শততম জন্মদিনে শুভেচ্ছা

বিপ্লবী বিনোদবিহারী চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

| ১০ জানুয়ারি ২০১০ ৩:০৮ পূর্বাহ্ন

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে পরিচালিত ১৯৩০ সালের ‘চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ’-র কনিষ্ঠতম যোদ্ধাদের একজন বিনোদবিহারী চৌধুরী। ঐতিহাসিক অস্ত্রাগার লুণ্ঠন অভিযান ও জালালাবাদ যুদ্ধে সম্মুখসমরে অংশগ্রহণ করে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে অংশ নেওয়ার অপরাধে প্রায় ১২ বছর জেল খেটেছেন। জেলখানায় বসেই তিনি স্নাতক হন। কারাজীবনে কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। তারই জের ধরে কংগ্রেসের রাজনীতিতে নাম লেখান এবং ১৯৪৮ সালে পূর্ব-পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সেই সুবাদে তাঁর সুযোগ ঘটে বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করার। পরবর্তীকালে ঊনসত্তুরের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশে নানান সামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক ও শিক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে আজ পর্যন্ত যুক্ত আছেন সক্রিয়ভাবে। ১৯১০ সালে জন্ম নেওয়া এ বিপ্লবীর শততম জন্মদিন পালিত হচ্ছে আজ ১০ই জানুয়ারি ২০১০ তারিখে। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত মাসিক বিশদ সংবাদ-পত্রিকার জন্য আলম খোরশেদ ও এহসানুল কবিরের নেওয়া সাক্ষাৎকারটি এ-উপলক্ষে এখানে পুনঃপ্রকাশিত হল।

binodbihari1.jpg
বিনোদবিহারী চৌধুরী; ছবি: এহসানুল কবির

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলম খোরশেদএহসানুল কবির

আলম খোরশেদ: আপনার সম্পর্কে তো সবাই কমবেশি জানে। আপনি একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। কিন্তু আমাদের পত্রিকার পাঠকদেরকে আপনার সঙ্গে আরও অন্তরঙ্গভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। খুব বেশি প্রশ্ন করব না, আপনার কাছ থেকে সবিস্তারে আপনার জীবনের কাহিনী শুনব। শৈশবের কথা দিয়েই শুরু করুন।

বিনোদবিহারী চৌধুরী: আমার জন্ম ১৯১১ সালের ১০ই জানুয়ারি বোয়ালখালী থানার উত্তর ভূর্ষি গ্রামে। আমার বাবা স্বর্গীয় কামিনীকুমার চৌধুরী আর মা বামা দেবী। বাবা ছিলেন কমিটি পাশ উকিল। কমিটি পাশ বোঝেন তো? তখন ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে একটা পরীক্ষা দিয়ে মুন্সেফ কোর্টের উকিল হওয়া যেত। উনি ফটিকছড়ি মুন্সেফ কোর্টের উকিল ছিলেন। ছয় বছর বয়সে আমি আমার বাবার কাছে চলে যাই। ওখানে রাঙামাটি প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম। প্রত্যেক ক্লাশেই ফার্স্ট হতাম। ক্লাস ফোর পাশ করার পর বাবা বললেন, ‘এই স্কুলে ইংরেজিটা তোর ভালো শেখা হয় নাই, তোকে আরো ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেব। স্বভাবতই আমাকে ক্লাস ফাইভে বা কমপক্ষে ফোরে ভর্তি করানো উচিত ছিল। কিন্তু তিনি আমাকে ফটিকছড়ি করোনেশান এইচ ই স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি করিয়ে দিলেন। ওখানে ক্লাস এইটে পড়ার সময় শিক্ষকেরা বললেন, ‘তুই শহরে গিয়ে কোনো একটা ভালো স্কুলে পড়। তুই স্কলারশিপ পাবি, ভালো রেজাল্ট করবি।’ আমি বাবাকে কথাটা বললাম। বাবা বললেন আমাকে শহরে রেখে পড়ানোর মতো আর্থিক সঙ্গতি তাঁর নেই, তেমন কোনো আত্মীয়-স্বজনও নেই যার কাছে রেখে আমাকে পড়াতে পারেন। তিনি একটা কঠিন শর্ত দিলেন। বললেন, ‘তোকে শহরে রেখে পড়াতে পারি এক শর্তে। ফার্স্ট তো তুই হবিই, কিন্তু সেকেন্ড বয়ের চেয়ে একশ নম্বর বেশি পেয়ে ফার্স্ট হতে হবে।’ আমি বললাম, ‘সেটা তো সম্ভব না। তবে, আমি কথা দিতে পারি আমি ফার্স্ট হব আর সব বিষয়ে আশির ওপরে নম্বর পাব।’ আমি তা-ই পেলাম। শহরে নয়, বাবা আমাকে বোয়ালখালী থানার পি সি সেন সারোয়াতলী স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সেটা তখনকার দিনের খুব নামকরা স্কুল। প্রত্যেক বছর সেখান থেকে বেশ কিছু ছেলে স্কলারশিপ পেত। হেড মাস্টার ছিলেন যতীন্দ্রমোহন দস্তিদার। সমস্ত চিটাগাঙে তিনজন সেরা হেডমাস্টারের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন।

আ খো: ঐ স্কুলে কোন ক্লাশ পর্যন্ত পড়েছিলেন?

বি চৌ: ঐ স্কুল থেকেই আমি মেট্রিক পাশ করেছি। মেট্রিকে আমি চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে তৃতীয় হই এবং ‘প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ স্কলারশিপ’ পাই। কিন্তু এর মধ্যেই আমার জীবনে সবচেয়ে বড় ঘটনাটা ঘটে গেছে। সারোয়াতলী স্কুলে নিয়মিত ডিবেট হত। আমি তো তখন নতুন ছাত্র, তেমন কেউ আমাকে চিনে না। কিন্তু একদিন একটা ডিবেটে আমি অংশগ্রহণ করেছিলাম। সবার কথাবার্তা তখন প্রায় শেষ। আমি দাঁড়িয়ে কিছু বলতে চাইলাম, ওরা বলতে দিল। সবাই আমার বক্তৃতার প্রশংসা করল। স্কুল থেকে বেরোবার পথে এক সিনিয়র ভাই পেছন পেছন এসে আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। তাঁর নাম রামকৃষ্ণ বিশ্বাস। উনি বললেন, ‘তোমার বক্তৃতা আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি তোমাকে আমার বন্ধু করতে চাই।’ তো, যেতে যেতে অনেক কথা হল। তিনিও খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। আস্তে আস্তে তাঁর সঙ্গে আমার খুব ভাব হয়ে গেল। তাঁর কাছে অনেক বই ছিল। আমাকে নিয়মিত বই পড়তে দিতেন। তিনি মাস্টারদার বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার দেওয়া বইপত্র পড়ে, তার সঙ্গে মিশে আমি মনেপ্রাণে বিপ্লবী হয়ে গেলাম।

এহসানুল কবির: কোন বইগুলো আপনাকে বিপ্লবী হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল? আপনার বিপ্লবী হওয়ার পেছনে আর কারও ভূমিকা ছিল?

বি চৌ: ১৯২১-২২ সালে যখন সারা ভারতে অসহযোগ আন্দোলন চলছে, তখন আমার বাবাও সেই আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। তিনি বিলাতি কাপড় ছেড়ে খদ্দর পরা শুরু করেন। আমাদেরকেও দেশি মোটা কাপড়ের জামা কিনে দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমিও সেই ছোটবেলায় নানা সভা-সমিতিতে গিয়েছি। ১৯২২ সালে মহাত্মা গান্ধী যেদিন চট্টগ্রামে ভাষণ দেন সেদিন আমি আমার দাদার সাথে গান্ধীজির মিটিঙে গিয়েছিলাম। আন্দরকিল্লায় এখন যেখানে জেমিসন হাসপাতালটা আছে, সেখানেই গান্ধীজি বক্তৃতা করেন। তাই ও-জায়গাটার নাম দেওয়া হয় ‘গান্ধী ময়দান’। এভাবে স্বদেশি চেতনার ছাপ আমার মধ্যে পড়ে। পরে রামকৃষ্ণের কাছ থেকে দেশাত্মবোধক বইপত্র পড়ে, ক্ষুদিরাম, কানাইলালের ইতিহাস পড়ে আমি বিপ্লবী হয়ে উঠি। একটা বইয়ের নাম বিশেষভাবে বলতে পারি। সেটা হল সখারাম গণেশ দেওস্করের লেখা দেশের কথা। মাস্টার’দা সূর্য সেনের বিপ্লবী দলে আমি যোগ দিই ১৯২৭ সালে।

আ খো: মাস্টার’দা সূর্য সেনের সঙ্গে আপনার প্রথম দেখা হয় কখন?

বি চৌ: আমি যখন বিপ্লবী দলে আসি তখন মাস্টার’দা জেলে। ১৯২৪ সালে ‘রাউলাট অ্যাক্ট’ অনুযায়ী চট্টগ্রাম সহ বাংলার এবং ভারতের অন্যান্য প্রদেশের, বিশেষত পাঞ্জাব ও মুম্বাইয়ে অনেক লোককে বিনা বিচারে আটক করে। মাস্টারদা খবর পেয়ে আত্মগোপন করেন। আসাম যুক্তপ্রদেশ প্রভৃতি বিভিন্ন জায়গায় গোপনে সফর করে তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালান। দুই বছর আত্মগোপনে থাকার পর ১৯২৬ সালে ‘ভারত রক্ষা আইন’-এ তিনি কলকাতা থেকে গ্রেফতার হন। ’২৮ সালের শেষের দিকে তিনি জেল থেকে বের হন। চট্টগ্রাম ফিরে তিনি আবার সংগঠনকে গোছাতে থাকেন। রামকৃষ্ণ বিশ্বাস, তারকেশ্বর দস্তিদার এঁদের কাছে তিনি আমার কথা শোনেন। ১৯২৯ সালের জুলাইতে আমি যখন চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হই, তখন তিনি আমার কাছে খবর পাঠান আমি যেন চট্টগ্রাম কলেজেই পড়ি এবং ওনার সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম ছেড়ে কোথাও না যাই। আমি চট্টগ্রাম কলেজের হিন্দু হোস্টেলে থাকতাম। একদিন রামকৃষ্ণ আমাকে বলল, তুমি রাত আটটার দিকে অভয়মিত্র শ্মশানে যাবে, সেখানে মাস্টারদার সঙ্গে তোমার দেখা হবে। আমি সাতটার দিকেই চলে গেলাম। সেদিন ছিল শনিবার, অমাবস্যার রাত্রি। তখন আমার যা বয়স, শ্মশান বলতে তো খুব ভয়ের জায়গা। চারপাশে নোংরা, আবর্জনা, শেয়াল, শকুন। আমি নীরবে পায়চারি করছিলাম। মনে মনে ভয়ও যে পাই নাই, তাও নয়। তবু, কখন মাস্টার’দা আসেন সেই অপেক্ষায় থাকলাম। প্রায় পৌনে আটটার দিকে আমার পিঠে একটা হাতের স্পর্শ পেয়ে খুব শিউরে উঠলাম। মাস্টার’দা বললেন, ‘ভয় পেয়েছিস?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’ মাস্টার’দা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে সত্য বলার প্রশংসা করলেন। তারপর কথাবার্তা আরম্ভ হল। উনি ঘুরেফিরে বললেন, ‘তুমি বিপ্লবী দলে এসো না।’ আমি বললাম, ‘আমি তো বিপ্লবী দলে এসেই গেছি। আপনি না আসতে বলছেন কীভাবে?’ উনি হেসে বললেন, ‘নারে, আমি হলাম হাইকোর্ট, আমার কথা ছাড়া কেউ দলে আসতে পারে না। রামকৃষ্ণ বিশ্বাস তোমাকে দলে এনেছে, তারকেশ্বর তোমাকে পরখ করেছে, তাই আমি তোমার সঙ্গে কথা বলছি। এখন আমি যদি “না” বলি তা হলে তো তুমি দলে আসতে পারবে না। তুমি ভালো ছাত্র। ভালোমতো পড়াশোনা করে সুনাগরিক হয়ে দেশের অনেক উপকার করতে পারবে। বিপ্লবী দলেই আসতে হবে এমন কোনো কথা নেই।’ আমিও আমার মতো বোঝাতে লাগলাম, কেন আমি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাই, কেন অন্য কোনো পথে দেশের উপকার করতে চাওয়া অর্থহীন মনে করি। প্রায় পৌনে দশটা পর্যন্ত কথা চলল। উনি আমাকে হোস্টেলের কাছাকাছি এগিয়ে দিয়ে গেলেন। তখনও উনি বলছিলেন, ‘বিপ্লবী দলে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা তুমি ছেড়ে দাও। পড়াশোনা কর।’ পরের রোববারে মাস্টারদার সঙ্গে আমার আবার দেখা হল, চট্টেশ্বরী কালী বাড়ির দক্ষিণ দিকে পুকুর ঘাটে তেঁতুল গাছের তলায়। ঐদিনও সেই একই কথা, ‘বিপ্লবী দলে এসো না।’ আমারও সেই একই কথা। আমি জেদ করে বললাম, ‘আপনি যদি আমাকে দলে না নেন, তা হলে আমি অন্য কোনো বিপ্লবী দলে যোগ দেব। বিপ্লবী দল তো আরও আছে।’ উনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তোকে অনেক পরীক্ষা করলাম। তোকে দলে নিলাম। তুই অনেক কিছু করতে পারবি।’

আ খো: আপনার বিপ্লবী জীবনের উল্লেখযোগ্য দুয়েকটা অপারেশনের কথা বলুন।

বি চৌ: ১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল আমরা চট্টগ্রামকে তিনদিনের জন্য স্বাধীন করেছিলাম। টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস করেছি, অক্সিলারি ফোর্সের সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র লুট করেছি। আমাদের প্রোগাম ছিল ট্রেজারি ভেঙে দেব, জেলখানা থেকে কয়েদিদের বের করে দেব, সমস্ত অস্ত্রভাণ্ডার লুট করে চট্টগ্রাম শহরকে যতক্ষণ আমাদের দখলে রাখতে পারি ততক্ষণ দেশের মানুষের কাছে ব্রিটিশবিরোধী ইস্তাহার বিলি করব। আমাদের কাছে অনেক ধরনের ইস্তাহার তৈরি ছিল। আমরা জানতাম, আমরা বেশিদিন টিকে থাকতে পারব না, ব্রিটিশরা নানা জায়গা থেকে ফৌজ এনে শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে মেরে ফেলবেই। শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত তাদের সঙ্গে লড়ে প্রাণ দেওয়ার জন্যই আমরা যুদ্ধ শুরু করেছিলাম। কিন্তু সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল আমাদেরই কয়েকজন নেতার জন্য। এই যে দামপাড়া পুলিশ লাইন, এখানে অস্ত্রের গুদাম ছিল, ওটা আমরা লুট করি। পুলিশ আমাদের সঙ্গে না পেরে প্রথমে পিছু হটে যায়। ম্যাজিস্ট্রেট উইলকিনসনকে আমরা গুলি করেছিলাম। তার ড্রাইভার উন্ডেড হয়েছিল। আমাদের ওপরে অর্ডার ছিল অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ যা লাগে নিয়ে বাকিসব পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে দিতে হবে। আগুন ধরাতে গিয়ে আমাদের একটা ছেলে আন্ডু, ভালো নাম হিমাংশু সেন, ওর গায়ে পেট্রোল পড়ে আগুন ধরে যায়। অনন্ত সিংহ, গণেশ ঘোষ, আনন্দ গুপ্ত আর মাখন ঘোষাল এরা চারজন হিমাংশুকে নিয়ে একটা গাড়িতে করে চলে গেল। আমি মাস্টারদার কাছে ছিলাম। মাস্টারদা বললেন, ‘অনন্ত চলে গেল! আমাকে জিজ্ঞেসও করল না!’ অনন্ত সিংহ আমাদের দল ‘চট্টগ্রাম রিপাবলিকান আর্মি’র সিএনসি ছিলেন, গণেশ ঘোষ জিওসি, অন্যরা কেউ মেজর কেউ ক্যাপ্টেন এরকম। অম্বিকা’দা ছিলেন সেকেন্ড ইন কমান্ড। তিনি বললেন, ‘ওকে ওখানে মেরে ফেলা উচিত ছিল, ওকে আবার ওরা বাঁচানোর জন্য নিয়ে গেল!’ আমরা ওদের ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। প্রায় দেড়ঘণ্টা পরেও তারা আসল না। এর মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট উইলকিনসনের নেতৃত্বে পুলিশ আবার ফিরে আসে। উইলকিনসন একটা ফরেন জাহাজ থেকে মেশিনগান নিয়ে এসেছিল। দামপাড়া পুলিশ লাইনের উল্টো দিকে একটামাত্র দোতলা বাড়ি ছিল। ‘কে কে সেন ইলেকট্রিক অফিস’ ছিল সেটা। সেই বাড়ির ছাদে মেশিনগান বসিয়ে তারা গুলি করতে শুরু করল। আমাদেরকে আবার বলা হল ‘লাই ডাউন, ফায়ার, এন্ড শাউট স্লোগান।’ এই যে রাত্রি দুইটার সময় আমরা পঞ্চাশটা ছেলে স্লোগান দিচ্ছি ‘বন্দে মাত্রম’, তাতে মনে হচ্ছে আমরা দুই হাজার ছেলে ওখানে। ওরা আবার পালিয়ে গেল। তখন মাস্টার’দা, অম্বিকা’দা, লোকা’দা সহ যারা নেতৃস্থানীয় ছিলেন, তারা সিদ্ধান্ত নিলেন অনন্ত সিংহরা ফেরত না আসা পর্যন্ত আমরা একটু ভিতরে গিয়ে পাহাড়ে শেলটার নেব। পাহাড় বেয়ে ভিতরের দিকে যেতে যেতে আমরা ফতেয়াবাদ-হাটহাজারি পর্যন্ত চলে গেলাম। সেখান থেকে প্রতিদিন ওদের খোঁজ নিচ্ছিলাম। ওদেরকে খুঁজতে গিয়ে আমাদের অনেক ছেলে শহরের নানা জায়গায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা গেল, আহত হল। শেষ পর্যন্ত কোনো খোঁজ না পেয়ে আমরা পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী শহরের দিকে আসতে লাগলাম। পথে, জালালাবাদ পাহাড়ে, ২২ তারিখ রাতে ব্রিটিশ সৈন্যদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়। আমাদের বারোজন ছেলে মারা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সৈন্যরা পালিয়ে যায়। আমি গুলি খেয়েছিলাম। আমার বাঁচার কথা ছিল না। আমার বন্ধু রজত সেন বলেছিল, ‘তুই তো বাঁচবি না, কষ্ট পাবি, তোকে মেরে ফেলি।’ সেদিন যুদ্ধ-পরিচালক ছিলেন লোকনাথ বল, লোকা’দা। উনি বললেন, ‘না ওকে মারবি না, ও বাঁচবে, ওকে দিয়ে অনেক কাজ হবে।’ দুইপাশে দুইজনের কাঁধে ভর দিয়ে আমাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে বললেন। ১৮ তারিখ থেকে আমরা পাহাড়ের কাঁচা আম আর কিছু তরমুজ-বাঙ্গি ছাড়া কিছুই খাই নি। সবাই খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিল। একে অভুক্ত, তার ওপর গুলি খাওয়ার পর আমার অবস্থা তো বুঝতেই পারছেন। অনেকদূর হাঁটার পর আমি ওদেরকে হাতজোড় করে বললাম, ‘আমি তো বাঁচব না, আমার জন্য তোমরা পিছিয়ে পড়বে। তারচেয়ে তোমরা চলে যাও, আমি মরে গেলে মরে যাব, বেঁচে গেলে কোনোদিকে আশ্রয় নেব।’ ওরা চলে গেল, আমি আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে রাত দুইটা-আড়াইটার সময় কুমিরায় আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠলাম। সেই বাড়িতে মাস দুইয়েক আগে আমার এক খুড়তুতো ভাইয়ের বিয়ে হয়েছিল। বাড়ির মালিকের নাম পার্শ্বনাথ ভৌমিক। উনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। ওনারা আমার সেবাযত্ন করলেন। ১৭-১৮ দিন যাওয়ার পর আমি যখন একটু একটু খাওয়া-দাওয়া করতে পারছি, তখন আরেক বিপদ হল। একদিন দেখি জনা ১৫ গুর্খা সৈন্য ঐ বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তখন মহাত্মা গান্ধীর লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলন চলছিল। এর অংশ হিসাবে কুমিরাতেও কংগ্রেসের লোকেরা লবণ বানানোর ক্যাম্প করেছিল। সৈন্যরা এসেছিল ওদেরকে দমন করতে। ঐটা যেহেতু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বাড়ি, সেজন্য সৈন্যরা সেখানে উঠেছিল। আমি দেখলাম, আমি যদি ধরা পড়ি তা হলে ওদের সবার সমস্যা হবে। তাই আমি বউ সেজে একটা বুড়া লোকের সঙ্গে ঐ বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি। কিছুদিন পর আমি ঢাকা চলে যাই। সেখানে এক বাড়িতে থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে মাস্টারি নিই। দুটো মেয়ে পড়াতাম।

এ ক: ঢাকায় কোনো ধরনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অংশ নেন নি?

বি চৌ: হ্যাঁ, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে তো অংশ নিয়েছি। মাস্টার’দার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ২২শে এপ্রিল জালালাবাদ যুদ্ধে ব্রিটিশ সৈন্যরা আমাদের সঙ্গে না পেরে পালিয়ে যায়। কিন্তু এর পর থেকে ব্রিটিশ সরকার পুরো চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। গ্রামে গ্রামে পর্যন্ত ক্যাম্প করেছিল। মাস্টার’দা, নির্মল’দা, অম্বিকা’দা সহ সবাই আত্মগোপন করেছিলেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তখন থেকে আমরা আর সম্মুখ-যুদ্ধে যাব না; গেরিলা ওয়ারফেয়ার করব। মাস্টারদা’র নির্দেশে আমি ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট ডুরনোকে হত্যা করার পরিকল্পনা করি। ওই অপারেশনে রমেণ ভৌমিক আর সরোজ গুহকে পাঠিয়েছিলাম। সরোজ গুহর হাতেই অস্ত্র ছিল, রমেন ভৌমিকের হাতে একটা টয় রিভলবার ছিল। সরোজ গুলি করেছিল, ডুরনো আহত হয়েছিল, কিন্তু মরে নাই।

এ ক: প্রীতিলতা কখন বিপ্লবী দলে আসেন? তাঁর সঙ্গে কি আপনার দেখা হয়েছিল?

বি চৌ: ১৯৩০-৩১ সালে যখন চট্টগ্রামে প্রায় ৩-৪ হাজার ছেলে জেলে, মাস্টার’দা, অম্বিকা’দা সহ দলের শীর্ষ নেতারা সবাই আত্মগোপনে, তখন ছেলেদেরকে দিয়ে দলের কাজকর্ম চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ল। সেই সময় দলে মেয়ে রিক্রুট করার সিদ্ধান্ত হয়। মাস্টারদা’র ডাকে সাড়া দিয়ে প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত সহ অনেক মেয়ে বিপ্লবী দলে যোগ দেয়। ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পাহাড়তলি ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে প্রীতিলতা নেতৃত্ব দেয় এবং সফলভাবে অপারেশন শেষ করার পর ধরা পড়ার আশংকায় আত্মহত্যা করে। তখন আমি ঢাকায়। আমার সঙ্গে তার দেখা হওয়ার সুযোগ ঘটে নাই।

আ খো: ঢাকার পর্ব শেষ করে চট্টগ্রাম ফিরলেন কখন? চট্টগ্রাম থেকেই তো গ্রেফতার হন।

বি চৌ: ১৯৩৩ সালে আমি চট্টগ্রামে আসি। ওই বছরই প্রথমবার গ্রেফতার হই, ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বরে বেরিয়ে আসি। আবার ৪১ সালের মে মাসে জেলে যাই, বেরিয়ে আসি ৪৫ সালের নভেম্বর মাসে।

এ ক: জেল জীবনের অভিজ্ঞতাটা সংক্ষেপে একটু বলেন।

বি চৌ: জেল জীবন আমার জীবনের জন্য একটা রিনাইসেন্স। জ্ঞানীগুণী সব লোকের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ হল। আমার মতো কমবয়সী ছেলে খুব কম ছিল। সবাই আমাকে খুব স্নেহ করতেন। বিচিত্র বিষয়ের অসংখ্য বই ধার নিয়ে পড়েছি। জেল থেকেই আমি ইন্টারমিডিয়েট ও বিএ পাশ করি। ল’ পরীক্ষাও দিয়েছিলাম। এক বন্ধুর কাছে উর্দু ভাষা শিখেছি, ফরাসি ভাষাও শিখতে শুরু করেছিলাম। দেশ-বিদেশের নানা জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য ইত্যাদি পড়ে আমি সম্পূর্ণ নতুন মানুষ হয়ে গেলাম।

আ খো: জেল থেকে বেরোনোর পর তো আপনার রাজনৈতিক জীবনেরও আরেক অধ্যায় শুরু হল।

বি চৌ: জার্মানি যখন রাশিয়া আক্রমণ করল, তখন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ নিল। অনন্ত সিং, গণেশ ঘোষ সহ অনেক বিপ্লবী জেল থেকেই ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে বিবৃতি দিলেন। চট্টগ্রাম থেকে আমরা প্রায় দেড় হাজার লোক জেলে ছিলাম। ১৯৪৫ সালের শেষে আমরা যখন জেল থেকে বের হচ্ছি তখন আমরা দশ-পনের জন ছাড়া বাকি সবাই কমিউনিস্ট হয়ে গেছে। যতীন্দ্রমোহন রক্ষিত, আমি, মহেন্দ্র চৌধুরী, পুলিন দে, দীনেশ দাশগুপ্ত, সুখেন্দু’দা হাতেগোনা এই কয়েকজন ছাড়া সবাই কমিউনিস্ট হয়ে গেল। আমি কমিউনিস্ট হতে পারি নাই, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে গান্ধীর আন্দোলনে যোগ দিলাম। ‘গান্ধী জনকল্যাণ সংঘ’ নামে একটা সংগঠন করে গ্রামে গ্রামে চরকা স্থাপনসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছি। ’৪৬ সালের ইলেকশনে চট্টগ্রাম জেনারেল কনসটিট্যুয়েন্সিতে কংগ্রেসের প্রার্থী নেলী সেনগুপ্তার ইন্টারপ্রিটার হিসাবে আমি গ্রামে গ্রামে ঘুরেছি। ইলেকশনে আমরা জিতেছিলাম। এর পরের ঘটনা তো আপনারা জানেন, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয়ে গেল, এরপর দেশভাগ। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ‘ভিভিসেকশন অব ইন্ডিয়া ইজ অ্যা সিন।’ কিন্তু দেশ তো ভাগ হয়ে গেল। সবাই দলে দলে ভারতে চলে গেল। সব কমিউনিস্টরাও গেল।

এ ক: আপনি তো রয়ে গেলেন।

বি চৌ: আমার বন্ধু ভূপেন্দ্রকুমার দত্তকে বলেছিলাম, ‘সবাই তো দলে দলে চলে যাচ্ছে, আমি কী করব!’ ভূপেন্দ্র বলেছিল, ‘তোমার বিবেক কী বলে দেখ।’ আমি বলেছিলাম, ‘আমি নেলী সেনগুপ্তার সঙ্গে সারা চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে ঘুরেছি, দেশের মানুষের কাছে দেশাত্মবোধের কথা বলেছি, আশা জাগিয়েছি; এখন আমি কোন মুখে আমার দেশ ছেড়ে চলে যাব?’ আমি যাই নি। আমি আমার দুঃখী, ক্ষুধার্ত, নির্যাতিত, নিপীড়িত, অত্যাচারিত মানুষের সঙ্গে রয়ে গেলাম। তাদের কিছু উপকার করতে পারি নাই, কিন্তু সমবেদনা প্রকাশ করেছি, সরকারের কাছে সাহায্যের জন্য দেন-দরবার করেছি।

আ খো: পরে তো পার্লামেন্টের মেম্বার হয়েছিলেন।

বি চৌ: কংগ্রেস নেতা কিরণশঙ্কর রায় ’৪৬-‘৪৭ সালের দিকে দেশত্যাগ করে চলে যাওয়ায় ’৪৮ সালে তাঁর আসনটা ভেকেন্ট হয়। বরিশাল, ফরিদপুর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালি, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এই বিশাল এলাকার সবগুলো জেলা-শহর মিলে একটা আসন। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে আমাকে বলা হল এই আসনে আমাকে নির্বাচন করতে হবে। আমি বললাম, এই শহরগুলাতে একবার করে যেতে হলেও তো অনেক টাকা-পয়সা খরচ হবে। আমার তো পয়সা নাই। উনারা বললেন, ‘না, আপনাকে করতেই হবে।’ এই বাড়িটা বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে তিন হাজার টাকা কর্জ নিয়েছিলাম। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন আমাকে সাহায্য করেন। মোট নয় হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। আপনাদের শুভেচ্ছায়, আশির্বাদে আমি নির্বাচিত হই। আমি যেহেতু মাস্টার’দার সঙ্গে ছিলাম, গুলি খেয়েছিলাম, প্রাণ দিতে গিয়েছিলাম, সেজন্য লোকে আমাকে ভোট দিয়েছিল। বিভিন্ন এলাকার কংগ্রেস নেতারা আমাকে খুব সাহায্য করেন। সিলেটের বসন্তকুমার দাশ, ব্রজেন্দ্রনায়াণ চৌধুরী এঁরা আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনাকে এখানে আসতে হবে না, আপনার হয়ে আমরাই ভোট চালাব।’ বরিশালের সতীন সেন, মনোরঞ্জন গুপ্তরাও তাই বললেন। ফরিদপুরে একবার গিয়েছি, পাঁচ-সাতজনের সঙ্গে দেখা করেছি, একটা ভোটার লিস্ট দিয়ে এসেছি। ঢাকাতে আমাকে খুব খাটতে হয়েছে। তো, যাই হোক, ৫৪ সাল পর্যন্ত আমি এমএলএ ছিলাম। আমি সাধ্যমত জনগণের সেবা করেছি।

আ খো: ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় আপনার অবস্থান কী ছিল?

বি চৌ: মুসলীম লীগের বিরুদ্ধে সব পার্টি এক হয়ে যখন যুক্তফ্রন্ট করল, আমারও উচিত ছিল ওখানে যোগ দেওয়া। কিন্তু আমার পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কথার বাইরে তো আমি যেতে পারব না, তাই আমি যোগ দিতে পারি নাই। আমার পার্টির কথামতো আমি পূর্ণেন্দু দস্তিদারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। পূর্ণেন্দু বাবু ভিন্নমতের লোক হলেও আমার বন্ধু ছিলেন। তিনিই নির্বাচিত হলেন। ’৫৮ সালে তো মার্শাল ল’ হয়ে গেল।

আ খো: এরপর কী করলেন?

বি চৌ: এরপর আমার রাজনীতি ছিল সমাজসেবা। যেখন যেটুকু সম্ভব আমি জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছি। এখন পর্যন্ত তা-ই করে যাচ্ছি।

এ ক: এরমধ্যে তো ভাষা আন্দোলন হল। তখন তো আপনি এমএলএ।

বি চৌ: হ্যাঁ, তখন আমি এমএলএ। রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়ার পক্ষে আমরাও কাজ করেছি। কিন্তু ২১ শে ফেব্রুয়ারির দিন যে ছাত্ররা ১৪৪ ব্রেক করবে, সেটা আমরা জানতাম না। আড়াইটার সময় অ্যাসেম্বলি ছিল, আমি দুইটার সময় একটা রিকশা করে বের হয়েছি। ছাত্ররা আমার পথ আটকাল। ওরা বলল, ‘আপনাকে পার্লামেন্টে যেতে দিব না, পুলিশ আমাদের অনেক ছাত্রকে গুলি করে মেরেছে।’ ছাত্ররা আমাকে মেডিকেল হোস্টেলে নিয়ে গেল। ওখানে বরকতের লাশ দেখলাম। একেবারে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। আমি অনেকক্ষণ চোখ বুঁজে হাতজোড় করে তার আত্মার সদ্গতি কামনা করে ছাত্রদেরকে বোঝালাম, ‘আমি তো সরকার দলের লোক নই, সরকার তো মুসলীম লীগের, আমি কংগ্রেসের লোক। আমাকে তোমরা যদি অ্যাসেম্বলিতে যেতে না দাও, তা হলে এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করবে কে?’ তারা বুঝল। আমাকে যেতে দিল। আমি গিয়ে আমাদের লোকজনকে খবর দিলাম। ঐদিন আমরা চিফ মিনিস্টার নূর আলম সাহেবকে কোনো কথাই বলতে দিই নি। তিনি বাধ্য হলেন অ্যাসেম্বলি স্থগিত করে ছাত্রদের ডেডবডি দেখতে যেতে। তিনি একটা তদন্ত কমিটি করার ঘোষণা দিলেন। আমার দলের প্রেসিডেন্ট সুরেশ্চন্দ্র দাশগুপ্ত আমাকে বললেন, ‘তুমি এখন গা ঢাকা দাও, বাড়ি চলে যাও, গোপনে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাও। এই আন্দোলনকে আমাদের সফল করতে হবে।’

আ খো: ‘৬২-র শিক্ষা আন্দোলনের সময় আপনার অবস্থান ও ভূমিকা কী ছিল?

বি চৌ: তিনটা ছাত্র সংগঠন ছিল তখন—ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ আর ছাত্র কংগ্রেস। কংগ্রেসের সেক্রেটারি হিসাবে আমি আমার দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্র কংগ্রেসকে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সংগঠিত করি, সহযোগিতা করি। কানুনগোপাড়া কলেজে ছাত্র কংগ্রেস খুব শক্তিশালী ছিল। ওখান থেকেই আমাদের ছাত্ররা আন্দোলন পরিচালনা করত। বৈদ্যনাথ মিত্র, চিত্ত দাশ, নরেন সেন এরা ছিল আমাদের ছাত্র সংগঠনের নেতা। এদের মাধ্যমেই আমি ছাত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতাম।

এ ক: ’৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ও তো আপনি জেলে ছিলেন এক বছরের জন্য। সেবার আপনাকে জেলে যেতে হয়েছিল কেন?

বি চৌ: কারণ আমি ইন্ডিয়ার চর! আমাকে বাইরে রাখলে আমি পাকিস্তানের ক্ষতি করতে পারি। তাদের মানসিকতা বরাবরই এরকম। একবার আমি পার্লামেন্টে বক্তৃতা করার সময় চিফ মিনিস্টার নূরুল আমিন বলে ওঠেন ‘এন ইন্ডিয়ান এজেন্ট স্পিক্স’। আমি বলেছিলাম, ‘হোয়াট ডু ইউ সে, মিস্টার চিফ মিনিস্টার? ইউ হ্যাভ টু এক্সপাঞ্জ ইট।’

আ খো: এরপর তো গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একাত্তর। একাত্তরে কোথায় ছিলেন?

বি চৌ: একাত্তরের মার্চ মাস পর্যন্ত আমি এই বাড়িতেই ছিলাম। এরপর গ্রামের বাড়িতে যাই। ওখানে আমাদের স্কুলের মাঠে ছেলেদেরকে সংগঠিত করা, ট্রেনিং দেওয়া এসবের ব্যবস্থা করেছিলাম। যারা যুদ্ধে যাচ্ছে, তাদেরকে খাওয়া সরবরাহ করা ইত্যাদি করতে লাগলাম। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুস সামাদ আমাকে খুব সাহায্য করেছিল। ওকে আমিই নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছিলাম। একাত্তরের মে মাসে সে আমাকে বলল, ‘দাদা, আপনাকে আমি আর বাঁচাতে পারব না। আপনি কলকাতায় চলে যান। আপনি থাকলে ওরা গ্রামের সবাইকে মেরে ফেলবে। আপনি না থাকলে আমি আমার গ্রামের লোকদেরকে বাঁচাতে পারব। আমি কথা দিচ্ছি আমি এখানে মিলিটারি আসতে দেব না। সেই ব্যবস্থা আমি করব।’ অনেক চিন্তাভাবনা করে, সবার সঙ্গে পরামর্শ করে শেষ পর্যন্ত আমি কলকাতা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। একজনের কাছে মাত্র এক হাজার টাকায় একটা জমি বিক্রি করে আমি চলে গেলাম। আশপাশের এলাকার প্রায় দুশো লোক আমার সঙ্গে কলকাতা গেল। ওখানে ক্যাম্পে থেকে তরুণদেরকে যুদ্ধে সংগঠিত করতে শুরু করি। ইন্ডিয়ান গভমেন্টের সহযোগিতায় শরণার্থী ক্যাম্পে স্কুল করা, ওগুলো পরিচালনা করা ইত্যাদি কাজও করেছি। এরকম প্রায় ৪০টা স্কুল আমি করেছিলাম।

এ ক: দেশে ফিরে আসলেন কখন?

বি চৌ: ’৭২ সালের জানুয়ারিতে।

আ খো: স্বাধীন দেশে ফিরে এসে তো আপনি আর রাজনীতিতে যোগ দেন নি।

বি চৌ: না, রাজনীতিতে যোগ দিই নি। আমি আমার সমাজসেবার কাজই করে যাচ্ছি।

এ ক: মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। স্বাধীন দেশে তার কতটুকু প্রতিফলন দেখতে পেলেন?

বি চৌ: আসলে কমিউনিস্ট পার্টি বলেন আর আওয়ামী লীগ বলেন, কেউই সাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত না। সাম্প্রদায়িকতার বীজ এদেশের সব রাজনৈতিক ধারার মধ্যে রয়ে গেছে।

এ ক: আজকের বাংলাদেশে ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদের যে প্রচণ্ড উত্থান, এর জন্য ইতিহাসের কোন কোন ভ্রান্তিকে দায়ী মনে করেন?

বি চৌ: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ সাহেবের উচিত ছিল সারাদেশের রাজাকার-আলবদর নেতা সহ চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদেরকে মেরে ফেলা। তিনি সেটা করেন নি, উল্টো সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। এটা ছিল সবচেয়ে বড় ভুল।

এ ক: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান অধঃপতিত অবস্থার কথা আপনি জানেন। এ থেকে উত্তরণের জন্য কী করা উচিত বলে আপনার মনে হয়?

বি চৌ: সবার আগে দরকার একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা। এক দেশে একসঙ্গে এত রকম শিক্ষাধারা চলতে পারে না।

এ ক: বিদ্যালয়ের পাঠক্রমের মধ্যে ধর্মশিক্ষা থাকা কি আপনি উচিত বলে মনে করেন?

বি চৌ: একদম না।

আ খো: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। অসুস্থতার মধ্যেও কয়েকদিন ধরে আমাদেরকে সময় দিলেন।

বি চৌ: আপনারা আমার প্রীতি, আর নমস্কার গ্রহণ করুন।

free counters

—-

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কামরুজ্জমান জাহাঙ্গীর — জানুয়ারি ১১, ২০১০ @ ৮:৫৭ পূর্বাহ্ন

      বিনোদবিহারীর সাক্ষাৎকারটি আবারও পড়লাম। বেশ উদ্দীপনামূলক কথকতা এখানে উঠে এসেছে। তবে এর ভিতর দিয়ে আরও বেশি কিছু কথাও জানার ইচ্ছা হচ্ছে। আচ্ছা, তিনি তো দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মূল-রাজনীতির সাথে কখনই জড়িত ছিলেন না। এখনও কি তিনি মনেপ্রাণে কংগ্রেসের সাথেই যুক্ত? তিনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আরও বলিষ্ঠভাবে সংযুক্ত হলে ভালো লাগত। আর কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরাসরি আমাদের, মানে, এই দেশের মানুষের অবস্থান না থাকলেও এদেশের বেশির ভাগ মানুষ কিন্তু মুসলিম লীগ বা শেরে-এ-বাংলার কৃষক প্রজা পার্টির মাধ্যমে তাদের মুক্তির পথ বের করতে চেয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি মাস পিপলের সাথে তত জড়িত হতে না পারলেও তেভাগা আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষের অনেকটা কাছাকাছি আসতে পেরেছিল। তিনি যখন কংগ্রেসের জন্য জেল খাটছেন, তখন কিন্তু মানুষ তেভাগার দাবিতে সরাসরি আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। তিনি যে দুইবার এমএলএ নির্বাচিত হলেন তাও তো কংগ্রেসের হয়েই? কেবলমাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটেই তিনি নির্বাচিত হলেন? তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কংগ্রেসের রাজনীতিকে কি আর রাজনীতির সঠিক ধারা বলা যাবে? তিনি এই দেশের রাজনীতির পালসটা ধরতে চাননি?! তিনি যে অত গুরুতরভাবে আহত হলেন সেটা কোন্ স্থানে। সেটার ধরনই বা কেমন ছিল?

      আরও কিছু বিষয় জানার আগ্রহ কার্ও কারও থাকতে পারে, কারণ, যুব কংগ্রেসের আন্দোলনের ধরন নিয়ে কেউ কেউ এমন কথাও বলেন যে, এঁরা নাকি মা-কালির নামে নিজের শরীরের রক্ত প্রতীকীভাবে উৎসর্গ করে তবেই গেরিলা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।
      আচ্ছা, কমিউনিস্ট পার্টি আর মুসলিম লীগের সাথে তাদের সম্পর্ক কেমন ছিল? তাদের দলে কি মুসলিম সম্প্রদায়ের কোনো লোক ছিলেন?

      তাকে নিয়ে কিছু বাজে মন্তব্যও (আমি নিজে বিশ্বাস করতে চাই, এসব সঠিক নয়) চালু আছে যে, যুব কংগ্রেস কর্তৃক পরিচালিত এই সশস্ত্র সংগ্রামে তার ভূমিকা তত স্পষ্ট ছিল না। তিনি আসলে পলিটিক্যাল মিথ। এই বিষয়টি নিয়ে আরও স্পেসিফিক কথা তাঁর কাছ থেকে নেয়া যেত কি? তিনি বিপ্লবী হিসাবে সর্বান্তকরণে একজন দৃষ্টান্তস্থাপনকারী ব্যক্তিত্ব হিসাবে থাকুন, তাই আমি চাই। যার জন্যই এত কথা জানার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম।

      – কামরুজ্জমান জাহাঙ্গীর

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সৈয়দ আলি — জানুয়ারি ১৪, ২০১০ @ ১:২৩ অপরাহ্ন

      কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর সম্ভবত যুগান্তর পার্টির সাথে যুব কংগ্রেসকে মিলিয়ে ফেলেছেন। কারণ, তখন দুটিই বিপ্লবী দল ছিলো, যুগান্তর (সূর্য সেন) ও অনুশীলন (মহারাজ)। যা হোক, তাঁর অনুসন্ধিৎসু মনের প্রশংসা করি।

      – সৈয়দ আলি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com