সেন্টমার্টিন: দইরগার চরত বেরাই টেরাই হনো মজা ন পাইবা…

নূরুল আনোয়ার | ১০ আগস্ট ২০১০ ৮:৪৫ অপরাহ্ন

nanwar_1.jpg
লেখক, স্ত্রী শিল্পী ও পুত্র আপন, পেছনে কেয়াবন

nanwar_2.jpg
আপন

সেন্টমার্টিন ভ্রমণের প্রথম অভিজ্ঞতা হয়েছিল দুই হাজার দুই সালের ডিসেম্বর মাসে। সঙ্গে ছিল আমার এক বন্ধু। নাম বাবু। আমরা বৃহত্তর চট্টগ্রামটা ঘুরে দেখব এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু সেন্টমার্টিন যাব সেই চিন্তাটা তখনও মাথায় আসেনি। যখন আমরা আমার বন্ধু রাফায়েলের ঘরে গিয়ে আতিথ্য গ্রহণ করলাম তিনি আমাদের মনকে উসকে দিলেন, কেন আমরা সেন্টমার্টিন যাই না। ওখানে কীভাবে যেতে হয় তিনি আমাদের পথ বাতলে দিয়েছিলেন। ব্যাপারটা আমাদের মনে ধরেছিল। তার কথামত আমরা পরের দিন ভোরে কক্সবাজারের লালদিঘীর পাড় থেকে একটা লোকাল মাইক্রোবাসে করে টেকনাফের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছিলাম। শীত তখনও জেঁকে বসেনি। কুয়াশা এবং হালকা ঠাণ্ডা মিলে পুরো প্রকৃতিটা আমাদের অনুকূলে ছিল। আমার ঠিক মনে আসছে না। মাইক্রোবাস খুব সম্ভব আমাদের কাছ থেকে মাথাপিছু ষাট টাকা করে নিয়েছিল। টাকাটা আমাদের কাছে মুখ্য ছিল না। নতুন একটা জায়গায় যাচ্ছি, যে কারণে আমাদের মনটা ভারি উৎফুল্ল ছিল।

মাইক্রোবাস সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ আমাদের টেকনাফে নিয়ে নামিয়ে দিয়েছিল। এই জায়গাটিতে আমাদের প্রথম পদার্পণ। তার আগে আমার ধারণা ছিল টেকনাফ একটা বড়সড়ো শহর, যেখানে বাংলাদেশী এবং বার্মার লোকজন গিজগিজ করে। ব্যাপারটা তা নয়। টেকনাফ আমাদের গ্রামের বাজারের চেয়ে খুব বেশি বড় নয়। সুতরাং আমি চমৎকৃত হলাম না। তা নিয়ে আমার মাথাব্যথাও ছিল না। আমরা সেন্টমার্টিন যাব এবং সেখানকার সৌন্দর্য উপভোগ করব। জীবনে প্রথম একটা নতুন জায়গায় যাচ্ছি, আমরা খুশিতে গদগদ ছিলাম।

ঘাপলা বাধল এক জায়গায়। বোটে কোনো সিট নেই। আমরা যাবার আগেই বোটের সব সিট বেচা হয়ে গেছে। আমার বাড়ি চট্টগ্রামে। আমি সেখানে দেদারসে চাটগেঁয়ে ভাষা ব্যবহার করতে থাকলাম। বলে রাখা দরকার, গোটা কক্সবাজার এলাকায় চাটগেঁয়ে ভাষার আলাদা একটা মরতাবা আছে। চট্টগ্রামের বাইর থেকে যত পর্যটক যান, পয়সার বিনিময়ে যত সম্মানের অধিকারী হন তার চে’ কম পয়সা খরচ করে চাটগেঁয়েরা বেশি সুযোগ লাভ করেন এবং তাদের খাতিরও করে বেশি। আমি সে সুযোগটা গ্রহণ করতে চেষ্টা করলাম। এখানে পয়সা খরচটা বিষয় নয়। আমি কীভাবে বোটের দুটো সিট লাভ করতে পারি তার সুযোগ নিতে চেষ্টা করাটা ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। আমি ব্যর্থ হইনি।

টিকেট বিক্রেতা আমাকে একটা নির্জন জায়গায় টেনে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “অঁনে চাটগার মানুষ। আঁরার দুইয়ান সিট বুকিং আছিল, মানুষ ন আঁইয়ে। অঁনে চাইলে দুইয়ান সিট দিত্ পারি। কিছু টেঁয়া বেশি দিয়ন পরিব।” (আপনি চট্টগ্রামের মানুষ। আমাদের দুটো সিট বুকিং ছিল, কিন্তু লোক আসেনি। আপনি চাইলে সিট দুটো আপনাকে দিতে পারি। কিন্তু টাকা একটু বেশি গুণতে হবে।)

আমি বললাম, “কত দিয়ন পরিব?” (কত দিতে হবে?)

টিকেট বিক্রেতা বলল, “প্রতি সিডত পঞ্চাশ টেঁয়া গরি বেশি দেওন পরিব।” (প্রতি সিটে পঞ্চাশ টাকা করে বেশি দিতে হবে।)

আমি রাজি হয়ে গেলাম। এতদূর এসে যদি আবার ফিরে যেতে হয় তাহলে তো পুরো একটা দিন মাঠে মারা যাবে। আমরা টিকেট কাটলাম এবং বোটে উঠে বসলাম। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তারা বোট ছেড়ে দিল। তারা আর যা-ই করুক, একটা কাজ ভালভাবে করে। সময়ের ব্যাপারে তারা খুবই সচেতন। কারণ একটাই, যেতে দেরি করলে ওদিক থেকে ফিরতেও তাদের দেরি হবে। আমরা ইঞ্জিনচালিত বোটে করে রওয়ানা দিলাম। বোট ভট ভট শব্দ তোলে ছুটে চলল। প্রথমে নাফ নদী ধরে চলল বোট। নাফ নদীর পানি ছিল দু’ভাগে বিভক্ত। বাংলাদেশের দিকটা স্বচ্ছ এবং মিয়ানমার দিকটার পানি ঘোলা। সাগরে যখন বোট অবতরণ করল আমার ভেতরটাই যেন পরিবর্তন হয়ে গেল। তার আগে পাহাড়ে ওঠার যথেষ্ট সুযোগ আমার হয়েছিল। যখন আমি পাহাড়ে উঠতাম তখন নিজেকে খুবই বড় মনের মনে হত। এবার হল তার উল্টো। সাগরের প্রশস্ততা দেখে মনে হল যেন আমার বুকটাই প্রশস্ত হয়ে গেছে। তখন সাগরে তেমন একটা ঢেউ ছিল না। সাগরের পানি দিঘীর পানির মত ছল ছল করছিল। এটাকে আমার মনে হয়েছিল সাগরের উদারতা। মাঝে মাঝে নীল পানিতে সূর্যের কিরণ লেগে ঝিক ঝিক করছিল। অন্ধকার আকাশের তারকার সুন্দরের সঙ্গে তার একমাত্র তুলনা চলে, যদিও দু’টি জিনিসের সৌন্দর্য দু’ ধরনের। নৌকা যখন সেন্টমার্টিনের কাছাকাছি এসে ঢেউয়ের কবলে পড়ল আমার অনুভূতিটা অন্য রকম মনে হতে থাকল। একের পর এক ঢেউ সাদা ফণা তুলে কুলের দিকে ছুটে চলেছে। তারপর কিছুদূর এগুতেই ঢেউগুলো ভেঙে ভেঙে পড়ছে। তারপর নিস্তেজ। ঢেউয়ের তোড়ে আমাদের বোট বারবার উঠানামা করছিল। মনে হতে থাকল এই বুঝি বোটটির সলিল সমাধি ঘটছে। কেউ ভয়ে চিৎকার করছে, কেউ কান্না করছে, কেউ কেউ আনন্দের আতিশয্য প্রকাশ করে লাফলাফি আরম্ভ করে দিয়েছে। আমরা ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের পক্ষে সেটির বহিঃপ্রকাশ ঘটানো কি সম্ভব? আমাদের মত বয়সের তরুণদের আহাজারি করা তো চলে না। সেটা বেমানান। দুয়েকটি তরুণীকে দেখলাম ভয়ে হাত দিয়ে চোখ-মুখ ঢেকে আছে। আর তাদের সঙ্গে থাকা তরুণরা এ অবস্থা দেখে আরও বেশি উল্লাসে ফেটে পড়েছে। আর তারা বলতে থাকল, এ গেল রে ডুবে গেল!

বোট যখন কিনারায় এসে ভিড়ল আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। তখন সেন্টমার্টিনে কোনো জেটি ছিল না। কূলে ওঠার জন্য ছিল বাঁশের লম্বা সেতু। সেই সেতুর ওপর দিয়ে মানুষ কূলে উঠত। আমরাও উঠলাম।
তখন একটা বেজে গেছে। সারেং বলে দিয়েছে আড়াইটার আগে এখানে এসে সকলকে উপস্থিত হতে হবে। মাত্র দেড় ঘণ্টা সময়ের মধ্যে বেড়ানো কি সম্ভর? আমাদের মনটা খারাপ হয়ে গেল। এই দেড় ঘণ্টার মধ্যে আমরা কী দেখব? স্থানীয় একজন লোককে জিজ্ঞেস করলাম, সেন্টমার্টিনে দেহনের মত কী আছে?

তিনি জবাব দিলেন, দেহনের এ্যান কিছু নাই। আছে নারিকেল গাছ আর কেয়াঝাঁড়। আর আছে দইরগার পানি। (দেখনের এমন কিছু নেই। আছে নারিকেল গাছ আর কেয়াঝাঁড়। আর আছে সাগরের পানি।)

আমরা একে অপরকে বললাম, কোথাও যেয়ে কাজ নেই। আপাতত ওখানে নারিকেল গাছের তলায় বসে সাগরের পানি দেখি।

সেন্টমার্টিনে তখন যোগাযোগ অবস্থা তেমন ভাল ছিল না। আমরা একটা খাবার হোটেলে ঢুকলাম। আমার বন্ধুর শখ তিনি রূপচাঁদা মাছ দিয়ে ভাত খাবেন। তিনি নিজের গরজে খোঁজ নিতে থাকলেন দোকানে রূপচাঁদা আছে কি না। সব দোকানে একবাক্যে স্বীকার করে নিল, তাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ রূপচাঁদা মাছ আছে।

আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণের দরকার ছিল না। একটা হলেই আমাদের চলে। আমার বাড়ি যেহেতু চট্টগ্রামে সামুদ্রিক মাছ সম্পর্কে টুকটাক অভিজ্ঞতা আমার ছিল। তারা যে মাছগুলোকে রূপচাঁদা বলে চালিয়ে দিচ্ছে আসলে ওগুলো কোনোটাই রূপচাঁদা ছিল না। আমি যখন তাদের আসল রূপচাঁদা বের করতে বললাম তারা আমার মুখের ওপর কথা বলা আরম্ভ করে দিল। আমি তাদের সঙ্গে পেরে না উঠে চাটগেঁয়ে ভাষায় বাতচিত আরম্ভ করে দিলাম। তারা বুঝে গেল আমার সঙ্গে পেরে ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই। শেষ পর্যন্ত তাদের স্বীকার করে নিতে হল কারও দোকানে রূপচাঁদা নেই। আমার বন্ধুকে বললাম, কিছু বুঝলেন? তিনি জবাব দিলেন, মুখে রোচে ওরকম একটা মাছ পছন্দ করেন।

রূপচাঁদার কাছাকাছি স্বাদের একটি মাছ আছে তার নাম কালো রূপচাঁদা (স্থানীয় ভাষায় আঁইছচাঁদা)। ওটা রূপচাঁদার চাইতে সাইজে বড়। আমি বললাম, আমাদের আঁইছচাঁদা দাও। আমার বন্ধু আঁইছচাঁদা খেয়ে রূপচাঁদার স্বাদ নিলেন। তিনি খুশি, আমিও তৃপ্ত।

nanwar_3.jpg
পুত্রের সঙ্গে লেখক, পায়ের নিচে মরা প্রবাল

দুপুরের খাবার সারার পর আমাদের হাতে আর বিশেষ সময় অবশিষ্ট ছিল না। সেন্টমার্টিন থেকে ঠিক দুপুর আড়াইটায় যথানিয়মে বোট আবার টেকনাফের উদ্দেশে রওয়ানা দিল। অনেকে অনেকদূর হেঁটে এসে ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছে। তখন দুয়েকটা ভ্যান ছাড়া যথেষ্ট যানবাহন ছিল না। ওগুলো কোনো কোনো ভাগ্যবানদের জুটত এবং তাদের কাছ থেকে আদায় করে নিত কয়েকগুণ বেশি টাকা। আমরা ঠাঁয় বসে থাকার কারণে আমাদের শরীরে তেমন একটা ক্লান্তি ছিল না। অনেকের চোখে মুখের ভঙ্গি দেখে মনে হয়েছে তারা সেন্টমার্টিন ঘুরে এসে তেমন তৃপ্ত হতে পারেননি—কী আছে ওখানে, নারিকেল গাছ আর কেয়াঝাঁড় ছাড়া? সেন্টমার্টিন কি আমাদের গ্রামের চেয়ে সুন্দর? অবশ্যই না। তার সৌন্দর্যটা অন্য জায়গায়। আপনি যখন সেন্টমার্টিনের পাড়ে দাঁড়িয়ে দূরের সমুদ্রকে অবলোকন করবেন তখন কি অবাক না হয়ে পারবেন? আমাদের গ্রামের চারপাশে সেই জলধর তো নেই। আমাদের গ্রামের চেয়ে এই তফাৎটা আছে বলেই সেন্টমার্টিনটা আমার কাছে অপূর্ব মনে হয়েছে, অন্য কারণে নয়।

যা হোক, আমাদের বোট ছুটে চলল টেকনাফের উদ্দেশে। বোটের লোকজন আবার আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠল। সেন্টমার্টিন আসার সময় যারা ভয়ে ভেঙে পড়েছিলেন তাদেরও এবার খানিকটা সাহসী মনে হল। তারাও অন্যদের সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়তে চাইল। কিন্তু অতি উল্লাস বেশি সময় টেকে না। আমরা যখন অর্ধপথ পেরিয়ে সাগরের মাঝে এলাম আমাদের বোটের গতি আকস্মিকভাবে থেমে গেল। কারণ একটাই—বোটের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেছে। যারা এতক্ষণ ধরে আনন্দে লাফালাফি করছিল ভয়ে তাদের মুখমণ্ডল পাণ্ডুবর্ণ হয়ে গেল। আমিও সন্ত্রন্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমার বন্ধুটির সঙ্গে কথা বলে কোনো উপযুক্ত উপায় বের করব সেই বুদ্ধি-ভরসা আমাদের ছিল না। আমার সাগরের মাঝে ঘুরপাক খেতে থাকললাম। সারেং একখানা লাল পতাকা উড়িয়ে দূরে একখানা বোটের দৃষ্টি আর্কষণ করার চেষ্টা করতে থাকল। দেখলাম এতে কাজ হয়েছে। ওই বোটটি দ্রুত আমাদের দিকে ছুটে আসছে। আমাদের ভাগ্য ফর্সা বলতে হবে, ওটি কাছাকাছি আসতে না আসতেই আমাদের বোটটি সারিয়ে ফেলল সারেংরা। সন্ধ্যা তখন গড়িয়ে রাত হতে চলেছে। এবার সকল যাত্রী আনন্দ-উল্লাস বাদ দিয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেল। কেউ কেউ অবিরত আল্লাহর নাম জপ করতে থাকল।

রাত আটটা বাজে আমাদের বোট কুলে এসে ভিড়ল। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। সকলে লাফ দিয়ে দিয়ে কূলে উঠে যেতে থাকল। আমি যখন লাফ দিতে গেলাম বোট সরে যাওয়াতে হাঁটু পরিমাণ পানিতে পড়ে গেলাম। আমার পায়ে ছিল দামি নতুন জুতো। এক সপ্তাহ হয়নি কিনেছি। জুতো জোড়ার হাল অবস্থা এমন হল পুরোটা কাদায় লেপটে আছে। আমার হালকা জুতো যেন দু’ কেজির মত ওজন হয়ে গেল। এই জুতো জোড়া পায়ে রেখেই আমি অর্ধ-কিলোমিটার পথ হেঁটে টেকনাফ বাজারে চলে এলাম। আলোতে এসে যখন জুতো জোড়া নিরীক্ষণ করলাম আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেল। একটা জুতার তলা কোথায় যেন পড়ে গেছে, আরেকটির পড়ি পড়ি করছে। জুতোর গায়ের কমলা রঙটিকে লোনাপানি এমনভাবে গ্রাস করেছে টুকরো টুকরো সাদা হয়ে গেছে। লোনাপানি এমন মারাত্মক হতে পারে প্রথম জানলাম।

 

দুই

প্রথম দফার কথা থাক। আমি দ্বিতীয় দফায় সেন্টমার্টিন ভ্রমণে মনস্থির করলাম ২০১০-এর এপ্রিল মাসে। আট বছর পরে।

দুটো জায়গা আমাকে খুব করে টানে। একটা হল পাহাড়, অন্যটা সাগর। তবে সব পাহাড় এবং সাগর আমাকে টানে না। যে পাহাড়ে সবুজের সমারোহ নেই সেখানে আমি যাই না। যে সাগর নির্জীব সেটাও আমার কাছে আকর্ষণীয় নয়। আমি মুম্বের উপকণ্ঠে বসে আরব সাগর অবলোকন করেছি। আমার কাছে ভাল ঠেকেনি। এ সমুদ্রটিতে আমি কোনো প্রাণ খুঁজে পাইনি। মনে হয়েছে নিশ্চল পানির একটা অসীম দিঘী। বুড়িগঙ্গার ময়লা পানির সঙ্গেও এর তুলনা চলে। যে সাগরে পানির খেলা থাকবে না সেখানে যাওয়াটাই নিরর্থক। সেদিক থেকে আমাদের বঙ্গোপসাগর দেখতে যাওয়ার মজাটাই আলাদা।

দুই হাজার নয় সালের মাঝামাঝি সময়ে আমার গিন্নি শিল্পী আমাকে বলল ঢাকার বাইরে কোথাও ঘুরে আসার জন্য। তখন কোথাও যাওয়ার মত মন-মানসিকতা আমার মধ্যে কাজ করেনি। কাজের চাপও ছিল প্রচ- রকম। তাই তাকে বললাম, কোথাও যেয়ে কাজ নেই। আগামী ডিসেম্বরে আমরা সেন্টমার্টিন ঘুরে আসব।

আমি পত্রপত্রিকায় দেখেছি সেন্টমার্টিন অবকাঠামোর দিক দিয়ে আগের চে’ অনেক উন্নত হয়েছে। নতুন নতুন জাহাজ আসার কারণে সেন্টমার্টিনের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুনত্ব এসেছে। সেখানে বানানো হয়েছে অনেক হোটেল মোটেল। আমার পুত্র আপনও সাগর খুব পছন্দ করে। তার বয়স এখন সাড়ে পাঁচ। এই বয়সে সে তিনবার কক্সবাজার বেড়িয়ে এসেছে। এ বয়সে আমরা এসব কল্পনাও করতে পারিনি। গেলবার যখন ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল সে বার বার আমার কাছে বায়না ধরল কক্সবাজার যাবে। আমি তাকে কথা দিযেছিলাম। কিন্তু নানা কাজের চাপে তার কথা রাখতে পারিনি। সেন্টমার্টিন গেলে তার সেই ইচ্ছাটিও পূরণ হবে—তাই আমার এই পরিকল্পনা।

কিন্তু ডিসেম্বরে আমাদের সেন্ট মার্টিন যাওয়া হয়নি। নানা কাজে আমরা এত ব্যস্ত ছিলাম যে সেকথা আমরা মনেও রাখতে পারিনি। গত ঊনিশ মার্চ ছিল আমার গ্রামের গাছবাড়িয়া হাই স্কুলের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। আমি ওই স্কুলের ছাত্র ছিলাম। ওই স্কুলে অনেক মনীষী পড়াশুনা করেছেন। জাতীয় অধ্যাপক ডাক্তার নুরুল ইসলাম ছিলেন গাছবাড়িয়া হাই স্কুলের ছাত্র। লেখক আহমদ ছফা, কর্নেল অলি আহমদ এরকম অনেকে এ স্কুলের ছাত্র ছিলেন। নাড়ির টানে কিংবা অন্য কারণে হোক আমি স্থির করেছিলাম অনুষ্ঠানটিতে যাব। সেই যে এসএসসি দিয়েছি তারপর থেকে কোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা নেই। মনটা ভারি উতলা হয়ে উঠল। শিল্পীকে বললাম, চল গ্রাম থেকে ঘুরে আসি।

সে বলল, যেতে পারি এক শর্তে। একই সঙ্গে সেন্টমার্টিনও ঘুরিয়ে আনতে হবে।

সে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দিল গত ডিসেম্বরে আমাদের সেন্টমার্টিন যাবার কথা ছিল। আমি তাকে বললাম, এখন তো বেশ গরম পড়ে গেছে। শুনেছি এই সময় সাগরও নাকি বেশ উত্তাল থাকে। আল্লাহ না করুক একটা অঘটন যদি ঘটে যায় তখন কী হবে?

সে আমাকে একটা যুক্তি দেখাল, মরলে সবাই এক সঙ্গে মরব। তখন কারও জন্য কেউ কান্না করার থাকবে না।

আমিও ঘোষণা দিয়ে ফেললাম, তাই হবে।

এটা মার্চের প্রথম দিককার ঘটনা। আমি সেন্টমার্টিন যাবার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লেগে গেলাম। বন্ধু-বান্ধবদেরও বলে বসলাম, সেন্টমার্টিন যাচ্ছি। তারা বললেন, পাগলে কী না করে ছাগলে কী না খায়। এই সময়ে কেউ কি সেন্টমার্টিন যায়? আমি সেসব গায়ে না মেখে টেকনাফের বাসের টিকেটের জন্য টিকেট কাউন্টারে ছুটলাম। ‘সেন্টমার্টিন পরিবহণ’ নামে একটি এসি বাস আছে। আমি ওখানে গিয়ে ধরনা দিলাম। কাউন্টারের লোক জানতে চাইল, কবে যাবেন? আমি বললাম, ষোল তারিখ রাতে। তারা আমাকে জানাল এত আগে টিকেট কাটার দরকার নেই। যাবার দু’ তিন দিন আগে এলে টিকেট পাওয়া যাবে। হোটেল এবং জাহাজের টিকেট বুকিংও তারা নিজগুণে করে দেবে বলে আমাকে আশ্বস্ত করল।

বলে রাখা দরকার, ষোল তারিখটা আমি বিশেষ কারণে পছন্দ করেছিলাম। আমি যদি ষোল তারিখ রওয়ানা দেই সতের তারিখ ওখানে দিয়ে পৌঁছব। ওইদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন এবং সরকারি ছুটি। এমন একজন মহান নেতার জন্মদিনে আমরাও আনন্দে মেতে থাকব সেটাকে আমি ছোট করে দেখতে পারিনি। তাছাড়া তার একদিন পর শুক্র শনি দু’দিন সাপ্তাহিক ছুটি। মাঝখানে আঠার তারিখ একদিন অফিস থেকে ছুটি নিলে টানা চারদিন আমি কাজে লাগাতে পারি। সুতরাং আমার পরিকল্পনাটা একেবারে ফেলে দেয়ার মত ছিল না। কিন্তু আমি কি জানতাম, আমার মত অনেকে এধরনের পরিকল্পনা নিয়ে ঘর থেকে বের হবে?

আমি চার পাঁচদিন পর আবার বাস কাউন্টারে গেলাম। গিয়ে আমার এমন দশা হল মাথায় বাজ পড়ার মত অবস্থা। সেন্টমার্টিন পরিবহণের কাউন্টারের লোকেরা জানাল তাদের সব টিকেট আগে বিক্রি হয়ে গেছে। টানা চারদিন ছুটি এটা তাদের জানা ছিল না। আমি তাদের কাছে জানতে চাইলাম, আর কোনো এসি গাড়ি আছে কি না। জবাব এল, এ ছাড়া আর কোনো গাড়ি নেই।

নন-এসি কোনো গাড়িতে কি সিট পাব?

আমরা শ্যামলী গাড়ির টিকেট বিক্রি করি। কিন্তু ওগুলোও শেষ হয়ে গেছে।

আমি বললাম, একটু চেষ্টা করে দেখুন না, যদি পারা যায়?

একজন তাদের অন্যান্য গাড়ির কাউন্টারের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করল। তারপর ফোন রেখে দিয়ে বলল, গাড়ির একেবারে পেছনে দুটো সিট খালি আছে।

আমার মন থমকে গেল। পেছনের সিটের দুরবস্থা সম্পর্কে ধারণা আমার পূর্বের ছিল। ওখানে যদি বসি সারা পথ আমাদের ঝাঁকি খেয়ে খেয়ে যেতে হবে এবং আমাকে বউ-বাচ্চার বমি পরিষ্কার করতে করতে গোটা রাত কাবার করতে হবে। আমি তাদের বললাম, এত পেছনের সিটে বসে যাওয়া সম্ভব নয়। আপনারা আমাকে অন্য গাড়িতে ব্যবস্থা করে দিন।

তারা বলল, সেই আশা ক্ষীণ। আমাদের জানা মতে সব গাড়ির টিকেট বিক্রি হয়ে গেছে। সামনে ‘মডার্ণ লাইন’ নামে একটা গাড়ি আছে, আপনি গিয়ে চেষ্টা করে দেখতে পারেন। এই গাড়ি সম্পর্কে পূর্বের কোনো অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। তার আগে গাড়ির নামও শুনিনি। তারপরেও তাদের কথা মেনে মডার্ণ লাইনে গেলাম। তাদের কাছে টিকেট আছে কিনা জিজ্ঞেস করতে তারা বলল, আছে। তবে সামনে নয়, পেছনের দু’সিট আগে।

আমি তাদের অনুরোধ করতে থাকলাম, কোনো রকমে দুটো সিট সামনে দেয়া যায় কিনা। তাদের জবাব কড়া। বলল, নিলে দুটো সিট নিয়ে নিন। অন্য লোক এসে গেলে এগুলোও হারাবেন। কারণ গাড়ির খুবই ক্রাইসিস চলছে।

তার কথাগুলো আমাকে কবুল করতে হল। বললাম, কী আর করা। দিন দুটো সিট। আমার ভয় বাচ্চাটার জন্য। সে যদি গাড়ির ঝাঁকিতে বমি করে আমাদের কষ্টের সীমা থাকবে না। লোকটি বলল, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আমাদের গাড়ি একেবাওে লেটেস্ট মডলের। একবার চড়লে বুঝতে পারবেন, কোনো নড়চড় নেই। মনে হবে যেন পানিতে ভেসে ভেসে যাচ্ছেন।

সে যা বলে আমার বিশ্বাস না করে উপায় ছিল না। আমি দুটো টিকেট কিনে আবার সেন্টমার্টিন পরিবহনের কাউন্টারে এসে হাজির হলাম। তাদের বললাম, যে ধরনেরই হোক টিকেট তো নিলাম। এখন বলুন, হোটেল এবং শিপের বুকিং কোথায় দেব।

তারা বলল, ওটা আমরা করে দেব। আপনি টাকা রেখে যান, আমরা সব ঠিক করে রাখব।

আমি বললাম, দুটো মিলিয়ে কত দিতে হবে?

তারা বলল, হোটেলের জন্য দু’ হাজার এবং শিপের টিকেট বাবদ তের শ’ টাকা।

আমি কাকুতি করে বললাম, একটু কি কমানো যাবে না?

তারা বলল, এটা তো আমাদের ব্যবসা নয়। আপনার মুখের খাতিরে আমরা কাজটা করে দিচ্ছি। সেন্টমার্টিনের সব চে’ ভাল হোটেল এবং শিপে চড়ার সুযোগটি আমরা আপনাকে করে দিলাম।

আমি অনুনয় করে বললাম, ফোন করে দেখুন না, দামটা একটু কমানো যায় কিনা। আমার কথা মতো একজন ফোন করল। আসলে ফোন করেছে কিনা বোঝা মুশকিল। মনে হল সে ফোনে কথা বলার অভিনয় করছে। সে ফোনে বলতে থাকল, ভাইজান, যা তা রুম দিলে হবে না। আমার খুবই কাছের মানুষ। ভাড়াও একটু কমাতে হবে। পারবেন না? একটু চেষ্টা করে দেখুন না। নইলে আমাকে অন্য কোথাও চেষ্টা করে দেখতে হবে। না পারলে আর কী করা।

লোকটি ফোন রেখে দিল। তারপর আমার উদ্দেশে বললেন, দেখলেন তো, কোনো কথাই শুনল না। এখন আপনার ইচ্ছে যাবেন কি যাবেন না। লোকটির কথা বিশ্বাস না করার উপায় ছিল না। আমি তার কথা মানতে বাধ্য হলাম। বললাম, ঠিক আছে, বুকিং দিয়ে দিন।

আমি টাকাটা গুণে তার হাতে তুলে দিলাম। সে বলল, আগামীকাল এসে টিকেট নিয়ে যাবেন। এর মধ্যে আমরা সব ঠিকঠাক করে রাখব।

পরের দিন টিকেটের জন্য গেলাম। তারা আমাকে হোটেল এবং জাহাজের টিকেট ধরিয়ে দিলেন। কিন্তু টিকেটের গায়ে কোনো টাকার অংক নেই। আমি যা বোঝার বুঝে গেলাম।

 

তিন

যেভাবে হোক সেন্টমার্টিন আমাদের যাওয়া হচ্ছে। আমার পুত্র আপন কিছুটা অসুস্থ। এবার তাকে সুস্থ করার চিন্তাটা মাথায় এসে ভর করল। তাকে আমার বন্ধু ডাক্তার ইকবাল কবিরের কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি তাকে দেখে শুনে ওষুধ লিখে দিলেন। গাড়িতে চড়লে সে বমি করে—এই কথাটাও তাকে বলতে ভুল করলাম না। এটাও জানালাম আমাদের সিট গাড়ির একেবারে পেছনের দিকে। সুতরাং এবার বমির উৎপাত আরও বেশি হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তিনি প্রেসক্রিপশনে একটা সিরাপের নাম লিখে দিলেন, যেটি গাড়িতে চড়ার আগে খেতে হবে। তারপরেও পথে কোন সমস্যা হলে আমি যেন তাঁকে জানাই। বন্ধুর উপদেশ শিরোধার্য। আমি নিশ্চিন্ত হলাম।

শিল্পী চার পাঁচদিন আগে থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকল। তার বন্ধু-বান্ধব-সহকর্মী যারা সম্প্রতি সেন্টমার্টিন থেকে ঘুরে এসেছেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সে নানা ধরনের তথ্য সংগ্রহ করল। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী সে থাকা-খাওয়া-পরা ইত্যাদি ব্যাপারে সজাগ হয়ে কাজ করতে থাকল। সে আস্ত একটা মুরগি ফ্রাই করে বাক্সবন্দি করল। বেশ কটি আটার রুটি তৈরি করে নিল। শুকনো খাবার বিস্কিট-চানাচুরও ব্যাগে ভর্তি করতে সে ভুল করল না। দুধ চা বেশি সময় রাখলে কালো হয়ে যায়, তাই ফ্ল্যাক্স ভর্তি করে লাল চা নিল। তার এতসব আয়োজন দেখে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। তার জিনিসপত্রের বহর এত বেড়ে গেল বড় একটা ব্যাগের জায়গায় দুটো ব্যাগেও সংকুলান করতে আমাদের হিমশিম খেতে হল। পুরো ব্যাপারটা এমন আমরা যেন কোন দূর দেশে দীর্ঘদিনের জন্য নিরুদ্দেশ হচ্ছি। আমরা ওখানে এক রাত কাটাব তাকে সেই কথা বোঝাই কী করে। তাকে নিরস্ত করে সাধ্য কার!

ষোল তারিখ আমরা ঘর থেকে বেরুলাম। তারপর রিকশায় করে একেবারে মডার্ণ লাইনের কাউন্টারের সামনে এসে হাজির হলাম। ব্যাগ দুটো হাতে করে নিয়ে বউ-বাচ্চাসহ কাউন্টারের ভেতরে ঢুকলাম। শিল্পী এবং আপন চেয়ারে বসল। আমি অনাবশ্যক কাউন্টারের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াতে চেয়ারে বসা লোকটি বলল, কোথায় যাবেন?

আমি বললাম, টেকনাফ।

সে বলল, টিকেট কটা?

আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের হাতে এখনও টেকনাফের টিকেট আছে?

সে জানতে চাইল, আপনার ক’টা লাগবে?

আমি ওসবের জবাব না দিয়ে বললাম, ওদিন আপনার গাড়িতে সিট ছিল না, আজ আবার টিকেট দিচ্ছেন কোথা থেকে?

লোকটি কোন জবাব দিল না। আমার বুঝতে একটুও কষ্ট হল না লোকটি আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তার সঙ্গে বাতচিত করা মানে মনের প্রশান্তি নষ্ট করা ছাড়া আর কী। আমি গিয়ে একটা চেয়ারে বসে পড়লাম।

আমাদের গাড়ি ছিল রাত সাড়ে ন’টায়। সেই গাড়ি আসল দশটায়। আমি আমার ব্যাগ দুটো লকারে দিয়ে দিলাম। তারপর বউ-বাচ্চা নিয়ে গাড়িতে উঠে দেখি আমাদের সিটে দু’জন ভদ্রলোক বসে আছেন এবং খোশ আলাপে মত্ত। আমি তাদের বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আপনারা বোধহয় ভুল সিটে বসেছেন। এই দুটো সিট আমাদের।

ভদ্রলোক দু’টি তাদের টিকেট দেখিয়ে বললেন, এ রকম ভুল হবার তো কথা নয়। এই দেখুন, সিটগুলো আমাদের।

তাদের সঙ্গে কথা বলার মত আর কোন জবাব আমি খুঁজে পেলাম না। আমার বুঝতে বাকি থাকল না একই সিট দু’বার বিক্রি করেছে। প্রতারণা কারে বলে? বাসের সুপারভাইজার এসে বলল, কিছু করার নেই। আপনাদের পেছনে সিটে বসতে হবে।

শিল্পী একটু বেশি আল্লাহওয়ালা মানুষ। সে বলল, আপনাদের এই অবিচার আল্লাহ মেনে নেয়?

সুপাভাইজার বলল, মাঝে মাঝে মেনে নেয় না। তখন মারামারি হয়।

আমরা মারামারি করার মানুষ নই। সুতরাং আমাদের মেনে নিতে হল।

গাড়ি চলা আরম্ভ হতে না হতেই আমরা ঝাঁকির কবলে পড়ে গেলাম। আমার জীবনে এমন বাজে অবস্থায় আর পড়িনি। আমার পুত্র আপন বলল, পাপা, গাড়িটা এমন করছে কেন?

আমি বললাম, আমরা গাড়িতে চড়েছি তো তাই খুশিতে ডান্স করছে।

আপন ছোট হলেও বুদ্ধিমান। সে বলল, তোমার কথা সত্য নয়। গাড়ির পেছনে বসলে এরকম হয়। সত্য সব সময় সত্য। আমি কোন জবাব খুঁজে পেলাম না।

কখনও কম, কখনও মাঝারি, কখনও জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে দিয়ে গাড়ি দ্রুত গতিতে ছুটে চলল। চাকার নিচে কোথাও ছোট একটা ইটের টুকরো পড়লেও আমরা বুঝতে পারি গাড়ির ঝাঁকুনির মাধ্যমে। কোথাও যখন গাড়ি স্পীড ব্রেকার অতিক্রম করে কিংবা চাকা গর্তে পড়ে মনে হয় যেন আকাশ থেকে পড়ল। তখন পেছনে বসা লোকজন একরকম চিৎকার করে ওঠে। আমরা আমাদের বাচ্চাটিকে কোলের ওপর লম্বালম্বি শুইয়ে দিলাম যাতে কোথাও আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। বাচ্চাটিকে সযত্নে রাখার জন্য আমরা সারারাত একটুও ঘুমোইনি। গাড়ির ঝাঁকুনিটা বেশি অনুভব করতে থাকলাম কক্সবাজারের রামু পার হওয়ার পর। রাস্তা বোধকরি বিশেষ ভাল ছিল না। তারপরেও চালক এত দ্রুত গাড়ি চালাচ্ছিল ঝাঁকুনি খেয়ে আমরা দু’ হাত লাফিয়ে উঠতাম। চালককে একটু সাবধানে চালানোর অনুরোধ করেও তার সুমতি আমরা লাভ করতে পারিনি। আমরা ঝাঁকুনি খেয়ে আর্তচিৎকার করতাম সে আরও মজা পেত—সেই ব্যাঙের গল্পের মত ‘তোমার খেলা আমাদের মৃত্যু’। কেউ প্রতিবাদ করলে তার একটাই জবাব ছিল, আপনাদের এত কষ্ট কেন? সামনে গাড়ি তো দিব্যি যাচ্ছে।

আমার বুঝতে একটুও বাকি থাকল না ওই গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দেয়ার মানসিকতা তাকে পেয়ে বসেছে। ব্যাপারটা এরকম, যেমন এক কুকুরের ভাত আর কুকুর সহ্য করতে পারে না।

তখন সকাল হয়ে গেছে। সূর্যের আলো গাড়ির জানলা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছে। বেলা যত বাড়তে থাকল সূর্যের আলোর তাপ তত বাড়তে থাকল। সারা রাত ঘুমোইনি বলে সূর্যের আলোয় আমাদের চোখ জ্বালা করতে থাকল। প্রশ্রাবের বেগ পেয়েছিল অনেক আগে থেকে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গাড়ি একবার থামিয়েছিল। তারপর গাড়ি চট্টগ্রাম শহর, চকরিয়া ইত্যাদি পেরিয়ে এলেও কোথাও থামেনি। প্রশ্রাবের যন্ত্রণায় আমার তলপেট টনটন করছিল। একটা কথা বলা দরকার গাড়িতে আপন একবারও বমি করেনি। মনে হল আমার বন্ধু ডাক্তার সাহেবের ওষুধ ভালভাবে কাজ করেছে।

 

চার

সকাল ন’টায় আমরা টেকনাফে এসে নামলাম। আমাদের জাহাজের নাম ছিল কেয়ারি সিন্দবাদ। আগে থেকে টিকেট কাটা ছিল বলে আমাদের তেমন একটা ভোগান্তি হয়নি। আট দশ বছরের একটা ছেলে এসে আমাদের জাহাজে নিয়ে যাওয়ার জন্য ধরণা দিল। এ ধরনের একটা সাহায্য তাৎক্ষণিকভাবে খুব দরকার ছিল। কিন্তু আমার সংশয় ছিল সে ব্যাগ দু’টি বহন করতে পারবে কিনা। তার স্বতঃস্ফূর্ত জবাব, আমরা এর চে’ বড় ব্যাগ নিয়ে যেতে পারি।

তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমাকে কত দিতে হবে।

সে জবাব দিল, অঁনে খুশি অই যা দেওন। (আপনি খুশি হয়ে যা দেবেন।)

সে আমাদের বড় ব্যাগটি পিঠে তুলে নিল যেভাবে স্কুলের ছাত্ররা তাদের ব্যাগ বহন করে। অন্য ব্যাগটি সে মাথায় নিল। আমার হাতে অল্প জিনিসপত্র ছিল সে ওগুলোও টানাটানি শুরু করে দিল। একটা জিনিস আমার খুব খারাপ লাগল, এ অল্প বয়সের ছেলেদের এখন পড়াশুনা করার কথা, অথচ সে ওটা না করে মুটের কাজ করছে। গাড়ি থেকে জাহাজের দূরত্ব খুব বেশি নয়, মোটে দু’ মিনিটের পথ। সে ব্যাগ দুটো জাহাজে নিয়ে গেলে তাকে আমি দশটি টাকা দিলাম। মনে হল সে অত টাকা আশা করেনি। সে বায়না ধরল কোন খাবার-দাবার এনে দিতে হবে কিনা। আমি তাকে বললাম, দরকার নেই। তুমি এখন যেতে পার। গাড়িতে অনেক লোক বসে আছে। তুমি যদি আরও একটা ব্যাগ টানতে পার কিছু টাকা পাবে।
ছেলেটি চলে গেল।

আমরা জাহাজের টয়লেটে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এলাম। কলের পানি ভয়ানক লবণাক্ত। আমরা বোতলের খাবার পানির কিছুটা মুখ ধোয়ার কাজেও ব্যবহার করলাম। ক্ষুধার জ্বালায় পেট চিনচিন করছিল। শিল্পীকে বললাম, তোমার খাবার যা আছে বের কর। এখন খাব।

আমরা ঘরের বানানো রুটি মুরগির ভূনা মাংশ দিয়ে নাস্তা সারলাম। এবং তৃপ্তিসহকারে। আপনকেও খাওয়ালাম।

প্রায় দশটার দিকে আমাদের জাহাজ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে রওয়ানা দিল। তখন জাহাজে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। গোটা জাহাজটিতে যাত্রী গিজ গিজ করছিল।

জাহাজ তখন নাফ নদীতে। আমরা জাহাজের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম এবং দূরপানে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকলাম দু’পাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। একটা জিনিস দেখে আমার বুকটা কচ কচ করে উঠল। অনেক দূরে দেখতে পেলাম মায়ানমারের কাঁটা তারের বেড়া। ভারতের দেখাদেখি তারাও এই কাজ করেছে। গ্রামে ভাইয়ে ভাইয়ে রেষাারেষি হলে ঘরের মাঝখানে বেড়া দিয়ে পৃথক হয়ে যায়। আল্লাহর দুনিয়াতেও তার ব্যতিক্রম ঘটল না। ইচ্ছে করলে এপাড়ের মানুষ ওপাড়ে, ওপাড়ের মানুষ এপাড়ে আসতে পারবে না।

জাহাজে একজন লোকের সঙ্গে আমার পরিচয় হল। তাঁর নাম ওয়ালিদ। বয়স আমার চেয়ে একটু বেশি হবে। তিনি অনেকক্ষণ ধরে একাকী বসা ছিলেন। আমাকে পেয়ে তিনি আমার সঙ্গে আড্ডা জুড়ে দিলেন। ভদ্রলোক খুবই অমায়িক। তাঁর বাড়ি পিরোজপুরে। তিনি টেকনাফে শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে আছেন। সেন্টমার্টিনে যাচ্ছেন স্কুল পরিদর্শনে। তাঁর সঙ্গে কথায় কথায় কথা উঠল গতরাতের গাড়িতে ভোগান্তির কথা। আমার কথায় তিনি আফসোস করতে থাকলেন। বললেন, আপনার সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয় থাকলে আমি কিছুটা হলেও আপনার উপকারে আসতে পারতাম।

আমি জানতে চাইলাম, কী রকম?

তিনি বললেন, গাড়ির কাউন্টারের সঙ্গে আমাদের কম বেশি যোগাযোগ থাকে। সরকারি লোকদের তারা কিছুটা খাতির করে চলে। আমরা তো তাদের পার্মানেন্ট প্যাসেন্জার। সব সময় তো আর এরকম ভিড় থাকে না। তখন তো আমাদের ওপর ভরসা করেই তাদের চলতে হয়।

আমি বললাম, আপনি কি আমাকে আগামীকালের দুটো টিকেট যোগাড় করে দিতে পারেন?

তিনি বললেন, আপনি কোথায় যাবেন, নিশ্চয় ঢাকায়?

আমি বললাম, না। আমি প্রথমে বাড়ি যাব। চট্টগ্রামে যেতেই পথে আমার বাড়ি। সুতরাং চট্টগ্রাম হলেই আমার চলবে।

ওয়ালিদ সাহেব আমার সঙ্গে কথা বন্ধ করে সেন্টমার্টিন পরিবহনের লোকজনের সঙ্গে মোবাইলে বোঝাপড়া আরম্ভ করে দিলেন। বললেন, আমার দু’জন আত্মীয় আগামীকাল চট্টগ্রামে যাবেন। আপনারা ভাল দেখে দু’ট সিট রিজার্ভ রাখবেন। আর কোন কথা শুনতে চাই না। টিকেট দু’টি আমি সেন্টমার্টিনে গিয়ে কিনে নেব। আপনারা ওখানে বলে রাখুন।

কথা শেষ করে ওয়ালিদ সাহেব ফোন বন্ধ করে দিলেন। তারপর আমাকে বললেন, ভাইজান, আপনার সিট বুকিং হয়ে গেছে। আপনি ইচ্ছে করলে সেন্টমার্টিন নেমেই টিকেট কিনে নিতে পারেন।

আমি বললাম, ধন্যবাদ, তাই হবে।

আমাদের জাহাজ নাফ নদী পেরিয়ে সাগরে এসে পড়ল। গতবার যখন এসেছিলাম সাগর ছিল শান্ত। এবার কিছুটা উত্তাল। তবে এ ঢেউ জাহাজকে তেমন একটা টলাতে পারছে না। ঢেউ মাড়িয়ে মাড়িয়ে জাহাজ আড়াই ঘণ্টা চলার পর সেন্টমার্টিনের ঘাটে নোঙ্গর করল। তখন জাহাজ থেকে বারবার ঘোষণা আসতে থাকল, কেউ তাড়াহুড়ো করবেন না। এক সঙ্গে সকলে একপাশে যাবেন না। জাহাজ উল্টে যেতে পারে। কিন্তু লোকজন ভাষ্যকারের কথা কানে ঢোকাল বলে মনে হল না।

জাহাজে ওঠার সময় যেরকম একটি ছেলে পেয়েছিলাম, এবার ওরকম একটি ছেলে জুটে গেল। সে একই কায়দায় আমাদের ব্যাগগুলো তুলে নিল। দেখলাম তার তেমন অসুবিধা হচ্ছে না। সে আমার নির্দেশ মত ব্যাগ দুটো সেন্টমার্টিন পরিবহনের কাউন্টারে নিয়ে রাখল। আমি পকেট থেকে বের করে তাকে দশটি টাকা দিলাম। সে কোন রকম আপত্তি করল না।

ওয়ালিদ সাহেব উদ্যোগী হয়ে সেন্টমার্টিন পরিবহন থেকে আমাদের জন্য দুটো টিকেট করিয়ে দিলেন। কেবল তিনি আমার উপকারই করেননি, তিনি আরও দু’জন লোকের সহায় হয়েছিলেন। তারা হোটেলের সিট পাচ্ছিলেন না। তিনি লোকজনকে বলে কয়ে হোটেল অবকাশে অনেক কমে মাত্র আট শ’ টাকায় তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে এ-ও স্মরণ করিয়ে দিলেন, আপনি ঢাকা থেকে দু’ হাজার টাকায় বুকিং দিয়ে হোটেলের রুম নিয়ে বোকামি করেছেন এবং চরমভাবে ঠকেছেন। ভবিষ্যতে এরকম ভুল আর করবেন না।

মানুষ তো ঠেকে শেখে। আমি ঠকেই শিখলাম।

এবার আমরা আরও একটি সমস্যার মুখোমুখি হলাম। আমাদের হোটেলটির নাম পান্না রিসোর্ট। কিন্তু হোটেলটি কোথায় আমাদের জানা ছিল না। লোকজন বলল, একেবারে সী বীচের সঙ্গে লাগোয়া। আমার সহায়ক ওয়ালিদ সাহেব একজন ভ্যানওয়ালাকে ডেকে বললেন, এদেরকে পান্না রিসোর্টে দিয়ে এস। তুমি কত নেবে।

ভ্যানওয়ালা কোন রকম ভূমিকা না করে বলল, আশি টাকা।

ভ্যানওয়ালার টাকার অংক শুনে ওয়ালিদ সাহেব থ বনে গেলেন। তিনি বললেন, এটুকু পথ তিনবার আসা-যাওয়া করলেও আশি টাকা লাগার কথা নয়।

সেন্টমার্টিন পরিবহনের কাউন্টারের লোকটি ওয়ালিদ সাহেবকে বলল, স্যার, আপনি চলে যান। ভ্যানের ব্যবস্থাটি আমি করে দেব।

ওয়ালিদ সাহেব চলে গেলেন। অনেকক্ষণ দর কষাকষির পর আমাদের জন্য ভ্যান ঠিক করা হল চল্লিশ টাকায়। আমরা জিনিসপত্র নিয়ে ভ্যানে চড়ে বসলাম। গ্রামের ছায়াঘেরা সিমেন্টের জমানো পথ ধরে ভ্যান পাঁচ মিনিট চলার পর দু’টি দোকানের সামনে গিয়ে থামল। ভ্যান আর যাবে না। আমি তো অবাক। যেটুকু পথ এসেছি বড়জোর আধা কিলোমিটার হতে পারে। ভ্যানওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন যাবেন না?

সে জবাব দিল, ন দেহর সাম্মে রাস্তা নাই? (দেখেন না সামনে আর রাস্তা নেই?)

আমি সেদিকে লক্ষ্য করিনি। হ্যাঁ, সামনে আর রাস্তা নেই। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে যাব কী করে? এখান থেকে কত দূর।

সে জবাব দিল, বেশি দূরে নয়। আধা মাইল অইব।

আমার দশা হল মাথায় বাজ পড়ার মত। ভ্যানওয়ালা দেখিয়ে দিল, পাড়ার ভেতর দিয়ে চলে যান তাহলে কিছুটা ছায়া পাবেন। সাগরের পাড় দিয়ে যেতে পারেন, কিন্তু বালি অত্যধিক গরম।

এই লোকের কথায় কোন কিছুই আমার মাথায় আসছে না। তাকে বললাম, সে না হয় গেলাম। কিন্তু এটুকুন বাচ্চা এবং দু’ দুটো ব্যাগ নিয়ে আমরা কীভাবে যাব?

সে কাট কাট জবাব দিল, ইয়ান কি আঁই জানি? অঁনে আঁর টেঁয়া দিয়েরে বিদায় গরন। (সেটা কি আমি জানি? আপনি আমাকে টাকা দিয়ে বিদায় করেন।)

তাই তো, সেই কী করবে? আমি পকেট থেকে চল্লিশ টাকা বের করে তার হাতে তুলে দিলাম। সে চলে গেলে একজন দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে একটা ছেলে যোগাড় করে দিতে পার, যেই আমার ব্যাগগুলো নিয়ে যাবে?

ইতোমধ্যে আমি সবার সঙ্গে চাটগেঁয়ে ভাষায় বাতচিত আরম্ভ করে দিয়েছি। আমি তাদেও বোঝাতে চেয়েছি আমার বাড়ি ঢাকা নয়। আমার বাড়িও এখানে। ইচ্ছে করলে তোমরা যাচ্ছেতাই করতে পার না। দোকানদার বলল, অঁনারা বইয়ন, দেই কী গরা যায়। (আপনারা বসেন, দেখি কী করা যায়।)

আমি বসব কী, আমার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে। দোকানদারকে বললাম, তোমার ডাব কত করে?

সে জবাব দিল, কুড়ি টেঁয়া। (বিশ টাকা।)

আমি বললাম, বিশ টাকা! পনের টাকা দিলে হয় না?

সে বলল, কুড়ি টেঁয়ার হম ন বেচি। অঁনে তো দেশি মানুষ, ঠিক আছে নেয়ন। কিন্তু বাছাবাছি গরিত ন পারিবা। (বিশ টাকার কম বেচি না। আপনি তো দেশী মানুষ, ঠিক আছে নেন। কিন্তু বাছাবাছি করতে পারবেন না। আমি যেটা দেই সেটা নিতে হবে।)

দোকানদার ছোট ডাব বাছতে লেগে গেল। তার ডাব বাছা দেখে আমার হাসি পেয়ে গেল। আমি বললাম, কী রে তুঁই না কইলা দেশী মানুষ, তই এত বাছাবাছি গর কিয়ল্লাই? (কী রে, তুমি না বললে আমি দেশী মানুষ, তাহলে এত বাছাবাছি কেন?)

সে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, আঁই চিন্তা গরগিলাম দুয়া একগুয়া ছোড আছে, এহন ত দেইর বেয়াগুন হমান। (আমি ভাবছিলাম দুয়েকটা ছোট ডাব আছে, এখন দেখছি সবগুলোই সমান।)

আমি হেসে বললাম, তইলে এহন কি কুড়ি টেঁয়া দেয়ন পরিব না? (তাহলে কি আমাকে এখন বিশ টাকাই দিতে হবে?)

সে বলল, ইয়ান ক্যানে অনব? অঁনেরে ত আঁই হতা দেইয়ি। (তা হবে কেন? আমি তো আপনাকে কথা দিয়েছি।)

মনে মনে বললাম, যাক, এদের মধ্যেও একটা নীতিবোধ কাজ করে।

ডাব খেতে খেতে দশ বার বছরের একটা ছেলে এসে হাজির। তার মাথায় একটা ব্যাগ। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি আমাকে একটা ছেলে যোগাড় করে দিতে পারবে?

সে জানতে চাইল, অঁনারা হডে যাইবান? (আপনারা কোথায় যাবেন?)

আমি বললাম, পান্না রিসোর্টে।

ছেলেটা গরমে ঘেমে গেছে। কিছুটা ক্লান্তও। সে একটু জিরিয়ে নিলে পারে। কিন্তু সেসবে তার তোয়াক্কা নেই। আমাকে বলল, আঁইও এডে যাইদদি। গেলে আঁর লয় চলন। (আমিও ওখানে যাচ্ছি। যেতে চান আমার সঙ্গে চলেন।)

ইয়ান নইলে গেলাম। কিন্তু ব্যাগ নিব হনে? (তা না হয় যাওয়া যাবে। কিন্তু ব্যাগ বহন করবে কে?)

হারা আঁর মাথাত তুলি দেইওন। আঁর সময় নাই। (তাড়াতাড়ি আমার মাথার ওপর তুলে দেন। আমার সময় নেই।)

তুঁই পারিবা না? (তুমি পারবে?)

আরও দুয়া অইলেও পাইরগম। আঁরার অভ্যাস আছে। (আরও দুটা হলেও পারব। আমাদের অভ্যাস আছে।)

এ পর্যন্ত যে ক’টি ছেলের সঙ্গে আমাদের মোলাকাত হল সবারই কথা একই রকম। তারা এসব কাজে ভীষণ দক্ষ। সে আমারও একটি ব্যাগ মাথায় নিল। আরেকটি নিল পিঠে।

আমরা তার পিছু পিছু হাঁটতে আরম্ভ করলাম। প্রথমে কিছু দূর হাঁটলাম পাড়ার ভেতর দিয়ে। তারপর নামলাম সমুদ্রের চরের ওপর দিয়ে। তখন ভাটির সময়, সাগরের পানি অনেক দূর চলে গেছে। আমরা শুকনো বালির চর মাড়িয়ে ভেজা চরে চলে গেলাম। ভেজা বালির চরটা এমন যেন সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করা হয়েছে। সূর্য খাড়া রোদ ঢালছে বটে, কিন্তু সাগরের বাতাসের কারণে তেমন একটা মন্দ লাগল না। তবে আমরা ঘেমে একাকার হয়ে গিয়েছিলাম। পা পা করে হেঁটে আমরা পান্না রিসোর্টের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। টিনের ছাউনির কটেজ। বেশ ছিমচাম। তিনপাশে কেয়াঝাঁড়ে ঘেরা। সামনে একখানা দরিদ্র বাড়ি। দরিদ্র বলছি এই কারণে, বাড়িটা অনেকটা ভাঙাচোরা। আদিবাসীদের পোশাক পরা দু’জন মহিলা সামনে বসা। তাদের দেখে মনে হল তারা আদিবাসী। পরে জানলাম, তারা আদিবাসী নয়, স্থানীয় এবং মুসলমান। এখানকার মহিলারা আদিবাসীদের মত করে কাপড়চোপড় পরে।

সবকিছু ভাল ঠেকলেও আমার মনটা দমে গেল। ঢাকাতে আমাকে বলেছিল পাকা তিন তলা হোটেলে আমাদের কক্ষ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এবং আমরা দোতলায় থাকব। এখানে এসে দেখলাম তার উল্টোটাই ঘটেছে। ভাগ্য আমাদের সঙ্গে এক রকম প্রতারণাই করল।

আমাদের দেখে দাড়িওয়ালা এক যুবক এগিয়ে এল। সে চার নম্বর কক্ষটি আমাদের জন্য খুলে দিল। আমি বললাম, আপনি চার নম্বর রুম খুলছেন কেন? আমরা তো দুই নম্বর রুম ভাড়া নিয়েছি।

সে বলল, ওই রুমটা একটু ছোট। এখানে আপনারা আরাম করে থাকতে পারবেন।

কক্ষ ছোট তার কথা সত্য নয়। আমি অনুমান করে দেখলাম প্রতিটি কক্ষের সাইজ একই রকম। ব্যাপার হল দুই নম্বর কক্ষটি অন্য লোক দখলে নিয়ে নিয়েছে।

আমরা ভেতরে ঢুকলাম। ঢোকার পর এটা যে একটা টিনশেড বাড়ি কিছুতেই তা মনে হল না। চারপাশের দেয়াল এবং মেঝে টাইলস করা। ওপরে প্লাইউড এমনভাবে লাগানো হয়েছে পাকা বাড়ির ছাদকে হার মানায়। বড় বড় দু’খানা খাট বিছানো। তার ওপর ধবধবে সাদা চাদর এবং বালিশ। মন চাইলে খাট দুটো আমরা ইচ্ছে মত ব্যবহার করতে পারি। আমার ভেতরে যে আক্ষেপ জমা ছিল তা নিমেষে উধাও হয়ে গেল। সেন্টমার্টিনে তো বিদ্যুৎ নেই। দেখলাম তারা জেনারেটরকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে। জেনারেটরের বিদ্যুতে ঘরের পাখা ঘুরছে। ছেলেটাকে একখানা বিশ টাকার নোট দিলাম। সে বলল, স্যার, আমার কাছে ভাঙতি নেই।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোঁয়ার পওনা হত? (তোমার পাওনা কত?)

এসবের প্রতি তার কোন আসক্তি নেই এমন ভাব করে বলল, অঁনে যা দেওন। (আপনি যা-ই দেবেন।)

আমি হেসে বললাম, দুই টেঁয়া দিলে অইব না? (দু’ টাকা দিলে চলবে?)

সে কিছুটা বিরক্ত ও নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, অঁনে খুশি অইলে দেয়ন? (আপনি খুশি হলে দেন?)

আমি বললাম, যাও, তোঁয়ারে কুড়ি টেয়া দিলাম। (তোমাকে বিশ টাকাই দিয়ে দিলাম।)

যা-ই বলি ছেলেটাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। যাবার সময় বলল, অঁনারা হত্তে যাইবেন? (আপনারা কবে যাবেন?)

আমি বললাম, কালিয়া। (কালকে।)

সে বলল,আঁর নাম মিন্টু। আঁরে বওত মাইনসে চিনে। এডিয়ার মাইনসেরে কইলে আঁরে ডাকি দিব। খাইত চাইলে হাসান রেস্টুরেন্টত যাইয়ন। ইয়ানর সাম্মদি আসমা হোটেল। ইথারা গম খাবার ন রাঁধে। (আমার নাম মিন্টু। অনেকে চেনে। এখানকার লোকজনকে বললে আমাকে ডেকে দেবে। খেতে চাইলে হাসান রেস্টুরেন্টে যাবেন। তার সামনে আসমা হোটেল আছে। ওরা ভাল খাবার করে না।)

তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়ান হডে? (ওটা কোথায়?

সে বলল, আঁই জিয়ত্তুন ব্যাগ আন্নি ইয়ানর এক্কেনা সাম্মদি। (আমি যেখান থেকে ব্যাগ এনেছি তার একটু সামনে।)

মিন্টু চলে গেল। আমি কাপড়চোপড় ছেড়ে বাথরুমে ঢুকলাম। ঢুকে দেখলাম বাথরুমের পানির কল কাজ করে না। এখন বোঝা গেল, আমরা কেন দু’ নম্বর কক্ষের বদলে চার নম্বর কক্ষ পেলাম। খুব সম্ভব চার নম্বর কক্ষের লোকজন বাথরুমের করুণ দশা দেখে দু’ নম্বরে চলে গিয়েছে। কটেজের কেয়ারটেকার যুবকটির নাম ছিল রশীদ। আমি তাকে ডেকে বললাম, রশীদ, আপনি জানেন, বাথরুমের পানির কল নষ্ট?

রশীদ বলল, একটা ভাল আছে, ওটা ব্যবহার করেন। একটু পর আমাদের লোক এসে বাকিটা ঠিক করিয়ে দেবে।

আমার মেজাজ চরমে ছিল। এত টাকা দিয়ে হোটেল ভাড়া নিয়েছি, অথচ পানির কল ঠিক থাকবে না এটা কেমন কথা? আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, রশীদ, আমি এ রুমের ভাড়া কত দিয়েছি জানেন?

রশীদ জবাব দিল, নিশ্চয় তিন হাজার টাকা।

আমি বললাম, তিন হাজার নয়, দু’ হাজার টাকা।

সে হেসে বলল, তাহলে তো কমে পেয়েছেন। আপনার টিকেটটা মাত্র চারবার বিক্রি হবার পর আপনি কিনেছেন। পাঁচ সাতবার বিক্রি হলে তিন হাজার টাকায় কিনতে হত।

এবার বোঝা গেল এসব টিকেট দালালদের হাত ঘুরে ঘুরে আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়। আমি আর কথা বাড়ালাম না। কথা বাড়িয়ে তার সঙ্গে পেরে উঠব সেটা মনে হল না।

আমরা সকলে গোসল করে ফ্রেশ হলাম। ক্লান্তির ছাপটা কেটে গেল বটে, কিন্তু খিদের যন্ত্রণাটা ভালভাবে অনুভব করতে থাকলাম। শুয়ে পড়লে ঘুমিয়ে যাব। সে ভয়ে বিছানায় গেলাম না। শিল্পীকে বললাম, চল খেয়ে আসি।

শিল্পী জবাব দিল, এত রোদে আর বেরুবো না। ছেলেটাও কেমন জানি অসুস্থতা বোধ করছে।

ব্যাগের ভেতর আরও কিছু খাবার অবশিষ্ট ছিল। শিল্পী ওগুলো বের করল। যেটুকু খাবার আছে, আমার মনে হল ইচ্ছে করলে আমি পুরোটা সাবাড় করে দিতে পারি। কিন্তু অন্যদের তো আর উপোস রাখতে পারি না। একটা সন্দেহ কাজ করছিল, খাবার ঠিক আছে কিনা। না, একটুও নষ্ট হয়নি। আমরা তিনজনে ভালভাবে খেলাম। তারপরও দেখি আরও কিছু খাবার থেকে গেছে। নিজে নিজে লজ্জিত হলাম। একটু আগে আমি পুরো খাবারটা একাকী খেতে পারব এমন চিন্তা মাথায় এসেছিল। পেটের খিদের চে’ চোখের খিদে যে কত ভয়ঙ্কর এর আগে কোনদিন ভেবে দেখিনি।

শিল্পী বলল, আধা ঘণ্টা বিশ্রাম নাও। তারপর আমরা বাইরে যাব। পুরো বিকেলটা আমরা ঘুরে ঘুরে দেখব।

আমরা প্রায় পনের ঘণ্টা গাড়ি এবং জাহাজে কাটিয়েছি। আমাদের চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। যখন আমরা শুয়ে পড়লাম কখন যে চোখে ঘুম নেমে এল আঁচও করতে পারলাম না।

 

পাঁচ

আমাদের যখন ঘুম ভাঙে তখন প্রায় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। শিল্পী বলল, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও, নইলে পুরো দিনটা মাঠে মারা যাবে।

ব্যাপারটা তাই। আমাদের হাতে সময় বেশি নেই। আগামীকাল একটার আগে আমাদের হোটেল ছাড়তে হবে। তিনটে বাজে চড়তে হবে জাহাজে। আমাদের হাতে সময় কোথায়!

আমরা তৈরি হয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম। সমুদ্রের পানি দুপুরের চে’ আরও দূরে চলে গেছে। নানা জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে বড় বড় পাথরের মত কালো প্রবাল চরের ওপর মাথা উত্তোলন করে আছে। পানির মধ্যেও অনুরূপ পাথর দেখা গেল। ওগুলো কখনও ডুবছে, কখনও পানির ভেতর থেকে মাথা উত্তোলন করছে। দুপুরবেলা যে সৈকতটি জনমানব শূন্য ছিল তা এখন লোকে লোকারণ্য। সকলে দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফি, ঝাপাঝাপি করছে। আমরা তাদের মাঝে মিশে গিয়ে ছবি ওঠাতে থাকলাম। পশ্চিমাকাশে সূর্য ডুবতে বসেছে। আকাশটা সোনালি রঙ ধারণ করেছে। সবার চোখ সেদিকে।

সৈকতের এখানে-সেখানে ছাড়া ছাড়া টঙ-দোকান। চা-সিগারেটসহ আরো নানা জিনিসের দোকানও রয়েছে। কিন্তু কেনার মত জিনিস তেমন একটা নেই। কিছু কিনতে চাইলে দাম হাঁকে দ্বি-গুণ তিন গুণ। জিনিসগুলোও মানসম্পন্ন নয়। তারপরও মানুষ কিনছে। দাম দিয়ে কিনে খাচ্ছে। কিছুই করার নেই। প্রতিটি মানুষ যেন তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। আমি চাটগেঁয়ে ভাষায় বাতচিত করে দুয়েকটি দোকানের সঙ্গে খাতির জমিয়ে ফেললাম। ফল হল তারা আমার কাছ থেকে প্রতিটি জিনিসে এক দুই টাকা করে কম রেখেছে। যেমন, ডাব বিক্রি করে বিশ পঁচিশ টাকা, আমার কাছ থেকে নিল পনের টাকা। চা বিক্রি করে ছয় টাকা, আমার কাছ থেকে নিল পাঁচ টাকা। চা-টা যে মানসম্পন্ন তা বলা যাবে না। আসল জিনিসের মধ্যে ডাবটাই একমাত্র খাটি। শুটকির দোকানে গেলাম। লইট্টা শুটকির দাম হাঁকল চার শ’ টাকা। তার দাম হতে পারে দেড় থেকে দু’ শ’ টাকা। অথচ শুটকি ওখানেই উৎপাদন হয়। রূপচাঁদা শুটকি সাত শ’ টাকা। কিন্তু কোনটাই রূপচাঁদা নয়। আমি চাটগেঁয়ে লোক দোকানদার চিনতে পেরে বলল, এখানে আসল শুটকি পাবেন না। পেলেও অনেক দাম দিয়ে কিনতে হবে। আপনি কক্সবাজার থেকে কিনে নেবেন। কখনও-সখনও তারা সত্য কথাটাই বলে। তখন ভাল লাগে। সত্য কথার একটা দাম তো আছে।

সন্ধ্যা যখন পেরিয়ে গেল পুরো সৈকতে অন্ধকার নেমে এল। এমন অন্ধকার দশ হাত দূরেও দেখার উপায় নেই।

আপনি যখন সেন্টমার্টিন যাবেন দেখবেন দশ বার বছরের ছেলে পিলের আকাল নেই। তারা উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তেমনি ঘুরে বেড়াচ্ছে অসংখ্য কুকুর। আমি এক সময় মহেশখালিতে ছিলাম। ওখানেও আমি কুকুরের আধিক্য দেখেছি। সাগরের বাতাস কুকুর প্রজননের জন্য সহায়ক কিনা কে জানে।

সেন্টমার্টিনে প্রবাল তোলা বা বিক্রি করা নিষিদ্ধ। তারপরেও ছোট ছোট ছেলেমেয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে তা বিক্রি করে। আমার একটা সুবিধা ছিল চাটগেঁয়ে ভাষায় কথা বলতে পারি বলে যে কারও সঙ্গে মিশে যেতে পারতাম। একটা ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, সেন্টমার্টিনে দেখার জিনিস কী কী আছে?

সে বলল, দেহার জিনিস ত সী বীচ। মনে চাইলে কালিয়া বেইন্না প্রবাল দ্বীপত যাইত পারন। গম লাগিব। (দেখার জিনিস তো সী বীচই। মন চাইলে আগামীকাল সকালে প্রবালদ্বীপে যেতে পারেন। ভাল লাগবে।)

ছেলেটির পরামর্শ শিল্পীর মনে ধরল। বলল, আমরা কালই প্রবালদ্বীপে যাব।

আমি বললাম, যেতে চাইলে তো যাওয়া যাবে না। কীভাবে যেতে হয় সেটা তো জানতে হবে।

আমি ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম, প্রবালদ্বীপে কীভাবে যায়।

সে বলল, এডে বোট পওন যায়। আজার দের আজার টেঁয়া লইব। ঘাডুত্তন লোকালে গেলে একজন দেড় শ টেঁয়া গরি লইব। (এখানে বোট পাওয়া যায়। হাজার দেড় হাজার টাকা নেয়। ঘাট থেকে লোকালে গেলে একেক জন দেড় শ’ টাকা করে যেতে পারে।)

শেষের পরামর্শটা আমার মনে ধরল টাকা খরচের কথা ভেবে। শিল্পীকে বললাম, আমরা সকাল সকাল ঘাটে চলে যাব। তারপর ওখান থেকে যাবার ব্যবস্থা করব।

ছেলেটি বলল, অঁনারা চাইলে সমুদ্র বিলাস চায় আইত পারন। (আপনারা ইচ্ছে করলে ‘সমুদ্র বিলাস’ দেখে আসতে পারেন।)

আমি বললাম, সমুদ্র বিলাস কী?

সে জবাব দিল, হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি।

আমি বললাম, খুব সুন্দর?

ছেলেটি বলল, এত সুন্দর নয়। অই বেডারে এডিয়ার মানুষ পছন ন গরে। (তেমন সুন্দর নয়। লোকটাকে এখানকার মানুষ পছন্দ করে না।)

আমি জানতে চাইলাম, কারণ কী?

সে হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে নানা রকম ফিরিস্তি দিয়ে চলল। সেইসব কথা এখানে লেখার উপযুক্ত জায়গা মনে করলাম না। শিল্পী বলল, আগামীকাল আমরা প্রবালদ্বীপ ঘুরে সমদ্র বিলাস দেখে যাব।

আমি বললাম, তাই করব।

অবশ্য আমাদের ওখানে যাওয়া হয়নি। কারণ প্রবালদ্বীপ থেকে আসতে আসতে অনেক বেলা হয়ে গিয়েছিল। ওদিকে রশীদ রুম ছেড়ে দেয়ার জন্য আমাদের চাপাচাপি করছিল।

যাক সেসব কথা। আমরা খাবারের হোটেলের সন্ধানে পথ ধরলাম। ছেলেটি আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাল খাবার কোন হোটেলে পাওয়া যায়?

সে বলল, আসমা হোটেলে।

আমি বললাম, আমরা তো শুনলাম হাসান হোটেলে।

সে অনেকটা আতঙ্কিত স্বরে বলল, অই হোটেলত ন যাইয়ন। ঈতারা গম মাছ ন রাখে। বেয়াগুন পচা মাছ। আঁই অই হোটেলত চওরি গইরতাম। (ওই হোটেলে যাবেন না। ওরা ভাল মাছ রাখে না। সব বাসি মাছ রান্না করে। আমি ওই হোটেলে চাকরি করি।)

ছেলেটি নিজের হোটেলের বদনাম নিজে করছে দেখে আমি দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে গেলাম। দুপুরে শুনলাম হাসান, আর এখন আসমা। দু’জনেই বাচ্চা ছেলে, কার কথা বিশ্বাস করব। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হোটেল দু’টি কোথায়?

সে জবাব দিল, দুইয়ানই পাশাপাশি। (দু’টাই পাশাপাশি।)

আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে যাব?

সে বলল, আঁডিও যাইত পারন, আবার ভ্যানেও যাইত পারন। (হেঁটেও যেতে পারেন, আবার ভ্যানেও যেতে পারেন।)

আমরা সামনে রাস্তায় উঠে লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম হোটেল দু’টি কোনদিকে। ওরা সামনে দেখিয়ে দিল। একটা ভ্যানকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি যাবে নাকি? গেলে ভাড়া কত?

তার তড়িৎ জবাব, কুড়ি টেঁয়া। (বিশ টাকা।)

আমি কোন রকম বিচার-বিশ্লেষণ না করে বললাম, দশ টাকা যাবে?

সে রাজি হয়ে গেল। বড়জোর শ’ চার শ’ গজ নিয়ে আমাদের হাসান হোটেলের সামনে নামিয়ে দিল। আমরা তো থ বনে গেলাম। এতটুকু পথের জন্য দশ টাকা দিলাম। লোকগুলো যে কত ধুরন্ধর কল্পনাই করা গেল না।

ইতোমধ্যে ছেলেটাও এসে গেছে। সে ফিসফিস করে বলল, আঁই জিয়াইন কইয়ি, ঈতারারে ন হইও। (আমি যেসব কথা বলেছি ওদের বলবেন না।)

কথাগুলো বলে সে দৌড়ে পালিয়ে গেল। কথাগুলো এমনভাবে বলল তার সব কথাই আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ঠেকল। ফলে হাসান হোটেলের তোয়াক্কা না করে আসমাতে চলে গেলাম।

আসমা হোটেলের সামনে অনেক রকম মাছ সাজিয়ে রেখেছে। আমরা আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি রূপচাঁদা মাছ খাব। কিন্তু ওখানে কোন রূপচাঁদা নেই। আমি বললাম, আপনাদের কাছে রূপচাঁদা আছে?

তারা নানা প্রজাতির মাছ দেখিয়ে বলল, এইয়িন তো রূপচাঁদা। (এগুলোই তো রূপচাঁদা।)

আমি চাটগেঁয়ে ভাষায় বললাম, এইয়ুন রূপচাঁদা নয়। আসল রূপচাঁদা বাইর গরন। (এগুলো রূপচাঁদা নয়। আসল রূপচাঁদা বার করুন।)

তখন তারা বলল, আপনি এডিয়ার মানুষ আগে ন কইবা না? আঁরার তুন রূপচাঁদা নাই। অঁনে হাসান হোটেলত যন। এএডে পাইবেন। (আপনি এ এলাকার লোক আগে বলবেন না? আমাদের কাছে রূপচাঁদা নেই। আপনি হাসান হোটেলে যান। ওখানে পাবেন।)

আসমা হোটেলের লোকজন একটুও মিথ্যা বলেনি, হাসানে রূপচাঁদা আছে। আছে কোরাল, চিংড়ি, ইলিশ, আঁইছচাঁদা, কাঁকড়া আরও নানা জাতের মাছ। তারা আমাকে প্রথম দেখায় জেনে গেল আমি মাছ চিনি। আমি একটা রূপচাঁদা পছন্দ করলাম।

দোকানদার বলল, অঁনে কন দরদাম গরিত ন পারিবা এবং কেয়ারে কইতও ন পারিবা। এক দাম তিন শ টেঁয়া লাগিব। আঁরার মানুষ দশ মিনিটের ভিতর ফ্রাই গরি দিব। অঁনে নিজে দেইবেন এইয়িনত্তুন হত হারাপ মাছ বেশি দিয়েরে বেছি। (আপনি কোন দরদাম করতে পারবেন না এবং কাউকে বলতেও পারবেন না। এক দাম তিন শ’ টাকা দেবেন। আমাদের লোক আপনাকে দশ মিনিটের মাথায় ফ্রাই করে দেবে। আপনি নিজেই দেখবেন এর চে’ নিকৃষ্টমানের মাছ কত দামে বিক্রি করি।)

বাবুর্চি এসে মাছ নিয়ে গেল। একটু বাদে আমার কেমন জানি মনে হল ওরা যদি আমাকে আমার পছন্দের মাছটি না দেয়? আমি আমার কৌতূহল নিবারণ করতে রান্নাঘরে চলে গেলাম। গিয়ে তো আমার চোখ ছানাবড়া। ইতোমধ্যে আমার পছন্দের মাছ পাল্টে একটা পঁচা মাছ রেখে দিয়েছে। আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। এ-ও কি সম্ভব! চ্যালেঞ্জ করে বসলাম, এটা আমার মাছ নয়।

পাশে একটা মাছের বাক্স রাখা ছিল। আমি বললাম, এটা খোল।

বাবুর্চি বাক্স খুলল। আমি বললাম, আমার মাছ তো এখানেই রেখে দিয়েছ।

আমি ওই মাছ উঠিয়ে নিয়ে বাবুর্চিকে দিয়ে কাটালাম এবং ফ্রাই করালাম। ইতোমধ্যে আমি অবাক চোখে লক্ষ্য করলাম, যেই মাছ আমার কাছে তিন শ’ টাকায় বিক্রি করেছে তার চে’ ছোট এবং পঁচা মাছ অন্য লোকের কাছে পাঁচ শ’ টাকায় বিক্রি করল।

 

ছয়

রাতের খাবার শেষ করে আমরা হোটেলের উদ্দেশে পা বাড়ালাম। এবার ভ্যানে যাবার তোয়াক্কা করলাম না। আমরা যখন সৈকতে এসে নামলাম তখন সমুদ্রে জোয়ার চলছে। পানি অনেক দূর ওপরে চলে এসেছে। এসব অনুমান মাত্র। কারণ এত বেশি অন্ধকার ছিল যে কোন কিছু দেখা যাচ্ছিল না।

পরের দিন প্রবালদ্বীপে যাব এ নিয়ে রশীদের সঙ্গে কথা বললাম। সে জানাল, কটেজের আরও তিনজন লোক যাবেন। আমরা ইচ্ছে করলে তাদের সঙ্গে যেতে পারি।

আমরা প্রবালদ্বীপে যাব এটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য এক ভদ্রলোক এলেন। পরে জেনেছিলাম তার নাম বিপু। তিনি তার এক বন্ধু এবং হবু বউকে নিয়ে সেন্টমার্টিন বেড়াতে এসেছেন। হবু বউকে নিয়ে বেড়াতে আসা এই প্রথম কাউকে দেখলাম। তিনি বললেন, সকলে যদি একসঙ্গে প্রবালদ্বীপে যাই তাহলে আমাদের আনন্দ আরও বেশি উপভোগ্য হবে। তাছাড়া খরচের দিকটাও অনেক কমে আসবে।

আমি বিপু সাহেবের সঙ্গে একমত না হয়ে পারলাম না। তিনি চলে গেলে আমরা দু’টি প্লাস্টিকের চেয়ার হাতে করে নিয়ে সাগরের চরে চলে গেলাম। ঢাকা থেকে সঙ্গে আনা টর্চটাও হাতে করে নিয়ে গেলাম। আমরা একেবারে পানির কাছাকাছি গিয়ে বসলাম। রাতটা অন্ধকার হলেও মন্দ ছিল না। বাতাসের শো শো শব্দ। সাগরের ঢেউ ভাঙার গর্জন। আকাশে অসংখ্য তারার মেলা। জোয়ারের তোড়ে পানি বাড়ছে আর বাড়ছে। পানি যখন একটু বাড়ে আমরাও একটু একটু করে ওপরের দিকে উঠে আসতে থাকি। এটা আমাদের কাছে এক ধরনের খেলার মত মনে হল। আমার পুত্র আপন ব্যাপারটি খুব ভালভাবে উপভোগ করেছে।

রাত বারটা বাজার আগে সাগরের জোয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেল। আমরা কটেজে ফিরে গেলাম। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতে হবে এটা আমাদের মাথায় কাজ করতে থাকল।

সকালে আটটার দিকে রশীদ নাস্তা নিয়ে এল। আমরা নাস্তা খেতে আরম্ভ করে দিলাম। এই ফাঁকে সে প্রবালদ্বীপে যাবার বোট ঠিক করে এল। বোট এক হাজার টাকায় যায় না। বলে কয়ে বোটের লোককে সাড়ে আট শ’ টাকায় রাজি করানো গেল।

আমরা এবং বিপু সাহেবের লোকজন বোটে চড়ে বসলাম। আর যা-ই বলি না সাগরে ভ্রমণের মজাটাই আলাদা। প্রবালদ্বীপ বা ছেঁড়াদ্বীপে যেতে বোটকে উপকূল থেকে দূরে যেতে হয় না। গভীর সাগরে ঢেউ খুব একটা থাকে না। ঢেউ থাকে উপকূলের কাছাকাছি। ঢেউয়ের সঙ্গে বোট যখন উঠানামা করে তখন আনন্দে নাচতে ইচ্ছে করে। আমাদের একজন আনন্দের আতিশয্য প্রকাশ করতে গিয়ে চিৎকার করতে করতে গলা ফাটিয়ে ফেলেছিল। এটাই হয়ত স্বাভাবিক।

পঁয়ত্রিশ মিনিট সাগরে ভেসে আমরা প্রবালদ্বীপে পৌঁছলাম। প্রবালদ্বীপের পানি খুবই স্বচ্ছ। সেন্টমার্টিনের পানিও স্বচ্ছ। তবে এত স্বচ্ছ নয়। পানি এত স্বচ্ছ যে এক কোমড় পানিকে মনে হবে হাঁটু পরিমাণ। পানির স্বচ্ছতার কারণে দূরের নিচের তলদেশকে খুব কাছে দেখায়। পানিতে নামলেই বুঝতে পারবেন গভীরতা কত। পানির তলদেশ বুঝতে না পেরে একটা গর্তে পড়ে আমাকে কাপড় ভেজাতে হয়েছে।

একটা সমস্যাও আছে। স্বচ্ছ হলে কী হবে পানিতে বিশ্রি পঁচা মাছের গন্ধ। মনে চাইলেও আপনার সে পানি মুখে নিতে ইচ্ছে করবে না। বড় বড় কালো প্রবাল। কাদামাটিতে ফোটা ফোটা বৃষ্টি পড়লে যে রকম ছোট ছোট গর্ত হয় প্রবালগুলোর গায়ে ওরকম চিহ্ন রয়েছে। খালি পায়ে হাঁটলে কেটে যাবার ভয় ভেতরে ভেতরে কাজ করে। আসলেও তাই। খুব সম্ভব প্রবালের প্রাচীনত্ব থেকে এগুলো কালো রঙ ধারণ করেছে। সাগরে জোয়ার থাকার কারণে আসল প্রবাল দেখার ভাগ্য আমাদের হয়নি।

প্রবালদ্বীপকে ছেঁড়াদ্বীপও বলা হয়ে থাকে। এ দ্বীপে কেয়াঝাঁড় ছাড়া আর কোন গাছ নেই। আমরা পুরো দ্বীপটা একবার চক্কর দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। একপাশে সোনালি বালি। অপরপাশে দেখলাম জোয়ারের তোড়ে ভেসে আসা ছোট ছোট ঝিনুক আর ঝিনুক। এখান থেকে ঝিনুক এবং প্রবাল কুড়ানো নিষেধ বলেই হয়ত এগুলোর আধিক্য এত বেশি চোখে পড়ল।

ঘণ্টা দেড় ঘণ্টা প্রবাল দ্বীপে কাটিয়ে আমরা আবার সাগরের ঢেউ ভেঙে ভেঙে সেন্টমার্টিনে এসে পৌঁছলাম। এখানে এসে কিছু সময় আমরা সমুদ্রস্নান করলাম। রশীদ ডেকে বলল, আমাদের এখুনি হোটেল ছাড়তে হবে। ইচ্ছে করলেও আমরা এখানে আর থাকতে পারব না। হোটেলের নতুন বোর্ডার এসে বসে আছে। আমরা তাড়াহুড়ো করে গোসল সারলাম। ব্যাগ গুছালাম। রশীদ একটা ছেলে যোগাড় করে দিল ব্যাগ নিয়ে যাওয়ার জন্য। কোন কিছুর প্রতি খেয়াল রাখার মত অবকাশ আমাদের ছিল না। আমরা এত ব্যতিব্যস্ত ছিলাম যে, আধা পথে এসে মনে হল হোটেলের বাইরে শুকোতে দেয়া কাপড়গুলো আনা হয়নি। শিল্পী বলল, গিয়ে নিয়ে এস।

আমি বললাম, আমও যাবে, ছালাও যাবে। মনে আছে তিনটা বাজে জাহাজ ছেড়ে দেবে। এর মধ্যে খেতে হবে। ব্যাগ নিয়ে জাহাজে উঠতে হবে।

 

সাত

আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে খেয়ে নিলাম। তারপর জাহাজে। কাঁটায় কাঁটায় তিনটেয় জাহাজ ছেড়ে দিল।

যাত্রীরা জাহাজে বসার সিট নিলেও খুব কম মানুষই সিটে বসে। তারা সকলে জাহাজের বারান্দায় গিয়ে বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখায় ব্যস্ত থাকে। আমার শরীরে ক্লান্তি নেমে এসেছিল। ঘুমে চোখ বুজে আসছিল। আমি বউ-বাচ্চার কোন খবর না রেখে সিটের ওপর সটান শুয়ে পড়লাম এবং এক পশলা ঘুমিয়েও নিলাম।

আপন গতিতে একটানা আড়াই ঘণ্টা চলার পর জাহাজ ধুমধুমিয়া এসে থামল। জাহাজের লোকজন নামার জন্য তাড়াহুড়ো শুরু করে দিল। লোকজন একপাশে চলে আসার কারণে জাহাজটি একরকম কাত হয়ে গেছে। ভয়ানক রকম দুর্ঘটনা ঘটার আশু সম্ভাবনা। জাহাজের ভাষ্যকার চিৎকার করে বলে যেতে থাকল, সব মানুষ আরও যারা আছেন সকলে একপাশে চলে আসুন। তারপর জাহাজটি কাত করে সকলে ডুবে মরুন। এত কষ্ট করে বাড়ি যাওয়ার দরকার কী। মরে গেলে আর কষ্ট করতে হবে না।

ভাষ্যকারের কথায় দেখলাম বেশ কাজ হয়েছে। আমাদের ডুবে মরার আশঙ্কা আর থাকল না। আস্তে আস্তে প্রায় মানুষ জাহাজের ভেতরে চলে এল। ভাষ্যকার আবার বলে যেতে থাকলেন, দেখলাম সকলের মৃত্যুর ভয় আছে। আশা করি, আমরা আমাদের পরম আত্মীয়ের কাছে ফিরে যেতে পারব। কঠিন কথা বলার জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন। আপনাদের যাত্রা শুভ হোক।

ধীরে ধীরে সব মানুষ জাহাজ থেকে বেরিয়ে যেতে থাকল। কে কার আগে যাবে এমন পরিস্থিতিতে জাহাজের গেটে এক রকম ধাক্কাধাক্কি লেগে গেল। আমরা এক জায়গায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলাম। এবার আমি আমাদের জিনিসপত্র নেয়ার কোন মুটে পেলাম না। সব মুটেদের লোকজন আগে থেকে নিয়ে নিয়েছে। লোকজনের এক রকম যাওয়া শেষ হয়ে গেলে আমি আমাদের ব্যাগ দু’টি হাতে করে সরু গেট দিয়ে বাইরে চলে এলাম। গাড়ির কাউন্টার পর্যন্ত আমাকে ওভাবে যেতে হল। ব্যাগের ওজনে আমার কাঁধ ব্যথা হয়ে গেছে। হাতের তালু লাল হয়ে গেছে।

আমাদের গাড়ি ছাড়ার কথা সন্ধ্যা ছ’টায়। সাড়ে ছ’টা বেজে গেছে। তারপরও গাড়ি আসেনি। সাত আট বছরের একটা ছেলে একটা টাকা দেন, একটা টাকা দেন বলে কান্না জুড়ে দিয়েছে। ছেলেটি হয়ত রোহিঙ্গাদেরই হবে। ব্যাপারটা আমি একটিবারের জন্যও খেয়াল করিনি। আমার পুত্র আপন আমাকে বলল, পাপা, তোমার মাথাটা নিচে নামাও।

আমি বললাম, কেন?

সে বলল, নামাও না? কানে কানে একটা কথা বলব।

আমি মাথা নামালে সে আমার কানে মুখ এনে ফিস ফিস করে বলল, তুমি না বলেছিলে যারা গরিব, যাদের মা-বাবা নেই তাদের ভালবাসতে হয়। ভিক্ষুকদের ভিক্ষা দিতে হয়। তুমি ওই বাবুটাকে একটা টাকা দাও না কেন?

আমি বললাম, তাই তো!

আমি আপনের হাতে দু’টি টাকা দিয়ে বললাম, এই দু’ টাকা তাকে দিয়ে এস।

আপন টাকা দু’টি তার হাতে দিয়ে বলল, এবার হাস?

ছেলেটা হি হি করে হেসে উঠল। চমৎকার সে হাসি। ছেলেটাকে কান্না থামিয়ে হঠাৎ হাসতে দেখে আমরা যারা কাউন্টারে বসা ছিলাম সকলে হাসিতে ফেটে পড়লাম। মনে হল আমাদের সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল।

nurulanwar1@gmail.com

ওয়েব লিংক
নূরুল আনোয়ার: আর্টস

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (13) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন hasan — আগস্ট ১১, ২০১০ @ ১:৫০ অপরাহ্ন

      দেখতে খারাপ লাগছে লেখকের নিজের ব্যক্তিগত ছবি ছাপা হওয়ায়।

      – hasan

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Luba — আগস্ট ১১, ২০১০ @ ৪:২৪ অপরাহ্ন

      এত পড়ার টাইম নাই।

      – Luba

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোঃ জাকারিয়া — আগস্ট ১২, ২০১০ @ ৪:০১ অপরাহ্ন

      সেন্ট মার্টিনে আমি দুইবার গিয়েছি। প্রথমবার ভোগান্তিতে পড়েছিলাম। পরে সব জেনেশুনে যাওয়ায় কোনো সমস্যা হয়নি। ইচ্ছে আছে বিয়ের পর বউকে নিয়ে যাব।

      – মোঃ জাকারিয়া

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কাইজার অাহম্মেদ — আগস্ট ১৩, ২০১০ @ ১২:৫৭ পূর্বাহ্ন

      ধন্যবাদ…ভাল লাগল…….অারো জানার অাগ্রহ রইল…….

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mir — আগস্ট ১৩, ২০১০ @ ৮:৫৫ অপরাহ্ন

      সাবলীল ও ডিটেইল বর্ণনা। পড়ে ভালো লাগলো। লেখক, তার স্ত্রী ও পুত্রের জন্য নিরন্তর শুভকামনা রইলো।

      – mir

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মায়া রহমান — আগস্ট ১৪, ২০১০ @ ২:৫৯ পূর্বাহ্ন

      সুন্দর গোছানো লেখা, পড়ে অনেক আনন্দ পেলাম। এরপরে বাংলাদেশে গেলে যাবার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

      – মায়া

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন talat — আগস্ট ১৬, ২০১০ @ ৮:২৯ অপরাহ্ন

      মোটামুটি ভালো হয়েছে। তবে দ্বীপটির অনেক বিবরণ আসেনি। আরো কিছু ছবি থাকলে ভালো হতো।

      – talat

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শাহেদ — আগস্ট ১৮, ২০১০ @ ৮:৪৫ অপরাহ্ন

      চমৎকার লিখেছেন। সুন্দর হয়েছে।

      – শাহেদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন azra — আগস্ট ১৮, ২০১০ @ ১০:৪১ অপরাহ্ন

      সেন্ট মার্টিনের চমৎকার বিবরণ পড়ে ভাল লাগল। যেতে ইচ্ছে করছে। আর বাঙালীদের চিরাচরিত মানুষ ঠকানোর প্রবণতার বিবরণ এসেছে, যা ছিল সত্য কিন্তু বেদনাদায়ক। লেখার স্টাইল আরো ভাল চাই, ভবিষ্যতে আরো ভাল লেখা পাবার প্রত্যাশা রইল। লেখক আর পরিবারকে শুভেচ্ছা।

      – azra

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mujtoba — december ২২, ২০১০ @ ৮:২৪ অপরাহ্ন

      এতো ডিটেইলস– উনার এতো সময় …..

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন sagar — জুন ১৯, ২০১১ @ ৩:৫৬ অপরাহ্ন

      উনি কি ডিটেইল লিখে দোষ করলেন নাকি? সেটাতো আরো ভাল হলো, অনেক কিছু জানা গেল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন S.H. — অক্টোবর ২৪, ২০১৩ @ ৯:২১ অপরাহ্ন

      আপনার লেখা পড়ে ভালই লাগল। চালিয়ে যান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন yusuf reza — আগস্ট ১৪, ২০১৪ @ ১১:৪৪ অপরাহ্ন

      আপনার থেকে আরো ভাল লেখা আশা করেছিলাম।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com