বহুবাচনিক দ্রষ্টা নারীগণের বাচ্য হয়ে ওঠা

এস এম রেজাউল করিম | ৩১ জানুয়ারি ২০১০ ৯:২৮ পূর্বাহ্ন

desire_a.jpg…….
ডিজায়ার, ক্যানভাসে মিশ্র মাধ্যম, ১৫৩ x ১২২ সে. মি., ২০০৯
……..
আঁকিয়ে’র সাথে অন্ধের সম্পর্ক কেমন? অন্ধগণ নাজিয়া আন্দালীব প্রিমা’র আঁকা ছবি দ্যাখে না, তিনি তাই অন্ধদের বহিষ্কার করেছেন তাঁর ক্যানভাস থেকে, প্রিমা’র ছবির সকল নারী চোখওয়ালা, আবার অপলক; অন্ধগণ অপলক থাকতে পারে, পলক ফেলতেও পারে, ঘটনা হিসাবে অ/পলকের জন্য চোখ/দৃষ্টি থাকা আবশ্যিক না। চোখ থাকা মানেই দৃষ্টি থাকা নয়; কিন্তু দৃষ্টি থাকা মানে দৃশ্যের প্রতি সংবেদন থাকা, অন্ধের এই সংবেদন নাই। প্রিমা’র ক্যানভাসের চোখগুলা সংবেদনশীল, মানে দৃষ্টিসম্পন্ন, মানে নারী বলতে প্রিমা সংবেদনশীল দৃষ্টিসম্পন্ন নারী বোঝেন। প্রীমা’র নারীগণ দেখছেন, প্রতিক্রিয়া আছে তাদের, প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান তাদের চোখে, শরীরে। প্রিমা’র প্রকল্প জটিল, তিনি প্রতিক্রিয়া আঁকেন নারীর শরীরে। পেইন্টিংয়ের ইতিহাসে নারীর উপস্থিতি অগুণতি, তবে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই নারী দ্রষ্টব্য, দেখবার; সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণও নারীকে দেখবার মতো হয়ে উঠবার নির্দেশনা দেয়। বিপরীতে প্রিমা’র নারীগণ প্রধানতঃ দ্রষ্টা। নারীর দ্রষ্টারূপ অভ্যস্ততার ব্যত্যয়, প্রিমা’র নারীগণ চোখ নামায় না, দেখতে থাকে, নারীর দেখতে থাকবার ঘটনা অস্বস্তির। নারীর চোখ নামিয়ে নেওয়াই সমাজের বিধি, ফলতঃ দেখতে থাকাই দ্রোহ।
—————————————————————–
বেশি বেশি বোরখা বিক্রি উন্নয়ন ডিসকোর্সের জন্য তাই আনন্দসংবাদ, বোরখা একটা পোশাক হিসাবে লাইফস্টাইলের অংশ করতে পারা উন্নয়ন প্রকল্পের অন্য অংশ। উন্নয়নবাদের শক্তিমত্তা টের পাওয়া যায় শিল্পীর (প্রীমা’র) মস্তিস্কে বোরখার অবস্থিতি থেকে, নারীর বিবিধতা নির্মাণে স্মারক হিসাবে বোরখা ব্যবহার করবার মাধ্যমে প্রীমা তাঁকে উন্নয়ন ডিসকোর্সের দেয়া দায়িত্ব সম্পাদন করেন, দর্শকের মনোজগতে বোরখা স্থাপন করবার মধ্য দিয়ে।
—————————————————————-
prof_preema.jpg…….
নাজিয়া আন্দালীব প্রিমা (জন্ম. ১৯৭৪)
…….
কিন্তু প্রীমা’র নারীভাবনা দ্রোহী ভাবব কি?; প্রিমা’র ভাবনার একটা বড় অংশে নারী শুধু দ্যাখেই না, উপরন্তু নিজেকে দেখাতে অস্বীকার করে, নিজেকে দেখানো যেইখানে অধিপতি রীতি অবগুন্ঠন সেইখানে আত্মরক্ষার উপায়, অবগুন্ঠন আবার নিষেধের বেড়া হতে পারে, প্রিমা’র নারীগণের পর্দাসকল সেই নারীগণের স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া নাকি তাদের জন্য অনতিক্রম্য সাংস্কৃতিক সীমানা নাকি স্রেফ আরেকটা পোশাক? এই প্রশ্ন করবার জন্য অন্ততঃ একটা অনুমান করতে হয় যে, এর একবাচনিক উত্তর আছে। উত্তর একটা হওয়া সম্ভব, আবার একটা হবার সম্ভাব্যতা একাধিক হবার সম্ভাবনা নাকচ করে না। কিন্তু একেশ্বরবাদ ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক একবাদ যৌথভাবে (অথবা পরিণতির দিক থেকে উভয়ে হয়তো অভিন্ন) একবাচনিক উত্তর পেতে চায়, একটা উত্তর দেবার জন্য চাপ দিতে থাকে। আধুনিক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের লক্ষ্যও ‘এক’, ফলে প্রিমাও একজন, পর্বে পর্বে বা ক্যানভাস থেকে ক্যানভাসে প্রিমা পাল্টে যেতে পারেন না, কপিরাইট আইনেও প্রিমা একজনই, নইলে আগের ছবির মালিকানা দাবি করবে কী করে পরবর্তী কোনো প্রিমা, পরিবারে কি প্রিমা একাধিক হতে পারেন? না। ‘এক’-এর এই সর্বব্যাপ্তি ঐ প্রশ্ননির্মাতা স্বতঃসিদ্ধ অনুমানকে আড়ালে রাখে, প্রিমাকেও বলতে থাকে ‘এক’ হতে, ‘এক’ উৎপাদন করে যেতে। প্রিমা’র ‘নারী’ উপলব্ধির বিবিধতা তাঁকে গররাজি করে দেয়। প্রিমা’র নারীভাবনা প্রথমতঃ অধিপতি সংস্কৃতিনির্ধারিত ‘নারী’ হতে গররাজি, অতঃপর বিবিধ।

comparative-life.jpg
কমপারেটিভ লাইফ, ক্যানভাসে মিশ্র মাধ্যম, ১২২ x ১৫৩ সে. মি., ২০০৯

বিবিধ নারীর উপস্থিতি দিয়ে প্রিমা বিবিধতাকে স্বীকৃতি দেন, কিন্তু এই বিবিধ নারীকে প্রিমা কোথা থেকে সংগ্রহ করেন? নারী অপলক, দেখতেছে, শরীরের ভাষায় কামনা প্রকাশিত, এই নারীকে প্রীমা ঢেকে কেন দেন? নারী নির্মাণে প্রীমা’র বোরখা প্রয়োজন, নারী বুঝবার জন্য প্রিমা পর্দা প্রাসঙ্গিক ভাবেন। মুসলিম নারী বুঝবার জন্য আধুনিক উন্নয়ন ডিসকোর্সেরও বোরখা দরকার, মুসলিম নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে ব্যবসা করবার জন্য উন্নয়ন ডিসকোর্সের প্রয়োজনীয় প্রতিপক্ষ বোরখা, বোরখা মুসলিম সমাজে সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমের অনুপ্রবেশ ও হস্তক্ষেপ বৈধতা লাভের উপায় বহুদিন যাবত, বাংলাদেশে (সারা বিশ্বের মুসলিম সমাজেই সম্ভবতঃ) এনজিও গুলির প্রাপ্ত বৈদেশিক অর্থের একটা বড় অংশ আসে মুসলিম নারীর বোরখা খুলবার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে, যেন সকল বোরখাবিহীন নারী এনজিওগুলোর সাফল্যের (বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হওয়ায় সাফল্য অধিকতর পরিস্ফূট হয়) দৃশ্যমান কেসস্টাডি, এই কেসস্টাডিগুলো লিপিবদ্ধ করবার জন্য নতুন প্রকল্পের সম্ভাবনা। মুসলিম নারী বুঝবার জন্য বোরখা যখন আবশ্যিক তখন বোরখাবিহীন প্রতি নারী ক্ষমতায়িত এবং তাদের জন্য বৈধ প্রশ্ন, “বোরখা কবে, কীভাবে ছাড়লেন?” বোরখা তাই উন্নয়নবাদের দীর্ঘজীবনের সম্ভাবনা। বেশি বেশি বোরখা বিক্রি উন্নয়ন ডিসকোর্সের জন্য তাই আনন্দসংবাদ, বোরখা একটা পোশাক হিসাবে লাইফস্টাইলের অংশ করতে পারা উন্নয়ন প্রকল্পের অন্য অংশ। উন্নয়নবাদের শক্তিমত্তা টের পাওয়া যায় শিল্পীর (প্রীমা’র) মস্তিস্কে বোরখার অবস্থিতি থেকে, নারীর বিবিধতা নির্মাণে স্মারক হিসাবে বোরখা ব্যবহার করবার মাধ্যমে প্রীমা তাঁকে উন্নয়ন ডিসকোর্সের দেয়া দায়িত্ব সম্পাদন করেন, দর্শকের মনোজগতে বোরখা স্থাপন করবার মধ্য দিয়ে।

বিবিধতা উদারনৈতিক নারীবাদীগণ পছন্দ করেন না, কারণ, উদারনীতির ভারী দল দরকার, উদারনীতি শক্তির মহড়া, ভিন্নতা স্থগিত রেখে মঞ্চে আরোহণেই কেবল শক্তি বাড়তে পারে। বিবিধতা কোনো এক আধিপত্যের বিপরীতে লড়াইয়ের মঞ্চে ওঠা অধঃস্তন কোনো সমষ্টির অন্তর্গত ক্ষমতাসম্পর্ক প্রকাশ করে দেয়। কনজ্যুমারিজম আবার বিবিধতাকে উদযাপন করে, তাহলে উদারনীতি আর কনজ্যুমারিজম সাংঘর্ষিক? প্রিমা তাহলে বিবিধতা কাকে বলছেন? কনজ্যুমারিজমের আগ্রহ-বিবিধতার উপলব্ধি যাতে পোশাকি বা ভোগের স্বাধীনতার সাথে সমীকৃত করা যায়, ততক্ষণ বিবিধতা শংকা তৈরি করে না। উদারনীতি এইখানে কনজ্যুমারিজমের সাথে কোলাকুলি করে। প্রিমা এই কোলাকুলির ময়দান।

women_and_her_dream.jpg…….
উওম্যান অ্যান্ড হার ড্রিম; ক্যানভাসে তেল; ৫০ x ৪০ সে. মি., ২০০৯
……..
এবাদে প্রদর্শনী দেখে আমার গুরুত্বপূর্ণ ঠেকেছে, প্রিমা তাঁর নারী নির্মাণে মাতৃত্ব প্রসঙ্গ মনে করেন না, ‘ম্যাডোনা এন্ড চাইল্ড’-এর সর্বব্যাপ্ত মাতৃত্ব অগ্রাহ্য করে প্রিমা’র নারী স্বপ্নে নিজেকে দ্যাখে বর্ধিত দ্বিত্বে, নারী এবং স্বপ্নের দ্বৈত সে বা তারা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে, এই তাকিয়ে থাকা, এই দেখাদেখি অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করে দেয় তাবৎ পৃথিবী। প্রিমা’র নারী সিদ্ধান্ত নেয় প্রকৃতি হবার, Monet-এর পুকুরে ডুবে ভাসে-দিনের প্রহরে প্রহরে রঙের বদলে যাওয়া দ্যাখে, নিজেও বদলে বদলে যায় হয়তো, মহাজগতের এখানে ওখানে তাকায়, আড়াল থেকে অস্বস্তি জাগানিয়া দৃষ্টিতে দ্যাখে, প্রিমা’র “আড়াল” রাজনৈতিকভাবে উন্নয়নমনস্কতার স্মারক তবু ঐ অস্বস্তিটা স্বীকার্য। নারী উপলব্ধি করে, ক্ষেপে যায়, চোখে রক্ত উঠে পড়ে কামনায়, অতঃপর সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, স্বপ্নে নিজেকে দেখবার, নিজেকে বা নিজেদের দেখতে দেখতে আর সব বাতিল করে দেয়-তাঁর ছবির দর্শকের মনে এমন ভাবনা তৈরিতে প্রিমা’র নারীভাবনা প্রয়োজনীয় দৃশ্যবাস্তবতা নির্মাণ করতে থাকে।

(ঢাকার বেঙ্গল গ্যালারি অব্‌ ফাইন আর্টস্-এ নাজিয়া আন্দালীব প্রিমার প্রদর্শনী ‘অপলক নারী’ পরিবেশিত হয় ১৫ থেকে ২৬ জানুয়ারি ২০১০)

rezaulkarim.manu@gmail.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com