জীবনের পাতায় পাতায় (৪)

বেবী মওদুদ | ১৫ মার্চ ২০১১ ২:৪৯ অপরাহ্ন

শুরুর কিস্তি কিস্তি ২
——————————–
স্মৃতিকথা ধারাবাহিক
——————————–
কিস্তি ৩-এর পর

যশোর রেলওয়ে স্টেশন বৃটিশ আমলের তৈরি। বলা চলে স্থলপথে কলকাতা যাবার এটাই প্রধান দ্বার। দর্শনা হয়ে বনগাঁ, কৃষ্ণনগর ও নদীয়া হয়ে রেলগাড়িতে চড়ে কলকাতা শিয়ালদহ স্টেশনে যাওয় যেত। এবার রেলগাড়িতে উঠে আমরা বগুড়া এলাম। দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়। তবে জানালা খুলে গ্রামীণ দৃশ্য দেখতে দেখতে এবং ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এই ভ্রমণ আমাদের খুব ভালো লাগতো। তখন তো আমরা পাঁচ ভাই ও দুই বোন। আব্বা একটা বগিই রিজার্ভ করে নিতেন। আমার মা রান্না করা খাবার সঙ্গে নিলেও রেলের খাবারও যথেষ্ট ভালো ছিল। মনে আছে আমরা রাতে বগুড়া শহরে পৌঁছাই।

2_1.jpg
বগুড়ায় ১৯৫৪ সালের সাব-জজ কোয়ার্টার এখন জজ কোয়ার্টার

বগুড়ার সাত মাথার কাছেই সুত্রাপুর এলাকায় আমাদের বাসা ছিল। বিরাট বাউন্ডারির ভেতরে আমাদেরটা ছিল সাবজজ কোয়ার্টার। আরও তিনটা বাসা ছিল মুনসেফ সাহেবদের জন্য। আমাদের বাসার সামনে ছিল খোলা বড় মাঠ। গেটটা বন্ধ রাখা ও খোলার দায়িত্ব ছিল একজন চাপরাশির। একজন নাইট গার্ডও থাকতো রাতের বেলা। আর আমার আব্বার সঙ্গে অফিসে যাতায়াত করতো একজন চাপরাশি। কোর্ট কাছেই ছিল বলে আব্বা হেঁটে যাতায়াত করতেন। বাড়িতে কাজের লোকজনও ছিল। তখনও হ্যারিকেন বাতিই ছিল ভরসা। ভেতরে বিশাল উঠোন। একদিকে রান্নাঘর, অন্যদিকে সেই আমলের কাঁচা পায়খানা। নীচে মাটির চারী বসানো থাকতো। মেথর সকালে শুয়োর টানা গাড়ি এনে পরিস্কার করতো ঠিকই, কিন্তু বাউন্ডারির বাইরে মেথর পট্টি থেকে শুয়োরের দল আসতো। দরোজা খোলা পেয়ে উঠোনে ঢুকে পড়লে বের করাও খুব মুশকিল হতো। আমরা প্রথম প্রথম ঐ পায়খানায় যেতে চাইতাম না। আর শুয়োর দেখেও খুব ভয় পেতাম। পরে সবকিছু সয়ে যেতে হয়। বৃষ্টি হলে ছাতা মাথায় দিয়ে ওখানে যাওয়াটা একটা বিড়ম্বনা হতো। তখন ঘরের পাশে বারান্দায় একটা পায়খানা করা হয়। আমরা অবশ্য উঠোনে টিউবওয়েলের পানিতে গোসল করতাম।

উঠোনে ডালিম, বাতাবি, পেয়ারা, বরুই ও লেবু গাছ ছিল। ডালিম কাঁচা থাকতেই আমি পেড়ে খেয়ে নিতাম। পেয়ারা গাছে ওঠা শিখলাম। পায়খানার পাশে একটা বড় নিমগাছ ছিল। নিমপাতার চিকন ডাল কেটে দাঁত মাজা, নিমফল কুড়ানো চলতো। গাছভর্তি কাক আর পাখিদের বাসা ছিল। বাড়ির সামনে গেটের পাশে একটা শিউলি ফুলের গাছ ছিল। আশ্বিনের সকালে উঠে দেখতাম শিউলির চাদর বিছানো রয়েছে। শিউলি কুড়িয়ে মালা গেঁথে বাড়ির সবাইকে উপহার দিলে খুব খুশি হতো সবাই। কাছেই ছিল এডওয়ার্ড পার্ক। সেখানে ভোরবেলা বকুল ফুল ঝরে থাকতো। বকুলের গন্ধটা আমাকে খুব টানতো। ফ্রকের কোচরে করে ফুল কুড়িয়ে এনে মালা তৈরি করতাম। হুমায়ুন ও রুবীও শিখে ফেললো মালা গাঁথা। আমরাও লাগালাম বেলি, জবা, জুঁই, মাধবী লতা। আমার মা ফল গাছ লাগালেন অনেক। যখন ফুল ও ফল ধরতো আমাদের খুশির সীমা থাকতো না।

আমার মা মুরগী পালতেন। মুরগীর ডিম দিয়ে যেদিন মুরগি রান্না করতেন বাড়িতে যেন ভোজের উৎসব হতো। প্রতিদিন এক বাটি দুধ খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল আমাদের জন্য। চায়ের কাপে চা খেতেন শুধু আমার বাবা। আমরা খেতাম বাটিতে। আমার বাটি ছিল সাদা রঙের; তবে লাল রঙের ফুল আঁকা। আমার মা-ও চা খেতেন বাটিতে। আমরা দেখেছি, আজীবন তিনি এই বাটি করেই চা খেতেন। এ সময় থেকে আমিও সকালে চা খেতে শুরু করি। আমার মা হরলিক্স দিয়ে চা খেতেন। মাঝে মাঝে আমিও হরলিক্স দিয়ে চা খাবার সুযোগ পেতাম। আমার মা কখনও দুধ বা দুধের তৈরি খাবার খেতেন না। তবে মিষ্টি ও দই খুব পছন্দ করতেন। চৌকির ওপর দস্তরখানা বিছিয়ে খাবার খেতাম। রান্নাঘরে পিঁড়িতে বসেও খাওয়া চলতো। আমাদের সাত ভাই-বোনের প্রত্যেকের জন্য পিঁড়ি তৈরি করা হয়েছিল।

আমার বাবা খুব সিগারেট খেতেন। একটা টিনভর্তি সিগারেট কিনতেন। আমার লক্ষ্য থাকতো টিনটার প্রতি–কখন খালি হবে, কখন আমি পাবো। সিগারেট শেষ হলেই বাবা আমাকে ডেকে দিয়ে দিতেন। কখনও কখনও বড় ভাইদের দিতাম। এখানে বাবাকে অনেকদিন রাবারের নলে টানা হুক্কায় তামাকের ধুমপান করতে দেখেছি। তামাকের গন্ধে সারা ঘর ভরে যেত বলে আমার মা বারান্দায় বসে খেতে বলতেন। বাবা অফিসে গেলে বড় ভাইরা টেনে আমাদের দেখাতো।

বাড়িতে আমরা তখনও সবাই খড়ম পায়ে চলাফেরা করতাম। আমারও একজোড়া রঙ্গীন খড়ম ছিল। বাইরে যাবার সময় জুতো পরতাম। আমার বাবা অফিসে যেতেন কোট পরে। তবে তিনি সাধারণতঃ সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরতেন। আজীবন সেটাই দেখেছি। দর্জি এসে তাঁর ও ভাইদের মাপ নিয়ে যেত। এমন কি প্রতি মাসের প্রথম রোববার নাপিত এসে আমার বাবা ও ভাইদের চুল কেটে দিয়ে যেত। আমাদের ফ্রক সেলাই করতেন মা, তাঁর সেই বিখ্যাত, ১৯৩৮ সালে কেনা সিঙ্গার সেলাই মেশিনে। সেই মেশিনটি এখনও এ্যান্টিক হিসেবে আমার কাছে আছে। আমার মা চেষ্টা করতেন আমাকে সেলাই শেখাতে। সুঁইয়ে সুতো ভরা, বোতাম লাগানো। কিন্তু সেলাই শেখার কোন ইচ্ছাই আমার হতো না। আমার মন পড়ে থাকতো বাইরে। কচুপাতার শিশিরগুলো কী ঝরে গেছে? সেই সুন্দর প্রজাপতিটা কী ফুলে ফুলে এখনও উড়ছে? ফড়িংগুলো আজও কী সবাই একসঙ্গে আসবে? বরুই গাছের পাকা বরুইগুলো পাড়তে একটা কঞ্চি খুঁজতে হবে। পাখির বাসা খুঁজে বাচ্চা দেখতাম। পাখিরা টের পেলে খুব হৈ চৈ করতো। কিন্তু আমরা তো শুধু অবাক হয়ে দেখতাম। আমার মা সেলাই করতে করতে ঘুমিয়ে পড়তেন, আমি সেই ফাঁকে বেরিয়ে পাড়া ঘুরতাম।

আমাদের বাউন্ডারিতেই ছিল হাসান ভাই, হাসিব, সহিদ ও ওয়াহিদ চার ভাই। চাচা-চাচীও খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আরও একটা বাসায় থাকতো নাসরিন, পারভীন ও খোকন । আমাদের খেলার সাথী ছিল ওরা। তিন বাসাতেই সবার মাঝে ভালো সম্পর্ক ছিল। এ বাড়ির রান্না মাছ, ও বাড়ির পিঠা-পায়েস আনা-নেওয়া চলতো। শবে বরাতের সময় আমরা বাড়ি বাড়ি রুটি ও হালুয়া নিয়ে যেতাম। সন্ধ্যাবেলা সবাই বাড়ির ঘর-বারান্দা জুড়ে মোমবাতি জ্বালাতাম। পটকা ফোটাত বড় ভাইরা। আলোর ফুলঝুরি জ্বালাতাম। আমার মনে পড়তো আলোকের এই ঝর্ণাধারা গানটি। পাড়া-প্রতিবেশির মধ্যে একটা ভালো মধুর সম্পর্ক ছিল। তিন নাম্বার বাড়িটায় কারা থাকতেন আজ আর মনে নেই। তবে তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। আমার যাতায়ত ছিল সবার কাছে। বাউন্ডারির বাইরে আরও একটা বাড়িতে যেতাম। রুবি ও বেবীর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিল। এখন এরা কে কোথায় আমার জানা নেই।

dsc_0494.jpg
মিশন প্রইমারি স্কুল, ২০১১

বগুড়ায় আমি ও ছোট ভাই হুমায়ুন স্কুলে ভর্তি হই। গিলবার্ট সাহেবের মিশনারী প্রাথমিক স্কুল-এ প্রথম শ্রেণীতে। স্কুলের নাম–মিশন প্রইমারি স্কুল। ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।এবং এখনও আছে। আমরা মেঝের ওপর মাদুরে বসতাম এবং নীচু ডেস্কে বই রাখতাম ও শ্লেটে লিখতাম। আমাদের সঙ্গে ভানু, সোহেলী, আনন্দ, সীতা নামে ছেলে মেয়েরা পড়তো। মনে আছে স্কুলের পোষাক ছিল সাদা। সকালে গিয়ে বারোটায় চলে আসতাম। আমাদের বাসার একজন চাপরাশি সাইকেলের সামনে হুমায়ুন ও পেছনে আমাকে বসিয়ে নিয়ে যেত। প্রথম যেদিন স্কুলে গেলাম, আবার মা ঘিয়ে ভাজা পরোটা, হালুয়া ও ডিম সেদ্ধ খেতে দেন। কত দোয়া-দরুদ পড়ে মুখে বুকে ফুঁ দিয়ে দিলেন। কত ভালো কথা বলে মন দিয়ে লেখাপড়া করতে বললেন। কিছু কিছু সাবধানতার কথাও বলেছেন। স্কুল শুরুতে একটা প্রার্থনা সঙ্গীত হতো। অনেক ছেলেমেয়ে পড়তো স্কুলে। বিনা বেতনে তো ছিলই, খুবই ভালো স্কুল হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তিতে আমরা পাড়ার ছেলেমেয়ে সবাই একসঙ্গে স্কুলে যেতাম। আমাকে সবাই এতো মানতো ও ভালোবাসতো যে আমি যেন তাদের আত্মার আত্মীয়। স্কুলে দুষ্টামি করলে কানধরে হাঁটু ভেঙে বসে থাকার শাস্তি ছিল। আমি একটু বড় হলে বাড়ির কাছের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়।

dsc_0485.jpg
………….
মিশন প্রাইমারি স্কুলের এখনকার শিক্ষার্থীরা
………….

বই পড়ার অভ্যাস আমার তখন পাঠ্য বইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল। বিশেষ করে বাংলা বইয়ের সব কবিতাই মুখস্থ থাকতো। স্কুলে হাতের লেখা থাকলে আমি মুখস্থ কবিতাই লিখতাম। আমার বাবার আলমারি ভর্তি বইগুলো চেয়ে চেয়ে দেখতাম আর ভাবতাম–আর কত বড় হলে ওগুলো পড়তে পারবো?

আমাদের বগুড়া থাকার এই সময় ভারত যাতায়াতে পাসপোর্ট ও ভিসা পদ্ধতি চালু হয়। এতে মা-বাবা খুব দুঃখ পেয়েছিলেন। বাবা কোনদিন আর ভারত যাননি। পরে মা পাসপোর্ট করে, ভিসা নিয়ে আমাদের ভারতে নিয়ে গিয়েছিলেন।

এখানে থাকতে আমাদের সাত ভাই বোনের জল বসন্ত হয়। সবার শেষে হলো আমার। মশারির ভেতর একা একা ঘরে শুয়ে থাকতে ভালো লাগতো না। আমার মা নিমপাতা ভেজে ভাতে মাখিয়ে খাইয়ে দিতেন। নিমপাতা গরম পানিতে ফুটিয়ে গোসল করাতেন। খুব শীঘ্রি সুস্থ হয়ে উঠি। তবে বসন্তের দাগ তখনও আমার সারেনি। আমার মা রোজ গোলাপ জল দিয়ে গোটার দাগ মুছে দিতেন, আর চিন্তা করতেন দাগ যদি না মুছে যায় তাহলে আমার ভবিষ্যৎ খুব খারাপ হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একদিন সব দাগ মুছে যায়। এই অসুস্থ অবস্থায় একদিন আমি ঘুমিয়ে আছি, দুপুরে আমার ছোট ভাই হুমায়ুন কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরে আমার কাছে নালিশ করলো, একজন তার শ্লেট ভেঙেছে এবং খুব বকেছে। শুনে আমি তার হাত ধরে সোজা স্কুলে গিয়ে তার শ্লেট ভেঙে দিলাম। সে আর কেউ নয়। আমাদের বাসা থেকে বেশ পেছনে একটা বাসায় ওরা থাকতো। রুবী ও বেবী ওদের নাম। বেবী ছোট, সে ভেঙেছিল শ্লেট। অনেকদিন ওদের সঙ্গে কথা বলিনি। আড়ি দেয়া তখন শিখেছিলাম। ওদের বাসায় একটা বড় বরুই গাছে মিষ্টি বরুই ধরতো। সেই বরুইয়ের লোভে আবার দ্রুত ভাব হয়ে যায়।

dsc_0482.jpg
মিশন প্রাইমারি স্কুলে এখনকার পাঠদান

বগুড়া পুলিশ লাইনের মাঠে প্রায় আমরা ফুটবল খেলা দেখতে যেতাম। আমাদের বাসার সামনের মাঠেও বড় ভাইরা তাদের বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন। আমরা বাড়ির সিঁড়িতে বসে খেলা দেখতাম। খেলা শেষ হলে আমরা ছোটরা বল নিয়ে কিছুক্ষণ খেলতাম। বড় ভাই সাইকেল চালাতে পারতেন। তিনি আমাদেরও শেখাতেন। সাইকেল চালাতে গিয়ে কতবার পড়ে গিয়ে হাত-পায়ে ব্যথা পেয়েছি। কেটে রক্ত পড়েছে। ভালো হয়ে আবার চালাতাম।

বগুড়ায় আমার মা প্রায় প্রতি সপ্তাহে নতুন সিনেমা এলেই দেখতে যেতেন। আমাকেই তার সঙ্গী হতে হতো। প্রতিবেশি চাচীদের সঙ্গে গেলেও আমাকে মা সবসময় সঙ্গে নিয়ে যেতেন। ছবি দেখতে দেখতে আমি তাঁর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যেতাম। ছবি ভালো না বুঝলেও আমি গান শুনে খুব আনন্দ পেতাম। অশোক কুমার, রাজকাপুর ও দিলীপ কুমারের ছবি ছিল আমার মায়ের প্রিয়। মেরিনা ও উত্তরা সিনেমা হল ছিল। কলকাতার বাংলা ও বোম্বাইয়ের হিন্দী ছবি চলতো খূব। ছবির গানগুলো ভালোলাগতো। তখন দেখা ‘বহুৎ দিন হুয়ে’ ছবির নামটি মনে আছে।

বগুড়ায় আমার বাবার এক চাচাত ভাই মোহাম্মদ মুসা বিয়ে করেছিলেন। ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বিভিন্নস্থানে চাকুরি করতেন। এবং পরবর্তিকালে ভূমি মন্ত্রণালয়ে উপ-সচিব পদেও উন্নীত হন। আমার চাচার শ্বশুর বাড়িতে আমাদেরও সমাদর ছিল। বাড়ির পেছনে একটা বড় দিঘি ছিল। সেই দিঘির মাছ ধরা হলে আমাদের বাসায় আসতো। আমার চাচা বগুড়ায় এলে তার ছেলে ফটিক আমাদের সঙ্গে থাকতো, খেলতো। আমার এই চাচাতো ভাই ফটিক ছোটবেলা থেকেই আমার ভক্ত ছিল। আমার ছোটভাই হুমায়ুন ও সে প্রায় সমবয়সী থাকায়, আমরা তিনজন খুব মজা করে ঘুরে বেড়াতাম ও খেলতাম।

আমরা বড় দিঘিতে সাঁতার কাটা শিখতাম। আমার চুল ছোট থাকায় দ্রুত শুকিয়ে যেত। ঘরে ফিরে আবার গোসল করতাম। মা টের পেলে বকা খেতে হতো। খুব রোগা পাতলা ছিলাম। বেশির ভাগ সময় রাতে খেতাম না। সন্ধ্যা হলেই ঘুমিয়ে পড়তাম। এই সময় থেকে আমি খুব জেদি ও অভিমানী হয়ে উঠি। মা বকলে সেদিন তো ভাত না খেয়ে কাটানো একটা বিষয় হয়ে উঠত। তবে ঘরে না খেলেও প্রতিবেশিদের বাড়িতে আমার আদর ও কদর ছিল। আমি আরও একটা জেদ করতাম—ভাইদের মতো শার্ট-প্যান্ট পরার জন্য।

বগুড়ায় তখনও বিদ্যুত ছিল না। আমরা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে পড়তাম, খাওয়া-দাওয়াও করতাম। শুধু হ্যারিকেন হাতে, দূরে বদনা হাতে পায়খানায় যেতে ভয় করতো। তখন মোমবাতির চলন বেশি ছিল না। তবে কুপি বা মাটির প্রদীপ জ্বালানো হতো—সাদা কাপড়ে সলতে বানিয়ে সর্ষের তেলে ভিজিয়ে। আমার মা পোড়া সলতে দিয়ে কাজলদানিতে কাজল তৈরি করে আমাদের চোখে দিতেন। তিনিও চোখে দিতেন। ছোট্ট ভাইরা জেদ করলে কপালের পাশে একটা টিপ দিতেন। চোখে কাজল দেয়া আমার খুব প্রিয় ছিল।

ভুতের গল্প শুনতাম খুব। নিশির ডাকের কথাও শুনতাম। বড় ভাই গল্পের বই পড়ে পড়ে আমাদের শোনাতেন এবং সাবধানও করে দিতেন যেন সবাই ভালো হয়ে চলি। ভুত রাতের বেলা এসে ভয় দেখাতে পারে। আর নিশির ডাক শুনে এমন সম্মোহিত হয়ে যেতে পারি যে ঘুম থেকে উঠে বিছানা ছেড়ে, ঘর ছেড়ে তার পিছু পিছু চলে যেতে পারি। কখনও সে সাদা কাপড় পরে আসে। আবার কখনও তার মাথায় থাকে ঝাকড়া চুল। বড় ভাই এমন সুন্দর করে গল্প শোনাতেন যে, আমরা মুগ্ধ হয়ে আকৃষ্ট হয়ে যেতাম। অনেক সময় অন্ধকারে হঠাৎ কোনও ছায়া দেখে ‘ভুত ভুত’ বলে ভয় পেয়ে চীৎকারও করতাম। রাতে একা থাকতে চাইতাম না কেউ।

আমাদের বাসার সামনে একটা দোকানে রোজ সকালে লুচি ও হালুয়া বিক্রি করতো। আমাদের বাসার সিঁড়িতে বসে দেখতাম, কত মানুষ সারাদিন ঐ দোকানে বসে খেতো। মাঝে মাঝে আমরাও এনে খেতাম। এতো সুস্বাদু ছিলো সেই ছোলার ডালের হালুয়া, যা আজও ভুলতে পারি না। বগুড়ায় ছোট ছোট লাল আলু পাওয়া যেতো। আমার মা প্রায়ই আলু ভর্তা করতেন, শুকনো মরিচ ও সর্ষের তেল মাখিয়ে। সেই আলুভর্তা ও ডাল দিয়ে ভাত খেতে খুব ভালো লাগতো। আঠা-আঠা লাল আলু ভর্তার ঘ্রাণ এখনও মনে আছে। বগুড়ার বিখ্যাত দই ও লাল চিড়ে আমাদের খুব প্রিয় ছিল।

১০.৭.১৯৫৬ তারিখে আমার বাবা ঢাকা জেলা জজ কোর্টে অতিরিক্ত জেলা ও সেশন জজ হিসাবে যোগদান করেন। আমরা তার ক’দিন আগেই ঢাকা চলে আসি।

বগুড়ার স্মৃতি আমাকে এখনও পিছু টানে।

(কিস্তি ৫)

baby.maudud@gmail.com
আর্টস প্রোফাইল: বেবী মওদুদ


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন kasem880@gmail.com — মার্চ ২০, ২০১১ @ ২:৫৯ পূর্বাহ্ন

      আপনার লিখা পড়লাম, খুব ভাল লাগলো বাল্যকালের বিষয়ে লিখাগুলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নবীন — december ৫, ২০১১ @ ২:১৯ পূর্বাহ্ন

      আপনার লেখা পড়ে অনেক ভাল লাগল। ওই মুনসেফ কোয়াটার এ আমার ও কিছু স্মৃতি আছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Md Nurul islam — জানুয়ারি ২৪, ২০১২ @ ২:৩৭ অপরাহ্ন

      it is good

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com