নজরুলসঙ্গীতের নবজন্মে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা

বাবু রহমান | ২৭ আগস্ট ২০১০ ৮:৪২ অপরাহ্ন

nazrul-112.jpg
নজরুল ইসলাম (২৫/৫/১৮৯৯ – ২৯/৮/১৯৭৬)

ছন্দ ও নবরসের দিক থেকে বাংলা গানের ইতিহাসে সবচে শক্তিশালী, ঋদ্ধ ও ওজঃগুণসম্পন্ন গান কাজী নজরুল ইসলামের। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ-চল্লিশ দশকের এমন কোন শিল্পী নেই যিনি নজরুল সঙ্গীত গাননি। বাংলা গানে প্রাক-নজরুল গীতিকবি ও সুরকার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন ও অতুল প্রসাদ সেন। এঁরা প্রত্যেকেই এক এক জন সার্থক স্রষ্টা। প্রাগুক্ত চারজন স্রষ্টাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন নজরুল। নজরুল গুরু রবীন্দ্রনাথকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। শুধু গানের সংখ্যাধিক্যে নয়।সুরের বাঁধ ভাঙা জোয়ারে ডিস্ক, বেতার (১৯১৯), সবাক চলচ্চিত্র (১৯৩১), মঞ্চ নাটক, পত্র-পত্রিকাসহ গণমাধ্যমকে ভাসিয়ে সয়লাব করে দিয়েছিল তাঁর গান।

—————————————————————-
‘নবযুগ’ পত্রিকায় কবি তখন স্বাক্ষরযুক্ত সম্পাদকীয় লেখেন। এক সংখ্যায় লিখলেন ‘পাকিস্তান না ফাঁকিস্থান?’ আর যায় কোথায়, ভীমরুলের চাকে ঢিল ছোঁড়া ছাড়া আর কী? তরুণ এই পাকিস্তান আন্দোলনকারীরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন।… আক্রমণের পর ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি কবি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। তার পিঠে সেই আঘাতের চিহ্ন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কবি বহন করছিলেন। বাংলাদেশে কবির ব্যক্তিগত সহকারী শফি চাকলাদার সেকথা অকপটে স্বীকার করেছেন। ছবি তুলে রেখেছেন, কিন্তু কাউকে দেননি।… লুম্বিনী হাসপাতালে শেকল দিয়ে বেঁধে, লোক-আড়ালে কবিকে নিঃশেষ করে দেয়া হলো।
—————————————————————-
নজরুলের শিষ্য হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন চিত্ত রায়, জগৎ ঘটক, সন্তোষ সেনগুপ্ত, দুর্গা সেন, কমল দাশগুপ্ত, রঞ্জিত রায়, গিরীণ চক্রবর্তীসহ আরও অনেকে। আর এঁদের সেই সৃষ্টিকে ধরে রেখেছিলেন সে সময়ের কণ্ঠশিল্পীবৃন্দ। বিশেষ করে কে. মলিক, আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, ভবানী দাস, কমলা ঝরিয়া, সত্য চৌধুরী, জগন্ময় মিত্র, বীণা চৌধুরী, কমল দাশগুপ্ত, নিতাই ঘটক, সুধীরা সেনগুপ্তা, কানন বালা, পদ্মরানী চ্যাটার্জী, বেচু দত্ত, আব্বাস উদ্দীন, দিলীপ রায়, বরোদা চরণ গুপ্ত, বিজনবালা ঘোষ দস্তিদার, মনোরঞ্জন সেন, উমাপদ ভট্টাচার্য, নীহারবালা, আব্দুল লতিফ, হরিমতী, আশ্চর্যময়ী দাসী, সরযুবালা, ধীরেন দাস, মৃণাল কান্তি ঘোষ, ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্র, রথীন ঘোষ, রাধারানী দেবী, রত্নেশ্বর মুখার্জী ও সিদ্ধেশ্বর মুখার্জীসহ অনেকেই তাঁর গান গেয়ে ধন্য হয়েছেন।

রেকর্ড কোম্পানিতে ফরমায়েসী কাজ করেছেন বলে অনেক সময় বড়কর্তাদের অনুরোধে অযোগ্য শিল্পীদের দিয়েও গান করাতে হয়েছে। তাতে গানে সুরের মান হয়তো দু’একটির নেমে গেছে। অবশ্য বেতারে নজরুল তাঁর মান পুরোপুরি ধরে রেখেছেন। সেখানে শুধু সুর নয়, ছন্দ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। নানা বিষয়ের অবতারণা করেছেন তাঁর বেতার সঙ্গীতে। আকাশবাণী, হরপ্রিয়া, ষট-ভৈরব, যাম যোজনায় কড়ি মধ্যমসহ গীতি-আলেখ্য রচনা ও সুর যোজনা করেছেন কাজী নজরুল।

চলচ্চিত্রের সবাক যুগ যখন থেকে শুরু হয় সেই ১৯৩১-এর ‘জলসা’ ছবি থেকে ‘শহর থেকে দূরে’ (১৯৪৩) ছবিতে কখনো গান রচনা, কখনো সুর, কখনো অভিনয় এবং কখনো সঙ্গীত পরিচালনা করতে হয়েছে। তাঁর এই জনপ্রিয়তা ও মেধার কারণে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’র ‘দিল্লী’ কেন্দ্র তাঁকে ‘আকাশবাণী কোলকাতা’ কেন্দ্রের উপদেষ্টা নিয়োগ করে সম্মানিত করে। আজকে যাদের তারকা বিশেষণে ভূষিত করা হয়, তাদের চেয়ে শতগুণ বেশি জনপ্রিয় ছিলেন তিনি।

 

দুই.

কবি তখন নবপর্যায়ে ‘নবযুগ’ পত্রিকার সম্পাদক।ভারতবর্ষ বিভাগের প্রাক আয়োজন চলছে। সমস্ত ক্ষমতা কোলকাতার শিক্ষিত শ্রেণীর হাতে। তরুণ মুসলিম লীগ নেতা বদরুদ্দোজা, আলম হোসেন, জুলফিকার হায়দার তখন পাকিস্তান আন্দোলন করছেন। এই উচ্ছ্বাস আন্দোলনে বাঁধ সাধলেন নজরুল। তিনি বললেন এটি মেকি, ভুয়া আন্দোলন; পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ নিরক্ষর নেংটি পড়া মুসলমানদের মুখের গ্রাস কেড়ে এরাঁ নেতা বনতে চান।

‘নবযুগ’ পত্রিকায় কবি তখন স্বাক্ষরযুক্ত সম্পাদকীয় লেখেন। এক সংখ্যায় লিখলেন ‘পাকিস্তান না ফাঁকিস্থান?’ আর যায় কোথায়, ভীমরুলের চাকে ঢিল ছোঁড়া ছাড়া আর কী? তরুণ এই পাকিস্তান আন্দোলনকারীরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন। কবি পত্রিকা অফিসের কাজ সেরে অনেক রাতে ফেরেন, মওকা মতো পেতে হবে; ছ’ফিট লম্বা এই কবিকে সামনাসামনি ধরাশয়ী করা যাবে না। যারা কবির স্নেহ নিয়ে কোলকাতায় দাপটের সাথে চলতেন, তারাই কবির জীবনের জন্য হুমকী হয়ে দাঁড়ালেন।

সে সময়ের লেখক মোহাম্মদ কাশেম তাঁর স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন সেই দুর্ঘটনার কথা। আক্রমণের পর ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি কবি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। তার পিঠে সেই আঘাতের চিহ্ন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কবি বহন করছিলেন। বাংলাদেশে কবির ব্যক্তিগত সহকারী শফি চাকলাদার সেকথা অকপটে স্বীকার করেছেন। ছবি তুলে রেখেছেন, কিন্তু কাউকে দেননি। তাঁর চিকিৎসার সুব্যবস্থা করার জন্য সমিতি হলো, ‘নজরুল রোগ নিরাময় সমিতি’। সেখানেও ঢুকে গেল দু’একজন পাকিস্তানপন্থী। তারাই নিয়ন্ত্রণ করত তার চিকিৎসা, দেখাশোনা, অর্থ সংরক্ষণ। ওই সমিতির কোষাধ্যক্ষ ছিলেন কবি জসীম উদদীন। তাদের দীর্ঘসূত্রিতায় রোগ ধীরে ধীরে নিরাময়ের অযোগ্য হয়ে উঠলো। সুফি জুলফিকার হায়দার তাতে সহযোগিতা করলেন। লুম্বিনী হাসপাতালে শেকল দিয়ে বেঁধে, লোক-আড়ালে কবিকে নিঃশেষ করে দেয়া হলো।

poet-kazi-nazrul-and-poet-j.jpg………
নজরুলের পাশে জসিম উদদীন, দুজনেই পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, মে, ১৯৭৫।
………
পঞ্চাশের প্রথম দিকে ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় কবির চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। রবীউদ্দীনকে সাথে দিয়ে কবিকে ভিয়েনায় পাঠানো হলো। কিন্তু ততদিনে নিভেছে দেউটি। কবি আর ভাল হলেন না। পেছনের যে নার্ভটি ঘাড়ে গিয়ে পৌঁছায়, সেটি শুকিয়ে মরে গেছে।

……..
১৯৪২-এ রেকর্ডকৃত প্রণব রায়ের রচিত কমল দাশগুপ্তের গাওয়া একটি গান
……….
এই ইতিহাস না জানলে কবির সৃষ্টি কী করে অন্ধ বিবরে নিক্ষিপ্ত হলো সে তথ্য জানা হবে না। কবির শিষ্য, গুণগ্রাহী ও বন্ধুরা ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তাঁর সৃষ্টির ব্যবহার সচল রেখেছিলেন। এর পর থেকেই ষড়যন্ত্রের শুরু। কবির ‘কথার কুসুমে গাঁথা’ গানটি ‘কথা প্রণব রায় ও সুর কমল দাশগুপ্ত’ এভাবে প্রকাশিত হয়ে গেছে।নজরুলের ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি’ গানটির সুরকার হিসেবে চিত্ত রায়ের নাম ছাপা হয়েছে।ধীরেন দাস থেকে শিল্পী সতীনাথ হয়ে নতুন যুগের শিল্পীরাও চিত্ত রায়ের সুর হিসেবেই এই গান গেয়েছেন। এমনি করে কবির গান অন্যের নামে হারিয়ে যেতে থাকে।

১৯৪৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত নজরুল সঙ্গীতের অন্ধকার যুগ। ১৯৬৪ সালে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে নজরুল সঙ্গীত গাওয়ানো হলো। কিন্তু শান্তিনিকেতনের আশ্রমবাসীরা তাঁর রাশ টেনে ধরলেন।আশ্রমকন্যাকে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। তিনি ঘরে ফিরলেন। ধীরেন বসু নামের শিল্পী প্রথম রেকর্ড করলেন ‘নজরুলগীতি’ শিরোনামে। পাশাপাশি রবীন্দ্রসদনে নজরুল জয়ন্তী হলো। কমরেড মুজাফফর আহমেদ, কল্পতরু সেনগুপ্ত, মাযহারুল ইসলাম, কমল দাশগুপ্ত, আব্দুস সালাম প্রমুখ নতুন করে উদ্যোগ নিলেন।

……..
নজরুলের পাশে বসে গান গাইছেন ফিরোজা বেগম
……..
কমল দাশগুপ্ত দেউলিয়া হয়ে সর্বস্ব খুঁইয়ে যুথিকা রায় থেকে দূরে সরে গেলেন। কাছ ভিড়লো সোনার তরী, ফিরোজা বেগমের। রবীন্দ্রনাথের গান ছেড়ে কমলগীতি গাইতে শুরু করলেন তিনি–‘কথা কাজী নজরুল ইসলাম’। প্রশ্ন জাগে, নজরুল রচিত এত গান কমল দাশগুপ্ত কোথায় পেলেন? এইচএমভির মহড়া কক্ষ থেকে যে বাঁধানো খাতাগুলি হারিয়ে গিয়েছিলো সেগুলিই এসব গানের উৎস কিনা? ‘কথা প্রণব রায়’ এবং ‘সুর কমল দাশগুপ্ত’ এভাবে এই গান (‘বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিবে’) রেকর্ড কোম্পানিতে চুক্তিবদ্ধ হলো কীভাবে? মনে রাখা দরকার, নজরুল তখন মূক, চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করার অবস্থা নাই তাঁর। তাঁকে ততদিনে সিফিলিস রোগাক্রান্ত, পাগল ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করা হয়ে গেছে।

 

তিন.

বাংলা গানের দ্বিতীয় পর্যায়। গীতিকার ও সুরকার ততদিনে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে। দেশভাগের পর পঞ্চাশে নতুন একদল শিল্পী তর তর করে প্রকাশিত হলেন; কারণ নজরুলী যুগ শেষ। হতাশায় নিমজ্জিত শিল্পীসমাজ কালীঘাট ও শ্মশানঘাটে নেশায় বুদ হয়ে পড়ে থাকে। কবির গান আর চলে না।

ষাটে এসে নজরুল সঙ্গীতের দীর্ঘশ্রুতিবাদন প্রকাশিত হলো। তাঁর জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। কিন্তু ডিস্ক অপ্রতুল! মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, শ্যামল মিত্র, উৎপলা সেন, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সনৎ সিংহ, রবীন চট্টোপাধ্যায়, রবীন মজুমদার–একঝাঁক নতুন শিল্পী গণমাধ্যমে হাজির। বাংলা গানের নব ধারায় ঢেকে গেলো নজরুলী আবহ।

‘আমি এত যে তোমায় ভালবেসেছি’, ‘ময়ূরকণ্ঠী রাতের নীলে’, ‘বনে নয় মনে মোর’ ইত্যাদি গানের মাধ্যমে মানবেন্দ্র তখন বাংলা গানের শ্রোতাদের মনে তাঁর জায়গা করে নিয়েছেন। চলচ্চিত্রের কণ্ঠশিল্পীর সাথে সাথে সুরকারের খাতায়ও নাম লেখালেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়।

manabendra.jpg……..
মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
……..
বাংলা আধুনিক গানের এই ধারায় মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় যখন তুঙ্গে তখন তাঁর কণ্ঠে একক একটি নজরুল সঙ্গীতের ডিস্ক (১৯৬৫) প্রকাশিত হলো। বরিশালের উজিরপুর মুখার্জী পরিবারের উত্তরসূরী মানবেন্দ্র আর একই জেলার তবল-এ-নেওয়াজ রাধাকান্ত নন্দীর যুগলবন্দি। রাধাকান্তের আঙুলে যেন খই ফোটে। ছন্দের আড়ি, কুয়াড়ি হয়ে সমে এসে ধা বাজে পরম লগ্নে। হিন্দুস্তানী সঙ্গীতের তালিমের চরম নির্যাস উভয়ে ঢেলে দিতে পেরেছেন কবির লঘুসঙ্গীতে। যেটা আধুনিক গানে সম্ভব নয়।

প্রেমে পড়লেন মানবেন্দ্র। পয়ষট্টির পাক-ভারত যুদ্ধের পর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা নিয়ে অনুরোধের আসরের ফাঁকে শ্রোতারা শুনতে থাকে বাণী-বীণার এই নতুন স্বাদ। সঙ্গীতামোদী মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়লো নজরুলের গানে। মানব ও নজরুল হয়ে গেলেন একই বৃন্তের ফুল। নজরুল সঙ্গীত হয়ে গেলো ‘মানবেন্দ্রর গান’। অনুরোধ, মানবেন্দ্রর গান শুনতে চাই। কোথাও আবার উল্টো ঘটনা–আধুনিক গান শুনবো, এসব শুনবো না। মানবেন্দ্র সেখানে গোঁয়াড়—শুনতেই হবে। নিজের গাওয়া বিখ্যাত আধুনিক গানের প্রলোভন দেখিয়ে নজরুলের এক ডজন গান শোনানো হয়ে গেছে। কোথাও বা তিনি বাকযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন, কখনো শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন; কিন্তু নজরুল সঙ্গীত দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। থামেননি একটুও।

গানের তরী বেয়ে রবীন্দ্রনাথের গান ছেড়ে এলেন অনেকে। তার মধ্যে অন্যতম ডাক্তার অঞ্জলি মুখোপাধ্যায়। লন্ডনে তাঁর চিকিৎসা পেশা ছেড়ে নাড়া বাঁধলেন আঙ্গুরবালা দেবীর কাছে। তালিমে নায়কী ও গায়কী দুটোই চেপে বসলো কণ্ঠে। সুরামোদী শিল্পী এবং শ্রোতাগণ ঝাঁপিয়ে পড়লেন এদিকে। মানবেন্দ্র নজরুল সঙ্গীতের যে নব আন্দোলন শুরু করলেন তার সাথে যুক্ত হলেন অঞ্জলি। সুরের ধারা ঢেলে দিলেন শ্রোতাদের কানে। তবলায় রাধাকান্ত নন্দী। ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’, ‘এত জল ও কাজল চোখে’, ‘কেন আনো ফুলডোর’, ‘মুসাফির মোছ রে আঁখিজল ফিরে চল’, ‘ভরিয়া পরাণ শুনিতেছি গান’ বাংলা গানকে সুরের বন্যায় ভাসিয়ে দিলো।

সাতচল্লিশের পর যারা শরণার্থী হয়ে পল্লীগীতির মিষ্টি গলা নিয়ে অতাঈ (স্বয়ংশিক্ষিত) সাজতে গিয়েছিলেন তাঁরা বললেন, ‘মানব তো সুর বিকৃত করছে।’ তাঁর গায়কীর চাল ধরতে গেলে যে তালিম প্রয়োজন, সেটা তো তাঁদের নেই। না ক্লাসিক্যালে, না নজরুল সঙ্গীতে। পল্লীগীতি ও আধুনিক গানের অক্ষম গায়করা এহেন মন্তব্যে জীবনপাত করছেন।অন্যদিকে সুমন চৌধুরী, গোলাম সোহরাব, কমল রড্রিক্স, ফেরদৌস আরা, জান্নাত আরা, ইয়াকুব আলী খান, সিফাত-ই-মঞ্জুর, সাবিহা মাহবুব, ফাতেমা-তুজ-জোহরা, মানস দাস, অভিজিৎ সাহা ও লেখক নিজে নতুন ধারায় উজ্জীবিত।

ডা. অঞ্জলি মুখার্জী গাইলেন ‘নতুন নেশার আমার এ মদ’, ‘এ কোন মধুর শরাব দিলে’, ‘সৃজন ছন্দে আনন্দে’ ইত্যাদি নজরুল সঙ্গীত। পাশাপাশি সুপার সেভেন ডিস্কে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় ধ্রুপদী ঘরানায় গাইলেন ‘সন্ধ্যা গোধূলি লগনে’, ‘পথিক ওগো চলতে পথে’ ইত্যাদি গান। অসাধারণ লয় ও সুর তাঁর গাওয়া এ গানগুলিতে। বাঙালী সঙ্গীত সমাজে ছড়িয়ে গেলো এ গান। এমনকি নিজের সুরে গাইলেন নজরুলের ‘আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন’ গানটি। জনপ্রিয় হবার পর তিনি স্বীকার করলেন এ গানের সুর তাঁর।

বাংলাদেশে সদ্যপ্রয়াত মফিজুল ইসলাম বেশ কয়েকটি গান সুর করেছেন। মানবেন্দ্র ও অঞ্জলির এই ধারাটি এখনো চলমান। ইতিমধ্যে অনেক নতুন গান আবিষ্কৃত হয়েছে। সেগুলি এ ধারায় যুক্ত হয়েছে। ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে বেশ কয়েক জন স্বরলিপিকার নজরুল মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁদের নিজেদের ভাগ্যে লক্ষ্মীর দেখা মিললেও স্বরস্বতী দূর অস্ত। হিন্দুস্তানী সঙ্গীতে তালিম ব্যতীত নজরুলের গান নিয়ে নাড়াচাড়া ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছু নয়। তবে নব প্রজন্মের হাতে বাংলা গানের এই শ্রেষ্ঠ ধারার আলোকবর্তিকা যে দুজন শিল্পী নিজের জীবন নিঃশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের কাছে দিয়ে গেলেন তার জন্য তাঁরা অমর, অক্ষয় হয়ে থাকবেন। তারপরও মূল শক্তি হলো কাজী নজরুল ইসলামের বাণী ও সুরের অপূর্ব সমন্বয়—ভারতীয় সুর ও ছন্দের সার্থক প্রয়োগ। এ জন্যই সফল হয়েছেন যোগ্য নাবিক মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। তাঁকে নমস্কার।

২১/৫/২০১০

ওয়েব লিংক
বাবু রহমান: আর্টস

—-
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন a.n.m afzal hossain — আগস্ট ২৭, ২০১০ @ ১০:২৩ অপরাহ্ন

      নজরুলের কাছে আমাদের বার বার ফিরে যেতে হবে। শফি চাকলাদারের তোলা ছবিটি দেখতে চাই।

      – a.n.m afzal hossain

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Saif Tinku — আগস্ট ২৮, ২০১০ @ ১২:২৯ পূর্বাহ্ন

      ধন্যবাদ, নজরুল এবং তাঁকে নিয়ে মানবেন্দ্রের কাজ সম্পর্কে নতুন কিছু জানলাম।

      – Saif Tinku

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রবীর বিকাশ সরকার — আগস্ট ২৯, ২০১০ @ ৯:৪৮ অপরাহ্ন

      ———————————————-
      নজরুলের জাগতিক গান আসলেই অসাধারণ!
      ———————————————-

      প্রণব রায় লিখিত কিছু গান আসলে নজরুলের লিখিত বলে আমারও মনে হয় কবির নিজস্ব ভাবনা ও আঙ্গিকের কারণে। তাঁকে নিয়ে এত ষড়যন্ত্র হয়েছে তা জেনে আজ সত্যি বিস্মিত হলাম! আমার দৃঢ় বিশ্বাস বাঙালি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কাউকেই সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। তাই জাতিগঠনে তাঁদের উপলব্ধি, অভিজ্ঞতাকে আজও কাজে লাগাতে ব্যর্থ। প্রশ্ন জাগে রবীন্দ্র-নজরুল দ্বারা বাঙালি জাতি কতখানি প্রভাবিত?

      নজরুলের জাগতিক গান আসলেই অসাধারণ!

      প্রতিটি সচেতন মানুষ যদি নিজের জীবনরহস্যকে আবিষ্কার করতে চান, আর নিজের মধ্যে সুপ্ত স্বদেশপ্রেমকে জাগ্রত করতে আগ্রহী হন তাহলে নজরুলসংগীত নিভৃতে শোনা উচিৎ। নজরুলের জীবনঘনিষ্ঠ প্রতিটি গানের অন্তরালে স্বদেশবোধের সুরধুনি প্রবাহিত। নরনারীর গভীর প্রেম আসলে স্বদেশ প্রেমেরই নামান্তর যা সহজে উপলব্ধি করা যায় না সচরাচর। নজরুলের গানে সেটি আছে।

      কুশলী অনুসন্ধানী বাবু রহমানকে জানাই অজস্র সাধুবাদ।

      – প্রবীর বিকাশ সরকার

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ভানু ভাস্কর — জানুয়ারি ১২, ২০১১ @ ৪:৫৭ অপরাহ্ন

      নজরুলের গানের কোন তুলনা নেই। চৌর্যবৃত্তির কোপানলে পড়ে আমরা অনেক কিছুই তাঁর হারিয়েছি। কিন্তু যা পেয়েছি সেটার মুল্যায়ন করা দরকার, গভীরভাবে। এতদিন করিনি। আমাদের এই প্রজন্ম যেন সেই কাজটি করে যেতে পারে। কিন্তু এর সাথে গানের নামে দেশে যে ভণ্ডামী চলছে, সেটাকেও রুখতে হবে।

      – ভানু ভাস্কর

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com