জীবনবৃক্ষে রিপু-রঙ

পূরবী বসু | ২৫ এপ্রিল ২০১১ ৬:৪৮ অপরাহ্ন

ভয়/আতঙ্ক

১৯৬৪ সালের শীতকাল। মুন্সীগঞ্জ শহর। কাশ্মীরের হযরতবাল দরগায় সংঘটিত এক কুখ্যাত, স্পর্শকাতর চুরিকে কেন্দ্র করে চারদিকে তখন প্রবল সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, খুনোখুনি। গত কয়েক দিন ধরে নানান ধরনের গুঞ্জন, বিভিন্ন রকম গুজব কানে আসছে। ফলশ্রুতিতে মিলিত কণ্ঠে “নারায়ে তকবীর, আল্লাহু আকবর” শোনার আশঙ্কায় প্রতি রাতেই আমরা ভয়ে ভয়ে কান পেতে বসে থাকি ঘরের ভেতর। যে ধ্বনি এতো পূতপবিত্র, যে শব্দোচ্চারণ সৃষ্টিকর্তার মহিমা ঘোষণা করে কেবল, তার প্রতি এতো আতঙ্ক কেন? কেননা, সময়টা ১৯৬৪ সাল, আর আমাদের বসতি ভারত উপ-মহাদেশেরই একাংশে—যা বহুকাল ধরে বিক্রমপুর বলে পরিচিত। হঠাৎ এক রাত্রে সত্যি সত্যি সেই প্রাণকাঁপানো, গলা শুকিয়ে দেওয়া, পরিচিত শব্দাবলী কানে ভেসে আসে। একে একে মনোযোগ দিয়ে বাড়ির প্রত্যেকেই শুনি আমরা, সেই মহারব। তাই তো! নিঃসন্দেহে নদীর ধার থেকেই আসছে সমস্বরে উচ্চারিত ঐ ধ্বনি। একযোগে, সুর করে, পুনঃ পুনঃ। “নারায়ে তকবীর, আল্লাহু আকবর”। এবার আর রক্ষা নেই। কী করবো, কোথায় যাবো এখন আমরা? এতো রাতে!

purabi-basu2.jpg
………
পূরবী বসু
………

ভাই-বোনেরা একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে মশারির ভেতরে বসে কাঁপতে থাকি। হঠাৎ মা আবিষ্কার করেন, এবং কিছুক্ষণ পাশের ঘরে স্থির দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চিন্ত হন, ঘুমন্ত ঠাকুমার ধীর লয়ের নিশ্বাস-প্রশ্বাস নির্দিষ্ট এক ছন্দে নাসিকা গর্জনের মাধ্যমে গভীর খাদে যে গোলমালের মতো এক শব্দ সৃষ্টি করছে, তা-ই এই ঘরে নারায়ে তকবীর আল্লাহু আকবর-এর জন্ম দিচ্ছে, অন্তত আমাদের ভীত মনে, সন্ত্রস্ত কানে অবিকল তাই শোনাচ্ছিল সেই রাতে। মায়ের আবিষ্কারে হাঁপ ছেড়ে বাঁচি আমরা। ছোট ভাই দুলাল কেবল এতোক্ষণে বলে ওঠে, তাই তো বলি, দূর থেকে আসা গুঞ্জনটা এতক্ষণ ধরে এক জায়গাতেই থেমে আছে কেন? আর যেন কাছে এগুচ্ছে না!

কাম/সম্ভোগ

তার সঙ্গে রতিক্রিয়ায় যে আনন্দ, যে সুখ কখনো পাই না, আমার পাশ দিয়ে অন্য মানুষটির নিছক হেঁটে চলে যাওয়া, তার মুখের বিরল দু’চারটে শব্দোচ্চারণ, আমার চোখে চোখ রেখে সামান্য স্মিত হাসি, কিংবা তার ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত আলতো একটুখানি ছোঁয়া তার চেয়ে বহুগুণ শিহরণ জাগায় শরীরে-মনে; পুলকিত হয়ে উঠি আমি – সিক্ত হয়ে ওঠে আমার অন্তর্গত বসন।

হিংসা/পরশ্রীকাতরতা

মেঘ-বৃষ্টি-ঝড়হীন সুনীল আকাশ মাথায় নিয়ে কাকভোর হলে বিছানা ছেড়ে উঠে প্রতিদিনের মতো আজ-ও কাচের জানালা দিয়ে বাগানের দিকে তাকাই। দেখি, চারদিকে দেয়াল ঘেরা আমার সখের বাগানের অপরূপ শোভা, সবচেয়ে আকর্ষণীয় টকটকে লাল রঙের ওপর হলুদ ছোপ ছোপ বৃহৎ, নিটোল আর উজ্জ্বল টিউলিপটা, ভেঙে দিয়ে গেছে কেউ। শুধু ভেঙে দিয়ে গেছে বললে ভুল বলা হবে। মূল গাছটি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে গেছে ফুলসহ লম্বা ডগাটিকে, একেবারে গোড়া থেকে। মৃত সেনাপতির ঈর্ষণীয় দেহাবশেষ মাটিতে টান টান শুয়ে আছে যেন। ঘাসের ওপর পড়ে আছে ডগাসহ একহারা দীর্ঘাঙ্গি আধফোটা টিউলিপটি, যার লাল টুকটুকে শরীরের ভেতর হলদে ছিটাগুলো এখনো স্পষ্ট জ্বল জ্বল করছে।

ক্রোধ/রোষ

জ্যোৎস্নাপ্লাবিত বিছানায় বসে মেয়েটি অতঃপর একটি ধারালো ছুরি দিয়ে তার সঙ্গীর পুরুষাঙ্গ কেটে রক্তাক্ত বস্তুটা দুই আঙ্গুলে ধরে এমন অবলীলায় ছুঁড়ে ফেলে দেয় জানালার বাইরে, মনে হয়, যেন ঐ বিশেষ প্রত্যঙ্গটি এর আগে আর কখনো চোখে দেখেনি সে, কখনো স্পর্শ করেনি। যেন একতাল গোবর অথবা কোন অবাঞ্ছিত পোকামাকড় এসে পড়েছিল হাতের আঙুলে। কোনমতে টোকা দেবার ভঙ্গিতে দুই আঙুল ঝেড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে–দূরে।

লোভ/লালসা

নেমন্তন্ন খাওয়া শেষ হলে খাঁটি রুপোর তৈরি চামচ দু’খানি কোলের ওপর বিছানো ভাড়ি কাপড়ের ন্যাপকিনে ভালো করে মুছে নিয়ে আস্তে নিজের কোটের পকেটে পুরে দিই, সবার অলক্ষ্যে। মনে মনে বলি, নিজেকে সান্ত্বনা দিই, ওদের অনেক আছে, আমার কিছুই নেই।

ক্ষুধা/তৃষ্ণা

সকল ভাইবোনের জন্যে ভিন্ন ভিন্ন বাটিতে পর পর সাজিয়ে রাখা আছে ঘরে-তৈরী পায়েস। পুরো শীতকালের জন্যে বরাদ্দ মাত্র একটিবারের জন্যে তৈরি মিষ্টান্ন। দ্রুত নিজেরটা গলাধঃকরণ করে আরেকটি বাটিও চেটেপুটে শেষ করে ফেলি। ভাগ্যিস, বাড়ির বিড়ালটা কথা বলতে জানে না। সে-ই যে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটির জন্যে পুরোপুরি দায়ী, সে সম্পর্কে আর যার-ই থাক, আমার যে কোন সন্দেহ নেই সেকথা জানাতে ভুলি না কাউকে, কেননা নিজের চোখে আমি তা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু বড়-ই অসময়ে—বড় দেরিতে। মিষ্টান্নটা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি তাই।

ন্দেহ/আশঙ্কা

বড় চাকুরী করার সুবাদে আর পোড়া দেশটাতে লেখাপড়া জানা ছেলেমেয়েদের চাকরী-সংস্থানের মারাত্মক ঘাটতির কারণে বড় বিপদে পড়ি মাঝে মাঝেই। আগ্রহ দেখিয়ে, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আলাপ করতে আসে যারা, অথবা আন্তরিকভাবে নিজেদের ঘরে নেমন্তন্ন করে যখন অর্ধ-পরিচিতজন, প্রায় অবধারিতভাবেই দেখি, সেই সঙ্গে সবিনয়ে আসে একখানি চাকরীর প্রার্থনা অথবা সুপারিশ। আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের আগ্রহে তাঁর নিজস্ব বাসভবনে, ঢাকায় বসবাসরত আমেরিকায় পড়াশোনা করা প্রাক্তন ছাত্রদের এলামনাই এসোসিয়েশন তৈরি হলো যেদিন, সেদিন-ই প্রথম আলাপ হলো নূর সাহেব আর তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে। এক সময় কলরেডোতে লাইব্রেরি বিজ্ঞানে পড়াশোনা করতেন নূর। সু-আলাপী দম্পতি। ফেরার সময় জানতে পারি, এতো রাতে স্কুটারে করে হাতিরপুলে ঘরে ফিরবেন তারা। শুনে জোর করে আমাদের গাড়িতে করে পৌঁছে দিই তাদের বাসায়। এই সামান্য ব্যাপারটির জন্যে এতবার তিনি ফোন করবেন, বাড়িতে নেমন্তন্ন করবেন কল্পনাও করিনি। বার বার পোড় খাওয়া, হোঁচট খাওয়া নষ্ট মন আমার। খালি মনে হয়, ছেলে-মেয়ে অথবা ভাগ্না-ভাগ্নি কারো চাকরীর দরকার নিশ্চয়। বহুবার এড়িয়ে যাবার পর, একবার যেতেই হলো হাতিরপুলে তাদের বাড়িতে। আমাদের সম্মানে নূর সাহেব তার বিবাহিত ছেলেমেয়েদের-ও পরিবারসহ আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সেদিন। ঘর ভর্তি আত্মীয়স্বজন। উৎসবের আমেজ। প্রচুর রান্নাবান্না করা হয়েছিল—যেমনটি হয়ে থাকে। একসময় খাওয়াদাওয়া শেষ হয়। মিষ্টি, পানসুপুড়ি-ও। অথচ এখনো কোন গুণী, শিক্ষিত, অল্পবয়সী ছেলে বা মেয়েকে কাছে ডাকা হলো না যে পা ছুঁয়ে প্রণাম করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে তার আর্জি পেশ করবে—একখানা ছোটখাটো চাকরী কেবল, আর কিছু নয়। মনে মনে অস্থির হয়ে উঠি। অতি প্রত্যাশিত বিড়ম্বনার সেই অবধারিত পর্যায়টুকু পার করে দিই না কেন আমরা, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব? কিন্তু না, সে মুহূর্তটি আসে না। প্রস্থানের জন্যে তৈরি হলে, দোতলা থেকে বাড়ির পুরো দল আমাদের পেছনে পেছনে নিচে নেমে আসে। সকলে সার বেঁধে দাঁড়ায় গেটের কাছে আমাদের বিদায় দিতে। হঠাৎ নূর সাহেব এক মিনিট দেরি করতে বলে দ্রুত ওপরে চলে যান, একটা কিছু ভুলে গেছেন তিনি। এক্ষুনি ফিরবেন। আমি সভয়ে চারদিক তাকাতে থাকি, কে আসেনি নিচে যাকে ওপরে দেখেছি আগে, কাকে ধরে সামনে এনে দাঁড় করাবেন নূর সাহেব—কে সেই সহস্র-সহস্রের ভেতর আরো একটি চাকুরীপ্রার্থী বেকার তরুণ? না, কেউ নয়। নূর সাহেব একাই ফিরে এলেন। হাতে কাগজ দিয়ে জড়ানো একগুচ্ছ লাল গোলাপ। তিনি ওগুলো আমার স্বামীর হাতে তুলে দেন। ক’দিন আগে কাগজে দেখেছেন ভক্তদের তরফ থেকে ঘটা করে ওর ষাট বছরের জন্মদিন পালন করার সংবাদ। ঠিক ঐ জগতের মানুষ নন বলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গিয়ে উপস্থিত হননি অনুষ্ঠানে, কী রকম সংকোচ হয়েছে। কিন্তু তাই বলে দেরিতে হলেও জন্মদিনের শুভেচ্ছাটা জানাতে দোষ কী? চলন্ত গাড়ি থেকে আমি বিস্ময়ে পেছনের দিকে তাকিয়ে থাকি। দেখি নূর সাহেব ও তার স্ত্রী ছেলেমেয়ে নাতিনাতনীসহ হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছেন আমাদের।

পরনিন্দা/পরচর্চা

আমার চরিত্রে বহু দোষ। কাজেকর্মে ত্রুটি-বিচ্যুতি তার চেয়েও অনেক বেশি। তারপরেও বুঝি না, পৃথিবীতে করণীয় এত কিছু থাকতে কেন যে সে অন্যের কাছে নিরন্তর কেবল আমার সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলে বেড়ায় যার অধিকাংশ-ই তার মনোকল্পিত! আমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকার বাধ্যবাধকতার মতো কোন উপকার করিনি তার। কোন বাঁধন, কোন দায়ই থাকার কথা নয় তার, আমার প্রতি। তাহলে?

ঘৃণা/বিদ্বেষ

কেবল তাঁর নাম আর গায়ের রঙটি পছন্দ নয় বলে তাকে প্রতিবেশি হিসেবে মেনে নিতে রাজি হলো না তারা কেউ। আশেপাশের বাড়ির সকল বাসিন্দারা একাট্টা হয়ে যখন জীবন একেবারেই দুর্বিষহ করে তুলল এই নবাগত বাড়ির মালিকটির, যে এই অঞ্চলের একমাত্র ব্যতিক্রমী মানুষ, যার গায়ের রঙ সাদা নয়, যে ধর্মে খ্রিস্টান নয়, ইংরেজি ভাষা যার প্রাথমিক ভাষা নয়, তখন বাধ্য হয়ে সেই গাঢ় চামড়ার লোকটি তার অনেক সখে কেনা স্বপ্নের বসতবাড়িটি গৃহহীনদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে দান করে দিয়ে রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে চলে যায়।

অনিষ্ট/কৃতঘ্নতা

যে একদিন নিজের জীবন বিপন্ন করে আমাকে বাঁচিয়েছিল, গোপনে নিজ গৃহে আশ্রয় দিয়েছিল–দু’বেলা অন্ন জুগিয়েছিল, আজ তার একমাত্র কন্যাটিকে আমি অতি অনায়াসে, সজ্ঞানে, স্থির চিত্তে নিজের হাতে বিয়ের নাম করে এক নারী-ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দিলাম।

সংশয়/অবিশ্বাস

স্বামীর সাময়িক অনুপস্থিতিতে নবজাতক কন্যাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে ঘরে ফেরার সময় আমার ঘনিষ্ঠতম বান্ধবী, যে আবার আমার উর্ধতন কর্মকর্তার স্ত্রী-ও বটে, তার গাড়িখানা নিয়ে নিজে আসতে পারবে না, পরিবর্তে, তার প্রতিবেশীকে পাঠাবে হাসপাতালে—আমাকে ঘরে নিয়ে যেতে, এটা ছিল আমার কাছে অচিন্তনীয়। মনে মনে ভাবলাম, বড়র পীড়িতি বালির বাঁধ। প্রবাসে এরকম অবস্থায় শেষ পর্যন্ত এই অভিজ্ঞতা! প্রথম শিশু-সন্তান নিয়ে স্বজনবিহীন একলা ঘরে ফেরা! অভিমানে, অনুযোগে মন যখন ভারাক্রান্ত, চক্ষু ছলছল, বন্ধুত্বের গভীরতায় যখন সন্দেহ গাঢ় জমাট-বাঁধা, শিশু কোলে ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখি সহাস্যে আমাদের বরণ করার জন্যে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে সে – হালকা হলুদ সিল্কের শাড়ি পরনে, হাতে একগাদা রকমারি উজ্জ্বল রং-এর তাজা ফুল। মুখে চোখে এক অনাবিল আনন্দ, তৃপ্তি আর প্রশান্তি। আমাদের অতি সাধারণ ছোট্ট বাড়িটার প্রতিটি ঘর ধুয়ে মুছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে আনুষ্ঠানিকভাবে সজ্জিত করেছে সে একা হাতে। তারপর অপেক্ষা করছে আমার জন্যে—আমাদের জন্যে। অপেক্ষা করছে প্রয়োজনীয় খুঁটিনাটির সকল তদারক শেষে–যেখানে যা থাকা দরকার, সব কিছুর সুষ্ঠু ব্যবস্থা সাঙ্গ করে। সামনের দরজায় ও ঘরের ভেতরের লম্বা দেওয়ালে ঝুলছে হলুদ আর সাদা রং-এর একসঙ্গে পাক লাগানো ঘন-কোঁকড়ানো সরু রিবন। সেই সঙ্গে গাঢ় গোলাপীর ওপর বড় বড় সাদা হরফে লেখা ব্যানার, ‘Welcome Home……’।

গর্ব/অহঙ্কার

তিন প্রজন্মের কোটিপতি তোমরা। উঁচু বংশ। সেই সঙ্গে তেইশ বছরের উদ্ভিন্ন যৌবন আর অনিন্দ্যসুন্দর কান্তি। তুমি ধরাকে সরা জ্ঞান করা শুরু করলে। এখন বুঝতে পারছ, যা তোমার নিজস্ব অর্জন নয়, যা নিজের মধ্যে ধারণ করতে কোন প্রচেষ্টা, সাধনা বা পরিশ্রমের দরকার হয় না, জীবন নামক প্যাকেজটির ভেতর প্রাথমিকভাবে যা আপনাআপনি চলে আসে, তা হয় বেশিদিন ধরে রাখা যায় না, নয়তো তা নেহায়েৎ-ই মূল্যহীন।

মোহ/নেশা

প্রচুর সুযোগ আর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাল রাতটা যখন স্বাভাবিকভাবে, ঘটনাবিহীন অবস্থায় পার করে দিতে পেরেছি আমরা, কঠিন এক অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি দুজনেই। কাল রাত ছিল একটি জটিল রাত। এক বিশাল সিদ্ধান্তের সন্ধিক্ষণ। এক অভূতপূর্ব ক্রান্তিকাল। আমাদের সামনে দুই জগতের দরজাই ছিল খোলা–হয় ইচ্ছার কাছে, প্রায়-অদমনীয় আবেগ আর অভিলাষের কাছে তাৎক্ষণিক আত্মসমর্পণ, নয়তো অপেক্ষাকৃত নিস্তরঙ্গ অথচ স্থায়ী সম্পর্কের ধারাবাহিকতা রক্ষা। বিস্ফোরণের বলি বহু দেখেছি জীবনে। তোমাকে একান্ত করে পেতে গিয়ে স্থায়ীভাবে হারাতে চাইনি। আমি উত্তেজনাকে বিসর্জন দিয়ে তাই সৌম্যকে বেছে নিয়েছি, যদিও জানি, বিশ্বাস-ও হয়তো করি, বার বার কাপুরুষের মতো মরণের চাইতে মুহূর্তের জন্যে একবার নড়ে চড়ে জ্বলে ওঠা, একবার বাঁচার মতো বাঁচা, সার্থক জীবনেরই ইঙ্গিত।

গোপনীয়তা/ভণিতা

কুরুক্ষেত্র বানাবার মতো অপরাধ এটা নয়। সে বোঝাতে চেষ্টা করে, ধনেপাতার গন্ধ তার যে ভয়ানক অপছন্দ, সেটা এতো বছর ধরে আমাকে জানতে না দেওয়ার মধ্যে কোন ষড়যন্ত্র বা দুরভিসন্ধি ছিল না তার। একমাত্র কারণ–যার জন্যে একথা আমাকে কখনো সে বলেনি, আর তা হলো–সে জানে আমি ধনেপাতা ভীষণ পছন্দ করি। কেন মিছেমিছি আমাকে বঞ্চিত করবে যেখানে সত্যিকারের ভালোলাগার জিনিস এতো কম পৃথিবীতে? তাছাড়া, বছরের পর বছর খেতে খেতে আজকাল আর ধনেপাতার গন্ধটা আগের মতো তেমন তীব্র আর জংলি-ও মনে হয় না তার কাছে। এমন কি কখনো সখনো কোন কোন তরকারিতে এই গন্ধ ভালো-ও লাগে তার। মানুষ নতুন কিছুতে, প্রাথমিকভাবে অপছন্দের কিছুতে আস্তে আস্তে “taste develop”-ও তো করে! করে না? সে বোঝাতে চেষ্টা করে আমায়। যেমন, ধরা যাক, আমি বিয়ের পর প্রথম প্রথম চাইনিজ খেতে একদম পছন্দ করতাম না। এখন তো প্রতিমাসে একবার অন্তত চাইনিজ খাবার না খেলে চলে না আমার। কিন্তু এসব যুক্তির কথা আমি মানতে রাজি নই। আমার সোজাসাপ্টা প্রশ্ন, এটা এতোদিন, এতো বছর একত্রে ঘর করার পরেও কেন আমার কাছে গোপন করে রাখলো সে? কেমন করে তা পারলো? কেন আমাকে বোকার মতো তৃতীয় ব্যক্তির মুখ থেকে তা জানতে হলো আজ? তাহলে কি সে তার জীবনের এমন আরো অনেক কিছুই গোপন করে রেখেছে আমার কাছে? তার নিজস্ব এবং ভিন্ন একটা জগত কি রয়েছে যেখানে আমার প্রবেশ নিষেধ? তার সম্পর্কে, তার পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারে আরো নতুন নতুন তথ্য কি আবিষ্কার করবো আমি? সত্যি বলতে কী, তার ওপর বিশ্বাস হারাতে বসেছি আমি। ধনেপাতা এমন মহা কিছু খাদ্যদ্রব্য নয় যে আমাকে তা খেতেই হতো। তার অপছন্দ জানলে আমিও না হয় খেতাম না তা। পৃথিবীতে রকমারি খাবার-দাবারের অভাব আছে? পুরো এক সপ্তাহ কেটে যাবার পরেও যখন আমার মাথা ঠাণ্ডা হয় না, দু’জনের মধ্যে কথাবার্তা প্রায় বন্ধ সামান্য ধনেপাতাকে কেন্দ্র করে, তখন প্রকৃত-ই কিছুটা রাগান্বিত হয়ে পড়ে সে। সেদিন সকালে অফিসে যাবার মুখে একটা কঠিন প্রশ্ন রেখে যায় সে আমার জন্যে। ভেবে দেখতে বলে, তার চরিত্রে বা তার ভালোলাগার জিনিসের মধ্যে এমন কিছুই কি নেই যা আমি মোটেও পছন্দ করি না, কিন্তু মুখ বুজে সহ্য করি কেবল এই জন্যে যে হয় সেটা তার বিশেষ পছন্দের, না হয় যার ওপর তার তেমন নিয়ন্ত্রণ নেই–যা প্রাকৃতিক বা জেনেটিকভাবে পূর্বনির্ধারিত? ভাবনার জন্যে বেশিদূর এগুবার আগেই আমি আবিষ্কার করি, ওর বিশেষ পছন্দের নায়িকা সুচিত্রা সেনের পুরনো ছবিগুলো, বিশেষ করে উত্তম-সুচিত্রা জুটির সেই রমরমা ছবিগুলো, যা পুনঃ পুনঃ রাত জেগে দেখে সে এবং চায় আমিও তার পাশে বসে তারই মতো করে তা উপভোগ করি, সেসব ছবি দেখতে দেখতে মনে মনে সেই দুর্দান্ত আকর্ষণীয় মুখমণ্ডল ও দেহবল্লভের অধিকারী নায়িকা সুচিত্রা সেনের অতি-অভিনয় আর ন্যাকামির জন্যে যত-ই বিরক্ত হই না কেন আমি, মুখে হাসি অক্ষূণ্ন রেখে এবং আগ্রহ সহকারে সম্পূর্ণ ছবিটি পাশে বসে দেখে এই ধারণা কি দিই না তাকে যে সুচিত্রা-উত্তম জুটির হিট ছবিগুলো তার মতোই আমারও খুব পছন্দের? তাহলে?

সংস্কার ও স্পৃহা

কুড়ি না পেরুতেই ঠাকুমা বিধবা হয়। সেও প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা। আমার বাবা ঠাকুমার সবচেয়ে ছোট ছেলে। আমাদের কাছেই বরাবর থাকে ঠাকুমা। রোজ সকালে চটের থলিতে করে কাঁচা বাজারটা বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই ঠাকুমা ছুটে যায় সেখানে। বাজার থেকে কী কী এলো দেখার জন্যে ভীষণ কৌতূহল ঠাকুমার। থলি খুলে প্রথমেই হাতিপাতি করে দেখবে কী মাছ এসেছে। তরতাজা সব তরিতরকারি, কুমড়ো, ডাটা, বেগুন, বা আলু, কপি, কাঁচামরিচ, পুঁই শাক, কচুর লতির নিচে পড়ে থাকা সেদিনের জন্যে কেনা খানিকটা তাজা মাছ। চকচকে দৃষ্টিতে একমনে মাছ দেখে ঠাকুমা। কুলীন কায়স্থ ঘরের বিধবা সে। মাছ, মাংস থেকে শুরু করে পেঁয়াজ, রসুন, মুসুরি ডাল–যা কিছু উপাদেয়, যা কিছু স্বাস্থ্যকর, প্রায় সব কিছুই নিষিদ্ধ তার জন্যে। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ঠাকুমা এক বেলা (মধ্যাহ্নে) মাত্র অন্ন গ্রহণ করে আসছে। এটাই নিয়ম। বিনা প্রতিবাদে প্রতিদিন ভক্ষণ করে চলেছে সেই একঘেয়ে গতানুগতিক খাবার–মূলা, ডাটা অথবা লাউ দিয়ে রাঁধা মটর বা খেসারী ডাল (কখনো সখনো মুগ বা ছোলার ডাল), শাক বা পাঁচমিশালি তরকারি, সেই সঙ্গে কখনো কখনো বাড়তি একটুখানি সরষের তেল বা নামমাত্র ঘিয়ের সঙ্গে আলু বা উচ্ছে সেদ্ধ। সাথে আতপ চালের ভাত। মাছগুলো দু’হাতে ধরে ছানতে ছানতে ঠাকুমা মার উদ্দেশে বলে, “বৌ, তুমি অন্য কামগুলি সার। আমি আউজকা মাছটা কাইট্যা দেই তোমারে।” মার মুখ অন্ধকার হয়ে আসে। এই কথাটা শোনার সময় ঠাকুমার কাছ থেকে যদি দূরে থেকে থাকে মা, ঠাকুমাকে নিরস্ত করা যাবে না বুঝতে পেরে তার মুখ থেকে কোন অপ্রীতিকর মন্তব্য বেরিয়ে আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেইসব মন্তব্য কানে এলে আমাদের অতি পরিচিত স্নেহশীল মা’টিকে অকস্মাৎ কেমন যেন ভীষণ নিষ্ঠুর বলে মনে হয়। বুঝতে পারি, এই দৈনন্দিন কাঁচা বাজারের থলেখানা নিয়ে মা-ঠাকুমার মধ্যে অদৃশ্য এক দ্বন্দ্ব, টানাপোড়েন চলছে। আর ঠাকুমার এ প্রস্তাব উত্থাপনের সময় মা যদি তার আশেপাশেই থেকে থাকে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি করার চেষ্টা করে মা এই বলে যে, ঠাকুমা কেন শুধু শুধু মাছ কুটতে গিয়ে আবার চানটান করার ঝামেলা পোহাবে। তার চেয়ে ঠাকুমা বরং পুজোর ঘরে গিয়ে আহ্নিকটা সেরে ফেলতে পারে এখন! মা নিজেই কেটে নেবে ঐ কয়েকটি মাছ। ওটা কোন ব্যাপার নয়। মোট কথা, আমার ধারণা, যে ঠাকুমার মাছ খাওয়া বারণ, তাকে দিয়ে মাছ কুটানো অনুচিত বা অনাকাঙ্ক্ষিত মনে করে মা। ঠাকুমা তবু জোর করে, প্রায় টানাটানি করে মাকে মাছ কুটতে সাহায্য করার জন্যে। কোনদিন সফল হয়, কোনদিন হয় না। আমি যদিও তখন যথেষ্ট ছোট, এটুকু বুঝি যে খাদ্যের স্বাদের সঙ্গে ঠাকুমার পরিচয় রয়েছে, যা গ্রহণ করতে মনও হয়তো চায় তার, তা পরিপূর্ণ নিষিদ্ধ যখন, তখন অন্যভাবে, অর্থাৎ একে ছুঁয়ে, ছেনে, ধরে-টরে, অপরকে তা খাইয়ে এবং খেতে দেখে পরোক্ষে একরকম তৃপ্তি ও আনন্দ পায় সে। এটুকু করতে দিতে মা কেন যে বাধা দেয় ঠাকুমাকে! কেন যে দেয় তা টের পেলাম–স্বচক্ষে দেখতে পেলাম একদিন। সে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। অঘ্রাণের এক পড়ন্ত বিকেলের আলো-ছায়ায় আমাদের বাড়ির উঠোনের দক্ষিণ কোণে বিশাল চালতে গাছটার গোড়ার দিকে বসে মাথা নিচু করে মুখ দিয়ে এক বিজাতীয় শব্দ বের করছে ঠাকুমা। তার উপুড় করা খোলা মুখ দিয়ে অনবরত বের হচ্ছে শ্লেষ্মা। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, খুব-ই কষ্ট হচ্ছে তাঁর। চাপা কণ্ঠে খক খক, ওয়াক ওয়াক করে গলা থেকে অদ্ভুত এক শব্দ বের করে বমি করার চেষ্টা করছে ঠাকুমা। তার ফর্সা গোলগাল মুখখানা রাঙা হয়ে উঠেছে। ঘোমটা সরে যাওয়ায় মাথাভর্তি তার ছোট ছোট করে কাটা ঘন সাদা চুলগুলো দেখা যাচ্ছে, যা সাধারণত কখনো দেখতে পাই না আমরা। চোখ দিয়ে ক্রমাগত জল ঝরছে ঠাকুমার। আর মা তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে কোমর ভেঙে নিচু হয়ে ঠাকুমার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বক বক করে কী যেন অনর্গল বলে যাচ্ছে। তার মুখখানা দেখে বুঝি–ঠাকুমার যা-ই হয়ে থাক, মা তাতে মোটেও খুশী নয়। তারপরেও ঠাকুমাকে সাহায্য করার প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছে মা। ঘর থেকে বেরিয়ে অন্য বোনদের সঙ্গে একটু দূরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চুপচাপ সব দেখি আমরা। মায়ের আদেশে কেউ কাছে যেতে সাহস করি না। শুনি, মা দাঁতে দাঁত চেপে চাপা গলায় বলছে, “পাপ। পাপ। মহা পাপ।’ এই মহাপাপের ফলে গোটা সংসারের সর্বনাশ নাকি অবশ্যম্ভাবী। মায়ের ধারণা–এজন্যে রসাতলে যাবে সবাই। সেদিন বিকেলে, সন্ধ্যায়, রাতে ঠাকুমা অনবরত ঘরের একোণে সেকোণে বসে বসে অনেক গোঙায়। একটানা খক খক করে, ওক দিয়ে, বমি করে ভাসায় কয়েকবার। মা সেসব পরিষ্কার করে, আর একনাগাড়ে বক বক করে ঠাকুমার পিণ্ডি চটকায়। একসময় সাদায় কালোয় মেশানো বাড়ির বিশাল পোষা বেড়ালটার পায়ে ধর্ণা দেবার কথা ওঠে, কষ্ট থেকে মুক্তি পাবার আশায়। এই কুসংস্কারে মা-ঠাকুমা দুজনেই পরম বিশ্বাসী। মনে পড়ে, আমার বয়স যখন ছয়, গলায় ইলিশ মাছের কাঁটা ফুটলে বেড়ালের পা ধরতে বলেছিল মা, ঠাকুমা দুজনেই। গলায় প্রচণ্ড অস্বস্তি নিয়েও আমি হেসে কুটি কুটি হয়ে গড়িয়ে পড়েছিলাম। পরিত্রাণের জন্যে বেড়ালের পা ধরা আর হয়নি। না চাবিয়ে শুকনো ভাতের মুঠি গিললে এমনিতেই সেরে গিয়েছিল। কিন্তু সেই চেষ্টা করে ঠাকুমার ব্যথা আরো বেড়ে গেছে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় নিঃশব্দে দুই চোখ থেকে অনবরত ঝরতে থাকা জল শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে নিয়ে ঠাকুমা এবার সত্যি সত্যি দুই হাতে বেড়ালটির সামনের দুই পা জড়িয়ে ধরে মাথা নিচু করে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বিড় বিড় করে অস্পষ্ট সুরে কিছু বলতে শুরু করে। কিন্তু তাতে মুক্তি মেলে না। অবশেষে ঠাকুমার মুখের কাছে কুপি উঁচিয়ে ধরে, মুখ হা করিয়ে গলার ভেতর সরু চিমটি ঢুকিয়ে কিছু বের করে আনার চেষ্টা করে মা। কিন্তু ব্যর্থ হয়। যতদূর দেখা যায়, কিছুই চোখে পড়ে না। আরো গভীরে আছে কিছু। ঠাকুমা তখন পুনঃ পুনঃ মার কাছে অনুনয় করতে থাকে, তার শারীরিক অবস্থার কথা তার কনিষ্ঠ পুত্রকে, মানে আমাদের বাবাকে, যেন জানানো না হয়। কিন্তু গভীর রাতে ঠাকুমার কষ্ট আরো বেড়ে গেলে অন্য কোনো উপায় না দেখে বাধ্য হয়ে বাবাকে কথাটা জানাতেই হয় মাকে। অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তারের বাড়িটা আমাদের বাসা থেকে বেশি দূরে নয়। মনে আছে সে রাতে আকাশে বিশাল এক চাঁদ উঠেছিল। হয়তো পূর্ণিমা ছিল, বা তার কাছাকাছি সময়। ফকফকে জোছনায় চরাচর ভেসে যাচ্ছিল। পাড়ার রাস্তা ধরে বাবার সঙ্গে মা আর ঠাকুমা হাঁটতে শুরু করে। সে রাত অন্য রাতের মতো নয়। আর তাছাড়া আমি বাড়ির সবার ছোট মেয়ে। ফলে মার পিছে পিছে আমিও চলি। বাধা দেবার কথা হয়তো কারো মনেও আসে না সে সময়। কী হয়েছে ঠাকুমার, ডাক্তার জানতে চাইলে মা নিজেই উত্তর দেয়। সেদিন দুপুরে ঠাকুমা পুকুরে শাক ধুতে গেলে তার অজান্তে শাকের ঝাঁকাতে হয়তো কোন ছোট মাছ ধরা পড়ে যায়। বুড়ো মানুষ। চোখে দেখতে পায়নি। শাকের সঙ্গে হয়তো বন্দি মাছটিকেও রেঁধে ফেলেছিল ভুলে। শাক দিয়ে ভাত খাবার সময় মনে হয়, গলায় কাঁটা বিঁধেছে। অথবা অন্য কোনো কিছু ফুটেছে গলায়। হয়তো কোনো বাঁশের কাঠি, তরকারির শক্ত আঁশ কিংবা অন্য কিছু। ডাক্তার বাঁ হাতে ছোট্ট টর্চটি ধরে ডান হাত দিয়ে তার সরু আর লম্বা ফোরসেপখানি ঢুকিয়ে দেন ঠাকুমার গলার ভেতর। তারপর ঠাকুমার গোঙানি সত্ত্বেও কিছুক্ষণ ঘাঁটাঘাঁটি করে তার গলার গভীর খাদ থেকে যা বের করে আনেন, তা শাকের ঝাঁকায় অসাবধানতায় উঠে আসা কোনো ছোট্ট মাছের কাঁটা, বাঁশের টুকরো কিংবা শক্ত আঁশ নয়। রীতিমতো বড়-সড় স্বাস্থ্যবান বঙ্কিম এক মাছের কাঁটা। চিনতে অসুবিধে হয় না কারো, ডাক্তারের ফোরসেপের দুই দাঁতের মাঝখানে আটকা পড়ে আছে কৈ মাছের গলার কাছের অর্ধ বৃত্তের মতো শক্ত, কালচে আর ভয়ঙ্কর সেই কাঁটা। মনে পড়ে, সেদিন দুপুরেই ফুলকপি আর আলু দিয়ে রাঁধা কৈ মাছের ঝোল থেকে এক টুকরো লেজের অংশ দিয়ে আমায় ভাত খেতে দিয়েছিল মা। মাথার কাছে বেশি বেশি ও জটিল ধরনের কাঁটা থাকে বলে বাচ্চাদের সবসময় কৈ মাছের নিচের অংশই দেওয়া হয়। কাঁটাটা বের করে আলোর কাছে উঁচু করে যখন ধরলেন ডাক্তার, মা-বাবা দুজনেরই চোখগুলো মুহূর্তের জন্যে বিস্ফারিত হয়ে উঠেই নিবে গেল। তাদের মুখমণ্ডল আস্তে আস্তে কালো হয়ে এলো। ঠাকুমার মাথা সামনের দিকে আরো যেন নুয়ে পড়েছে। কারো দিকেই আর তাকাচ্ছে না সে। ডাক্তার বললেন, ‘খুব সাবধান। এর পরে পুকুরে শাক-তরকারি ধুতে গেলে খুব সাবধান! মাছঠাছ উঠে না আসে। বড় বাঁচা বেঁচে গেছেন এইবার।’

purabibasu@gmail.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (7) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজীব আহ্‌মেদ জয় — এপ্রিল ২৫, ২০১১ @ ১০:৩২ অপরাহ্ন

      ভাল লাগল লেখাটা। কয়েকটা শিরোনামের নিচের লেখা- ভয়/আতঙ্ক, কাম/সম্ভোগ, সন্দেহ/আশঙ্কা, গোপনীয়তা/ভণিতা- তো অসাধারণ লাগল! এতদিনে বুঝলাম যে পূরবী বসুর কাছে অন্য কেউ ভেবে ফেসবুকে আমি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলাম- সে কে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আবদুর রব — এপ্রিল ২৬, ২০১১ @ ১২:২৪ পূর্বাহ্ন

      অদ্ভুত! এ যেন জীবনের অন্দর মহলের চলচ্ছবি, রিপুর জীবন্ত বিবলিওগ্রাফি…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মারুফ মতিন — এপ্রিল ২৬, ২০১১ @ ১:০৩ অপরাহ্ন

      দারুন। অসাধারণ। এ রকম লেখা বিরল। জীবনের সব দিক আলকিত।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সিরাজুল হোসেন — এপ্রিল ২৮, ২০১১ @ ৫:২৮ অপরাহ্ন

      জীবনবৃক্ষ থেকে অনেক রং, কোন কোন রং প্রকাশিত নয়, অন্তরালের, তা প্রকাশ করতে নেই বলেই আমার মনে হয় – নিজের প্রতি সুবিচার করা সবচেয়ে কঠিন, তাই বোধহয় সে চেষ্টা না করাই ভাল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শাকিল আহমেদ শাওন — এপ্রিল ২৮, ২০১১ @ ১১:৫৯ অপরাহ্ন

      খুব ভাল লেখা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গীতা দাস — মে ১, ২০১১ @ ৫:৫১ অপরাহ্ন

      জীবনের জটিল পরত ফুটে উঠেছে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com