শিল্পী নাসিমুল খবিরের নিরিখ ও নির্মাণ

আলফ্রেড খোকন | ৩ জানুয়ারি ২০১০ ৯:২৫ পূর্বাহ্ন

budiganga.jpg
বুড়িগঙ্গা

ভাস্কর নাসিমূল খবির রচিত শ্রীমতী বোরাক ও সহোদরাবৃন্দ নামের কয়েকটি রচনার প্রদর্শনী চলছিল এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ-এর গ্যালারী অব ফাইন আর্টস-এ। ২৫ ডিসেম্বর এই প্রদর্শনী শুরু হলে আমরা বন্ধুরা মিলে যখন সন্ধ্যার আলো-ছায়ামগ্ন গ্যালারীর প্রবেশপথ দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন মনে একধরনের কৌতূহল ভিড় করছিল, কারণ নাসিমূল খবিরের একক কোনো রচনার প্রদর্শনী এর আগে চোখে পড়েনি।

garments-girl.jpg…..
গার্মেন্টস কন্যা
…….
চারুকলার ভাষায় নাসিমূলের কাজকে ভাস্কর্য শিরোনামে পরিচয় করিয়ে দেয়া আছে, অর্থাৎ শ্রীমতী বোরাক ও সহোদরাবৃন্দ একটি ভাস্কর্য প্রদর্শনী। সেই অর্থেই নাসিমূল খবির একজন ভাস্কর। যেখানে ভাস্কর নিজেই বলেছেন, ‘‘এই প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য আমার নিকট অতীত ও সাম্প্রতিককালের পরস্পর সম্পর্কিত ভাস্কর্য ধারণা বা ধারণাজাত পরীক্ষা নিরীক্ষার খসড়া প্রকাশ।”

শুধু তাই নয়, ভাস্কর তার কাজ নিয়ে প্রদর্শনীপত্রে নিজেই যা বলার তা অনেকটা বলে দিয়েছেন। সে বিষয়ে বললে একই বিষয়ে দ্বিতীয়বার বলা হবে।

এখন নাসিমূল খবিরের এই ভাস্কর্যকে কয়েকটি রচনা বললাম তার একটি খসড়া বাক্য আমি বলে নিতে চাই। শিল্পকলার যেহেতু ব্যাকরণ আছে, তাই সে সম্পর্কে জেনেই তা নিয়ে কথা বলতে হয়। কিন্তু যিনি এই ব্যাকরণ জানেন না তিনি কী করে বলবেন! আমার মনে ব্যাকরণের বাইরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকরণ আছে আর তা দর্শক-ব্যাকরণ। একজন দর্শক ব্যাকরণ জেনে কোনো দৃশ্য দেখেন না। (একটি শিশু ব্যাকরণ জেনেই ভাষায় কথা বলতে শেখে না।) সেই সুবাদে দর্শকের গ্যালারী থেকে বলার অধিকার চর্চাই নাসিমূল খবিরের শ্রীমতী বোরাক ও সহোদরাবৃন্দ রচনার প্রদর্শনী প্রসঙ্গে কথা বলা। এবং একইভাবে এগুলিকে ভাস্কর্য বলার চেয়ে নির্মাণ বা রচনা বলতেই আমি স্বচ্ছন্দ। কারণ এখানে এমন এক সৃষ্টির সাধ পাওয়া যাবে যা রচনার মতই পাঠ করা সম্ভব। এক একটি কাজের মধ্যে অনেকগুলি পৃষ্ঠা আছে, প্রতিটা পৃষ্ঠায় আরও আর গভীরে প্রবেশের তোরণ—জীবনের, জীবন যাপনের।

গ্যালারীতে প্রবেশ করার পর দেখতে দেখতে আমার প্রথম দেখা রচনাটির শিরোনাম ‘বুড়িগঙ্গা’। কাঠ ও লোহার যৌথ নির্মাণ ‘বুড়িগঙ্গা’। আমার মত চিত্রকলার ব্যাকরণ না-জানা দর্শকের চোখে এটি প্রথমে ছিল নেহাত কাঠ ও রডের একটা কিছু। কিন্তু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর দেখলাম কাঠের অংশ মানে একজন উপুর হয়ে শোয়া নারী। দৃশ্যত যাকে নৌকা মনে হবে। নৌকার ছৈ যেন একজন নারীর দেহের পশ্চাৎদেশ। তারপর গ্রীবা থেকে যে রডটি উঠে গেছে উপরের দিকে একটা লোহার নাট’কে কেন্দ্র করে দুইসুতো দুই টুকরো রডেই নির্মিত ভাঁজ খেলানো চুল, যে কেউ তাকে পালের সাথে তুলনা করতে পারেন। এই কাজটি দেখতে থাকলে ধীরে ধীরে নাসিমূল খবির আপনাকে নিয়ে যাবে বুড়িগঙ্গায়, আর বুড়িগঙ্গা’র তীরে নস্টালজিয়া রচিত এমন এক পৌরাণিক আবহে, যার আবহসঙ্গীত বুড়িগঙ্গা’র ছলাৎচ্ছল গতি, প্রবাহ আর শক্তিমত্তায় অধীর। তীর থেকে দেখা নদীর দর্শকের যেমন নদীতে নামার আকাঙ্ক্ষা জাগে তেমনি এক গভীর-গোপন কামনা পেয়ে যেতে পারেন কাঠ ও রডে নির্মিত নাসিমূল খবিরের ‘বুড়িগঙ্গা’য়।

ঠিক একই ধারায় তার নির্মাণগুলির মধ্যে আছে ‘গার্মেন্টস কন্যা’, ‘ইংলিশ রোডের মেয়ে’। ‘গার্মেন্টস কন্যা’ একইভাবে কাঠ ও রডের যুগল নির্মাণ। কাঠের অংশ আছে একটি মেয়ের কোমর থেকে নিম্নভাগ। এবং শক্ত ও ঋজু মেরদণ্ডীর হাতে যথারীতি তিনটি নাটের এক টিফিন ক্যারিয়ার, এবং মাথার চুলে বাতাস পেলে একজন কিশোরীর যেমন গতিময় হয়ে ওঠে অবয়ব, তেমনি এক গতি। এক অদ্ভুত উপলব্ধি দাঁড় করিয়ে দেবে তার ‘গার্মেন্টস কন্যা’। যা বাস্তবতার চেয়ে আরও বেশি, আরও সংবেদনশীল।

‘ইংলিশ রোডের মেয়ে’ শীর্ষক কাজ দুটিও একই মাধ্যমে নির্মিত। তবে সেখানে শিল্পীর এক গভীর-গোপন পর্যবেক্ষণ সত্যিই আমাদেরকে নিরিখ করতে শেখায়। বহুদিনের পুরনো এখন লুপ্ত ইংলিশ রোডের যৌনপাড়ার মোড়ে খদ্দের খোঁজার দৃশ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের সেইসব দৃশ্য আজও বিষণ্ন করে, বেদনার ইংলিশ রোড। কিন্তু লুপ্ত সেই দৃশ্যের স্মারক তার এই অভিনিবেশী কাজ। যেখানে পাওয়া যাবে কিশোরীর শরীররেখা, কাঠের প্রতি কোপে কোপে বেরিয়ে পড়বে এমন এক জীবন যা সত্যিই পূঁজি-সভ্যতার প্রলোভনে প্রপঞ্চময়। যেন শৈশবে হারিয়ে যাওয়া বাবার আদরে ভাইয়ের স্নেহের এক না ফেরা কিশোরী। তরুণী হয়ে ওঠার আগেই যে আবার হারাবে। প্রাণবন্ত, স্বপ্নময় এক একজন বালিকার করুণ সঘন আকুতির সেইসব কাহিনীর উপর এমন এক নিস্তব্ধতা তিনি নির্মাণ করে দিয়েছেন, যা লোহা আর শুকনো কাঠেই যেন সম্ভব। নাসিমূল খবিরের অন্যান্য কাজ প্রসঙ্গে আমার দৃষ্টি ফেরাব না। কারণ এইখানে শিল্পী বসতবাড়ির ভিটেমাটি। অভিনন্দন! আমন্ত্রণ ধারাবাহিকতার সম্ভাবনাকে মনে রেখে…।

কারওয়ানবাজার, ঢাকা ৩০/১২/২০০৯

jao_ajana@yahoo.com

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রেজাউল করিম — জানুয়ারি ৬, ২০১০ @ ৩:০৩ অপরাহ্ন

      ক.
      এই লেখক ব্যাকরণ জানেন না।
      তাই তিনি ভাস্কর্য না বলে রচনা বলেন; কারণ রচনা মানে পাঠসম্ভব হওয়া। তাহলে ভাস্কর্য বিষয়ে লেখকের দর্শক-ব্যাকরণ কী সংজ্ঞা দিলো—যাহা পাঠযোগ্য নহে তাহা ভাস্কর্য হয়, নিদেনপক্ষে, ভাস্কর্য পাঠের অযোগ্য বর্গভূক্ত। না জানা তাহলে সুবিধা উৎপাদী, স্রষ্টা হবার পরিসর দেয়, অজ্ঞানেই সৃষ্টিশীলতা। লেখক-ব্যাকরণে রচনা হতে হলে ভাস্কর্য না হতে হবে, গ্রন্থ হতে হবে, উল্টানোর জন্য পৃষ্ঠা থাকতে হবে।
      খ.
      পুঁজিকে প্রতিরোধ/গালাগাল করবার জন্য যা পুঁজির সৃষ্টি না তার দায় পুঁজির উপর দেয়া যায় কি? বেশ্যাবৃত্তি পুঁজি-সভ্যতার প্রলোভনপূর্ব। এর দায় পুঁজিকে দেয়ার সুবিধা আছে বটে; patriarchy/masculinity বেশ অন্তরালবর্তী হতে/থাকতে পারে।

      – রেজাউল করিম

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রেজা ঘটক — জানুয়ারি ৮, ২০১০ @ ১০:০৯ অপরাহ্ন

      একজন কবি যখন একজন শিল্পীর কোনো নির্মাণকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারেন, তখন সেই সৃষ্টি সত্যি সত্যি একটা অশরীরী আবহে নতুন মাত্রা লাভ করে। শিল্পী নাসিমুল খবির ডিউক যখন সেই কায়াটি আমাদের আগেই দেখিয়ে দেন, তখন তা উপলব্ধি করার জন্য শুধু দেখার চোখই যথেষ্ট। আর খোকন যেহেতু কবি, তাই কবির দৃষ্টিতে সেই সৃষ্টি আরো বেগময় হয়েছে। ডিউকের বিষয় নির্বাচন আর বাস্তবে তার উপস্থাপনার ঢঙটি দর্শকদের অবশ্যই মুগ্ধ করে। বিশেষ করে পুরান ঢাকার ওপর তার গবেষণা আর দীর্ঘ শ্রমসাধ্য কাজগুলো আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। ঢাকার অনেক বিলুপ্ত বিষয় আবারো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আমাদের হারানো ঐতিহ্যকে। আর তা শিল্পী নাসিমুল খবিরের হাতে আবারো নবরূপ লাভ করেছে। যা হয়তো নবীন শিল্পীদের ভাবনাকে আরো সমৃদ্ধ করবে।

      – রেজা ঘটক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আলফ্রেড খোকন — জানুয়ারি ২৪, ২০১০ @ ২:৪৮ অপরাহ্ন

      আপনার কাছে বইজাতীয় বিষয় ছাড়া তাহলে আর কিছু পাঠ করা যায় না। পড়াই পাঠ!

      ভাই সাহেব, যে কোনো রচনাই (এই রচনা মানে আপনি কি প্রবন্ধ ভাবলেন?) পাঠ করা যায়, ভাস্কর্যও একধরনের রচনা। তা পাঠ করা যায়। এ বিষয়ে আপনি চারুকলার উচ্চতর জ্ঞানসম্পন্ন লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিষ্কার করে নিতে পারেন।

      আমি যে চারুকলার ব্যাকরণ জানি না, তা লেখায়ই বলে দিয়েছি। তো আপনার কণ্ঠে এটা তো শোনার কোনো দরকার নেই, তাই না? না কি আপনি ওই অংশটুকু জাম্প করেছেন। দর্শক তো ব্যাকরণ বই নিয়ে কোনো কিছু দর্শন করিতে যান না।

      তো ভাল, আপনি মতামত দিলেন, এটা অনেক ভাবাবে আমাকে।

      – আলফ্রেড খোকন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রেজাউল করিম — ফেব্রুয়ারি ১, ২০১০ @ ২:৩৬ অপরাহ্ন

      “এবং একইভাবে এগুলিকে ভাস্কর্য বলার চেয়ে নির্মাণ বা রচনা বলতেই আমি স্বচ্ছন্দ। কারণ এখানে এমন এক সৃষ্টির সাধ পাওয়া যাবে যা রচনার মতই পাঠ করা সম্ভব। এক একটি কাজের মধ্যে অনেকগুলি পৃষ্ঠা আছে, প্রতিটা পৃষ্ঠায় আরও আর গভীরে প্রবেশের তোরণ—জীবনের, জীবন যাপনের।” – এই কথাগুলা তো আপনার। আমাকে কীভাবে দায়ী করলেন?

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com