গুরু ও চণ্ডাল

মাহবুব মোর্শেদ | ২ এপ্রিল ২০১০ ১১:২৩ পূর্বাহ্ন

transporter-lake.jpg
“ট্রান্সপোর্টে, লেকের ধারে, কালুর দোকানে ক্লাশের সময়টা অপব্যয় করতাম। কিন্তু সেলিম আল দীনের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আমরা একটা একটা প্যারালাল বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করছিলাম।”

উপক্রমণিকা
কথিত আছে, মহৎ প্রতিভা আত্মজীবন চর্চা করে না। আত্মজীবনের সঙ্গে জড়িত পরজীবনের কথা তাইলে কেমনে বলা সম্ভব? স্মৃতি তো অবিনশ্বর নয় যে যখন নিজের মহৎ প্রতিভা বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হইবে তখন তিনি যথাবিধি সামনে আইসা দাঁড়াইবেন। ফলে, যৌবনেই স্মৃতির ভিতর সমাহিত হইলাম। সেই অর্থে এটা যতটা না সেলিম আল দীনের ততোধিক আমার নিজের….

এই লেখাখানির ছোট একটা হিস্ট্রি আছে। হিস্ট্রি মোটামুটি এক বছরের। ব্লগ-ফেসবুকের মতো মিডিয়া থাকতে এত ছোট একটা লেখার একবছরের ইতিহাস থাকা একটু অস্বাভাবিক। হিস্ট্রি তৈরি হওয়ার পিছনে গল্পকার, উপন্যাসিক, সম্পাদক মশিউল আলমের কিছু ভূমিকা আছে। স্বপ্নাদিষ্ট হয়া এই লেখা তৈরি করার পর লেখাটা কই ছাপা যায় এই নিয়া আমি ভাবতেছিলাম। যখনকার কথা তখন মশিউল আলম আমার কলিগ আছিলেন। তখন উনি মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন, এখনও করেন। অবশ্য পরিহাস কইরা আমি কইতাম, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক আর ত্রৈমাসিক নাই, মশিউল আলমের ষান্মাসিকে পরিণত হইছে।

মশিউল আলমকে কথাপ্রসঙ্গে লেখাটার কথা জানাইছিলাম। উনি ওই কুক্ষণেই ত্রৈমাসিকের জন্য লেখাটা চাইলেন। আমার কী মনে হইলো, লেখাটা ওনার হাতে দিলাম। কথা আছিল, ওনার পত্রিকা বাইর হবে জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বর-নভেম্বরে কি ডিসেম্বরেই। শেষ পর্যন্ত ধৈর্য্য ধইরা ফেব্রুয়ারি পার করলাম। শেষে ভাবলাম, যা হওয়ার হইছে, মশি ভাইয়ের কাছে লেখা ফিরত চাই। ফিরত চাইলাম, উনি ফিরত দিয়া বাঁচলেন। শুধু যে পকেটে টেকা নাই বইলা মশি ভাই আমার লেখাটা ছাপতে পারেন নাই বা ওনার অন্য পরিকল্পনার জন্য আমার লেখা উনি অদূর ভবিষ্যতে ছাপতে পারবেন না বইলা সাব্যস্ত করছেন, তা না। উনি লেখাটায় কিছু বিব্রতও হইছেন বইলা মনে হইছিল। উনি কইতেছিলেন একদিন, লেখাটা ছাপার আগে একটা নোট দিতে হবে। মশি ভাই ভাবতেছিলেন, নোটে লেখবেন, ‘জানি না মীজানুর রহমান, এই ভাষায় এই লেখা পেয়ে কী করতেন…’। আমি ভাবতেছিলাম, কী করতেন আসলে? এখন বুঝতেছি, মীজানুর রহমান যা করতেন মশিউল আলমও তাই করলেন। মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক দীর্ঘজীবী হউক।

বলাবাহুল্য, লেখাটা পাক্কা এক বছর আগের। কী লিখছি, কী ভুল আছে আর ফিরে দেখি নাই। কেউ যদি পইড়া কোনো তথ্যে ভুল ধইরা দেন তাইলে ভাল। স্মৃতি চঞ্চলা। অতএব ভ্রান্তি মার্জনীয়।

১.
সেলিম আল দীনের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হইছিল উনি মারা যাওয়ার বছরখানেক আগে। ওনার সঙ্গে যোগাযোগ, দেখাসাক্ষাৎ কমতে কমতে শেষদিকে এমন এক জায়গায় এসে ঠেকছিল যে দেখা হওয়ার জন্য একটা উপলক্ষ দরকার হয়া পড়ছিল। উপলক্ষ হিসাবে মহুয়া উৎসব যুৎসই আয়োজন। আমি তখন দৈনিক যায়যায়দিনে কাজ করি। আমার মোবাইল ফোনে ওনার ফোন নাম্বার ‘সেলিম স্যার’ নামে সেভ করা আছিল। কিন্তু সেইটা কোনো কামে আসত না। কারণ উনি বা আমি কেউই কাউরে ফোন দিবার প্রয়োজন অনুভব অনেক দিন থিকাই করি না। পথ যখন দুই দিকে বেঁকে যায় তখন প্রত্যহ প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিকেও পথের কোনো বাঁকে আর পাওয়া যায় না। লোকমুখে শুনতেছিলাম এইবার স্যার ঘটা করে মহুয়া উৎসব পালন করার উদ্যোগ নিছেন। খবর পাওয়ার পর আর দেরি হইল না। এক দুপুরে ওনার ফোন আসল। স্যার কইলেন, ‘এবার বড় আকারে মহুয়া ফোটার উৎসব হবে। তুই চলে আয়।’ দিন-তারিখ ও উৎসবে উপস্থিতি হওয়ার সময় উল্লেখ করে স্যার যাইতে নির্দেশ দিলেন। আমি নানা গাঁইগুই করার চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হইল না। বুঝলাম, স্যারের কাছ থেকে দূরে গিয়া আমরা একটু বড় হওয়ার ভান করতেছি বটে, কিন্তু উনি এখনও বড়ই আছেন। ওনার নির্দেশ অমান্য করা আমাদের পক্ষে দূরত্ব ও ব্যস্ততা সত্ত্বেও অসম্ভব এখনো হয়া উঠে নাই।
—————————————————————–
মোহাম্মদ রফিকের কবিতা খুব খেয়াল করে পড়তেন। আর অযথা প্রশংসা করতেন। মহাকাব্যিক, অসাধারণ এইগুলা ছিল তার প্রশংসার সাধারণ ভাষা। কারো নিন্দা করলে চোদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে ফেলতেন। স্যারের লেখালেখির ইতিহাসটা বড়ই মজার। উনি প্রথম যৌবনে কবি হইতে চাইছিলেন। কবিতার বইও বাইর করছিলেন। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সময়ের স্বরটা উনি ধরতে পারেন নাই। একভাবে ব্যর্থ হয়ে নাটকে হাত মশকো করেছিলেন রফিক আজাদ ও ফরহাদ মজহারের পরামর্শে। রফিক আজাদকে তিনি বাবা ডাকতেন। দেখা হলেই পা ছুঁয়ে সালাম করতেন।
—————————————————————-
উৎসবের দিন সকালবেলা স্যার ফোন দিয়া তাড়া দিলেন। জিগাইলেন কখন রওনা দিব। কইলাম, অফিস শেষ হইলেই রওনা দিব। স্যার বললেন, দুপুরের আগে আসতে হবে। আমি অনেক কষ্ট করে বিকাল চারটায় রওনা হওয়ার পক্ষে স্যারকে রাজি করাইতে পারলাম। হিসাব মতো আমার সাড়ে পাঁচটার মধ্যে অকুস্থলে পৌঁছানোর কথা। দেখলাম স্যার ঠিক সাড়ে পাঁচটায় আবার ফোন দিছেন। দিয়াই কইলেন, ‘তুই কোথায়?’ আমি বললাম, ‘আপনার সামনে। স্যার, আমি আপনারে দেখতেছি। আপনি দেখতে পাইতেছেন না।’

আমি রিকশাগুলার আড়ালে আছি। আমার হাতে সিগারেট। আধখাওয়া সিগারেটের ভাগ্যে খারাবি লেখা আছিল। স্যার দেখলাম, আমার বক্তব্যের সত্যাসত্য নিরূপণের জন্য রিকশাগুলার দিকে উঁকি দিতেছেন। তাই আধখাওয়া সিগারেট ফেলায়া দিয়া আমি আগায়া গিয়া স্যারের সান্নিধ্যে উপস্থিত হইলাম। স্যার তখন গাছের নিচে মঞ্চ স্থাপনের কাজ তদারক করতেছিলেন। ঐতিহ্য অনুসারে মহুয়া গাছে কাপড় বেঁধে গাছের নিচে মঞ্চ করে গান আলোচনা কবিতা বক্তৃতা হয়। গাছে কিছু লাইটিংয়ের ব্যবস্থা হয়। সন্ধ্যা ঘনাইলে এই মঞ্চ দূর বা কাছ দুই অবস্থান থিকাই মোহনীয় হয়।

১৯৯৯ কী ’৯৮ কী ’৯৭ সালের এক বৃষ্টির দিনে এই মহুয়া গাছের পাশ দিয়া স্যার আর আমি যাইতেছিলাম। তখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হইতেছিল। বৃষ্টি হইলেই স্যারের মধ্যে ‘ময়ূরযান’ নামে এক নাটক লেখার আইডিয়া চাগান দিয়া উঠত। ‘ময়ূরযান’ হইল স্যারের অলিখিত এক নাটক। বছর বছর বৃষ্টি হইলেই উনি ‘ময়ূরযানে’র কথা ভাবতেন, বলতেন। সেদিনও উনি কেমনে ‘ময়ূরযান’ লিখবেন, লিখতে হইলে তাকে কী কী করতে হবে সেই কথাগুলা বলতেছিলেন। মহুয়া গাছের পাশ দিয়া যাইতে যাইতে মহুয়ার সবুজ ফলগুলা দেখাইয়া স্যার কইলেন, ‘চিনস?’ আমি কইলাম, ‘না স্যার।’ উনি কইলেন, ‘এইটাই হইলো মহুয়ার ফল।’ স্যার গাছটার দিকে কিছুক্ষণ দেখলেন। কইলেন, ‘সামনের বছর থেকে এইখানে বসন্তে উৎসব করব। মহুয়ার ফুল ফুটে যখন চারদিক মাতাবে তখন এখানে নাচগান, হুল্লোড় হবে।’ হুল্লোড় কথাটা উনি খুব পছন্দ করতেন। কোনো পিকনিক বা গেট টুগেদার হইলে সেইটার নাম দিতেন হুল্লোড়। দীপাবলী বা হোলি উৎসবে ভারতীয়রা যেভাবে রঙের উৎসব করেন তেমন একটা উৎসবের কল্পনা স্যারের মধ্যে ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আপাত কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে শান্ত-স্নিগ্ধ অনুষ্ঠানকেই স্যারের দেখাদেখি আমরা হুল্লোড় বলতাম।

এক-একটা সময় আসত যখন স্যারকে পায়ে হাঁটার বাসনা পায়া বসত। আমি তখন লিকলিকে হালকাপলকা ছেলে। আমার কাছে হাঁটা ব্যাপারটা ছিল অত্যাচার স্বরূপ। প্রৌঢ় অধ্যাপকের সঙ্গে বৈকালিক রাস্তাবিহারের চাইতে দুয়েকটা ডালপুরি সমভিব্যহারে প্রান্তিকের চা বা বান্ধবীর রহস্যময় চাহনি আমাদের কাছে অধিক রহস্যময় মনে হইত। তথাপি স্যারের সাথে প্রায় প্রতিদিনই হাঁটতে বের হইতাম। বের না হইলে স্যার প্রান্তিকে এসে আড্ডা থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাইতেন। হাঁটাকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য শিল্প ও লেখা বিষয়ে নানা কথা বলতেন। কোনোদিন হাঁটতে হাঁটতে স্যার নানা গাছ চিনাইতেন, ফুল চিনাইতেন। একবার ভিসির বাড়ির সামনে একটা মিষ্টি ও ঝাঁঝালো ফুলের গন্ধ পায়া থমকে দাঁড়াইছি, দেখলাম স্যার একটু জোরে শ্বাস নিলেন। আমি জিগাইবার আগেই কইলেন, লেবু ফুল। আমি কইলাম ভিসির বাসায় লেবু স্যার কী করেন? আমার কূটাভাস বা কটুআভাস পছন্দ করতেন। বললেন, ‘আহ! বুক ভরে জোরে শ্বাস নে।’

এইসব বৈকালিক বা সান্ধ্য রাস্তাবিহারে আমরা মহুয়া গাছগুলা শনাক্ত করতাম। ফুল ও ফলের পরিস্থিতি তদারক করতাম। আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পর ক্যাম্পাসে কিছু মহুয়ার গাছ লাগানো হইছিল। কিছু ছোট গাছ বড়ও হয়া উঠছিল। কিন্তু আমি গুনে দেখছি মহুয়া উৎসব যখন শুরু হয় তখন ক্যাম্পাসে মোট সাতটা মহুয়া গাছ আছিল। আর সেই গাছগুলার সবটাতে ফুল আসত না। দুই-একটা গাছে ফুল আসত। নতুন কলাভবনের সামনের গাছটাতেই ফুলের মচ্ছব হইত। মৌসুমে বাদুড় মধু খাইতে আইসা গাছটাকে ছেকে ফেলত। বাসমতি পোলাও রান্না করার প্রথম দিকে যে গন্ধ বাইর হয় সেইরাম একটা গন্ধ তখন গাছ থিকা চৌদিকে ছড়ায়া যাইত। এ গন্ধ এমনই তীব্র যে, একবার নিবার পরে চোখ বন্ধ করে কল্পনা করলেই গন্ধটা স্মৃতি হিসাবে নাকে খেলে যায়, অটোমেটিক। যে-বছর স্যার কইলেন উৎসব হবে তার পরের বছর বসন্ত আসার আগে বুঝা গেল উৎসব হবে, ফাইনাল। সেটা ১৯৯৯ সাল। আগস্টের বর্ধিত ভর্তি ফি বিরোধী আন্দোলন তখনও খানিক দূরে। জাহাঙ্গীরনগরের ভিসি তখন প্রফেসর আলাউদ্দিন আহমেদ। প্রফেসর আলাউদ্দিন আহমেদকে সেলিম আল দীন স্যার খুব পছন্দ করতেন। ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের প্রতি স্যারের একটা স্বভাবগত টান ছিল। প্রফেসর আমিরুল ইসলাম চৌধুরীর পর জাহাঙ্গীরনগরে যত ভিসি হইছেন সবাই ছিলেন স্যারের বন্ধু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই হরেদরে একই ব্যাচের ছাত্র আছিলেন। আলাউদ্দিন আহমেদকে সেলিম স্যার তুই কইরা বলতেন। পরে আবদুল বায়েস ভিসি হইলেও দেখছি স্যারের সাথে তার তুই-তুমি সম্পর্ক। প্রফেসর মুস্তাহিদুর রহমানের সাথেও তার একই ধরনের ব্যাচের বন্ধুত্ব আছিল। আলাউদ্দিন আহমেদ পদাধিকারী হয়ে সেলিম আল দীনকে টিএসসির পরিচালক বানাইছিলেন। এই ঘটনা জাহাঙ্গীরনগরের কালচারাল অঙ্গনে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনছিল। সেলিম স্যারের কিছু পাগলামি বাদ দিলে যে দুই বা আড়াই বছর উনি টিএসসির পরিচালক আছিলেন সেই সময়টায় স্টুডেন্টরা টিএসসিতে যাইত, জায়গাটাকে জমায়া রাখত। তিনি দায়িত্ব ছাড়ার পর টিএসসি আর সেই আমেজ ফিরে পায় নাই। বরং শশ্মানের মতো হয়া পড়ছিল। ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিকাল বেলা হাঁটতে হাঁটতে সেন্ট্রাল লাইব্রেরির পাশ দিয়া যাইতে যাইতে প্রায় দিনই মহুয়া গাছ পরীক্ষা করা হইত। এমনে এক দিন ফুলের কুঁড়ি দেইখা হিসাব করে স্যার কইলেন মার্চের ১৯ তারিখে মহুয়া ফোটার উৎসব হবে। টফি, সুমা, বনোদের খবর দিয়া কহনকথার একটা বৈঠক করে অনুষ্ঠানের ব্যাপারে স্যারের সিদ্ধান্ত জানানো হইল। কহনকথা আমাদের গানের দল। আমাদের মানে স্যারের। স্যার তখন মন দিয়া গানের সাধনা করতেছেন। নিয়মিত গান লেখেন। টিএসিতে প্রায় দিনই গানের রিহার্সাল হয়। টফি, সুমা কীবোর্ড বাজায়ে গান করে। আর বনফুল গিটারিস্ট। আমি সুর নাই, ছন্দ নাই নিধিরাম সর্দার। ওরা গান করত আর আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়ে হাসতাম। গানগুলা আমার খুব পছন্দ লাগত। স্যারের একটা রাবীন্দ্রিক মন আছিল। শিল্পের বহু শাখায় যেমনে ঠাকুর মশায় তার সৃষ্টিশীলতার ঘোড়া ছুটাইছিলেন, সেলিম আল দীনও চাইতেন তেমনে তার সৃষ্টি নানা শাখায় পত্রপল্লবে বিকশিত হয়া উঠুক। গান লিখে তাতে সুর দিতেন স্যার। আমি আজও বুঝতে পারি নাই, কেন গান-বোঝা মানুষেরা স্যারের লেখা ও সুর দেওয়া গান পছন্দ করতে পারে নাই। ১৯৯৯ সাল থিকা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মোটামুটি বিখ্যাত কোনো এক শিল্পীকে দিয়া স্যার গান গাওয়ানোর চেষ্টা কইরা গেলেও কেউ শেষ পর্যন্ত রাজি হয় নাই। যাই হউক, জাহাঙ্গীরনগরের ঘরোয়া অনুষ্ঠানগুলাতে স্যারের গান গাইত কহনকথার শিল্পীরা, বিশেষ করে টফি ও সুমা। সঙ্গীতাও কিছু গান তুলছিল। আর কেউ তুলছিল কি না আমার মনে নাই। মহুয়া উৎসব উপলক্ষে নতুন কিছু গান বান্ধা হইল। যতদূর মনে পড়ে, ‘আমি যতবার মেঘেদের শরীর ছুঁতে চাই…’ গানটা স্যার মহুয়া উৎসবের আগে লেখছিলেন আর সুরও দিছিলেন।

আমার কিছু সাংগঠনিক গুণাগুণ আছিল। লোক জোগাড় করা আর মাইক, পোস্টার এইগুলা সংগ্রহ করায় আমি কিছুটা দক্ষতা অর্জন করছিলাম। তাই স্যার এইগুলা নিয়া নিশ্চিত আছিলেন। কিন্তু পয়লা মার্চে আমার জীবনে একটা দুর্বিপাক নাইমা আসল। কয়দিন থিকাই আমার জ্বর-জ্বর অনুভব হইতেছিল। শরীর দুর্বল। কিন্তু স্যার রীতিমতো মোগল। তার হাতে পড়লে আড্ডা দেওয়া বাধ্যতামূলক। আমাকে কলাভবন থেকে পাকড়াও করে উনি ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা নিয়া গেলেন। আফজাল হোসেনের অ্যাডফার্ম ‘মাত্রা’য় গিয়া কিছুক্ষণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে কিছু শিল্প আলোচনা করার পর আমি স্যারকে কইলাম, বইমেলার শেষ দিনটা দেখে আসি। ঢাকায় স্যারের ঠিকানা ছিল তিনটা: আফজাল হোসেনে প্রতিষ্ঠান ‘মাত্রা’, মাসুম রেজা-গিয়াসউদ্দিন সেলিমদের প্রতিষ্ঠান ‘সাবলাইম’ আর ৫০, পুরানা পল্টনে হিমু ভাইয়ের বাড়ি। স্যারের সাথে ঢাকা আসলে প্রথমে এই তিন ঠিকানার যে কোনো একটায় স্যার আসন গ্রহণ করতেন। উনি থিতু হইলে আমি বাইর হয়া পড়তাম। জাহাঙ্গীরনগরে ফেরার একটা সময় ঠিক করে আমি আড্ডার উদ্দেশ্যে আজিজ মার্কেটে যাইতাম। পরে গভীর রাতে হলে ফেরা হইত।

ফেব্রুয়ারি আসলে আজিজ মার্কেটের বদলে আড্ডা বইমেলায় স্থানান্তরিত হইত। বহেরাতলার লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে আড্ডা দিতাম। বইমেলায় গিয়া ঐতিহ্য প্রকাশনীর স্টলের সামনে ব্যাস পত্রিকার সম্পাদক রবিউল করিমের সঙ্গে দেখা হইল। উনি কইলেন, সেদিনই তার প্রথম বইমেলায় আসা। কারণ নিদারুণ পক্স তারে কাবু করছিল। সাইরা উইঠাই শেষ দিনের বইমেলা ধরতে আসছেন। ওনার সাথে হাত মিলাইলাম মনে একটু অস্বস্তি নিয়া। পক্সের জীবাণুর ভয় মনের গভীরে আছিল। তখনও আমি জানতাম না, মাত্র একজন রুগির সাথে হাত মিলাইতে ভয়ের কিছু নাই। কারণ ঢাকার বাতাস তখন স্বয়ং পক্সের জীবাণু বহন করতেছেন। সেইবার পরিচিত অপরিচিত বহু লোকের পক্স হইছিল। বইমেলা থেকে ফিরে ‘মাত্রা’য় গিয়া দেখলাম স্যার কী একটা লেখা লেখতেছেন। এই লেখাগুলা সাধারণত টিভির জন্য লেখা হইত। যোগাযোগ, আড্ডা আর টিভির জন্য নাটক লেখার জন্যই মূলত উনি ঢাকা সফর করতেন। ওইদিন ফিরতে ফিরতে একটু রাত হয়া গেল। গাড়ি যখন প্রান্তিক গেটে পৌঁছাইল তখন সাড়ে দশ-পৌনে এগারো। রীতি হইল, নয়টার আগে পৌঁছাইলে আমি প্রান্তিকে নেমে আরেক প্রস্থ আড্ডা পিটিয়ে হলে ফেরার পথে সালাম-বরকত হলে নজু ভাইয়ের দোকানে খাব। আর দশটা পার হলে খাবার কিনতে পাওয়া যাবে না। তাই স্যারের বাসায় খাইতে হবে। স্যার তখন প্রান্তিক গেটের কাছের একটা বাসায় থাকতেন। ওইখানে আহারের সুবন্দোবস্ত ছিল। কিন্তু আমি সেইখানে খাওয়া তেমন একটা পছন্দ করতাম না। কারণ স্যারের বাসায় খাওয়ার পর সিগারেট খাওয়া যাইত না। তার চেয়ে বড় কথা, খাওয়ার পর স্যার এমন গল্প জুড়ে দিতেন যে রাত একটা-দেড়টার আগে ছাড়া পাওয়া কঠিন আছিল। তাই আমি প্রান্তিক গেটে নেমে যাইতে পছন্দ করতাম। দশটা পার হলে একটা বাড়তি বিপদ উপস্তিত হইত। মোগলের সাথে খানাও খাইতে হইত।

ওইদিনও স্যারের বাসায় খেয়ে রাত একটা কী দেড়টার দিকে ফিরতেছিলাম। তখন প্রান্তিক গেটের কাছে দশ-বারোটা কুকুর রাতের বেলা জটলা পাকায়ে থাকত। আমি কুকুর খুব ভয় পাই। জোটবদ্ধ কুকুর দেখলে এই ভয় আরও বেড়ে যায়। জোটবদ্ধ কুকুরদলকে কোনো রকম পাশ কাটিয়ে কৌশলে জায়গাটা পার হয়া আমি দ্রুত হাঁটা দিতাম। ওইদিন কুকুরগুলা মোড়ের কাছে ছিল। আমি ওদের কাছে পৌঁছাইতে সবগুলা কী মনে করে জানি আমার দিকে তাকাইল। নীরবে এক কী দুই মিনিট কুকুরগুলা আমার দিকে তাকায়ে থাকল। আমার বুকের ভিতরে একটা শঙ্কা মোচড় দিল সাথে সাথে। কুকুরদের সহানুভূতির চোখে তাকানো আমার মধ্যে একটা অতিপ্রাকৃতিক বোধ আইনা দিল। আমি সাথে সাথে অনুভব করলাম, আমার ভেতরে কিছু-একটা হইছে। সম্ভবত আমার খুব জ্বর হইছে। মাথায় হাত দিয়া দেখলাম চুলের নিচে গুটি গুটি কিছু উঠতেছে। ঢাকা শহরে ঘুরার ফলে চুলে প্রচুর ধুলাবালি লম্বা চুলের নিচে জমা হইছে। ক্লান্ত পদবিক্ষেপে আমি ঘরে ফিরতে ফিরতে ভাবলাম, হয়তো ওই কুকুরদলের সবাই কুকুর নয়। জাহাঙ্গীরনগরে তখন ছোট লেজের শিয়াল ঘুরত। একলা পথিককে পাইলে তার সঙ্গে ভয়ভীতির খেলা জুড়ে দিত বনবাসী শিয়াল। সেলিম স্যার বলতেন, শৃগালের আক্রমণের শিকার হইলে দুই হাত উঁচু করে মাথার উপরে তুলতে হবে। যাতে শৃগালের ভ্রম হয় যে যাকে সে ভয় দেখাইতে উদ্যত হইছে সে মানুষ না, একটা ভালুক।

রুমে ফিরে দেখলাম সোহেইল জাফর ঘুমের এন্তেজাম করতেছে। শুভাশিস সিনহা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আমার রুমমেট ছিল এই দুই বিখ্যাত ব্যক্তি। আমরা তিনজন তিন সময়ে ঘুমাইতাম আর তিন সময়ে উঠতাম। আমাদের মধ্যে জাতিভেদ প্রখর ছিল। আমাদের তিনজন তিন রকম জাতীয়তা পোষণ করতাম। হাত-মুখ ধুইয়া মশারি টাঙায়ে কোনো রকমে ঘুমায়ে পড়লাম। রাতে আমার ভীষণ জ্বর আসল। জ্বরের ঘোরে সকালে দ্রুত ঘুম ভেঙে গেল। আমার কী হইছে বুঝতে না পাইরা আমি জাফরকে ঘুম থেকে জাগাইলাম। সে আবিষ্কার করল আমার পক্স হইছে। আয়নায় দেখলাম, মুখে খইয়ের মতো করে পক্স ফুটতেছে। কিছুক্ষণ পর বাড়ছে সংখ্যা। মেডিকেল সেন্টার থেকে ডাক্তার আসল। বলল, আমি যেন দ্রুত বাড়ি চলে যাই। সিদ্ধান্ত হইল, বাড়িই যাব। কিন্তু তখন বগুড়ায় শ্রমিক ধর্মঘট চলতেছে না কী যেন একটা ঝামেলা হইছে বইলা আমার আর বাড়ি যাওয়া হইল না। বাড়ি যাওয়ার খুব বেশি ইচ্ছাও আমার ছিল না। আমি পারতপক্ষে বাড়ি যাইতাম না। বাড়ি না গিয়া আমার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা ছিল মেডিকেল সেন্টারের পাশে জাকসু ভবনে পড়োবাড়িতে জাকসুর সাধারণ সম্পাদকের রুমে স্থাপিত মেডিকেল সেন্টারের বসন্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া। আমি দুপুরের মধ্যে নিজেরে সেইখানে স্থানান্তর করলাম। জায়গাটা ছিল দারুণ। চারদিক ফাঁকা, পাশে মেয়েদের হল। সামনে একটা বড় পুকুর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার অবকাশ আমার আছিল না। সারা শরীরে তখন পক্স। যাতনা। মনে হইতেছিল কেউ শরীরে বিন্দু বিন্দু আগুনের শিখা জ্বালিয়ে দিয়েছে। জিহবায়ও কয়েকটা উঠে গেল। পিঠে চোখে কোথাও বাদ নাই। শুধু ডান কনুই বাদ ছিল। তাতে ভর দিয়া আমি বইসা থাকতাম। কনুইতে ভর দিয়া আলতো হেলে রাতে ঘুমাইতাম। আমার এক সুসম্পর্কের চাচা থাকতেন ক্যাম্পাসের সামনে শেখ হাসিনা যুবপ্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। স্মার্ট, অমায়িক এই ভদ্রলোক আমাকে খুব পছন্দ করতেন। পুরা পরিবারের মধ্যে তিনিই একমাত্র গৌরবর্ণ আছিলেন বলে তার নাম সাদা হয়েছিল। চাচী পিয়ন মারফত আমার জন্য তিতা, কষ্টা, ভাজা নানা খাবার পাঠাইতেন। মেডিকেল সেন্টারের ডাক্তার বিনামূল্যে গাদা গাদা ঔষধ দিতেন। দিনের বেলা মাথায় তোয়ালা জড়িয়ে আমি জাকুস ভবনের বারান্দায় গিয়া বসতাম। বন্ধুদের ক্লাসে যাওয়া দেখতাম আর পরিচিত কারো দেখা মিললে দূর থেকে তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতাম। বরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকে অমলের যে দশা হইছিল তা আমি কয়েকদিনেই অনুভব করতে পারলাম। মাঝে মাঝে মনে হইত ওই সামান্য অসুখই যেন আমারে মৃত্যুর আস্বাদ দিতেছে। অপেক্ষা করতাম কখন সন্ধ্যা হবে।
—————————————————————–
হইতে পারে বিকাল বেলা স্যারের সাথে প্রায় দিনই হাঁটতাম বইলা আমার কথা স্যারের মনে পড়ত। অথবা হাঁটা শেষ হইলে ওনার মনে হইত কিছু শিল্প আলোচনা করা দরকার। অথবা স্রেফ বাৎসল্য ও বন্ধুত্ববশত উনি আসতেন। প্রতিদিন হাঁটা শেষ কইরা কহনকথার পুরা দল নিয়া তিনি আমারে দেখতে আসতেন। পক্স খুব ছোঁয়াচে রোগ। তবে যার একবার পক্স হইছে তার দ্বিতীয়বার হওয়ার চান্স কম। কিন্তু যার হয় নাই তার চান্স থাকে। টফি, সুমার কখনো পক্স হয় নাই বইলা ওরা স্যারের নির্দেশে দূরে দাঁড়ায়া থাকত। দূর থেকে আমার জন্য তারা নানা আশঙ্কা প্রকাশ করত। স্যার আইসা জাকসু ভবনের বেতের চেয়ারে বসতেন।
—————————————————————-
সন্ধ্যা হইলে প্রায় দিনই স্যার আসতেন। হইতে পারে বিকাল বেলা স্যারের সাথে প্রায় দিনই হাঁটতাম বইলা আমার কথা স্যারের মনে পড়ত। অথবা হাঁটা শেষ হইলে ওনার মনে হইত কিছু শিল্প আলোচনা করা দরকার। অথবা স্রেফ বাৎসল্য ও বন্ধুত্ববশত উনি আসতেন। প্রতিদিন হাঁটা শেষ কইরা কহনকথার পুরা দল নিয়া তিনি আমারে দেখতে আসতেন। পক্স খুব ছোঁয়াচে রোগ। তবে যার একবার পক্স হইছে তার দ্বিতীয়বার হওয়ার চান্স কম। কিন্তু যার হয় নাই তার চান্স থাকে। টফি, সুমার কখনো পক্স হয় নাই বইলা ওরা স্যারের নির্দেশে দূরে দাঁড়ায়া থাকত। দূর থেকে আমার জন্য তারা নানা আশঙ্কা প্রকাশ করত। স্যার আইসা জাকসু ভবনের বেতের চেয়ারে বসতেন। ঘাসের বিছানায় চেয়ার পেতে আমরা মুখোমুখি বসতাম। স্যারের এই সদলবলে আসা এবং আলোচনা আমাকে একপ্রকার শুশ্রুষা এনে দিত। কী কারণে যেন ওই সময় স্যার শেক্সপিয়ারের ওপর মহা ক্ষেপে ছিলেন। শেক্সপিয়ারের ওপর ক্ষেপে থাকার জন্য অবশ্য বিশেষ কোনো অজুহাত দরকার আছিল না। কিছু একটা হইলেই উনি শেক্সপিয়ারের বদনাম করতেন। বলতেন, আমরা মুর্খ বইলা শেক্সপিয়ারকে ইংরেজরা আমাদের এইখানে অবশ্যপাঠ্য নাট্যকার হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারছে। আমরা যদি দুনিয়া দখল করতে পারতাম তাইলে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হইতেন রবীন্দ্রনাথ। পৃথিবীর সর্বত্র রবীন্দ্রনাথ পাঠ্য হইতেন। তাতে সভ্যতার কিছু উপকার অবশ্যই হইত। স্যারের জীবৎকালে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে শেক্সপিয়ার তেমন পড়ানো হইত না। প্রসেনিয়াম থিয়েটারের সঙ্গে ওনার সংঘর্ষের কারণে ভারতীয় বিশেষ করে বাংলার লোকাল নাটক শেক্সপিয়ারের চাইতে গুরুত্ব দিয়া পড়নো হইত। এক্ষেত্রে স্যার একটা কৌশল অবলম্বন করতেন। তিনি পাকা একাডেমিক বইলা রবীন্দ্রনাথ দিয়া শেক্সপিয়ারকে বাতিল করার চেষ্টা করতেন না। বলতেন, ক্রিস্টোফার মার্লো ইজ ফার মোর বেটার দ্যান শেক্সপিয়ার। ডক্টর ফস্টাসের উদাহরণ অহরহ টানতেন। তার এই শেক্সপিয়ার বিদ্বেষের কারণে নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ল্যাবরেটারিতে শেক্সপিয়ার কখনও অভিনীত বা পঠিত হইতে দেখছি বইলা মনে পড়ে না। অনেক চিন্তা করে আমার মনে হইছিল, শেক্সপিয়ার হইলেন স্যারের অল্টার-ইগো। সেলিম আল দীনরা যখন নাটক নিয়া কাজ শুরু করছেন তখন ঢাকা ও কলকাতার মঞ্চে শেক্সপিয়ারের দোর্দণ্ড প্রতাপ। মঞ্চের বিগ ফিশরা অনুবাদ নাটকের ওপর ভর দিয়া প্রসেনিয়াম মাতাইতেছেন। হইতে পারে, উনি তখন শেক্সপিয়ারের দ্বারা চ্যালেঞ্জড হইছিলেন। অথবা হইতে পারে, শেক্সপিয়ারের সর্বত্রবিস্তারী নাট্যপ্রতিভা তাকে কাবু করে ফেলেছিল। উনি সারাক্ষণ শেক্সপিয়ারের নাটক, নাটকের বাণী, নাটকের পরিবেশনা থেকে বাইর হওয়ার চিন্তা করে করে সেখান থেকে দূরে যাইতে চেষ্টা করতেন। স্যার বলতেন, স্ট্রিন্ডবার্গ নাকি লেখার টেবিলের সামনে শেক্সপিয়ারের ছবি টাঙায়ে রাখতেন। এর ফলে তার মনে প্রচণ্ড বিক্ষোভের সৃষ্টি হইত আর সেই ক্ষোভ থিকা তার নাটক জন্মগ্রহণ করত। স্যারের ঘরে শোভা পাইত টেগোরের বড় একখানা ছবি কিন্তু মনের মধ্যে শেক্সপিয়ারের একটা স্থায়ী ছবি টাঙায়ে রাখতেন। বারবার তোতাপাখির মতো করে বলতেন, শেক্সপিয়ার কেমনে তার পূর্বসূরী মার্লোর আইডিয়া তসরুপ করে নাটক লিখছিলেন। নাট্যতত্ত্ব বিভাগে ডক্টর ফস্টাস খুব চর্চিত হইত। সেও স্যারের প্রভাব। আমি ডক্টর ফস্টাসের প্রভাব দেইখা বিরক্ত হয়া একবার স্যারকে বলেই ফেললাম যে, ‘স্যার ফাউস্ট ইজ ফার মোর বেটার দ্যান ডক্টর ফস্টাস।’ টেগোর, গ্যেটে, দান্তে, ভার্জিল থেকে উদাহরণ দিলে স্যার কাবু হয়ে যেতেন। ওনাদের নাম শুনলেই নমঃ নমঃ করে উঠতেন।

১৯৯৯ সালের ওই সময় স্যার কোনো নাটক লিখতেছিলেন বইলা মনে পড়ে না। তত্ত্ব নিয়াও খুব চিন্তিত বইলা মনে হইত না। কিন্তু শিল্পের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ইত্যাদি নিয়া বড় ভাবিত আছিলেন। উনি আড্ডায় এইগুলা নিয়া কথা বলতেন। গভীর ও জটিল শিল্পচিন্তাটা ওনার স্বভাবের অংশ হয়া গেছিল। বলতেন, তিনি এমন এক শিল্পকর্ম সম্ভব করে তুলতে চান যার থাকবে মধ্যে সঙ্গীতের ঐকতান, নৃত্যের লহরী, কবিতার গভীরতা, উপন্যাসের ব্যাপ্তি, নাটকের সজীবতা। একজন শিল্পী হিসাবে তার শিল্পকামনার কথা খুব মোহনীয় লাগত। কিন্তু যখনই তিনি অধ্যাপকের সুরে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পের গুণাগুণ বর্ণনায় ব্যস্ত হয়া পড়তেন তখন সেখানে কোনো শিল্পীকে আর পাওয়া যাইত না। মনে হইত, তিনি যে শিল্পরচনা করতেছেন তা এক বিশাল ভ্রান্তির ওপর দাঁড়ায়ে রইছে। ওই ভ্রান্তির আবরণ ছাড়াইতে তিনি ধারালো চাকু হাতে এক অধ্যাপকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইছেন। একজন মানুষের সবকিছু সুখকর হয় না। তা প্রত্যাশা করাও এক ভ্রান্তি। যখনই স্যারের প্রতি আমার বিরাগ জন্মাইত, আমি নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে পালায়া যাইতাম। এক সপ্তা বা এক পক্ষ দেখা না দিয়া থাকতাম। তারপর একদিন হঠাৎ মনে হইত, স্যারের সঙ্গে দেখা কইরা আসি। কিছু শিল্পালোচনা হোক। জীবিত আর কোনো ব্যক্তি সর্বদা এমন শিল্প আলোচনায় মত্ত হয়ে আছেন এমন আমি দেখি নাই। মাঝে মাঝে মনে হইত উনি সাধু। নাট্যরচনার মধ্য দিয়া ঈশ্বরের সাক্ষাৎ পাওয়ার সাধনা করতেছেন। আমারে দেখলেই উনি একেবারে প্রসঙ্গে চইলা আসতেন। শিল্প-অবস্থানের ভিন্নতার কারণে একটা মধুর বিবাদ সর্বক্ষণই লেগে থাকত। আর বিবাদই আলোচনাকে দীর্ঘায়িত ও প্রাসঙ্গিক কইরা তুলত। মাঝে মধ্যে বাংলার প্রাচীন বা মধ্যযুগের সাহিত্য নিয়া আলোচনা শুরু হয়া যাইত। আমার মধ্যে একটা ফুরফুরে অনুভূতি তৈয়ার হইত। স্যারের আলোচনার প্রতি একটা অদম্য আকর্ষণ বোধ করতাম।

পক্সের সময় আমি প্রথম টের পাইলাম স্যারও আমার সঙ্গে আলোচনায় কিছুটা আকর্ষণ বোধ কইরা থাকতে পারেন। তখনও আমি মুখে মুখে তর্ক করতাম না। আমি ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। কনিষ্ঠতম কোনো সাহিত্যিক তো দূরের কথা বয়োজ্যেষ্ঠ কারো সঙ্গেও তর্ক জিনিশটা স্যার ভালোভাবে নিতেন না। কারো সাথে তর্ক হইলে ওনার ঘুমে ব্যাঘাত হইত। উনি একটা মানসিক অস্থিরতা বোধ করতেন। আমার মনে গুরুতর বিবাদ উপস্থিত হইলে আমি প্রশ্ন আকারে উত্থাপন করতাম বিষয়গুলা। স্যার উত্তর দিতে গিয়া আমার দ্বিমত আবিষ্কার করতেন। পরে অবশ্য সরাসরি কিছু বিতর্ক আমি তুলতাম। তবে কারো সামনে না। স্যার আর আমি থাকলে এই দ্বিমতগুলা আমি প্রকাশ করতাম। ঢাকায় স্থানান্তরিত হওয়ার পরও অনেকদিন আমার মনে হইত স্যারের সান্নিধ্যে গিয়া কিছু শিল্প আলোচনা কইরা আসি। অনুভব করতাম যেন এতে আমার মধ্যে জন্ম নেয়া লেখার আইডিয়া নতুন মাত্রা পাইতে পারে। লেখার রুচি বাড়তে পারে। চাই কি পড়াশোনার রুচিও বাড়তে পারে। তবে সবসময় আলোচনা হইত তা না। মাঝে মাঝে আলাপের ফাঁকে দীর্ঘ নীরবতা নাইমা আসত। আমি কইতাম, ‘স্যার এই নীরবতার নাম গর্ভবতী নিস্তব্ধতা।’ কথাটা আমি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা লেখায় পাইছিলাম। কিন্তু কথাটা যে সুনীলের এইটা স্যারকে কোনোদিন বলি নাই। কারণ জনপ্রিয় সাহিত্যের প্রতি তিনি স্বভাবগত এক সংঘর্ষ পোষণ করতেন। জনপ্রিয়তাকে তিনি সাহিত্যের দোষ আর টেলিভিশনের গুণ হিসাবে দেখতেন।

পক্সের দিনগুলাতে এইসব আড্ডার ফাঁকে মহুয়া উৎসব নিয়া নানা আলোচনা হইত। গানের অগ্রগতি কী হইল, কে নাচবে, কে বক্তৃতা দিবে তা নিয়া আলোচনা হইত। এ উৎসবের ধারণা স্যারের মনে আসছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন বা শ্রীনিকেতনের কর্মকাণ্ড থেকে। বোলপুরে প্রচুর মহুয়া গাছ থাকতে পারে, আর রবীন্দ্রনাথ কখনো মহুয়া উৎসবও করে থাকতে পারেন। সেখান থেকে স্যার আইডিয়াটা নিতে পারেন। ঠিক হইল, বোটানির একজন শিক্ষক (আবুল খায়ের স্যার) মহুয়া গাছ সম্পর্কে তথ্যসমৃদ্ধ বক্তৃতা দিবেন। বিজ্ঞান কী বলে এই সম্পর্কে আলোচনা হবে। কেউ যাতে একে বৃক্ষপূজা হিসাবে আখ্যা না দিতে পারে এইজন্য কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হবে। ক্যাম্পাসের ও দেশের ধর্মীয় গোষ্ঠীকে স্যার খুব ভয় পাইতেন। তাকে কোনোদিন মুরতাদ বা নাস্তিক ঘোষণা দিয়ে তার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে তারা যাতে শোর মাচাতে না পারে এইজন্য তিনি তটস্থ থাকতেন। নানা সময়ে নবীজীর বৃক্ষপ্রেমের উদাহরণ টাইনা আনতেন। ঠিত হইল, আমার পক্সের কারণে কোনোভাবেই অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ পিছান যাবে না। কারণ অলরেডি ফুল ফুটতে শুরু করছে। একদিন স্যার আমার জন্য কিছু মহুয়া ফুল কুড়ায়ে আনলেন। ফুল থেকে মধু খাওয়ার পদ্ধতি বাতলে দিলেন। দিনক্ষণ না পিছানোর পক্ষে স্যারের যুক্তি ছিল অকাট্য। পক্স আঠারো দিনের বেশি থাকে না। ফলে, পক্স থেকে সেরে উঠে উনিশ দিনের দিন আমি হেঁটে গিয়া সোজা মঞ্চে উঠে যদি একটা কবিতা পড়ে দিয়া আসি তাইলে সেটা কোনো অবাক করার ঘটনা হবে না। স্যারের আদেশ মোতাবেক আমার পক্সের গুটিগুলা শুকাতে আরম্ভ করল। ১৫ দিনের আগেই আমি মোটামুটি সুস্থ হয়া উঠলাম। কিন্তু আমার কাছে বসন্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রটি ততোদিনে মোহনীয় হয়া উঠছে। আমি স্থানের মজা পাইতে শুরু করছি। ফলে আরও কিছুদিন আমি সেইখানে থেকে গেলাম। ১৯ মার্চ সন্ধ্যা বেলা প্রথম বারের মতো জাকসু ভবন থিকা বারাইয়া রাস্তায় নামলাম। দূর থেকে দেখলাম, মহুয়া গাছটায় ফ্লাড লাইটের আলো পড়েছে। দূর থেকে একটা রহস্যের আসর বইলা মনে হইতেছিল। ট্রান্সপোর্ট থেকেই মহুয়ার ঘ্রাণ পাওয়া যাইতেছিল। কাছে যাইতে সবাই আমাকে অভ্যর্থনা জানাইল। স্যারও খুব খুশি হইলেন। আমি একটা কবিতা পড়লাম। কবিতার নাম ‘বসন্তে রচিত’। আমরা যখন অনুষ্ঠানের ওইখানে বইসা আছিলাম তখন গাছ থেকে টুপটাপ করে ফুল পড়তেছিল। মনে হইতেছিল, প্রকৃতির আশীর্বাদ রূপে এই ফুলাহার পড়ছে। পরের অনুষ্ঠানগুলাতে ফ্লাড লাইটের ব্যাপারে কিছু সংশোধনী আনা হইছিল। লাইট জ্বালাইলে বাদুড়দের সমস্যা হয় বইলা তীব্র আলো ব্যবহার করা হবে না, এই মর্মে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হইল।

অনুষ্ঠানটা ক্যাম্পাসে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিছিল। ঢাকা থিকা গান গাইতে গেছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। মজার ব্যাপার হইল গান গাওয়ার সময় হইলে সঞ্জীবদাকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। অনেক পরে উনি কোনো একটা জঙ্গলের ভিতর থেকে বের হয় ‘সাদা ময়লা রঙিলা পালে’ আর ‘গাড়ি চলে না’ গান দুইটা গাইছিলেন। ক্যাম্পাসের বামপন্থীরা সেলিম আল দীনকে পছন্দ করত না। আমি তার সাথী ছিলাম বইলা কঠোর ভাষায় আমারও সমালোচনা করত। তারা মহুয়া উৎসব নিয়া ব্যাপক হাসাহাসি করছিল। সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে মহুয়া উৎসবের কোনো ভূমিকা না পেয়ে তারা আমাকে অনেক ভর্ৎসনা করছিল। কিন্তু আমার কাছে এইসবের আলাদা মূল্য আছিল। দেশ উদ্ধারের বাসনা নিয়া বামপন্থীদের সাথে করা বহু জিনিশ আমি ভুইলা গেছি। নিশ্চয় তারাও ভুইলা গেছেন। কিন্তু সেলিম আল দীনের সঙ্গে সংগঠিত বহু ফালতু সাহিত্য আলোচনা আমার স্পষ্ট মনে রইছে। পরন্তু আমি গ্রামে ও মফস্বল শহরগুলাতে বড় হইছি। বড় সাহিত্যিক হওনের বাসনা সেই কৈশোরেই আমাকে লোভাতুর করে তুলেছিল। বড় সাহিত্যিক জীবনে দেখি নাই। লেখকরা কেমনে লেখে এইগুলা বইয়ে পড়ছি। কাছ থিকা লেখক, সাহিত্যিক ও তাদের জীবন দেখি নাই। সেলিম আল দীনের সান্নিধ্য আমার সেই সাহিত্যিক দেখার বাসনাকে তৃপ্ত করেছিল। সেলিম আল দীন কত বড় সাহিত্যিক আমি জানি না। তবে অল্পদিনেই আমি বুঝতে পারছিলাম, উনি বড় সাহিত্যিকের মতো করে জীবনযাপন করেন। নিজের একটা জগতে বাস করেন। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, আমি অনায়াসে যাতায়াত করতে পারি সেই রহস্যজগতে। এখন হয়তো তুড়ি মেরে বড় বড় সাহিত্যিককে উড়িয়ে দেয়ার মতো পাকামি বা বেয়াদবি অর্জন করতে পারছি। কিন্তু তখন সেলিম আল দীন আমার কাছে বিস্ময় আছিলেন। জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি প্রত্নতত্ত্বে ভর্তি হয়েছিলাম। ক্লাশ তেমন একটা করতাম না। ট্রান্সপোর্টে, লেকের ধারে, কালুর দোকানে ক্লাশের সময়টা অপব্যয় করতাম। কিন্তু সেলিম আল দীনের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আমরা একটা একটা প্যারালাল বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করছিলাম। সেইখানে শুধু সাহিত্যের ক্লাশ হইত। অভিজ্ঞতার ক্লাশ হইত। কদর্যতা আর গ্লানির ক্লাশও হইত ফাঁকে ফাঁকে। উনি যা শিখাইতে চাইছেন তা আমি শিখছি। কিন্তু যা শিখাতেই চান নাই তা আরও বেশি কইরা শিখছি।

২.
এই প্যারালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে আরও একটা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের ছিল। সেইটা হইল আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজপথের বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়বাসী লোকেরা একই সাথে সেলিম আল দীন ও আন্দোলনে আমার যোগকে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড হিসাবে দেখতেন। কিন্তু আমি দেখতাম না। আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু হইলে স্যারের সঙ্গে আমার একটা দূরত্ব তৈরি হইত। দেখাসাক্ষাৎ কমে যাইত। স্যার ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে নিরাপদে থাকতে পছন্দ করতেন। রাজনীতি না কইরা একবার দুইবার ভোট দিয়া, বন্ধুদের সাথে তুই-তোকারি কইরা কিছু সুবিধা নিয়া থাকতে পছন্দ করতেন। অন্য শিক্ষকদের মতো রাজনীতি কইরা ভাল পোস্ট পজিশন আদায় কইরা সুখে থাকা তার পক্ষে সম্ভব আছিল না। সেই পদ্ধতি উনি জানতেন না। ফলে, আমরা যখন ক্ষমতাসীন প্রশাসন, দল বা ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে মিছিলে নামতাম তখন স্যারের সঙ্গে বিশাল দূরত্ব তৈয়ার হইত। মিছিলে আমাকে দেখে উনি দূরে সরে যাইতেন। আন্দোলন তুঙ্গে থাকলে উনি একদমই আর খোঁজ নিতেন না। নিরানব্বইয়ের বর্ধিত বেতন ফি বিরোধী আন্দোলন শুরু হইলে স্যারের সাথে আমার একটা দীর্ঘ অন্তরাল তৈরি হইল। আমরা তখন সিনিয়র ছাত্রনেতাদের দেখে দেখে আন্দোলনের কৌশলগুলা রপ্ত করতেছি। রাজনীতি বুঝার চেষ্টা করতেছি। ক্ষমতাসীনদের প্রবল প্রতাপের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যে একটা বড় শিক্ষা এই মনে মনে বুঝতেছি। মনের গহীনে সাহস আয়ত্ত হইতেছে। প্রথম বর্ষে আমাদের কোর্সের সমাপনী বিষয় ছিল পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের ওপর একটি সন্দর্ভ রচনা। এ উপলক্ষে আমরা দুই দিনের সফরে পাহাড়পুর গিয়েছিলাম। সেখানেই খবর মিলল নতুন বছরের ভর্তি ফর্মের জন্য দ্বিগুণ ফি নির্ধারণ করেছে প্রশাসন। ক্যাম্পাসে একটা গোলযোগ অত্যাসন্ন। কিন্তু দেশে একটা গুরুতর রাজনৈতিক গোলযোগ চলছে। হরতাল-অবরোধের কারণে আমাদের দুই দিনের সফর ছয় দিনে পরিণত হইল। ক্যাম্পাসে ফিরে আমরা দ্রুত আন্দোলনে যুক্ত হইলাম। বর্ধিত ফি প্রত্যাহারের দাবিতে জমজমাট আন্দোলন তৈরি হইল। ছাত্রদের পক্ষ থেকে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হইল। অনেক আন্দোলনের পর প্রফেসর মুস্তাহিদুর রহমান নিযুক্ত হইলেন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য। অনেক আলোচনার পরও কোনো সমাধান হইল না। শেষ পর্যন্ত আমরা সিন্ডিকেট মিটিং ঘেরাও করলাম। সারারাত শিক্ষকদের আটকায়া রাখা হইল। আলোচনা, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের পর যখন সবাই ক্লান্ত তখন ভোরের আলো ফোটার সময় পুলিশ লাঠিচার্জ করল। টিয়ারসেলে বাতাস ঝাঁঝালো হয়া উঠল। সিন্ডিকেট অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করল। দুই ঘণ্টার মধ্যে সবাইকে ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে বলা হইল। কিছুক্ষণ লড়ার পর আমরা হলে ফিরে বড় বড় বোচকা বেন্ধে বের হইলাম। সবাই ঢাকা যাইতেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল হবে। প্রেসক্লাবে যাওয়া হবে। কর্মসূচি পালন হবে। এইরকম ধারণা নিয়ে আমরা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হইলাম। আমি ব্যাগ গুছিয়ে নিচে নেমে হলের পিএবিএক্স থেকে স্যারের বাসায় ফোন দিলাম। স্যার ফোন ধইরা কইলেন, চলে আয়। গেলাম, গিয়া বললাম, ‘স্যার ঢাকা যাইতে হবে।’ বললেন, ‘ঢাকা যাবি তো তাড়া কিসের? মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিনরে তোরা এমন ক্ষেপাইলি। এখন বোঝ পুলিশের বাড়ির মজা।’ স্যারের সাথে বেশি তর্ক করলাম না। গোসল-টোসল করে নাস্তা খেয়ে পূর্ববৎ আড্ডা-আলোচনায় মত্ত হইলাম। সাহিত্য, শিল্প, রবীন্দ্রনাথ। কেউ রবীন্দ্রনাথের নামে কিছু কইলে স্যার খুব ক্ষেপে যাইতেন। ওই সময় কেউ একজন পত্রিকায় লিখে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে খানিক উষ্মা প্রকাশ করছিলেন। সে সম্পর্কে স্যার কইলেন, ‘গবাক্ষে প্রতিফলিত আকাশ বুঝিস?’ আমি কইলাম, ‘না স্যার।’ উনি বললেন, ‘গবাক্ষ হইল গরুর পায়ের ছাপ মাটিতে পড়লে যেই দাগ হয় সেইটা। গবাক্ষে পানি জমলে সেইখানে তো আকাশের ছায়া পড়ে, নাকি? সেই জলে আকাশের ছায়া দেখে এরা আকাশ মাপে।’ আমি স্যারকে সমর্থন করলাম, বললাম, ‘ঋত্বিক ঘটকের একটা সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম। উনি সেইখানে বলছিলেন, কেউ যদি রবীন্দ্রনাথের নামে কটু কথা বলে তাইলে আমার হয়ে তাকে জুতো মেরে আসবি।’ আমার এই সমর্থনে তিনি খুব খুশি হইছিলেন।

সেইদিন দুপুর গড়ায়ে বিকাল হইল। আমি কইলাম, ‘স্যার, ঢাকা যাবেন না?’ স্যার বলেন, ‘আজ থেকে যা। কাল সকাল সকাল তোকে পৌঁছায়ে দেব।’ আমি বললাম, ‘স্যার, সবাই মাইর খায়া ঢাকা গেল। আমি একা আপনার এইখানে শিল্পালোচনা করতেছি এইটা তো ভাল দেখাইতেছে না। আমি যাই।’ স্যার কইলেন, ‘যাবি? আচ্ছা যা তাইলে। কালকে বিকালে আফজালের ওইখানে আসিস।’ স্যারকে কথা দিয়া আমি ঢাকার পথে রওনা দিলাম।

বর্ধিত বেতন ফি বিরোধী আন্দোলনের দ্বিতীয় দফা ঢাকায় শুরু হইল। আমি সাইমন জাকারিয়ার আজিমপুরের বাসায় থেকে আন্দোলনে যোগ দিতাম। আমার সাথে ওইখানে জাফর এসে জুটল। মাঝে মাঝে মাদল হাসান আসত। ঢাকা শহরের বন্ধুস্থানীয় লেখকদের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগ স্থাপনে আমি অনেক আগায়ে ছিলাম। আজিজ মার্কেটের আড্ডায় মাদল ও জাফরের সঙ্গে লেখকদের সংযোগ আমার দৌত্যে অনুষ্ঠিত হইছিল। দৌত্য শব্দটা ইচ্ছা করে ব্যবহার করলাম। এই ধরনের শব্দ স্যার খুব পছন্দ করতেন। একটু অপ্রচলিত পুরনো বাংলা বা তৎসম শব্দ ব্যবহার করে গদ্য রচনা ওনার ভাল লাগত। যদিও এইটা আমার পছন্দ না। আমি মুখের ভাষার কাছাকাছি থাকতে বেশি আনন্দ পাই। আমার সহপাঠী বন্ধু লেখকদের মধ্যে শুভাশিস সিনহা তখন ব্যাপক পরিচিত। ঢাকা শহরের প্রায় সব সাহিত্য সাময়িকীতে তার কবিতা নিয়মিত ছাপা হইত। আমরা শুভাশিসকে হিংসা করতাম। ঢাকা শহরের সাহিত্য সম্পাদক ও বড় লেখকদের সঙ্গে তার মারফতি যোগাযোগের বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করতাম। শুভাশিস বাদে বাকি সহপাঠী লেখক-কবিরা হরেদরে সেলিম আল দীনের কাছে যাইতে চাইত, কিন্তু উনি প্রশ্রয় দিতেন না। স্যারের টোন বুঝে তার সাথে চলা মুশকিল ছিল। ফলে, কাউকে যদি একদিন পরীক্ষামূলকভাবে একসেস দিতেন, তো পরের দিন আর পাত্তা দিতেন না। তার সাবজেক্টের কিছু ছাত্র একবার তার সাথে দেখা করার উদ্যোগ নিল। তারা আমার ইয়ারমেট। ওরা আমাকে স্যারের সাথে ঘুরতে দেখত। সেখান থেকে হয়তো ওদের মনেও আড্ডার বাসনা জেগে উঠে থাকবে। পুরাতন কলাভবনে স্যারের রুমের দরজায় গিয়া তারা ভেতরে ঢুকার অনুমতি প্রার্থনা করল।

স্যার বললেন, ‘তোরা কোন ইয়ার?’ ওদের একজন বলল, ‘স্যার, ফার্স্ট ইয়ার।’

‘তোদের সঙ্গে তো আমার ক্লাশ নাই। কেন এসেছিস?’

‘স্যার একটু কথা ছিল।’

স্যার বললেন, ‘থার্ড ইয়ারে উঠে তারপর আসিস।’ বলে স্যার ওদের তাড়ায়ে দিলেন।

কবিদের মধ্যে মাদল ছিল বিদ্রোহী। অ্যাডজাস্টিং টেন্ডেন্সি ওর মধ্যে একদমই আছিল না। যাকে তাকে মুখের ওপর যা-তা বলার রেওয়াজ ছিল ওর। স্যারের সঙ্গে সে বেয়াদবি দেখাইত না। যথাসম্ভব ভদ্রস্থ থাকত, তারপরও মাদলকে স্যার প্রথম দিকে নিতেন না। পরে খুব স্নেহ করতেন এবং মাদলের নানা সংকটে উদ্বেগ বোধ করতেন। নাট্যতত্ত্বের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও শুভাসিস সিনহার সঙ্গ খুব চাইতেন। শুভাশিস স্যারকে দেখলেই গাছের আড়ালে, টিলার আড়ালে, বিল্ডিংয়ের আড়ালে লুকায়ে পড়তো। স্যারের সাথে লুকোচুরির সম্পর্ক ছিল তার। সে লুকাইছে এইটা টের পাইলেই তিনি লোক পাঠিয়ে তাকে উদ্ধার করে বাসায় নিয়ে গিয়ে বন্দিদশায় তার সঙ্গে আড্ডা দিতেন। স্যারের এই এক গুণ, কারো মধ্যে প্রতিভা আছে বুঝতে পারলেই হলো। তাকে শিষ্য বানিয়ে তবে নিরস্ত হতেন।

কবি মোহাম্মদ রফিকের সঙ্গে তার তখন দীর্ঘকালীন বিরহ চলতেছে। জাহাঙ্গীরনগরে তখন দুইটা কুতুব মিনার, মোহাম্মদ রফিক ও সেলিম আল দীন। আরেকটা বিশমাইলে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর আমলে প্রায় তৈরি হইতে ধরছিল। কাজ শেষ না হওয়ায় আর বিশেষ আলোচিত হইতে পারে নাই। রফিক স্যারের সঙ্গে সেলিম স্যারের এই বিরহ ও বিবাদ বিষয়ে নানা কথা আমরা শুনতাম। পরে আমাদের উদ্যোগে সেই বিবাদ মিটেছিল। সম্পর্ক যাই থাক, রফিক স্যারের রুমে কারা যাচ্ছে এটা সেলিম স্যার খুব খেয়াল করতেন। কবিদের সঙ্গে তিনি খুব প্রতিযোগিতা বোধ করেতেন। মোহাম্মদ রফিকের কবিতা খুব খেয়াল করে পড়তেন। আর অযথা প্রশংসা করতেন। মহাকাব্যিক, অসাধারণ এইগুলা ছিল তার প্রশংসার সাধারণ ভাষা। কারো নিন্দা করলে চোদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে ফেলতেন। স্যারের লেখালেখির ইতিহাসটা বড়ই মজার। উনি প্রথম যৌবনে কবি হইতে চাইছিলেন। কবিতার বইও বাইর করছিলেন। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সময়ের স্বরটা উনি ধরতে পারেন নাই। একভাবে ব্যর্থ হয়ে নাটকে হাত মশকো করেছিলেন রফিক আজাদ ও ফরহাদ মজহারের পরামর্শে। রফিক আজাদকে তিনি বাবা ডাকতেন। দেখা হলেই পা ছুঁয়ে সালাম করতেন। একবার আমার সামনে আজিজ মার্কেটে বাবা বাবা বলে সালাম করে ফেললেন। শুভাসিস সিনহা নাকি হুমায়ুন আজাদকে সেলিম আল দীনের কথা বলেছিল কোনো এক অবসরে। হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ‘ও তো পিতাবাদী। রফিক আজাদকে দেখেই পিতা পিতা বলে পায়ে পড়ল।’ আসলে সেলিম আল দীন স্বভাবে খুব ভক্তিবাদী ছিলেন। তিনি নিজেও ভক্তি পছন্দ করতেন। যাদের ভক্তি করতেন তাদের মন থেকেই করতেন। কৃতজ্ঞতা তাকে ভক্তির দিকে নিয়া যাইত। ভক্তির মধ্যে কপটতা ছিল কখনো দেখা গিয়েছিল? আমার খুব বেশি মনে পড়ে না। তবে তার মধ্যে এক প্রকার প্রতিহিংসা কাজ করত। উনি তীব্র বিক্ষোভ সহকারে ঘামতে ঘামতে লিখতেন। একবার বললেন, ‘সাজ্জাদ কাদির আমার নাটক পড়ে কী বলছিল, জানিস? মিডিওকার। লেখা ছেড়ে দিতে বলেছিল। আর এখন?’ একটা তৃপ্তি বোধ করতেন, থরে থরে সাজানো নিজের বইগুলার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরে। ঢাকা শহরে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিচারণ করতেন অনেক দূরের কোনো বিষয় হিসাবে। যেন কোনো চলমান সংযোগ বোধ করছেন না। স্মৃতির হালকা পথরেখা ধইরা কিছুটা আগায়া গিয়া দেখে আসতেছেন। নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তার কী হইছিল সেইটা কোনোদিনই স্পষ্ট করে আমরা বুঝতে পারি নাই। কেন বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে সাময়িকভাবে তিনি সাদাত কলেজে চলে গিয়েছিলেন তারও সুরাহা হয় নাই।

মাঝে মাঝে বলতেন তার এক হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর কথা। ঢাকায় থাকতেন সেই লেখক বন্ধু। নাম শাহজাদ ফিরদৌস। কোনো এক সময় পশ্চিমবঙ্গে চলে গিয়েছিলেন। একবার আজিজ মার্কেটে শাহজাদ ফিরদৌসের কোনো একটা বই দেখে আমি সে-কথা স্যারকে জানালে তার মুখ চকচক করে উঠল। বললেন, ‘সেই শাহজাদ ফিরদৌস? বইটা এনে দিস তো।’ আজ দেই কাল দেই করে করে শাহজাদ ফিরদৌসের সঙ্গে তার সংযোগ তৈরি করার অবলম্বন সেই বই আর কোনোদিনই তাকে পৌঁছানো হয়নি। তবে আমার দুতিয়ালিতে তিনি শৈশবের এক স্মৃতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারছিলেন। ওনার বাবা রেলওয়েতে কাজ করতেন। সেই সুবাদে কুড়িগ্রামের উলিপুরে থাকতেন। আমার বন্ধু কাজল অর্থাৎ শুভাশিস মজুমদার সেই উলিপুরের। হঠাৎ একদিন কাজলের সঙ্গে তার আলাপ করিয়ে দেয়ার পর তিনি আবিষ্কার করলেন, তার শৈশবের এক দিদি আসলে কাজলের মাসিমা। কাজলের মাধ্যমে তাদের মধ্যে পত্রযোগাযোগ স্থাপিত হইছিল। তিনি উলিপুর যাওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিছিলেন। শেষ পর্যন্ত যেতে পারছিলেন কি? আমি জানি না। আমার মতে শৈশবের স্মৃতিবাহী জায়গাগুলোতে ফিরে যেতে নেই। কারণ স্মৃতি বাস্তবের চেয়ে মধুর।

স্যার চাইতেন কেউ ওনাকে কবি বলুক। ছোট এই শব্দটার প্রতি ওনার এক অনর্থক মায়া জন্মাইছিল। কিন্তু লোকে স্যারকে কবি বলত না। বলত রফিক স্যারকে। এজন্য তার মধ্যে এক ধরনের অভিমান ছিল। এ অভিমান ছিল স্থায়ী। এই অভিমানগুলো জমাতে জমাতে পাহাড়প্রমাণ হলে তিনি লিখতে বসতেন। লাইনগুলোকে কবিতা করে তোলার তীব্র বাসনা কখন তাকে আপ্লুত কইরা ফেলত। রফিক স্যারের সঙ্গে সেলিম স্যারের কী হইছিল আমরা জানি না। তবে দীর্ঘ দুই-তিন বছরের বাচনিক সম্পর্ক জোড়া লাগছিল শামীম রেজা, প্রশান্ত মৃধার দুতিয়ালিতে। রফিক স্যারের ঘরে শামীম ভাই ও প্রশান্ত মৃধা ছিলেন। কে জানি সেলিম স্যারকে নিয়া গেল সেইখানে। স্যার রুমে ঢুকেই রফিক স্যারকে সালাম করে বসলেন। রফিক স্যার তাকে বুকে টাইনা নিল, তারপর দুইজনে মিলে কানতে আরম্ভ করলেন। এইটা ১৯৯৭ সালের ঘটনা হবে। সম্ভবত নভেম্বর বা ডিসেম্বরে এই ঘটনা ঘটছিল। আমি কেমনে ওই সময় রফিক স্যারের রুমে উপস্থিত হইছিলাম সেইটা একটা বিস্ময়। ’৯৭ সালের অক্টোবরে আমি ক্যাম্পাসে গেছিলাম। ’৯৮ সালের জানুয়ারিতে আমাদের ক্লাশ শুরু হইছিল। একথা স্পষ্ট মনে আছে, ক্লাশ শুরুর আগেই কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে আমার সুসম্পর্কের ভিত স্থাপিত হইছিল। কিন্তু এইরকম একটা মানভঞ্জন অনুষ্ঠানেও যে সাক্ষী হইছিলাম সেইটা আজকে বিশেষভাবে মনে পড়ল। এর আগে এই কথা কেন জানি মনে পড়ে নাই। এইখানে জানায়ে রাখি, সেলিম আল দীন এবং মোহাম্মদ রফিকের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার সূত্র হয়েছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। ইলিয়াসের সঙ্গে কখনোই সাক্ষাতের সুযোগ হয় নাই। কিন্তু কলেজ থেকেই তার সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হইছিল। ইলিয়াসের লেখা আমার ভীষণ পছন্দ হইত। রংপুরে থাকার সময় ইলিয়াসের মৃত্যু হইলে আমার মধ্যে গুরুতর এক বিরহ উপস্থিত হইছিল। আমি একা একা শোকগ্রস্ত হয়ে ঘুরছিলাম পুরা শহর জুড়ে। জাহাঙ্গীরনগরে জানুয়ারি মাসে আমার মনে হইল, ইলিয়াসকে নিয়ে তার জন্মবার্ষিকীতে একটা অনুষ্ঠান করব। প্রথম দিকে ফারুক ওয়াসিফ আমাকে সমর্থন দিলেও পরে উনি বগুড়ার অনুষ্ঠান নিয়া ব্যস্ত হয়া পড়ছিলেন। ফলে, পুরো আয়োজনটা আমি একক উদ্যোগে করছিলাম। অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হইছিলেন মোহাম্মদ রফিক ও সেলিম আল দীন। বক্তব্য দিছিলেন আনু মুহাম্মদ। দর্শক হিসাবে উপস্থিত হইছিলেন, রেহনুমা আহমেদ ও মানস চৌধুরী। সেলিম স্যার ও রফিক স্যার দুইজনেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করছিলেন। খালিকুজ্জামান ইলিয়াসকেও আমি দাওয়াত দিছিলাম। কিন্তু উনি কোনো এক ব্যস্ততায় উপস্থিত হইতে পারেন নাই। উনি তখন জাহাঙ্গীরনগরে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ও কলা অনুষদের ডিন। সেলিম স্যার কইলেন, ইলিয়াস ভাই আমার লেখার খুব প্রশংসা করতেন। খালিকুজ্জামানের বাসায় মাঝে মাঝে আসলে তার সঙ্গে ওনার আড্ডা হইত। এরকমই এক আড্ডায় তিনি কেরামতমঙ্গল নাটকের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। স্যারের মতে আহমদ ছফা ছাড়া এমন উদার লেখক তিনি আর দেখেন নাই। আহমদ ছফা হলেন সেই বিরল লেখক যিনি তরুণদের মধ্যে সামান্য সম্ভাবনা দেখলে জনে জনে তা বলতেন এবং লিখতেন। আর ছিলেন এই ইলিয়াস। রফিক স্যারের কাছে ইলিয়াস ছিলেন মঞ্জু, অর্থাৎ তার বাল্যবন্ধু, ইয়ার, মেট। তিনি মঞ্জুর বিবাহ, কলেজজীবন নিয়া এক্সক্লুসিভ একটা বক্তৃতা দিছিলেন। সেলিম স্যার মাঝে মাঝে ইলিয়াসের প্রশংসার কথার পুনরাবৃত্তি করতেন। বলতেন মহান সাহিত্যিক আহমদ ছফার কথা। বলতেন, ‘চল্ না, একদিন ছফা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে আসি।’ আমি আহমদ ছফাকে দূর থেকে অনেকবার দেখলেও কখনো কথা বলি নাই। স্যারের সঙ্গে ছফা-দর্শনে যাওয়ার আইডিয়াটা আমার মাথায় খেলে গেল। আহমদ ছফা তখন আজিজ মার্কেটে ‘উত্থানপর্ব’ নামে একটা দোকানে বসতেন। স্যারকে নিয়া সেই দোকানে গেলাম একদিন। স্যার প্রথমেই তার পদস্পর্শ নিলেন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছফা কেমন ছিলেন সেই বিবরণ দিলেন আমাকে। তার পাখি পোষা, বাঁশি বাজানো ইত্যাদি নিয়ে বললেন। বললেন, ‘ছফা ভাই, একদিন আমার খাওয়ার টাকা ছিল না, আপনি আমাকে সকালের নাস্তা খাইয়েছিলেন, সেই দিনটার কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে।’ পুরানা দিনের স্মৃতিচারণ করতে করতে ছফা বললেন, রবীন্দ্ররচনাবলী পড়া কোনো তরুণের দেখা তিনি আর ইদানিং পান না। মানিক পড়া কোনো সাহিত্যিকের দেখা মেলে না বলে তিনি তীব্র অসন্তোষ ব্যক্ত করলেন। এরপরই কী এক রহস্যময় কারণে তাদের দুজনের মধ্যে ব্যক্তিত্বের সংঘাত শুরু হইল। দুইজনেই মধ্যযুগের নানা কাব্য থেকে মুখস্ত বলে যেতে থাকলেন। শেখ শুভদয়া থেকে শুরু করে পদ্মাবতী পর্যন্ত এই মুখস্ত বলার প্রতিযোগিতা গড়াইল। আমি একেবারে তাজ্জব হয়া গেলাম।

ফরহাদ মজহারের ব্যাপারেও স্যার নমঃ নমঃ করতেন। বলতেন, ‘উনি আমার জীবন রক্ষা করেছেন।’ উনি নাকি কবিতা সাধনায় ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন। তখন ফরহাদ ভাই ওনাকে বুঝিয়ে নাটকের দিকে পথনির্দেশ করেছিলেন। জাহাঙ্গীনগরে পড়তে পড়তেই আমি ফরহাদ ভাইয়ের খুব ভক্ত হয়ে উঠছিলাম। কিছুকাল তার সান্নিধ্যও পেয়েছিলাম। তার কথা স্যারকে গিয়া গিয়া বলতাম। অন্য কেউ হইলে স্যার রাগ করতেন। কিন্তু ফরহাদ ভাই বইলা খুব খুশি হইতেন। নানা খুঁটিনাটি জিজ্ঞাস করতেন। ফরহাদ ভাই তার নাটক ও তত্ত্ব নিয়া যে কঠোর সমালোচনা করতেন সেইগুলা গুরুত্ব দিয়া শুনতেন। গুরুতর বিবাদ মনে উপস্থিত হইলেও প্রকাশ করতেন না। বলতেন, আমাদের কালের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ফরহাদ ভাই।

কিন্তু হুমায়ুন আজাদকে খুব ভয় পেতেন। আহমদ শরীফের মৃত্যুর পর গেছি শহীদ মিনারে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাইতে। ফুল দিয়া লাশ দেখে আমরা গগন শিরিশগুলার নিচে দাঁড়াইছি, অমনি কোথা থেকে হুমায়ুন আজাদ উপস্থিত। বললেন, কী হে সেলিম, সুন্দর একটা পাঞ্জাবী পরেছো। বলেই চলে গেলেন। স্যার আমাকে জিগাইলেন, কী বললো বল তো? আমি বললাম, প্রশংসাই তো করলো মনে হয়। স্যার একটু সন্দেহ প্রকাশ করলেন, বললেন, ভাল ছাত্রদের এই এক সমস্যা বুঝলি। উনি হলেন টিপিক্যাল ভাল ছাত্র। আমরা ওনার নোট মুখস্ত করে পরীক্ষা দিতাম। এখনও এটা উনি ভুলতে পারছেন না।

ঢাকায় বর্ধিত বেতন ফি বিরোধী আন্দোলনের সময়ই জানা গেল আলাউদ্দিন স্যার ভিসি পদ, প্রফেসরশিপ ত্যাগ করে কিশোরগঞ্জের উপনির্বাচনে দাঁড়াইতেছেন। হইতে পারে আন্দোলনের কারণে উনি সেইসময় ওই সিদ্ধান্ত নিছিলেন। এমনও হইতে পারে, প্রফেসরশিপের চাইতে জননেতা হওয়াটাকে তিনি শ্রেয়োতর মনে করছিলেন। কিন্তু কেউ যে এমন কাজ করতে পারে এমন ধারণা আমাদের ছিল না। তাই বিষয়টা ভীষণ বিস্মিত করছিল। আলাউদ্দিন স্যারের প্রস্থানে দেখলাম সেলিম স্যারের মধ্যে একটু বিষণ্নতা তৈরি হইলো। উনি একটু চিন্তিত হয়া পড়লেন। উনি মনে করছিলেন, প্রফেসর আবদুল বায়েস আর তার টিএসসির ডিরেক্টরশিপ বাড়াবেন না। রাজনীতির এই আকস্মিক গতিবিধিতে উনি একটু থমকে গেছলেন। আবদুল বায়েসকে অভিনন্দন জানাবেন কি না এই নিয়ে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর উনি ঠিকই তাকে অভিনন্দন জানাইলেন। তার সাথে তুই-তোকারির পুরনো সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন। পুরানা বন্ধুত্বের স্মৃতি তুইলা ধরলেন। আবদুল বায়েস আওয়ামী লীগ হইলেও সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি আছিলেন। প্রথমে তিনি খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করলেন। কালচারাল কাজকর্মে মন দিলেন। নির্মাণ কাজ শুরু করলেন। সেলিম আল দীন সেইগুলাতে ব্যাপক সমর্থন ও সহযোগিতা দিলেন। এরই মধ্যে নতুন কলাভবন নির্মাণের কথা শোনা গেল। নতুন কলাভবনের জায়গাটায় একটা ঘনবন আছিল। গাছ কাইটা কলাভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে আমরা নীতিগতভাবে একাট্টা আছিলাম। কিন্তু দেখা গেল আন্দোলনের শক্তি আর নাই। সাইনেডাইয়ের মধ্যে ঢাকায় আন্দোলন চালাইতে গিয়া সবাই কোনো না কোনো ধার-দেনার মধ্যে পইড়া রইছি। তাছাড়া আন্দোলনের মূল শক্তি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট আর ছাত্র ইউনিয়ন রাজি না। তাই আবু জাঈদ আজিজের নেতৃত্বে আমরা মিনিমাম অ্যাকটিভিজমের উদাহরণ হিসাবে সাক্ষর সংগ্রহ শুরু করলাম। এর মধ্যে শুনতে পাইলাম, নতুন কলাভবনের মূল পরিকল্পনায় সামনের গাছগুলা কাটার কথা আছে। তার মানে আমাদের মহুয়া গাছ ফিনিশ। গুটিকয় লোক মিলে স্বাক্ষর সংগ্রহ জমতেছে না। তখন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে গাছ কাটার বিরুদ্ধে আন্দোলন পত্রপত্রিকায় একটা হেজিমনি তৈরি করছিল। এই দেইখা আমরাও একটু বল পাইলাম। কিন্তু ভিতরে ভিতরে হতাশ ছিলাম। মহুয়া গাছের ভবিষ্যৎ চিন্তা কইরা অশান্তিবশতঃ আমি একদিন সেলিম স্যারের সাথে কথা বলতে গেলাম। বললাম, এই মহুয়া গাছ গেলে আমরা তা কিছুতেই মানবো না। সো, গাছ কাটলে আলাউদ্দিন স্যারের মতো বায়েস স্যারকেও যাইতে হবে। স্যার কী বুঝলেন জানি না। মহুয়া গাছ নিয়া তারও আবেগ ছিল। উনি ওইদিন সন্ধ্যাতেই আমারে ভিসির বাসার সামনে দাঁড় করায়ে রেখে ভিতরে ঢুকে গেলেন। আমি অন্ধকারে অনেকক্ষণ চোরের মতো দাঁড়ায়ে থাকলাম। বের হয়া স্যার বললেন, গাছটা বেঁচে গেল মনে হয়। সত্যি গাছটা বেঁচে গেছলো। শুধু ওই গাছটা সাথে সঙ্গীসাথী কিছু গাছকেও সে রক্ষা করতে পারছিল। ভবন নির্মাণ পরিকল্পনা থেকে সামনের গাছগুলা বাদ পড়তে পেরেছিল।

হয়তো শেষবারের জন্য মহুয়া উৎসব করতে গিয়া ২০০৭ সালে স্যারের মনে হয়া থাকবে সেই কথা। নাও মনে হইতে পারে। কারণ ঘটনার ওপর ঘটনার ঘনঘটা যখন জীবনকে পর্যুদস্ত করে তোলে তখন স্মৃতি আর আলাদা কইরা মনে হয় না। মনে স্মৃতির বদলে যা থাকে তা হইলো স্মৃতির অবভাস। সেই যেনস্মৃতি বা ঊনস্মৃতিকেই আমরা স্মৃতি বইলা ভুল করি। হইতে পারে, উনি হয়তো আমারে খালি দেখতে চাইছিলেন। সত্য হইলো ওইবার দেখা না হইলে এখন আমাকে বলতে হইতো মৃত্যুর আগে প্রায় তিনবছর স্যারের সাথে আমার দেখাসাক্ষাৎ হয় নাই। কেন দেখা হয় নাই, কী ঘটনা এইটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। কারণ সবাই জানে। আমরা যখন উপযুক্ত একটা পেশা বাইছা নেওয়ার জন্য ঢাকা শহরে সংগ্রাম করতেছি তখন সাভারের নিভৃত পল্লীতে সেলিম আল দীনের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় কোথায়? কিন্তু আমি নিশ্চিত জানতাম স্যারের মধ্যে প্রচণ্ড মৃত্যুভীতি বাসা বাঁধছে। উনি লেখার জন্য তাড়াহুড়া করতেছেন। দ্রুত লিখতেছেন। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতেছেন ভেতরে ভেতরে। এইটার শুরু ১৯৯৮ সালে। ওইবার উনি ফুসফুসে সমস্যাজনিত কারণে রাজধানীর শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি হইছিলেন। খুব খারাপ অবস্থা হইছিল তখন। ডাক্তার পানাহার বারণ কইরা দিছিলেন। কিন্তু ওনার খুব ইচ্ছা করতো পান করার। দুই একবার দেখছি বন্ধুদের কাছ থেকে নিয়ে সামান্য খাইছেন। অল্প খাইলেই ওনার অধিক নেশা হইতো। এছাড়া অবশ্য উপায় ছিল না। কারণ সবাই ওনার খানাপিনার দিকে কড়া দৃষ্টি রাখতো। একবার শেরাটনের সামনে জ্যামে আটকা পড়ছি। গাড়ির মুখ সাকুরার দিকে। স্যার কয়, এটা চিনশ? আমি দেখলাম উনি সাকুরা বারের দিকে আঙুল দেখাইতেছেন। চিনি বলা বিপদ। তাই বললাম, এটা কী স্যার। উনি কইলেন, জানিস না, ভাল কথা। চিনবি না। কখনো ওই বিল্ডিংটায় যাবি না। মদ তো দূরের কথা স্যারের সামনে সিগারেট খাওয়া যাইতো না। একজনের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন কাটাবো অথচ সিগারেট খাবো না এটা খুব কঠিন ব্যাপার। প্রথম দিকে উপায় পাইতাম না। উনি প্রচণ্ড হায়ারারকিতে বিশ্বাসী। আনুষ্ঠানিক হায়ারারকি। ওনার বাসায় বসার ব্যবস্থা হলো, কার্পেট বা নিচু ডিভান। আমরা কার্পেটে বসলে উনি ডিভানের পাশে রাখা একটু উঁচু তাকিয়ার ওপর বসতেন। আমরা ডিভানে বসলে উনি ডিভানেই বসতেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বলতেন নিচে আরাম করে বস। এরকম আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে একত্রে সিগারেট খাওয়া হয়া উঠতো না।

শমরিতা থেকে ফেরার পর কিছুদিন সিগারেট তেমন খান নাই। কিছু সময় কাটার পর দেখা গেল প্যাকেট কেনা শুরু হইছে। প্রথমে খাইতেন বাংলা ফাইভ। বাংলা ফাইভ বাজার থেকে হাওয়া হয়ে গেলে বেনসন ধরলেন। লেখার সময় অত্যধিক সিগারেট খাইতেন। প্যাকেটের পর প্যাকেট সাবাড় করে দিতেন। চোখের সামনে তাকে সিগারেট খেতে দেখে আমার নেশা উঠতো। কিন্তু হায়ারারকি অতিক্রম করা কঠিন আছিল। তাই একটা বুদ্ধি বের করলাম। আড্ডা দেয়ার ফাঁকে স্যার মাঝে মাঝে চড়–ই পাখির মতো চান কইরা আসতেন। কোনো এক গরমের দিন এমন এক গোসলে যাওয়ার কথা কইতেই তার মিনিট দুয়েকের অনুপস্থিতির সুযোগে আমি সিগারেট ধরায়ে বসলাম। কিছুক্ষণ পর বুঝলাম, ওনার গোসল শেষ, করিডোর ধইরা আসতেছেন। এমন সময় বেশি করে ধোঁয়া করিডোরের দিকে ছাইড়া দিলাম। ধোঁয়া দেখে স্যার আসতে গিয়াও আবার ফিরে গেলেন। সেইদিন থেকে আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে আমার জন্য তিনি সিগারেট ব্রেক বরাদ্দ রাখতেন। কোনো একটা ছুতা করে অন্য ঘরে চলে যেতেন। ফেরার সময় আওয়াজ দিতেন। এই ফাঁকে আমি সিগারেট আহার করতাম।

শমরিতা থেকে ফিরার পর থেকে সেলিম স্যার খাওয়া-দাওয়ার বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনলেন। ওনার জন্য আলাদা রান্না হইতো। আলাদা কইরা গলাভাত। মশলা ছাড়া রান্না করা আধাসেদ্ধ সবজি, ডাল আর মাছ দিয়া উনি দুই বেলা খাইতেন। সেগুলো ছিল বিস্বাদ। কিন্তু উনি খুব তৃপ্তি করে দ্রুত খাইতেন। হয়তো বললেন, চল খেয়ে নেই। আমি হাত ধুয়ে বসেছি তো দেখি ওনার খাওয়া শেষ। আমি ওনারে কোনোদিন মাংস খাইতে দেখি নাই। সাভার থেকে মাশরুম কিনে আনতেন। রান্না ঘরে বিশেষ ব্যবস্থায় মাশরুম চাষের ব্যবস্থা করছিলেন। কে জানি তারে গ্রিন টি আইনা দিছিলো। স্বাদহীন সেই চা খাইতেন। মাঝে মাঝে নিজেই রান্না করতেন। একদিন কইলেন, ভাল একটা জিনিশ পাইছি, চল খাই। আমি তো অধীর আগ্রহে ওয়েট করতেছি। দেখি কিছু না। চা। বললেন, এই চা বিশেষভাবে খাইতে হবে। আগে চায়ের গন্ধ নিয়া তারপর কাপে চুমুক দিতে হবে। কেউ একজন দার্জিলিং থেকে ওনারে এক প্যাকেট চা পাঠাইছিল। উনি দার্জিলিং আর সিলেটের চা মিশাইছেন। যত ওপরের দিকের চা ততোই নাকি গন্ধ আর যতো নিচের দিকের ততোই স্বাদ। অদ্ভুত খাবারের মধ্যে ব্রোকোলি খাইতেন। কিন্তু সব খাবারই ছিল বিস্বাদ। বিস্বাদ খাবার গ্রহণের অভ্যাস রীতিমতো সাধনার ব্যাপার। কিন্তু দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করার জন্য এর কোনো বিকল্প আছিল না। উনি খুব চাইতেন রবীন্দ্রনাথের সমান বাঁচতে। আশি বছর। নিজের অর্জনগুলা দেইখা, উদযাপন কইরা যাইতে চাইছিলেন। খাবারে কৃচ্ছ্রতা সাধন করলেও মাছের ব্যাপারে উনি উদার আছিলেন। প্রচুর মাছ খাইতেন আর কিনতেন। একবার আমাকে কইলেন, কাল সকালে আমরা নয়ার হাট যাচ্ছি। ব্রিজের ওপর বসে সূর্যোদয় দেখবো, আর পরোটা খাবো। তুই গেলে চল। শর্ত হইলো সূর্যোদয় দেখতে হইলে ভোর পাঁচটায় উইঠা তার সঙ্গে যোগ দিতে হবে। এত সকালে ক্যাম্পাস জীবনে ঘুম থিকা উঠছি বইলা মনে পড়ে না। ভোর দেখার খুব বেশি দায় থাকলে আমরা পুরা রাত জাইগা ভোর দেইখা দেন ঘুমাইতে যাইতাম। স্যার এমন লোভ দেখালেন যে মনে হইলো নয়ারহাট ব্রিজের ওপর সূর্যোদয় না জানি কী অভাবনীয় এক জিনিশ। আমি কোনো রকমে সোয়া পাঁচটার মধ্যে পৌঁছায়া দেখি কুদ্দুস ভাই গাড়ি রাস্তায় স্টার্ট দিছে, স্যার বাসা থেকে নাইমা আসতেছে। অর্থাৎ আমি যে সূর্যোদয় দেখার জন্য যাইতে পারি আর সে জন্য ভোরে উঠতে পারি এইটা স্যারও বিশ্বাস করেন নাই। নয়ারহাট সাভারের খুব কাছে বংশাই নদীর তীরে বড় আকারের বাজার। একটা বড় ব্রিজের নিচে অবস্থিত। অনেকবার দেখছি। স্যারের সাথে নয়ারহাট গিয়া আমি হতাশ হইলাম। কীসের সূর্যোদয় আর কীসের কী। গাড়ি গিয়া সোজা থামলো মাছের বাজারে। পশ্চিম দিকে মুখ করে জেলেরা মাছ নিয়া বসছে। পিছনে নদী। নদী থেকে তোলা টাটকা মাছ, বড় বড় ভাগা দিয়ে বিক্রি হইতেছে। ভোরবেলা ওই টাটকা মাছ কিনতে আসছেন স্যার। বংশাই নদীতে সূর্যোদয় দেখা বিষয়ে আমার রোমান্টিক ধারণা মাছের বাজারে গিয়া আধমরা হয়া গেল। ঘুম ঘুম চোখ নিয়া আমি স্যারের মাছ কেনা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। জেলেরা সবাই মোটামুটি স্যারকে চিনে। স্যার স্যার বইলা ডাকে আর কয় স্যার গাড়িতে দিয়া আসি পুরা ভাগা। স্যার চার-পাঁচ হাজার টাকার মাছ কিনলেন। পকেটের টাকা শেষ করে কই মাছের একটা ভাগা কিনে নিয়া জেলেকে কইলেন, বাসায় আইসা টাকা নিয়া যাইস। আমি চোখ সরু করে করে স্যারের মাছ কেনা দেখতেছি আর উদীয়মান সূর্যের জন্য মাছের বাজারে মরতে থাকা আমার আবেগের জন্য হাঁসফাঁস করতেছি। আমার বেহাল দশা দেইখা আমারে নিয়া বাজারের একটা হোটেলের কাছে গিয়া কইলেন, চল পরাটা খাই। পরাটার ভেতর ডিমভাজা দিয়া স্যান্ডউইচ বানায়া খাইলাম। সূর্যমামা ততক্ষণে চেয়ারের মাথায় উইঠা বসছেন। দেখলাম নয়ার হাঁটের অবাক সূর্যোদয়। মাছ খাইতে খাইতে স্যার খুব সিদ্ধহস্ত হয়া পড়ছিলেন। খুব কৌশলে কাঁটাঅলা মাছ খাইতে পারতেন। দ্রুত কাঁটা বাইছা মাছ খাওনের একটা টেকনলজি তার আয়ত্ত হইছিল। রসিয়ে রসিয়ে খাইতেন। বাসায় পথ্য হিসাবে কম মশলা দেওয়া খাবার খাইলেও কোথাও দাওয়াতে গেলে মশলাদার মাছ খাইতেন। একবার আমরা চাঁদপুরে গেলাম। সেলিম আল দীনের ভাই ও বোনের বাসা সেইখানে। চাঁদপুরে প্রচুর সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়। গিয়া দেখলাম কীসের পথ্য, কীসের ওষুধ, স্যারের জন্য ওনারা মহামৎস্যভোগের আয়োজন করছে। টেবিলে বহুপ্রজাতির মাছ সমুদ্র থেকে উইঠা তেল আর মশলায় ডুব সাঁতার দিয়া ডিশে আইসা বইসা রইছেন। খেতে বসে স্যারের মাছ খাওয়ার টেকনলজি দেখে টাসকি খায়া গেলাম। অসম্ভব ক্ষিপ্র গতিতে উনি মাছ গলাধঃকরণ করতেছেন। আমরা তার সাথে কোনোভাবেই পাইরা উঠতেছি না। কোথাও দাওয়াতে গেলে স্যার আগেই কী কী মাছ তার পছন্দ তার একটা ফিরিস্তি দিয়া রাখতেন। পছন্দ করতেন, বিলের দেশি কালো কই, সাইজে যারা আধাহাত। এই ধরনের কই হাইব্রিড মাছ আসার পর আর বাজারে দেখা যায় না। খাওয়া আর ডাইনিং টেবিলের সঙ্গে স্যারের লেখক জীবনের সুসম্পর্ক আছিল। বাসার ডাইনিং টেবিলে বইসা কাগজ-কলম ছড়ায়ে দিয়া উনি লেখতেন। একটার পর একটা সিগারেট ধরাইতেন আর দুর্বোধ্য হস্তাক্ষরে লেইখা যাইতেন। উনি কী লিখছেন এইটা ধারণা করার জন্য রীতিমতো হস্তলিপি বিশারদ হইতে হয়। এমন দুর্বোধ্য হাতের লেখা বোধহয় হাসান আজিজুল হক ছাড়া আর কারো নাই। একবার হাসান আজিজুল হকের একটা লেখা দেখার ভাগ্য আমার হইছিল। সেইটা পাঠোদ্ধার করার জন্য মোহাম্মদ রফিকের দ্বারস্থ হইতে হইছিল। কথিত আছে আমাদের পরিচিতদের মধ্যে মোহাম্মদ রফিক ছাড়া সে লেখা পড়ার সাধ্য নাকি আর কারো নাই। দেখতে দেখতে স্যারের হস্তলিপি পাঠোদ্ধার করার ক্ষেত্রে আমি কিছুটা বুৎপত্তি অর্জন করছিলাম। কিছু কিছু পড়তে পারতাম। এই কাজের জন্য তিনি সবসময় একজন ছাত্রকে পয়সার বিনিময়ে নিযুক্ত রাখতেন। তারা ধৈর্য্য সহকারে তার লেখা পাণ্ডুলিপি সহজবোধ্য হস্তাক্ষরে লিখতো। পত্রিকায় কর্মরত বন্ধুদের অনুরোধে তার লেখা একটা প্রবন্ধ আদায় করতে গিয়া আমাকেও একবার তার পাণ্ডুলিপি পুনরুদ্ধার করতে হয়েছিল। মানবজমিন পত্রিকা বের হবে বইলা মুজিব ইরম বললেন, আমি যেন তার হয়ে সেলিম আল দীনকে পত্রিকার উদ্বোধনী সংখ্যায় লেখার আমন্ত্রণ জানাই। আমন্ত্রণ জানিয়ে একটা বিপদে পড়ে গেলাম। স্যার লিখতে শুরু করলেন এক প্রবন্ধ ‘রাষ্ট্রতন্ত্র ও পাখিরা’। এই প্রবন্ধ লেখার পর আমার দায়িত্ব পড়লো পুনরুদ্ধারের। দুনিয়ায় এর চেয়ে ক্লান্তিকর কাজ আর কিছু নাই। সে ক্লান্তি কেটে গেলে আরেক উপদ্রব উপস্থিত হইলো। মানবজমিন পত্রিকায় কিছুদিন পর কারো নাম উল্লেখ না করে স্যারকে উদ্দেশ্য করে একটি প্রতিবেদন ছাপা হইলো। প্রতিবেদন প্রকাশের পর স্যার ক্ষুব্ধ হইলেন। আমার সঙ্গে পত্রিকার লোকদের সংশ্লিষ্টতা হেতু আমাকে স্যার দোষারোপ করলেন যে, কেন আমি তাকে এরকম ট্যাবলয়েডে লেখার জন্য প্ররোচিত করেছি। সে যাত্রা কিছুদিন আত্মগোপন করে আমি বেঁচে গিয়েছিলাম।

সংবাদপ্রত্রের প্রথম চাকরি জীবনে আজকের কাগজের ঈদ সংখ্যার জন্য তার ধাবমান নাটকটি সংগ্রহ করার পর সেইটার পাঠোদ্ধারের দায়িত্বও আমার ওপর পড়ছিল। আমি খুব যত্নসহকারে পাঠোদ্ধার ও প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলাম। স্যার কইছিলেন, আমি পাণ্ডুলিপির ৯৫ ভাগ সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারছিলাম। স্যার ডাইনিং টেবিলে বইসা লেখতেন। লেখার জন্য যেরকম প্রশস্ত টেবিল তার দরকার তেমন চাহিদা ডাইনিং টেবিল ছাড়া আর কেউ মেটাতে পারতেন বইলা মনে হয় না। লেখার সময় ওনার যে খুব নীরবতা দরকার হইতো তা না। বরং প্রাসঙ্গিক আলাপ-আলোচনা করতে পারা একজন লোক থাকলে সুবিধা হইতো। প্রাচ্য লেখার সময় আমি তাকে এইরকম সঙ্গ দিছিলাম। প্রাচ্যের কাহিনীর সাথে বেহুলা-লক্ষিন্দরের প্যারালালটা আমার পছন্দ হয় নাই। কিন্তু স্যার কইতেন, প্রাচ্য যে ক্ষমার আদর্শ এইটা উনি এই নাটকের মধ্য দিয়া প্রকাশ করতে চান। নাটকের মমার্থ ঠিক কইরা পরে নাটক লেখা আমার শিল্পবুদ্ধির সাথে যাইতো না। শিল্প যদি তার মোরাল ঠিক কইরা আগাইতে চায় তাইলে সে শিল্প উদ্দেশ্যসাধনের শিল্পে পরিণত হয়। নানা দ্বিমত সত্ত্বেও আমি তার লিখনপদ্ধতিটা ভাল কইরা খেয়াল করতাম। মাঝে মাঝে মনে হইতো, উনি বোধহয় প্রণোদনা বা প্রতিভা দিয়া লেখতেছেন না। পরিশ্রম দিয়া লেখতেছেন। কাটাকুটির মধ্য দিয়া শিল্প তৈয়ার করার চেষ্টা করতেছেন। লেখার সময় খুব অস্থিরতা বোধ করতেন। হঠাৎ হঠাৎ বেরিয়ে পড়তেন। হঠাৎ হঠাৎ লিখতে বসতেন। ঘন ঘন গোসল করতেন। প্রথমবার পাণ্ডুলিপি রেডি করার পর উনি পুরাটা একবার দুইবার তিন বার, বারবার পড়তেন আর বদলাইতেন। পুরা পাণ্ডুলিপি শোনার জন্য মুরগা ধরা হইতো। ঘোরার বা রাত জাগার লোভ দেখিয়ে পুরাটা তাদের শোনানো হইতো। শ্রোতার মুখের ভাবান্তর স্যার খেয়াল করতেন। তাদের মতামত শুনতেন আর তুড়ি মেরে দ্বিমতগুলাকে উড়ায়ে দিতেন। মুখে তুড়ি মারলেও মনে মারতেন না। গ্রহণ-বর্জনের মধ্যদিয়া একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাইতেন। পরে পাণ্ডুলিপি বদলাইতেন। সেলিম আল দীনের নাটকের পাণ্ডুলিপিগুলাতে কিছু নাট্য, কিছু কাব্য, কিছু বর্ণনা, কিছু বিস্তার থাকতো। সব মিলায়া একটা মিশ্র আঙ্গিকের শিল্প প্রস্তুত হইতো। উনি যখন বনপাংশুল লেখেন তখন আমার সঙ্গে তার সখ্য হয় নাই। তবে বনপাংশুল যখন শৈলী পত্রিকায় প্রকাশিত হইলো এবং যখন মঞ্চের জন্য প্রস্তুত হইতো তখন আমি তার প্রতিক্রিয়া কাছ থিকা দেখতেছিলাম। আখ্যান বা উপাখ্যান নামধারী একটা নাটক লেখার পর এবং সেটাকে উপন্যাসের মতো আকার দেওয়ার পর উনি খুব তৃপ্তির মধ্যে আছিলেন। মোটামুটি নিশ্চিত আছিলেন যে, নাসিরুদ্দীন ইউসুফ এইবার আর তার এ আখ্যানকে মঞ্চে আনতে পারবেন না।

বাচ্চু ভাই ও সেলিম আল দীনের মধ্যে শিল্পসম্পর্ক বা বন্ধুত্ব বিষয়ে আমি তখনও তেমন একটা জানতাম না। তবে খেয়াল করছিলাম, নাট্যতত্ত্বে অধ্যাপক হওয়া সত্ত্বেও সেলিম আল দীন ঢাকা থিয়েটারে তার নাটকের মঞ্চায়ন বিষয়ে কিছু কন না। নীরবে খালি খেয়াল করেন। মাঝে মাঝে মনে হইতো দুই জনের মধ্যে অলিখিত একটা প্রতিযোগিতা চলতেছে। সেলিম আল দীন মঞ্চে আনা দুঃসাধ্য একেকটা নাটক লিখতেছেন আর বাচ্চু ভাই সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ কইরা সেইটারে মঞ্চে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করতেছেন। ঢাকা থিয়েটারের নাটক মঞ্চায়ন, কাস্ট-ক্রু বিষয়ে স্যারের কোনো মত-দ্বিমত আছিল না। তবে প্রতি পলের খবর উনি জেনে রাখতেন। অস্থিরতা ও উদ্বেগ সহকারে নাটকের অগ্রগতি খেয়াল করতেন। পরন্তু সাংগঠনিক ব্যাপারে বাচ্চু ভাইয়ের কথাকেই শেষ কথা বইলা মানতেন। ওনাদের দুই জনের বন্ধুত্বের অনেক বিষয় রহস্যময়। খুব যে দেখা-সাক্ষাৎ, আড্ডা আলোচনা হইতো, তা না। কিন্তু মারেফতি একটা যোগাযোগ ছিল। একদল মানুষ পর্যায়ক্রমে ওনাদের দুইজনের সাথেই মিশতো। এই মেশামেশির মধ্য দিয়া ওনাদের মারেফতি যোগাযোগ রক্ষিত হইতো। বনপাংশুল লিইখা স্যার খুব তৃপ্তিতে ভুগতেছিলেন। ওনার মনে হইতেছিল এইটা মঞ্চে আনা কঠিন হবে। রীতিমতো একটা দীর্ঘ উপন্যাস এইটা। বাচ্চু ভাইও হয়তো কিছুটা কনফিউজড আছিলেন। রিহার্সাল রুমে সহসা একদিন বনপাংশুলের পাঠ শুরু হইলে স্যার একটু নড়ে চড়ে বসলেন। মাঝে মাঝে যাইতেন সেই পাঠ আয়োজনে। শেষ পর্যন্ত ওই আখ্যান বা উপন্যাসের ব্যাপ্তি ধরতে বাচ্চু ভাই মঞ্চকে দর্শকের জায়গায় আর দর্শককে মঞ্চের জায়গায় বদল কইরা মঞ্চায়ন করছিলেন। সেলিম আল দীনের লেখার সম্পূর্ণতাকে ধরার চেষ্টা করছিলেন। এবং এর জন্য সিরিয়াস এডিটিংয়ের মধ্য দিয়া ওনারে যাইতে হইছিল। মঞ্চ ও স্ক্রিপ্টে ক্রিয়েটিভিটি সত্ত্বেও বনপাংশুল আমার ততোটা ভাল লাগে নাই। বিশেষ কইরা কাস্টিং নিয়া মধ্যে কিছু অস্বস্তি আছিল। আমি স্যারকে খোঁচায়ে এ বিষয়ে তার মত জানার চেষ্টা করতাম। কিন্তু কিছুতেই জানা যাইতো না। স্যারের মতো আমিও জানি যে, নাসিরুদ্দীন ইউসুফ হইলেন আমাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ নির্দেশক। ফরহাদ ভাই (ফরহাদ মজহার) বলেন, উনি ঢাকা থিয়েটারের নাটকগুলারে দেখেন বা পাঠ করেন বাচ্চুর নাটক হিসাবে, সেলিম আল দীনের নাটক হিসাবে না। কিন্তু ফরহাদ ভাই সম্ভবত তাদের এই আন্তঃসম্পর্ককে সামগ্রিকভাবে পাঠ করার অবকাশ পান না। তাই একটা দিকে বেশি নজর দিয়া ফেলেন। টেক্সট যদি নাই থাকে মঞ্চায়ন কীসের হবে। আধার নিজে টেক্সট হয়া উঠতে পারে, নিজে আলাদা পরিপ্রেক্ষিত তৈয়ার করতে পারে। কিন্তু আধেয়কেও বস্তু হয়া উঠতে হয়। বাচ্চু ভাই যদি সেলিম আল দীনের নাটক না কইরা শেক্সপিয়ারের নাটক করতেন, তাইলে তিনি অন্যরকম নির্দেশক হয়া উঠতেন। তাতে অন্য নির্দেশকদের থেকে তাকে আলাদা কইরা পাঠ করা সম্ভব হইতো কি না, সেইটা বিশেষভাবে ভাবা যাইতে পারে। জাহাঙ্গীরনগরের ল্যাবরেটারিতে সেলিম আল দীন নাটক নিয়া নানা নিরীক্ষা করতেন। সেইখান থিকা বাচ্চুভাইকে দূরাগত সিগনাল দেওয়ার চেষ্টা করতেন। আবার বাচ্চুভাইয়ের ল্যাবরেটরি থেকে কিছু জিনিশ নিয়া জাহাঙ্গীরনগরের মঞ্চে প্রয়োগ করার চেষ্টা করতেন। সেলিম আল দীনের সাথে দিনগুজরান করা মানে সারাদিন মঞ্চের লোকজনের সঙ্গে উঠবস করা। আমি নির্দেশক আর ক্রু ছাড়া মঞ্চের লোকদের তেমন পছন্দ করতাম না। ক্যামেরার ফ্লাড লাইটের গরমের ক্লান্তি আর গ্ল্যামার নিয়া নাটকের লোকগুলা মঞ্চে উঠতো, প্রচণ্ড পরিশ্রমের পর একটা নাটক করে ঘেমে নেয়ে যখন কাছে আসতো তখন তাদের ক্যামেরার গরমের সঙ্গে শৈল্পিক গরম যুক্ত হইছে। এ উত্তাপ সহ্য করা কঠিন। স্যার দুই একবার পরিচয় করায়ে দিতেন। তাতে অস্বস্তি আরও বাইড়া যাইতো।

আমি স্যারকে কইতাম, মঞ্চের প্রতি আমার কোনো ভরসা নাই। কারণ এইটা খুব এলিট একটা প্রকাশমাধ্যম। নাটক নগরে অভিনীত হয়। বেশি লোক দেখতে পারে না। স্যার বলতেন, তুই কি জানিস আমার বাসন নাটকটা গ্রাম থিয়েটারের সদস্যরা কতবার মঞ্চায়ন করেছে সারাদেশে? আসলেই বাসন মঞ্চে স্যারের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাটক। বছরের কোনো না কোনো সময় এইটা কোনো না কোনো স্থানে অভিনীত হইতো। সারাদেশে এইটা বহু মানুষের গোচরে আসছে সন্দেহ নাই। আমি কইতাম, দেখেন সারাদেশে থিয়েটারগুলা বাসন করে বটে কিন্তু যৈবতী কন্যার মন বা কেরামতমঙ্গল তো তারা করে না। যৌবনে সুবর্ণা মুস্তাফা, হুমায়ুন ফরিদী বা রাইসুল ইসলাম আসাদ যে নাটকগুলা করছেন সেইগুলা তো আপনি ফিরায়া আনতে পারবেন না। শিল্পের সেই মুহূর্তগুলারে আপনে পুনরুদ্ধার করতে পারবেন না। সেইটা হারায়ে গেছে। নতুন কালে নতুন কেউ হয়তো সেইগুলা করবে। নতুন মুহূর্ত তৈয়ার হইবে। কিন্তু সেইগুলা আর ফিরবে না। মঞ্চে প্রদর্শিত নাটক সেই অর্থে হারায়ে গেছে। আমরা যা পাইছি তা হইলো, দর্শকের স্মৃতি। স্মৃতি তো সৃষ্টি না। স্যার বলতেন সিনেমায় তোকে খায়া ফেলছে। সত্যি কথা। সিনেমার যাদুতে আমি তখন পরাস্ত হয়া আছিলাম। আমি মনে করতাম, দৃশ্যমাধ্যমে সিনেমাই শেষ কথা। একাত্তরের যীশু দেইখা আমার ধারণা হইছিল বাচ্চুভাই সিনেমা তৈরি করলেই ভাল হইতো। যা তৈরি হইতো তা আমরা আজও দেখতে পাইতাম। কিন্তু মঞ্চে যা আজ হইতেছে কাল তা থাকবে না। আমার যদি ইচ্ছা করে, আবার কেরামতমঙ্গল দেখতে তাইলে কী বিশাল দক্ষযজ্ঞ করতে হবে সেইটা ভাবতে গেলেও জ্বর এসে যাবে। স্যার কইতেন, গৌড়জনের সামনে উপস্থাপন করলেই হইলো। শিল্পরসিক যা বলবে তাই শেষ কথা। মঞ্চ হইলো তাৎক্ষণিক, কিন্তু উপস্থিত দর্শক শ্রোতা ও অভিনেতাদের মধ্যে সেটা একটা অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা অন্য কোনো মাধ্যমে সম্ভব না। স্যার গৌড়জন কথাটা নাট্যজনের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করতেন। গৌড় প্রাচীন নগরী। শিল্পরসিকদের গৌড়জন বা নাগরিক বইলা তিনি তাদের এলিট চেহারাটাকে স্বীকৃতি দিতেন। গৌড়ের অধিবাসীদের দেখার জন্য যাহা তাহার প্রতি আমার খুব বেশি শ্রদ্ধা প্রকাশ পাইতো না। সে কারণেই আমি স্যারের সাথে বহুদিন কাটানোর পরও আমার মনে গোপনে বা প্রকাশ্যে কখনো নাটক রচনার ভাব উদয় হয় নাই। অধিকাংশ নাটকের রিহার্সাল দেইখা তাতে নিয়ম ও কাজের কড়াকড়ি দেইখা আমার তলস্তয়ের ‘হোয়াট ইজ আর্টে’র কথা মনে পইড়া যাইতো। মনে হইতো শ্রম ও অর্থের অপব্যয় হইতেছে। স্যার আমাকে তার অপঠিত নাটকগুলা পড়তে উৎসাহ দিতেন। আমি একটা একটা করে পড়ে সেইগুলা নিয়া কথা বলতাম। নিজের রচনা বিষয়ে তিনি খুব উচ্চম্মন্য আছিলেন। পারতপক্ষে সমালোচনা তাকে শুনতে হইতো না। মানে শুনতে চাইতেন না। মূর্খদের মুখেও তিনি প্রশংসা শুনতে চাইতেন। রাস্তায় একটা ন্যাংটো বাচ্চা যদি আইসা স্যারের কাছে বলে যে, আপনের বনপাংশুল পড়লাম, দারুণ লিখেছেন। তাহলে স্যার বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ না রাইখা পোলাটারে কোলে তুইলা নিয়া তাকে অভ্যর্থনা করবেন, এ নিশ্চিত। এই নাজুক পরিস্থিতিতে স্যারের নাটক নিয়া তার সাথে আলোচনা করা অনেকটা মূর্খতার শামিল। লেখার ঘটনা, প্রেরণা ও প্রণোদনার কথা যদি কিছু জানা যাইতো তাইলে সেইটাই লাভের লাভ। একবার আমি কইলাম, স্যার আপনার সব নাটক পইড়া আমি যতটুকু বুঝলাম তা হইলো আপনি নিজের কোনো কথা লেখেন নাই। আমরা যে জীবন যাপন করি, যে জীবনের মধ্যে থাকি, যে সমস্যার দ্বারা তাড়িত হই সেই জীবনের কথা আপনার নাটকে নাই। আপনে এমন মানুষের কথা লিখছেন যাদের সমস্যার কথা নিয়া আমরা সেমিনার সিম্পোজিয়াম করতে পারি। চাইলে তাদের নিয়া মিটিং মিছিলও করতে পারি, কিন্তু সেই জীবন আমাদের জীবনে আইসা আমাদের কথা বলে না। স্যারকে বিতর্কে পরাস্ত করতে হইলে রবীন্দ্রনাথের উদাহরণ দিতে হইতো। আমি কইলাম, রবীন্দ্রনাথ কিন্তু নিজের জীবনের কথা লিখছেন। তলস্তয়ও হরেদরে নিজের জীবনের কথা লিখছেন। আমাদের একক নির্জনতা তাই রবীন্দ্রনাথের গানকেই যাচ্ঞা করে। মনে হইলো স্যার যেন কিছুটা ভাবতে বসলেন আমার কথায়। এইবার উনি থিতু ভাবনার মধ্যে পইড়া গেলেন। হঠাৎ হঠাৎ আমারে ডাকতেন। রাজনীতি নিয়া কথা বলতেন। সমকালীন সংকটগুলা বুঝার চেষ্টা করতেন। তখন ডিসকভারি চ্যানেলে গণহত্যার ওপর বেশ কিছু ডকুমেন্টারি প্রচার হইতেছিল। উনি এইগুলা মনোযোগ দিয়া দেখতেন। কিন্তু কিছু কইতেন না। আমাকে লেখার জন্য খুব তাড়া দিতেন। কইতেন লেখার সময় যেন বাইরে না কাটাই। আমার কথা হয়তো তার মনের গভীরে প্রতিক্রিয়া তৈরি করছিল। একদিন কইলেন, এই যে যৈবতী কন্যার মন এই যে পরী আর কালিন্দী এই দুইজন তো আমার আশপাশের মানুষ। আমি তাদের একটা অপরিচিত পরিস্থিতির মধ্যে পুনর্নির্মাণ করছি। বলতে বলতে স্যার মনে হয় স্মৃতির মধ্যে দাখিল হয়া গেলেন। কইলেন, শরতের পূর্ণিমা দেখছিস? কোনো এক শরতের পূর্ণিমায় আমি আর অমুক একটা খোলা সরিষা ক্ষেতের পাশ দিয়া হাঁটতেছি। গভীর রাত। শরতের শিশিরে চন্দ্রালোক এসে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ওইখানে আমার মাথায় যৈবতী কন্যার মনের ভাবনা আসলো। ওই নারীকে আমি কালিন্দী রূপে কল্পনা করলাম। কথাগুলা শুইনা আমি একটু থমকে গেলাম। সেলিম আল দীনের নাটকে দেখি নিম্নবর্গের একটা চরিত্র ক্ল্যাসিক টোনে কথা বলতেছে। তার কথা ঠিক তার কথা হিসাবে পড়া যাইতেছে না। লেখক তার সাথে লেখার বিষয়ের সম্পর্ক আড়াল করতে চরিত্রে শ্রেণী-অবস্থানকে একটা পর্দা হিসাবে ব্যবহার করতেছেন। সেলিম আল দীন বাস্তবতা থেকে এমনে পলায়ন করতেছেন। আইডিয়া হিসাবে তার নাটকগুলা অসাধারণ। তার চাকা, হাতহদাই, হরগজের আইডিয়াগুলার কথা চিন্তা করলে অবাক লাগে। প্রতিটাতেই আছে প্রচণ্ড প্যাশন, পরিশ্রম আর নিষ্ঠা। কার জানি একটা কথা উদ্ধৃত কইরা স্যার কইতেন, তার লেখায় ফাঁক থাকলেও ফাঁকি নাই। কৌশলের কথা, তবু কথাটারে আমি সত্য হিসাবে মানছি। তবে পুরাটা না। আমি মনে করি, তিনি তত্ত্ব রচনায় প্রচণ্ড ফাঁকি দিছেন। তত্ত্ব রচনার জন্য চিন্তার যে ব্যাপ্তি দরকার তা তার আয়ত্তে আছিল না। তারপরও উনি তত্ত্ব তৈয়ার করতেন। একজন লেখক যদি লেখা ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের হাতিয়ারও নিজে তৈয়ার কইরা যাইতে চান তাইলে ঘোর বিপদ উপস্থিত হয়।

রিডারের সার্বভৌমত্ব খর্ব কইরা তিনি নিজের টেক্সকে একদেশদর্শী একটা প্লাটফর্মে দাঁড়া করাইতে চাইতেন। যা তার সাহিত্য পাঠের ক্ষেত্রে অনেককে বিমুখ করছে। আমার ক্ষুদ্র বিদ্যায় আমি তার দ্বৈতাদ্বতবাদী শিল্পতত্ত্ব এবং একাকারবাদী শিল্প আঙ্গিকের তত্ত্বকথার দ্বারা খুব বেশি তাড়িত হইতে পারি নাই। তাছাড়া তিনি দুর্বোধ্য সংস্কৃত ভাষায় প্রবন্ধ লেখতেন। তৎসম ও তদ্ভব শব্দের বাহুল্যে সেইগুলা ভারাক্রান্ত হয়া উঠতো। প্রবন্ধ দিয়া তিনি যে কথা মানুষকে বুঝাইতে চাইতেন সেই কথা মানুষ উল্টা বুঝতো। বিশ্বাস হইতো না, এই ব্যক্তি হাতহদাইয়ের মতো লেখা নিজের হাতে লেখছেন। স্যারের সাথে আমার প্রথম সাহিত্য আলোচনার সূত্রপাত হইছিল, হরগজ পাঠের প্রতিক্রিয়া জানাইতে গিয়া। যে কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর আমার হরগজের কথা বিশেষভাবে মনে হয়। ঘূর্ণিঝড়ের বীভৎস বর্ণনা দিয়া উনি মানবিক বিপর্যয়ের একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করছিলেন। এইরকম কাজ বাংলাভাষায় তো আর দেখি নাই। নোয়াখালি এলাকার মানুষ হওয়ার কারণে দক্ষিণ জনপদের ওপর তার আলাদা একটা দখল আছিল। উনি ওই এলাকার মানুষের জীবনের যাত্রা-অভিযাত্রা ইত্যাদির খোঁজ রাখতেন। সেই অভিযাত্রা হাতহদাইয়ের মধ্যে চিত্রিত রইছে। কিন্তু হাতহদাই কেরামতমঙ্গল হরগজ ইত্যাদি আলাদা আলাদা এলাকার কাহিনী। এই এলাকাগুলার ওপর ওনার দখল আছিল। কিন্তু বনপাংশুলে আইসা মনে হইলো উনি এমন এক এলাকার ওপর দখল নিলেন যেই এলাকায় ওনার তালুকদারী নাই। কলকাতার কানাগলির বাইরে নিয়া গিয়া বাংলার বিস্তৃত ভূগোলের মধ্যে সাহিত্যকে প্রতিষ্ঠা করার যে অভিযান তারাশঙ্কর শুরু করেছিলেন তা সাহিত্যের একটা অংশকে নতুন দিক ও দিশা দিয়াছিল সত্য কিন্তু ভেতর থিকা প্রাণভোমরা লুটে নিয়াছিল। ঔপনিবেশিক চৈতন্য ও মধ্যবিত্ত প্রবণতা শহুরে কেন্দ্র থেকে যখন বিস্তৃত ভূগোলের মধ্যে ছড়াইতে চায় তখন সে কিছুটা জমিদারের মতো বিচরণ করে। শারিরীকভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারি দেখাশুনা করলেও সাহিত্যে ভূগোল বর্ণনায় তার জমিদারিকে তেমনভাবে প্রসারিত করেন নাই দেইখা শান্তি লাগে। তারাশঙ্করের পর সাহিত্যে অনেক লেখকের দেখা পাওয়া গেল, যেনারা রচনার প্রাণভোমরা বা চেতনা কলকাতায় রাইখা স্রেফ জমিদারি বাড়াইতে রচনার ভূগোলকে প্রসারিত কইরা দিলেন। গদ্য যাযাবরবৃত্তির আঙ্গিক নয়। মানুষ নগর তৈরি কইরা নাগরিক না হওয়া পর্যন্ত, নগরে শ্রেণী তৈরি কইরা বিভিন্ন এলাকায় ভাগ হয়া বসবাস না করা পর্যন্ত লিখিত উপন্যাসের উদ্ভব হয় নাই। লেখক অবশ্যই ঐশ্বরিক প্রতিভার অধিকারী। কিন্তু দেশের সমস্ত বর্গ, গোত্র, জাতি গোষ্ঠী তার অধিগম্য এইটা আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। দেশের সমস্ত ভূগোল ও ভাষা তার সহজগম্য হইতে পারে, সমস্ত প্রসঙ্গ তার দখলদারিতে থাকবে এইটা বিশ্বাস করা কঠিন। বনপাংশুলের মধ্যে সেলিম আল দীন মান্দাই জনগোষ্ঠীর যে সংকট ও বর্ণনাকে চিত্রায়ন করছেন আমার মতে, সেইটা মেইনস্ট্রিমের ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে দেখা। বনপাংশুল লেখার পর আমি কিছুটা সমালোচনা করে এই কথাগুলার বলার চেষ্টা করলে স্যার ভীষণ ক্ষিপ্ত হইছিলেন। সম্পর্ক ভাঙো ভাঙো অবস্থায় আমি লেখাটা প্রত্যাহার কইরা নিছিলাম। কোথাও প্রকাশ করি নাই।

অত্যন্ত দ্রুত প্রাচ্য লেখার পর স্যার দেখলাম আত্মঅনুসন্ধানে ব্যস্ত হয়া পড়লেন। তখন সাভারের পথে ঢাকা আসতে খুব কষ্ট হইতো। গাবতলীর আগে আমিন বাজারের কাছে জটিল জাম লাগতো। তাই গাড়ি করে কাঠবাড়িয়া বাজার হয়ে আশুলিয়া উত্তরার পথ মাড়িয়ে ঢাকা আসা-যাওয়া করতাম আমরা। বর্ষায় আশুলিয়া থৈ থৈ করতো। স্যার বর্ষার গানের ক্যাসেট গাড়িতে রাখতেন। বসন্তে বসন্তের গান। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া অন্যগান গাড়িতে নিতেন না। ভক্সওয়াগনের কাচে বৃষ্টি পড়তেছে। ভিতরে পীযুষকান্তি হয়তো মেঘের গুরু গুরু গলায় সাধতেছেন। বসন্তে শান্তিদেব ঘোষের ফাগুনের পূর্ণিমায় এলো চাঁদ বা ও চাঁদ তোমায় দোলা কে দেবে কে দেবে কে… নিয়মিত বাজতো। প্রাচ্য লেখার পর দেখলাম, স্যার খালি পথের শেষ কোথায়… শুনতেছেন। ওই গানটা কে কেমনে গাইছে সেইটা নিয়া উনি আলোচনা করতেন। খুব শুনতেন গানটা। আমি মনে মনে বুঝতাম, পথের শেষটা উনি কল্পনা করার চেষ্টা করতেছেন। ওই সময় একবার বললেন, পুঠিয়া চল। দুলালরা লোকসংস্কৃতি উৎসব করেতেছে। চল দেখবি। বাংলার প্রাণ কী সেইটা দেইখা আসতে পারবি। স্যারের সাথে পুঠিয়া চললাম। সেইবার হাসান আজিজুল হক প্রধান অতিথি ছিলেন। হাসান স্যারের সাথে পুঠিয়া আসছিলেন নাজিম মাহমুদ। একটা মাটির ঘরে পাটি পেতে রাতের খাবারের পর হাসান স্যারের সাথে আড্ডা বসলো। এমন আড্ডায় সেলিম স্যার একটা অলিখিত প্রতিযোগিতা বোধ করতেন। উনি এমনসব প্রসঙ্গের অবতারণা করতেন যাতে তিনি যে সাহিত্যিক হিসাবে বেশি বাঞ্ছিত সেইটা স্পষ্ট বোঝা যায়। হাসান স্যারের কথা উঠলে উনি সেলিম স্যার হাসান স্যারের ‘আমৃত্যু আজীবন’ গল্পটার ব্যাপক প্রশংসা করতেন। ওই আড্ডায়ও একই ধরনের প্রশংসায় হাসান স্যারকে ভাসায়ে দিলেন। পরে নাজিম মাহমুদের কাছে ‘পথের শেষ কোথায়’ শোনার বায়না করলেন। অনুরোধে খালি গলায় উনি সুন্দর গাইলেন। বিস্ময়কর ব্যাপার, ওই অনুষ্ঠানের কিছুদিন পর নাজিম মাহমুদ মারা গেছিলেন। অর্থাৎ পথের শেষ নির্দিষ্ট হয়া গেছিল। সেলিম স্যারও পথের শেষের খোঁজ করতেছিলেন।

কিছু খ্রিস্টিয় বিশ্বাস ওনার মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। তার মধ্যে একটা হইলো কনফেশন। উনি মাঝে মাঝে কনফেশন আকারে আমার কাছে ব্যক্তিগত নানা পাপ স্বীকার করতেন। কিন্তু আমি যাজক নই, উনি সেইটা বুঝতেন। কনফেশনের ধারণা থেকে ওনার মধ্যে নিমজ্জন আখ্যানের বীজ রোপিত হয়। লেখার আইডিয়ার প্রসঙ্গ উঠলে উনি দিওনুসুসের কথা কইতেন। যিনি তার অনাগত সন্তানকে আসন্ন বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে নিজের উরুর মাংশপেশীতে রোপন করছিলেন। স্যার সবসময় যে নাটকটা লেখার কথা কইতেন সেটার নাম ‘ময়ূরযান’, এইটা নাকি ঋতু সম্ভোগের গল্প। সম্ভোগের এই গল্প থিকা সইরা আইসা ‘ময়ূরযানে’র জায়গা দখল করলো কনফেশনের গল্প। অনাগত এই নাটকের মতো অনাগত এক সন্তানের কথা তাকে তাড়িত কইরা বেড়াইতো। জন্মের পরপরই স্যারের একমাত্র সন্তান মারা গিয়েছিল। সেই পুত্রের জন্য তার আমরণ শোক তাকে নিভৃতে কাঁদাইতো। উনি ভাবতেন, যে সম্পদ তিনি আহরণ করতেছেন তা উত্তারাধিকারহীনভাবে রেখে যেতে হবে। পরে তিনি পুত্র নামে একটি নাটক লিখেছিলেন। আমি এখনও সেই নাটক পড়ি নাই। বিধায় মন্তব্য করতে পারতেছি না। প্রাথমিকভাবে সেই কনফেশনের গল্পের নাম হইলো ‘রুক্মবর্ণ’। পাপবিদ্ধ, দণ্ডিত একজন মানুষ নিজের ক্রুশকাঠ কাঁধে নিয়া শেষ যাত্রা করতেছেন, সেই যাত্রার মধ্যে ফিরে ফিরে আসতেছে তার যাপিত জীবন। প্রথম দফা ‘রুক্মবর্ণ’ ২ শত পৃষ্ঠার মতো লেইখা স্যার থমকাইলেন। আমারে জরুরি ভিত্তিতে ডাইকা নিয়া কিছু অংশ পড়াইলেন। আমি কইলাম, স্যার এইটা আপনি এখন প্রকাশ কইরেন না। এইটারে আমার ক্যান জানি কনফেশন মনে হইতেছে। আমি ভাবছিলাম, স্যার আমার কথা নিবেন না। কিন্তু দেখলাম দ্রুত রুক্মবর্ণ বাতিল হইতে থাকলো। তার জায়গায় জন্ম হইতে থাকলো নতুন এক কাহিনী। ‘নিমজ্জন’। ‘নিমজ্জন’ হইলো পৃথিবীর তাবৎ গণহত্যার স্মৃতিবাহিত এক রচনা। স্থানকালের ভেদ ঘুচে গিয়ে মহাকালের সামনে দাঁড়ানো এক ব্যক্তি। যার ওপর সকল গণহত্যার চাপ আইসা ভর করছে। এক অর্থে এও সকল মানুষের পক্ষে একজনের পাপ স্বীকারের গল্প। দণ্ডিত ক্রুশবিদ্ধ যীশুর কথা মনে পইড়া যায়। যদ্দুর মনে পড়ে ২০০৩ নাগাদ নিমজ্জন শেষ হইছিল। এইটা লেখার সময় আর উনি মঞ্চের কথা ভাবতেন না। একটা পরিপূর্ণ রচনার চিন্তাই শুধু তার মাথায় আছিল। দর্শকদের সামনে বসায়া লেখা একটা কঠিন কাজ। খুব সতর্ক থাকতে হয়। দর্শককে সম্বোধন কইরা লেখার চেয়ে কষ্টকর কাজ আমার দৃষ্টিতে আর নাই। যাই হউক, এইসময় উনি কিছু অনাকাক্সিক্ষত খ্যাতির দেখা পান। ১৯৯৮ সালের আগস্টে টফি আমাদের জানায় স্যারের জন্মদিন ১৮ আগস্ট। কহনকথার পক্ষ থিকা আমরা টিএসসিতে ছোটখাট একটা গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। কিছু মানুষরে দাওয়াত করি। কিছুটা প্রচার পায় সে আয়োজন। ঘটা কইরা জন্মদিন পালন নাকি ওইবারই প্রথম, স্যার কইছিলেন। ওই জন্মদিনের সূত্রে জানা গেল, পরের বছর তার ৫০ তম জন্মদিন হবে। আমাদের সামান্য আয়োজনের সূত্রে ৫০ তম কথাটা বেশ প্রচার পায়। ঘটা করে সে অনুষ্ঠান সেমিনার-সিম্পোজিয়াম আর উৎসব করে পালন করেছিল ঢাকা থিয়েটার। ওইবার নিশ্চিত বুঝতে পারছিলাম, বাচ্চু ভাই সেলিম আল দীনের জন্য কী করতে পারেন। আর কেনই বা সেলিম আল দীন সবসময় তার শরণাগত। লোকে বলে, শামসুর রাহমান ছাড়া ৫০ তম জন্মদিনে এইভাবে কেউ বাংলাদেশে অভিনন্দিত হন নাই। ঢাকা শহরের বিদ্বৎ সমাজ নাকি শামসুর রাহমানের ৫০ তম জন্মদিনে বাংলা একাডেমীর বটতলায় একটা অনুষ্ঠান করে তাকে প্রধানকবি হিসাবে বরণ কইরা নিছিলো। সেলিম আল দীনের জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাইতে এলিট সংস্কৃতিসেবী নাগরিকদের মধ্যে কে আসেন নাই তা হিসাব কইরা বলতে হবে। বাচ্চু ভাইয়ের সাংগঠনিক প্রতিভা সেইবার দেখছিলাম। এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়া উনি দৃষ্টিকটূ কিছু করেন নাই। প্রচারের ভার যখন নিকট বন্ধু শিরোধার্য করেন তখন আনন্দের আর সীমা থাকে না। দেখছিলাম, সে আনন্দ আত্মপ্রচার বিলাসী সেলিম আল দীন উপভোগ করতেছেন। পরে দেখছি, বাচ্চু ভাইয়ের ৫০ নীরবে নিভৃতে চইলা গেছে, কোনো অনুষ্ঠান ও সংবর্ধনা ছাড়াই। ওইবার ঢাকা থিয়েটার আয়োজিত সেমিনারে দেবেশ রায় আসছিলেন। কইলকাতা থিকা অরুণ সেন ততোদিনে বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়া কিছু উদ্যোগ করতেছেন। আনন্দবাজার গোষ্ঠীর বাইরে প্রতিক্ষণ কিছুটা প্রগতিশীল ভূমিকা নিয়া তখনও সক্রিয়। অরুণ সেন বাংলাদেশের কবিতা নিয়া আগেই লেখছিলেন। সেলিম আল দীনের ওপর লেখলেন ওই সময়েই। লেখতে লেখতে শেষে একটা বই-ই হয়া গেল। তারই মাধ্যমে দেবেশ রায় সেলিম আল দীনের সাহিত্যের খবর পায়া থাকবেন। বাতাসে খবর মিললো সেলিম আল দীনের প্রায় সব লেখাই উনি পইড়া ফেলতেছেন। সেমিনারও ঘনায়ে আসছিল। স্যার কইলেন, আমারে তিস্তাপারের বৃত্তান্তটা পড়া। আমি বইটা আরেকজনের কাছ থিকা নিয়া পড়ছিলাম বইলা দিতে পারলাম না। কে জানি দিয়া গেল এক কপি। কিন্তু স্যারের পড়া আগায় না। কিছু দূর একা একা পইড়া উনি আবদার করলেন ওনারে পইড়া শোনাইতে হবে। এইভাবে কিছুদূর পড়া হইলেও উপন্যাসের ব্যাপ্তি তেমন একটা ভেদ করা গেল না। পরে, আমি শর্টকাট ওনারে উপন্যাসটা ব্রিফ করলাম। স্যারের সঙ্গে গাড়িতে ঢাকা যাওয়ার পথে সাধারণত আমি সবসময় সাথে বই নিতাম। কারণ মাঝে মাঝে দীর্ঘ অবসর মিলতো। সে অবসরে বই পড়া যাইতো। তখন উপন্যাসের নতুন ধরনের খোঁজে পড়তে আছিলাম। বইটা নিয়া তার সাথে বিস্তর আলাপ হইতো। দেবেশ রায়ের সঙ্গে নিজের চিন্তার ঐক্য লক্ষ কইরা উনি পুলকিত হইতেন। একবার রাজারবাগে গাড়ি সারাইয়ের কারখানায় বেশ সময় আটকা পড়লে মধ্যযুগের বিলুপ্ত আঙ্গিকের পুনরুদ্ধার সম্ভব কি না এই নিয়া বিস্তর আলোচনা হইছিল। আমি দেবেশ রায়ের কথার সূত্র ধইরা কইছিলাম এইটা সম্ভব না। কারণ, আঙ্গিক শুধু আঙ্গিক না। আঙ্গিক হইলো সামাজিকতা যোগাযোগ ও জীবনযাপন ও ইতিহাসের অংশ। চাইলেই কেউ পাঁচালির পরিপ্রেক্ষিত রচনা করতে পারবে না এই কালে। সেই দর্শক, সেই আঙ্গিকের প্রয়োজন, সেই কাল সবই গেছে। উপনিবেশ প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য ও আধুনিক সাহিত্যের মধ্যে যে দুর্ভেদ্য দেওয়াল দিছে সেইটা ভাইঙ্গা পিছনে ফিরা সম্ভব না। তবে আমরা দেওয়াল ভাইঙ্গা একটা সেতু তৈয়ার করতে পারি। স্যার কইতেন, আমার এই ব্যাখ্যা ভুল। কেননা এখন গ্রামদেশে পাঁচলি আখ্যান উপাখ্যান জারি আছে। ফলে সেতুবন্ধ সম্ভব, এমনকি সেই আদি আঙ্গিকে প্রত্যাবর্তনও সম্ভব।

রমরমা পঞ্চাশতম বার্ষিকীর পর স্যারের মধ্যে কনফিডেন্স বৃদ্ধি পাইলো। কলকাতায় ওনার কিছু ভক্ত অনুরাগী তৈরি হইলো। উনি কলকাতা গেলেন। আগে কলকাতায় ওনার অনুরাগী ছিলেন, নাথবতী অনাথবৎ শাঁওলী মিত্র। শাঁওলী মিত্রের কথা উঠলে উনি রক্তিম হয়া উঠতেন। ওনার প্রতি বন্ধুত্ব অনুভব করতেন। এবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ওনার কিছু অনুরাগী বিশ্লেষকের জন্ম হইলো। দেশ পত্রিকার বাংলাদেশ সংস্করণে ওনার ওপর প্রবন্ধ প্রকাশিত হইলো। দেশ পত্রিকার কপটতা সর্বজন বিদিত। তারা পশ্চিমবঙ্গের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের সাহিত্য সংখ্যা করলো বটে। কিন্তু সেইটা শুধু বাংলাদেশে প্রচারের জন্য ছাড়লো। দেশের সেই সংখ্যায় সেলিম আল দীনের ওপর লিখেছিলেন অয়ন গঙ্গোপাধ্যায়। বাংলাদেশের সাহিত্য বিষয়ে বিস্তারিত প্রবন্ধ লিখেছিলেন অরুণ সেন, সো ফার আই ক্যান রিকল। অরুণ সেন একটা প্রগতিশীল আদর্শ হিসাবে বাংলাদেশের সাহিত্য ফেনোমেনা প্রচার করতে আছিলেন। কইলকাতার সাহিত্যিকরা কখনো বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যকে বাংলা সাহিত্য হিসাবে স্বীকার করেন নাই। কিন্তু বাঙালি মুসলমান সর্বদাই বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরকে নিজের সাহিত্য হিসাবে গণ্য কইরা আসছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়া স্বাধীন দেশে সাহিত্য বিকাশের যে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হইছে তাতে সৃষ্টিশীলতার কিছু প্রাচুর্য তৈরি হইছে। ১৯৪৭ সাল থেকেই ইতিহাসের গতি পশ্চিম বাংলা ও পূর্ববাংলার জন্য দুই ভিন্ন ধারায় বইতে শুরু করছিল। ১৯৭১-এর পর রাজনৈতিক ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা আর এক ধারায় ফিরে আসে নাই। ফলে সাহিত্য দ্বিধাবিভক্ত হয়া গেছে। এই দ্বিধা যে নাই তা প্রমাণের সকল উদ্যোগ ব্যর্থ করে দিয়ে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য নতুন পত্রপল্লবে বিকশিত হইতেছে। সে সাহিত্যকে বাংলাদেশের সাহিত্য বললে সাধারণ দৃষ্টিতে ক্ষতির কোনো কারণ দেখা যায় না। কিন্তু অরুণ সেন ভুলে কখনো পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যকে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য হিসাবে উল্লেখ করছেন বইলা প্রমাণ পাই না। অর্থাৎ এই সাহিত্য বাংলাদেশের সাহিত্য আর ওইখানে যা হইতেছে তা বাংলা সাহিত্য। বাংলাদেশের সাহিত্যকে তখনই বাংলাদেশের সাহিত্য হিসাবে মাইনা নেওয়া যায়, যখন পশ্চিম বঙ্গের সাহিত্যকে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য বলা যাবে। স্যারকে আমি আমার আপত্তির কথা বইলা রাখছিলাম। কিন্তু অরুণ সেনের সমর্থন স্যারকে তখন আপ্লুত কইরা রইছে। উনি কইলেন, তার মতে অরুণ বাবুর অবস্থান সঠিক লাগে। ২০০১-এ বোধহয় উনি কলকাতা সফর কইরা আসলেন। আইসা কইলেন, কপিলা বাৎসায়নের লগে ওনার বিশাল ঝগড়া হইছে। কোনো এক সেমিনারে কপিলা বাৎসায়নরা বলতেছিলেন, ভারতবর্ষের জাতীয় নাট্যআঙ্গিক হিসাবে রামায়ণকে বাইছা নেওয়া যায়। স্যার সেইটা মানতে রাজী আছিলেন না। তিনি বললেন, মহাভারত-রামায়ণের বাইরেও ফর্ম আছিল। সেই ফর্মে নতুন কইরা রামায়ণও লেখা হইছিল। যদি সার্বিকভাবে কোনো কিছুকে আদর্শ মানতে হয় তাইলে সেই লোকায়ত ফর্মের কাছে ফিরা যাইতে হবে। আমি এইসব আলোচনার মধ্যে একটা জিনিশ বুঝতে পারি নাই সাহিত্যের মধ্যে জাতীয় নাট্যআঙ্গিকের প্রসঙ্গ কেমনে আসে। এইটা ধুইয়া আমরা কি পানি খাবো? কলকাতা থেকে একবার উষা গাঙ্গুলী ঢাকা আসলেন। দেখা গেল তিনিও সেলিম আল দীনের অনুরাগী। কলকাতায় হরগজ করবেন বইলা প্রস্তুতি নিতেছেন। উষা গাঙ্গুলীর নাট্যদল রঙ্গকর্মী সেইবার ঢাকায় ওসমানী মিলনায়তন মঞ্চে ব্রেখটের মাদার কারেজ অ্যান্ড হার চিলড্রেন করছিল। হিন্দি ভাষায় নাম ছিল হিম্মতি মাই। ব্রেখটের নাটক দেইখা আমি খুব কাইত হয়া পড়ছিলাম। আমার আগে মনে হইতো, বর্ণনাত্বক রীতিটা স্যার যতটা না আমাদের লোকাল ফর্ম থিকা নিছেন তার থেকে বেশি পাইছেন ব্রেখট থিকা। ব্রেখট থিকা আইডিয়া নিয়া লোকজ ফর্মে তার সাজুয্য পাইয়া একে একটা তত্ত্বের আকার দিছিলেন। ওসমানী মিলনায়তনে হিম্মতি মাই দেখে ফেরার পথে ব্রেখট প্রসঙ্গ তুললাম আমি। উনি কথা আগাইতে দিলেন না। কইলেন, ব্রেখট ব্রেখট করিস না। আমাদের দেশে হাজার বছর ধরে এইটা চলতেছে। যা আমার পূর্ব পুরুষরা হাজার বছর ধরে চর্চা করতেছে সেই জিনিশ শিখার জন্য কেন ব্রেখটের দারস্থ হইতে হবে?

কইলকাতা বিজয়ের আগে স্যারের মনে বিশ্বজয়ের বাসনা জাগছিলো। ইংরাজি ভাষায় তার রচনা অনুবাদ হউক এইটা তিনি চাইতেন। কিন্তু বঙ্গভাষী ইংরাজ কাউকে পাওয়া যাইতো না। পাওয়া গেলেও তারা স্যারের রচনা অনুবাদ করতে রাজি হইতো না। কিন্তু হুমায়ূন কবীর হিমু একজন সুইডিশ জোগাড় করে ফেললেন। আলফ্রেড নোবেলের দেশের লোক। ব্যবসায়িক সূত্রে সুইডিশ ভদ্রলোকের সঙ্গে হিমু ভাইয়ের সখ্য ছিল। উনি নিজেও সুইডিশ জানেন। সুইডিশ ভদ্রলোকের সঙ্গে মিলে হিমু ভাই হরগজ তরজমা করে ফেলছিলেন। ১৯৯৮ সালে ইউরোপ যাওয়ার একটা সুযোগ পাইলেন। সুইডেন যাওয়ারও সুযোগ মিলে থাকতে পারে। আমার স্পষ্ট মনে নাই। সুইডেন যাওয়া উপলক্ষে হরগজের অনুবাদ বই আকারে প্রকাশ করা হইলো। স্যার বলতেন, রবীন্দ্রনাথ একদিন ইউরোপের দরবারে নিজের কিছু পদ নিয়া হাজির হইছিলেন। সেই পদগুলাই যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপকে মুক্তির বাণী শুনাইছিল। গুরুদেবের পথ অনুসরণ করে তিনিও হরগজ নিয়া ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। যাবার দিন আমরা তাকে বিদায় জানাইতে গেলাম। এইরকম যাত্রায় উনি চাইতেন ওনারে পা ছুঁয়ে আমরা সালাম করি। আমার সাথে শুভাশিস সিনহা ছিল। উনি নানা প্রকারে আমাদের সালাম করতে ইশারা করলেও আমরা তেমন একটা সাড়া দিলাম না। উনি নিরুপায় হয়া কইলেন, এতদূর যাইতেছি তোরা আমাকে সালাম করবি না? আমরাও নিরুপায় হয়া সালাম করলাম। আমরা সালাম করতে না চাইলেও অনেকে আপোষে সালাম করতেন। গুরু গুরু বইলা সালাম করলে উনি খুব খুশী হইতেন। বলতেন, দেখলি কেমন সম্মান করলো? সে যাত্রায় তার ইউরোপ ভ্রমণ ভাল হইছিল। কিন্তু সুইডিশ ভাষায় অনূদিত হরগজ সেইখানে বাজারজাত করা যায় নাই।

‘রক্মবর্ণ’ ২০০ পৃষ্ঠা লেইখা নতুন করে ‘নিমজ্জন’ লেখা শুরু করার পর ‘রুক্মবর্ণ’ ওনার স্ত্রীর জিম্মায় চলে গেল। পারুল ভাবী স্বভাবে ভীষণ স্থির নারী। ঘরে সারাদিনের আড্ডাতেও তার আওয়াজ পাওয়া যাইতো না। কিন্তু খাবারদাবার, চা-পানির সরবরাহে কোনো কমতি পড়তো না। সেলিম আল দীনের সরবতার বিপরীতে তার ছিল অখণ্ড নীরবতার এক জগৎ। উনি বাগান করতেন। বারিন্দার টবে ফার্ন ক্যাকটাস আর লতানো গাছের বাগান গইড়া তুলছিলেন। প্রায় প্রত্যেক গাছ আর ফুলের নাম উনি জানতেন। আমি খেয়াল করছি, নিঃসন্তান নারীরা ফুল চাষের ব্যাপারে খুব যত্নশীল হন। তাদের হাতে বোনা গাছে খুব ফুল হয়। সেলিম আল দীনের লেখা কাগজগুলো উনি খুব যত্নে তুলে রাখতেন। স্যারের ওপর কোথাও কিছু প্রকাশ হইলে সেটা সংগ্রহ করে রাখতেন। লেখা শেষ হইলে মূল কপি স্যার স্বেচ্ছায় ভাবির জিম্মায় দিয়া তৃপ্তিতে থাকতেন। আর বলতেন, এই মহীয়ষী নারী না থাকলে আমি যে কবে ভেসে যেতাম। ভাবি যে মহীয়ষী নারী সেটা স্যারের মৃত্যুর পর আমি আরও গভীরভাবে অনুভব করলাম। স্যারের স্মৃতিকে তিনি একটি মন্দির হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে, তার মধ্যে বাস করতেছেন মৃত্যুর দিন থিকা। শুনছিলাম, লেখকদের মধ্যে একমাত্র চেখভেরই নাকি বউভাগ্য ঈর্ষণীয়। সেলিম আল দীনের নানা অত্যাচার সহ্য কইরা ভাবি শেষ পর্যন্ত তার ভালোবাসাকে যেমনে পাহারা দিয়া রাখছেন তা দেইখা আমি হতবাক হয়া যাই। উনি যদি চাইতেন তবে সেলিম আল দীনের সংসার প্রতিদিন ভাইসা যাইতো। কিন্তু তিনি বাসায় আবহ সঙ্গীত হয়া থাকতেন। মঞ্চে মূখ্য ভূমিকা নিতেন সেলিম আল দীন। তার ড্রয়িংরুমে আগে রবীন্দ্রনাথের একটা ছবি ঝুলানো থাকতো। ৫০তম জন্মদিনে কিছু পোর্ট্রেইট পাওয়া গেল। স্যারের সেই ছবিগুলা ড্রয়িংরুম দখল কইরা নিল। নানা ভঙ্গিমায় তোলা স্যারের ছবিগুলা ড্রয়িংরুমে ঝুলানো থাকতো। প্রথম প্রথম আত্মগরিমার একটা প্রচারপত্র মনে হইতো ঘরটাকে। পরে দেখতে দেখতে চোখ সহা হয়ে গেছলো। মাঝে মাঝে স্যারের গরিমার অনুভূতি অসহনীয় হয়া উঠতো। মনে হইতো এমন একটা লোককে সহ্য করা তো কঠিন কাজ। ভাবির ধৈর্যের কথা তখন বিশেষভাবে মনে হইতো।

স্বভাবের কারণে কৃত্য উনি খুব পছন্দ করতেন। কেউ কৃত্য কইরা ওনারে কোনো উপাধি দিলে উনি খুব আনন্দের সঙ্গে সেটা গ্রহণ করতেন। রবীন্দ্রপরবর্তী বাংলা নাটকের প্রধান নাট্যকার উপাধিটা খুব চালু হইছিল। কথাটা অবশ্য মিথ্যা না। মূলধারার কবি লেখকরা ত্রিশের পর আর নাটক ও গানের পথ মাড়ান নাই। এই সুযোগে গান ও নাটক অকবি ও অগীতিকারদের দখলে চইলা গেছিল। কবিরা এসে গানকে উদ্ধার না করলে বাংলা গান মেধাহীনতা থিকা রক্ষা পাবে না, এইটা স্যার মনে করতেন। আর নিজে কবিতার পথ ছেড়ে নাটককে রক্ষা করার প্রয়াস নিছিলেন। নয়তো ঢাকার মঞ্চে হয় যাত্রাপালা, নয়তো অনুবাদ নাটক ছাড়া আর কিছু দেখা যাইতো না। সৈয়দ শামসুল হক নাটক লিখেছেন, বুদ্ধদেব বসুও নাটক লিখেছেন। কিন্তু তাদের দুজনের সব্যসাচিত্বের আড়ালে নাট্যপ্রতিভা কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আসতে পারে নাই। ফলে, নাট্যকার হিসাবে সেলিম আল দীন একটা বড় প্রসঙ্গ হয়া উঠলেন। কিন্তু সামনাসামনি এমন উপাধি প্রদান ও তা গ্রহণ করা আমি একটু সমালোচনার চোখ দেখতাম। নিজে পারতপক্ষে এমন উপাধি ব্যবহার করতাম না। শামীম রেজা তাকে নাটকের মহাকবি উপাধি দিছিলেন। লেখায়, বলায় শামীম ভাই খুব উল্লেখ করতেন উপাধিটা। অথচ স্যার চাইতেন তাকে কেউ কবি বলুক। শামীম ভাই তাকে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর একটা উপাধি তৈয়ার কইরা দিছিলেন। তবু তার দুধের স্বাদ মেটে নাই। উনি কইতেন, নাটককে উনি কবিতা বা সঙ্গীতের পর্যায়ের একটা শিল্পরূপ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চান। নাটকের মতো বারোয়ারি ফর্মে সেইটা কেমনে সম্ভব সেইটা আমি বুঝতে পারতাম না। এইটুকু বুঝতাম উনি গতিকে ধরতে চাইতেছেন। স্রোতকে আকার দিতেছেন। বেদনাকে মানুষের মুখের কথায় প্রতিষ্ঠা দেওয়ার কোশেশ করতেছেন। শিল্পী হিসাবে তার এই দহন ও প্রচেষ্টা বেশ ভাল লাগতো। উপাধি ছাড়াও উনি আরেকটা জিনিশ খুব পছন্দ করতেন। লেখার আঙ্গিকে কেউ দূরাগতভাবে তাকে অনুসরণ করলে তিনি খুশী হয়া উঠতেন। বলতেন, এইভাবে প্রজন্ম থিকা প্রজন্মান্তরে তার চিন্তা প্রবাহিত হইতে থাকবে। বদরুজ্জামান আলমগীর ও সাইমন জাকারিয়াকে বিশেষ পছন্দ করতেন তার নাট্যআঙ্গিক অনুসরণ কইরা তারা নাটক লিখতেছে বইলা। নাট্যতত্ত্ব বিভাগে ছাত্র-শিক্ষকরা তার আঙ্গিক অনুসরণ কইরা লেখার চেষ্টা করতো। কিন্তু উনি এনাদের তেমন পাত্তা দিতেন না। উনি বিদ্রোহীদের শ্রদ্ধা করতেন। প্রতিভাকে ঈর্ষা করতেন। কিন্তু নাট্যতত্ত্ব বিভাগের জন্য শিক্ষক হিসাবে বাইছা বের করতেন এমনসব ছাত্রকে যারা অনুগত, গুড ফর নাথিং ও অকর্মণ্য। আনুগত্যের লোভেই উনি এই ছাত্রদের বাইছা নিতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আনুগত্য তিনি পাননি। আমি ক্যাম্পাস ছাড়ার পর একদিন কী কাজে কলাভবন গেছি। দেখি স্যার একলা রুমে বইসা আছেন। কইলেন, বিভাগে তার কথার আর গুরুত্ব নাই। সবাই মিলে তারে একঘরে কইরা রাখছে। আমি কইলাম স্যার, বিরোধিতা করতে পারে এমন ছাত্র তো আপনে নিতে চান নাই। কিন্তু পরীক্ষিত অনুগতরাও দেখি বিরোধিতা করে। স্যার আমার কথায় খুব ব্যথা পাইছিলেন। বিরোধিতা মোকাবিলা করার সাধ্য তার আছিল। হয়তো বিরোধিতাও তেমন গুরুতর কিছু আছিল না। কিন্তু উনি এক ধরনের ভীতির মধ্যে থাকতেন। ভাবতেন তার বিরুদ্ধে কোনো একটা ষড়যন্ত্র হয়তো কোথাও ঘনায়ে উঠতেছে। কোনো দেয়াল বা ঝোপের আড়াল থেকে বের হয়ে আততায়ী হামলা করবে হঠাৎ, এমন অলীক ধারণাও ছিল তার। সন্ধ্যা বেলা একা হাঁটতেন না। সঙ্গে টর্চ নিয়ে আলো ফেলতে ফেলতে হাঁটতেন। রাস্তায় কোনো গাড়ি তার গাড়ির পেছন পেছন কিছুক্ষণ এলে কুদ্দুস ভাইকে জোরে গাড়ি চালাইতে বলতেন। না কোনো আততায়ী তার পথ রোধ করে নাই। কেউ এসে তার ওপর হামলা করে নাই। আন্তঃজেলা ডাকাত দল পথরোধ করে সর্বস্ব লুটে নেয় নাই। রোগভোগের সাধারণ এক মৃত্যু তাকে নিয়ে গেছে।

ঢাকা থেকে মাঝে মাঝে খবর নিতাম। দূর থেকে বুঝতাম স্যার একা হয়া পড়তেছেন। সূর্য পশ্চিমে হেলান দিতেছে। আগে কত কিছু লেগে থাকতো। আমরা নিয়মিত নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করতাম। ঢাকা থেকে কবি সাহিত্যিক শিল্পীরা যাইতেন নিয়মিত। আমাদের আগে শামীম ভাইরা আয়োজন করতেন কবিতা বিকাল। সেইগুলা স্যার মন ভইরা উদযাপন করতেন। নানা তর্ক-বিতর্ক কথা বাতাসে ভেসে থাকতো। উনি টিএসির পরিচালক হওয়ার পরপরই হল নাট্যউৎসব করছিলেন। প্রত্যেক হল নিজেদের নাটক করছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এইরকম এক আয়োজনের মধ্য দিয়া নাকি নাসিরুদ্দিন ইউসুফ আর সেলিম আল দীন আত্মপ্রকাশ করছিলেন। নাট্য উৎসবে দেখতাম মুক্তমঞ্চে হাজার মানুষের করতালির মধ্যে ওনার উজ্জ্বল মুখ। নাট্যতত্ত্ব বিভাগের রুমে দেখতাম নোনা ধরা দেয়ালের ভাঙা জানালার ঘরে একা বইসা রইছেন, কোনো এক গ্রীষ্মের বিকাল বেলা। কখনো মনে হইতো, কোনো শিল্পী তার গান গাইতে রাজি হইলো না বইলা মনে হয় স্যার মন ভার কইরা বইসা আছেন। কখনো মনে হইতো, প্রকাশকরা বই প্রকাশ করে না বইলা তার মন খারাপ। কখনো মনে হইতো ভিতরে কোনো গুরুতর রোগ বাসা বানছে। উনি খুব ক্যান্সারের ভয় পাইতেন। নিমজ্জনের পর তাড়াহুড়া কইরা কয়টা নাটক লেখলেন। আগে হইলে ইউনিক আইডিয়ার জন্য ওয়েট করতেন। ভাবতেন, সময় নিতেন। নিমজ্জনের পর তাড়াহুড়া শুরু কইরা দিলেন। পথের শেষ কোথায় সেটা কিছুটা হইলেও অনুমান করতে পারছিলেন বইলা মনে হয়। আর কিছুদিন বাঁচলে ষাইট হইতো। তবু কয়েক খণ্ড রচনাবলী হওয়ার মতো লেখা লেইখা গেছেন। আমাদের অত হবে না। আমাদের আগের প্রজন্মে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ ছাড়া কারো রচনাবলী হবে না। স্যার আফসোস কইরা বলতেন, একটু মনোযোগ দিলে তুই টিচার হইতে পারতি। এইখানে জয়েন করে আরামে লিখতে পারতি। সাংবাদিক হয়ে অপচয় শুরু করলি। আমি কইছিলাম, শিক্ষকের জীবন আমার ভাল লাগে না। মনে হয় একটা বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া শুধু। স্যার বললেন, শুধু ঘুরপাকটাই দেখলি? প্রতিবছর যে হাজার হাজার তরুণ প্রাণ আসতেছে, নতুন দিন নতুন কলরব শুরু হইতেছে এইটা টের পাইলি না?

আমি ঘাড়ত্যাড়া লোক, মনে মনে বলতাম, না স্যার সেইটা টের পাইলাম না।

সকল পেশার মধ্যে শিক্ষকদের অনুসারি সবচেয়ে বেশি হয়। শিক্ষকদের মধ্যে যে-গুরুর গুণ নাই তারও যথেষ্ট শিষ্য থাকে। যার গুণ আছে তার কী হয় অনুমান করা যায়। একদিন শুনলাম, স্যার ল্যাব এইডে। অবস্থা খুব খারাপ। দেখতে যাবো যাবো করতেই সিঙ্গাপুরে নেওয়ার আয়োজন শুরু হইলো। সিঙ্গাপুর নেয়ার সময় হওয়ার আগেই একটা ফোন পাইলাম। নির্লিপ্ত নয়ন ফোন দিছে। কানতেছে। কিছু কয় না। আমি অফিস থিকা বাইরায়া পড়লাম। ল্যাবএইডে গিয়া দেখি লোকে লোকারণ্য। ইতিমধ্যে তার মৃত্যু জাতীয় ঘটনায় পরিণত হইছে। শহীদ মিনার থেকে জাহাঙ্গীরনগর পর্যন্ত নানা কর্মসূচি ঘোষণা হইছে। জীবিত অবস্থায় নানা অভিযোগে যারা তাকে আড়ালে আবডালে পর্যুদস্ত করার বাসনা পোষণ করত তারা ডুকরে ডুকরে কাঁদতেছে। বন্ধুদের কান্না আমি অহরহ দেখি কিন্তু গোপন ও প্রকাশ্য শত্রুরা যখন কান্দে তখন জীবনের আরেকটা গভীর সত্যের মুখোমুখি হইতে হয়। সেই সত্য কী এইখানে বলবো না। সেই সত্যের কথা লিখতে হলে সেলিম আল দীনের জীবন নিয়ে আরেকপ্রস্থ রচনা আমাকে লিখতে হবে।

১৪ জানুয়ারি ২০০৮ উনি মারা গেলেন। পরেরদিন শহীদ মিনারে গেলাম। টিভি ক্যামেরার সামনে মরদেহ আগলায়ে সবাই দাঁড়ায়ে রইছেন। আমি ঘুইরা ঘুইরা মানুষ দেখতেছি। খ্রিস্তভ কিসলোভস্কির হোয়াইট সিনেমার কথা মনে হইলো, যেইখানে মৃত্যুর অভিনয় কইরা এক ব্যক্তি তার শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে আগত মানুষজনের প্রতিক্রিয়া লুকায়ে দেখতেছিলেন। মনে হইতেছিল, স্যার ঘটনাগুলা দেখতেছেন। আর মনে মনে খুব খুশী হয়া উঠতেছেন।

শেষ আনুষ্ঠানিকতায় মৃতব্যক্তির উপস্থিত থাকার চিন্তা খুবই ফিকশনাল। কিন্তু আমি ঘুইরা ঘুইরা লোক দেখতেছিলাম, আর ভাবতেছিলাম, স্যার এইখানে থাকলে খুব ভাল হইতো।

————

আরো লেখা

রুখসানার হাসব্যান্ড(গল্প)
চলিতেছে

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: মাহবুব মোর্শেদ
ইমেইল: mahbubmorshed0@gmail.com

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

প্রতিক্রিয়া (24) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সৈকত আরেফিন — এপ্রিল ২, ২০১০ @ ১:৪০ অপরাহ্ন

      খুব ভাল লাগল ‘গুরু ও চণ্ডাল’; এতে করে সেলিম আর দীনকে চেনা, অর্থাৎ তাঁর সাধারণত্ব ও অসাধারণত্বকে উপলব্ধি করা আমাদের জন্য সহজ হবে।

      – সৈকত আরেফিন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাজিদ মাহমুদ — এপ্রিল ২, ২০১০ @ ২:০১ অপরাহ্ন

      লেখার নামটি যথার্থ মনে হচ্ছে।

      এমন গুরু বিষয়ে এ ভাষায় লেখা চণ্ডালীই বটে! আপনাদের আশকারায় আজকাল সাহিত্য রেডিওতে জকিরা যে ভাষায় কথা বলছে, তা শুনে থুথু ছিটাতে ইচ্ছে করে মুখে। কথ্য বাংরেজী বা ছাগলামী-প্রকার ভাষা মিডিয়া কী করে ঠাই দেয় তা মিডিয়াই ভালো জানে। নতুন কোনো ভাষা জন্ম দিতে চাইলে যে মুরোদ থাকা প্রয়োজন, এটাও সৃষ্টিকর্তারা ভুলে বসে আছেন–ফলে তৈরি হচ্ছে এক বাগাড়ম্বর। লেখার বিষয়বস্তু কিছুটা শ্রুতিমধুর ভাষায় লেখা হলে, পাঠকের আনন্দই হত পড়তে। আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারটা ‘ডায়লগে’র অলংকার হলেও এই অবিমিশ্রিত-কুপমণ্ডুলিকা বেশিদূর পর্যন্ত পড়ার রস পেলাম না।

      আপনার ভাষার ব্যবহারের এই ঘটির জল কোনোদিনও সমুদ্রে গড়াবে না এতেই শান্তি। ভালো থাকুন। সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ হোন, জাতিকে উদ্ধার করুন।

      – সাজিদ মাহমুদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইফফাত আরেফীন তন্বী — এপ্রিল ৩, ২০১০ @ ৩:২৯ পূর্বাহ্ন

      লেখার প্রতিটা লাইনে এত বেশি পরিচিত গন্ধ! পরিচিত সময়ের… দারুণ ভাবে আমিও বিযুক্ত যেন… আসলেই বিযুক্ত!! একটা কথা, শেক্সপীয়র নিয়েও তিনি তেমন মেতে থাকতেন যেমনটি মার্লো নিয়ে ছিলেন। আমাদের পুরো হ্যামলেট ইংরেজীতে মুখস্ত করাবার জন্য রীতিমতো অত্যাচার করেছেন… আমাদের ল্যাবে শেক্সপীয়র উপস্থাপন হয়েছে বহুমাত্রায়… আর হ্যাঁ কবিতা থেকে নাটকে আসার কথা তাঁকে প্রথম বলেন কবি জসিম উদ্দীন… ফরহাদ মজহার, রফিক আজাদ পরে…। আমি আসলে আমার অনুভূতিটুকু জানাতে চাচ্ছিলাম… ভালো লাগলো খুব, ধন্যবাদ।

      – ইফফাত আরেফীন তন্বী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মারুফ রায়হান — এপ্রিল ৩, ২০১০ @ ১১:৫৫ অপরাহ্ন

      লেখককে আস্ত একখানা বই লেখার অনুরোধ জানাই। কবি মোহাম্মদ রফিকও যদি স্মৃতিকথা লেখেন, তাহলে সেলিম আল দীনের জীবনীর বড় অংশ পাওয়া সম্ভব হবে।

      – মারুফ রায়হান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আইরিন সুলতানা — এপ্রিল ৪, ২০১০ @ ১২:৫১ পূর্বাহ্ন

      সকালবেলা ফেসবুকে থেকে লিংকটা নিয়ে ব্রাউজারে ওপেন করে রেখেছি, বি-শা-ল লেখা, সময় করে পড়ব বলে। অত:পর সন্ধ্যার পর থেকে শুরু করে, মাঝে নৈশ্যভোজের পর এই মাত্র পাঠ শেষ হলো!

      যা হোক, এবার লেখা নিয়ে বলি কিছু।

      একসময় মঞ্চনাটকের এক কলাম- দুই ইঞ্চি রকমের বিজ্ঞাপনগুলো প্রতিদিনই আসতো পত্রিকায়। সেই সূত্রেই হাতহদাই নামটি খুব চোখে পড়তো।(যদিও নাটকটি দেখা হয়নি!) সেলিম আল দীনের নাম মাঝে মাঝে ভুলে গেলেও হাতহদাই খুব মনে আছে আমার। তারপর একসময় হাতহদাই আর সেলিম আল দীন দুটো এক করলাম। ফলে সেলিম আল দীন আমার কাছেও হয়তবা নাট্যকার সেলিম আল দীন- অর্থ্যাৎ যে গতানুগতিক পরিচয়ে তাকে পরিচিত করা হয় আর কি।

      তাঁর “ভাঙ্গা প্রেম অশেষ বিশেষ” আত্মজৈবনিক রচনাটি বেশ ধীরে-সুস্থে পড়েছি। এটা তাঁর মৃত্যুর পর সম্ভবত প্রকাশকের উদ্যোগে (এবং সম্ভবত কোনরকম সম্পাদনা ছাড়াই, অর্থ্যাৎ মূল পাণ্ডুলিপিকে অপরিবর্তিত রেখে) প্রকাশিত।

      আমি অবশ্য খুব বেশী সেলিম আল দীন সাহিত্য পাঠক নই। ফলে আমার জন্য তাঁর রচনা ধীরে-সুস্থে পাঠ অবশ্যম্ভাবীই ছিল। এই প্রসংগটা টানার কারণ হলো “একটু অপ্রচলিত পুরনো বাংলা বা তৎসম শব্দ ব্যবহার করে গদ্য রচনা ওনার ভাল লাগত।” , এই অংশটি। আত্মজৈবনিক রচনাগুলো একটু সহজ ভাষায় হলে তা পাঠককে খুব তাড়াতাড়ি স্মৃতিচারণের সেই নষ্টালজিক দুনিয়াতে নিয়ে যায়। কিন্তু সেলিম আল দীন তার এই বইয়ে এরকমটি করেনি। তবে বর্ননার ধারা বেশ ভিন্নই ছিল। লেখনি যত আলাদাই হোক না কেন, তবু ভিন্নতা স্বত্বেই ভিন্ন ভিন্ন লেখকের জীবনি লেখার দিক দিয়ে এক সীমানায় আনা যাবে, কিন্তু সেলিম আল দীন -কে সেই সীমানায় নিয়ে যাওয়া যাচ্ছিল না মোটেও। এটা কেবল মাত্র শব্দচয়ন ও বিন্যাসের কারনে। যেহেতু তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ বা সাক্ষাতের কোনরকম সুযোগই আমার ছিলনা, ফলে ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে নিয়ে কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভবই না। তবে তাঁর এই বইটি পড়ে তাকে প্রেমিক পুরুষ মনে হয়েছে। প্রেম ও ভালবাসার প্রতি তাঁর আলাদা আলাদা সংজ্ঞা প্রদানের জোরালো চেষ্টা ছিল তাঁর বইটিতে। কেবল নিজের প্রেম উপাখ্যান নিয়ে নিজের রচনাতে অনেক প্রেম কিংবা ভালবাসা সম্পর্ক হয়ত আমার মত অনেক পাঠককের মধ্যেই নীতিগত বিষয়ে ইতঃস্ততা তৈরী করবে তাকে নিয়ে, তবে এগুলো অবশ্যই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অংশ। ফলে পাঠকের এই ভ্রুকুটিতে হয়ত লেখক সেলিম আল দীনের প্রতিচ্ছবিতে আদতে কোন প্রকার শ্লাঘাহানি ঘটবে না। মৃত সন্তানের জন্য তাঁর দূর্দান্ত হাহাকার দেখা গেছে এই বইটিতেও।
      লেখা পড়ে, দূউউর থেকে এটুকু বুঝতে পারি, উনার পক্ষে সাংসারিক হয়ে ওঠা হয়ত সম্ভব হয়নি। তাঁর স্ত্রী যে তাঁর অনেক ব্যাপারে ধৈর্যশিলা ছিলেন, এটার উল্লেখ রয়েছে তাঁর লেখাতেই। এবং ক্ষেত্র বিশেষে কখনো কখনো মনেও হয়েছে, তাঁর আত্মপ্রেম, তাঁর প্রেমিক-পুরুষ স্বভাব হয়ত কোন কোন ক্ষেত্রে সংসারিক নীরব দূরত্বও তৈরী করেছিল। অবশ্য পাঠক হিসেবে এই ব্যাপারে এতদূর কথা বলার এখতিয়ার রাখা ঠিক না। তবে এটা কেবল পাঠ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া/ভাবনা।

      সেলিম আল দীনের গান অনেক পরিচিত শিল্পীরাও ফিরিয়ে দিয়েছেন জেনে অবাক হচ্ছি। আপনি বলছেন, সেলিম আল দীন একটু ক্ষমতাকেন্দ্রীক। সেটা কিন্তু সবাই। বিশেষত মিডিয়াতে (সেটা শিল্পকেন্দ্রীকই হোক বা সাহিত্য বা অন্য কোন মাধ্যম) সাধারণত মুখ-পরিচিতির একটা বিরাট ভূমিকা থাকে। অবাক হচ্ছি এই হিসেবেই। তিনি তো মুখ চেনাই ছিলেন। নয়তো এখন কত এ্যাড়ে-গ্যাড়ে-নাথ্থু-খ্যাড়ের এ্যালবাম হিট হয়ে যাচ্ছে! আবার জীবনমুখী গানের বাজার খুব ভালো আমাদের দেশে। ধারনা করে নিতে পারি, সেলিম আল দীনের গানগুলি কমার্শিয়াল গান ছিলনা।

      একটা ব্যাপার সব সময় অবাক করা ভাল লাগার জন্ম দেয়, তা হলো, তাঁর এই উৎসব পালন। পাখি উৎসব, মহুয়া উৎসব। এগুলো আপাত দৃষ্টিতে কেবলই উৎসব নয়, একটা প্রাণ-প্রজাতিমূলক জ্ঞানচর্চাও বটে।

      লেখককে নিয়ে পাঠক যত রিভিউ করবে, লেখকের ভাবনার গভীরতা ততই প্রস্ফুটিত হবে অন্য পাঠকের কাছে। তবে এই লেখাটা অবশ্য সেলিম আল দীনের নির্দিষ্ট কোন রচনা নিয়ে ছিলনা। ছিল ব্যক্তি সেলিম আল দীনকে নিয়ে। কিংবা লেখক এবং ব্যক্তি সেলিম আল দীনের মধ্যকার সমতা-অসমতা নিয়ে, আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে। ফলে উপভোগ্য ছিল অবশ্যই।

      ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আহমেদ শামীম — এপ্রিল ৪, ২০১০ @ ২:১৫ পূর্বাহ্ন

      বিশেষ কিছু বৈচিত্র নিয়ে আপনার লেখাটা সমাত্মজীবনী, সতীর্থদের জন্য সুখপাঠ্য ও স্মৃতিজাগানিয়া। স্যার তার সব পছন্দের শিষ্যদের একপর্যায়ে চণ্ডালে ‘পরিণত’ করতেন, এবং প্রচণ্ড দ্বন্দ্বারতিতে লিপ্ত থাকতেন। সম্পর্ককে শিল্পরূপ দেয়ার জন্য তার এই দ্বান্দিক প্রেমকে না বুঝে অনেক সময় মাত্রারিক্ত চণ্ডালী করেছি। আপনার লেখা পড়ে মনের মধ্যে একটা গামছা-মোচড় পড়ল।

      – আহমেদ শামীম

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন elora leelith — এপ্রিল ৪, ২০১০ @ ৪:৫৬ পূর্বাহ্ন

      এত বেশি মুখস্ত এই সব…।

      স্যার একদিন গোপন কথা বলবার মত করে বলেছিলেন: “কাউকে বলিনি, তোকে বলছি, ‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍’যৈবতী কন্যার মন’ কিন্তু আমার আত্ন যৈবনিক লিখা।”

      স্যার চারপাশের মানুষদের নিয়ে লিখতেন না, এ একদম ভুল ধারণা। কবি যেমন নারী লিখতে গিয়ে নদী, নদী কেটে পাহাড় লেখে; তেমনি নাটকেরও আছে আলাদা আড়াল আভরন…।

      – elora leelith

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mohosin — এপ্রিল ৪, ২০১০ @ ৮:০৮ অপরাহ্ন

      “প্রৌঢ় অধ্যাপকের সঙ্গে বৈকালিক রাস্তাবিহারের চাইতে দুয়েকটা ডালপুরি সমভিব্যহারে প্রান্তিকের চা বা বান্ধবীর রহস্যময় চাহনি আমাদের কাছে অধিক রহস্যময় মনে হইত”

      ভাল লাগল বিশাল এই “গুরু ও চণ্ডাল” লেখাটি, এটাকে আমি গুরু দক্ষিণা বলে মনে করি।

      – mohosin

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোহাম্মদ আজম — এপ্রিল ৫, ২০১০ @ ১২:৫২ পূর্বাহ্ন

      দারুণ লিখেছেন। পইড়া আরাম পাইলাম। জীবনীর সাথে শিল্পটা এমনভাবে জড়ায়া-মিশায়া গেছে যে প্রায় কোনো অংশই অদরকারী মনে হয় নাই। সেলিম আল দীনকে নাটকসহ চেনা গেল, নাটক ছাড়াও। অনেক ধন্যবাদ।

      – মোহাম্মদ আজম

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rabbani — এপ্রিল ৫, ২০১০ @ ৩:৩৪ পূর্বাহ্ন

      পুরা লেখাটা পড়ে শিখলাম যা হাসলাম আরও বেশি। এইটাও কি কনফেশন টাইপের কিছু? সৃজনশীল যে কোনো প্রাণী একটু অহংকারী হবেই। স্বয়ং ঈশ্বরও পুজাপ্রার্থী বলে কথা। এনিওয়ে, ভালো লাগলো। ধন্যবাদ।

      – Rabbani

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মশিউল আলম — এপ্রিল ৫, ২০১০ @ ৪:৫০ অপরাহ্ন

      ‘গুরুচণ্ডালি’ শিরোনামে একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখা আমাকে দিয়েছিলেন মাহবুব মোর্শেদ। মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যায় সেটি প্রকাশ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নানা কারণে পত্রিকা প্রকাশে খুব দেরি হয়ে যাচ্ছিল বলে লেখক স্বভাবতই হতাশ হচ্ছিলেন। এক বছরের মতো সময় পার হওয়ার পর তিনি লেখাটি ফেরত চাইলেন। লেখাটি আটকে রাখার আর কোনো যুক্তি বা অধিকার আমার ছিল না। আমি সেটি তাঁকে ফিরিয়ে দিই।

      বিডিনিউজ আর্টস-এ সেই লেখাটি গুরু ও চণ্ডাল নামে ছাপা হয়েছে। সে-লেখার শুরুতে লেখক একটি ছোট্ট উপক্রমণিকায় বলেছেন, আমি লেখাটি মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকায় ছাপলাম না। এ-কথা তিনি জানিয়েছেন নিছক তথ্য হিসেবে নয়, খানিক অভিযোগ বা অনুযোগের শুরু। তথ্য হিসেবে এটা ঠিক যে লেখাটি এখনো মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকায় ছাপা হয়নি। কারণ লেখাটি নেওয়ার পর পত্রিকাটির কোনো সংখ্যাই বের হয়নি। কিন্তু মাহবুব মোর্শেদ লিখেছেন, ‘মীজানুর রহমান যা করতেন’ আমিও নাকি তাই করলাম। তাঁর বিশ্বাস, মীজানুর রহমান তাঁর এই লেখাটি ছাপতেন না, লেখাটির গুরুচণ্ডালি ভাষার কারণে। মাহবুব মোর্শেদের ধারণা, তাঁর লেখাটির ভাষা নিয়ে আমারও আপত্তি ছিল। এটা সত্য, একবার কথাপ্রসঙ্গে তাঁকে বলেছিলাম, মীজানুর রহমান আপনার এই লেখাটি পেলে কী করতেন (ছাপতেন কি না), সেটা একটা প্রশ্ন। কিন্তু আমি কী করব তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই বা দ্বিধা নেই, আমি লেখাটি প্রকাশ করব। কিন্তু মাহবুব মোর্শেদ সে-সুযোগ আমাকে না দিয়ে (সঙ্গত কারণেই) লেখাটি ফেরত নিয়েছেন। এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু আমি লেখাটি ছাপতে রাজি ছিলাম না—এমন কথা প্রচার করে তিনি আমার প্রতি অবিচার করলেন। আমি দুঃখিত হলাম। কারণ সাড়ে বারো হাজার শব্দের বেশি লম্বা লেখাটির প্রায় দশ হাজার শব্দ পর্যন্ত আমি সম্পাদনা করেছিলাম যথাসাধ্য যত্নের সঙ্গে। বিডিনিউজ আর্টস-এ প্রকাশিত ভাষ্যটি দেখে বুঝতে পারছি, যে অবস্থায় আমি মাহবুব মোর্শেদকে লেখাটির সফট কপি ফেরত পাঠিয়েছি, ওইভাবেই লেখাটি ছাপা হয়েছে। এই পরিশ্রমও পণ্ডশ্রম হলো দেখতে পাচ্ছি। মাহবুব মোর্শেদ, আপনাকে ধন্যবাদ। সমাজে পণ্ডশ্রমিকদেরও প্রয়োজন থাকে, থ্যাংকলেস্লি!

      মশিউল আলম
      ঢাকা, ৫ এপ্রিল ২০১০
      mashiul.alam@gmail.com

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নূর সিদ্দিকী — এপ্রিল ৫, ২০১০ @ ৭:১১ অপরাহ্ন

      `স্যার ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে নিরাপদে থাকতে পছন্দ করতেন। রাজনীতি না কইরা একবার দুইবার ভোট দিয়া, বন্ধুদের সাথে তুই-তোকারি কইরা কিছু সুবিধা নিয়া থাকতে পছন্দ করতেন। অন্য শিক্ষকদের মতো রাজনীতি কইরা ভাল পোস্ট পজিশন আদায় কইরা সুখে থাকা তার পক্ষে সম্ভব আছিল না। সেই পদ্ধতি উনি জানতেন না। ফলে, আমরা যখন ক্ষমতাসীন প্রশাসন, দল বা ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে মিছিলে নামতাম তখন স্যারের সঙ্গে বিশাল দূরত্ব তৈয়ার হইত। মিছিলে আমাকে দেখে উনি দূরে সরে যাইতেন। আন্দোলন তুঙ্গে থাকলে উনি একদমই আর খোঁজ নিতেন না। নিরানব্বইয়ের বর্ধিত বেতন ফি বিরোধী আন্দোলন শুরু হইলে স্যারের সাথে আমার একটা দীর্ঘ অন্তরাল তৈরি হইল’

      আপনার লেখা অসাধারণ কিন্তু উর্ধ্বকমা বন্দি এই কয়েকটি লাইনের মতো আরও অসংখ্য লাইন আমার পছন্দ হয় নাই। নাই হইতে পারে। আপনার বিশ্বাস আপনার কাছে আমারটা আমার। আমি স্যারের সাথে প্রায় ৫বছর চলাফেরা করছি, খাইছি, স্যারের বাসায় ঘুমাইছি। আমারও অনেক স্মৃতি আছে, স্যার তাঁর কিছু কথা ডায়েরিতে লিখছেনও বটে।
      আমি আসলে কোনো কালেই স্যারকে আলাদ অন্য চরিত্রের মধ্যে খুঁজতে যাই নাই। ফলে আপনার অনেক কথা হয়তো সত্য কিন্তু আমি বিশ্বাস করতে গিয়ে পারতাছি না।
      স্যার আমারে বলতেন পুত্র—এইটা ক্যাম্পাস এবং ঢাকার অনেকেই জানতেন। কিন্তু শেষকালে আমিও আপনার মতোই চণ্ডাল হয়া পড়ছিলাম। স্যারকে ভয় পাইতাম। দেখলে গাছের আড়ালে লুকাইতাম। এই যেমন স্যার যেদিন ফাইনালি অসুস্থ্য হইলো সেই সন্ধ্যায়ও স্যারকে আমি প্রান্তিক গেটে দেখছি। সিগারেট খাইতে খাইতে স্যার হাঁটতাছেন ক্লান্ত হয়া। আমিও সিগারেট নিয়া বটগাছের আড়ালে আন্ধারে খাড়াইয়াছিলাম। তারপর স্যার চইলা গেল। আমি মানিকগঞ্জের বাস ধরলাম। ওই সময় স্যারের সাথে নির্লিপ্ত নয়ন আছিল। ওই দিনই রাত ১টার দিকে নয়ন ফোন কইরা কইল স্যার ঢাকার হাসপাতালে ভর্তি। শুইনা মনে হইলো আমি শালায় কত্ত বড় পাষণ্ড কেন স্যারের সামনে গেলাম না।

      একবার স্যারের হুকুমে আমি আর দুপুর মিত্র দুইজনে মহুয়া উৎসব করছি। ম্যাল খাটছি। স্যারের সেই দিনের খুশি ছিল চোখ কাপাইন্যা। আর বাইরে বৃষ্টি আছিল দুনিয়া ডুবাইন্যা।
      আপনি ভালো লিখছেন। অনেক ভালো। আমার দেখা এবং বিশ্বাসের বাইরেও যে আরেক সেলিম আল দীন থাকতে পারে তা জানলাম বুঝলাম, কিন্তু মানতে গিয়ে ঝামেলায় পড়লাম। তয় বিশ্বাস করার মতোও কথা বলছেন। আসলে আপনার লেখার প্রতিক্রিয়া জানানের সাহস দেখাইতে গিয়াও ঝামলোয় পইড়া অগোছালো কথা লিখছি। এই আর কি।

      নূর সিদ্দিকী
      nursi31@gmail.com

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হযরত মামুন আব্দুল্লাহ্ — এপ্রিল ৬, ২০১০ @ ৪:৪৪ অপরাহ্ন

      লেখাটা পড়লাম, প্রায় তিনদিন ধরে একটু একটু করে, যদিও সেলিম আল দীন আমার কিছুই ছিল না এবং আমি নাটক-প্রেমিক বা নাট্যকর্মীও নই। তারপরেও এই দীর্ঘ লেখাটা শেষ পর্যন্ত পড়তেই হলো, রচনাগুণের কারণে। আপনার রচনাভঙ্গি এবং অকপটতা বেশ ভালো লাগলো। সমকালের কারো মৃত্যুর পরে প্রকাশিত অধিকাংশ (প্রায় সবগুলোই) বস্তুত শেষ পর্যন্ত স্তুতি রচনাতে পরিণত হয়, আপনার লেখাটা সে দিক থেকে বিবেচনা করলে অনেক আলাদা। শুরুতে যে নোটখানা দিয়েছেন সেইটার – “…আত্মজীবনের সঙ্গে জড়িত পরজীবনের কথা তাইলে কেমনে বলা সম্ভব? স্মৃতি তো অবিনশ্বর নয় যে যখন নিজের মহৎ প্রতিভা বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হইবে তখন তিনি যথাবিধি সামনে আইসা দাঁড়াইবেন। ফলে, যৌবনেই স্মৃতির ভিতর সমাহিত হইলাম। সেই অর্থে এটা যতটা না সেলিম আল দীনের ততোধিক আমার নিজের…” এই অংশটা চমৎকার এবং নতুন ধরনের হইছে, আমার ভালো লাগছে।

      – হযরত মামুন আব্দুল্লাহ্

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মামুন চক্রবর্তী — এপ্রিল ৬, ২০১০ @ ৫:০৫ অপরাহ্ন

      স্যার যখন মুক্তমঞ্চে ভাষণ দিতেন, আমরা সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুধু শুনতাম। একবার হাশেম খানের ভাষণের সময় দর্শক তালি দেওয়া শুরু করলে স্যার সবাইকে ধমক দিলেন, ‘তোমরা হাশেম ভাইয়ের কথার সময় তালি দাও!’ এরপর স্যার প্রায় ৩০ মিনিট ভাষণ দিলেন, কেউ চু শব্দটাও করার সুযোগ পায়নি।

      মাহবুব মোর্শেদকে অনেক ধন্যবাদ, স্যারকে নিয়ে অনেক সুন্দর একটা লেখার জন্য।

      মামুন চক্রবর্তী
      mamunurrashidju@gmail.com

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ — এপ্রিল ৬, ২০১০ @ ৬:০০ অপরাহ্ন

      মশিউল আলম সমীপে,
      ১০ হাজার শব্দ পর্যন্ত সম্পাদনা কইরা দেওনের জন্য আপনারে কৃতজ্ঞতা জানাই। আগেই জানানো উচিত আছিল।

      সম্পাদনায় আপনি অত্যন্ত পারদর্শী। লেখা খুটায়ে পড়েন। এই কারণেই হয়তো মীজানুর রহমান তার পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব আপনারে দিছিলেন। কিন্তু আপনার জিম্মায় এমন ঐতিহাসিক পত্রিকাটার অনিয়মিত হয়া যাওয়া অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। কোন সংখ্যা বাইর হবে, সংখ্যায় কী থাকবে এই নিয়া আপনের মধ্যে প্রচুর দোনামোনা আছে। গত এক বছরে আপনের পরিকল্পনা ছিল, গত দুই বছরে পরলোকগত কয়জন সাহিত্যিকরে নিয়া সংখ্যা করবেন। কিন্তু লেখা ফিরত নেওয়ার সময় জানতে পারলাম, জীবিত একজন বিজ্ঞানীকে নিয়া আপনি সামনের সংখ্যা করতে যাইতেছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটা সংখ্যার জন্য লেখা জোগাড় কইরা পরে সেইটারে ঝুলায়ে রাইখা আরেক সংখ্যার কথা ভাবা বোধহয় ঠিক না। বিশেষত, এক বছর পর লিখা ফিরত দেওনের চাইতে দুই বা তিনমাস পর ফিরত দেওয়া আমার মতে, ভাল।

      আপনি কইছেন, আমার লেখা প্রকাশ নিয়া দোনামোনার মধ্যে আপনি আছিলেন না। ভাষাপ্রশ্নে আপনার এই প্রগতিশীল অবস্থান ভাল লাগলো। আমার অবশ্য মনে পড়ে, আপনি কয়েকবার লেখার মধ্যে ভাষার মিশ্রতা নিয়া অসন্তোষ ব্যক্ত করছিলেন। বিশেষ কইরা মুখের ভাষা আর শান্তিপুরি ভাষার মিশ্রণ নিয়া কইছিলেন। আর কয়েকজন সাহিত্যিকের নাম উল্লেখ কইরা কইছিলেন, উনি বা অমুকে কিছু মনে করবে না তো?

      মীজানুর রহমান নিজে যখন এই লেখা আপনের কথা মোতাবেক ছাপতেন না তখন আপনে ছাপার ডিসিশনে এক বছর ধইরা অনড় আছিলেন এইটা একটা নীরব বিপ্লবের মতো ব্যাপার। সকল বিপ্লবের ফল ফলে না, এই বিপ্লবের গাছেও ফল ধরলো না। দুখ এইখানেই।

      মাহবুব মোর্শেদ
      mahbubmorshed0@gmail.com

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মনির সরকার — এপ্রিল ৭, ২০১০ @ ৪:২২ পূর্বাহ্ন

      পুরা লেখা পইড়া আমি শুধুই হাসছি; মনে মনে কইছি আহা রে আমরা বন্ধুরা এমনিই কথা কইতাম। দোনোমোনো, কইছিলেন, শান্তিপুরী ইত্যাদি। এই সব শব্দ মিল্লা যখন যখন “প্রৌঢ় অধ্যাপকের সঙ্গে বৈকালিক রাস্তাবিহারের চাইতে দুয়েকটা ডালপুরি সমভিব্যহারে প্রান্তিকের চা বা বান্ধবীর রহস্যময় চাহনি আমাদের কাছে অধিক রহস্যময় মনে হইত।” বা “এত সকালে ক্যাম্পাস জীবনে ঘুম থিকা উঠছি বইলা মনে পড়ে না। ভোর দেখার খুব বেশি দায় থাকলে আমরা পুরা রাত জাইগা ভোর দেইখা দেন ঘুমাইতে যাইতাম।” এই রকম লেখা সৃষ্টি করে তখন একলা একলা হাসি। আমি এর সাহিত্য মূল্য জানি না। কিন্তু এই ভাষা আমারে পুরা লেখাটা পড়তে বাধ্য করে। আমি বুঝতে পারি “শান্তিপুরী” মানে কী। এখন কথা হইল যিনি দশ হাজার শব্দ সম্পাদনা করছিলেন এবং এই সম্পাদনা তো আসলেই পণ্ডশ্রম।

      তবে আমার মতে দীর্ঘস্থায়ী রচনার ক্ষেত্রে হয় মুখের ভাষা, নয় শান্তিপুরী যে কোনো একটা বেছে নেওয়া শুভ।

      সুইডেন যাবার সময় পা ছুঁয়ে ছালাম করার বিষয়টায় আপনি এইভাবে স্যারকে না পচাইলেও পারতেন। যার গান কেউ করতে চায় না, যার নাটক কেউ প্রকাশ করতে চায় না, নিভৃতে যিনি বাংলা নাটকে কালজয়ী কিছু কাজ দিয়ে গেছেন সেতো একটু সম্মান—হোক না সেটা লোকদেখানোর জন্য—আশা করতেই পারেন। একবার মনে করুন না একটা প্যারা লিখতে কত শতবার ভাবতে হয়।

      ধন্যবাদ।

      -মনির সরকার

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মশিউল আলম — এপ্রিল ৭, ২০১০ @ ৮:০৫ অপরাহ্ন

      মীজানুর রহমান মারা যাওয়ার পর আমার সম্পাদনায় মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার দুটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমটি সাধারণ সংখ্যা, পরেরটি বিশেষ সংখ্যা (মীজানুর রহমান স্মরণ সংখ্যা।) শেষেরটিতেই ঘোষণা ছিল, পরবর্তী বিশেষ সংখ্যা বেরবে জামাল নজরুল ইসলামকে নিয়ে। মাহবুব মোর্শেদের এই কথা সত্য নয় যে হঠাৎ করে ওই পরিকল্পনা করা হয়েছে। গত দুই বছরে প্রয়াত লেখকদের নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করব এমন কথা আমি তাঁকে কখনো বলিনি বা আমার এমন কোনো পরিকল্পনাও ছিল না। তবে বাসুদেব দাশগুপ্ত, মাহমুদুল হক, শহীদুল জহির ও সেলিম আল দীন—গত কয়েক বছরে প্রয়াত এই লেখকদের সম্পর্কে লেখা পেলে একটি সাধারণ সংখ্যায় সেগুলো প্রকাশ করতাম এমন ভাবনা ছিল, সে-কথাই বলেছিলাম মাহবুব মোর্শেদকে। কিন্তু সে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মাহবুব মোর্শেদ সেলিম আল দীনকে নিয়ে লিখেছেন নিজের তাগিদেই (তাঁর ভাষায় ‘স্বপ্নাদিষ্ট হয়া’), আমি ঘটনাক্রমে সে-কথা জেনে লেখাটি তাঁর কাছে চেয়ে নিয়েছিলাম।

      মীজানুর রহমান মাহবুব মোর্শেদের গুরুচণ্ডালি ভাষায় রচিত লেখাটি পেলে তাঁর পত্রিকায় ছাপতেন না এমন কথা নিশ্চিত করে বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি তা মাহবুব মোর্শেদকে বলিওনি। বলেছিলাম, তিনি ছাপতেন কি না সেটা একটা প্রশ্ন। কিন্তু মাহবুব লিখলেন, মীজানুর রহমান আমার ‘কথা মোতাবেক’ তাঁর লেখাটি ছাপতেন না। এবং তিনি যা করতেন না, আমি সেই কাজ করতাম, অর্থাৎ তাঁর গুরুচণ্ডালি ভাষায় রচিত লেখাটি ছাপতাম—এ নিয়ে আমি ‘দোনামোনা’র মধ্যে ছিলাম না—ভাষার প্রশ্নে এটিকে তিনি বলেছেন আমার ‘প্রগতিশীল অবস্থান’। আমি লেখাটি ছাপার ‘ডিসিশানে এক বছর ধইর‌্যা অনড়’ ছিলাম—এটা, মাহবুব বলছেন, ‘একটা নীরব বিপ্লবের মতো ব্যাপার’, যে ‘বিপ্লবের গাছে ফল ধরল না’।

      আসলে, কে কেমন ভাষায় লিখছেন তা আমার বিশেষ মাথাব্যথার বিষয় নয়, এখানে প্রগতিশীলতা বা প্রতিক্রিয়াশীলতার প্রশ্ন আছে কি না জানিও না। ভাষা নিয়ে রাজনীতি সম্পর্কে আমি উৎসাহী নই।

      মাহবুব মোর্শেদ, দেখতে পাচ্ছি, সত্যকে ভেঙে, মচকে, মোচড় দিয়ে উপস্থাপন করতে বেশ উৎসাহী। তাঁর এই একটি লেখার সুবাদে আমার সঙ্গে যে কয়েকবার আলাপ হয়েছে, তারই উপস্থাপনায় দেখতে পাচ্ছি কত বিচ্যুতি। এখন ভাবছি, প্রয়াত সেলিম আল দীনকে নিয়ে তিনি যে এত কথা লিখেছেন, তাতে না-জানি কত মোচড় আছে।

      মশিউল আলম
      < ‍small>mashiul.alam@gmail.com

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ — এপ্রিল ৮, ২০১০ @ ১০:০৬ অপরাহ্ন

      আশা করি, এইবার সবার পক্ষে বোঝা সম্ভব হবে বিষয়টা কী?

      ১. মশিউল আলমের ভাষ্য, ‘পরবর্তী বিশেষ সংখ্যা বেরবে জামাল নজরুল ইসলামকে নিয়ে।’ (এইটা আমি মশিউল আলমের মুখে শুনি নাই। মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পড়ি নাই বইলা সেখান থেকেও জানতে পারি নাই।)
      ২. মশিউল আলমের ভাষ্য, ‘বাসুদেব দাশগুপ্ত, মাহমুদুল হক, শহীদুল জহির ও সেলিম আল দীন—গত কয়েক বছরে প্রয়াত এই লেখকদের সম্পর্কে লেখা পেলে একটি সাধারণ সংখ্যায় সেগুলো প্রকাশ করতাম এমন ভাবনা ছিল, সে-কথাই বলেছিলাম মাহবুব মোর্শেদকে। কিন্তু সে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’

      ৩. মশিউল আলমের ভাষ্য, ‌’মাহবুব মোর্শেদ সেলিম আল দীনকে নিয়ে লিখেছেন নিজের তাগিদেই (তাঁর ভাষায় ‘স্বপ্নাদিষ্ট হয়া’), আমি ঘটনাক্রমে সে-কথা জেনে লেখাটি তাঁর কাছে চেয়ে নিয়েছিলাম।’
      অর্থাৎ যে সংখ্যার জন্য মশিউল আলম আমার লেখা নিয়া এক বছর বছর ফেলে রাখলেন সেই সংখ্যার উদ্যোগই তিনি নেন নাই। তাজ্জব! তাইলে প্রশ্ন, উনি লেখাটা নিছিলেন কেন?

      সার্বিক বিচারে মশিউল আলমের বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ শেষ পর্যন্ত যা দাড়াইলো:
      ১. উনি পত্রিকা প্রকাশের কোনো পরিকল্পনা বা উদ্যোগ ছাড়াই এক বছর ফাও ফাও আমার লেখা আটকায়া রাখছেন।
      ২. উনি ভাষাগত বা লেখার বিষয়গত কারণে লেখাটা ছাপতে পারেন নাই এই অভিযোগ তাইলে থাকে না। কারণ, উনি স্রেফ প্রতারণা করছেন। লেখা আটকায়া রাখাই ওনার মূল উদ্দেশ্য আছিল। ফলে, নানা সময়ে নানা কারণ দেখানোটা জাস্ট ওনার সময়ক্ষেপণ।
      ৩. এবং এই প্রতারণা সকলের সামনে উপস্থাপিত হওয়ায় উনি আমার লেখার বস্তুনিষ্টতা নিয়া প্রশ্ন তুলছেন। যা ধূর্ততার শামিল। অথচ গত এক বছরে উনি এই লেখার সম্পাদনা করছেন বইলা দাবি করছেন। সন্দেহ হইলে ওনার পক্ষে একবছর সময়ের মধ্যে পুরা লেখার সত্যাসত্য যাচাই করা সম্ভব আছিল। ফলে, এখন উনি যে প্রশ্ন তুলছেন সেইটা কোনোভাবে মাইনা নেওয়া যায় না।

      এই অহেতুক সময়ক্ষেপণ, ধূর্ততা ও প্রতারণার নিন্দা এখন আমি কেমনে জানাই?

      – মাহবুব মোর্শেদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মশিউল আলম — এপ্রিল ৯, ২০১০ @ ৩:৫৩ পূর্বাহ্ন

      মাহবুব মোর্শেদ, দেখতে পাচ্ছি, আমি তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছি ইত্যাদি অভিযোগ তুলছেন এখন। তিনি প্রথমে অভিযোগ করলেন, আমি তাঁর লেখাটি ছাপতে চাইনি তাঁর গুরুচণ্ডালি ভাষার কারণে। এখন বলছেন, কারণ সেটা নয়, আমি ইচ্ছা করেই নানা ছুতোয় কালক্ষেপণ করে লেখাটি এক বছর ধরে আটকে রেখেছিলাম। তিনি প্রথম অভিযোগটি থেকে সরে এসেছেন দেখে খানিক স্বস্তি বোধ হচ্ছে। কিন্তু ধূর্ততার সঙ্গে প্রতারণা করে তাঁর লেখাটি আটকে রেখে কালক্ষেপণ করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য—তাঁর এই পরিবর্তিত অভিযোগও আমার জন্য একটু পীড়াদায়ক। এহেন আচরণ তাঁর সঙ্গে আমার করার কোনো কারণ ছিল না। আমি তা করিও নি। কোনো লেখকের লেখা আটকে রেখে বা প্রকাশের পথ স্থগিত করে একজন সম্পাদক কীভাবে লাভবান হতে পারেন তা আমার বোধগম্য নয়। আমি যে তাঁর লেখাটি দীর্ঘদিন প্রকাশ করতে পারিনি সেজন্য সবিনয়ে লজ্জিত ছিলাম, এখনও লজ্জিতই আছি। বাস্তবিক, বৈষয়িক নানা কারণে আমার এই অপারগতা তাঁর কাছে গর্হিত অপরাধ বিবেচিত হলেও আমি তা সবিনয়ে স্বীকার করব। কিন্তু তিনি যদি সাব্যস্ত করে বসেন যে আমি ইচ্ছা করেই তাঁর লেখাটি আটকে রেখেছিলাম, এবং আটকে রাখাই ছিল আমার চূড়ান্ত লক্ষ্য, তবে তা হবে এক চূড়ান্ত ভ্রান্তি, এবং আমার প্রতি নির্দয় অবিচার।

      কিন্তু মানুষ সম্বন্ধে সাধারণভাবে আমি আশাবাদী: জগতে সবাই ভালোমানুষ, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি কারো মধ্যে কোনো বদলোকী দেখি নাই ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকেই আমার বদলোক ভাবতে ইচ্ছা করে না। এমনকি অন্যদের সাক্ষ্যে কারোর বদলোকীর খবর পাওয়ার পরেও আমি তাকে বদলোক বলে সাব্যস্ত করি না এই যুক্তিতে এবং এই শুভবাদে যে, আমি তো তার মধ্যে কোনো বদলোকী এখনও পর্যন্ত দেখতে পাইনি। শত্রুতার কবলে পড়ার আগেই আমি কাউকে শত্রু বলে ধরে নিই না; কারো কাছ থেকে আঘাত পাওয়ার আগেই তাকে আঘাত করি না। অনেক সময় আঘাত পাওয়ার পরেও প্রত্যাঘাত করি না। আঘাত-প্রত্যাঘাতে আমার স্বভাবসুলভ অনীহা।

      তাই, মাহবুব মোর্শেদ যখন অভিযোগ করছেন আমি আমি ধূর্ত, প্রতারক, তাঁর লেখাটি আটকে রাখাই ছিল আমার লক্ষ্য, তখনো আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে যে, তাঁর এই অভিযোগ খাঁটি নয়, এ এক ধরনের অগুরুতর অভিনয়: নিছক শোরগোল করা তাঁর লক্ষ্য। শোরগোল শব্দটা ভালো নয়, দুষ্টামিসূচক। বরং বলা যাক, আওয়াজ করা, জানান দেওয়া, এক্সিসটেন্স অ্যাসার্ট করা যাকে বলে, সেই রকম কিছুর ঝোঁক তাঁর মধ্যে আছে বলে আমার ধারণা হলো। তিনি যে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের পর অভিযোগ করে যাচ্ছেন (অবস্থান বদল করে করে), এও সম্ভবত তাঁর সেই আওয়াজ করার স্বভাবেরই অন্তর্গত (সম্ভবত)।

      এর জন্য আমি মাহবুব মোর্শেদকে দোষ দেব না। সক্রিয়মন সৃজনশীল-চিন্তাশীল-প্রকাশপ্রবণ মানুষের জন্য এ এক নিরূপায় দশা। কথা যাকে বলতেই হবে, সেসব কথা অন্যদের যাকে শোনাতেই হবে, অন্যদের মনোযোগ আকর্ষণের অদম্য স্পৃহা যাকে অস্থির করে রাখে, তাকে উপায় কিছু বের করতেই হবে। আমাদের এই তথাকথিত সাহিত্যজগতে যাকে বলে ‘পলেমিক্স’, সে-বস্তুটার বড়ই অভাব। লেখা নিয়ে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াগুলো ভালো লাগল, খুব ভালো লাগল, অথবা এ লেখা কিছুই হলো না—এই রকম কথাবার্তার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। মাহবুব মোর্শেদকে যতটুকু জানি, তিনি পলেমিক্স পছন্দ করেন। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য, লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা-বিশ্লেষণ-প্রতিবিশ্লেষণ ইত্যাদি কিছুই হয় না। সেলিম আল দীনের মতো জীবন্ত কিংবদন্তীতুল্য মানুষকে নিয়ে তিনি এত পরিশ্রম করে এত দীর্ঘ একটি লেখা লিখলেন (তরতাজা স্মৃতি নিয়ে একালে এই দেশে কে এমন একটি লেখা লিখেছেন গত দশ-বিশ বছরে?), তা নিয়ে সারবস্তুময় কোনো প্রতিক্রিয়া কি পাওয়া গেল? এ পর্যন্ত, আমার দুটি বাদে, যে-সব প্রতিক্রিয়া বিডিনিউজ আর্টসে প্রকাশিত হয়েছে, এমন কি আছে সেগুলিতে, যা নিয়ে কোনো রকম প্রতি-প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে, পলেমিক্স শুরু করতে পারেন লেখক মাহবুব মোর্শেদ? না। সেরকম কিছু ঘটে নাই। কিন্তু মাহবুব মোর্শেদ সপ্রতিভ লেখক, কথা বলতে, ঝগড়া করতে (ইতিবাচক অর্থে, আরগু করতে) পছন্দ করেন তিনি । যে-কোনো সুযোগে/সুবাদে/অজুহাতে তিনি সেই কর্মে অবতীর্ণ হতে সদা-উদ্যত। এই ক্ষেত্রে আমার প্রথম প্রতিক্রিয়াটি (৫ এপিল লেখা, ঠিক প্রতিক্রিয়া নয়, এক ধরনের ব্যাখ্যা বা ক্ল্যারিফিকেশন) তিনি পেয়ে গেছেন সক্রিয়তাচর্চার এক মোক্ষম সুযোগ হিসেবে। কিন্তু তা কোনো গঠনমূলক দিকে এগোল না, প্রসঙ্গের কারণেই সে-সুযোগ দেখা দেয় নি। সুতরাং আমি যা লিখেছি, তাকে কন্ট্রাডিক্ট করার মধ্যে দিয়েই মাহবুব মোর্শেদ শুরু করলেন তাঁর ‘যুদ্ধযাত্রা’। কিন্তু এ নিষ্ফল, এ থেকে কোনো ফলই ফলবে না। আমাকে ধূর্ত, প্রতারক বলেও কোনো লাভ হবে না। এইসব নিষ্ফল অভিনয় আমাদের সৃজনশীল-বুদ্ধিবৃত্তির দারিদ্র্যের সীমারেখাকে আরো প্রকট করে তুলবে।

      সেলিম আল দীনকে যাঁরা কাছে থেকে দেখেছেন, তাঁর সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁর লেখা পড়েছেন, তাঁকে নিয়ে ভেবেছেন, তাঁরা যদি ‘গুরু ও চণ্ডাল’ শিরোনামে বিডিনিউজ আর্টসে প্রকাশিত মাহবুব মোর্শেদের লেখাটি নিয়ে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করেন, মাহবুব মোর্শেদের বর্ণিত ঘটনাবলি ও বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতার মিল-অমিল (সম্ভাব্য) যাচাই করেন, ঘটনাবলি অতিক্রম করে সেলিম আল দীনের শিল্পদৃষ্টি, জীবনবোধ, তাঁর লেখালেখি ও জীবনযাপনের নানা প্রসঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন, এবং তা থেকে মাহবুব মোর্শেদের সঙ্গে যদি কারোর পলেমিক্স শুরু হয়, তাহলে সেটাই হতে পারে বেশি উপভোগ্য বিষয়। আমি মাহবুব মোর্শেদের লেখাটি প্রকাশ করতে চেয়েছি, আটকে রেখে কালক্ষেপণ করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য—এগুলো এখানে অতি তুচ্ছ, নগণ্য, অপ্রয়োজনীয়, ফালতু বিষয়।

      মাহবুব মোর্শেদ লিখেছেন আমি তাঁর লেখাটির বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি। প্রশ্নটি উঠল সম্ভবত আমার সঙ্গে তাঁর আলাপের বিবরণী পড়ার পর। আমি দেখলাম, আমার সঙ্গে তাঁর যেসব কথাবার্তা হয়েছে, সেগুলির কিছু কিছু তিনি উপস্থাপন করেছেন একটু মোচড় দিয়ে। আমি যা বলি নাই, মিন করি নাই, তিনি তাই ধরে নিয়েছেন। আমাকে অকারণে দোষ দিয়েছেন। এইসব দেখেশুনে আমার মনে হলো আমার সঙ্গে কদিনের ইন্টার‌্যাকশানের বিবরণেই তিনি যে টুইস্ট এনেছেন, সেলিম আল দীনকে নিয়ে এত দীর্ঘ লেখাটিতে কতই না টুইস্ট (মোচড়) তিনি মেরেছেন। এটাকে যদি তিনি মনে করেন তাঁর লেখাটির বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা, তবে তাতে আমার আপত্তি নাই। এই বিবরণী পড়ার আগ পর্যন্ত আমি তার এহেন মোচড়-লিপ্সা সম্পর্কে অবগত ছিলাম না।

      শেষে, একটু পরিষ্কার করার জন্য বলি, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার সাধারণ সংখ্যাগুলো বের হতো প্রতি তিন মাস পর পর, সেগুলি বিষয়ভিত্তিক নয়। বিশেষ সংখ্যাগুলি প্রকাশ করা হয় কয়েক বছর পর পর, তারও কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। একটি পরিকল্পিত বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের আগে একাধিক সাধারণ সংখ্যা প্রকাশিত হতে পারে, কারণ একেকটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করতে কয়েক বছর লেগে যায়। জামাল নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশের পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মীজানুর রহমান নিজেই, কয়েকটি লেখাও তিনি সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। কিন্তু সংখ্যাটি প্রকাশের আগে স্বাভাবিক নিয়মেই পত্রিকাটির একাধিক সাধারণ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। আমার পরিকল্পনা ছিল জামাল নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশিত হওয়ার আগে একটি সাধারণ সংখ্যা প্রকাশ করব। সেটার জন্য নানা ধরনের লেখা সংগ্রহ করছিলাম। সেই ধারাতেই সৌভাগ্যক্রমে মাহবুব মোর্শেদের লেখাটি পেয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমার অকর্মণ্যতায় এবং কিছু বৈষয়িক কারণে সে-লেখাটি এক বছর আটকে রেখেও প্রকাশ করার সুযোগ পাই নি। কিন্তু জামাল নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশ করা প্রয়াত মীজানুর রহমানের সম্মানেই এক দুর্ভর দায় হয়ে উঠেছে, যা মেটানো আশু প্রয়োজন। আমি মাহবুব মোর্শেদকে সবিনয়ে বলেছিলাম, আপনি কি আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে পারেন? তিনি অপারগতা প্রকাশ করায় আমি তাঁকে তাঁর লেখাটি ফেরত পাঠাতে বাধ্য হয়েছি, দুঃখপ্রকাশসহই। তাঁর লেখাটি অহেতু আটকে রাখার কোনো দুরভিসন্ধি আমার ছিল না। তিনি বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে সপ্রতিভ লেখকদের একজন: বুদ্ধিমান, পর্যবেক্ষণশীল, বিশ্লেষণী, সংস্কারমুক্ত। এবং তিনি এতই চঞ্চল, মুখর ও পলেমিক্স-লিপ্সু যে, তাঁর লেখালেখি নিয়ে যদি সমসাময়িক লেখক-পাঠকদের মধ্যে কাজের কথা না হয়, তাহলে তিনি অকাজের কথা নিয়ে আমার মতো অভাজনদের উপর মওকামতো চড়াও হবেন, এতে কোনোই সন্দেহ নেই।

      আমার সঙ্গে এইসব তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঝগড়া কোনো কাজের কথা নয়। এসবে প্রবৃত্ত না হয়ে শ্রদ্ধেয় মাহবুব মোর্শেদ যদি একটি নতুন লেখায় উদযোগী হন, তবে পাঠকমহলের কিছু লাভ হয়, বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারও কিছু সমদ্ধ হতে পারে।

      মাহবুব মোর্শেদের জন্য শুভকামনা।

      মশিউল আলম
      ঢাকা, ৯ এপ্রিল ২০১০

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sayeed Jubary — এপ্রিল ১০, ২০১০ @ ৯:৪৬ পূর্বাহ্ন

      এই লেখা সেলিম আল দীনকে তার শিষ্যতুল্য লেখকদের গাইড বই কিছিমের স্মৃতিকথা হইতে উদ্ধার করছে।

      – Sayeed Jubary

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ — এপ্রিল ১০, ২০১০ @ ৮:৪০ অপরাহ্ন

      মশিউল আলম সমীপেষু,

      নিজের বক্তব্য আবার দিতে চাইতেছি না। আমার ধারণা, আপনার বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ ক্লিয়ার করতে পারছি। অভিযোগ বদলাইছে আপনার ভাষ্য অনুযায়ী। আমি চাই নাই, কিন্তু আপনার এইখানে দেওয়া বক্তব্যের পর আপনার বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ হিসাবে অহেতুক সময়ক্ষেপণ, প্রতারণা ও ধূর্ততার অভিযোগ করছি। অভিযোগে পরিবর্তন আপনার কারণে আসছে।

      আপনি যে শেষ পর্যন্ত যুক্তির পথ ছাইড়া আমার স্বভাব অনুসন্ধান করছেন এবং মনোবিশ্লেষণের মাধ্যমে আমার আর্গুমেন্টের সমস্যা দেখাইতে চাইছেন এইটায় আমি খুব মজা পাইছি।

      আমি খুবই সিরিয়াসলি দেখতে চাইছিলাম, কেন আপনি আমার লেখাটা প্রকাশ করতে ব্যর্থ হইলেন। লেখক হিসাবে টিকে থাকার স্বার্থে এই সত্যটা জানা থাকা দরকার বইলাই। এইখানে টুইস্ট, ফাইজলামি, উইট কিছু করতে চাই নাই। তুচ্ছও ভাবি নাই এই তর্কটারে।

      আপনার সঙ্গে কথা বলার ফল ভাল হইলো। আমার সঙ্গে অন্যরাও অনুমান করতে পারবেন কেন আমার লেখা প্রকাশ হইলো না।

      আপনাকেও শুভেচ্ছা।

      – মাহবুব মোর্শেদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন iffat arefin — এপ্রিল ১১, ২০১০ @ ৬:১৩ অপরাহ্ন

      সেলিম আল দীনের একটি বিশেষ গুণ হলো তাঁর আশেপাশের প্রত্যেকটা মানুষের সাথে সম্পর্কটা বিশেষ হয়ে থাকতো। প্রত্যেকটা সম্পর্কই ছিলো বিশেষ–সেই বিশেষ সম্পর্ক নিয়ে লিখতে গিয়ে যদি নানা মোচড় এসেই যায় ক্ষতি কী? সেটি নতুন মাত্রা পায় হয়তো। নূর, ভেতরের অনেক লাইন আমিও মানতে পারিনি, কিন্তু সুখপাঠ্য হওয়ায় তা উপেক্ষা করে গেলাম। তবে তার নাটক প্রকাশের জন্য উদগ্রীব থাকতেন ওটা সম্পূর্ণ রূপে মিথ্যা। কারণ এসময়ের অনেক পত্রিকার মানুষকে দেখেছি বাসায় এসে বসে থাকতে। আমি নিজেই ড্রইং রুমে এসে বলেছি বাসায় নেই, কারণ তিনি বলতেন ‘লেখা দেবো না, গিয়ে বল বাসায় নেই ঢাকায়।’ আমি হয়ত বলার সাথে সাথে দেখতাম শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন! এবং প্রায়শঃ ফিরিয়ে দিতেন সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের।

      মাঝে মাঝে পরিবারের সদস্যগণ অস্থির থাকতো তাঁর পুত্রকন্যাদের ভরভরন্তিতে। তাঁর চলে যাওয়ার শোক যখন জাগে তখনই আমরা হেসে ফেলি… আশ্চর্য এক মানুষ! কীভাবে যে প্রস্থানের পরও এত প্রকট ভাবে বিরাজ করে একটা মানুষ!

      – iffat arefin

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন উম্মে মুসলিমা — এপ্রিল ১৩, ২০১০ @ ৪:২৮ অপরাহ্ন

      প্রবন্ধটি একটি পক্ষপাতমুক্ত বিশ্লেষণ। আমরা যারা সেলিম আল দীনকে কাছ থেকে দেখিনি তাদের কাছে অসাধারণ প্রতিভার বাইরের একজন মানুষ (ফেরেশতা নন)কে চেনা সহজ হয়। তাই ‘গুরু ও চণ্ডাল’ নামকরণ কেবল ভাষার মিশ্রণকেই নির্দেশ করে না। প্রবন্ধের এক জায়গায় ‘গবাক্ষ’-এর ব্যাখ্যা আছে। আসলে ওটা ‘গোষ্পদ’-এর ব্যাখ্যা । গবাক্ষর অর্থ জানালা। ধন্যবাদ প্রবন্ধকারকে।

      – উম্মে মুসলিমা

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com