বোর্হেসের প্রতি চিঠি

সুজান সন্টাগ

| ২৬ জানুয়ারি ২০১০ ১:৩১ অপরাহ্ন

borges2.jpg
হোর্হে লুইস বোর্হেস (২৪/৮/১৮৯৯ – ১৪/৬/১৯৮৬)

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান খান

[১৯৯৬ সালে এ চিঠি মার্কিন সাহিত্য সমালোচক এবং ঔপন্যাসিক সুজান সন্টাগ লিখেছিলেন প্রায় এক যুগ আগে প্রয়াত লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেসকে উদ্দেশ্য করে। চিঠিটি সন্টাগের বই Where the Stress Falls-এ সংকলিত হয়েছে। অনুবাদক লেখাটি অনুবাদ করেছেন ক্লাউদিয়া মার্তিনেসের স্প্যানিশ অনুবাদ থেকে।—বি. স.]

borges_care21.jpg

১৩ জুন ১৯৯৬ নিউ ইয়র্ক

প্রিয় বোর্হেস,

যদিও আপনার সাহিত্য সব সময়ই চিরন্তরের অন্তর্ভুক্ত তবুও আপনাকে একটা চিঠি লেখা মনে হয় না খুব একটা বিস্ময়কর হবে। (বোর্হেস, দশ বছর হয়ে গেছে!) যদি কোনো সমসাময়িক সাহিত্যিককে অমরতার অভিমুখী মনে হয়, সে হচ্ছেন আপনি। যদিও আপনি ছিলেন আপনার সময় এবং সংস্কৃতির এক বিশাল সৃষ্টি, তারপরও আপনি জানতেন কীভাবে আপনার সময় এবং সংস্কৃতিকে অতিক্রম করতে হয় আর এর ফলাফল ছিলো জাদুকরী। আপনার মনোযোগের ব্যাপ্তি এবং উদারতাই হচ্ছে এর বিশেষ কারণ। লেখকদের মধ্যে আপনি ছিলেন অপেক্ষাকৃত কম স্বকেন্দ্রিক এবং স্বচ্ছ, একই ভাবে সবচেয়ে শৈল্পিক। আত্মার প্রাকৃতিক বিশুদ্ধতাও এর এক বিশেষ কারণ। আমাদের মধ্যে আপনি বেশ দীর্ঘ সময় বেঁচে ছিলেন। ধ্বংসের এবং উদাসীনতার চর্চাকে আপনি এমন এক পূর্ণতায় নিয়ে গেছেন যা আপনাকে অন্য যুগের মানসিক পরিব্রাজকে রূপান্তরিত করেছে। আপনার কালচেতনা ছিলো অন্যদের চেয়ে আলাদা; অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্পর্কে সাধারণ ধারণাগুলো আপনার কাছে তুচ্ছ মনে হয়েছিলো। আপনি বলতে ভালোবাসতেন এই কথা যে প্রতিটি মুহূর্তের মধ্যে অতীত ও ভবিষ্যৎ হাজির রয়েছে। এই সূত্রে আপনি (যদ্দুর মনে পরে) কবি ব্রাউনিং-এর উদ্বৃতি দিয়ে বলতেন, “বর্তমানে ঝাঁপিয়ে পড়ে অতীত ভবিষ্যৎ।” অন্য লেখকদের ধারণাসমূহে নিজের পছন্দকে খুঁজে পাওয়া ছিলো আপনার বিনম্র স্বভাবেরই অংশ।

এই বিনম্রতা ছিলো আপনার উপস্থিতির নিশ্চয়তা। আপনি ছিলেন নতুন নতুন আনন্দের আবিষ্কারক।

নিরাশাবোধ এত গভীর আর স্থিত ছিলো যে তার জন্যে ক্রোধান্বিত হওয়ার দরকার হতো না আপনার। বরং আপনাকে হতে হয়েছে সৃষ্টিশীল… আর আপনি ছিলেন, সর্বোপরি সৃষ্টিশীল। সত্তার যে স্থিতি আর অনন্যতা আপনি খুঁজে পেয়েছিলেন তা আমার কাছে দৃষ্টান্ত স্বরূপ। কোথাও আপনি বলেছিলেন, একজন লেখকের জীবনে যা কিছু ঘটে তা-ই উপাদান– এরকমই ভাবা উচিত একজন লেখকের। (আপনার অন্ধত্বের কথাই বলছি।)

sontag21.jpg
……
সুজান সন্টাগ (১৬/১/১৯৩৩ – ২৮/১২/২০০৪)
……..
অন্য লেখকদের কাছে আপনি ছিলেন মহত্তম উপাদান। ১৯৮২ সালে অর্থাৎ, আপনার মৃত্যুর চার বছর আগে (বোর্হেস, দশ বছর হয়ে গেছে!) এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলাম; বোর্হেস ছাড়া অন্য কোনো জীবিত লেখকই আমার কাছে আজ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। অনেকেই বলেন তিনি জীবিতদের মধ্যে মহত্তম… খুব অল্প লেখকই তাঁর কাছ থেকে শিখেছেন বা তাঁর অনুকরণ করেছেন। এখনও পর্যন্ত তাই চলছে। আমরা এখনও আপনার কাছ থেকে শিখে যাচ্ছি। এখনও আমরা আপনার অনুকরণ করছি। আপনি মানুষকে উপহার দিয়েছেন কল্পনা করার নতুন সব ধরন, একই সময় আপনি অতীতের কাছে, সর্বোপরি সাহিত্যের কাছে আমাদের ঋণের কথা জানিয়েছেন। কখনো কখনো আপনি বলেছেন আমরা যা এবং আমরা যা-ছিলাম তার জন্য কার্যত সাহিত্যের কাছে আমরা ঋণী। বই যদি হারিয়ে যায় তাহলে ইতিহাস, মানবসত্তাও হারিয়ে যাবে। আমি নিশ্চিত আপনি ঠিকই বলেছেন। বই আমাদের স্বপ্ন আর স্মৃতির কেবল খামখেয়ালি যোগফল নয়, বরং স্বাতিক্রমণের এক নমুনাও বটে। কেউ কেউ পলায়নের উপায় বলে মনে করেন: দৈনন্দিন বাস্তব জগত থেকে এক কল্পনায়। বইয়ের জগতে পলায়ন। বই তো আসলে তারও চেয়ে বেশি কিছু।

দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে বইয়ের নিয়তি কখনোই এতটা অবক্ষয়ের মুখোমুখি হয়নি। বই আর বইয়ের অভিঘাতকে অস্বীকার করার সম্ভাব্য পরিস্থিতি আজ বিনাশের সমকালীন পরিকল্পনায় প্রতিমুহূর্তে আরও বেশি নিমজ্জিত। এখন আর কেউ বিছানায় শুয়ে কিংবা পাঠাগারের এক নির্জন কোণে আলোর নিচে বসে ধীরে ধীরে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছেন না। অচিরেই, আমাদেরকে একথা জানানো হবে যে কাঙ্ক্ষিত যেকোনো রচনাকে (text) বইয়ের পর্দায় ডাক দিতে পারি আমরা, সম্ভব তার চেহারা বদলে দেয়া, সম্ভব প্রশ্ন তৈরি করা, সম্ভব এই রচনার সাথে ইন্টার‌্যাক্ট করা। রচনায় রূপান্তরিত হওয়া বইয়ের সাথে উদ্বৃত্তের মানদণ্ডে আমরা যখন এর সাথে ইন্টার‌্যাক্ট করবো, তখন লিখিত শব্দগুলো প্রচারণার দ্বারা স্থিরকৃত আমাদের দৃশ্যমান বাস্তবতার ঠিক অন্য এক চেহারায় রূপান্তরিত হয়ে যাবে। গৌরবময় এই ভবিষ্যৎই তৈরি হচ্ছে, আর আমাদের কাছে শপথ করে বলছে এটা নাকি আরও বেশি গণতান্ত্রিক। অবশ্যই, আপনি এবং আমি জানি অন্তর্দর্শন… এবং বইয়ের মৃত্য ছাড়া এর আর কোনো অর্থ নেই। আজকাল আর বহ্ন্যুৎসবের দরকার হয় না। বর্বরদের আর বই পোড়ানোর দরকার নেই। পাঠাগারেই এখন বাঘ। প্রিয় বোর্হেস, এটা জানুন যে অভিযোগ করে আমি আনন্দ পাই না। কিন্তু বলুন, বই আর পাঠের নিয়তি সম্পর্কে এই অভিযোগগুলো আপনাকে ছাড়া আর কাকে এতটা ভালোভাবে বলা যায়? (বোর্হেস, দশ বছর হয়ে গেছে!) আপনাকে যা বলতে চাই তা হলো আমরা আপনার অভাব বোধ করি। আমি আপনার অভাব বোধ করি। আপনি এখনও আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

আমরা প্রবেশ করছি অদ্ভুত এক যুগে, একবিংশ শতকে। এই শতক আমাদের আত্মাকে অচেনা এক পরীক্ষার মধ্যে ফেলবে। তবে কথা দিচ্ছি, আমাদের কেউ কেউ বিশাল পাঠাগারকে ত্যাগ করবো না। আর আপনি হয়ে থাকবেন আমাদের আদর্শ এবং নায়ক।

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — জানুয়ারি ২৬, ২০১০ @ ৩:১০ অপরাহ্ন

      অসাধারণ একটা লেখা পড়বার আনন্দ পেলাম। বার বার পড়ার মতো লেখা। দারুণ। আমি আপ্লুত।

      “যদিও আপনি ছিলেন আপনার সময় এবং সংস্কৃতির এক বিশাল সৃষ্টি, তারপরও আপনি জানতেন কীভাবে আপনার সময় এবং সংস্কৃতিকে অতিক্রম করতে হয় আর এর ফলাফল ছিলো জাদুকরী। আপনার মনোযোগের ব্যাপ্তি এবং উদারতাই হচ্ছে এর বিশেষ কারণ। লেখকদের মধ্যে আপনি ছিলেন অপেক্ষাকৃত কম স্বকেন্দ্রিক এবং স্বচ্ছ, একই ভাবে সবচেয়ে শৈল্পিক। আত্মার প্রাকৃতিক বিশুদ্ধতাও এর এক বিশেষ কারণ।”

      আমাদের দেশে বিশুদ্ধ আত্মার অধিকারী লেখক ক’জন আছেন খুব জানতে ইচ্ছে করছে। আমার উদ্ধৃত প্যারাটি অনুধাবন করা প্রত্যেক লেখকের জন্যই জরুরি মনে করি।

      – শিমুল সালাহ্উদ্দিন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কামরুজ্জমান জাহাঙ্গীর — জানুয়ারি ২৬, ২০১০ @ ৭:৪৬ অপরাহ্ন

      কী চমৎকার সব কথকতা, থোকা থোকা পুষ্পগুচ্ছের মতো তা বুকের একেবারে গভীরের কোথায় যেন লেগে যাচ্ছে। এ এক আশ্চর্য-পরশ লেখাটির ভিতর আছে। নিজেকে কী যে উচ্ছ্বাসমুখরতায় পেলাম। সুজান সন্টাগ আর আনিসুজ্জামান খানকে অনেক অনেক ভালোবাসা।

      – কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন M R L — জানুয়ারি ২৭, ২০১০ @ ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন

      সাবলীল অনুবাদ, মনে হয় চিঠিটা বাংলা ভাষাতেই লেখা হয়েছিল। আরো পড়তে চাই!

      – M R L

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন sajib dey — সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৪ @ ১২:৩৩ পূর্বাহ্ন

      লেখাটা বেশি সরল হয়ে গেছে তার সম্পর্কে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com