অদ্ভুত মানুষসকল এবং একজন ঘোড়া

নাদিয়া ইসলাম | ২৮ নভেম্বর ২০১০ ৯:১২ অপরাহ্ন

stub.jpg
স্ট্রাটফোর্ডের স্টারবাকস, ছবি. গুগল আর্থ

জন লুকের সাথে আমার পরিচয় হইছিল স্ট্রাটফোর্ডের শপিং সেন্টারের বাইরে। আমি স্টারবাকসের কুনায় বইসা বইসা ট্যাজো-র চাই টি ল্যাটে ও বিরি খাইতেছিলাম, তখন আধা চাইনিজ আধা ক্যারিবিয়ান একজন লোক আমার পাশে আইসা বসলেন। আগুন চাইলেন। রাস্তা থাইকা কুরায়া আনা একটা সিগারেটে আগুন ধরায়া নাম বললেন: জন লুক।

frlogo.jpg…….
“…ফেরারি বানানো হইছে আমারে সম্মান দেখায়ে। দেকছো তো লোগোটা!”
……..
আমি একটু অবাক হইয়া তাকাইলাম! এইটা তো খ্রীশ্চান নাম! তখন উনি উনার টানা চোখ ও চ্যাপ্টা নাকের দিকে পয়েন্ট আউট কইরা কইলেন উনার জন্ম একজন কালো ক্রীতদাসীর পেটে। উনার বাপ শ্যাং ডাইন্যাস্টির একজন রাজা আছিলেন। উনার জন্ম যীশু খ্রীস্টের জন্মের প্রায় দেড় হাজার বছর আগে।

আমি কিছু বললাম না। কী বলবো? চা শেষ কইরা উইঠা বললাম, আমি যাই, আমি লাঞ্চ ব্রেকে আসছিলাম, পরে কথা বলবো। উনি উইঠা মাটিতে এক হাঁটু দিয়া বইসা আমার হাতের উলটা পিঠে চুমা দিয়া বললেন, বিদায়, নাদিয়া। আবার দেখা হবে। আমি বললাম, আবার দেখা হবে।

২.
ওমেযেসু চ্যেগে শোবো আমার ইউনিভার্সিটিতে সিকিউটির কাজ করতেন। উনার সাথে আমার সাক্ষাৎ হইতো ক্লাসে ঢুকার ও বাইর হওয়ার সময়। একদিন ইয়ান স্কট ক্যেটেল-এর সাথে দেখা করার জন্যে সন্ধ্যার অনেক পরে ক্যাম্পাসে গিয়া শোবো-র পাশে একটা টুল নিয়া বইসা ছিলাম এবং বিরক্ত হয়া নাকের ব্রন খুটাইতেছিলাম। শোবো বললেন, চেহারা ও ত্বক ঠিক রাখা খুব কঠিন একটা কাজ। আমি স্বীকার করলাম এইটা কঠিন কাজ। উনি বললেন উনি ত্বক ঠিক রাখার জন্যে সপ্তাহে একদিন রক্ত খান।

আমি জিগাইলাম, মানুষের রক্ত?

উনি বেশ গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন, না মানুষের রক্ত না। গরু ছাগল ও শুয়োরের রক্ত। যেহেতু লন্ডনে সব মাংস প্রসেস হয়া আসে, তাই তার রক্ত যোগার করতে কান্ট্রিসাইডের ফার্মে যাইতে হয়। এইটা বেশ কঠিন একটা কাজ। তবে ত্বক ঠিক রাখার জন্যে কাজটা উনি করেন।

৩.
lighter.jpg……
বিপদে পড়লে যেন উপরের দিকে লাইটার উঠায়ে বুতামে চাপ দেই। তখন উনি আকাশ থাইকে লাফ দিয়া নামবেন…
…….
সকালে কামে যাওয়ার আগে প্রতিদিন আমি পারসি-ইংগেল থাইকে দুইটা ব্যানানা মাফিন কিনি–ওজন কমানোর জন্যে সকালবেলা চিনি-ছাড়া যেই চা-টা খাই সেইটা গলা দিয়া নামানোর জন্যে চিনি-যুক্ত কিছু একটা জিনিস লাগে তো! তো যথারীতি একদিন সকালে ঢুকলাম পারসি-ইংগেলে। সেইদিন আমার পরিচিত সার্ভারের বদলে দেখলাম আরেক পোলারে–লাল চুল এক আইরিশ। উনি আমারে বললেন ব্যানানা মাফিন নরম ধরনের মহিলারা খান। শক্ত মহিলা (অর্থাৎ আমি এবং আমার নীল চুল-ও আছে) এবং উনার মত সুপারহিউম্যান পাওয়ার-অলা ফ্লাইং হিউম্যানয়েড এজেন্টদের খাদ্য ব্যানানা মাফিন না। উনি নিজের নাম জানাইলেন, কইলেন উনার পিতা ডক স্যাভাজ এবং আমারে গলায় পরার জন্যে একটা লাইটার দিলেন, যেইটার বুতামে চাপ দিলে একটা সোজা নীল আলো বাইর হয়, কইলেন, আমি বিপদে পড়লে যেন উপরের দিকে লাইটার উঠায়ে বুতামে চাপ দেই। তখন উনি আকাশ থাইকে লাফ দিয়া নামবেন এবং আমারে বিপদ থাইকা উদ্ধার করবেন, কীভাবে লাফ দিয়া নামবেন তাও একটা ছোট লাফ দিয়া দেখাইলেন। আমি বুতাম-অলা লাইটার নিয়া ব্যানানা মাফিন না কিনা চা খাইতে খাইতে দুকান থাইকা বাইরে আসলাম।

৪.
69-এর জন্যে বাস স্টপে বইসা ছিলাম একদিন। সুইস এক ভদ্রলোক আমার পাশে দাঁড়ায় ছিলেন। আমার হাতের বাদামের প্যাকেটের দিকে ইঙ্গিত কইরা কইলেন, ভালো জিনিস। বেশি কইরা খাওয়া উচিত। আমি মাথা নাড়লাম। উনি উনার হাতটা আমার দিকে বাড়ায়ে কইলেন, কী মনে হয়? আমি উত্তর দিলাম, কী ”কী মনে হয়?” উনি বললেন, মানুষের হাত এমন দেকছো? আমি আসলে একজন ঘোড়া। আমিও অনেক বাদাম খাই। আমি বললাম, খাওয়াই উচিত। বাদাম তো ভালো জিনিস! উনি মাথা নাইড়া দুঃখের সাথে কইলেন, কেউ তো এখন আর এইসব জিনিস বুঝে না! তুমি ফেরারি গাড়ি চিনো?

জি, চিনি, দেকছি রাস্তা-ঘাটে!

ফেরারি বানানো হইছে আমারে সম্মান দেখায়ে। দেকছো তো লোগোটা!

জি দেকছি!

উনি বললেন, আমি বইসে থাকতে পারি না। মানুষরা বসতে ও দাঁড়াইতে ও শুইতে পারে। আমি পারি না।

আমি বললাম, কিন্তু ঘোড়া তো অনেক শক্তিশালী, তাদের নিশ্চই দাঁড়ায়ে থাকতে কষ্ট হয় না! ভদ্রলোক আমার কথায় আহত হইলেন মনে হইলো, উনি ঘাড় ঘুরায়ে আরেক দিকে তাকায়ে থাকলেন, ভাগ্যিস, ঘোড়ারা ঘাড় ঘুরাইতে পারেন!

আমার বাস আইসা সামনে দাঁড়াইলো। আমি বাসে উঠলাম।

বিলাত, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১০

ওয়েব লিংক
নাদিয়া ইসলাম: আর্টস

—–
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Amin Al Rasheed — নভেম্বর ২৮, ২০১০ @ ১০:৫০ অপরাহ্ন

      এটা কি ফ্যান্টাসি নাকি অ্যাবসার্ড গল্পধরনের কোনো গল্প…

      – Amin Al Rasheed

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোয়াজ্জেম আজিম — নভেম্বর ২৯, ২০১০ @ ৭:৩৬ পূর্বাহ্ন

      বেশ ভাল লেগেছে গল্পগুলো। অদ্ভুত মানুষগুলো তো অদ্ভুত সময়েরই প্রতিনিধি। ধন্যবাদ লেখককে।

      – মোয়াজ্জ্জেম আজিম

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নাবীল — এপ্রিল ১, ২০১২ @ ২:৩৫ অপরাহ্ন

      বেশ মজা পেলাম… ভাল লাগছে

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইসমাইল হোসেন — এপ্রিল ২, ২০১২ @ ১২:৫৫ অপরাহ্ন

      দারুন লেখা। শক্তিশালী লেখন। তার আর কোন লেখা এর আগে পড়ি নি। অভিনন্দন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com