জীবনের পাতায় পাতায় (২)

বেবী মওদুদ | ১০ জুলাই ২০১০ ৭:২৪ অপরাহ্ন

কিস্তি ১
——————————–
স্মৃতিকথা ধারাবাহিক
——————————–
(কিস্তি ১-এর পর)

কলকাতায় আমার জন্মের পর মা আমাকে বেবী জনসন পাউডার মাখাতেন। সেটা দেখে আমার বড় ভাই আমাকে বেবী বলে ডাকতে শুরু করে। আমার ডাক নাম হয়ে যায় বেবী। তবে আকিকা দিয়ে বাবা আমার নাম রাখেন আফরোজা নাহার মাহফুজা খাতুন। এত বড় নাম আমার ভালো লাগতো না বলে বড় হয়ে লেখালেখি করতে এসে আমি নিজেই আমার নাম বেবী মওদুদ রাখি। পরে অবশ্য এজন্য অনেক বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে, সেকথা পরে বলবো।

bm-letter.jpg…….
লেখকের মাকে লেখা বাবার চিঠি, ১৯৪৩
…….
আমার বাবা ও চাচারা ধুতি পরতেন। কলকাতা ছেড়ে আসার পর তিনি সবসময় পাজামা-পাঞ্জাবী এবং ঘরে লুঙ্গি পরতেন। তখন অবশ্য বাঙালি মাত্রই ধুতি, লুঙ্গি, পাজামা পরতেন। সেখানে হিন্দু-মুসলমান বলে কোনো দ্বন্দ্ব ও চিহ্নিত-করণ ছিল না। এখন অবশ্য ধুতিপরা মানুষ দেখাই যায় না। আমার বাবার কাছে শুনেছি তিনি সাড়ে তিনটাকা দরে ধান বিক্রি করেছেন। আমার মায়ের বাজারের খাতা খুলে দেখলাম, তিনি দুই আনা দরে গরুর গোস্ত, পাঁচ আনায় চার সের চাল, এক আনায় মাছ কিনেছেন। চাল ও পিয়াজ-রসুন গ্রাম থেকে আসতো।

আমার মায়ের মৃত্যুর পর তার সঞ্চয়ে কোনো অর্থ, গহনা, দামি শাড়ি পাইনি। কিন্তু পেয়েছি তার কাছে বিবেচিত যে পরম সম্পদ, তাহলো মাকে লেখা বাবার কিছু চিঠি, বাজার ও ধোবার হিসাবের খাতা, রান্নার রেসিপি লেখা, সিঙ্গার সেলাই মেশিনটি। আর পেয়েছি কলকাতায় কেনা আমার পড়ার টেবিল। বাবার লেখা চিঠিপত্রের কিছু কথা এখানে তুলে দিলাম।

bm-17.jpg…….
বেবী মওদুদ, কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্রী, ১৯৬৪
……..
২৮.১১.১৯৩৯ সালে বিয়ের পাঁচ মাস পর আমার মাকে লেখা চিঠি। বাবা শ্রী রামপুরে বদলি হয়ে যান। চিঠির কথা: “তোমার কাছ থেকে নিরাপদে এসেছি ও ভালো আছি। রাঁধুনী এসেছে। সে দেখতে খালেকের মামার মতো। এ ছোকরাকে খালেক জানে কারণ খালুজী যখন মধুপুর যাবার যুক্তি করেছিলেন সে সময় তিনি এই ছোকরাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এর বাড়ি মাড় গাঁয়ে। তোমাদেরই দেশে। মাহিনা সাত টাকা নেবে। কেমন রাঁধে, কাজ করে পরে জানাবো।”

চিঠি-২
২৭.০৪.১৯৪৩ সালে কলকাতা থেকে লেখা। আমার মা তখন বড় ছেলে জাহাঙ্গীরকে নিয়ে বামুন্ডিতে থাকতেন। চিঠির কথা:

“তোমার শরীর কেমন থাকে লিখো। খোকা বাবু এখন কেমন আছে? তার পায়খানা কেমন হয়, তার খাওয়া দাওয়া কেমন? কি খেতে চায় সব জানাবে। তার খাওয়া সম্বন্ধে বিশেষ ধরা কাটা করবে, একটুও এদিক ওদিক না হয়। তার শরীর সারছে কিনা লিখো। তাকে এখনও ওষুধ খাওয়ান হচ্ছে কি? সব কথা খুলে লিখো।

আমি ওয়াড়ি থেকে আজ সকালে ফিরেছি। দেশে সকলেই বেশ ভাল আছে। জেবু ভালো আছে ও আনন্দে আছে। তার কায়দা পড়া প্রায় শেষ হয়ে এলো। গাঁয়ের অবস্থা বেশ ভালো নয়। আমাদের ওখানে খুব ঝড় পানি হয়েছে। পাশের গাঁয়ে ৪/৫টা লোক ঝড়ে ঘর চাপায় মারা গেছে। রোজই বৃষ্টি হচ্ছে। তোমায় এইসঙ্গে একটা মেসিনের সুঁচ দিলুম। আর তোমার কাপড় পাঠাচ্ছি। কোনটা পেলে না জানিও।

গাঁয়ে ধানের দর প্রায় ১৪ টাকা মণ। জমির দাম ৪০০ টাকা বিঘা। আমাকে এক বিঘা নিষ্কর জমি কিনতে হলো। দাম পড়বে ৪৫০ টাকা। চাউল আনবার সময় ১/ মণ এনেছি। জোবেদ বড় দুষ্টামি করছে। তাকে মামুজি একদিন মারতে গিয়েছিলেন। তাকে রাখা যাবে না। বড় চোর ও শয়তান হয়েছে। ওরোস শরীফের দিনে মানাই ও তেনাই ভাইয়ের সংগে দেখা হয়েছিলো। তারপর মানাই দুবার এসেছিলো। তেনাই ভাই একদিন বাসা খুঁজতে এসে ঠিক করতে না পেরে পালিয়ে গেছে। তারা দেশে চলে গেছে। আমি বেড়ু গ্রামে একটা চিঠি দিয়েও কোন উত্তর পাইনি, রওজার দামাদও দেয়নি। কেন বল ত?

এখানের অবস্থা ভালো নয়। কলিকাতায় এবারে লোক পিছু হিসাব করে চাল দাল দেওয়া হবে। ইচ্ছেমতো কিনতে দেবে না। ফেনীর ও চাঁটাগায়ের অবস্থা ভালো নয়। বোধহয় জাপান বাংলাদেশ আক্রমণ করবে। তাহলে আমাদের যে কি অবস্থা হবে ভেবে ঠিক করতে পারা যায় না। লোকে বড় ভয় পেয়েছে ও মেয়ে ছেলে সরাচ্ছে। খোদা মালেক।”

আমার ছোটচাচা কলকাতার ৪৮ নং তালতলায় বসবাস করতেন। তিনি কলকাতা কর্পোরেশনে চাকুরি করতেন। তিনিই মাঝে মাঝে আসতেন পাকিস্তানে। আমার মেজ খালু কলকাতায় সরকারি চাকরি করতেন। তিনি থাকতেন ১৩নং তালতলা স্ট্রীটে। আমরা কলকাতা গেলে মায়ের মামার বাসা পাকসার্কাসে অথবা মেজ খালার বাসায় উঠতাম। মায়ের দুই মামাত বোন সঈদা ও সহেলা সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলে পড়তেন। সকাল বেলা সঈদা খালা যখন পাউরুটিতে মাখন লাগিয়ে নাশতা সাজাতেন, তখন আমাকে গান শোনাতে হতো। আমি যে গান গাইতে পারতাম একথা ভাবতেই এখন আশ্চর্য লাগে। আর শোনাতাম ছড়া ও কবিতা। এ সবই বাড়িতে আমার বাবার কাছে শেখা।

আমার খালারা আমার কাছে কবিতা শুনতো, বিনিময়ে চীনাবাদাম ও শনপাপড়ি খাওয়াতো। দুপুরবেলা শনপাপড়ি ওয়ালার ডাক শোনার অপেক্ষায় থাকতাম। আমার মায়ের মামুজান চাকরি থেকে অবসর নিয়ে নিজ গ্রামে বামুন্ডি চলে যান এবং সেখানে একটা দোতলা বিরাট বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। আমরা গেলে পুকুরে গোসল করার লোভ সামলাতে পারতাম না। বিশাল পুকুর। তবে মেয়েদের জন্য অনেকখানি দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল।

আমার মায়ের বড় দুঃখ ছিল আমি তার মনের মতো হতে উঠতে পারিনি। তিনি যা জানতেন ও পারতেন তার বিন্দুমাত্র আমার মধ্যে পাননি। আমাকে তিনি তার কিছুই শেখাতে পারেননি।

বীরভুম জেলার বোলপুর থানার এক অজ পাড়া গাঁ বেড়–গ্রামে আমার মায়ের বাপের বাড়ি। ২৩ জানুয়ারি ১৯২৩ সালে তার জন্ম হয়। বিয়ে হয়েছিল ১৬-১৭ বছর বয়সে। খুব ছোটবেলায় তার মা মারা গেলে তাকে তার মামুজান নিয়ে আসেন নিজের কাছে। ফলে মামুজানের কাছেই তিনি বড় হয়ে ওঠেন। তাঁর নানী, মামী, খালাদের কাছেই তিনি সেলাই, খাবার তৈরি, ধর্মশিক্ষা ও কিছু লেখাপড়াও শেখেন। তার আত্মীয়-স্বজন ভাই-বোনদের সবার বড় হওয়ায় সবাই তাকে বড়বুবু বলে ডাকতেন। আমার বাবা তার ভাগের জমিজমা সব ভাইদের দিয়ে চলে আসেন। আমার মা তার অংশ বোনদের কাছে রেখে আসেন, তবে তিনি মাঝে মাঝে গিয়ে বেড়িয়ে আসতেন। তাঁর মামুজান ও পিতা মারা যাবার সময় তার সঙ্গে ছোট্ট বেলায় আমরাও কয়েকবার কলকাতা ও বোলপুর গিয়েছি। ট্রেন যাত্রা যেন শেষই হয় না। আবার ট্রেন বদল করতেও হতো। একবার বোলপুর স্টেশনে এক মিনিটের জন্য ট্রেন থামলো। ট্রেনের দরজায় পালকি লাগানো হলো। আমার মা ত্বরিৎ গতিতে আমাকে সহ চার ভাইবোনকে পালকিতে ঢুকিয়ে নিজেও উঠলেন। পালকি চড়ে মায়ের সঙ্গে তার নানা বাড়ি বামুন্ডিতে গিয়েছিলাম। ঐ সময় খুব সচ্ছল পরিবারে পালকিতে যাতায়াত করার চল র্ছিল। এরপর মোষের গাড়ি, গরুর গাড়িতে যাতায়াত করেছি। ঐ লাল মাটির পথ, ফসল ভরা ক্ষেতের পর ক্ষেত, গাছ পালায় ঘেরা গ্রামীণ পরিবেশ দেখতে আমার খুব ভালোলাগতো। শহরে মানুষ হয়েছি, তাই গ্রামে দু একদিন থাকতেই হাঁপিয়ে উঠতাম।

আমার মা তার আত্মীয় স্বজনদের খুব প্রিয় ছিলেন। সবার তিনি মেয়ে ছিলেন, আবার সবার তিনি বড়বুবু ছিলেন। তাকে কে কী খাওয়াবেন এই নিয়ে সবাই ব্যস্ত থাকতেন। সকালে এক বাটি চা ও মুড়ি, তারপর ভাত, পরোটা, ডিম ভাজি, দু তিন রকম হালুয়া, মোরব্বা, আবার চা। সুন্দর করে রঙীন সুতোয় সেলাই করা দস্তরখান বিছিয়ে সে এক ধুমধামের খাওয়া দাওয়া হতো। আর কত রকম যে পিঠে হতো। গুড়ের ও ঘন দুধের পায়েস–আমি এখনও সে স্বাদ ভুলতে পারি না। মায়ের পাশে বসে বসে আমারাও খেতাম। আমার নানা বীরভূম কোর্টের উকিল ছিলেন। অনেক সময়ে বোলপুরেও থাকতেন। নানার সঙ্গে আমার মা খুব একটা কথা বলতেন না। খুব ছোট্ট বেলায় তারা চার বোন জন্ম নেবার পর নানী মারা যান, আমার নানা আবার বিয়ে করেছিলেন। এটা তিনি মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারেন নি। তার বাপের বাড়ির সঙ্গে খুব একটা ভালো সম্পর্ক ছিল বলে আমার কখনও মনে হয়নি। সেখানে তার সঙ্গে দু’বার গিয়েছি। ঘরভর্তি আখ দেখে খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সাঁওতাল মেয়েরা এসে কাজ করতো। আমি প্রথম প্রথম খুব ভয় পেতাম। তারা গান গেয়ে শোনাত, নাচতো। আমার মায়ের সঙ্গে গল্প করতো। আমাকেও আদর করে বিটি ডাকতো।

আমার মা লেখাপড়া ঘরে বসে করেছেন, চিন্তা-চেতনায় কিছুটা রক্ষণশীল ছিলেন বলেই–অনেকখানি নীরব থাকতেন। তবে পারিবারিক দায়দায়িত্বে তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণ ছিলেন। ধর্ম পালন তার শৈশব থেকে, এরপর সেলাই ও রান্না বান্না, সন্তানদের লালন-পালনে তার স্নেহ মমতায় আমরা আন্তরিকভাবে গড়ে উঠেছি। একটি শুদ্ধ আদর্শ বাঙালি পরিবার ছিল আমাদের।

আমরা অনেকগুলো ভাইবোন ছিলাম। মায়ের সঙ্গেই আমাদের সম্পর্ক ছিল বেশি। বাবা কিছুটা গাম্ভীর্য নিয়ে তার লেখাপড়া ইত্যাদিতে ব্যস্ত থাকলেও আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল খুব গভীর। দু’ছেলের পর আমি বড় মেয়ে। শৈশব থেকে মেয়েদের জন্য যে সতর্কতা রাখা দরকার, ঐ সময়ে আমাদের পরিবারে ছিল বটে, তবে ধর্মীয় গোঁড়ামী, রক্ষণশীলতা ও কুসংস্কারের প্রচ-তা ছিল না। আমার মা গল্পের বই ও পত্রিকা পড়তে পছন্দ করতেন, সেটা আমার মধ্যে ঢোকাতে পেরেছিলেন। কেননা এতে করে ঘরে রেখে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। আমার মা খুব সিনেমা দেখতেন। কোনো কোনো ছবি পছন্দ হলে দু’তিনবার দেখতেন। আমার মায়ের একান্ত সঙ্গী হতাম আমি। ফলে শৈশব থেকে সিনেমা দেখা ও গান শোনার নেশাটি আমারও হয়ে যায়।

আমাদের বাবাকে কখনও নিয়মিত নামায পড়তে দেখি নি। আমার মা নিয়মিত কোরান পাঠ, নামাজ, বিশেষ বিশেষ দিনসহ সবকটি রোজা রাখতেন। তবে আমার বাবা ত্রিশটি রোজা রাখতেন। ইফতারের জমাট খাওয়াদাওয়া ছিল। ঈদের সময় ভাইদের নিয়ে পাড়ার মসজিদে নামাজ পড়তে যেতেন এবং যথারীতি কোরবানিও দিতেন। কোরবানির মাংস তিন ভাগ করে একভাগ ঘরে তুলতেন। আমাদের বাসায় তখন ফ্রিজ ছিল না। আমার মা সব গোস্ত বিভিন্নভাবে রান্না করতেন। মাংস নিতে অনেক ফকির ও দুঃস্থ আসতো। তাদের ভাগ শেষ হলে আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য রাখা ভাগ থেকে দিতাম। আমাদের তো তেমন আত্মীয় কেউ এখানে ছিল না।

আমার মা-খালারা কলকাতায় তালতলার পীর সাহেবের মুরীদ ছিলেন। কলকাতা গেলে সেখানে মা তাদের দেখতে যাবেনই। তার সঙ্গে একবার গিয়ে পীর সাহেবকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। পীরের বাড়ির ভিড়, মুরীদদের আতিশয্য ছিল প্রচ-। খাওয়া-দাওয়াও ছিল। আমার বাবা কোনো পীর, ফকির, মাযার যিয়ারত ইত্যাদি পছন্দ না করলেও আমার মাকে কখনও তার ধর্মীয় কর্ম বা ভক্তি প্রদর্শনে বাঁধা দেননি। কখনও কখনও ঠাট্টা করে কিছু বলেছেন।

মা আমাদের বাড়িতে ধর্ম শিক্ষার জন্য মৌলভী ঠিক করতে জোর করতেন। তবে মৌলভীর সাক্ষাৎকার নিতেন আমার বাবা। আমার বাবার কোরান শরীফ এতোখানি মুখস্ত ছিল যে তিনি সুরা ও পারার সংখ্যা ধরে পড়তে বলতেন। মৌলভী সাহেব ভোরবেলা এলেই আমার বড় দু’ভাই সুবোধ বালকের মত পায়জামা শার্ট মাথায় টুপি পরে তাঁর কাছে পড়তে বসতো। আমাকে খুঁজে জোর করে সালোয়ার ওরনা পরিয়ে মা জোর করে পড়তে পাঠাতেন। আমার কাছে মনে হতো যে ভাষা বুঝি না, জানি না সে ভাষায় কোরান পড়ে কী লাভ? শুধুমাত্র উচ্চারণটুকুই ছিল যথেষ্ট। আমি কোনোমতে পড়তে চাইতাম না দেখে মা খুব রাগারাগি করতেন এবং নিজেই পড়াতেন। তার কাছে অনেকদূর পড়েছি, মুখে মুখে পড়িয়ে বিভিন্ন সুরা শেখাতেন। না শিখলে, না পড়লে বাবার কাছে বলে দিলে বাবা বলতেন, বড় হোক, তখন আপনি শিখে নেবে। কোরান শরীফের বাংলা অনুবাদ, হাদিস, বোখারী শরীফ, ধর্মীয় অনেক বই তিনি বাংলায় পড়লে আমাদেরও পড়তে বলতেন।

আমাকে সেলাই ও রান্না শেখানোর অনেক চেষ্টা করেও তিনি পারেননি। সূচীশিল্প কর্ম খুব ভালো জানতেন। বিভিন্ন রংয়ের সুতোর এমব্রয়ডারির কাজ জানতেন। আমাদের জামা কাপড়, বালিশের ঢাকনা, টেবিলক্লথে এমব্রয়ডারি, ক্রস কাঁটার কাজ তুলতেন, শীত এলে উলের কাজ করতেন। ঈদের সময় আমাদের জামা ঘরে সেলাই হতো। আমাকে দিয়ে বহু কষ্টে একটা উলের হাফ হাতা সোয়েটার বানাতে পেরেছিলেন। তার সিঙ্গার সেলাই মেশিনটি বিয়ের সময় পাওয়া। সেটা দীর্ঘ চল্লিশ বছর ব্যবহার করেছেন। তিনি ছাড়া আর কারও ব্যবহারের সুযোগ ঘটেনি। তেমনি গান শোনার জন্য তাকে একটা গ্রামোফোন কিনে দেন আমার বাবা। হিজ মাস্টার ভয়েজের কত পুরনো রেকর্ড ছিল। দুপুরে খাওয়ার পর মাঝে মাঝে তিনি গান শুনতে বসলে আমাদেরও শোনার সুযোগ হতো। কণিকা, সুচিত্রা মিত্র, পঙ্কজ মল্লিক, দেবব্রত বিশ্বাসের রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং পূজোর আধুনিক গানের রেকর্ড আমি তখন থেকে শুনে আসছি।

খুব ভালো রান্নার হাত ছিল আমার মায়ের, যা আমাকে শেখানোর চেষ্টা করেও তিনি পারেননি। আমার আর দুবোন একটু আধটু শিখলেও আমি কখনও আগ্রহ বোধ করিনি। আমাদের বাসায় বাবুর্চি, কাজের লোকজন থাকলেও মা নিজে রান্না করতেন এবং আমাদের শেখানোর চেষ্টা করতেন। ছোট্ট বেলায় আলু ছিলতে দিলে খোসা কত পাতলা হতো দেখাতেন, পেয়াজ কুচি কত মিহিন হয় তাও শেখাতেন। খাসতা পরোটা তৈরির জন্য ময়দায় ঘিয়ের ময়ান দিতে দিতে হাত ব্যাথা হয়ে যেত। তিনি বলতেন, বিয়ের সময় মেয়ে দেখতে এসে এসব পরীক্ষা করে দেখবে মেয়ে কেমন? আমি বলতাম, আপনারও কি হয়েছিল? মা মাথা নাড়তেন, ‘আমার তো শ্বশুর শাশুড়ীই দেখিনি’। আমি বলতাম, শ্বশুরবাড়ি যাবার দরকার। ভাইদের বাড়ি গিয়ে থাকবো?

আমার মায়ের শৈশব-কৈশোর কেটেছে ঘরে বসে ঘরোয়া কাজকর্ম করে। তখন ছিল বোরখার যুগ। চারপাশের ঘেরাটোপের মধ্যে জীবন-যাপন করেও তারা যেটুকু শিক্ষা অর্জন করেন তা নিপুণ ভাবেই নিতে পেরেছিলেন। লেখাপড়া করার সুযোগ পেলে তাদের হৃদয়ের দ্বার আরও বেশি করে উন্মুক্ত হতো। সামান্যটুকু যে সচেতন হতে পেরেছেন সেটা তাদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত আন্তরিকতা ও একাগ্রতা ছিল বলে।

আমার বাবা বিচিত্র অভিজ্ঞতার অধিকারী ছিলেন। আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গীসম্পন্ন হলেও আভিজাত্যের অহঙ্কার ছিল না, তবে পারিবারিক মূল্যবোধের প্রতি অটল ছিলেন। সেখানে কোনও কিছুকে তিনি প্রশ্রয় দিতেন না। গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, তাই গ্রামীণ জীবনধারায় অভ্যস্ত ছিলেন। তারপরও একটা ব্যক্তিগত জেদ তার ছিল, তার জন্য একটা নীতিবোধ তার মধ্যে গড়ে ওঠে। পড়তে ভালোবাসতেন খুব। নিয়মিত পড়ার অভ্যাসটা তাকে যথেষ্ট জ্ঞানার্জনে সহায়তা করে। যখন যে অবস্থায় থাকতেন প্রচুর বই কিনতেন। অনেক পুরনো ও দুর্লভ বই তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল। তাকে বই পড়তে ছোট্ট বেলা থেকেই আমরা দেখে আসছি। বই কিনে কিনে তিনি বাড়িতেই একটি ব্যক্তিগত লাইব্রেরি তৈরি করেছিলেন–আর এটাই আমাদের পরিবারের একমাত্র সম্পদ। অনেক দুর্লভ বই তাঁর ছিল। কলকাতায় যখন পড়তেন তখনই এর বেশির ভাগ কেনা হয়। এছাড়া বই কিনতে কখনও কার্পণ্যা দেখান নি। ঢাকা থেকে মোহাম্মদ নাসির আলী ও কলকাতা থেকে আমার চাচা বইয়ের যোগানদার ছিলেন। তিনি নিজেও যেখানে থাকতেন সেখানকার লাইব্রেরি ও বইয়ের দোকানের সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠতো। অবশ্য আমাদের জন্যও দু’একটা বই ও পত্রিকা কিনতেন। তার ব্যক্তিগত বই-পুস্তকের আলমারীটি ছিল আমাদের সবার প্রিয়। আমরা শৈশব থেকে বই পড়ার শিক্ষা-দীক্ষা পিতার কাছ থেকে পাই।

আমার বাবার কাছে বই পড়া ও মননশীলতার যে জ্ঞান লাভ করেছি তা আজও আমার কাছে বিরাট অর্জন। আমার গড়ে ওঠার পেছনেও তার গভীর স্নেহ ও মমত্ববোধ বিশেষ ভাবে সহায়তা করেছে। সেই যুগে যখন রোকেয়ার নারী জাগরণী বাণীতে উজ্জীবিত মুসলিম সমাজ উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছে এবং তাদের ঘরের মেয়েদের শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে উদ্যোগ গ্রহণ করছে, সেই সময়েই তো আমার জন্ম। তৎকালীন মধ্যবিত্ত সমাজের মানসিকতায় সংস্কারপন্থী ছিলেন বলেই আমার মনে হয়েছে। জীবনধারায় ও চিন্তাভাবনায় আধুনিক ছিলেন, তবে সময়কে ছাড়িয়ে যেতে চাননি। বিশেষ করে সামাজিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন। সরকারি চাকরি হিসেবে বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের বিচার সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বিচারকের পেশাকে তিনি পবিত্র মনে করতেন, অন্য সব পেশা থেকে। সততা মেধাবী এবং দায়বদ্ধতা ছিল বলে তিনি সবার কাছে শ্রদ্ধা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছিলেন। একজন সাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর সুনাম ছিল। তিনি ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন। ইতিহাস তার প্রিয় বিষয় ছিল। প্রচুর পড়াশোনা করেছেন, তাই অনেক কিছু জানা ছিল বলে, প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে পারতেন। আমরা তাঁর কাছে অনেক গল্প শুনেছি ইতিহাসের নানা ঘটনার ও রাজা বাদশাহদের। আবার সাহিত্যের নানা তথ্য, সাহিত্যিকদের নানা কথা তিনি বলতেন এ থেকে বোঝা যায় তার সময়ের সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বিচারক ছিলেন বলে সর্বত্র যাবার সুযোগ ছিল না। সীমাবদ্ধতা যথেষ্ঠ ছিল, তারপরও আমরা দেখেছি বহু কবি-সাহিত্যিক তার কাছে আসতেন। বিশেষ করে তাঁর সঙ্গে গল্প করতে সবাই খুব পছন্দ করতেন। আমরা অনেক সময় দেখেছি তিনি বলছেন, আর অন্যরা শুনে যাচ্ছেন। সততার সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করতে হত, তাই অপচয় ও বিলাসিতা কোনোটাই তিনি প্রশ্রয় দিতেন না, তবে সৌখিন ছিলেন বলে ছোট ছোট শখগুলো অবশ্যই মেটাতেন, সেখানে কোনো কার্পণ্য ছিল না তার। তখনকার দিনে টিনভর্তি সিগারেট কিনে খেতেন। ঐ টিনটা খালি হবে, তার প্রতি আমাদের আকর্ষণ ছিল। আবার কখনও হুকোয় টান দিয়ে ধুমপান করতেন। সেটাও সাজিয়ে দেয়া হতো।

আমার বাবা যখন ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ গান গাইতেন, তখন তার দুচোখ পানিতে ভরে উঠতে দেখতাম। আমি আমার এই জীবনে আমার বাবা ও সুফিয়া কামালকে দেখেছি অনেক গানের কথা মুখস্ত। কলকাতায় ছাত্রজীবনে আমার বাবা নজরুলের গানের অনুষ্ঠানে যেতেন। কবির ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয়’ গানটি জ্ঞান দে’র কণ্ঠে তিনি শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সেকথাও আমাদের বলতেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর মনে হয় সম্পূর্ণ পড়া ছিল। অসংখ্য কবিতা ও গানের লাইন মুখস্থ ছিল। অতুল প্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলালের অনেক গান আমি তাঁর কাছে শুনে শুনে মুখস্থ করে ফেলি। আর জীবন-যাপনের সবটুকু সাধারণ আদর্শ ও নীতির শিক্ষা মা-বাবাকে দেখে অর্জন করি। তারা বিলাসিতা পছন্দ করতেন না। অপচয়কে একেবারে সহ্য করতেন না, আর বেতনের টাকায় খুব টেনেটুনে চলতে হতো–এটা আমি বড় হয়েও দেখেছি। চাকুরির সীমিত বেতনের উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করতে হত। অন্য কোনো আয় ছিল না। তবে জীবন-যাপন একরকম সাধারণ ও আনন্দময় স্বাদ আমাদের পরিবারে সবসময় ছিল।

কলকাতা থেকে প্রথমে আমার বাবা খুলনায় এসে কোর্টে চাকরিতে যোগদান করেন। পরে আমার মা ও আমাদের তিন ভাইবোনকে নিয়ে আসেন। যদিও আমাদের আত্মীয় স্বজনরা খুশি হতে পারেন নি। চোখের জল দিয়ে বিদায় দিয়েছিলেন। মায়ের কাছে শুনেছি অনেক আশঙ্কা, অনেক অজানা চিন্তা-ভাবনা নিয়ে তারা আসেন। সবকিছু নতুন করে গড়ে তুলতে হয়। অর্থ বিত্ত কিছুই ছিল না, তবে স্বপ্ন ছিল, প্রত্যাশা ছিল। নতুন দেশ, নতুন মানুষ, নতুন ধারায় ও ব্যবস্থাপনায় জীবন-যাপনে নিজেদের মিশিয়ে নেবার চেষ্টা ছিল।

(কিস্তি ৩)

baby.maudud@gmail.com
আর্টস প্রোফাইল: বেবী মওদুদ


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সায়্যিদ চৌধুরী — জুলাই ১১, ২০১০ @ ৭:২৩ পূর্বাহ্ন

      ডি.এল. রায়ের গানের প্রথম লাইনটি–ধন ধান্য পুষ্প ভরা–হবে । ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা’ নয় ।

      – সায়্যিদ চৌধুরী

      [গানের লাইনটি শুদ্ধ করা হলো। আপনাকে ধন্যবাদ। – বি. স.]

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com