জীবনের পাতায় পাতায় (১)

বেবী মওদুদ | ২৩ জুন ২০১০ ২:২৩ অপরাহ্ন

——————————–
স্মৃতিকথা ধারাবাহিক
——————————–

এক.
baby-maudud25.jpgসোমবার ২৩ জুন ১৯৪৮ সালে কলকাতার পার্ক সার্কাসের থিয়েটার রোডে একটি তিন তলা
……..
বেবী মওদুদ
……..
বাড়ির ফ্ল্যাটে আমার জন্ম হয়। বাংলা ৯ আষাঢ় প্রায় বেলা একটা হবে। আমার মায়ের কাছে শুনেছি, সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, যাকে বলে মুষলধারে। তার শরীরটা সকাল থেকেই খারাপ লাগছিল বলে দাইকে খবর দেয়া হয়েছিল। আমার মায়ের যখন প্রসব ব্যথা ওঠে খুব কষ্ট হচ্ছিল। এক তলার ফ্ল্যাটে থাকতেন কবি সুফিয়া কামাল। তাঁকে খবর দেয়া হলে তিনি কাছে বসেন এবং দোয়া দরুদ পড়ে ফু দেন। তারপরই আমার জন্ম হয় এবং আমাকে প্রথম কোলে নিয়ে স্নেহচুম্বন করে আশীর্বাদ করেন। মা তাকে বলেছিলেন, বুবু দোয়া করবেন যেন আমার মেয়ে আপনার মত ভালো মানুষ হয়। আমার মা যখন কথাগুলো আমাকে বলছিলেন, তখন তার মুখখানা আনন্দে উজ্বল হতে দেখেছিলাম। বড় হয়ে যখন সুফিয়া কামালের স্নেহের পাত্রী হলাম, তখন তাঁকে মায়ের কথাগুলো বলেছি। তিনি হেসে বললেন, তোর মার দেখি সব মনে আছে।

am-pic.jpg……
বাবা আবদুল মওদুদ
…….
আমার বাবা তাঁর চেয়ে বয়সে তিন বছর বড় ছিলেন। বাবাকে তিনি ভাই ডাকতেন। বাবা তাকে বুবু বলে ডাকতেন। সেই সুবাদে আমি তাকে ফুপু ডাকতাম। তিনি আমার বাবার বড় বোনকে দেখেছেন, সেকথা আমাকে একদিন বলেছিলেন। কলকাতার এই বাড়িতে আরও অনেক কবি সাহিত্যিক, শিল্পী আসতেন। তাদের একটা ভালো আড্ডাস্থান ছিল। আমার বড় ভাইয়ের কাছে শুনেছি, শিল্পী জয়নুল আবেদীন ও শিল্পী কামরুল হাসান ট্রাম বা বাসের টিকেটের উল্টোপিঠে ছবি এঁকে দিতেন। কবি জসীমউদ্দীন, আব্বাসউদ্দীন আহমেদ, কবি আহসান হাবীবও আসতেন এই বাড়িতে। পরবর্তীতে আমি বড় হয়ে তাদের মুখ থেকেও এসব কথা শুনেছি। সওগাত-সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন এবং তার কন্যা বেগম-সম্পাদিকা নূরজাহান বেগমের যাতায়াত ছিল এ বাড়িতে।

আমার বাবার পূর্বপুরুষরা বর্ধমানে বসবাস করতেন। খঙকোষ থানার ওয়ারী গ্রামে আমার দাদার বাড়ি। এখনও সেই গ্রামে আমাদের আত্মীয়স্বজন রয়েছেন। আমার দাদা মাহফুজুল হক গ্রামের মসজিদের ইমাম ছিলেন। প্রচুর কৃষিজমি ছিল। একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার হিসেবে তারা জীবনযাপন করতেন। তিনি আরবী, ফার্সী ও বাংলা জানতেন। আমার বাবাও তাঁর কাছে ভালো আরবী ও ফার্সী শেখেন। আমার বাবা ছোটবেলায় পিতৃমাতৃহীন হলেও লেখাপড়ায় আগ্রহী ও মেধাবী ছিলেন। সংস্কৃতি শেখেন স্কুলে এবং ইংরেজীও লেখাপড়ার মাধ্যম হওয়ায় বেশ ভালো জানতেন। সাহিত্যের বই পড়ার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। ছাত্রজীবনে লেখার চর্চাও শুরু করেন। তিনিই গ্রামের প্রথম মুসলমান, যিনি প্রবেশিকা পাশ করে কলকাতায় এসে ইসলামিয়া কলেজে লেখাপড়া করেন। বেকার হোস্টেলে থাকতেন। ইতিহাসের একনিষ্ঠ ছাত্র ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স, এম. এ. এবং পরে এল এল বি পাশ করেন। বেঙ্গল জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মুন্সেফ হিসেবে বিচার বিভাগের চাকরিতে যোগদান করেন। তাঁর প্রিয় শিক্ষক ছিলেন খুদা বক্স।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রিয় বন্ধু ছিলেন বাঁকুড়া জেলার এ বি এম হবীবুল্লাহ, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান প্রফেসর ছিলেন। আজীবন তাদের এই বন্ধুত্ব অটুট ছিল। এছাড়া হুমায়ুন কবীর, অন্নদাশঙ্কর রায় প্রমুখ অনেকের সঙ্গে তাঁর সখ্য ছিল। কলকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউটের সদস্য ছিলেন। আমাদের বাসায় বাবার জন্য রোকুনুজ্জামান দাদাভাই যেতেন লাইব্রেরির বই নিয়ে। তিনিও তখন এখানে চাকরি করতেন। পরে দাদাভাই দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকায় যোগদান করেন।

আমার বাবা চাকরীজীবনে বাংলাদেশের নানা স্থানে বসবাস করেছেন। সেসব স্থানের সাহিত্য-সংস্কৃতিসেবীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে আমি বড় হয়ে এর কোনো কোনো স্থানে গিয়ে বাবার সুনাম শুনতাম। তিনি কঠোর ন্যায়-নীতির বিচারক হিসেবেও সবার কাছে পরিচিত ছিলেন।

mother.jpg……
মা হেদায়েতুন নেসা
……..
কলকাতায় আমার জন্মের সময় বাবা ছিলেন আলীপুর কোর্টের মুন্সেফ। আমার বড় তিন ভাই ছিলেন, তাদের নাম হচ্ছে জাঁহাঙ্গীর, আলমগীর ও হারুন। যদিও আলমগীর ভাই জন্মের কয়েকমাস পর মারা যান। আমার বাবা কোর্ট থেকে ফিরে আমার জন্মের খবর পেয়ে অত্যন্ত খুশি হন এবং পোস্টকার্ড কিনে এনে বড় ভাইকে নিয়ে সব আত্মীয় স্বজনদের চিঠি লিখে জানান। আমরা পরে বড় হয়ে জেনেছি, আমার বাবার প্রথম বিয়ে হয় বর্ধমানে। একটি কন্যা সন্তান জন্ম দিয়ে প্রথম স্ত্রী মারা যান। আমার সেই বোনকে আমি কোনোদিন দেখিনি। তিনি তার নানাবাড়িতে লালিত-পালিত হন।

আমার মায়ের বাপের বাড়ি বীরভূমের বেড়ু গ্রামে। তারা ছিলেন চার বোন। শৈশবে মাতৃহীন হওয়ায় মা তার নানাবাড়িতে এবং কলকাতায় মামার কাছে লালিত-পালিত হন। তার মামা মাসুদুল মান্নান ছিলেন সরকারি চাকুরিজীবী। আমার মা ছিলেন সবার বড়বুবু। আত্মীয়-স্বজনের কাছে খুব আদরের পাত্রী ছিলেন। আমার বাবার সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে মামা খুব সন্তুষ্ট ছিলেন। জামাই হিসেবে আমার বাবার প্রচণ্ড সমাদর দেখেছি।

ভারত ভাগ হবার পর আমার বাবা তার ইচ্ছানুযায়ী পাকিস্তানের পূর্ববঙ্গে চলে আসেন। আত্মীয়-স্বজন তো বটেই, জন্মভূমির শেকড় ছিঁড়ে চলে আসায় তার মনে একটা দুঃখবোধ থাকলেও কখনও প্রকাশ করতেন না। তবে আমার মা সব সময় তার গ্রাম, কলকাতার জীবনযাপনের কথা বলতেন, আত্মীয়স্বজনদের জন্য কাঁদতেন। কলকাতার ছেচল্লিশের দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ এসব কিছুর অভিজ্ঞতা থেকেই তারা পূর্ববঙ্গে চলে আসতে বাধ্য হন। কিন্তু যোগাযোগটা ছিল। সম্ভবতঃ ১৯৫৪ সালে পাসপোর্ট প্রথা চালু হবার পর আমার বাবা আর কখনও কলকাতা যান নি। তার জন্য কলকাতা থেকে আসতো সাপ্তাহিক দেশ, ত্রৈমাসিক চতুরঙ্গসহ অন্যান্য পত্রিকা এবং বই। আমার স্মৃতিতে ঝাঁপসা মনে আছে, ১৯৫৩ সালে তিনি আমাদের কলকাতা নিয়ে যান। ট্রাম গাড়ি চড়িয়ে ঘুরে দেখান। তার মুখে শুনেছি তার ছোটবেলার স্মৃতি, ধান বিক্রি করতে বর্ধমান শহরে আসা, গল্পের বই কেনা, বিড়ি টানতে টানতে ঘরে ফেরার অনেক গল্প। শ্রাবণ মাসের এক বর্ষণমুখর দিনে তার পিতা মারা যান। মা মারা যান আরও আগে। তাদের কথা বলার সময় দুচোখ বেয়ে পানি ঝরতে দেখেছি আমি।

তিনি যখন মুন্সেফ নিয়োগ পেলেন, তখন আশ-পাশের লোকজন তাকে দেখতে আসতো। গেজেটে তার নাম দেখে বর্ধমানের প্রখ্যাত আইনজীবী আবুল কাশেম ডেকে পাঠান এবং নাশতা খাইয়ে বলেছিলেন, “তোমার বাবাকে ইংরেজি পড়তে না পারায় ঠাট্টা করেছিলাম। এখন দেখছি সে তার জেদ রেখে, তোমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছে।

১০ আগস্ট ১৯৩৬ সালে বিচার বিভাগের চাকুরিতে যোগদান করেন। তিনি শিবপুর (হাওড়া), বর্ধমান, দিনাজপুর (১৯৩৬), মানিকগঞ্জ (১৯৩৮), ঢাকা সদর (১৯৩৮), বিষ্ণুপুর (১৯৩৯), শ্রীরামপুর (১৯৩৯), সন্দীপ (১৯৩৯), বারুইপুর (১৯৪৩), কলকাতা, রানাঘাট প্রভৃতি স্থানে আদালতে মুন্সেফ হিসেবে চাকুরি করেন।

পূর্ববঙ্গে প্রথমে এসে টাঙ্গাইলের আদালতে অতিরিক্ত মুন্সেফ হিসেবে চাকুরি করার পর ৭ নভেম্বর ১৯৪৯ সালে পাবনায় সাবজজ হিসেবে নিয়োগ পান।

আমার বড় ভাইয়ের কাছে শুনেছি কলকাতা থেকে রেলগাড়ি চড়ে বাবার সঙ্গে মা ও আমরা তিন ভাই-বোন পূর্ববঙ্গে বসবাসের জন্য চিরতরে চলে আসি। আমি তো ছিলাম কোলের শিশু। আমার কিছুই মনে নেই। সবার কাছে আমাদের পরিবারের পরিচয় হয়ে ওঠে মোহাজের। কেউ কেউ ডাকতো ঘটি বলে।

কিস্তি ২

baby.maudud@gmail.com
আর্টস প্রোফাইল: বেবী মওদুদ


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শামীম আরা বেগম — জুন ২৪, ২০১০ @ ১২:৪৮ অপরাহ্ন

      এটা কি আপনার আত্মজীবনী না পারিবারিক কথপোকথনগুলো একসাথে স্মৃতির পাতায় গল্পগুচ্ছ করা জানাবেন। তবে খুব ভাল লেগেছে। পুরোপুরি শেষ করবেন না? ছোটবেলা থেকেই আপনার ভক্ত আমি। ভাল থাকুন, খুব ভাল।

      – শামীম আরা বেগম

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অমরেশ রায় — জুন ২৭, ২০১০ @ ১০:১১ অপরাহ্ন

      লেখা ভালো হচ্ছে। এ থেকে আমাদেরও শেখার আছে অনেক কিছু।

      – অমরেশ রায়

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গীতা দাস — জুন ২৮, ২০১০ @ ১২:২৪ পূর্বাহ্ন

      স্মৃতিকথা পড়া আমার শখ। কাজেই আপনারটাও পড়ব, তবে আমাদের প্রধানমন্ত্রী আপনার বন্ধু বলে তাঁর কথাও আপনার স্মৃতিকথায় আশা করছি।

      – গীতা দাস

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন laiju man Naher — জুলাই ৫, ২০১০ @ ৭:১১ পূর্বাহ্ন

      আপা ভাল আছেন! লেখাটা ভাল লাগল। আপনাকে রংপুরে দেখেছিলাম, সম্ভবত ৯৩-এ রোকেয়া জন্মবার্ষিকী পালন করতে এসেছিলেন। টাউন হলে আপনার সাথে কথা হয়েছিল। মহিলা পরিষদে আসতে বলেছিলেন। ভাল থাকুন আর লিখতে থাকুন!

      – laiju man Naher

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com