সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, যখন আমি… (কিস্তি ৯)

চঞ্চল আশরাফ | ২৭ জানুয়ারি ২০১০ ৩:৫০ অপরাহ্ন

hazad11b.jpg
সন্তানদের সঙ্গে সমুদ্রে, ১৯৯৬

hazad11c.jpg
থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে, জন্মদিনে; ২০০৪

কিস্তি:

(কিস্তি ৮-এর পরে)

শাহরিয়ার ভাই কেন ওইরকম আচরণ করেছিলেন, আমি বলবো না যে এটা আমার বোধগম্য নয়। একটি হাস্যকর সত্যও এর কারণ হিসেবে জড়িয়ে গিয়েছিল। সেটা এখন বলতে চাই না। তো, নতুনধারার উদ্বোধনী সংখ্যার জন্যে লেখা চাইতে ও সংগ্রহ করতে গিয়ে মমতাজউদদীন আহমদ, বদরুদ্দীন উমর প্রমুখের সূত্রে বেদনাদায়ক ও মজার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। সে-সব উল্লেখের জায়গাও এটি নয়। বরং এখন মনে হয় যে, হুমায়ুন আজাদের লেখা চেয়ে সে-রকম অভিজ্ঞতা হতে পারত। কেননা, তাঁর সঙ্গে আমার বাক-বিতণ্ডা আর সব সাহিত্যিকদের তুলনায় বেশিই ঘটেছিল। লেখা চেয়ে তাঁকে আমি তিন বার ফোন করি। প্রথম বার তিনি বাসায় ছিলেন না। দ্বিতীয়বার ফোনে তাঁকে পাই এবং তিনি বলেন যে তাঁর শরীর ভালো নেই এবং সপ্তাখানেক পরে আবার ফোন করতে বলেন। সেটা করি এবং তিনি বলেন যে তাঁর মন ভালো নেই। কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘কিছুই ভালো লাগে না আমার, আমি কিছুতেই আশার কিছু দেখছি না চঞ্চল। সব পতনের দিকে, অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে।’ এই যে লিখছি কথাটা, আমার শরীর কেঁপে উঠছে; বেদনায় ভরে উঠছে মন। যেমন শিউরে উঠেছিলাম তখন; বলেছিলাম, ‘এই অনুভবটা, ঠিক এই অনুভূতিটা নিয়ে নতুনধারার জন্যে একবার বসুন। আমি নিশ্চিত, সেটা হবে উদ্বোধনী সংখ্যায় প্রকাশিত লেখাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো।’

‘স্তুতি করছো, না-কি সত্যি বলছো?’

‘স্তুতি করার প্রতিভা আমার নাই স্যার। এমনিতেই আপনার গদ্য আমার এবং অনেকের প্রিয়। আপনার লেখায় কপটতা একেবারেই নাই। তা ছাড়া যে-কথাগুলো আপনি বললেন, তার সঙ্গে, আপনার ভাষায়, গভীরব্যাপক সত্য ও বাস্তবতা জড়িয়ে আছে। আসলে আমি চাইছি এই সত্য, সময়ের এই মর্মান্তিক সত্য লেখাটায় আসুক। সেটা আপনার হাতে যতটা তীক্ষ্ণ হয়ে উঠবে, আর কারও পক্ষে সে-রকম সম্ভব কি-না আমার জানা নেই।’

‘হুম।’

‘আমি বলতে চাচ্ছি স্যার ব্যক্তির অনুভবের সঙ্গে সার্বিকের একটা সম্পর্ক আছে। বাঙলা ভাষার অধিকাংশ লেখকই ব্যক্তির অনুভবকে সমগ্রতার অভিব্যক্তিতে নিয়ে যেতে পারেন না।…’

‘আমি লিখবো। কবে দিতে হবে?’

‘দুই সপ্তার মধ্যে স্যার।’

‘ঠিক আছে। আচ্ছা, আনোয়ার আহমদ আমাকে ফোন করেছিলেন। উনি তোমার ওপর কিছুধ্বনির একটা সংখ্যা করছেন, আমার কাছে লেখা চেয়েছেন। আমি বলেছি, এত তাড়াতাড়ি তোমার ওপর এই কাজটা ঠিক হচ্ছে না।’

‘হ্যাঁ স্যার আমিও তা-ই মনে করি। কিন্তু আন্ওয়ার ভাই একবার যে-সিদ্ধান্ত নেন, সেটা করেই ছাড়েন। বিরোধিতা করলে পাগলামি করেন, সিনক্রিয়েট করেন।’

‘আমি যে লিখি নি, তুমি কষ্ট পাওনি তো!’

‘স্যার, আমি তো এ-কাজটারই পক্ষে নই। আপনি যে আমার ওপর লেখেননি, এতে আমি বরং স্বস্তি বোধ করছি।’

এর পর আর কথা হয়েছিল মনে নেই। কিন্তু মনে আছে যে দায়িত্ব আমার ওপর তখন ছিল তা কেড়ে নেয়া হয়। কাজটি বেশ আনন্দের সঙ্গে করেন আবু হাসান শাহরিয়ার। আজ হাস্যকর, উদ্বোধনী সংখ্যার জন্য তখন পর্যন্ত সংগৃহীত ২৬টি লেখা নেয়ার উদ্দেশ্যে তিনি রনজু রাইমকে আমার পেছনে লেলিয়ে দেন। এর মধ্যেই নাঈমুল ইসলাম খানের সঙ্গে তাঁর মান-অভিমান ও বাক-বিতণ্ডা চলতে থাকে। এক সন্ধ্যায় তিনি দরজায় চেঁচিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার সঙ্গে আমার বেতনের ব্যবধান হবে এক টাকা। তোমার সোয়া এক লাখ আর আমার পঁয়ত্রিশ, ওসব চলবে না।’ আমার শঙ্কা হতে লাগল, নতুনধারা বের হবে না। আমাকে নিউজ সেকশনে পাঠিয়ে দেয়া হয় এই অজুহাতে যে, ফিচারে আমি ‘সেইফ’ নই। ফলে, হুমায়ুন আজাদের কাছে ফের লেখা চাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হল না। প্রাক-উদ্বোধনী সংখ্যার ডামি এডিশন বেরিয়েছিল, আজও আমার কাছে সেটি আছে। কয়েকজন তরুণের ত্রুটিপূর্ণ বাঙলায় লেখা আর্টিকেল তাতে ছাপা হয়েছিল।

নতুনধারার সার্কাস দেখতে দেখতে শীত এসে গেল। সেই শীতে যেদিন আমি সেন্ট্রাল রোডে নাঈমুল ইসলাম খানের বিসিডিজেসিতে গেলাম একটা বইয়ের এডিটিংয়ের কাজে, সেদিনই হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। মনটা খুব অস্থির হয়ে ছিল; এত জনের লেখা নিয়েছি অথচ পত্রিকাটি বের হবে কি-না জানি না; অনুশোচনায় ভরে উঠেছিল আমার মন। বিসিডিজেসি থেকে বের হয়ে মনে হলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গেলে মনটা ভালো হবে। আহমদ কবীরের রুমের সামনে মেহের নিগারের সঙ্গে দেখা হলো। অনেক দিন পর তিনি আমাকে দেখে উচ্ছ্বসিত হলেন, আমার মন ভালো হয়ে গেল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আমরা কথা বললাম, বিদায় নেয়ার সময় তাঁর ফোন নম্বরটা নিলাম। বারান্দা ধরে এগিয়ে দেখি, রফিকউল্লাহ খানের রুম বন্ধ; তাঁর সঙ্গে দেখা হলে ভালো হতো, খুব ভালো হতো; কেননা, আমার প্রথম কবিতার বই বের হওয়ার পর থেকে তিনি আমাকে বিশেষ স্নেহের চোখে দেখেন, ছাত্রত্ব হারানোর পরও সেই সুযোগ নিয়ে আমি তাঁর রুমে আড্ডা দিয়েছি, অকৃপণভাবে তিনি আমাকে সিগারেট খাইয়েছেন। তো, দোতলা থেকে নেমে আমি পশ্চিমের গেটের দিকে যাচ্ছি, দেখি গ্যারেজের পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে আসছেন হুমায়ুন আজাদ। সঙ্গে কিছু ছেলেমেয়ে। আমাকে দেখে বললেন, ‘কী খবর, কেমন চলছে তোমার সাংবাদিকতা?’

‘চলছে না স্যার।’

‘কেন? শুনলাম, শাহরিয়ার তোমাকে ফিচার থেকে সরিয়ে দিয়েছে?’

‘ঠিকই শুনেছেন।’

‘এখন?’

আমরা গেট পার হলাম। কিছু রিকশা সেখানে দাঁড়িয়েছিল, যেমন এখনও দাঁড়িয়ে থাকে। দু’ মেয়ে তাঁকে বলল, ‘আসি স্যার।’ আমি বললাম, ‘আপনি কেমন আছেন?’

‘ভালো নেই। ফোনে হুমকি দেয়া হচ্ছে। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না। কিন্তু দেশটা যে নষ্ট হয়ে গেল, সব যে অন্ধকার হয়ে আসছে…’

ইত্তেফাকের ঈদ সংখ্যায় পাক সার জমিন সাদ বাদ লেখার পর থেকে স্যারকে থ্রেট করা হচ্ছে।’ সঙ্গে দাঁড়ানো এক ছাত্র বলল।

একটু আগে ভালো হয়ে-যাওয়া আমার মন খারাপ হলো খুব; অসহায় বোধ হলো। আমি বিদায় নিলাম। কেন যে! তিন ছাত্র নিয়ে তিনি দক্ষিণের পথ ধরে হাঁটতে লাগলেন। মনে হলো, কেন আমি তাঁর সঙ্গে আরও কিছু দূর গেলাম না।

তখনও পাক সার জমিন সাদ বাদ উপন্যাসটি আমার পড়া হয় নি। দৈনিক জনকণ্ঠে যোগ দেয়ার পর উপন্যাসটি নিয়ে নাসির আহমেদ (কবি ও সাংবাদিক; তখন জনকণ্ঠের সহকারী সম্পাদক, এখন সমকালের ফিচার এডিটর) ও আবীর হাসান (কবি ও কথাসাহিত্যিক; তখন জনকণ্ঠের সহকারী সম্পাদক, এখন রেডিও আমার-এ প্রধান বার্তা সম্পাদক)-র মধ্যে আলাপ হতে দেখেছি। ২০০৪ সালের বইমেলায় বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর নতুন করে উপন্যাসটি আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। তার আঁচ এসে লাগে অফিসেও, নাসির ভাই বলেন, হুমায়ুন আজাদকে মৌলবাদিরা মেরে ফেলবে; একেবারে জায়গামতো আঘাতটা করা হয়েছে। আবীর ভাই বলেন, উপন্যাসটার শিল্পমান নিয়ে আমি সন্তুষ্ট নই। কিন্তু এটা একটা কাজ যা মৌলবাদের বিরুদ্ধে যে-কোনও ফিল্ডওয়ার্কের চেয়ে বেশি জোরালো। লেখকের রাজনৈতিক দায়িত্ব কী এবং সেটা কীভাবে পালন করতে হয়, এই উপন্যাস তার নমুনা। নাসির ভাই বলেন, আমার খুব ভয় হয়, যে-কোনও দিন তার ওপর হামলা হতে পারে, দু’তিন দিন আগেও তাকে থ্রেট করা হয়েছে। প্রতিদিনই তো উনি বইমেলায় যাচ্ছেন। আমি বলি, বইমেলা উনি খুব এনজয় করছেন নারী বের হওয়ার পর থেকেই। তবে স্যারের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের কিছু একটা করা উচিত। সাংবাদিকরা এই চাপটা সরকারের ওপর সৃষ্টি করতে পারে। আবীর ভাই বললেন, তুমি পাগল হয়েছ? এটা তো সেই সরকার যাদের মধ্যে হুমায়ুন আজাদকে হত্যা করার মতো লোক আছে। দেলোয়ার হোসেন সাঈদী সংসদে বসে কী বলেছিল, জান না?

hazad11a.jpg
হেলিকপ্টারে করে ১৯৯৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন হুমায়ুন আজাদ। সেখানে আগ্রহীদের জন্য নারী বইয়ে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন।

২৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে অফিস থেকে মনিপুরীপাড়ায় (সেখানে আমার বাবা-মা থাকেন) যাই; নিজ বাসায় (তখন বাবর রোডে থাকতাম) ফিরতে রাত দশটার বেশি হয়ে যায়। তখনও ক্যাবল কানেকশন ওই বাসার টিভিতে লাগানো হয় নি। বিটিভির খবর শোনা বেশ আগেই বাদ দিয়েছি। জানি না, বিটিভি সেই খবর দেখিয়েছিল কি-না। যা-ই হোক, বেশ তাড়াতাড়িই সে-রাতে ঘুমিয়ে পড়ি। যেমন আন্ওয়ার ভাইয়ের মৃত্যুর রাতে জেনিসের বাসা থেকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে জনকণ্ঠে হুমায়ুন আজাদের রক্তাক্ত ছবি দেখে মাথায় যেন বাজ পড়ল আমার। পাগলের মতো আমি হাতে যা পেয়েছি, তা ছুঁড়ে মেরেছি। কেঁদে উঠেছি। ঝুমু তখন রান্নাঘরে, নাস্তা বানাচ্ছিল। সব কিছুই ঠিকঠাক চলছিল তখন পৃথিবীতে; কেবল আমার ভেতরটা তছনছ হয়ে যাচ্ছিল। ঝুমু দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। বললো: কী হলো, এমন করছো কেন তুমি? বললাম, ‘দ্যাখো, আমার হুমায়ুন আজাদের মুখ রক্তে ভেসে গেছে।…’

ওর কাঁধে মাথা রেখে আমি কাঁদতে লাগলাম।

কেবল জনকণ্ঠই হুমায়ুন আজাদের রক্তমাখা ছবি ছেপেছিল। বিষয়টি আমার পছন্দ হয় নি। অফিসে গিয়ে আবীর ভাইকে তা জানালাম। তিনি বললেন, ‘জাতি দেখুক, দেশের অবস্থা কতটা ভয়াবহ।’ বললাম, ‘সংবাদপত্রের এথিকস’… তিনি প্রায়-চেঁচিয়ে বললেন, ‘এথিকস তো সমাজের জন্য। যেখানে সমাজ বিপদগ্রস্ত, এথিকস সেখানে হাস্যকর। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির লাশ ঠোকরাচ্ছে শকুন, এমন ছবি মিডিয়ায় আসে নি?’

কেবল আমার নয়, সেই হামলার পর অনেকের শঙ্কা ছিল তিনি বাঁচবেন না। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মিছিল, ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ, বইমেলাজুড়ে মিছিল, মানববন্ধন ইত্যাদির মধ্যে সারাদিন গুজব, তিনি বেঁচে নেই, ক্লিনিক্যালি ডেড। বইমেলায় দেখা গেল সবার মধ্যে উৎকণ্ঠা; বাঙালি এত ভালোবাসে তাঁকে! হুমায়ুন আজাদকে আমরা এত ভালোবাসি? দেখি, কেউ ফোন করছে আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গণিকে; কেউ সিএমএইচে কর্তব্যরত সাংবাদিক বন্ধুকে; পত্রিকা অফিসে; হুমায়ুন আজাদের পরিবারের কাউকে। দেখি, সাক্ষাৎমাত্র একজন জানতে চাইছে আরেকজনের কাছে, স্যার কেমন আছেন? বাঁচবেন ত! এর মধ্যে তাঁকে নিয়ে শুরু হয়ে গেছে রাজনীতি; খালেদা জিয়া সিএমএইচে তাঁর শয্যাপাশে হাজির হয়েছেন, সেই দৃশ্য টিভিতে বারবার দেখানো হচ্ছিল। শেখ হাসিনা সিএমএইচে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাঁকে ক্যান্টনমেন্টের গেটে আটকে দেওয়া হয়েছে।

মনে হচ্ছিল, এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া মানুষের মধ্যে যে উত্তেজনা সঞ্চার করেছে, তাতে সরকারের পতন প্রায় নিশ্চিত; কিন্তু কিছুই হল না, কিছু দিনের বিক্ষোভ প্রদর্শন ছাড়া; বিএনপি-জামাত সরকার এই প্রতিকূলতা শেষ পর্যন্ত ঠিকই সামলে উঠল, যেমনটি তারা পেরেছিল একই বছরে সংঘটিত ২১ আগস্টের ভয়াবহ ও কলঙ্কজনক গ্রেনেড হামলায়, তারপর জনপ্রিয় নেতা সাংসদ আহসানউল্লাহ মাস্টার, সাবেক অর্থমন্ত্রী ও সাংসদ শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ ইউনুস হত্যায় (এই হত্যাকাণ্ডটি ছিল ভয়াবহ; খুনী সেই অধ্যাপককে খুন করেও তৃপ্ত হয় নি, তাঁর লাশ টুকরো-টুকরো করে বস্তায় ভরেছিল)। আমার মনে হয়, হত্যার এই ধারা হুমায়ুন আজাদকে দিয়ে শুরু হয়েছিল, আর তা রাজনৈতিকভাবে সামলে উঠতে পারায় বাকি হত্যাকাণ্ডগুলো সহজ হয়ে গিয়েছিল।

যা-ই হোক, ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হসপিটাল থেকে মোটামুটি সুস্থ হয়ে তিনি ফিরে আসেন। তাঁকে দেখার জন্যে দলে দলে লেখক, ছাত্র, সংস্কৃতিকর্মী বাসায় ভিড় করতে থাকেন। সেই ভিড়ে আমিও ছিলাম। চেহারা এমন হয়ে গেছে যে, হঠাৎ তাঁকে দেখে চেনা যায় না। মুখের আকৃতিই বদলে গেছে। কথা বলতে পারলেও কিছুই আগের মতো নেই, কেবল ভঙ্গিটুকু ছাড়া। ভেবেছিলাম, এই আঘাতের পর তিনি আর লিখতে পারবেন না; বিশ্রামেই কাটাতে তাঁকে হবে মৃত্যু পর্যন্ত। কিন্তু সম্ভবত পরের সপ্তায় জনকণ্ঠের সাময়িকীতে তাঁর কবিতা ছাপা হয়। তার ভাষা ছিল আবেগে পরিপূর্ণ; এমন অনিয়ন্ত্রিত আবেগ, বলতে পারি, এর আগে তাঁর কোনও কবিতায় দেখি নি। পড়েই বুঝতে পারা গিয়েছিল, ওই হামলার পর দেশে যে প্রতিবাদ আর উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছিল, তা বিশেষভাবে আপ্লুত করেছে তাঁকে; শুরুটা এমন ছিল, ‘তোমরা কেঁদেছিলে? কেন হাহাকার ক’রে উঠেছিলে?’… সম্ভবত এভাবে শেষ হয়েছিল কবিতাটি – ‘তোমাদের আমি বুকের ভেতরে রাখি, সেখানে জমে থাকে আমার কালো অশ্র“বিন্দু’; আজও মনে পড়ে।

জার্মানিতে যাওয়ার সম্ভবত চার দিন আগে লেকচার থিয়েটারে তিনি মানবাধিকার ও লেখকের স্বাধীনতা: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ শিরোনামে একটি বক্তৃতা দেন। দৈনিক সংবাদের সম্পাদকীয় পাতায় সেটি তিন কিস্তিতে ছাপা হয়েছিল। সেই বক্তৃতায় তাঁর একটি কথা আমার খুব মনে ধরেছিল। কথাটি এ-রকম: সুশীল সমাজ বলে এদেশে একটা কথা আছে। এটি আসলে সিভিল সোসাইটির বাঙলা অনুবাদ। তবে সুশীল শব্দটি উচ্চারণ করলে আমার ছেলেবেলার ব্যাকরণের কথা মনে পড়ে। তাতে পড়েছিলাম, গোপাল খুব সুশীল। সে নিয়মিত কলা খায়। আমাদের সুশীল সমাজও নিয়মিত কলা খায়। বিবৃতি দেয়। ইস্ত্রি-করা জামা পরে কলা খাওয়া, বিবৃতি দেয়া আর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখা ছাড়া তাদের আর কোনও কাজ নেই। আসলে সুশীলদেরকে দিয়ে কিছু হবে না। সমাজ পরিবর্তনের জন্য অশীলদের আজ খুব প্রয়োজন।

তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ লেখকরা তাঁকে কেমন লেখক মনে করতেন? ভাবলে, প্রথমে আমার মনে আসে মমতাজউদদীন আহমদকে; উত্তরার আলীবাবা সুইটসের কাচাগোল্লা তিনি সালাম সালেহ উদদীন আর আমাকে খাইয়েছেন দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে; যত বার দেখা হয়েছে তাঁর সঙ্গে, তত বার তিনি নিজের গাড়িতে আমাদের বসিয়ে নিয়ে গেছেন উত্তরায়, সেখানে দিনের পর দিন কাচাগোল্লা খেয়ে আমাদের গোল্লায় যাওয়ার উপক্রম হলে সালাম আর আমি দৃশ্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। তিনি আজকের কাগজে থেকে যান, আমি বের না-হওয়া সেই নতুনধারার সার্কাস উপভোগ করতে করতে যোগ দিই জনকণ্ঠে। সেখানেই এক বিকেলে এলেন মমতাজ উদদীন আহমদ। হুমায়ুন আজাদ তখন জার্মানিতে। প্রথমেই নতুনধারার জন্যে সংগৃহীত তাঁর লেখাটি চাইলেন তিনি। তারপর বললেন, ‘তোমার বাচ্চার বয়স কতো হলো? ওকে আমি কিছুই দিতে পারিনে। ওর জন্যে ফতুয়া নিয়ে যাবো।’ বলা বাহুল্য নয়, ঋষভের জন্য ২০০২ সাল থেকে তিনি জামা আর মিষ্টি নিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি বললাম, ‘ওর জন্মের কথা যে আপনার মনে আছে, সেটাই যথেষ্ট। কিছুই নিতে হবে না।’ তিনি বললেন, ‘এসব বলো না চঞ্চল। ঠিক আছে, আজই তোমার বাসায় মিষ্টি নিয়ে যাবো। তুমি কিন্তু এখান থেকে একদম নড়বে না। তোমাকে নিয়ে বেরুবো।’

এর পর তিনি হাবিব ভাইয়ের (আলী হাবিব, শিশুসাহিত্যিক, রম্যলেখক, সাংবাদিক, তখন জনকন্ঠে কর্মরত) সঙ্গে আলাপ সেরে নিলেন এবং সন্ধ্যার পর আমরা বের হলাম। গাড়িতে উঠে তিনি ড্রাইভারকে বেইলি রোড যেতে বললেন। তারপর আমাকে বললেন, ‘ওখানে ভালো কোনও মিষ্টির দোকান দেখলে আমাকে বলো।’ আমি মনে-মনে হেসে নিলাম। গাড়ি থামল সাগর পাবলিশার্সের সামনে। তিনি আমাকে বসতে বলে দোকানে ঢুকলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যে বেরিয়ে এলেন গাড়িতে ঢুকে বললেন, চাষী নজরুল ইসলামের ওয়াইফের এখানে আসার কথা, তার কাছে আমি কিছু টাকা পাই। সেখান থেকে গাড়িটা কোনও এক গলিতে ঢুকল। একটা বাড়ির সামনে তিনি থামতে বললেন। থামলে তিনি গাড়ি থেকে নেমে কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে এলেন। গাড়িটি চলতে শুরু করলে তিনি বললেন, ‘চাষী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক অবস্থান আমার পছন্দ না। কিন্তু সে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক। দেশপ্রেমিক। এজন্যেই তাঁর প্রতি আমার দুর্বলতা।’ ভাবলাম, আমি তো তাঁর কাছে কৈফিয়ত চাই নি। হলিফ্যামিলি হাসপাতালের গলি পার হলে পেট্রোল পাম্পের সামনে একটা জ্যাম পড়ল। বললেন, ‘বাঙলা সাহিত্যে কতো ছোট-ছোট লেখককে বড় করে ফেলা হয়েছে, তাই না চঞ্চল।’ বললাম, ‘কথাটা হুমায়ুন আজাদের কাছ থেকে শুনেছি।’ তিনি আমার দিকে তাকালেন কিছুক্ষণ, হয়তো সেই তাকানোয় রাগের প্রকাশ ছিল। আমার চেহারা থেকে দৃষ্টি প্রত্যাহার করে তিনি সামনে তাকালেন এবং বললেন, ‘হুমায়ুন আজাদ অত বড় লেখক না; মাঝারি মানের লেখকও না। অথচ উল্টাপাল্টা কথা বলে আর বিদেশি বই নকল করে অনেক বড় লেখক হয়ে গেছে।’ তখন মগবাজার চৌরাস্তা পার হচ্ছিলাম আমরা। একটা মিষ্টির দোকান দেখা যেতেই ড্রাইভার বলল, মিষ্টির দোকানের সামনে কি থামবো? বললেন, ‘কথাটা তোমার খারাপ লাগছে, জানি চঞ্চল। দ্যাখো, মীর মশাররফ হোসেন কী লিখে বড় লেখক হয়েছে? বিষাদ সিন্ধু? ফুঃ, ওটা কোন ক্যাটাগরির লেখা বলতে পারো চঞ্চল? পরীক্ষায় প্রশ্ন করা হয়, এটা কি ট্র্যাজিডি, না মহাকাব্য? আসলে এটা কিছুই না। কিন্তু ওই কিছু না-টা লিখেই কতো বড় লেখক, দেখেছ?’ গাড়ি রেল ক্রসিং পার হয় আর তিনি বলেন, ‘বাঙলা ভাষায় শেক্সপিয়র স্ট্যান্ডার্ডের কোনও নাট্যকার আছে?’ বললাম, ‘তার দরকার নেই। বাঙলা ভাষায় যারা নাট্যকার তাদেরই দরকার বাঙলা ভাষার, শেক্সপিয়রের স্ট্যান্ডার্ডের কী দরকার? দীনবন্ধু মিত্রের দরকার ছিল বাঙলা ভাষায়, তিনি জন্মেছিলেন।’ তিনি বললেন, ‘খুব চমৎকার বলেছ চঞ্চল, এজন্যেই আমি তোমাকে এত øেহ করি। আচ্ছা, সত্যি করে বল তো নাট্যকার হিসেবে বাঙলা ভাষার আমাকে দরকার ছিল? আমার কি কিছু টিকবে?’ গাড়ি কারওয়ানবাজারের মুসলিম সুইটস পার হয়, আমি বলি, ‘হ্যাঁ খুব ছিল, অবশ্য এখন আর নেই।’

ফার্মগেট পার হয়ে গাড়ি যখন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে পড়ল, গতি বাড়ল। তিনি বললেন, ‘হুমায়ুন আজাদ কেমন লেখক?’ শুনে আমার ভালো লাগল না। বললাম, ‘সেটা তো আপনি বলেই দিয়েছেন কিছুক্ষণ আগে, এর পর তাঁর সম্পর্কে আপনার সঙ্গে কিছু বলার আগ্রহ আমার নেই স্যার।’ ‘তুমি রাগ করেছ চঞ্চল? আমিও আমার কোনও শিক্ষক সম্পর্কে এমন কথা কেউ বললে সহ্য করতাম না।’

আমি কিছু বলি না। মানিক মিয়া অ্যভিনিউ পার হয়ে আড়ং বরাবর একটা জ্যামে পড়ল গাড়িটা। সেখানেই তিনি আমাকে খুশি করার জন্যে কি-না জানি না, বললেন, ‘তার শিশুসাহিত্য তো ভালো। আচ্ছা, পাক সার জমিন সাদ বাদ কি তুমি পড়েছ?’ বললাম, ‘পড়েছি।’ ‘কেমন উপন্যাস?’ বললাম, ‘লোক পত্রিকায় আমি উপন্যাসটা নিয়ে লিখছি।’ গাড়ি চলতে শুরু করল। বাঁ-দিকে একটা মিষ্টির দোকান দেখা গেল। আমি চুপ করে রইলাম। আসাদ গেট পার হয়ে আর একটা মিষ্টির দোকান, এই প্রথম মনে হলো, ঢাকার লোকজন খালি মিষ্টি খায়, নইলে রাস্তায়-রাস্তায় এত দোকান কেন! কিন্তু এই জিনিসটা কোনও দিন ভালো লাগে নি আমার, ছোটবেলা থেকেই মনে হয়েছে, মিষ্টিতে তো খালি চিনির স্বাদ, মুঠো ভরে চিনি নিয়ে মুখে পুরে দিলেই তো মিষ্টি খাওয়া হয়ে যায়! এক বার অনেক আগে, তখন আমি স্কুলে পড়ি, আমিাকে দুই সের (তখন কেজি ছিল না) মিষ্টি আনার জন্য বাজারে পাঠানো হলে আমি সেই পরিমাণ চিনি নিয়ে বাসায় ফিরেছিলাম। কোথায় যেন যাওয়ার কথা ছিল আমাদের, হাসপাতালের এক পিয়নকে ডেকে সেই চিনি ফেরত দিয়ে মিষ্টি আনা হয়েছিল, মনে পড়ে। কলেজ গেটে তিনটা মিষ্টির দোকান, তারপর বাবর রোড। বললাম, ‘স্যার, সামনে ডানদিকে কিছু দূর গেলেই আমার বাসা। চলেন।’ ততক্ষণে গাড়িটি অনুরাগ কমিউনিটি সেন্টারের সামনে এসে গেল, তিনি বললেন, ‘আজ না। আর একদিন। ফতুয়া আর মিষ্টি না নিয়ে তোমার বাসায় যাওয়া কি ঠিক হবে?’ ড্রাইভার গাড়ি থামালে আমি নেমে গেলাম।

আমার মনে পড়ছে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও মাসুদুজ্জামানের কথা। ২০০১ সাল থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বাঙালির চিন্তামূলক রচনাসংগ্রহ প্রকল্পে কাজ করার সূত্রে প্রায়ই দেখা হতো বিশ্বজিৎ ঘোষ (আমার শিক্ষক), সৈয়দ আজিজুল হক, মাসুদুজ্জামান, আহমাদ মাযহার, আকিমুন রহমান, মইনুদ্দিন খালেদ, সাজেদুল আউয়াল, শওকত হোসেন প্রমুখের সঙ্গে। সেই আড্ডায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ছিলেন অবধারিত মধ্যমণি। তো, এক রাতে খাওয়াদাওয়ার সময় শুদ্ধ বাঙলা লিখতে পারা না-পারা নিয়ে কথা উঠল। আমি বললাম, ‘বুদ্ধিজীবীরা (সবাই নন) কেমন বাঙলা জানেন, তা টের পাওয়া যায় দৈনিকের সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করলে। বাক্যগঠন যে কী ভয়াবহ জিনিস, তা অধিকাংশ লেখকের কাছ থেকে বুঝতে পেরেছি। এমন-কি বাঙলা বিভাগের শিক্ষক ড. আবুল কালাম মনজুর মোরশেদও তা হাড়ে-হাড়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং এখনও দিচ্ছেন।’ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম, ‘স্যার, উনি কীভাবে শিক্ষক হলেন? তা-ও আবার ভাষাবিজ্ঞানের!’ তিনি বললেন, ‘আমিও বুঝি না চঞ্চল। ও-ই মুখস্থটুখস্থ করে হয়ে যায় আর কি!’ মাসুদুজ্জামান বললেন, ‘ভাষা শুদ্ধ করে লেখার জন্যে সে-রকম ব্যাকরণ দরকার। বাঙলা ভাষার স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যাকরণ তো নাই।’

সায়ীদ স্যার বললেন, ‘সেই কাজ করবে কে?’

মাসুদুজ্জামান: ‘হুমায়ুন আজাদ করতে চেয়েছিলেন। বাঙলা একাডেমিকে তিনি সেই প্রস্তাব দিয়েওছিলেন। টাকা নিয়ে বনিবনা হয় নাই।’

সায়ীদ স্যার: ‘কত টাকা চেয়েছিলেন উনি?’

মাসুদুজ্জামান: ‘বোধ হয় তিন লাখ।’

সায়ীদ স্যার: একটা জাতির ব্যাকরণ লেখা হবে, তার জন্যে তিন লাখ টাকা বেশি হয়ে গেল! সেই টাকা আমি দেবো। ব্যাকরণ এখান থেকেই বের হবে। হুমায়ুন আজাদকে খবর দাও।

আহমাদ মাযহার: এখন সেই ইচ্ছা তাঁর আছে কি-না সেটা দেখার বিষয়। কারণ, উপন্যাস লিখে উনি বেশ রোজগার করছেন।

মাসুদুজ্জামান তাঁর সঙ্গে এ-ব্যাপারে যোগাযোগ করেছেন কি-না জানি না; কিন্তু এই আলাপের কিছু দিন পর আমি তাঁর সঙ্গে এ-নিয়ে কথা বলেছিলাম। সেটা ২০০২ সালের আগস্টের দিকে খুব সম্ভবত; দু’-আড়াই মাস আগে তিনি আমেরিকা ঘুরে এসেছেন। তিনি বলেছিলেন, এই বিষয়ে তাঁর যে আবেগ ও আগ্রহ ছিল, তা নষ্ট হয়ে গেছে। ‘এখন আমার অন্য অনেক সৃষ্টিশীল কাজ। এর বাইরে যে-কোনো আহ্বান আমার কাছে ব্যাঘাতের মতো মনে হয়। এক সময় আমি খুব ব্যগ্র বোধ করতাম বাঙলা ভাষার নিজস্ব ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যাকরণের জন্যে; কিন্তু ওখানকার গর্দভগুলো জাতির জন্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ এই কাজ এবং আমার আবেগকে বুঝতে পারে নি। অথচ জনগণের অর্থের অপচয়ে ওদের আনন্দের সীমা নেই। ওই প্রতিষ্ঠানটির পৃষ্ঠপোষকতায় বছরের পর বছর তারা কেবল মুলো ধ্বংস করে চলেছে।’

বুঝলাম, এ-নিয়ে তাঁর ক্ষোভের সীমা নেই। তবু তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। তাঁর একটাই কথা, আগ্রহ এবং সময় কোনোটাই তাঁর নেই।

বললাম, ‘তা হলে কাজটা কে করবে?’

তিনি বললেন, ‘পৃথিবীতে বহু ভাষা আছে, যেগুলোর নিজস্ব কোনো ব্যাকরণ নেই। না-থাকলে যে কোনোদিনই হবে না, এমন নয়। কিন্তু মানসিকভাবে এখন আমি নিজেকে এই কাজের উপযুক্ত মনে করছি না।’

সেদিন তাঁর আমেরিকা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু কথা হয়েছিল। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওখানকার বাঙালিদের অবস্থা কেমন? মনে পড়ে, বলেছিলেন, ‘ওখানকার বাঙালিরা সচ্ছল ও আধুনিক ক্রীতদাসের জীবন যাপন করে। দিন-রাত কাজ আর কাজ। পারিবারিক জীবন বলে কিছু ওখানে নেই।’

‘তাহলে আমেরিকায় গেলে বাঙালিরা আর আসতে চায় না কেন?’

‘ওখানে আছে টাকা। অবশ্য নিউইয়র্কের বাঙালিরা ডলারকে টাকাই বলে। বাংলাদেশের মতো ওখানে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, মিথ্যাচার, ঘুষ এসব নেই। ওখানে স্বাধীনতা আছে। নিরাপত্তা আছে। ডলার আছে। বাংলাদেশে তো এসব নেই। এসব কারণে তারা বাংলাদেশে থাকার চেয়ে ক্রীতদাসের শান্তিপূর্ণ সৎ জীবন বেছে নিয়েছে। যদিও নিউইয়র্কের জীবন বেশ কষ্টকর।’

‘বাঙালি শ্রমিকের জীবন সেখানে কেমন?’

‘বেদনাদায়ক ও স্বর্গীয়। এক বাঙালি ডাক্তারকে দেখেছি, সেখানে সে একটি ক্লিনিকের দারোয়ান। ওয়াশিংটনে এক চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টকে দেখেছি, যে রেস্তোরাঁর ওয়েটার। তাদের জীবন খুব কষ্টকর, যৌনজীবন বলেও তাদের কিছু নেই; কিন্তু ডলার আর নিরাপত্তায় তারা স্বর্গসুখেই আছে।’

‘স্যার, রাজনীতি? ধর্ম?’

বাংলাদেশ রাজনীতিবাজের দেশ, ওটা মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তার দেশ। বাংলাদেশে খালেদা জিয়া খুব শক্তিশালী, বাইরে বেশ নিরীহ; আর আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নিজ দেশে কোনও শক্তিই নেই, কিন্তু বাইরের দেশগুলোতে তার শক্তির সীমা নেই। আমি হোয়াইট হাউস দেখতে গেছি, সেখানে অত পাহারাদার নেই। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর ভবন, সচিবালয়, মন্ত্রণালয় ঘিরে রাখে সশস্ত্র পাহারাদাররা। সেখানে এমন কিছু দেখি নি। ধর্মের কথা শুনবে? ওখানকার মুসলমানরা খুব ধর্মান্ধ, বাঙালি মুসলমানরাও; শুক্রবারে এরা মসজিদে দৌড়ায়, কিন্তু গোপনে মদ্যপান করে। দোকানে মাংসের প্যাকেটে বড় করে ‘হালাল মিট’ লেখা থাকে; কিন্তু এক মুসলমান দোকানদারের কাছ থেকে জানতে পেরেছি, ওইসব পশু জবাই করে খ্রিস্টান বা ইহুদিরা। এই হালাল মিট নিয়ে আমি লিখেছি; তাতে ওখানকার ধর্মান্ধ মুসলমানরা আমার ওপর খুব ক্ষেপে গেছে। যে আমেরিকা আমি দেখে এসেছি, সেটা আসলে তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র।’

h_azad11.jpg

হুমায়ুন আজাদের লাশ যেদিন আসে জার্মানি থেকে, সেদিনের বৃষ্টিধৌত বিষণ্ণ অপরাহ্নে কলাভবনের সামনে মাসুদুজ্জামানের সঙ্গে সামান্য কথা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে সেখানে শিশির ভট্টাচার্য্যও ছিলেন। ছিলেন আমার সহোদর ফয়সল ভাই। বলেছিলাম, ‘কেন তাঁকে মরে যেতে হবে? অনেক কাজ তো বাকি ছিল! বাঙলা ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণটা, আমাদের সম্পদ…’

মাসুদ ভাইয়ের চোখ ভিজে এসেছিল। আমারও কি? আবার?

(চলবে)

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: চঞ্চল আশরাফ
ইমেইল: chanchalashraf1969@yahoo.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কামরুজ্জমান জাহাঙ্গীর — জানুয়ারি ২৮, ২০১০ @ ১২:৪০ পূর্বাহ্ন

      এই অংশের শেষটা অত তাড়াহুড়া করে শেষ হয়ে গেল! অনেকটা বেখাপ্পাও। আজাদের উপর সশস্ত্র হামলা থেকে খানিক স্মৃতিময়তা, তারপরই একেবারে মৃত হুমায়ুন আজাদের মুখোমুখী হয়ে পড়া?
      এর ভিতর তিনি ফিরে এলেন, আমরাই তো দেখলাম, বিমানবন্দর থেকে কত অসহায় বিধ্বস্ত অবস্থায় ফিরে এলেন। এই প্রথম মানুষের ভালোবাসায় তিনি তার ব্যাকুলতাও প্রকাশ করলেন। এত কিছু ঘটনা, যন্ত্রণা, আমাদের ব্যাকুলতা, দীর্ঘ ক্রন্ন্দনময়তা বোধ হয় চঞ্চল এভাবে শেষ করবেন না, আমরা অপেক্ষায় থাকলাম।

      – কামরুজ্জমান জাহাঙ্গীর

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Santosh — জানুয়ারি ৩০, ২০১০ @ ১১:২১ পূর্বাহ্ন

      ভালো লাগল।

      – Santosh

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্নেহ — এপ্রিল ২৯, ২০১৬ @ ৭:৩৭ অপরাহ্ন

      কবে থেকে আটকে আছে একটা শব্দ- ‘চলবে’…

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com