আর্টস বৈঠক

মেহেরজান বিতর্ক (কিস্তি ২)

| ৭ মার্চ ২০১১ ৫:৪৩ অপরাহ্ন

কিস্তি ১-এর লিংক

mj_111.jpg
ছবিতে অল্প বয়সের মেহের হিসাবে দৌড়াচ্ছেন সায়না আমিন।

তো এই সব মিলিয়ে আমার কাছে ছবিটা আপত্তিকর মনে হয়েছে, আমি যদি বলি আপত্তিকর—যে যদি ছবিটাতে অন্য প্রসঙ্গগুলো, মুক্তিযুদ্ধের অন্য প্রসঙ্গগুলো দিয়ে যদি মুক্তিযুদ্ধটাকে খুব ভালোভাবে তুলে ধরা যেত, পজিটিভ ওয়েতে তুলে ধরা যেত, আমি হয়তো এই ব্যতিক্রমী মূল যে ঘটনাটা, সেটাকে মেনে নিতে রাজি ছিলাম। কিন্তু সেটা করা হয় নি আর কি।

(ব্রাত্য রাইসু: তাইলে আপনি কি বলবেন যে এটায় নেগেটিভভাবে দেখানো হইছে মুক্তিযুদ্ধকে?)


বৈঠকের অডিও/ভিডিও ২

অবশ্যই, অবশ্যই। পুরো ছবিতে মুক্তিযুদ্ধকে নেগেটিভভাবে দেখানো হয়েছে এবং এইটা আমি জানি না যে কেন হয়েছে। কারণ আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, এই নির্মাতা বা তার সাথে আরো যারা আছে, আমি চিনি তাদেরকে—অন্য যারা ছেলেপেলেরা আছে—সবাই কিন্তু খুব প্রগ্রেসিভ ধ্যান-ধারণার ছেলেপেলে বলেই আমি জানি। ওরা যে খুব সচেতনভাবে এটা করেছে, সেটাও আমার মনে হয় না। মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা মানে… হয়তো কম ছিল… বা কী কারণে আমি জানি না… মানে যে কোনো কারণেই এটা এখন একটা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ছবিই হয়ে গেছে।

(ব্রাত্য রাইসু: এরপরে কে বলতে চান? ফৌজিয়া…?)

ফৌজিয়া খান: আমার নাম ফৌজিয়া খান। শ্রুতিলোকন মাধ্যমে কাজ করার চেষ্টা করি। ছবিটা আমি ওই প্রিমিয়ার শো’র সময় দেখি, উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনীর পরে বের হয়ে, দেখছিলাম যে প্রবল রি-অ্যাকশান, নেগেটিভ রি-অ্যাকশান। আমিও ছবিটা পছন্দ করি নাই। পছন্দ না করার কিছু কারণ হচ্ছে… মোরশেদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার মিলে যায়। তবে আমি আমার অপছন্দের কারণগুলো—আবার একটু যেই অমিলের জায়গা মোরশেদ ভাইয়ের সঙ্গে, সেইটা আমি একটু ইয়ে করতে চাই। আমার একটা জায়গা—আমি যেটা দেখছিলাম যে বাইরে যারা প্রবলভাবে রি-অ্যাক্ট করছিল, তারা কেউ কেউ আমার পরিচিত। অনেকেই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাদের যেটা মূল আপত্তির জায়গা ছিল—যেটা মোরশেদ ভাইও বললেন যে, মুক্তিযুদ্ধকে নেগেটিভলি রিপ্রেজেন্ট করা করা হয়েছে এই ছবিতে। আমার কাছে—আসলে যুদ্ধের সময় আমার বয়স মাত্র এক বছর, কাজেই আমি সরাসরি যুদ্ধ দেখি নাই, তবে আমার কাছে যেটা মনে হয় যে, এই যে… শুধু মুক্তিযুদ্ধ না, যে কোনো বিষয়—এই যে বীরাঙ্গণা, নারী-নারীর যে প্রেজেন্টেশন—এইসব বিষয়ে আমাদের যে একটা, প্রচলিত যে ভাবনা, আমি বলবো, সেই ভাবনার চাইতে একটু অন্য রকম ভাবে এই ছবিতে এই বিষয়গুলো এসছে। সেই অন্যরকমের জায়গাটা কি—আমরা প্রচলিতভাবে, যেভাবে দেখতে চাই, মুক্তযুদ্ধকে একটা আদর্শিক জায়গা থেকে, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি আদর্শিক জায়গা থেকে পাকিস্তানীদের একটা ভিলেন হিসেবে দেখতে চাই। মানে দেখে আমরা অভ্যস্ত এবং নারীদের ব্যাপারেও আমি বলবো যে, আমি আসলে বীরাঙ্গণা শব্দটা এবং ধর্ষিতা—এই দুইটা শব্দই ব্যবহারে আমার একটু… ধর্ষিতা তো আমি ব্যবহারই করি না, আর বীরাঙ্গণাটাও আমি একটু হ্যাজিট্যান্ট আসলে, whether we should use it any more। যদিও হচ্ছে—বীরাঙ্গণা শব্দের শুরুটা অনেক সম্মানের জায়গা থেকে এসছিল কিন্তু আমার মনে হয় যে আমাদের সমাজে সেই সম্মানটা আমরা দিতে পারিনি তাদেরকে, ৭১-এ যারা পাকিস্তানী সৈন্যদের বা আমাদের বাংলাদেশের অনেক মানুষের নির্যাতনের শিকার যেসব নারীরা হয়েছিলেন—তাদের।

mj114.jpg
ফৌজিয়া খান

তো আমি দেখছিলাম যে, এই আদর্শিক Portrayal যেটা—সেই জায়গাগুলো ভাঙছিল বলেই হচ্ছে গিয়ে, মানে অনেকের নেগেটিভ রি-অ্যাকশন। আমি লিফটে নামার সময় দেখছিলাম, এক ভদ্রলোক, উনি প্রবলভাবে সমালোচনা করছিলেন যে—‘মুক্তিযোদ্ধার গালে চর মারা হয়েছে এবং পাকিস্তানী সোলজারের সঙ্গে প্রেম দেখানো হয়েছে।’ আমার আপত্তিটা কিন্তু সেই জায়গায় নয়। আমার আপত্তিটা—আমি বলবো যে, আমি যদি চলচ্চিত্রের ভাষার কথা ভাবি—মানে অন্তত রুবাইয়াত—পরিচালক, তিনি এটাকে খুবই রিয়েলিস্টিক অ্যাপ্রোচে, ন্যারেটিভ ভঙ্গিতে আসলে ছবিটাতে, সব ক্যারেক্টার, সমস্ত কিছুই হচ্ছে ন্যারেটিভ জায়গা থেকে এবং রিয়েলিস্টিক অ্যাপ্রোচ থেকে সে ট্রিটমেন্টটা করেছে। এবং সেই জায়গায়ই হচ্ছে যে, আমি বলবো যে—মোরশেদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার আপত্তির জায়গাগুলো খুব মিলে যায়। আপনার—ওর পুরো ছবির কাহিনীই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের পেক্ষাপটে, কিন্তু আমরা ভিজ্যুয়ালি হচ্ছে কখনো মুক্তিযুদ্ধকে দেখি না এবং যে চরিত্রগুলো—সেই চরিত্রগুলোও সাংঘাতিকভাবে অবিকশিত আমার মনে হয়, অবিকশিত এবং অভিনয় তো—আসলে আমি বলবো যে, ইন ফ্যাক্ট পরিচালকের অভিনয়ই আমার—মানে জয়ার অভিনয়ের চাইতে ভালো লেগেছে আর কি, পরিচালক যেই চরিত্রটা করেছেন! আমার আপত্তির জায়গাটা হচ্ছে যে—আমরা যখন হিস্ট্রিক্যাল কোন ইভেন্টকে একটা ন্যারেটিভ চলচ্চিত্রের বিষয় হিসাবে করি, তখন ভিজ্যুয়ালি সেইটা রিপ্রেজেন্ট করার দায় হচ্ছে পরিচালকের, ডেফিনেটলি আছে। সেই জায়গায়টাই আমার মনে হয় রুবাইয়াত—এটা কি, আমি জানি না ইচ্ছা করেও হতে পারে অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবেও হতে পারে। রুবাইয়াতের সঙ্গে আমার ব্যাপাটা নিয়ে কথা হয় নাই, আমি জানি না কেন তারা এইটা করেছে? আমার মনে হয় প্রপস থেকে শুরু করে তার ক্যারেক্টারাইজেশন, তার পোশাক আশাক—কোনো কিছুতেই, মানে হচ্ছে গিয়ে, রুবাইয়াত ঐ রিয়েলিস্টক—মানে ঐ চল্লিশ বছর আগেকার যে বাংলাদেশ, সেই বাংলাদেশকে কোনো ভাবেই আনতে পারে নি। আমার আপত্তির জায়গাটা হচ্ছে এইটা—যে মুক্তযুদ্ধের আদর্শের জায়গা থেকে আমার কোনো ইয়ে নেই, এটা একটা ফিকশন, কাহিনী চিত্র—সেইখানে পরিচালক আমার মনে হয় যে সেই স্বাধীনতাটা নিতে পারে। আমার কাছে এটা মনে হইছে মোরশেদ ভাই, যে একটা কাহিনী চিত্রের মধ্যে পরিচালক এইরকমের গল্পের ইয়ে নিতে পারেন। কিন্তু এর ভিজ্যুয়ালাইজেশনের যে ধারাটা সেই ধারার মধ্যে আমি মনে করি যে সে ফেইল করেছে টোটালি। ১৯৭১-এর বাংলাদেশের যে মুক্তিযুদ্ধ, সেই মুক্তিযুদ্ধকে ভিজ্যুয়ালি রিপ্রেজেন্ট করতে সে টোটালি ব্যর্থ। আর ক্যারেক্টারাইজেশন তো ডেফিনিটলি একই—আমারও কথা এক। এবং তাদের যে ভাষা—এই চরিত্রদের ভাষা, সে চরিত্রদের ভাষা কিন্তু এখনকার, মানে এখন বাংলাদেশে ২০০০ এইটা কত…?

(ব্রাত্য রাইসু: ১১সাল।)

১১ সালের, এখনকার ভাষা এবং এখানে যে পোশাক, সেই পোশাক হচ্ছে ২০১১ সালের পোশাক।

(ব্রাত্য রাইসু: এটা কে পোস্টমডার্ন অ্যাপ্রোচ হিসাবে আমরা ধরতে পারি কিনা? মানে এখনকার পোশাক আর সেই সময়ের কাহিনী, এটা হইতে পারে কিন্তু।)

আমি সেটার সঙ্গে অ্যাগ্রি করি না আর কি।

mj_112.jpg
ওমর রহিম ওয়াসিম রূপে ও সায়না আমিন মেহের রূপে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছেন।

হাবিব খান:ফৌজিয়া যেটা বলছে যে—ওই সময়ের যা ঘটনা, ওই সময়টার ভিতরে যা ছিল তা এখানে আসে নাই।

ফাহমিদুল হক: আমি একটা রেফারেন্স বলি? ঢাকার থিয়েটার—তারা আইডিয়ালি মনে করে যে ক্যারেক্টারের রিয়ালাইজেশনের মানে রিয়ালিস্টিক পিকচারাইজেশনের ক্ষেত্রে বয়স বা ইয়ে কোন ব্যাপার না। যেমন শিমুল ইউসুফকে দেখা গেছে—ইভেন তারা মেকাপও নেন না–শিমুল ইউসুফকে দেখা গেছে একজন তরুণীর চরিত্রে অভিনয় করছেন এবং তারা এটা লুকানোরও চেষ্টা করেন না। মানে উনি যেটা ইঙ্গিত করছেন, আমি সেই জায়গায়ই… মানে এরকম…

ফৌজিয়া খান: কিন্তু এই ছবিটাতে সেই পোস্টমডার্ন অন্য কোনো কিছুর চর্চা দেখি না আর কি, হ্যাঁ? এই ছবিটার স্টাইল যেটা—স্টাইল—এই যে গল্প বলার যে স্টাইলটা—That’s very simple এবং ন্যারেটিভ।

(ফাহমিদুল হক: অল্প কিছু ফ্র্যাগমেন্টস আছে, আদারওয়াইজ ন্যারেটিভ।)

আমি কোন এক্সেপশনাল ফ্রেগমেন্টস্ দেখি না। সেই জায়গা থেকে আমি মনে করি, যখন একটি হিস্টরিক্যাল ইভেন্টকে আমার ছবিতে আমি নিয়ে আসব তখন হচ্ছে ভিজ্যুয়ালি সেই হিস্ট্রির সেই সময়, সেই ক্যারেক্টর, সেই প্রপস্—মানে আমার দেখানোর দায়িত্ব, দায়িত্ব বলতে আমি এইটাই মনে করি আর কি, দায়িত্ব না—আমার গল্পকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্যই সেটা করা জরুরী বলে মনে করি। আর এইখানে আমি—নানান ইজমের আমরা ইয়ে করতে পারি, কিন্তু আমার কাছে সেটা খুব খোঁড়া যুক্তি লেগেছে।

ফরহাদ মজহার: আমার এখানে ছোট্ট প্রশ্ন ছিল—মোরশেদকে, খালি প্রশ্ন—বোঝার জন্যে। এটা কি ঐতিহাসিক ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপরে? আপনাদের কাছে কি মনে হইছে?

(মোরশেদুল ইসলাম: আপনার কী মনে হয়েছে?)

না, আপনি ঐতিহাসিক কথা বললেন না? ঐতিহাসিক ছবি…

(মোরশেদুল ইসলাম: এই ছবির পটভূমি ১৯৭১।)

পটভূমি ১৯৭১, কিন্তু ১৯৭১-এর ওপর ডেফিনিটলি বয়ান না, নাকি?
(মোরশেদুল ইসলাম: পটভূমি ১৯৭১।)

mj_113.jpg……
ভিক্টর ব্যানার্জি, মেহেরজান ছবির পোস্টারে।
…….
পটভূমি ১৯৭১… ঐতিহাসিক, আমরা ঐতিহাসিক ছবি বলতে যেটা বুঝি… তর্কগুলোতে আমরা যেটা বারবারই দেখি যে আমরা ইতিহাসের কথা যখন নিয়ে আসি—তখন—আমি কিন্তু…আপনাদের সাথে খুব বিরাট যে কোন পার্থক্য… ডিফারেন্স, তা না কিন্তু। কিন্তু আমরা ছবিটাকে বিচার করতে গেলে—আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে যে ছবিটার প্রতি যে অবিচারটা হয়েছে—সেটা হলো এটা, অন্যদিকে—হয়তো এই কথাগুলোই বলতাম আমরা, অবজেকসনটা হচ্ছে—আমরা হাটুরে মার বলি না?—যে হঠাৎ করে ধইরা, এই ধর—এইরকম ঘটনাটা হয়েছে। প্রিমিয়ার হওয়ার পরেই যে রিঅ্যাকশনটা হয়েছে, তারপরেই যেভাবে মবিলাইজেসনটা হয়েছে, তারপরে সাইলেন্ট প্রোটেস্ট-এর যে জিনিসগুলো হয়েছে—এর ফলে যেটা হয়েছে—ছবিটার প্রতি যেই একটা বিচার হতে পারত, বিচার হবার পরে—তার মধ্যে অনেকেই যারা—এই ছবিটার বিপক্ষে যারা বলছেন—তাদের অনেকেরই সাবস্ট্যান্টটিভ বক্তব্য আছে—তার সঙ্গে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমি একমত।

(মোরশেদুল ইসলাম: সেটা তো আপনার সাথে আমি একমত।)

কিন্তু তখনই এটা জটিলতা বাড়ায়—কেন হয়েছে ওটা—তখন আমার মনে হয় যে, ‘ঐতিহাসিক ছবি’ বলতে আমরা আসলে কী বুঝি এবং মুক্তিযুদ্ধকে আমরা যেভাবে দেখতে চাই—‘আমরা’ কারা? এরা কখন তৈরি হয়েছে? এরা কীভাবে তৈরি হয়েছে? এখনকার যারা—২০১১ সালে যারা ছবিটাকে হয়তো বাদ দিচ্ছে… আমরাও তো হয়তো কাছাকাছি বয়স—সেদি থেকে আমাদের যে মুক্তিযুদ্ধে একটা অংশগ্রহণ ছিল—আমাদের দিক থেকে দেখবার যে ব্যাপার ছিল—সেটা তো গত ৪০ বৎসরে আমরা কোত্থাও দেখি নাই! কোন মুক্তিযুদ্ধের—কোন বইয়ে, কোত্থাও আমরা দেখি নাই। কোথাও তো আসে নাই মুক্তিযুদ্ধের কথ। এই ছবিতেও আসে নাই। স্বভাবতই, ঠিক না? তো আমরা যখন বলছি আমরা—এই ‘আমরা’ কারা? এ কথা—এইটা বোঝার জন্য আমি এই প্রশ্নটা করছি।

ফৌজিয়া খান: এটা আমি কিন্তু অন্তত কখনোই বলি নাই বা মোরশেদ ভাইয়ের কথায়ও অন্তত এটা পাই নাই যে—এটা ‘ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র’ আমরা বলছি! আমরা কিন্তু জানি যে…

ফরহাদ মজহার: তাইলে, ‘প্রেক্ষাপট’ কথাটার অর্থ কী? ‘ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট’? সবকিছুই ঐতিহাসিক পেক্ষাপট।

ফৌজিয়া খান: হ্যা, হ্যা, আপনি যখন ইতিহাসের একটা এলিমেন্টকে ব্যবহার করবেন—এলিমেন্টকে—এই পুরা ছবির ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে—ছবিটার কাহিনী দাঁড়িয়ে আছে একাত্তরের উপর।

ফরহাদ মজহার: কেন তারা বহু পুরনো—সেই আপনার ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ থেকে আরম্ভ করা, দীর্ঘ বছরের ইতিহাস তার মধ্যে আছে, প্রেক্ষাপট তো শুধু একাত্তর না?

মোরশেদুল ইসলাম: সেগুলা আছে।

ফরহাদ মজহার: তাইলে প্রেক্ষাপট কথাটার অর্থ কী?

ফৌজিয়া খান: না, অন্য অন্য—আমি জানি না, তাইলে আপনি আরো দার্শনিক বিভেদ আনতে পারেন, আমি—বা শাব্দিক ইয়ে আনতে পারেন…।

ফরহাদ মজহার: না দার্শনিকতা না, আমি তা আনতেছি না। আমাকে কটাক্ষ কইরেন না, আমি এখনো দার্শনিক হই নাই।

ফৌজিয়া খান: আপনি সাধারণ জ্ঞানী মানুষ।

mj115.jpg
ফরহাদ মজহার

ফরহাদ মজহার: আমি অতি মূর্খ মানুষ, আমি বুঝতে চাইছি যে, ‘প্রেক্ষাপট’ কথাটা যখন বলি আমরা, আমি বলছি যে, আমি বুঝতে চাইছি যে, আপনাদের—আপনি যেখান থেকে আসছেন, ওটা আমি বুঝতে চাইছি যে—এই প্রেক্ষাপট… নিশ্চই একটা বয়ান আছে আমাদের মনের মধ্যে, সেই প্রেক্ষাপটটা কী? আমরা আজকে যেমন—এখন যে ঘটনাটা ঘটছে এই ঘরটার মধ্যে—এটা একটা ঘটনা, আমি যখন বাড়িতে গিয়ে যখন কাউকে ব্যাখ্যা করবো—ওইটা কিন্তু আমার বয়ান, এটা কিন্তু ঘটনা না? তাইলে মুক্তিযুদ্ধ একটা হিস্ট্রি, একটা ঘটনা—অবশ্যই, কিন্তু যেকোন বয়ান হতে পারে।

মোরশেদুল ইসলাম: হ্যা, হতে পারে, সেটা তো বললাম, প্রথমেই আমরা বললাম।

আমার প্রশ্নটা হচ্ছে যে, আমরা তাহলে এটাকে বিচার করছি—একটা বিশেষ বয়ানের জায়গায় দাঁড়িয়ে। আমি বলছি যে—এই বয়ানটা—যারা বিচার করছেন, তারা ভুল করছেন, তা বলছি না। তারা ঠিকই করছেন, তার মানে, বাংলাদেশে একটা ডমিনেন্ট—মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত, বাংলাদেশ সংক্রান্ত একটা ডমিনেন্ট—একটা আধিপত্যশীল, অধিপতি একটা চিন্তাধারা গড়ে উঠেছে—যেখানে দাঁড়িয়ে ছবিটাকে বিচার করা হয়েছে। এবং সেই বিচারের জায়গায় ছবিটা—আমি বলবো যে—বিচার বলতে যেটা বুঝি, নান্দনিক বিচার বলি, সিনেমার যে বিচার বলি, কাহিনীর যে বিচার বলি—সেইদিক থেকে ছবিটা বঞ্চিত হয়েছে। ছবিটার প্রতি আমার নিজেরও কোনো…।

মোরশেদুল ইসলাম: ওকে, ওকে, না ফরহাদ ভাই, আপনার কথার সাথে তো আমি একমত। আপনার কথাটাই মোটামুটি ফাহমিদুল যে লেখাটা লিখেছে সেই লেখাতে কিন্তু মোটামুটি সেটাই ফাহমিদুল বলার চেষ্টা করেছে, যে মুক্তিযুদ্ধকে আমরা মোটা দাগে যেইভাবে চিন্তা করি এই ছবিতে সেইভাবে বলা হয় নাই। এটা হতেই পারে, এবং মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে সে অন্য ভাবে মুক্তিযুদ্ধকে দেখতেই পারে। আমরা তো সেইটাই আলাপ করছি। সে কীভাবে দেখেছে সেটা নিয়ে আমাদের আলাপ করার তো অধিকার আমাদের আছে।

(ফরহাদ মজহার: নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই।)

আমরা কেউ বলতে পারি যে মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করা হয়েছে, কেউ বলতে পারি, না ঠিকই আছে।এইটাই আলোচনা হচ্ছে। আমরা কিন্তু তার মাথায় কেউ লাঠি আমরা মারছি না। তার ছবিকে নিষিদ্ধ করার কথাও কেউ আমরা বলছি না। আরেকটা কথা হচ্ছে যে এই ছবি এত দুর্বল একটা ছবি—ছবি হিসেবে আমি যদি বলি, অ্যাজ এ ফিল্ম—এটা এত দুর্বল একটা ছবি যে আমার লজ্জা লাগছে যে এই ছবি নিয়ে এত আলোচনা করতে হচ্ছে!

ব্রাত্য রাইসু: আর কারো কোন আপত্তি আছে এই ছবির ব্যাপারে। বলবেন, আপত্তির জায়গাটা যদি বলতেন প্রথমে।

সলিমুল্লাহ খান: না এখানে যে আলোচনাটা হচ্ছে সে ক্ষেত্রেও আপত্তি অনেকগুলি উঠেছিল, তাই না? সেগুলির ওপরে মন্তব্য হচ্ছে যে—যেমন, এই কথাটা, এইটা যে ঐতিহাসিক ছবি কিনা, না ন্যারেটিভ ছবি। আমি একটা উদাহরণ দেই। সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে-বাইরে’ আশির দশকের গোড়ার দিকে মুক্তি পেয়েছিল, আপনাদের যাদের মনে আছে, তাই না? এটি কি ঐতিহাসিক ছবি? না নয়? চলচ্চিত্রের ভাষায় বলে, ‘হোয়েদার ইট ইজ এ পিরিয়ড পিস।’ আমরা একটা টেকনিক্যাল শব্দ বলি ‘পিরিয়ড পিস’। তখন ওই সময়—যেমন নিখিলেশের চরিত্রটা ঠিক ছিল কিনা, সন্দ্বীপের চরিত্রটা ঠিক ছিল কিনা—অনেক সমালোচনা হয়েছে। উনি সন্দ্বীপকে অনেক বেশি—মানে, যে রকম ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের চিত্রিত করা উচিত নয়, সেভাবে করেছে বলে আপত্তি আমি তখনও শুনেছি। তাকে অনেক অর্থগৃধ্নু, সোনার প্রতি লোভী, এভাবে দেখানো হয়েছে। এটা ট্রিটমেন্ট, কিন্তু এইটা তো রবীন্দ্রনাথের একটা ন্যারেটিভকে উনি আবার রি-ন্যারেটিভ করেছেন। এখন রবীন্দ্রনাথ একটা ঐতিহাসিক চরিত্র, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন সেটাই সেময়ের স্বদেশী আন্দোলনের পুরা ছবি নয়। এটা স্বদেশী আন্দোলনের সময়ের ছবি, ওইটা হচ্ছে পটভূমি। ‘পটভূমি’ কথাটার যদি কোনো আদৌ অর্থ থাকে, তাই না?

mj116.jpg
সলিমুল্লাহ খান

অর্থাৎ, নিখিলেশও একটা চরিত্র, আপনার, ধরুন—সন্দীপও একটা চরিত্র, বিমলাও একটা চরিত্র। বিমলার ডায়রির মধ্য দিয়েই জিনিসটা ঘটেছে। যখন নিখিলেশ মারা যায় বা শেষ হয়ে যায় তখন তার রিফ্লেকশন আকারে আসে—সে বিধবা হয়ে যায়, শেষে যখন দেখা যায়—সে বৈধব্যের বেশ পরেছে।

আমরা এর থেকে–ছবি কথা বলে সাজেশনের মাধ্যমে, এইটাকে ঐতিহাসিক ছবি বললে কি খুব বেশি গুরুতর ভুল হয়?

pk_1.png

ভিডিও ধারণ ও অনুলিখন: প্রমা সঞ্চিতা অত্রি


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

প্রতিক্রিয়া (8) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রিটন খান — মার্চ ৭, ২০১১ @ ১০:৫২ অপরাহ্ন

      আলোচনা বেশ জমে উঠছে, ভালো লাগছে পড়তে। আরো ভালো লেগেছে, ঘটনা এবং তার সম্পর্কিত বয়ান-এর তর্কটুকু। তৃতীয় কিস্তি পড়বার অপেক্ষায় রইলাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Pranay — মার্চ ৮, ২০১১ @ ৫:২৭ অপরাহ্ন

      আলোচনা বেশ জমে উঠছে, ভালো লাগছে পড়তে। আরো ভালো লেগেছে, ঘটনা এবং তার সম্পর্কিত বয়ান-এর তর্কটুকু। তৃতীয় কিস্তি পড়বার অপেক্ষায় রইলাম।
      এটি কি ঐতিহাসিক ছবি না! মুক্তিযুদ্ধ একটা হিস্ট্রি, একটা ঘটনা—অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করা হয়েছে ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফাহিম হাসান — মার্চ ৮, ২০১১ @ ৭:৩২ অপরাহ্ন

      চমৎকার আলোচনা।

      ফৌজিয়া খান ওনার বক্তব্যে পরিস্কার ভাবে বলেছেন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কথা। এ নিয়ে বিতর্ক কেবল সময় নষ্ট করেছে। ফরহাদ মজহারের কথার ধোঁয়াশা অর্থহীন ও অনাবশ্যক বলে মনে হয়েছে।

      মোরশেদুল ইসলামের যুক্তিগুলো ছিল আলোচনার প্রাণ (দুই পর্বেই)। প্রথমত তিনি খুব স্পষ্ট করে তার অপছন্দের কথা বলেছেন। এরপর কেন অপছন্দ তাও ব্যাখ্যা করেছেন নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে। এই বৈঠকের সেরা উক্তি-

      “অ্যাজ এ ফিল্ম—এটা এত দুর্বল একটা ছবি যে আমার লজ্জা লাগছে যে এই ছবি নিয়ে এত আলোচনা করতে হচ্ছে!”

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rabiul islam — মার্চ ৮, ২০১১ @ ৮:১৪ অপরাহ্ন

      এ ধরনের ছবি করার আগে আরো ভালো করে ভাবা উচিত ছিল। আমাদের চেতনাকে এভাবে ধুলিস্মাৎ করা ঠিক হয়নি। আশা করছি এরপর কেউ এ ধরনের ছবি করবে না।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন EMDAD — মার্চ ৯, ২০১১ @ ১১:০৩ অপরাহ্ন

      দেশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে বলে এই ছবিটা নিয়ে এত বাড়াবাড়ি হচ্ছে। না হয় এই ছবিটা সিনেমা হলে ভালো ভাবে চলে নাই বা মার্কেট পায় নাই,
      আমার মনে হয় তাই এত কথা হচ্ছে। যদি আমার কথা ভুল হয় তাইলে যুক্তি দেখাবেন। ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রোহান — মার্চ ১১, ২০১১ @ ১০:০৯ পূর্বাহ্ন

      ফরহাদ মজহার এর কথাটাই আমার কাছে মনে হয়েছে–আসল কথা।

      ছবিটা বন্ধ করা হয়েছে এটার টেকনিক্যাল ত্রুটির কারণে নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার বা দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে তার জন্য। এটা বন্ধ করা হয়েছে তাদের আদেশে যারা মুক্তিযুদ্ধকে একটি নির্দিষ্ট স্বার্থে ব্যবহার করে আসছে এবং করতে চায় এবং যারা মনে করে মুক্তিযুদ্ধকে জানতে হলে বা দেখতে হলে ওই চিন্তার ভেতর দিয়ে দেখতে হবে, জানতে হবে। মেহেরজান’র কপাল পুড়েছে কারণ এখানে মুক্তিযুদ্ধকে ওই ছকবাঁধা স্বার্থান্বেষী শ্রেণীচিন্তার ভেতর দিয়ে দেখানো হয় নি। এই ছবিটা কোনো চলচ্চিত্র সমালোচকের কথায় বন্ধ করা হয় নি।

      মুক্তিযুদ্ধ একটা ঘটনা, আর একে নিয়ে যে ছবি-এটা ঘটনা নয়, বয়ান। বয়ান বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে হতে পারে। ফরহাদের এই কথাকে আর একটু সামনে নিয়ে গিয়ে বলা যায়–মুক্তিযুদ্ধ একটা ‘টেক্সট ‘। এটাকে দেখার, জানার আঙ্গিক বিভিন্ন হতে পারে, তার জন্য ‘টেক্সট’ এর পরিবর্তন হয় না।

      সবশেষে প্রশ্ন একটাই-ছবিটার নির্মাণশৈলী যতই খারাপ হোক, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় না থাকলে এটাকে বন্ধ করা হত কি?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হেলাল — এপ্রিল ২০, ২০১১ @ ১২:৫০ পূর্বাহ্ন

      প্রতিক্রিয়ায় ফাহিম হাসান বলেছেন, ‌’ফরহাদ মজহারের কথার ধোঁয়াশা অর্থহীন ও অনাবশ্যক বলে মনে হয়েছে।’ সে সাথে মোরশেদুল ইসলামের কথার প্রশংসা করলেন।
      অথচ স্বয়ং মোরশেদুল ইসলাম ফরহাদ মজহারের সাথে একমত বলেছেন বারবারই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুদীপ্ত হাননান — এপ্রিল ২৭, ২০১৬ @ ৩:৩৫ অপরাহ্ন

      কার্ল মার্কস জীবিত থাকতেই তার তাত্ত্বিক অবস্থানকে একটু ঘুরিয়ে প্রকাশ করছিলেন হার ইউজিন ড্যুরিং নামের একজন। ড্যুরিং নাকি জানাশোনা লোকই ছিলেন। তো ড্যুরিং মার্কসের তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক দিক নাকি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, এটি তিনি বলতেন। কিন্তু ড্যুরিংয়ের লেখা প্রকাশ এবং প্রচার হওয়ার পর এ্যাঙ্গেলস নাকি দেখলেন যে মার্কসকে উল্টাভাবেই মূলত ড্যুরিং প্রচার করছেন। তাই এ্যাঙ্গেলস লিখেছিলেন – এ্যান্টি ড্যুরিং।
      মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তো ব্যবসায়ের শেষ নেই …
      মেহেরজান সিনেমা নিয়ে আমার আর কোনো মতামত নেই।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com