গ্যাংগারাইল

মোশাহিদা সুলতানা ঋতু | ২৫ আগস্ট ২০১০ ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন

gangarail_1.jpg
গ্যাংগারাইলের পাড়

খুলনা শহরের রয়েল হোটেলে রুটি, মাখন, আর ডিম দিয়ে সকালের নাস্তা শেষ করে কফি খাচ্ছি। মোবাইলে দেখি রিং বাজছে। ফোন করেছে দুলু–আমার গাইড। ফোন তুললে ওই পাশ থেকে দুলু বলল, আপা, আমি আসছি নিচে। দুলুকে অপেক্ষা করতে বলে আমি কফিতে শেষ চুমুক দিচ্ছি।

দুলুকে আমি কখনো দেখিনি। এর আগে আমার গাইড ছিল সালাম। সে চিটাগাংয়ে একটা চাকরি পেয়েছে, তাই তার এক প্রতিবেশীকে বলে দিয়েছে আমাকে নিয়ে যেন আজকে বের হয়। এদিকে কালকে আমি একজন সহকারী গবেষককেও পেয়েছি, যার গত পরশু অনার্সের শেষ ফাইনাল পরীক্ষা ছিল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সব মিলে আজকের সফরে আমার সঙ্গী দুইজন হলো। শেষ চুমুক দিতে দিতে সহকারী গবেষক শাওন ফোন করলো। শাওনের ফোনটা না তুলে আমি নিচে রিসেপশনে চলে গেলাম। রিসেপশনে এসে দেখি গাড়ির ড্রাইভারও এসে হাজির। আজকের ড্রাইভারের নাম সুমন। একটা সাদা রঙের টয়োটা গাড়ি নিয়ে এসেছে সে।

picture-190.jpg………
মধুখালী, চিংড়িঘেরের ধার দিয়ে
………
আমরা তিন জন ম্যাপ নিয়ে বসলাম রিসেপশনে। দুলুকে দেখালাম কোন কোন জায়গায় যেতে চাই আজকে। দুলু যখন শুনলো আমি আজকে কয়রা আর পাইকগাছায় যেতে চাই তখন সে বলল, ভালো হয় যদি আমরা প্রথমে কয়রা যাই। সেখান থেকে দুপুরের পর পাইকগাছা যাওয়া যেতে পারে।

দুলুকে একটু ভালো মত লক্ষ করলাম। সে একটা সাদা গেঞ্জি জিন্সের প্যান্টে গুজে পড়েছে, সাথে একটা কালো রঙের জাহাজের মত জুতা। আমার পায়ে লাল রঙের স্পঞ্জের স্যান্ডেলের দিকে তাকালাম। কাদা পারাতে হবে বলে আমি আগে থেকেই প্রস্তুত। শাওনকেও দেখলাম একটা স্যান্ডেল পরে এসেছে। কিন্তু বটিয়াঘাটা থেকে আসা আমাদের গাইড দুলু পরেছে জুতা। আমি দুলুকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার জুতা পরে অসুবিধা হবে না তো?

দুলু জবাব দিল, না হবে না, আমার অভ্যাস আছে।

শাওনকে আজকে বেশ চুপচাপ দেখা যাচ্ছে। কালকে শাওন অনেক কথা বলছিল। বলছিল, সে একজন চলচ্চিত্র পরিচালক হতে চায়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম ক্লাবের সে একজন সদস্য। আমার সাথে ঘুরতে যেয়ে তার মাথায় ঘুরছে এই বিষয় নিয়ে কীভাবে একটা ডকুমেন্টারি তৈরি করা যায়।

গাড়িতে উঠলাম আমরা তিন জন। সুমন গাড়ি ছাড়ল। আজকে মার্চের ২৩ তারিখ। ২০১০ সালের বসন্ত কাল শেষ হয়ে যাবে আর তিন সপ্তাহ পরেই। গাড়ি ছাড়ার সাথে সাথে আগের রাতের রয়াল হোটেলের রুমের খোলা জানালার কথা মনে পড়ল। জানালাতে কোনো গ্রিল নেই। ঠিক টেবিলের সামনে থেকে ছাদ পর্যন্ত উঁচু একটা বিশাল জানালা। কাল রাতে জানালা দিয়ে বাতাস এসে সারা ঘর তছনছ করে দিচ্ছিল। এই তছনছ করা দেখাটাও ভালো লাগছিল। সামনে খাতা কলম নিয়ে জানালার কাছে বসেছিলাম রাত ২টা পর্যন্ত। মনে হলো, আজকে রাত কখন আসবে, আমি আবার কখন হোটেলের রুমের বিশাল জানালার পাশে একা বসে বসন্তের গন্ধ নিব আর অন্ধকারে বহুদূর ঘুরে আসব, কখনো চার্লস নদীর পারে, কখনো ব্রহ্মপুত্রের পারে।

গাড়িতে করে যাচ্ছি কয়রার দিকে। শুনেছি সেখানে লবণ পানি আর মিষ্টি পানি নিয়ে কৃষকদের মধ্যে বিরোধিতা আছে। আমার গবেষণার উদ্দেশ্য হচ্ছে দেখা যে সরকারের জলমহাল ইজারা দেয়ার কারণে কী কী সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে লবণাক্ততা ঘিরে। কয়রা বেশ দূরে সেটা আমার জানা ছিল না। ম্যাপে যদিও দেখা যাচ্ছে কাছে, কিন্তু গাড়ি যাবার রাস্তাটা বোধহয় বেশ ঘুরে গেছে। কখনো রাস্তার দুই ধারে গাছ, কখনো বাজার, লোকালয়, আবার সারি সারি গাছ পেরিয়ে হাজির হলাম একটা ফেরি ঘাটে। ফেরি ঘাটে ফেরি আছে, কিন্তু আর কোনো গাড়ি নেই। এই অঞ্চলে মানুষ তেমন যায় না। সুমন জিজ্ঞেস করলো, “আপা, আপনি তো বিশ্যবিদ্যালয়ে পড়ান, আপনার এখানে কী কাজ?” আমি বললাম, “এই তো গবেষণার কাজ।” সুমনকে ভাবতে দেখে আমিও ভাবনায় পড়ে গেলাম আসলেই তো আমার কী কাজ, আমি তো এখনো জানি না এলাকাটা কেমন।

 

দুই.

ফেরিঘাটে বসে জানতে পারলাম, ফেরি আজ সারাদিনে নাও চলতে পারে, যদি আর কোনো গাড়ি না আসে। অর্থাৎ আমাদের সন্ধ্যা পর্যন্তও বসে থাকতে হতে পারে। শাওন এবং দুলু যখন এদিকে-ওদিক হাঁটাহাঁটি করছে তখন আমি বুঝতে পারছি, এখন অন্যভাবে এই বিষয়ের সমাধান করতে হবে। ফেরির টিকেট কাটার দায়িত্বে আছে যে লোকটা তাকে দেখছি ব্যস্ত হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছেন। তবে সেই ব্যস্ততা টিকেট কাটা নিয়ে নয়, সেই ব্যস্ততা টিকেট কাটা হচ্ছে না বলে। অন্য যেই সব কাজ থাকে সেই সব নিয়ে। এই যেমন দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা, নদীতে গোসল করা, অজু করা, নামাজ পড়া এবং খাবার পানি সংগ্রহ করা।

picture-185.jpg……..
মধুখালীর বগেন্‌ভিলা গাছ
……..
শাওন এসে জানালো এই ফেরি নিয়ে এখনই পার হতে হলে ৪০০ টাকা দিতে হবে। আমি দরাদরি করতে চাইলে টিকেট বিক্রেতা জানালো এই ফেরিটা বেসরকারী। অর্থাৎ ৪০০ টাকার কমে যেতে হলে মালিকের সাথে ফোনে কথা বলতে হবে। সে আমাকে একটা ফোন নাম্বার দিল। আমি ফোন করাতে ওই পাশ থেকে এক ভদ্রলোক ফোন তুললেন। আমি পরিচয় দিলাম, আমি একজন শিক্ষক, ঘাটে আটকে আছি, উনি যেন ফেরিটা তাড়াতাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত দেন। ওই পাশ থেকে ভদ্রলোক আমার কথা শুনে জবাব দিলেন, যে উনি ফেরির মালিক নন, উনি একজন স্কুলশিক্ষক। আমার তখন সত্যি সত্যি ওই শিক্ষককে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করছিল, ভাই আপনি কী পড়ান স্কুলে? সেটা না করে আমি ফোন রেখে দিলাম। বুঝলাম ব্যস্ত টিকেট বিক্রেতা নাম্বারটা দিতে ভুল করেছেন। আবার নতুন নাম্বার এনে ফোন করা হলো। এবার ওই পাশ থেকে ফোন তুললেন একজন লোক, পাওয়া গেল আসল মালিককে, শশাঙ্ক সরকারকে। শশাঙ্ক দাকে বোঝালাম যে আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে এসেছি, উনি যেন আমাকে কম টাকায় ফেরি পারাপারের ব্যবস্থা করে দেন। শেষে ধার্য্য হলো তিনশ টাকা। ফেরি ছাড়ল।

ফেরির এই পারে রাস্তা খুব খারাপ, আশেপাশে যেদিকে তাকানো যায় চোখে পড়ে শুধু খরখরে মাটি। মনে হলো কয়রা নামটার সাথে খরার একটা মিল আছে। আমি দেখছি এই অঞ্চলে গাছ একেবারে নেই বললেই চলে। আমার পথপ্রদর্শক বলল, এই অঞ্চলে লবণাক্ততার জন্য গাছ হয় না।আর যা দুই একটা হয় তাতে কোনো ফল হয় না। লবণসহিষ্ণু কিছু গাছ যেমন বাবলাও এই অঞ্চলে কম। খুলনার অন্যান্য গ্রামেও গিয়েছি, বটিয়াঘাটায় প্রচুর বাবলা গাছ দেখেছি।

বটিয়াঘাটায় একটা রাস্তার নাম আছে প্রেম কানন। একটা দীর্ঘ রাস্তার দুই পাশে ঘন বাবলা গাছ। সেই রাস্তা দিয়ে ছেলে মেয়েরা স্কুল ছুটির পর এক সাথে বাড়ি ফিরত। বাড়ি ফেরার পথে কিশোর-কিশোরীরা প্রেম নিবেদন, গ্রহণ, ও প্রত্যাখ্যান করত। আমি যখন ভাবছি প্রেম কানন রাস্তায় নানা রকম প্রেমের ঘটনার কথা তখন দেখি আমরা পৌঁছেছি একটা বাজারের মত জায়গায়। দুলুর দায়িত্ব ছিল সে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যাবে যেখানে যেয়ে লোকজন খুঁজে পাওয়া যায় কথা বলার জন্য। বাজারে নেমে পড়লাম। নেমে বুঝলাম দুলু মানুষকে ডেকে কথা বলতে অভ্যস্ত না, মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি করার ব্যাপারেও সে কাঁচা। আমাকেই কথা বলার জন্য এগিয়ে যেতে হলো।

একটা চায়ের দোকানে বসলাম। সেখানে এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা। উনি আমাদের আসার কারণ জানতে চাইলেন। আমি বললাম আর উনি সাথে সাথে বোঝাতে শুরু করলেন এই অঞ্চল সম্পর্কে উনি কত জানেন। চা খাওয়ার সময় আমি চায়ের দোকানটা বসে বসে দেখছিলাম। ভাবছিলাম বস্টনের লিটেল ইতালির কথা। ঠিক এরকম ছোট্ট একটা কফি শপে বসে সান্ধ্য আড্ডা দেয় শহুরে তরুণ পেশাজীবীরা। আর এখানে এই চায়ের দোকানে সাধারণ কৃষক, এনজিও কর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আড্ডা দেন। চায়ের কেতলিতে পানি সারাক্ষণ গরম হচ্ছে। বিশ্রাম নেই কেতলির এই দূর গ্রামেও।

চা খাওয়া শেষ করে বের হব ঠিক তখন দেখি একটা জটলা তৈরি হয়েছে বাজারে। একটা মোটর সাইকেল এক্সিডেন্ট করেছে। একজন মহিলা মাথায় আঘাত পেয়েছেন, দর দর করে রক্ত পড়ছে। তাকে ধরাধরি করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। এরকম দূরের গ্রামে অনেকেই মটর সাইকেল চালায়। এ ধরনের দুর্ঘটনা দেখে এখানকার গ্রামের লোকেরা অভ্যস্ত। জটলা হালকা হয়ে গেলে আমরা রওয়ানা দিলাম আরো সামনের দিকে। যেতে যেতে ডান দিকে দেখি রাস্তার পারে একটা ছোট্ট ঘরের সামনে বারান্দায় একজন বৃদ্ধ আর একজন যুবক বসে আছে। আসে পাশে আর কিছু নেই। ঘরের সামনে এসে কথা বলতে শুরু করলাম দুই জনের সাথে। বৃদ্ধজন বাবা আর যুবকটি তার ছেলে। উনারা অনেক কথা বললেন। সারাংশ হচ্ছে এই যে এই গ্রামে আগে জলমহাল ইজারা দেয়া হত, কিন্তু এখন আর দেয়া হয় না। বুঝলাম আমরা ভুল তথ্য পেয়ে এসেছি। তারপরও তাদের সাথে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করলাম। যুবকটি বলছে যে তিন মাস ধরে তাদের কোনো কাজ নেই। এ অঞ্চলে এমপি লবণ পানি ঢোকানো নিষেধ করে দিয়েছে, বিধায় এখন চিংড়ি চাষ করতে পারছে না তারা। অন্য দিকে মাটির লবণাক্ততা দূর হচ্ছে না বলে তারা ধানও বুনতে পারছে না। অপেক্ষা করছে বৃষ্টির পানি এসে কবে ধুয়ে নিয়ে যাবে লবণ, আর কবে তারা ধান বুনবে। এলাকার সব লোক কাজ না করে বসে আছে। তখন মনে হলো ফেলে আসা চায়ের দোকানের কথা। ওই চা দোকান দুপুর ১২টার সময়ও মানুষে ভরা। তার মানে এখন এই অঞ্চলের পুরুষরা অলস সময় কাটাচ্ছে? এই দুই জন মানুষকে দেখে কী করে বলি।

 

তিন.

কয়রা থেকে ফিরে যাচ্ছি এবার পাইকগাছার দিকে। যাওয়ার পথে পড়েছে বটিয়াঘাটা। ফেরিঘাটে আনোয়ারের দোকানে যেয়ে চুই ঝাল দেয়া খাসির মাংস আর ভাত অর্ডার দিলাম। আমরা তিনজন খাচ্ছি এক টেবিলে। তিন বাটি মাংস অর্ডার দিলাম। তারপর মনে হলো আসলে আরেকটু বেশি অর্ডার দিলে ভালো হত। আমি আর শাওন নির্দ্বিধায় মাংস খেয়ে যাচ্ছি। খুবই সুস্বাদু এই চুই ঝাল দেয়া মাংস। খুলনার সব চাইতে ভালো খাবার। খুলনা এসে চুই ঝাল দেয়া মাংস না খেয়ে গেলে যেন পাপ হবে এরকম গোগ্রাসে খাচ্ছি, কিন্তু লক্ষ করলাম বটিয়াঘাটাবাসী আমাদের দুলু বেশি খাচ্ছে না। খাচ্ছে না কেন জিজ্ঞেস করাতে উত্তরে দুলু বলল, “আমি মোটা হয়ে যাব তাই খাইতেছি না।” দেখলাম, আসলে দুলু একটু মোটাই। তার হাবেভাবে বোঝা যাচ্ছে সে কোনো কঠোর পরিশ্রম করে অভ্যস্ত না। গ্রেহস্তের আদরের সন্তান। কোনো কাজ না করে অনেক কাজ করার ভাব তার মধ্যে আছে। সে আরো জানালো যে তার এক বন্ধু সুদূর আমেরিকা থেকে তার জন্য স্লিম হওয়ার ওষুধ পাঠাবে শীঘ্রই। সেজন্য সে এখন থেকেই কম কম খেয়ে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। আমার মনে হলো খুব যুক্তি আছে কথায়। দুলুকে আর জোরাজুরি করলাম না। বেচারা বিয়ে হয়নি এখনো, মোটা হয়ে যাচ্ছে, তাকে জোর করে খাসির মাংস না খাওয়ানোই ভালো।

msr-2.jpg…….
বাধের মধ্যে দিয়ে গেছে স্লুইস গেট। বাধের পাশে বাবলা গাছ। বাবলা গাছ বাধ শক্ত রাখে।
…….
আনোয়ারের হোটেলে বিল দিয়ে ফেরিঘাটের পাশে গরুর দুধ দিয়ে বানানো চা খেয়ে রওয়ানা দিলাম আমরা পাইকগাছার দিকে। বটিয়াঘাটার সৌন্দর্য দেখছিলাম। রাস্তার দুই ধারে বাবলা গাছ, অদূরে নদী, ছবির মত ঘর, কৃষ্ণচূড়া গাছ–এই হচ্ছে বটিয়াঘাটার মূল আকর্ষণ। ঘরের আঙিনা কত সুন্দর রাখা যায় গাছ বুনে, সেটা বটিয়াঘাটার কিছু বাড়ি না দেখলে বোঝা যাবার কথা না। সুমন হঠাৎ মেইন রাস্তা বাদ দিয়ে ভিতরের দিকের একটা রাস্তা দিয়ে যাওয়া শুরু করলো। এবার সুযোগ হলো মানুষের বসতবাটি কাছ থেকে দেখার। একটা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। ডান দিকে হঠাৎ সাদা ফুলের বড় গাছ দেখে থমকে গেলাম। এরকম সাদা ফুলের গাছ দেখেছিলাম ভারমন্টে। আর কিছুদূর যেতে দেখি বেশ কয়েকটা কৃষ্ণচূড়া পাশাপাশি দাড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে দুপুরের রোদ থেকে লাল আভা বের হচ্ছে। আরেকটু সামনে যেয়ে আমি যা দেখলাম তা আমি কোনদিন টিভিতেও দেখিনি। আমার ডান দিকে একটা খাল। দশ গজ পর পর ছোট ছোট কাঠের সেতু, কখনো কখনো মাটির সেতু। এই সেতুগুলো হলো ঘরের মূল ঢোকার পথ। সেতুর দুই ধারে সারি সারি গোলপাতা গাছ। ছোটবেলায় টারজান-এ দেখেছিলাম চারিদিকে গাছ দিয়ে সাজানো বাড়ি। হঠাৎ টারজানের কথা মনে পড়ে গেল। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো যুক্তরাষ্ট্রের Maine স্টেটের এক গ্রাম। সেখানে দেখেছি ইস্ট কোস্টের ধনী ব্যক্তিদের সামার হাউস। আমার মনে হলো, এই বাড়িগুলি ওই সামার হাউসগুলোর থেকেও সুন্দর ছিমছাম। এটা যেন কোনো আদিম স্থাপত্য শিল্পীর পরিকল্পনা করা ঘর। খুব ইচ্ছা করছিল নেমে দেখতে এই ঘরগুলিতে থাকা ভাগ্যবান মানুষগুলি কারা। কাদের উঠানে সন্ধ্যা নামে জলের উপর গোলপাতার প্রতিফলন দেখে?

গাড়ি আবার যখন মেইন রোডে উঠলো এক সময় ভরপেটে তন্দ্রা এসে গেল। ‘চা খাওয়া দরকার’ বলতেই দুলু উত্তেজিত হয়ে বলল, “আমার এক বন্ধু থাকে সুন্দরমহল যাবার পথে, রাস্তাতে তার সাথে দেখা করতে পারি, চা-টাও ঐখানে খাওয়া যেতে পারে।” আমার মনে হলো, মন্দ হয় না ব্যাপারটা। একটা স্কুলের পাশে দুপুর তিনটার সময় গাড়ি থামল। আমরা নেমে একটা খোলা জায়গায় যেয়ে দাঁড়াতেই চারপাশ থেকে চেয়ার নিয়ে এসে হাজির কিছু মানুষজন। আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে এসেছেন যুবদলের এক কর্মী। কথায় কথায় জানতে পারলাম এই কর্মী এইবার ইলেকশনে দাঁড়াচ্ছেন। আগামী রবিবার ইলেকশন। এখন তার মূল কাজ হলো মানুষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা। বিনা পয়সায় ভোটারদের খাওয়ানো। আমাদের আপ্যায়ন করতে যেয়ে উনি আশে-পাশের আরো কিছু সম্ভ্রান্ত লোককেও ডেকেছেন। এই কোনো কিছুর জন্যই আমি প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু মুহূর্তে প্রস্তুত হয়ে গেলাম। ইনারা কিছুতেই আমাকে ছাড়তে চাইছিলেন না। আমি এক রকম কোনো কথা না শুনেই উঠে গেলাম। সামনে কী অপেক্ষা করছে এই দিনশেষে আমি জানি না।

 

চার.

গাড়ি এসে থামল নদীর পারে ঘাটে। আমি তখন জানি না ঠিক কী দেখতে যাচ্ছি সামনে। শুধু জানি এক সপ্তাহ আগে নদীর ঐপারে মধুখালী গ্রামে মারামারিতে বেশ কিছু মানুষ আহত হয়েছিল। লবণপানি মিষ্টিপানি নিয়ে ঘটে যাওয়া বিরোধ ও মারামারির সব চাইতে সাম্প্রতিক ঘটনাটি ঘটেছে নদীর ওই পাড়েই। মনে একটু ভয় করছে না তা নয়। যুবদলের উঠতি নেতা বলে দিয়েছে, এই এলাকা খুব ভালো নয়। সন্ত্রাসীদের জায়গা। আমরা যেন অবশ্যই সন্ধ্যার আগে ফিরে আসি। আমার এটাও মনে হয়েছিল যে যুবদলের নেতা ভেবেছেন, একটু ভয় দেখানো ভালো–তাহলে বোঝানো যায় এই এলাকায় তাদের কত নিয়ন্ত্রণ আছে! পরে যখন মধুখালী গিয়েছি পাঁচ ছ বার তখন বুঝতে পেরেছি এই ভীতি প্রদর্শন আসলে নিজেদের ক্ষমতা জাহির করারই একটা কৌশল মাত্র।

ছোট্ট একটা খেয়াতে উঠলাম আমরা তিনজন। আমাদের সাথে আছে শুধু একজন মাঝি, একটা অল্প বয়েসী বউ আর একটা ছোট মেয়ে। একেকজনের দুই টাকা লাগে খেয়া পার হতে। আমি সমুদ্রে জাহাজে ভ্রমণ করেছি। নৌকায়, লঞ্চে নদীতে ভ্রমণ করেছি। কিন্তু খেয়াতে করে এরকম উত্তাল নদী কখনো পার হইনি। বিশাল বড় বড় ঢেউ এমন করে তেড়ে আসে মনে হয় যেন এখনি ডুবে যাবে খেয়া, কিন্তু খেয়া ডোবে না! ভাবছি আমার আগের নদী দেখা আর এখনকার নদী দেখার মধ্যে তফাৎ কোথায়? ইঞ্জিনের নৌকায়, জাহাজে, লঞ্চে যেই ঢেউ দেখা যায় তা পর্যটকদের চোখে দেখা ঢেউয়ের মত। সেখানে ঢেউয়ের সাথে পর্যটকের বিচ্ছিন্নতা আছে। কিন্তু আজকে এত কাছে থেকে ঢেউ দেখা যেন নিজেকে দেখার মত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, আমার বিদেশে দীর্ঘ সময় বসবাস এবং মাটি ও নদীর কাছে আমার ফিরে আসা আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে দেখার চোখ। আমার সমস্ত সত্তা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি এই ঢেউ আমার, আমি এই ঢেউয়ের। আমি অপলক চেয়ে থাকি ঢেউয়ের দিকে, ভাবি কী আছে এই শক্তিতে। কোথা থেকে এই শক্তির উৎপত্তি, কোথায় তার শেষ। শো শো করে বাতাসের শব্দ হচ্ছে। মাঝির পেশীবহুল হাতের দিকে তাকিয়ে চমকে যাই, মনে পড়ে যায় হারিয়ে যাওয়া কৃষ্ণাঙ্গ বন্ধু চুকুর হাত। পৃথিবীর সব পরিশ্রমী হাত বুঝি একই রকম।

madhukhalite-khea-birle.jpg…….
মধুখালীতে নৌকা ভিড়েছে
………
দেখতে দেখতে ওই পারে যেয়ে ভিড়ল খেয়া। আমি পশ্চিম দিকে হেলে যাওয়া সূর্যকে এক ঝলক দেখে নিয়ে মনে মনে ভাবি এই নদী, এই সূর্য, এই গ্রাম–এরা আমার কত চেনা। মধুখালীর কাদামাটিতে পা দিয়েই আমার মন ভিজে গেল। সামনে দুই ধারে যতদূর চোখ যায় প্রান্তর জুড়ে চিংড়ির ঘের, ছোট ছোট গ্রাম, গাছে ঘেরা উঠান রাস্তার ধারে। খেয়া থেকে নেমে বাম দিকে হাঁটা শুরু করলাম। অনেক দূর হাঁটার পর দেখি রাস্তার পারে কাঠ দিয়ে বানানো একটা বেঞ্চ, তার পাশে একটা বগেন্‌ভিলা গাছে অসংখ্য গোলাপী বগেন্‌ভিলা ধরে আছে। বেঞ্চের আরেক পাশে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছে অসংখ্য কৃষ্ণচূড়া ধরে আছে। মনে হয় যেন দুইটা গাছ চুপ করে দাঁড়িয়ে নিজেদের ফুলের সৌন্দর্য প্রদর্শনী প্রতিযোগিতা করছে। বেঞ্চে বসে একটু বিশ্রাম নিলাম আমরা। পাশে একটা গাছে কয়েকটা বাচ্চা উঠে বসে আছে। হাসছে আমাদের দেখে।

নদীর পার দিয়ে আরেকটু সামনে হেঁটে গেলে ডান দিকে একটা গ্রাম। গ্রামের ভিতর ঢুকে পড়ার সাথে সাথে নানা ধরনের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হলাম। আমরা কারা, কেন এসেছি, সাংবাদিক নাকি সরকারী লোক, গবেষণার বিষয় কী–ইত্যাদি ইত্যাদি নানা প্রশ্ন। আমি তাদেরকে ধৈর্য্য ধরে বোঝালাম যে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই এবং আমি একটা গবেষণা করছি লবণাক্ততা নিয়ে। আমি আরো জানালাম যে এই এলাকায় পানি ব্যাবস্থাপনা নিয়ে জানতে চাই। বলার সাথে সাথে দেখলাম একজন মানুষ এগিয়ে এলো। এসে খুব নিচু স্বরে বলল, “আপনি এমন সময়ই আসিছেন, কইদিন আগে ইখানে মারামারি হয়িছে খুব। বোঝলেন? এখানকার অবস্থা খুব গরম। সন্ত্রাসীরা আইসি কী তা-ব করলি, কী আর বইলব।” সে হাত উঁচু করে সামনে একটা পুরানো দালানের বাড়ির দিকে আঙুল তুলে বলল, “ওই বাড়িতে চেয়ারম্যান এসেছিল, তো চেয়ারম্যান এলাকা ঘুরে ওই বাড়িতে গেছিল পানি খাতি, সে এসেছিল মিষ্টি পানির পক্ষে কথা বলতি, ঘুরি টুরি যাবার আগি পানি খাত বসিছে আর তখন দূর থেকে লাঠি, বাঁশ নিয়ে একদল মানুষ আসি ওই বাড়ি ঘিরাও করিছে। সব ভাঙ্গি গেসি বুঝলেন। সব ধান ছিটয়িই, জানালা ভাঙ্গি তারপর গেছে।”

picture-189.jpg……..
বাচ্চারা লেখক আর তাঁর সঙ্গীদের দেখে গাছে উঠে হাসছে
……..
আমি পুরানো বাড়িটিতে ঢুকতে চাইনি। আমার মনে হয়েছে এই বাড়িতে ঢুকলেই এখন গ্রামবাসীদের ধারণা হবে হয় আমি সাংবাদিক, অথবা আমি এনজিও কর্মী–খোঁজ নিতে এসেছি। অথচ আমি তাদের একজনও নই। আমি একজন সাধারণ গবেষক যার জানার আগ্রহ আছে কিন্তু সে জানে না সে ঠিক কী জানতে চায়, শুধু জানে এখানে জানার মত বিষয় কী কী আছে সেটা সে জানতে চায়। কিন্তু আমার অল্পবয়সী সহকারী গবেষক এইসব কিছুই চিন্তা করলো না। সে ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করার জন্য যখন প্রস্তুত তখন আমি আর না বলে পারলাম না যে এখন এখানে কোনো ছবি তুলো না, আগে বিষয়টা বুঝে নেই। এখানকার মানুষের মনে আমাদের নিয়ে অনেক প্রশ্ন। ক্যামেরা সে বের করলো না আমার পরামর্শে কিন্তু সে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল কিছু না ভেবেই। আর কিছু বাকি রাখল না যখন তখন আমিও নামকাওয়াস্তে একটু ঘুরে আসলাম। আমি লবণ-মিষ্টি পানির বিরোধ সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছি। আমি এখানে আসব শুনে আমার অনেক বন্ধু আমাকে উপদেশ দিয়েছে এনজিওর সাথে যোগাযোগ করতে। কিন্তু আমি ইচ্ছা করে যোগাযোগ করিনি কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নিয়ে এখানে আসা মানে আসলে কোনো এনজিওর গল্প শোনা। মানুষের গল্প শেষ পর্যন্ত এনজিওর সাফল্যের গল্পে হারিয়ে যায়।

পুরানো দালানটার পাশ দিয়ে একটা রাস্তা গেছে ভিতরের দিকে। আমি সেটা ধরে উদ্দ্যেশ্যহীন হাঁটা শুরু করলাম। ডান দিকে বড় উঠানওয়ালা বাড়ি। বাড়িগুলি দেখে বোঝা যাচ্ছে এখানে গ্রামের মধ্যবিত্তরা থাকে। আমার অনুমান সঠিক হলো যখন আমি সামনে যেয়ে পুকুরপাড়ে বসলাম। এটা এই পাড়ার একটা পুকুর যেখানে আশেপাশের বাড়িতে থাকা মানুষেরা স্নান করে। পুকুরের ঘাটটা বাঁধানো, চারিদিকে অনেক নাম না জানা গাছ। পরে জেনেছি এই পুকুরের পাশের গাছগুলির নাম। শিরিষ গাছ, চন্দন চটকা গাছ, কুশ গাছ, গেউয়া গাছ, পরশ পেপুল গাছ, আরো কত কী। একটা সাধারণ পুকুর ঘাটে বসে আছি, কিন্তু বসে থাকাটা অসাধারণ মনে হচ্ছে। গ্রামের লোকরা আমাকে এসে বলছে, “আপা, ওই সামনে চলেন, ঐখানে অনেক মানুষ পাবেন। আমি উনাদের বলেছি আপনের কথা। উনারা বসে আছেন।” আমি বললাম, “আপনারা যান, আমি আসছি।”

আমার আসলে এই পুকুর ঘাট ছেড়ে কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না। মন চাইছিল ওখানেই বসে থাকি। নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কি অলস গবেষক?” মন থেকে উত্তর পেলাম, “অলস হলে অলস, যা মনে টানে না সেই কাজ করে গবেষণা হবে নামে মাত্র, কাজ কিছু হবে না।” নিজেকে প্রশ্রয় দিলাম। কারণ জানি তাড়াহুড়া করে গবেষণা হয় না। আমি পুকুরপাড়েই বসব। যারা আসে তাদের সাথেই কথা বলব। তাই করলাম। একজন একজন করে আসছে স্নান করতে–একজন মহিলা গেল, একজন পুরুষ আসল, আরেকজন পুরুষ আসল। আমি বসে বসে দেখলাম মানুষ। এক পর্যায়ে মনে হলো ওঠা উচিত।

আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো একটা উঠানে। সেখানে বেশ কয়েকটা চেয়ার পাতা হয়েছে। প্রায় ২০-২৫ জন মানুষ এসে ঘিরে ফেলেছে। আমার একটু অস্বস্তি লাগলো। কিন্তু আবার মনে হলো, এখনি সময় এই মানুষগুলোকে নিজের সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়ার। পুকুর পার থেকে উঠে এসে শিক্ষকের গাম্ভীর্য নিয়ে মানুষের সামনে আসলাম। একটানা বলে গেলাম যে এই অঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আমি কী কী জানতে চাই। আমি বলে গেলাম যে আমি জানি আপনাদের এখানে একটা গ-গোল হয়েছে, এবং এই গণ্ডগোলের উৎস এই পানি নিয়ে–লবণ পানি ও মিষ্টি পানি নিয়ে বিরোধ। আমি বলে গেলাম, আমি কোনো এনজিওকর্মী নই, আমি ওয়াপদার লোকও নই, আমি একজন সাধারণ শিক্ষক।

picture-196.jpg……
চিংড়ির ঘের
……..
আমার কথা শুনে তারা কী বুঝলো জানি না তবে আমাকে একজন বলল, “আপনাকে দেখে বিশাস হয় না আপনি শিক্ষক। একজন শিক্ষক কেন আমাদের সম্পর্কে জানতে চাইবে। একজন শিক্ষকের তো বই পড়ে সব জানার কথা। কাদা পেরিয়ে, ঘামে ভিজে এত দূর আসার কথা না।” আমার হঠাৎ শিক্ষক সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা নিয়ে ভাবনা আসছিল। কিন্তু বাস্তবতা এই যে এখানকার মানুষ এটা বিশ্বাস করছে না। আমার সহকারী গবেষক আলাদা করে যতবার কথা বলতে গেছে গ্রামের মানুষদের সাথে ততবার তাকে একই প্রশ্ন শুনতে হয়েছে যে আমি আসলে কে। কাজেই আমি ওই গ্রামবাসীর মন্তব্য থেকে বুঝে গেলাম যে তাদেরকে আমার সত্যি পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করা বৃথা, কারণ আমি যাই বলি না কেন তারা তাদের মতই ভাববে। এই ধারণা বদলাতে সময় লাগবে।

ওই উঠানে জনসম্মুখে নিজের পরিচয় পর্ব শেষ করে আমি উঠে দাঁড়ালাম। একটু যেয়ে দাঁড়ালাম চিংড়ির ঘেরের সামনে। বসন্তের বাতাস চারিদিক থেকে এসে আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি সামনে তাকিয়ে আছি। দূরে দিগন্তজোড়া চিংড়ির ঘের, যেন এই জমি অপেক্ষা করছে কবে সবুজ ধানগাছে ছেয়ে যাবে। আমি দাঁড়িয়ে কথা বলছি একজন মাঝবয়সী লোকের সাথে। লুঙ্গি আর শার্ট পরে খুব আয়েশী ভঙ্গিতে চিংড়ির ঘেরের সামনে দাঁড়িয়ে উনি আমার সাথে কথা বলছিলেন। গ্রামের মানুষদের মুখের ভাব দেখে বুঝলাম যে এই গ্রামে খুব কম মানুষ তাদের মনের ভাব গুছিয়ে বলতে পারে, এই লোক সেই অল্প মানুষদের মধ্যে একজন। উনি আমাকে বলে গেলেন যে রাতের বেলা কী ভাবে পালা করে এই গ্রামের লোক স্লুইস গেট পাহারা দেয় যাতে লবণ জলের লোকেরা গেট খুলে পানি ঢোকাতে না পারে। উনার গল্প শুনতে শুনতে কল্পনা করছি মশাল নিয়ে গভীর রাতে দল বেঁধে হেঁটে যাচ্ছে গ্রামের লোক। উদ্দেশ্য লবণ জল ঢুকতে না দেয়া। এই দৃশ্য ভাবতে ভাবতে আমার মনে পড়ল নোবেল প্রাইজ বিজয়ী অর্থনীতিবিদ Elinor Ostrom-এর কথা। Ostrom নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কমন প্রপার্টি রিসোর্সের উপর কাজ করে। তিনি দেখিয়েছেন সরকারী বা বেসরকারী প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ছাড়াই গ্রামের সাধারণ মানুষ কীভাবে অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় নিজেরা সংগঠিত হয়ে নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে। উনি নেপাল ও আফ্রিকাতে মাঠ পর্যায়ে গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন পানিসম্পদ, বনসম্পদ, এবং অন্যান্য ব্যক্তি মালিকানাহীন প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্ব সরকারী বা এনজিও উদ্যোগ ছাড়াও সফল হয়। মনে প্রশ্ন জাগে, নেপালে ও আফ্রিকাতে Ostrom কী দেখেছিলেন। তিনি কি এরকম দৃশ্য দেখেছেন কখনো। আমার মনে হচ্ছিল Elinor Ostrom-কে নিয়ে আসি এখানে, তাকে দেখাই এই দৃশ্য–এই রাত জাগা শ্রম।

picture-192.jpg……..
চিংড়ির ঘের
……
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যখন বাতাস খাচ্ছি তখন আমার জন্য ডাবের রস নিয়ে আসল পাড়ার এক বৌদি। আমাদের কথার প্রসঙ্গ পাল্টে গেল ডাবের রসের আগমনে। তখন কথা উঠলো এই অঞ্চলের ফল গাছ নিয়ে। কথায় কথায় জানতে পারলাম এখানে ফলের বৈচিত্র নেই একেবারেই। নদীর ওই পাড়েও অনেক ফলের গাছ আছে, কিন্তু এই পাড়ে নেই। আরো জানা গেল নদীর ওই পাড়টা আরো সবুজ, কিন্তু এই পাড়ে গাছের সংখ্যাও কমে গেছে। ডাবের রস দিয়ে গেল যেই বৌদি তার পরনে গোলাপি রঙের শাড়ি, মুখে হাসি, কপালে সিঁদুরের টিপ। সে বলল, বাচ্চাদের খাওয়ার মত মিষ্টি ফলের মধ্যে এখানে এখন আছে শুধু সফেদা, ডাব, আর খেঁজুর। আর কোনো ফল বলতে গেলে নেই। হাসিমুখ করে গোলাপি আভা ছড়িয়ে বৌদি বলল, “আপনেরে জল দিলাম না, আমাদের লবণজল আপনি খাতি পারবেন না, আপনার পেট খারাপ হবি, তাই আপনেরে ডাবের জল দিলাম।”

 

পাঁচ.

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আমাদের যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। তরুণ সহকারী গবেষককে পাওয়া যাচ্ছে না। সে আপন খুশিতে চলচ্চিত্র নির্মাণের আকাক্সক্ষায় এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার উঠতি পরিচালক ভাব, উস্কুখুস্ক চুল, আঁতেল ভাব, অকারণে উত্তেজনা আমি উপভোগ করছি। আর এদিকে আমাদের দুলু তার জুতা পায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুলুর জুতা শুধু আমার চোখেই পড়েনি, গ্রামের লোকদের চোখেও পড়েছে। গ্রামের লোকরা তাকে ভয় দেখাচ্ছে, “এই জুতা পরি গেলি কাদায় জুতো নষ্ট হয়ি যাবি।” দুলু হাসিমুখে জবাব দিচ্ছে, “এই জুতা আমি হাতে নিয়ে কাদা পার হব।” যাদেরকে প্রতিনিয়ত কাদা পার হতে হয় তারা যে জুতা পরার শখটা বিসর্জন দেয়নি সেটা দেখে আমার ভালো লাগলো। দিনশেষে দুলুকে আমি নতুন ভাবে দেখা শুরু করলাম।

নাম না জানা অনেকগুলো চোখের দিকে তাকিয়ে একটা শুষ্ক গ্রাম দেখে ফিরে এলাম খেয়া পার হতে। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। নীলচে সন্ধ্যার আলোয় চিক চিক করছে নদীর ঢেউ। আরেকবার এই ঢেউয়ে মাতাল নদী পার হয়ে ফিরে যাচ্ছি আমি। মনে হচ্ছে এই নদী আমার। খেয়া পার হওয়ার পরে প্রায় ১৫ গজ রাস্তা হাঁটু সমান কাদার মধ্যে হাঁটতে হয়। কাদা পার হয়ে পিছন দিকে তাকালাম নদীর দিকে। এই নদী ভদ্রা নদী নামে এসেছে দাকোপ থেকে, এখানে এসে সে নতুন নাম পেয়েছে ‘গ্যাংগারাইল’। “এই নদীতে খেয়া পার হলি নাকি মানুষ গ্যাংগায় তাই এই নদীর নাম হয়ি গেছে গ্যাংগারাইল।”

moshahida@gmail.com

ওয়েব লিংক
মোশাহিদা সুলতানা ঋতু: আর্টস

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হিরন — আগস্ট ২৫, ২০১০ @ ৫:২২ অপরাহ্ন

      প্রাঞ্জল অথচ হাল্কা চালে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন লেখক, তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

      – হিরন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Aaraf — আগস্ট ২৫, ২০১০ @ ৮:৫৩ অপরাহ্ন

      ডাবের রস না হয়ে ডাবের ডাবের জল/পানি হলে বেশি ভালো হতো, যেভাবে গ্রামের বৌদি বলেছেন।

      – Aaraf

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ratri — আগস্ট ২৬, ২০১০ @ ৪:২৬ অপরাহ্ন

      “মানুষের গল্প শেষ পর্যন্ত এনজিওর সাফল্যের গল্পে হারিয়ে যায়।…” ভালো লাগলো।

      – ratri

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আবু বকর — আগস্ট ২৯, ২০১০ @ ২:৪৩ পূর্বাহ্ন

      খুব ভালো লাগলো। কাঁচা হাতের পরশ বিদ্যমান। সামগ্রিক ভাবে প্রশংসার দাবিদার।

      – আবু বকর

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rupan — জানুয়ারি ৩০, ২০১১ @ ৪:৩৭ অপরাহ্ন

      সহজ ভাষা। ভালো লাগলো।

      – Rupan

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sajjad — জুলাই ১২, ২০১১ @ ১০:০৯ পূর্বাহ্ন

      ভ্রমন কাহিনী আমার খুব প্রিয়, মজা পাই এইসব রচনা পড়ে। লেখককে ধন্যবাদ। বটিয়াঘাটার পর যে গ্রামের বর্ণনা আপনি দিয়েছেন এক কথায় অসাধারণ, তবে আপনি ঐ গ্রামের ছবি না দিয়ে ভীষণ মন খারাপ করে দিয়েছেন। জীবন চলার অবশ্যম্ভাবী ব্যস্ততা না থাকলে আপনার সহযোগী হতাম, দেশটাকে ঘুরে দেখার সুযোগ পেতাম।

      সাজ্জাদ (szahidapu@hotmail.com)

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com