হাক্‌শোবাজারে একশ’ তাইজ্জব!

মীর ওয়ালীউজ্জামান | ১ আগস্ট ২০১০ ৬:০৭ অপরাহ্ন

deu-er-taray-sajjad.jpg
ঢেউয়ের তাড়ায় সাজ্জাদ

বাংলাদ্যাশত্ বাস করি য্যাতেনে হাক্‌শোবাজারে ন আইছে, দইজ্জাত্ ন নাম্‌ছে—হ্যাতেনেরে এই দ্যাশেথ্থন বার গরি দঅন ফড়িবো।

মন্তব্য শুনে আমি যুগপৎ চমকিত ও ঔৎসুক্যে উদগ্রীব। রুবি আর আমি একটি চমৎকার ইলেক্ট্রিক রিকশায় কেবল চেপেছি। চালককে জিজ্ঞেস করে জেনেছি, সে আমাদের গন্তব্য হোটেলটি খুব ভালভাবে চেনে। বিদুৎচালিত ঝক্ঝকে রিকশায় চাপতে পেরেই আমার প্রথম চমক ও তুষ্টিলাভ ঘটেছে এইমাত্র। সেই আমেজ এই মেঘলা সকালে পুরোপুরি উপভোগের আগেই রিকশাচালকের ওই স্বতঃস্ফূর্ত ফতোয়া! আমরা মোটেই ওকে কোনরকমে প্রণোদিত করিনি।

jhau-gachh.jpgঅতএব হোটেল-মোটেল জোনের নতুন নতুন নির্মাণ আর পর্যটকের আনাগোনা লক্ষ্য করার মাঝেই আমি রিকশাচালককে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম কী? নাম বাহাদুর। ১৩-১৪ বছর আগে এখানেই জন্ম। বাবা নিখোঁজ, মা আর তিন ভাইবোনের সংসারেরও সেই চালক। আরো জানাল, ওরা ভাইবোনেরা বাংলাদেশি। বাবা-মা বার্মা থেকে এসেছিল। মনে-মনে চম্কে গিয়ে রুবির সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করি। একটুখানি সতর্কও হয়েছি ভেতরে ভেতরে। বাহাদুর ছেলে আমার তাৎক্ষণিক সব ঔৎসুক্য মিটিয়ে দিয়েছে। ততক্ষণে বাহাদুর আমাদের বাহন চালনা করে হোটেলের সদর দরজা পেরিয়ে গাড়িবারান্দায় পার্ক করেছে। বাস ডিপো থেকে এই মিডিয়া ইন্টারন্যাশনাল হোটেল বড়জোর এক কিলোমিটার পথ। আমরা নেমে দেখি, মেয়ে রুবাই ও জামাই সাজ্জাদ দাঁড়িয়ে। ওরা আমাদের আগেই পৌঁছে গেছে।

তোমাদের চেনা জানা অতিথি নিবাস, মা, রুবাইকে বলি—এবারে তোমরা লিড নেবে; আমি আর রুবি তোমাদের অনুসরণ করব কেবল। আমি বাহাদুরকে ধন্যবাদ জানিয়ে লবিতে ঢুকে যাই। ওয়েলকাম পানীয় নিয়ে সামনেই অপেক্ষমান সুবেশ স্টিউয়ার্ড যুবক। ডায়াবেটিক আমরা নিয়মভঙ্গ করে, যেন বা অভ্যর্থনাকারীকে উৎসাহিত করার ভঙ্গিতেই অরেঞ্জ জুসের পাত্র তুলে নিই হাতে। আরাম্সে আসন গ্রহণ করে পানীয়ে চুমুক দিয়ে মাথা পেছনে হেলিয়ে দিয়ে চোখ বুঁজি। কী আরাম আর নিশ্চিন্তি!

coxbazar-saikat.jpg…….
কক্সবাজার সৈকত
………
রাতের বাসে ঢাকা থেকে আসাটা এ যাত্রায় তেমন উপভোগ করিনি। পুরনো অভ্যাসবশে সোহাগের ‘আরামদায়ক’ ভলভো কোচের টিকিট নিয়েছিলাম। রিটার্ন ট্রিপশুদ্ধ। কিন্তু মালিবাগে সোহাগ ডিপোতে বাসে উঠে বুঝলাম, ‘এ মহিউদ্দিন সে মহিউদ্দিন নয়…’ অর্থাৎ যে সদ্য আমদানীকৃত স্ক্যানিয়া বাসে চড়ে ২০০৭ সালে চিটাগাং-কক্সবাজার ও সুন্দরবনের পথে খুলনা তক্ ভ্রমণ করেছি, সে আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্য এবারে কপালে নেই। সুপারভাইজারকে জিজ্ঞেস করাতে সে জানাল, এ সেই সুইডিশ ভলভো বাস-ই বটে। তারপর সে ছোট্ট একটি পানির বোতল সামনের আসনের পেছনে আঁটা পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে, তার কালো নেকটাই-এর নট ঠিক করতে করতে সরে গেল। বুঝলাম, আমি যে বাসের কথা বললাম, মানুষটি তা দেখেইনি। হয়তো সদ্য নিযুক্তি পেয়েছে, বর্তমান ব্যবস্থাই যে সেরা ব্যবস্থা—সেবিষয়ে ও নিঃসন্দেহ। অন্য যাত্রীরা যারা আমার তুলনায় অনেক বেশি, নিয়মিতভাবে এসব বাসে ভ্রমণ করেন—আমার বিস্ময় লক্ষ্য করে বাখান করলেন, সে স্ক্যানিয়া বাসগুলো পুরনো, ঝরঝরে হয়ে যাওয়ায় সেগুলির অভ্যন্তরীণ সজ্জা, স্বাচ্ছন্দ্য ইত্যাদি সবই পাল্টে গিয়ে এক্ষণে বর্তমান হতদশায় পর্যবসিত হয়েছে।

যা বোঝার বুঝে গেলাম। বাসে জানলার ধারে বসেছিলাম। আসনগুলো পুনর্নির্মাণকালে প্রস্থে চাপানো হয়েছে, ফলে জানলার পর্দা নাকে এসে লাগছে। তাতে দুর্গন্ধ। ওই যে বাতানুকূল যে কোন জায়গা চব্বিশ ঘণ্টা বন্ধ রেখে দিলে, আলো-হাওয়ার খেলা একটু-আধটু না খেলালে যে স্যাঁতসেতে ‘মাস্টি’ একটা শ্যাওলা-স্যাঁতাপড়া গন্ধ নাকে এসে আঘাত করে, সেই রকম। আমরা প্রযুক্তি কিনি মানুষকে আরাম থুড়ি চমক্ দেবার জন্য—কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলি অচিরে ‘শেয়ালের হাতে খন্তা’ দিলে যা হয়, সেই অবস্থায় উপনীত হয়। মনে মনে নাক-কান মুলেছি। বাস ইন্সপেকশ্যন না করে আর দীর্ঘযাত্রার জন্য চোখকান বুঁজে নামী পরিবহনের গাড়িতে উঠব না। রুবাই আর সাজ্জাদ অবশ্য ওদের তারুণ্যের আমেজে সব কিছুই মোটামুটি উপভোগ করছিল, মনে হল। রুবি ঘুমিয়ে রাত কাটিয়েছে। যাত্রাবিরতি ছিল চৌদ্দগ্রামে, চকোরিয়ায়। তখন চা-কফি আর সঙ্গে আনা এগরোল, ফলমূলের সদ্ব্যবহার করেই যাহোক চাঙ্গা হওয়া গিয়েছিল।

তাই চমক্ ছিল প্রথম থেকেই এযাত্রায়। সোহাগের বাসে উঠে আসন ইত্যাদির অনভিপ্রেত বে-আরাম আমাকে বেশ চমকিত, আশাহত ও ক্লান্ত করে দিয়েছিল। বাস কর্তৃপক্ষ শেষ চমকটি দিলেন খোদ মোকামে পৌঁছে। ঢাকা থেকে আমাদের বলা হয়েছিল, সোহাগের বাস হোটেল মিডিয়ার কোল ঘেঁষেই যায়, আমাদের ওরা হোটেলের সন্নিকটে নামিয়ে দেবে। কিন্তু কার্যতঃ হল কি? ওদের অফিসের সামনে সবাইকে নেমে যেতে বলায় আমরাও অগত্যা মধুসূদন হলাম। নেমে আবার দরাদরি করে বিদ্যুৎচালিত রিকশায় উঠে যখন হোটেলের কাছে প্রায় পৌঁছে গেছি, দেখলাম ওই বাসটাই হুশ্ করে আমাদের পেরিয়ে ডিপোতে গেল। এটা ওদের পক্ষে কথার খেলাপ আর আমাদের জন্য কিছুটা হলেও হ্যাঁপাবৃদ্ধির আর একটি উদাহরণ ছাড়া আর কী! আমি অবশ্য শেষ পর্যন্ত খুশি হলাম বাহাদুরের সঙ্গে পরিচিত হয়ে।

e-riksha.jpg…….
ই রিকশায়
……..
সে যাক্। বাসযাত্রায় যতখানি নাখোশ হয়েছিলাম, তারচে’ অনেক বেশি আনন্দ আর ভাল ব্যবস্থাপনা আমাদের উপহার দিয়েছে হোটেল মিডিয়া ইন্টারন্যাশনাল। সাড়ে-তিন দশক হয়ে গেল, আমি বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের বাঁধা অতিথি। বাংলাদেশের যেখানেই যাব, সেখানে পর্যটনের যে-কোন অতিথি নিবাস আমার জন্য বেস্ট অপশ্যন ছিল এতকাল। এবারে সেখানে ঠাঁই না মেলায়, স্ত্রী ও মেয়ে-জামাইয়ের পছন্দের হোটেলে উঠে আমি পরিতৃপ্ত, কৃতজ্ঞ। হোটেল মিডিয়া ইন্টারন্যাশনাল যে টাকার বিনিময়ে যতবড় মাপের সেবা, স্বাচ্ছন্দ্য আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের অফার করেছে, সেটা অতুলনীয় মনে হয়েছে। বিদেশের হোটেলে যে কাঠ কাঠ প্রফেশন্যলিজম প্রত্যক্ষ করেছি, তার সঙ্গে তুলনায় এদের অকৃত্রিম সেবাদানের উন্মুখতা এককথায় ম্যাচলেস। ছেলেমেয়েরা রিসেপশনে ফর্মস ফিল আউট করে আমাকে শুধু একটা সই করতে বলল। আমাদের রুম দু’টো পাবার কথা বেলা ১২টায়। অথচ, সৌভাগ্যক্রমে ন’টার আগেই আমাদের রুমে লাগেজ চলে গেল। হাতে একটি করে টাট্কা লাল গোলাপ নিয়ে আমরা লিফটে চড়লাম।

চারতলায় ৪১৫, ৪১৬—পাশাপাশি দু’টো ঘর আমাদের। করিডোর বরাবর পশ্চিমে তাকালে বঙ্গোপসাগরের অশান্ত ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার দৃশ্য ও শব্দ! রাইট অন দ্য সী! হোটেল-মোটেল জোনে সৈকত ঘেঁষে উত্তর থেকে দক্ষিণে যে সড়ক তৈরি করা হয়েছে, তার দু’টি কি তিনটি প্লটের পরই মিডিয়ার অবস্থান। ছেলেমেয়ে ৪১৬-তে ঢুকলে আমি আর রুবি ৪১৫-র দখল নিলাম। চমৎকার বড়সড় ঘর। বাথরুম তো রবি ঠাকুরের শাজাদপুরের কাচারিবাড়ির গোসলখানা যেন! বড় স্নানঘর আমি পছন্দ করি। এযুগে প্রকাশ্যে একথা বললে তো জেলফাঁস হবার কথা। এই সেদিন রাজধানীর বেগুনবাড়িতে এক ছ’তলা দালান উপড়ে গিয়ে টিনশেড কলোনি টাইপের অনেকগুলো আবাসনের ওপর পড়ল। ‘ইঁটের পরে ইঁট, মাঝে মানুষ কীট’—সেই কবেকার পড়া লাইনটা মনে পড়ে গেল। ঐসব লেখকেরা—গত শতাব্দীর—আশ্চর্যরকমের সত্যদ্রষ্টা এ্যাপোলো ছিলেন সব, নাকি? জর্জ অরওয়েলের নাইনটিন এইটি-ফোর! সাড়ে-চার দশক আগে নীলক্ষেতের শরীফ মিয়ার চা-খানায় বসে যখন এসব পড়ে-টড়ে আলোচনায় মেতে থাকতাম, তখন কি ভেবেছি ১৯৮৪-ও আসবে, ঠাকুরকবির ১৪০০ সাল-ও আসবে, আবার চলেও যাবে আমাদেরই চোখের সামনে দিয়ে—মনে তেমন কোনো দাগ না কেটেই!

কী গো আম্মু ? আমি সারি তুমি শুক, গল্প করি টুকুর টুক—করলেই হবে না কি নাশতা খেতে যাবে? নাকি আমরা খেয়ে তোমাদেরটা ক্যারি ব্যাগে নিয়ে আসব? আমাদের মেয়ে রুবাই এরকম গড়গড়িয়ে রেলগাড়ির মতোই কথা বলে। শোনে কম। তা সে যাক্গে। আমি লাফিয়ে উঠলাম, না না, চল্ যাই, সবাই একসঙ্গে ব্রেইকফাস্ট খাব। স্নান করে আমার বেশ ফ্রেশ লাগছে এখন। সারারাত যে তেমন ঘুম হয়নি, তেমনটি আর মনে হচ্ছে না। করিডোরে সাজ্জাদ দাঁড়িয়ে। করিৎকর্মা ছেলে ক’টি চিরকুটের মতো ছাপা কাগজ এগিয়ে ধরল সামনে। এসব আবার কী? হাতে নিয়ে দেখলাম, ব্রেইকফাস্ট অন দ্য হাউস-এর কুপন! এযে দেখছি ষোল আনার ওপরে আঠারো আনা! এটা কী বললে আব্বু? রুবাই ধরে বসল আমার মন্তব্যের খেই। লিফ্টে উঠে দোতলার বোতাম টিপে ব্যাখ্যা করতে হল, আমাদের কালে তো ষোল আনায় এক টাকা হত… ইত্যাদি। এসে গেল রেস্তোরাঁর ফ্লোর। আবার এক চমক! রঙিন বেলুন দিয়ে অতিথিদের জন্য অভ্যর্থনা তোরণ তৈরি করা হয়েছে। কোনো বিশেষ উপলক্ষ্য হবে, ভাবলাম।

চারজনের একটা টেবিলে রুবি আর আমি আসন নিলাম। সামনে বে উইনডো বরাবর সত্যি-সত্যি বেই অব বেঙ্গলের উর্মিমালার লীলা দৃশ্যমান। নাহ্, মানতেই হবে, মোটামুটি চট্জলদি ব্যবস্থাপনা হলেও আমাদের হোটেল নির্বাচন অত্যন্ত মনোগ্রাহী একটা কাজ-ই হয়েছে। নিজেদের কনগ্র্যাচুলেইট করি বারবার, মনে-মনেই। রুবাই-সাজ্জাদের সঙ্গে একজন বেয়ারা আমাদের খাবার নিয়ে এল। আমরা নিজেরাই তো যাচ্ছিলাম, আমি বলে উঠলাম, বাফেই সিস্টেম যখন… না স্যর, সিনিয়্যর সিটিজেনদের সুযোগমতো আমরাই সার্ভ করি। ছেলেটির সপ্রতিভ উত্তর শুনে প্রীত আমি উচ্চারণ করি, অনেক ধন্যবাদ ভাই আপনাকে। স্যর, চা-কফি…। ওহ্, তাহলে কাইন্ডলি এক মগ কাল কফি যদি আমাকে এনে দেন…। রাইট এ্যাওয়ে স্যর। ছেলেটি কফি বারের দিকে এগোয়। মেয়ে আমার জন্য হালকা টোস্ট দু’স্লাইস, অল্প অল্প মাখন আর মার্মালেড এবং ওমলিট এনেছে। রুবির জন্য পরোটা, ডাল ফ্রাই আর ডিমের পোচ। ছেলে মেয়েদের প্লেইটে দেখলাম, এক স্লাইস টোস্ট, এক পরোটা, একটু ডাল, ডিমভাজা, মাখন-জ্যাম…। বিস্ময়টুকু গিলে ফেলি এই ভেবে যে, ওরা গান শোনে না, গানের ‘রিমিক্স’-এর সঙ্গে শরীর আন্দোলিত করে কেবল।

mermaid-eco-resort.jpg
মারমেইড রিজর্টে রুবাই ও সাজ্জাদ

নাশতা শেষ হল। সমুদ্রের কাছে গিয়ে একবার দেখা করে আসতে হয়। নিচে নেমে দেখি, ছেলেমেয়ে অপেক্ষমান। সজ্জন জামাই সাজ্জাদ জানাল, কথা হয়ে গেছে সৌদিয়া-এস আলমের সঙ্গে। ওদের মার্সেইডিজ-বেন্জ বাসে ফিরতি সফরের জন্য টিকিট বুক্ড হয়েছে। তার আগে অবশ্য সোহাগের অফিস থেকে একটা কিছু গপ্পো ফেঁদে আমার ঢাকা থেকে কেটে আনা টিকিট ফেরত দিতে হবে। সাজ্জাদ স্বেচ্ছায় সে দায় ঘাড়ে নিয়ে রুবাইকে সঙ্গী করে বেরিয়ে পড়ল। আমি আর রুবি সমুদ্র সকাশে হাঁটা দিলাম। আগের মতো এলোমেলো শঙ্খ-প্রবাল সামগ্রীর অস্থায়ী দোকানপাট তুলে দিয়ে সেখানে সুদৃশ্য সেমি-পার্মানেন্ট মার্কেট তৈরি করা হয়েছে। বেশ কিছুটা জায়গা ঘিরে সবুজ ঘাসের লন আর বাগান তৈরির প্রচেষ্টা চলেছে। সরকারি কাজের তদারকি ঠিকমতো হয় না। পার্কের ভেতর পাকা ওয়াকওয়েতে বৃষ্টির জল জমে আছে। কারণ? ঢালটা ঠিকমতো ঢালাই হয়নি। ড্রেনেজের ব্যবস্থা সঙ্গীন। ওখানে কেউ হাঁটতে গেলে আছাড় খেয়ে পড়বে!

সৈকতে পৌঁছে যথারীতি সার সার হেলান দেয়া আসনের একটিতে বসলাম। বলা হল, সেটির তুলোভরা ম্যাট্রেস—অতএব ইকো-ফ্রেন্ডলি আর ভাড়া বেশি; কারণ অন্যগুলো লাল-নীল প্ল্যাস্টিকের চাদরে ঢাকা। ১৯৭৪-এ এক দুর্ঘটনার পর আমি আর সমুদ্রে পা ভেজাইনি। অনেকদিন হল, রুবিও আমার দেখাদেখি ওই ছত্রপতি শিবাজির ভূমিকা পালন-ই শ্রেয়োতর মনে করে আসছে, লক্ষ্য করছি। আমরা ছাতার নিচে আসীন হলাম। হকারদের আনাগোনা চলছে। আলুর চিপ্‌স চিবোনো হল যথেচ্ছা। ছেলেমেয়েরা আর আসে না তো আসেই না। ফোনে জানাল, ওরা অনেক দক্ষিণে ওই সীগাল হোটেল বরাবর বিচে নেমে নিজেদের ছন্দে ধীরেসুস্থে উত্তরে এগোচ্ছে। কফি নিলাম। প্রচ- ঝোড়ো বাতাস বইছে। সঙ্গে উড়ছে বালু, মানুষের পায়ে পায়ে। চশমার কাচ ঝাপসা হয়ে যায়। মুছি, আবার চোখে দিই। খিদে পেয়ে যাচ্ছে। অবশেষে রুবি ওদের ফোনে জানাল, আমরা নিরিবিলি রেস্তোরাঁয় যাচ্ছি। ওরা যেন সরাসরি ওখানে চলে আসে।

আধ কিলোমিটার হেঁটে এসে রিকশা পাওয়া গেল। এই ইলেক্ট্রিসিটি চালিত ই-রিকশা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যকর। চারজন মুখোমুখি বসে আলাপ-সালাপ করা চলে। পাঁচ মিনিটে উদ্দিষ্ট রেস্তোরাঁয় পৌঁছে গেলাম। সেই পুরনো দিনের টিনের ছাদের নিচে মাছি ভন্ভনে নিরিবিলি রেস্তোরাঁ নয়—এ তো ঝাঁ চক্চকে ইমারত। মার্বেলে বাঁধানো প্রবেশদ্বার। ভেতরে লোকজন কম। সবাই কি খেয়ে চলে গেছে? এয়ার কুলারের সরাসরি ইমপ্যাক্ট থেকে দূরে আরামদায়ক একটা উইন্ডোসাইড টেবিলে বসলাম। রুবাই, সাজ্জাদ এসে গেল। হাতছানি দিয়ে ওয়েটারকে ডেকে বললাম, প্রথমে ভর্তা-ভাজিগুলোর নাম ধীরে ধীরে বলে যাও, যাতে যার যা পছন্দ মনে-মনে ঠিক করে নিতে পারি। ছেলেটি হেসে তার দীর্ঘ খাদ্যতালিকা আউড়ে গেল। এবারে আমার পছন্দের ভর্তা লিস্ট কর—চিংড়ি, বেগুন, আলু আর এরা তো শুঁটকি বলবেই—ওটাও আমিই বলে দিচ্ছি। তিত্ করলা ভাজা দেবে দু’বাটি—আর কেউ না খেলে আমিই খাব। পাতলা মসুর ডাল। ব্যস। রুবি, ছেলেমেয়ে রূপচাঁদার ঝাল দোপেঁয়াজা আর মুরগির কারি বলল। দৈ আছে কি? না স্যর, দধি আর লইট্টা ফ্রাই শেষ হইয়া গেছে। ঠিক আছে। চলবে।

হোটেলে ফিরে ঘণ্টা দুইয়ের একটি নিটোল ভাতঘুম সারা হল। রুবি জানালো, ছেলেমেয়েরা বীচে। চা-টা’ একসঙ্গে ওখানেই খাওয়া যাবে। ঢিলেঢালা ভাবে হেঁটে বীচে পৌঁছে একটু ফাঁকায় দেখি, ভ্যানের ওপরেই স্টোভ জেলে একটি ছেলে কী যেন ভাজাভুজি করছে। ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে দু’তিনজন। এগিয়ে গেলাম। রুবি যথারীতি একটা বীচ চেয়ারে লম্বা হল। সৈকতে সূর্যাস্ত দর্শনকামী মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটছে ধীরে। আলাপ জুড়লাম। আপনারে জাপানি সা’ব মনে করসিলাম, ছেলেটি জানাল। সকালে সে কোন রেস্তোরাঁয় পরিচারকের কাজ করে। বিকেলে সৈকতে এই ওপ্‌ন-এয়ার স্ন্যাকশপ চালায়। উদ্যোগী ছেলে বটে! বেসনে ডুবিয়ে ভাজা চিংড়ি খেয়ে বুঝলাম, ওর এলেম আছে ঠিকই! টিশার্ট-শর্ট্স-টুপি-কেড্জ পরা জাপানি সাহেবকে ওই জিনিস খেতে দেখে ভিড় জমল। অনেকেই একটা দু’টো চেখে দেখতে চাইল। ভাজাওয়ালা খুশি হয়ে আমাকে জানাল, এবারে একটা স্পেশ্যাল নাশ্‌তা সে আমাকে খাওয়াবে।

রুবি উঠে এসে পোয়ামাছের ফ্রাই নিয়েছে। ওর চিংড়িতে এলার্জি। মুঠোফোনে খবর পেয়ে ছেলেমেয়েরা উপস্থিত। সবারই মুখ চলছে টুক্টাক। ইস, উহ্ ইত্যাদি উষ্ণতা, ঝালস্বাদ জ্ঞাপক ধ্বনিও শোনা যাচ্ছে দেদার। ভ্যানের নিচের তাক থেকে এবার বেরল বড় এ্যালিউমিনিয়ামের বাটিভর্তি জেলির মতো দেখতে এক মিশ্রণ। এইটা হইল স্যর লইট্টা—ম্যারিনেইডে দিছি সকালে। ফুটন্ত ডোবা তেলে সে কাঁটাচামচে গেঁথে এক একছড়া ম্যারিনেইডে মজানো লইট্টা ফেলে, আর চচ্চড় শব্দে ভাজা হয়ে যায়। প্রথম প্লেইটটা ও আমার হাতে তুলে দিলে আমি মন্তব্য না করে নাকের কাছে তুলে ধরি। ভুরভুর করে স্বাদু ভাজাচিংড়ির সুগন্ধ! মুচ্মুচে ওই ভাজা অতঃপর সকলেই চায়। পৌনে এক ঘণ্টায় ওর বেচাবিক্রি শেষ!

সূর্য মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ায় ক্যামেরা তাক্ করা তরুণের দল কিছুটা যেন নিরুৎসাহ। কত বেচলে হে? উৎসুক প্রশ্ন আমার। আপনের জন্যই আইজ আমার সব মাল সন্ধার আগেই শেষ, ছেলেটি হাসিমুখে ওর চালচুলো গোছগোছ করতে করতে বলে। অফ সিজিনে আইজকা সবচে বেশি বেচ্ছি। আটশোর উপ্রে অইবো। ভেরি গুড, আমিও খুশি হই। তোমার সংসার কত বড়? মা-বাবা আর আমরা চাইর বাই—এই সংসার আমাগো। বাবা, মা আর আমি কাজকাম করি। বাইগো ইস্কুলে পড়াই। বাসা বাড়া দেই তিন হাজার টাকা। মনে মনে ওকে স্যালিউট করে আমরা ততক্ষণে আলো জ্বলে ওঠা বীচের চা-খানার দিকে পা বাড়াই। আলাপের ফাঁকে জেনেছি, এই তরুণও রোহিঙ্গ্যা জাতক।

ওপ্‌ন-এয়ার ক্যাফের বাইরের দিকে প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসা হল। বড় বড় রঙীন হরফে লেখা হরেক রকম স্ন্যাকের নামগান—যার মধ্যে চিকেন-এগ্ মোগলাই আমার নজর কাড়ল। ওয়েটারকে বললাম, ওই জিনিস গোটা দুই ভাল করে ভেজে কেটেকুটে নিয়ে এস তো! আমার চা-টা চিনি বাদ দিয়ে করবে। রুবি, রুবাই, সাজ্জাদ—সবাই দু’এক টুকরো পরোটা চেখে দেখল। মন্দ নয় একেবারে। সাজ্জাদকে বললাম, তুমি তো টুপি-সানগ্লাস আননি। চল, ওই দোকানে, পছন্দ হলে নিয়ে নেবে। সে ছেলে এড়িয়ে গেল। ওর এসব দরকার হয় না। শীতের দিনে ভোরবেলা গিজার না চালিয়ে কন্‌কনে ঠাণ্ডা জলে ওর স্নান করার কথা শুনে দু’বছর আগে মনে-মনে চম্কে গিয়েছিলাম। এখন বুঝি, ওর এই বয়সে এরকম আচরণ খুবই স্বাভাবিক, স্বাস্থ্যপ্রদও বটে!

eco-resort-e-taja-panio-shamne.jpg……..
ইকো রিজর্টে, সামনে তাজা পানীয়
……..
সাজ্জাদ যখন ওর এমবিএ-র জন্য ডাচবাংলা ব্যাঙ্কে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করছিল, তখন ওর এক সহকর্মী ইউনুস আমাদের বাসায় এসেছিল। অত্যন্ত সদালাপী ছেলে। চট্ করে যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। বিজনিস ম্যানেজারদের ওরকম গুণ থাকলে পেশায় শনৈঃশনৈঃ উন্নতি অবশ্যম্ভাবী বলা যায়। তো সেই ইউনুস নাকি এখন কক্সবাজারে কেয়া কজমেটিক্সের সেইল্‌জ অধিকর্তা হয়ে এসেছে। রুবাইদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ হয়েছে। ওরা হোটেল সীগালের বার-বি-কিউ জয়েন্টে আড্ডা দিতে যাবে। তা যাক্। রুবি আর আমি হোটেলে ফিরলাম। হাতমুখ ধুয়ে দু’ফোঁটা ভড্কা মেশানো জল আর বার্বিকিউ চানাচুর নিয়ে বসে ‘দেশ’ পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলাম। অহো, কী শান্তি। ছেলেমেয়েরা রুবিকে ফোন করেছে। ওদের কথা শুনে সে জানালো, তুমি যদি নিয়মমাফিক রুটি খেতে চাও, তাহলে ওরা আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসবে। ঠিক আছে, তাই খাব। বলে আমি দেশের গল্পে ডুব দিই আবার। এসংখ্যায় একটি সারপ্রাইজ রয়েছে। দু’টি নিয়মিত ছোট গল্প তো আছেই, উপরি পাওনা হচ্ছে তৃতীয় আরেকটি গল্প! এ যাত্রায় ক্যাপ্টেন কক্সের বাজারে বেড়াতে এসে মেলাই চমক্ মিলছে। অধিকাংশই প্লেজ্যান্ট আবার!

শনি-রবিবার রাত ৯:৪৫ মিনিটে দেশ টিভির সম্প্রচার যাও পাখি দেখলে মনটা ভরে যায়। এখানে বিদ্যুৎ যাবার ভয় নেই। মিডিয়া হোটেলে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুতের সরবরাহ কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। অতএব নিশ্চিন্তে গুছিয়ে আমরা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বহেরু চরিত্র উন্মোচনের পর্ব ৮২ উপভোগ করতে বসলাম। বিজ্ঞাপন বিরতির সময় হৈ হৈ করে রুবাই, সাজ্জাদ এসে গেল। আমাদের ডিনারের পোঁটলা রেখে চুপচাপ নিজেদের ঘরে চলেও গেল। আমাদের বাড়িতেও এরকম হয়। আমি যেহেতু সারা সপ্তাহে এই দু’বার মাত্র আধঘণ্টা করে টিভির অনুষ্ঠান দেখি, বাড়ির কেউ ঐসময় আমার বিরক্তির কারণ হতে চায় না। আমি অবশ্যই এজন্য ওদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকি। যাও পাখি দেখা সাঙ্গ হলে রুবি ওদের ডাকল। খেতে খেতে পারিবারিক আড্ডা জমিয়ে তুললাম সকলে মিলে। ছেলেমেয়েরা সী মেইড ট্যাভার্নের অতিথি, অভ্যন্তরীন সজ্জা, সার্ভিসের গুণাগুণ বর্ণনা করল। ছ্যাঁকাপোড়া, গ্রিল্ড কেবাব জাতীয় খাবার আমি সাধারণতঃ এড়িয়ে চলি। তবে ওদের নিয়ে আসা সামুদ্রিক মাছের বটি কাবাব আর তান্দুরি চিকেনের সঙ্গে বার্টাড নান খেতে ভালই লাগল। সেকথা জানাতে রুবাই-সাজ্জাদ অত্যন্ত খুশি হল দৃশ্যতঃই। ওহ্, বাচ্চারা! বিদেশে গিয়ে থাকবে কী করে!

সকালে উঠে জলটল খেয়ে, বাথরুম সেরে দরজা টেনে দিয়ে সামনের বারান্দায় চলে গেলাম। টানা এক ঘণ্টা সমুদ্র দেখতে দেখতে দ্রুত পায়চারি করে, ঘাম ঝরিয়ে ঘরে ফিরে দেখি, রুবি তৈরি। দু’জনে দোতলার রেস্তোরাঁয় নেমে গেলাম। না জানি আজ কী চমক রয়েছে কপালে… ভাবতে ভাবতে পরোটা-ডাল-ডিমভাজা নিলাম। তরুণ বয়সে জেনেছিলাম, দ্য আর্মি এ্যাকচ্যুয়ালি মার্চেজ অন ইট্স বেলি। তাই পেটপুরে নাশতা সেরে কফিপান শেষে বেরিয়ে এলাম। রুবি ওদের ঘরে ব্রেইকফাস্ট কুপন দিতে গেল। আধঘণ্টা পর রুবাই জানাল, ওরা রিকশা ঠিক করে আমাদের জন্য লবিতে অপেক্ষমান। রুবি ঝোলায় জলফল ভরে নিল। পোর্টিকো আলো করে উজ্জল নীল রং-এর ঝক্ঝকে ই-রিকশা দাঁড়িয়ে। পাশে হাস্যমুখে সাজ্জাদ-রুবাই। হ্যাভ আ নাইস এ্যান্ড সেইফ ট্রিপ, স্যর। মর্নিং শিফটের ডিউটি ম্যানেজার আমাদের বিদায় সম্ভাষণ জানায়। থ্যাঙ্ক ইউ, ভাই, জানি না কোন্ নিরুদ্দেশে এরা আমাদের নিয়ে চলেছে, বলে আমি পরম নিশ্চিন্তে সিগ্রেট ধরাই।

এপথেই তো গতবার হিমছড়ি গেলাম মা, তাই না? আমার প্রশ্ন শুনে মেয়ে মিটিমিটি হেসে ওর বরের দিকে তাকায়। সাজ্জাদ বলে ওঠে, এবারে আপনাদের আমরা হিমছড়ির পথে দু’দুটো আগে-যান-নি এমন জায়গায় নিয়ে যাব। গুড, বলে ডানদিকে তাকাতেই আমার বাকরোধ হল। এই দু’দিন ধরেই দেখছি সমুদ্র অত্যন্ত চপি, অস্থির আর ঝোড়ো বাতাসে উদ্বেল। ঢেউ এসে এত কাছে ভেঙে পড়ছে দেখে ভয় ভয় লাগলেও ভাল লাগছিল। মেঘলা সকাল। বাতাসের গন্ধে একটু যেন বৃষ্টিভেজা ভাবও রয়েছে। আধঘণ্টা চলে পৌঁছলাম মারমেইড ক্যাফে-তে। বাঁ দিকে বাঁশ, বেত আর খড়ে তৈরি সব ছাউনি—চা-কফি, তাস-দাবা খেলার ব্যবস্থা, মায় স্নুকার টেবিলও রয়েছে একটি চারধার খোলা চালার নিচে। ফলভরা টুক্রি সামনে। অনবদ্য। যে তরুণের দল এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, তারা একলজির পাঠ-টাঠ নিয়েই কাজে নেমেছে, মনে হল। মুগ্ধ হলাম দেখে। রাস্তা পেরিয়ে একেবারে উত্তাল সমুদ্রের মুখোমুখি পাতা কাঠের বেঞ্চিতে বসলাম। মাথার টুপি চেপে ধরে রাখতে হল। উদ্দাম হাওয়া। পথে এরকম কয়েকটি জায়গাতে দেখেছি, ফৌজি এঞ্জিনিয়ারিং কোরের সৈনিক ও প্রকৌশলীরা কংক্রিট ব্লক, মোটাদানার বালুঠাসা ক্যানভাসের বড় বড় বালিশের দেয়াল তুলে ভাঙন ঠেকাতে ব্যস্ত। সাজ্জাদ, রুবাই, রুবি ব্লকগুলো অনড় ভেবে ঢেউয়ের একেবারে কাছে যেতে গিয়ে ঢেউয়ের সগর্জন ঝাপটায় পা ও পোশাকের একাংশ ভিজিয়ে ফিরে এল হাসতে হাসতে।

seafood-televaja.jpg……..
সীফুড তেলেভাজা
……..
কোন প্রশ্ন না করলেও আমি বুঝতে পারছিলাম, পরবর্তী গন্তব্য মারমেইড একো-রিজর্ট। ডেইলি স্টার পত্রিকার লাইফস্টাইল ম্যাগাজিনে বেশ কিছুদিন আগে এদের বিষয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন পড়েছিলাম। ছবি থেকেই বুঝে গিয়েছিলাম, বান্দরবানে গাইড ট্যূরের হাসান ভাই যেমন টিলার গায়ে ছবির মতো চাকমা কটেজ, মারমা ভিলা তৈরি করেছেন এক দশক আগে, তেমনি এরাও স্থানীয়ভাবে লভ্য নির্মাণসামগ্রী দিয়ে একলজিক্যাল অতিথিনিবাস গড়ে তুলেছে। কাজেই, সাগরতীরে মারমেইড কর্তৃপক্ষ কী করছেন, সেটা প্রত্যক্ষ করার ইচ্ছে ছিলই। রিকশা-চালক জায়গাটা চেনেন না ঠিক, আমাদেরই মতো এর ওর কাছে যা শুনেছেন, তারই ভরসায় নিয়ে চললেন আমাদের।

এবারে আমি মেয়ের পাশের আসনে বসে কক্সবাজার উপকূলরেখায় অলস নজর রেখেছি। সাজ্জাদ সামনের দিকে কিছু একটা সাইন-টাইন দেখতে পেয়ে চালককে থামতে বলল। নেমে আমরা সোৎসাহে ডানে নেমে ফজলুর রহমান, কেয়ারটেকার অব দ্য প্রজেক্ট-এর সঙ্গে পরিচিত হলাম। উনি জানালেন, চল্লিশ লাখ টাকা বিঘে দরে উনি প্রকল্প উদ্যোক্তাদের ১৩ বিঘে জমি এখানে যোগাড় করে দিয়েছেন। এই উপকারের বিনিময়ে উনি চাকরি পেয়েছেন। উঁচু নিচু জমি, সাঁকো পেরিয়ে ঘেমে নেয়ে প্রায় সাগর তীরে পৌঁছে দেখলাম, একসারি বাক্সের মতো ঘর—ভারতে হাইওয়ে ধাবাগুলোতে যেমন সারিবদ্ধ সেতখানা থাকে—তেমনি দাঁড়িয়ে। ওগুলো নাকি স্টাফ কোয়ার্টার্স! ন্যূনাধিক পাঁচ বাই সাত ফুটের খুপড়ি সব। রুবাই কিছুক্ষণ ছবি-টবি খ্যাঁচাখেঁচি করে আমাকে গম্ভীরভাবে জানাল—এটা মোটেই সে মারমেইড রিজর্ট হতে পারে না! আমি স্মিত হেসে বললাম, তা তো বটেই। কিন্তু এই যে একটু ওঠানামা, হাটাহাঁটি—জ্যৈষ্ঠের ভাপ ওঠা প্রাক-দুপুরে খানিকটা ঘাম ঝরল সুখি, আয়েসি মানুষগুলোর—তাই বা মন্দ কী? সেকথা শুনে আমার একটু-অলস মেয়েটা অসন্তোষ প্রকাশ করল রীতিমত। একটু পরে রিকশায় উঠে দামাল হাওয়ার দমকে রুবাই পুনরায় উজ্জীবিত। আরো কিলোমিটার দুয়েক যাওয়ার পর ডানদিকে রিজর্টের সাইন এবারে কাউকে ফাঁকি দিতে পারল না।

নেমে ফ্রন্ট অফিসে রিপোর্ট করতে একজন গাইড আমাদের সঙ্গী হল। যুবকটি সোৎসাহে বিভিন্ন ধরনের বাংলো, লভ্য সুবিধাদি দেখিয়ে ওপ্‌ন-এয়ার ক্যাফেতে বসাল আমাদের। আমার জন্য আনারসের জুস, রুবাইয়ের জন্য আম এবং সাজ্জাদ আর রুবির জন্য টাট্কা ডাবের জল বলা হল। সবশেষে কফি খাব জানালাম। নানারকম ফলের গাছ চারদিকে বেড়ে উঠছে। নারকেল বীথির ছায়ায় বসে গ্যাঁজাতে খুবই ভাল লাগছিল। দু’টো খোড়ো চালের বাংলোর মাঝখানে নীলচে সূর্যভাঙা বঙ্গোপসাগরের ঢেউ হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। নীল-কালো রং করা দু’টো সাম্পান এদের ঘাটে বাঁধা। এখানকার অতিথিরা সকালে এঞ্জিনচালিত সাম্পানে চড়ে মাঝের ব্যাকওয়াটার ল্যগুন পেরিয়ে, ঐ দূরের ঝাউয়ের সারি ঘুরে ওদিককার বীচে দিন কাটিয়ে আসতে পারেন। সেখানে নগ্নদেহে রৌদ্রস্নান, বীচ বার্বিকিউ, স্নরকেলিং, সার্ফিং-এর ঢালাও ব্যবস্থা রয়েছে, গাইড ছেলেটি বলল।

এবারে ফেরার পালা। এমন চমৎকার একটি একোফ্রেন্ডলি অর্ধদিবস উপহার দেবার জন্য রুবাই-সাজ্জাদকে প্রকাশ্যেই কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানালাম রুবি, আমি। ফেরার পথে ফৌজি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত অতিথিশালায় নেমে একটু খোঁজ-খবর নিলাম। কোন্ অফিসের আধিকারিক এখানকার ৭টি কক্ষের বুকিং নিয়ন্ত্রণ করেন, সেটা জেনে নিলাম। মিলিয়ে দেখলাম, সাজ্জাদ আর রুবাই বেড়াতে এসে এবিষয়ে যে তথ্যাদি সংগ্রহ করেছিল, সেটা ঠিকই ছিল।

আজ পুরনো ঝাউবন রেস্তোরাঁয় খাব ঠিক করেছিলাম। অতএব, দু’টো নাগাদ সেখানে পৌঁছে গেলাম। বেয়ারা অভ্যর্থনা জানিয়ে ভেতরে ফ্যামিলি রুমে নিয়ে বসাল। এখানকার লইট্টা ফ্রাই ও মশুর ডাল আমার সবচেয়ে পছন্দের খাবার ছিল ২০০৭ সালে। আমার জন্য তাই বলা হল। নানারকম ভর্তা, করলা ভাজি, বীফ ভুনা ইত্যাদি মিলিয়ে-মিশিয়ে খাওয়া হল। লইট্টা ভাজায় সেই চিংড়ির স্বাদ পেলাম না। ডালটাও কেমন বৈরসা ঠেকল জিভে। দৈ খোঁজা হল। বাইরে এসে রিকশায় ওঠার পর পাঁচ কাপ দৈ দিয়ে গেল কেউ।

হোটেলে ফিরে দৈ খেয়ে কিছুটা স্বস্তি মিলল। ঘুমিয়ে পড়লাম। কখন বিকেল পেরিয়ে সন্ধে নেমে গেছে। রুবি ডেকে ডেকে হয়রান। আমি চোখ মেলে আবার বুজঁতেই ঘণ্টা পার। অবশেষে শয্যাত্যাগ করে সামনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। নিচে আলোয় আলোময় টুকিটাকি দোকানপশার। ভাঁটার সমুদ্র দূরে অপসৃয়মান। ঢেউয়ের শব্দ তাই দূরাগত, আবছা। পর্যটকেরা ঘরে ফিরছে। সঙ্গে বাচ্চা, সওদা, ভিজে পোশাক, খাবারের ক্যারিব্যাগ। সাজ্জাদ, রুবাই আর কেয়া কজমেটিক্সের ইউনুস ডেক চেয়ারে বসে উদ্দাম লোনা বাতাস গায়ে মেখে আড্ডায় মগ্ন। ঘরে ডাকলাম ওদের, চা আর ফ্রেঞ্চফ্রাই এসে গেছে বোধহয়, এস তোমরা, জয়েন আস্। জলখাবার আর ওদের আগমন যুগপৎ ঘটল। ফ্রেঞ্চফ্রাইটা অত্যন্ত প্রপার কোয়ালিটির—মুচমুচে, শুকনো, গোলমরিচ মাখানো। রুবি প্লেইটে আপেল, ক্রীম ক্র্যাকার্স বিস্কিট এগিয়ে দিল। চা খেতে খেতে তুমুল আড্ডা হল। ফাঁকে-ফাঁকে আমি দেশ পত্রিকাও একটু একটু পড়ছি। নিশ্ছিদ্র পারিবারিক রঁদেভূ যাকে বলে।

কেয়া কজমেটিক্সের হৃত বাজার পুনরুদ্ধারের এক্সাইটিং নানা এপিসোড শোনাল ইউনুস। এদিকে যাও পাখি-র সময় হয়েছে। বহেরু গ্রামের ইতিকথা প্রত্যক্ষ করার আগে রুম সার্ভিসে ফোন করে আমাদের জন্য রুমালি রুটি, তরকারি, গ্রীন স্যালাড দিতে বল্লাম। নাটক দেখতে দেখতে হালকা ডিনার সারা হল। পরদিন দুপুর ১২:৩০-এ ফেরত বাসযাত্রা। আমি পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে সকালে দু’ঘণ্টা ছুটি চেয়ে রাখলাম। যেহেতু তেমন বিশেষ কোন গন্তব্য নেই এবং সমুদ্রের প্রায় কোলেই আমরা দিন দুয়েক যাবৎ বাস করছি এবং আরো যেহেতু রুবাই সাজ্জাদ দিনে-রাতে যখন খুশি সাগরপানে, এদিক সেদিক ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতে পারছে স্বচ্ছন্দে—সেহেতু আমাকে ছুটি দিতে দেখলাম কারো আপত্তি নেই।

সকালে হাঁটাহাটি শেষ করে রুবি আর আমি ব্রেইকফাস্ট পর্ব সেরে রুমে ফিরলাম। স্নান সেরে পোশাক পাল্টে বেরিয়ে পড়লাম একা। বহুদিন বাদে কক্সবাজার টাউনের হাইরোডে গেলাম। চল্লিশ বছর আগে এই সড়কের দু’পাশেই ছিল যাবতীয় কাজকর্মের আয়োজন ও সজ্জা। মানুষের ভিড় বেড়েছে শতগুণ যেন। ফুলুদা’র বাড়িটা অবশ্যি তেমনি রয়েছে। সোমেশ্বর চক্রবর্তী, অবসর প্রাপ্ত অধ্যাপক লেখা মার্বেল ফলকটিতে ঘিয়ে রং ধরেছে। বাগানে অবহেলার ছাপ স্পষ্ট। বৈচিত্র্যের অভাব লক্ষণীয়। বাংলোর বারান্দায় উঠে হাঁক দিলাম, ফুলুদা, বাড়ি আছ?

কে রে? বলতে বলতে পর্দা সরিয়ে সৌম্যদর্শন কাঁচাপাকা একমাথা কোঁকড়াচুলো অধ্যাপক বেরিয়ে এলেন। শেলফ্রেমের চশমার ভেতর উজ্জ্বল চোখজোড়া যেন হেসে উঠল। আরে মাও সে তুং, তুমি কোত্থেকে? খবর নেই, ফোন নেই। চুপচাপ ওদিক দিয়ে এসে আবার ওদিক থেকেই কেটে পড়ো। একবার বেলাভূমির সোমেন চন্দ বলেছিল বটে, ওয়ালীভাই শহরে। আপনার এখানে তো একবার আসবেন বলেছেন। আমি মাথা নিচু করলাম। স্যরি দাদা, তোমার উপস্থিতি উপেক্ষা করে চলে গেছি। ক্ষমা করে দিও। বলে আমি শুঁড়তোলা বিদ্যাসাগরী চটিমোড়া পা ছোঁবার জন্য কোমর ভাঙতেই ফুলুদা হা হা করে উঠলেন। আমার দু’কাঁধ ধরে টেনে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। চোখ ফেটে অনেকদিন পর অশ্রুবিন্দু বাধাহীন বেরিয়ে এল। ওর কাঁধে মুখ রেখে আঙুল ছুঁইয়ে চোখের জল নিয়ে নিলাম। চল্, ভেতরের ড্রইংরুমে বসি। আজকাল বয়স হয়েছে তো, জোলো হাওয়া সয় না শরীরে।

বেতের সোফায় গা এলিয়ে দিলাম। ড্যানসেট রেকর্ড প্লেয়ারে আরসিএ ভিকটর কোম্পানীর ৭৮ আরপিএম-এর কালো ভিনাইল রেকর্ড বাজছে। ‘ডেইলাইট কাম… মি ওয়ান্না গৌ হৌম… হ্যারি বেলাফণ্টে! ১৯৫৬ সালে রেকর্ডকৃত গান। অমর কণ্ঠে গীত সেই ব্যনানা বৌট সঙ কতকাল পরে শুনলাম। হ্যারির ক্যালিপ্সো গাওয়া কণ্ঠে উচ্চারিত ‘ট্যালিম্যান’-কে একালে অনেকে ‘তালিবান’ ভেবে নিয়ে বলেন, সেই ৫০-৬০ বছর আগেই তালিবানদের কীর্তি ঐ ক্যারিবীয় গানে গানে বিবৃত হত! দৃশ্যতঃই বোঁচানাক বর্মী থামি পরিহিত এক বালিকা আমাদের জন্য একটি ছোট্ট ট্রেতে বয়ে দু’টি বড় মগভর্তি কাল কফি নিয়ে এল। অন্দরে কে কে আছেন, সেসব খোঁজ নিলাম না ইচ্ছে করেই—আমারও তো বয়স হয়েছে। পঞ্চাশোর্ধে বনং ব্রজেৎ… এখনো যে সভ্য (?) ও সুশীল সমাজ আমার মতো মানুষকে সহ্য করছে—এই আমার পরম সৌভাগ্য!

বালিকা দ্বিতীয় বারে নিয়ে এল গরম-গরম কুচো নিম্‌কি। পরে আম কেটে দেব, দাদু, রিন্রিনে কণ্ঠে কথা ক’টি বলে সে ভারি পর্দা ঠেলে ভেতরে চলে গেল। আহা, পর পর পছন্দের সব রেকর্ড—স্যান্টানার ব্ল্যাক ম্যাজিক উম্যন, গুয়াজিরা, আই এইণ্ট গ্যট নৌবাডি, নীল ডায়ম্যন্ডের হট অগাস্ট নাইট এ্যালবামের সং সাং ব্লু… আরো কত সব গান বাজিয়ে শুনলাম। ফুলুদা খুব ইনজয় করছিলেন। কতদিন পরে এলে, বন্ধু আমার… একবার উদাত্তকণ্ঠে গেয়ে উঠলেন। উঠতে হল। আবার আসব বলে বিদায় নিলাম। বুকের ভেতর টন্টন্ করে উঠল। মাসিমা, মেসোমশাই, বোন, বউদি, ছেলেমেয়ে—এসব বিষয়ে উনিও কথা তুল্লেন না, আম্মো চুপ।

মিডিয়া হোটেলে ফিরে রিসেপশ্যনে আমি বিল মেটাতে মেটাতেই পরিবারের সদস্যরা সবাই নেমে এল। যথারীতি ফ্রন্ট অফিস ম্যানেজারদের ধন্যবাদ জানালাম। হাতে হাতে একটি করে লাল গোলাপ ও এক ক্যান ম্যাংগোজুস মিলল। গুডবাই টোকেন হিসেবে। হৃষ্টমনে রিকশা চেপে আধকিলোমিটার দূরে সমুদ্রতীরে সউদিয়া-এস আলমের এমবার্কিং স্টেশনে হাজির হলাম। কাঁটায় কাঁটায় দুপুর ১২টা। রুবাই-সাজ্জাদ আমার হাতে নেসক্যাফের দুধচিনি মিশ্রিত তৈরি কফির কাপ ধরিয়ে দিয়ে উদ্দাম হাওয়ার সঙ্গে যুঝতে এক মিনিট দূরের সৈকতমুখো হল। রুবি, আমি বাস ক্যম্পানির অফিস-কাম-প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জে বসে কাচের আড়াল থেকে ঢেউয়ের আছড়ে পড়া দেখতে দেখতে অপেক্ষমান যাত্রীদের সঙ্গে আলাপচারি চালিয়ে গেলাম। ১২-১৫ মিনিটে ঢাকাগামী স্টেইট-অব-দ্য-আর্ট মার্সেইডিজ-বেন্জ কৌচ এসে দরজার সামনে দাঁড়াল। লাগেজ হোল্ডে ব্যাগট্যাগ তোলা হল। চুলটুল এলোমেলো অবস্থায় রুবাইরা ফিরে এসেছে। সবাই বাসে উঠে নির্ধারিত আসনে বসে পড়লাম। অনেক ক’টা পরিবার সহযাত্রী। বাচ্চা যাত্রীদের কিচিরমিচির শুনতে ভাল লাগছিল। আকাশে মেঘ ছিল সকাল থেকেই। হঠাৎ চারদিকে যেন আঁধার নেমে এল। ঝম্‌ঝম্ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।

বাস ঠিক সাড়ে বারটায় কক্সবাজার ছাড়ল ঠিকই, কিন্তু মুষলধারে বৃষ্টির কারণে দেখেশুনে নিরাপদ গতি বজায় রেখে এগোতে লাগল। আসন পেছনে হেলিয়ে চোখ বুঁজলাম। কানে বাজছিল ভেসে এল, ‘কম, মিস্টাহ টালিম্যন, টালি ম্য বানানা …’। ঘুমের আমেজ কেটে গেল। চকোরিয়ার ইনানী ইনের কম্পাউন্ডে বাস দাঁড়িয়েছে। দ্বিপ্রাহরিক আহার সারতে যাত্রীরা তাড়াহুড়ো করে নামলেন। বৃষ্টি কিছুটা ধরলেও থামেনি একেবারে। আমি করলা ভাজা আর ডাল-ভাত খেলাম চারটি। ওরা মাছ, মুরগির সঙ্গে ডাল-ভাত। বাসে উঠে ঘুম দিলাম। অনেকেই পাতলা কম্বলে শরীর ডেকে নিদ্রার আয়োজনে ব্যাপৃত। বৃষ্টির কারণে ভেতরের কুল আবহ কুলার মনে হচ্ছিল। মাঝে মাঝে চোখ মেলে বুঝতে পারছিলাম, বাসের গতি তেমনি মন্থর; কারণ, বৃষ্টি পড়েই চলেছে। সড়ক ভেজা, রোডসাইড বিপজ্জনক ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ—খানাখন্দ তো রয়েইছে।

চিটাগাং পৌঁছে বাসের পেছনের একটি চাকা বদলাতে ব্যস্ত হল ক্রু। চা খেয়ে সড়কের ওপারে সুমির হটকেইক-এ হানা দিলাম। প্রায় সব খাবারই শেষ এই ভরা সন্ধেবেলায়। দু’টো করে হটডগ আর বীফর্বাগার পেলাম ভাগে। বাসে উঠে তাই রেলিশ করে সেবা করা হল। বাস ছাড়ল। যাত্রীদের অনেকেই বাড়িতে খবর দিচ্ছেন, দিনভর বৃষ্টির জন্য আমাদের পৌঁছতে দেরি হচ্ছে। অনেকে দশটা-এগারোটা নাগাদ ঢাকা শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে যার যার বাড়ি যাবার গাড়ি রাখতে অনুরোধ জানিয়ে রাখলেন। বাস্তবে যেটি ঘটল—চৌদ্দগ্রাম হাইওয়ে ইন-এ ইন্ করতেই রাত সাড়ে-দশ হয়ে গেল। সেখানেও আরেক দফা স্ন্যাকসেবন কফিপান হল। বেশ রাত হওয়ার সুবিধে পেলাম আমরা কাচপুর ব্রিজে ওঠার পর। একেবারে ফাঁকা রাস্তা। যানজট নেই মোটে। একটানা চলে শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ি হয়ে শহরের দু’তিনটে জায়গায় যাত্রীদের অনুরোধে তাদের মালপত্রশুদ্ধ নামিয়ে দিয়ে কেবল আমাদের চারজনকে নিয়েই পান্থপথের মাথায় ওদের অফিসের সামনে বাস চাক্কাজ্যাম করে দিল।

আমরা রাত সাড়ে বারোটায় ট্যাক্সি পেয়ে অবাক হলাম। দশ মিনিটে বাড়ি পৌঁছে চালককে ধন্যবাদ জানিয়ে গৃহপ্রবেশ করলাম। রুবি সযত্নে ভাত, ডালসেদ্ধ, ডিমের কারি তৈরি করে টেবিলে দিয়ে দিল আধঘণ্টার মধ্যে। পাবনার লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের গব্যঘৃত সহকারে সেই হোমস্পান সাপার খেতে বসে অমৃতের স্বাদ পেলাম। মেয়ে, জামাই, স্বামীকে খাইয়ে নিজে চারটি ডাল-ভাত খেয়ে রুবি বিছানা নিল। গত তিনদিনের খবরের কাগজ নেড়েচেড়ে কিছুক্ষণ পরে আমিও চিত হলাম। ওম্ শান্তি। দেয়া’জ নোউ প্লেইস লাইক হৌম! চোখ জড়িয়ে আসার আগে ভাবছিলাম, এযাত্রায় চমক অর্থাৎ আনএক্সপেক্টেড এলিমেন্টের কমতি ছিল না যেমন—তেমনি শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে—সেরেনডিপিটির বিস্ময় ও আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতাও হয়েছে প্রচুর, বেশুমার।

m.waliuzzaman@gmail.com

free counters

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহবুব — আগস্ট ৬, ২০১০ @ ৭:২৯ অপরাহ্ন

      বরাবরের মতোই দারুণ লাগলো। দারুণ খাদ্যরসিক মনে হচ্ছে আপনাকে!

      – মাহবুব

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com