গোলাপের নাম

উম্‌বের্তো একো

জি এইচ হাবীব | ১০ এপ্রিল ২০১০ ৩:০১ অপরাহ্ন

eco.jpg
উম্‌বের্তো একো

অনুবাদ: জি এইচ হাবীব

লিংক: কিস্তি ১

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৩
———————————————————————————

(কিস্তি ২-এর পরে)

সে ক্স ট্‌

গির্জার প্রবেশপথ[৪৭] দর্শনে অ্যাড্‌সোর মুগ্ধতা, এবং কাসালি-র উবার্তিনোর[৪৮] সঙ্গে উইলিয়ামের ফের সাক্ষাৎ

স্ট্রাযবুর্গ, শার্ট, ব্যামবার্গ আর প্যারিসে পরে আমি যে-সমস্ত গির্জা দেখেছি, মঠের গির্জাটি সেগুলোর মতো রাজসিক নয়। সেটা বরং ইতালিতে আমি এরিমধ্যে যেসব গির্জা দেখেছিলাম সেগুলোর মতো: দর্শকের মাথা ঘুরিয়ে দিয়ে স্বর্গপানে উঠে যাবার সামান্যতম প্রবণতাও তাদের নেই, বরং ভূমিতেই প্রোথিত সেগুলো দৃঢ়ভাবে, আর কখনো কখনো তারা যতোটা না উঁচু তার চেয়ে বেশি প্রশস্ত; তবে এটার প্রথম স্তরের ওপর শোভা পাচ্ছে, দুর্গের মতো, বর্গাকার, খাঁজকাটা সচ্ছিদ্র পাঁচিল-এর একটা বিন্যাস, আর এই তলাটার ওপর উঠে গেছে আরেকটা কাঠামো, বুরুজের মতো ততটা নয় যতটা একটা নিরেট দ্বিতীয় গির্জার মতো, শীর্ষোপরি ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া একটা ছাদ আর সাদামাটা জানলা নিয়ে। মঠের ভেতরের একটা শক্তপোক্ত গির্জা সেটা, আমাদের পূর্বপুরুষেরা যেমনটি তৈরি করেছিল প্রভেন্স আর ল্যাঙডক্-এ, আধুনিক শৈলীর ঔদ্ধত্য আর পাথুরে অলঙ্করণ বাহুল্য থেকে মেলা দূরস্থানীয়, যা কিনা, আমার বিশ্বাস, আরো সাম্প্রতিক সময়েই কেবল সমৃদ্ধ করা হয়েছে কয়ার-এর ওপর একেবারে স্বর্গের ছাদপানে দাপটের সঙ্গে উঠে যাওয়া শীর্ষসহ।

rose_3.jpg…….
The Name of The Rose-এর বিশেষ সংস্করণ
……..
দুপাশে দুটো খাড়া আর নিরাভরণ স্তম্ভসহ প্রবেশপথটা, প্রথম দর্শনে, একটা বিরাট একক খিলানের মতো উন্মুক্ত হয়ে আছে; কিন্তু স্তম্ভদুটো থেকে দুটো এম্ব্রেযার শুরু হয়ে শীর্ষোপরি অন্য আরো বহুবিধ খিলানে শোভিত হয়ে দৃষ্টিকে নিয়ে গেছে, যেন কোনো অতল খাদের কেন্দ্রের মধ্যে, বিশাল এক টিম্পানাম (খিলানপোরি দেয়ালগাত্র) ভূষিত খোদ প্রবেশমুখটার দিকে, টিম্পানামের ভররক্ষা করছে দু’পাশে দুটো ইম্পোস্ট আর মাঝখানে একটি খোদাই-করা খুঁটি, আর খুঁটিটি প্রবেশমুখটাকে ভাগ করে দিয়েছে দুটো ফোঁকরে যার সুরক্ষাদান করছে ধাতুসহযোগে শক্তিবৃদ্ধি করা ওক কাঠের দুটো দরজা। দিনের সেই সময়টাতে দুর্বল সূর্যটা প্রায় সোজাসুজি রোদ ফেলছিল ছাতের ওপর, আলো বাঁকা হয়ে এসে পড়ছিল গির্জার সম্মুখভাগের ওপর, যদিও তাতে টিম্পানামটা আলোকিত হচ্ছিল না; কাজেই স্তম্ভ দুটো পেরিয়ে আসার পর হঠাৎ করেই নিজেদের আবিষ্কার করলাম আমরা বেশ কিছু খিলানের এক অরণ্যময় ভল্টের নিচে, সেসব খিলানের উদয় হয়েছে আনুপাতিকভাবে এম্ব্রেযার দুটোর শক্তি বৃদ্ধি করা অপেক্ষাকৃত ছোট স্তম্ভগুলো থেকে। অন্ধকারে আমাদের দৃষ্টি যখন সয়ে এসেছে, চোখদুটো আমার ধাঁধিয়ে দিল (যে-কারো স্থিরদৃষ্টি আর কল্পনাতেই ধরা পড়ার মতো) খোঁদাই-করা-পাথরের নীরব ভাষা, তাৎক্ষণিকভাবে নিক্ষেপ করল আমাকে এমন এক দৃশ্যের ভেতর এখনো যা আমি বলে বোঝাতে অক্ষম।

দেখলাম, আকাশে স্থাপিত একটি সিংহাসন, তাতে এক ব্যক্তি ব’সে[৪৯]। ‘উপবিষ্ট ব্যক্তি’র মুখটি কঠোর এবং অনুভূতিশূন্য; বিস্ফারিত চোখ দুটো তীব্র জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে পৃথিবীবাসী এক মানবজাতির দিকে যে-জাতি ইতিমধ্যে এসে পৌঁছেছে তার ইতিহাসের অন্তিম লগ্নে; রাজসিক চুল আর দাড়ি তার মুখ ও বুকের ওপর আন্দোলিত হচ্ছে নদীর জলের মতো, সমান এবং সুসমঞ্জসভাবে দু’ভাগে বিভক্ত স্রোতধারায়। তার মাথার মুকুটটি এনামেল আর মণি-জহরত সমৃদ্ধ, সোনা আর রূপোর সুতোয় এম্ব্রয়ডারি আর লেসের কাজ করা রক্তবর্ণ রাজকীয় টিউনিক বড় বড় ভাঁজে দুই হাঁটুর ওপর প’ড়ে আছে। হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে রাখা বাম হাঁতটায় একটা সীলমোহর দেয়া বই, ডান হাতটি হয়ত আশীর্বাদের কিংবা হয়ত—আমি ঠিক নিশ্চিত নই—নিষেধের ভঙ্গিমায় উঁচু করা। ক্রশসহ পুষ্পসজ্জিত একটা জ্যোতিশ্চক্রের দুর্দান্ত সৌন্দর্যে আলোকিত হয়ে রয়েছে মুখটা, ওদিকে সিংহাসনের চারদিকে আর ‘উপবিষ্ট ব্যক্তি’র মুখের ওপরে দেখতে পেলাম জ্বল জ্বল করছে একটা পান্না সবুজ রঙধনু। সিংহাসনটার সামনে, ‘উপবিষ্ট ব্যক্তি’র পায়ের নীচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে স্ফটিকের একটি দরিয়া, আর ‘উপবিষ্ট ব্যক্তি’র চারদিকে, সিংহাসনটির পাশে আর ওপরে দেখতে পেলাম চারটে বীভৎস প্রাণী—আমার কাছে বীভৎস বলেই মনে হলো দেখতে, কিন্তু গভীর ভাবাবেগে আত্মহারা, যদিও বশ্য আর প্রিয় তারা ‘উপবিষ্ট ব্যক্তি’র কাছে, আর তারই গুণকীর্তন ক’রে যাচ্ছে নিরন্তর।

কিংবা হয়ত সব কিছুকেই ভয়ংকর বলা যায় না, কারণ একজনকে আমার কাছে বেশ সুদর্শন আর সদাশয় বলেই মনে হলো, আমার বাম দিকে (উপবিষ্ট ব্যক্তির ডান দিকে) একটি বই বাড়িয়ে ধরা লোকটিকে। কিন্তু অন্য দিকে আবার ছিল একটা ঈগল, রীতিমত ভয়ংকর বলে মনে হলো সেটাকে আমার; সেটার ঠোঁটটা আছে ফাঁক হয়ে, ঘন পালকগুলো সজ্জিত রয়েছে একত্রে আবদ্ধ একটি বক্ষ ও পৃষ্ঠত্রাণের মতো, প্রসারিত হয়ে আছে শক্তিধর বক্র নখর আর বিশালকায় ডানা। আর, ‘উপবিষ্ট ব্যক্তি’র পায়ের কাছে, প্রথম দুটো ফিগারের নীচে ছিল আরো দুটো, একটা বৃষ আর একটা সিংহ, দুটো দানোই তাদের নখর বা খুরের মধ্যে আঁকড়ে ধরে আছে একটা ক’রে বই, তাদের শরীর সিংহাসন থেকে বেঁকে থাকলেও মাথা ঘুরে আছে সিংহাসনটারই দিকে, যেন কাঁধ আর ঘাড়গুলো বেঁকে গেছে হিংস্র কোনো আবেগ আতিশয্যে, টানটান হয়ে আছে পাঁজর আর জঙ্ঘার মাঝখানের দু’পাশ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো কোনো মৃত প্রাণীর, পাকস্থলী বিদারিত, সাপের মতন লেজ কুণ্ডলী পাকানো, মোচড়াচ্ছে, চূড়োয় গিয়ে শেষ হয়েছে অগ্নিশিখার লকলকে জিভের মতো। দুটো দানোই ডানাওলা, দুটোই জ্যোতিশ্চক্র ভূষিত; তাদের ভয়ংকর চেহারা সত্ত্বেও তারা কিন্তু নরকের নয় স্বর্গের প্রাণী, আর তাদেরকে যদি ভয়ংকর বলে মনে হয়ে থাকে তবে সেটা এই জন্যে যে তারা ‘যিনি আসছেন’ এবং যিনি জীবিত ও মৃত সবারই বিচার করবেন তার প্রশংসায় গর্জন করে চলছিল।

সিংহাসনটার চারপাশে, চারটে প্রাণীর পাশে আর উপবিষ্ট ব্যক্তির পায়ের নীচে, যেন স্ফটিকের দরিয়ার স্বচ্ছ পানির ভেতর দিয়ে দৃশ্যমান তারা এমনভাবে, যেন দৃশ্যটার পুরো পরিসরটা ভ’রে তুলতে, টিম্পানামের ত্রিভুজাকার কাঠামোটা অনুযায়ী সজ্জিত অবস্থায়, সাত জন আর সাত জনের, তারপর তিন আর তিন জনের, তারপর দুজন আর দুজনের একটা ভিত্তি থেকে উত্থিত হয়েছিলেন, বিশাল সিংহাসনটার দুপাশে, চব্বিশটি খুদে সিংহাসনে, চব্বিশজন প্রবীণ, পরনে সাদা পোষাক মাথায় স্বর্ণ মুকুট। তাদের কারো হাতে বীণা, একজনের হাতে সুগন্ধীদানী, আর মাত্র একজন ছিলেন একটি বাদ্যযন্ত্র বাদনরত অবস্থায়, অন্যদিকে বাকিরা ছিলেন ভাবসমাধিগ্রস্ত, তাদের মুখ ফিরে আছে ‘উপবিষ্ট ব্যক্তি’র দিকে, যার গুণকীর্তন তাঁরা করছিলেন, তাদেঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ-ও বেঁকে গিয়েছিল প্রাণীগুলোর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো, ফলে তাঁরা সবাই দেখতে পাচ্ছিলেন উপবিষ্ট ব্যক্তিকে, উন্মত্তের মতো নয় মোটেও, যদিও পরমানন্দদায়ক নৃত্যের গতি-বিভঙ্গ নিয়ে – ডেভিড নিশ্চয়ই এমনই নাচ নেচেছিলেন পেটিকাটির সামনে – কাজেই তাদের শরীরের উচ্চতার রীতি লঙ্ঘন ক’রে তাদের চোখের মণি যেখানেই থেকে থাকুক না কেন, সবগুলোই গিয়ে মিলেছিল দীপ্তিশীল সেই একই স্থানটিতে। আহা, ভৌতবস্তু ও ওজন থেকে অলৌকিকভবে মুক্তি পাওয়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সেই রহস্যময় ভাষায় পরিত্যক্ততা আর ভাবাবেগের, অস্বাভাবিক অথচ তারপরেও মোহনীয় ভঙ্গিমার কী এক ঐকতান, যে-অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ পরিপূর্ণ হয়েছে নতুন বলিষ্ঠ আকারে, যেন পবিত্র দলটিকে আঘাত করেছে প্রচণ্ড বেগে ধাবমান বাতাস, জীবন বায়ু, আনন্দের প্রবল উত্তেজনা, ধ্বনি থেকে অলৌকিকভাবে প্রতিচ্ছবিতে রূপান্তরিত আনন্দমুখর বন্দনাগান।

কিন্তু আমার আত্মা যখন সেই পার্থিব সৌন্দর্য ও রাজসিক অপ্রাকৃত সংকেত-এর ঐকতানে আত্মহারা, এবং আনন্দের এক প্রার্থনাসঙ্গীতে ফেটে পড়ছে প্রায়, তখন আমার দৃষ্টি, প্রবীণদের পায়ের কাছে ফুটে ওঠা রোয উইন্ডোগুলোর সমানুপাতিক ছন্দের সঙ্গী হয়ে এসে পড়েছে টিম্পানামটি ঠেকা দিয়ে রাখা মাঝের খুঁটির পরস্পরবিজড়িত ফিগারগুলোর ওপর। তেজস্বী, ক্রশাকারে পরস্পরছেদী, খিলানের মতো সেই তিন জোড়া সিংহ—যাদের প্রত্যেকটি সেটার পেছনের থাবাদুটো মাটিতে রেখে সামনের দুটো তার সঙ্গীর পিঠের ওপর দিয়ে রেখেছে, কেশর সর্পিলভাবে কুঞ্চিত, মুখটা টানটান হয়ে আছে যেন এখুনি ভয়-দেখানো গর্জন ক’রে উঠবে, খুঁটির গায়ে লেগে আছে না জানি কোন আঠা বা লতাতন্তুর সাহায্যে—তারা কী, আর কোন প্রতীকী বার্তার কথাই বা বলছিল তারা? আমার আত্মাকে শান্ত করার জন্যে, সেই সঙ্গে সম্ভবত সিংহের নারকীয় প্রকৃতি বশীভূত করার উদ্দেশ্যে আর সেটাকে উচ্চতর জিনিসের একটি প্রতীকী পরোক্ষ উল্লেখে রূপান্তরিত করতেও, খুঁটিটার দুপাশে ছিল দুটো মানবমূর্তি, খোদ স্তম্ভটির মতোই অস্বাভাবিক রকমের দীর্ঘ, এবং প্রতিরূপ যেন তারা আরো দুটোর, তাকিয়ে আছে সেই মানবমূর্তি দুটোরই দিকে, অলংকৃত ইম্পোস্ট দুটোর দু’পাশ থেকে, যেখানে রয়েছে ওক কাঠের দরজা দুটোর চৌকাঠের দুই বাজু। এই মূর্তিগুলো ছিল আসলে চার বৃদ্ধের, চিনতে পরলাম পিটার ও পল, জেরেমিয়াহ্ আর ঈসাকে, তাঁদের দেহ মুচড়ে রয়েছে যেন একটা নাচের পদক্ষেপ নিয়ে, দীর্ঘ হাড্ডিসার হাত দুটো তাদের উঁচু হয়ে আছে, আঙুলগুলো এমনভাবে ছড়িয়ে আছে যেন ডানা সেগুলো, আর ডানার মতো তাদের দাড়ি ও চুল আলোড়িত হচ্ছে এক ভবিষ্যদ্বাণীপূর্ণ বাতাসে, সুদীর্ঘ কাপড়চোপড়ের ভাঁজগুলো নড়ে উঠছে ঢেউ আর পুঁথিগুলোকে প্রাণদানকরা দীর্ঘ পায়ের কারণে, সিংহগুলোর চেয়ে একেবারে আলাদাভাবে তবে সিংহগুলোর মতো একই উপাদানে। আর দিব্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও নারকীয় পেশীতন্তুর সেই রহস্যময় ঐকতান থেকে আমার বিমুগ্ধ দৃষ্টি সরিয়ে নিতে আমি দরজার পাশে, সুগভীর খিলানের নীচে, কখনো এম্ব্রেযারটিকে অবলম্বন ও অলংকৃত করা সরু সরু স্তম্ভের মাঝখানের জায়গাটিতে, আর প্রতিটি স্তম্ভশীর্ষের নিবিড় পর্ণরাজির ভেতর, আর সেখান থেকে বহুতর খিলানের অরণ্যময় ভল্টের দিকে শাখাবিস্তার করা, অন্যবিধ কিছু দৃশ্য দেখতে পেলাম, যার কথা ভাবতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে আমার, তবে কেবল তাদের রূপকশক্তি অথবা সেসবের নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমেই কেবল তারা তাদের অবস্থানের যাথার্থ্য প্রতিপন্ন করে। দেখলাম এক কামুক রমণী, নগ্ন, কৃশ, তাকে চিবিয়ে খাচ্ছে এক দল নোংরা ব্যাঙ,তার রক্ত চুষে নিচ্ছে কিছু সাপ, সঙ্গে আছে পেটমোটা একটা স্যাটির (satyr), গ্রিফিনের মতো সেটার পাদুটো তার-সদৃশ রোমে আবৃত, অশ্লীল গলায় নিজেরই সর্বনাশের রুক্ষ, কর্কশ গর্জন করে যাচ্ছে সেটা; দেখলাম এক কঞ্জুসকে, তার জাঁকাল স্তম্ভময় শয্যায় মৃত্যুর কাঠিন্যে কঠিন অবস্থায়, বর্তমানে যে কিনা অসহায় শিকার এক পাল পিশাচের, সেসবের একটি মুমূর্ষু লোকটার মুখের ভেতর থেকে তার আত্মাটা বের ক’রে আনছে একটা সদ্যোজাত শিশুর আকারে (হায়! চিরন্তন জীবনে সেটা কখনো জন্মলাভ করবে না আর); দেখলাম গর্বোদ্ধত এক লোককে, কাঁধের সঙ্গে তাঁর সেঁটে আছে এক শয়তান, নখরগুলো তার সেঁধিয়ে দিয়েছে লোকটার দুই চোখের ভেতর, অন্যদিকে, হাতাহাতির এক জঘন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এক অন্যকে ছিঁড়ে খাচ্ছে দুই পেটুক, দেখতে পেলাম আরো কিছু প্রাণীকেও, ছাগল-মাথা সিংহের রোম, চিতাবাঘের চোয়াল, সবাই বন্দি তারা অগ্নিশিখার এক অরণ্যে, আর সে-আগুনের সুতীব্র নিঃশ্বাস যেন অনুভব করতে পারছিলাম প্রায়। এদিকে তাদের চারপাশে, তাদের মাথার ওপর, আর তাদের পায়ের নীচে ছিল আরো কিছু মুখ আরো কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ: পরস্পরের চুল খামচে ধ’রে থাকা এক পুরুষ ও এক রমণী, অভিশপ্ত এক লোকের চোখ খুবলে নিতে থাকা দুটো বিষধর সাপ, দাঁত বের ক’রে হাসতে থাকা এক লোক, তাঁর বড়শি-বাঁকা হাতে এক হাইড্রার পাকস্থলী টেনে ফালাফালা করে ফেলছে সে, আর, শয়তানের কেচ্ছা-কাহিনীর বইতে দেখা মেলে যেসব জীব-জন্তুর[৫০] সেসব, সবাই জড়ো হয়েছে তারা এক সভাস্থলে আর তাদের বসিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের সামনের সিংহাসনটার রক্ষক ও মুকুট হিসেবে, সেটারই গুণকীর্তন করছে তাদের পরাজয়ে, ফন, দ্বিলিঙ্গবিশিষ্ট প্রাণী, ছ’আঙুলে জানোয়ার, সাইরেন, হিপোসেন্টর, গর্গন, হার্পি, ইনকিউবি, ড্র্যাগোপড, মিনোটার, লিংক্স, পার্ড, কিমেরা, নাক দিয়ে আগুন ছোটানো সাইনোফেলি, কুমীর, পলিকডেট, চুলওলা সাপ, সালামান্দার, শিংঅলা ভাইপার, কচ্ছপ, সাপ, পিঠে দাঁত বসানো দোমাথা জীব, হায়েনা, ভোঁদড়, বায়স, করাত-দাঁত সদৃশ শিংওলা হাইড্রোফোরা, ব্যাঙ, গ্রিফিন, বাঁদর, কুকুর-মাথা, লিউক্রোটা, ম্যান্টিকোর, শকুন, প্যারান্ডার, উইজ্ল, ড্রাগন, হুপি, পেঁচা, সরীসৃপ, হিপনেল, প্রেস্টার, স্পেকটাফিকাস, কাঁকড়াবিছে, সরিয়ান, তিমি, সিটাল, অ্যাম্ফিসবিনা, ইয়াকুলি, ডিপসাস, সবুজ গিরগিটি, পাইলট মাছ, অক্টোপাস, মোরে, আর সামুদ্রিক কাছিম।[৫০] নরকের তাবৎ প্রাণী মনে হলো যেন জড়ো হয়েছে সেখানে টিম্পানামে ‘উপবিষ্ট ব্যক্তি’-র আবির্ভাবে সদর দালান, অন্ধকার বনভূমি, হতাশ বন্ধ্যাভূমি হিসেবে কাজ করতে, তাঁর সামনে যিনি একই সঙ্গে প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন ভয়ও দেখাচ্ছেন, তাদেরকে, আরমাগেড্ডন-এ পরাজিতদের, উপস্থিত হয়েছে ‘তাঁর’ সামনে যিনি অবশেষে আবির্ভূত হবেন জীবিত আর মৃতদেরকে আলাদা করতে। এবং এ-দৃশ্য দেখে প্রায় হতভম্ব, আর, কোনো বন্ধুবৎসল পরিবেশে রয়েছি না শেষ বিচারের ময়দানে রয়েছি এ-কথা ভেবে দ্বিধাগ্রস্ত আমি যখন আতংকিত, আরেকটু হলেই চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে পড়ে আর কী, এমন সময় মনে হলো যেন শুনতে পেলাম (নাকি আসলেই শুনতে পেয়েছিলাম?) সেই কণ্ঠস্বর, দেখতে পেলাম সেই সব দৃশ্য যা শিক্ষানবীশ হিসেবে, পবিত্র গ্রন্থাবলী পাঠের আমার প্রথম অভিজ্ঞতায়, মেল্ক-এর কয়ারে আমার ধ্যানমগ্ন রাত্রিগুলোতে আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল, এবং আমার দুর্বল এবং দুর্বল হয়ে আসা স্নায়ুগুলোর সেই মতিচ্ছন্ন দশায় আমি তুর্যনিনাদের মতো এক প্রবল কণ্ঠ শুনতে পেলাম: “ ‘তুমি যাহা দেখিতেছ তাহা পত্রিকায় লিখ’ (আর আমি এখন ঠিক সে-কাজটিই করছি), এবং আমি মুখ ফিরাইয়া দেখিলাম, সপ্ত সুবর্ণ দীপবৃক্ষ, ও সেই সকল দীপবৃক্ষের মধ্যে “মনুষ্যপুত্রের ন্যায় এক ব্যক্তি”, তাঁর বক্ষস্থলে সুবর্ণ পটুকায় বদ্ধ কটি, তাঁহার মস্তক ও কেশ শুক্লবর্ণ মেষলোমের ন্যায়, তাঁহার চক্ষু অগ্নিশিখার তুল্য, এবং এবং তাঁহার চরণ অগ্নিকুণ্ডে পরিষ্কৃত সুপিত্তলের তুল্য, এবং তাহার রব বহুজলের রবের তুল্য, আর তাঁহার দক্ষিণ হস্তে সপ্ত তারা আছে, এবং তাঁহার মুখ হইতে তীক্ষ্ণ দ্বিধার তরবারি নির্গত হইতেছে। আর দেখিলাম স্বর্গে এক দ্বার খোলা রহিয়াছে, আর যিনি বসিয়া আছেন, তিনি দেখিতে সূর্য্যকান্তের ও সার্দ্দীয় মণির তুল্য, আর সেই সিংহাসনের চারিদিকে মেঘধনুক, সেই সিংহাসন হইতে বিদ্যুৎ, রব ও মেঘগর্জ্জন বাহির হইতেছে। আর উপবিষ্ট ব্যক্তি তাঁহার হস্তে একখানি তীক্ষ্ণ কাস্ত্যা লইয়া উচ্চ রবে চিৎকার করিয়া উঠিলেন: ‘আপনারা কাস্ত্যা লাগাউন, শস্য ছেদন করুন; কারণ শস্যছেদনের সময় আসিয়াছে; কেননা পৃথিবীর শস্য শুকাইয়া গেল।’ তাহাতে যিনি মেঘের ওপর বসিয়া আছেন, তিনি আপন কাস্ত্যা পৃথিবীতে লাগাইলেন, ও পৃথিবীর শস্যছেদন করা হইল।”

ঠিক সেই মুহূর্তে আমি উপলব্ধি করলাম দৃশ্যটি ঠিক সেই কথা বলছে যা মঠে ঘটে চলেছে, যা মঠাধ্যক্ষের স্বল্পবাক ওষ্ঠাধর থেকে জানা গেছে, এবং আমি যেসব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম ঠিক সেকথাই যে সেই প্রবেশপথে বর্ণনা করা ছিল এই নিশ্চিত বিশ্বাসে পরবর্তী দিন ক’টিতে আমি যে কতবার সেই প্রবেশপথটির কথা ভেবেছি! এবং আমি জানতাম আমারা ওখানে পৌঁছেছিলাম একটা বিশাল আর স্বর্গীয় গণহত্যার সাক্ষী হওয়ার জন্যে।

কেঁপে উঠলাম আমি, যেন অতি ঠাণ্ডা শীতবৃষ্টিতে সিক্ত হয়েছি আমি। আর তারপর আরো একটা কণ্ঠ শুনতে পেলাম আমি, তবে এবার সেটি এসেছে আমার পেছন থেকে, আর গলাটা অন্যরকম, কারণ আওয়াজটা এসেছে পৃথিবী থেকেই, আমার দেখা দৃশ্যের সেই চোখধাঁধানো মর্মস্থল থেকে নয়; সত্যি বলতে কী, এই আওয়াজটি সেই দৃশ্যটিকে চূর্ণবিচূর্ণ ক’রে দিল, কারণ, আমি ঘুরে দাঁড়াতে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমার মতোই ধ্যানমগ্ন উইলিয়াম-ও (আবারো তাঁর উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠলাম আমি) ঘুরে দাঁড়ালেন।

আমাদের পেছনের প্রাণীটি দৃশ্যত এক সন্ন্যাসীই বটে, যদিও তার ছেঁড়া আর নোংরা পোশাক দেখে তাকে ভবঘুরে বলেই বোধ হলো; আর তার মুখটা ছিল স্তম্ভশীর্ষগুলোতে এইমাত্র আমার দেখা দানবগুলোর মতো। আমার সারা জীবনে কোনোদিন শয়তানকে নিজের চোখের সামনে দেখিনি আমি, যদিও আমার অনেক ব্রাদার-ই তাকে দেখেছে; তবে আমার বিশ্বাস, কোনোদিন যদি সে আমার সামনে হাজির হতো, তাহলে সেই মুহূর্তে আমাদের সঙ্গে কথোপকথনে রত হওয়া লোকটির চেহারাই থাকত তার, যেহেতু মানুষের রূপ ধরবে বলে ঠিক করলেও নিজের প্রকৃতি পুরোপুরি লুকিয়ে ফেলতে ঐশ্বরিক বিধান বাধা দিতো তাকে। তার মাথাটা কেশশূন্য, প্রায়শ্চিত্তের জন্যে মুড়ে ফেলা হয়নি, বরং তা থকথকে একযিমা রোগের অতীত ক্রিয়ার ফল; ভুরু এতো ঝুলে পড়েছে যে তার মাথায় চুল থাকলে তার (পুরু এবং লোমশ) ভ্রূপল্লবের সঙ্গে মিশে যেতো; খুদে অস্থির মণিসহ চোখ দুটো গোল গোল, যদিও দৃষ্টিটা সরল নাকি বিদ্বেষপূর্ণ তা বুঝতে পারা গেল না: সম্ভবত, ভিন্ন ভিন্ন মেজাজে, দুটোই খেলে যায় সেখানে। নাকটাকে নাক বলা যায় না, কারণ ওটা স্রেফ দুই চোখের মাঝখানে শুরু হওয়া একটা হাড়, কিন্তু মুখ থেকে উঠে সেটা সঙ্গে সঙ্গেই বসে গেছে, তাতে সেটা রূপান্তরিত হয়েছে দুটো অন্ধকার গহ্বরে, ঘন রোমে ভরা চওড়া দুটো নাসারন্ধ্রে। একটা ক্ষতচিহ্নের মাধ্যমে নাকের সঙ্গে যুক্ত হওয়া মুখটা চওড়া এবং এবড়োখেবড়ো, বামের চেয়ে ডানের দিকেই বেশি প্রসারিত, আর অস্তিত্বহীন ওষ্ঠ এবং বেশ সুষ্পষ্ট ও মাংসল অধরের মাঝখান থেকে বেরিয়ে আছে, অসমান ছাঁদে, কালো, কুকুরের দাঁতের মতো ধারাল দাঁত।

হাসল লোকটা (অন্তত আমার সেরকমই মনে হল), তারপরে, যেন সতর্ক করে দিচ্ছে এমনি ভঙ্গিতে একটা আঙুল তুলে বলে উঠল:

‘penitenziagite (পেনিটেনযিয়াজিতে)![৫১] যে draco তোমার আত্মাকে in futurum কুরে কুরে খাবে সেটা থেকে সাবধান! মৃত্যু super nos! …প্রার্থনা করো যেন Santo Pater এসে es liberer nos malo আর আমাদের সব পাপ! হা! হা! পছন্দ হয়েছে বুঝি এই negromanzia de Domini Nostri Jesu Christi! Et anco jois m’es dols e plazer m’es dolors | Cave el diabolo! Semper ওঁৎ পেতে আছে আমার জন্যে কোনো এক angulum-এ, আমার গোড়ালীতে থাবা মারার জন্যে। কিন্তু সালভাতোরে কি আর বুদ্ধু! Bonum monasterium আর aquí refectorium আর প্রার্থনা করো Dominium nostrum-এর কাছে। আর বাকিটা merda-র যোগ্য নয়। আমেন। ঠিক বলেছি না?’

এই কাহিনী যখন আরো সামনের দিকে এগোবে, এই প্রাণীটির কথা আমাকে আবারো, বেশ বিশদ করেই বলতে হবে, তুলে ধরতে হবে তার কথাবার্তা। স্বীকার করছি, কাজটা খুব কঠিন বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে, কারণ, তখন যেরকম কিছুতেই বুঝতে পারিনি, এখনো বলতে পারছি না কোন ভাষায় কথা বলছিল সে। যে-ভাষায় মঠের বিদ্বান লোকজন মনের ভাব প্রকাশ করতেন সেই লাতিন নয় ভাষাটা, ওসব অঞ্চলের কোনো প্রাকৃত ভাষাও নয়, নয় আমার শোনা কোনো ভাষা। আমার ধারণা, আমার শোনা লোকটার প্রথম কথাগুলোর বর্ণনা এই মুহূর্তে যে দিলাম (যতটা স্মরণে আছে) তাতে ওর ভাষার একটা আবছা ধারণা দিতে পেরেছি আমি। লোকটার দুঃসাহসিক জীবন, আর কোথাও শেকড় না গেড়ে বিচিত্র যেসব জায়গাতে সে নানান সময়ে বাস করছে সেসব কথা পরে জানতে পেরে আমি বুঝতে পারি, সালভাতোরে কথা বলে সব ভাষাতেই, অথচ কোনো ভাষাতেই না। কিংবা বলা যায়, নিজে সে এমন একটা ভাষা আবিষ্কার করে নিয়েছে যে-ভাষার মধ্যে রয়েছে সে যেসব ভাষার সংস্পর্শে এসেছে তার সবগুলোরই পেশীতন্তু—ওদিকে, একবার আমার মনে হয়েছিল, ওর ভাষাটা দুনিয়ার উৎপত্তি থেকে ব্যাবেল-এর সুউচ্চভবন-এর ঘটনা পর্যন্ত একটা ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত সুখী মানবজাতি যে আদমীয় ভাষা ব্যবহার করেছে, অথবা মানবজাতির বিভক্তির সেই শোচনীয় ঘটনার পরে যেসব ভাষার উৎপত্তি হয়েছে সেসবের কোনোটিই নয়, বরং ঐশ্বরিক শাস্তির পরে প্রথম দিনের ঠিক সেই কোলাহলপূর্ণ অর্থহীন ভাষা, সেই আদিম বিভ্রান্তির ভাষা। এদিকে আবার সালভাতোরের কথাকে কোনো ভাষাও বলতে পারি না আমি, কারণ মানুষের সব ভাষারই কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে এবং প্রতিটি শব্দই ad placitum[৫২] একটা জিনিসকে বোঝাবে, একটি অপরিবর্তনীয় রীতি অনুযায়ী, কারণ মানুষ কুকুরকে একবার কুকুর আরেকবার বিড়াল বলতে পারে না, বা এমন কোনো ধ্বনি উচ্চারণ করতে পারে না যে-ধ্বনির বিপরীতে সচেতন মানুষ কোনো অর্থ সুনির্দিষ্ট করেনি, এই যেমন হঠাৎ যদি কেউ ‘ব্লিতিরি’ শব্দটা উচ্চারণ করে ওঠে তখন যেমনটি ঘটবে। কিন্তু তারপরেও, কোনো না কোনো ভাবে কিন্তু, সালভাতোরে কী বলতে চেয়েছে সেটা কিন্তু আমি বুঝেছিলাম, যেমনটা অন্য সবাই-ই বুঝেছিল। আর সেটাই প্রমাণ করে যে সে একটা নয় বরং সব ভাষাতেই কথা বলত, যদিও কোনোটাই শুদ্ধভাবে নয়, কখনো একটা কখনো আরেকটা থেকে শব্দ নিয়ে। পরে আমি এটাও খেয়াল করি যে, প্রথমে হয়ত সে লাতিনে কোনো একটা কিছুর কথা বলল, তারপর সেটারই কথা বলবে সে প্রোভাঁস-এ, এবং আমি বুঝতে পারলাম, সে কিন্তু নিজের বাক্যগুলো উদ্ভাবন করছে না বরং বর্তমান পরিস্থিতি আর সে যা বলতে চায় সেই অনুসারে অন্যান্য বাক্যের disiecta membra[৫৩] ইতস্তত বিক্ষিপ্ত খণ্ডাংশ ব্যবহার করছে, যা সে অতীতে কোনো এক সময় শুনেছিল, এই যেমন, খাবারের কথা বলতে গেলে যাদের সঙ্গে সে একসময় সেই খাবার খেয়েছিল কেবল তাদের কথা বা ভাষার সাহায্যেই তা বলতে পারত, এবং নিজের আনন্দের প্রকাশ ঘটাতে পারত কেবল সেই সব বাক্য দিয়ে যা সে আনন্দিত লোকজনকে বলতে শুনেছিল যখন সে নিজেও একই রকম আনন্দের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল। ওর ভাষাটা ছিল অনেকটা ওর মুখের মতো, যা কিনা অন্য লোকের মুখ থেকে তুলে নেয় টুকরো টুকরো অংশ বসিয়ে দিয়ে তৈরি করা, বা কোনো পবিত্র মানুষের দেহাবশেষ ধারণকারী দামী পাত্রের মতো, অন্যান্য পবিত্র বস্তুর ভাঙা টুকরো জোড়া দিয়ে বানানো যেসব আমি দেখেছি (sic licet magnis componere parva,[৫৪] অবশ্য যদি ঐশ্বরিক বস্তুর সঙ্গে নারকীয় বিষয়ের তুলনা করার এক্তিয়ার অমার থেকে থাকে)। সেই মুহূর্তে, অর্থাৎ তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাতের সময়, তার মুখ আর তার কথা বলার ধরন দেখে সালভাতোরেকে প্রবেশদ্বারের নীচে দেখা লোমশ আর খুরবিশিষ্ট সংকর প্রাণীগুলোর চাইতে আলাদা প্রাণী বলে কিছু মনে হয়নি। পরে আমি উপলব্ধি করি লোকটা সম্ভবত মজার, মনটা ভালো। এবং আরো পরে… না, গল্পের আগে দৌড়ালে চলবে না আমাদের। বিশেষ ক’রে যখন লোকটা কথা বলার পর উইলিয়াম বেশ কৌতূহলের সঙ্গে জেরা করলেন তাকে।

‘তুমি পেনিটেনযিয়াজিতে কথাটা বললে কেন?’

সালভাতোরে জবাবে বলে উঠল, ‘Domine frate magnificentissimo Jesus venturus est আর les hommes penitenzia[৫৫] করতেই হবে। ঠিক না?’

কঠোর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন উইলিয়াম। তুমি কি মাইনরাইটদের কোনো কনভেন্ট থেকে এসেছো এখানে?’

‘Non comprends[৫৬]।’

‘আমি জিগ্যেস করছি তুমি সন্ত ফ্রান্সিস-এর ফ্রায়ারদের সঙ্গে ছিলে কিনা; জানতে চাইছি তথাকথিত অ্যাপসলদের তুমি চিনতে কিনা..।’

মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেল সালভাতোরের, কিংবা বলা যায়, তার রোদে পোড়া বুনো মুখটা ধূসর হয়ে গেল। বেশ খানিকটা মাথা ঝুঁকিয়ে উইলিয়ামকে সম্মান জানালো সে, তারপর তার আধখোলা ঠোঁট জোড়ার ফাঁক দিয়ে ‘vade retro’[৫৭] কথাটা উচ্চারণ ক’রে পরম ভক্তিভরে আশীর্বাদ করল নিজেকে, তারপর একটু পর পর পেছন দিকে তাকাতে পিঠটান দিল।

‘আপনি কী জিগ্যেস করলেন ওকে?’ উইলিয়ামকে শুধোলাম আমি।

কিছুক্ষণের জন্যে চিন্তামগ্ন রইলেন উইলিয়াম। ‘ও কিছু না। পরে বলব তোমাকে। এখন চলো, ভেতরে যাওয়া যাক। উবার্তিনোকে দরকার আমার।’

ষষ্ঠ ঘণ্টার অব্যবহিত পর তখন। পাণ্ডুর সূর্যালোকটা পশ্চিম দিক থেকে আসছে, ফলে গির্জার ভেতরে ঢুকছে সেটা একেবারে অল্প কিছু সংকীর্ণ জানালা গলে। সূক্ষ্ম একফালি আলো তখনো প্রধান বেদিটা ছুঁয়ে আছে, সেটার সামনের অংশ সোনালী দীপ্তিতে জ্বলজ্বল করছে। পাশের নেইভগুলো ডুবে আছে আঁধারে।

বেদির সামনে, শেষ চ্যাপেলটার কাছে, বাম নেইভটাতে কৃশতর একটা স্তম্ভ দাঁডিয়ে। তার ওপর মেরীমাতার একটা পাথুরে মূর্তি বসানো, আধুনিক ধরনে খোদাই করা সেটা, মুখে অমলিন একটা হাসি। পেটটা সুস্পষ্ট, পরনে ছোট একটা বডিস সহ সুন্দর পোশাক, বাহুতে একটি শিশু। মেরীমাতার মূর্তির পাদদেশে, প্রার্থনারত, প্রায় ভূমিশায়িত হয়ে আছে ক্লুনিয়াক সম্প্রদায়ের পোশাক পরা এক ব্যক্তি।

এগিয়ে গেলাম আমরা। আমাদের পায়ের আওয়াজ পেয়ে মাথা তুলল লোকটি। বৃদ্ধ, টাকমাথা, মুখটায় দাড়িগোঁপের চি‎‎‎হ্ন নেই, বড় বড় পাণ্ডুর-নীল চোখ, পাতলা, লালমুখ, গায়ের রং সাদা, দুধে সংরক্ষিত মমির মতো একটা হাড়সর্বস্ব খুলির সঙ্গে সেঁটে আছে চামড়া। অকালমৃত্যুর ফলে শুকিয়ে যাওয়া এক কুমারীর মতো মনে হলো লোকটিকে। প্রথমে উদভ্রান্তের মতো একটা দৃষ্টি নিয়ে আমাদের দিকে তাকালেন তিনি, যেন একটা তুরীয় আনন্দময় দৃশ্য উপভোগের মাঝপথে বাগড়া দিয়েছি আমরা; তারপর মুখটা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার।

‘উইলিয়াম!’ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন তিনি। ‘প্রিয়তম ভাই আমার!’ একটু কষ্ট করেই উঠে দাঁড়ালেন তিনি। তারপর এগিয়ে এলেন আমার প্রভুর দিকে, জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে, চুমো খেলেন তাঁর মুখে। ‘উইলিয়াম!’ আবারো বলে উঠলেন তিনি, চোখ ভিজে এলো তাঁর জলে। ‘কতো দিন পর! কিন্তু তাঁরপরেও চিনতে পারছি আমি তোমাকে! কত দীর্ঘ সময়, কত কিছুই না ঘটে গেল এর মধ্যে। কত পরীক্ষার মধ্যেই না ফেললেন প্রভু!’ কাঁদতে থাকলেন তিনি। উইলিয়ামও জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে, স্পষ্টতই ভীষণভাবে আলোড়িত বোধ করছেন তিনি। আমরা এখন কাসালির উবার্তিনো সন্নিধানে।

এরিমধ্যে অনেক কথা শুনেছি আমি তাঁর সম্পর্কে, ইতালিতে আসার আগেই, আরো বেশি করে শুনেছি রাজদরবারের ফ্রান্সিসকানদের সঙ্গে মিশতে গিয়ে। কেউ একজন আমাকে বলেছিল যে সে-সময়কার সবচয়ে বড় কবি ফ্লোরেন্সের দান্তে আলেঘিরি, যিনি মাত্র কয়েক বছর হল মারা গেছেন, একটা কবিতা লিখেছিলেন (অবশ্য প্রাকৃত তাসকান ভাষায় লেখা বলে সেটা পড়তে পারিনি আমি) যেটার অনেক পঙ্‌ক্তি-ই উবার্তিনোর Arbor vitae crucifixae[৫৮]-এর কয়েকটি স্তবকের সারসংক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই নয়। এটাই যে বিখ্যাত লোকটির একমাত্র গুণ তা নয়। তবে আমার পাঠক যাতে এই সাক্ষাতের গুরুত্ব আরো ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারেন সেজন্যে আমাকে সেসব বছরের ঘটনাবলীর একটা বর্ণনা দেবার চেষ্টা করতেই হচ্ছে, যতটুকু আমি মধ্য ইতালিতে আমার ক্ষণিকের বাস আর বিভিন্ন মঠাধক্ষ ও সন্ন্যাসীর সঙ্গে আমাদের ভ্রমণকালীন উইলিয়ামের অসংখ্য কথপোকথন থেকে বুঝতে পেরেছিলাম।

এসব ব্যাপার-স্যাপার যতটুকু বুঝতে পেরেছিলাম তা আমি বলার চেষ্টা করবো, যদিও ঠিক নিশ্চিত নই সেসব আমি ঠিকমতো ব্যাখ্যা করতে পারবো কিনা। মেল্ক-এ আমার প্রভুরা আমাকে প্রায়ই বলতেন ইতালির ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক উত্থান-পতন পরিষ্কারভাবে বুঝে উঠতে পারা একজন উত্তরাঞ্চলবাসীর পক্ষে খুবই কঠিন।

উপদ্বীপটি, যেখানে যাজক সম্প্রদায়ের ক্ষমতা অন্য যেকোনো দেশের চাইতে অনেক বেশি সুস্পষ্ট, এবং যেখানে যাজকেরা তাদের ক্ষমতা এবং সম্পদের একটা প্রদর্শনীতে মেতে ওঠে, সেখানে দুর্নীতিপরায়ণ যাজকদের বিরুদ্ধে অন্তত দুশ বছরের জন্যে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র জীবনের জন্যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, এবং তাদের কাছ থেকে লোকে স্যাক্রামেন্ট নেয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিল। বিভিন্ন স্বাধীন সম্প্রদায় গড়ে তুলেছিল তারা, এবং সামন্ত প্রভু, সম্রাট এবং নগর ম্যাজিস্ট্রেট তাদেরকে একইরকম ঘেন্নার চোখে দেখত।

দারিদ্র্যের প্রতি ভালোবাসার বাণী প্রচার করতে অবশেষে আবির্ভূত হলেন সন্ত ফ্রান্সিস, এবং তাঁর বাণী ছিল গির্জার কথার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এবং তাঁর প্রচেষ্টার সূত্র ধরে গির্জা কঠোর জীবনাচরণের প্রতি সেসব পুরনো আন্দোলনের আহ্বানকে স্বীকৃতি দিল, এবং সেসবের মধ্যে ওঁৎ পেতে থাকা বিঘ্ন সৃষ্টিকারী উপাদান দূর ক’রে তা পরিশুদ্ধ করল। এরপরে নম্রতার, পবিত্রতার একটা সময় আসার কথা ছিল, কিন্তু কলেবর বৃদ্ধি পেয়ে ফ্রান্সিসকান সম্প্রদায় সর্বোত্তম মানুষগুলোকে আকৃষ্ট করাতে একসময় সেটা প্রবল শক্তিশালী হয়ে উঠল, বড্ড বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ল জাগতিক ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে, ফলে অনেক ফ্রান্সিসকানই চাইল সম্প্রদায়টিকে সেটার আগের বিশুদ্ধ অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে। আমি যখন সেই মঠে অবস্থান করছি সে-সময়ে যে-সম্প্রদায়ের সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা সদস্য সংখ্যা তিরিশ সহস্রাধিক সে-সম্প্রদায়ের জন্যে কাজটা বড়ই কঠিন। কিন্তু তাই ঘটল এবং সম্প্রাদায়টি যে ‘নীতি’-র জন্ম দিয়েছিল সন্ত ফ্রান্সিসের অনেক সন্ন্যাসী সেই নীতির বিরুদ্ধাচারণ করল, এবং তারা বলল সম্প্রদায়টি এরিমধ্যে সেই সব যাজকীয় প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্যাবলী অর্জন করেছে যেসব প্রতিষ্ঠানের সংস্কার সাধনের জন্যেই সেটার জন্ম হয়েছিল। তারা এ-ও বলল, সন্ত ফ্রান্সিস জীবিত থাকাকালীনই এমনটি ঘটেছিল, এবং তাঁর শিক্ষা ও লক্ষ্য ব্যর্থ হয়েছিল। তাদের অনেকেই সে-সময়ে নতুন করে একটি বই আবিষ্কার করল যেটা জোয়াকিম নামের এক সিস্টার্সীয় সন্ন্যাসী লিখেছিলেন আমাদের যুগের দ্বাদশ শতকে, এবং তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা ছিল বলে লোকে ভাবত। আর সত্যি সত্যিই তিনি এক নতুন যুগের আবির্ভাবের বিষয় আগে ভাগেই দেখতে পেয়েছিলেন, যে-যুগে যীশুর মহিমা জগতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে, যে-মহিমা তাঁর নকল অ্যাপসলদের কাজের ফলে অনেক আগেই খর্ব হয়ে গিয়েছিল। আর তিনি ভবিষ্যতের কিছু ঘটনা এমনভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে সবার কাছেই এ-বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে নিজের অজান্তেই তিনি ফ্রান্সিসকান সম্প্রদায়ের কথা বলছিলেন। কাজেই অনেক ফ্রান্সিসকানই বেজায় খুশি হয়ে উঠেছিল, মনে হয় বাড়াবাড়ি রকমই, কারণ তখন, শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, সরবোন-এর প-িতরা মঠাধ্যক্ষ জোয়াকিমের শিক্ষার নিন্দা জানিয়েছিলেন। দৃশ্যত, কাজটা তাঁরা এজন্যে করেছিলেন যে ফ্রান্সিসকান (এবং ডমিনিকানরা) অতিমাত্রায় শক্তিশালী অতিমাত্রায় জ্ঞানী হয়ে উঠছিল প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে, এবং সরবোনের সেই পণ্ডিতকুল হেরেটিক বা ধর্মদ্বেষী আখ্যা দিয়ে নিকেশ করে দিতে চাইছিলেন তাদেরকে। কিন্তু চক্রান্তটা সফল হয়নি, তাতে ভালোই হয়েছিল গির্জার জন্যে, এবং গির্জা তখন টমাস অ্যাকুইনাস আর ব্যাগনেরেজিও-র বোনাভেনতুরা[৫৯]—যাঁরা নিশ্চিতভাবেই ধর্মদ্বেষী নন—তাঁদের রচনাবলী প্রচারের অনুমতি দিল। তারই ফলে এটা বোঝা গেল যে প্যারিসেও ধারণাগত একটা বিভ্রান্তি ছিল, বা এমন কেউ ছিল যে নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্যে সেসব ধারণাগুলো সম্পর্কে একটা বিভ্রান্তি তৈরি করতে চেয়েছিল। আর হেরেসি বা বিরুদ্ধ ধর্মমত খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী লোকজনের ওপর ঠিক সেই মন্দ প্রভাবটিই ফেলে; মতাদর্শগত ধন্দে ফেলে দেয় তাদের আর সবাইকে ইনকুইযিটর হওয়ার জন্যে উস্কে দেয় যাতে তারা ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধি করতে পারে। কারণ মঠে তখন আমি যা দেখেছি (এবং এখন যার বর্ণনা দিতে যাচ্ছি) তাতে আমার এটা ভেবে নেয়ার কারণ রয়েছে যে প্রায় সময়েই ইনকুইযিটররাই হেরেটিক বা ধর্মদ্বেষী সৃষ্টি করে, এবং সেটা যে কেবল এই অর্থে যে যেখানে কোনো ধর্মদ্বেষীর অস্তিত্ব নেই সেখানেও তারা ধর্মদ্বেষীদের কল্পনা ক’রে নেয়, তা নয়, বরং ইনকুইজিটররা ধর্মদ্বেষমূলক পচন এমন প্রবলভাবে দমন করে যে অনেকেই বিচারকের প্রতি আক্রোশবশত সেই পচনের অংশীদার হয়। সত্যি বলতে কী, এই দুষ্টচক্রটা শয়তানের ফন্দি। ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন।

কিন্তু আমি বলছিলাম জোয়াকিমাইটদের ধর্মদ্বেষিতার কথা (অবশ্য সেরকম যদি কিছু থেকে থাকে)। আর তাসকেনিতে ছিলেন এক ফ্রান্সিসকান, বোর্জো সান ডনিনোর জেরার্ড, জোয়াকিমের ভবিষ্যদ্বাণীর পুনরাবৃত্তি ক’রে মাইনরাইটদের ওপর গভীর ছাপ ফেলেছিলেন তিনি। ফলে তাদের মধ্যে ‘সাবেক রীতি’র একদল সমর্থক তৈরি হল, সম্প্রদায়টি পুনর্গঠনে মহান বোনাভেনতুরার প্রচেষ্টার বিরোধিতা সত্ত্বেও, সেই বোনাভেনতুরা যিনি সেটির জেনারেল হয়েছিলেন। ফ্রান্সিসকানদেরকে যে-শত্রুরা একেবারে নিকেশ করে দিতে চেয়েছিল তাদের হাত থেকে গত শতকের শেষ তিরিশ বছর ধরে লিঅনস-এর কাউন্সিল সম্প্রদায়টিকে রক্ষা করে আসছিল, এবং সম্প্রদায়টির হাতে যেসব সম্পত্তি ছিল তার সব কিছুরই মালিকানা বজায় রাখার অনুমতি দিয়েছিল কাউন্সিল (যা কিনা প্রাচীনতম সম্প্রদায়গুলোর জন্যে এরিমধ্যে আইন হয়ে গিয়েছিল)। কিন্তু মার্চেস-এর কিছু কিছু সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ক’রে বসল, কারণ তারা বিশ্বাস করত সেই ‘রীতি’-র মর্মবস্তুর সঙ্গেই চরম বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে, কারণ, ফ্রান্সিসকানদের নিজেদের বলতে কোনো কিছুই থাকা চলবে না, না ব্যক্তিগতভাবে, না কনভেন্ট হিসেবে, না একটি সম্প্রদায় হিসেবে। এই বিদ্রোহীদেরকে সারা জীবনের জন্যে কয়েদ ক’রে রাখা হল। আমার মনে হয় না যে তারা গসপেল-বিরোধী কোনো কিছু প্রচার করছিল, কিন্তু প্রশ্নটি যখন জাগতিক বস্তু করায়ত্ত করার তখন মানুষের পক্ষে সঠিকভাবে বিচার-বিবেচনা প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমাকে বলা হয়েছিল যে বেশ কিছু বছর পর, সম্প্রদায়ের নতুন জেনারেল রেমন্ড গাউফ্রেদি আনকোনাতে এসব বন্দির দেখা পেয়েছিলেন, এবং তিনি তাদেরকে মুক্ত ক’রে দেয়ার পর বলেছিলেন: “ঈশ্বরের কৃপায় আমাদের সবাই আর পুরো সম্প্রদায়টিই যদি এমন পাপে কলংকিত হতো!” ধর্মদ্বেষীরা যা বলে তা যে সত্য নয় এবং গির্জায় যে এখনো মহৎপ্রাণ লোক রয়েছে এটা তারই একটা নিদর্শন।

এই সব মুক্ত বন্দিদের মধ্যে অ্যাঞ্জেলাস ক্ল্যারেনাস বলে একজন ছিলেন, তাঁর সঙ্গে পরে দেখা হয়েছিল প্রোভেন্স থেকে আসা এক সন্ন্যানী পিয়ের ওলিউ-র, যিনি জোয়াকিমের ভবিষ্যদ্বাণীগুলো প্রচার করছিলেন, এবং তারপর তার সঙ্গে দেখা হয় কাসলির উবার্তিনোর, আর এভাবেই সূত্রপাত ঘটেছিল স্পিরিচুয়ালদের[৬০] আন্দোলনের। সেই সময়ে পোপের সিংহাসনে অধিষ্ঠান ঘটে মারোনের পিটার নামে এক পুতঃপবিত্র সন্ন্যাসীর; পঞ্চম সেলেস্তিন নামে শাসন করেছিলেন তিনি। স্পিরিচুয়ালরা পরম স্বস্তি নিয়ে স্বাগত জানাল তাঁকে। বলা হয়েছিল, ‘এক সন্ত আবির্ভূত হবেন, এবং তিনি খৃষ্টের শিক্ষা অনুযায়ী কাজ করবেন, এবং দেবেদূতোপম জীবনযাপন করবেন তিনি: দুর্নীতিপরায়ণ যাজকবৃন্দ, হুঁশিয়ার।’ হতে পারে সেলেস্তিনের জীবন ছিল অতিমাত্রায় দেবদূতোপম, অথবা হয়ত তার আশেপাশের যাজকরা খুবই দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল, অথবা তিনি হয়ত সম্রাট এবং ইউরোপের অন্যান্য রাজার সঙ্গে নিরন্তর দ্বন্দ্বের পীড়ন সহ্য করতে পারছিলেন না। তা সে যা-ই হোক না কেন, ঘটনা হচ্ছে সেলেস্তিন তাঁর সিংহাসন পরিত্যাগ করলেন এবং একটি আশ্রমে গিয়ে ঠাঁই নিলেন। কিন্তু তার সেই সংক্ষিপ্ত শাসনামলেই, যা কিনা ছিল এক বছরেরও কম, স্পিরিচুয়ালদের সব আশা পূর্ণ হল। সেলেস্তিনের কাছে গিয়েছিল তারা এবং তিনি তাদের সঙ্গে মিলে fratres et pauperes heremitae domini Celestini[৬১] নামক একটি সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করলেন। অন্যদিকে পোপের যখন রোমের সবচাইতে শক্তিশালী কার্ডিনালদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার কথা, তখন কোলোনা আর অরসিনি নামে দু’জন গোপনে নব্য দারিদ্র্য আন্দোলনকে সমর্থন জানালো; সামর্থ্যবান মানুষ, যাঁরা বিপুল বৈভব আর বিলাসের মধ্যে জীবন যাপন করেন, তাদের পক্ষে এমন একটি পথ বেছে নেয়া সত্যিই অদ্ভুত; এবং আমি কখোনোই বুঝতে পারিনি যে তাঁরা কি নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে স্পিরিচুয়ালদের মাথায় কাঁঠাল ভাঙছিলেন নাকি তাদের মনে হয়েছিল যে স্পিরিচুয়ালদের প্রবণতাকে সমর্থন জানানোর মধ্যে দিয়ে তাঁরা তাদের ভোগ-বিলাসের জীবনকে একটা যৌক্তিকতা দান করছেন। ইতালীয় হালচালের যৎসামান্য আমি যা বুঝি তাতে সম্ভবত দুটোই সত্য। উদাহরণস্বরূপ, যখন স্পিরিচুয়ালদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রদ্ধাভাজন হিসেবে পরিণত হয়ে উবার্তিনো ধর্মদ্বেষী হিসেবে অভিযুক্ত হওয়ার ঝুঁকির মুখোমুখি তখন কার্ডিনাল অরসিনি উবার্তিনোকে চ্যাপলেন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তারপর কার্ডিনাল স্বয়ং উবার্তিনোকে রক্ষা করেছিলেন অ্যাভিনন-এ।

সে যাই হোক, এসব ক্ষেত্রে সচরাচর যা ঘটে, একদিকে অ্যাঞ্জেলাস আর উবার্তিনো ধর্মমত অনুযায়ী প্রচার চালিয়ে গেলেন, আর অন্যদিকে দলে দলে সাধারণ জনতা তাঁদের সেই বাণী সত্য বলে গ্রহণ করে সারা দেশে, সব বিধিনিষেধের গণ্ডীর ওপারে ছড়িয়ে দিল। কাজেই ইতালী এই ফ্রাতিচেল্লী (Fraticelli) বা দরিদ্র জীবনের পাদ্রীদের দ্বারা আক্রান্ত হল, যাদেরকে তারা বিপজ্জনক বলে মনে করত। এই পর্যায়ে, কারা যে স্পিরিচুয়ালদের প্রভু, যারা যাজকীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখত, আর কারা তাদের নগণ্য অনুসারী, যারা তখন সম্প্রদায়ের বাইরের বাসিন্দা, ভিক্ষা ক’রে বেড়াচ্ছে আর কায়িক শ্রম দ্বারা উপার্জিত অর্থ দিয়ে দিন গুজরান করছে, কোনো ধরনের সম্পত্তিই যাদের নেই, তা বোঝা দুষ্কর হত। আর এই জনগোষ্ঠী নিজেদের নাম দিল ফ্রাতিচেল্লি, অনেকটা ফরাসী বেগার্ডদের (Beghards)[৬২] মতো, যারা পিয়ের ওলিউ-ও কাছ থেকে প্রেরণা লাভ করত। পঞ্চম সেলেস্তিনের পর পোপের পদে অধিষ্ঠিত হলেন অষ্টম বনিফেস, এবং তিনি স্পিরিচুয়াল ও ফ্রাতিচেল্লিদের সম্পর্কে মোটের ওপর এক ধরনের নিস্পৃহতাই দেখালেন। অস্তগামী শতাব্দীর শেষ বছরগুলোর দিকে তিনি Firma cautela[৬৩] নামক একটা হুকুমনামা (bull) জারি করলেন, যেখানে একই সঙ্গে তিনি বিতোচি (Bizochi—পোপ দ্বাদশ জন ১৩১৭ খৃষ্টাব্দে তাঁর হুকুমনামায় ফ্রাতিচেল্লিদের এই নামেই অভিহিত করেছিলেন। অনুবাদক) আর খোদ স্পিরিচুয়ালদের মুণ্ডুপাত করলেন। এই বিতোচি-রা ভবঘুরে ভিক্ষুক সম্প্রদায়, যাদের অবস্থান ফ্রান্সিসকানদের একেবারে শেষ প্রান্তে, আর স্পিরিচুয়ালরা তখন সম্প্রদায় ত্যাগ করে মঠ বা আশ্রমবাসী হয়েছে।

অষ্টম বনিফেসের মৃত্যুর পর স্পিরিচুয়ালরা তাঁর কিছু উত্তরাধিকারীর কাছ থেকে, তাঁদের মধ্যে পঞ্চম ক্লেমেন্ট অন্যতম, শান্তিপূর্ণভাবে সম্প্রদায় ত্যাগ করার অনুমতি প্রার্থনা করলেন। আমার বিশ্বাস তাঁরা তাতে সফল হতেন, কিন্তু দ্বাদশ জনের আবির্ভাব তাঁদের সব আশা কেড়ে নিল। সিসিলিতে তখন অনেক সন্ন্যাসী আশ্রয় নিয়েছিল; ১৩১৬ খ্রিষ্টাব্দে পোপ নির্বাচিত হওয়ার পর দ্বাদশ জন সিসিলির রাজাকে তার রাজ্য হতে সেসব সন্ন্যাসীকে তাড়িয়ে দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে পত্র পাঠালেন; এছাড়া তিনি অ্যাঞ্জেলাস ক্ল্যারেনাস আর প্রভেন্স-এর স্পিরিচুয়ালদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করলেন।

সব কিছু এতো মসৃণভাবে চলতে পারে না, এবং কুরিয়া (curia) এ-কাজে বাধা দিল। উবার্তিনো আর ক্ল্যারেনাস সম্প্রদায় ত্যাগ করার অনুমতিলাভের ব্যবস্থা করতে পারলেন। প্রথমজনকে গ্রহণ করল বেনেডিক্টীয়রা, দ্বিতীয়জনকে সেলেস্তিনীয়রা। কিন্তু অন্য যারা তাদের স্বাধীন জীবন যাপন অব্যাহত রাখল তাদের প্রতি এতটুকু করুণা করলেন না জন। ইনকুইজিশনের মাধ্যমে তাদের ওপর নির্যাতন চালালেন তিনি এবং অনেককেই পুড়িয়ে মারা হলো।

তিনি উপলব্ধি করলেন যে যারা খোদ গির্জার কর্তৃত্বের জন্যে হুমকিস্বরূপ সেই ফ্রাতিচেল্লির আগাছা উপড়ে ফেলতে হলে তাঁকে সেই বিশ্বাসটিতে আঘাত হানতে হবে যে-বিশ্বাসের ওপর তারা দাঁড়িয়ে আছে। তারা দাবি করত যীশু এবং তাঁর অ্যাপসলদের নিজের বলতে কোনো সম্পত্তিই ছিল না, ব্যক্তিগত ভাবেও না, সম্মিলিতভাবেও না। এবং পোপ এই ধারণাটিকে ধর্মদ্রোহী বলে নিন্দা জানালেন। পোপের এই অবস্থানটি কিন্তু খুবই আশ্চর্যজনক, কারণ যীশু যে দরিদ্র ছিলেন এই ধারণাটিকে পোপ কেন ধর্মভ্রষ্ট বলে মনে করলেন তার কোনো সুস্পষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না; অথচ মাত্র এক বছর আগে, পেরুজিয়াতে ফ্রান্সিসকানদের এক সাধারণ সম্মেলনে পোপ কিন্তু এর বিরুদ্ধ মতটিকেও নিন্দা জানিয়েছিলেন। আগেই বলেছি, সম্রাটের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ওই সম্মেলনটি একটি বিশাল পরাজয়; এটাই হচ্ছে আসল কথা। কাজেই, অনেক ফ্রাতিচেল্লিকেই, যারা সাম্রাজ্য আর পেরুজিয়া সম্পর্কে কিছুই জানত না, পুড়িয়ে মারা হলো।

তো, এসব চিন্তাই খেলে যাচ্ছিল আমার মাথায় কিংবদন্তীসম উবার্তিনোর দিকে অনিমেষে তাকিয়ে থাকতে থাকতে; আমার প্রভু আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিতে বৃদ্ধ তাঁর একটি উষ্ণ, প্রায় জ্বলন্ত হাত দিয়ে আমার গালটা আলতো করে ছুঁলেন। পবিত্র মানুষটি সম্পর্কে অসংখ্য যেসব কথা শুনেছিলাম আর তাঁর লেখা Arbor vitae crucifixae-র পাতায় আমি যা পড়েছিলাম তার অনেক কিছুরই মানে বুঝে গেলাম আমি সেই হাতের স্পর্শে: নিগূঢ় রহস্যময় যে-আগুন তাঁকে তাঁর যৌবনে গ্রাস করেছিল, যখন, প্যারিসে অধ্যয়নরত থাকলেও ঈশ্বরতাত্ত্বিক ভাবনা চিন্তা থেকে সরে এসেছিলেন তিনি, এবং অনুতপ্ত মাগদালেন-এ (Magdalen) রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছেন বলে কল্পনা করেছিলেন নিজেকে, সেই আগুনের মানে বুঝতে পারলাম আমি; তারপর ফোলিনো-র সন্ত অ্যাঞ্জেলার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সংযোগেরও মানে বুঝতে পারলাম আমি, সেই সন্ত অ্যাঞ্জেলা যিনি মরমী জীবন আর ক্রুশ এর বন্দনায় দীক্ষিত করেছিলেন তাঁকে; বুঝলাম, কেন তাঁর ঊর্ধ্বতনরা তাঁর ধর্মপ্রচারের সুতীব্রতায় সন্ত্রস্ত হয়ে একদিন লা ভার্নায় অবসরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তাঁকে।

গভীর মনোযোগের সঙ্গে মুখটি পর্যবেক্ষণ করলাম আমি, সেটার বিভিন্ন অংশ সন্ত বলে ঘোষিত সেই নারীর মতন মিষ্টি যাঁর সঙ্গে উন্মত্তের মতো আধ্যাত্মিক ভাবনা-চিন্তা বিনিময় করেছেন তিনি। আমি টের পেলাম, তাঁর চোয়াল নিশ্চয়ই শক্ত হয়ে উঠেছিল যখন ১৩১১ খৃষ্টাব্দে ভিয়েনে কাউন্সিল[৬৪] Exivi de paradiso[৬৫] ডিক্রির মাধ্যমে স্পিরিচুয়ালদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ ফ্রান্সিসকান ঊর্ধ্বতনদের পদচ্যুত করেছিল, যদিও স্পিরিচুয়ালদেরকে আহ্বান জানিয়েছিল সম্প্রদায়ের ভেতর শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে; এবং কৃচ্ছসাধনের এই গুরু সেই ধূর্ত আপোষ মেনে নেননি বরং ভিন্ন একটি সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন সর্বোচ্চ কঠোরতার নীতি অবলম্বন ক’রে। এরপর মহান এই যোদ্ধা তাঁর যুদ্ধে হেরে যান, কারণ সেই সময়টায় দ্বাদশ জন একটা প্রবল যুদ্ধ চালাচ্ছিলেন পিয়ের ওলিউ-র অনুসারীদের বিরুদ্ধে (যাঁদের মধ্যে স্বয়ং উবার্তিনোকেও ধরা হচ্ছিল) এবং তিনি নারবোন ও বেযিয়ার্স-এর সন্ন্যাসীদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। কিন্তু পোপের বিরুদ্ধে নিজের বন্ধুর স্মৃতিকে রক্ষা করতে ইতস্তত করলেন না উবার্তিনো, এবং তাঁর পবিত্রতার কাছে পরাস্ত হয়ে জন তার বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে সাহস পেলেন না (যদিও অন্যদের বেলাতে তিনি তা করেছিলেন)। সেসময়ে সত্যিই তিনি উবার্তিনোকে নিজের গা বাঁচাবার একটা উপায় বাতলে দিয়েছিলেন, প্রথমে তাঁকে নানা উপদেশ দিয়ে, আর তারপর তাঁকে ক্লুনীয় সম্প্রদায়ে প্রবেশের আদেশ দিয়ে। দৃশ্যত ভীষণভাবে নিরস্ত এবং ভঙ্গুর উবার্তিনো নিশ্চয়ই পোপের দরবারে পরিত্রাতা এবং বন্ধু জোটাবার ব্যাপারে কম যেতেন না, এবং সত্যি বলতে কী, ফ্ল্যান্ডার্সের জেমব্লাশ মঠে যাবার জন্যে রাজিই ছিলেন তিনি, কিন্তু আমার বিশ্বাস, তিনি ওখানে কখনোই যাননি, বরং আভীনিঅঁ-তেই রয়ে যান তিনি, কার্ডিনাল অরসিনি-র ছত্রছায়ায়, ফ্রান্সিসকানদের আদর্শ রক্ষা করার উদ্দেশ্যে।

সাম্প্রতিক সময়েই কেবল (এবং আমি যেসব গুজব শুনেছিলাম সেসব ছিল ভিত্তিহীন) দরবারে গুরুত্ব হারাতে শুরু করেন তিনি, আভীনিঅঁ ত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং পোপ এই অদম্য মানুষটিকে তাড়া করে ফিরলেন এবং তিনি per mundum discurrit vagubundus[৬৬]। তারপর বলা হলো তাঁকে আর খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। মাত্র সেদিন বিকেলেই উইলিয়াম আর মঠাধ্যক্ষের কথপোকথন থেকে জানতে পারলাম যে এই মঠেই লুকিয়ে আছেন তিনি। আর এখন তিনি আমার সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

তিনি বলে চলেছেন, ‘জানো, উইলিয়াম, ওরা আমাকে মেরেই ফেলেছিল প্রায়। গভীর রাতে প্রাণ হাতে করে পালাতে হয়েছিল আমাকে।’

‘কে মারতে চেয়েছিল আপনাকে? জন?’

‘না। জন কখনোই আমাকে খুব পছন্দ করত না, কিন্তু আমাকে সেই বরাবরই শ্রদ্ধা ক’রে এসেছে। শত হলেও, বেনেডিক্টীয় সম্প্রদায়ে যোগ দিয়ে আমি যেন আমার শত্রুদের মুখ বন্ধ ক’রে দিই এই আদেশ আমাকে দিয়ে বিচার এড়াবার একটা প্রস্তাব দশ বছর আগে সে-ই তো দিয়েছিল আমায়। দীর্ঘদিন গজগজ করেছে ওরা, এই বলে বক্রোক্তি করেছে যে দারিদ্র্যের এতবড় একজন প্রবক্তা কিনা এমন ধনী একটি সম্প্রদায়ে যোগ দিয়ে কার্ডিনার অরসিনির দরবারে বাস করবে। উইলিয়াম, জাগতিক জিনিসের ব্যাপারে আমার ঘৃণার কথা তো তোমার জানাই আছে! কিন্তু আভীনিঅঁ-তে থাকার এবং আমার ব্রাদারদের বাঁচানোর সেটাই ছিল পথ। পোপ অরসিনিকে ভয় পায়, আমার মাথার একটা চুলেরও ক্ষতি করতো না সে। এই তো, তিন বছর আগে তার দূত হিসেবে অ্যারাগনের রাজার কাছে পাঠিয়েছিল সে আমাকে।’

‘তাহলে কে মারতে চেয়েছিল আপনাকে?’

‘ওরা সবাই। কিউরিয়া। দু’দুবার খুন করার চেষ্টা করেছে তারা আমাকে। আমার মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল তারা। পাঁচ বছর আগে কী ঘটেছিল তুমি জানো। এর দু’বছর আগে নারবোন-এর বেগার্ডদেরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং বেরেঙ্গার তাল্লোনি নিজে একজন বিচারক হয়েও এই আদেশের বিরুদ্ধে পোপের কাছে আপীল করেন। কঠিন একটা সময় ছিল সেটা। জন এরিমধ্যে স্পিরিচুয়ালদের বিরুদ্ধে দুটো হুকুমনামা জারি করেছেন, এমনকি সেসেনা-র মাইকেল পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছেন – ভালো কথা, কখন পৌঁছোচ্ছেন তিনি?’

‘দু’দিনের মধ্যেই এসে পড়বেন তিনি।’

‘মাইকেল… অনেক দিন তাঁর সঙ্গে দেখা নেই আমার। এবার তিনি এখানে আসছেন, আমরা কী চেয়েছিলাম সেটা তিনি বোঝেন, পেরুজিয়া সম্মেলনও জোর দিয়ে বলেছে যে আমরাই ঠিক। কিন্তু তখন, ১৩১৮তে পোপের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন তিনি এবং তাঁর হাতে প্রোভাঁস-এর পাঁচজন অবাধ্য স্পিরিচুয়ালকে তুলে দিয়েছিলেন। পুড়িয়ে মারা হয়েছিল তাদের, উইলিয়াম… ওহ্, ভয়ংকর!’ দু’হাতে নিজের মুখ ঢাকলেন তিনি।

‘কিন্তু তাল্লোনির আপীলের পরে ঠিক কী ঘটেছিল?’ উইলিয়াম শুধোলেন।

‘জন বাধ্য হয়েছিলেন বিতর্কটা ফের চালু করতে, বুঝলে! কাজটা তাঁকে করতেই হয়েছিল, কারণ কিউরিয়াতেও এমন কিছু লোক ছিল যারা সংশয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল, এমনকি কিউরিয়ার ফ্রান্সিসকানেরাও—ফ্যারিসি, ভণ্ড লোকজন সব, যাজকভাতার জন্যে নিজেদের বিক্রি করতেও একপায়ে খাড়া, কিন্তু সংশয়াচ্ছন্ন। ঠিক এই সময়েই জন আমাকে দারিদ্র্য সম্পর্কে একটা স্মারকপত্র রচনা করতে বলে। চমৎকার একটা লেখা হয়েছিল সেটা, উইলিয়াম, ঈশ্বর আমার অহংকার ক্ষমা করুন…।’

‘পড়েছি আমি সেটা। মাইকেল দেখিয়েছিলেন আমাকে।’

‘এমনকি আমাদের লোকের মধ্যেও সন্দিহান লোক ছিল, অ্যাকুইটেইন-এর প্রভিন্শ্যাল, সান ভিতালির কার্ডিনাল, কাফ্ফা-র বিশপ…’

‘একটা নির্বোধ,’ উইলিয়াম বলে উঠলেন।

‘তার আত্মা শান্তি পাক। দু’বছর আগে ঈশ্বর তাকে ডেকে নিয়েছেন।’

‘ঈশ্বর অতটা করুণাময় নন। ওটা ছিল কনস্টান্টিনোপল থেকে আসা একটা ভুয়ো খবর। এখনো আছে সে আমাদের মধ্যে। এবং আমাকে বলা হয়েছে প্রতিনিধি দলের মধ্যে সেও থাকবে। ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন!’

‘পেরুজিয়া সম্মেলনের প্রতি কিন্তু সহানুভূতি আছে তার,’ উবার্তিনো বললেন।

‘ঠিক তাই। সে হচ্ছে সেই জাতের লোক যারা সবসময় তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীর সেরা সমর্থক।’

উবার্তিনো বললেন, ‘সত্যি বলতে কী, এমনকি তখনো সে খুব একটা কাজে লাগেনি এ-ব্যাপারে। তো, কোনো কিছুতেই কিছু হলো না, তবে ধারণাটিকে যে ধর্মদ্বেষী বলে আখ্যা দেয়া হলো না সেটাই বড় কথা। কাজেই অন্যরা আমাকে আর কখনোই ক্ষমা করল না। সব দিক থেকে চেষ্টা করেছে তারা আমার ক্ষতি করবার, বলেছে তিন বছর আগে লুই যখন জনকে ধর্মদ্রোহী বলে আখ্যা দিয়েছিল তখন আমি নাকি সাচসেনহাউসেন-এ ছিলাম। অথচ ওরা কিন্তু জানত আমি সে-বছরের জুলাইতে অরসিনি-র সঙ্গে আভীনিঅঁ-তে ছিলাম।… ওরা আবিষ্কার ক’রে বসল সম্রাটের ঘোষণার খানিকটা নাকি আমারই ধারণার প্রতিফলন। কী পাগলামী!’

উইলিয়াম বললেন, ‘ততটা কিন্তু নয়। আমিই ওদেরকে ধারণাটা দিই, আপনার আভীনিঅঁ ঘোষণা আর ওলিউ-র লেখা কিছু পাতা থেকে নিয়ে।’

আশ্চর্য এবং আনন্দিত, এই দুয়ের মাঝামাঝি একটা কণ্ঠে উবার্তিনো বলে উঠলেন, ‘তুমি? তুমি তাহলে আমার সঙ্গে একমত?’

উইলিয়ামকে অপ্রস্তুত দেখাল। তিনি এড়িয়ে যাবার সুরে বললেন, ‘সে-সময় সম্রাটের জন্যে ওটাই ছিল সঠিক ধারণা।’

সন্দেহের দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকালেন উবার্তিনো। ‘আহা, কিন্তু তুমি তো আর সত্যিই সেসব কথা বিশ্বাস করো না?’

উইলিয়াম বললেন, ‘আপনি বলুন, আপনি কী করে ওই কুকুরগুলোর কবল থেকে রক্ষা পেলেন।’

টীকা

[৪৭.]
http://www.paradoxplace.com/Photo%20Pages/France/West/Moissac_&_Around_Agen/Moissac/Moissac_Cloisters.htm

ওপরের ওয়েব পেজটিতে গেলে উপন্যাসে বর্ণিত গির্জার সম্মুখভাগের সঙ্গে যথেষ্ট সাদৃশ্যপূর্ণ ফ্রান্স-এর মইসাক মঠের গির্জার বিভিন্ন অংশের ছবি পাওয়া যাবে। – অনুবাদক

golap_3_2.jpg

[৪৮.]
কাসালির উবার্তিনো: (আনুমানিক ১২৫৯ – আনুমানিক ১৩৩০ খৃ.) ধর্মতাত্ত্বিক, ধর্মপ্রচারক, এবং ফ্রান্সিসকান স্পিরিচুয়াল। কাসালির উবার্তিনো যুবক বয়সেই মরমীবাদী ফলিনো-র অ্যাঞ্জলা, পার্মার জন (যিনি ক্যালব্রিয়ার জোয়াকিমের অ্যাপোক্যালিপটিক ভিযন-এ আচ্ছন্ন হয়েছিলেন) এবং বুদ্ধিজীবী এবং স্পিরিচুয়াল আন্দোলনের প্রাণপুরুষ পিয়ের ওলিউ-র কাজকর্ম ও কথাবার্তায় বিমুগ্ধ ও প্রভাবিত হয়েছিলেন। ১৩০৪/৫ খৃষ্টাব্দে উবার্তিনো তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Arbor vitae crucifixae (যীশুর ক্রুশবিদ্ধ জীবনের বৃক্ষ) রচনা করেন, যা যীশু খৃষ্টের জীবন এবং যন্ত্রণা নিয়ে গদ্যে রচিত একটি মহাকাব্য। যার শেষ দিকে রয়েছে অ্যাপোক্যালিপ্স বা বাইবেল বর্ণিত পৃথিবীর ধ্বংস বিষয়ক টীকা-ভাষ্য। সন্ত ফ্রান্সিস এবং খৃষ্টীয় দারিদ্র বিষয়ক অতি উৎসাহী চিন্তা-ভাবনা ছাড়াও গ্রন্থটিতে রয়েছে যাজক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে ফ্রান্সিসকানদের শৈথিল্যের তীব্র সমালোচনা।

গোড়ার দিকে পোপ দ্বাদশ জন উবার্তিনোকে একরকম সমীহের চোখে দেখতেন। কিন্তু উবার্তিনো যখন ফ্রান্সিসকানদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে অসম্মত হলেন, তখন জন তাঁকে বেনেডিক্টীয়দের দলে স্থানান্তর করলেন। শেষপর্যন্ত তাঁদের সম্পর্ক ভীষণ তিক্ততায় পর্যবসিত হয়। ১৩২৫ খৃষ্টাব্দে আভিনীয়ঁ থেকে পালাতে বাধ্য হন উবার্তিনো। জানা যায়, ১২৮৯ খৃষ্টাব্দে দ্বাদশ জন-এর বিরুদ্ধে একটি সারমন/ হিতোপদেশ রচনা করেছিলেন তিনি; এ-ছাড়া তাঁর জীবনের শেষ বছরগুলো রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে।

[৪৯.]
golap_3_1.jpg
এখানে বর্ণিত দৃশ্যটির সঙ্গে মইসাক-এর মঠের গির্জার এই টিম্পানামের উৎকীর্ণ ভাস্কর্যের খুঁটিনাটির সাদৃশ্য লক্ষণীয়।

[৫০.]
http://bestiary.ca/

এই ওয়েব ঠিকানায় গেলে এসব জন্তু-জানোয়ারের অনেকগুলো সম্পর্কে নানান তথ্য জানা যাবে, পাওয়া যাবে সেগুলোর ছবিও। যেসব জন্তু সম্পর্কিত তথ্য ও ছবি ওখানে নেই সেগুলো গুগল বা অন্য কোনো সার্চ এঞ্জিনের সাহায্যে খুঁজে নেয়া সম্ভব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। – অনুবাদক

[৫১.]
penitenziagite (পেনিটেনযিয়াজিতে)!…

অনুবাদ: ‘অনুতাপ করো! তোমার আত্মাকে ক’দিন পর যে কুরে কুরে খাবে সেই ড্রাগন থেকে সাবধান! আমাদের মরণ এই এলো বলে! …প্রার্থনা করো, আমাদের পবিত্র পিতা এসে যেন সব অশুভ আর আমাদের সব পাপ থেকে মুক্তি দেন আমাদের! হা! হা! তোমার বুঝি খুব পছন্দ হয়েছে আমাদের প্রভু যীশু খৃষ্টের এই ডাকিনী বিদ্যা! আমিও মনে করি আনন্দই যন্ত্রণা, সুখ বেদনাময়… শয়তান সম্পর্কে হুঁশিয়ার! সারাক্ষণ এক কোণে ওঁৎ পেতে আছে আমার জন্যে আমার গোড়ালীতে থাবা মারার জন্যে। কিন্তু সালভাতোরে কি আর বুদ্ধু! এই মঠটা খুব সুন্দর, আর এই খাবার ঘরটা, প্রার্থনা করো আমাদের প্রভুর কাছে। আর বাকি কোনো কিছুই একটা ঘোড়ার ডিমেরও সমান না। আমেন। ঠিক বলেছি না?’

টীকা: এটাই সালভাতোরের প্রথম আবোল-তাবোল। যখনই সে উপস্থিত হয়, কথা বলে ভালগার লাতিন, প্রোভেন্সাল, ইতালীয় আর হিস্পানি/কাতালানের একটা জগাখিঁচুড়ি ভাষায়।

[৫২.]
ad placitum

অনুবাদ: ঐকমত্য অনুসারে

[৫৩.]
disiecta membra

অনুবাদ: ইতস্তত বিক্ষিপ্ত খণ্ডাংশ

[৫৪.]
(si licet magnis componere parva…)

অনুবাদ: আমি যদি ক্ষুদ্রকে বৃহতের সঙ্গে তুলনা করতে পারি…

টীকা: ভার্জিলের জর্জিক্স ৪. ১৭৬ থেকে। মহাকাব্য ঈনীড-এর জন্যে বিখ্যাত ভার্জিল জর্জিক্স গ্রন্থে রোমকদের গেরস্থালী কাজকর্মে নির্দেশনা দিয়েছেন। জর্জিক্স-এর চতুর্থ খণ্ডে মৌমাছি প্রতিপালনের বিষয় আলোচিত হয়েছে। এখানে তিনি অ্যাটিক বা গ্রীসীয় মৌমাছিদের পরিশ্রমের সঙ্গে কামারশালায় সাইক্লপদের পরিশ্রমের তুলনা করেছেন।

[৫৫.]
Domine frate magnificentissimo Jesus venturus est আর les hommes penitenzia

অনুবাদ: আমার প্রভু ব্রাদার সবচাইতে মহিমান্বিত… যীশু এই এলেন বলে, আর মানুষকে তো অনুতপ্ত হতেই হবে, কী বলো?

[৫৬.]
Non comprends

অনুবাদ: আমি বুঝতে পারছি না।

[৫৭.]
“vade retro”

অনুবাদ: “আমার পেছনে যাও/দাঁড়াও”

টীকা: বাইবেল-এর নিউ টেস্টামেন্ট বা নূতন নিয়মের মার্কলিখিত সুসমাচার ৮:৩১-৩৩ বা The Gospel According to Saint Mark ৮:৩১-৩৩ থেকে। “পরে তিনি” (যীশু) “তাহাদিগকে এই শিক্ষা দিতে আরম্ভ করিলেন যে মনুষ্যপুত্রকে অনেক দুঃখ ভোগ করিতে হইবে, এবং প্রাচীনবর্গ, প্রধান যাজক ও অধ্যাপকগণ কর্ত্তৃক অগ্রাহ্য হইতে হইবে, হত হইতে হইবে, আর তিনদিন পরে আবার উঠিতে হইবে। এই কথা তিনি স্পষ্টরূপেই কহিলেন। তাহাতে পিতর (Peter) তাঁহাকে কাছে লইয়া অনুযোগ করিতে লাগিলেন। কিন্তু তিনি মুখ ফিরাইয়া আপন শিষ্যগণের প্রতি দৃষ্টি করিয়া পিতরকে অনুযোগ করিলেন, বলিলেন, আমার সম্মুখ হইতে দূর হও, শয়তান; কেননা যাহা ঈশ্বরের, তাহা নয়, কিন্তু যাহা মনুষ্যের, তাহাই তুমি ভাবিতেছ।”

এটি আমাদেরকে বাইবেল-এর নিউ টেস্টামেন্ট বা নূতন নিয়মের মথিলিখিত সুসমাচার চতুর্থ অধ্যায়ের বা The Gospel According to Saint Matthew 4-এর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে যীশু খৃষ্টকে নির্জনস্থানে নিয়ে গিয়ে তিনবার প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। শেষ মুহূর্তে যীশু বলেছিলেন, “দূও হও, শয়তান (vade, Satanas); কেননা লেখা আছে, তোমার ঈশ্বর প্রভুকেই প্রণাম করিবে, কেবল তাহারই আরাধনা করিবে। (৪.১০)”

[৫৮.]
Arbor vitae crucifixae

অনুবাদ: যীশুর ক্রুশবিদ্ধ জীবনের বৃক্ষ

টীকা: প্যারাদিসো-র দ্বাদশ সর্গে কবি দান্তে বোনাভেনতুরেকে দিয়ে উবার্তিনোকে ভর্ৎসনা করিয়েছেন ফ্রান্সিসকান নীতি-র প্রতি তাঁর অত্যধিক আনুগত্যের জন্যে।

[৫৯.]
বোনাভেনতুরা (১২২১-১২৭৪ খৃ.) ইতালীয় রোমান ক্যাথলিক দাশর্নিক, ফ্রান্সিসকান সম্প্রদায়ের জেনারেল। Ñ অনুবাদক

[৬০.]
Spirituals:
স্পিরিচুয়াল বা ফ্রান্সিসকান স্পিরিচুয়ালরা ছিল আস্সিসি-র সন্ত ফ্রান্সিস-এর অনুশাসন এবং বৈশিষ্ট্যের কঠোর ও আপসহীন অনুসারী।

[৬১.]
fratres et pauperes heremitae domini Celestini

অনুবাদ: ডম সেলেস্তিনের ভ্রাতৃবৃন্দ আর দরিদ্র সন্ন্যাসীগণ

[৬২.]
Beghards

১১৭০ খৃষ্টাব্দে, বর্তমান মধ্য বেলজিয়ামের দুটো প্রদেশ ব্রাবান্ট-এ জন্ম নেয়া একটি খৃষ্টীয় সম্প্রদায়, পরে তারা নেদারল্যান্ড, জার্মানী, ফ্রান্স, উত্তর ইতালী, পোল্যান্ড এবং বোহেমিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। বেশিরভাগ সদস্যই ছিল কারিগর শ্রেণীর; দারিদ্র্য এবং যৌথ সম্পদের ধারণার প্রবক্তা বেগার্ডরা ছিল বিয়ে-বিরোধী, যদিও সদস্যরা সম্প্রদায় ছেড়ে দিয়ে বিয়ে করতে পারত। গির্জা এবং সেকুলার ক্ষমতা প্রত্যাখ্যান ক’রে বৃদ্ধ, শিশু আর অনাথদের সেবায় নিজেদেরেকে নিয়োজিত করেছিল তারা। আমালরিসীয় এবং ললার্ডদের হেরেটিক বা ধর্মদ্রোহী আন্দোলনের সঙ্গে যোগ ছিল বেগার্ডদের এই আন্দোলনের। ১৪শ শতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এদের, এবং এরপর ইনকুইজিশন পেছনে লাগে তাদের। এই সম্প্রদায়ের নারী সদস্যদের বলা হতো বেগুইন, Beguine। বিচ্ছিন্নভাবে এখনো এদের দেখা মিলবে ব্রেডা, আমস্টার্ডাম এবং গেন্ট-এ। সূত্র: আ ডিকশনারী ফর বিলীভার্স অ্যান্ড নন-বিলীভার্স, প্রোগ্রেস পাব্লিশার্স, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন।

[৬৩.]
Firma cautela

অনুবাদ: প্রবল সতর্কতার সঙ্গে

টীকা: অষ্টম বনিফেসের এই হুকুমনামাটি জারি হয় ১২৯৬ খৃষ্টাব্দে।
অনুবাদক)

[৬৪.]
Council of Vienne

যখন পোপ সমগ্র রোমান ক্যাথলিক বিশ্বের গির্জার বিভিন্ন প্রতিনিধিদেরকে কোনো মন্ত্রণা সভায় ডাকেন এবং তাঁদের নেয়া সিদ্ধান্তসমূহ একটি দ্ব্যর্থহীন ও আনুষ্ঠানিক আইনের মাধ্যমে অনুমোদন দান করেন তখন সেই মন্ত্রণাসভা বা কাউন্সিলকে বলা হয় একুমেনিকাল কাউন্সিল, Oecumenical Council। ১৩১১-১২ খৃষ্টাব্দে ফ্রান্সের ভিয়েনেতে (Vienne) অনুষ্ঠিত ১৫শ কাউন্সিল ভালদেনসীয়, স্পিরিচুয়াল, বেগার্ড এবং অন্যান্য হেরেটিকের বিরুদ্ধে হয়রানি এবং নির্যাতনমূলক কিছু সিদ্ধান্তের জন্যে বিখ্যাত হয়ে আছে। সেই কাউন্সিলে টেম্পলার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও দমনমূলক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। সূত্র: আ ডিকশনারী ফর বিলীভার্স অ্যান্ড নন-বিলীভার্স, প্রোগ্রেস পাব্লিশার্স, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন। – অনুবাদক

[৬৫.]
Exivi de paradise

অনুবাদ: আমি স্বর্গ ত্যাগ করেছি।

টীকা: এই হুকুমনামাটি পোপ পঞ্চম সেলেস্তিন ১৩১২ খৃষ্টাব্দের ১২ই মে জারি করেছিলেন, অক্টোবর ১৩১১ থেকে মে ১৩১২ খৃ. পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ভিয়েনে কাউন্সিলে। পবিত্রতা, দারিদ্র্য এবং বাধ্যতা, ফ্রান্সিসকান নীতির এই তিনটি প্রতিজ্ঞার ওপর গুরুত্বারোপ করে হুকুমনামাটি শুরু হয়েছে। পোশাক-আশাক, জুতো, ধর্মপ্রচার, উপবাস, ইত্যাদি বিষয় কীভাবে দেখা হবে, ব্যবহৃত হবে সেটাই হুকুমনামাটিতে আলোচিত হয়েছে। ফ্রান্সিসকানদেরকে এখানে আদেশ করা হয়েছে যাতে করে তারা তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভিক্ষাগ্রহণ না করে; এছাড়া, একটি তালিকা দেয়া হয়েছে যেসব কারণে দারিদ্র্যের চরিত্র ক্ষুণœ হয়েছে; কারণগুলো হচ্ছে দালানগুলোতে বিশাল বিশাল হোল্ডিং, জাঁকজমকপূর্ণ আসবাবপত্র, ইত্যাদি। হুকুমনামাটি শেষ হয়েছে এই দাবি জানিয়ে যে ফ্রান্সিসকান সম্প্রদায়ের মধ্যেকার যুদ্ধরত দলগুলি যেন শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে এবং কোনো দল, তা তারা স্পিরিচুয়ালই হোক ÑÑ যারা দারিদ্র্যের কঠোরতম ব্যাখ্যার প্রবক্তা, বা কনভেনচুয়ালই হোক ÑÑ যারা কিনা এবিষয়ে খানিকটা শিথিল মতাবলম্বী, তারা কেউই একে অন্যকে হেরেটিক বলতে পারবে না।

[৬৬.]
per mundum discurrit vagubundus

অনুবাদ: ভবঘুরের মতো গোটা দুনিয়া ঘুরে বেড়িয়েছেন।

(কিস্তি ৪)

ghhabib67@yahoo.com

—-
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন razib hasan — জুলাই ১৪, ২০১২ @ ২:৩৮ অপরাহ্ন

      vary nice…………………

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com