে নামায়ে নেয়া হল এটা হল থেকে–এ সব ব্যাপারে।

পিয়াস করিম: আমি মনে করি না যে এত সরলভাবে এটা ন্যারেট করা সম্ভব। আপত্তি আছে কিংবা আপত্তি নাই এই সরল বাইনারিটা খুব বিপজ্জনক। আমি ওভাবে প্রশ্নটাকে উত্তরই দিতে পারব না। এটাকে একটা  খুব বিপজ্জনক একটা ভুল প্রশ্ন বলে মনে করি। এটা হচ্ছে আমার অভিমত।

ব্রাত্য রাইসু: না সঠিক উত্তরের মাধ্যমে ভুল প্রশ্নের আপনি  আপনি কোনো সমাধান করবেন কিনা?


আর্টস বৈঠক: মেহেরজান বিতর্ক, পর্ব ০৫

পিয়াস করিম: না, সঠিক উত্তরটা তো এত সহজ নয়। বিভিন্ন  ইন্টারপ্রিটেশন হতে পারে। বিভিন্ন ইন্টারপ্লে হতে পারে কিন্তু…

ফাহমিদুল হক: তার আগে রাজু ভাই বা সুমন ভাই উনারা যদি কিছু বলেন?

ব্রাত্য রাইসু: হ্যা, রাজু ভাই?

পিয়াস করিম: আমাকে বাদ দিয়ে দিলেন! আমিও একজন!

ব্রাত্য রাইসু: না না না! আপনাকে তো আগে জিজ্ঞেস করলাম….

সলিমুল্লাহ খান: আসলে আপনার বলা হয়ে গেছে বলে মনে করেছে ও (ফাহমিদুল)।

ফাহমিদুল হক: সরি, আমি আসলে আপনাকে ইন্টারাপ্ট করলাম।

মোরশেদুল ইসলাম: না, উনি তো আসলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলেছেন। উনি যেটা বললেন যে–একবাক্যে তো আসলে এটা বলা সম্ভব না।

ফাহমিদুল হক: আমি মনে করেছি যে, উনি বোধহয় উনার বক্তব্য শেষ করেছেন। সরি।

ব্রাত্য রাইসু: রাজু ভাই কিছু বলবেন?

জাকির হোসেন রাজু: না, আমার মনে হয় পিয়াস ভাই …..

পিয়াস করিম: না, ঠিক আছে।

ব্রাত্য রাইসু: পিয়াস ভাই সারেন্ডার করছেন যে এটা প্রশ্ন আকারেই–এটা প্রশ্ন হিসেবেই যেহেতু ভুল তাই …..

পিয়াস করিম:  না আমি একেবারেই আত্মসমর্পণ করছি না, সরি। আমি মনে করছি যে এটা অতি সরলীকৃত একটি প্রশ্ন এবং আমি অতি সরলীকৃত উত্তর দিতে রাজি না। আমি মনে করি যে  এটার আরেকটু সিরিয়াস ব্যাখ্যা হওয়া উচিৎ।

ব্রাত্য রাইসু: আমরা সেটাতে পরে আসব, সিরিয়াস ব্যাখ্যার দিকে। এখন আপাতত যদি কারও এই ভুল প্রশ্নে আপত্তি না থাকে তাঁরা যদি উত্তরটা দেন।

জাকির হোসেন রাজু: সত্যি কথা বলতে আমার অবস্থাও পিয়াস ভাইয়ের মত। আমার এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মত কোন উত্তর নেই।  আমি র‍্যাদার বলব যে যে কোন ফিল্ম–সেটা মেহেরজান  হোক বা অন্য যে কোন ফিল্ম হোক, আমরা এটাকে দেখি একটা মিডিয়া টেক্সট হিসেবে এবং মিডিয়া টেক্সট হ্যাজ মেনি কমপ্লেক্স ফাংশন। কাজেই ঠিক আইদার-অর মানে এটা উপকার করেছে বা অপকার করেছে এই ধরনের উত্তর আমার কাছে মনে হয় না…….

ব্রাত্য রাইসু: কিন্তু আপনি যদি একজন পার্সন হন তাহলে তো আপনার আপত্তি থাকবে বা আপত্তি থাকবে না। সেটা তো হইতেই পারে। অনেক জটিল ব্যাপারে আমার আপত্তি থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে। সেটা হতে পারে না? আমি বলতেছি না যে সিনেমাটা কি রকম, একজন দর্শক হিসেবে আপনার কী কী আপত্তি আছে বা আদৌ আছে কি না?

জাকির হোসেন রাজু: যদি আপত্তির কথা বলেন আমি বলব যে ওভারঅল আমার কাছে মনে হয়েছে ছবিটা দুর্বল। ছবিটা খুব ভাল দাঁড়ায় নি।

পিয়াস করিম: আমারও সেই মত। আমি মনে করি একটা দুর্বল ছবি হয়েছে।

সুমন রহমান: ওটাকে আমরা অসন্তোষ বা অস্বস্তি বলতে পারি। আমার অনেকগুলো অসন্তোষ আছে, অস্বস্তি আছে এই ছবি নিয়ে।

ব্রাত্য রাইসু: সেটা বলেন তো,আপনার অস্বস্তিগুলো কি কি আছে বলেন?

সুমন রহমান: অস্বস্তি যেমন মানে এইগুলি আমার আসলে টপিক না মানে ফিল্মের লোকজন ভাল বলতে পারবেন। কিন্তু আমি সাধারণ দর্শক হিসেবে যেটা আমার মনে হয়েছে যে, ওয়েলমেড না ছবিটা। তারপর অভিনয় ভাল না, খুব বাজে কিছু ক্রুটি আছে  অভিনয়ে। এগুলো খুব–মানে চোখে লাগে আর কি। কিন্তু যে জায়গাটায় আমি বেসিক্যালি কথা বলতে চাই সেটা ভিন্ন জায়গা–সেখানে আপত্তি-অনাপত্তি একদম ভিন্ন জিনিস আর কি। এটার বাইরে কোথাও আমি হয়ত কিছু বলব।

ফাহমিদুল হক: আচ্ছা, আমি মনে হয় সুমন ভাইকে হেলপ করতে পারি, আমার  এক্সপেরিয়েন্সটা দিয়ে। সেটা হল যে, আমার নাম ফাহমিদুল হক, আমি প্রথম  আলোতে একটা লেখা লিখেছি, সেটা হয়ত আপনাদের অনেকেই পড়েছেন। এই লেখায় হয়ত আমি এইভাবে লিখতাম না। আমি সাধারণত চলচ্চিত্রে আগ্রহী। চলচ্চিত্র নিয়ে গবেষণা করেছি কিছু এবং আমি ইনডিভিজ্যুয়াল টেক্সট ধরেও আলোচনা করেছি কিছু। যেমন, মোরশেদ ভাইয়ের খেলাঘর নিয়ে আমি লিখেছি, সাম্প্রতিক ছবি রানওয়ে নিয়ে লিখেছি, থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার নিয়ে লিখেছি,  এটা নিয়েও হয়ত লিখতাম, কিন্তু অন্যভাবে। একটা ইনডিভিজুয়াল টেক্সট হিসাবে।

আমি ছবিটার জন্যে লিখলাম, ছবিটা নিয়ে যে প্রতিক্রিয়া হল সেটার প্রতিক্রিয়া হিসাবে। সেখানে আমি যেটা এক্সপেরিয়েন্স করলাম–আমার লেখাটার আগে এবং পরে, আমার লেখাটায় আমি অ্যাকিউসড করলাম  এটাকে কেউ টেক্সট হিসেবে দেখছেন না, এটাকে—এটার, এই ছবির উদ্দেশ্য এবং এই ছবি কতটুকু আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করল সেরকম একটি রাজনৈতিক জায়গা থেকে এটাকে দেখছেন। তো এর ফলে যেটা হল যে, এই প্রতিক্রিয়াটা আমার, ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দ হল না। যার ফলে আমি আমার লেখাটা লিখলাম। আমি আমার লেখাটায় অভিযোগ করলাম যে, কেউ  টেক্সট নিয়ে কথা বলছেন না, সবাই সাব টেক্সট নিয়ে কথা বলছেন। এখন আমি আবার এখানে  দেখলাম–যত আলোচনা হল সবটাই প্রায় টেক্সট নিয়ে, আমি এবার সাব -টেক্সট নিয়ে কথা বলব। সেটা হল যে চারজন, এ্যা… তিনজন–আমার বন্ধু, প্রিয়দর্শিনী আপার সাথে আমার পরিচয় নেই। [ মুসতাইন জহির: প্রিয়ভাষিণী] প্রিয়ভাষিণী, সরি। তো, প্রথম দু’জনতো আমার নিজের কলিগ আর মাহমুদুজ্জামান বাবুর সঙ্গেও আমার এক ধরনের বন্ধুত্ব আছে। তো ছবিটা দেখার পর থেকেই,পরের দিন থেকেই, প্রিমিয়ারের পরের দিন  থেকেই ওই প্রথম  দুইজন, যারা আমার কলিগ, বাবুর সাথে আমার সরাসরি কখনোই যোগাযোগ হয়নি, তাঁর সঙ্গে প্রতিদিনই…এদের সঙ্গে প্রতিদিনই প্রায় দেখা হয়, আমার সঙ্গে, মানে তর্ক-বিতর্ক শুরু হল। এবং তাঁরা দেখলাম, আমি যেটাকে তর্ক আকারে বলতে চাচ্ছি তাঁরা এটাকে উত্তেজিত হয়ে নাকচ করতে চাচ্ছে। তারপর তারা প্রথম  আলো’তে একটা লেখা লিখলেন। এবং বলতে পারেন ইতঃমধ্যে অনলাইনে মানে ব্লগ এবং ফেইসবুকে এই ছবিটা নিয়ে পাশাপাশি লেখা শুরু হয়েছে এবং এই সবটা আমি  অবজার্ভ করে আমার লেখাটা আমি লিখলাম। সেখানে আমি বলতে চাইলাম কী—যে, এই ছবিটা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে যে গ্রান্ড ন্যারেটিভ সেটার বাইরে গিয়েছে এবং আপত্তিটা এখানেই। এবং আমি এটাও প্রমাণ কতে চাইলাম যে এই ছবিতে যে গ্রান্ড ন্যারেটিভের বাইরে গেল এটা বাংরাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক যত চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে–এই প্রক্রিয়ায়, যেটাকে আমি ডিকন্সট্রাকশন বলছি এবং পরে এক পর্যায়ে আমি কাউন্টার ন্যারেটিভও বলেছি, এই প্রক্রিয়ায় এটি প্রথম না।  আমি বেশ কিছু ছবির উদাহরণ দিয়ে দেখালাম যে এধরনের ডিকন্সট্রাকশন অল্প অল্প করে ইতঃমধ্যে শুরু  হয়েছে, বিশেষ করে গত এক দশকে। এর মধ্যে আমি কয়েকটা ছবির নাম বলেছিলাম, এর মধ্যে একটা ছিল হল ‘শ্যামলছায়া’, উল্লেখযোগ্য যে দুটোর কথা আমি বলতে চাই, আরেকটা হল ‘নরসুন্দর’। শ্যামলছায়া’র পরিচালক হলেন–লেখক এবং পরিচালক হূমায়ন আহমেদ এবং নরসুন্দর-এর পরিচালক হলেন তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদ। তো শ্যামলছায়া’য় দেখলাম যে আমাদের একটা…এ্যা ওইখানে—আমার এর আগে একটা আর্টিকেল ছিল, ইনফ্যাক্ট এই লেখায় বেশ দু-তিনটা প্যারা ঐ আগের আর্টিকেল থেকে কপি-পেস্ট, আমি তাড়াতাড়ি লিখতে পেরেছি এ জন্যই। আমার ঐ আর্টিকেলটায় ছিল যে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্রে মৌলভী বিবর্তন। মৌলভী যে ক্যারেকটারগুলো থাকে– একটা সময়ের আগে আমি দেখেছি–তিনি সাধারণতঃ এসেনশিয়ালি রাজাকার হন এবং তার মধ্যে অনেক বদগুণ থাকে। আর একটা সময়ের পরে এই মৌলভী ক্যারেকটারগুলোই একধরনের–পোর্ট্রেয়ালের ক্ষেত্রে একধরনের চেঞ্চ হচ্ছে। এটাকে আমি, হয়ত, খুব দুর্বলভাবে হলেও, এটাকে আমি কানেক্ট করিয়েছি মাঝখানে ঘটে যাওয়া গ্লোবাল কিছু ফেনোমেনার সাথে। যেমন নাইন-ইলেভেনের পরে , ইরাক ওয়ার, আফগানিস্তান ওয়ার, এগুলোর ফলে একটা মুসলিম আইডেন্টিটির এপ্রিসিয়েশনের ক্ষেত্রে আমাদের একটা ইন জেনারেল একটা পরিবর্তন এসেছে এবং সেখানে দেখা যাচ্ছে শ্যামলছায়া ছবিতে একজন মৌলভী–তিনি খুবই ভাল মানুষ। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সবার আগে যোগ দিচ্ছেন। মানে একটা নৌকায় করে একটা গ্রুপ একটা গ্রাম  থেকে পালিয়ে যাচ্ছে, এখানে হিন্দু ক্যারেকটার্স আছে, মুসলিম ক্যারেকটার্স আছে। তো যাত্রীরা যেখানে, মুসলিম ক্যারেকটাররা যেখানে হিন্দু ক্যারেকটারকে নৌকায় নিতেই চাচ্ছে না, যে, ওদের দেখে পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাকে গুলি করবে–তখন ওই মৌলভী সাহেব, ইয়াং-তরুণ একজন মৌলভী, তিনি নেগোশিয়েট করে তাদের উঠালেন। এর পরে, ঐ হিন্দু ক্যারেকটারগুলা আবার সুযোগ পেলেই পূজা অর্চনা করছে, তো তখন মুসলিমরা আবার ক্ষেপে যাচ্ছে। তিনি তখন আবার নেগোসিয়েট করার চেষ্টা করছেন এবং বলছেন যে সবার–‘লাকুম দ্বীন উকুম ওয়াল ইয়া দ্বীন’, এই রকম একটা কিছু বলছে। তারপর যখন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা হল, এই, এই মৌলভী ক্যারেকটারটাই সর্বপ্রথম মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিচ্ছেন , এই গ্রুপের মধ্যে। এছাড়া আমি অন্য অনেক ছবির উদাহরণ ওখানে দিয়েছি যেমন, ‘মেঘের পরে মেঘ’, চাষী নজরুল ইসলাম–এটার কথা আমি ওখানে লিখিনি, ওখানেও একটা মানে মূল ক্যারেকটারের পাশাপাশি একটা বড় বন্ধু ক্যারেকটার আছে, যেখানে–যিনি মৌলভী। এইগুলো আলোচনা করতে করতে আমি–সবচেয়ে শেষের যে উদাহরণটা, অ্যা–তারেক অ্যান্ড ক্যাথরিন মাসুদের নরসুন্দর শর্টফিল্মটা , সেখানে একজন মুক্তিযোদ্ধা, পাকিস্তানি সৈন্য এবং রাজাকারদের তাড়া খেয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন এবং পালাতে পালাতে তিনি আশ্রয় নিচ্ছেন হলো–একটি সেলুনে,  সেই সেলুনে তিনি গিয়ে দেখলেন, আমি আবার কোত্থেকে কোথায় আসলাম, এখানে তো সব বিহারী–বিহারীদের সেলুন। তো তখন যারা তাড়া করছে তারা যখন এখানে আসছে তখন তিনি–বিহারীরা তাকে বাঁচিয়ে দেয়, কোন একটা কিছু বলে। এই যে ডিকন্সট্রাকশনগুলো, এটা অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। ‘মেহেরজান’ সেখান থেকে একটা, বড় একটা লাফ দিয়েছে–আমি এটা বলতে চাচ্ছি। এবং আমি আমার লেখায় এটাও বললাম যে, এই ছবির যে টেক্সচুয়াল যে প্রবলেমগুলো, চিত্রনাট্যের যে সমস্যা, অনেক–মেকিং-এর যে দুর্বলতা, সেগুলো কেউ বলছেন না। কিন্তু, এই হঠাৎ করে মনে হয়, মানে আকাশ থেকে একটা কিছু পড়েছে এবং সবাই তীব্রভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। তো এই  লেখার পরে যেটা হল, আমি আমার পুরো গল্পটা বলে আমি একটা, মানে অনুসিদ্ধান্ত টানব, সেটা হলো–এই লেখার পরে আমি জানতে পারি যে আমার কলিগদের  যে লেখা সেটার পরে তারা প্রচুর ফোন পেয়েছেন থ্যাঙ্কস জানিয়ে। এখন আমার লেখার পরে আমিও প্রচুর ফোন পাচ্ছি, থ্যাঙ্কস জানিয়ে কিন্তু আমার ইতঃমধ্যেই রাজাকার, মানে উপাধি আমি লাভ করেছি—অনলাইনে, ব্লগে বিশেষ করে। সেখানে–সচলায়তন বলে একটি ব্লগ আছে, সেখানে প্রায় চার পাঁচটি লেখা ইতঃমধ্যেই রচিত হয়ে গেছে যেখানে আমার লেখা কতখানি জার্গনে ভারাক্রান্ত, থিয়োরিটিক্যালি কতখানি লোডেড, কিন্তু কিছুই বোঝা যায় না;  আর আমার ধারণাগুলি কত ভ্রান্ত সে বিষয়ে নানা ধরনের লেখালেখি হচ্ছে। এবং লেখাগুলো তাও একরকম দাঁড়াচ্ছে কিন্তু কমেন্টের অংশে আমার নাম নিয়ে অনেক ইয়ে করা হচ্ছে, পরিবর্তন করে–যেটাকে নেইম টিজিং বলে আর কি, বা নেইম কলিং বলে আর কি, সেটা খুব  খারাপ ভাষায় এবং খুবই বাজে বাজে ভাষায় আমাকে গালি দেয়া হচ্ছে।  তো এই অভিজ্ঞতা আমাদের এখানে উপস্থিত আছেন এরকম আরও কয়েকজনের আছে, আমি জানি। যে যখনই  কিছু ডিসকার্সিভ আলোচনা হয়, মানে সাদা-কালোভাবে না দেখে একটু ভিন্নভাবে একটু আলোচনা হয় তখনই…মানে স্পেশালি এটা অনলাইনে এটা লক্ষ্য করার মত যে, একটা দঙ্গল বেঁধে কিছু লোক এসে ব্লগাররা বিশেষ করে তাকে নানাভাবে গালিগালাজ ও হেনস্থা করে। [ফরহাদ মজহার: নোংরা এবং কুৎসিত ভাষায়।] কুৎসিত ভাষায়। এখন, এই পুরো ঘটনা– এগুলো সব সাব-টেক্সটের বিষয়,আমি মেহেরজানের টেক্সট -এ  গেলামই না, এই যে রেসপন্স, আমার পারসোনাল রেসপন্স, ছবি দেখে মানুষের যে রেসপন্স এবং আমার রেসপন্স এর কারণে অন্য মানুষের  রেসপন্স, এগুলো আমার কাছে খুব মানে ইয়ে প্র্যাকটিস মনে হয় না। এটাকে আমি কানেক্ট করতে চাই যেভাবে ছবিটাকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে সেটার সঙ্গে। এটা–আমাদের মোরশেদ ভাইরা আরও ছবি করবেন, আরও নানা রিয়েলিটিজ আসতে পারে, আরও নানা ডিকন্সট্রাকশন হতে পারে, তখন কী দাঁড়াবে? এই যে এই উদাহরণটা এখানে থাকল বাংলাদেশের ফিল্ম কালচারের জন্য এটা খুবই মারাত্মক একটা বিপজ্জনক ঘটনা ঘটল এবং এই যে আলোচনা, মোরশেদ ভাইয়ের ভাষায় এত বাজে ছবি নিয়ে এত বেশি আলোচনা এটাও আমার কাছে অন্যতম একটা ফেনোমেনা মনে হয়। তো, এই যে ব্যাপারগুলো, এই ব্যাপারগুলো আসলে আমাদের সার্বিক—জাতীয়তাবোধ, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আমাদের এত দিনের যে সংগ্রাম মানে, সত্যকে প্রত্যিষ্ঠা করবার জন্যে বা যাই বলি না কেন, আর্টিস্টিক-ই হোক বা রিয়েলিস্টিক –ই হোক, এগুলোর জন্যে খুবই অ্যার্লামিং। এখন আমি, কালকে ফেইসবুকে আমি একটা ইয়ে দিলাম…কী বলে—ওটাকে বলে স্ট্যাটাস, সেটা হলো—সামনে আসছে, আমার এই এক্সপেরিয়েন্সের পরে, সামনে আসছে মোরশেদুল ইসলামের ‌‌আমার বন্ধু রাশেদ ও নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর গেরিলা। এরকম, এই এই–গ্রান্ড ন্যারেটিভের এই ছবিগুলো নিশ্চয় আমাদের সামেনে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরবে। কিন্তু এরকম পাঁচটি ছবির পাশে একটি মেহেরজানকে নেয়ার মত টলারেন্স আমাদের থাকা উচিৎ বলে আমি মনে করি। কিন্তু মনে হচ্ছে আমাদের অনেকেরই তা নেই।

ব্রাত্য রাইসু : মোরশেদ ভাই, কী বলেন এ ব্যাপারে? মানে টলারেন্সের ব্যাপারে মোরশেদ ভাই কী বলেন?

মোরশেদুল ইসলাম: না আমি তো প্রথমেই বলেছি, আমি ছবি প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্তের সাথে একমত না। এবং ছবিটা, আমার কথা হচ্ছে যে, ছবিটা দর্শকই রিজেক্ট করত, তাহলে এটার স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটত আর কি এবং সেটা আমি খুবই প্রত্যাশিত ছিলাম।

ব্রাত্য রাইসু: স্বাভাবিক মৃত্যুর অপেক্ষায় ছিলেন আপনি?

হাবিব খান: না, হয়েছেও তাই।

meher052.jpg
মেহেরজান(২০১১) থেকে

মোরশেদুল ইসলাম: হ্যাঁ, এবং আমার ধারণা আর এক সপ্তাহ ছবিটা চললে ছবিটা পাবলিকই রিজেক্ট  করত। কারণ আমি এখনও বিশ্বাস করি আমরা যে কথাগুলো ভাবছি, যে জিনিসগুলো ভাবছি, সেইগুলোর সাথে বাংলাদেশের ম্যাক্সিমাম—তরুণ প্রজন্ম বলি, সবাই বলি–ম্যাক্সিমাম লোক আমাদের  সাথেই বেশি একমত হবে। আপনারা যারা ছবিটার…পক্ষে বলব না, মানে কিছুটা সাফাই গাইছেন তাদের পক্ষের লোক কম, আমি বিশ্বাস করি এখনও। সুতরাং…

সুমন রহমান: না, এইটা তো ভোটাভুটির কোন বিষয় না…

মোরশেদুল ইসলাম:  না, ঠিক আছে। আমি এটাকে আমার বিশ্বাস বলছি…

ফাহমিদুল হক: না, আমি বলছি এটাকে ডিসকার্সিভ আলোচনা। পক্ষে বিপক্ষে আমি যাচ্ছি না।

মোরশেদুল ইসলাম: না,আমি সেইটা না…আমি—এখন, কেউ কেউ তো ছবিটার মধ্যে একটা পজিটিভ দিকও দেখতে পারে বা একটা টলারেন্সের ব্যাপার দেখতে পারে কিন্তু পাবলিক ছবিটাকে টলারেট করত না বলে আমার বিশ্বাস,  আর একটা সপ্তাহ চললে।  তো সেইটার স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটত,  যেই সুযোগটা আমাদের হাবিব ভাই নষ্ট করে দিয়েছেন সেই জন্য আমি আরেকটু নিন্দা জানাই।

জাকির হোসেন রাজু: পাবলিক ছবিটা খুব একটা দেখেনি তো। দেখেছে কি?

মোরশেদুল ইসলাম: না, দেখেনি তো। অলরেডি চারটা হল থেকে ছবিটা নামিয়ে দিয়েছে। বাকি দুইটা হলে চলত আর সেটা আর এক সপ্তাহ চলার পর শেষ হয়ে যেত।

পিয়াস করিম: পাবলিক টলারেন্স যদি ভাল ছবির মাপকাঠি হতো তাহলে আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আজকে অন্যরকম হতো।

ব্রাত্য রাইসু: আচ্ছা পিয়াস করিম, আপনি নাম বইলা বলেন।

পিয়াস করিম: এটা উটকো বক্তব্য, এটা খুব সিরিয়াসলি নেয়ার দরকার নেই। [ব্রাত্য রাইসু: না, বলেন না...] আমি বলছিলাম, পাবলিক টলারেন্স যদি ভাল চলচ্চিত্রের মাপকাঠি হতো তাহলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস আজকে অন্যরকম হতো আর কি।

মোরশেদুল ইসলাম: না, সে তো বটেই। ভাল চলচ্চিত্রের জন্য বলছি না, আমি এটা…

সলিমুল্লাহ খান: ফাহমিদুল যে বললেন, মানে টলারেন্স প্রসঙ্গে–আমার মনে হয় বিনয়ের সালে এটা বলা দরকার, ঠিক বিপরীতভাবেও টলারেন্সের অভাব আছে। মানে এটা  তো একটা দেখলাম, যখনই কেউ আপনার মতের সাথে একমত হয় না, আপনি কিভাবে ইন-টলারেন্ট হয়ে ওঠেন সেটা আপনি দেখেন না। অন্যরা দেখে। এইখানে যারা এই ছবির বিরুদ্ধে অথবা এই ছবিকে  নামানোর জন্য বলছে, তাদের এটা টলারেন্সের অভাব–এটা নিন্দনীয়, আমি আপনার সাথে একমত; কিন্তু এমন কি, এইটাকে যে… এই ছবিকে সমালোচনা যারা করে তাদের দিকেও আপনি যে কোপ দৃষ্টিত তাকান, আপনার ভয়েসের মধ্যে যে কোপ –কোপ-স্বর  পাওয়া যায়, সেইটাও কিন্তু ভয়াবহ। আমি এই জন্যই বলব, টলারেন্স উভয় দিক থেকেই দরকার।

ফাহমিদুল হক: না, আমি এখানে…

পিয়াস করিম: মানে আপনি ব্যক্তি ফাহমিদুলকে বলছেন? আমি কোন কোপ দেখিনি ওনার ভয়েসের মধ্যে, আপনি হয়তো কাছে আছেন…।

সলিমুল্লাহ খান: না না,আমরা…

ফাহমিদুল হক: সলিম ভাই, আমি হেল্প করবো…প্রথমত, আপনি আমার লেখাটা সম্ভবত পড়েন নি, আপনি জিজ্ঞেস করছিলেন, ওখানে আমি যতটা পারা যায় নির্মোহ এবং মানে, অনুত্তেজিত থাকার চেষ্টা করেছি। আমার লেখার মধ্যে সেই ….

সলিমুল্লাহ খান: না, আমি আপনাকে ব্যক্তি হিসেবে বলছি না। আমি বলছি আমাদের এ্যাটিচ্যুডটা হচ্ছে এরকম–ইনটলারেন্স ইজ এ পার্ট অব আওয়ার জেনারেল কালচার, শুধু আপনি না…

ফাহমিদুল হক: কিন্তু এটা যদি আমি পারসোনালি নিই…

মোরশেদুল ইসলাম: ফাহমিদুল, আপনার লেখায়…আমি বলি একটু?

ফাহমিদুল হক: জ্বী।

মোরশেদুল ইসলাম: আপনার লেখায় কিন্তু আমি কোন সারবস্তু খুঁজে পাই নি।  কেন পাই নি বলি আপনাকে, আপনি মূল যে বিষয়টা বলার চেষ্টা করেছেন যে, মুক্তিযুদ্ধকে আমরা যে গ্রান্ড ন্যারেটিভে দেখি এটা তার বিপরীত ছবি বলেই আমাদের আঁতে ঘা লাগছে। আপনার গ্রান্ড ন্যারেটিভের বাইরেও কিন্তু… গ্রান্ড ন্যারেটিভের বাইরেও কিছু ছবি হয়েছে আপনি উদাহরণ দিয়েছেন; সেগুলো হয়তো…সেগুলোর তুলনায় এটা অনেক বেশি ইয়ে, সেইজন্য এতটা রি-অ্যাক্ট করা হচ্ছে। কিন্তু  আমার কাছে যে প্রশ্নটা ছিল–যে ছবিটাকে যদি আমরা ওভাবে দেখি,  গ্রান্ড নেগেটিভে, গ্রান্ড ন্যারেটিভে আমি যেতে চাচ্ছি না, ছবির মূল যে বিষয়টা নিয়ে সবাই আপত্তি করছে—যে, পাকিস্তানি আর্মির সাথে মেয়েটাকে প্রেম, সেটাকেও আমি ভুলে যেতে চাই, সেটাকেও আমি গ্রহণ করতে চাই। কিন্তু অন্যান্যভাবে যে ছবিটাতে মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করা হয়েছে বা আমাদের নির্যাতিতা নারীদের প্রতি অসম্মান করা হয়েছে আমি বলব, সেই পয়েন্টসগুলো আপনি লক্ষ্য করেননি। যেই পয়েন্টসগুলো কিন্তু ওদের লেখাতেও ছিল, সেগুলো আপনি টাচ করেন নি।

ব্রাত্য রাইসু: আচ্ছা, সুমন কিছু বলতে চাইছেন? আমরা সুমনের হয়ে আসি?

সলিমুল্লাহ খান: আচ্ছা, সুমনের কথা একটু শুনি, ভাই?

ফাহমিদুল হক: ওই যে, উনি (মোরশেদুল ইসলাম) আমাকে একটা প্রশ্ন করছিল।

ব্রাত্য রাইসু: আচ্ছা, ফাহমিদুল আমরা ওই জায়গায় পৌঁছব আবার। হ্যাঁ, সুমন বলেন। নাম বইলা নেন, সুমন।

সুমন রহমান: আচ্ছা, আমার নাম সুমন রহমান। আমি, যেটা হইছে যে ওই ফাহমিদুলের প্রসঙ্গেই বলতেছিলাম, যে, আমি ছবি দেখার আগেই গালাগালির শিকার হইয়া গেছি আর কি। মানে, লেখার তো পরের কথা, দেখার আগেই আমার সম্পর্কে গালাগালি হয়ে গেছে যে…মানে এটা থেকে আমার যেটা মনে হচ্ছে যে…

ফৌজিয়া খান: না,না, কেন গালাগালি?

সুমন রহমান: মানে এই ছবির পক্ষে আমাকে নেওয়া যায় আর কি। মানে আমি সেই রকম সন্দেহজনক চরিত্র, তাদের কাছে, যে এই ছবির পক্ষে কথা বলবে আর কি! সেইজন্য আগে থেকেই…

ব্রাত্য রাইসু: ও আগেই ঠিক করা?

ফৌজিয়া খান:  আগেই ঠিক করে ফেলছে?

সুমন রহমান: হ্যাঁ, এরা আগেই ঠিক করে ফেলছে এবং এরকমও শুনলাম যে…ফেইসবুকে দেখলাম যে, আমাকে নাকি ব্রিসবেন থেকে উড়ায়ে নিয়ে আসা হইসে এইটার পক্ষে কথা বলার জন্য!

সলিমুল্লাহ খান: আচ্ছা, আপনি এখন কি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? যে, ছবিটার পক্ষে বলবেন না বিপক্ষে বলবেন?

ফাহমিদুল হক: আমি এরকমও দেখেছি, বলা হচ্ছে যে, রুবাইয়াত হোসেনের লেখাটি নাকি সুমন রহমানের লেখা।

সুমন রহমান: হ্যা এরকম কথাও বলছে।

ফাহমিদুল হক: আরেকটা শুনেছি…

পিয়াস করিম: এবং ফারুক ওয়াসিফের লেখা, মানে হুইচ, অ্যা ভেরি সেক্সিস্ট কমেন্ট, যে ওই রকম লেখা নারীরা লিখতে পারে না।

ফাহমিদুল হক: আমার কলিগ বললেন যে, আমাদের লেখায় এইটা–এতগুলো হিট হয়েছে প্রথম আলো অনলাইন ভাসর্নে আর তোমাদের লেখায় মাত্র ছয়টি হিট হয়েছে বা ছয়টি পয়েন্ট এসেছে বা কমেন্ট এসেছে। আমি বললাম, তোমাদের লেখা মানে? কয় ‘তুমি আর ফারুক ওয়াসিফ মিলে যেটা লিখে দিয়েছো রুবাইয়াতের হয়ে?’ এই এক্সপেরিয়েন্সের পরে আপনি আমার মধ্যে যদি কোন কিছু দেখে থাকেন, সেটা কি খুব ন্যাচারাল না?

সুমন রহমান: না, আমি এই ছবিটা নিয়ে…জাস্ট খুব অল্প কথায়, আমার যেটা মনে হইছে আর কি, ছবিটাতে…মানে যে কয়টা জিনিস আমি এ ছবিটাতে ডিল করতে দেখি নাই আর কি–প্রথমত, ফিল্ম কিন্তু…সাউথ এশিয়ান ডিসকোর্সে বতর্মান ফিল্ম যেগুলো আসলে হিস্ট্রিকে ডিল করে, এইটা জাকির হোসেন রাজু এইটার উপর গবেষণা করেছেন, উনি ভালো জানেন, যে, বেইসিক্যালি একটা ন্যাশনালিজম কন্সট্রাক্ট করে ছবিগুলো; ছবিগুলোর একটা মিশনই এটা এবং এটার সাথে সাথে একটা অডিয়েন্সও কন্সট্রাকটেড হয়। মানে ফিল্ম অডিয়েন্স ইজ এন অ্যাকটিভ পার্ট অব ফিল্ম, নাউ-এ-ডেইজ ইন সাউথ এশিয়া। তো এখন আমি যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা ছবি করব, যেই ইস্যুটা, যেই ইস্যুটা মানে ইস্যুটায় অনেক কিছুই এখন পযর্ন্ত আনরিসলভড, অনেক কিছু মানে ইয়ে হয় নাই। এই ছবিটার, আমার যেটা খুব প্রধান ইয়ে মনে হইছে. যদি দুবর্লতা বলি বা মানে এক ধরনের বাইপাস করে গেছে, যেটা মানে করে যাওয়া ঠিক হয় নাই বা করে যাওয়া…মানে না করা উচিত ছিল সেটা হচ্ছে যে, এই, এই ইস্যুটা অর্থাৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদ বা যেটা মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিসংগ্রাম, এই ইস্যুটাকে সে–তার ডিল করা উচিৎ ছিল। সে প্রেমটা দেখাইছে ঠিকই, প্রেম একটা হইসে, প্রেম হইতেই পারে, এটা কোন, আমি কোন ইয়ে দেখি না কিন্তু যেটা হইছে যে ওই জায়গাটিতে সে ক্রিটিক্যালি দাঁড়াইতেই পারে নাই এই ছবিটা। মানে ওইটাকে বাদ দিয়ে একটা–একটা প্রেমের জগতে সে ঢুকে গেছে এবং আমার কাছে যেটা মনে হইছে যে, রিসেন্টমেন্ট যেটা হইছে ছবির ইয়েতে, সেটার এটা একটা কারণ হইতে পারে। আর দ্বিতীয়ত…, আরেকটা হচ্ছে যে রিসেন্টমেন্টের জন্য কোনো কারণ লাগবে না। কারণটা হচ্ছে যে, এখন জাতি স্পস্টত দুই ভাগে বিভক্ত আর কি। এখন যেটা আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, আমি ওই ফেইসবুকে লিখছিলাম যে একটা নব্য ফ্যাসিজম ডেভেলপ করছে, সেটা যে, এটা হচ্ছে যে ম্যাপিং হয়ে গেছে আমাদের, কে কি বলবে, কে কি বলবে না–এটা একদম ম্যাপিং হয়ে গেছে, আমরা সবাই সবাইকে চিনে ফেলছি; ফলে আমরা রাতের অন্ধকারেও বুঝি যে—আচ্ছা, ফরহাদ মজহার কী বলতে পারেন! এই রকম একটা ব্যাপার দাঁড়াইঢা গেছে।

ব্রাত্য রাইসু: আচ্ছা ফরহাদ ভাই কী বলবেন এ ব্যাপারে?

ফরহাদ মজহার: কী আর বলব?

ব্রাত্য রাইসু: আচ্ছা, পিয়াস করিম, আপনি যদি কিছু বলেন?

পিয়াস করিম: আমি পিয়াস করিম। আমি ছবিটা খুব অ্যাবজর্ব করার করার সুযোগ পাই নি। আমি এখানে আসার আগেই সুমন, আমি আর কে কে এক সঙ্গে ছবিটা দেখে আসলাম। আমি ছবিটা প্রত্যাহার করার আগে দেখার সুযোগ পাইনি। ফলে ফারজানা ববিকে অনেক ধরে-টরে আমার বাড়িতে বসে ছবিটা দেখে আসলাম, ফলে খুব বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা কিছু করতে পারব বলে মনে হয় না। কিন্তু আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে আপাত দৃষ্টিতে, এবং এটা নিয়ে চার-পাঁচ জন/ছ’জন বন্ধু মিলে দেখছিলাম, হাসি-ঠাট্টা হচ্ছিল, তর্ক –বিতর্ক, মানে তর্ক-বিতর্ক ঠিক না, উটকো কমেন্ট হচ্ছে তার মাঝখান দিয়ে যা হজম করা গেছে– আমার কাছে মনে হয়েছে ছবিটার কতগুলো সম্ভাবনা ছিল।; কিন্তু সম্ভাবনাগুলোকে বিকশিত করা যায়নি। আমাদের মেইট স্ট্রীম পপ ন্যাশনালিজমের ন্যারেটিভে যে ব্যাপারটা আছে, আমি ব্লগে দেখে যা বুঝতে পারছি, এখানে আমি, আমি গত কিছুদিন আসলেই একদম মনোযোগ দিতে পারিনি, বন্ধুরা যাঁরা লিখেছে এবং আক্রমণের শিকার হয়েছে তাদের অনুরোধে কিছু কিছু ব্লগের লেখা দেখতে হয়েছে—যে, পাকিস্তানি সৈন্যের সঙ্গে বাঙালি মেয়ের প্রেম হবে কেন? একেবারে ঐ পযরআয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।

সুমন রহমান: না, ওইটাই তো মূল আপত্তি।

পিয়াস করিম: হ্যাঁ এবং ওইটা–ছবির সবচেয়ে শক্তিশালী সম্ভাবনা ছিল। এই যে রাজনৈতিক সীমানা—যে, জার্মান সৈন্যের সঙ্গে যে হলোকাস্ট ভিক্টিমের প্রেম হতে পারে, এই যে কলোনিয়াল এডমিনিস্ট্রেটের সঙ্গে কলোনাইজড-এর প্রেম হতে পারে, এ সম্মন্ধে অনেক ছবি তৈরি হয়েছে। সুমন তো ‘ব্লাকবুটে’র কথা বলছিলেন আসতে আসতে।

[সুমন রহমান: হ্যাঁ, ‘ব্লাকবুক একটা ছবি আছেএ রকম অনেক ছবিই আছে]

পিয়াস করিম: এটার যে একটা সম্ভাবনা ছিল, এটার মানবিক সম্ভাবনা, একটা মানবিক ন্যারেটিভ তৈরি করা যেতো । মানে  ব্লগ ডিসকোর্সে,  ব্লগ ন্যারেটিভে যেটা সবচেয়ে বেশি আক্রমণের, আমি বলব ভালগার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে, সেটা ছবিটার  সবচেয়ে সম্ভাব্য শক্তির দিক ছিল বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। এটা বিকাশে, বিকাশ করা যায়নি।

দ্বিতীয়ত হচ্ছে যে, এখানে অল্প একটা কথা বলে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, আমি ফারুক ওয়াসিফের লেখা, না, কার লেখা পড়ে মনে হচ্ছিল যে ওইটা হয়ত ছবির একটা শক্তিশালী অংশ কিন্তু দেখলাম যে একটা কথা বলে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সেটা হচ্ছে যে, নীলা যখন বলছে যে আমি ধর্ষিতা হয়েছি কিন্তু সেটাই প্রথম বারের মত নয়। এক তরুণ বন্ধু তিন চার দিন আগে এক ডিনারে আমাকে বলছিল, ওটা বেশ আপত্তিকর এক কথা, ও যদি আগে রেইপডও হয়ে থাকে এই রেইপ তো ব্যক্তি দ্বারা রেইপ। তার সঙ্গে একটা কলোনিয়াল আর্মি রেইপের তুলনা করা যাবে কেন? আমি বলব যে, কোনো রেইপই ব্যক্তিগত রেইপ নয়। প্রত্যেকটা রেইপই হচ্ছে স্ট্রাকচারাল রেইপ। পুরুষতন্ত্র রেইপ করছে। কলোনিজম রেইপ করছে। এর মধ্যে গুণগত পার্থক্যটা কোথায়? মানে, যদি ওইটা যদি তোলা যেত, যদি উত্থাপিত করা যেত যে নারীরা তো ধর্ষিতা হয়ে আসছেই, পাকিস্তান সোলজার দ্বারাই প্রথম বাংলাদেশী নারীরা ধর্ষিতা হয়নি এবং এই কথাটা বলার মধ্যে কোন দোষের কিছু নেই বরং ওই পার্টিকুলার আসপেক্টটাকে ডেভেলপড করে যেত, করেননি। এগুলো সবই কিন্তু একবার ছবিটা, একঝলক দেখে এখানে চলে আসার ফল। ফলে খুব…। আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, ইট’স অ্যা পুত্তরলি মেইড মুভি। ছবিটা খুব ভালভাবে তৈরি হয়নি, খুব…ওইভাবে দানা বাঁধে নি।

খাজা সাহেবের চরিত্রটা যেটাকে ছবির কেন্দ্রিয় চরিত্র বলা হচ্ছে আমার কাছে খুব দুর্বলভাবে সংগঠিত একটা চরিত্র বলে মনে হয়েছে। মানে একটা ছোট্ট কথা, যেটা আমরা একসময় মার্ক্সিয় পরিভাষায় বলতাম, কিন্তু কথাটা আজকেও খুব রেলিভেন্ট যে, খাজা সাহেবের–উৎপাদন সম্পর্কে তাঁর অবস্থানটি কোথায়? উনি বসে বড় বড় কথা বলেন, কিন্তু উনি কী করে খান? ধরে নিচ্ছি, উনি গ্রামীণ জোতদার। কিন্তু গ্রামীণ জোদ্দার হিসেবে ওই উৎপাদন সম্পর্কে তার অবস্থানটা কোথায়–কোথাও কিন্তু স্পষ্ট না। পুরো ছবিতে দুটো উৎপাদনের ব্যাপার আছে। একটা হচ্ছে চায়ের দোকানদার চা বানাচ্ছে, আর হচ্ছে বাউল মাছ ধরছে। এ ছাড়া পুরো ছবিতে কিন্তু–বাস্তব জীবন এ ছবিতে প্রতিফলিত নয়। ফলে আমার ছবিটাকে মনে হয়েছে যে, বাস্তব–মানে আমি এপিয়ারেন্স এবং এসেন্সের বাইনারি যে খুব প্রযোজ্য না, ঐ বিতর্ক আমি জানি। কিন্তু ছবিটা একটা ভাসা ভাসা পর্যায়ে রয়ে গেছে, এর…

ব্রাত্য রাইসু: পিয়াস ভাই এক সেকেন্ড। মানে উৎপাদন সম্পর্কের উপস্থাপন কি–জরুরী কিনা ছবির জন্য, আদৌ?

পিয়াস করিম: আমার কাছে মনে হয় জরুরী এবং তার জন্যে সোসালিস্ট-রিয়েলিজমের ছবি তৈরি করতে হবে বলে মনে হয় না। সেটা হচ্ছে যে একটা জীবনকে যখন আমি দেখি, জীবনের কোন অ্যাসপেক্টগুলোকে আমি ভ্যালুরাইজ করব আর কোন অ্যাসপেক্টগুলা ভ্যালুরাইজ করব না এটা শিল্পকর্মের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এখন আমার যেটা মনে হয় যে, কোনো শিল্পকর্মের কিন্তু–কোন একটা পার্টিকুলার টেক্সট জীবনের সামগ্রিক অভিজ্ঞতাগুলোকে ধারণ করতে পারে না। কিন্তু অ্যাজ এ রিডার অব এ টেক্সট, অ্যাজ এ ভিউয়ার অব এ টেক্সট, কোন পার্টিকুলার অ্যাসপেক্টগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে, কোনটা গুরুত্ব পাচ্ছে না–এটা আমার জন্য খুব জরুরি একটা প্রশ্ন এবং তার জন্য কিন্তু সোভিয়েত স্টাইলের ভালগার সোশালিস্ট-রিয়েলিস্ট হওয়ার দরকার নেই। এটা একেবারে ক্রিটিক্যাল রিয়েলিজমের জায়গা থেকে ওই ব্যাপারটা সম্ভব এবং ঐ–ঐ অর্থে কোন চরিত্রই দানা বাঁধেনি আসলে। এমন কি প্রেম–যেটা আসলে একটা ভীষণ শক্তিশালী সাহসী প্রেমের উপাখ্যান হতে পারত, এই—এই ছবিটা একটা শক্তিশালী হতে পারতো, কিন্তু প্রেমটাও/কে খুব কষ্ট-আরোপিত প্রেম মনে হয়েছে। এই যে পাকিস্তানি সৈন্যটির সঙ্গে যে নীলার প্রেমটি গড়ে উঠল, নীলার নাতো, মেহেরের প্রেমটি গড়ে উঠল–এই প্রেমটি কেমন করে গড়ে উঠল?  মানে এটা, এটা কোথায়, ভিত্তি কোথায়? এই যে–এর টেকনিক্যাল ট্রিটমেন্টগুলো কোথায়, এসথেটিক ট্রিটমেন্টগুলি, টেক্সচুয়াল ট্রিটমেন্টটা কোথায়? কোথাও… এ প্রেমটা দানা বাঁধেনি, প্রেমের গল্পটা দানা বাঁধেনি। পুরো গল্পটা একটা ভাসা ভাসা গল্প মনে হয়েছে। এবং ওই যে ম্যাজিক্যাল রিয়েলিজমের কথাটা আযম বললেন–ইট’স এ ক্রপ-আউট। আমরা একটা রিয়েলিস্ট ছবি দেখতে বসেছি, যেখানে একাত্তর সালের নারী ডিজুস একসেন্টে কথা বলেন, মানে রুবাইয়াতের সালমা খালা চরিত্রে, আমি–রুবাইয়াত আমার ব্যক্তিগত তরুণ বন্ধু, খুব ভালবাসি, খুব পছন্দ করি, আমার মনে হচ্ছিল, রুবাইয়াতের কথা শুনছি, সামনাসামনি বসে। দ্যাট’স হাউ শি টকস। এখন এটাকে মাজিক্যাল রিয়েলিজম বলে পার করে দেয়া যাবে না। এই যে মাজিক্যাল রিয়েলিজম রিয়েলিজমের…না, একই টেক্সটের মধ্যে বিভিন্ন উপাদান থাকতে পারে, আমি সেটা একেবারে অস্বীকার করছি না। টেক্সট এসেনশিয়ালি হেটরো-ক্লাসিক–চলচ্চিত্রে আরেকটু কম, উপন্যাসে বেশি, চলচ্চিত্রে যেহেতু দু’ঘন্টা আড়াই ঘন্টা একটা ফ্রেমে বেঁধে ফেলতে হয়, আরেকটু আটোসাটো আরেকটু গভীর ন্যারেটিভ হতে হয়; কিন্তু তারপরও বিভিন্ন উপাদান থাকতে পারে। কিন্তু সালমা খালার তিজুস অ্যাকসেন্ট কিংবা যখন মেহেরজান বোম্বাইয়ের নারীর পোশাক পরে প্রেম করছে এবং যখন পাকিস্তানি সৈন্যটি আমাদের মেল-সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসিতে পরিনত হচ্ছে–এটাকে ঠিক ম্যাজিক্যাল রিয়েলিজম বলে চালিয়ে দেয়া যাবে না।

ব্রাত্য রাইসু: পিয়াস ভাই,মাঝখানে–ডিজুস অ্যাকসেন্ট বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন?

পিয়াস করিম: বাংলাদেশের নাগরিক, উচ্চ-মধ্যবিত্ত, যে একটি ইংরেজী অ্যাকসেন্ট -বাংলা অ্যাকসেন্ট মেশানো একটা খিচুড়ী ভাষায় কথা বলে।

ব্রাত্য রাইসু: এইটা কি আপনি মনে করেন, একাত্তরের দিকে এই ভাষায় কথা হতো না?

পিয়াস করিম: না, ছিল না। আমি একাত্তরে বেঁচে ছিলাম। তখন এই একসেন্ট ছিল না।

ব্রাত্য রাইসু: একাত্তরে ইংরেজি…(অস্পষ্ট) কথা বলতো না?

ফৌজিয়া খান: একাত্তর কেন,  দশ বছর আগেও ছিল না।

হাবিব খান:  তার আশেপাশেই ছিল না।

সলিমুল্লাহ খান: আচ্ছা রাইসু, পিয়াস যদি অনুমতি দেন আমি একটু ইন্টারভেন করি? সেটা হচ্ছে আপনি যে প্রশ্নটা তুলেছেন এটা ছবির একটা কেন্দ্রীয় বিষয়। একটা যদি মুক্তিযুদ্ধ হয়–সেটাকে পটভূমি বলেন, ইতিহাস বলেন, বাদ দেন, একটা প্রেজেন্ট বিষয় হচ্ছে–অলওয়েজ, ফেমিনিন প্রেজেন্স। স্ট্রং ফেমিনিন প্রেজেন্স ছবিতে এবং  তারাই কেন্দ্র। তাদের…দুই উইমেন-এর কথার মধ্য দিয়ে ছবির ন্যারেটিভ ফ্রেমওয়ার্ক করা হইছে। কাজেই, দ্য কোয়েশ্চন অব ফেমিনিন সেক্সুয়ালিটি  ইজ ইম্পর্টেন্ট।

পিয়াস করিম:  রাইট। অ্যাবসলিউটলি রাইট।

সলিমুল্লাহ খান: তার মধ্যে একটা শব্দ আছে—একটা শব্দ কেউ কিন্তু বলছেন না, কিন্তু আমার বারবার—আমাকে পীড়া দিচ্ছে এইটা, মানে রেইপ ইজ নট এন ইনডিপেনডেন্ট ভ্যারিয়েবল হিয়ার। রেইপ ইজ এ ভ্যারিয়েবল অব রেইসিজম ইন দ্য ওয়ার। ধরেন ইউরোপীয়রা আমেরিকায় গেছে। আমেরিকা যাওয়ার সময় তারা শ্রমিক দরকার বলে, দাস দরকার ছিল তাদের, একটা সাদা লোককে তো দাস করে নাই, আফ্রিকা থেকে সব দাস ধরে নিয়ে গেছে। আমেরিকান ইন্ডিয়ান–লালদেরকে একজনকেও দাস বানাইতে পারে নাই। দু’একটা পোকাহোনতাস-এর গল্প শুনি, ওটা (অস্পষ্ট)-এর গল্প।

পিয়াস করিম: উইলিয়াম ফকনারের খুব চমৎকার ছোটগল্প আছে যে রেড-ইন্ডিয়ানদের দাস বানানো…

সলিমুল্লাহ খান: আচ্ছা, তাহলে দেখা যাচ্ছে কি পাকিস্তানিরা যদি আমাদের ভাই হত, ঐ যুদ্ধের মধ্যে, ভাইয়ে ভাইয়ে যদি ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা হত, ফ্রেটারনাল ওয়ার হত, তাহলে এই রেইপটা এই রেসিস্ট চরিত্র অর্জন করত না। একটা নির্যাতিত জাতির বা অপোনেন্ট জাতির মেয়েকে ধরে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে মাসের পর মাস রাখা, রুবাইয়াত নিজেই তার ইন্টারভিউতে এবং প্রবন্ধে বলেছেন নীলিমা ইব্রাহীমের উদ্ধৃতি দিয়ে, যে ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ বইতে লেখছে পনের থেকে ঊনিশ জন মেয়ে পাকিস্তানি সোলজারের সাথে চলে গেছে এটা ফ্যাক্ট, উনি বলছেন, আমি ফ্যাক্ট নিয়ে তর্ক করছি না। কিন্তু পাকিস্তানিরা যে বাঙালি মেয়েদেরকে রেপ করেছে যুদ্ধের সময়…

পিয়াস করিম: সে ব্যাপারে তো আমার কোনো দ্বিমত নাই। দ্যাট ওয়াজ আ কলোনিয়াল রেইপ–এ ব্যাপারে আমার কোনো রকমের দ্বিমত নাই।

meher051.jpg
………
সারা, মেহেরজান (২০১১)
………

সলিমুল্লাহ খান: হ্যা,কলোনিয়ালিজমের মধ্যে আরেকটা কথা আছে, ইট’স এ ক্যাটাগরি অব সোশাল সায়েন্স–এটা হচ্ছে রেইসিজম। বর্ণবাদ। এইটা বর্ণবাদী ধর্ষণ। সুতরাং এটাকে সাধারণ ধর্ষণ বলা যাবে না। ধর্ষণ নিন্দনীয়, বর্ণবাদী ধর্ষণ কম নিন্দনীয় হতে পারে না, আমি বেশি বলছি না, আপনি নিশ্চয় রাজি হবেন যে–এটা কম নিন্দনীয় নয়? কিন্তু রেইসিজমের…আপনি এটা, আপনি এটা রিডিউস করতে পারবেন না। অর্থাৎ, রেইসিস্ট রেইপ ক্যান নট বি রিডিউসড রেইপ এলোন।

পিয়াস করিম: আচ্ছা, আপনার শেষ হলে বলবেন, আমি একটু বলব আর কি, আমি এটাকে কেন রেসিস্ট–রেসিস্ট কথাটাকে আমি এত আলগাভাবে কেন ব্যবহার করছি না। আপনি জানবেন সলিমুল্লাহ্ খান, আপনি তো পড়াশোনা করেন, রেইসিজমের ক্যাটাগরিটা হচ্ছে বেসিক্যালি নাইন্টিথ্ সেঞ্চুরি  অনওয়ার্ডস একটা ক্যাটাগরি। যখন এথনিক ডিফারেন্সকে একটা বৈজ্ঞানিক চরিত্র দেয়ার প্রচেষ্টা করা হল। রেইস বলে, এটা ইউনাইটেড নেশনস থেকে শুরু করে আমরা সবাই বলি–রেইস বলে আসলে কোন ক্যাটাগরি নেই।

সলিমুল্লাহ খান: পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটা কি রেইসিস্ট নাকি নয়? এটা আপনি বলেন।

পিয়াস করিম: না, আমাকে শেষ করতে দিতে হবে তো?

সলিমুল্লাহ খান: হ্যা, বলেন।

পিয়াস করিম: আমি মনে করি না–ইট ওয়াজ এ রেইসিস্ট রিলেশনশিপ। ইট ওয়াজ এ কলোনিয়াল রিলেশনশিপ। রেইস হচ্ছে, যখন রেইসকে কন্সট্রাক্ট করা হয় সোশ্যালি, পলিটিক্যালি, রেইস তখনই রেলিভেন্স পায়। পশ্চিম পাকিস্তানিরা যখন আমাদেরকে মেরেছে, আমাদের মেয়েদেরকে ধর্ষণ করেছে তারা এটাকে রেইসের ফ্রেমওয়ার্কে ব্যাখ্যা করে করেনি। হুইচ ডিডন’ট মেক ইট এনি লেস পেইনফুল। আমি জাস্ট রেইসিজম কথাটাকে অত আলগাভাবে ব্যবহার করতে চাচ্ছি না।

সলিমুল্লাহ খান: আপনি একটু বই পড়েন। ডোন্ট মাইন্ড। আপনি বলেছেন, আমিও বলছি, আপনিও বই পড়েন। আপনি  অন্ধ নন। আইয়ুব খানের ‘প্রভু নয় বন্ধু’ পড়েছেন আপনি?

পিয়াস করিম: ‘প্রভু নয় বন্ধু’ আমি পড়েছি। খুব মনোযোগ দিয়েই পড়েছি।

সলিমুল্লাহ খান: এভরি লাইন ইজ ফিলড আপ উইথ রেইসিজম।

পিয়াস করিম: না। রেইসিজম আর এথনোসেন্ট্রিজম একই ব্যাপার নয়।

সলিমুল্লাহ খান: একই ব্যাপার…

পিয়াস করিম: না, সলিমুল্লাহ ভাই। আপনি যখন–এই আলগা একটা ডেফিনেশন নিয়ে আসলে হবে না সলিম ভাই।

সলিমুল্লাহ খান: না না, কেন? আমি রেইসিজম যেটা বলছি–পাকিস্তানিরা সিস্টেমেটিক্যালি রেইপড বেঙ্গলি উইমেন বিকজ অব দেয়ার রেশিয়াল এন্ড  এথনোলজিক্যাল ডিফারেন্স।

পিয়াস করিম: না, আমি রেইস কথাটা ব্যবহার করতে চাচ্ছি না, কারণ রেইস কথাটা ইট’স এ  কোয়াজাই-সায়েন্টিফিক মিস্টেইকেন ক্যাটাগরি।

সলিমুল্লাহ খান: থ্যাঙ্ক ইউ যে, আপনি এটা ব্যবহার করতে চাচ্ছেন না। আমি মনে করেছি আপনি এটা ভুলে গেছেন। ব্যবহার করতে চাচ্ছেন না, থ্যাঙ্ক ইউ।

পিয়াস করিম: না, আমি ভুলে যাই নি। আমার বুদ্ধির উপর যদি আপনার বিন্দুমাত্র ভরসা থাকে আমি ভুলে যাই নি। আমি খুব সচেতনভাবে আপনি যে অপচেষ্টাটা করছেন–আপনার মুখের টার্মগুলো চাপিয়ে দিতে, আমি এটার বিরোধিতা করছি। আপনার তো ভাবার দরকার নেই যে আপনিই হচ্ছেন একমাত্র বুদ্ধিমান লোক।

সলিমুল্লাহ খান: আপনার সাধু চেষ্টার জন্যে আমি খুব ধন্যবাদ দিচ্ছি আপনাকে।

পিয়াস করিম: আপনি এখানে একমাত্র বুদ্ধিমান লোক, পড়াশোনা জানা  লোক–তা তো নয়। ফলে আমি আপনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি যে এই শব্দগুলোকে আলগাভাবে ব্যবহার করবেন না। এগুলো সিরিয়াস টার্ম, এর পেছনে একটা বৈজ্ঞানিক ইতিহাস আছে…

সলিমুল্লাহ খান: আমি আপনাকে বলছি যে আপনি ব্যবহার করছেন না এটা আমি নোট করলাম। আমি ব্যবহার করব না–এটা না বললেই ভাল।

পিয়াস করিম: না, সেটা তো আপনাকে বলিনি। আপনি যে আমার…

সলিমুল্লাহ খান: এখনি তো বললেন।

পিয়াস করিম: না না না, আপনি আমার উপর  চাপিয়ে দিলেন, সলিম ভাই আপনি ভুলে গেছেন। বক্তব্যটা তো আমি দিচ্ছিলাম।

সলিমুল্লাহ খান: আমি জিজ্ঞেস করেছি, আপনি রেইসিস্ট মনে করেন কিনা? আপনি বলেছেন, না। তাহলে তো হলই।

সুমন রহমান: আচ্ছা, রেইস একটা ফ্লোটিং সিগনিফায়ার—এটা অনেকেই বলেন, এইটা অনেকেই বলেন, সেটা…

পিয়াস করিম: না না না, সলিম ভাই, আপনি কিন্তু আমার বক্তব্যে ইন্টারভেন করেছেন, আমি কিন্তু ইন্টারভেন করিনি। আপনি যতক্ষণ বলেছেন আমি মনোযোগ দিয়ে শুনেছি।

সলিমুল্লাহ্ খান:  আমি তো বললাম, আমি প্রশ্ন করেছি আপনাকে, আপনি উত্তর দিয়েছেন। এখন আপনি বলেন।

পিয়াস করিম: হ্যা, কিন্তু এরকম প্রশ্ন করার আগে আপনি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবেন না আপনার টার্মগুলো।

সলিমুল্লাহ্ খান: প্রশ্ন করলে কি চাপিয়ে দেয়া হয়?

সুমন রহমান: না, না, থাক। ফিমেল গেইজ নিয়া সলিম ভাই যেটা বলছেন এটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট একটা পয়েন্ট।

পিয়াস করিম: না, আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে ইট’স অ্যা কলোনিয়াল রেইপ এবং কলোনিয়াল রেইপের সঙ্গে প্যাট্রিয়াক্যল রেইপের একটা প্যারালাল আছে। পুরুষতন্ত্রের ভিত্তিতে যদি একটি নারীকে ধর্ষণ করা হয় এবং যদি রেইসিজম কিংবা কলোনিয়ালিজম একটি নারীকে ধর্ষণ করে, এতে কিন্তু পেইনটা কোন অংশে কম হয় না এবং এই সম্ভাবনাটা ছবিটাতে বিকাশ লাভ করানো যেত, ওখানেই কিন্তু আমার কাছে…আমি উপন্যাসটা পড়িনি এবং  আমি উপন্যাসের রেফারেন্সটা–রেফারেন্স টেক্সট হিসেবে আপনি (সলিমুল্লাহ্ খান) যেটা বলছেন, আমি মেনে নিচ্ছি, হ্যা? আমি মেনে নিচ্ছি  যে, রেফারেন্স টেক্সট ইজ এন ইম্পর্ট্যান্ট, ইয়ে। কিন্তু উপন্যাস আর চলচ্চিত্র ডিফরেন্ট অ্যাসথেটিক ফর্ম এবং যখন ট্রান্সলেশন করা হয়,ট্রান্সলেশন থিয়োরি তো প্রচুর লেখালেখি হয়েছে পাশ্চাত্যে, সলিমুল্লাহ খান আপনি জানেন। যখন একটা টেক্সট থেকে আরেকটা টেক্সটে, একটা ফর্ম থেকে আরেকটা ফর্ম-এ ট্রান্সলেশন করা হয়, এটা একটা স্বাধীন–একটা রেলিটিভলি  অটোনমাস এসথেটিক ফর্ম দাঁড়িয়ে যায়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালি’ আর সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’ একই ফর্ম নয়। সেখানে ওই ব্রাত্য রাইসু যে কথাটা বলছিলেন যে এবাদুরের উপন্যাসের, আমি উপন্যাসটা পড়িনি, সবলতা বা দুর্বলতা–যাই হোক, রুবাইয়াতের উপর চাপিয়ে দেয়াটা বোধ হয় ঠিক হয়নি। আমি ছবিটা দেখে হতাশ হয়েছি। আমি রুবাইয়াতের কাছ থেকে–এত ছবিটার…গত কয়েক বছর ধরে শুনে আসছি, আরেকটু শক্তিশালী ছবি আশা করেছিলাম আমি। আমি হতাশ হয়েছি। কিন্তু এটা আমার কাছে খুব একটা কনশাস, খুব ইন্টেনশনাল একটা ব্যাপার মনে হয় নি আর কি। আমার ছবিটির ব্যাপারে সমালোচনা আছে, কিন্তু ইন্টেনশনালি এবং যে কথাটি আপনি (সলিমুল্লাহ্ খান)  বলেছেন যে, এই পাকিস্তানি সৈন্যটির সাথে এই মেয়েটির প্রেম–ইট ইজ অ্যান অ্যালিগোরিক্যাল রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য রিলেশনশিপ বিট্যুইন  ওয়েস্ট পাকিস্তান এন্ড বাংলাদেশ, আমার কাছে কখনো মনে হয়নি ছবিটাতে দেখে। আমার কাছে মনে হয়নি।

সলিমুল্লাহ্ খান: না, আমি বলেছি যে এটা হতে পারে। এটা একটা সাজেশন। না হলে তো আপত্তি নাই।

পিয়াস করিম: কিন্তু আমার কাছে এটা মনে হয় নি আর কি। আমার কাছে মনে হয়েছে এটা ছবির একটা সম্ভাব্য শক্তির জায়গা ছিল, যেটা রুবাইয়াত এবং অন্যান্য চলচ্চিত্র কর্মী যারা জড়িত ছিলেন তাঁরা এটাকে নিয়ে যেতে পারেনি পরের স্তরে। আর আমি উত্তেজিত হয়ে যাওয়ার জন্য দুঃখিত, সলিম ভাই।

ব্রাত্য রাইসু: না, আপনারা এরকম  রেগুলার উত্তেজিত হবেন! এইটাতো খারাপ কিছু না!

pk_1.png


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আলোক যাত্রা — মে ২, ২০১১ @ ২:৫৪ অপরাহ্ন

      মেহেরজান প্রয়োজনের অতিরিক্ত গুরুত্ব পাচ্ছে। ব্যাপারটা পীড়াদায়ক…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কৌশিক আহমেদ — মে ৪, ২০১১ @ ৫:২৬ অপরাহ্ন

      কিস্তি-৫ পড়লাম মাত্র। আগেরগুলো পড়া ফরজ হয়ে গেছে। মেহেরজান নিয়ে এত বিশদ আলোচনা আর কোথাও চোখে পড়ে নাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন sourtok — মে ১২, ২০১১ @ ২:৫০ পূর্বাহ্ন

      আলোচনায় খাওয়ার বিষয়টি বেমানান লেগেছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আলমগীর ফারিদুল হক — আগস্ট ২০, ২০১১ @ ৭:০২ অপরাহ্ন

      এখানে সলিমুল্লাহ খান পয়েন্ট আউট করছেন সঠিক বর্ণবাদ। পিয়াস করিমের এক্ষেত্রে অগ্রহণ বা গ্রাহ্য না করার কিছু ত দেখি না!

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com