চিন্তার সংকট: সাহিত্যের স্বাধীনতা: মানুষের মুক্তি

প্রসঙ্গ হাসান আজিজুল হকের কার্তেসীয় পদ্ধতি এবং সাহিত্যে আত্মঘাতী বোমাবাজির প্রবণতা

সেলিম রেজা নিউটন | ২ december ২০১০ ৮:১৬ অপরাহ্ন

hassan_aziz.jpg
হাসান আজিজুল হক।

ছবি: মোস্তাফিজ মামুন

……….

[হাসান আজিজুল হকের “সাহিত্য সমালোচনা কীভাবে সম্ভব” দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রতি শুক্রবার ক’রে প্রকাশিত ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে দুই কিস্তিতে মুদ্রিত হয়েছিল ২০০৭ সালের ২৯শে জুন ও ৬ই জুলাই তারিখে। সেটিকে উসিলা করে সেলিম রেজা নিউটন এই লেখাটি লিখেছেন। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে, সালেহ মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ সম্পাদিত, খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘ছোটকাগজ’ কাকতাড়ুয়া’-এ। বাংলা সাহিত্য বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন ও প্রসঙ্গ নিয়ে চিন্তা ও দার্শনিক তর্কমূলক নিবন্ধটি আর্টস-এ পুনঃপ্রকাশিত হলো।–বি.স.]




প্রথম কাণ্ড: সাহিত্য লইয়া কী করিব?

কত না মিথ্যা জিনিসে আমি বিশ্বাস করতাম, আর সেসবের ওপর দাঁড়ানো আমার বিশ্বাসগুলোর কাঠামো কত না সংশয়াকীর্ণ ছিল তা ভেবে কয় বছর আগে আমি চমকে গিয়েছিলাম। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, বিজ্ঞানসমূহের মধ্যে স্থিতিশীল ও টিকে থাকার মতো কোনো কিছু যদি আমি প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে আমার দরকার-জীবনে স্রেফ একবারের জন্য-প্রত্যেকটা জিনিস সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া এবং একেবারে গোড়া থেকে আবার শুরু করা।

রেনে দেকার্ত ১৬৩৯, অনুবাদ বর্তমান প্রাবন্ধিকের

হাসান আজিজুল হক, দেখতে পাচ্ছি, বোমাবাজ হয়ে উঠছেন। আত্মঘাতী বোমাবাজ: বোমা যেহেতু আত্মাকেই আঘাত করে–বস্তুর আর প্রাণীর আত্মাকে–এবং নিজের আত্মাকে হত-বিকৃত না-করে যেহেতু কারও প্রতিই বোমাপ্রবণ হওয়া যায় না।

ভিক্ষুকের ডাকাডাকিতে টের পাই শুক্রবার হয়েছে, আজ সাহিত্য। পাতা খুলে দেখি প্রথম আলোর ‘সাহিত্য সাময়িকী’ মারফত বোমা এসে হাজির: সাহিত্যের সমালোচনা কীভাবে সম্ভব[১] (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-খ; বর্তমান প্রবন্ধ-পরিশিষ্ট দ্রষ্টব্য) এবং তার প্রথম বাক্যটা হচ্ছে, সাহিত্যের সমালোচনা কি আদৌ সম্ভব?। বোমা নয় তো কী? বোমাবাজ যে হয়ে উঠেছেন হাসান, সেটা টের পাওয়া গিয়েছিল এ বছরের ৭ই জানুয়ারি, বাংলাদেশের বৃহত্তম সাহিত্য-সমালোচক-প্রতিষ্ঠান প্রথম আলোর দেওয়া পুরস্কার নিতে যখন তিনি ঢাকা শেরাটন হোটেলের বলরুমে ঢুকেছিলেন।

আমাদের দেশে অবশেষে তৃণমূল পর্যায় অতিক্রম করে যে সাহিত্য এখন শেরাটনে, তাতে ‘এখনো আঁস্তাকুড়মুখী’ (মলয় ভৌমিক, ২০০৮: ৫) এই লেখকের কোনো হতাশা বা উল্লাস বা অন্য কোনো অনুভূতি বা মন্তব্য সম্পর্কে পুরস্কার-দাতাদের পত্রিকার সচিত্র প্রতিবেদনে কিছুই জানা যায় না (নিজস্ব প্রতিবেদক, ২০০৭)। “সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, চাষী-মজুরের জীবনযাত্রার সঙ্গে …সুপরিচিত”, “সিরিয়াস আপোষহীন লেখক” হাসান যে এখন জীবনের শেষ পর্যায়ে টপক্লাস বড়লোকদের জীবনযাত্রার সাথে পরিচিত হচ্ছেন সে বিষয়ে হয়ত কখনো তিনি লিখবেন–সে আশা করতে অবশ্য দোষ নেই (“কেন হাসান আজিজুল হক”, সম্পাদকীয় রচনা, রবিন ঘোষ, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৯৮৮: ৮)। তো, ঐ অনুষ্ঠানেই, ‘সৃজনশীল শাখা’য় ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই: ১৪১২’-র পুরস্কারে হাতেনাতে ভূষিত হওয়ার মুহূর্তে দেওয়া অভিভাষণে, কর্পোরেট-পৃষ্ঠপোষকতাপুষ্ট সাহিত্যের ভরা মজলিশে প্রথম বোমাটা মেরেছিলেন হাসান:

… আজকাল এটাই মনে হয় যে লেখা অবশ্যই ছেড়ে দেওয়া উচিত; আর সাহিত্য নিয়ে কী করব? এমন একটা দেশে-সমাজে, কিংবা আমি বলব, এমন একটা পৃথিবীতে আমরা বাস করছি, যেখানে কেবল জান্তব বেঁচে থাকা এবং সেই জান্তব বেঁচে থাকাকে অতিশয় উন্নত করার বাইরে মানুষের জীবন যাপনের মধ্যে আর কিছু নেই। … কতদিন আগে বঙ্কিমচন্দ্র বলে গেছেন, এ জীবন লইয়া কী করিব? আজকে আমি এই প্রশ্নটা আপনাদের সামনে তুলব। বলুন আপনারা, সাহিত্য নিয়ে আপনারা কী করবেন? সংগীত নিয়ে আপনারা কী করবেন? চিত্রকলা নিয়ে আপনারা কী করবেন? আমরা যদি নিজেদের বিবেকের কাছে সৎ থাকি, তাহলে প্রশ্নের জবাব আমাদের কারও কাছেই নেই। (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-ক; মোটা হরফ বর্তমান লেখকের) [বর্তমান লেখায় হাসানের এক নম্বর উদ্ধৃতি]

হাসানের এই প্রশ্ন-বোমার অসৎ- বা সদুত্তর দেওয়ার আদৌ কোনো প্রচেষ্টা আমাদের ‘আলোকিত’ সাহিত্য-সমাজ করেছেন বলে শুনি নি। তারা হয়ত থ মেরে গিয়েছিলেন। সেই ১৯৬৭-৬৮ সাল থেকেই তো তাঁর লেখা পড়ে, কথা শুনে মোটামুটি আক্কেলগুড়ুম হয়ে আছেন আমাদের বঙ্গীয় সাহিত্য-সমাজ, মাঝে-মাঝে শুধু আড়চোখে তাকানো কিংবা ফুল-চন্দন বর্ষণ করা ছাড়া। এখন তাঁরই বোমায় বিদ্বৎ-সমাজ সাহিত্য-সমাজ সমালোচক-সমাজ স্রেফ নিহত। আত্মঘাতী পরিস্থিতিই বটে।

ক’দিন না-যেতেই বরং আবার সাহিত্যবোদ্ধা-সাহিত্যসমালোচকদের কাছ থেকে পুরস্কার পেয়েছেন হাসান আজিজুল হক, আবার সেই প্রথম আলোর কাছ থেকে, ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০০৭ নির্বাচিত ১০ সৃজনশীল বই’ নামক টপটেন সাহিত্যিক চার্টে তাঁর নাম উঠেছে। (কঠিন ব্যাপার: লাগাতার ‘সৃজনশীল’ থাকা এবং লাগাতার ‘স্বীকৃতি’ পেতে থাকা। এবং আরও কঠিন ব্যাপার: সাহিত্য দিয়ে কী করব জানা না-থাকলেও সাহিত্য রচনা করে যেতেই থাকা এবং সাহিত্য দিয়ে কী করব জানা না-থাকলেও পুরস্কার দিয়ে কী করব তা জানা থাকা[২]।) এই দশ জনের বই রিভিউ করেছেন প্রথম আলোর মনোনীত দশ সমালোচক এবং সেই সূত্রে প্রথম আলোরই সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সাহিত্য-সমালোচক মশিউল আলমের ‘রিভিউ’ থেকে নিশ্চিত হওয়া গেল যে আগের বার স্রেফ মুখ ফস্কে ঐ বোমা মারেন নি হাসান। মশিউল যথাযথ জানাচ্ছেন:

    গত বছর ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই’ প্রতিযোগিতার সৃজনশীল শাখায় পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস আগুনপাখির লেখক হাসান আজিজুল হক পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানে সমবেত সুধীমণ্ডলীকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘সাহিত্য দিয়ে আপনারা কী করবেন?’ বিধবাদের কথা অন্যান্য গল্প বইটির উৎসর্গপত্রেও দেখছি সেই জিজ্ঞাসা : ‘সাহিত্য দিয়ে আমরা কী করব?’

    মাত্র ৩১ বছর বয়সে বাংলা একাডেমী পুরস্কারে সম্মানিত কথাশিল্পী ৬৬ বছর বয়সে এসে সাহিত্যের পাঠকসমাজকে ও নিজেকে জিজ্ঞাসা করছেন, সাহিত্য দিয়ে কী করার আছে। তরুণ বঙ্কিমচন্দ্রের মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এ-জীবন লইয়া কী করিব? প্রৌঢ় হাসান আজিজুল হকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, সাহিত্য দিয়ে আমরা কী করব?

    এহেন জিজ্ঞাসা তাঁর মুখে উচ্চারিত হতে এর আগে কখনো…শোনা যায় নি। এতকাল পরে এ রকম জিজ্ঞাসা উত্থাপনের মানে কী, তার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে স্বস্তি পাওয়া যেত। সাহিত্য দিয়ে বা সাহিত্য নিয়ে আমরা কী করব–এই প্রশ্নের উত্তরই যদি আমাদের জানা না থাকে, তাহলে কেন এত আয়োজন। (মশিউল আলম, ২০০৭)

মশিউলকে আন্তরিক ধন্যবাদ না জানিয়ে উপায়ই নাই। হাসানের প্রশ্নটা তিনি এবারে এড়িয়ে যান নি, থ মেরে যান নি। প্রশ্নটাকে বরং সিরিয়াসলি নিয়েছেন বলেই মনে হচ্ছিল, এবং কবুলও তিনি করলেন যে “এর একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে স্বস্তি পাওয়া যেত।” সত্যিই তো, “এই প্রশ্নের উত্তরই যদি আমাদের জানা না থাকে, তাহলে কেন এত আয়োজন”, তাহলে তো সাহিত্য করাই ছেড়ে দিতে হয়, সাহিত্য-পুরস্কার দেওয়া-নেওয়াও ছেড়ে দিতে হয়, তাই না? সাহিত্যের অস্তিত্ব নিয়েই টানাটানি, এমন একটা মারাত্মক প্রশ্ন নিয়ে তারপর মশিউল কী ভাবলেন ভগবান জানেন, ঐ লেখারই শেষের দিকে এসে মশিউলের আশ্চর্য সিদ্ধান্ত: “সাহিত্য দিয়ে আমরা কী করব–এটা আমাদের কাছে আদৌ কোনো প্রশ্ন নয়” (মশিউল আলম, ২০০৭)। এটা যদি আদৌ কোনো প্রশ্ন না হয়, তাহলে কী নিয়ে এতক্ষণ কথা বললেন তিনি! আর, এ-প্রশ্নের উত্তর যদি তাঁর জানাই থাকে তাহলে তা বুঝিয়ে বলাই তো দরকার ছিল।

“সাহিত্য নিয়ে আপনারা কী করবেন? সংগীত নিয়ে আপনারা কী করবেন? চিত্রকলা নিয়ে আপনারা কী করবেন?” হাসানের উত্থাপিত এই প্রশ্নের জবাব আমাদের কাছে জরুরি বৈকি। কিন্তু হাসান যে বললেন, “আমরা যদি নিজেদের বিবেকের কাছে সৎ থাকি, তাহলে এ প্রশ্নের জবাব আমাদের কারও কাছেই নেই” আমরা তার সাথে বিন্দুমাত্র একমত নই। আমরা বরঞ্চ মনে করি, “আমরা যদি নিজেদের বিবেকের কাছে সৎ থাকি, তাহলে এ প্রশ্নের জবাব আমাদের” কাছে অবশ্যই আছে। হাসানের জবানিতেই বর্তমান প্রবন্ধের এখানে-ওখানে আমরা তা পেশও করব। মশিউল হাল ছেড়ে দিলেও আমরা এত সহজে হাল ছাড়ছি না। যে “জিজ্ঞাসা তাঁর [হাসানের] মুখে উচ্চারিত হতে এর আগে কখনো…শোনা যায় নি। এতকাল পরে এ রকম জিজ্ঞাসা উত্থাপনের মানে কী, তার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে স্বস্তি পাওয়া যেত” তো বটেই, এই ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করাই বর্তমান প্রবন্ধের মূল একটা কাজ, তবে আমাদের ব্যাখ্যা মশিউল আলম এবং হাসান আজিজুল হকদেরকে “স্বস্তি” দেবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। সেই অস্বস্তিকর আলোচনায় আরো বেশি করে ঢোকার আগে, দেখুন, মাত্রই সিরিয়াসলি যিনি বলেছেন সাহিত্য দিয়ে আমরা কী করব (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-ক), যে-প্রশ্নের ঘায়ে খোদ সাহিত্যের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে, সেই প্রশ্নের কোনোপ্রকার ফয়সালা না করেই, তিনিই আবার সাহিত্য-সমালোচনাকেখানিক পরে দেখতে পাব সবাইকেই আসলে–প্রথমে শিল্প এবং সাহিত্যের স্বশাসন এবং স্বয়ম্ভরতা মেনে নিতে বলছেন এবং নিতান্তই প্রশ্নাতীতভাবে শনাক্ত করছেন শুদ্ধ শিল্পের জায়গা-জমি (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-খ; বর্তমান লেখায় হাসানের পাঁচ নম্বর উদ্ধৃতি)। সাহিত্য আমাদের (সমাজের ও মানুষের) আদৌ কোনো কাজে আসে কি না তা নিয়েই যাঁর গভীর সংশয়, তিনিই আবার শুদ্ধ শিল্প এবং স্বয়ম্ভর সাহিত্য আবিষ্কার করছেন। অথচ বলতে গেলে শুদ্ধ সাহিত্যের ধারণাই বিরুদ্ধে তিনিই একদা বলেছিলেন,

    কোনো একটা অবস্থানে দাঁড়িয়ে লেখককে তাঁর সময়ের সমাজের প্রতিবেশের ছাপ গ্রহণ করতেই হয়। সে কাজটা অবশ্য সবাইকেই করতে হয়–এই ছাপ নেবার হাত থেকে কারো নিস্তার নেই–এবং সব মানুষই কোনো না কোনোভাবে সেটা প্রকাশও করে ফেলে। লেখক তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে ঐ কাজটাই করে থাকেন। কাজেই বোঝা যাচ্ছে সাহিত্য সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ সামগ্রী হিসেবে আকাশ থেকে ঝরে পড়ে না। (সাক্ষাৎকার/১, হাসান আজিজুল হক : সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ১৮)

শুধু তাই নয়, ঠিক দুই দশক আগে এর চেয়েও স্পষ্ট করে যিনি বলেছিলেন,

    বেশির ভাগ বুর্জোয়া শিল্পতত্ত্বে বিশুদ্ধ শিল্পের, সৌন্দর্যের, রূপের…দোহাই দিয়ে নানারকম রঙিন ফানুস ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেইসব ফানুস এখন ফাটিয়ে দেওয়া দরকার। (সাক্ষাৎকার/৫, হাসান আজিজুল হক : নূরুল কবির, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ৮৩)

সেই একই ব্যক্তি এখন যদি শিল্প-সাহিত্যের শুদ্ধ-স্বয়ম্ভর গায়েবি সত্তার খোঁজ পেয়ে থাকেন তো তাঁকে আমার অভিনন্দন জানাতে কুণ্ঠা করা উচিত নয়।

যদি আমি ঠিক বুঝে থাকি, হাসানের বৈপরীত্যগুলোকে যথাযথভাবে বুঝতে পারলে শুধু তাঁকেই বোঝা যায় না, বাজারের এই যুগে, এমনকি সব পাল্টে দেবার ইচ্ছেটাকেও পাল্টে দেবার এই যুগে, খোদ বাংলা সাহিত্যকেও বুঝে নেওয়ার কর্তব্য সাধনের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া যায়। বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যে তাঁর মতো এত বড় ঘটনা (কেস) আর কোথায়? তাঁর অনন্যসাধারণ গুরুত্বই তাঁকে এই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু করে তুলেছে। তাঁর সংকট তাঁর একার নয়; তাঁর সংকট তাঁর যুগের সংকট। তাঁর যখন চোখ-ধাঁধানো উত্থানের দিন গেছে, সেই দিনও ছিল বিগত যুগের বৈশিষ্ট্যেরই স্মারক। একদিকে বিপ্লবের যুগের আদর্শ সাহিত্যিক, আর অন্যদিকে বাজারের যুগের দিশাহারা বুদ্ধিজীবী–উভয় সত্তাকে আপন শরীরে ধারণ করেছেন হাসান আজিজুল হক। হাসানদের যুগের লেখক-সাহিত্যিকদের জন্য তৎকালীন হালফ্যাশনের সমাজ-বদলের ইচ্ছার মধ্যেই কোথাও কি গলদ ছিল?[৩] তাঁদের পছন্দের বলশেভিক সমাজতন্ত্রের ধারণার মধ্যেই কি ছিল ভ্রান্তি? আমরা কি তাহলে সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম পরিত্যাগ করব? মুক্তি আর স্বাধীনতার লড়াই এগুবে কোন পথে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্যে নিতান্তই দরকারী এবং প্রধানত সাহিত্যের পরিসরে এসবের উত্তর অনুসন্ধান করা এই প্রবন্ধের অন্যতম কর্তব্য।

বর্তমান প্রবন্ধের স্লথ গতিধারার সাথে ধৈর্য ধরে তাল মেলাতে পারলে, আমার বিশ্বাস, আমরা দেখতে পাব, একদিকে রাজনৈতিক এলাকায় বলশেভিক সমাজতন্ত্রের মিথ্যা আশ্বাস ও রুশ-মার্কিন ঠাণ্ডা-যুদ্ধের ডামাডোলে সর্বত্র তথাকথিত বিপ্লবের ঢেউ, ৭০ বছর বছর চোখের সামনে তার করুণ বিলুপ্তি আর সমাজ-সংসার-সাহিত্যে কর্তৃত্বপরায়ণতার মতাদর্শের বহুরূপী সর্বব্যাপী বিস্তার, এবং অন্যদিকে অর্থনৈতিক এলাকায় পৃথিবী জুড়ে পুঁজিবাদের/বাজারের আপাত-অপ্রতিরোধ্য বিস্তার–এই দুই ঘটনাকে মোকাবেলা করে লড়ে যেতে পারার মতো দূরসন্ধানী দৃষ্টিকল্প আশু লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হাজির না-থাকাটা হাসানের উপরে কথিত এবং নিচে আলোচিত বৈপরিত্যসমূহের জন্য দায়ী। ভক্তির এই দেশে, ভক্তিপরায়ণু পাঠকদের জন্য একটা কথা আগাম বলে না-রাখলেই নয়: হাসানকে সম্মান বা অসম্মান করা অথবা শ্রদ্ধা বা অশ্রদ্ধা করা এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়; সম্মান-অসম্মান, শ্রদ্ধা-অশ্রদ্ধা আদৌ এ-লেখার বিষয়বস্তু নয়; বরং আমাদের সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের চিন্তার পদ্ধতিগত গলদগুলো বোঝার চেষ্টা করা এ-রচনার সর্বপ্রধান প্রধান উদ্দীষ্ট বিষয়–অপ্রধান বিষয়াদি ক্রমান্বয়ে দৃষ্টিগোচর হবে।

দ্বিতীয় কাণ্ড: দেকার্তের দোহাই

নিজেদেরটা আরও সুস্থিরভাবে বিচার করতে পারার জন্য বিভিন্ন দেশের মানুষজনের রীতিনীতি-লোকাচার সম্পর্কে জানাটা ভালো; আর, আমাদের নয় এমন সমস্ত হালচালই অবান্তর-অর্থহীন যুক্তি-পরিপন্থী, এমন চিন্তা না-করাটা ভালো …। কিন্তু ভ্রমণের পেছনে কেউ যখন অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে, নিজের দেশে তখন সে আগন্তুকে পরিণত হয়, এবং যখন কেউ বিগত শতাব্দীগুলোতে অনুশীলিত বিষয়-আশয় সম্পর্কে অতিরিক্ত কৌতূহলী হয়ে ওঠে, সাধারণত তখন সে তার নিজের সময়-কালে অনুশীলিত বিষয়-আশয় সম্পর্কে অতিশয় অজ্ঞ হয়ে ওঠে।

রেনে দেকার্ত ১৬৩৭, অনুবাদ বর্তমান প্রাবন্ধিকের

গুরুতর এবং আনন্দদায়ক ঘটনা হলো, যা বলতে চান তা বলে ওঠার আগেই তাঁর আলোচ্য লেখায় যেভাবে নাম-ধাম-হদিস-সহ ‘দার্শনিক’ পদ্ধতির কথা তুলেছেন দর্শনের প্রাক্তন প্রফেসর, তা আমার পড়া-মতে হাসানের বেলায় কালেভদ্রেই ঘটে। পড়া যাক:

সাহিত্যের সমালোচনা কি আদৌ সম্ভব? এখান থেকে আলোচনা শুরু করে আমরা একটি নির্দিষ্ট উত্তরে পৌঁছুনোর চেষ্টা করতে পারি। একটা ‘না’-এর জায়গা থেকে যদি দেখি, তাহলে কোনো সময় একটা ‘হ্যাঁ’-এর জায়গায় হয়ত আমরা পৌঁছুতে পারব। এই পদ্ধতিতেই আধুনিক দর্শন তৈরি হয়েছিল। এই পদ্ধতি দেকার্তের। কার্তেসীয় পদ্ধতিতে ঘরে যদি নতুন জিনিস ঢোকাতে চাই, তাহলে পুরোনো জিনিসগুলোকে আগে ঝেঁটিয়ে বের করে দিয়ে ঘরটা ফাঁকা করতে হবে। তখন ইচ্ছেমতো নতুন জিনিস ঢোকাতে পারব। শূন্যতাটা আগে দেখে নেওয়া ভালো। আমরা যে-বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করতে চাইছি, তা এরকম একটা ‘না’-এর জায়গা থেকে শুরু করলে ফল মিলবে বেশি।

ফরাসি দার্শনিক দেকার্ত একটা নতুন দর্শন দিতে ব্যস্ত না হয়ে দর্শন নির্মাণের জন্য একটা পদ্ধতি বের করতেই আগে মন দেন। তাঁর এই শুরুর রচনার নাম ‘মেডিটেশন্‌স্‌ অন ফার্স্ট ফিলোসফি’। এর প্রথম কথাই হচ্ছে, সন্দেহ করো, অস্বীকার করো। সন্দেহ করতে করতেই এমন একটা কিছু পাওয়া যাবে, যাকে আর সন্দেহ করার কোনো উপায়ই থাকবে না। প্রতিষ্ঠিত বা স্বীকৃত বিষয়গুলি, যেগুলি সবাই মেনে নিয়েছে সেগুলোকেও সন্দেহ করতে হবে। দেখতে হবে শেষ পর্যন্ত এমন একটা জায়গায় পৌঁছুনো যায় কি না, যেখানে আর সন্দেহ করার উপায় নেই। (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-খ; মোটা হরফ বর্তমান লেখকের) [বর্তমান লেখায় হাসানের দুই নম্বর উদ্ধৃতি]

হাসানের দেকার্ত-উপস্থাপনটা চমৎকার, আংশিক অতি-সারল্যের একটু মুশকিল থেকে গেল। দেকার্ত শূন্যতা দেখতে চেয়েছিলেন! পুরানা সবকিছু ঝেঁটিয়ে বের করে দিয়ে তারপর ইচ্ছেমতো নতুন জিনিস ঢোকাতে চেয়েছিলেন? মনে হয় না। দেকার্ত আসলে চেয়েছিলেন গোড়া থেকে শুরু করতে। বিদ্যমান সমগ্র জ্ঞানকাণ্ডটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, আন্তরিক ও দৃঢ়ভাবে সন্দেহ করেছেন, চ্যালেঞ্জ করেছেন তিনি–পরখ করেছেন নিজের যুক্তিবোধ দিয়ে। মিথ্যামিথ্যা সন্দেহ নয়, পাতানো সন্দেহ নয়–সত্যিসত্যি তাঁর যুগের জ্ঞানতত্ত্বকে আগাগোড়া সন্দেহ করেছেন দেকার্ত, তারপর পরীক্ষানিরীক্ষা শেষে সেই জ্ঞানতত্ত্বের পদ্ধতিগত জায়গাগুলোকে অস্বীকার করেছেন, স্রেফ খারিজই করে দিয়েছেন। তাঁর আগের আর পরের দর্শন-বিজ্ঞান একেবারে আকাশ-পাতাল আলাদা (এ বিষয়ক সংক্ষিপ্ত কিন্তু ধারালো আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য: নোম চমস্কি, ১৯৯৬: ১৪–৫৪)। ক্রমশ আমরা দেখব: হাসান কিন্তু সমগ্র সাহিত্য-জ্ঞানকাণ্ডটাকে সন্দেহ করছেন না, সমর্থনই করছেন বরং; সমগ্র সাহিত্য-শাস্ত্রটাকে নিজের যুক্তিবোধ দিয়ে–যা অপরের যুক্তিবোধের কাছেও বোধগম্য–পরখ করছেন না, সাহিত্য সম্পর্কে চিন্তাভাবনা নতুন করে গোড়া থেকে শুরু করতেও চাচ্ছেন না। চাচ্ছেনটা কী তাহলে তিনি? বিষাদ-ভারাক্রান্ত-চিত্তে আমরা দেখব: সম্ভবত বিশেষ কিছু একটা চাচ্ছেন না আদৌ, বড় সাহিত্য-প্রতিষ্ঠানের সম্পাদকের আব্দার ও তদ্বির শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করার উপলক্ষে সাহিত্য-বাজারে যে ‘হাসান আজিজুল হক’ নামে একটা দোকান এখনও খোলা আছে এবং সেই দোকানের মালপত্র যে তরুণ/নতুন দোকানপাটের মালপত্রের চেয়ে এখনও অনেক ভালো, সেটাই আসলে জানান দিতে চাচ্ছেন তিনি। তবু সেই সুবাদে যে দেকার্তের পদ্ধতি-প্রশ্নটার সামনে আমরা দাঁড়াতে পারলাম, সেটাই নগদ লাভ।

পদ্ধতিটা দুর্দান্ত কিন্তু। কিন্তু এটা যদি আমার পদ্ধতি হয়? অবৈজ্ঞানিক নিউটনের? হাসানের আপত্তি আছে? ক্রমাগত প্রশ্ন করা, সংশয়-সন্দেহের আগুনে ঝালাই করা, আর অনুসন্ধান করে যাওয়া, ফলত বড় বড় দেবতা ও দরবেশকে অবলীলায় অস্বীকার করা, যতক্ষণ না যুক্তিগ্রাহ্য একটা জায়গায় পৌছানো যাচ্ছে–এই সব বৈশিষ্ট্য অধম এই প্রবন্ধ-রচয়িতার এবং নিশ্চয়ই আরো অনেকেরও খাসলতের অংশ। উত্তম হাসানের স্বভাবও কি তাই? তাহলে তাঁকে দেকার্তের নাম নিতে হচ্ছে কেন? দেকার্ত কিছু বললেই সেটা সন্দেহের ঊর্ধ্বে উঠে যায়? হাসান কি তাহলে দেকার্ত-পন্থী? শুদ্ধ-স্বয়ম্ভর শিল্প-সাহিত্যে দেকার্তের সন্দেহ-সংশয় ছিল না? হাসান কিন্তু আবার জায়গা-মতো ‘দ্বান্দ্বিক-মার্কসবাদী’ পদ্ধতিরও লোক (দ্রষ্টব্য: হাসান আজিজুল হক, ১৯৯৮: ৫৮–৬৮)![৪] আবার হেগেলের দোহাইও তিনি দেন। বেশিদূর যেতে হবে না। আলোচ্য রচনাটিরই শেষের দিকে বলতে গেলে পদ্ধতিরই প্রশ্নে তিনি হেগেল আর মার্কসের দ্বন্দ্ব-পদ্ধতির লাশ ফেলে দিয়েছেন একই বাক্যে [বর্তমান লেখায় হাসানের বারো নম্বর উদ্ধৃতি]। নিজের লেখাটাতেই হাসান যদি স্ব-বর্ণিত কার্তেসীয় পদ্ধতি প্রয়োগ করতেন তবে তিনি সাহিত্য সম্পর্কে যেগুলি সবাই মেনে নিয়েছে সেগুলোকেও সন্দেহ করতেন, অন্তত অধিপতি-সাহিত্য-শাস্ত্রের নানান ধারা-উপধারা-পাতিধারার সাহিত্যিক-পণ্ডিত-সমালোচকদের কাছে সাহিত্য সম্পর্কিত যে-বিষয়গুলি প্রতিষ্ঠিত বা স্বীকৃত সে সম্পর্কে সংশয় পোষণ করতেন, এবং শুদ্ধ-স্বয়ম্ভর শিল্প-সাহিত্যকে অস্বীকার না করলেও সন্দেহ তো করতেনই। কিন্তু তিনি আগে থাকতেই শুদ্ধ-স্বয়ম্ভর শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গিয়েছেন যেখানে আর সন্দেহ করার উপায় নেই। কার্তেসীয় পদ্ধতির ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত অবস্থান এটা। বোঝা কি যাচ্ছে না যে আর যা-ই হোন, শুদ্ধ-স্বয়ম্ভর ‘কার্তেসীয়’ পদ্ধতির লোক হাসান নন? হাসানের আলোচ্য লেখায় তাহলে স্বয়ং হাসানের পদ্ধতিটা কী দাঁড়ায়?

দেখা যাচ্ছে, নীতি-পদ্ধতির প্রশ্নে ঘোষিত প্রকাশ্য অবস্থানটি হাসানের জন্য বড় ব্যাপার নয়। লেখা থেকে লেখায় বা একই লেখার এক অংশ থেকে অন্য অংশে তার হেরফের ঘটতে পারে। লেখার আরম্ভেই যে হাসান মহা আড়ম্বরে দেকার্তের পদ্ধতির দোহাই দিয়েছেন, সেটা কিন্তু এই জন্য নয় যে দেকার্তের এবং তাঁর নীতি-পদ্ধতিগত অবস্থান একইরকম। দেকার্তের দোহাই এখানে স্রেফ কৌশলগত। দেকার্তের নাম নিয়ে পাঠকের মধ্যে নিজের সম্পর্কে একটু সমীহ জাগানোর চেষ্টার চেয়ে বেশি কিছু হিসেবে একে বিবেচনা করা কঠিন। সামান্য একটু থেমে চিন্তা করলে দেখা যাবে, নীতি-পদ্ধতির প্রশ্নটাই হাসানের কাছে আদৌ নীতি-পদ্ধতির নয়, কৌশলের–বুদ্ধির। তাহলে, হাসান আজিজুল হকের সাহিত্যিক নীতি-পদ্ধতি সম্পর্কে একটি বৈশিষ্ট্য শণাক্ত করা গেল। কাকতালীয় পরিহাস, হাসানের প্রবন্ধের এক্কেবারে শেষ দোহাইটিও ঠিক এই বস্তুই, বুদ্ধির দোহাই। বুদ্ধি-প্রযুক্ত নিরপেক্ষতার তুলি দিয়ে এক রকম নিরঞ্জন অর্জন করা গেলেই নাকি সেটা হয় উপযুক্ত সমালোচনা, যদিও সে বস্তু সোনার পাথরবাটির মতোই সুদূর অপ্রাপ্য বলে তিনি নিজেই অকাতরে কবুল করেছেন। সংশয় হয়: হাসানের এই বুদ্ধি ‘রিজ্‌ন্‌’ নয়, বিচারশক্তি নয়, মনীষা নয়, এ-ও ঐ কৌশল–চাতুর্য-বুদ্ধিরই নামান্তর। নীতি-পদ্ধতিগত বিচারে এখানে দেকার্তের নামগন্ধ নাই।

তৃতীয় কাণ্ড: সাহিত্য রচনা কি আদৌ সম্ভব?

যুক্তি-প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতা যাদের আছে, আর স্পষ্ট ও বোধগম্যভাবে লেখার উদ্দেশ্যে সবচেয়ে দক্ষতার সাথে যারা তাদের নিজেদের চিন্তাকে সাজাতে পারে, প্রভাবনের সর্বোত্তম ক্ষমতা তাদের আছে … এমনকি যদি তারা জীবনে কখনও রেটোরিক না-ও পড়ে থাকে। আর, যাদের অত্যন্ত আনন্দদায়ক মৌলিক ভাবধারা আছে এবং সর্বোচ্চ স্টাইল-সহকারে ও সুসজ্জিতভাবে সেগুলোকে প্রকাশ করতে যারা জানে, শ্রেষ্ঠ কবি হতে তারা ব্যর্থ হবে না, এমনকি যদি কাব্য-কলা তারা না-ও জেনে থাকে।

রেনে দেকার্ত ১৬৩৯, অনুবাদ বর্তমান প্রাবন্ধিকের

হাসান আজিজুল হকের সাহিত্যিক নীতি-পদ্ধতি সংক্রান্ত ওপরে শণাক্তকৃত বৈশিষ্ট্যটি ছাড়া আরও সব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও লেখাপড়া এগিয়ে নিতে নিতে অনুমান দাঁড় করানো যাবে বৈকি। তার আগে চলুন দেখি, পদ্ধতি-প্রস্তাব শেষে কী বক্তব্য পেশ করেন হাসান:

তাহলে এবার প্রশ্নটা তুলি! সমালোচনা কি সম্ভব? সমালোচনার নামে যে আলাদা একটা সাহিত্য আছে তা কতটা ধোপে টেকে। কড়া সমালোচক, নিরপেক্ষ সমালোচক, বিবেকবান সমালোচক মিন মিন করে বা মহা আড়ম্বর করে যে রায় দিয়ে আত্মতৃপ্তি বোধ করেন, তার ভিত্তি কতটা মজবুত! তিনি শক্ত পায়ে দাঁড়াতে পারেন তো? ভাঁড়ের ভূমিকা নিতে হয় না তো তাঁকে? আসলে তিনি কী করেন সাহিত্য সমালোচনার বেলায়? সাহিত্যের ওপর চড়াও হওয়া ছাড়া প্রকৃত প্রস্তাবে তিনি কি আর কিছুই করতে পারেন? নিজের পড়াটাকেই তিনি যা পড়েন তার ওপর চাপিয়ে দেন? তিনি বুঝতেও পারেন না তিনি ঠিক কি করছেন? যে খাবার হাজার লোকে খাবে, সেই খাবার খেয়ে একা তিনি হাজার খাদকের পক্ষ থেকে তার স্বাদ-গন্ধ ঘোষণা করছেন। সমালোচনার শেষ পরিণতি কি এখানে গিয়েই ঠেকে? … সামপ্রতিক সাহিত্যতত্ত্বের জায়গা থেকে এ রকম কথা এখন আসছে। (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-খ; মোটা হরফ বর্তমান লেখকের) [বর্তমান লেখায় হাসানের তিন নম্বর উদ্ধৃতি]

সাহিত্য-সমালোচনার বিরুদ্ধে হাসানের এই সওয়ালগুলোকেই খোদ সাহিত্য রচনার বিরুদ্ধে যদি কেউ খাটিয়ে দেখতে চায়? কার্তেসীয় পদ্ধতি মোতাবেক যদি কেউ সবকিছুকে সন্দেহ করতে চায়, অস্বীকার করে দেখতে চায়, যতক্ষণ না গ্রহণযোগ্য যুক্তিসম্মত পাটাতন দাঁড়াচ্ছে? আসুন, পরীক্ষা করে দেখা যাক।

সমালোচনা-সাহিত্য ধোপে টেকে কি না তা নিয়ে হাসানের প্রশ্ন। কিন্তু আশ্চর্য বটে, ঘুণাক্ষরেও তাঁর মনে আসে না যে খোদ সাহিত্যকে একবার ধোপাবাড়ি পাঠিয়ে দেখলে কেমন হয়, ধোপে টেকে কি না? জীবন-বাস্তব সম্পর্কে কিছু একটা ধারণা-অভিজ্ঞতা-উপলব্ধি-অনুভূতি ইত্যাদি কারও মনে জন্মালে যদি তিনি সেটাকে ভাষায় প্রকাশ ক’রে সেই রচনাটিকে সাহিত্য নামক বিশেষ একটা সুবিধাজনক চৌহদ্দির মধ্যে ফেলেন এবং এ বিশেষ প্রকাশ-কর্মটির জন্য যদি তিনি নিজেকে সৃজনশীল, স্রষ্টা, মৌলিক রচনার মালিক, এক কথায় সাহিত্যিক ব’লে ধরে নিয়ে আত্মতৃপ্তি বোধ করেন এবং হাততালি, পুরস্কার ইত্যাদির অপেক্ষা করতে থাকেন, আর মনে করতে থাকেন দেশ-দশ-জাতিকে ধন্য করে দিয়েছেন, তা কতটা ধোপে টেকে? সাহিত্যিক-মশাই শক্ত পায়ে দাঁড়াতে পারেন তো? যদি না-পারেন, তাহলে সাহিত্য রচনা কীভাবে সম্ভব? কিন্তু এইসব প্রশ্ন তাঁর মনে ভাসে না। চিন্তাসঙ্কুলতা, যুক্তি-পরম্পরা ও প্রশ্নকাতরতা এবং আত্ম-অনুসন্ধিৎসা ও আত্মজিজ্ঞাসা ইত্যাদিকে তাঁর মননের বৈশিষ্ট্য হিসেবে নির্ণয় করা শক্ত। দেকার্তের কথা তুলে পদ্ধতির কথা পাড়লেও নিজের পদ্ধতি, নিজের-নিজেদের সাহিত্য-রচনার পদ্ধতি, নানান সময়ে যে সাহিত্য-সমালোচনামূলক নানান রচনা লিখলেন তার পদ্ধতি–এসব নিয়ে কোনো কথাই কোনোদিন তুললেন না তিনি। যেসব যুক্তি দিয়ে তিনি সাহিত্য-সমালোচনাকে কাবু করার চেষ্টা শুরু করলেন, সেসব যুক্তি আগে নিজেরই প্রতি (অর্থাৎ খোদ সাহিত্যের প্রতি) উৎসর্গ করলে কী দাঁড়ায় তার খোঁজ নেওয়াটা তো অন্তত স্বাভাবিক সৌজন্যের খাতিরে হলেও আবশ্যিক ছিল।

হাসান কিছু-একটা লিখলেই যে বড় বড় পত্রিকা-ইন্ডাস্ট্রির বড় বড় সম্পাদক-সমালোচকের কাছে তা সাহিত্য বলে বিবেচিত হয়, আর ফরিদপুরের করিমুন্নেসা কিছু লিখলে যে তা কিছুই হয় না, সেই সাহিত্যের ভিত্তি কতটা মজবুত! এই চিন্তাও তাঁর মনে বিন্দুমাত্র ছায়া ফেলে না। মানুষে মানুষে প্রকাশের এবং সম্পাদন-ক্ষমতার (পার্‌‌ফর্‌মেন্সের) পার্থক্য থাকবেই এবং সেসবের মধ্যে নানা জন নিজের নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি-রুচি-দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সাহিত্যের শ্রেয়-হেয় বিচারও করবেন–তাতে আমি আপত্তি করছি না। রুচি ও প্রকাশের এই বিপুল বৈচিত্র্য সবসময়ই স্বাস্থ্যকর, কিন্তু হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক এই বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে সাহিত্যের একটি বিশেষ ‘মানদণ্ড’ বা গজফিতা নির্মাণ এবং সেটাকে ছাড়া অন্য সবকিছুকে অ-সাহিত্য হিসেবে খারিজ করে দেওয়াটা প্রকৃতই চিন্তা-উদ্দীপক। তথাচ, কিছু কিছু মানুষ আদৌ কীভাবে সাহিত্যিক বা লেখক হয়ে ওঠেন, অথচ বাকিরা বহুকিছুর ‘সহিত’ থেকেও কীভাবে ‘সাহিত্যিক’হতে পারেন না অথবা অনেক কিছু লিখেও কীভাবে ‘লেখক’ হতে পারেন না–এবং এই অবস্থার পেছনে বাজারের সাহিত্য-উৎপাদন-প্রকৌশল ও একপেশে সাহিত্যবিচারবুদ্ধির দীক্ষায়ণ-প্রকৌশল কীভাবে কাজ করে–সেই প্রশ্ন হাসানের বেলায় আগাগোড়াই গরহাজির থেকে যায়, এমনকি তখনও, যখন তিনি শুদ্ধ সাহিত্য নিয়ে, সাহিত্য-সমালোচনার প্রক্রিয়া নিয়ে কথা তুলছেন। চিন্তাশীলতা বা যুক্তিবিন্যাসের গতিধারাকে নিজের গতিতে তিনি এগুতে দেন না তিনি। যদি দিতেন তাহলে এসব চিন্তা তাঁর মনে ছায়াপাত না-করে থাকত কীভাবে? তার মানে আগের থেকেই, কৃত্রিমভাবে, তিনি নির্ধারণ করে রাখেন কতটুকু কথাকে চিন্তা-যুক্তি-পদ্ধতি হিসেবে পাড়বেন।

যুক্তি-বিন্যাসের ক্ষেত্রে ছক-কষা মন-মানসিকতার কারণেই হয়ত তিনি খেয়াল করতে ব্যর্থ হন, অন্যের বিরুদ্ধে–এক্ষেত্রে সাহিত্য-সমালোচকের বিরুদ্ধে–পেশ করা যুক্তি-প্রণালী কীভাবে তাঁর নিজের সাহিত্যিক-অবস্থানটাকেই সমস্যা-সঙ্কুল করে তুলছে। নইলে বর্তমান লেখায় হাসানের তিন নম্বর উদ্ধৃতি মোতাবেক তিনি কি ভেবে দেখতেন না, সাহিত্যিক নিজে আসলে কী করেন তথাকথিত সাহিত্য রচনার বেলায়? তিনি কি বুঝতে পারেন, তিনি ঠিক কী করছেন? খোদ বাস্তবের ওপর চড়াও হওয়া ছাড়া প্রকৃত প্রস্তাবে তিনি কি আর কিছুই করতে পারেন? বাস্তব সম্পর্কে নিজের পড়াটাকেই তিনি যা পড়েন বা লেখেন তার ওপর কি চাপিয়ে দেন না? বাস্তবকে দেখে-শুনে-শিখে এবং বাস্তবতার অংশ হিসেবে অভিজ্ঞ হয়ে উঠে বাস্তব সম্পর্কে জনাব সাহিত্যিক যে বিবরণ রচনা করেন সেটাকেই পরে তিনি এবং সাহিত্যওয়ালারা বাস্তব বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেন না তো? বাস্তব থেকে নেওয়া নিজের পাঠটিকেই তিনি খোদ বাস্তবের ওপর চাপিয়ে দেন না তো? টেলিভিশন যেমন মনে করতে থাকে টিভিই বাস্তব–‘রাস্তা ও টিভিটার তফাত নিকটে’। আসলেই কিন্তু অধিপতি ধারার টিভি বা সাংবাদিকতার মতোই, সাহিত্যও বাস্তবকে উদ্ভাবন করতে থাকে। আমাদের সাহিত্যিক-সাহেব তাহলে শক্ত পায়ে দাঁড়াতে পারেন তো? ভাঁড়ের ভূমিকা নিতে হয় না তো তাঁকে? হাসান আজিজুল হক কী বলেন? হাসানের ‘সাহিত্যের বাস্তব’ প্রবন্ধটা (হাসান আজিজুল হক, ১৯৯৪: ১৪১–১৫৩) এ প্রসঙ্গে আবার পড়লাম, চাইলে পাঠকও একবার দেখে নিতে পারেন:

যা কিছু যেমন আছে অবিকল তেমনি তুলে ধরাটাই কি সাহিত্যে বাস্তবতা? …

যাথার্থ্যের কথাটা যদি বস্তুর বেলাতেই এত জটিল, তাহলে জীবন্ত প্রাণী এবং সবচেয়ে বড়ো কথা মানুষের এবং মানুষের সমাজের বেলাতে যে তা অমীমাংসেয় জটিলতায় গিয়ে পৌঁছুবে তা সহজেই অনুমান করা চলে। …

এই অবস্থায় জীবনবাদী বাস্তববাদী লেখকের হাত থেকে বাস্তব কেবলই পিছলে পিছলে যায়। অতি সামান্য একটা বস্তু, যার নড়াচড়াটুকু পর্যন্ত নেই তারও সঠিক বিবরণ দেওয়া তাঁর পক্ষে যখন সম্ভব হয় না, সেখানে একটা পুরো মানুষ সম্বন্ধে মনস্থির করে কি লেখা যায়? …

সাহিত্যের বাস্তব তাই বাস্তব ভেঙে গড়া আর এক দ্বিতীয় বাস্তব যাকে বলতে পারি বাস্তবতর, বাস্তব থেকে চোলাই করা আগুনের মতো উজ্জ্বল একধরনের তরল; … (হাসান আজিজুল হক, ১৯৯৪: ১৪১–১৪৫) [বর্তমান লেখায় হাসানের চার নম্বর উদ্ধৃতি]

বাস্তবের ওপর চড়াও হওয়া ছাড়া প্রকৃত প্রস্তাবে এ ঘটনাকে আর কী বলা যায়? বাস্তবের ওপর চড়াও না হয়ে উপায়ই বা কী? মানুষের বাচ্চা মাত্রই এই-ই তো করেন। ডুগডুগি-বাজানো সাহিত্যিক-সততার কথা বলছি না, সাদাসিধা সততার সাথে কেউ যখন কিছু লেখেন বা বলেন বা জানান বা প্রকাশ করেন বা রচনা করেন, তখন তিনি/তাঁরা নিজ-নিজ বাস্তবতা সম্পর্কে নিজের নিজের পাঠই তো পেশ করেন, নাকি? সে বাস্তবতা হতে পারে কোনো ঘটনা, কোনো দৃশ্য, কোনো কল্পনা, কোনো পাঠ, কোনো অভিজ্ঞতা, কোনো অনুভূতি ইত্যাদি যেকোনো কিছুই। এটাই তো জানার-জানানোর স্বাভাবিক মানবিক প্রক্রিয়ার অংশ, তাই না? কি নিরক্ষর মানুষ, কি সাহিত্যিক, কি সাহিত্য-সমালোচক, কি ইস্কুলের ছাত্র, কি দার্শনিক, কি রিকশাওয়ালা–সকলকে তো তাই করতে হয়? সাহিত্য-সমালোচকের দোষটা তাহলে কী? আর, সাহিত্যের বিশেষ গুণটাই বা কী? কিন্তু সাহিত্য ও সমালোচকের দোষগুণ খণ্ডণ করা আমার এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য হলো এইটা ধরিয়ে দেওয়া যে আলাদা একটা পুরস্কারযোগ্য মহান বস্তু হিসেবে সাহিত্য রচনা করার কিছু নাই। আলাদা একটা পদার্থ হিসেবে সাহিত্য-সমালোচনা রচনা করার বা সাহিত্যের ওপর চড়াও হওয়ারও বোধগম্য কোনো কারণ নাই। সাহিত্য কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানবীয় রচনার অগণন অভিপ্রকাশের অন্যতম মাত্র। মানবীয় রচনার আলাদা আলাদা ভাগকে আলাদা আলাদা নাম দিয়ে বর্গীভূত করার বিকল্প নাই বটে, কিন্তু কোনো একটা বিশেষ বর্গকে মহামহিমান্বিত করার মূল যুক্তিমালা সমাজ-নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে জনমানসকে বিশেষ গড়নে দীক্ষায়িত করার সাথে সম্পর্কিত। অনেক অনেক দিন আগে যখন গোটা একটা লোকালয়ে গুটিকয় এলিট-ব্রাহ্মণ ছাড়া গোটা জনগোষ্ঠীকেই অক্ষর-বঞ্চিত রাখা হতো, তখন অ-আ-ক-খ রচনা করলেও সেটাকে আলাদা করে সাহিত্য বা ‘বাঙ্ময়’ বা ‘সরস্বতী’ বা ‘শ্বেতহস্তী’ জাতীয় কিছু-একটা মহিমান্বিত পদ-নামে চিহ্নিত করার তাৎপর্য থাকে। কিন্তু সেই অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। হস্তাক্ষর তো হস্তাক্ষর, খোদ মুদ্রাক্ষরই এখন অচিন্ত্যনীয় সংখ্যক মানুষের কব্জায় চলে এসেছে। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতির মৌলিক সত্য অর্থাৎ, সনাতন ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র বা অত্যাধুনিক এলিট-মহাজনী ‘দীক্ষায়ন-প্রকৌশল’ (দ্রষ্টব্য: সেলিম রেজা নিউটন, ২০০৩) বা উত্তরাধুনিক কোরেশ-বংশের প্রতাপ তথা কর্তৃত্ব ও গোলামির জ্ঞানতন্ত্র মোটেও অস্ত যায় নি। সেই সূত্রেই আমাদের বৃহৎ সাহিত্যিকদের রমরমা। (বলে রাখা ভালো, শাসক হুজুরদের মূলধারার সাহিত্যকে চ্যালেঞ্জ করার কথা বলে বিকল্পধারার সাহিত্য যারা বানাতে চান, সেখানেও পুরস্কার-পদক-মহিমা-কারিশমা ইত্যাদি চালু করতে চান, তাঁরাও আসলে আগামীতে মূলধারাই হয়ে উঠতে চান, নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থ মোতাবেক জনমানসকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান–খোদ সাহিত্য-কর্তৃত্বকে উৎপাটিত করে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতার সীমাকে আরও প্রসারিত করতে চান না।)

তো, এভাবে জমিদার, কর্পোরেট পুঁজিদার আর এলিট অক্ষরদারদের দ্বারা-দিয়া-কর্তৃক ব্যতীত আর কীভাবে সাহিত্য রচনা সম্ভব? হাসানের কথা ধরেই বলি, যে খাবার হাজার লোকে খাবে, অক্ষর-জমিদারের হেঁসেলে বসে সে-খাবার যিনি রান্না করছেন অভুক্ত জনসাধারণকে ধন্য করার জন্য তিনিই তাহলে সাহিত্যিক বটেন, আর সেই খাবার খেয়ে একা যিনি হাজার খাদকের পক্ষ থেকে তার স্বাদ-গন্ধ ঘোষণা করছেন তিনি হচ্ছেন সাহিত্য-সমালোচক [বর্তমান লেখায় হাসানের তিন নম্বর উদ্ধৃতি]। … ধরেই নেয়া হচ্ছে: জনসাধারণ নিজেরা যার যার খাবার রান্না করতে অক্ষম এবং শবেবরাতের রাতের মতো করে যার যার রান্না-করা খাবার পরস্পরের সাথে বিনিময় করতেও অক্ষম। শুধু তাই নয়, রান্না-করা খাবার খেয়ে তার স্বাদ উপলব্ধি করতে ও অপরকে তা জানাতেও অক্ষম জনাব জনসাধারণ। জনগণের কল্পিত এই অক্ষমতার ওপরই গড়ে ওঠে সাহিত্যের সৌধ। হ্যাঁ, সাহিত্য রচনা শুধু এভাবেই সম্ভব।

চতুর্থ কাণ্ড: শুদ্ধ সাহিত্যের ছায়াবাজি

লোকজনের মধ্যে যত রকম জিনিস আছে তার মধ্যে সুবিবেচনা জিনিসটা সবচেয়ে সমভাবে বণ্টিত, কেননা প্রত্যেকেই নিজের সম্পর্কে ভাবে যে এই জিনিসটা তার মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে। যাদেরকে অন্য যেকোনো কিছু দিয়ে তুষ্ট করা সবচেয়ে কঠিন, তারাও সাধারণত এই গুণ তাদের মধ্যে ইতিমধ্যে যতটা আছে তার চেয়ে অধিক আর চায় না। আর, এ-ক্ষেত্রে সকলেই যে ভুল করছে সে-রকম সম্ভাবনা কম। শক্ত এই বিশ্বাসটাকে বরং এমনকিছুর প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার যে, সঠিক বিচারবুদ্ধির ক্ষমতা এবং সত্য থেকে ভুলকে আলাদা করার ক্ষমতা – যে-ক্ষমতাকে যথাযথ অর্থেই সুবিবেচনা বা যুক্তিবুদ্ধি বলা হয়ে থাকে – প্রকৃতিগতভাবেই সকল মানুষের মধ্যে সমান। ফলত, আমাদের মতামতের যে-বৈচিত্র্য, তা এই ঘটনা থেকে উঠে আসে না যে, কারও কারও ভাগে যুক্তি-বুদ্ধি দেওয়া হয়েছে বেশি আর কারও কারও ভাগে কম, বরং এই ঘটনা থেকে উঠে আসে যে, আমরা আমাদের চিন্তনকে আলাদা আলাদা উপায়ে কাজে খাটাই এবং একই বিষয়ের প্রতি আমাদের মনোযোগ নিবদ্ধ করি না। প্রাণশক্তিপূর্ণ একটা মনের মালিক হওয়াটাই কিন্তু যথেষ্ট নয়; একেবারে প্রথমে যা আবশ্যিক তা হচ্ছে ঐ মনটাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো। সবচাইতে বড় যত সব মন, অত্যুৎকৃষ্ট কর্মে যেমন তারা সক্ষম তেমনি সর্বনিকৃষ্ট ত্রুটি-বিচ্যুতির সুযোগও তাদের থাকে; আর, দৌড়াতে দৌড়াতে যারা সোজা পথটা পরিত্যাগ করে, তাদের তুলনায় যারা অতি ধীরে ভ্রমণ করে, তৎসত্ত্বেও তারা অনেক বিরাট উন্নতি সাধন করতে পারে, যদি শুধু তাদের পথটা থাকে সোজা।

রেনে দেকার্ত ১৬৩৭, অনুবাদ বর্তমান প্রাবন্ধিকের

ঐ জমিদার, কর্পোরেট পুঁজিদার আর এলিট অক্ষরদার গোষ্ঠী-সিন্ডিকেটের বহুবিচিত্র ভানুমতির খেল তথা কায়দাকানুন-বাৎচিত-ডিসকোর্স-করণ-কারণ-প্রকৌশলেরই নাম তাহলে সিনেমা নাটক উপন্যাস কবিতা সঙ্গীত বিজ্ঞাপন গল্প নৃত্য চিত্রকলা। এ-ই তাহলে হাসান-কথিত ‘শুদ্ধ শিল্প’ আর ‘স্বয়ম্ভর সাহিত্য’। আচ্ছা। তো শুদ্ধ-স্বয়ম্ভরতার সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তাঁর নিজের যুক্তি-পদ্ধতিটা কী রকম? আসুন, তাঁর মুখ থেকেই শুনি:

অধিকাংশ সমালোচকই একটা উপরের জায়গায় হাজির হতে চান, তিনি নিজে এই মৌলিক কথাটা ভুলে যান যে আগে শিল্প, তার পিছু পিছু শিল্পের সমালোচনা। আগে সাহিত্যের সৃষ্টি, তারপর সাহিত্য সমালোচনা। যদি সাহিত্য সৃষ্টি না হয় সমালোচনার কোনো জায়গা থাকে না। আগে মানুষ তারপর তার ছায়াটা।

কাজেই সমালোচনাকে প্রথমে শিল্প এবং সাহিত্যের স্বশাসন এবং স্বয়ম্ভরতা মেনে নিতে হবে। অন্তত তার অস্তিত্ব সমালোচনার মুখাপেক্ষী নয়। অধিকাংশ জায়গায় বহুরকমের বিধিনিষেধ আরোপ করা যায়, একটি জায়গায় যায় না–সেটা শুদ্ধ শিল্পের জায়গা। বিধিনিষেধ শব্দটিই শিল্প সম্বন্ধে স্ববিরোধী। বিধিনিষেধ আরোপ সামাজিক, রাষ্ট্রিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিবেচনায় হতে পারে, শিল্পের বিবেচনায় কখনোই নয়। …

… সব সমালোচনাই মূলের ব্যাখ্যা, মূলকেই খুলে দেখানো, শিল্পের আইনকানুন, রীতি-কৌশল স্পষ্ট করে তোলা। … (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-খ; মোটা হরফ বর্তমান লেখকের) [বর্তমান লেখায় হাসানের পাঁচ নম্বর উদ্ধৃতি]

সমালোচনা উপরের জায়গায়, না সাহিত্য উপরের জায়গায় এই তাহলে মোদ্দা সংকট। এই সংকট মোচনের জন্যই তাহলে দেকার্ত থেকে দেরিদা পর্যন্ত টানা-হ্যাঁচরা। সাহিত্য যে উপরের জায়গায়, সমালোচনা যে নিচে এই কথাই হাসান এরপর নানাভাবে অনেকক্ষণ ধরে বলে গেছেন। তরল ও তুচ্ছ বিষয়কে মুখ্য বানিয়ে তোলারই দৃষ্টান্ত বটে। তথাপি যুক্তিবিন্যাসের ধরনটা এক্ষেত্রে পদ্ধতিগতভাবে বিচার করে দেখা গুরুত্বহীন নয়। সাহিত্যই যে আসল, সমালোচনা যে তার পিছু পিছু, তা বোঝাতে যেয়ে অবলীলায় এক নিঃশ্বাসে হাসান বলে ফেললেন, আগে সাহিত্যের সৃষ্টি, তারপর সাহিত্য সমালোচনা। আগে মানুষ তারপর তার ছায়াটা। এই সূত্রায়নের অন্তঃসলিলা যুক্তিপ্রবাহ অনুসরণ করলে যে সাহিত্যই মানুষ-পদবাচ্য হয়ে ওঠে, সেটা দর্শনের প্রবীণ অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক যখন খেয়াল করেন না তখন বিস্মিত হতে হয়। যুক্তিবিন্যাসের পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে নিজের অজান্তে যে সাহিত্যকেই খোদ মানুষ বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সাহিত্য যে প্রতিস্থাপিত করে বসছে খোদ মানুষকেই–তা খেয়াল করতে না-পারাটা হয়ত নিছক অমনোযোগবশত নয়, পক্ষপাতপ্রসূত বরং। অধিপতি-সাহিত্য-মতাদর্শ-দর্শনের দিক থেকে শুদ্ধ-স্বয়ম্ভর শিল্প-সাহিত্যের সপক্ষে যুক্তিবিন্যাসের এরকম ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি গড়ে তোলাটাই হয়ত স্বাভাবিক।

বলা বাহুল্য, সাহিত্য আসলে মানুষ তো নয়ই, বাস্তবতাও নয়। মতাদর্শ, সাহিত্য আর দর্শন হচ্ছে মানুষের ছায়া, বাস্তবতার ছায়া। বহুদিন আগে মার্কস এবং এঙ্গেলস “বাস্তবতার ছায়ার সাথে কুস্তি খেলাকে নাকচ করার জন্য জার্মান ভাবাদর্শ নামে একটি আস্ত কেতাব লিখেছিলেন, কেননা তাঁরা দেখেছিলেন “ঐ কুস্তি প্রতিযোগিতা স্বাপ্নিক আর হতবুদ্ধি জার্মান জাতি বেশ উপভোগ করে” (মার্ক্স এবং এঙ্গেলস, ২০০৭: ৯)। ঐ একই উদ্দেশ্যে একদিন কাউকে হয়ত ‘বাঙাল/বাঙালির ভাবাদর্শ’ নামে বই লিখতে হবে, কেননা সেই বৃটিশ আমলেই বাঙালি বাবুরা ছায়ার সাথে কুস্তি খেলা শুরু করেছিলেন। তার ইশারা খানিক বাদেই আমরা দাখিল করব।

কিন্তু তার আগে, আমার সন্দেহ, আমার বিরুদ্ধে একটা নালিশ এতক্ষণে উঠেই গেছে: ‘শুদ্ধ শিল্প’ আর ‘স্বয়ম্ভর সাহিত্য’র কথা হাসান তুলেছেন সামগ্রিক একটা তত্ত্ব হিসেবে তো নয়, স্রেফ সমালোচনার তুলনায় সাহিত্যের শ্রেয়ত্ব ও প্রাথমিকত্ব বোঝাতে। হ্যাঁ, এরকম শিশু-সরল মানুষও নিশ্চয়ই আছেন। তাঁরা মনে মনে আমাকে দোষও দেবেন। সুতরাং, আকেলমন্দ্‌গণের ধৈর্যের পরীক্ষা আমাকে নিতেই হচ্ছে। হাসানের এই উদ্ধৃতির কথাগুলো আরও চিকন করে বিচার করতে পারলে উপকারই আছে। তাতে অন্তত বোঝানো যাবে, হাসানকে ভুল বোঝার জন্য বর্তমান রচনাকার উদগ্রীব নন।

ঠিক আছে, তাহলে ঐ উপর-নিচের সংকটটা ধরেই আবার একটু দেখি। বুঝলাম, উপরের জায়গাটা সাহিত্যিককে দিতে হবে, সমালোচককে থাকতে হবে নিচে। কিন্তু সে কথা প্রতিপাদনের জন্যে আগে-সাহিত্য-পরে-সমালোচনার যুক্তি-শৃঙ্খলা কি বোধগম্য? সাহিত্য নিজেই কি সমালোচনা হিসেবে হাজির হতে পারে না? অথবা, সমালোচনা নিজেও কি সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে না? পারে। খুব পারে। সহজেই তা উপলব্ধিযোগ্য। সাহিত্য সংক্রান্ত ডিসকোর্স-সমগ্রের অন্তর্ভুক্ত কোনো নাম-বর্গই স্বর্গীয় সেপারেশনে বিরাজ করতে পারে না। ‘গদ্য’ আর ‘কবিতা’কে কি চাপাতি দিয়ে কোপ মেরে আলাদা করে ফেলা যায়? ‘প্রবন্ধ’ আর ‘গল্প’ কি পরস্পরে জড়ানো থাকতে পারে না? মহাভারত-রামায়ণ কি ধর্মগ্রন্থ, না সাহিত্য, না ইতিহাস, না দর্শন, না নীতিকথামূলক গ্রন্থ? নিদেনে সামপ্রতিক কালের সাহিত্য যে সুস্পষ্টভাবেই লক্ষণ-গণ্ডী ডিঙাতে শুরু করেছে সে খবর হাসান রাখেন না তা নয়, কিন্তু বেড়া ডিঙানো তাঁর পছন্দ না।

আমার আর-একটি কথা মনে হয়, সাহিত্য জিনিসটা এখন আর বিশুদ্ধ নেই। গোটা পৃথিবীতেই নেই। সাহিত্য যে কখন রাজনৈতিক নিবন্ধ, কখন যে একটা সাংস্কৃতিক মত, কখন যে প্রচণ্ড রকমের সমাজতাত্ত্বিক একটা আলোচনা–এটা এখন বোঝা দুষ্কর হয়ে উঠেছে। আলাদা করা যায় না। নতুন সাহিত্য যা আমরা দেখছি তাতে যাবতীয় বিষয় এর মধ্যে ঢুকছে। সাহিত্য নিজস্ব জায়গা হারাচ্ছে। নতুন কোনো আকার নিচ্ছে এমনও বলা যায় না। পশ্চিমবাংলাতেও অল্পবিস্তর এরকম দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে উগ্রতা আছে। সবাইকে এবং সবকিছুকে নাকচ করার একটা মনোভাব। (হাসান আজিজুল হক, ২০০৩: ২১) [বর্তমান লেখায় হাসানের ছয় নম্বর উদ্ধৃতি]

সাহিত্য জিনিসটা যে মহাভারতের কালেও বিশুদ্ধ ছিল না, তা হাসানের হিসাবেই আসে না। তাঁর শুধু মনে হয়, জিনিসটা এখন আর বিশুদ্ধ নেই। এবং গোটা পৃথিবীতেই যে সাহিত্য জিনিসটা এখন আর বিশুদ্ধ নেই, তাতে হাসান কিন্তু খুশি নন। এতে করে বরং সাহিত্য নিজস্ব জায়গা হারাচ্ছে বলে তাঁর ধারণা। এর মধ্যে তিনি দেখেন উগ্রতা, দেখতে পান সবাইকে এবং সবকিছুকে নাকচ করার একটা মনোভাব। এ যে তাঁর কাঙিক্ষত নয় তা কি আর বলতে? শুদ্ধ শিল্পের জায়গাজমি-ওয়ালা বিশুদ্ধ একটা সাহিত্য-প্রাসাদ তাহলে হাসানের মাথায় বরাবরই আছে, তাই না? বর্তমান রচনায় তাঁর তিন নম্বর উদ্ধৃতিতে হাসানই বলেছেন বিশুদ্ধ শিল্পতত্ত্বের ধারণাটার উৎস হচ্ছে বুর্জোয়া শিল্পতত্ত্ব। হাসানও যে ইদানীং বুর্জোয়া শ্রেণীর পক্ষেই অবস্থান নিতে শুরু করেছেন সে-কথা ক্রমেই আমরা দেখতে থাকব। (বাংলাদেশের গজায়মান নতুন বড়লোক শ্রেণী এবং তাঁদের সুশীল সমাজ জাতীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে এমনকি সভাপতিত্ব করতেও আমরা তাঁকে দেখেছি সে-কথা এখানে স্মতর্ব্য।)

আগে-সাহিত্য-পরে-সমালোচনার ফর্মুলাটি আর কী অর্থ বহন করে? ঠিক আছে, একেবারে পাকাপোক্তভাবে খোপ-খুপরি খাড়া ক’রে ছাঁচ-বানানো বর্গ অর্থেও, তথা সংকীর্ণতম অর্থেও, যদি সাহিত্য আর সমালোচনা কথা দুটিকে ঢালাই করি, তাহলেই বা কী দাঁড়ায়? তার মানে ধরে নিচ্ছি, যাবতীয় যুক্তি-তর্ক-ইতিহাসের ঊর্ধ্বে ‘সাহিত্য’ বলে নিরঙ্কুশ–সম্পর্কাতীত-সংশ্রবাতীত–একটা জিনিস আছে, যেমন ছোট গল্প; আর, ‘সাহিত্য-সমালোচনা’ বলেও একটা সেরকমই আর-একটা পদার্থ আছে যা এ ক্ষেত্রে আসলে ঐ ছোট গল্পটি লেখা হওয়ার পরই কেবল লিখিত হওয়া সম্ভব। বেশ তো। এ তো পাগল, শিশু, খালেদা জিয়া এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনারও বুঝবেন যে আগে সাহিত্যটি রচিত হতে হবে, শুধুমাত্র তার পরই সাহিত্য-বস্তুটির আদৌ কোনো প্রকার সমালোচনা হতে পারবে। এই কথা বোঝানোর জন্য তো গম্ভীর গম্ভীর বাক্য পরিবেশনের প্রয়োজন পড়ে না। শ্রীরামের জন্মের আগেই না-হয় কোনো এক সাহিত্যিক সাত কাণ্ড রামায়ণ-কাব্য রচনা করে বসে ছিলেন, তাই বলে কোনো সমালোচক কি সম্প্রতি বা প্রাগৈতিহাসিক কালে এ কথা মুখ দিয়ে আদৌ উচ্চারণও করেছেন যে রামায়ণটি রচিত হওয়ার আগেই তিনি রামায়ণ-এর একটি সমালোচনা লিখে ফেলার অধিকার চান?

অতএব, সমালোচনাকে প্রথমে শিল্প এবং সাহিত্যের স্বশাসন এবং স্বয়ম্ভরতা মেনে নিতে হবে হাসানের এই দেন-দরবার, এ শুধু আগে-সাহিত্য-পরে-সমালোচনার মামুলি মামলা নয়, এর বিশেষ মোজেজা আছে। শিল্প এবং সাহিত্যের স্বশাসন এবং স্বয়ম্ভরতাএই সব কথা আমাদের অনেক চেনা। অধিপতি-সাহিত্য-ডিসকোর্সে এই বুলির অর্থ হলো সাহিত্যকে দেশ-কাল-বাস্তবের মাথার উপর দিয়ে শিল্পের আসমানে পাঠানো, যেন দেখা না-যায় যে–উদাহরণত বলছি–কর্দমাক্ত বাংলাদেশ উত্তরণ-অতিক্রমণ শেষে সাহিত্য এখন শেরাটনে ঢুকে বছর বছর পঞ্চাশ হাজার টাকা পুরস্কার পাচ্ছে, পাঁচ লাখ রুপির বৈদেশিক পুরস্কারও হচ্ছে বৈকি! এর সাথে যোগ করুন হাসান-কথিত শুদ্ধ শিল্পের জায়গা, যোগাযোগ পূর্ণ হবে। এ কি তাহলে সমালোচনার হাত থেকে সাহিত্যিক হিসেবে আগাম রক্ষাকবচ চাওয়া মাত্র? কিন্তু যিনি সাহিত্যিক তিনিই সমালোচক তিনিই সম্পাদক তিনিই প্রকাশক–এও তো মামুলি ঘটনাই বটে। সেকালে বুদ্ধদেব বসু ছিলেন, এ কালে ভুরি ভুরি সাহিত্যপ্রসূ আছেন। সুতরাং এ শুধু বুদ্ধদেব বসুর হাত থেকে জীবনানন্দের প্রটেকশন চাওয়ার অর্থে সমালোচনার হাত থেকে সাহিত্যের প্রটেকশন চাওয়ার কেস মাত্র নয়, এ হলো সবকিছুর হাত থেকে নিরাপদ থাকার বাসনা: শিল্প-সাহিত্য (অর্থাৎ সাহিত্যিক মশায় নিজে) হবেন স্বয়ম্ভূ, স্বশাসিত, শুদ্ধ: কেউ কোনো কথা তুলবে না, কেউ কোনো প্রশ্ন করবে না; সবাই শুধু নিন্দা করবে, না-হয় হাততালি দেবে–‘এক্স’কে না-হয় ‘ওয়াই’কে। এ হলো সর্বময় ক্ষমতার বাসনা: মডারেট-মৌলবাদী রাজনীতিবিদদের মতো লাদেনবাদী-লেনিনবাদী সাহিত্যিকও হবেন টোটালিটারিয়ান।

খেয়াল করার বিষয়: সাহিত্য এবং সমালোচককে শুদ্ধ সাহিত্য-সত্তা হিসেবেই বা বিবেচনা করতে হবে কেন? সামাজিক সত্তা-প্রতিষ্ঠান-কাঠামোগুলোর মধ্যকার সামগ্রিক সম্পর্কতত্ত্বের দিক থেকে তাকালে, সাহিত্যের সমালোচক তো শুধু সাহিত্য-সমালোচক নামক সাহিত্য-ব্যক্তিত্বটিই নন, রাজনীতি-রাষ্ট্র মৌলবাদ-মার্কসবাদ মতাদর্শ-আইন-পুরস্কার-দণ্ড এমপি-এমডি-কর্পোরেট-বিজনেস সকলেই সাহিত্যের সমালোচক। সাহিত্য-সত্তাগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক বৃহত্তর সমাজ-সত্তাগুলোর মধ্যকার ক্ষমতা-লেনদেন-টানাপোড়েনের আঁকেপাঁকে ঠিকরানো আলোর প্রতিসরণ-প্রতিফলনে জারিত প্রতীকও বটে। প্রতীকী এই টানাপোড়েনে ঠিক আজকের এই বাংলাদেশের সাহিত্য-পাড়ার পুরাতন বা প্রবীণ সাহিত্যওয়ালাদের ও তাঁদের সাঙ্গোপাঙ্গোদের ক্ষমতা-সুবিধা-স্পেস তথা নাম-যশ-খ্যাতির ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন কারা? বহুলকথিত ‘তরুণ’ অভিধায় বর্গীভূত একগুচ্চের সাহিত্যিক-সাহিত্যসমালোচক। আসলে তাঁরাও সাহিত্যের রাজদরবারে নিজ নিজ আসন দাবি করছেন। প্রবীণ সম্রাটের মুখে তাই গুরুতর প্রশ্ন শোনা যাচ্ছে: সাহিত্যের সমালোচনা কীভাবে সম্ভব? সাহিত্যের সমালোচনা কি আদৌ সম্ভব? সেই আওয়াজকে চাইলে কেউ সাহিত্যের আলাপ মনে করতে পারেন, কেউ ক্ষমতার প্রলাপও মনে করতে পারেন।

সাহিত্য-জগতের এই উপর-নিচ ক্ষমতা-সংকট হলো রাষ্ট্র-রাজনীতির উপর-নিচ সংকটাবস্থারই তীর্যক প্রতিরূপ–যে-পরিস্থিতি অক্টোবর-মহাসংকট, হাসিনা-খালেদা ইত্যাদি-প্রভৃতি পার হয়ে নোবেল-বিজয়ী সুদখোর-মহাজন-ব্যবসায়ীদের ‘অপার সম্ভাবনার বাংলাদেশ’-এ ১১ই জানুয়ারির ঝড় বইয়ে দিয়েছে। চিন্তার সংকট আর রাজনীতির সংকট, সাহিত্যের স্বাধীনতা আর মানুষের মুক্তি, এবং সাহিত্যজগতে সে সবের ভাঙ্গাচোরা ত্যারাব্যাঁকা ছায়া-প্রচ্ছায়া এভাবে সম্পর্কসূত্রে বাঁধা। কিন্তু সে আলাপ আরেকটু পরে।

আপাতত, শিল্প ও সাহিত্যের স্বশাসন ও স্বয়ম্ভরতা সংক্রান্ত হাসানের ঐ উদ্ধৃতির [বর্তমান লেখায় হাসানের পাঁচ নম্বর উদ্ধৃতি] মূল শব্দগুলোকে অন্য পাশ থেকেও একটু দেখে নিতে হচ্ছে। প্রথমে ‘স্বয়ম্ভর’ কথাটা। যে নিজেই নিজের ‘ভরণপোষণ’ করে সে হলো স্বয়ম্ভর (শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী, ২০০৫: ১১৮৬)। সাহিত্য কি নিজেই নিজের ভরণপোষণ করে? সাহিত্যকে ‘ভরণ’ করে কে, মানে কে তার ‘প্রতিপালন’ করে, কে তার ‘খাদ্যাদি দান’ করে, কে তার ‘বেতন’ বা ‘মাইনা’ দেয় (শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী, ২০০৫: ৯১৯)? সাহিত্যকে ‘পোষণ’ করে কে, অর্থাৎ তাকে পোষে কে, তার ‘পুষ্টি’ জোগায় কে (শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী, ২০০৫: ৭৭২)? সাহিত্য নিজেই নিজেকে ছাপায়? প্রকাশ করে? টপটেন-চার্ট বানায়? সাহিত্য নিজেই নিজেকে পুরস্কার দেয়? নোবেল বুকার আদমজী আনন্দবাজার ফিলিপ্‌স্‌ প্রথম আলো কী করেন তাহলে? বোঝা যাচ্ছে (অভিধানের সাহায্য গ্রহণ করাটা এখানে হয়ত বাহুল্য), হাসান যেমনটা দাবি করেছেন, সাহিত্য সেরকম ‘স্বয়ম্ভর’ কিছু নয়।

তারপর দেখুন, সাহিত্যের স্বশাসন। এর চেয়ে তাজ্জব বস্তু কী আছে! আছে হয় ত একটা: ‘সংবাদ-মাধ্যমের’ স্বশাসন ও স্বাধীনতা। সাহিত্য যদি নিজেই নিজেকে শাসন করে, তাহলে কর্পোরেট-পৃষ্ঠপোষকতা পুঁজি মিডিয়া পুরস্কার সম্পাদক সমালোচক বিপনন তারকাবৃত্তি সেমিনার-সিম্পোজিয়াম আলোচনা-সভা বড় কাগজ ছোট কাগজ রিভিয়্যু পরিচিতি বড়-ছোট মেজর-মাইনর ইত্যাদির অন্তহীন পরিমাপ-প্রণালী অথবা গম্ভীর গালে-হাত-দেওয়া সাহিত্যিক ফটোর কাজ কী? নাকি এরাও সাহিত্য? নাকি এরাই সাহিত্য? কে কাকে রচনা করেন তাহলে? সাহিত্যিক সাহিত্যকে? নাকি সাহিত্যই সাহিত্যিককে?

তারপর, শিল্প সংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রসঙ্গ। যিনি সামাজিক, রাষ্ট্রিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিবেচনায় নানারকম বিধিনিষেধ আরোপ করাটা দিব্যি মেনে নিতে পারেন, অর্থাৎ মানুষের সত্যিকারের বাঁচার প্রায় সব এলাকাকে বিধিনিষেধ আর কর্তৃত্বপন্থার কণ্টকে বিনাপ্রশ্নে বন্দি করে ফেলতে পারেন, তিনি নাকি শুধু শিল্পকে বিধিনিষেধের আওতায় আনতে পারেন না। এ-কথা স্রেফ বিশ্বাসযোগ্য নয়, যুক্তিগ্রাহ্য তো নয়ই। মানুষের বাস্তব-বস্তুগত বাঁচার চেয়ে শিল্প বড়? মানুষের চেয়ে শিল্প বড়? কিছুক্ষণ আগে আমরা দেখেছিলাম সাহিত্যই হচ্ছে মানুষ, সমালোচনা তার ছায়া; এখন দেখছি শুধু তাই নয়, শিল্প-সাহিত্য মানুষের চেয়েও বড়ো। হাসানের ভাষায়, বিধিনিষেধ শব্দটিই শিল্প সম্বন্ধে স্ববিরোধী কেন? শুধু সম্বন্ধে স্ববিরোধী কেন? খোদ মানুষ বা মনুষ্যত্ব সম্বন্ধেই কি বিধিনিষেধ শব্দটা যথেষ্ট স্ববিরোধী নয়? স্বাধীনতা ছাড়া মনুষ্যত্ব কীসের? স্বাধীনতা কী বস্তু তাহলে? বিধিনিষেধ-সাপেক্ষে স্বাধীনতা? ও জিনিস তো বলশেভিকদের সমাজতন্ত্রের মতো, জর্জ বুশের গণতন্ত্রের মতো। ওরই আরেক নাম দাসত্ব। গণতান্ত্রিক দাসত্ব, সমাজতান্ত্রিক দাসত্ব।

বোঝাই যাচ্ছে, বিধিনিষেধ-কর্তৃত্ব-সাপেক্ষে মানুষের সামাজিক, রাষ্ট্রিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এলাকায় যাঁর কর্তৃত্বপরায়ণ/আনুগত্যপরায়ণ মন আপত্তি তোলে না, ‘শিল্প-সাহিত্যের’ বিধিনিষেধেও তাঁর আপত্তি শেষ পর্যন্ত থাকবে না। ঐ উদ্ধৃতিরই তৃতীয় অনুচ্ছেদে দেখুন: হাসান নিজেই জানাচ্ছেন, শিল্পের আইনকানুন আর রীতি-কৌশল উদঘাটন করে দেখানোই নাকি সমালোচনার কাজ। এই তো এসে গেল শিল্পের আইনকানুন। (রীতি-কৌশলও কিন্তু প্রকারান্তরে বিধিনিষেধই! সেদিকে আমি যাচ্ছিই না, খোদ আইনকানুন থাকতে রীতি-কৌশলে আর কী দরকার? আর, আইনকানুন থেকে বিধিনিষেধই বা কত দূর?) কর্তৃপক্ষের দিক থেকে দেখলে তো আইনকানুন ছাড়া দুনিয়াই চলে না, শিল্পসাহিত্য চলারও প্রশ্ন ওঠে না। আইনকানুন-কর্তৃপক্ষগণের মতে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, কিছুই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, সাহিত্যও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আর, আইনের লোক হিসেবেই মনে হয়, আলোচ্য উদ্ধৃতিতে হাসান আজিজুল হক স্বয়ং শিল্পের আইনকানুন এবং বিধিনিষেধ-এর একটা নজিরও স্থাপন করে ফেলেছেন: সমালোচনাকে [পড়ুন: সকলকে] শিল্প এবং সাহিত্যের স্বশাসন এবং স্বয়ম্ভরতা মেনে নিতে হবে। হাসানের নিজেরই দেওয়া যুক্তি কি তাহলে টিকল? বরং তাঁর কর্তৃত্বপরায়ণ মানসগঠন এবং যুক্তির বিকট বৈপরীত্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেল।

‘শুদ্ধ সাহিত্য’ই হোক আর ‘স্বয়ম্ভর সাহিত্য’ই হোক, আমাদের এখনকার ‘সাহিত্য-সমাজ’ আধুনিক বাংলা সাহিত্য বলতে যা বুঝে থাকেন তার গোড়া আছে উপনিবেশের দাসত্বের ইতিহাসে, উপনিবেশের ছায়ার ইতিহাসে। সবাই তো আর দাসত্ব করে নি। অনেকে বিদ্রোহও করেছেন। সাক্ষাৎ উপনিবেশের ঔরসে যে ‘শিক্ষিত’ অভিজাত কেরানি শ্রেণী আমাদের তৎকালীন কলকাতায় জন্ম লাভ করেছিল, সব ভালো সব মন্দ মিলিয়ে তারাই আমাদের আজকের সাহিত্যের আদি উদ্‌গাতা। পশ্চিমি চিন্তার দাসত্বের অভিযোগ হাসানও এনেছেন, তবে তরুণ সমালোচকদের বিরুদ্ধে, নিজের/নিজেদের বিরুদ্ধে নয়, বলাবাহুল্য:

দেরিদাকে পড়েছি এবং মেনেছি এবং তাঁর তত্ত্বকে প্রয়োগ করে রায় দিচ্ছি আমাদের সাহিত্য পোস্টমডার্ন হচ্ছে কি হচ্ছে না। … চিন্তার দাসত্ব আশ্রয় করে আধুনিকতা আর তারুণ্যের ধ্বজা তুলে ধরার মতোই হয়ে দাঁড়ায় সেই সমালোচনা।

… দেরিদা পড়ে যদি তাঁকে উদ্ধৃত করা যায়, তাহলে একটা কাজের কাজ হলো। কিন্তু দরকারটা হচ্ছে দেরিদাকে সম্পূর্ণ বোঝা এবং প্রয়োজন হলে এই দর্শনের গ্রহণ-অগ্রহণের কোনো জায়গা আছে কি না, নিজের জায়গা থেকে তা নির্দেশ করতে পারা। কিন্তু আমরা শুধুই গ্রহীতা। কোনো সংকোচবোধ করছেন না সমালোচকেরা, অবলীলাক্রমে কথা বলছেন, … (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-খ; মোটা হরফ বর্তমান লেখকের) [বর্তমান লেখায় হাসানের সাত নম্বর উদ্ধৃতি]

বেশ আগে হুমায়ুন আজাদকে নিবিড়ভাবে পড়ে দেখতে গিয়ে আহাম্মক ব’নে গিয়েছিলাম। হেঁয়ালিতে আর বৈপরীত্যে ভরপুর পেয়েছিলাম তাঁকে এক উপন্যাসে (দ্রষ্টব্য: সেলিম রেজা নিউটন, ২০০১)। পরে খেয়াল করে দেখেছি, আমাদের আধুনিক বাংলা সাহিত্যওয়ালাদেরই সাধারণ বৈশিষ্ট্য এই বৈপরীত্যপূর্ণতা। যেমন, চিন্তার দাসত্বের যে অভিযোগ হাসান এনেছেন তরুণ সমালোচকদের বিরুদ্ধে সেই একই অভিযোগ গোটা আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিরুদ্ধেই খাটে, সেটা কিন্তু একটু আগে তিনিই বলেছেন:

সমালোচনা সুস্থির হওয়া দরকার। দুর্ভাগ্য যে আমাদের কোনো কিছুই সুস্থির হতে পারে না। ভেতর থেকে বৃদ্ধি পেয়ে চারাগাছ যে বিশাল মহীরুহ হয়, পুরো প্রক্রিয়াটা চারাগাছের মৌলিক সম্ভাবনার মধ্যেই থাকে। বহুকাল ধরে আমাদের বড় হওয়াটা অধীনতার মধ্যে–আমরা থেকেছি পরের পায়ের তলায়, পরের চিন্তার তলায়। জুতোর তলায় থাকা আর চিন্তার তলায় থাকার মধ্যে খুব একটা তফাৎ নেই। তলায় থাকতে থাকতে আমাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত উল্টো-হীনম্মন্যতার জন্ম হয়েছে। আমাদের সৃষ্টির কাজটা সুস্থিরভাবে হয় না, আমরা যেমন ছায়ায় বেড়েছি, আধুনিক বাংলা সাহিত্যও তেমনি। (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-খ; মোটা হরফ বর্তমান লেখকের) [বর্তমান লেখায় হাসানের আট নম্বর উদ্ধৃতি]

হাসানরা যখন তাঁদের বিশ-একুশ বছর বয়েসে সার্ত্র পড়ে বৃত্তায়ন (হাসান আজিজুল হক, ১৯৯১) লিখছিলেন, বাংলা সাহিত্যে অস্তিত্ববাদের প্রয়োগ ঘটাচ্ছিলেন তখন কি সার্ত্রকে সম্পূর্ণ বোঝার কর্তব্য সমাধা করে নিয়েছিলেন? সেটা কি চিন্তার দাসত্ব ছিল না? তখন কি তাঁরা শুধুই গ্রহীতা ছিলেন না? তখন কি তাঁদের কোনো সংকোচবোধ হয়েছিল? আর আধুনিক বাংলা সাহিত্যই যেখানে পরের পায়ের তলায়, পরের চিন্তার তলায়, উপনিবেশের জুতার তলায়, উপনিবেশের ছায়ায় বেড়ে উঠেছে, এবং সে কারণে যেখানে আমাদের কোনো কিছুই সুস্থির হতে পারে না, সেখানে সমালোচনা সুস্থির হওয়া দরকার বলে উপদেশ বিতরণের অসঙ্গতিটুকু ধরতে পারা কি হাসানের পক্ষে এতই কঠিন? তবু, আজকের বিশ-বাইশ তেইশ-তেত্রিশদের বিরুদ্ধে হাসানের অভিযোগের ওখানেই শেষ নয়:

ফুকো, দেরিদাকে কেউ যদি পড়তে চায়, তাকে আগে ফরাসি ভাষা শিখতে হবে–একথা বলা কি খুব অন্যায় হবে? আমি মনে করি সেটা খুব ঠিক কথা হবে। [নইলে] … শুধু অন্যের মুখের ঝাল খাওয়া ছাড়া কোনো জিনিসের স্বাদ পাব না, কাউকে কিছু বুঝিয়েও বলতে পারব না। এ রকম নানা ধরনের ভিতরের টানাটানির ফলে আমাদের সমালোচনা এলোমেলো হয়ে পড়েছে আর এর গ্রহণযোগ্যতা কমে গেছে। (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-খ; মোটা হরফ বর্তমান লেখকের) [বর্তমান লেখায় হাসানের নয় নম্বর উদ্ধৃতি]

আলোচ্য লেখাটায় হাসান আগাগোড়া সাহিত্যিকের জামা-চশমা পরে সমালোচকের ছায়ার সাথে কুস্তি করে গেলেন। আমি কিন্তু আগাগোড়াই দেখলাম সাহিত্যের একটা সত্তা আরেকটা সত্তার বিরুদ্ধে তলোয়ার ঘোরাচ্ছে। গোটা প্রবন্ধটায় একটাবারও হাসানের মনে পড়ল না, তিনি নিজে শুধু সাহিত্যিক নন, সমালোচকও বটেন। একটি-দুটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ-নিবন্ধ, রিভিউ, আলোচনা ইত্যাদি তাঁরও আছে বৈকি [বর্তমান লেখায় হাসানের এগারো নম্বর উদ্ধৃতি দ্রষ্টব্য][৫]। বক্তা হিসেবে, প্রাবন্ধিক হিসেবে, প্রধান অতিথি হিসেবে, সভাপতি হিসেবে তিনি এবং তাঁর প্রজন্মের উজ্জ্বল সমালোচকেরা যে গত তিন-চার দশক ধরে মার্কস-মার্কেজ-এঙ্গেলস-হেগেল-কান্ট-দেকার্ত-সক্রেটিস-গুন্টার-গ্রাস আউড়ে চলেছেন, তাঁরা কি জার্মান-ফরাসি-স্প্যানিশ শিখে নিয়েছিলেন? “মার্কসীয় দর্শন” (হাসান আজিজুল হক, ১৯৯৮: ৫৮–৬৮) কিম্বা “দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ ও নন্দনতত্ত্ব” (সনৎকুমার সাহা, ২০০০: ১১০–১১৫) সম্পর্কে তাঁরা বুঝিয়ে বলেছিলেন অন্যের মুখের ঝাল খেয়েই তো? নিজের বেলায় আঁটিসাঁটি পরের বেলায় চিমটি কাটি: এ-ই তাহলে কার্তেসীয় পদ্ধতির দোহাই দেওয়া হাসানের যুক্তি-পদ্ধতির দৌড়। গোপাল হালদার যতই বলুন, এই ‘যুক্তি’ধারাকে “বিশুদ্ধ র‌্যাশনালিজম বা যুক্তিনিষ্ঠতা” বলে মানাটা যুক্তিনিষ্ঠ হয় না (গোপাল হালদার, চতুরঙ্গ, জুন ১৯৮৯; উদ্ধৃত: শেষ প্রচ্ছদ, হাসান আজিজুল হক, ১৯৯৮)।

অধিকতর সুনির্দিষ্ট ক’রে বললে, পশ্চিমি চিন্তার দাসত্বের অভিযোগ স্বয়ং হাসানের বিরুদ্ধেও দিব্যি আনা চলে। তার জন্যে এই প্রশ্নটি তোলাই আপাতত যথেষ্ট হবে: আচ্ছা, সমালোচনার ওপর হঠাৎ এত রাগ উঠল কেন হাসানের? দুষ্ট লোকেদের ‘অন্যায়’ সমালোচনার তোড়ে কি তাঁর “দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে”র অবস্থা হয়েছে (কাজী নজরুল ইসলাম, ১৯৯৬: ২৯৫)? ঠিক আছে, এটা হয়ত একটা কারণ। কিন্তু তিনি নিজে যে-কারণটির কথা পরিষ্কার করে উল্লেখ করেছেন তা আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। সে কারণটি হচ্ছে, তাঁর ভাষায়, সামপ্রতিক সাহিত্যতত্ত্বের জায়গা থেকে এরকম কথা এখন আসছে; শুধু তা-ই নয়, আধুনিক সাহিত্যতত্ত্ব, শিল্পতত্ত্ব সমালোচনার গোড়াই মেরে দিচ্ছে; এবং তদুপরি অবস্থাবৈগুণ্যে তত্ত্বই সমালোচনাকে অসম্ভব করে তুলছে। এই সব তত্ত্বসামপ্রতিক সাহিত্যতত্ত্ব, আধুনিক সাহিত্যতত্ত্ব, শিল্পতত্ত্ব ইত্যাদি যে পশ্চিমা পিতাদের ‘বস্তু’ তা বলাই বাহুল্য, যদিও তার সাথে লাতিন আমেরিকার নামটি আছে। কিন্তু সেখান থেকে যদি এরকম কথা এখন না-আসত? তাহলে হাসান ‘সাহিত্য-সমালোচনা’র বিরুদ্ধে এই বিশাল মামলা ঠুকতেন না। এ তো তাঁরই যুক্তি। আর কোনো যুক্তির-ই দোহাই তো তিনি দেন নি। হাসানের এই পশ্চিম-মুগ্ধতা, উপনিবেশিক প্রভুদের প্রতি কৃতজ্ঞতার বোধ আলোচ্য লেখাটিতেও আড়াল করা যায় নি। আড়াল করতে তিনি চানও না যে,

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত নতুন পৃথিবীর চিন্তা সংস্কৃতি দর্শন কোনো কিছুরই সংস্পর্শে আমরা আসিনি। … তারপর আমাদের আধুনিক সাহিত্য শুরু হয়েছে, ভাষা ক্ষমতাশালী হয়েছে, বুদ্ধির চর্চা শুরু হয়েছে। ইহবাদী মন, মানবতাবাদী উপযোগবাদী কর্মপ্রয়াস, যুক্তিবাদী বিচারপ্রবণতা, সুনির্দিষ্টভাবেই পশ্চিমনির্ভর, সন্দেহ নেই। আজ গর্ব করার মতো অনেক কিছু থাকলেও সেসব মৌলিকভাবে আমাদের নিজেদের নয়, সমাজ দেশ কাল ইতিহাসের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে নয়, বরং পড়ে-পাওয়া চৌদ্দ আনা পশ্চিমি বিদ্যা থেকেই আমাদের সব অর্জন। (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-খ; মোটা হরফ বর্তমান লেখকের) [বর্তমান লেখায় হাসানের দশ নম্বর উদ্ধৃতি]

প্রশ্নটা পশ্চিম বনাম প্রাচ্যের যান্ত্রিক তুলনামূলক শ্রেয়ত্বের নয় মোটেও। কিন্তু আমাদের সব অর্জন পশ্চিমি বিদ্যা থেকেই, বৃটিশ উপনিবেশিক প্রভুরা আমাদের ভাষাকে ক্ষমতাশালী করেছে, ওরা আসার আগে আমাদের বুদ্ধির চর্চা ছিল না, কিম্বা আমাদের ইহবাদী মন, মানবতাবাদী উপযোগবাদী কর্মপ্রয়াস এবং যুক্তিবাদী বিচারপ্রবণতা একেবারে সুনির্দিষ্টভাবেই পশ্চিমনির্ভরইতিহাসের এই সব ব্যাখ্যা স্রেফ গোলামের ব্যাখ্যা, গোলামের আদিখ্যেতা-প্রসূত, গোলামির জ্ঞানতন্ত্র।

উপনিবেশিক আমল থেকে যে-পদার্থটি সাহিত্য নামে বিশেষ রটনা পেয়ে আসছে তা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে “ছায়াবাজি”রই সাহিত্য–ছায়া-সাহিত্য। কথাটা আগে একবার তুলেছিলাম যে: আঠারো শতকের ‘স্বাপ্নিক আর হতবুদ্ধি জার্মান জাতি’র মতোই উনিশ শতকের কলকাতাকেন্দ্রিক ‘স্বাপ্নিক আর হতবুদ্ধি’ বাঙালি বাবুরাও কিন্তু ‘বাস্তবতার ছায়া’র সাথে শুদ্ধ সাহিত্যের এই “ছায়াবাজি” খেলা, তথা ‘কুস্তি প্রতিযোগিতা’য় অতিশয় দড় ছিল। সাক্ষী সুকুমার রায় (১৪১০: ৩)। তাঁর জবানিতেই আমরা জানতে পারলাম সেই কুস্তি প্রতিযোগিতা আজগুবি ছিল না মোটেও: “আজগুবি নয়, আজগুবি নয়, সত্যিকারের কথা–/ ছায়ার সাথে কুস্তি করে গাত্রে হল ব্যথা!” তার মানে, তখনকার হাসান আজিজুল হকদের কাছেও ‘ছায়ার সাথে কুস্তি’টা রীতিমতো ‘সত্যিকারের কথা’ই ছিল। শুধু তা-ই নয়, আমাদের এখনকার হাসানদের কাছে সাহিত্য–অর্থাৎ মানুষের তথা বাস্তবের ছায়া–যেমন খোদ বাস্তব তথা মানুষ হিসেবে নিজেকে দাবি করে, অথবা, প্রকারান্তরে, ছায়া নিজেকে বাস্তবের চেয়েও খাঁটি বলে দাবি করে, তেমনি সুকুমারের সময়কার উপনিবেশের ঔরসে জায়মান, “শিশির ভেজা সদ্য ছায়া”র সাহিত্যকারদের কাছেও মূল বস্তুর চেয়ে–মানুষের চেয়ে–তার ছায়াই ছিল অধিক বাস্তব: “পাতলা ছায়া, ফোক্‌লা ছায়া, ছায়া গভীর কালো–/ গাছের চেয়ে গাছের ছায়া সব রকমেই ভালো।” আগেও বলেছি, এই ঔপনিবেশিক ছায়া-সাহিত্যই এখন অবধি সাহিত্য নামে প্রচারিত আছে। এই বস্তুই হাসান-কথিত শুদ্ধ শিল্প, স্বয়ম্ভর সাহিত্য।

পঞ্চম কাণ্ড: আত্মঘাতী বোমাবাজি, আত্মঘাতী পরিস্থিতি

আমার নিজের ক্ষেত্রে বলা যায়, কখনও আমি আমার মনকে কোনো দিক দিয়েই সাধারণ লোকজনের মনের তুলনায় অধিক উৎকৃষ্ট বলে কল্পনা করি নি। উল্টা বরং প্রায়ই আমি কামনা করেছি যে, চিন্তাশক্তির দ্রুত কর্মশীলতার দিক দিয়ে, বা কল্পনাশক্তির স্বচ্ছতা আর সুনির্দিষ্টতার দিক থেকে, বা স্মরণশক্তির সুসম্পূর্ণতা আর তাৎক্ষণিকতার দিক দিয়ে আমি যদি অন্য কারো কারো সমান হতে পারতাম তাহলে ভালো হতো। আর, এগুলো ছাড়া অন্য এমন কোনো গুণাবলীর কথা আমার জানা নাই যা মনের সুসম্পূর্ণতা অর্জনে অবদান রাখে; কেননা যুক্তি-বুদ্ধি বা বোধশক্তিই যেহেতু সেই একমাত্র জিনিস যা আমাদেরকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে এবং বর্বরদের থেকে আমাদের পার্থক্যটাকে নির্দেশ করে, তাই আমি বিশ্বাস করতে চাই যে, প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যেই এ-জিনিসটা পূর্ণ মাত্রায় থাকার কথা; এবং এই বিষয়ে আমি সেইসব দার্শনিকদের সাধারণ মতটাকেই গ্রহণ করতে চাই, যাঁরা বলেন বড় এবং ছোটর মধ্যকার পার্থক্য খাটে শুধু দুর্ঘটনারই বেলায়, একই প্রজাতির ব্যক্তিদের গঠন-প্রকৃতি বা স্বভাব-প্রকৃতির বেলায় নয়।

রেনে দেকার্ত ১৬৩৯, অনুবাদ বর্তমান প্রাবন্ধিকের

আত্মঘাতী বোমাবাজির ক্ষেত্রে, স্বীকার করতেই হবে, হাসান পথিকৃত নন। ভাদ্র মাসের অসহ্য গরমে শহুরে-শিক্ষিতদের নজর ও নজরদারির আড়ালে শহর-গ্রামের উঁচু উঁচু গাছে পেকে-ওঠা তালের সমান্তরালে সমাজ-অরণ্যের উঁচুনিচু ডালে, ঝোপে-ঝাড়ে এবং কোটরে-খোঁড়লে যে আরও বেশি পরিপক্ব হয়ে উঠেছিল বোমাবাজির বিন্যাস-বন্দোবস্ত–২০০৫ সালের ১৭ই আগস্ট মোতাবেক ১৪১২ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসের আগে পর্যন্ত সেই খবর আমাদের গ্রামগুলোকে রাষ্ট্র করে তোলে নি। ঐ দিন ঘণ্টা খানেক সময়ের মধ্যে সারা বাংলাদেশে শ পাঁচেক বোমা খইয়ের মতো ফুটিয়েছিল জেএমবি নামক একটি রাজনৈতিক দল। তারপর বেশ কিছু দিন ধরে সারা বাংলাদেশে চলল আত্মঘাতী বোমাবাজদের করুণ তাণ্ডব এবং রাষ্ট্রীয় জুলুম-যন্ত্রের নিপীড়ণ-নিরাপত্তা প্রদর্শনী। একমাত্র ফরহাদ মজহারের (অতি-উৎসাহী, জগাখিচুড়িপূর্ণ এবং বিদ্যমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী বামপন্থী প্রগতিশীলতাকে একপেশে ও ঢালাওভাবে খারিজ করার ঝোঁকসম্পন্ন এবং ব্যাপকভাবে স্ববিরোধী কিন্তু চিন্তা-উদ্রেককারী ও পথানুসন্ধানী) কিছু রচনা (ফরহাদ মজহার, ২০০৫-ক; ফরহাদ মজহার, ২০০৫-খ; ফরহাদ মজহার, ২০০৫-গ, ফরহাদ মজহার, ২০০৫-ঘ) ছাড়া আদৌ আর কেউ সেই পরিস্থিতির মোটামুটি সামগ্রিক কোনো পর্যালোচনা দাঁড় করানোর তাগিদ অনুভব করেছেন বলেও টের পাওয়া যায় নাই।[৬] (এখানে অবশ্য আনু মুহাম্মদের রচনার কথা উল্লেখ না-করাটা অন্যায় হবে। তৎকালীন ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তাঁর একটা বিশ্লেষণ-প্রচেষ্টা ছিল। দ্রষ্টব্য আনু মুহাম্মদ, ২০০৮: ১১–৩২। আমার জানার বাইরে আরো অনেকে অনেক কিছু লিখেছেন নিশ্চয়ই। সহৃদয় কেউ আমাকে জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।) বরং, আমাদের নাম-খ্যাতি-প্রমোশন-ক্যরিয়ার অভিমুখিন নিষপ্রাণ আমলাতান্ত্রিক সাহিত্যসমাজ পরিস্থিতি ফয়সালা করার যাবতীয় দায়-দায়িত্ব মার্কিন ও ইঙ্গ-বঙ্গীয় রাষ্ট্রীয় বাহিনীসমূহের কাছে অর্পণ করে নিজেদেরকে প্রকৃতই আত্মঘাতী হিসেবে হাজির করেছিলেন। এই আত্মঘাতী আত্মসমর্পণ অন্ধভাবে চেনে শুধু সাম্রাজ্যবাদ এবং উপনিবেশিকতার রসে জারিত সন্ত্রাসবাদ-সেক্যুলারিজ্‌ম্‌-আধুনিকতা-মৌলবাদের পরস্পর-জেহাদী বদ্ধমুখ ধারণাগুচ্ছকে, আর ইঙ্গ-মার্কিন-সৌদী ষড়যন্ত্র-জাল এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের প্রায়-সর্বময় অল্প-বাস্তব-অধিক-কাল্পনিক নেটওয়ার্ককে। খোদ আমাদের এই সমাজের নানান প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গের সাথে ১৭ই-আগস্ট-প্রপঞ্চের কোনো সমাজতাত্ত্বিক-ঐতিহাসিক-আর্থ-সামাজিক সম্পর্কসূত্র আছে কিনা তা এই আত্মঘাতী আত্মসমর্পণকারীদের জন্য কোনো প্রশ্নই না। আমাদের সব মহান বুদ্ধিজীবীরা তাহলে লেখেনটা কী, চিন্তা করেন কী নিয়ে, আর সবচেয়ে বড় কথা, তাঁদের চিন্তার পদ্ধতি-প্রণালীটাই বা কী রকম, এবং সাহিত্যের সাথে আত্মঘাতী বোমাবাজি প্রবণতার সম্পর্কই বা কী–এইসব ভাবনা আমাকে নতুন করে আচ্ছন্ন করে ফেলে। হাসান আজিজুল হক এই সাহিত্যসমাজেরই প্রধানতম নমস্য নেতাদের আদরের ধন। নেহায়েত নিন্দা করার ধান্দায় হাসান আজিজুল হককে আমি বোমাবাজ উপাধি দেই নি। একটু দেরিতে হলেও সে-কথা এখন ভেঙে বলাই ভালো। বাংলাদেশে এবং পৃথিবীতে গোটা মানব-সমাজ কীভাবে আত্মঘাতী বোমাবাজি করতে এবং তার শিকার হতে ক্রমাগত অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, এবং সেই হয়ে-ওঠায় ‘সরকারী’ বুদ্ধিজীবীদের অবদান কতটুকু কী রকম–সেই দিকে সুধী-সমাজের মনোযোগ আকর্ষণ করাটাই আমার উদ্দেশ্য।

হাসানকে আত্মঘাতী বোমাবাজ বলার মধ্য দিয়ে তাঁকে অন্যায্য সম্মানে ভূষিত করা হয়ও বটে, কেননা আত্মঘাতী বোমাবাজ যেরকমভাবে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন, হাসানরা ঠিক তার উল্টা পদ্ধতিতে চড়-থাপ্পড়-নিন্দা-জেল-জুলুম-সমালোচনার হাত থেকে তেলতেলে-সতর্কতায় নিজেদের সবেধন জীবনটিকে বাঁচিয়ে রাখেন। তথাপি, কথা দিয়ে বোম্‌ ফাটানো বলে একটা কথা আছে, বোম্বাস্টিং কথা বলে একটা কথা আছে, বাক্য-বারুদ-সহযুক্ত বাক-বোমা আর কি। বর্তমান লেখায় হাসানের এক নম্বর উদ্ধৃতি স্মরণ করুন: “বলুন আপনারা, সাহিত্য নিয়ে আপনারা কী করবেন? সংগীত নিয়ে আপনারা কী করবেন? চিত্রকলা নিয়ে আপনারা কী করবেন? আমরা যদি নিজেদের বিবেকের কাছে সৎ থাকি, তাহলে এ প্রশ্নের জবাব আমাদের কারও কাছেই নেই।” এরকম বোমা ফাটাতে যিনি সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছেন তাঁকে বোমাবাজ ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে। কিন্তু এই বোমাবাজি সাহিত্যের প্রতীকী বোমাবাজি, ছায়া-বোমাবাজি–বাস্তব বোমাবাজির করুণ ক্যরিকেচার। প্রকৃত বোমাবাজিতে শারীরিকভাবে বোমাহামলাকারী মারা যান, ছায়া-বোমাবাজিতে হামলাকারী লেখকদের মৃত্যু ঘটে না, সাহিত্যে বরং তাঁরা অমর হয়ে থাকেন, হয়ত তাঁদের ছায়া-মৃত্যু ঘটে, হয়ত তাঁদের ছায়া-জীবন দীর্ঘায়ু-প্রাপ্ত হয়। যুগের ভার তাঁরা আর বহন করতে পারেন না, পরস্পরের সাথে দেখা হলেই তাঁরা বলতে থাকেন সাহিত্য মরে গেছে, ছোটগল্প মরে গেছে, কবিতা মরে গেছে ইত্যাদি প্রভৃতি।

এতদ্‌সত্ত্বেও, বাংলাদেশে জেএমবি-র আত্মঘাতী বোমাবাজির সাথে সাহিত্য-বোমাবাজির মিলও আছে। উভয়েই দেশী-বিদেশী শাসকশ্রেণীর সাহায্য-ষড়যন্ত্র-সমর্থন-পুরস্কার-নির্ভর, উভয়েই এলিটিস্ট, ভ্যানগার্ড-তাত্ত্বিক, গণবিচ্ছিন্ন–”জনতার জঘন্য মিতালী”কে (সুধীন দত্ত, ১৯৯৯: ১০১) অসহ্য জ্ঞান করে, উভয়েই চিন্তাবিমুখ, উভয়েই বাঁধাবুলি, উভয়েই কর্তৃত্বপরায়ণ, উভয়েই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের গোলাম এবং উভয়েই ভয়াবহরকম আত্মঘাতী। এখানে বলে রাখা জরুরি, দেশে দেশে আত্মঘাতী বোমা-প্রবণতার ফারাক আছে। শ্রীলঙ্কার প্রধানত হিন্দু তামিল জনগোষ্ঠী আর প্যালেস্টাইনের প্রধানত মুসলিম জনগোষ্ঠীর জগৎ-প্রসিদ্ধ আত্মঘাতী হামলাসমূহ তাঁদের ব্যাপকমাত্রার গণসম্পৃক্ত জাতিগত মুক্তি আন্দোলনের অংশ। আর, আমাদের জেএমবি-র আত্মঘাত জাতিবিচ্ছিন্ন-জনবিচ্ছিন্ন, দেশী-বিদেশী শাসকমহলের আর্থ-রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে-ওঠা প্রপঞ্চ। হাসানকে যখন আমি প্রতীকী অর্থে আত্মঘাতী বোমাবাজ বলি তখন আমি শাসকশ্রেণীর গৃহপালিত জেএমবি-নেতৃত্বের সাথেই তাঁকে তুলনা করি (তাঁদের আত্মত্যাগী কর্মীবাহিনীর সাথে নয়, বা এলটিটিই-হামাসের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সাথে নয়)।

কিন্তু স্থানে-কালে রূপভেদ থাকলেও আত্মঘাতী বোমাবাজি একটা জগৎ-জোড়া প্রপঞ্চ। মানুষের সংসারে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী আর্থ-রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পরিণামে এর বিকাশ। এর সার্বিক সামাজিক-ঐতিহাসিক পর্যালোচনা বাদ দিয়ে ষড়যন্ত্র-তত্ত্বের অন্ধকারে নিপতিত করে একে একটা হঠাৎ-আপদ হিসেবে পাঠ করাটা মারাত্মক ভুল হবে। বাংলাদেশকে পুঁজিবাদের বিশ্ববাজারের নিম্নাঙ্গে পরিণত করা এবং তার উপযোগী সেনা-রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে তোলার প্রজেক্ট বাস্তবায়নরত আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজের মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা সগৌরবে সেই ভুলটাই যখন দশ হাতে দশ মুখে প্রতিষ্ঠা করা শুরু করলেন তখন, ২০০৫ সালে, রচিত একগুচ্ছ চিন্তা-ঘন ও অনুভূতি-দীর্ণ কবিতায় আমি তৎকালীন আত্মঘাতী পরিস্থিতির একটা পর্যালোচনা দাঁড় করিয়েছিলাম (প্রকাশ-নিয়ন্ত্রক সাহিত্য-প্রকৌশলের সুবাদে সেগুলো প্রকাশিত হয় অনেক পরে: সেলিম রেজা নিউটন, ২০০৬)। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী আর্থ-রাজনৈতিক-রাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্যসূচক নানান প্রবণতার পাশাপাশি বিশেষত মিডিয়া-বাহিত সংস্কৃতির বিভিন্ন চিহ্ন-বৈশিষ্ট্য এবং মানুষের আত্মিক-আধ্যাত্মিক-ধর্মীয় চিন্তনের প্রশ্ন-প্রসঙ্গগুলোকে মিলিয়ে একটা সার্বিক আত্মঘাতী পরিস্থিতিকে শনাক্ত করার চেষ্টা ছিল সেখানে মুখ্য। পদ্যের ইশারার বাইরে গদ্যের যুক্তিতে সেই প্রচেষ্টাকে বিশদ করে তোলার কর্তব্য অবশ্য অসম্পাদিত থেকে গেছে।

আপাতত সংক্ষেপে শুধু বলে রাখি: পৃথিবীর দেশে দেশে জায়মান যে আত্মঘাতী পরিস্থিতি ব্যক্তিকে বোমাবাজ আর রাষ্ট্রকে আইনসম্মতভাবে আত্মস্বীকৃত খুনি করে তোলে, সেই একই পরিস্থিতি সাহিত্য-সংস্কৃতিকেও করে তোলে অন্ধ ও আত্মবিনাশী (বর্তমান প্রবন্ধের উপজীব্য হাসান-সাহিত্য তারই নমুনা); কিন্তু আত্মঘাতী পরিস্থিতির অসহায় শিকার হওয়ার তলে-তলে সাহিত্য-সংস্কৃতি-কৃষ্টি স্বয়ং সেই পরিস্থিতির নির্মাতা-কারিন্দা-কারিগরবর্গের (অর্থাৎ শাসকশ্রেণীর) সহচর-অনুচরও বটে; অধিকন্তু, এ-কথাও খেয়াল না-করার উপায় নাই, সাহিত্য-সংস্কৃতি তথা মিডিয়াই সার্বিক আত্মঘাতী পরিস্থিতির সদা-সৃজ্যমান বিবরণ-সমগ্র প্রণয়ণের ‘বৈধ’ ও ‘যথাযথ’ কর্তৃপক্ষ। সদা-সৃজ্যমান এই বিবরণ-সমগ্র তথা ডিসকোর্সের সাথে (হাসানের লেখা পরোক্ষভাবে এই ডিসকোর্সেরই অংশ) উপযুক্ত বোঝাপড়া শুরু করা সম্ভব হলে আমরা আত্মঘাতী পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে পারব এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির এলাকা থেকে তাকে প্রতিরোধের কাজ শুরু করতে পারব–এই উপলব্ধিই বর্তমান প্রবন্ধের প্রধানতম প্ররোচনা।

এখন আবার হাসানের রচনাটির ভেতরে ফিরে আসা যাক। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, শুরুতে হাসান এমন একটা ধুমধারাক্কা ভাব ধরলেন যে সাহিত্য-সমালোচনা সম্পর্কে একটা ‘না’-এর জায়গা থেকে তিনি শুরু করছেন, দেকার্তের পদ্ধতি মোতাবেক, একটা সংশয় বা একটা সন্দেহ বা একটা অস্বীকারের জায়গা থেকে। কিন্তু ঘটনা সত্য নয়। আসলে ওটা একটা কৌশল মাত্র। সাহিত্য-সমালোচনা সম্পর্কে তাঁর মনে সত্যিসত্যি কোনো সংশয়ই নাই। তাঁর শুধু এই আপত্তিটুকু আছে যে সমালোচনা সুস্থির হওয়া দরকার। ছদ্মযুক্তি প্রদান, ছদ্ম-পদ্ধতির বোরখা পরা এবং সন্দেহ বা অস্বীকারের ভান করাটা এক্ষেত্রে যেভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তা উপেক্ষণীয় নয়।

তাঁর লেখাটা আসলে বলতে চেয়েছিল সাহিত্য-সমালোচকদের কীভাবে কীভাবে সমালোচনা করা উচিত, কীভাবে কীভাবে উচিত না। বলতে চেয়েছিল, সাহিত্য সম্পর্কে ‘খারাপভাবে’, মানে উদ্ধত-ভাবে, অতিরিক্ত জোরের সাথে, আউলাঝাউলা করে কলরব তুলে সমালোচকের নিজের সিদ্ধান্তকে সাহিত্য নামক কর্মটির উপর চাপিয়ে দিলে এবং পরিণামে সম্পূর্ণভাবে অসমন্বিত চিৎকার-হুল্লোড় তৈরি হলে কিছুই বুঝতে পারা যাবে না। বেশ তো, এ কথা হাসান বা অন্য যেকোনো সাহিত্যিক তাঁর সমালোচক-বন্ধু বা সমালোচক-শত্রুকে বুঝিয়ে বা ধমক দিয়ে বলতেই পারেন। কিন্তু, সে বলনের বা ধমকের শিরোনাম সাহিত্য সমালোচনা কীভাবে সম্ভব না-হয়ে হতে পারত ‘সাহিত্য-সমালোচনার সঠিক নিয়মকানুন’; এবং তার প্রথম বাক্যটি সাহিত্যের সমালোচনা কি আদৌ সম্ভব? না-হয়ে হতে পারত সমালোচনা সুস্থির হওয়া দরকার।

কিন্তু সমালোচনা সুস্থির হওয়া দরকার বলাটা এক কথা, আর সাহিত্যের সমালোচনা কি আদৌ সম্ভব? বলাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। আপাত-উল্টা একটা জায়গা থেকে সেটা দেখা সম্ভব: সমালোচনা না-থাকলে খোদ সাহিত্য দাঁড়াবে কীভাবে? আপনি যখন কিছু একটা লেখেন, যখন আপনার জীবনের সুতীব্র-গভীর কোনো অনুভূতি বা অভিজ্ঞতার অভিপ্রকাশ হিসেবে কিছু রচিত হয়, তখন লেখা-মাত্র কি সেটা সাহিত্য হয়ে ওঠে? না। অধিপতি-সাহিত্যের নিয়ম এরকম না। নিয়ম হলো, সাহিত্যিক কাউকে সেটা পড়ে, বিচার করে সিদ্ধান্ত দিতে হবে যে হ্যাঁ, এটা হয়েছে, বা না, কিছুই হয় নি ইত্যাদি প্রভৃতি। ইনিই তো আদি সাহিত্য-সমালোচক। এঁর নাম সম্পাদক হতে পারে, আনন্দবাজার হতে পারে, প্রথম আলো হতে পারে, ছোট কাগজ হতে পারে, পাড়ার দাদা হতে পারে। যিনি পড়ে রায় দেন, ছাপেন, ছাপতে অস্বীকার করেন, সাহিত্য শেখান (এভাবে কর, ওভাবে কর, আরেকটু এরকম কর …), পুরস্কার দেন, তিরস্কার করেন সেই সাহিত্য-সমালোচকটির সার্টিফিকেটের জোরেই তো কোনো রচনা সাহিত্য হয়ে ওঠে বা হয় না, তাই না? প্রচলিত অধিপতি-সাহিত্য-পদ্ধতির তো এটা একেবারে গোড়ার জায়গা। সমালোচনাই এখানে সাহিত্যের অস্তিত্ব-শর্ত।

সমালোচনাটা যেই করুক, সাহিত্য-সমালোচনা না থাকলে তো সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতিরই প্রশ্ন উঠত না। আর এই স্বীকৃতি-অস্বীকৃতিই তো সাহিত্যের শাস্ত্রীয় কর্তৃত্বের প্রধানতম ক্যানন: কে মেজর কে লেজুড়, কে প্রধান কে অ-ধান, কে সাহিত্যিক কে কোর্টের দলিল-লেখক, কে নোবেল কে ডাম্বেল, কে বুকার কে ফুকার, কে আনন্দ কে নিরানন্দ … এইসব কি সাহিত্য-শাস্ত্রের প্রধানতম খুঁটি নয়? এইসব স্বীকৃতি-অস্বীকৃতি না-থাকলে তো সাহিত্যই থাকে না, যদিও তখনও মানুষের নানান রকম লিখিত অলিখিত রচনা থাকে যা সাহিত্য-পদবাচ্য হওয়ার জন্য উন্মুখ নয় মোটেও, বরং নিজের জীবনকে খুঁটিয়ে দেখার এবং প্রকাশ করার স্বাভাবিক মানবিক বৈশিষ্ট্যের স্মারক। যে-মানুষ গুহাচিত্র আঁকছিলেন, তিনি কি শিল্প ঘটাচ্ছিলেন নাকি? যে-মানুষ এখনও প্রবাদ-প্রবচন বানান তিনি কি সাহিত্য সাধেন? যে দাদি-দিদারা হাজার বছর ধরে মুখে মুখে গল্প বানিয়েছেন তাঁরা কি কথাসাহিত্য খেতাব চান? হাসানেরই আগুনপাখি-তে (হাসান আজিজুল হক, ২০০৫) যে প্রাজ্ঞ নারী পুরো কাহিনীটি বয়ান করেন, বাস্তবের সেই নারীরা আদৌ সাহিত্য-মুখাপেক্ষী থাকেন কি? নাকি তারা সমালোচককে ভয় করেন বা ভালোবাসেন? আবার, সাহিত্যিক-সমালোচক তো ভাই-ভাই, এমন-কি বোন-বোনও। সাহিত্যিক-সমালোচক অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে অহি-নকুলও বটে। ভায়ে-ভায়ে কি ভাগাভাগি হয় না? বোনে-বোনে কি বনিবনার অভাব হয় না? এই লেখাটিতেই তো, সমালোচনাকে এমন-কি পরগাছা বলার সময়ও হাসান সুস্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন সাহিত্য ও সাহিত্য-সমালোচনার পরস্পরনির্ভরশীলতার কথা।

সাহিত্য-সমালোচনা আছে বলেই সাহিত্য আছে, শিল্পসাহিত্য-সমালোচনা আছে বলেই মানুষের স্বাভাবিক, স্বভাবত-সৃজনশীল, বহুবিচিত্র অভিপ্রকাশ শিল্পসাহিত্য-পদবাচ্য হিসেবে স্বীকৃত-পুরস্কৃত হতে পারে না। সাহিত্যের এহেন ভিত্তিস্বরূপ সাহিত্য-সমালোচনার বিরুদ্ধে বোমা মারতে গিয়ে হাসান তাহলে নিজের খুঁটির ওপরই বোমা মারছেন। আত্মঘাতী বটে। তাছাড়া, সত্যিই তো আর সাহিত্য-সমালোচনা এই দুনিয়া থেকে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করছেন না হাসান, তাই না? তা করলে তো আর তিনি সাহিত্য-সমালোচক-বিচারকদের রায় মাথা পেতে নিয়ে সারা জীবন ধরে একের পর এক পুরস্কার গ্রহণ করতেন না। তাহলে কি পুরস্কার দিলে, আর ফুল-চন্দন বর্ষণ করলে সমালোচক ভালো, আর ‘অন্যায়’ সমালোচনা করলে সমালোচক খারাপ? যদি তিনি সামান্য পর্যায়ের একজন পাঠক হন তাহলে মন খারাপ, আর যদি তিনি বিজ্ঞ বন্ধুবর কেউ হন তাহলে মন ভালো?

মন অবশ্য তাঁর ন্যায্যতও ভালো হতে পারে, কেননা, এখনকার তরুণ সাহিত্য-সমালোচক তথা সাহিত্যিকরা বৃদ্ধ বা অগ্রজ সাহিত্যিকদের সমালোচনা করতে গিয়ে পরিণত-মনষ্কতা ইত্যাদির পরিচয় দিচ্ছেন না, তাঁদের সমালোচনার মান খুবই করুণ, ম্যাজিক রিয়ালিজম, পোস্টমডার্নিজম, পোস্ট কলোনিয়ালিজম ইত্যাদি নিয়ে স্রেফ বুলিবাগিশি করছেন তাঁরা, ফুকো দেরিদা বার্থ চমস্কি বাখতিন সাঈদ প্রমুখের নামাবলী গায়ে দিয়ে তাঁরা ঘুরছেন ঐসব নামধারীরই রচিত মূল গ্রন্থগুলো পাঠ করা বাদ দিয়ে, এবং সব মিলিয়ে–

দুর্বল পরিপাকশক্তির কারণে অল্পেই আমাদের সমালোচনার দম ফুরিয়ে যায়। একটু একটু করে বড় একটি নির্মাণ গড়ে ওঠে না–একটি-দুটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ-নিবন্ধ, রিভিউ, অলোচনা [আলোচনা], আলটপকা মন্তব্য ইত্যাদির মধ্য দিয়েই সব উৎসাহ সীমিত থেকে যায়। পাণ্ডিত্যেরও একটি গ্রাহ্য গর্ব আছে–সেই গর্ব দাবি করতে পারে তেমন মানুষই বা কই! (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-খ; মোটা হরফ বর্তমান লেখকের) [বর্তমান লেখায় হাসানের এগারো নম্বর উদ্ধৃতি]

হাসানের এ সব পর্যবেক্ষণ তো ঠিকই বটে, কিন্তু বৃদ্ধ সাহিত্যিক ও সমালোচকদের বেলায়ও তা সঠিক, এবং তরুণ ও বৃদ্ধ উভয় শিবিরেই যে এর ব্যতিক্রম আছে সে-কথাও ঠিক। কিন্তু তারপর? রচনাটির এই পর্যায়ে এসে হাসান একেবারেই উদোম হয়ে পড়েছেন। দেখা যাচ্ছে, দুর্বল পরিপাকশক্তির কারণেই কি না কে জানে, অল্পেই হাসানের সমালোচনার দম ফুরিয়ে গিয়েছে। তাঁর আর কিছুই বলার নেই! অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? প্রথম থেকে আবার দেখি।

প্রথমে ফাটলো একটা বোমা। উড়ে গেল সাহিত্য-সমালোচনা। বিস্ফোরণ-স্থলে প্রাপ্য নানান আলামত সংগ্রহ করতে নেমে দেখা গেল, আসলে বহাল তবিয়তেই আছেন জনাব সমালোচনা। তবে তিনি আর দুষ্টু সমালোচনা নন, সুশীল সমালোচনা। তাকে মেনে নিতে হচ্ছে শিল্পীর মৌলিক অহংকার এবং শিল্পের মৌলিক জায়গা, অধিকন্তু শিল্প এবং সাহিত্যের স্বশাসন এবং স্বয়ম্ভরতা। এখন বোমার আওয়াজ আর নেই। কিন্তু ভীতিকর বকাঝকা আছে, ঝাড়ি আছে। সমালোচকের দম্ভ ভাঁজ করে পকেটে রেখে দেওয়ার জন্য জনাব সাহিত্যিক খুব চিল্লাফাল্লা করছেন এই আশায় যে একটু বিনয় সমালোচনার মধ্যেও ঢুকে যেতে পারে। একই সাথে সাহিত্য ও সাহিত্য-সমালোচনার পরস্পরনির্ভরশীলতার কথাও সুস্পষ্টভাবে শোনা গেল। বাইরে বাইরে ঝাড়ি-ঝাড়ি একটা ভাব কিন্তু বহালই থাকল, পাছে সমালোচনা-স্যার আবার আস্কারা পেয়ে বসেন। কিন্তু আস্কারা তবু ঠেকানো গেল না। সমালোচনার প্রতি সত্যিকারের দরদ দেখা দিল সাহিত্যিক-সাহেবের মনে: নিজের কথাটা জোরের সঙ্গে, আত্মবিশ্বাসের নিশ্চিতির সঙ্গে বলা ছাড়া একজন সমালোচকের আর কিই-বা করার থাকে! শুধু তাই নয়! জনাব সাহিত্য এবারে এক টানেই পূর্ণ ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে ফেললেন প্রায়: তিনি শিল্পীর বিনয়ের কথাও বললেন। আবার সাথে-সাথেই বললেন, সমালোচনা সুস্থির হওয়া দরকার। কিন্তু, মুশকিল হলো, নিজে আর কিছুতেই সুস্থির হতে পারলেন না তিনি। একবার সমালোচনাকে ধম্‌কান, একবার তার মাথায় আদরের হাত বোলান, একবার গলা টিপে ধরে তার গোড়াই মেরে দেন, আবার তাকে কোলে নিয়ে জল খাইয়ে বাঁচিয়ে তোলেন। এই টম-অ্যান্ড-জেরি খেলা চলল একেবারে শেষ পর্যন্ত। কথাসাহিত্যিকের কথার উদ্ধৃতি দেওয়ার লোভ সামলানো সত্যি কঠিন:

সাহিত্য সমালোচনা নিয়ে এতক্ষণ ধরে বিস্তর মাথা নেড়ে সংশয় প্রকাশ করলেও এখন প্রশ্ন, তবে কি সমালোচনা সম্ভবই নয়? সমালোচনা শব্দটা বাদ দিয়ে স্রেফ আলোচনাও কি অসম্ভব! ঘর তো পুরো ফাঁকা করা হয়ে গেল। এখন কি শূন্যতাই হাতে থাকবে ‘হাতে থাকল পেনসিল’-এর মতো? শিল্পী বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর আঁকার জমিটা দুই হাতের তালু পেতে পেতে আন্দাজ করে নিতেন। সাহিত্য শিল্পের সমালোচনার জায়গাটা এমন হাতড়ে হাতড়ে আন্দাজে হলেও স্থির করা দরকার, কারণ সমালোচনা চালিয়ে যেতে কেউ কোনোদিন কসুর করবে না। উপভোগ আর বিচারে কখনোই অপ্রবৃত্তি অরুচি জন্মাবে না। আসলে ‘না’-এর পরই আসে ‘হ্যাঁ’–হেগেল, মার্কস দুজনেই বলেন, সত্তার স্বরূপ জানা যায় দ্বন্দ্বে–দ্বন্দ্বেই থাকে মূল সত্য। সৃজনের আর সত্যের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে সংঘর্ষে সংঘর্ষে, ধাক্কাধাক্কিতে। ধাক্কাধাক্কি খারাপ নয়–ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মতো। লাশ ফেলতে গেলে এ ছাড়া উপায় নেই। [বর্তমান লেখায় হাসানের বারো নম্বর উদ্ধৃতি]

ধাক্কাধাক্কি সত্যি হয়ত খারাপ নয়–ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মতো, উপভোগ্য বটে, কিন্তু একদম ল্যাজেগোবরে মাখামাখি অবস্থা: সমালোচনাকে থাকতেই হবে (একটু পরই আবার দেখব সমালোচনাটাই সাহিত্যের সব)। বিস্তর আউলাঝাউলা ডিগবাজির সার্কাস দেখানো হলে পর, সাহিত্য সমালোচনা নিয়ে এতক্ষণ ধরে বিস্তর মাথা নেড়ে সংশয় প্রকাশ করার পর শেষে যখন দেখলেন, লাশ ফেলতে গেলে ছাড়া উপায় নেই (কে যে বাঁচল, আর কার যে লাশ পড়ল, আল্লা পাক জানেন আর হাসান জানেন), তখন তার বোধ হয় খানিক আগে বলা নিজের একটা কথাই মনে পড়ল: শিল্পীর অহংকারই বলি, ঔদ্ধত্যই বলি তারও বাড়াবাড়ি আছে। তখন হয়ত তিনি ভাবলেন এবার থামা দরকার। এবার তিনি ব্রেক কষা শুরু করলেন। উদ্ধৃতি না-দিলেই নয়:

এ অবস্থায় ‘সমালোচনা’ কথাটা একটা উপহাস বা লব্জ হয়ে যাচ্ছে। যাচ্ছে বটে, কিন্তু এ কথা তো আর মিথ্যে নয় যে শিল্প সাহিত্য নিঃসঙ্গ, নিস্তব্ধ শৈলচূড়া নয়! সেখানে বহু মানুষের যাতায়াত, কথাবার্তা, আলাপ-প্রলাপ, রাগ-দ্বেষ-হিংসা, নম্রতা সমর্পণ, আঁকাবাঁকা সুঁড়ি পথ, চওড়া রাজপথ–সবই থাকবে। শিল্পের গন্তব্য মানুষ। এই গন্তব্য চূড়ান্ত ও অলঙ্ঘ্য আর এই গন্তব্য ছাড়া শিল্পের অস্তিত্ব নেই। এই মানব বক্তব্যটাই যদি শেষ কথা হয়, তাহলে মানুষের সাড়া পাওয়াটাই তার অস্তিত্বের ভিত্তি। সাড়া পেতেই হবে শিল্পকে। যেকোনো সাড়া, যেকোনো অবস্থাতেই হোক–একটু ঘাড় ঝুঁকিয়েই হোক বা কুস্তিগিরের বহ্বাস্ফোটে–সেই সাড়া–প্রতিক্রিয়াকেই আলগাভাবে সমালোচনা বলা যেতে পারে। (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-খ; মোটা হরফ বর্তমান লেখকের) [বর্তমান লেখায় হাসানের তেরো নম্বর উদ্ধৃতি]

কী বুঝলেন মান্যবর পাঠক? শিল্পের গন্তব্য মানুষ। এই গন্তব্য ছাড়া শিল্পের অস্তিত্ব নেই। আর, মানুষের সাড়া পাওয়াটাই তার অস্তিত্বের ভিত্তি। এবং সেই সাড়াপ্রতিক্রিয়াকেই সমালোচনা বলা যেতে পারে। অর্থাৎ, সমালোচনাই ‘শিল্পের’ অস্তিত্বের ভিত্তি, সমালোচনা তথা সাড়া পেতেই হবে শিল্পকে। যেকোনো সাড়া, যেকোনো অবস্থাতেই হোক। কী খবর পাঠক? কোথায় গেল হাসানের শুদ্ধ শিল্প? কোথায় গেল হাসানের স্বয়ম্ভর সাহিত্য? কোথায় গেল সমালোচনার বিরুদ্ধে হাসানের আস্ফালন? সমালোচনাই সব। মানুষের সাড়াতথা, হাসানেরই মতে, সমালোচকের সাড়া–পাওয়াটাই শিল্পের অস্তিত্বের ভিত্তি। সমালোচনা ছাড়া শিল্পই নাই, শিল্পের অস্তিত্বই নাই। গোটা ব্যাপারটাকে অপরূপ বাকচাতুর্য ছাড়া আর কী বলা যায়?

হাসানের আলোচ্য লেখাটি তার মুখের অংশে যে-বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল বলে আপাতভাবে মনে হচ্ছিল, ঘাড়ের নিচ থেকে লেজের দিকে যেতে-না-যেতেই দেখা গেল, সে নিজেই থুক্কুরি বা স্যরি বলে ঐ কাগুজে বোমার ততোধিক কাগুজে স্প্লিন্টারগুলোকে খুঁজে খুঁজে গুছিয়ে তুলে ঝোলায় ভরে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে পড়েছে। আপনি কিন্তু বাড়ি যাবেন না, পাঠক! আমাদের এখনও কাজ বাকি আছে।

ষষ্ঠ কাণ্ড: শাস্ত্রীয় সাহিত্যবুদ্ধির দশমহাবিদ্যা

সর্বোপরি, এটা সম্ভব যে আমার হয়ত ভুলই হচ্ছে; এবং যাকে আমি স্বর্ণ আর হীরক বলে ভাবছি তা হয়ত সামান্য তামা আর কাঁচ ছাড়া আর কিছুই না। যেসব জিনিস আমাদের নিজেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেগুলোর ব্যাপারে ভুল ধারণা করার (ডিলিউশন) কত যে সম্ভাবনা থাকে, তা আমি জানি। আর, এ-ও জানি, বন্ধুদের রায়ে কত বেশি করে সন্দেহ রাখতে হয়, বিশেষত বন্ধুদের সেই রায় যখন আমাদেরই সপক্ষে যায়।

রেনে দেকার্ত ১৬৩৭, অনুবাদ বর্তমান প্রাবন্ধিকের

এখন কাজ হচ্ছে, কার্তেসীয় পদ্ধতির দোহাই দানকারী হাসান আজিজুল হকের যুক্তিবিন্যাস-প্রণালী এবং সাহিত্য-শাস্ত্রের পদ্ধতিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পর্কে আমাদের বিশ্লেষণলব্ধ অনুমানগুলোকে একটু গুছিয়ে ফেলার চেষ্টা করা। ইতোমধ্যেই কমবেশি আলোচিত প্রসঙ্গগুলো থেকে এখানে একটা তালিকা বানাচ্ছি। দশমহাবিদ্যা হচ্ছে কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী, কমলা–দেবী দুর্গার এই দশটি মূর্তি (ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক, ২০০০: ৫৯১)। দশমহাবিদ্যার এই তালিকাটা বানানোর সময় শুধু সাহিত্য-দেবতা হাসানের কথাই মনে রাখছি না। আসলে এটা আমাদের সাহিত্য-শাস্ত্রীয়, সাহিত্য-কর্তৃপক্ষীয় বুদ্ধিবৃত্তি সংক্রান্ত সাধারণ একটা পর্যবেক্ষণ-কাঠামো পেশ করবে হয়ত। দশমূর্তির দশধা নিম্নরূপ।

    (ক) প্রাথমিকতম বিশ্বাস।

    ১। শিল্প-সাহিত্যের বিশুদ্ধতা: বিশেষ কোনো যুক্তি-তর্ক-প্রমাণের ধার না-ধেরেই, নেহায়েত অভ্যাস-পরম্পরাক্রমে, শিল্প-সাহিত্য সংক্রান্ত যে-ধারণাগুলো সবাই মেনে নিয়েছে সেগুলো নিতান্ত সুশীলভাবে মেনে নেওয়া এবং অন্যদেরকেও মেনে নিতে বলা লেখক-সাহিত্যিকদের সাধারণ একটা বৈশিষ্ট্য। শিল্প-সাহিত্যকে নিত্য-জীবন থেকে আলাদা একটা দিব্য এলাকা বলে ধরে নেওয়া হয়। শিল্প সাহিত্য সৃজনশীলতা মৌলিক আইডিয়া ইত্যাদি ধারণাগত চৌহদ্দি বা ক্যাটেগরিগুলোর গড়ে ওঠাকে ঐতিহাসিকভাবে এবং বিশ্লেষণাত্মক যুক্তিবুদ্ধির দিক থেকে না-দেখে স্বর্গীয়, প্রশ্নাতীত, সন্দেহাতীত ধারণানিচয় হিসেবে দেখার ঝোঁক প্রবলভাবে বিরাজমান।

    ২। এলিট-মহাজনী-ব্রাহ্মণ্য-কোরেশ-পক্ষপাত: মূলগত স্বভাবের দিক থেকে, বিদ্যমান অধিপতি-সাহিত্য একটি এলিট কর্মধারা। এ প্রথানুসারে গুটিকয় লোকমাত্র সাহিত্যিক-দার্শনিক-রাজনীতিবিদ-শিক্ষিত-সৃজনশীল, আর-সবাই তাঁদের নিষ্ক্রিয় গ্রাহক। নিত্য-জীবন থেকে আলাদা শিল্প-সাহিত্যের এই দিব্য এলাকাটি সকলের জন্য উন্মুক্ত নয়। ঈশ্বরপ্রদত্ত ‘ট্যালেন্ট’ ‘জিনিয়াস’ ‘প্রতিভা’র অধিকারী লোকজনের এলাকা। কয়দিন আগে পর্যন্ত এইসব বস্তু শুধু উঁচু শ্রেণীর বা জাতের শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের মধ্যে বিদ্যমান বলে বিশ্বাস ছিল। এখন নারী, গরিব, কালো ও বাদামি মানুষদের মধ্যে যাঁরা উঁচু শ্রেণীর/জাতের বা শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের মতোন মনমানসিকতা অর্জন কতে শিখেছেন তাঁদেরও অল্পস্বল্প প্রবেশাধিকার মিলছে। কিন্তু তাঁদেরকে বিভিন্ন অম্লমধুর নামে চিহ্নিত করে পৃথক রাখা হচ্ছে, মূলধারার স্বীকৃতি পাওয়া তাঁদের জন্য বিশেষ রকম কঠিন। তবু তাঁরাও এলিট-মহাজনদেরই অন্তর্গত, তাঁরাও অসাধারণ–সাধারণ পাবলিক নন।

    (খ) সাহিত্যিক পুরোহিততন্ত্র।

    ৩। অথরিটিতে আস্থা: লেখক-সাহিত্যিক-সৃজনশীল-শিক্ষিত মহাজনেরা সাহিত্য, দর্শন ইত্যাদির শাস্ত্রীয় গুরুদেবগণকে আগে থাকতেই সঠিক ধরে নিয়ে তাঁদের ওপর প্রশ্নাতীত, সংশয়াতীত, সন্দেহাতীত আস্থা স্থাপন করেন। কেউ এইসব অথরিটিকে সন্দেহ করেন না, তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে যাচাই করেন না। এই অথরিটি বা পুরোহিতবর্গের মধ্যে কারও প্রতি এর আস্থা, কারও প্রতি ওর আস্থা, কারও এঁকে পছন্দ, কারও আবার ওঁকে পছন্দ। কিন্তু সাহিত্যিক মোল্লাতন্ত্র ও পুরোহিততন্ত্রের মধ্যেই থাকতে হয় লেখক-সাহিত্যিকদেরকে।

    ৪। নামের দোহাই: কোনো একটা কহতব্য বিষয়কে তার আধেয়গত সারবত্তা ও অভ্যন্তরীণ যুক্তিসিদ্ধতার দিক থেকে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখানোর বদলে এই অনুমানকে প্রশ্রয় দেওয়া যে, কোনো অথরিটি তথা বড় হুজুরের নামের দোহাই সহকারে কথাটা পেশ করতে পারলে সেটা গ্রহণযোগ্য হিসেবে উতরে যাবে। এক্ষেত্রে হুজুরের নাম, তাঁর নামাঙ্কিত তত্ত্বের ডাক-নাম, তাঁর বইপত্র-রচনার নাম, কোনো একটা সুপরিচিত বা আচমকা উদ্ধৃতি ইত্যাদির ব্যবহার দেখা যায়।

    শিল্প-সাহিত্য-দর্শনের শাস্ত্রীয় হুজুরদের নামানাম প্রয়োগ করে সামান্য পর্যায়ের পাঠককে ভয় দেখিয়ে বশ করতে চাওয়া হয়, আবার এ সব নামের তাবিজ দিয়ে লেখক-সাহিত্যিকরা নিজেদের মনের ভয়ও দূর করতে চান। ছোটবেলায় শিশু যেমন ভয় পেলেই–বা, না পেলেও অন্যকে ঘাবড়ে দেওয়ার জন্য–মাতাপিতার নাম ডাকে, লেখক-সাহিত্যিকরাও তেমনি পাঠকদেরকে ভড়কে দেবার জন্য লেখাজুড়ে একটু পর পর নানান তাত্ত্বিক পিতামাতার নাম ডাকেন। লেখক-সাহিত্যিকরা আসলে বড় হুজুরের নাম ধরে নিজেরাই অথরিটি হয়ে উঠতে চান, নিজেরাই হুজুর হয়ে উঠছেন বলে ভাবেন।

    অন্যের রচনার দোহাই দেওয়া যাবে না তা নয়। যা আমি বলতে চাই, তা যদি আমার চেয়ে ভালোভাবে কেউ বলে থাকেন, এবং তাঁর বলার মধ্যে যদি সারবত্তা ও যুক্তিসিদ্ধতা থাকে তাহলে তাঁর উদ্ধৃতি দেওয়াই যেতে পারে, আর সেই উদ্ধৃতি দিতে গেলে তো নামোল্লেখ করতেই হবে, কিন্তু শুধু ‘শাস্ত্রে শুনেছি খাঁটি, পতিতপাবন নামটি/পতিতকে না তরাও যদি, কে ডাকবে ঐ নাম ধরে/লালন তরাও গো সাঁই/এই ভব কারাগারে’ (ফকির লালনের গান; উদ্ধৃত: আবুল আহসান চৌধুরী, ২০০৭: ২১৩) জাতীয় নামের জোরে যদি কেউ সাহিত্যনদী তরাতে চান, সেখানে আপত্তি।

    (গ) পদ্ধতিগত ফটকাবৃত্তি।

    ৫। বাজার-বুদ্ধি: ফটকা শব্দটা এখানে কিন্তু মোটেও কটুকথা বলার তাড়ণাপ্রসূত নয়, যেমনটা হঠাৎ করে কারো কারো মনে হতে পারে। সম্ভাব্য ভুলবোঝাবুঝির অহেতুক শিকার হতে চাই না বলে ফটকা শব্দটার বিকল্প আমি সন্ধান করেছি। তথাপি ফটকা শব্দটিই আমাকে ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফটকা শব্দের অর্থ বুঝতে ‘জিনিসপত্রের বাজারদরের অনিশ্চিত হ্রাসবৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে এক প্রকার জুয়া ব্যবসা’ বা ‘ঝুঁকিদার ব্যবসা’ (ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক, ২০০০: ৮০০) প্রভৃতি আভিধানিক অর্থ তো বটেই, একই সাথে মনে রাখতে হয় ফটকা পুঁজির কথা–শব্দটার উৎস যে শেয়ার মার্কেটও বটে, সেই কথা। ফটকা-বুদ্ধি হচ্ছে বাজার-বুদ্ধি, শেয়ার মার্কেটের বুদ্ধি, ব্যবসা-বুদ্ধি। নিজে উৎপাদন না-করে স্রেফ লেনদেন করার সুযোগে মধ্যস্বত্ত্বভোগী হিসেবে দাঁও মারার বুদ্ধি। বাজারের যুগে সাহিত্যতন্ত্র যে পদ্ধতিগতভাবে ফটকাবৃত্তি দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার ঝোঁকসম্পন্ন হয়, সে-ঘটনাটিকে এই জায়গা থেকে বোঝার সুযোগ আছে বৈকি। (বাজারের যুগ বলতে আমি কী বোঝাতে চাচ্ছি তা দেখার জন্য: সেলিম রেজা নিউটন, ২০০৩।) উপরন্তু, বাজারের যুগে ‘বুদ্ধি’ বলতে কিন্তু ফটকা-বুদ্ধিকেই বোঝায়। বুদ্ধিহীন বোকা কবি যখন লেখেন “মানুষেরই সব প্রতিভা/ সকল বুদ্ধিবৃত্তি।/ বুদ্ধির দিন বিজয়ী,/ সেলাম, শেয়ালসত্তা” (বদরে মুনীর, ২০০৮: ৯–১০), তখন তিনি সম্ভবত এই বাজার-বুদ্ধি আর ফটকা-বুদ্ধির কথাই লেখেন।

    ৬। নীতি-পদ্ধতির প্রশ্নে ফটকা অবস্থান: নীতি-পদ্ধতির প্রশ্নে ঘোষিত প্রকাশ্য অবস্থানটি বড় ব্যাপার নয়। এটা সেটা লিখে লিখে পাতা ভরানো এবং মাথা ভরানোটাই বড় ব্যাপার। নীতি-পদ্ধতির প্রশ্নটাই লেখক-সাহিত্যিকদের কাছে নীতি-পদ্ধতিগত নয়, কৌশলগত। লেখা থেকে লেখায় বা একই লেখার এক অংশ থেকে অন্য অংশে তার হেরফের ঘটতে পারে। এমনকি পদ্ধতিগত প্রশ্নে কেউ দেকার্তের দোহাই দিলেও ধরে নেওয়া যাবে না যে তিনি দেকার্তের চিন্তা-পাটাতনটিতে দাঁড়িয়ে আছেন বা আন্তরিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে চাচ্ছেন। একই লেখার শুরুর দিকে যিনি থাকেন কার্তেসীয় পদ্ধতির লোক, শেষের দিকে এসে তিনিই হয়ে পড়েন হেগেল-মার্কসের দ্বন্দ্বানুসারী।

    ফটকাবৃত্তির একটি করুণ কন্ট্রাডিকশন রচিত হয় যদি ওপরের এক নম্বর দফার কথা মনে রেখে খেয়াল করা যায় যে, শিল্প-সাহিত্যের বিশুদ্ধতায় যিনি বিশ্বাসী তিনি কিন্তু শিল্পের জন্যই শিল্প রচনা করে যাবেন, খ্যাতি-অখ্যাতিতে তাঁর কিছু যাবে-আসবে না, কদাচ নিজেকে তিনি নাক-উঁচু এলিট বলে ভাবতে যাবেন না বা জনসাধারণ নামক ভেড়ার পাল উদ্ধারকারী রাখাল-ভ্যানগার্ডের ভূমিকায় নামতে যাবেন না। তাঁর স্রেফ বিশুদ্ধ শিল্পের সাধনায় ডুবে থাকার কথা। এই অর্থে আমাদের সাহিত্যিকদের অধিকাংশই বিশুদ্ধ শিল্পের সাধক নন। নীতিতে তাঁরা এলিটিস্ট, বুলিতে গণপন্থী, আর বেকায়দা প্রয়োজনের যুক্তিতে শুদ্ধ-সাত্ত্বিক–নিতান্ত ফটকা অবস্থানের কর্কশ ক্যারিকেচার।

    ৭। বাক্যবাগিশী, বাগাড়ম্বর, রেটোরিক: কোনো একটা রচনা আমি কেন লিখছি, কোনো একটা বক্তৃতা আমি কেন করছি, কোন জিজ্ঞাসা বা তাড়না বা ঘটনা-পরম্পরা বা উপলব্ধি বা আবেগ আমাকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নিচ্ছে তার ইতিহাস বা ইশারা বুদ্ধিজীবীদের লেখায় দেখা যায় না। বোঝা যায়, আত্ম-অনুসন্ধিৎসা, আত্মজিজ্ঞাসা, চিন্তাসঙ্কুলতা, অকাট্য যুক্তি-পরম্পরা এবং প্রশ্নকাতরতা মূলধারার লেখক-সাহিত্যিকদের স্বাভাবিক মনন-বৈশিষ্ট্য নয়। অন্তত প্রকাশিত রচনাবলীতে এসবের কোনো প্রকাশ দেখা যায় না। নিজের জীবনজীবিকা ও পেশা-পরিমণ্ডল বা একান্ত ‘ব্যক্তিগত’ অভিজ্ঞতা ইত্যাদি নিয়ে আত্মপর্যালোচনা বা আত্মবিশ্লেষণ নিতান্তই বিরল।

    দেখা যায় শুধু বাক্য, শোনা যায় শুধু গাদা গাদা কথা। কথার জাহাজ কোন ঘাটে ভিড়িয়ে অবশেষে বিশ্রাম করা যায় তা খুঁজতে থাকা আর সেই ফাঁকে কথার পর কথা সাজাতে থাকা, শিল্প-সাহিত্য-সমাজ সম্পর্কে বাঁধাগতের মুখস্ত মতাদর্শ প্রচার, নানান আবোলতাবোল প্রসঙ্গের অবতারণা, ‘অপর’ ধারণাটির ক্যারিকেচারপূর্ণ প্রয়োগ ঘটানো, শঠতাপূর্ণ তাত্ত্বিক ভণিতার আশ্রয় নেওয়া যথা চমস্কি-ফুকোর বিতর্কের ভেতরে আদৌ না-ঢুকেই আলগা মন্তব্য করে বসা, তুচ্ছ বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ বানিয়ে তোলা, বিক্ষিপ্ত ও সংক্ষিপ্তভাবে চটকদার নানান অনু-গল্প, কেচ্ছা, অনু-প্রসঙ্গের ইচ্ছা-খুশি উপস্থাপন করার মাধ্যমে নিজের পড়াশোনার বিস্তৃত বহর সম্পর্কে ধারণা দিয়ে পাঠককে অভিভূত করার প্রয়াস, যেমন দর্শন-মজলিশে হ্বিটগেনস্টাইনের রবীন্দ্র-নাটক পাঠের কাহিনীর অবতারণা, কিম্বা হঠাৎ একটা ল্যাটিন নামের উল্লেখ ইত্যাদি অনেক সাহিত্য-নক্ষত্রেরই রচনার চিরপরিচিত ভঙ্গি। (হাসানের আলোচ্য রচনায় এসব জিনিসের নমুনা পর্যাপ্ত থাকলেও আমি সেদিকে আর যাই নি পাঠকের ক্লান্তির কথা ভেবে। কেউ যদি চ্যালেঞ্জ করেন তখন বিস্তারিত বলা যাবে।)

    (ঘ) যুক্তিবিন্যাস-প্রণালী ও বিচারবুদ্ধি।

    ৮। ছক-কষা মনন ছদ্মযুক্তির কারবার: চিন্তাহীনতার বদ্ধ কাঠামো, আগাম ছক-কষা (স্কিম্যাটিক) মন-মানসিকতা এবং রক্ষণশীলতা আমাদের সাহিত্য-এলাকার মুক্তচিন্তা উদারতা প্রগতিশীলতা প্রভৃতির ধ্বজাধারীদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এঁদের লেখালেখির মধ্যে চিন্তাশীলতা বা যুক্তিবিন্যাসের গতিধারাকে নিজের গতিতে এগুতে দেখা যায় না, কৃত্রিমভাবে আগাম নির্ধারণ করা থাকে কতটুকু কথাকে চিন্তা-যুক্তি-পদ্ধতি হিসেবে খাড়া করা হবে। এসব ক্ষেত্রে, ফলত, স্বাভাবিকভাবেই যুক্তির নামে ছদ্মযুক্তির কারবার এবং বহু রকমের ভান-ভনিতা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়।

    ৯। যুক্তির বিকট বৈপরীত্য নিপাট যুক্তিহীনতা: আখের গোছানোর কর্মক্ষেত্রে ছাড়া বুদ্ধিজীবীরা যুক্তিবোধ বা ধীশক্তি নামক বস্তুটির আদৌ কোনো ব্যবহার করছেন–এটা প্রকৃতই বিরল ঘটনা। তাঁরা এমনকি খেয়াল করতেও ব্যর্থ হন যে অন্যের বিরুদ্ধে পেশ করা যুক্তি-প্রণালী কীভাবে তাঁর নিজের সাহিত্যিক-অবস্থানটাকেই সমস্যা-সঙ্কুল করে তুলছে। অন্যের বিরুদ্ধে যে যুক্তিগুলো প্রয়োগ করছেন অবলীলায়, সেই যুক্তিগুলোই নিজের বেলায় প্রয়োগ করলে কী ঘটবে তা নিয়ে মোটেই চিন্তিত নন তিনি। শুধু তা-ই নয়, নিজের একটি রচনাতে শাস্ত্রীয় কোনো অফিসারের যে যুক্তি-সিদ্ধান্ত-পদ্ধতির দোহাই তিনি পেশ করেন, নিজের ঐ রচনাটিতেই যে সেটা তিনি নিজেই প্রয়োগ করছেন না, এমনকি তা-ও খেয়াল করেন না জনাব বুদ্ধিজীবী। কিংবা নিজের দেওয়া যুক্তির বা থিসিসের পাল্টা যুক্তি বা অ্যান্টি-থিসিসও যে তিনি একই রচনার অন্যত্র দিয়ে ফেলছেন তা তিনি খেয়ালই করেন না। সুস্পষ্ট যুক্তিহীনতা থেকে শুরু করে এমন ধরনের ‘যুক্তি’ও দাপটের সাথে হাজির করতে দেখা যায়, সাধারণ বিচারেও যা নেহায়েতই ত্রুটিপূর্ণ।

    ১০। গোলামির জ্ঞানতন্ত্র এবং কর্তৃত্বপরায়ণতা: লেখক-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা সার্বিকভাবে পশ্চিমা নয়া ঔপনিবেশিক সাহিত্য-থিওরির অনুরণন-সঞ্চারী। গোলামের আদিখ্যেতা-প্রসূত গোলামির জ্ঞানতন্ত্র তাঁদের জ্ঞানবিজ্ঞানের জোগানদাতা। ইঙ্গ-ইউরোপীয়-মার্কিনী-লাতিনা জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন-সাহিত্য-পদ্ধতিতত্ত্বের শো-বিজের নিত্য নতুন তারকারাজি ও নক্ষত্রপুঞ্জর উত্থান-পতন তথা সুপারনোভা-ব্ল্যাকহোলে গর্ত এবং আতশবাজি তাদের চোখ ধাঁধায় আর উষ্টা খাওয়ায়। এদিকে মার্কস তো ওদিকে চিহ্ন, এদিকে ফুকো তো ওদিকে ফোকর, এদিকে লাঁকা তো ওদিকে ফাঁকা। অবস্থা সঙ্গীন। জনাব সাহিত্যিক শ্রীমান সমালোচককে উড়িয়ে দিচ্ছেন কারণ ঐ দিক থেকে আসা থিওরি-ফোয়ারা নাকি সে-রকমই বলছে। ইত্যাদি। আবার, গোলামির জ্ঞানতন্ত্র শুধু গোলামের আদিখ্যেতা-প্রসূতই নয়, কর্তার সর্বকারকতা-হেতুও বটে। কর্তা ছাড়া গোলাম নাই: ‘গোলাম মালিক খোঁজে, মালিক গোলাম’ (সুমন চট্টোপাধ্যায়, ১৯৯৩)। কর্তৃত্বপরায়ণ মানসগঠন সাধারণভাবে লেখক-সাহিত্যিকদের চিন্তনরীতি ও যুক্তিবিন্যাস-প্রণালীর সাধারণ পাটাতন নির্মাণ করে।

বাংলা সাহিত্যশাস্ত্রের চিন্তন-প্রণালী তথা যুক্তি-পরম্পরা-কাঠামোর নীতি-পদ্ধতিগত বৈশিষ্ট্যসমূহের বিস্তারিত অবয়ব শনাক্ত করার কর্তব্যকে বহুদিন যাবত নিজের কাজ বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছি। সে উদ্দেশ্যেই, বারো-তেরো বছর ধরে যাঁকে বিবিধ বিচিত্র পরিস্থিতিতে এক প্রকার ঘনিষ্ট ও আন্তরিক পর্যবেক্ষণের আওতায় পেয়েছি সেই হাসান আজিজুল হকের একটা প্রবন্ধ ধ’রে উক্ত কর্তব্য-সাধনের হাত মক্‌শো করে নেওয়াটা আমার এই বৈশিষ্ট্য-শনাক্তকরণ-প্রচেষ্টার সপক্ষে প্রধান সাফাই। কিন্তু একটা মাত্র প্রবন্ধ বিচার করে হাসানের মতো সাহিত্য-দিকপাল সম্পর্কে ষষ্ঠ কাণ্ডের বিপজ্জনক দশমহাবিদ্যার অবয়বের রূপরেখা শনাক্ত করা কি যুক্তিসঙ্গত? এ-প্রশ্নের উত্তরে বেশি কিছু না-বলে আপাতত হাসানের সাথে সুর মিলিয়ে এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে, “সবচেয়ে খেলো লেখাটির ভিতর দিয়েও পুরো লেখকের একটুখানি ছবি প্রকাশ পেয়েই যায়” (হাসান আজিজুল হক, ১৯৯৮ এর ‘গ্রন্থ প্রসঙ্গে’), বিন্দুতে সিন্ধ ধরা পড়ে, একটা ভাত টিপলে হাঁড়ির অবস্থা আন্দাজ করা যায়। তা ছাড়া, তাঁর অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধ আমি পড়েছি যা নিয়ে এইরকম চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখানো যায় যে ওপরের দশমহাবিদ্যা তাঁর ঐসব রচনাতেও জারি আছে।

হাসানের আলোচ্য রচনাটিকে ধরেই যদিও শণাক্তকৃত, এই দশমহাবিদ্যা আসলে আমাদের অধিপতি-বুদ্ধিজীবিতারই প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য-তালিকা। এ থেকে আমাদের সাহিত্য-ডিসকোর্সের তথা খোদ সাহিত্যশাস্ত্রের কিছু বৈশিষ্ট্যই পাওয়া গেল। এগুলো শুধু হাসানের বৈশিষ্ট্য নয়, বাংলা সাহিত্যের সর্বাধিক পরিচিত ধারাটিরই সাধারণ বৈশিষ্ট্য। হাসানের, অপরাপর সাহিত্য-দিকপালদের এবং বর্তমান লেখকের নিজের বিভিন্ন রচনা নিয়ে দীর্ঘকালের নিবিড় পাঠ-পরীক্ষণ-পরিক্রমার মধ্য দিয়ে আমার তরফে এসবের প্রামাণিকতা-গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হবে। আর, এ-কথা বলা তো নিতান্তই বাহুল্য বটে, নিজেকেই আমি সন্দেহ করি, নিজের এই প্রবন্ধের ব্যাপারেও আমি নিঃসংশয় নই। সুতরাং, যাঁরা এই প্রবন্ধের একাধিক খসড়া পড়ে আমাকে এগিয়ে যাওয়ার প্রাথমিক সঙ্কেত দিয়েছেন, আমার সেইসব অকৃত্রিম বন্ধুর সমর্থনে বিচলিত না-হয়ে বলতে চাই, ছাপা হওয়ার পরেও আদৌ যাঁরা এই লেখাটা ধৈর্য নিয়ে পড়বেন, তাঁরা যদি আমার বন্ধু না-ও হন, নিশ্চয়ই আমার ভুলগুলো ধরিয়ে দেবেন।

ওপরের ষষ্ঠ কাণ্ডের পাঁচ নম্বর দফার পরিপ্রেক্ষিতে, আমি জানি, একটা প্রশ্ন এখানে না-উঠে পারেই না। ফটকা-বুদ্ধি যিনি আয়ত্ত করেছেন, সাহিত্য-লেখাপড়ার কাজে তা প্রয়োগও করছেন, বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাঁর কাছ থেকে কি আর ভালো কিছু আশা করা যায়? উত্তর হচ্ছে: মানুষের মনোভাব-আচরণ-বিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ কার্যকলাপকে কোনো যুক্তি-ফর্মুলা দিয়ে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় না। মানুষের সামনে সবসময়েই সব পথ খোলা থাকে। কোনো বিজ্ঞান বা হস্তরেখাবিদ্যা বা যুক্তিতন্ত্র বা মতাদর্শের সাহায্যে কোনো ব্যক্তির ভবিষ্যৎকথন এই প্রবন্ধের কাজ নয়।

সপ্তম কাণ্ড: সাহিত্যের স্বাধীনতা

আমি সেই কয়েদীর মতো, যে ভাবে সে স্বাধীন, আর এটা যে স্রেফ একটা স্বপ্ন সে ব্যাপারে সন্দেহ করতে শুরু করে, এবং জেগে ওঠার বদলে স্বপ্নটা সে দেখেই যেতে চায়। আমি তাই আমার পুরাতন মতামতের ঢালুতে আরামে পিছলে যাওয়াতেই সুখী। ঝাঁকি খেয়ে সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে ভয় পাই আমি, কেননা আমার শান্তির ঘুমের পর যখন আমি জেগে উঠব তখন হয়ত আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আর, আমাকে লড়াই করতে হবে আলোতে নয়, বরং যেসব সমস্যা আমি উত্থাপন করেছি সেসবের কয়েদ-করা অন্ধকারে।

রেনে দেকার্ত ১৬৩৯, অনুবাদ বর্তমান প্রাবন্ধিকের

হাসানদের সাহিত্য-বুদ্ধির যেসব বৈশিষ্ট্য বর্তমান রচনায় শনাক্ত করা যাচ্ছে তাতে করে বোঝা যায়, ছোটবেলা থেকে বড় হতে হতে প্রশিক্ষণ-দীক্ষায়ণ-পদ্ধতিতে ‘শিখে-ওঠা’ নানারকম বুলির বহুবিচিত্র এদিক-সেদিক সমাবেশ-বিন্যাস তথা সাজানো-গোছানোর বাইরে পরিস্থিতি বুঝে নিজের মতো করে চিন্তা করার মতো মনন, তথা জগৎ-বদলানোর মতো প্রতিরোধস্পৃহা, তাঁদের গড়ে ওঠে নি। নিজেদের নাম-খ্যাতি-আয়-উন্নতির বাইরে সত্যিকার অর্থে কোনোরকম বিবেকবুদ্ধি কিংবা নীতিবোধ-মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হয়ে উন্নত সমাজ কায়েম করার দিকে এগুনো আদৌ তাঁদের কাজ নয়। বড়জোর বিখ্যাত কোনো ‘দর্শন’-এর ব্যানারে আয়ত্ত করা মুখস্ত কিছু বুলি আওড়ানো তাঁদের আত্মপ্রতিষ্ঠা-প্রকল্পকে জায়েজ করে মাত্র। অথচ এঁরাই সমাজের বিবেক, নীতিবোধের ন্যায়পাল, মূল্যবোধের মহাবীর হিসেবে, পূজনীয় প্রতিমা হিসেবে, লব্ধপ্রতিষ্ঠ। এঁরা নিজেদের চিন্তাশূন্যতার ছাঁচে অনুগতদেরকে ঢেলে সাজান, গোটা সমাজে বুক ফুলিয়ে চিন্তাশূন্যতার চর্চা হতে থাকে, সর্বময় রাষ্ট্র-কর্তৃত্ব ও সর্বাত্মক বাণিজ্যতন্ত্র বিনা-প্রতিরোধে মানবপ্রজাতির সমস্ত সদ্‌গুণ ধ্বংস করতে থাকে, আর সাহিত্যওয়ালারা নাম-বিত্ত-পুরস্কার-প্রতিষ্ঠার লোভে তাদের সাহিত্য-সৃষ্টিকর্মে দুনিয়া সয়লাব করে ফেলেন। এটাই হলো সেই আত্মঘাতী পরিস্থিতি, যখন একচেটিয়া কর্তৃত্বকে ঠেকানোর মতো যুক্তিমালা, গণআন্দোলন, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ প্রভৃতির অনুপস্থিতিতে জেএমবি’র মতো সাম্রাজ্যবাদী অর্থপুষ্ট আত্মবিনাশী বোমাবাজির গণবিচ্ছিন্ন ও গণবিরোধী ধারা নিজেকে মুক্তির দিশারী বলে দাবি করতে থাকে, আর ফরহাদ মজহারের মতো বুদ্ধিজীবী তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তুলনা করে আত্মতৃপ্তি পেতে থাকেন (ফরহাদ মজহার ২০০৫-খ)। এভাবেই বাজার-প্রচল সাহিত্য তথা হাসান আজিজুল হকবৃন্দ হয়ে ওঠেন আত্মঘাতী পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারিন্দা বা এজেন্ট। সামরিক-বেসামরিক-বাণিজ্যিক কোনো কর্তৃপক্ষই আর সাহিত্যকে বিন্দুমাত্র ভয় পায় না, সাহিত্য হয়ে ওঠে তাদের আদরের ধন। দুধকলা দিয়ে “বাবুরাম সাপুড়ে”র সাহিত্য পোষেন তারা, যে-সাহিত্য “করে নাকো ফোঁস্‌ ফাঁস্‌,/ মারে নাকো ঢুঁশ ঢাঁশ” (সুকুমার রায়, ১৪১০: ৩)।

সুতরাং, হাসান আজিজুল হকদের আসলে আর দেওয়ার কিছু নাই, তাঁরা ফটকা, তাঁদের দিন শেষ–এরকম চটজলদি অনাবশ্যক উপসংহারের আরামে গা এলানোয় বর্তমান রচনাকারের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নাই। আসলে, বাংলাদেশের অধিপতি-সাহিত্য-ডিসকোর্সটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে না-পারলে আমাদের চিন্তার সংকটের স্বরূপ উপলব্ধি করা আমাদের আয়ত্তের অতীত থেকে যাবে, আর সাহিত্য বলতে বোঝাবে নাম-যশ-ক্যারিয়ার গঠনের আরেকটা রাস্তা, যে-রাস্তায় হাততালি পিঠ-চাপড়ানো মারহাবা বাহ্‌বা সাবাশ আর ছি ছি ছাড়া ইতিমধ্যে আর-সব বিলুপ্ত হওয়ার পথে। ঢালাও মন্তব্য, দ্রুত সিদ্ধান্ত, এক কথায় খারিজ এইসব তো আমাদের প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য-বৈশিষ্ট্য। চুল চিরে চিরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তদন্ত করে সামগ্রিক ডিসকোর্সগত পর্যবেক্ষণ গড়ে তোলার কাজটাই এখনকার কাজ। এখানে অধিপতি-সাহিত্য-ডিসকোর্স বলতে বড়-কাগজ-ছোট-কাগজ তরুণ-প্রবীণ বিখ্যাত-অখ্যাত-কুখ্যাত সমাজবাদী-কলাকৈবল্যবাদী উত্তরাধুনিক-অত্যাধুনিক ইত্যাদি-প্রভৃতি নির্বিশেষে সবচাইতে সরব, সবচেয়ে দৃশ্যমান ধারাটির কথা বলা হচ্ছে। আদতে এই একটি ধারাই আমাদের দেশে দেখা যায়। মূলধারা, উপধারা, বিকল্পধারা প্রভৃতির নামে যত প্রকার লেখালেখি দেখি, সবই পাকে-প্রকারে অধিপতি-সাহিত্য-ডিসকোর্সটিরই ধারক-বাহক। লোকসাহিত্য-লোকসংস্কৃতির নানান কথ্য-মৌখিক রচনা-সূত্রে এমনকি নিতান্তই গরিব, অক্ষর-বঞ্চিত নিম্নবর্গের মানুষদের মনের মধ্যেও সুস্পষ্টভাবে দেখা যায় অধিপতি-ভাব ও ভাষার কর্তৃত্ব, খোদ কর্তৃত্বের বিভিন্ন আলখাল্লা।

আগে একবার বলেছি, সাহিত্য অগণন মানবীয় রচনার অন্যতম অভিপ্রকাশ। সাহিত্য আমাদের চিন্তার নথিবদ্ধ প্রকাশ ঘটায়। এখানেই তার বিশেষ গুরুত্ব। বিদ্যমান চিন্তা-প্রণালীর সংকট-সূত্রগুলোকে সাহিত্যে শনাক্ত করা একান্তই সম্ভব কিন্তু দুরূহ পরিশ্রম-সাধ্য কাজ। আমাদের সমাজ-সাহিত্য-রাজনীতি ও পরিবর্তন-প্রয়াসী রূপাবয়বসমূহের ঐতিহাসিক বিকাশধারার পারস্পরিক বিনিময়-জড়ন-বিজড়ন-সংশ্লিষ্টতা কোথায় যেন এক সূত্রে গাঁথা। সেই সুতাটি, আমার ধারণা, আমাদের চিন্তার থোড়-বড়ি-খাড়া খাড়া-বড়ি-থোড় প্যাটার্নগুলোর মধ্যে, আমাদের চিন্তার খোদ পদ্ধতি-প্রণালী-পরম্পরার মধ্যে নিহিত আছে।

চিন্তার সংকটটা কোথায়? চিন্তা সার্বভৌম, চিন্তা স্বাধীন, চিন্তার স্বাধীনতা চাই এইসব কথা বলে বলে মুখ ব্যথা করে ফেলেছেন আমাদের বিদ্বৎসমাজ। অথচ, প্রায় যাবতীয় ভদ্রলোকেরা দেখছি তাঁদের লেখায় ও কর্মে পরাধীন আচরণই করছেন। বিদ্যমান সমাজটার মূল গাঠনিক ভারসাম্যহীনতা যেকোনো প্রকারেই হোক টিকিয়ে রাখার দিকেই তাঁদের স্বাভাবিক ঝোঁক। সর্বনাশা জরুরি অবস্থার নিপীড়নকে লেখায় পরিষ্কারভাবে চ্যালেঞ্জ করার মতো লোক বিরল। গত পনর বছরের বাংলাদেশে প্রকাশ্য দিবালোকে এবং ততোধিক প্রকাশ্য নিশালোকে ঢোল-সহরত পিটিয়ে বিকাশমান কর্পোরেট পুঁজিবাদী ধারাটির চিন্তা-ভাব-ভাষা-চালচলন-আদবকায়দা-আবরণ ও দেহভঙ্গিমায় প্রশিক্ষিত হয়ে উঠছেন নতুন সহস্রাব্দের অরুণ-বরুণ-তরুণ সমাজ (নতুন সহস্রাব্দের তরুণদের সম্পর্কে হাসানের মূল্যায়ন এবং সে-সম্পর্কে বর্তমান লেখকের প্রতিক্রিয়ার জন্য দ্রষ্টব্য: হাসান আজিজুল হক, ২০০০-ক; সেলিম রেজা নিউটন, ২০০০-ক) এবং মূলত প্রবীণ সমাজের অন্তর্গত “নির্বিচার অর্থসম্পদ সংগ্রহকারী ছোট একটি শ্রেণী”, যে-শ্রেণীর মধ্যে আছেন:

    অবসরপ্রাপ্ত সেনাপতি ইত্যাদি, পুলিশের বড় কর্তা ইত্যাদি, রোঁয়া-ওঠা সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভীমরতিপ্রাপ্ত অধ্যাপক, আপন পেশায় সম্পূর্ণ নষ্ট ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী ইত্যাদি ইত্যাদি কে নয়। … তাদের নাম ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত বা অনবরত সচল আমলা, সেনাবাহিনী বা পুলিশবাহিনীর বড় কর্মকর্তা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেষ্টা-শিক্ষক। (হাসান আজিজুল হক, ২০০০-খ)

কি শিক্ষিত কি অশিক্ষিত, কি বড়লোক কি গরিব পণ করেছে এলিট কর্তৃত্ব-কর্তৃপক্ষের গোলামি করে যাবে। তাঁদের এই স্বাধীন গোলামির শেকড়-বীজ তাদের পায়ের নিচে নয়, মগজেই বরং প্রোথিত-রোপিত-অঙ্কুরিত-পল্লবিত। অন্যদিকে, কর্পোরেট-কেরামতির কালচার যাঁদের পছন্দ না, তাঁদের একটা অংশ তথাকথিত সর্বহারার একনায়কত্বের আওয়াজ দিয়ে লেনিনবাদী পার্টি-এলিটদের কর্তৃত্ব-শাস্ত্রের অধীনে, এবং অপর অংশটি তথাকথিত ইসলামী বিপ্লবের আওয়াজ দিয়ে লাদেনবাদী পার্টি-এলিটদের কর্তৃত্ব-শাস্ত্রের অধীনে, আনতে চান দেশ-মানুষ-সংস্কৃতি-প্রকৃতিকে। এই তিনটি পক্ষই কর্তৃত্ববাদী। তিনটি পক্ষই তিন প্রকার এলিটের শাসন চান, বাকি সমস্ত মানুষকে পরাধীন করে রাখতে চান উন্নয়ন, প্রগতি, ধর্ম আর কল্যাণের নামে। যাবতীয় সাহিত্য-সংস্কৃতি-তমুদ্দুন-কালচার হুজুরদের পকেটে। সুতরাং, অধিপতি-চিন্তার প্রধান এই তিনটি রূপবিন্যাসকে–তথা খোদ কর্তৃত্ব নামক ঘটনাটিকে–চ্যালেঞ্জ করতে পারার মধ্যেই আছে মানুষের মুক্তির পথ। ‘সাহিত্য-সৃজনশীলতা-রাজনীতি’ ইত্যাদির নামে প্রচুর মালপত্র পয়দা হলেও গোলামির বৃত্তেই পাক খাচ্ছে প্রায় সর্বপ্রকার চিন্তা। এখানেই চিন্তার সংকট। চিন্তার সংকট এখানেও যে, একেবারে নিজের ঘরের মধ্যে “বিশ্ববিদ্যালয়ের ভীমরতিপ্রাপ্ত অধ্যাপক”বৃন্দ কী করছেন না করছেন যে-ব্যাপারে হাসানদের মতো বুদ্ধিজীবীরা একেবারেই দৃষ্টিহীন–শুধু তথাকথিত মৌলবাদী শিক্ষকেরাই তাঁদের সংশ্লিষ্ট-আলোচনার টার্গেট। মৌলবাদী এবং মার্কসবাদী শিক্ষকেরা হাতে হাত রেখে যে ‘ভীমরতিপ্রাপ্ত’ হয়ে চলেছেন এবং তার ফলে “খোদ বিশ্ববিদ্যালয়টাই যে একটা ‘মুক্তবাজারে’ পরিণত” হতে চলেছে তা কিছুতেই হাসানদের চোখে পড়ে না (দৃষ্টিহীনতার এই সংকটটা এখানে বিশ্ববিদ্যালয় নামক বাজারে বা ভাগাড়ে জমা হওয়া লেখান্তরে হাসান-কথিত ‘মানুষের বিষ্ঠা’ থেকে তোলা টাকা আয় করার সাথেও সংশ্লিষ্ট সে-প্রসঙ্গে আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য: সেলিম রেজা নিউটন, ২০০০-খ)।

মিডিয়াকেন্দ্রিক শো-বিজনেসের সাথে সাহিত্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান ধারাটির তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো সাদৃশ্য খেয়াল না করে থাকাটা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। মানুষের জীবন-জগত-সংসারের সর্বক্ষেত্রেই অনুসরণীয়-অনুকরণীয় শাস্ত্র-শরিয়ত আইনকানুন-বিধিবিধান নমস্য-পূজনীয় আব্বু-আম্মু কর্তা-শাসক পুরোহিত-মওলানা বড়-হুজুর-ছোট-হুজুর নেতা-লিডার তাত্ত্বিক-দার্শনিক বড়ভাই-দিদিমণি আইডিয়াল-রোলমডেল ট্যালেন্টেড-জিনিয়াস এক্সপার্ট-বিশেষজ্ঞ-বিশারদ গুরুজনদের চরম অস্বস্তিকর অমোঘ উপস্থিতি শৈশব থেকে আমাদেরকে ভুগিয়ে আসছে। কয়েক হাজার বছর ধরে সর্বক্ষেত্রে বিরাজমান কর্তৃত্ব-তন্ত্রের পরম প্রতাপশালী পরিমণ্ডলটিকে জীবনের দামে আমাদেরকে চিনে নিতে হয়েছে, হচ্ছে।

কর্তৃত্ব-কর্তৃপক্ষের অসংখ্য মুখ, অগণন চেহারা–ইবলিসের মতো। ইবলিসের বিরুদ্ধে লড়াই মানুষের, মনুষ্যত্বের। আমাকে নিয়ন্ত্রণ করবে কে? আমি নিজে? নাকি ইবলিস? নিজেকে নিজে শাসন-নিয়ন্ত্রণ-পরিচালনা করতে পারার মতো মানবীয় সক্ষমতা একান্ত ব্যক্তিগত পর্যায়ে অর্জন করার কাজ এবং সামাজিক পর্যায়ে তার সাথে মানানসই অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক আয়োজন-বন্দোবস্ত-কাঠামো গড়ে তোলার কর্তব্য ঐ লড়াইয়ের উপজীব্য। এ হচ্ছে নিজেকে শুধু নিজেরই অধীন–স্ব-অধীন–রাখতে পারার সংগ্রাম, মানে স্বাধীনতার নিরন্তর সংগ্রাম। এ হচ্ছে নিজে খোদ নিজের খোদা হয়ে ওঠার জেহাদ–নিজের নফ্‌সের বিরুদ্ধে, আবার একাধারে সমাজ-নিয়ন্ত্রক সমাজ-কর্তা হিসেবে ও যাবতীয় আর্থিক অসমতা-বৈষম্যের প্রতিভূ হিসেবে সদাসর্বত্র-হাজির-থাকা ইবলিসের বিরুদ্ধেও। ইবলিসের অনেক চেহারার মধ্যে ইহলৌকিক দেবতারাও আছেন। অন্য সব কিছুর পাশাপাশি তারা মনুষ্যত্বের ব্যক্তিক আত্মপ্রকাশ আর মনুষ্য-আত্মার সামাজিক অভিপ্রকাশের প্রকাশ্য এলাকাটিকে নজরবন্দি করে রেখেছেন হাজার হাজার বছর ধরে। বন্দি হয়ে থাকা এই এলাকাটির অধিপতি-কর্মচারীরা নিজেদেরকে সাহিত্য নামে চালিয়ে আসলেও আদতে তা ছায়া-সাহিত্য, কর্তৃত্ব-শাস্ত্রীয় সাহিত্য। সত্যিকারের সাহিত্যের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বাধীনতা। মানুষের নিজের এবং নিজেদের সত্তা, আকাঙক্ষা, অনুভূতি, সংগ্রাম ও স্বপ্নের সহজ, স্বাভাবিক ও স্বাধীন অভিপ্রকাশ ঘটানো তার প্রধান কাজ। প্রকৃত সাহিত্যের ধারণাটিকে ছায়া-সাহিত্যের হাত থেকে উদ্ধারের লড়াই তাই মানুষের সার্বিক মুক্তি ও স্বাধীন অভিব্যক্তি অর্জনের লড়াইয়েরই অংশ। এই সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতেই কর্তৃত্বের প্রতিমাবিনাশী ক্ষুদ্র একটি রচনা হিসেবে এই লেখাটিকে পাঠ করা হোক–আমার নিবেদন এটুকুই। এখানে হাসান বা আমি উপলক্ষ মাত্র।

হাসানরা যে আস্তে-ধীরে দশমহাবিদ্যাধর হাসান আজিজুল হক হয়ে ওঠেন তার ‘রহস্য’টা কী? এর থেকে উদ্ধারের রাস্তাই বা কী? আমি যখন কোনো সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীর রচনা পড়ি তখন নিজের অভিজ্ঞতার সাথে মেলাই। নিজেকে প্রশ্ন করি: তিনি কী লিখছেন, কেন লিখছেন। একটু আগে, দশমহাবিদ্যার ছয় নম্বর দফায় আমি এই কথাটাই তুলেছিলাম, পরে এসে সেখান থেকে কথা এগিয়ে নেব বলে, কথাটা আরেকবার বলি: কোনো একটা রচনা একজন বুদ্ধিজীবী কেন লিখছেন, কোনো একটা বক্তৃতা তিনি কেন করছেন, কোন জিজ্ঞাসা বা তাড়না বা ঘটনা-পরম্পরা বা উপলব্ধি বা আবেগ তাঁকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নিচ্ছে তার ইতিহাস বা ইশারা বুদ্ধিজীবীদের লেখায় দেখা যায় না। কেন দেখা যায় না তা বোঝা গেলে, আমার ধারণা, হাসান আজিজুল হকদের আকাশ-তারকা-কুসুম হয়ে ওঠার বোধগম্য হতে পারে।

ঘটনা হলো, ঐ বুদ্ধিজীবীটির আসলেই বলার কী আছে বা আদৌ কিছু আছে কি না সেটা বড় ব্যাপার না। কিছু একটা তিনি জীবন থেকে শিখেছেন বা উপলব্ধি করেছেন, সেটা সবার সাথে শেয়ার করার স্বাভাবিক তাড়না থেকে নয়, যে রকম শিক্ষাপদ্ধতি সমাজপ্রণালী ব্যক্তিক বিকাশ বা আর্থিক বন্দোবস্ত তিনি জগতের জন্য মঙ্গলজনক বলে বিশ্বাস করেন তার পক্ষে বৃহত্তর নীতিগত অবস্থান থেকে তর্ক-বিতর্ক বা চিন্তার লড়াই বা নির্দিষ্ট কোনো দৃষ্টিভঙ্গির প্রচার-প্রসার ঘটানোর জন্য নয়, বরঞ্চ নিজের তারকা-সূত্র অবিচ্ছিন্ন রাখার আশায়, অন্যের অনুরোধে, ফরমায়েশে একটা-কিছু লিখে ফেলা–কোনোক্রমে খাড়া করা আর কি। অর্থাৎ, বুদ্ধিজীবীগিরির কাজ বা লেখালেখির ব্যাপারটাকে নিছক করে-কম্মে খাওয়া, নাম-খ্যাতি-ক্ষমতা-মর্যাদা-প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির মামলা হিসেবে দেখা। তিনি নিজে একটি দোকান, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান–লেখালেখি হলো গিয়ে সেই দোকানের বা ব্যবসায়িক হাউসের একাধারে পণ্য এবং পাবলিক রিলেশন্স কর্মকাণ্ড তথা বিজ্ঞাপনী তৎপরতা। ব্যবসাটা চালাতে হবে তো! এখান থেকেই আসে বাক্যবাগিশী, বাগাড়ম্বর, রেটোরিক, অকারণ নামের দোহাই, ফটকাবৃত্তি, নীতি-পদ্ধতির প্রশ্নে কপট অবস্থান, তত্ত্বগত ভান-ভনিতা, ছদ্ম-যুক্তির কারবার ইত্যাদি। (এই যে বুদ্ধিজীবীটির কথা বলছি, তিনি আমাদের অধিপতি-সাহিত্যের পাদপ্রদীপের আলোকপ্রাপ্ত বিখ্যাত লেখক-সাহিত্যিকদের প্রতিনিধি, তিনি বড় কাগজেরও হতে পারেন, ছোট কাগজেরও হতে পারেন। এঁরা ছাড়া আরো অগণন লেখক আছেন যাঁরা আন্তরিক সততার সাথে লেখালেখি করে চলেছেন, বৃহৎ বা ক্ষুদ্র সাহিত্য-প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্তা-কত্রীদের কৃপা-করুণা-আদর অর্জনের বিদ্যা আয়ত্ত করাটাকে যাঁরা নিজেদের কর্তব্যের বাইরে রেখে দিয়েছেন।)

অবাধ দোকানদারির এই সর্বগ্রাসী জমানা, হাসানের মতো বিপ্লবী সাহিত্যিককে হতাশ বুদ্ধিজীবীতে রূপান্তরিত করেছে–এ-কথায় সন্দেহ করার অবকাশ কমই। কিন্তু মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে যেসব মারাত্মক বৈপরীত্য দাঁড়িয়ে যাচ্ছে তাঁর কথাবার্তায় তা ভালো করে বুঝে নেবার দায় থেকে আমরা মুক্তি পাব কীভাবে। মাত্র কুড়ি বছর আগেই তিনি সাহিত্যের উপযোগিতা সম্পর্কে কীরকম সুস্পষ্ট ধারণা পোষণ করতেন:

    বুঝতেই পারা যায় দা কুড়োল কোদাল টুথব্রাশ চাল ডাল যেমন সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সাহিত্য তা নয়। কার্ল মার্ক্সের ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ তত্ত্বও নয়, আইনস্টাইনের ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’ও নয়। কিন্তু ও-দুটি থেকে যথাক্রমে বিপ্লব ও বোমা ঠিকই বেরিয়ে আসছে। সাহিত্য এই জাতীয় সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয়। …

    … মনে আছে থিসিস অন ফায়ারবাখ-এ মার্ক্সের শেষ এগারো নম্বর থিসিসটা? দুনিয়ার ব্যাখ্যা অনেক হয়েছে, এখন দরকার এটাকে বদলে ফেলা। … আমার নিজের দেশে এটা আমি পরিষ্কার বুঝতে পারি যে সাহিত্য কোনো না কোনোভাবে কাজ করছে এটা দেখতে চাইলে সাহিত্য ছেড়ে দিয়ে ঐ ‘বদলে’ ফেলার কাজে নামা বা লেখাকে অন্তত সেইদিকে চালিত করা অনেক বেশি জরুরি। (সাক্ষাৎকার/১, হাসান আজিজুল হক : সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ১৮)

লেখকের দায়বোধ এবং সমাজে সাহিত্যের ভূমিকা সম্পর্কে তখন তাঁর মনে কোনো সংশয়ই ছিল না। “একটা লেখা শুরু করার পেছনে কি কি বিষয় কাজ করে?” পশ্চিমবাংলার বিজ্ঞাপনপর্ব পত্রিকার সম্পাদক রবিন ঘোষের এই প্রশ্নের উত্তরে হাসান বলেছিলেন:

    সাধারণত কোনো একটা সুনির্দিষ্ট দায়িত্বের বোধ। দায়বোধ থেকে লিখি। পাশের বাসায় ডাকাতি হলে সেই প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানোর দায় আমরা বোধ করি–এই রকম ভাবে সারা দেশে ডাকাতি হতে থাকলে, সমগ্র পৃথিবী জুড়ে সেটা চলতে থাকলে তার একটা দায়িত্ব স্বীকার করতে আমরা বাধ্য। সেটা করতে হয় ঠিক পরের দিক বিবেচনায় নয়, নিজের দিক থেকেও বটে। (সাক্ষাৎকার/২, হাসান আজিজুল হক : রবিন ঘোষ, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ৪৩)

পেছন ফিরে দেখাটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, কে কত বড় সাহিত্যিক, কে কত মহৎ বস্তু রচনা করেছেন তা নয়, তাঁর কাছে আসল প্রশ্ন ছিল সমাজের কাছে, মানুষের কাছে লেখকের দায়বদ্ধতা:

    … একশোবার সত্যি যে সাহিত্যিক তাঁর সময়ের সমাজের কাছে, মানুষের কাছে দায়বদ্ধ। এই দায় কোনো একভাবে পালন করতে না পারলে তিনি কি লিখলেন না লিখলেন তাতে কিছু এসে যায় না। (সাক্ষাৎকার/১, হাসান আজিজুল হক : সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ২১)।

তখন তাঁর কাছে লেখালেখির অর্থ খুবই পরিষ্কার ছিল:

    লেখা একরকম ঋণশোধ দেওয়া। বেঁচে থাকার উপকরণ জোগাচ্ছে সমাজ। কেবলই নিতে থাকলে যে লজ্জা ও অপরাধবোধ জমা হতে থাকে তা থেকেই লিখি … (সাক্ষাৎকার/৩, হাসান আজিজুল হক : কথা, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ৫২)।

হাসান সঠিকভাবেই জানতেন সারা দুনিয়া জুড়ে ‘বিকারগ্রস্ত মানব-অস্তিত্বকে ঠিক জায়গায় আনার যে কর্মযজ্ঞ তাতে অংশ নেওয়াই লেখকের কাজ’। শুধু স্রোতে গা ভাসিয়ে নয়, স্লোগানের মতো করে আওড়াবার জিনিস হিসেবে নয়, ন্যায়সঙ্গত বলেই কাম্য ছিল বিপ্লব তাঁর কাছে। চমৎকার ঋজুতার সাথে তিনি বলতেন:

    যে অসম্ভব উৎকট পৃথিবীতে আজ আমরা বাস করছি তা তো মানুষই তৈরি করছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সমস্ত পৃথিবী গ্রহটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার অস্ত্র নির্মাণ করেছে মানুষ; পৃথিবীর দূরতম প্রান্তে বসবাস করছে যে নিরীহতম মানুষটি তার সমস্ত রক্তটা চুষে নেওয়ার চোং তৈরি করেছে মানুষ, মানুষকে চাপা দিয়ে থেতো করে দেবার যন্ত্র বানাতে পেরেছে মানুষ। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় মানব পরিস্থিতি আজ এক অসম্ভব অসহনীয় পরিস্থিতি। লেখকের দায় তাই বড়ো অর্থে মানবজাতির কাছে–সুনির্দিষ্ট অর্থে আপন দেশ ও কালের কাছে। বিকারগ্রস্ত মানব অস্তিত্বকে ঠিক জায়গায় আনার যে কর্মযজ্ঞ তাতে অংশ নেওয়াই লেখকের কাজ। (সাক্ষাৎকার/৫, হাসান আজিজুল হক : নূরুল কবির, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ৮৬)

    বাস্তবের তীব্র স্রোতের মধ্যেও সব সময়েই খুঁজতে হয় কোনো একটা ধ্রুবকে মানে কোনো একটা স্থায়ী অবলম্বনকে আমি পরিবর্তনশীল মানববাস্তবকেই ধ্রুব করেছি–সেটাকেই উল্টেপাল্টে খুঁড়ে যাবো। আমি মনে করি মানব-বাস্তব মানুষের হাতেই আছে। এইজন্যেই আমি উৎকট আগ্রহ নিয়ে মানুষের সমাজের দিকে চেয়ে থাকি–রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রথা সংস্কার এইসবের খুব ভিতরে যাবার চেষ্টা করি কারণ ব্যাধিগ্রস্ত … সমাজকে বদলানোর চেষ্টা ন্যায্য ; বিপ্লব স্লোগান হিসেবে নয়, ন্যায়সঙ্গত বলেই কাম্য …। (সাক্ষাৎকার/২, হাসান আজিজুল হক : রবিন ঘোষ, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ৪৪)

আর, কাঙিক্ষত এই বিপ্লব সাধনের কাজে সাহিত্যকে সহায়ক শক্তি বলেই তিনি জানতেন। “সাহিত্য কি সমাজ পরিবর্তনের ভূমিকা নিতে পারে?” এই প্রশ্নের উত্তরে হাসানের জবাব ছিল একেবারে চাঁছাছোলা:

    সহায়তা দিতে পারে। … সাহিত্যের কোথাও কোনো ভূমিকা নেই কিছুমাত্র প্রভাব নেই এই কথাটা যদি পুরোপুরি মেনে নিতে হয় তাহলে আর লেখা চালিয়ে যাবার কোনো অর্থ হয় না। (সাক্ষাৎকার/২, হাসান আজিজুল হক : রবিন ঘোষ, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ৪৮)

দেখুন, এখন যিনি লেখাই ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন, সুশীল সাহিত্য-সমাজকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়ে বারবার করে বলছেন, বিবেকের কাছে সৎ থাকলে আমরা কেউই নাকি বলতে পারব না, সাহিত্যের আদৌ দরকার কী, তাঁরই মুখে দশক দুই আগেও লেখালেখি ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল নিতান্তই বেমানান। লেখালেখি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবেন কিনা এই প্রশ্নে তাঁর উত্তর ছিল দ্বিধাহীন:

    কখনোই ভাবি না। ছেড়ে দেবার কথা ভাবি না, শুরু করার কথা ভাবি। লেখা শুরু হয়নি, মানে ঠিকমতো বাঁচাই শুরু হয়নি। জীবনকে ঠিকমতো নেংড়ানো হচ্ছে না এখনো। লেখা ছেড়ে যখন দেব না তখন কেন ছাড়বো প্রশ্ন আর ওঠে না। তাই না ? (সাক্ষাৎকার/৩, হাসান আজিজুল হক : কথা, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ৫৪)

আর, বর্তমানের অনেক কঠিন এই পৃথিবীতে হাসানের মতো লেখকের যখন আরো নব উদ্যমে লেখা শুরু করার কথা ছিল, তখন তাঁর “আজকাল এটাই মনে হয় যে লেখা অবশ্যই ছেড়ে দেওয়া উচিত … সাহিত্য নিয়ে কী করব?” তাহলে এই বিশ বছরের মধ্যে এমন কিছু নিশ্চয়ই ঘটেছে, যে হাসান পৃথিবীকে ‘বদলে’ ফেলার কাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। কী ঘটেছে এই বিশ বছরে? রুশ-মার্কিন উভয়পাক্ষিক প্রচারণার কারণে ‘সমাজতন্ত্র’ নামে প্রচারিত জিনিসটা দুনিয়া থেকে উবে গেছে প্রায়, উঠতে বসতে সাহিত্যিকেরা এখন মার্কসের নাম নেন না৩, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একচ্ছত্র আধিপত্যের চাপে সবার নাভিশ্বাস ওঠার দশা ইত্যাদি প্রভৃতি। সেই জন্যেই কি তাঁর মনে হচ্ছে, “এমন একটা পৃথিবীতে আমরা বাস করছি, যেখানে কেবল জান্তব বেঁচে থাকা এবং সেই জান্তব বেঁচে থাকাকে অতিশয় উন্নত করার বাইরে মানুষের জীবন যাপনের মধ্যে আর কিছু নেই”? এসব দেখেশুনেই তিনি কি তাহলে হতাশ[৭] হয়ে পড়েছেন, দুনিয়া ‘বদলে’ ফেলার লড়াই থেকে অবসর গ্রহণ করতে চাইছেন? সেটা যদি তিনি সোজাসাপ্টাভাবে জানিয়ে দিতেন, তাহলে তাঁকে নিয়ে এই প্রবন্ধ লেখার প্রয়োজন পড়ত না।

হাসান আসলে খুব ভালো করেই জানেন “সাহিত্যের শক্তি … পরিমাপহীন” (সাক্ষাৎকার /১, হাসান আজিজুল হক : সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ১৯)। সাহিত্যের এই অপরিমেয় শক্তি আজ চোখের সামনে কর্পোরেট লুটেরা শ্রেণী পুরোদস্তুর কাজে লাগাচ্ছে, আর সেই কাজে বৈধতা অর্জনের জন্য অন্য অনেক কিছুর পাশাপাশি হাসান আজিজুল হককে পুরস্কার দেওয়ার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে। হাসানকে তাঁর কাজের স্বীকৃতি আর ‘অন্নপ্রাপ্তির সুবিধে’ নিতে হবে বাংলাদেশ-ভারতের কর্পোরেট ডাকাতদের কাছ থেকে? ঐ ডাকাতদের বিরুদ্ধে তাদের গায়ে লাগার মতো সোচ্চার থাকলে কি তারা হাসানকে ডেকে এনে পুরস্কার তুলে দিত হাতে? এটা তাহলে কীসের পুরস্কার? কর্পোরেট ধনিক শ্রেণীকে সমাজের সুন্দর স্বাভাবিক নেতৃত্বপ্রদানকারী অংশ, তথা ‘সুশীল সমাজ’, হিসেবে মেনে নেওয়ার পুরস্কার কি এটা নয়? সমগ্র পৃথিবী জুড়ে চলতে থাকা ডাকাতির দায়িত্ব হাসান কি তবে আর স্বীকার করবেন না ঠিক করেছেন? হ্যাঁ, এইটাই মূল প্রশ্ন; ‘সাহিত্য লইয়া কী করিব’ কোনো প্রশ্নই না। ‘সাহিত্য লইয়া কী করিব’ যাঁদের কাছে প্রধান প্রশ্ন তাঁরা আসলে আত্মসমর্পনের অজুহাত খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

এরকম আত্মসমর্পনের অন্যতম উৎস-স্থান হলো ওপরে দশমহাবিদ্যার দশম দফায় উল্লেখিত কর্তৃত্বপরায়ণ মানসগঠন। হাসানরা শুরু করেন সামাজিক মুক্তির নামে জারি-থাকা জগৎজোড়া আন্দোলনের যুগে কিছু-একটা ‘কমিটমেন্ট’ থেকে, আর হাসানরা শেষ করতে করতে এসে যায় জগৎজোড়া দোকানদারির জমানা। তাঁরা যখন শুরু করেছিলেন তখন মুখে এবং ‘ঈমান’ থেকে উচ্চারণ করেছিলেন ‘মুক্তি’, কিন্তু নিজেদের অজান্তে বাস্তবে চর্চা করছিলেন কর্তৃত্ব–পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, সংগঠনে, সমাজে এবং সাহিত্যে। ফলে অবশেষ-বয়েসে এসে কর্তৃত্বই হয়ে দাঁড়ায় তাঁদের একমাত্র কমিটমেন্ট। আর, আমাদের চিন্তাশীল বিদ্বৎসমাজ, হাসানরা যার অন্যতম নেতা, ঘটনার উপযুক্ত কোনো ব্যাখ্যা পান না। জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রথমোক্ত যুগটিতে কাউকেই কিছু চিন্তা করতে হতো না, সবই আসত চীন-রাশিয়া-আলবেনিয়া থেকে। আর, নাগরিক-ব্যবসায়িক-ট্রান্সপারেন্সির বর্তমান যুগে সবই আসে নিও-লিবারাল ইউরোমার্কিন কর্পোরেট কাচের ওপার থেকে–কাউকেই কোনো চিন্তা করতে হয় না। চিন্তা-যুক্তি-বিশ্লেষণবিমুখ সর্বাত্মক কর্তৃত্বপরায়ণতা তাই আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক লক্ষণ-চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

লেখক-সাহিত্যিকরা কিন্তু আদিতে এই কর্তৃত্বপরায়ণ মানসগঠনটি পান একেবারে ছোটবেলা থেকে দীক্ষায়িত হতে হতে, প্রশিক্ষিত হতে হতে, এক কথায় দীক্ষায়ণ-প্রকৌশলের কলকব্জা থেকে, পরে বড় হয়ে তিনি নিজে এই লাইনের বড় গুরু হয়ে ওঠেন। নাম-খ্যাতি-অর্থাদি অর্জন করেন। সাহিত্যিক হতে গেলে অনেক কিছু আপনাকে মেনে নিতে হবে বা শিখে নিতে হবে। আপনাকে সাক্ষাৎ বা পরোক্ষ গুরু ধরতে হবে। তাঁরা আপনাকে শেখাবেন, গাইড করবেন। প্রচুর বিধিনিষেধ বিশ্বাস সিদ্ধান্ত অনুসিদ্ধান্ত শাসন অনুশাসন এ সবের মুখোমুখি হতে হবে।

অধিপতি-ধারার শাস্ত্র-সঙ্কুল পথে শিল্প-সাহিত্য ব্যাপারটাই আসলে কর্তৃপক্ষীয়। আপনার যেকোনো রচনা যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো না কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মুদ্রিত প্রকাশিত গৃহীত স্বীকৃত প্রশংসিত পুরস্কৃত পর্যালোচিত না হচ্ছে ততক্ষণ তা শিল্প-সাহিত্য বলে বিবেচিতই হবে না। এই কর্তৃপক্ষ যত বড়, আপনি তত বৃহৎ শিল্পী-সাহিত্যিক। এই কর্তৃপক্ষ অবশ্য শিল্প-সাহিত্যেরই কর্তৃপক্ষ–বাস্তবে এরই নাম শিল্পের স্বশাসন। রাজনৈতিক ইত্যাদি কর্তৃপক্ষ সেখানে নাক গলালে তা শিল্পের স্বাধীনতার লঙ্ঘন। এইসব ইত্যাদি-প্রভৃতি ধ্যানধারণার মধ্যে বেড়ে উঠতে উঠতে শিল্পী-সাহিত্যিকরা নানান ধরনের রাষ্ট্র-পার্টি-মতাদর্শগত বিধিনিষেধ মেনে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে, বলশেভিক-বামপন্থী কর্পোরেট-নাগরিকপন্থী ইসলামী-লাদেনপন্থী বিবিধ-বিচিত্র অগণতান্ত্রিক কট্টরপন্থার অনুগামী-সমর্থক হওয়াটা শিল্পী-সাহিত্যিকদের জন্য গতানুগতিক মামুলি একটা ব্যাপার।

কর্তৃত্বপরায়ণ মানসগঠনের অপর পিঠ হচ্ছে দাস-প্রবণতা, আনুগত্য-পরায়ণতা। কর্তৃত্বের ক্রমবিন্যাসতন্ত্রে প্রত্যেক কর্তাই তার ওপরের কর্তার গোলাম। যে নিজে দাসত্ব করতে পারে না, সে অন্যকে দাস বানাতে পারে না। যে নিজের স্বাধীনতা জলাঞ্জলি দিতে পারে না, সে অন্যের স্বাধীনতায় শঙ্কা বোধ করে না। আজকে যিনি বড় কর্তা, গতকাল বা আরেক পরিস্থিতিতে তিনিই বড় গোলাম ছিলেন। আজকে যিনি বড়ে গোলাম, তিনি গোলামি করেন এই আশায় যে কাল তিনি বড় কর্তা হবেন। এ ধরনের লোকেরা নিজের সন্তানকে পর্যন্ত সবার আগে অনুগত কর্মচারী বানায়, দাস বানায়, নিজের দাস–এই আশায় যে সন্তান বড় হলে পিতাটির মতো, মাতাটির মতো বড় অফিসার হবে, ফার্মের গরুর মতো দুধে-ঘাসে থাকবে।

কর্তৃত্বপরায়ণতা তথা আনুগত্যশীলতা হচ্ছে সেই ব্যাধি-বৈশিষ্ট্য যা থেকে জন্ম নেয় প্রশ্নহীন, গা-ভাসানো, পরাধীন মানসগঠন। বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হয়ে নিজে নিজে তার সমাধান করতে শেখা, নিজে নিজে ভাবতে শেখা, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে শেখা এ সব বৈশিষ্ট্য অর্জনের পেছনে থাকে স্বাধীনতা। স্বাধীনতাই সর্বপ্রকার সৃজনশীলতার ধাত্রী। সবকিছু নিয়ে, যেকোনো কিছু নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারলে, সন্দেহ করতে না পারলে স্বাধীন হওয়া যায় না, স্ব-অধীন থাকা যায় না। তখনই বড় পীর আসেন, দীক্ষাগুরু আসেন, অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ আসেন, সংগীতের সর্বজ্ঞ আসেন, রাজনীতি-বিশারদ আসেন, বুদ্ধিজীবী আর শতরূপী শতমুখো এক্সপার্ট আসেন–আমার-আমাদের সব সমস্যার ফয়সালা, সর্ব মুশকিলের আসান তিনিই জানেন। এভাবে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব জেঁকে বসে ইবলিসদের। ধর্ম মার খায়। অধর্মের রাজত্ব-বৃদ্ধি ঘটে। সর্বগ্রাসী সর্বব্যাপক দীক্ষায়ণ-প্রকৌশলের সার্বক্ষণিক মনমোহিনী প্রচারণায় মানুষ ভুলতে বসে যে সে নিজে তার নিজের জীবন আবিষ্কার করতে, আস্বাদন করতে এবং পরিচালনা করতে সক্ষম। তথাকথিত সাহিত্য তথা শাস্ত্রীয় সাহিত্য বা ছায়া-সাহিত্য এই কর্তৃত্বপরায়ণতা তথা আনুগত্যশীলতার ব্যাধিবর্ধক দীক্ষায়ণ-প্রকৌশলের প্রসিদ্ধ যন্ত্রগুলোর মধ্যে অগ্রবর্তী।

স্বাধীনতাই মানুষের স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক প্রজাতিগত স্পৃহা। মনুষ্যসন্তান জন্ম নেওয়ার মুহূর্ত থেকে তাঁকে অজস্র-অগণন পাকেচক্রে-প্রচারণায় গোলাম বানানোর প্রশিক্ষণ দিয়েও ঐ স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক দুর্নিবার স্পৃহাকে কিছুদিনের জন্য দমিয়ে রাখা যায় মাত্র। সহযোগিতা-সংহতি-বন্ধুত্বশীলতার বাতাবরণে লড়াই-সংগ্রামের উপযুক্ত বৃষ্টি নামলেই অঙ্কুরিত হয়ে ওঠে স্বাধীনতার বীজ আর মুক্তির ছোট ছোট দানা। আখেরি বিপ্লব বলে কিছু নেই। বিপ্লব প্রতিদিন। বাঁচতে হলে মানুষকে স্বাধীন হতে হবে।

এখানেই আমাদের সাহিত্য-সচেতন বন্ধুদের দিক থেকে এই উপলব্ধির দরকার আছে বলে আমার বিশ্বাস যে, তথাকথিত সাহিত্য আর রাজনৈতিক মতাদর্শের নানান তত্ত্ব-কাঠামোর চিন্তা-দাসত্ব আমাদের উদ্যমকে পঙ্গু করে দেয়। সেগুলোর আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারাটা তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাধীন মানুষের স্বাধীন সাহিত্য বিকশিত হোক। সাহিত্যের কোনো কিছুই হয়ে ওঠার দরকার নেই। মানুষ তার ইচ্ছা-স্বাধীন সুখ-দুঃখে সাহিত্য করবে এই যথেষ্ট। সাহিত্যে বা অন্য যেকোনো কিছুতে যদি সে সক্রিয় হয়ে ওঠে সেটাই আনন্দের। সাহিত্য মানুষের অকারণের-অপ্রয়োজনের ধন হয়েই থাক, সাহিত্য হয়ে উঠুক মানুষের স্বাধীনতার এলাকা–যদি কিছু কাজও তাকে দিয়ে হয় তো হোক না, আপত্তি করবে কে? তত্ত্ব-মতাদর্শ-ভাবাদর্শ মানুষের চোখে ঠুলি পরায়, তাকে শাসন করে, তার ওপর কর্তৃত্ব খাটায়, তাকে একেপেশে অপযুক্তির গোলাম বানাতে চায়। নানান রকম মতাদর্শের পাশাপাশি খোদ সাহিত্য-মতাদর্শের শাস্ত্রীয় খপ্পর থেকে বেরুতে না-পারলে সত্যিকারের স্বাধীন সাহিত্য রচনা করাটা আদৌ সম্ভব কিনা, আমার সন্দেহ। এ কথা শুধু আমার মুখ দিয়ে বেরুলে অনেকের কানে ‘সিনিক’ শোনাতে পারে, কেননা তত্ত্ব-নামাবলী আর বিদ্যার আলখাল্লা পরা হুজুরদের মতাদর্শিক স্লোগান-কথা শুনে-শুনেই সবাই অভ্যস্ত। তাই যখন দেখলাম, সবাই যা মেনে নিয়েছে সেরকম প্রতিষ্ঠিত সবকিছুকেও দেকার্ত সন্দেহ আর অস্বীকার করতে বলেছেন বলে হাসান প্রচার করছেন, তখনই আমি এই কথাটা তোলা প্রয়োজন বিবেচনা করেছি, ‘সাহিত্য’ ‘সাহিত্য-সমালোচনা’ প্রভৃতি চৌহদ্দিগুলোকে তথা সামগ্রিক সাহিত্য-শাস্ত্রটিকেই সবার আগে সন্দেহ ও অস্বীকার করা দরকার, তারপর অন্য কথা। নইলে তারুণ্যের লড়াই-স্পৃহার একটা বড় অংশ “কিছুক্ষণের মজা”য় পর্যবসিত হয়, “যা আর যাই হোক সাহিত্যের লক্ষ্য হতে পারে না” (সনৎকুমার সাহা, “হাসান আজিজুল হক : ফিরে দেখা”, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ৯৬)।

নির্মমভাবে সর্বপ্রকার তামাশার মুখোশ খসানো সত্যিকারের স্বাধীন বুদ্ধিজীবীর কাজ। ব্যক্তি এবং সমাজ প্রকৃতই স্বাধীন না হলে তিনি নিজের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খান। পরাধীন সমাজের তকতকে তকমাওয়ালা কর্তা-কর্মচারীরা সারাক্ষণ তাঁর দিকে তেড়ে আসতে চায়, তাঁকে ধ্বংস করতে চায়। নিজের স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা আর সুখ বজায় রাখার জন্যই তাই তাঁকে যত বেশি করে সম্ভব এই পরাধীন সমাজে স্বাধীনতার বীজানু ছড়িয়ে দিতে হয়, অক্লান্তভাবে, সর্বপ্রকার ক্ষমতা ও শাস্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হয়, চ্যালেঞ্জ করতে হয়, কর্তৃত্বকে অবৈধ প্রতিপন্ন করে তুলতে হয়। তাঁর জন্য এই কাজ, বোঝাই যাচ্ছে, দেশোদ্ধারের কাজ নয়, পরহিতব্রতী মিশন নয়, ভ্যানগাড-পার্টির রাখালগিরি নয়–এ হচ্ছে নিজেকে বাঁচানোর কাজ, নিজের সন্তানকে বাঁচানোর কাজ।

রচনা: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ২৯শে জুন ২০০৭–২৯শে এপ্রিল ২০০৮
সংযোজন-বিয়োজন ও পরিমার্জনা: ৩০শে জুন ২০০৭–২৯শে মে ২০০৮


পাদটীকা

[১] বর্তমান রচনায় বাঁকা হরফ মানেই হাসান আজিজুল হকের আলোচ্য রচনার উদ্ধৃতি। অন্য কারও উদ্ধৃতির বেলায় উদ্ধৃতি-চিহ্ন ব্যবহৃত হয়েছে। ৩য় বন্ধনীর ভেতরকার অংশ উদ্ধৃতি নয়। একক উদ্ধৃতি-চিহ্ন মানে আক্ষরিক-শাব্দিক অর্থের অধিক বিশেষার্থক বা তীর্যকার্থক বা ইঙ্গিতময় কোনোকিছু, কারও সাথে আলাপচারিতার বা কারও রচনার স্মৃতি থেকে উদ্ধার করা অংশ, অথবা হাল আমলের বাংলা ভাষা-সাহিত্যে প্রচলিত বাক্যবন্ধ বা বাগধারা জাতীয় কিছু ইত্যাদি ইত্যাদি।

[২] প্রথম আলো বর্ষসেরা বই ১৪১২-র পুরস্কার পেয়ে হাসান বলেছিলেন: “এ অনুষ্ঠানের সঞ্চালক [সাজ্জাদ শরিফ] … বলে গেলেন যে লেখকেরা দেশের সমাজের ভেতরে শিরা-উপশিরার মতো বিচরণ করেন, আমাদের স্বপ্ন জাগান — এইগুলো সাহিত্য সম্পর্কে বলতেই হয়। তার চেয়ে আনন্দের কথা হচ্ছে, আমরা যারা লিখি, মাঝে মাঝে আমাদের অন্নপ্রাপ্তির কিছু সুবিধে হয় আর কি। এইটা কিন্তু সত্যি কথা। তারপর কার শিরা-উপশিরায় কী স্বপ্ন জাগানো হয় সেটা জানি না। বরং আজকাল এটাই মনে হয় যে লেখা অবশ্যই ছেড়ে দেওয়া উচিত …।” হাসান আজিজুল হক (২০০৭-ক) পুরস্কার পেলে ‘অন্নপ্রাপ্তির কিছু সুবিধে’ যে হয়, সেটা পুরস্কারের অন্যতম অর্থনৈতিক দিক — গ্রহীতার তরফে, কিন্তু দাতারও তরফে ‘অন্নপ্রাপ্তির কিছু সুবিধে’ হয় কিনা সেটাও পুরস্কারের অন্যতম অর্থনৈতিক দিক — দাতার তরফে। এ-ছাড়া পুরস্কার-মাত্রই যে বড়রা ছোটদেরকে দেয়, পুরস্কার মাত্রই যে স্বীকৃতি প্রদানের ব্যাপার, পিঠ চাপড়ানো আর বাহ্বা দেওয়ার ব্যাপার — সেটা পুরস্কারের প্রধান রাজনৈতিক দিক। একটু ভাবতে গেলেই বোঝা যায়, পুরস্কারের রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতির আরো অনেক অনেক দিক আছে। সেসব আলাপ এখানে এখন নয়। কিন্তু দ্রষ্টব্য: হাসান শুধু নিজের ‘অন্নপ্রাপ্তি’র দিকটাই দেখলেন। আরও দ্রষ্টব্য এই যে, পুরস্কার হাসানের জন্য নতুন কিছু নয়: “এর থেকে সৌভাগ্যের ব্যাপার আর কী হতে পারে” যে নবম শ্রেণীতে পড়ার সময়েই তিনি “রাজার নজরে” পড়েছিলেন (মলয় ভৌমিক, ২০০৮: ৫)। তারপর থেকে রাজা আদমজী, রাজা ফিলিপ্স্, রাজা আনন্দবাজারের ক্রমশ দীর্ঘায়মান তালিকা তাঁর নাম-যশ-’অন্নপ্রাপ্তির সুবিধা’কে বিশদ করেছে ঠিকই, কিন্তু লেখালেখি দিয়ে “কার শিরা-উপশিরায় কী স্বপ্ন” জাগানো যায়, না-যায় সেই সংক্রান্ত অসুবিধাকে কোনোদিন বিশদ করতে পারে নাই, সেটা তাঁর কাছে কথার কথা মাত্র, “এইগুলো সাহিত্য সম্পর্কে বলতেই হয়। তার চেয়ে আনন্দের কথা হচ্ছে, আমরা যারা লিখি, মাঝে মাঝে আমাদের অন্নপ্রাপ্তির কিছু সুবিধে হয় আর কি।” হাসানের এই অবস্থার নোট নিয়ে রাখা যাক; পরে এ-বিষয়ে বলা যাবে।

[৩] হাসানের আজিজুল হকদের কালে, তাঁরা যখন সাহিত্যিক হিসেবে বেড়ে উঠছিলেন, মার্কসবাদ-বিপ্লব-কমিটমেন্ট প্রভৃতি যুগের ধর্ম। এমনকি আশির দশক পর্যন্তও এই অবস্থা অবারিত ছিল। হাসানেরই কথা থেকে তার দলিল দাখিল করা যায়:

    … মার্কসবাদ এখন একটা ফ্যাশান। সবচেয়ে বড়ো দুর্বৃত্ত, সবচেয়ে বড়ো শোষক, সবচেয়ে বড়ো ভ- ফেরেববাজ ঠোঁটে তুলে নিয়েছে মার্ক্সের নাম, গলায় পরেছে মার্ক্সের কণ্ঠীমালা। মার্ক্সের চেয়েও বড়ো মার্ক্সবাদীতে দেশ ছেয়ে গেছে। ধনীর ড্রয়িংরূম, আমলার অফিস, সেনাপতির বন্দুক, অধ্যাপকের টেবিল, নেতার মঞ্চ আজ মার্ক্সের নামে উচ্চকিত। (সাক্ষাৎকার/৫, হাসান আজিজুল হক : নূরুল কবির, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ৮৩)

[৪] হাসানের আজিজুল হকদের সমকালের বাংলাদেশের লেখক-সাহিত্যিকদের মধ্যে অনেকেই, বলতে গেলে প্রধান অংশটাই, ছিলেন বিঘোষিত মার্কসবাদী। তাঁদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত মার্কসবাদী সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক নিজে। এখন মাত্র দুই দশকের মধ্যে দিনকাল এত পাল্টেছে যে হাসান যে বড়োসড়ো মার্কসবাদী তাঁরও হয়ত প্রমাণ হাজির করতে হবে। নিচের উদ্ধৃতিগুলো যথেষ্ট বিবেচিত হবে কিনা কে জানে।

কিন্তু উদ্ধৃতিগুলো পেশ করার আগে বলে রাখি, দিনকালের এই পরিবর্তন ভালো না খারাপ, সেটা স্বতন্ত্র প্রশ্ন। মহাকর্তৃত্বপরায়ণ ও আমলাতান্ত্রিক বলশেভিক-সমাজতন্ত্র মানুষের দাসত্বেরই নামান্তর, সেটা বলশেভিকদের উদ্ভবের অনেক আগে বাকুনিন প্রমুখ মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্রী, তথা নৈরাজ্যবাদীরা, যুক্তিপূর্ণভাবে অনুমান করেছিলেন। পৃথিবীব্যাপী সত্তর বছরের বলশেভিক-বাস্তবতা সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাইয়েছে। আমাদের দেশে আমরা অনেকেই মুখস্ত মতাদর্শের অন্ধ দাসত্ব করেছি, কেউ মরেছি কেউ জীবনবাজি ধরেছি, তাতে জনগণের এবং সমাজের অবস্থা বদলায় নি, নেতারা অনেকেই অনেক কিছু আয় করেছেন, বিদেশ ঘুরেছেন। সেসব আলোচনার জায়গা এই প্রবন্ধ নয়। উঠতে-বসতে-মার্কসবাদের সেই দিন নাই বলে আমি আক্ষেপ করছি বলে পাছে কেউ ভাবেন, তাই টিপ্পনী কেটে রাখলাম।

আরো একটা কথা। নিচে, এবং এই প্রবন্ধের অন্যত্র, মার্কসীয় মতাদর্শ সম্পর্কে হাসানের যেসব উদ্ধৃত পাওয়া যাবে, সেগুলো বিশ্লেষণ করলে মার্কস আর তাঁর চিন্তাভাবনা-কর্ম — তথা ‘বিজ্ঞান’ — সম্পর্কে হাসান প্রমুখ বলশেভিক সমাজতন্ত্রীদের বিপ্লব-সমাজতন্ত্র-সমাজপরিবর্তন প্রভৃতি সংক্রান্ত ধ্যানধারণার অনেক কৌতূহলোদ্দীপক ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক অনুধাবন করা যায়। বাংলাদেশে বলশেভিক-বামপন্থা বা ডানপন্থী বামপন্থার চিন্তাচর্চার ইতিহাস রচনা করার জন্য এই ধরনের বিশ্লেষণ অতীব জরুরী, কিন্তু সেই কাজ আলাদা কোনো প্রবন্ধের কাজ। এদেশে ‘মার্কসবাদ/বিজ্ঞান’ যে কতবড় ডগ্মা ছিল তা নিচের পাঁচটি উদ্ধৃতি থেকেও আঁচ করা যায় (যাঁরা এখনও বলশেভিক-বাম তাঁরা কী আঁচ করবেন, তা অবশ্য আমার অনুমানের বাইরে; আমি কিন্তু মার্কসকে খারিজ করছি না, তাঁকে ডগ্ম্যাটিকও বলছি না, তাঁকে বরং মুক্তিমুখীন সমাজতন্ত্রী হিসেবে পাঠ করার গুরুত্বপূর্ণ অবকাশই আছে, অনেক প্রশ্নে তাঁকে গ্রহণ না-করার অবকাশও আছে):

এক) মানুষের সভ্যতার ইতিহাসটাকে সামনে রেখে মার্ক্স্ মানুষের সমাজের বিকাশের ধারাটাকে বুঝতে চেষ্টা করেছিলেন এবং সেই বিকাশের নিয়মগুলোকে সূত্রবদ্ধ করে একটা বিজ্ঞানের ভিত্তিস্থাপন করেছিলেন। (সাক্ষাৎকার/১, হাসান আজিজুল হক : সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ২৮)

দুই) … হ্যাঁ আমি স্পষ্টই বলবো মানুষকে দেখার, মানুষের সভ্যতাকে দেখার, সমাজ এবং মানুষের ইতিহাসকে দেখার এ পর্যন্ত যত দৃষ্টিভঙ্গী আমরা পেয়েছি, তার মধ্যে মার্কসীয় মতবাদই সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক। (সাক্ষাৎকার/৪, হাসান আজিজুল হক : শাহাদুজ্জামান, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ৫৮)

তিন) আসলে মার্কস আমাদের দিয়েছেন একটা বিজ্ঞান। সমাজ পরিবর্তনের নিয়মগুলির অনুসন্ধান করতে গিয়ে, বিশেষ করে পুঁজিবাদী সমাজের পটভূমিতে সমাজের জঙ্গমতার মূল নিয়মগুলি বুঝতে গিয়ে তাঁকে গড়ে তুলতে হয়েছে সমাজ-পরিবর্তন সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান; এই বিজ্ঞান ব্যবহার করে আমারা [আমরা] এখন তুলনায় অনেক ভালোভাবে, সমগ্রভাবে রাষ্ট্র ও সমাজকে বুঝতে পারি, সভ্যতা ও সংস্কৃতি-কে বিশ্লেষণ করতে পারি, সাহিত্য-শিল্পের গতি-প্রকৃতি অনুধাবন করতে পারি। (সাক্ষাৎকার/৫, হাসান আজিজুল হক : নূরুল কবির, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ৮৩)

চার) সমাজবিকাশের সূত্রগুলি বিজ্ঞানের নিয়মে পাবার চেষ্টা করে মার্কসীয় তত্ত্ব এবং এই কারণেই মার্কসবাদ ডগ্মা নয়। (সাক্ষাৎকার/৫, হাসান আজিজুল হক : নূরুল কবির, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ৮৪)

পাঁচ) … আমরা যখন এই বাস্তব সমাজের বিভিন্ন দ্বন্দ্ব ও সম্পর্কগুলোর আলোকে আমাদের জীবনকে দেখবার চেষ্টা করি এবং সেই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণকে যখন সাহিত্যে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করি তখন সেই সাহিত্য একদিক থেকে মার্কসীয় সাহিত্য হয়ে ওঠে। … যদি মোটা দাগে মার্কসীয় সাহিত্যের লক্ষণ কি জিজ্ঞেস করেন তাহলে বলতে পারি, মার্কসীয় সাহিত্যে মানুষের জীবনকে তার সত্যস্বরূপে হাজির করবার চেষ্টা থাকে। (সাক্ষাৎকার/৪, হাসান আজিজুল হক : শাহাদুজ্জামান, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৮৮৮: ৫৮)

[৫] হাসানের প্রকাশক তরফ জানাচ্ছেন: “বঙ্কিম, তারাশঙ্কর, শিবরাম, নজরুল, আবুল ফজল থেকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, নাজিম মাহমুদ হয়ে মানবমুক্তি, সাম্প্রদায়িকতা, শিক্ষা, চলচ্চিত্র, সব কিছুই তাঁর ভাবনার বিষয়।”(হাসান আজিজুল হক, ২০০৩; মলাটের ফ্ল্যাপ থেকে) এত কিছু যাঁর ভাবনার বিষয় তিনিও নাতিদীর্ঘ লেখক বৈকি! এই গ্রন্থের দুইটা মাত্র জিনিস দশ পাতা পেরিয়েছে, তা-ও বারো পাতা পেরোয় নি। তাঁর আরও তিনটা প্রবন্ধ-নিবন্ধ ইত্যাদির সংকলন (হাসান আজিজুল হক, ১৯৮৮, হাসান আজিজুল হক, ১৯৯৪, হাসান আজিজুল হক, ১৯৯৮) পাতা গুনে দেখলাম। বেশিরভাগ লেখাই ঐ নাতিদীর্ঘই বটে।

[৬] ফরহাদ মজহারের এসব লেখালেখির একটা মোকাবেলা তখন থেকে আমার মাথায় চড়ে ঘুরে বেড়ালেও পারিপার্শ্বিক পৃথিবীর হাতে নাজেহাল হয়ে আমি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ থেকে গেছি, মাথা থেকে মাটিতে তাঁকে এখনও নামাতে পারি নি। দেখা যাক ভবিষ্যতে পারি কি না।

[৭] হাসানদের হতাশার ব্যাপারটা কিন্তু প্রথম আলো পত্রিকার সাংবাদিকেরা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই: ১৪১২’-র পুরস্কার দেওয়ার অনুষ্ঠানে হাসান আজিজুল হক এবং গোলাম মুরশিদ যেসব কথাবার্তা বলেছিলেন তাতে করে ঐ অনুষ্ঠানের প্রতিবেদনের শিরোনামেই প্রথম আলো ঘোষণা করে জানিয়েছিল “দেশ নিয়ে হতাশ পুরস্কারপ্রাপ্তরা” (নিজস্ব প্রতিবেদক, ২০০৭)। এ-হতাশা বলতে গেলে সুবিদিত। হাসানদের যুগের বলশেভিক-বাঙালি-বাম ঘরানার বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবীই এই হতাশার শিকার। এঁরা শুধু আক্ষেপ করেন, হা-হুতাশ করেন। জগৎ বদলানোর ব্যক্তিগত যে-দায়িত্ব তা এঁরা আর বোধ করেন না। হাসান-মুরশিদকে দেওয়া পুরস্কার প্রকারান্তরে এই হতাশ হওয়ারই পুরস্কার। উদ্যমহীন, হতাশ, গড্ডল-প্রবাহ-অনুসারী বুদ্ধিজীবীবৃন্দ এবং তাঁদের নাম-ভজনাকারী জনসমষ্টিই কর্পোরেট পুঁজিবাদের কাম্য। প্রতিবেদনটির সংশ্লিষ্ট অংশ এখানে টুকে রাখলে ক্ষতি নেই:

‘পুরস্কার পেতে ভালো লাগে, ভালোই লাগে, খুবই ভালো লাগে।’ সৃজনশীল শাখায় আগুনপাখি উপন্যাসের জন্য ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই: ১৪১২’-র পুরস্কার পেয়ে এই অভিভূত অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। এর পরই তাঁর কণ্ঠে বেজে ওঠে হতাশার সুর। তিনি বলেন, ‘দাঁড়ানোর জন্য মাটি দরকার, কিন্তু মাটি পাওয়ার পর দাঁড়ানোটা তো দরকার।’ বর্তমান কালে মানুষের নানা অবমাননার কথা উল্লেখ করে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি যোগ করেন, ‘আজকাল তো মনে হয় লেখাই ছেড়ে দেওয়া উচিত।’

একই সুর বেজেছে মননশীল শাখায় পুরস্কারপ্রাপ্ত হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি বইয়ের লেখক গোলাম মুরশিদের কণ্ঠেও। বাঙালির বিস্মৃতিপ্রবণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘মাত্র ৩৫ বছর আগে এ দেশে বুদ্ধিজীবীদের যারা হত্যা করেছিল, তারাই আজ পতাকা উড়িয়ে সরকারকে মন্ত্রণা দেয়। …’

হাসানের কি পা নাই? হাসান কি দাঁড়ানোর মাটি খুঁজে পাচ্ছেন না? নিজের পায়ে নিজে সোজা হয়ে দাঁড়ালেই তো হয়! এত ক্ষোভের আর হতাশার কী আছে? আসলে হাসানের জানাই আছে, তাঁর পায়ের নিচ থেকে এতদিনকার বিপ্লব আর মার্কসীয় সাহিত্যের ‘মাটি’ সরে গেছে বলে ‘দাঁড়ানো’র কাজ করাটা তাঁর জন্যে ইদানিং একটু কঠিন, কিন্তু এরই মধ্যে পায়ের তলায় কর্পোরেট কংক্রিটের নতুন মেঝেও যে তৈরী হয়েছে সে-কথা প্রকাশ্যে কবুল করতে পারেন না বলেই কি তিনি অমন ক্ষুব্ধ-কণ্ঠ? আমার মন বলে, প্রাক্তন বিপ্লবী-বিদ্রোহী আত্মসমর্পন করে প্রভুর পদতলে আশ্রয় গ্রহণ করেও যখন মুক্ত কণ্ঠে সকলকে তা জানাতে লজ্জা বোধ করেন, তখন সত্যিই তা খুবই হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি তৈরি করে, কেননা বিদ্রোহী কখনও প্রাক্তন হন না। কথাটা গোলাম মুরশিদের জন্যও হয়ত প্রযোজ্য।

অন্যদিকে গোলাম মুরশিদকে দেখুন। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি নামে কেতাব লেখার জন্য পুরস্কার পাওয়া-মাত্র সেই বাঙালি জাতির চরিত্র উদ্ধার করতে শুরু করেছেন ‘বাঙালির বিস্মৃতিপ্রবণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে’। চারিপাশে এত এত রাজাকার-আলবদর দেখে ঘাবড়ে গিয়ে তিনি নিজে যে হতাশ হয়ে পড়েছেন, তার সব দোষ বাঙালি জাতির। তাঁর নিজের কোনো দোষ নাই, ব্যর্থতা নাই, তিনি নিজে বাঙালিও নন — অতীব জমজমাট যুক্তি-পদ্ধতি, অতীব আশ্চর্য আত্মপ্রতারণা। এজন্যেই বলেছিলাম, এ-প্রবন্ধে শণাক্ত-করা হাসানের বুদ্ধিবৃত্তিক বৈশিষ্ট্যগুলো হাসানের একার নয়, আরো অনেকেরই।

বইপত্রের হদিস

আনু মুহাম্মদ (২০০৮)। কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রথম সংস্করণ। ঢাকা: সংহতি প্রকাশন। (এই বইয়ের প্রথম প্রবন্ধ “সাম্রাজ্যবাদ, ধর্মীয় রাজনীতি এবং বাঙালি মুসলমানের ট্র্যাজেডি” দ্রষ্টব্য।)

আবুল আহসান চৌধুরী (২০০৭)। লালন সাঁইয়ের সন্ধানে। প্রথম প্রকাশ। ঢাকা: পলল প্রকাশনী।

কাজী নজরুল ইসলাম (১৯৯৬), “আমার কৈফিয়ত” (আদি গ্রন্থ: সর্বহারা), নজরুল-রচনাবলী (আবদুল কাদির সম্পাদিত), নতুন সংস্করণের প্রথম পুনর্মুদ্রণ, ঢাকা: বাংলা একাডেমী।

ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক (২০০০)। বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান। পরিমার্জিত সংস্করণ। ডিসেম্বর।

নিজস্ব প্রতিবেদক (২০০৭), “প্রথম আলো বর্ষসেরা বই: ১৪১২ [–] দেশ নিয়ে হতাশ পুরস্কারপ্রাপ্তরা”, প্রথম আলো, ৭ই জানুয়ারি, প্রথম পৃষ্ঠা।

ফরহাদ মজহার (২০০৫-ক), “পল উলফোভিৎজ ও বাংলাদেশে বোমাবাজি” (কলাম: ‘সরল পাঠ’; ট্যাগ: ‘দেশ জুড়ে বোমা হামলা’), প্রথম আলো, ২৫শে আগস্ট ২০০৫ বৃহস্পতিবার ১০ই ভাদ্র ১৪১২, পৃষ্ঠা ১০: ‘সম্পাদকীয়’।

ফরহাদ মজহার (২০০৫-খ), “এদেরকে ক্রিমিনাল বললে দেখা যাবে আমরা ক্রিমিনাল ছিলাম আমরা পলিটিক্যাল না”, আমাদের সময়, ১২ই সেপ্টেম্বর ২০০৫ সোমবার ২৮শে ভাদ্র ১৪১২, ২য় পৃষ্ঠা: ‘মুক্তধারা’, http://www.amadershomoy.com/news.php?id=18764&sys=3|

ফরহাদ মজহার (২০০৫-গ), “সন্ত্রাস, আইন ও ইনসাফ”, চিন্তা, বছর ১৪ সংখ্যা ১, নভেম্বর, পৃষ্ঠা: ৭–২৮।

ফরহাদ মজহার (২০০৫-ঘ), “বোমা সমাজে প্রতিক্রিয়ার পুঁটুলিগুলো ফাঁস করে দিচ্ছে” (কলাম: ‘সরল পাঠ’), প্রথম আলো, ৮ই ডিসেম্বর ২০০৫ বৃহস্পতিবার ২৪শে অগ্রহায়ণ ১৪১২, পৃষ্ঠা ১০: ‘সম্পাদকীয়’।

বদরে মুনীর (২০০৮)। আমরা যারা ভুল করেছিলাম। রাজশাহী: মানুষ নেটওয়ার্ক।

নোম চমস্কি (১৯৯৬)। Powers and Prospects: Reflections on Human Nature and Social Order. London: Pluto Press. বর্তমান লেখকের ব্যবহৃত ই-সংস্করণ: The Electric Book Company Ltd (www.elecbook.com), London।

মলয় ভৌমিক (২০০৮), “হাসান আজিজুল হক: বেড়ে ওঠার টুকরো গল্প”, প্রথম আলো পত্রিকার ‘সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন’ ছুটির দিনে-র ৪৪৪ নম্বর সংখ্যার মূল রচনা (হাসানের আনন্দ পুরস্কার, ১৪১৪ পাওয়া উপলক্ষে আয়োজিত প্রচ্ছদ রচনা), ২০শে বৈশাখ ১৪১৫, শনিবার, ৩রা মে।

মশিউল আলম (২০০৭), “সাহিত্য নিয়ে আমরা কী করব”, প্রথম আলো ‘সাহিত্য সাময়িকী’, ১লা জুন।

কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস (২০০৭)। জার্মান ভাবাদর্শ (ফয়েরবাখ: বস্তুতান্ত্রিক ও ভাবতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধ)। ভাষান্তর: জাকের আহমদ এবং জাভেদ হুসেন। বাংলাবাজার, ঢাকা: বাঙলায়ন।

বিজ্ঞাপনপর্ব (১৯৮৮)। রবিন ঘোষ সম্পাদিত বিজ্ঞাপনপর্ব: মননশীল সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক অপ্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতার ত্রৈমাসিক (হাসান আজিজুল হক সংখ্যা), পঞ্চদশ বর্ষ, সংখ্যা ৩–৪, কলকাতা।

রেনে দেকার্ত (১৬৩৭)। Rene Descartes. Discourse on the Method of Rightly Conducting the Reason and Seeking for Truth in the Sciences. Original Source: Discourse on Method. Cambridge University Press, edited by Haldane and Ross. Quotation retrieved from The Marxist Internet Archives, www.marxists.org/reference/subject/philosophy/works/fr/descarte.htm.

রেনে দেকার্ত (১৬৩৯)। Rene Descartes. Meditations on First Philosophy in which are demonstrated the existence of God and the distinction between the human soul and the body. Quotation retrieved from The Marxist Internet Archives, http://www.marxists.org/reference/archive/descartes/1639/meditations.htm.

শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী (সম্পা.) (২০০৫)। বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান। পরিমার্জিত সংস্করণ। ৬ষ্ঠ পুনর্মুদ্রণ। ঢাকা: বাংলা একাডেমী।

সনৎকুমার সাহা (২০০০)। সমাজ সংসার কলরব। ঢাকা: জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন।

সুকুমার রায় (১৪১০ বঙ্গাব্দ)। সমগ্র শিশুসাহিত্য (সত্যজিৎ রায় ও পার্থ বসু কর্তৃক সম্পাদিত)। পরিমার্জিত সংস্করণ। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স।

সুধীন দত্ত (১৯৯৯), “প্রত্যাখ্যান” (ক্রন্দসী কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত), সুধীন দত্তের কাব্যসংগ্রহ, প্রথম প্রকাশ ১৯৬২, প্রথম দে’জ সংস্করণ: দে’জ পাবলিশিং (পুনর্মুদ্রণ ১৯৯৯), কলকাতা।

সুমন চট্টোপাধ্যায় (১৯৯৩), “নবাব নবাবী করে” (ক্যাসেটের ‘দুই’ নম্বর পাশে তিন নম্বর গান), ইচ্ছে হ’ল: সুমনের গান, (অডিও অ্যালবাম), কলকাতা: দ্য গ্রামোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড (এইএমভি)।

সেলিম রেজা নিউটন (২০০০-ক), “মানুষের কর্তব্য পালন করবে কে”, প্রথম আলো, ‘শুক্রবারের সাময়িকী’, ২০শে ফাল্গুন ১৪০৬, ৩রা মার্চ।

সেলিম রেজা নিউটন (২০০০-খ), “হাসান আজিজুল হকের ‘ভীমরতিপ্রাপ্ত অধ্যাপক’বৃন্দ এবং ‘টাকার দাম যদি এক টাকা হয় তাহলে ওই টাকাটা কেউ কাদা থেকে তুলুক কি মানুষের বিষ্ঠা থেকেই তুলুক দাম তার এক টাকাই থেকে যাচ্ছে’ এবং …”, বিজয়ের আলো: সমাজ, সংস্কৃতি ও যোগাযোগ বিষয়ে গণযোগাযোগ-বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রকাশনা (মুসতাক আহমেদ কর্তৃক সম্পাদিত), ১ম বর্ষ, বিজয় দিবস সংখ্যা, পৃষ্ঠা ৩–১০, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

সেলিম রেজা নিউটন (২০০১), “হুমায়ুন আজাদের ‘কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ’: পুঁজিবাদী সমাজের ক্ষয় ও ক্ষরণ সম্পর্কে একটি আলোচনা”, সপ্তক (প্রফেসর আলী আরেফুর রেহমান কর্তৃক সম্পাদিত), ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা, নভেম্বর, পৃষ্ঠা ২১–৪০, রাজশাহী: ইংরেজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

সেলিম রেজা নিউটন (২০০৩), “বাজারের যুগে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার আম্মু-আব্বু-সমাচার অথবা বাংলাদেশে বিদ্যমান মহাজনী মুদ্রণের পলিটিক্যাল ইকোনমি”, জনপরিসরে গণমাধ্যম অন্যান্য প্রসঙ্গ (কামরুল হাসান মঞ্জু কর্তৃক সম্পাদিত), পৃষ্ঠা ৪৬৭–৫১২, ঢাকা: ম্যাস্‌-লাইন মিডিয়া সেন্টার।

সেলিম রেজা নিউটন (২০০৬), “আত্মঘাতী পরিস্থিতি” (কবিতাগুচ্ছ), দ্রোহ: একুশে সংখ্যা (মিন্টু চৌধুরী সম্পাদিত), বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন চট্টগ্রাম জেলা কমিটির প্রকাশনা, পৃষ্ঠা: ১৬–২২, ২১শে ফেব্রুয়ারি।

হাসান আজিজুল হক (১৯৮৮)। অপ্রকাশের ভার। ঢাকা: ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড।

হাসান আজিজুল হক (১৯৯১)। বৃত্তায়ন। ঢাকা: পেঁচা প্রকাশনা (রুম নং ১২৯ হোটেল গ্রীনলিফ, ১১৭/৪ ডিআইটি বর্ধিত সড়ক, ফকিরাপুল), রাজশাহী: রূপম প্রেস, ঘোড়ামারা।

হাসান আজিজুল হক (১৯৯৪)। কথাসাহিত্যের কথকতা। দ্বিতীয় সংস্করণ। ফেব্রুয়ারি। ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ।

হাসান আজিজুল হক (১৯৯৮)। অতলের আঁধি। ঢাকা: জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন। (দ্রষ্টব্য “মার্ক্‌সীয় দর্শন” প্রবন্ধটি।)

হাসান আজিজুল হক (২০০০-ক), “তরুণ প্রজন্মের সহস্রাব্দ”, প্রথম আলো, ঈদ সংখ্যা, ৬ই জানুয়ারি।

হাসান আজিজুল হক (২০০০-খ), “পথ জুড়ে কি শুধুই কাঁটাবালি?”, প্রথম আলো, ২য় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সংখ্যা, ৪ঠা নভেম্বর।

হাসান আজিজুল হক (২০০৩)। কথা লেখা কথা। ঢাকা: সময় প্রকাশন।

হাসান আজিজুল হক (২০০৫)। আগুনপাখি। ঢাকা: সন্ধানী প্রকাশনী।

হাসান আজিজুল হক (২০০৭-ক), “সাহিত্য নিয়ে আপনারা কী করবেন?” (সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় ‘বক্তৃতা’ হিসেবে মুদ্রিত), প্রথম আলো, ৮ই জানুয়ারি।

হাসান আজিজুল হক (২০০৭-খ), “সাহিত্য সমালোচনা কীভাবে সম্ভব”, প্রথম আলো, ‘সাহিত্য সাময়িকী’, ২৯শে জুন।

salimrezanewton@gmail.com

ওয়েব লিংক
সেলিম রেজা নিউটন: আর্টস

—–
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

শুরুতে ফিরে যেতে ক্লিক করুন
free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (11) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর — december ৩, ২০১০ @ ৬:৪৩ অপরাহ্ন

      সেলিম রেজা নিউটনের লেখাটি ইতোমধ্যে কাকতাড়ুয়ায় পড়েছিলাম। আবার পড়তে পারলাম, ভালো লাগল। খুবই পরিশ্রমী আর দরকারি লেখা। এটি পড়তে পড়তে মনে হয়, লেখক হাসানকে হাসানের প্রতিদ্বন্দ্বী করে ফেলছেন লেখক। একজন হাসান আমাদের কাছে ক্রমশই অচেনা হয়ে যাচ্ছেন না তো? তিনি যে অচেনার প্রক্রিয়ায় আছেন তা এমনিতেই খানিক আঁচ করা যায়।
      তবে এটা স্বীকার করতে হয়, তিনি পুরস্কারের প্রতি যথেষ্ট সদয় ভাব দেখান। তা গ্রহণে কখনও তার অনিহা তো নেইই, বাছবিচারও নাই। সেটা জাতীয় পর্যায়ের বেলা-ই হচ্ছে না, ফিলিপস, আনন্দবাজার, প্রথম আলো ইত্যাদির ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি। তিনি এটাই হয়ত মনে করেন, পুরস্কার হচ্ছে ভালোবাসা, পুরস্কার হচ্ছে স্বীকৃতি।
      আমরা বরং একজন গল্পকারের প্রতিবাদের ধরনসমূহ দেখি? দেশভাগ নিয়ে তার যন্ত্রণার শেষ যেমন নেই, তেমনি তা নিয়ে লেখালেখির প্রাণময়তাও আমরা দেখি। আগুনপাখি, আত্মজা ও একটি করবী গাছ তার অসাধারণ সৃষ্টি। সশস্ত্র বাম আন্দোলনকে তার মতো কেউ চিহ্নিত করেননি, অন্তত বাংলাদেশের কোনো সাহিত্যিক তা করেননি। মুক্তিযুদ্ধের গল্প যেমন আছে, তা যে তেমন কোনো ফলদায়ক বিষয় হবে না, তেমনটিও তিনি বলেছেন।
      আর্মি-শাসন, খালকাটা, ধর্মীয় সন্ত্রাস নিয়ে গল্প লিখেছেন তিনি।
      বরং এও বলা যায়, প্রতিষ্ঠানবিরোধী একধরনের কর্তৃত্বকে তিনি লালন করতে চেয়েছেন। শিল্প-সংস্কৃতির ধরন থেকে সমাজতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রকে তিনি পছন্দ করেছেন।
      এখন কর্পোরেট পুঁজির কাল_এখন সুশীল সমাজের কাল, সামরিক-বেসামরিক এলিটিজমের কাল, এবং এইসবকে তিনি একেবারে ভুলে থাকছেন, তাও বলা যায় না।
      তিনি এসবের ভিতর নিজের কনফিডেন্স বিল্ডাপ করতেই পারেন। সেটাই তিনি হয়ত লালন করছেন, আমাদেরকে স্মরণও করাচ্ছেন। গুরুবাদিতার এ-কালকে আমাদের স্মরণও রাখতে হচ্ছে!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Muhit Hssan Digonta — december ৩, ২০১০ @ ৭:৫১ অপরাহ্ন

      অক্ষমের আস্ফালন আর কত দেখবো! আপনি কী ”প্রথম আলোর” পুরস্কার পেলে ছাড়তেন? আমি নিশ্চিত না। আপনিও “এসটাব্লিশমেন্টের” বাইরে যান নি। ও এত বড় তাই তার নিন্দা আমি করবই রে, এরকম ভাব ছাড়ুন। জগতে ভাবের অভাব পড়ে নি, তাই এই ভাব নেওয়াটা একটা অপরাধের সমতুল্য।

      – Muhit Hssan Digonta

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন maruf raihan — december ৪, ২০১০ @ ১২:৩০ পূর্বাহ্ন

      লেখককে ধন্যবাদ।

      মারুফ রায়হান
      অনলাইন ম্যাগাজিন বাংলামাটি

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মহিউদ্দিন খান খোকন — december ৮, ২০১০ @ ৪:১৯ অপরাহ্ন

      সেলিম রেজা নিউটনের বিশাল লিখাটি পড়বার চেস্টা করলাম। হাসান আজিজুল হকের একটি বক্তব্যের উপর তার এই সমালোচনা মূলক দীর্ঘ গবেষণা পড়ে বিস্মিত হয়েছি। লিখাটি পড়ে প্রথমে মনে হয়েছে সেলিম রেজা নিউটন নিশ্চয়ই একজন বিশাল পন্ডিত তা নাহলে হাসান আজিজুল হকের এরকম সমালোচনা করবার ধৃষ্টতা পান কোথায়। আমি ভাবছি এত বড় পণ্ডিতের কোন লিখা আমি কোথাও পেলাম না–পড়লাম না, এ আমার ব্যর্থতাই হবে। কৌতূহলী হলাম তার পরিচয় জানবার জন্য, দেখলাম তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, এবং এক সময় বাম রাজনীতি করতেন। জনাব নিউটনকে অনুরোধ করবো কোনো সূত্র আবিষ্কার করবার আগে দয়া করে হাসান আজিজুল হকের উপন্যাস-গল্প-প্রবন্ধগুলো পড়ুন, আরো জানুন তারপর গবেষণা করুন। বাংলা সাহিত্যে হাসান আজিজুল হকের অবদান, অবস্থান এতই শক্ত যে নিউটনের ধাক্কায় একচুলও নড়বে না। আর ব্যক্তি হাসান আজিজুল হককে চিনতে চাইলেও তাঁর কাছেই যেতে হবে আপনাকে। আপনি নিজেকে কি মনে করেন জানি না তবে একজন বিখ্যাত গুণীজন সম্পর্কে মন্তব্য করার শালীনতাটুকুও আপনার নাই। আমরা যতটুকু জানি হাসান আজিজুল হক কোন দিন পুরস্কার পাবার জন্য লেখেন না, নিজে সারা জীবন নেপথ্যে থেকেই কাজ করতে পছন্দ করেন। পুরস্কার তার চেহারা দেখে কিংবা খ্যাতি দেখে নয়–তাঁর সৃস্টি দেখে দিতে বাধ্য হয়েছেন। আপনি হয়তো জানেন না তিনি জাতীয় পুরস্কারও প্রত্যাখান করেছেন তাঁর বলিস্ঠ ব্যক্তিত্বের কারণেই। সুতরাং একজন হাসান আজিজুল হক কিংবা গোলাম মুর্শিদ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করবার আগে নিজের দিকে তাকান।

      বিডিনিউজ২৪ ডট কমের সম্পাদক ২০০৮ সালের একটি পুরাতন বিতর্কিত লিখা এতদিনপর কেন প্রকাশ করলেন বোঝা গেল না। আমরা বিডিনিউজ২৪-এর নিয়মিত পাঠক, ভালো লিখা দেখতে চাই।

      – মহিউদ্দিন খান খোকন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন salman tareque — december ১০, ২০১০ @ ১২:০৬ পূর্বাহ্ন

      এটা আমাদের ব্যক্তি পুজার নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা । একজনকে শ্রদ্ধা করতে করতে ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে ঘোরতর প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ করা। তার সমালোচনা করলে সহ্য না করে একজনের সুন্দর পরিশ্রমকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিই। এটা আমাদের নেতিবাচক এতিহ্য। যাক, জনাব মহিউদ্দিন নিউটনকে সাজেশন দিতে গিয়ে হাসান আজিজুল হকের মতোই সিদ্ধান্তমূলক আচরণ করেছেন।‍‌‌ ‍‍‍‌”সশস্ত্র বাম আন্দোলনকে তার মতো কেউ চিহ্নিত করেননি, অন্তত বাংলাদেশের কোনো সাহিত্যিক তা করেননি।” জনাব কামরুজ্জামান জাহাংগীর, আপনি কি জাকির তালুকদার পড়েছেন। অবশ্যই পড়েছেন। অন্তত একজন গল্পকার হিসেবে তো অবশ্যই। তার হাঁটতে থাকা মানুষের গান, গল্পসমগ্র পড়েছেন নিশ্চই। দেখবেন তাতে বাম আন্দোলন কিভাবে এনেছেন, এনেছেন তার সশস্ত্রতার কথা।
      ” তবে এটা স্বীকার করতে হয়, তিনি পুরস্কারের প্রতি যথেষ্ট সদয় ভাব দেখান। তা গ্রহণে কখনও তার অনিহা তো নেইই, বাছবিচারও নাই। সেটা জাতীয় পর্যায়ের বেলা-ই হচ্ছে না, ফিলিপস, আনন্দবাজার, প্রথম আলো ইত্যাদির ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি। তিনি এটাই হয়ত মনে করেন, পুরস্কার হচ্ছে ভালোবাসা, পুরস্কার হচ্ছে স্বীকৃতি।”
      জনাব কামরুজ্জামান জাহাংগীর, আমাদের স্বাধীনতার পর থেকে কিছু লেখক, প্রবন্ধকার, অধ্যাপক আছেন যারা সকল সময় সবার বিরুদ্ধে কথা বলেন,লিখেন, কথায় কথায় মার্কস আনেন, জনগণের কথা বলেন, বিপ্লবের কথা বলেন; কিন্তু কেউ তাদের কিছু বলেন না, । তারা দিব্যি ছয় বেলা পেটপুরে ভাত খান, শেরাটনে বৈঠক করেন অথবা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে মোটা অংকের বেতনে রাতে হুইস্কি টেনে খবরের কাগজে বিপ্লবের কথা বলেন। তাতে সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্যবাদী, এদেশীয় দোশর কেউ রাগ করেন না, সরকারও কিছু বলেনা। কারণ কি জানেন – তিনি এটাই হয়ত মনে করেন, পুরস্কার হচ্ছে ভালোবাসা, পুরস্কার হচ্ছে স্বীকৃতি।”(কামরুজ্জামান জাহাংগীর)।
      “লিখাটি পড়ে প্রথমে মনে হয়েছে সেলিম রেজা নিউটন নিশ্চয়ই একজন বিশাল পন্ডিত তা নাহলে হাসান আজিজুল হকের এরকম সমালোচনা করবার ধৃষ্টতা পান কোথায়। আমি ভাবছি এত বড় পণ্ডিতের কোন লিখা আমি কোথাও পেলাম না–পড়লাম না, এ আমার ব্যর্থতাই হবে। ”
      জনাব, মহিউদ্দিন খান খোকন , কারও সম্মন্ধে কিছু বলতে চাইলে পন্ডিত হওয়া লাগেনা। একজন মানুষ মাত্রেই বলার অধিকার তার প্রাপ্য। লেখক লিখে যাবেন, তারকা হবেন, তাকে কিছু বলা যাবে না,এটা মধ্যযুগীয় হিংস্রতা। তাকে না বলতে অনুরোধ করা হল ধৃষ্টতা। জনাব, ভালো লেখা কি হাসান আজিজুল হকের আত্মস্মৃতিমুলক বই? নাকি সাক্ষাৎকার? নাকি রাস্তায় দেখা ঘটনার পরম্পরা বলা।
      নিউটনের লেখা আমিও কাকতাড়ুয়ায় পড়েছি্ । লেখাটার পুন:মুদ্রন এজন্যই দরকার ছিলো, আপনারা পড়বেন, আমরা পড়বো, অনেকে পড়বে। কথিত ইন্টেলেকচুয়াল সাহিত্যিক সম্পর্কে বেশী মানুষ জানবে। খেটে খাওয়া মানুষের টাকায় কত লোক কি উপায়ে বাণিজ্য করে তা একটু জানা প্রয়োজন বৈকি। সারা জীবন বিপ্লব করে প্রতিক্রিয়াশীলদের টাকা খেয়ে জীবন যাপন করা, বাংলালিংকের এ্যাড করে লাখ টাকা কামানো, ফ্যাসিস্টদের সাথে রুটি রুজির ফায়সালা করা কথিত বিপ্লবীদের কথা সবাই জানে। তাই এই লেখার দরকার, আরও বেশী দরকার। তবুও কি আসে যায় ? কিন্তু আশা হারাই না। আমাদের সামনে ইলিয়াছ আছে, ছফা আছে, শহিদুল্লাহ , আনু মুহাম্মদ আছে। বিপ্লবী ইন্টেলেকচুয়াল নয়, অধিকার সচেতন বিপ্লবী অনেক ভালো। সবাইকে ধন্যবাদ। ও লেখককেও ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন salman tareque — december ১০, ২০১০ @ ১২:০৯ পূর্বাহ্ন

      জনাব নিউটনকে বলব, এরকম সকল লেখকদের নিয়ে লিখুন। সাহিত্য এখন মাফিয়াদের হাতে। এটা চলতে দেয়া যায় না।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন aziz hashan — december ১১, ২০১০ @ ৮:২৬ অপরাহ্ন

      সালমান ভাই ঠিক কইছেন বলে মনে হইতেছে, তয় একটি অভিভাষণ নিয়ে বক্তৃতামালা তুলে এ ধরনের ভণ্ড (নিউটন ও আপনার মতে) লেখকদের স্বরূপ উন্মোচনের চেয়ে হাসান আজিজুল হকের লেখার (গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ) মধ্যে বৈপরীত্যমূলক অবস্থান চিহ্নিত করে দেখালে সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে চোখে ক্লান্তির বদলে স্বস্তি বোধ করতাম। একজন লেখকের কোনো একটি বা দুটি জায়গায় তুলে ধরা তাৎক্ষণিক বক্তব্য ও মন্তব্য দিয়ে তাঁকে বিবেচনা করা যায় বলে আমার জানা নেই। জানি না আপনি সাহিত্যিক বা সাহিত্য সমালোচক কিনা, তবে সেলিম রেজা নিউটন এ দুটোর কোনোটাই নন বলে জানি। তাই কোনো লেখকের নামে এভাবে এলোমেলো সূত্রের উল্লেখে সমালোচনা বা আলোচনা করে হয়তো বাজারে বেশ হাততালি পাওয়া যায়। তবে তা যা নিয়ে লেখকের এত ব্যথার পরিচয় তুলে ধরে সেই সাহিত্যের কোনো কাজে আসে না। তাই দয়া করে হাসানের লেখা ধরে সমালোচনা করলে বাংলা সাহিত্যের লোকজন হয়তো মৌলিক কিছু পেতে পারে। শুধু শুধু একজন লেখককে নিয়ে এতোবড় প্রবন্ধের অবতারণা পাঠকের ক্লান্তি বিরক্তি স্পষ্ট করে। আর দুঃখজনক হলেও মনে করিয়ে দেয়, হাসানের মতো জনপ্রিয়তা বা পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্খা নিয়েই কি তবে প্রাবন্ধিকের এতো তত্ত্ব-উপাত্ত ও তথ্যের আমদানি?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অনার্য ফরহাদ — december ১২, ২০১০ @ ৯:৫০ অপরাহ্ন

      প্রতিক্রিয়া লেখার ধৃষ্টতা প্রদর্শনে বরাবরই আমি অপারগ। কিন্তু পাঠক সালমান তারেকের প্রতিক্রিয়া দেখে নিজেকে সামলে রাখতে পারলাম না। মনে হলো কিছু একটা লেখা দরকার। নিজের আত্মার খানিকটা স্বস্তির জন্য। ভনিতা ছেড়ে মূলে যাই।

      সালমান তারেক বলেছেন, আমাদের জাতির দর্পন সাহিত্য তাঁর দৃষ্টিতে মাফিয়াদের কবলে চলে গেছে। কথাটা আমার গায়ে কেমন যেন কাটা মতো বিঁধেছে। তাই এই লেখা। তারেকের অবগতির জন্য বলছি, আপনার এই কথাটা সাহিত্য চর্চাকারীদের হৃদে কিছুটা হলেও দাগ কেটেছে। আপনি সাহিত্যকে মাফিয়া চক্রের কবলে চলে গেছে বলে, বাংলার লেখকদেরকে হীন দৃষ্টিতে দেখেছেন তো বটেই। পাশাপাশি দেশের সাহিত্যকে অবজ্ঞা করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। এটা কতোটা যুক্তিযুক্ত হয়েছে ভেবে দেখবেন।

      নয়তো এমন কথা বলার যথোপযুক্ত কারণ দর্শাবেন বলে আশা করছি। এ বিষয়ে আপনার নীরবতা অনুতপ্ত হওয়াকেই প্রমাণ করবে বলে মনে করি।

      – অনার্য ফরহাদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অনার্য ফরহাদ — december ১২, ২০১০ @ ৯:৫৯ অপরাহ্ন

      আপনার এই কথাটা সাহিত্য চর্চাকারীদের হৃদে কিছুটা হলেও দাগ কেটেছে। আপনি সাহিত্যকে মাফিয়া চক্রের কবলে চলে গেছে বলে লেখকদেরকে হীন দৃষ্টিতে দেখেছেন তো বটেই, পাশাপাশি দেশের সাহিত্যকে অবজ্ঞা করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। এটা কতটা যুক্তিযুক্ত হয়েছে ভেবে দেখবেন। নয়তো এমন কথা বলার যথোপযুক্ত কারণ ব্যাখ্যা করবেন বলে আশা করছি। এ বিষয়ে আপনার নীরবতা অনুতপ্ত হওয়াকেই প্রমাণ করবে বলে মনে করি। আমাদের দেশে এটা জনপ্রিয়তার অস্ত্র হয়ে গেছে। বিতর্ক উস্কে দিয়ে সাহেবধন আর মাঠে থাকেন না। তো আশা করি এই মাফিয়া বিষয় অচিরেই আমাদের কাছে পরিষ্কার করবেন।

      – অনার্য ফরহাদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন CHONDON ANWAR — december ১৩, ২০১০ @ ১১:৫৪ পূর্বাহ্ন

      সুলেখক নিউটনের লেখাটিতে যে মন্তব্য ও বক্তব্য দিয়েছেন তার সাথে খুব বেশি একমত হতে পারা না গেলেও, অনেক ক্ষেত্রে সত্যতা ও যুক্তিবদ্ধতা অনস্বীকার্য । তবে হাসান আজিজুল হকের টোটাল সাহিত্যের সাথে আমার নিবিড় পাঠ ও যৎসামান্য কিছু লেখালেখির সুবাদে আমার ভিতরে যে হাসান সম্পর্কে চিন্তার ভীত্ (ঠিক/বেঠিক প্রশ্ন তুলছি না) জন্মেছে, তাতে নিউটনের লেখাটি সে অর্থে আমার কাছে শুধূই প্রতিক্রিয়াশীল মনে হয় নি, রীতিমত কোমর ঝগড়া মনে হয়েছে, অধিকন্তু হাসানের কারিশমাটিক চরিত্র ও মেজাজকেও তিনি ধরতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। দেশভাগ থেকে স্বাধীনতা, স্বাধীনতা থেকে স্বৈরশাসন- তাঁর মত এতো রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে ক’জনের ভিতরে? সন্তান যদি চিৎকার করে মাকে বলে, ‌‍তুই আমার মা না। তবে কি ধরে নেওয়া যায় যে, সন্তান মাকে অস্বীকর করছে। বরং মায়ের কাছে দাবি করে কিছু না পেয়ে ক্ষোভে মায়ের উপরেই আরো জোর খাটিয়েছে। জীবনকে সাহিত্যের জন্য শহীদ করেছেন যে মানুষটি, তিনি যখন বলেন, সাহিত্য দিয়ে কী হবে? তবে ধরে নিতে হবে প্রজন্ম হিসেবে আমরাই নিদারুণ ব্যর্থ। তার দ্রোহের ভাষাও আমাদের দশজনের বাইরের ভাষা। ফের বলছি, হাসান আজিজুল হকের সম্পর্কে লেখকের মন্তব্যগুলো সুপ্রযুক্ত না হলেও সুলেখা হয়েছে বটে। এবং লেখকের পরিশ্রমকে সাধুবাদ জানাই। আমি হাসান আজিজুল হকের উপরে থিসিস করছি। লেখক যদি অনুগ্রহ করে আমাকে মেইল করেন উপকৃত ও কৃতজ্ঞ হবো। চন্দন আনোয়ার, এম ফিল ফেলো, আই বি এস, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ০১৭১৬১৯৫৭১৭

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোজাফফর হোসেন — december ১৩, ২০১০ @ ৭:১৮ অপরাহ্ন

      লেখাটি আজই আমি প্রথম পড়লাম। সেলিম রেজা নিউটন-এর সাথে মতের কিছুটা সংঘাত ঘটলেও বলতেই হচ্ছে অতি দরকারী লেখা এটা। লেখকদেরকে একটু ভিন্নভাবে খতিয়ে দেখার বড় উপযুক্ত সময় এখন। সেলিম রেজা নিউটনকে ধন্যবাদ।

      আর পুরস্কার গ্রহণ করাকে আমি অন্যায় মনে করি না–সে ছোট বড় যাই হোক না কেন! তবে এই পুরস্কারের কারণটা ভালো করে উপলব্ধি করতে হবে বৈকি।

      মোজাফফর হোসেন
      সম্পাদক, শাশ্বতিকী
      রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com