চারটি কবিতা

সিদ্ধার্থ হক | ১৯ আগস্ট ২০১০ ১০:২০ অপরাহ্ন

সমগ্র মৃদুতা নিয়ে

সমগ্র মৃদুতা নিয়ে যদি তুমি ভাবো এই পৃথিবীর কথা,
বহুদিন একটানা চুপ করে থেকে তাকে দেখো মনে মনে,
তবে জেনো, পরিপূর্ণ একা হয়ে মহাশূন্যে ছুটছে সে এখন।
কোনোদিন থামে নাই। ঢলে পড়ে যায়নি নিদ্রায়।
অনাস্তিক ছায়া পথে জীবনের ঘূর্ণমান জায়গীর বসিয়েছে।
বন্ধু নেই, সুনির্ণীত শত্রু নেই, আছে এক
আত্ম-জিজ্ঞাসার হুঁশ, মহাশূন্যে একা ছুটে চলা।
নিঃসঙ্গ কে আর তার মত

নিজেকে রক্ষণ করা জেনে নিতে হয় পৃথিবীকে।
আপন মনের জোরে তৈরি করে নিতে হয় আবহমণ্ডল,
রূপের কবিতা। স্বচ্ছ বৃষ্টিপাত ঢেলে সাজায় সে
অভ্যন্তরগুলি অবিরাম। দিগন্তের শান্ত বেড়া তোলে।
স্তরে স্তরে তৈরি করে গভীর আকাশ, মনোরম কারাগার;
হৃদয়ে আগ্নেয়গিরি জ্বেলে রাখে ভূপৃষ্টে সবুজ চায় বলে।

যদিওবা বহু বহু জাগতিক বেদনায় তুমি নত, নিম্নগামী—
লক্ষ করো, অনন্ত আশ্চর্য পথে, তবু তুমি তারই উৎসাহ;
পৃথিবীর যা যা আছে তোমারও তা আছে। লক্ষ করো
এই সত্য জেনে, যদিও মানুষ তবু ভয় চলে যায়, কষ্ট কমে—
স্পষ্টভাবে টের পাও মানুষের তৈরি করা
ক্ষণস্থায়ী সংজ্ঞা আর রাষ্ট্রের বাইরে, নির্দিষ্ট বুদ্ধির পথে
চলেছে পৃথিবী, ব্যতিক্রমী কবিতার ন্যায়,
পরিপূর্ণ ভুলহীন, সুস্থির ও রাগী। সময়কে নিয়ে কোনো
মাথাব্যথা নেই, কিন্তু বৃষ্টি নিয়ে আছে। সেইহেতু
বহু আগে লুপ্ত হওয়া জীবনের পূর্বাভাসগুলি, দ্যুতিগুলি—
অনায়াসে সঞ্চারিত হয়ে আছে তোমার ভিতরে।

যখন সময় হবে এক মুঠো ছাই করে তোমাকেও
সঞ্চারিত করে দেবে অন্য কারো পরিশ্রমী মনে।

ঐ যে জ্বোনাকি ওড়ে পেটের ভিতরে এক বাতিঘর নিয়ে
ঝোঁপে ঝোঁপে জ্বেলে দেয় দিগন্তের বিবাহ সংবাদ
তুমি টের পেয়ে যাও, এই ধারানিবন্ধের স্রোতে
সে তোমারই মন।

২৭/৭/২০১০
 

মা – দুই

অনেক দেশের পথে মৃত মাকে দেখি জেগে আছে।
তারা পথে পরবাস, নিজ দেশে মৃত বলে,
পর পথে আমার মা এখন থাকছে। বেদনার সীমানায়
সে একা অনেক জন, এক থেকে বহু হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
কখনো অচেনা লাগে, কখনো বা চেনা,
তবু সে তো আমারই সে মা।

চিরন্তন হয়ে গেছে, প্রশ্ন নেই তাই, কোনো অপেক্ষাও নেই।
কিন্তু ক্ষুধা আছে, ক্ষুধা রথে শ্বাস নেয়, শ্বাস নেয়…
মা আমার শুয়ে থাকে গভীর ক্ষুধায় বাঁকা হয়ে;
হাত সে পাতে না আর, হতভাগা বরফের সাদা চাপে হাত
তার কাঁপে। সে একা অনেক রূপ, তবু দেখি ক্ষুধায় সে
পরিপূর্ণ একা।

মৃত তবু মৃত্যু নেই যার, সে এখন আবছায়া চোখ মেলে
পরবর্তী মৃত্যু কথা ভাবে সন্ধ্যা হলে। রাত হলে
ঘুমহীন স্বপ্নে দেখে এবার সে মারা যাবে দীর্ঘ বাহু
সন্তানের মন থেকে নেমে আসা পাথরের চকিত আঘাতে;
আর্তনাদ করবে না, মনে মনে ঠিক করে রাখে

পথে পথে আলোহীন শ্বাসে তার ক্লান্ত, মূর্খ চোখ বুজে আসে।
অনেক মৃত্যুকে ভেবে মৃত মার কপালে ও চোখে
জীবনের দুএকটি বলিরেখা জাগে, যোগ হয়। মার দেহে
এতো ধূলো জমে আছে মনে হয় সে এখন পথের মন্দির;
পৃথিবীর সব লোক জুতো পায়ে তার দেহে হাঁটে; তার চোখে
যা নেই তা খোঁজে।

জুলাই ২০১০
 

অসম্ভব নির্জনতা

মানুষ প্রকৃত পক্ষে লক্ষ করে প্রকৃতিকে একা হয়ে গেলে।
এইভাবে নিজেকে নষ্টের ইচ্ছা কমে আসে তার।
জগতের আপামর অপ্রাসঙ্গিকতাকে টের পেয়ে
মনোযোগ জাগে। তখন সে দেখে বাতাসের মনস্তাপ
তার মধ্যে দরবেশের মত বসে আছে। বিস্তার ছড়িয়ে
আছে লক্ষ লক্ষ জলে ডোবা মাঠ হয়ে মনের ভিতরে।
জগতের অস্থিরতা, সেও তো রয়েছে ধীর পদ্মাসনে বসে।
তখন সে জেনে যায় ঘটনার পিছে থাকা নিহিত অপার।
বাতাসের নাড়ি ধরে বলে দেয় তীব্রগতি ঝড় কত দূরে;
তারপর সেই কটি দিন শুধু ওড়া, মানুষ হয়েও শুধু
উড়ে চলা মুলোৎপাটিত এক বারান্দায় বসে; সমতল
পৃথিবীকে ঝেড়ে ফেলে সে বারান্দা উড়ে যায় পর্বতের গভীর কার্নিশে
রোমকূপে রোমকূপে ইগলের ভয়হীন মুক্তি ও চিৎকার… শোনা যায়

অসম্ভব নির্জনতা মনে এলে প্রকৃতির মনস্তত্ত্ব টের পাওয়া যায়;
বিকেলের অনুরোধে তখন সে মাঠে চলে যায়। ঘাসে বসে
টের পায় বহু দিন বসেনি সে ঘাসে। আলোর আলোত্বটুকু
মাঠ ভরে থাকে, ধরা পড়ে চোখে। মনে হয় ঐ আলো
মার ভেজা চুল থেকে নেমে আসা ফোঁটা ফোঁটা রূপ, রূপকথা।
নিজের ক্লান্তিকে কোলে নিয়ে বসে লক্ষ করে প্রকৃতির কোনো
ক্লান্তি নেই। গাছেরা কৌতুকপ্রিয়, টুপ টাপ ফেলে দেয়
সবুজাভ বুননের কিছু রব, নৈপুণ্যের মত টোকা
তার নিচে বসে থাকা মানুষের কোলে। বহুক্ষণ বসে থেকে
গাছে পিঠ দিয়ে, গাছেদের সংহতিকে অন্তরের মধ্যে পাওয়া যায়।
বোঝা যায় বিশ্রামে সম্পন্ন হয় সব প্রাণ, এমনকি মহা
আকাশের দক্ষ হাঁস অনেক উড়বার পর আকাশের পথ থেকে
সরে গিয়ে নেমে আসে মাঠের সন্ধ্যায় মানুষের প্রেরণার
ক্লান্তি থেকে ভিন্ন এক নিজস্ব ক্লান্তিতে; বিস্তৃত শূন্যের দাগ
মুছে নিতে উড়ো হাঁস নেমে আসে মানুষের জানা সমতলে।
হাঁসদের চিৎকারে, আর্ত চিৎকারে মাঠ কাঁপে। তখন
বাতাস এসে উদ্ভিতকে ঝাঁকি দিয়ে আরো বেশি উদ্ভিতসম্পন্ন
করে তোলে। বোঝা যায় প্রেরণার পাশাপাশি অবহেলা
আছে। অবহেলা পেয়ে পেয়ে সব আলো সব উপস্থিতি
অবয়বহীন হয়ে পড়ে উঠে যায় আকাশের দিকে।
সন্ধ্যা নামে তাই সন্ধ্যা নামে শুধু তাই সন্ধ্যা নামে….

২৭/৭/২০১০
 

সিদ্ধার্থের মনে

অনেক অন্যায় আর অপচয় সংঘটিত হয়ে গেছে পৃথিবীর
ঘরে ঘরে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে। মানুষের কাজে না লেগে
শুধু অপব্যবহৃত হয়ে গেছে মানুষের চাতুর্য ও জ্ঞান।
তাই কোনো প্রসন্নতা পরিতৃপ্তি নেই।
আত্মানুসন্ধান করে ওঠে শুধু মানুষের হাতে পোড়া
মানুষের মুখভষ্ম অন্তিম চিৎকার; প্রতিধ্বনি শুনে শুনে
পরিষ্কার বোঝা যায় মানুষের অভিরুচি শুধু এক
রুচিকর ছাই। এখন রয়েছে পড়ে
দলগত বিষণ্নতা অস্ফূট সন্ধ্যার। কোনো মুক্তি
কোনো শান্ত মতামত নেই। শব্দ নেই। মনোরম
কোনো গান নেই সাঁঝবেলা। সব রব স্তূপ হয়ে
অস্পষ্ট আঁধারে ক্রয় আর বিক্রয়ের অসম্মানে
লুকানো রয়েছে। কিছু কিছু দেখা শেষ হল হয়ে গেল।
চেতনার চোখ তবু পাতাদের মধ্যবর্তী শূন্যতা সমান।
লাবণ্যৈ নিহিত এক ব্যথা থেকে গেল। শুধু এইটুকু বলি
নিয়মিত অন্যায় স্থাপিত হয়ে আছে বার বার হয়ে যায় দেখে
প্রকাণ্ড শূন্যতা এক আগুনের বৃক্ষ হয়ে জন্ম নেয় মনে।
কাটি তাকে শিরা উপড়ে ফেলে দেই দূরে, আবার সে
ফিরে আসে জন্ম নেয়, দু একটি দ্বিধাগ্রস্ত কথা বলে
ধীরে ধীরে গেড়ে বসে, দ্বিধাহীন হয়।
নিখুঁত সন্ধ্যার (প্রকৃতিতে কোনো খুঁত নেই) এই
সর্বব্যাপী স্তব্ধ সন্ধিক্ষণে কাঁটা ছেঁড়া করা এই
হুঁশ ছাড়া আর কিছু যেমন ঈশ্বরবোধ
কিম্বা কোনো সুসহজ আশা জাগে না তো সিদ্ধার্থের মনে

২৬/৭/২০১০
 

abdulhaque100@gmail.com

ওয়েব লিংক
সিদ্ধার্থ হক: আর্টস

free counters

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহউদ্দিন — আগস্ট ২০, ২০১০ @ ১:২৮ পূর্বাহ্ন

      পড়তে বেশ ভালো লাগলো কবিতাগুলো। অনেক জায়গা ভাবালোও। জীবনানন্দ দাশের নির্লিপ্ত ভাবুকতার কথা মনে পড়ে গেলো। জীবনানন্দের সুচেতনা প্রভৃতি কবিতার কথা মনে হলো।

      ভাবনার গভীরতাকে তো আমরা দর্শন বলি, তাই না!

      দ্বিতীয়বারের পাঠে খুব কষ্ট হয়েছে আমার, অনেক বেশি চাপ পড়ছে মাথায়… হয়তো এই চাপ মাথাব্যথায় চেপে দেবার মতো আরামই লাগছে।… অভিনন্দন কবি সিদ্ধার্থ হককে।

      – শিমুল সালাহউদ্দিন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফেরদৌস আলম তাজ — আগস্ট ২১, ২০১০ @ ১২:০২ পূর্বাহ্ন

      ———————————————
      অনন্যসাধারণ সব রূপ-কল্পের শেষেও পুনর্বার ‘সন্ধ্যা’য় আক্রান্ত কবি
      ———————————————

      ২৭ তারিখের কবিতা ২৬ তারিখের আগে দেবার কি কোন কারণ আছে কিনা জানি না? সুখপাঠ্য কবিতা। ‘মা ২’ বাদেই বলছি। কবিতার শরীরগঠন সম্পর্কে আমার জানা নাই, বলে রাখছি। বক্তব্য আছে কবির:

      ”স্পষ্টভাবে টের পাও মানুষের তৈরি করা
      ক্ষণস্থায়ী সংজ্ঞা আর রাষ্ট্রের বাইরে, নির্দিষ্ট বুদ্ধির পথে
      চলেছে পৃথিবী, ব্যতিক্রমী কবিতার ন্যায়,
      পরিপূর্ণ ভুলহীন, সুস্থির ও রাগী।”

      কিন্তু উদ্দ্যেশ্য কী?

      ‘সিদ্ধার্থের মনে’র শুরুতে আমরা ঘোষণা শুনি আসম্ভব সব অপচয়ের। তবু গানহীন সাঝবেলা, নির্ল্লজ কেনা বেচা, বোধের অপচয়, সব কিছু জেনে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত কবির মনে কোনও ‘…সুসহজ আশা জাগে না’।
      ২৬/৭-এর এই কবিতা পইড়া পরের তারিখের খোঁজে যাই পাঠক, ২৭/৭-এ বুঝি তলানি আছে! কিন্তু মাহাপৃথিবী, ‘সমগ্র মৃদুতা নিয়ে’ পরিশ্রমী মনগুলাকে ছাই কইরা দেয় এখানেও! কবিদের অনন্ত শোক। কিন্তু শোকই কেবল?
      ‘অসম্ভব নির্জনতা’ও একই গাথামালা। কেবল শিরোনাম’ই তাই বলে দেয়। তবু যখন শুনি ‘…এইভাবে নিজেকে নষ্টের ইচ্ছা কমে আসে তার’, নড়েচড়ে বসি পাঠক। কিন্তু কিসের কী? অনন্যসাধারণ সব রূপ-কল্পের শেষেও পুনর্বার ‘সন্ধ্যা’য় আক্রান্ত কবি।

      আগের পাঠক প্রতিক্রিয়া’য় ‘দর্শন’-এর ইঙ্গিত ধরেই বলি। তিনটি কবিতার (‘মা ২’-এর নির্দিষ্ট তারিখ নাই), যেহেতু খুবই পাশাপাশি লিখা, যে দর্শন, তা নিয়া একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে ভাবি, আসলে কবি ২৬ তারিখেই তো এক প্রকার বইলা রাখছেন ২৭ তারিখে কী লিখবেন। তাই ‘সুসহজ আশা জাগে না’ জেনে, পরের দিন মিছি মিছি ‘নিজেকে নষ্টের ইচ্ছা কমে আসে’ জাতীয় ঘোষণা দিবার পরে আবার সন্ধ্যা’ই তারে খায়। এই কি জীবন আর কবিতার দর্শন? নিষ্পাপ প্রশ্ন আমার কবিরে :)। কারণ

      ‘…প্রতিধ্বনি শুনে শুনে
      পরিষ্কার বোঝা যায় মানুষের অভিরুচি শুধু এক
      রুচিকর ছাই’।….

      ‘রুচিকর ছাই’ উৎপাদনই উদ্দেশ্য এখনে কবির? কবির চাইতে পরিষ্কার তিক্ততা নিয়া যা আর কেউ বুঝতে পারে না। তাই বুঝি কবিদের ক্ষত অপার। কিন্তু তার চাইতে কোন অংশে কম কি, পরিতাপ, মিছি মিছি আমাদের দর্শন খোজার :) ?

      – ফেরদৌস আলম তাজ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ডা: সিদ্ধার্থ সরকার — আগস্ট ২৮, ২০১০ @ ১২:৪৪ পূর্বাহ্ন

      বেশ ভালো লাগলো।

      ডা: সিদ্ধার্থ সরকার
      জিয়াগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ, ভারত

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — আগস্ট ২৮, ২০১০ @ ৩:৩৯ পূর্বাহ্ন

      আবার পড়লাম আজ। কয়েকবার করে। কী এক সম্মোহনী আছে কবিতাগুলোতে।

      কবির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলতে চাই, “এ জীবনানন্দ দাশের পুনরাবৃত্তি ছাড়া কিছু মনে হলো না আমার কাছে।”

      শুভকামনা। কবির আরো কবিতা পড়তে চাই।

      – শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com