রাশিদা সুলতানার পরালালনীল

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ | ২৪ আগস্ট ২০১০ ৮:১০ পূর্বাহ্ন

ছোটগল্প কী? তা কত প্রকার? কেন লেখা হয়? কেন পড়া হয়? একজন অলেখক-পাঠক কী পড়েন, পড়তে চান, ছোটগল্পে? কী পড়েন, পড়তে চান একজন লেখক-পাঠক? উপন্যাসের সঙ্গে ছোটগল্পের মিল এবং গরমিলগুলি
cover_poralalnil.jpg……..
পরালালনীল । রাশিদা সুলতানা । প্রচ্ছদ: । ধ্রুব এষ । মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ফোন: ৭১৭৫২২৭ । ফেব্রুয়ারি ২০০৯ । ৯৬ পৃষ্ঠা । ১২০ টাকা ।
……..
rashida-s-bf.jpg

কী কী? কবিতার সঙ্গে? প্রবন্ধের সঙ্গে?—ইত্যাকার নানা প্রশ্ন জাগে মনে। সমস্যা হ’ল, প্রশ্নগুলির উত্তর, বা উত্তরের প্রয়াসগুলো, ব্যক্তিসাপেক্ষ হ’তে প্রায় বাধ্য। এবং কাজেই ছোটগল্পের কোনো সর্বমান্য সংজ্ঞার্থের দিকে পৌঁছুতে পারা সুদূরপরাহত। কিন্তু তবু প্রশ্নগুলির উত্থাপনের, বারে-বারে উত্থাপনের, জরুরতটা থেকেই যায়।

উপন্যাস নিয়ে, কবিতা নিয়ে আলোচনা অনেক হয়েছে। তুলনায়, ছোটগল্প বেশ উপেক্ষিত। একে, এখন-অব্দি, উপন্যাসেরই একটা বাই-প্রডাক্ট ব’লে ধ’রে নেওয়া হচ্ছে মনে হয়।

উপস্থিত আমাদের সম্বল কিছু পাঠশালাপাঠ্য পশ্চিমী ধারণা—যথা, মোপাসাঁ, গোগল, চেখভ, ক্যাথার, রবীন্দ্রনাথ, মম; যথা, উপন্যাসের চেয়ে আকারে ঢের ছোটখাটো, প্রকারে আঁটোসাঁটো, সূচনা-ব্যাপ্তি-উপসংহারে নিবিড় নিয়মনিষ্ঠ, ঘটনার ঘনঘটা আর ব্যাপক চিন্তনের ভারমুক্ত একটা সুচিক্কণ রচনা; আর—রবিবাবুর বেদবাক্য: শেষ হ’য়ে হইল না শেষ। এ-ই, প্রায়, সবটুকু। এসব দিয়ে চ’লেও যাচ্ছিল ভালোই, অনেকদিন। কিন্তু এখন ন’ড়েচ’ড়ে বসতে হচ্ছে আবার। ছোটগল্প তার এইসকল তকমা পরতে চাইছে না আর। যেন। ব্রাত্য রাইসুর মতো লেখকদের গল্প পড়তে গিয়ে আমাদের আবার ভাবতে বসতে হচ্ছে—তাহলে ছোটগল্প কী জিনিস।
——————————————————–
ধান ভানতে শিবের গীত রাশিদা গা’ন না, আর ধান ভানেনও প্রায় কোনো কলাকৌশল ছাড়া, একেবারে ম্যাটার-অব-ফ্যাক্ট ভঙ্গিতে। তবে এই “সারল্য”-কে প্রকরণদক্ষতার অভাব হিসাবে পরিগণনারও অবকাশ থাকে, কেননা সারল্য তো দুই প্রকারের হ’তে পারে : অর্জিত, এবং অজ্ঞানপ্রসূত (বা অভিজ্ঞ ও অনভিজ্ঞ)। কিন্তু কোনো পাঠক কারো লেখায় এর দেখা পেলে তাকে কোন্‌টি ব’লে ধ’রে নেবেন?
——————————————————–
ছোটগল্পের সঙ্গে উপন্যাসের প্রধান যে-ভেদচিহ্নটি, মানে আকার, তা-ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, এবং এই চ্যালেঞ্জ খুব সদ্যস্তনও নয়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘নষ্টনীড়’-কে গল্প, আর ‘দুই বোন’ আর ‘মালঞ্চ’-কে উপন্যাস বলেছেন। কেন? অমিয়ভূষণের ক্ষুদ্র রচনা ‘মধু সাধু খাঁ’ কেন উপন্যাস? কেন কনরাডের ‘হার্ট অব ডার্কনেস’? প্রসঙ্গতঃ, হাসান আজিজুল হকের ‘বৃত্তায়ন’-এর কথা পাড়া যাক। (পেঁচা প্রকাশনা থেকে) বইটার প্রথম সংস্করণের প্রকাশের সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। হাসান স্যর এটিকে তখন গল্পই বলতেন, আমাদেরই পেড়াপিড়িতে এটাকে “উপন্যাস” হিসাবে গ্রন্থস্থ করতে নিমরাজি হয়েছিলেন তিনি। আমি পরে ভেবেছি যে রচনাটির বিষয়ে তাঁর প্রাথমিক সিদ্ধান্তটি যথার্থ ছিল। কেন ভেবেছি?

পাঠক হিসাবে, গল্পে কী পড়তে আমি নিজে চাই? কী চাই লিখতে, গল্পে? আমার চাওয়া, উপন্যাসের ক্ষেত্রে কি আলাদা? কবিতার ক্ষেত্রে?

একটা প্রাথমিক, এবং ঈষৎ মোটাদাগের জবাব হ’ল: গল্পে আমি (এখানে একটা সুনির্দিষ্ট আমি, মানে জনাব সু.অ.গো.) সমাজতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব, রাজনীতি, অর্থনীতি, কামসূত্র, দর্শন, অথবা এনজিও বা খবরের কাগজের রিপোর্টিং পড়তে চাই না। আমার ধারণা, গল্প না-প’ড়ে সেইসকল বিষয়ের বই বা কাগজপত্র পড়লে আমার উপকার বেশি হবার সম্ভাবনা।

এ তো কী-চাই-না বলা হ’ল; কী-চাই বিষয়ে বক্তব্য কী আমার? সেটা অবশ্য খুব পরিষ্কার নয় আমারই মনে। তবে, আমার কাছে কোনো সাহিত্যরচনা অ্যাপিল করে আনন্দ দিয়ে, প্রধানতঃ। আনন্দ মানে অবশ্য হাস্যরস নয়। আনন্দের নানা রূপ, রকিতমা। তবে একটা মোটামুটি অবধারণযোগ্য বৈশিষ্ট্যে আমি তাকে শনাক্ত করতে পারি : মুক্তি। আমার ভিতরে “মুক্তি”-র বোধ জাগায় যা, তাকে আমি বলি আনন্দ। মুক্তি—বাস্তবের থেকে, নানা অনাবশ্যক আড়ম্বর আর গূঢ়ৈষার থেকে, নিজের মুখোশের, বর্মের, “প্যর্সন্যালিটি”-র থেকে—স্বপ্নের, বা স্বপ্নকল্প এক উন্মোচনের ভিতর।

হামেশা খেয়াল করেছি যে নিজেকে গল্পের ভিতরে ঢুকিয়ে ফেললে, মুক্তি নয়, আরেক বন্ধনযন্ত্রণায় নিয়ে ফেলা হয়, আর, গল্পটিকে শিল্পবস্তু হিসাবে চেনবার সুযোগও যায় ক’মে। যে-গল্প যত বেশি মর্মস্পৃক্ তত কম হয়তো তা গল্প। যেন। এই হিসাবে, রাশিদা সুলতানার, অন্ততঃ এই বইটার গল্পগুলি আমার কাছে অনেকটাই সার্থক।

রাশিদার গল্প, প্রথমেই বলা দরকার, আমার দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ তেমনএকটা নয়—অন্ততঃপক্ষে তাঁর এই বইটির বাবদে এ-কথা বেশ জোরগলাতেই বলা চলে; ফলে, গল্পগুলির সাথে আমার দরকারি দূরত্ব বড়খুব ব্যাহত হয় না। এই দূরত্বটুকু তাঁর গল্পে প্রবেশের একটা প্রাথমিক আমন্ত্রণপত্রস্বরূপ আমার কাছে। এমনকি যে-গল্পগুলিকে (সখেদে বলতে হয় যে বেশিরভাগ গল্পই এ-শ্রেণির) তথাকথিত রিয়ালিস্টিক গল্পের ঘরানায় ফেলে দেওয়া চলে, তাদেরও সঙ্গে আমার নিজের জাগতিক অভিজ্ঞতার সংস্রব যতটুকু, তাকে পরোক্ষ অভিজ্ঞতাই বলতে শেষপর্যন্ত হয়। মানে চরিত্রগুলো, ঘটনাগুলো একেবারে অপরিচিত না-হ’লেও, এই পরিচয় অনেকটাই পরস্মৈপদী, এবং খোদ লেখকেরও পক্ষে হ’তে পারে তারা তা-ই। আর, তা হয় যদি, বলা যায় যে যে-পরোক্ষতা আমাকে গল্পগুলিকে পড়ায় উদ্বুদ্ধ করেছে, তা-ই লেখকেরও মধ্যে গল্পকে গল্প হিসাবে লেখার জন্য সহায়ক নৈর্ব্যক্তিকতা সরবরাহ করেছে।

এই নৈর্ব্যক্তিকতা, বা আপাত-নির্লিপ্তি, রাশিদার গল্পের সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট। তাঁকে কখনোই নিজ গল্পে বিবেকের ভূমিকায় হাজির দেখা যায় না; সমাজতান্ত্রিক, রাজনীতিক, নৈয়ায়িক কি মনস্তাত্ত্বিকের ভূমিকাতেও নয়। রাশিদার লেখায় এইসকল মহৎ উদ্দেশ্য শনাক্ত করতে কষ্টকল্পনায় ভর-করা-বৈ চারা থাকে না। এই শান্তিটুকু কার গল্পে পাওয়া তেমন যায় আর আজকাল? আর কার গল্প স্রেফ গল্প পড়তেই পড়া আর যায়? আজ যখন নানা মাধ্যমে ফিউশন হচ্ছে, তখন গল্পের সঙ্গে (শহীদুল জহির বা ব্রাত্য রাইসুর মতো) কবিতার ফিউশন না-ক’রে কেন যে হাঁফানি-বর্ধক প্রবন্ধের, সন্দর্ভের সঙ্গে ফিউশনে মেতেছেন আজকের গাল্পিকেরা, কে বলবে। এক ভারি শুষ্কং কাষ্ঠং কালে এসে আমরা পড়েছি। এমন কথাও শুনতে আকছার পাই যে গল্প যদি গল্পই কেবল, কেন তা পড়া। তো যাঁদের পাঠাভ্যাস এইরূপ, ‘পরালালনীল’ তাঁদের ডেস্কে না-থাকা বেহ্তর।

রাশিদার গল্পের দ্বিতীয় প্রশংসার্হ বৈশিষ্ট্য এই যে পড়বার সময়ে আমরা কখনোই বিস্মৃত হই না যে গল্পকার স্ত্রীজাতীয়া। নারীবাদ (প্রায়) কোথাও নাই—জোরজবরদস্তি পুরুষ ব’নবার লেশমাত্র অভিপ্রায়টুকু গোচরে আসে না; এই নির্ভার, নির্ভান নারীত্ব, আমাকে তার সবটুকু নাঈভটি সহকারেই আনন্দ দেয় এর বিশ্বস্ততা আর প্রাঞ্জলতায়।—“আনন্দ” কথাটা লিখেই ফেলেছি এখানে; যদিও, এ-আনন্দ নিখাদ নয়। তবে খাদের কথায় পরে আসছি।

ধান ভানতে শিবের গীত রাশিদা গা’ন না, আর ধান ভানেনও প্রায় কোনো কলাকৌশল ছাড়া, একেবারে ম্যাটার-অব-ফ্যাক্ট ভঙ্গিতে। তবে এই “সারল্য”-কে প্রকরণদক্ষতার অভাব হিসাবে পরিগণনারও অবকাশ থাকে, কেননা সারল্য তো দুই প্রকারের হ’তে পারে : অর্জিত, এবং অজ্ঞানপ্রসূত (বা অভিজ্ঞ ও অনভিজ্ঞ)। কিন্তু কোনো পাঠক কারো লেখায় এর দেখা পেলে তাকে কোন্‌টি ব’লে ধ’রে নেবেন? বলা মুশকিল; মুশকিল, কারণ তার যথাযথ নির্ধারণার জন্য লেখকের এক-দু’টি নয়, তাঁর নানা সময়ের অনেক লেখা পড়া দরকার, তাঁর লেখক হিসাবে বেড়ে ওঠবার ইতিহাসটিকে ঠাহর করতে পারা দরকার। কিন্তু কার তত সময় আজকাল আছে আর। ফলে সমালোচকদের চৌকাঠস্থ হওয়া-ছাড়া গতি কী। কিন্তু সমালোচকই বা কোথায় আমাদের। আছে কেবল পাল-কে-পাল স্তাবক আর নিন্দক, বা বড়জোর ভাবসম্প্রসারক বা ভাবসঙ্কোচক। সমালোচক নৈব নৈব চ।

আমি নিজে রাশিদার লেখা সবগুলি গল্পই পড়েছি, মানে বই হ’য়ে বেরিয়েছে যেগুলি। তাঁর ‘অপনা মাঁসেঁ হরিণা বৈরী’ আর ‘আঁধি’-র সব গল্প প’ড়ে এসেই ‘পরালালনীল’-এ উপনীত হয়েছি। এবং এই নাতিহ্রস্ব পথ-পরিক্রমায় যে-গল্পটিতে এসে আমার মনে হয়েছে যে তাঁর প্রকরণদক্ষতার অভাব নিয়ে মনে যে মৃদু অসোয়াস্তি ছিল এতকাল, তাকে সন্দেহ করবার, পুনর্বিবেচনা করবার একটা কারণ ঘ’টে গেছে, তা ‘স্বপ্নমঙ্গল’। গল্পটিকে রাশিদার লেখক-জীবনের একটা বাঁকবদলের চিহ্ন ব’লেও ভাবতে ইচ্ছা করে। এটি একটি স্বপ্নদৃশ্য, আর গল্পের নামকরণে তা ব’লে দিয়েই লিখছেন রাশিদা। কিন্তু স্বপ্ন দেখা যত সহজ (সহজ নাকি, আসলেই?) স্বপ্ন প্রণয়ন তত কঠিন। আমাদের চেতন মনের আছর আমাদের চেতন-অবস্থার কোনো কাজে না-ফেলা আমাদের পক্ষে প্রায়-অসম্ভব। গল্পটা আমি উৎকণ্ঠা নিয়ে পড়েছি : পদে-পদে ভয় পেয়েছি, এই বুঝি হেলে পড়ল বাস্তবের ছিঁচকাঁদন বা উইশফুল-থিংকিঙে-ভরা দিবাস্বপ্নের দিকে। না, রাশিদা ভয় দূর করেছেন আমার। একেবারে শেষপর্যন্ত হাল ছাড়েন নি নৌকার। ঘাটে ভিড়েওছেন এমন নিপুণ দক্ষতায় যে গল্পটা শেষ হবার পর হাট ব’সে গেছে নদীপাড়ে। রবি ঠাকুরের শেষ হ’য়ে হইল না শেষ নয়, এ যেন শেষ হ’য়ে হইল সে শুরু। এই কথাটি আমরা গল্পের অন্যতম সংজ্ঞা স্বরূপ পেশ করতে চাই এখন: ছোটগল্প শেষ হবার পর শুরু হয়।

এ এক নোতুন শুরু, রাশিদার। অবশ্য এর ঈষৎ প্রতিভাস তাঁর প্রথম দিক্কার কিছু গল্পে (যথা ‘প্রত্যাখ্যাতা প্রতিশ্রুতা’) আবিষ্কার করা দুরূহ নয়। কিন্তু ঐ গল্পগুলির সঙ্গে এক কাতারে একে ফেলা যে কিছুতেই যায় না আর, তার প্রধান কারণ গল্পের সঙ্গে ব্যক্তি-লেখকের নান্দনিক অসম্পৃক্তি, আর গল্প বলবার প্রকরণ-সমৃদ্ধ ভঙ্গি। আর গল্পটির শেষ অংশটুকু—আহ্! আমার পড়া পৃথিবীর তাবৎ শ্রেষ্ঠ গল্পের সমাপ্তিকে প্রায় ম্লান ক’রে দেওয়া… অভাবিতপূর্ব—অনবদ্য—কবিতা!

কিন্তু কেবলই এই গল্পটিকে নিয়ে বললে, অন্য গল্পগুলিকে মিথ্যা ক’রে দেওয়া হয়, এবং তা হয় ঘোর অন্যায়, এবং তাতে রাশিদার অনেকগুলি প্রধান অর্জনকে অস্বীকার করবার দুর্যোগ তৈরি হয়। ‘স্বপ্নমঙ্গল’-এর বরং বিস্তৃততর আলোচনা হ’তে পারে তাঁর পরের বইটি নিয়ে লেখবার সময়, সেই বইটির অগ্রদূত-হিসাবে।

ঠিক ‘স্বপ্নমঙ্গল’-এর ধরনে যদিও নয়, তবু অন্য গল্পগুলিও, প্রচলিত ছঁকের ভিতরে থেকেও, দেখতে পাচ্ছি তাদের অবকাঠামো পর্যায়ে কিছু সূক্ষ্ম নাড়া খেয়ে গেছে। পরিবর্তনের চিহ্নগুলি মিহি, কিন্তু অদৃশ্য নয় একেবারে। আগের বইটি পর্যন্ত, স্রেফ ব’লে যাওয়ার যে-অভ্যাস রাশিদার, তাকে এই প্রথম খানিকটা কাবু করবার প্রয়াস যেন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে; দেখতে পাচ্ছি তিনি গল্পের সূচনা আর উপসংহারে মনোযোগী হয়েছেন, এবং হামেহাল পাঠককে চমকে দিতেও পারছেন (‘আলিমের নিভৃতিচর্চা’-য় যেমন)। এই সবই শুভলক্ষণ, যদি অবশ্য ‘বাঙ্গালীর হাসির গল্প’-এর হঠাৎ-ডাক্তারি-বিদ্যা-বিহ্বল নাপিতের দশায় গিয়ে না-পড়েন লেখক। তবে রাশিদা সেই দশায় পড়বেন না ব’লেই আমার বিশ্বাস। গল্পের পর গল্পে দেখছি, তিনি ক্রমাগত শিখে যদিও চলেছেন, নবলব্ধ শিক্ষার দ্বারা বেএক্তিয়ার হ’য়ে কদাচ পড়েন নি।

‘স্বপ্নমঙ্গল’-এর পর, আমার মতে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য, বইটির নাম-গল্প ‘পরালালনীল’। রাশিদা প্রায় কখনোই “প্লট-সচেতন” ন’ন, এবং পাঠক হিসাবে আমিও প্লটের বড়একটা তোয়াক্কা যদিও করি না, এই গল্পটির প্লটের বিশেষ প্রশংসা আমাকে করতেই হচ্ছে। প্লট বলতে এখানে অবশ্য চমৎকার ঘটনাবলির বুদ্ধিদীপ্ত বিন্যাস নয়, বরং যে-বাতাবরণের ভিতর গল্পটা ঘ’টে উঠছে, তার কথা বলছি। রাশিদার প্রায় সব গল্পের মতোই, এ-গল্পেরও চরিত্রগুলি বাস্তবিক এবং বিশ্বাসযোগ্য, ঘটনাগুলিও—কিন্তু কী যেন একটাকিছু আছে তাদের মধ্যে যা বাস্তব হ’য়েও ঠিক বাস্তব নয়, অবিশ্বাস প্রতিপাদন না-ক’রেও সন্দেহজনক। এই যে এক মধ্যবয়স্কা, সমাজের উচ্চকোটির মনোরঞ্জিনী, একদা বারাঙ্গনা এখন মালকিন, যার প্রেমে কেউ পড়েছে, কেউ অযাচিত দিয়েছে অনেক, কেউ অযাচিত পেয়েছে, প্রায় যে-কোনো কোর্টেজানের জীবন তার, কোনোখানে সংশয়ের অবকাশ নাই কোনো।

কিন্তু—কিন্তু সে কবিতা লেখে (অনেকটা আমাদের মশহুর বাঈজিদের মতো? যেমন ওমরাও জান বা গহর জান?); কিন্তু সেটাও নয়। বেশ গা-ছমছমে, দ্বিতীয় এক আভ্যন্তর জীবন সে যাপন করে; নিসর্গ যেখানে ঝাপ্টায়-ঝাপ্টায় ঢুকে প’ড়ে মারাত্মক-সব তালগোল পাকিয়ে দিয়ে যায়। আর তার আত্মহত্যা বা তার চেষ্টা, গল্পের যেখানে শেষ—ঐ অনুপম মুহূর্তটিতে পাঠক-আমি ধন্ধে প’ড়ে যাই: যেমন ভাবা যেতে পারত, মানে তার জাগতিক সম্পর্কগুলি, অবদমনগুলি, আশা-সঙ্কটের নানা টানাপড়েন, প্রেম-প্রত্যাখ্যান—এইসব কিছুই হয়তো নয়, বরং এক উটের গ্রীবার মতো নিস্তব্ধতাই তাকে ঠেলে দিয়েছিল ঐ অব্যাখ্যাত পরিণতির দিকে। কিন্তু রাশিদা তা বলেন না, ব’লে দেন না, অন্ততঃ এই গল্পে দেন না, আর ঐ নীরবতাটুকু অনির্বচনীয়কে স্পর্শ ক’রে ফ্যালে, যেন পাঠকের অজান্তে, এমনকি লেখকেরও।

‘রাহুর আরোহী’-তে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ গল্পের পটভূমি হ’য়ে আসে—এই প্রথম, সম্ভবতঃ, রাশিদার গল্পে। কিন্তু এটি প্রথাগত মুক্তিযুদ্ধের গল্প নয়, বরং তার প্রেক্ষাপটে কিছু মানুষের মেটামর্ফসিসের বয়ান। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে শুরু ক’রে তার বহুবছর পর-অবধি, প্রায় ঈশ্বরের চোখের মতো হেনা পাঠ ক’রে গেছে এই বিচিত্র রূপান্তরকাব্য। দেখেছে তার স্বামীর নিষ্ঠুর স্বার্থপরতাকে হঠাৎ বদ্লে যেতে এক আত্মঘাতী বীরত্বে; দেখেছে তার শালপ্রাংশু শ্বশুরের দয়াভিক্ষু অপোগ- দশা; দেখেছে ঝর্না নাম্নী প্রাণথৈথৈ মেয়েটিকে ছিন্নভিন্ন মাংসের টুকরা-টাকরায় বদ্লে যেতে। কিন্তু, যুদ্ধ থেকে বাঁচিয়ে-তোলা সবেধন ছেলেটি যখন অশুভ রাজনীতি আর ড্রাগ র‌্যাকেটের শিকার হ’য়ে কারারুদ্ধ হ’ল, আর তার তদবির করতে গিয়ে অবহেলিত হ’তে তাকে হ’ল এক প্রাক্তন শান্তিকমিটি মেম্বার, বর্তমান মন্ত্রীর কাছে, তার পুরো জীবনের সবটুকু অনর্থের বোঝা তার মাথার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল রোজ কেয়ামতের আকাশের মতো…।

গল্পটির কৃৎকৌশল অসাধারণ। ঘন-ঘন ফ্ল্যাশব্যাক, সময়ের নানা স্তরে স্বচ্ছন্দ বিচরণ, গল্পের সময়টাকে একটা সময়হীনতায় বদ্লে দিয়েছে, আর তার ভিতরে চরিত্রগুলির, অনুভবগুলির বিকাশ আর বিবর্তন আরও স্পষ্ট হ’য়ে উঠেছে পাঠকের চোখে।

‘বারিধি’ গল্পটি আলাদা উল্লেখের দাবি হয়তো করে না, তবু রাশিদার গল্পভুবনের পরিধির আন্দাজ করতে এর পাঠ জরুরি। গল্পকারের আগের লেখাগুলির ধারাবাহিকতা এই গল্পে সবচেয়ে প্রকট। এখানে বিস্ময় উদ্রেকী কোনো উপাদান নাই, গল্পের শুরু থেকে শেষপর্যন্ত কোনো মোচড় নাই কাহিনিতে, শুধু একটা জীবনের কথা বলা হয়েছে, একেবারেই সরলভাবে, সরলরৈখিকভাবে। এই সারল্যের একটা আলাদা মূল্য অবশ্য আছে। তবে, তবু, এই গল্প শেষ হবার সাথে-সাথে শেষ হ’য়েই যায়, শুরু হয় না আর।
——————————————————–
যে-আনন্দ তাঁর গল্পগুলি আমাকে দিয়েছে, তা সম্পূর্ণ নিখাদ নয়। যেসকল খচখচানিগুলি আমার মনে মাঝেমধ্যে তৈরি হয় তা প্রধানতঃ তাঁর গল্পের ভাষা- এবং প্রকাশভঙ্গিকেন্দ্রিক। রাশিদার ভোকাব্যুলারি কিছুটা সীমিত; তদুপরি কিছু ভাষিক দুর্বলতা (যেমন, লোকচলতি এবং প্রায় অর্থহীন বিশেষণের প্রয়োগ, অশৈল্পিক ক্লিশে-বাহুল্য, ইত্যাদি), এইসকল কাটিয়ে ওঠার চেষ্টাও তাঁকে করতে হবে একটু।
——————————————————–
‘কর্কট’-কেও আপাতদৃষ্টে ‘বারিধি’-র সমজাতীয় গল্প মনে করা যেতে পারত হয়তো; কিন্তু এ-গল্পে প্রচুর উদ্বোধনের ইঙ্গিত আছে, আছে এক অদৃশ্য আলো, যাতে অসুস্থ আর গতযৌবনা বারবনিতা নুরজাহান থেকে-থেকে উদ্ভাসিত হ’য়ে ওঠে। চরিত্রটি এক আধো-ভুলে-যাওয়া-কিন্তু-মগজে-চেপে-বসা গানের টুকরার মতো বাজতেই থাকে প্রাণে। রিয়ালিস্টিক গল্প যতটা মর্মবিদারী হ’তে পারে এ-গল্প ততটাই। কিন্তু সেটাই এ-গল্পের বিষয়ে শেষ কথা নয়। কেবলই আমাদের চেতন স্তরে কাজ করে না গল্পটা, অবচেতনেও একটা গভীর ছাপ ফেলে নিশ্চয়ই দেয়। কী সব প্রাচীন, ভয়াবহ, পাথুরে ছবি ছলকে ওঠে যেন স্বপ্নের ভিতরে… কী-সব উপাখ্যান… ডিমিটার-পের্সেফোনি-হেডিজ…। গানের ক্ষেত্রে, গায়কদের “দরদ”-এর কথা বলা হয়, মাঝারি বা নিকৃষ্টমানের কথাকেও বাণী ক’রে তুলতে যা পারে—আমাদের শচীন কর্তা যা প্রায় হর-গানে দেখিয়েছেন—রাশিদাও দেখালেন যেন, এই গল্পটিতে।

‘নাহার বেগমের শেষ দিনগুলি’ গল্পের প্রচলিত নিয়মনীতির ভিতরকার, এবং একেবারে নিটোল। যে-কোনো ধরনের পাঠকেরই ভালো লাগবার কথা এই গল্প। আমার এক পরমাত্মীয়ার কথা মনে পড়ছে, যাঁর মাত্র একটা দাঁত, এবং একটা দাঁত মাজবার জন্য বিশেষ ধরনের টুথব্রাশের বায়নাক্কা যাঁর। পুনর্মূষিকের মতো পুনর্বালিকা এই বৃদ্ধার জন্য, এবং আমার সব চেনা-অচেনা পলিতকেশ কিশোরীর জন্য একটু গোপন অশ্রুমোচনের অবকাশ ক’রে দিয়েছে গল্পটি। রাশিদাকে ধন্যবাদ।

‘আলিমের নিভৃতিচর্চা’-র শেষে একটা চমৎকার চমক আছে। এবং এই গল্পটি, রাশিদার গল্পের ধারায় আরও একটা নোতুন সূচনার ইশারা বটে। মানে, স্রেফ বর্ণনা নয়, গল্প “বানাবার” দক্ষতাও যে তাঁর যথেষ্টই আছে, তার নজির এই গল্প (এবং, বলা বাহুল্য, ‘স্বপ্নমঙ্গল’)। অপিচ বইয়ের বাদবাকি গল্পগুলির প্রায় শ্বাসরোধী সিরিয়াসনেসের পর এ একটা অতিপ্রার্থিত রিলিফ-ও বটে।

সব মিলিয়ে, ‘পরালালনীল’ রাশিদা সুলতানার, লেখক হিসাবে পরিণতির দলিল। আমরা আশা করব, যে-মানে এসে তাঁর লেখনী উপনীত হয়েছে এই বইটিতে, তাকে ধ’রে রাখবার এবং উন্নততর করবার প্রয়াস তাঁর অব্যাহত থাকবে। তবে, উপরে যেমন বলেছিলাম, যে-আনন্দ তাঁর গল্পগুলি আমাকে দিয়েছে, তা সম্পূর্ণ নিখাদ নয়। যেসকল খচখচানিগুলি আমার মনে মাঝেমধ্যে তৈরি হয় তা প্রধানতঃ তাঁর গল্পের ভাষা- এবং প্রকাশভঙ্গিকেন্দ্রিক। রাশিদার ভোকাব্যুলারি কিছুটা সীমিত; তদুপরি কিছু ভাষিক দুর্বলতা (যেমন, লোকচলতি এবং প্রায় অর্থহীন বিশেষণের প্রয়োগ, অশৈল্পিক ক্লিশে-বাহুল্য, ইত্যাদি), এইসকল কাটিয়ে ওঠার চেষ্টাও তাঁকে করতে হবে একটু।

অনেক দিন পর (অনেক অনেক দিন পর) একটা আস্ত গল্প বই পড়তে পারলাম, জঘন্য ব্যস্ততার মধ্যেও। রাশিদার গল্পে কিছু না-থেকে কি পারে?

সিডনি, অগাস্ট ২০০৯

augustine.gomes@gmail.com

ওয়েব লিংক
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: আর্টসফেসবুক
রাশিদা সুলতানা: আর্টসফেসবুক

free counters

প্রতিক্রিয়া (30) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Chintamon Tussher — আগস্ট ২৪, ২০১০ @ ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন

      ——————————————
      আশা করব সম্পূর্ণ বাংলা শব্দে রচিত রচনা
      ——————————————
      আপনার লেখা অনেক পড়েছি কাগজে আজকে পড়লাম ওয়েবে, যা একটা অনুভূতি জাগায় বোঝাবার মতো নয়। কিন্তু বর্তমান লেখাটি একটি সমালোচনা হিসেবে মানছি এবং প্রশংসাও করছি। যদি লেখা শুরুর প্যারাতে কোন বিদেশী শব্দ না থাকতো।

      পড়তে শুরু করলাম এবং গলায় কাঁটা বাঁধালাম। জানি না এটা আপনার সমালোচনার আভিজাত্য কিংবা গাম্ভীর্য বজায় রাখার জন্য নাকি একান্তই অনিচ্ছাকৃত। তবে যাই হউক না কেন; আশা করব সম্পূর্ণ বাংলা শব্দে রচিত রচনা। ভালো থাকবেন।

      – Chintamon Tussher

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুমন রহমান — আগস্ট ২৪, ২০১০ @ ৩:৫৬ অপরাহ্ন

      —————————————————————-
      ছোটগল্পের “পাঠশালাপাঠ্য পশ্চিমী ধারণা”র যে ফিরিস্তি সুব্রত দিলেন, তার বাইরে বাংলা ছোটগল্প অনেককাল ধরেই হাঁটাহাঁটি করছে
      —————————————————————-

      রাশিদা সুলতানার গল্পের আলোচনা লিখতে গিয়ে বাংলা গল্প নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন তোলার প্রয়াস পেয়েছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। প্রথমত, রাশিদা-র গল্প প্রসঙ্গে তিনি দুইবার ব্রাত্য রাইসু এবং একবার শহীদুল জহিরের গল্পের প্রসঙ্গ পেড়েছেন। “পরালালনীল” প্রসঙ্গে তিনি পরবর্তীতে যা লিখেছেন তাতে উল্লিখিত গল্পকারগণ কোথায় আসন পান সেটা আমাকে ভাবাচ্ছে। তিনি কি বলতে চাইছেন যে, রাশিদা সুলতানা শহীদুল জহির এবং ব্রাত্য রাইসু ঘরানার গল্পকার (ব্রাত্য রাইসু ও শহীদুল জহিরকে এক ব্রাকেটবন্দি করার যৌক্তিকতাও ব্যাখ্যা দাবি করে)? অথবা, তিনি কি বলতে চাইছেন গোটা সমকালীন গল্পে এই তিনজনাই তার বিচারে উৎকৃষ্ট গল্পলেখক? আর ব্রাত্য রাইসুর গল্প পড়ার পর বাংলা গল্প নিয়ে তিনি নতুন যা যা ভাবলেন তা শুনবার আগ্রহ রইল, যা এই লেখা পাঠে মিটিল না। ভণিতা-আকারে জানা হল মাত্র।

      দ্বিতীয়ত, রিডাকশনিস্ট বা খারিজি অ্যাপ্রোচ বিদ্যাজাগতিক আলোচনায় খুব সুবিধার জিনিস নয়। তার ওপর, এই রচনাটি যেসব প্রিমাইজের ওপর দাঁড়িয়ে রিডাকশনিস্ট হতে চাচ্ছে, সেগুলো নিজেরাই যথেষ্ঠ নড়বড়ে। ছোটগল্পের “পাঠশালাপাঠ্য পশ্চিমী ধারণা”র যে ফিরিস্তি সুব্রত দিলেন, তার বাইরে বাংলা ছোটগল্প অনেককাল ধরেই হাঁটাহাঁটি করছে, সেটা তার গোচরে নাই এটা আমি ভাবতে পারি না। তার উদ্ধৃত শহীদুল জহিরসহ অনেকেই কেরানিসুলভ বিশ্বস্ততায় লাতিন আমেরিকান জাদুবাস্তবতার চর্চা করছেন। আমার ধারণা, মান্ধাতার আমলের ইংরাজি সাহিত্য নয়, বরং সমকালীন বাংলা ছোটগল্পের ওপর আগ্রাসী হয়ে বসতে চাইছে জাদুবাস্তবতা, যেমন সে এতকাল বসেছে বিশ্বসাহিত্যের অপরাপর লেখকদের ঘাড়ে, এর মোহিনী শক্তির মায়ায় আমরা শহীদুল জহিরসহ অনেক প্রতিভাবান গল্পকারকে ঘুরপাক খেতে দেখেছি। ব্যাপার এমন দাঁড়িয়ে গেছে যে, কোনো গল্প ভাল লাগলেই আমরা ভেবে বসি এটা যাদুবাস্তব গল্প!

      সুব্রত বলছেন, নিজেকে গল্পের ভেতর ঢুকিয়ে ফেললে আরেক বন্ধনযন্ত্রণায় পড়তে হয়, গল্পটাকে শিল্পবস্তু হিসেবে চেনার সুযোগ কমে যায়। এটাও খুব একতরফা মন্তব্য, বা বলা যায় এতে সুব্রত-র দৃষ্টিভঙ্গিটাই প্রাধান্য পেয়েছে। লেখক তার গল্পের ভেতরে ঢুকবেন না বাইরে থাকবেন, সেটা ঐ লেখক ও তার গল্পের বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভর করে। ফার্স্ট পার্সন ন্যারেটিভে যেমন উৎকৃষ্ট গল্প বিস্তর আছে, তেমনি থার্ড পার্সন ন্যারেটিভেও।

      গল্পকার তার গল্পের ফিউশন কবিতার সাথে করলেই সেটা বেহতর হয়ে যাবে, আর (হাঁফানিবর্ধক) প্রবন্ধের সাথে করলে সেটা যাবে না—এটাও স্কুলপালানো ধারণা। কে ফিউশনটা করছেন এটা হল বিষয়, কবিতা বা প্রবন্ধ বিষয় নয়। এখন সুব্রত-র যেহেতু প্রবন্ধে হাঁপানি ওঠে, ফলে তিনি নিশ্চিতভাবেই এটা করতে যাবেন না। নিজের জন্য যা প্রযোজ্য নয় তা অন্যের জন্য প্রযোজ্য হতেও পারে। সাহিত্য তো নানারকমেই করা যায়। গেছে। যাবে।

      ইত্যাকার ক্যাঁচালগুলো থাকায় এই লেখাটায় নেট লস হল রাশিদা সুলতানার। রাশিদা-র গল্পের ওপর এত চোখজুড়ানো আলোচনা থাকার পরেও মনোযোগ এখানে পড়ে যায়।

      সুমন রহমান
      ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়া

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোয়াজ্জেম আজিম — আগস্ট ২৪, ২০১০ @ ৬:২৯ অপরাহ্ন

      ——————————————–
      “সাহিত্যরচনা অ্যাপিল করে আনন্দ দিয়ে”
      ——————————————–
      একটি গল্পগ্রন্থকে ধরে সমসাময়িক গল্প সাহিত্যের যে চরিত্র ও তার কাছ থেকে চাওয়া-পাওয়ার স্বরূপ আপনি উন্মোচন করলেন, তা এক কথায় চমত্কার। “সাহিত্যরচনা অ্যাপিল করে আনন্দ দিয়ে” এবং তা পড়ে শেষ করা যায় কিনা এটা যে যে-কোন সাহিত্যের প্রাণভোমরা এই সহজ সত্যটি সহজে বোঝানো যায় না। আপনাকে এবং লেখককে অশেষ ধন্যবাদ।

      -মোয়াজ্জেম আজিম

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ — আগস্ট ২৫, ২০১০ @ ৯:৫২ পূর্বাহ্ন

      ——————————————–
      জাদুবাস্তবের গল্প, গল্প হয় যদি, সুখপাঠ্য হয় যদি, আমার প্রাণ তাতে মুক্তি পায় যদি, তাকে নিতে বাধা কোথায়?
      ——————————————–
      সুমন রহমান, অনেক ধন্যবাদ আমার লেখাটা খুঁটিয়ে পড়বার, এবং তা নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করবার জন্য।

      তবে বোধ হচ্ছে যে আপনার কাছে আমার কথাগুলি বাক্যের আকারে যত গেছে, গানের আকারে তত নয়। মানে আমার কথাগুলির সরল মাজেজাটা আপনি নিয়েছেন, মেজাজটা নেন নি, নিতে পারেন নি, বা নিতে চান নি। এর একটা প্রধান কারণ হ’তে পারে (এ একেবারেই অনুমান, ভুল হ’লে ধরিয়ে দেবেন), আমার রচনায় শহীদুল জহির এবং ব্রাত্য রাইসুর উল্লেখ। এবং উল্লেখমাত্রই আপনি হয়তো তেলেবেগুনে জ্ব’লে উঠে ভেবে ফেলেছেন যে এই দু’জনকে একালের শ্রেষ্ঠ গাল্পিকের আসন আমি দিয়ে বসলাম, এবং রাশিদা সুলতানাকেও তাঁদের ঘরানা (?) -ভুক্ত ক’রে নিলাম।

      খেয়াল করুন আবার আমার বাক্যটিকে, সেখানে প্যারেনথিসিসের ভিতর নাম-দু’টি উল্লিখিত হয়েছে, “কেবলই” এটুকু বলতে যে তাঁদিগের গল্পে আমি গল্পের সঙ্গে কবিতার ফিউশন দেখতে পাই। এতেই তাঁদেরকে একালের শ্রেষ্ঠ গল্পকার বলা হয় কীনা আমি জানি না, বা বলা হ’লেই সমস্যা কোথায় ঘটে, যদি এটা হয় আমার ব্যক্তিগত ধারণা? আর এটাও ঠিক যে প্রবন্ধ নিজেও কবিতা হ’য়ে দাঁড়াতে পারে, প্রমথ চৌধুরীতে সেটা হামেশা দেখতে পাই, তো এখানে প্রবন্ধ বলতে প্রাবন্ধিকতা, গাদ্যিকতা, তথ্যবাহুল্য, রিপোর্টপনাই, আমি বুঝিয়েছি। আপনি তা বোঝেন নি নাকি বুঝতে চান নি তা আপনি বলতে পারবেন।

      বাংলায় যে পশ্চিমী প্রেসক্রিপশনের বাইরে গল্প লেখা হয়েছে তার নজির আমাকে আপনি দেখান, সুমন। গল্প সময়ের সরলরেখায় চলবে, একটা নির্দিষ্ট শুরু থেকে একটা নির্দিষ্ট সমাপ্তির দিকে, পশ্চিমের এ-ই কি প্রেসক্রিপশন? তা হ’য়ে থাকলে তো প্রথম থেকেই বাংলা গল্প একে অমান্য ক’রে আসছে… রাইসুর গল্পে এমন একটাকিছু আছে যা একেবারেই পশ্চিমের নয়, পূর্বেরও নয়, যা সকল প্রেসক্রিপশনকেই কাঁচকলা দেখায়। আপনি অন্ততঃ বাংলাদেশে একটা গল্পকারকে দেখান যাকে এই অর্থে প্রথাবিবিক্ত বলা চলে, আমি না হয় এনজিও গল্পকারদের ভুলেই যাচ্ছি আপাততঃ। জাদুবাস্তবের গল্প, গল্প হয় যদি, সুখপাঠ্য হয় যদি, আমার প্রাণ তাতে মুক্তি পায় যদি, তাকে নিতে বাধা কোথায়? শ.জ.-কে লেখক হিসাবে খারিজ ক’রে দেওয়া, শুধুমাত্র এই অভিযোগে, হাস্যকর নয়?

      গল্পের ভিতর নিজেকে ঢুকিয়ে ফেলার মানে কি উত্তম পুরুষে গল্প বলা!!! আমি এখানে যা বলতে চেয়েছি তাকে হরেদরে নেগেটিভ ক্যাপাবিলিটি বলা হয়ে থাকে। মানে লেখক এবং লেখার ভিতর নাটক আর দর্শকের মতো একটা ব্যবধান, যার আড়াল থেকে শিল্পবস্তুকে শিল্পবস্তুরূপে দেখা যেতে পারে… শিল্পকে নিজের সর্বাঙ্গে মলম মেখে রাখলে তা মলম না অঙ্গ তা আর বোঝা যেতে পারা সহজ নয়। কেউ কেউ যে পারেন না, তা বলি না… কেউ কেউ বলেন, কঠিনেরে ভালবাসিলাম, সে কখনও করে না বঞ্চনা।

      পরিশেষে, এবং আবার… আমার লেখাটিকে আপনি তার্কিকের আর দার্শনিকের বিবেচনা দিয়ে আক্রমণ করেছেন, লেখকের বা পাঠকের মন দিয়ে নয়… অথচ আমার প্রিয়তম লেখকদের, কবিদের, আপনি একজন।

      সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ
      সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুমন রহমান — আগস্ট ২৫, ২০১০ @ ৭:৪১ অপরাহ্ন

      ———————————————
      অভিপ্রায় একটা অধরা জিনিস, একে নাড়াচাড়া না-করাই ভাল। বিশেষত প্রকাশ্য আলোচনায়।
      ———————————————

      সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, আপনার সহৃদয় প্রতিক্রিয়ার জন্য ধন্যবাদ।

      প্রথমত, প্রবন্ধ বা আলোচনাকে আমি দার্শনিকের বা তার্কিকের বিবেচনা দিয়েই দেখার চেষ্টা করি। কারণ, আমার ধারণা, একটা আলোচনা যুক্তির ওপরই দাঁড়ায়। তর্কে আমার আগ্রহ দুর্নিবার, অথচ আপনাকে সেটা আজও বিমর্ষ করে দেখা গেল। আপনি শুধু আমারই নন, বহুজনের প্রিয়তম কবি/লেখক, কিন্তু সেই ভক্তি থেকেই যদি আপনার সকল উক্তি বিবেচনা করতে থাকি, তাতে বিপদ হবার সম্ভাবনা বরং বেশি।

      আমি “তেলবেগুন” হলাম কিনা সে আমার আলোচনাই বলবে। আপনি যা লিখেছেন তাকেই উপলক্ষ করে আমার আলোচনা আমি করেছি, আপনার অভিপ্রায়কে উদ্দেশ্য করি নি। অথচ আপনি আমার আলোচনার সমালোচনা করতে গিয়ে আমার মনস্তত্ত্বের ওপর হামলে পড়লেন। অভিপ্রায় একটা অধরা জিনিস, একে নাড়াচাড়া না-করাই ভাল। বিশেষত প্রকাশ্য আলোচনায়।

      আপনি আমাকে দেখাতে বললেন, বাংলায় “পশ্চিমী প্রেসক্রিপশনের বাইরে” কোনো গল্প লেখা হয়েছে কিনা। কিন্তু আপনাকে তো এর আগে দেখাতে হবে ব্রাত্য রাইসু (বা অন্য কেউ) পশ্চিমা প্রেসক্রিপশনের বাইরে গল্প লিখেছেন। যেহেতু আপনি এই বয়ান দিয়েছেন। অবশ্য আপনার ব্যক্তিগত অভিমত হিসাবে একে মানতে আমার সমস্যা নাই। রাইসুর লেখায় আমারো মনোযোগ আছে।

      সমস্যা ঘটেছে অন্য জায়গায়। আপনি একত্র করেছেন শহীদুল জহির ও ব্রাত্য রাইসুকে। শহীদুল জহির জাদুবাস্তব ফর্মাটে লেখেন (কিন্তু এখানে পশ্চিমা প্রেসক্রিপশনে সমস্যা হচ্ছে না আপনার, যেহেতু তিনি ভাল লেখেন) আবার ব্রাত্য রাইসু, আপনার ভাষায়, পশ্চিম বা পূব কোনো ফর্ম্যাটেই যান না। এখন আপনি প্রথাগত লেখক শহীদুল জহিরের সাথে “প্রথাবিবিক্ত” লেখক ব্রাত্য রাইসুকে এক ব্রাকেটবন্দি করলেন কোন্ বিবেচনায়? নিশ্চয়ই তারা উভয়েই ভাল লেখেন এই বিবেচনায়। সমস্যা ঘটেছে এই জায়গায়। আপনি যদি ব্রাত্য রাইসুর নাম একলা উচ্চারণ করতেন “প্রথাবিবিক্ত” ক্যাটাগরিতে, তাহলে আমার বলবার কিছু ছিল না। সমস্যা বাঁধল যখন আপনার যুক্তির ওজন ভারি করার জন্য প্রথাগত লেখক শহীদুল জহিরের শরণ নিলেন। গুরুচণ্ডালি হয়ে গেল আর কি!

      এটুকুই আমার বলবার ছিল। শহীদুল জহির আমারও বিশেষ পছন্দের লেখক। আমি দেখাতে চেয়েছি, আপনার যুক্তিপ্রয়োগের ধরনের কারণেই তিনি খারিজ হয়ে যান।

      সুমন রহমান
      ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়া

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ — আগস্ট ২৬, ২০১০ @ ৮:১৩ পূর্বাহ্ন

      —————————————————————-
      জাদুবাস্তবতা পশ্চিমা প্রেসক্রিপশন? লাতিন আমেরিকা পশ্চিম? আমি তো এমনকি পূর্ব ইয়োরোপকেও পশ্চিম মানি না…।
      —————————————————————-

      প্রিয় সুমন, নিজে পুরোপুরি যুক্তিশীল না-হ’লেও, সদ্-যুক্তিকে আমি হেয় জ্ঞান করি না। আমি যা নিতে পারি না (এবং এ একটা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা) তা কুতর্ক। আমি কারো ভক্তির প্রত্যাশা করি না, করলে ভক্তিমার্গ অবলম্বন করতাম অ্যাব ইনিশিও। আমি এক-এক ক’রে আপনার আপত্তির জায়গাগুলিকে বুঝতে চেষ্টা করব এবার:

      ১. “…কিন্তু আপনাকে তো এর আগে দেখাতে হবে ব্রাত্য রাইসু (বা অন্য কেউ) পশ্চিমা প্রেসক্রিপশনের বাইরে গল্প লিখেছেন।”

      এটা দেখানো কেমন ক’রে সম্ভব তা যদি ব’লে দেন, আমি দেখাব তখন। আমি আপাততঃ যা বলতে পারি তা হ’ল, পশ্চিমা গল্প যদ্দূর পড়া আছে আমার, তাতে আমি নানাপ্রকারের “বয়ান”-কে শনাক্ত করতে পারি। এ নিয়ে কাঠামোবাদীরা প্রায় বৈজ্ঞানিক গবেষণাও করেছেন (যেগুলিতে আমার মতো নাদানের ভক্তি আনা কঠিন অবশ্য)। রাইসুর বয়ানকে ঐসকল শনাক্ত-কৃত বয়ানের সঙ্গে আমি মেলাতে পারি না। আমার মন্তব্যে ভিত্তি এই অনুধাবনটুকু, যা, অবশ্যই সাবজেক্টিভ, এবং যাকে অপ্রমাণ করা অসম্ভব নয়। কিন্তু অপ্রমাণযোগ্যতাই বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠা দেয়, এ-কথা, বোধ করি, পপার বলেন।

      ২. “…সমস্যা ঘটেছে অন্য জায়গায়। আপনি একত্র করেছেন শহীদুল জহির ও ব্রাত্য রাইসুকে।”

      একত্রীকরণ এবং একীভবন এক কথা নয়, সুমন। আমি একই ঘরে সাপ আর বেজিকে রাখলেই তারা উভয়েই সাপ বা বেজি হ’য়ে যায় না। আপনার এই কথাটাকেই আমি বলব সেইরূপ কুতর্ক যা বলে যেহেতু রবীন্দ্রনাথ এবং রামছাগল উভয়েরই দাড়ি আছে, রবীন্দ্রনাথ রামছাগল। আমি এই দু’জনের ভিতর একটা সামান্য গুণের উল্লেখ করেছিলাম, সেটা হ’ল কবিতার সঙ্গে ফিউশন। এটা বলার মানে এ নয় যে এ দু’জন হুবহু পদার্থ। হুবহুর দরকার হ’লে আমি বলতে পারতাম যে “রাইসু আর রাইসুতে যেমন দেখা যায়” বা, নিদেনপক্ষে, “রাইসু আর রাইসুর-মতোদের মধ্যে যেমন দেখা যায়”। লেজ নিয়ে কথা বললে আমি নিশ্চয়ই খচ্চর আর খেচর এতদুভয়ের উল্লেখ করতে পারি, একই ব্র্যাকেটে, কিন্তু তাতে তারা একই জিনিস তা নিশ্চয়ই বলা হয় না।

      ৩. শহীদুল জহির জাদুবাস্তব ফর্মাটে লেখেন (কিন্তু এখানে পশ্চিমা প্রেসক্রিপশনে সমস্যা হচ্ছে না আপনার…)।

      এক. জাদুবাস্তবতা পশ্চিমা প্রেসক্রিপশন? লাতিন আমেরিকা পশ্চিম? আমি তো এমনকি পূর্ব ইয়োরোপকেও পশ্চিম মানি না, তো কাজেই কথাটাকে ইগনোর করা-ছাড়া কী করতে পারি। লাতিন আমেরিকাকে পশ্চিম বলতে হ’লে বাংলাদেশের বাইরে সকল দেশকেই তা বলতে হয় বোধ হয়।

      দুই. পশ্চিমা প্রেসক্রিপশনে আমার সমস্যা হচ্ছে যে খুব তা আমি বলি নি। পশ্চিমে অনেক ভালো সাহিত্য হয়েছে। আমি বলতে চেয়েছিলাম যে ছোটগল্পের যেটুকু সংজ্ঞার্থ পাঠশালাগুলিতে চোলাই হ’য়ে আমাদের পাতে এসে প’ড়ে আসছে এযাবৎ, তাদের কথা।

      ৪. “… আপনি প্রথাগত লেখক শহীদুল জহিরের সাথে “প্রথাবিবিক্ত” লেখক ব্রাত্য রাইসুকে এক ব্রাকেটবন্দি করলেন কোন্ বিবেচনায়? নিশ্চয়ই তারা উভয়েই ভাল লেখেন এই বিবেচনায়। সমস্যা ঘটেছে এই জায়গায়। আপনি যদি ব্রাত্য রাইসুর নাম একলা উচ্চারণ করতেন “প্রথাবিবিক্ত” ক্যাটাগরিতে, তাহলে আমার বলবার কিছু ছিল না। সমস্যা বাঁধল যখন আপনার যুক্তির ওজন ভারি করার জন্য প্রথাগত লেখক শহীদুল জহিরের শরণ নিলেন। গুরুচণ্ডালি হয়ে গেল আর কি!”

      এর জবাব, অনেকটাই ২ নম্বরে আছে। বাড়তিটুকু এখানে: এঁদের “ভালো লেখার” যুক্তিতে, বা “প্রথাবিবিক্তির” যুক্তিতে একত্রিত করা হয় নি, কাজেই আপনার এই ইনডাকশনগুলি অত্যারোপণ দোষে দুষ্ট। আর, আমি যেকালে কোনো যুক্তিই দিই নি, আমার ধারণা প্রকাশ করেছি-মাত্র, সেখানে আমার যুক্তির ওজন ভারি করতে জহিরকে কেন টানব? তা করতে হ’ত যদি আমাকে, তো আরও ভালো লেখক নাই আর বাংলা ভাষায়? আমি তো জগদীশ গুপ্ত কি অমিয়ভূষণকে স্মরণ করতে পারতাম, বা নিদেন সন্দীপনকে?

      পরিশেষে, আমার যুক্তিপ্রয়োগের ধরনে শহীদুল জহির খারিজ হ’ন না, আমি যুক্তিপ্রয়োগ করি নি তাঁকে বহাল বা খারিজ করতে, এবং তা করি নি আলোচ্যমান লেখক রাশিদাকেও বহাল বা খারিজ করতে। ঐ কর্ম রিভিউয়ারদের। আমি নাদান, ভালো লাগলে ভালো বলি, খারাপ লাগলে খারাপ; মুখে চুমা দিয়ে পোঁদে বাঁশ দিতে (বা ভাইসি ভার্সা) শিখি নি। সেরকম করা যে খারাপ তাও বলি না। আমি বলি না যে আমি যা-যা পারি না, এবং সুমন রহমান যা-যা পারেন তা-তা-ই খারাপ। উল্টোটাই বলি, বিশ্বাস করেন।

      ভবদীয়
      সু.অ.গো.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Chintamon Tussher — আগস্ট ২৬, ২০১০ @ ১০:৫২ পূর্বাহ্ন

      আপনার লেখায় যে মেজাজের কথা বললেন তাতে শাব্দিক আভিজাত্যের উৎকর্ষ সাধনের চেষ্টা ছাড়ি আর কিছু মনে হলো না। আর যদি কেউ মন্তব্য করতে গিয়ে তেলেবেগুনে হন তাহলে তা উগরিয়ে না দিয়ে হজম করতে হয়।

      – Chintamon Tussher

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুমন রহমান — আগস্ট ২৬, ২০১০ @ ৬:৪৯ অপরাহ্ন

      —————————————————————-
      সভ্যতার “পশ্চিম” সাহিত্যের “পশ্চিম” নয়। এভাবে ভাবলে ভুল করা হবে, অন্তত এই কালে। আমার কাছে লাতিন আমেরিকার সাহিত্য হল সাহিত্যের “পশ্চিম”।
      —————————————————————-

      “আমি নাদান, ভালো লাগলে ভালো বলি, খারাপ লাগলে খারাপ; মুখে চুমা দিয়ে পোঁদে বাঁশ দিতে (বা ভাইসি ভার্সা) শিখি নি। সেরকম করা যে খারাপ তাও বলি না।”

      — হাঃ হাঃ হাঃ। উদ্ধৃতাংশের শেষ বাক্যটা এর আগের বাক্যগুলোকে খারিজ করে দেয় কিন্তু!

      একটা ভুল স্বীকার করে নিই। আপনি কবিতার ফিউশনকারী গদ্যকার হিসেবে এক ব্রাকেটে শহীদুল জহির ও ব্রাত্য রাইসুকে আনতেই পারেন। ওটা কুতর্ক নয়, আমার বোঝার ভুল ছিল। দুঃখিত এজন্য।

      তবে, যেহেতু পারসেপশন নিয়েই কথা হচ্ছে যুক্তি নিয়ে নয়, সে জায়গা থেকে বলি: রাইসুর গদ্য যতটুকু পড়েছি তাতে তার মধ্যে কবিতার ফিউশন আমি দেখি নি। নির্ভার নিপাট গদ্যই দেখেছি। শহীদুল জহির যে অর্থে প্রায় মর্মে-মর্মে কাব্যময়, বা ইলিয়াস, সেরকম কোনো আলামত রাইসুর মধ্যে আমি পাই না। রাশিদা সুলতানাকেও কাব্যভনিতাহীন লাগে।

      এখানেই প্রশ্ন জাগে, কেন তারা এলেন, রাশিদার গল্পের আলোচনায়? এ প্রশ্নের জবাব দেয়া সম্ভব, কিন্তু তাতে আমাকে আপনার অভিপ্রায়ের ভাষা পাঠ করে শোনাতে হবে, আপনি যেমন করেছেন প্রথম মন্তব্যে। এটা আমার ধরন নয়। আমি প্রকাশিত বিবৃতি থেকেই আলাপ পছন্দ করি। এমনকি অভিপ্রায় বোঝার পরেও। :)

      সভ্যতার “পশ্চিম” সাহিত্যের “পশ্চিম” নয়। এভাবে ভাবলে ভুল করা হবে, অন্তত এই কালে। আমার কাছে লাতিন আমেরিকার সাহিত্য হল সাহিত্যের “পশ্চিম”। শহীদুল জহির সহ আরো অনেককে এই আগ্রাসী, ভয়ংকর প্রভাববিস্তারকারী সাহিত্য তার ফর্ম ব্যবহার করতে বাধ্য করছে। আগের মন্তব্যে ইংরেজি সাহিত্যকে “মান্ধাতার আমলের” অভিধায় ভূষিত করার মাধ্যমে সেই ইংগিত রেখেছিলাম।

      রাইসুর গল্প কোথায় একেবারে আলাদা হয়ে যায়, সেটা ব্যাখ্যা করা নিশ্চয়ই যায়। প্রমাণ করার কিছু নাই। যা শনাক্তযোগ্য, তাহা ব্যাখ্যাযোগ্য নিশ্চয়ই। আর যেহেতু রাইসুর গল্প বাংলা ভাষাতেই প্রকাশিত, ফলে তার গল্পের অনুধাবন বাংলাভাষায় প্রকাশযোগ্য নিশ্চয়ই। আমার ধারণা আপনি একটু অভিনিবেশ দিলে সেই ব্যাখ্যাটা পেয়ে যাব আমরা। আপাতত অপেক্ষায় থাকলাম।

      বরং রাশিদা সুলতানার গল্প নিয়েই আলোচনা আগাক এখানে। ভালো থাকুন।

      – সুমন রহমান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আয়শা ঝর্না — আগস্ট ২৬, ২০১০ @ ৯:০৫ অপরাহ্ন

      —————————————————————-
      বাংলাদেশের প্রবীণ-তরুণ অনেক গল্পলেখক আছেন যারা কাজ করেছেন, করে যাচ্ছেন–সেখানে রাইসুর মতো লেখকের নাম উল্লেখের প্রয়োজনই আসে না।
      —————————————————————-

      রাশিদা সুলতানার পরালালনীল নামক গল্পগ্রন্থটি সেবারের মেলাতেই পড়া হযেছিল। এবার সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের আলোচনা পড়ে তাতে আলো এসে পড়লো। সুব্রত রাশিদার গল্পগুলো নিয়ে যত উচ্ছ্বাস দেখিয়েছেন, সেই সাথে ব্রাত্য রাইসুর গল্পকেও টেনে এনেছেন এটা ভাল লাগেনি। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে ছোটগল্পের অনেক পরিবর্তন এসেছে, তা বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য বজায় রেখেই। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ বাইরে থাকেন বলে হয়তো তার খোঁজ পান না। বাংলাদেশের প্রবীণ-তরুণ অনেক গল্পলেখক আছেন যারা কাজ করেছেন, করে যাচ্ছেন–সেখানে রাইসুর মতো লেখকের নাম উল্লেখের প্রয়োজনই আসে না।

      – আয়শা ঝর্না

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজু আলাউদ্দিন — আগস্ট ২৯, ২০১০ @ ১১:৩৯ অপরাহ্ন

      ————————————————–
      বদলগুলো কোথায় এবং কীভাবে ঘটছে তার কোন হদিস নেই এই লেখায়।
      ————————————————–

      আলোচনার প্রথমেই “ছোটগল্প কী? তা কত প্রকার? কেন লেখা হয়? কেন পড়া হয়” এরকম প্রশ্ন তো আছেই, উপরন্তু ‘একজন অলেখক-পাঠক এবং একজন লেখক-পাঠক’—এই দুই ভিন্ন অস্তিত্বের জানানও দিয়েছেন সুব্রত। ফলে আশা করা গিয়েছিলো তিনি ছোটগল্পের নানান দিক সম্পর্কে—গল্পকারকে নিয়ে আলোচনার সূত্রে—আমাদেরকে বিস্তারিত কিছু জানাবেন। বিস্তারিত না হলেও অন্তত প্রধান কতগুলো বৈশিষ্ট্য তো জানাবেন। কেন না তিনিই বলেছেন ”প্রশ্নগুলো উত্থাপনের, বারে-বারে উত্থাপনের জরুরতটা থেকেই যায়।” কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের যে তিনি এইসব প্রশ্ন উত্থাপন করে, পরে উপন্যাসের সামনে ছোটগল্পকে দাঁড় করিয়ে বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা শুরু করলেন। ব্যাপারটা এমন যেন উপন্যাসের আবির্ভাব না ঘটলে ছোটগল্পের চরিত্র নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়তো।

      তিনি বলেছেন “ছোট গল্প উপন্যাসেরই একটা বাই-প্রডাক্ট।” তথ্য হিসেবে এটা কতটা ঠিক এ নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। ভারতীয় জাতক কিংবা প্রতীচ্যের ইশপ ফেবলকে মনে করা হয় ছোট গল্পের উৎস হিসেবে। অন্যদিকে, এটা তো পাঠ্যপুস্তকে প্রায় ঘোষিত যে উপন্যাসের শুরু কলোনিয়াল যুগে এবং ফর্ম হিসেবে নতুন বলেই এর নামও দেয়া হয়েছিলো নভেল। অতএব ছোটগল্পকে ‘উপন্যাসের বাই-প্রডাক্ট’ বলা হবে কেন? আর ছোটগল্প নিয়ে যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন তার উত্তরের জন্য উপন্যাসের উপস্থিতিই বা জরুরী হবে কেন, আমি তা বুঝতে পারছি না। আর আলোচনাটি যেহেতু পরালালনীলসম্পর্কে সেখানে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের প্রধান ছোটগল্পকারকের রচনার প্রেক্ষিতে বিবেচনা করলেই তো– যদি তিনি সেটা করতেই চান—আমরা বইটির গুরুত্ব বা গুরুত্বহীনতাকে চিহ্নিত করতে পারি। সেভাবে তিনি এগিয়েছেনও, বলেছেন ‘রবিবাবুর বেদবাক্য: শেষ হয়ে হইল না শেষ’—’এই রকম তকমা পরতে চাইছে না আর।’ তার মানে ছোটগল্প রবীন্দ্রনাথের পরে বদলে গেছে। কিন্তু বদলগুলো কোথায় এবং কীভাবে ঘটছে তার কোন হদিস নেই এই লেখায়। সুব্রত হয়তো বলবেন, এতসব বদল দেখাবার ইতিহাস তিনি লিখতে বসেন নি, তিনি শুধু পরালালনীল আলোচনা করতে বসেছেন। তাহলে বলবো তিনি যেহেতু এই বইটির বিশিষ্টতা দেখাতে চাইছেন, এবং সেই সূত্রে রবীন্দ্রনাথ তথা বাংলা ছোটগল্পের প্রসঙ্গও এনেছেন সুতরাং, আমরা এই হসিদটা যুক্তিসঙ্গতভাবেই আশা করতে পারি। সুব্রত সেদিকে যাননি। যদিও নানান কথার ফুলঝুরি, অনুপম বাচনের রীতিতে এটি একটি ফাঁপানো নিবন্ধ হয়ে উঠেছে। আমাদের এখানে প্রবন্ধ সাহিত্যের বা পুস্তকালোচনার যে অসার ধারা গড়ে উঠেছে, সুব্রত এই লেখাটির মাধ্যমে সেই ধারারই সম্প্রসারণ হয়ে উঠলেন।

      সেই কবে সৈয়দ হক-এর অনন্য বিশ্লেষণে প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’, জগদীশ গুপ্তের ‘দিবসের শেষে’ ইত্যাদি গল্পের আলোচনা পড়ার সুযোগ হয়েছিল। অসাধারণ বিশ্লেষণী শক্তি আর ব্যাখ্যায় গল্পগুলোকে তিনি নতুন অর্থে আমাদের সামনে হাজির করেছিলেন। গল্পের কাঠামো, প্লটের নির্মাণ ও বিষয়বস্তু সবই এর অন্তর্ভুক্ত। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন কেন এবং কী কী কারণে ঐ গল্পগুলো অন্যদের চাইতে আলাদা। নিছক অসার প্রশংসার হাওয়াই মিঠাই তৈরি করে বাচ্চাদের বোকা বানানোর চেষ্টা করেন নি তিনি। ১০ গ্রাম চিনি দিয়ে বিপুলাকৃতির হাওয়াই মিঠাই দিয়ে অপরিপক্ক কোন লেখককে তুষ্ট করা সহজ, কিন্তু গভীর মননশীল পাঠকদের কাছে এর আদৌ কোন মূল্য আছে কি?

      আলোচনার নমুনা হিসেবে আরও দু একটি উদাহরণ আমি হাজির করতে চাই সুব্রতর এই লেখাটিকে ভালোভাবে বোঝার জন্য। এক. কাফকার ‘মেটামরফসিস’-এর উপর অক্তাবিও পাস-এর একটি আলোচনা পড়েছিলাম বহু আগে; একেবারেই ছোট্ট, হয়তো এক পৃষ্ঠার, কিন্তু তাতেই তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন কেন এটি সেই এপুলিয়াস এর স্বর্ণ-গর্দভ থেকে আলাদা; কারণ এই গ্রন্থের নায়ক লুসিয়াসও রূপান্তরিত হয়েছিলো একটি প্রাণীতে; গাধায়। অন্য দিকে, গ্রেগর সামসা এক বিরাট আরশোলায়। আমরা জানি লুসিয়াস কেন গাধায় রূপান্তরিত হলেন, আমরা জানি তার পাপগুলো। কিন্তু গ্রেগর সামসার ব্যাপারে কাফকা তেমন কিছুই বলেন না। কিন্তু পরিস্থিতির বর্ণনা থেকে আমরা ধীরে ধীরে কারণগুলোর ইঙ্গিত পেতে শুরু করি। দুই. মিলান কুন্ডেরার আলোচনায় কাফকার বিচার উপন্যাসের ‘কে’ চরিত্র। কুন্ডেরা তাঁর অসামান্য এক আলোচনায় আমাদেরকে অপরাধ ও শাস্তি নামক উপন্যাসের রাস্কলনিকভ-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পরামর্শ দিয়ে বললেন, রাস্কলনিকভ তার অপরাধের বোঝা বহন করতে পারছে না, সে সুখের অন্বেষণ করতে গিয়ে নিজের স্বাধীন ইচ্ছাকে শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থাৎ ‘অপরাধ অনুসন্ধান করেছে শান্তির’। অন্যদিকে, বিচার-এর দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত জোসেফ কে তার শাস্তির কারণ জানে না। কিন্তু সে জানতে চায়। ব্যাপারটা এখানে উল্টো স্রোতে বইতে শুরু করলো। অর্থাৎ ’শাস্তি খুঁজে ফিরছে অপরাধকে।’

      এই তুচ্ছ উদাহরণগুলো দিচ্ছি এই কারণে যে আমরা যখন কোন লেখক বা কোন বই নিয়ে আলোচনা করবো তখন অনিবার্যভাবেই তার সাথে অন্যদের তুলনা প্রতিতুলনার মাধ্যমেই আমরা বুঝতে পারবো এর নতুনত্ব, এর আলাদা বৈশিষ্ট্য।

      সুব্রত এই তুলনার একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন, কিন্তু কেন এবং কোথায় এই পরালালনীল আলাদা তা আলোচনা করে দেখান নি। অথচ বলেছেন ‘অনেকটাই সার্থক’, ‘প্রশংসার্হ বৈশিষ্ট্য’। কিন্তু কীসের সাপেক্ষে? আমরা তা কখনোই জানতে পারি না। বরং ‘ভাবসম্প্রসারক’ শব্দাবলী দিয়ে একটি ডাগর বাগান তৈরি করেছেন সুব্রত, কিন্তু বৈশিষ্ট্যের বা অর্থের একটি ফুলও তাতে ফুটতে দেখা যায় না।

      আলোচনার এক জায়গায় তিনি বলেছেন, ‘গল্পটির কৃৎকৌশল অসাধারণ, ঘন ঘন ফ্ল্যাশব্যাক, সময়ের নানা স্তরে স্বচ্ছন্দ বিচরণ, গল্পের সময়টাকে একটা সহনীয়তায় বদলে দিয়েছে আর তার ভিতরে চরিত্রগুলির অনুভবগুলির বিকাশ আর বিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পাঠকের চোখে।’ কৃৎকৌশল হিসেবে এই যে বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হলো, এগুলো কি আগে বহু সিনেমায় কিংবা উপন্যাসগুলোয় ছিলো না? আলেহো কার্পেন্তিয়েরের উপন্যাসগুলো কিংবা হুয়ান রুলকোর পেদ্রো পারামো কিংবা মার্কেসের শতবর্ষের নির্জনতায় কি এই কৃৎকৌশলের ব্যবহার আমরা দেখি নি? এখন প্রশ্ন হলো, এই গল্পকার যদি সেই একই কৃৎকৌশল ব্যবহার করে থাকেন—তা করলেই যে অসাধারণ হওয়ার সুযোগ নেই তা আমি বলছি না—কিন্তু কীভাবে তা অসাধারণ সেটা আমাদের বুঝতে ইচ্ছে করে। আর যেহেতু তার আগে অন্য লেখকরা এই কৃৎকৌশল ব্যবহার করেছেন এবং এই গল্পকারও যেহেতু করেছেন বলে সুব্রত দাবি করছেন, অতএব তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে তা দেখানোটাই হবে সঙ্গত। তা না হলে, ‘অসাধারণ’ বলে সুব্রতর এই দাবি অজ্ঞতাপ্রসূত বলে পাঠক মনে করতে পারেন।

      আলোচনার আরেক জায়গায় সুব্রত বলেছেন, ’আজ যখন নানা মাধ্যমে ফিউশন হচ্ছে তখন গল্পের সঙ্গে (শহীদুল জহীর বা ব্রাত্য রাইসুর মতো) কবিতার ফিউশন না করে কেন যে হাঁফানি-বর্ধক প্রবন্ধের, সন্দর্ভের সঙ্গে ফিউশনে মেতেছেন আজকের গাল্পিকেরা, কে বলবে।’ পরে সুমন রহমানের প্রতিক্রিয়ার জবাবে তিনি এও বলেন: “আর এটাও ঠিক যে প্রবন্ধ নিজেও কবিতা হয়ে দাঁড়াতে পারে, প্রমথ চৌধুরীতে দেখতে পাই, তো এখানে প্রবন্ধ বলতে প্রাবন্ধিকতা, গাদ্যিকতা, তথ্য বাহুল্য, রিপোর্টপনাই আমি বুঝিয়েছি।’

      প্রথম কথা হচ্ছে প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধ কবিতা পদবাচ্য হবে কিনা। খানিকটা রসাত্মক বর্ণনা এবং আবেগরঞ্জিত পর্যবেক্ষণ হলেই কি তা কবিতা হয়ে যায়? প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধকে যদি কবিতা হয়ে ওঠা বলি তা হলে বুঝতে হবে কবিতা বিষয়ক ধারণাটা বেশ তরল এবং নিচু মানের। শহীদুল জহীরকে না হয় এই তরল ধারণায় তাঁর গদ্যের সঙ্গে কবিতার ফিউশন ঘটিয়েছেন বলে দাবি করলেন কিন্তু ব্রাত্য রাইসুও কি তাই?

      ইদানীং কেউ একটু অতিপ্রাকৃত, অবাস্তব, পরাবাস্তব এবং ফ্যান্টাসী ধরনের কিছু লিখলেই তাকে যাদুবাস্তবতা বলে চালিয়ে দেয়া হয়। এগুলোর যে ভিন্ন প্রকৃতি এবং বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা আমরা বুঝতে পারি না। ফলে একটু আবেগদীপ্ত এবং রসাত্মক হলেই তা কবিতা বলে ভ্রম হয়।

      আজকের পোস্টমডার্ন সাহিত্যের পশ্চিমী ধারার এদিক-সেদিক তাকালেই দেখা যাবে কবিতার চেয়ে বরং প্রবন্ধের সাথেই—হাঁফানি-বর্ধক নয় মোটেই—ফিউশন বেশি ঘটেছে। সুতরাং আমাদের এখানে সেটা ঘটলে—যদি কেউ সফলভাবে ঘটাতে পারেন—তাহলে ক্ষতি কী?

      সুব্রত তাঁর আলোচনার এক জায়গায় বলেছেন “কিন্তু সমালেচকই বা কোথায় আমাদের। আছে কেবল পাল-কে-পাল স্তাবক আর নিন্দুক, বা বড়জোর ভাবসম্প্রসারক বা ভাবসঙ্কোচক। সমালোচক নৈব নৈব চ।” ঠিকই বলেছেন এই একটি জায়গায়, আমি তাঁর সাথে পুরোপুরি একমত। খারাপ লাগছে ঐ পাল-এর আয়তন বাড়ছে দেখে।

      সুব্রত হয়তো মানবেন সমালোচক না থাকার দুটো প্রধান কারণ হচ্ছে, এক. আমাদের এখানে যারা সমালোচক তাদের সাহিত্যরুচি এখনও পর্যন্ত নিম্নমানের; একেবারেই ব্যতিক্রম দু’একজন ছাড়া। দুই. আমাদের এখানে রুচিশীল, আধুনিক বা অগ্রসর কোন সমালোচনা সাহিত্য গড়ে উঠলো না তার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে আমাদের সমকালীন সাহিত্যের, মূলত কথাসাহিত্যের দারিদ্র। বিশ্বসাহিত্যের তুলনায় আমাদের কথাসাহিত্য হচ্ছে প্রাদেশিক ও কুপমণ্ডুক। এই কারণে তার কোন আয়ত ও গভীর জীবনদৃষ্টি নেই। নেই সার্বজনীন অনুভূতির শৈল্পিক বিন্যাস। ফলে সাহিত্য সমালোচনাও হয় সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের মতোই ভাবসম্প্রসারক, রুচিসম্প্রসারক নয়।

      – রাজু আলাউদ্দিন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জিয়া হাশান — আগস্ট ৩০, ২০১০ @ ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন

      স্মৃতি থেকে বলছি, রাশিদা সুলতানার আগের বই আঁধি নিয়ে সুমন রহমানের একটি আলোচনা আর্টস-এ পড়েছিলাম। তাতে সুমন রহমানের বক্তব্য ছিল রাশিদার গল্প মুড়মুড়কির মতো হজম করা যায় না। আবার না-পড়ে রাখাও বিপজ্জনক। কিন্তু তাঁর এ সতর্ক বাক্য সত্ত্বেও আমি ‘বিপজ্জনক’ অবস্থায় আছিলাম এত দিন।

      কিন্তু সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের লেখাটা এতই অনুপ্রেরণাদায়ক হয়ে উঠেছে যে, তা পড়ার পর গত সপ্তাহে আজিজ মার্কেট থেকে সংগ্রহ করে পরালালনীল পড়তে বাধ্য হয়েছি। তবে ‘স্বপ্নমঙ্গল’ ছাড়া বাকি গল্পগুলো না পড়ে ‘সুবিধাজনক’ অবস্থায়ই আছিলাম মনে হচ্ছে।

      – জিয়া হাশান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অরণ্য প্রভা — আগস্ট ৩০, ২০১০ @ ১১:৫৫ অপরাহ্ন

      সুব্রত এবং সুমনের প্রতিক্রিয়া পড়ে মনে হলো তারা পরিকল্পিতভাবে সমালোচনায় জড়িয়েছেন। আমরা চাই গঠনমূলক সমালোচনা।

      – অরণ্য প্রভা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ — আগস্ট ৩১, ২০১০ @ ১:৪৫ পূর্বাহ্ন

      ——————————————-
      আমি কী বলেছি আর আপনি আমি কী বলেছি বলছেন…
      ——————————————-

      প্রিয় রাজু আলাউদ্দিন,

      আপনার বিস্তারিত আলোচনার জন্য ধন্যবাদ। এ নিয়ে পরে লিখছি। আপাতত খেয়াল ক’রে দেখুন শুধু উপন্যাস আর ছোট গল্প নিয়ে আমি কী বলেছি আর আপনি আমি কী বলেছি বলছেন:

      আমি:

      একে [ছোটগল্পকে], এখন-অব্দি, উপন্যাসেরই একটা বাই-প্রডাক্ট ব’লে ধ’রে নেওয়া হচ্ছে মনে হয়।

      আপনি:

      তিনি বলেছেন “ছোট গল্প উপন্যাসেরই একটা বাই-প্রডাক্ট।”

      আপনি কি টের পাচ্ছেন যে আপনি আমার কথাকে তার উল্টো অর্থ দিচ্ছেন? আমি যেকালে জনারণ্যে প্রচলিত কথাটাকে এখানে ব্যঙ্গ করছি এবং বলতে চাইছি যে উপন্যাসের বাই-প্রডাক্ট ছোটগল্প নয়, বরং একটা স্বনির্ভর শিল্পমাধ্যম, সেখানে প্রচলিত ধারণাটা আপনি চাপিয়ে দিচ্ছেন আমারই উপরে! এবং তারপর জাতক-ফাতক টেনে নিয়ে এলেন আপনার মত প্রতিষ্ঠায়, যেখানে আপনার মত আমারই মত ছিল। আমার ধারণা এটা অনবধানবশত ঘটেছে, না হ’লে ব্যাখ্যা করবেন প্লীজ।

      সুব্রত।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ — আগস্ট ৩১, ২০১০ @ ২:২৬ পূর্বাহ্ন

      ———————————————–
      এই যে কথাগুলি, “আয়ত, গভীর জীবনদৃষ্টি, সর্বজনীন অনুভূতির শৈল্পিক বিন্যাস”—কী যে ক্লিশে, কী যে বিবমিষাকর…
      ———————————————–

      রাজু,

      আপনার কয়েকটা মন্তব্য বিষয়ে:

      “এই তুচ্ছ উদাহরণগুলো দিচ্ছি এই কারণে যে আমরা যখন কোন লেখক বা কোন বই নিয়ে আলোচনা করবো তখন অনিবার্যভাবেই তার সাথে অন্যদের তুলনা প্রতিতুলনার মাধ্যমেই আমরা বুঝতে পারবো এর নতুনত্ব, এর আলাদা বৈশিষ্ট্য।”

      – ১. উদাহরণগুলি “তুচ্ছ” হ’লে দেবার দরকার কী ছিল? ২. “…অনিবার্যভাবেই তার সাথে অন্যদের তুলনা প্রতিতুলনার মাধ্যমেই আমরা বুঝতে পারবো এর নতুনত্ব” – তাই নাকি? এটাই কি সাহিত্য বিচারের একমাত্র মান্য রীতি? আমার জানা ছিল না। কম্পেয়ারিটিভ লিটরেচর ব’লে একটা বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আছে ব’লে জানা যায়, তাদের এই রীতি শেখানো হয় কি না আমি জানি না। জাহির করবার বিদ্যার বা রুচির বা অভিপ্রায়ে ন্যূনতাবশত কেউ কেউ আবার তার ধার দিয়ে যানও না, যা নিয়ে বলছেন তা নিয়েই বলেন খালি। তো তাঁরা যে অশিক্ষিত, অযোগ্য, তাতে আর সন্দেহ থাকল না।

      “আর যেহেতু তার আগে অন্য লেখকরা এই কৃৎকৌশল ব্যবহার করেছেন এবং এই গল্পকারও যেহেতু করেছেন বলে সুব্রত দাবি করছেন, অতএব তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে তা দেখানোটাই হবে সঙ্গত। তা না হলে, ‘অসাধারণ’ বলে সুব্রতর এই দাবি অজ্ঞতাপ্রসূত বলে পাঠক মনে করতে পারেন।”

      – আবার তুলনামূলকতার আহ্বান! অন্য কেউ এসকল ডিভাইস ব্যবহার করেন নি সেটা কোনখানে বলা হয়েছে? এইসবই প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত। ব্যবহারের প্রশংসা এখানে নেই, আছে সুব্যবহারের প্রশংসা… এসবের কুব্যবহার আমি ঢের দেখেছি, কিন্তু এ-গল্পে রাশিদা বেশ পারদর্শিতা দেখিয়েছেন সময় নিয়ে খেলায়, এইটুকুই বলেছি।

      “শহীদুল জহীরকে না হয় এই তরল ধারণায় তাঁর গদ্যের সঙ্গে কবিতার ফিউশন ঘটিয়েছেন বলে দাবি করলেন কিন্তু ব্রাত্য রাইসুও কি তাই?”

      – তরল ধারার গদ্যের সঙ্গে… রাজু, “গদ্যের” সঙ্গে পদ্যের মিশ্রণের কথা আমি বলি নি। আমি কবিতা আপনার মতো না-বুঝলেও, কিছু আক্কেল আমার যে নাই এটা মানতে কষ্ট হয়। আমি বলেছি “গল্পের” সাথে “কবিতার” ফিউশনের কথা। কবিতা কিন্তু গদ্যেও হয়, আবার পদ্যে-লেখা সব রচনা-ই কবিতা নয়। অপিচ, পোয়েট্রি অব প্রোজ ব’লে একটা ব্যাপার আছে, যা আমি জহির বা প্র-চৌ-র রচনায় আস্বাদ করি, আমার আস্বাদন একটু তারল্যপন্থী বটে… রাইসুর গল্পের কবিতা আর জহিরের গল্পের কবিতা আলাদা বস্তু, নামাভাবে এক নামে ডাকছি, কিন্তু উভয়ই, তাদের আলাদাত্ব সত্ত্বেও, কবিতাই আমার কাছে। এ কবিতা, উভয়ত, গল্পের কবিতা, কবিতার কবিতা নয়।

      “ইদানীং কেউ একটু অতিপ্রাকৃত, অবাস্তব, পরাবাস্তব এবং ফ্যান্টাসী ধরনের কিছু লিখলেই তাকে যাদুবাস্তবতা বলে চালিয়ে দেয়া হয়। এগুলোর যে ভিন্ন প্রকৃতি এবং বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা আমরা বুঝতে পারি না। ফলে একটু আবেগদীপ্ত এবং রসাত্মক হলেই তা কবিতা বলে ভ্রম হয়।”

      আপনার প্রথম বাক্য দু’টির সাথে আমি কায়মনোবাক্যে একমত। কিন্তু, “একটু আবেগদীপ্ত এবং রসাত্মক হলেই তা কবিতা” এটা যদিও আমার ঘাড়ে চাপাতে চাইছেন, আমি এই মোট নিচ্ছি না। বয়স কম হ’ল না, কবিতার সঙ্গে সহবাসের ইতিহাসও কম দীর্ঘ নয় আমার—কবিতা খারাপ লিখি তো কী হয়েছে, আমি “তাই তো কবি গাহিয়াছেন”-এর সময় প্রায় একটা আয়ুষ্কাল পিছনে ফেলে এসেছি। তরল আবেগ দেখলে আমি কেঁদেটেদে ফেলি এখনও, কিন্তু কবিতার সার্টিফিকেট লিখতে ব’সে যাই না।

      “আজকের পোস্টমডার্ন সাহিত্যের পশ্চিমী ধারার এদিক-সেদিক তাকালেই দেখা যাবে কবিতার চেয়ে বরং প্রবন্ধের সাথেই—হাঁফানি-বর্ধক নয় মোটেই—ফিউশন বেশি ঘটেছে। সুতরাং আমাদের এখানে সেটা ঘটলে—যদি কেউ সফলভাবে ঘটাতে পারেন—তাহলে ক্ষতি কী?”

      আপনার “এদিক সেদিক” তাকানোর রেঞ্জ আমার তুলনায় ঢের বেশি বটে, কিন্তু আমি যেটুকু তাকিয়েছি, তাতে এর উল্টোটাই বেশি মনে হয়েছে—বা, এমন হ’য়ে থাকতে পারে যে উল্টোটা যেখানে সত্য নয়, সেসব লেখা পড়বার ধৈর্য আমার থাকে নি। আর ক্ষতির কথা আসছে কেন? ক্ষতি কোনোকিছুতেই নাই, পাঠক হিসাবে আমাকে হারানোটা যদি লেখকের ক্ষতি মনে না হয়, তো সবই লাভ।

      “সুব্রত হয়তো মানবেন সমালোচক না থাকার দুটো প্রধান কারণ হচ্ছে, এক. আমাদের এখানে যারা সমালোচক তাদের সাহিত্যরুচি এখনও পর্যন্ত নিম্নমানের; একেবারেই ব্যতিক্রম দু’একজন ছাড়া। দুই. আমাদের এখানে রুচিশীল, আধুনিক বা অগ্রসর কোন সমালোচনা সাহিত্য গড়ে উঠলো না তার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে আমাদের সমকালীন সাহিত্যের, মূলত কথাসাহিত্যের দারিদ্র। বিশ্বসাহিত্যের তুলনায় আমাদের কথাসাহিত্য হচ্ছে প্রাদেশিক ও কুপমণ্ডুক। এই কারণে তার কোন আয়ত ও গভীর জীবনদৃষ্টি নেই। নেই সার্বজনীন অনুভূতির শৈল্পিক বিন্যাস। ফলে সাহিত্য সমালোচনাও হয় সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের মতোই ভাবসম্প্রসারক, রুচিসম্প্রসারক নয়।”

      আমাকে “মানতে” বাধ্য ক’রে বলছেন, কাজেই মেনে নিয়ে শুরু করছি। আপনার এই উক্তিটি “আমাদের কথাসাহিত্য হচ্ছে প্রাদেশিক ও কুপমণ্ডুক। এই কারণে তার কোন আয়ত ও গভীর জীবনদৃষ্টি নেই। নেই সার্বজনীন অনুভূতির শৈল্পিক বিন্যাস”—এটি একটি মহান্ বাক্য, কারণ এটি যা বলছে এটি নিজে তা-ই: “প্রাদেশিক এবং কূপমণ্ডূক”। এই যে কথাগুলি, “আয়ত, গভীর জীবনদৃষ্টি, সর্বজনীন অনুভূতির শৈল্পিক বিন্যাস”—কী যে ক্লিশে, কী যে বিবমিষাকর…

      শুভ হোক।

      সুব্রত।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজু আলাউদ্দিন — সেপ্টেম্বর ৩, ২০১০ @ ২:২৫ পূর্বাহ্ন

      প্রিয় সুব্রত, আমি ভেবেছিলাম আপনি আমার বক্তব্য, ব্যাখ্যা এবং যুক্তিগুলো বুঝবার চেষ্টা করবেন। কিন্তু আপনার মন্তব্য পড়ে দেখতে পাচ্ছি আপনি সুস্থ্য তর্কের পরিবর্তে কুতর্কের জাল ছড়িয়ে দিয়েছেন। অথচ আপনি নিজেই সুমন রহমানের প্রতিক্রিয়ার জবাবে বলেছিলেন, “আমি যা নিতে পারি না (এবং এ একটা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা) তা কুতর্ক।” এত দ্রুত এই ব্যক্তিগত ব্যর্থতার পরিচয় দেবেন– তা আমি আশা করিনি। আর কেন একে কুতর্ক বলছি তা এক এক করে আপনার এবং আমার বক্তব্য পাশাপাশি হাজির করে দেখানোর চেষ্টা করবো। যদি ভুল বুঝে থাকি তাহলে আপনি আমাকে শুধরে দেবেন বলে আশা করি। আমি আমার ভুল স্বীকার করতে একটুও লজ্জাবোধ করবো না। কারণ, সাহিত্যে তর্ক বা কুতর্কের মাধ্যমে বিজয়ী হওয়ার কিছু নেই। আমি পরাজয়ের মাধ্যমে হলেও সত্যের কাছে পৌঁছাতে আগ্রহী। দেখা যাক আমরা কে কী বলেছিলাম।

      আপনার নিবন্ধে: “একে, এখন অব্দি, উপন্যাসেরই একটা বাই-প্রোডাক্ট বলে ধরে নেয়া হচ্ছে মনে হয়।”

      আমি বলেছিলাম এটা তথ্য হিসেবে ঠিক নয়।

      এ প্রসঙ্গে আপনার মন্তব্য:

      ”আপনি কি টের পাচ্ছেন যে আপনি আমার কথাকে তার উল্টো অর্থ দিচ্ছেন? আমি যেকালে জনারণ্যে প্রচলিত কথাটাকে এখানে ব্যঙ্গ করছি এবং বলতে চাইছি যে উপন্যাসের বাই-প্রডাক্ট ছোটগল্প নয়, বরং একটা স্বনির্ভর শিল্পমাধ্যম, সেখানে প্রচলিত ধারণাটা আপনি চাপিয়ে দিচ্ছেন আমারই উপরে! এবং তারপর জাতক-ফাতক টেনে নিয়ে এলেন আপনার মত প্রতিষ্ঠায়, যেখানে আপনার মত আমারই মত ছিল। আমার ধারণা এটা অনবধানবশত ঘটেছে, না হ’লে ব্যাখ্যা করবেন প্লীজ।”

      কুতর্কের খাতিরে নয়, সুব্রত, একেবারে সত্যের খাতিরেই বলবো গল্প যে উপন্যাসেরই বাই-প্রোডাক্ট এটা আপনার মত নয়, অন্য কেউ বলছে এবং আপনি তা উল্লেখ করেছেন। যদিও এর বিপক্ষে আপনার কোন স্পষ্ট বক্তব্য নেই। আপনি বলেছেন ‘ধরে নেয়া হচ্ছে মনে হয়’। কিন্তু এই উল্লেখের মাধ্যমে আমি আপনার কোন ‘ব্যঙ্গ’স্বর বা গল্পকে ‘স্বনির্ভর শিল্পমাধ্যম’ হিসেবে স্বীকৃতির সুর ধ্বনিত হতে শুনি নি এবং এখনও শুনি না। সুধী পাঠক, শুনিতে কি পান? তারপরেও, অনর্থক কুতর্ক এড়াবার খাতিরেই ভুল বুঝেছি বলে মেনে নিচ্ছি। কিন্তু গোল বাধে আপনার ঐ ‘জাতক-ফাতক’ উচ্চারণের মধ্যে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের কুৎসিত ও অশালীন রূপটি দেখে। আপনার তাচ্ছিল্য উপেক্ষা করেই জাতক বহুকাল টিকে থাকবে– সেটা আপনি স্বীকার করবেন নিশ্চয়ই।

      মন্তব্যে বলেছেন:

      ” উদাহরণগুলি “তুচ্ছ” হ’লে দেবার দরকার কী ছিল?

      “… (আমি বলেছিলাম): অনিবার্যভাবেই তার সাথে অন্যদের তুলনা প্রতিতুলনার মাধ্যমেই আমরা বুঝতে পারবো এর নতুনত্ব” – (আপনার প্রশ্ন) তাই নাকি? এটাই কি সাহিত্য বিচারের একমাত্র মান্য রীতি? আমার জানা ছিল না। কম্পেয়ারিটিভ লিটরেচর ব’লে একটা বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আছে ব’লে জানা যায়, তাদের এই রীতি শেখানো হয় কি না আমি জানি না। জাহির করবার বিদ্যার বা রুচির বা অভিপ্রায়ে ন্যূনতাবশত কেউ কেউ আবার তার ধার দিয়ে যানও না, যা নিয়ে বলছেন তা নিয়েই বলেন খালি। তো তাঁরা যে অশিক্ষিত, অযোগ্য, তাতে আর সন্দেহ থাকল না।”

      আমি মনে করি দরকার ছিলো। তুচ্ছ হলে দেয়া যাবে না–এমন কোন বিধান কি আছে ? আপনার বলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে তুচ্ছ নয়, ‘বড়’ই শুধু দরকারী। কেউ একজন– এ মুহূর্তে নাম মনে পড়ছে না–বলেছিলেন, ছোট ছোট জিনিসগুলো হচ্ছে বৃহৎ কিছুর দর্পণ। তবু বলবো, ‘তুচ্ছ’ বা ‘বৃহৎ’-এর তর্কে না গিয়ে এ কথা কি বলা যায় না যে আমার বক্তব্যকে পরিষ্কার করে বোঝাবার সুবিধার্থেই তা উদাহরণ হিসেবে আনা হয়েছে? উদাহরণটি বক্তব্য ও ব্যাখ্যার সাথে সঙ্গতি রক্ষা করছে কিনা সেটাই তো দেখার বিষয় হওয়া উচিৎ হবে। তাই নয় কি?

      আমার তুলনা-প্রতিতুলনা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছেন সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে এটা ’একমাত্র মান্য রীতি’ কিনা। না, আমি ‘একমাত্র’ বলিনি কোথাও। তবে তুল্যমূল্যের উপর আমি–‘আপনার মতোই’– জোর দিয়েছি। আপনার মতো বলার কারণ আপনার লেখাটিই। তুলনা-প্রতিতুলনার ব্যাপারটিও আমি এনেছি কারণ আপনার লেখায় তা বীজ আকারে ছিলো বলেই। তা না হলে বাংলাদেশের এক লেখক প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে কেন ‘মোপাসাঁ, গোগল, চেখভ, ক্যাথার, রবীন্দ্রনাথ, মম কিংবা সরাসরি ‘শহীদুল জহীর বা ব্রাত্য রাইসুর মতো’ বাক্যবন্ধ কেন এলো ? লেখকের গল্পগুলো বোঝানোর সুবিধার্থেই নয় কি ? তো যে জিনিস আপনি করলে গুনাহ নাই তা আমি করলেই গোস্তাকি ? এমনকি আপনি প্রকরণের পার্থক্য বোঝাবার জন্য উপন্যাস এবং গল্পকে পাশাপাশি রেখে তুলনামূলক আলোচনা করলেন। আমি তো আপনার সিলসিলাতেই আছি, নাকি?

      কৃৎকৌশল সম্পর্কেও আপনি আবার বিস্মিত হয়েছেন আমার তুলনামূলকতা দেখে:

      “- আবার তুলনামূলকতার আহ্বান! অন্য কেউ এসকল ডিভাইস ব্যবহার করেন নি সেটা কোনখানে বলা হয়েছে? এইসবই প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত। ব্যবহারের প্রশংসা এখানে নেই, আছে সুব্যবহারের প্রশংসা… এসবের কুব্যবহার আমি ঢের দেখেছি, কিন্তু এ-গল্পে রাশিদা বেশ পারদর্শিতা দেখিয়েছেন সময় নিয়ে খেলায়, এইটুকুই বলেছি।”

      ব্যবহার কিংবা সুব্যবহার নয়, বলেছেন ‘অসাধারণ ’। আর প্রাচীনকাল বলতে কবে থেকে? সত্যিই কি প্রাচীন কাল থেকে? (সাহিত্যিক সচেতনাসহ) আখ্যানের কলাকৌশল হিসেবে এর ব্যবহার প্রাচীন নয়, বরং আমি যতদূর জানি আধুনিক যুগের সাহিত্যেই যথাযথভাবে এর ব্যবহার শুরু। সুতরাং লেখিকা যদি–আপনার ভাষ্যমতে–অসাধারণভাবে সময়ের ব্যবহার করে থাকেন তাহলে তা নিশ্চয়ই কার্পেন্তিয়ের, রুলফো বা মার্কেসের মতো বা তারও চেয়ে বেশি সাফল্যের সাথেই করেছেন। কারণ স্রেফ ‘তুচ্ছ’ কারণে আপনার কাছে অসাধারণ মনে হবে এবং আপনি তা মেনে নেবেন– এটা আমার বিশ্বাস হতে চায় না। সে জন্যেই আপনার ব্যাখ্যা এবং বিশ্লেষণসহ ’অসাধারণ’ বিষয়টি বুঝে নেবার জন্য কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু আবারও বিষয়টি পরিষ্কার না করে এবার বললেন, ‘বেশ পারদর্শিতা দেখিয়েছেন সময় নিয়ে খেলায়।’

      হা হতোম্মি! বিমূর্তায়ন ও বিশেষণের ব্যাধি আমাদের সমালোচনা সাহিত্যকে কী বিবমিষাকর করে তুলেছে!

      আমার মন্তব্যের সূত্রে বলেছেন:

      ‘আপনার প্রথম বাক্য দু’টির সাথে আমি কায়মনোবাক্যে একমত। কিন্তু, “একটু আবেগদীপ্ত এবং রসাত্মক হলেই তা কবিতা” এটা যদিও আমার ঘাড়ে চাপাতে চাইছেন, আমি এই মোট নিচ্ছি না। বয়স কম হ’ল না, কবিতার সঙ্গে সহবাসের ইতিহাসও কম দীর্ঘ নয় আমার—কবিতা খারাপ লিখি তো কী হয়েছে, আমি “তাই তো কবি গাহিয়াছেন”-এর সময় প্রায় একটা আয়ুষ্কাল পিছনে ফেলে এসেছি। তরল আবেগ দেখলে আমি কেঁদেটেদে ফেলি এখনও, কিন্তু কবিতার সার্টিফিকেট লিখতে ব’সে যাই না।’

      প্রথমেই বলি, অন্যের উপর কোন কিছু চাপিয়ে দেয়ার অপসংস্কৃতি আমার নয়। আর আপনার বয়স কত হলো, এবং কবিতার সঙ্গে আপনি সহবাস করছেন না কী করছেন আর তার ইতিহাসই বা কত দিনের এবং কবিতা খারাপ লিখছেন কিনা তা হয়তো আপনার ব্যক্তিগত বিষয়ে অতি উৎসাহী পাঠকদের কৌতূহল মেটাতে পারে কিন্তু এখানে আমি তার প্রাসঙ্গিকতা দেখতে পাই না। বরং আপনার এই তথ্যদানের মধ্যে ফুটে উঠেছে এক প্রচ্ছন্ন দম্ভ যা বিবমিষারই জন্ম দেয়। আসলে আমাদের মনযোগ ছিলো আপনার নিবন্ধটির প্রতি, আপনার ব্যক্তিগত বিষয়ের প্রতি নয়। ফলে, আপনার এইসব বক্তব্য– উত্তেজনার বশে যেমনটা হয়ে থাকে– অসংলগ্ন মনে হয়েছে আমার কাছে। আর “তাই তো কবি গাহিয়াছেন”-এর সময় প্রায় একটা আয়ুষ্কাল পিছনে ফেলে এসেছি।” এই বাক্যটির অর্থ আমি বুঝতে পারিনি। বাক্যটি ঠিক আছে কি?

      তবে আমি যা উপভোগ করতে পারি না তাহলো মিথ্যাচার। যদিও কবিতায়, আখ্যানে মিথ্যাচারকে আমার কাছে উপভোগ্য শুধু নয়, অনিবার্য বলেও মানি। তবে সমালোচনা সাহিত্যে, কোন তথ্য হিসেবে নয়। এই কথা বলছি এই কারণে যে আপনি বলছেন, ‘কিন্তু কবিতার সার্টিফিকেট লিখতে বসে যাই না।’ তাই নাকি, সুব্রত? এত তাড়াতাড়ি এতসব সার্টিফিকেট ভুলে গেলে চলবে? সার্টিফিকেট আপনি লিখেছেন অনেকের জন্যেই। নাম বলবো ? অবনি অনার্য, শাগুফতা শারমিন, সাজ্জাদ শরিফ, খালেদ হামিদী, অদিতি ফাল্গুনী প্রমুখ। দেয়াটা আমি খারাপ কিংবা ভালো বলছি না। তথ্য হিসেবে আপনার বক্তব্য ঠিক নয় বলেই এই নামগুলো এলো। সঙ্গে একটি দুটি নমুনাও থাকলো; দেখেন স্মরণ করতে পারেন কিনা।

      ১” .. আর-একটু সময়, মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করতে পারলে ও বাংলা কবিতার পাঠকদরে ভালবাসা কিনে নিতে পারবে তাতে আমার সন্দহে নেই। জয় হোক।” –সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ (কাব্যগ্রন্থ: সরস সতী, প্রকাশ সাল: ২০০৮ (একুশে বইমলো) লেখক: অবনি অর্নায )

      ২”. .. তবু, এইসব শৈল্পিক কোলাহলকে ছাপিয়ে উঠে যে-একটি অতিবিশিষ্ট কণ্ঠস্বর আমাদের সদাসজাগ রেখেছে তার উচ্চারণের হীরকোপম গাঢ়তা আর বহুমাত্রিকতায়, তার পদসিদ্ধি, ছন্দোময়তায়, তার সুনিয়ন্ত্রিত নৈরাজ্যের বয়ানে তা সাজ্জাদ শরিফেরই একান্ত।
      আসুন আবার তা শোনা যাক।”
      –সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ (ছুরি চিকিৎসা ,প্রকাশ সাল: ২০০৮, সাজ্জাদ শরিফ …..)

      দেখুন কী বলেছি আর আপনি কী বলছেন।

      আমি :

      “আজকের পোস্টমডার্ন সাহিত্যের পশ্চিমী ধারার এদিক-সেদিক তাকালেই দেখা যাবে কবিতার চেয়ে বরং প্রবন্ধরে সাথেই—হাঁফানিবর্ধক নয় মোটেই—ফিউশন বেশি ঘটেছে। সুতরাং আমাদের এখানে সেটা ঘটলে—যদি কেউ সফলভাবে ঘটাতে পারেন—তাহলে ক্ষতি কী?”

      আপনি:

      ‘আপনার “এদিক সেদিক” তাকানোর রেঞ্জ আমার তুলনায় ঢের বেশি বটে, কিন্তু, আমি যেটুকু তাকিয়েছি, তাতে এর উল্টোটাই বেশি মনে হয়েছে—বা, এমন হ’য়ে থাকতে পারে যে উল্টোটা যেখানে সত্য নয়, সেসব লেখা পড়বার ধৈর্য আমার থাকে নি। আর ক্ষতির কথা আসছে কেন? ক্ষতি কোনো কিছুতেই নাই, পাঠক হিসাবে আমাকে হারানোটা যদি লেখকের ক্ষতি মনে না হয়, তো সবই লাভ।’

      আপনার পড়বার ধৈর্য্য না-থাকতেই পারে– এ নিয়ে কোন অনুযোগ করছি না। তবে উম্বের্তো ইকোর ফুকোস পেন্ডুলাম, ভ্লাদিমির নভোকফের পেল ফায়ার, জন বার্থ-এর গল্প কিংবা হোর্হে লুইস বোর্হেসের বহু গল্পের সাথে প্রবন্ধেরই ফিউশন ঘটেছে বেশি। এটা সত্য। অস্ট্রেলিয়াতে ক্যাঙ্গারুর উপস্থিতির মতোই সত্য এই তথ্য। সমালোচনা লিখতে গিয়ে যে আলোচ্য লেখকের লাভ-ক্ষতি নিয়ে আপনাকে ভাবতে হয়–এই তথ্য আমার জানা ছিলো না।

      সবশেষে, আমি বলেছিলাম:

      “সুব্রত হয়তো মানবেন সমালোচক না থাকার দুটো প্রধান কারণ হচ্ছে, এক. আমাদের এখানে যারা সমালোচক তাদের সাহিত্যরুচি এখনও পর্যন্ত নিম্নমানের; একবারেই ব্যতিক্রম দু’একজন ছাড়া। দুই. আমাদের এখানে রুচিশীল, আধুনিক বা অগ্রসর কোন সমালোচনা সাহিত্য গড়ে উঠলো না তার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে আমাদের সমকালীন সাহিত্যের, মূলত কথাসাহিত্যের দারিদ্র। বিশ্বসাহিত্যের তুলনায় আমাদের কথাসাহিত্য হচ্ছে প্রাদেশিক ও কূপমণ্ডুক। এই কারণে তার কোন আয়ত ও গভীর জীবনদৃষ্টি নেই। নেই সার্বজনীন অনুভূতির শৈল্পিক বিন্যাস। ফলে সাহিত্য সমালোচনাও হয় সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের মতোই ভাবসম্প্রসারক, রুচিসম্প্রসারক নয়।”

      আর আপনি বলছেন:

      ‘আমাকে “মানতে” বাধ্য ক’রে বলছেন, কাজেই মেনে নিয়ে শুরু করছি। আপনার এই উক্তিটি “আমাদের কথাসাহিত্য হচ্ছে প্রাদেশিক ও কূপমণ্ডুক। এই কারণে তার কোন আয়ত ও গভীর জীবনদৃষ্টি নেই। নেই সার্বজনীন অনুভূতির শৈল্পিক বিন্যাস”—এটি একটি মহান্ বাক্য, কারণ এটি যা বলছে এটি নিজে তা-ই: “প্রাদেশিক এবং কূপমণ্ডূক”। এই যে কথাগুলি, “আয়ত, গভীর জীবনদৃষ্টি, সর্বজনীন অনুভূতির শৈল্পিক বিন্যাস”—কী যে ক্লিশে, কী যে বিবমিষাকর…’

      বলেছি ‘সুব্রত হয়তো মানবেন’। ‘হয়তো’ শব্দটা যুক্ত থাকার পরও কি আপনার মনে হলো আমি আপনাকে মানতে বাধ্য করছি ? হরিচরণ, শৈলেন্দ্র, রাজশেখর, এনামুল হক, শিবপ্রসন্নরা ‘হয়তো’ শব্দের যে অর্থ করেছেন তবে তা অর্থহীন ?

      আবারও বলি, আমাদের সমকালীন কথাসাহিত্য একেবারেই প্রাদেশিক এবং কূপমণ্ডুক। আমার বক্তব্যকে ‘মহান বাক্য’ বলে ব্যাজস্তুতির মিহি কুতর্কের জাল দিয়ে সমকালীন কথাসাহিত্যের কূপমণ্ডুকতা এবং এই সাহিত্যকে কেন্দ্র করে অসার সমালোচনার দারিদ্রকে আড়াল করা সম্ভব নয়। চিন্তার দারিদ্র এবং ভাবনার অসততার চেয়ে বিবমিষাকর আর কী হতে পারে, বলুন।

      আপনার কল্যাণ হোক।

      বিনীত রাজু আলাউদ্দিন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মশিউল আলম — সেপ্টেম্বর ৩, ২০১০ @ ৫:২২ অপরাহ্ন

      রাশিদা সুলতানার পরালালনীল বইটির গল্পগুলি পড়েছি। এ বইয়ের আলোচনা লিখতে গিয়ে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ প্রশ্ন তুলেছেন ছোটগল্প কী, তা কত প্রকার, ছোটগল্পের সঙ্গে উপন্যাসের তফাৎ কী, ছোটগল্প উপন্যাসের একটা উপজাত (বাই-প্রডাক্ট) কি না, ইত্যাদি। কিন্তু পরালালনীল বইটি প্রসঙ্গে এই প্রশ্নগুলি কেন উঠল তা বুঝতে পারিনি। বইটির লেখাগুলি যে ছোটগল্পই, তা নিয়ে কি সুব্রতর মনে কোনো সংশয় ছিল?

      সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ শ্রদ্ধেয় কবি, কথাশিল্পী ও প্রবন্ধকার। তিনি যদি কোনো বইকে আলোচনার যোগ্য মনে করেন, এবং সে বই নিয়ে আলোচনা লিখে প্রকাশ করেন, তবে সাধারণ পাঠকের মনে হবে বইটি নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ। পরালালনীল তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মর্যাদা পাবে, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের এই লেখাটি প্রকাশের পর থেকে।

      সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ লিখেছেন পরালালনীল বইয়ের ‘স্বপ্নমঙ্গল’ নামের গল্পটি লেখক রাশিদা সুলতানার বাঁক-বদলের গল্প হয়েছে। কেমন করে তা হয়েছে, তিনি ব্যাখ্যা করেননি। গল্পটির অগ্রগতিকে তিনি নৌকার নদী পার হওয়ার সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, মাঝি সার্থকভাবেই নৌকা পাড়ে ভিড়িয়েছেন।

      ‘স্বপ্নমঙ্গল’ গল্পটি সম্পর্কে আমার বক্তব্য হলো, এটি রাশিদা সুলতানার অন্যতম দুর্বল গল্প। তাঁর আগের দুটি বইতে এর চেয়ে ভালো গল্প আছে। এ গল্পের বয়ানে নতুন কিছু নেই যা রাশিদার বাঁক-বদল ঘটিয়ে থাকতে পারে। পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই এক পৃথুলা নারী সম্ভবত বিদেশের কোনো হোটেলে ওঠে, যেখানে তার সঙ্গে মিলিত হয় তার গোপন প্রেমিক, একজন রাজনৈতিক নেতা। গল্পটা বর্ণিত হয় ওই পৃথুলারই বয়ানে, যে কিনা সব কথা বলে ওই পুরুষকে লক্ষ্য করে। মানুষ মরে যাওয়ার পর কিছু কিছু অবিচুয়ারি লেখা হয় যে-স্টাইলে, ঠিক সেভাবে। তাদের দুজনের মধ্যে ইতিমধ্যে যা কিছু ঘটেছে, যার সবকিছু তারা দুজনেই জানে, সেগুলো নিয়েই তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলে; আসলে তাদের লক্ষ্য পাঠক। এ সেই প্রাচীন অবিচুয়ারি টেকনিক: তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে এক বিকেলে আমরা দুজনে নদীতীরে বেড়াতে গিয়েছিলাম… এইরকম। উপরন্তু পৃথুলার চরিত্রটি পরিষ্কার পরিস্ফূট হয় না, তিনি বারবণিতা কিনা, তাঁর নিজের স্বামী-সংসার আছে কি না, রাজনৈতিক ওই নেতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রক্ষিতার কিনা–এইসবের কিছুই পরিষ্কার নয়। ধান ভানতে শীবের গীত গান না রাশিদা সুলতানা–সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের এই প্রশংসা খারিজ হয়ে যায় এ গল্পের বয়ানে। এবং অন্যান্য গল্পেও (‘আলীমের নিভৃতিচর্চা’র চৌদ্দ আনাই শীবের গীত। নইলে এ গল্পের শেষে গিয়ে লেখক যেটা বলেছেন সেটা বলে দিতে হতো গল্পের মাঝামাঝি নাগাদ।)

      ‘পরালালনীল’ নামের গল্পটিও এক ধনাঢ্য পতিতার গল্প, যাঁর বয়স এখন ৪৫, যিনি আর পয়সার বিনিময়ে কোনো পুরুষের সঙ্গে শোন না, যাঁর ব্যবসা অল্পবয়সী সুন্দরী তরুণীদের নিয়ে, অর্থাৎ তিনি এখন একজন পতিতা-সরদারনি। তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক দেশের সমস্ত ক্ষমতাবান রুই-কাতলার–রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সরকারের সচিব, পুলিশের বড়কর্তা পর্যন্ত। লিপি নামের এই নারীটিও ‘স্বপ্নমঙ্গল’ গল্পের ওই পৃথুলার মতোই গল্পটা বলেন নিজেরই বয়ানে, মানে উত্তম পুরুষে। এই গল্পের বড় মুশকিলের দিক হলো, লিপি নামের বারবনিতার বয়ানকে মনে হয় লেখকের নিজের বয়ান। বারবণিতা লিপির ভাষা আর লেখক রাশিদা সুলতানার ভাষাভঙ্গির মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। (‘নাহার বেগমের শেষ দিনগুলি’ গল্পেও এই সমস্যা প্রকটভাবে আছে)।

      এই বারবণিতা কবিতা লেখেন, গাজিপুরের বাগানবাড়ির ছাদে তারকাখচিত রাতে পাটি বিছিয়ে বসে আকাশ দেখেন, কখনো ইংলিশ গান গান: ক্লোজ ইয়োর আইজ অ্যান্ড আইল বি ওন মাই ওয়ে ওয়ান মোর টাইম লেট মি কিস ইউ…। তিনি তাঁর খদ্দের কিংবা প্রেমিকদের গল্প বলেন, তিনি কতবার কতজনের প্রেমে পড়েছিলেন, কতজন তাঁর প্রেমে পড়েছিল, তাঁদের কে কীভাবে আবার তাঁকে ত্যাগ করে চলে গেছে, কষ্ট দিয়েছে, কার কার কল্যাণে তিনি গাজিপুরে একটি বাগানবাড়িসহ অনেক কিছু পেয়েছেন–এই সমস্ত গল্প বলেন লিপি নামের এই বারবণিতা, যাঁকে উচ্চশিক্ষিত, একজন কবি ও লেখক বলে মনে হয়। তিনি কখন কী কারণে কোন প্রেমিকের গল্প বলেন, কেন কখন কোন ঘটনাটির স্মৃতিচারণ করেন, কাকে লক্ষ্য করে সেসব কথা বলেন, কিছু বোঝা যায় না। গল্পটা শেষ হয় শিহাব নামে একজন প্রেমিকের (একজন রাজনীতিক) জন্য ওই বারবণিতার নিজের গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টার মধ্যে দিয়ে। ‘পরালালনীল’ একটি সংহত, সুসংবদ্ধ গল্প না হয়ে হয়েছে অনেকগুলো গল্পের একটা ঘোঁট, যার একটা কাহিনি অন্য কাহিনির সঙ্গে জোড়া লাগেনি। এই গল্পের প্রত্যেকটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে একটি করে স্বতন্ত্র গল্প হতে পারত।

      গল্পকার রাশিদা সুলতানার সমস্ত মনোযোগই কেন্দ্রিভূত থাকে শুধু ঘটনা বর্ণনা করার প্রতি। গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি যা করেন, তা মূলত ঘটনারই বর্ণনা, যেসব দেখা যায় জীবনের উপরিতলে। সেসব বর্ণনাও শিল্পীর বর্ণনা নয়, একজন সাধারণ মানুষের বর্ণনা এমন হতে পারে। এ যদি সাহিত্য হয়, তাহলে সাহিত্য এবং যা সাহিত্য নয় এ-দুয়ের ভেদাভেদ ঘুচে যায়।

      মপাসাঁ, গোগল, চেখভ, রবীন্দ্রনাথ, মম–যেসব নাম সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ উল্লেখ করেছেন তাঁর আলোচনায়, তাঁদের লেখা গল্প এবং পৃথিবীর কথাসাহিত্যের পরম্পরা সম্পর্কে ধারণা থাকলে কি সাহিত্যপদবাচ্য বস্তু চিনতে কষ্ট হওয়ার কথা? সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের লেখাটি পড়ে বিস্মিত হয়ে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করেছি: তিনি যা লিখেছেন তা নিজেই বিশ্বাস করেন তো?

      মশিউল আলম
      ঢাকা, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১০

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুমন রহমান — সেপ্টেম্বর ৩, ২০১০ @ ৯:৫১ অপরাহ্ন

      ——————————————-
      প্রাদেশিক ও কূপমণ্ডুক সাহিত্য চাই!… নিছক বর্ণনা দিয়ে ভাল সাহিত্য হতে বাধা কোথায়?
      ——————————————-

      খুঁটিনাটি উত্তেজনার দিকে না গিয়েও হয়ত আলোচনা চলতে পারে।

      কিছু পয়েন্ট আমি এই বেলা টুকে রাখি, নিজের অবস্থাটা বোঝার স্বার্থে। আমার মনে হয়েছে, ফিউশন বিষয়টা বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের মতপার্থক্য ঘটছে। কবিতার সাথে গদ্যের ফিউশন বা প্রবন্ধের সাথে ফিউশন বলতে আমরা এখানে ভিন্ন ভিন্ন জিনিস বুঝতেছি। ফিকশনে প্রাবন্ধিকতা এক জিনিস, আর প্রবন্ধের ফিউশন বোধ হয় অন্য জিনিস। গদ্যে কাব্যিকতা আর কবিতার ফিউশন সেরকমই দুই জিনিস। সুব্রত যখন “হাঁফানিবর্ধক” প্রবন্ধের কথা পাড়েন তখন বোধ হয় তিনি বোঝান যে প্রবন্ধ নিজগুণে নয়, বরং ফিউশনকারীর পাঠগুণে হাঁফানিবর্ধক। সেরকম হলে আমার দ্বিমতের জায়গা নাই। আকছার দেখছি এই দশা।

      প্রবন্ধের ফিউশনের দৃষ্টান্ত হিসেবে রাজু আলাউদ্দিন যখন ফুকো-র পেন্ডুলামসহ পোস্টমডার্ণ সাহিত্যের কথা বলেন, তখনও আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না যে, সমস্যাটা প্রবন্ধের না, ফিউশনকারীর।

      রাজু আলাউদ্দিন বলছেন, আমাদের সমকালীন কথাসাহিত্য “একেবারেই প্রাদেশিক ও কূপমণ্ডুক”। এটাকে আমি নিন্দা নয়, বরং বরমাল্যরূপে নিতে চাই। এখনকার সাহিত্য প্রাদেশিক ও কূপমণ্ডুকই হওয়া দরকার, আন্তর্জাতিক ও সর্বমান্য হওয়ার চেয়ে। পোস্টমডার্ন জামানা! কিন্তু আসলেই কি তাই হচ্ছে? বরং আমাদের কথাসাহিত্য এখনো হাস্যকররকম ক্ল্যাসিক, শিক্ষানবিশ এবং মতাদর্শনিয়ন্ত্রিত। কিন্তু আরো দুঃখের বিষয় এই যে মতাদর্শের বইটারও একশ বছর আগের সংস্করণ আমাদের সাহিত্যিকদের হাতে। ফলে না সাহিত্যের আরাম পাওয়া যায়, না জ্ঞানের। প্রাদেশিক ও কূপমণ্ডুক সাহিত্য চাই!

      মশিউল আলমের সাথে এই জায়গায় একমত যে, রাশিদা সুলতানার স্বপ্নমঙ্গলের চেয়ে আঁধির গল্পগুলো বেশি টানে। কিন্তু নিছক বর্ণনা দিয়ে ভাল সাহিত্য হতে বাধা কোথায়? কাফকা-র মেটামরফসিস কি নিছক বর্ণনাই নয়? উপরিতলে যা ঘটছে এর বাইরে কি একটা বাড়তি লাইন আছে ঐ গল্পে?

      সুমন রহমান
      ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়া

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজু আলাউদ্দিন — সেপ্টেম্বর ৪, ২০১০ @ ৯:৪৮ অপরাহ্ন

      আসুন, আমরা এবার প্রাদেশিক ও কূপমণ্ডুক সাহিত্যের বরমাল্য প্রাপ্তি উপলক্ষে আল্লাহর কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া আদায় করি। সদা প্রভু, হে পরওয়ারদিগার এই পোস্টমডার্ন জামানায় আমাদেরকে আরো বেশি প্রাদেশিক ও কূপমণ্ডুক হওয়ার তৌফিক দান করো।

      – রাজু আলাউদ্দিন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুমন রহমান — সেপ্টেম্বর ৫, ২০১০ @ ৪:০৬ অপরাহ্ন

      আপনার প্রার্থনা বৈপরীত্যময়, রাজু আলাউদ্দিন। এর আগে আপনি সমকালীন বাংলা সাহিত্যকে “প্রাদেশিক ও কূপমণ্ডুক” আখ্যা দেয়ার মাধ্যমে সার্বজনীন ও উদারপন্থী সাহিত্যের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন। এখন এই প্রার্থনার মাধ্যমে আবার সর্বমান্য এবং সর্বকালীন ঈশ্বরের (“সদা প্রভু”) দরজা খুলে ধরেছেন। এভাবে, মশকরার মাধ্যমেও আপনি আপনার মতাদর্শিক পক্ষপাত বহাল রাখলেন। সঙ্গত কারণেই আপনার ইমামতিতে এই মহৎ প্রার্থনায় শরিক হওয়া আমাদের পক্ষে অসুবিধার। পোস্টমডার্ন ঈশ্বর বরং ব্যক্তিগত, কূপনিবাসী, কৌশলগত এবং খণ্ডকালীন হবেন বলে ধারণা করি।

      – সুমন রহমান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মশিউল আলম — সেপ্টেম্বর ৫, ২০১০ @ ১১:২৩ অপরাহ্ন

      সুমন রহমান প্রশ্ন তুলেছেন: ‘নিছক বর্ণনা দিয়ে ভালো সাহিত্য হতে বাধা কোথায়? কাফকা-র মেটামরফোসিস কি নিছক বর্ণনাই নয়? উপরিতলে যা ঘটছে তার বাইরে কি বাড়তি একটা লাইনও আছে ঐ গল্পে?’
      আমি হয়তো বর্ণনা বিষয়ে আমার বক্তব্য পরিষ্কার করে বলতে পারিনি। আমার বলার ছিল, (১) রাশিদা সুলতানার বেশি মনোযোগ ঘটনা বর্ণনার দিকে। (২) তাঁর বর্ণনা আমার কাছে কথাশিল্পীর বর্ণনা বলে মনে হয় না। মনে হয় একজন সাধারণ মানুষের বর্ণনাও হতে পারে।

      এখন, আমার এই বক্তব্য ধরে সুমন যেটা বলছেন, ‘নিছক বর্ণনা দিয়ে ভালো সাহিত্য হতে বাধা কোথায়?’–এই বাক্যে নিছক শব্দটা সমস্যা সৃষ্টি করে। আমার ধারণা, ‘নিছক’ বর্ণনা দিয়ে ভালো সাহিত্য হওয়া কঠিন। ভালো সাহিত্য হতে হলে ভালো বর্ণনা দরকার। ভালো বর্ণনা মানে শিল্পীর বর্ণনা।

      সুমন রহমান কাফকার মেটাফরফোসিস-এর দৃষ্টান্ত এনে আমাকে প্রশ্ন করলেন, গল্পটা কি নিছক বর্ণনাই নয়? না সুমন, গল্পটা মোটেও ‘নিছক’ বর্ণনা নয়। উপরিতলে যা ঘটছে শুধু তার বর্ণনাও নয়। ঘটনার উপরিতলের এবং প্রটাগনিস্টের মনের গভীরের বর্ণনা। শুধুই ঘটনার নিছক বর্ণনাও নয়। দৃশ্যের, পরিপার্শ্বের, আবহের, চলাফেরার, জেসচারের বর্ণনা আছে, যথেষ্ট পরিমাণে।

      এবং মেটামরফোসিস একজন সুদক্ষ, নিপুণ কথাশিল্পীর ভাষায় রচিত বর্ণনা। সাধারণ কোনো মানুষ, অলেখক বা অশিল্পীর হাতে এমন বর্ণনা অসম্ভব। (অলেখক ও অশিল্পী শব্দদুটি দোষগুণ নিরপেক্ষভাবে ব্যবহার করছি)।

      গ্রেগর সামসা এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেল সে এক বিরাট পোকায় রূপান্তরিত হয়েছে। চিৎ হয়ে শুয়ে আছে সে, ফলে একটা পোকা, তার শুয়ে থাকা পার্সপেকটিভ থেকে, অর্থাৎ তার চোখ যে-জায়গায় আছে সেখানে ক্যামেরা রেখে চলমান ছবি তুললে যে-দৃশ্য পাওয়া যেতে পারে বলে লেখক কল্পনা করেছেন, সেই দৃশ্যটা, কাফকার ভাষায়, খেয়াল করে দেখা যাক।

      One morning, as Gregor Samsa was waking up from anxious dreams, (সুমন, দেখুন, এটা ঘটনার উপরিতলের নয়, উপরিতলকে ছাড়িয়ে, গভীরের কোনো ইংগিত।) he discovered that in his bed he had been changed into a monstrous verminous bug. He lay on his armour-hard back and saw, as he lifted his head up a little, his brown, arched abdomen divided up into rigid bow-like sections. From this height the blanket, just about ready to slide off completely, could hardly stay in place. His numerous legs, pitifully thin in comparison to the rest of his circumference, flickered helplessly before his eyes.

      পোকা সামসার চোখে তার পাগুলো তার চারপাশের অবশিষ্ট পরিবেশের তুলনায় pitifully thin দেখাচ্ছে এবং সেগুলো তার চোখের সামনে flickered helplessly-এই বর্ণনা, এটা শুধু উপরিতলের বর্ণনা নয়। লাল রঙের দুটো অ্যাডভার্ব বলছে, এখানে, অদ্ভুত এই পরিস্থিতিতে গ্রেগর সামসার মনের খবরও আছে।

      তারপর, খেয়াল করবেন, ঘুম থেকে জেগে গ্রেগর নিজেকে ওই উদ্ভট অবস্থায় আবিষ্কার করার পর মাথা তুলে চোখ ঘুরিয়ে যখন তার পরিপার্শ্ব দেখতে থাকে তখন সে যা যা দেখতে পায়, এবং দেখতে দেখতে তার যা যা মনে হয়, সেসবের বর্ণনাও (বিবরণ) আছে।

      এই যে ছবি আঁকা, এ কি ‘নিছক’ই বর্ণনা?

      সুমন রহমান ‘নিছকই বর্ণনা’ ঠাউরে ভালো সাহিত্যের উদাহরণ হিসেবে মাত্র এই একটা লেখার কথাই উল্লেখ করেছেন। ধারণা করি, জয়েসের ‘এ পোর্ট্রটে অফ দি আর্টিস্ট অ্যাজ আ ইয়াং ম্যান’ ভালো সাহিত্যের আরেকটা দৃষ্টান্ত, আমার এ মতের সঙ্গে সুমন দ্বিমত করবেন না। সেখান থেকে কথাশিল্পীর বর্ণনার আরেক ধরনের একটা দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যায়।

      ইংরেজি ‘সাক’ শব্দটির (শব্দ ও ধ্বনি) সঙ্গে ছোট্ট স্টিফেনের পরিচয়ের বর্ণনা (লেখকের থার্ডপাসন ন্যারেটিভে, বলা হচ্ছে ঘটনার অনেক পরে) :

      ‘Suck was a queer word. The fellow called Simon Moonan that name because Simon Moonan used to tie the prefect’s false sleeves behind his back and the prefect used to let on to be angry. But the sound was ugly. Once he (Stephen) had washed his hands in the lavatory of the Wicklow Hotel and his father pulled the stopper up by the chain after and the dirty water went down through the hole in the basin. And when it had all gone down slowly the hole in the basin had made a sound like that: suck. Only louder.’

      স্টিফেনকে বিদ্যালয়ের হোস্টেলে রেখে মা-বাবা যেদিন ফিরে যাচ্ছেন (স্টিফেনের পার্সপেক্টিভ, লেখকের থার্ড পারসন ন্যারেটিভে):

      ‘The first day in the hall of the castle when she (mother) had said goodbye she had put up her veil double to her nose to kiss him (Stephen): and her nose and eyes were red. But he had pretended not to see that she was going to cry. She was a nice mother but she was not so nice when she cried.’

      যদি ‘পশ্চিমে’র ভালো সাহিত্যকে আপনারা সমাদর করতে না চান, তাহলে পুবের, আমাদের নিজেদের মধ্যে থেকে উদাহরণ দেওয়া যায়। কার লেখা সাহিত্য ভালো সাহিত্য? বঙ্কিমচন্দ্র? তাঁর বর্ণনার দৃষ্টান্ত নিন:

      “নগেন্দ্র দেখিতে দেখিতে গেলেন, নদীর জল অবিরল চল্ চল্ চলিতেছে–ছুটিতেছে–বাতাসে নাচিতেছে–রৌদ্রে হাসিতেছে–আবর্ত্তে ডাকিতেছে। জল অশ্রান্ত–অনন্ত–ক্রীড়াময়। জলের ধারে তীরে তীরে মাঠে মাঠে রাখালেরা গোরু চরাইতেছে, কেহ বা বৃক্ষের তলায় বসিয়া গান করিতেছে, কেহ বা তামাকু খাইতেছে, কেহ বা মারামারি করিতেছে, কেহ বা ভুজা খাইতেছে। কৃষকে লাঙ্গল চষিতেছে, গোরু ঠেঙ্গাইতেছে, গোরুকে মানুষের অধিক করিয়া গালি দিতেছে, কৃষাণকেও কিছু কিছু ভাগ দিতেছে। ঘাটে ঘাটে কৃষকের মহিষীরাও কলসী, ছেঁড়া কাঁথা, পচা মাদুর, রূপার তাবিজ, নাকছাবি, পিতলের পৈঁচে, দুই মাসের ময়লা পরিধেয় বস্ত্র, মসীনিন্দিত গায়ের বর্ণ, রুক্ষ কেশ লইয়া বিরাজ করিতেছেন। তাহার মধ্যে কোন সুন্দরী মাথায় কাদা মাখিয়া ঘসিতেছেন। কেহ ছেলে ঠেঙ্গাইতেছেন, কেহ কোন অনুদ্দিষ্টা অব্যক্তনাম্মী প্রতিবাসিনীর উদ্দেশে কোন্দল করিতেছেন; কেহ কাষ্ঠে কাপড় আছড়াইতেছেন। কোন কোন ভদ্রগামের ঘাটে কুলকামিনীরা ঘাট আলো করিতেছেন। প্রাচীনারা বক্তৃতা করিতেছেন-মধ্যবয়স্করা শিবপূজা করিতেছেন, যুবতীরা ঘোমটা দিয়া ডুব দিতেছেন, আর বালক বালিকারা চেঁচাইতেছে, কাদা মাখিতেছে, পূজার ফুল কুড়াইতেছে, সাঁতার দিতেছে, সকলের গায়ে জল দিতেছে, কখন কখন ধ্যানে মগ্না মুদ্রিতনয়না কোন গৃহিনীর সম্মুখস্থ কাদার শিব লইয়া পলাইতেছে। ব্রাহ্মণ ঠাকুরেরা নিরীহ ভালমানুষের মত আপন মনে গঙ্গাস্তব পড়িতেছেন, পূজা করিতেছেন, এক একবার আকণ্ঠ নিমজ্জিতা কোন যুবতীর প্রতি অলক্ষ্যে চাহিয়া লইতেছেন। আকাশে শাদা মেঘ রৌদ্রতপ্ত হইয়া ছুটিতেছে, তাহার নীচে কৃষ্ণবিন্দুবৎ পাখী উড়িতেছে, নারিকেল গাছে চিল বসিয়া রাজমন্ত্রীর মতো চারিদিক দেখিতেছে, কাহার কিসে ছোঁ মারিবে। বক ছোটলোক, কাদা ঘাঁটিয়া বেড়াইতেছে। ডাহুক রসিক লোক, ডুব মারিতেছে। আর আর পাখী হালকা লোক, কেবল উড়িয়া বেড়াইতেছে।”
      (বিষবৃক্ষ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)

      বঙ্কিমচন্দ্রকে প্রাচীন বলে যদি তাঁর শিল্পিতাকে সেকেলে বলে বাতিল করে দিতে চান, তাহলে আধুনিক দৃষ্টান্তও দিতে পারি।

      আধুনিকদের মধ্যে আধুনিকতম, একদম এই সময়কার একটা নমুনা:

      ‘ঘরের দরজা ঠেলা দিতেই ভ্যাপসা গন্ধ নাকে লাগে। জানলা খুইলা দিই, সন্ধ্যার লালিমা তখনো মিলায় নাই। ঠাণ্ডা বিছানা, আলগোছে শুই। আলো-আঁধারির মাঝে আমার নিজ ঘরে আমি চোখ বন্ধ কৈরা ঘুমাই। আমি ঘুমাই, আবার আমি যে ঘুমাইতেছি সেটা আবছা আবছা টের পাই ঘুমের মধ্যে। দূরে, বাবা-মায়ের ঘরে, দেয়ালঘড়িতে ঢং ঢং কৈরা সাতটা বাজে। একটা ধাড়ি ইঁদুর ঘরের মেঝেতে, টেবিলের কাগজপত্রের মাঝ দিয়া সড়সড় কৈরা দৌড়ায়, শুনি ঠিক ঠিক। আমার সিঁথানে বৈসা আমার এই নিরাপদ ঘুমটারে যেন আমিই পাহারা দিই।’
      (‘নিরাপদ ঘুম’, সুমন রহমান, ২০১০)

      এ বর্ণনা শিল্পীর। এটা চিনতে কি খুব কষ্ট হয়, সুমন রহমান সাহেব?

      আমি বলেছি, রাশিদার ঘটনার বর্ণনা শিল্পীর বর্ণনা বলে মনে হয় না আমার, একজন সাধারণ মানুষের বর্ণনা এমন হতে পারে। আমার লেখা উচিত ছিল, মোটামুটি শুদ্ধভাবে বাংলা বাক্য রচনা করতে পারেন, এমন যে-কোনো ব্যক্তির বর্ণনা এরকম হতে পারে।

      সুমন রহমান যদি সেটাকেই ভালো সাহিত্য বলে প্রচার করেন, আর নিজে কথাশিল্পীর মতো করে লেখার চেষ্টা করেন, তাহলে আমরা তাঁকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারি: সুমন, রাশিদা সুলতানার বর্ণনাকে ডিফেন্ড করতে কাফকার মেটামরফোসিস-কে টেনে এনে আপনি কাকে বোকা বানাতে চান? রাশিদা সুলতানাকে? না আমাদেরকে?

      কথাশিল্প লেখা হয় কথাশিল্পীর হাতে। বর্ণনাশক্তি কথাশিল্পীর সবচেয়ে প্রাথমিক, সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সেই কারণে সবচেয়ে দরকারি হাতিয়ার বলে আমার বিশ্বাস। এ-হাতিয়ার নিয়ে যাঁরা লিখতে শুরু করেন, তাঁদেরকে বলে ইকুইপ্ড লেখক। আবার এটাই সব নয়, আরও অনেক হাতিয়ার আছে, দেখার চোখ আছে, বলার ভাষা আছে, ভাষার ভঙ্গি আছে। এবং সব হাতিয়ারে সজ্জিত হওয়ার পরেও থাকে হাতিয়ারগুলি ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠার দীর্ঘ ও কষ্টকর সংগ্রাম।

      রাশিদা সুলতানাকে ইকুপড হওয়ার সময় ও সুযোগ দিচ্ছেন না কেন সলিমুল্লাহ খান, সুমন রহমান এবং সর্বশেষে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ? রাশিদা সুলতানা আপনাদের কী ক্ষতি করেছেন?

      স্মর্তব্য: এবাদুর রহমানের লেখা ‘দাস ক্যাপিটাল’ বইটির সেউতি সবুরকৃত আলোচনার প্রতিক্রিয়ায় সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ লিখেছিলেন, “এবাদের লেখা শিল্পপদবাচ্য কীনা, বা কতখানি তা, তা আমি নির্ধারণ করতে পারি নাই; এবং এবাদ, কষ্ট নিয়েন না, নিজের লেখার ক্ষেত্রেও এতদবধি একই অপারগতা আমার।” (সু. অ. গো. ২০০৮)

      ‘শিল্পপদবাচ্য’ লেখা চিনতে এহেন দ্বিধাগ্রস্ত একজন ব্যক্তি রাশিদা সুলতানাকে সার্টিফিকেট (তাঁর নিজের ও রাজু আলাউদ্দিনের কথা ধার করে বলছি) দিতে ‘জঘন্য ব্যস্ততার’ মধ্যেও এত কষ্ট স্বীকার করলেন! আমার বিস্ময় দূর হচ্ছে না।

      মশিউল আলম
      ঢাকা, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১০

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ — সেপ্টেম্বর ৬, ২০১০ @ ২:০৮ পূর্বাহ্ন

      প্রিয় রাজু,

      আমার আগের চিঠিটা একটু এমফ্যাটিক হ’য়ে গিয়েছিল, একটু দুর্দশায় আছি, আপনাকে আহত ক’রে থাকলে ক্ষমা চাইছি। কিন্তু ভাই, আমি কুতর্ক করি নি, করতে চাই নি।

      আমাদের যাত্রা, দু’টি আলাদা জায়গায় শুরু হয়েছিল। আপনি আমার রচনায় কিছু-একটা “দেখতে না-পাওয়ার” ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। আমার আপত্তি ছিল তাতে, কেননা আমার মনে হয়েছিল যে একটা রচনায় যা আছে, তা-ই হওয়া উচিত আলোচনার বিষয়, যা-নাই তা নয়।

      জাতককে আমি তুচ্ছ করব কেন? বা করিও যদি, সে-জিনিস “আমার” ব’লেই না করি? আমার মাকে আমি রেগে গিয়ে গালিও দিই যদি, তাতেও তাকে তুচ্ছ করা হয় না। আর জাতক বা যে-কোনো মহান্ গ্রন্থের সম্মানরক্ষাকর্তার আসনে নিজেকে না-বসানোই বেহতর। কেউ কোনো বইয়ের অসম্মান করলে যে গুনাহ্ হচ্ছে সেটা হবার কথা তার-ই, অন্যের নয়। অপিচ আমি গ্রন্থপুজারি নই।

      “বাংলাদেশের এক লেখক প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে কেন ‘মোপাসাঁ, গোগল, চেখভ, ক্যাথার, রবীন্দ্রনাথ, মম কিংবা সরাসরি ‘শহীদুল জহীর বা ব্রাত্য রাইসুর মতো’ বাক্যবন্ধ কেন এলো” – আপনি দয়া ক’রে আবার ঐ ঐ জায়গাগুলি প’ড়ে দেখুন কেন এল। রাশিদার গল্প প্রসঙ্গে আসেন নি তাঁরা, এইটুকু আমি বলতে পারি।

      “লেখকের গল্পগুলো বোঝানোর সুবিধার্থেই নয় কি?”–জি না। হরগিজ নেহি। পরন্তু, আমি লেখকের গল্প বোঝাবার জন্য এ লেখা লিখি নি। এটা পরীক্ষার খাতা নয়।

      “আর প্রাচীনকাল বলতে কবে থেকে? সত্যিই কি প্রাচীন কাল থেকে? (সাহিত্যিক সচেতনাসহ) আখ্যানের কলাকৌশল হিসেবে এর ব্যবহার প্রাচীন নয়, বরং আমি যতদূর জানি আধুনিক যুগের সাহিত্যেই যথাযথভাবে এর ব্যবহার শুরু”–সময়ের একটা তলে আরও নানা তলের ঢুকে যাওয়া, এ কি সারা “আরব্য রজনী” জুড়ে দেখতে পান না আপনি, রাজু?

      “সুতরাং লেখিকা যদি–আপনার ভাষ্যমতে–অসাধারণভাবে সময়ের ব্যবহার করে থাকেন তাহলে তা নিশ্চয়ই কার্পেন্তিয়ের, রুলফো বা মার্কেসের মতো বা তারও চেয়ে বেশি সাফল্যের সাথেই করেছেন”–কেন তা হ’তে হবে? মশা মারতে আমাকে কামান দাগতে হবে? কেন একজন নবীন বাঙালি লেখককে ঐ ঐ লাতিন আমেরিকান গুরু লেখকদের সঙ্গে প্রতিতুলনা না-ক’রে তার বিষয়ে লেখা যাবে না কিছু?–আর আপনার “অসাধারণ” নিয়ে প্রশ্নের জবাব হ’ল: খোদ রাশিদার তুলনায় অসাধারণ।

      “আর আপনার বয়স কত হলো, এবং কবিতার সঙ্গে আপনি সহবাস করছেন না কী করছেন আর তার ইতিহাসই বা কত দিনের এবং কবিতা খারাপ লিখছেন কিনা তা হয়তো আপনার ব্যক্তিগত বিষয়ে অতি উৎসাহী পাঠকদের কৌতূহল মেটাতে পারে কিন্তু এখানে আমি তার প্রাসঙ্গিকতা দেখতে পাই না। বরং আপনার এই তথ্যদানের মধ্যে ফুটে উঠেছে এক প্রচ্ছন্ন দম্ভ যা বিবমিষারই জন্ম দেয়”–আমি একমত আপনার সঙ্গে, এবং দুঃখিত।

      “আর “তাই তো কবি গাহিয়াছেন”-এর সময় প্রায় একটা আয়ুষ্কাল পিছনে ফেলে এসেছি।” এই বাক্যটির অর্থ আমি বুঝতে পারিনি। বাক্যটি ঠিক আছে কি?”–জি না, রাজু। বাক্যটি ভুল নয়, আপনি বুঝতে না-পারা সত্ত্বেও। “এক-আয়ুষ্কাল” এখানে একটা ফ্রেজ, যার অর্থ একটা পুরো জীবনের সমান লম্বা সময়।

      “‘কিন্তু কবিতার সার্টিফিকেট লিখতে বসে যাই না।’ তাই নাকি, সুব্রত? এত তাড়াতাড়ি এতসব সার্টিফিকেট ভুলে গেলে চলবে? সার্টিফিকেট আপনি লিখেছেন অনেকের জন্যেই। নাম বলবো ? অবনি অনার্য, শাগুফতা শারমিন, সাজ্জাদ শরিফ, খালেদ হামিদী, অদিতি ফাল্গুনী প্রমুখ”–একটা পুরো কথার অর্ধেককে নিয়ে মন্তব্য করা, বা তা দিয়ে কথককে আক্রমণ করবার একটা নাম আছে কি যেন তর্কশাস্ত্রে, মনে পড়ছে না, সুমন হয়তো বলতে পারবেন। আমার কথাটা ছিল এই: “তরল আবেগ দেখলে আমি কেঁদেটেদে ফেলি এখনও, কিন্তু কবিতার সার্টিফিকেট লিখতে ব’সে যাই না”। মানে, কোনো কবিতায় তরল আবেগ দেখলেই, আমি তাকে কবিতার সার্টিফিকেট দিই না। এর মানে এ নয় যে আমি কারও কবিতা নিয়ে কিছু লিখি না। আর, সার্টিফিকেট কেন বলছেন ব্লার্বলিখনকে? অবনি বা সাগুফতা নোতুন লেখক হ’তে পারেন, কিন্তু সাজ্জাদ বা অদিতি তো খুবই নামজাদা লেখক, তাঁদেরকে আমি সার্টিফিকেট দেব!

      কবিতার সঙ্গে প্রবন্ধের ফিউশন বলতে যা বলতে চেয়েছিলাম, সুমন উপরে তা ব’লে রেখেছেন। একোর রচনায়, শুধু “ফুকোর পেন্ডুলাম” নয়, “গোলাপের নাম”-এও ভয়াবহ রকমের তথ্যবাহুল্য আছে, কিন্তু তাঁর লেখা পড়বার সময় কখনও মনে হয় না যে প্রবন্ধ পড়ছি। মানে তথ্য বেশি-কি-কম তা নয়, পড়তে কেমন লাগছে, আমি তার কথা-ই বলেছি। আপনি তা বোঝেন নি মনে হয়।

      পরিশেষে, আবারও আপনার শেষ কথার জবাব সুমন দিয়ে রেখেছেন। আমি তাঁর সঙ্গে একমত। যে-প্রাদেশিকতার কথা আপনি বলছেন, সেটা, সুমনের মতো, আমারও অধিক কামনীয় মনে হয়। আমরা বিশ্বজনীন হ’তে গিয়ে বিশ্বসাহিত্যের কিছু তলানি অখাদ্য তৈরি ক’রে এসেছি এযাবৎ (কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে)। মাইকেল থেকে রবীন্দ্রনাথ মায় বুদ্ধদেব-তক এই হাহাকার শুনে এসেছি যে হায় হায় যেকালে বায়রন কীটস লিখেছেন, আমাদের ভারতচন্দ্রও এমনকি শুরু করেন নি! আর, কোথায় হ্যামলেট কোথায় চণ্ডীমঙ্গল! আজ একটু অন্যভাবে নিজেদেরকে চেনা শুরু হয়েছে আমাদের… পশ্চিমের চোখে নয় আর, নিজেদের চোখে। একে স্বীকার-অস্বীকার যা-ই করুন, এই চোখকে বুজিয়ে দেওয়া যাবে আর, তা মনে হয় না। অলমতি বিস্তরেণ।

      সুব্রত।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ — সেপ্টেম্বর ৬, ২০১০ @ ২:৪২ পূর্বাহ্ন

      প্রিয় মশিউল আলম,

      আপনার লেখাটি খুবই, খুবই অদ্ভুত। আমি আপনার নিজের করা এই বইটির আলোচনা প’ড়ে খুব হতাশ হয়েছিলাম, আর এই চিঠিটি প’ড়ে একেবারে অবাক্ হ’য়ে গেলাম।

      “কিন্তু পরালালনীল বইটি প্রসঙ্গে এই প্রশ্নগুলি কেন উঠল তা বুঝতে পারিনি। বইটির লেখাগুলি যে ছোটগল্পই, তা নিয়ে কি সুব্রতর মনে কোনো সংশয় ছিল?”–এই গল্প বই “প’ড়ে” এসব প্রশ্ন আমার মাথায় আসে নি। গল্প নিয়ে কিছু লিখতে গিয়ে বাই দ্য বাই মাথায় এসেছে, এবং মনে হয়েছে যে প্রশ্নগুলির উত্থাপনটা জরুরি, যেখানে, যখনই হোক।

      “সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ […]যদি কোনো বইকে আলোচনার যোগ্য মনে করেন, এবং সে বই নিয়ে আলোচনা লিখে প্রকাশ করেন, তবে সাধারণ পাঠকের মনে হবে বইটি নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ। পরালালনীল তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মর্যাদা পাবে, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের এই লেখাটি প্রকাশের পর থেকে”–এর মানে কী দাঁড়ায়? সু.অ.গো.-র জন্য রা.সু.-র বা তাঁর মাপের কারো লেখা নিয়ে লেখা হারাম? নাকি রা.সু.-র মাপের কোনো লেখকের লেখা নিয়ে যে-কারুরই লেখা হারাম? দ্বিতীয়টি হয় যদি, আপনি সেই হারাম খেয়ে রেখেছেন। প্রথমটি হ’লে আমাকে বগোল বাজিয়ে ঘুরতে হয়; নিজের বিষয়ে অমন উচ্চম্মন্যতা আমার ছিল না। হে হে।

      “সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ লিখেছেন পরালালনীল বইয়ের ‘স্বপ্নমঙ্গল’ নামের গল্পটি লেখক রাশিদা সুলতানার বাঁক-বদলের গল্প হয়েছে। কেমন করে তা হয়েছে, তিনি ব্যাখ্যা করেননি। গল্পটির অগ্রগতিকে তিনি নৌকার নদী পার হওয়ার সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, মাঝি সার্থকভাবেই নৌকা পাড়ে ভিড়িয়েছেন”–কেমন ক’রে বললে আমার কেমন ক’রে বলা হ’ত, বলুন তো, মশিউল? আর দয়া ক’রে আরেকটু অভিনিবেশ-সহ প’ড়ে মন্তব্য করুন। নৌকা ভেড়াবার কথা বলা হয়েছিল গল্পের সমাপ্তির প্রসঙ্গে।

      “এ সেই প্রাচীন অবিচুয়ারি টেকনিক: তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে এক বিকেলে আমরা দুজনে নদীতীরে বেড়াতে গিয়েছিলাম… এইরকম”–তো? এই স্টাইলে পৃথিবীর বহু শ্রেষ্ঠ গল্প রচিত হয়েছে (এবং বহুতর নিকৃষ্ট গল্প)। স্টাইলটা মুখ্য নয় তো, এক্সেকিউশনটাই আসল। সকল স্টাইলেই ঢের-সারা ভালো এবং বাজে গল্প আছে।

      “উপরন্তু পৃথুলার চরিত্রটি পরিষ্কার পরিস্ফূট হয় না, তিনি বারবণিতা কিনা, তাঁর নিজের স্বামী-সংসার আছে কি না, রাজনৈতিক ওই নেতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রক্ষিতার কিনা–এইসবের কিছুই পরিষ্কার নয়”–সবকিছু পরিষ্কার করা, বিশদ করা, পাঠকের মনে কোনো সংশয়ের লেশমাত্র না-রাখা-ই তাহলে গল্পলেখকের ফরজ কাজ, তাই না?

      “ধান ভানতে শীবের (sic) গীত গান না রাশিদা সুলতানা–সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের এই প্রশংসা খারিজ হয়ে যায় এ গল্পের বয়ানে। এবং অন্যান্য গল্পেও”–তাই? এ-গল্পের কোনটা ধান আর কোনটা শিবের গীত?

      “এই গল্পের বড় মুশকিলের দিক হলো, লিপি নামের বারবনিতার বয়ানকে মনে হয় লেখকের নিজের বয়ান। বারবণিতা লিপির ভাষা আর লেখক রাশিদা সুলতানার ভাষাভঙ্গির মধ্যে কোনো তফাৎ নেই”–মশিউল, এই অতি জঘন্য এবং অর্থহীন মন্তব্যটি আপনার নিজের করা রিভিউতেও ছিল। আমি তখনই এর প্রতিবাদ করতাম, কিন্তু লেখা হ’য়ে ওঠে নি। জঘন্যতা বোঝাবার জন্য আমি কালি খরচ করব না, অর্থহীনতা নিয়ে বলছি। শহীদুল জহির, আমার জানামতে, চোস্ত ঢাকাইয়া বলতে পারতেন। তাঁর গল্পের অনেক চরিত্র, যাদের কেউ রংবাজ, পাতি-মাস্তান, পুরিওয়ালা, এরাও ঐ একই ভাষায় কথা বলে তাঁর গল্পে, তাতে নিশ্চয়ই প্রমাণিত হয় যে শহীদুল জহিরও পাতি-মাস্তান বা পুরিওয়ালা? রবীন্দ্রনাথ বা শরৎচন্দ্রের প্রায় সকল চরিত্রই তাঁদের নিজেদের মুখের বা লেখার ভাষাতেই কথা কয়, তো কাজেই তারা ও তাঁরা একই মানুষ বটেন। “চরিত্রানুগ” মুখের ভাষার চর্চা বস্তাপচা টিভি সিরিয়ালের হাস্যকর এবং বিরক্তিকর বিষয়। লেখক স্বয়ম্ভু, তিনি তাঁর সৃষ্ট চরিত্রের মুখে কী ভাষা দেবেন তা আর কারুর এক্তিয়ার নয়। গোরু রচনার রচয়িতাদেরকে বরং এসব ডিকটেশান দেবেন।

      “তিনি কখন কী কারণে কোন প্রেমিকের গল্প বলেন, কেন কখন কোন ঘটনাটির স্মৃতিচারণ করেন, কাকে লক্ষ্য করে সেসব কথা বলেন, কিছু বোঝা যায় না”–আপনি লাগাতার “বুঝতে না পারার” কথা বলে চলেছেন। এত বুঝতে চাওয়া কেন রে ভাই? আর, চাইলে গল্প না পড়ে জীবনী পড়লেই তো হয়।

      “ ‘পরালালনীল’ একটি সংহত, সুসংবদ্ধ গল্প না হয়ে হয়েছে অনেকগুলো গল্পের একটা ঘোঁট, যার একটা কাহিনি অন্য কাহিনির সঙ্গে জোড়া লাগেনি। এই গল্পের প্রত্যেকটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে একটি করে স্বতন্ত্র গল্প হতে পারত”–তো? তাতেই এটি গল্প হয়? সব কাহিনিতে জোড়া লাগিয়ে দিতেই হবে? চিন্তার বিষয়।

      “গল্পকার রাশিদা সুলতানার সমস্ত মনোযোগই কেন্দ্রিভূত থাকে শুধু ঘটনা বর্ণনা করার প্রতি। গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি যা করেন, তা মূলত ঘটনারই বর্ণনা, যেসব দেখা যায় জীবনের উপরিতলে। সেসব বর্ণনাও শিল্পীর বর্ণনা নয়, একজন সাধারণ মানুষের বর্ণনা এমন হতে পারে। এ যদি সাহিত্য হয়, তাহলে সাহিত্য এবং যা সাহিত্য নয় এ-দুয়ের ভেদাভেদ ঘুচে যায়”–এ নিয়ে সুমন কিছু লিখেছেন উপরে। আমার নিজের কথা হ’ল, অন্ততঃ গল্পকার যত কম বর্ণনা-ছাড়া অন্যকিছু করেন, তত ভালো।

      “মপাসাঁ, গোগল, চেখভ, রবীন্দ্রনাথ, মম–যেসব নাম সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ উল্লেখ করেছেন তাঁর আলোচনায়, তাঁদের লেখা গল্প এবং পৃথিবীর কথাসাহিত্যের পরম্পরা সম্পর্কে ধারণা থাকলে কি সাহিত্যপদবাচ্য বস্তু চিনতে কষ্ট হওয়ার কথা? সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের লেখাটি পড়ে বিস্মিত হয়ে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করেছি: তিনি যা লিখেছেন তা নিজেই বিশ্বাস করেন তো?”–এখন আমার বিশ্বাসে অবিশ্বাস! হা হা হা… জি, বিশ্বাস করি, সেই বিশ্বাস আপনার কাছে যত অবিশ্বাস্যই ঠেকুক।

      গুণমুগ্ধ
      সুব্রত।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুমন রহমান — সেপ্টেম্বর ৬, ২০১০ @ ৯:১৪ অপরাহ্ন

      মশিউল আলম, রাশিদা এখানে উপলক্ষ বটে, কিন্তু আমি বলছিলাম বর্ণনাত্মক রীতি সম্পর্কে আপনার সার্বিক মনোভাবের প্রেক্ষিতে। আপনি লিখেছিলেন:

      গল্পকার রাশিদা সুলতানার সমস্ত মনোযোগই কেন্দ্রিভূত থাকে শুধু ঘটনা বর্ণনা করার প্রতি। গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি যা করেন, তা মূলত ঘটনারই বর্ণনা, যেসব দেখা যায় জীবনের উপরিতলে। সেসব বর্ণনাও শিল্পীর বর্ণনা নয়, একজন সাধারণ মানুষের বর্ণনা এমন হতে পারে।

      এই বক্তব্য থেকে এরকম ধারণা হতে পারে যে, সাহিত্যে বর্ণনাত্মক রীতি মোটামুটি ব্রাত্যজনোচিত, তবে, মুনশিয়ানা থাকলে একে ছাড় দেয়া যায়। আমার ধারণা, বর্ণনাই গল্প বা উপন্যাসের নিউক্লিয়াস। সাহিত্য জিনিসটাই ন্যারেটিভ, এমন কি কবিতা বা গানও। ফলে মশিউল যখন লেখেন, রাশিদার নজর ঘটনা বর্ণনা করার প্রতি, তখন মশিউল বর্ণনাকে হীনতর পদ্ধতি হিসেবে ভাবছেন কিনা সেই ধন্দে পড়ে যাওয়ার কারণ ঘটে। প্রসঙ্গটি ওখানে। ফলে মেটামরফোসিস টেনে এনে আপনাকে বা রাশিদাকে বোকা বানানো আমার উদ্দেশ্য নয়, বরং দেখানো যে মোটামুটি নিরলংকার বর্ণনা দিয়েও দারুণ সাহিত্য হতে পারে। রাশিদা সুলতানাকে তলস্তয় বা কাফকা বা শহীদুল জহিরের সাথে তুলনা করার দায় আমি নেব না, একদা তাঁর গ্রন্থ আঁধি নিয়ে যে সমালোচনাটুকু লিখেছিলাম, সেই গ্রন্থ প্রসঙ্গে এখনো সেই মত আমি আপহোল্ড করি। যতটুকু লিখেছি, প্রায়-ততটুকুই।

      সুমন রহমান

      (পুনশ্চ: আপনার মারণাস্ত্রোচিত হৃদ্যতায় উদ্ধৃত আমার যে গল্পখানি, তার নাম “নিরাপদ ঘুম” নয়, “নিরপরাধ ঘুম”।)

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mashiul Alam — সেপ্টেম্বর ৭, ২০১০ @ ১:০৩ পূর্বাহ্ন

      “হামেশা খেয়াল করছি যে, নিজেকে গল্পের ভিতরে ঢুকিয়ে ফেললে, মুক্তি নয়, আরেক বন্ধনযন্ত্রণায় নিয়ে ফেলা হয়, আর গল্পটিকে শিল্পবস্তু হিসাবে চেনবার সুযোগও যায় ক’মে।”

      সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ তাঁর আলোচনার একটি জায়গায় এ-কথা লিখেছেন। সুমন রহমান এ-বিষয়ে তাঁর সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। আমি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের মতকেই সমর্থন করি, এবং মনে করি, আখ্যানশিল্পের জন্য, গল্পের জন্য, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিবেচ্য বিষয়।

      এই একই অবস্থান থেকে রাশিদা সুলতানার ‘পরালালনীল’ গল্পটি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে এক জায়গায় আমি লিখেছিলাম: “এই গল্পের বড় মুশকিল হলো, লিপি নামের বারবনিতার বয়ানকে মনে হয় লেখকের নিজের বয়ান। বারবনিতা লিপির ভাষা আর লেখক রাশিদা সুলতানার ভাষাভঙ্গির মধ্যে কোনো তফাৎ নেই।” আমি এ-কথা লিখেছিলাম, সুব্রত যেমনটি বলেছেন, ‘গল্পটিকে শিল্পবস্তু হিসেবে চেনবার সুযোগ কমে যায়’ বলে। আমার দৃষ্টিতে লেখকের নিজেকে গল্পের ভিতরে ঢুকিয়ে ফেলার ব্যাপারটি এভাবেও ঘটে (আরো অন্যান্যভাবেও হয়তো ঘটে, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের কাছে জানতে চাইব, আর কী কী প্রক্রিয়ায় লেখকের গল্পের ভিতরে নিজেকে ঢুকিয়ে ফেলার ঘটনা ঘটে)।

      আমি বলেছি, এই যে লেখকের নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও তার সৃষ্ট চরিত্রের ভাষাভঙ্গি এক, অভিন্ন, আলাদা-করে-চেনা-যায়-না-এমন হয়ে যাওয়া, এটাকে আমার একটা ‘বড় মুশকিল’ মনে হয়েছে। মুশকিল বা সমস্যা, বোধ করা নিশ্চয়ই অপরাধ নয়।

      কিন্তু আমার এই মুশকিলবোধ প্রকাশের প্রতিক্রিয়ায় সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ আমাকে সম্বোধন করে সরাসরি লিখেছেন: “মশিউল, এই অতি জঘন্য এবং অর্থহীন মন্তব্যটি আপনার নিজের করা রিভিউতেও ছিল। আমি তখনই এর প্রতিবাদ করতাম, কিন্তু লেখা হয়ে ওঠেনি। জঘন্যতা বোঝাবার জন্য আমি কালি খরচ করব না। অর্থহীনতা নিয়ে বলছি।..”

      শ্রদ্ধেয় সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, আপনি আমার মন্তব্যটিকে ‘অতি জঘন্য’ বলে অভিযোগ করলেন, কিন্তু কেন একটি সাহিত্যিক মন্তব্যকে ‘অতি জঘন্য’ বলছেন, এখানে ‘জঘন্য’ বলতে আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন–একটুখানি ব্যাখ্যা করে বলা কি উচিত নয় আপনার? আপনার অভিযোগটা কিন্তু বড় অভিযোগ। সাহিত্যের আলোচনায় ‘জঘন্য’ মন্তব্য করার ওরিয়েন্টেশেন আমি পাইনি। আমাকে অতি জঘন্য মন্তব্যকারী বলে কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলে আমার প্রতি, (পাঠকদের প্রতিও) অবিচার হয় না কি? আমার মতো অনেক পাঠকের মনেও কৌতূহল জাগবে, কেন আপনি আমার মন্তব্যটিকে ‘অতি জঘন্য’ বললেন।

      আমার মন্তব্যটির ‘অর্থহীনতা’ বোঝাতে গিয়ে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ লিখেছেন, “শহীদুল জহির, আমার জানামতে, চোস্ত ঢাকাইয়া বলতে পারতেন। তাঁর গল্পের অনেক চরিত্র, যাদের কেউ রংবাজ, পাতি-মাস্তান, পুরিওয়ালা, এরাও ওই একই ভাষায় কথা বলে তাঁর গল্পে, তাতে নিশ্চয়ই প্রমাণিত হয় না যে শহীদুল জহিরও পাতি-মাস্তান বা পুরিওয়ালা?”

      একদমই উল্টা পথে চললেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। শহীদুল জহিরের পাতি-মাস্তান বা পুরিওয়ালা হওয়ার কথা আসছে কেন? তা তিনি হতে পারতেন না। অবশ্য পারলে সমস্যা ছিল না; বরং উত্তম পুরুষে একজন পাতি-মাস্তান সেজে যদি একটা গল্প তিনি লিখতেন, তাহলে সেই গল্পে সম্পূর্ণরূপে একজন পাতি-মাস্তান হয়ে ওঠাই হতো তাঁর শিল্পীসুলভ দায়। কিন্তু আমি বরং উল্টো, লেখকের সৃষ্ট চরিত্রের মধ্যে লেখকের নিজের ঢুকে পড়ার প্রশ্ন তুলেছিলাম। আমাদের, আমরা যারা গল্প লেখার চেষ্টা করি, এটা একটা সমস্যা, আমরা আমাদের মনের কথাগুলো প্রকাশ করি আমাদের তৈরি চরিত্রগুলোর মুখ দিয়ে, (কাজটা অন্যায় নয়, বেঠিকও নয়, কিন্তু, দৃষ্টান্তস্বরূপ, গ্রামের রাখালের গল্প লিখতে গিয়ে আমি যদি তার মুখের ভাষায় ও আবেগ-অনুভূতির বর্ণনায় শহুরে মধ্যবিত্ত লেখকের কৈশোর-নস্টালজিয়া ঢুকিয়ে দিই, তাহলে বিপদ ঘটে। সেরকম বিপদের কথাই বলতে চাচ্ছি)। দেখুন, আমি কিন্তু সুব্রতর ‘নিজেকে গল্পের ভিতরে ঢুকিয়ে ফেলা’র সমস্যাটা নিয়েই এত কথা বলছি। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রসঙ্গ বলে বলছি। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, আমার বিশ্বাস, আমার চেয়ে অনেক ভালো করে বিষয়টা বুঝিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু তিনি তাঁর ওই অন্যতম মৌলিক জায়গায় আর আলোকপাত না করে আমাকে ‘অতি জঘন্য’ মন্তব্যকারী বললেন, গল্প পড়া বাদ দিয়ে জীবনী পড়ার উপদেশ/পরামর্শ দিলেন, ‘চরিত্রানুগ সংলাপ’ লেখার ডিকটেশান দিতে বললেন গোরুরচনা লেখকদের।

      যা হোক, তবু বিষয়টা নিয়ে যখন কথা বলার উপল তৈরি হয়েই গেল, একটু বলি। সুমন রহমানও এখানে যোগ দিতে পারেন, দিলে ভালো হয়, কারণ, আমার মনে হয়েছে, লেখক ও তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলির মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাপারে সুমনের বক্তব্য অন্য ধরনের (সুব্রতর তুলনায়), সেখানেও কিছু জোরালো যুক্তি নিশ্চয়ই আছে। আধুনিক সাহিত্যতত্ত্বে নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হচ্ছে শুনতে পাই, আমরা সবাই তো সব জানতেও পারি না। যাঁরা জানেন, তাঁদের সুবাদে আমরাও যদি জানতে পাই, উপকার বৈ ক্ষতির সম্ভাবনা নেই।

      এখন, শহীদুল জহির প্রসঙ্গে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের কথার পিঠে আমার বক্তব্য: ১. ‘শহীদুল জহির চোস্ত ঢাকাইয়া বলতেন’, নাকি ঢাকার ভদ্রলোকদের মুখের ভাষার সঙ্গে সিরাজগঞ্জের গ্রামের মানুষদের আঞ্চলিক ভাষা মিশিয়ে ‘কথা বলতেন’, সেটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। ‘জানামতে’র দরকারও নাই। তিনি যে-ভাষায় গল্প-উপন্যাস লিখতেন তা আমাদের সামনে মুদ্রিত অবস্থায় হাজির আছে। আমরা দেখে নিতে পারি, যেকোনো একটি গল্পে, যেটি তিনি লিখেছেন থার্ড পারসন ন্যারেটিভে, সেখানে লেখকের বয়ানে তিনি কী ভাষা ব্যবহার করেছেন, আর সেই গল্পের চরিত্রগুলো কী ভাষায় কথা বলছে।

      “‘আয়, তরে তো আহনের সুময় দেখলাম,’ আসিয়া খাতুন আম্বিয়াকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা করলেন, ‘কেমুন আছস?’

      আম্বিয়ার মতো মেয়ের পিতৃগৃহে আগমন তেমন কোনো ব্যাপার নয়। তবুও বাড়ির একটি মেয়ে, গাঁয়ের একটি মেয়ে, আবার ফিরে এলো..।” (মাটি এবং মানুষের রং, শহীদুল জহির)

      “..তখন আবদুল করিমকে মেনে নিতে হয়, সে আজিজ ব্যাপারির ঘরের ভিতরে ঢুকে ঘনায়মান অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ডালপুরি খায় এবং বলে, ডাইলপুরির মইদ্দে ডাইল নাইকা, হুদা আলু।

      আ. আ. ব্যাপারি: হঁ। ডাইলের দাম বাইড়া যাইতাছে কেমুন, দেখ না!

      আ. ক(রিম): আপনের লগে ডাইল লয়া আমুনে।

      আ. আ. ব্যাপরি: কইত্থন?

      আ. ক(রিম): আমি মৈমনিং যাইতাছি বেড়াইতে।

      তারপর আবদুল আজিজ ব্যাপারি যখন জিজ্ঞেস করে, ময়মনসিংহ তার কী কাজ, সে বলে বলে যে, সে আসলে আকুয়া যাচ্ছে; এবং আবদুল আজিজ ব্যাপারি যখন আকুয়া কোথায় তা বুঝতে পারে না, সে বলে যে, সে আসলে ফুলবাড়িয়া যাবে।”
      (‘কোথায় পাব তারে’, শহীদুল জহির)

      “মহল্লার ওপর দিয়ে দীর্ঘ সময়ের স্রোত বয়ে যায় এবং কাছেই যেমন বুড়িগঙ্গা দিয়ে পানি যায়, তবু, কখন কখন মহল্লার লোকদের হয়তো আবদুল হালিমের কথা মনে পড়ে এবং তখন তারা বলে, হালায় পাগল আছিল এউকগা; ভূতের গলির লোকেরা সকলকেই হালা এবং পাগল বলে এবং পরিবর্তিত সময়ের ভেতর দিয়ে অর্থহীন কলরব করে।”
      (‘মহল্লায় বান্দর, আবদুল হালিমের মা এবং আমরা’, শহীদুল জহির)

      “তার মুখে একটি রহস্যময় হাসি ঝুলে ছিল। তার পাতলুনের ডান পা-এর প্রান্তটি সাইকেল কিপ দিয়ে আঁটা, পায়ে সাদা ক্যাম্বিসের জুতো, সাদা ফুল হাতা শার্টের প্রান্ত ধূসর রঙের প্যান্টের ভেতর গুঁজে দেয়া, মাথায় একটি জীর্ণ এবং তোবড়ানো কাপড়ের হ্যাট; সে যখন একটু নাটুকে পোজ নিয়ে মাথা উচু করে, দেহটা পিছন দিকে সামান্য বাঁকা করে দাঁড়ায় তখন তার মুখে সেই অস্পষ্ট হাসিটি দেখা যায়। এই অবস্থায় সে তার বাঁ হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে, ডান হাতটি একটি বৃক্ষ শাখার মতো দেহের পাশে তার কাঁধ বরাবর ওঠায় এবং ভিক্টোরিয়া পার্কের বিকেলের আলোয় সবুজ ঘাসের ওপর তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেরা দেখে যে, তার উত্তোলিত হাতে সে একটি শুকনো এবং ধূসর রঙের হাড় ধারণ করে আছে। এইটা কী? সে জিজ্ঞেস করে, এবং তার সম্মুখে দাঁড়ানো লোকদের, যাদের ভেতর একই সঙ্গে বালক এবং বয়স্ক মানুষ ছিল…। তখন লোকটি পুনরায় ছয় ইঞ্চি লম্বা এবং ঈষৎ বাঁক-খাওয়া হাড়টি আন্দোলিত করে বলে, কন, এইটা কী? ভালা কইরা দেখেন, ভালা কইরা দেইখা কন; এবং তখনও সম্মুখে দণ্ডায়মান লোকেরা চুপ করে থাকলে লোকটি যেন ইচ্ছাকৃতভাবে এই লোকদের একটু ভুল পথে এগিয়ে নিতে চায়…
      (‘ডুমুরখেকো মানুষ’, শহীদুল জহির)

      উদাহরণ আরো বাড়ানো যায়, কিন্তু আর প্রয়োজন নেই। তাছাড়া, শুধু লেখকের বর্ণনার ভাষা আর চরিত্রগুলির সংলাপের ভাষার তারতম্য নয়, চরিত্রগুলির চিন্তা, মনের অবস্থা, অন্যান্য চরিত্রের সঙ্গে ক্রিয়াকলাপ ইত্যাদি নানা কিছু মিলিয়ে তৈরি হয় (সেগুলিও বর্ণিত হয় লেখকেরই হাতে) তাদের সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিত্বের পার্থক্য। রাশিদার ‘পরালালনীল’ গল্পে এইখানে আমি মুশকিল দেখতে পেয়েছি। ‘নাহার বেগমের শেষ দিনগুলি’ গল্পটির কথাও এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছি। সেখানে নাহার বেগমের মনোলোগ ও তাঁর মেয়ের মনোলোগ একাকার হয়ে গেছে; ক্যারেকটাইজেশান বা চরিত্রায়ন শব্দটাকে কিশে বলতে পারেন, কিন্তু এটা এড়ানোর উপায় নেই। এখানে উদ্ধৃতি দিয়ে দেখানো যায়, চরিত্র দুটিকে পরস্পর থেকে আলাদা করে, লেখকের থেকে আলাদা করে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে কী ঘাটতি থেকে গেছে। কিন্তু সে কষ্ট আর স্বীকার করতে চাই না। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, আমার কেবলই মনে হচ্ছে, বিষয়টি অত্যন্ত ভালোভাবে জানেন, তাঁর আলোচনার একটি সূচনাবিন্দু ছিল এটি।

      রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রগুলি সব লেখকদের মতো করেই কথা বলে–সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এই উদাহরণ টেনেছেন কেন? এঁদের মতো করে গল্প লিখতে কি তিনি পরামর্শ দেবেন আমাদেরকে, বা রাশিদা সুলতানাকে? রবি বাবু বা শরৎ বাবু এখন, এই সময়ে গল্প লিখলে কি ওইভাবেই লিখতেন বলে মনে হয়?

      সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ আমাকে আরো লিখেছেন: “চরিত্রানুগ মুখের ভাষার চর্চা বস্তাপচা টিভি সিরিয়ালের হাস্যকর এবং বিরক্তিকর বিষয়। লেখক স্বয়¤ভু, তিনি তাঁর সৃষ্ট চরিত্রের মুখে কী ভাষা দেবেন তা কারুর এক্তিয়ার নয়। গোরু রচনার রচয়িতাদের বরং এসব ডিকটেশান দেবেন।

      মহাশয়, ডিকটেশান দেওয়ার মতো বিদ্যা বা দুঃসাহস কোনোটাই আমার নেই। কিন্তু এটুকু বলতে পারি, লেখক স্বয়ম্ভূ হলেও অন্যদের সঙ্গে তাঁকে যোগাযোগ স্থাপন করতে হয়। আমার গল্পে যদি রংপুরের মফিজ কথা বলে পটুয়াখালীর মকবুলের মুখের ভাষায়, তাহলে পাঠক আমাকে কী বলে ধরে নেবেন? বা আমার গল্পের একজন নিরক্ষর রিকশাওয়ালা যদি আমাকে পুশকিনের কবিতা রুশ ভাষাতে শোনায়, তাহলে কি আপনারা ভাববেন না আমি গল্পটা লিখতে বসার আগে লিটার খানেক ভোদকা গিলেছিলাম? না দাদা, লেখক এরকম স্বয়¤ভু হলে চলে না। হয়ও না। আমি একটু সুপারলেটিভ ডিগ্রিতে বললাম, জাস্ট বোঝাবার জন্য, আপনার ওই পয়েন্টটাই, গল্পের ভিতরে লেখকের নিজের ঢুকে যাওয়া।

      কিন্তু আপনাকে আমি কী বোঝাব? আমার চেয়ে আপনি হাজার গুণ, লক্ষ গুণ ভালো বোঝেন।

      এখন শেষ করব। তার আগে কয়েকটি জিজ্ঞাসা।

      সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ আমাকে লিখেছেন, “আপনার লেখাটি খুবই খুবই অদ্ভুত। আমি আপনার নিজের করা এই বইটির আলোচনা পড়ে খুব হতাশ হয়েছিলাম, আর এই চিঠিটি পড়ে একেবারে অবাক হয়ে গেলাম।”
      আমার লেখাটি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের কাছে কেন ‘খুবই খুবই অদ্ভুত’ লেগেছে তা একটু পরিষ্কার করে জানাতে তাঁকে অনুরোধ করছি।

      রাশিদা সুলতানার বই নিয়ে আমার আলোচনা পড়ে তিনি কেন খুব হতাশ হয়েছিলেন, এখানে হতাশার কী আছে/ছিল এবং সে-হতাশা কেন তাঁকে ধরেছিল, এটাও একটু ব্যাখ্যা করলে ভালো হয়। আর আমার চিঠিটি পড়ে কেন ‘একেবারে অবাক’ হয়ে গেলেন তিনি, আমি কিভাবে অবাক করলাম তাঁকে, তাও জানতে ইচ্ছা করি।

      তবে এটা অবশ্যই চাইতে চাইব, আমার উপরে-উল্লিখিত একটি মন্তব্য কেন ‘অতি জঘন্য’ বলে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ অভিযোগ করেছেন। ‘জঘন্যতা’ বোঝাবার জন্য একটুখানি কালি খরচ করার জন্য তাঁকে অনুরোধ করছি।

      মশিউল আলম
      ঢাকা, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১০

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ — সেপ্টেম্বর ৭, ২০১০ @ ১১:০২ পূর্বাহ্ন

      প্রিয় মশিউল, বিস্তারিত লেখবার অবকাশ এ-মুহূর্তে নাই। সংক্ষেপে কিছু বলার চেষ্টা করি।

      আপনি প্রথমেই আমার একটা কথার উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করেছেন, যেখানে আমি বলেছি গল্পের ভিতর লেখক নিজেকে ঢুকিয়ে না-ফেললেই ভালো। এই “ঢুকিয়ে ফেলা” লেখকের ভাষা নয়, বরং লেখকের চিন্তা, মনন, অভিপ্রায়। ভাষার বিষয়ে আমি লেখকের সম্পূর্ণ স্বাধীনতার অনুমোদন করি। হ্যাঁ, আমার ইচ্ছা হ’লে আমি একজন চাটগাঁইয়ার মুখে বরিশাইল্যে ভাষা বসাব বৈকি। আর, তেমন কি আপনারা করেন না আসলেই? বাংলাদেশে ক’জন মানুষ কলকাতার ভাষায় কথা কয়? কিন্তু হরদম বাংলাদেশি চরিত্ররা কলকাতার ভাষায় কথা বলে না কি?

      জঘন্য বলেছিলাম কেননা আপনার ঐ মন্তব্যের একটা অর্থ হয় যে রা.সু. বর্ণিত বারবনিতার গল্প তাঁর নিজেরই কাহিনি, অর্থাৎ তিনি নিজে তা-ই। আপনার কথাটা স্রেফ “ভাষাগত” মিল-ভিত্তিক হ’লে কিন্তু রাশিদার সকল গল্পের সকল চরিত্রকেই এই বিচারে আনতে হয়… মানে রাশিদার প্রায় সকল চরিত্রই রাশিদার ভাষাতেই কথা বলে ব’লে আমার ধারণা–সেখানে এই বারবনিতার বিশেষ উল্লেখ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে করাটা আমার অন্যায় হয়েছে কী না জানি না।

      আপনার রিভিউ এবং চিঠির ক্ষেত্রে আমার হতাশা ও বিস্ময়ের মূল কারণ আপনি নিজে। আপনি আমার চোখে এ-সময়ের একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান্ কথাকার, এবং কাজেই আপনার কাছে আমার প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। আশা করেছিলাম যে গল্পের প্যারাফ্রেসিং-এর সহজ পথ ছেড়ে, গল্পের ফর্ম, স্টাইল, টেকনিক প্রভৃতি বিষয়ে আলোকপাত করবেন, নিজের লেখক-কৃতী আর অভিজ্ঞতার আলোকে। কিন্তু যা করলেন তাকে মনে হয়েছে কাউকে আগেভাগেই খারিজ ক’রে রেখে শুরু করেছেন, এবং খারিজি কাজটাও দায়সারাভাবে সেরে দিয়েছেন। লেখাটা আপনার ব’লেই হতাশ হয়েছিলাম তখন, আর এ চিঠিতে খোকাবাবুর হুবহু প্রত্যাবর্তনে হয়েছিলাম বিস্মিত।

      রাশিদার মতো একজন নোতুন লেখককে খারিজ করা খুব সহজ। আপনার মতো প্রতিষ্ঠিত লেখকের জন্য তা কলমের আধটা খোঁচা। কিন্তু, এভাবে কাউকে খারিজ করলে, নিজেকেও প্রকারান্তরে তা-ই করা হয় মনে হয়।

      আমি কথাসাহিত্যের মানুষ নই। একটুআধটু খেলা করেছিলাম মাত্র। আমার গল্প নিয়ে লেখা একটু এলেবেলে হ’তেই পারে তাই। কিন্তু আপনি তো বোনাফাইডি কথাকার, আপনার কথা তো শুনে সমৃদ্ধ হ’তে ইচ্ছা করে… কেন আপনারও কথা আমারই মতো অর্থহীন ধিক্কৃতি হ’য়ে দাঁড়াবে বলুন তো?

      গুণমুগ্ধ
      সুব্রত।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফারিহান মাহমুদ — সেপ্টেম্বর ৭, ২০১০ @ ৭:৪০ অপরাহ্ন

      পরালালনীল-এর উপর সু.অ.গো’র লেখাটা একটা সমৃদ্ধ ও শিল্পিত সমালোচনাসাহিত্য। ‘স্বপ্নমঙ্গল’ ও অন্যান্য গল্পের উপর সু.অ.গো’র আলোকপাত থেকে গল্পের বিষয়বস্তু ও বর্ণনার যে ধারণা পেলাম, তাতে আমি কিছুটা অবাক হয়েছি এই ভেবে যে, রাশিদা সুলতানার মতো একজন লেখকের গল্পের বিষয়বস্তু এতো মামূলি ও সাদামাটা হতে পারে? যে গুণবিচারের ভিত্তিতে তাঁকে বা তাঁর লেখার উৎকর্ষ প্রচার করা হচ্ছে, তা তো আমি হরহামেশা ব্লগ ওপেন করলেই পাচ্ছি। রাশিদা সুলতানার অবস্থানটা তাহলে সত্যিকারে কোথায়?

      ব্রাত্য রাইসু’র দেশব্যাপী খ্যাতি থাকলে, এবং ব্রাত্য সত্যিই একজন ভালো মাপের কবি বা লেখক হলে হয়তো সু.অ.গো ব্রাত্যকে উপরে তুলে আনবার প্রয়াস দেখাতেন না, এবং এ-লেখায় নির্ঘাত ব্রাত্য’র অনুল্লেখ দেখতাম বলে আমার বিশ্বাস। (ব্রাত্যকে নিয়ে লেখা সু.অ.গো’র একটা নভেলা আমার কাছে জমা পড়েছিল, কোনও একটা সংকলনে ছাপবার জন্য। ব্রাত্য রাইসু নাম-নায়ক-কাহিনীতে আমার আপত্তি থাকায় সু.অ.গো’র সাথে আমার মৃদু মনোমালিন্য হয়েছিল। পরে অবশ্য ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়; তা অনেক অনেক দিন আগের কথা)। সু.অ.গো, সুমন রহমান, মশিউল আলম, মাহবুব মোর্শেদ, সেলিনা শিরীন সিকদার, এঁদের লেখায় যা পাই, ব্রাত্য রাইসু আসলে তা থেকে বহুদূর পেছনে। এ লেখায় তাই ব্রাত্য’র উল্লেখটাই বিপত্তি ঘটিয়েছে, তা থেকেই দানা বেঁধেছে ক্ষোভ।

      বিতর্ক খুব ভালো লেগেছে। রাজু আলাউদ্দিন, সুমন রহমান, মশিউল আলম, সুব্রত–সবাই স্ব স্ব পক্ষে ক্ষুরধার যুক্তি প্রদর্শন করেছেন। তবে, সুব্রত’র প্রতি অনুরোধ–আক্রমণ রচনায় ‘জাতক-ফাতক’ ইত্যকার শব্দের চেয়ে কূটনীতির ভাষা প্রয়োগ ও পরমত-সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করলে তা আরামপ্রদ আবহাওয়া তৈরিতে অধিক সহায়ক হবে বলে মনে করি। ফেইসবুকে সুব্রত’র ভাষারীতিতে আমি খুবই সন্তুষ্ট হয়েছিলাম, কিন্তু এ লেখাটা পড়ে খানিকটা মর্মাহত হতে হলো।

      ফারিহান মাহমুদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুমন রহমান — সেপ্টেম্বর ৭, ২০১০ @ ৮:৫৯ অপরাহ্ন

      সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ লিখলেন:

      …গল্পের ভিতর লেখক নিজেকে ঢুকিয়ে না-ফেললেই ভালো। এই “ঢুকিয়ে ফেলা” লেখকের ভাষা নয়, বরং লেখকের চিন্তা, মনন, অভিপ্রায়।

      এই চাওয়া মশিউল আলমেরও। কিন্তু তাঁরা কেন চান এটা? মশিউল আলমের জবানিতে, নেহাত প্রায়োগিক সুবিধার কারণে সেটা চান তারা। গল্পটিকে “শিল্পবস্তু হিসাবে চেনার সুযোগ” অব্যাহত রাখার জন্য। তাদের উভয়েরই যেটা অভিপ্রায় তা হল, সাহিত্য বাস্তবতাকে “প্রতিনিধিত্ব” করবে। বাস্তবের দলিল হয়ে উঠবে। নব্য-বাস্তববাদের এইটাই মেনিফেস্টো।

      অবাক ব্যাপার, এই দুজনই সাহিত্যিক, কিন্তু তাদের চাওয়াটা সাহিত্য সমালোচকের! সাহিত্য নির্মাতার কী ঘটে তাঁরা সেদিকে গেলেন না!

      আমার বিচারে, সাহিত্য কখনই বাস্তবকে “প্রতিনিধিত্ব” করতে পারে না, বরং সে বাস্তবকে “উৎপাদন” করে। সাহিত্যিক বাস্তবের সাথে আপনার খালি চোখে দেখা বাস্তবের যে মিল দেখে আপনি যারপরনাই আনন্দিত, ফলত সেই সাহিত্যকে অমরত্ব প্রদানে আগ্রহী, তা একটা মিথ। একটা জটিল মনস্তাত্ত্বিক হিসাব এর পেছনে আছে। সাহিত্যের উৎপাদিত বাস্তবতা এবং অসাহিত্যের বাস্তবতা এই দুই জিনিস একই কালিক মুহূর্তে আমরা অনুধাবন করি না। আগে পরে করি। ফলে এখানে একটা পারসেপশন অন্যটাকে প্ররোচিত করে। অন্তত করবার সম্ভাবনার মধ্যে থাকে। দৃষ্টান্ত দিই: ধরা যাক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চরিত্র হাড্ডি খিজির। এটি একটি সাহিত্যিক চরিত্র। এর নান্দনিক উৎকর্ষ আমাদেরকে বাস্তবের লুম্পেন নিম্নবর্গের মাঝে হাড্ডি খিজির উদঘাটনে প্ররোচিত করে। পথে ঘাটে, কিংবা ইতিহাসের ন্যারেটিভে আমরা অনামা লুম্পেনের মাঝে হাড্ডি খিজিরকে আবিষ্কার করে পুলকিত হই। অপরদিকে, লুম্পেন নিম্নবর্গ (অন্য কোনো টার্ম এ মুহূর্তে মাথায় না-আসায় এটাই ব্যবহার করছি, যদিও মার্কসীয় অর্থে মীন করছি না) সম্পর্কে আমাদের যে খিজির-পূর্ব পর্যবেক্ষণ, তা হাড্ডি খিজিরপাঠে খিজিরের নানাবিধ মহত্ত্বের সম্ভাবনায় সিদ্ধ হয়ে ওঠে। ফলে আমরা তা খিজিরে আরোপ করি। এভাবে, টেক্সট ও টেক্সটের বাইরে একটা হাড্ডি খিজির বিকশিত হতে থাকে। লেখকের ব্যক্তিত্বসমেত, পাঠকের আকাঙ্ক্ষাসমেত। লেখক ইলিয়াস কিংবা পাঠক সুমন, কার পক্ষে এই দুর্নিবার প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা সম্ভব?

      এখন, হাড্ডি খিজিরের এই নান্দনিক প্রাবল্যের কারণ কী? কারণ সে লেখক ইলিয়াসের স্বপ্ন, ইচ্ছা, দৃঢ়তা, মূঢ়তা, নির্জ্ঞান-সজ্ঞান- সমভিব্যহারে এই মনোজ্ঞ আকৃতি পেয়েছে। হাড্ডি খিজিরের মধ্যে শুধু ইলিয়াস নিজেই ঢোকেন নাই, তার আত্মীয়স্বজনকেও ঢুকিয়েছেন, এমন কি তাকে জগতজোড়া ন্যারেটিভের অংশীও করেছেন। লেখক কোন্ চরিত্রের মধ্যে কীভাবে বিরাজ করবে, তার গূঢ় হিসাব কেবল তিনিই রাখেন। আমাদের সাহিত্য সমালোচনা তার নাগাল খুব কমই পায়। আমরা কেবল ভাসা-ভাসা বলতে পারি, যথা, ওসমান ইলিয়াসের ব্যক্তিচরিত্রের “প্রতিফলন”। কিন্তু আমরা কি কখনই জানবো, সৃষ্ট “ওসমান” কীভাবে লেখক ইলিয়াসকে উৎপন্ন করে? আমরা কি কোনোদিন জানবো যে, ইলিয়াস কোন বিচিত্র নিয়মে এমন কি, খিজিরের মা মাতারির চরিত্রেও নিজেকে ঢুকিয়ে দেন? সেমিওটিক্স দিয়ে হয়ত তার কিছু নাগাল পাওয়া সম্ভব।

      ফলে, গল্পের ভেতর লেখক অবলীলায় ঢুকে থাকেন, কখনো স্ব-ইচ্ছায়, কখনো ইচ্ছানিরপেক্ষভাবে, কখনো নির্জ্ঞানে। এ থেকে বাইরে আসার কোনো রাস্তাই নাই। সাহিত্য বলতে আমি এই জিনিসই বুঝি, প্রিসাইজলি। ডেলিবারেটলি সেই চেষ্টা করা কিংবা না-করা সমান, কারণ এটা অনিবার্যভাবেই ঘটতে থাকে।

      – সুমন রহমান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজু আলাউদ্দিন — সেপ্টেম্বর ৭, ২০১০ @ ৯:৫১ অপরাহ্ন

      কূপমন্ডুক এবং প্রাদেশিকতার বিপক্ষে মশিউল আলম যে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ হাজির করেছেন তা আমার কাছে খুবই গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। মশিউলকে এজন্য ধন্যবাদ। ধন্যবাদ আরও একটি কারণে তা হলো মেটামরফসিস যে নিছক বর্ণনা নয়–এই ধারণাটি তিনি চমৎকারভাবে খণ্ডন করেছেন বলে।

      প্রিয় সুব্রত,
      একটি জায়গায় আমাদের মধ্যে বিরাট ব্যবধান লক্ষ্য করছি। ব্যবধানটা হচ্ছে সুমন রহমানের মতো আপনিও সাহিত্যের প্রাদেশিকতা এবং কূপমন্ডুকতার পক্ষে আর আমি এর বিপক্ষে। মনে হয় মশিউলও এর বিপক্ষে, যদি ভুল না বুঝে থাকি। আপনাদের পক্ষপাতকে আমি শ্রদ্ধা জানাই। আমার ধারণা এ বিষয়ে আমরা তর্ক-বির্তক থেকে কুতর্কেও চলে যেতে পারি। কিন্তু আমরা কখনো–বিশ্বাসের ভিন্নতার কারণেই–একমত হতে পারবো বলে মনে হয় না। সুতরাং এ নিয়ে আপনাদের মূল্যবান সময় আমি নষ্ট করতে চাই না। আপনাদের এই পক্ষপাত সাহিত্য এবং অসাহিত্যের মধ্যেকার ভেদ-রেখা ভুলে যেতে সাহায্য করবে আমাদেরকে। আর তাতে করে আমরা হঠাৎ করেই বিপুন পরিমাণ পোস্ট মডার্ন কথাসাহিত্যের একটি ভাণ্ডার পেয়ে যাবে। বা হয়তো ইতিমধ্যে পেয়ে গেছি।

      এইভাবে পোস্ট মডার্ন হওয়াকেই যদি সাহিত্যের অগ্রগতি বলে বৃহত্তর সুধী পাঠক সমাজ মেনে নেন তাহলে বুঝতে হবে আমার ধারণা ভুল এবং আমি সনাতনপন্থী ছিলাম। নিজের ধারণার জয়-পরাজয় নিয়ে আমার কোন কমপ্লেক্স নেই। আমার তৃপ্তি এই যে আমি যা ভাবি তাই বলি, তর্কের খাতিরে বিশ্বাসের খোলনলচে পাল্টে ফেলতে পারি না। এ আমার অক্ষমতা। সব শেষে, আপনাকে ধন্যবাদ বেশ কিছু বিষয়ে আপনার মূল্যবান খণ্ডন ও ব্যাখ্যার জন্যে।

      – রাজু আলাউদ্দিন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মশিউল আলম — সেপ্টেম্বর ৮, ২০১০ @ ১২:১৩ পূর্বাহ্ন

      এক.

      “এই গল্পের বড় মুশকিল হলো, লিপি নামের বারবনিতার বয়ানকে মনে হয় লেখকের নিজের বয়ান। বারবনিতা লিপির ভাষা আর লেখক রাশিদা সুলতানার ভাষাভঙ্গির মধ্যে কোনো তফাৎ নেই।”

      পরালালনীল গল্পটি সম্পর্কে আমি এই কথা লিখেছিলাম। কী বোঝাতে চেয়েছি, তারও বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছি অনেক উদ্ধৃতি-উদাহরণ সহযোগে। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ আমার এই মন্তব্যকে ‘অতি জঘন্য’ বলে অভিযোগ করেছেন। আমি জানতে চেয়েছি, এটা কী করে অতি জঘন্য মন্তব্য হলো। উত্তরে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ আমাকে লিখলেন, তাঁর বাক্য হুবহু উদ্ধৃত করছি:

      “জঘন্য বলেছিলাম কেননা আপনার ঐ মন্তব্যের একটা অর্থ হয় যে রা. সু. বর্ণিত বারবনিতার গল্প তাঁর নিজেরই কাহিনি, অর্থাৎ তিনি নিজে তা-ই।”

      এবার আমার বিস্ময়ে বাক্যহারা হওয়ার দশা উপস্থিত। ‘আপনার ঐ মন্তব্যের একটা অর্থ হয় যে..’ এরকম করে ভাবতে পারলেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ!!!

      আমি সত্যিই হতবাক। আমার বিবমিষা লাগছে। বমি করে নিজেকেই নিজের ভিতর থেকে বের করে ফেলে দিতে ইচ্ছা করছে।

      দুই.
      সুমন রহমান, আপনার গল্পটির শিরোনাম ও উদ্ধৃত অংশের শেষে একটি শব্দ ভুল লিখেছি বলে আমি দুঃখিত। ওটা ইচ্ছাকৃত নয়। আর আপনাকে উদ্ধৃত করেছি কোনো ‘মারণাস্ত্র’ প্রয়োগ করতে নয়। মারণাস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই।
      আপনার ‘নিরপরাধ ঘুম’ (প্রথম আলো ঈদসংখ্যা ২০১০) উদ্ধরণযোগ্য বলেই তা করেছি, এবং যথাস্থানে।

      ‘গল্পের ভিতরে লেখকের ঢুকে পড়া’ নিয়ে যে-প্রসঙ্গটি আপনি তুললেন, তা খ্বুই আগ্রহোদ্দীপক। কিন্তু এই যাত্রা এখানে অংশগ্রহণ করতে মন সায় দিচ্ছে না। ভয়াবহ গ্লানিকর অভিযোগের শিকার হয়েছি। এখানে (এই প্রতিক্রিয়া-ধারায়) আর কথাই বলা যাবে না।

      মশিউল আলম
      ঢাকা, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১০

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ — সেপ্টেম্বর ৮, ২০১০ @ ৩:০৮ পূর্বাহ্ন

      সুমন,

      আমার কথা ইগজ্যাক্টলি আপনার কথা, এবং আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন। আমি “বাস্তবতা-পরিপন্থী”। বাস্তবিকতার বয়ানের হাত থেকে লেখককে সরিয়ে রাখবার জন্যই বরং তাকে গল্পের বাইরে থাকবার উপদেশ আমি দিই। গল্পটা হবে তার হাতে তৈরি একটা শিল্পকর্ম, তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জীবনী নয়। গল্প সে “বানাবে”। এই বানানোতেই শিল্প… মানে ক্রিস্টিয়ান ডিয়রের গন্ধতরল আর বোদলেরের গন্ধতরল এক বস্তু নয়, বোদলেরেরটার থেকে অন্য এক “গন্ধ” আসে, যা শিল্পের… তার সঙ্গে তাঁর গায়ের গন্ধ খানিক মিশে থাকতেই পারে, কিন্তু গায়ের গন্ধটাই ঐ গন্ধতরলের পরিচয়চিহ্ন হ’য়ে দাঁড়ালে আখেরে শিল্প কিছু ক্ষুণ্ন হবার সম্ভাবনা হয়। পাকা খেলুড়েদের হাতে তারপরও উৎরে যদিও যায়, নোতুনদের জন্য সেটা একটা বিপজ্জনক মার্গ। এ-ই ছিল আমার কথা।

      সুব্রত।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com