কিস্তি ৫

ছফামৃত

নূরুল আনোয়ার | ১২ জানুয়ারি ২০১০ ১০:৩৮ অপরাহ্ন

শুরুর কিস্তি

(কিস্তি ৪-এর পর)

sofa_other3.jpg……
মেরি ড্যানহাম ও রওনক জাহানের সঙ্গে, ১৯৯৭
…….
ডক্টর মফিজ চৌধুরীর কথায় ফিরে আসি। ডক্টর চৌধুরীর সঙ্গে কাকার সম্পর্ক ছিল বাপ-বেটার মত। তিনি চৌধুরী সাহেবকে বাবা বলে ডাকতেন। ডক্টর চৌধুরী ইন্দিরা রোডে থাকতেন। তাঁর বাসভবনের নাম ছিল ‘শেরিফা নীড়’। ছফা কাকার মুখে শুনেছিলাম, শেরিফা নীড়ে ডক্টর মফিজ চৌধুরীর সঙ্গে অনেকদিন ছিলেন। গ্রাম থেকে আমার বাবা এসেও ওই বাড়িতে থেকে গেছেন। পরে পরে চৌধুরী সাহেব কচুক্ষেতের বাসায় থাকতেন। ছফা কাকার সঙ্গে আমারও দুয়েকবার ওখানে যাবার সৌভাগ্য হয়েছে। তখন আমি কাকার সঙ্গে মিরপুরের শেয়াল বাড়িতে তাঁর কেনা ফ্ল্যাটে থাকতাম। এখন ওই জায়গার নাম রূপনগর। চৌধুরী সাহেবের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছফা কাকার সঙ্গে ভাল সম্পর্ক ছিল। কিন্তু শেষের দিকে ছফা কাকা চৌধুরী সাহেবের বাড়িতে যেতেন না। তবে ফোনালাপটা বহাল ছিল। শুনেছি চৌধুরী সাহেবের মেয়েরা তাঁকেও ঘর থেকে বের হতে দিতেন না। চৌধুরী সাহেব মারা যাবার কদিন আগে থেকে ছফা কাকা খুবই বিমর্ষ ছিলেন। তাঁর মধ্যে আমি একটা ছটফটানি ভাব লক্ষ্য করেছিলাম। তাঁকে বলেছিলাম, আপনার কি একবার দেখা করে আসা উচিত নয়?
—————————————————————–
“প্রথমে আগরতলা, তারপর কোলকাতা। আমি কোথাও বিশেষ সুবিধে করতে পারলাম না। আওয়ামী লীগের কর্তাব্যক্তিরা তাদের দলের লোক ছাড়া অন্য কাউকে ফ্রন্টে যেতে দিচ্ছিল না। আমি মুখ আলগা স্বভাবের লোক। কখন কী বলে ফেলি তার কোন স্থিরতা ছিল না। আমাকে নিয়ে বন্ধু-বান্ধবেরা মুশকিলে পড়ে গেলেন। ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা প্রবাসী বাঙালিদের ভেতর থেকে পাকিস্তানি গুপ্তচরদের খুঁজে খুঁজে বের করতে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছিল। এককথায় যদি কারও ওপর তাদের নেকনজর পড়ে আমরা ধরে নিতাম, তার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। এখন কথা হচ্ছে লাশটা পাওয়া যাবে কি না। আমি যেভাবে চলাফেরা করতাম এবং বেপরোয়া কথাবার্তা বলতাম, অনায়াসে আমাকে পাকিস্তানি স্পাই হিসেবে চিহ্নিত করা যেত। সেই সময়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কাজী নজরুল ইসলামের বন্ধু কমরেড মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে সে যাত্রায় জানে বেঁচে গেলাম।”
—————————————————————-
তাঁর মুখ থেকে আপনাআপনি একটা শিস বেরিয়ে এল। ওই সময় তাঁর একটা অভ্যাস হয়েছিল কোনো কাজে তিনি অপারগ হলে শিস দিয়ে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেন, তারপর চুপ মেরে যেতেন। তখন তাঁর সঙ্গে দ্বিতীয় কথা বলার সাহস করা যেত না। আমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, আমি চৌধুরী সাহেবের বাসায় যাই তাঁর মেয়েরা তা চায় না। তাদের ধারণা, চৌধুরী সাহেব সুযোগ পেলে তাঁর সহায়-সম্পত্তি সব আমার নামে লিখে দেবেন। তাছাড়া তারা তাঁকে অনেকদিন ধরে ঘর থেকে বের হতে দেন না।

চৌধুরী সাহেব মারা যাবার পর তাঁর নামে একটা ছাত্র-বৃত্তি চালু করেছিলেন ছফা কাকা। সাংবাদিক নাজিম উদ্দীন মোস্তানের এক বন্ধু ছিলেন, নাম আবদুল কাদির। তাঁর একটা কম্পিউটার সেন্টার ছিল। কম্পিউটার জগত নামে একটা পত্রিকাও তিনি বা’র করতেন। মোস্তান সাহেবের মাধ্যমে তাঁকে ধরে ‘ডক্টর মফিজ চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ নামে একটা কম্পিউটার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। যারা জিতত তাদের মধ্যে কম্পিউটার বিতরণ করা হত। এই প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েক বছর চালু ছিল। কাদির সাহেব মারা যাবার সঙ্গে সঙ্গে উদ্যোগটিও থেমে যায়। পুরনো ঢাকার ওদিকে ডক্টর মফিজ চৌধুরীর নামে একটা স্কুল খোলার চিন্তাও তাঁর মাথায় এসেছিল। ভাল চিন্তা তো তিনি করতেন, কিন্তু অর্থ এবং ব্যস্ততার কারণে তাঁর অনেক উদ্যোগ আলোর মুখ দেখতে পেত না।

সেসব কথা থাক। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে পাশ করে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। তখন ছফা কাকা মনের দিক থেকে অনেক পাকা। ইতোমধ্যে উপন্যাস সূর্য তুমি সাথী এবং রুশ উপন্যাসিক পি. লিডভের তানিয়া বাজারে এসে গেছে। প্রকাশ করতে না পারলেও রাসেলের রচনার বঙ্গানুবাদ, ইতিহাস গ্রন্থ সিপাহি যুদ্ধের ইতিহাসের কাজ শেষ করে ফেলেছেন। সত্যেন সেনের মহাবিদ্রোহের কাহিনী পড়তে গিয়ে তাঁর মনে উদয় হয়েছিল সিপাহি যুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থটি লেখার ইচ্ছে। তখন লেখক বইটির নাম দিয়েছিলেন ‘মহাজাগরণ’। এ সময় পত্র-পত্রিকায়ও তাঁর কম-বেশি লেখা প্রকাশ হতে থাকল। সুতরাং সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর নামধাম সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হতে আরম্ভ করেছে।

ঊনিশ শ’ আটষট্টি সালের দিকে রবীন্দ্রনাথের ওপর একটি প্রবন্ধ-সংকলন প্রকাশ করারও একটি উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য তাঁকে লেখকদের কাছ থেকে লেখা আনা এবং নানা জায়গা থেকে বিজ্ঞাপন সংগ্রহের ব্যাপারে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছিল। আয়ুব খান সরকার তখন রবীন্দ্র-সঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এটা বাংলাদেশের কোনো মানুষের কাম্য ছিল না। সারাদেশের শিক্ষিত মানুষ মিছিল-মিটিংসহ যত রকম প্রতিবাদের ভাষা আছে সব ব্যবহার করতে শুরু করল। ছফা কাকারাও বোধহয় এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন :

“খাজা শাহাবুদ্দিন যখন বললেন রবীন্দ্র সঙ্গীত ব্যান্ড করা হল, তখন অনেকেই স্টেটমেন্ট-ফেস্টেটমেন্ট দিতে চাইল। আমি বললাম যে স্টেটমেন্ট-ফেস্টেটমেন্ট দিয়ে কোন লাভ হবে না। মিনিংফুল একটা বই বের করা দরকার। চল্লিশ হাজার টাকা খরচ হবে। আমি স্টুডেন্ট ওয়েজকে রাজি করালাম। আমি আর কাজী সিরাজ বলে আমার এক বন্ধু; শিল্পকলা একাডেমির তখন সেক্রেটারি। তখন আনিসুজ্জামান স্যারও বললেন, বিভিন্ন লোকদের থেকে লেখা নিয়ে আস। রবীন্দ্রনাথকে ডিফেন্ড করছি, সে একটা আনন্দ আছে না; দৌঁড়ে দৌঁড়ে গিয়ে লেখা নিয়ে আসছি। দু’ আনা খরচ দেয়, তিন আনা খরচ দেয়। তখন আমি ভাবলাম যে আমার একটা লেখা কি তারা ছাপবে; এত কষ্ট করছি একটা লেখাও যদি না ছাপে—সমস্ত প্রতিভা দিয়ে আইডিয়াটা তৈরি করছি। তারপরও আমার ভয় ছিল যে এরা হয়ত আমার লেখা ছাপবে না। আমি লেখাটা লিখে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে পাঠিয়েছি। সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের রবীন্দ্র প্রসঙ্গ বলে একটা কাগজ ছিল ওখানে লেখাটা তিনি ছেপেছেন এবং অংশবিশেষ স্টেটসম্যান-এ অনুবাদ করে ছেপেছেন। আমার একটা শক্তি হয়ে গেছে। (ছফা সা., পৃ. ২০)

কিন্তু সমস্যা বাঁধল প্রফেসর মুনীর চৌধুরীকে নিয়ে। তিনি বেঁকে বসেছেন আহমদ ছফার লেখা যদি ওখানে থাকে তিনি লেখা দেবেন না। এদিকে প্রফেসর মুনীর চৌধুরীর লেখার ধরন দেখে ছফা কাকা গেছেন খেপে। তিনি প্রফেসর মুনীর চৌধুরীর লেখা ছাপার যোগ্য কিনা সেই প্রশ্ন করে বসলেন। লিখেছেন :

“সেটা মুনীর চৌধুরী সাহেবের এই ধরনের একটা এলিটিস্ট ব্যাপার ছিল। প্রচণ্ডভাবে ছিল। এটা মেনেও নিয়েছিল সবাই। তখন আমি গিয়ে পাতলাখান লেনে ম্যানাস্ক্রিপ্ট বের করেছি। ম্যানাস্ক্রিপ্ট বের করে মুনীর চৌধুরীর লেখাটা বের করেছি। দেখি রবীন্দ্রনাথের কোটেশন বাইশ লাইনের মত, উনি লিখেছেন পনের সতের লাইনের মত। আমি আনিস স্যারের কাছে বললাম যে, এ লেখা ছাপা যাবে না; এটা লেখাই হয় নাই। উনি তো আমাকে ভেটো দেবেন, সুতরাং আমি মনে করলাম যে, অফেন্স ইজ দ্যা বেস্ট ডিফেন্স। আনিস স্যার তো নীল হয়ে গেছেন, কারণ মুনীর চৌধুরী ওনার খুব ফেভারিট এবং ওনার বসও। এরপর আমি ভিতরে ঢুকলাম, মুনীর চৌধুরীর ওখানে। বললেন, তুমি কেন আসছ? আমি বললাম যে লেখাটা ছাপা যাবে না। আর একটা লেখা দিতে হবে। লেখা হল নাকি এটা? উনি লেখাটা বদলেও দিলেন। আমার লেখাটা নিয়ে কোন কথা বললেন না। (ছফ. সা., পৃ. ২১)

অবশেষে এই সংকলন-বইটি ডক্টর আনিসুজ্জামানের সম্পাদনায় ‘স্টুডেন্ট ওয়েজ’ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। ছফা কাকা যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন তার নাম ছিল ‘রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতি সাধনা’। পরবর্তীতে এই প্রবন্ধটি তাঁর বিখ্যাত বই বাঙালি মুসলমানের মন-এ অন্তর্ভুক্ত হয়। ঊনিশ শ’ আটষট্টি সালের দিকে তিনি কবীর চৌধুরীর আগ্রহে বাংলা একাডেমি জার্নালের জন্য `Literary Ideals in Bengal’ নামে একটি ইংরেজি প্রবন্ধ রচনা করেন। এটি পরে বাংলায় অনুবাদ করে ‘বাংলার সাহিত্যাদর্শ’ নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। ঊনিশ শ’ পঁচাত্তর সালে বাংলাভাষা : রাজনীতির আলোকে গ্রন্থে এ লেখাটি স্থান পায়।

ঊনিশ শ’ উনসত্তর সালে ছফা কাকা স্বদেশ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করেছিলেন। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন তিনি নিজে। তারুণ্যের উন্মাদনায় পত্রিকাটি প্রকাশে এগিয়ে এসেছিলেন বলা যায়। এ পত্রিকা সম্পর্কে তাঁর লেখা থেকে জানা যায়:

“আমরা ‘স্বদেশ’ নামাঙ্কিত একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এই প্রয়াসের সঙ্গে রণেশদা, সত্যেনদা, কালি-কলম প্রকাশনীর প্রয়াত আলীম ভাই এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রথম বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি মন্ত্রী ড. মফিজ চৌধুরীসহ অনেকে জড়িত ছিলেন। বয়সের দিক দিয়ে আমি ছিলাম সবচাইতে ছোট। যে তিনটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে সম্পাদক হিসেবে আমার নাম ছাপা হয়েছিল।

সবচাইতে দুরূহ কাজ বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করার দায়িত্ব আমার ওপর এসে পড়েছিল। একটি বিজ্ঞাপনের জন্য আমাকে সাইয়িদ আতীকুল্লাহ সাহেবের কাছে যেতে হয়েছিল। তখন তিনি ‘ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিটেডের’ পিআরও-র দায়িত্ব পালন করছিলেন। আমি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ছোটখাট ভদ্রলোকটি আমার চোখে চোখে তাকিয়ে খুব কড়া এবং খাড়া স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, কী চাই। তার প্রশ্ন করার ধরন দেখে আমি থতমত খেয়ে গেলাম। বসতে সাহস হল না। আমতা আমতা করে বললাম, একটি পত্রিকা প্রকাশ করছি আমরা, সেই জন্য একটি বিজ্ঞাপন চাইতে এসেছি। বিজ্ঞাপন চাইতে এসেছেন? এ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে মিনিটখানেক চুপচাপ থাকলেন। আমি বললাম, হ্যাঁ। লেখাপড়া কতটুকু করেছেন? সংকুচিতভাবে বললাম, এবার এমএ দেব। তিনি বললেন, এসব বনের মোষ তাড়ানো বাদ দিয়ে লেখাপড়াটা ভালভাবে করলেই পারেন। তাঁর কথা শুনে আমার শরীর একটু একটু জ্বালা করছিল। আমি ভাবলাম, না-হয় বিজ্ঞাপন না-ই পেলাম। এই ঠোঁটকাটা ভদ্রলোকটির কথা-বার্তাগুলোর একটা জবাব দেয়া প্রয়োজন। সমস্ত সংকোচ ঝেড়ে ফেলে একটা চেয়ার টেনে তাঁর সামনে গ্যাঁট হয়ে বসলাম এবং ঝগড়া শুরু করলাম। এভাবেই সাইয়িদ আতীকুল্লাহ সাহেবের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তিনি আমাকে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, কিন্তু আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা এই বিজ্ঞাপন সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। জীবনে আমি বনের মোষ তাড়াইনি।” (ছফা খ. ৪, পৃ. ১৫৫)

স্বদেশ পত্রিকা সম্পর্কে আরও সাক্ষ্য পাওয়া যায় ডক্টর মোরশেদ শফিউল হাসান এবং কবি সোহরাব হাসান সম্পাদিত আহমদ ছফা স্মারকগ্রন্থে:

“পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন আহমদ ছফা। এ ছাড়া সম্পাদনা পরিষদে ছিলেন জাহাঙ্গীর চৌধুরী (ড. মফিজ চৌধুরী), সরদার ফজলুল করিম, সন্তোষ গুপ্ত, আবদুল হালিম, [সৈয়দ] আকরাম হোসেন, মুহম্মদ নূরুল হুদা ও কাজী সিরাজ। উপদেষ্টাদের মধ্যে ছিলেন সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, ড. আহমদ শরীফ প্রমুখ। সহকারী সম্পাদক ছিলেন মুনতাসীর মামুন ও অসীম সাহা।” (ছফা, স্মা. পৃ. ৪৭১)

ছফা কাকা তাঁর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ছফারা যুগে যুগে জন্মায় না, এক শ’ বছরে একবারই জন্মায়। কিন্তু এই ছফা আপনাআপনি বেড়ে ওঠেননি। ফসলের জন্য যেমন আলো, বাতাস, মাটি ইত্যাদির দরকার, তেমনি একজন মানুষকে সত্যিকার অর্থে বেড়ে ওঠার জন্য দরকার অনুকূল পরিবেশ। সেই অনুকূল পরিবেশ হচ্ছে কিছু ক্ষণজন্মা মানুষের সান্নিধ্য লাভ, যাঁদের সাহচর্য্য, দয়া-দাক্ষিণ্য, ভালবাসা অন্যকে প্রসার করার ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। ছফা কাকার ওপর এমন কিছু স্থান-কাল-পাত্রের প্রভাব রয়েছে, যা তিনি চেতন-অবচেতন মনে নানা জায়গায় অবলীলায় উল্লেখ করেছেন। ডক্টর মোরশেদ শফিউল হাসান ছফা কাকার কথাগুলো গুছিয়েছেন এভাবে:

“১৯৬৭-৭০/৭১ সময়পর্বে প্রথম দিকে কাপ্তান বাজারের হোটেলে নাইল ভ্যালি, পুরনো ঢাকার খোশমহল, আমিনিয়া ও সলোজা রেস্টুরেন্ট, ফরাশগঞ্জের লালকুঠি, নারিন্দার কবি রফিক সন্যামতের বোনের বাড়ি, বাংলাবাজারের বিউটি বোর্ডিং, কামাল বিন মাহতাব সম্পাদিত ‘ছোটগল্প’ পত্রিকার লিয়াকত এভিনিউস্থ অফিস, গোবিন্দের চৌরঙ্গি রেস্টুরেন্ট ও জমাতখানা গলির টোনাদার দোকান প্রভৃতিতে; পরে আজিমপুরে সন্‌জীদা খাতুন ওয়াহিদুল হকের বাসায়, ইন্দিরা রোডে ড. মফিজ চৌধুরীর বাড়িতে এবং সর্বশেষ ড. আহমদ শরীফের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে সাহিত্যিক আড্ডা, বৈঠক, সঙ্গীতানুষ্ঠান, সাহিত্যসভা ইত্যাদিতে প্রায় নিয়মিত উপস্থিতি। সে সময়ের প্রতিষ্ঠিত ও নবীন অনেক লেখকই এসব আড্ডা ও সভায় যোগ দিতেন। এ ছাড়া যেতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে। এ সময় ফরহাদ মজহার ও হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সখ্যতার সম্পর্ক তৈরি হয়। অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের দ্বারাও। এছাড়া ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে আরও পেয়েছিলেন মুহম্মদ নূরুল হুদা, রফিক কায়সার, রফিক নওশাদ, মাশুক চৌধুরী, শাহনূর খান, হেলাল হাফিজ প্রমুখকে।” (ছফা, স্মা., পৃ. ৪৭১)

ঊনিশ শ’ সত্তুর সালে ছফা কাকা পিএইচ-ডি করার জন্য মনস্থির করেন। বাংলা একাডেমী তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামে প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন পত্র আহ্বান করে একটি বিজ্ঞাপন ছেপেছিল। ছফা কাকা তখনও এমএ পরীক্ষা দেননি। বন্ধু-বান্ধবেরা পরামর্শ দিলেন, তুমি ওই প্রোগামে আবেদন কর। বৃত্তিটা যদি পেয়ে যাও তাহলে তিন বছর তোমাকে খাওয়া-পরার চিন্তা করতে হবে না। বন্ধুদের কথা তাঁর মনে ধরেছিল। তখন প্রফেসর কবীর চৌধুরী বাংলা একাডেমির পরিচালক ছিলেন। তিনি তাঁকে বুঝিয়েছিলেন যে, যেহেতু তিনি তখনও এমএ পরীক্ষা দেননি তথাপি তাঁর আবেদনপত্রটি যেন গ্রহণ করেন। প্রফেসর কবীর চৌধুরী কোনো রকম আপত্তি না করে বলেছিলেন, দরখাস্ত করে দাও।

ছফা কাকা দরখাস্ত করেছিলেন এবং অন্য প্রার্থীদের মত ইন্টারভিউ কার্ডও পেয়েছিলেন। তারপর নির্দিষ্ট দিনে তিনি ইন্টারভিউ বোর্ডে গিয়ে হাজির হলেন। বোর্ডে উপস্থিত ছিলেন ডক্টর আহমদ শরীফ, প্রফেসর মুনীর চৌধুরী এবং ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক। তাঁদের মধ্যে ডক্টর আহমদ শরীফ ও প্রফেসর মুনীর চৌধুরী ছিলেন ছফা কাকার পূর্ব-পরিচিত এবং তাঁর শিক্ষক। সে সুবাদে তাঁরা দুজন তাঁর প্রতি সহায়ক ভূমিকা পালন করলেও ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক ছফা কাকাকে তিল পরিমাণ ছাড় দিতে রাজি হননি। তাঁর কথা হল তিনি এমএ পাশ করেননি। ডক্টর হক তাঁর প্রতি এমন আচরণ করছিলেন পারলে ছফা কাকার মুণ্ডু চিবিয়ে খাবেন। ছফা কাকাও ছাড় দেবেন কেন? তিনি লিখেছেন:

“চারু বন্দ্যোপাধ্যায় এমএ পাশ না করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। মোহিতলাল মজুমদারও এমএ পাশ ছিলেন না, তথাপি এখানে শিক্ষকতা করেছেন। আমি তো এমএ পাশ করবই, দু’ চার মাস এদিক-ওদিকের ব্যাপার। দরখাস্ত করে অন্যায়টা কী করেছি। শুনে ড. এনামুল হক কনে আঙুলটা মুখের ভেতর পুরে দিয়ে আমার দরখাস্তের সঙ্গে দাখিল করা থিসিসের পরিকল্পনার শিটগুলোর ওপর চোখ বুলোতে বুলোতে প্রশ্ন করলেন, তুমি কোন বিষয়ের ওপর কাজ করবে? কণ্ঠস্বর শুনে মনে হল ঝাঁঝ অনেকটা কমে এসেছে। আমি বিনীতভাবে জবাব দিলাম, ‘আঠার শ’ থেকে আঠার শ’ আটান্ন সাল পর্যন্ত বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব, বিকাশ এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং রাজনীতিতে তার প্রভাব।’ তখন ড. হক বললেন, তুমি মধ্যবিত্ত বলতে কী বোঝ সে বিষয়ে কিছু বল। আমি হ্যারল্ড লাস্কি, বি. বি. মিশ্রের ইংরেজি গ্রন্থ থেকে যে সকল রচনামৃত বিনিদ্র রজনীর শ্রমে কণ্ঠস্থ করেছিলাম গড় গড় করে উগরে দিতে থাকলাম।” (ছফা, খ. ১, পৃ. ১৮২)

ছফা কাকার মতে, ডক্টর এনামুল হক ব্যাকরণের মানুষ। সমাজবিজ্ঞানের কচকচিতে তাঁর আগ্রহ নেই। তিনি প্রফেসর মুনীর চৌধুরী, ডক্টর আহমদ শরীফ, প্রফেসর কবীর চৌধুরী সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা ছফা কাকাকে বিশেষ ঘাটাঘাটি করার চেষ্টা করেননি। ইন্টারভিউ বোর্ডের পরীক্ষকের কৃপায় হোক, কিংবা ছফা কাকার নিজগুণে হোক তাঁকে বিশেষ বিবেচনায় বাংলা একাডেমীর গবেষণাবৃত্তির জন্য মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। যেভাবে হোক এই গবেষণাবৃত্তির পেছনে প্রফেসর মুনীর চৌধুরীর অবদানকে অস্বীকার করা উপায় নেই। পরের দিন কৃতজ্ঞতা জানাতে ছফা কাকা চৌধুরী সাহেবের কাছে গিয়েছিলেন এবং অনুরোধ করেছিলেন তিনি যেন বাংলা একাডেমীর বৃত্তিটা পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। ছফা কাকার কথায় তিনি রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু এক জায়গায় তিনি বেঁকে বসলেন। ছফা কাকাকে যদি থিসিস রেজিস্ট্রেশন করতে হয় তাহলে সেটা করতে হবে বাংলা বিভাগ থেকে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে নয়। প্রফেসর চৌধুরীর কথা হল ছফা কাকা তিন বছর বাংলা বিভাগে পড়াশুনা করেছেন, সুতরাং অন্যদের চাইতে তাঁদের দাবি বেশি। কিন্তু ছফা কাকা নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকায় চৌধুরী সাহেব বিষয়টি অন্যদিকে মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেন। তিনি তাঁকে বোঝাতে চাইলেন, তুমি যেহেতু এমএ পাশ করনি, বাংলা একাডেমী তোমাকে বৃত্তিটা না-ও দিতে পারে। তার বদলে তিনি প্রস্তাব করে বসলেন, তুমি অস্ট্রেলিয়া চলে যাও, আমি তোমাকে সাহায্য করব। সেখানে তুমি ভাষাতত্ত্বের ওপর পিএইচ-ডি করতে পারবে। শুধু গ্র্যাজুয়েট থাকলেও ওরা কোন রকম আপত্তি করবে না। প্রস্তাবটা শুনে ছফা কাকা ভেতরে ভেতরে উল্লসিত হয়েছিলেন। কিন্তু পরক্ষণে তাঁর মধ্যে সূক্ষ্ম আপত্তি জেগে উঠেছিল। ছফা কাকা লিখেছেন:

“আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম এবং তিন বছর পড়াশোনা করেছি। খুব ভাল ছাত্র না হলেও আমার বুদ্ধি-বিবেচনা নিতান্ত তুচ্ছ পর্যায়ের ছিল না। মাতৃস্তন্যে শিশুর যেমন অধিকার, শিক্ষকদের স্নেহের ওপরও ছাত্রদের সে রকম অধিকার থাকা উচিত। সেই স্নেহ আমি শিক্ষকদের কাছ থেকে পাইনি। তার পরিণতি এই হল যে বাংলা বিভাগ ছেড়ে দিলাম এবং প্রাইভেট প্রার্থী হিসেবে পরীক্ষা দিয়ে বিএ পাস কোর্সে পাস করলাম। বিএ পাস করার পর ঠিক করেছিলাম, অধিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার আমার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমাকে আবার প্রাইভেটে পলিটিক্যাল সায়েন্সে এমএ পরীক্ষা দিতে হল। সমস্ত বিষয়টা আমি এভাবে চিন্তা করলাম। শিক্ষকদের কাছ থেকে সামান্য উৎসাহ, অনুপ্রেরণা যখন আমার ভীষণ প্রয়োজন ছিল, সে সময়ে কেউ আমার দিকে কেউ মুখ তুলে তাকাননি। যখন নিজের চেষ্টায় উঠে আসতে শুরু করেছি, সকলে আমাকে অনুগ্রহ বিতরণ করে কৃতজ্ঞতাপাশে বাঁধতে চাইছেন। আমি মনে মনে স্থির করলাম, যে বস্তু প্রয়োজনের সময় হাজারবার কামনা করেও পাইনি, সেই বিশেষ সময়টি চলে যাওয়ার পর তার কিছু ক্ষতিপূরণ যদি আমার কাছে সেধে এসে ধরাও দেয়, আমি গ্রহণ করতে পারব না। এই গ্রহণ করতে পারছি না বলেই চোখে পানি এসে গিয়েছিল। এরই মধ্যে একদিন তাঁর অফিসে গিয়ে বললাম, স্যার, ভাষাতত্ত্ব বিষয়টার প্রতিই আমি আকর্ষণ অনুভব করতে পারি না। সুতরাং উচিত হবে, স্কলারশিপটার জন্য অন্য কাউকে বেছে নেওয়া। তিনি আমার কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

মুনীর চৌধুরী সাহেব ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল মানুষ এবং তাঁর বোধশক্তি ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। আমার ধারণা তিনি আমার অকথিত অভিযোগটি আঁচ করতে পেরেছিলেন। সে কারণেই আমার থিসিসটা বাংলা বিভাগের অধীনে রেজিস্ট্রেশন করতে চাপাচাপি করছিলেন।” (ছফা. খ. ১, পৃ. ১৮৩)

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের মত প্রফেসর মুনীর চৌধুরীকেও পাকিস্তানপন্থী রাজাকারবাহিনী রায়েরবাগের বধ্যভূমিতে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। তাঁর মৃত্যুতে কাকা ভয়ানকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর কথা স্মরণ করে ছফা কাকা লিখেছেন, ‘আমি এমন একজন মানুষকে হারালাম যিনি অভিমানের ভাষা বুঝতে পারতেন।’

বাংলা একাডেমীর গবেষণাবৃত্তির সূত্র ধরে ছফা কাকাকে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের কাছে যেতে হয়েছিল। কাকা বাংলা বিভাগে পড়াশোনা করেছিলেন সে তো জানা কথা। বাংলা বিভাগের বাইরে অন্য কোনো বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে তাঁর তেমন পরিচয় ছিল না। প্রাইভেটে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে তিনি এমএ পরীক্ষা দেয়ার কারণে ওই বিভাগেরও কোন শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়ে ওঠেনি। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষককে চিনতেন যাঁর নাম মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী। যাঁকে ‘ম্যাক’ বলা হত। কিন্তু তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ কাকার কখনও কথা হয়নি। এমন এক পরিস্থিতিতে একজন জ্ঞানী শিক্ষকের খোঁজ তিনি করছিলেন যিনি তাঁর পিএইচ-ডি থিসিসের পরামর্শক হবেন। ছফা কাকার বয়ানে:

“আমি বন্ধু-বান্ধবদের কাছে একজন জ্ঞানী শিক্ষকের নাম জানতে চেয়েছিলাম, যাঁকে আমার পিএইচ-ডি থিসিসটির পরামর্শক হিসেবে বেছে নিতে পারি। সকলে আমাকে বললেন, তুমি রাজ্জাক সাহেবের কাছে যাও। তাঁর মত পণ্ডিত আর একজনও নেই।” (ছফা, খ. ১, পৃ. ১৮৬)

ছফা কাকা ভয়ে ভয়ে রাজ্জাক সাহেবের কাছে গিয়েছিলেন। তিনি যখন তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন তখন কাঁথা মুড়ি দিয়ে রাজ্জাক সাহেব ঘুমোচ্ছিলেন। ঘুমোচ্ছিলেন কথাটাও ঠিক নয়, তিনি শুয়ে শুয়ে আয়েশ করছিলেন এবং ঘুমের ভান করছিলেন। কাকা তাঁকে সালাম দিলেন, তারপর নিজের পরিচয় দিয়ে তাঁর আবেদনটা বিনয়ের সঙ্গে পেশ করেছিলেন হবু গুরুর কাছে। কিন্তু রাজ্জাক সাহেব তাঁর কথা সামান্যতমও গ্রাহ্য করছিলেন না। তিনি এমন আচরণ করছিলেন আগন্তুক মানে মানে চলে গেলেই বেঁচে যান। কিন্তু ছফা কাকা দমবেন কেন? তখন তাঁর আত্মসম্মানবোধ ছিল বড়ই টনটনে। একজন লেখক হিসেবে সমাজে তাঁর প্রচার প্রসার ঘটে গেছে। অনেকে তাঁকে সমীহ করে চলেন একটু করুণা লাভের আশায়। এমন লোককে কিনা রাজ্জাক সাহেব তাড়িয়ে দেবেন কোনো কথা না বলে, তা কী করে হয়? কাকার আত্মাভিমান চারা দিয়ে উঠল। তিনি লিখেছেন:

“আমার ভীষণ রাগ ধরে গেল। কেমনতর মানুষ প্রফেসর রাজ্জাক! তাঁর কাছে একটা আবেদন করলাম, তিনি ভাল-মন্দ কোন জবাব না দিয়ে নীরব প্রত্যাখানের মাধ্যমে আমাকে বিদায় করতে চান। হতবাক হয়ে আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। এইভাবে অপমানিত হয়ে যদি চলে আসি আমি নিজের কাছে নিজে ছোট হয়ে যাই। কিছু একটা করা প্রয়োজন, কিন্তু কী করা যায়। প্রফেসরের বইয়ের গুদামে যদি আগুন লাগিয়ে দেয়া যেত, মনের ঝাল কিছুটা মিটত। কিন্তু সেটি তো আর সম্ভব নয়। আমি দু’হাত দিয়ে তাঁর শরীর থেকে কাঁথাটি টেনে নিয়ে দলা পাকাতে পাকাতে বললাম, আমার মত একজন আগ্রহী যুবককে আপনি একটি কথাও না বলে তাড়িয়ে দিতে পারেন, এত বিদ্যা নিয়ে কী করবেন?” (ছফা খ. ১, পৃ. ১৮৭)

প্রফেসর রাজ্জাক ছফা কাকার এমন কাণ্ড দেখে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত চৌকির ওপর উঠে বসলেন। তারপর এই কথা সেই কথা বলতে বলতে ছফা কাকার সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি করে ফেললেন। রাজ্জাক সাহেব প্রথমে তাঁর থিসিসের সুপারভাইজার হতে অপারগতা প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত রাজি না হয়ে পারেননি। তবে তিনি শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন আগে এমএটা পাশ করতে হবে।

রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে পরিচয় ছফা কাকার জীবনের এক বিরল ঘটনা। তিনি স্বীকার করেছেন:

“প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে পরিচিত হওয়া আমার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহের একটি। দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা নির্মাণে, নিষ্কাম জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে, প্রচলিত জনমত উপেক্ষা করে নিজের বিশ্বাসের প্রতি স্থিত থাকার ব্যাপারে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের মত আমাকে অন্যকোন জীবিত বা মৃত মানুষ অতটা প্রভাবিত করতে পারেনি। প্রফেসর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে আসতে পারার কারণে আমার ভাবনার পরিমণ্ডল বিস্তৃততর হয়েছে, মানসজীবন ঋদ্ধ এবং সমৃদ্ধতর হয়েছে।” (ছফা, খ. ১, পৃ. ১৮৪)

এমন একটা সময় ছিল ছফা কাকার সঙ্গে রাজ্জাক সাহেবের দিনে অন্তত একবার দেখা না হলে সারাদিনটাই মাটি মনে হত। সকাল-বিকাল, রাত-বিরাত পরোয়া না করে ছুটে যেতেন গুরুর কাছে। কখনও খেয়ে আসতেন, কখনও না-খেয়ে। মাঝে মাঝে আবদার করে বসতেন টাকা-পয়সার। প্রফেসর রাজ্জাক না করতে পারতেন না। যেভাবে হোক তিনি ছফা কাকাকে টাকা যোগাড় করে দিতেন। রাজ্জাক সাহেবের কাছে আরেকটা আবদারের জিনিস ছিল সেটা হল বই। তাঁর সান্নিধ্যে এসে তিনি অনেক দুর্লভ বই পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, যেটা অনেক জ্ঞানপিপাসুদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। রাজ্জাক সাহেব ছফা কাকার হাতে একের পর এক নানা বিষয়ের বই তুলে দিতেন, আর বইয়ের পোকা ছফা কাকা সেইসব পড়ে শেষ করে ফেলতেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অর্থশাস্ত্র, সাহিত্য কী-না পড়েছেন? বইয়ের সবকিছু তিনি বুঝে ফেলতেন তা কিন্তু নয়। তারপরেও পড়তেন। গুরুর আদেশ, না-পড়ে উপায় কি। গুরুর কথা শিষ্য লিখেছেন:

“আপনে এখন কী পড়াশুনা করবার লাগছেন?

আমি বললাম, কীভাবে শুরু করব বুঝতে পারছি না। আপনি যদি কিছু বইয়ের নাম বলে দিতেন।

স্যার শব্দ করেই হেসে উঠলেন। একই কথা মি. হ্যারল্ড লাস্কিরে কইছিলাম, তিনি লাইব্রেরি দেখিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, মাই বয় গো অ্যান্ড সোক।

আমি সঠিক অর্থটা বের করতে পারছিলাম না। লাইব্রেরিতে গো করা যায়, কিন্তু সোক কী করে সম্ভব। লাইব্রেরি তো গোসলখানা নয়। মনে হল, আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থাটা স্যার বুঝতে পারলেন। তিনি বললেন, প্রথম লাইব্রেরিতে ঢুইক্যাই আপনার টপিকের কাছাকাছি যে যে বই পাওন যায় পয়লা একচোটে পইড়া ফেলাইবেন। তারপর একটা সময় আইব আপনে নিজেই খুঁইজ্যা পাইবেন আপনের আগাইবার পথ। রাজ্জাক স্যার অগ্রসর হওয়ার রাজপথটা সেদিন এমনি করে চোখে আঙুল দিয়ে যদি দেখিয়ে না দিতেন হয়ত আমার আরদ্ধ গবেষণাকর্মটি আমি একভাবে না একভাবে শেষ করতে পারতাম। (ছফা, খ. ১, পৃ. ১৯৪)

হ্যাঁ, ছফা কাকাকে দিয়ে তাঁর গবেষণাকর্ম শেষ করা সম্ভব হয়নি। নদীতে সাঁতরে কূল পাওয়া যায়, কিন্তু সাগরের কিনারা করা দুষ্কর। প্রফেসর রাজ্জাক তাঁকে এমন এক অকূল সাগরে নিক্ষেপ করেছিলেন দীর্ঘ সময় সাঁতরেও তিনি কিনারা করতে পারেননি। এ নিয়ে ছফা কাকার রাগ-অভিমানও কম নয়। তিনি লিখেছেন:

“আমার একটা অপরাধবোধ রয়েছে। প্রচলিত নিয়ম ভেঙে সুযোগ দেয়ার পরও আমার পক্ষে পিএইচ-ডি করা সম্ভব হয়নি। একা একা যখন চিন্তা করি আমার মনে একটা অপরাধবোধ ঘনিয়ে আসে। হয়ত আমি নিজের উগ্র অহংটাকে বড় বেশি প্রাধান্য দিয়ে প্রফেসর মুনীর চৌধুরীর উদারতার প্রতি অবিচার করেছিলাম। আজকাল সেরকম একটা অনুভূতি আমার মধ্যে জাগ্রত হয়। বোধহয় সেজন্য আমার পক্ষে পিএইচ-ডি করা সম্ভব হয়নি। এটা হচ্ছে আমার অনুভব। পিএইচ-ডি শেষ করতে না পারার জন্য যে বাস্তব কারণ তার জন্য প্রফেসর আবদুর রাজ্জাককে আমি দায়ী মনে করি।” (ছফা, খ. ১, পৃ. ১৮৪)

তারপরও গুরু রাজ্জাকের কাছে তাঁর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। যখনই তিনি ফুরসৎ পেয়েছেন গুরুর চরণ বন্দনা করতে লেগে গেছেন। খুব কম মানুষের সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন সম্পর্ক ধরে রাখতে পারতেন। কিন্তু প্রফেসর রাজ্জাক ছিলেন তাঁর কাছে ব্যতিক্রম। তাঁকে প্রতিদিনই ছফা কাকার কাছে নিত্যনতুন ঠেকত, পোশাক-পরিচ্ছদের কারণে নয়, তাঁর জ্ঞান-গরিমার জাহিরতায়। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে কতটুকু প্রভাবিত করতে পারে ছফা কাকার লেখা পড়লে তা বোঝা যায়। তিনি লিখেছেন:

“রাজ্জাক সাহেবের কাছ থেকে যখন আসতাম কোন কোন সময়ে আমার মনে হত আমার মেরুদণ্ডটি তিনি হীরে দিয়ে বাঁধিয়ে দিয়েছেন। আমাকে তিনি হীরের মত কঠিন এবং দীপ্তিমান করে সৃষ্টি করেছেন। আমার জীবনে উত্থান-পতনের পরিমাণও অল্প নয়। এমনও সময় গেছে চারপাশের লোক আমাকে দেখলে ধিক্কারধ্বনি উচ্চারণ করত এবং ছি ছি করত। সে সমস্ত অবহেলা, অপমান, অসম্মান, দুঃখ-যন্ত্রণা তুচ্ছজ্ঞান করে নিজের মেরুদণ্ডের উপর থিতু হয়ে দাঁড়াবার একমাত্র প্রেরণা ছিলেন প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক। আমি কিছু কাজ-কর্ম করেছি। আমার লেখালেখি হয়ত লোকে পড়ে। কিন্তু সেসবের মধ্যে গর্ব করার মত কোন কিছু খুঁজে পাইনে। কিন্তু একটা গর্ব আমি কিছুতেই ছাড়ব না, ছাড়তে পারব না সেটি হল—আমি আবদুর রাজ্জাকের ছাত্র। এটা এমন একটা অনুভূতি আবদুর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে যিনি আসেননি তাঁর পক্ষে এই অনুভূতির ঘনত্ব এবং গাঢ়ত্ব উপলব্ধি করা কোনদিনই সম্ভব হবে না।” (ছফা, খ. ৪, পৃ. ১৬৩)

নিজের কথা বলি। প্রফেসর রাজ্জাকের সঙ্গে আমার সর্বমোট আমার দুবার দেখা হয়েছিল। দুবারই কাকার দৌলতে। আমি যখন বিরাশি সালে প্রথম ঢাকায় আসি কাকা আমাকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে নিয়ে গিয়েছিলেন টিএসসিতে। তখন তিনি একজন তরুণের সঙ্গে দাবা খেলছিলেন। পরে জেনেছিলাম তরুণের নাম নিয়াজ মোর্শেদ। ছফা কাকা যখন আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে গেলেন তখন আমি প্রফেসর রাজ্জাককে চিনতাম না। এমনকি তাঁর নামও শুনিনি। প্রথম দেখায় তাঁকে মনে হয়েছিল একজন খেটে খাওয়া মানুষ। তিনি যখন দাবা খেলছিলেন তাঁর পায়জামাটা হাঁটু অব্দি গুটানো ছিল। পাঞ্জাবির হাত দুটোও অনুরূপ। আমার মনে হয়েছিল তিনি অনেক পানি মাড়িয়ে এসে খেলতে বসেছেন। ছফা কাকা যখন আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে গেলেন তিনি মাথা নিচু অবস্থায় বাঁ-হাত নাড়িয়ে আমাদের সরে যেতে বললেন। কাকাও তাঁকে বিশেষ বিরক্ত করেননি।

আরেকবার প্রফেসর রাজ্জাককে দেখেছিলাম মিরপুরের বাসায়। ছফা কাকা বাসায় ছিলেন না। আমি এবং ইদ্রিস নানা কাজে ব্যস্ত ছিলাম। ইদ্রিস আমাদের বাড়ির কাজে সাহায্য করত। হঠাৎ কলিং বেল বেজে ওঠলে ইদ্রিস গিয়ে দরজা খুলে দিল। ইদ্রিস প্রফেসর রাজ্জাককে চেনার কথা নয়। তাঁকে পোশাকে-আশাকে এমন দেখাচ্ছিল ইদ্রিস তাঁকে কোন পাত্তাই দিল না। প্রফেসর রাজ্জাকের চেহারা মোবারক আমারও মনে ছিল না যে তাঁকে তোয়াজ করে ঘরের ভেতরে নিয়ে বসাই। তিনি টিফিন ক্যারিয়ারটা ইদ্রিসের হাতে দিয়ে বললেন, এইটা ছফাকে দিয়েন।

ইদ্রিস বলল, আপনে কেডা?

আমি আবদুর রাজ্জাক। এই নাম বললে ছফায় চিইনা ফেলাইব।

আমার টনক নড়ল। সর্বনাশ, ইনিই তো প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক, যাঁর কাছে কাকা আমাকে একবার নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি তৎপর হয়ে উঠলাম। ততক্ষণে প্রফেসর রাজ্জাক সিঁড়ি মাড়িয়ে প্রায় নিচে নেমে গেছেন। তাঁকে ঘরে নিয়ে যে বসাব সেই ফুরসৎ আর পাওয়া যায়নি।

এই লেখাটি সন-তারিখের ধারাবাহিকতা রেখে রচনা করা সম্ভব হচ্ছে না। নানা বিক্ষিপ্ত ঘটনা লেখাটির মধ্যে এসে ভিড় করার ফলে আমাকে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে আবার পিছিয়ে আসতে হচ্ছে বারবার। সম্ভবত এধরনের লেখায় এটাই স্বাভাবিক।

ওসব কথা থাক। ছফা কাকা লেখালেখির পাশাপাশি একজন সংগঠক হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তাঁর তৈরিকৃত জীবন-বৃত্তান্ত থেকে জানা যায়, ঊনিশ শ’ ঊনসত্তর সালে তিনি সাহিত্য-সংগঠন ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের নিয়ে গঠিত এ প্রতিষ্ঠানের তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ঊনিশ শ’ পঁচাত্তর সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ভাষাবিজ্ঞানী মনসুর মুসার লেখনীতে প্রকাশ পায়:

“বাংলাবাজারের প্রকাশকদের পাঠ্যপুস্তক ও নোটবই প্রকাশনাধারায় গুণগত পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে যেমন তাঁর একক উৎসাহ প্রবল ছিল, তেমনি লেখক শিবিরের মাধ্যমে লেখক-শিল্পী-কবি সকলকে প্রতিবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তখন ‘লেখক সংঘ’ বলে যে সরকারি আশীর্বাদপুষ্ট প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব ছিল, ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ঝোড়ো হাওয়ায় তা নির্জীব ও নিষ্ক্রীয় হয়ে পড়েছিল। লেখকদের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী আহমদ ছফা তাঁর কিছু তরুণ বন্ধুদের নিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে একটি লেখক সংগঠনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।” (ছফা, স্মা., পৃ. ৫৩)

বাংলাদেশ লেখক শিবির ছফা কাকার অস্তিত্বের একটা অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তখন বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি উদ্যোগী ও স্বক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই সংগঠনকে ঘিরে তাঁর অনেক স্বপ্ন কাজ করত। লেখক-শিল্পী-কবিদের এক কাতারে এনে তিনি বুদ্ধিবৃত্তির উন্নয়ন ঘটাতে চেয়েছিলেন। ফলে লেখকদের প্রেরণা যোগাবার জন্য বাংলাদেশ লেখক শিবির থেকে সাহিত্য পুরস্কারের আয়োজন করেছিলেন। লেখক শিবিরের অন্যতম শুভাকাঙ্ক্ষী কবি হুমায়ুন কবির ঊনিশ শ’ বাহাত্তর সালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন এবং পরের বছর লেখক শিবির থেকে ‘হুমায়ুন কবির সাহিত্য-পুরস্কার’ ঘোষণা করা হয়। এ প্রসঙ্গে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেন:

“১৯৭৩ সালে ঐ সংগঠনের তরফ থেকে সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। প্রথম পুরস্কার প্রাপক ছিলাম আমি (প্রবন্ধগ্রন্থ ‘শুদ্ধতম কবির জন্য’), নির্মলেন্দু গুণ (কবিতাগ্রন্থের জন্য), আর হুমায়ূন আহমেদ (উপন্যাসের জন্য)। ১৯৭৩ সালের ৬ জুন বিকেলবেলা তদানীন্তন পাবলিক লাইব্রেরির (এখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরি) অডিটোরিয়ামে আমাদের মানপত্র ও পুরস্কার দেওয়া হয়। ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’-এর সেটাই ছিল প্রথম পুরস্কার। পুরস্কারের নাম ছিল ‘হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার’। মানপত্রে সভাপতি হিসেবে ছিল আহমদ ছফার স্বাক্ষর। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে এটাই ছিল তরুণ লেখকদের প্রথম স্বীকৃতি। …সমসাময়িক লেখকদের এই পুরস্কার প্রদান থেকেই প্রমাণিত হয় আহমদ ছফার চরিত্রের ঔদার্য, তাঁর নেতৃস্বভাব, তাঁর গুণগ্রাহিতা।’ (ছফা,স্মা., পৃ. ৪৫)

কিন্তু ছফা কাকার পক্ষে লেখক শিবিরে টিকে থাকা সম্ভব হয়নি। তাঁর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে। কবি অসীম সাহার ভাষায়:

“তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনা ও শ্রমে গড়ে উঠা ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’ তাঁর হাতছাড়া হয়ে গেছে। ড. আহমদ শরীফ এবং শাহরিয়ার কবিরদের নেতৃত্বে চলে গেছে এই সংগঠন। এটাকে ছফা ভাই স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেননি।” (ছফা, স্মা., পৃ. ৮৮)

কবি অসীম সাহার লেখা থেকে আরও জানা যায়, পরবর্তীতে টিএসসির সেমিনার কক্ষে লেখক শিবিরের এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হলে সেটি প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন ছফা কাকা। তাঁর সঙ্গে কবি ফরহাদ মজহারও যোগ দিয়েছিলেন। লেখক শিবির সম্পর্কে ছফা কাকা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন:

“লেখক শিবির দাঁড় করাতে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। আমাদের দেশে এনলাইটেনমেন্ট-এর বিকাশের জন্য এইরকম একটা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন মর্মে মর্মে অনুভব করে আসছিলাম। আমি জাসদ করতাম। কিন্তু জাসদের কোন লোককে লেখক শিবিরে টানতে চেষ্টা করিনি। আমার ধারণা ছিল, বিচার, মূল্যায়ন এবং প্রমোট করার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে লেখক শিবিরকে দাঁড় করাব। উমর সাহেব শুরুতে কাগজে প্রবন্ধ লিখে লেখক শিবিরের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি মনে করলেন তাঁর একটা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম দরকার। তিনি লেখক শিবিরটা হাইজ্যাক করে নিলেন। লেখক শিবির উনাদের হাতে যাওয়ার পর সাহিত্যের কোন কাজে আসেনি; সেটা তো স্পষ্ট। (ছফা, সা., পৃ. ৭০)

ঊনিশ শ’ পঁচাত্তর সালে ছফা কাকা ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন, কিন্তু সেই পুরস্কার তিনি গ্রহণ করেননি। এই পুরস্কার না নেয়ার পেছনে হয়ত তাঁর মধ্যে একটা চাপা ক্ষোভ কিংবা অভিমান ভয়ানক রকম কাজ করেছিল।

আমরা যদি আরও একটু আগে ফিরে যাই তাহলে ঊনিশ শ’ একাত্তর সালের কথা বলতে হবে। একাত্তর সালটি ছিল ছফা কাকার জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। এ বছর তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রাইভেটে এমএ দিয়েছিলেন এবং একুশে মার্চ তাঁর মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে যে কোন শিক্ষার্থীকে পরিস্থিতির ছাপে একমুখী করে ফেলে। সকল শিক্ষার্থীর মাথায় একটা জিনিস কাজ করে আগে পড়াশুনা, পরে অন্য কাজ। সঙ্গত কারণে এটাই হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ছফা কাকা পরীক্ষা নামক বস্তুটাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন না। আমার মনে আছে, আমি যখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেব, পরীক্ষার দিন রাতে তিনি আমাকে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ পড়তে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন রাতের মধ্যে এটা শেষ করতে হবে। আমি বললাম, আগামীকাল আমার পরীক্ষা, এই সময় অন্য বই পড়ার সময় আমার হবে না। তিনি আমার ওপর খুব খেপেছিলেন। ডক্টর হারুন-অর রশীদ তখন উপস্থিত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছফা কাকার একটা ভাল সম্পর্ক ছিল। তাঁরও বাড়ি চট্টগ্রামে। ডক্টর হারুন ছফা কাকার ওপর প্রভাব খাটিয়ে কথা বলতে পারতেন। তিনি বললেন, ছফা ভাই, বইটা কি এখন না পড়লে নয়? ছফা কাকা তাঁকে ধমক দিয়ে বললেন, হাজারটা পরীক্ষায় ফেল করলেও আমার আপত্তি নেই, কিন্তু একটা ভাল বই পড়ার সুযোগ নষ্ট করা কখনওই উচিত নয়।

ছফা কাকার কথা অমান্য করার সাধ্য কার। সেদিন বইটা আমাকে রাত জেগে পড়তে হয়েছিল। আমার এমএ পরীক্ষার সময়ও তিনি একই কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। তিনি আমার পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে কাজের ছেলেটিকে ছুটিতে পাঠিয়েছিলেন। আমি তাঁকে বললাম, ছুটিটা কদিন পরে দিলে এমন কী সমস্যা হত। এখন কি আমাকে দিয়ে বাজার করা, রান্না করা এসকল কাজ সম্ভব? এবারও তিনি খুব রাগলেন। বললেন, এতদিন কী করেছ, তোমাকে পরীক্ষা দিতে হবে, সেই সঙ্গে অন্য কাজও করতে হবে। কাজের ছেলের ওপর ভরসা করে কোনো কাজ করা যাবে না। আমারও না মেনে উপায় ছিল না।

এ ঘটনা দুটো বয়ান করলাম একারণে—ছফা কাকা নিজে যা করতেন তিনি অন্যের ওপর তা-ই চাপাতে চাইতেন। তাঁকে আমার কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে যে তিনি একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ করতেন। আমার মনে হয়েছে তিনি এমএ পরীক্ষা দেয়ার পাশাপাশি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজও এক সঙ্গে করেছেন। ওই সময় তিনি প্রতিরোধ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। স্বাধীন বাংলার প্রথম পত্রিকা হিসেবে প্রতিরোধ লোকমুখে প্রচারিত ছিল। একাত্তর সালের সাত মার্চ পত্রিকাটি পাঠকের হাতে পৌঁছে। পত্রিকাটি ঐতিহাসিক সাত মার্চের জনসভায়ও বিতরণ করা হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এই মাসের তেইশ তারিখ তিনি আরও একটি ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন সেটি হল ‘ভবিষ্যতের বাংলা’ শিরোনামে একটি সেমিনারের আয়োজন। এই সেমিনার আয়োজনের পেছনে আরও দুজন ব্যক্তিত্ব যুক্ত ছিলেন তাঁদের একজন হলেন কবি হুমায়ুন কবির, অন্যজন কবি ফরহাদ মজহার। বিশ বছর পর একটি পত্রিকায় ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নিজেকে এই সেমিনারের একজন আয়োজক হিসেবে দাবি করেছিলেন এবং প্রচার করেছেন ‘ভবিষ্যতের বাংলা’ সম্পর্কে তাঁদের বড় করে ভাবতে হয়েছিল। সংবাদটা পত্রিকায় পড়ে ছফা কাকা খুব খেপেছিলেন। তিনি ডক্টর আহমদ শরীফকে সাক্ষী মেনে অগ্নিসাক্ষী পত্রিকায় একটি লেখা লিখেছিলেন, যার শিরোনাম ছিল, ‘ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কি মিথ্যার আশ্রয় নিলেন?’ ছফা কাকা বয়ান করেছেন:

“১৯৭১ সালে ২৩ মার্চ ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’-এর পক্ষ থেকে আমরা বাংলা একাডেমী মিলনায়তনে ‘ভবিষ্যতের বাংলা’ শিরোনামে একটি সেমিনার করেছিলাম। প্রয়াত ঐতিহাসিক ড. আবু মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ওই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেছিলেন। সেমিনারে অনেকেই প্রবন্ধ পড়েছিলেন এবং অনেকে বক্তব্য রেখেছিলেন। কারা প্রবন্ধ পড়েছিলেন এবং কারা বক্তব্য রেখেছিলেন বিশ বছর পরে আর স্পষ্টভাবে মনে নেই। অংশগ্রহণকারীদের নামগুলো মনে আছে। তাঁরা ছিলেন ড. আহমদ শরীফ, ড. মমতাজুর রহমান তরফদার, জনাব সরদার ফজলুল করিম, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জনাব কবীর চৌধুরী, ড. বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, প্রয়াত কবি হুমায়ুন কবির, জনাব ফরহাদ মজহার এবং আমি অর্থাৎ আহমদ ছফা। আমরা তিনজন অর্থাৎ আমি, হুমায়ুন এবং ফরহাদ মিলে এই সেমিনারটির আয়োজন করেছিলাম। আমরা ধরে নিয়েছিলাম বাংলাদেশ একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে লিপ্ত হতে যাচ্ছে। এই সময়ে যদি পণ্ডিতজনের মতামত আসন্ন যুদ্ধের স্বপক্ষে আমরা টেনে আনতে পারি, তাহলে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতির পক্ষে সহায়ক হবে আমরা মনে করেছিলাম। আমরা তিনজন—আমি, ফরহাদ এবং হুমায়ুন আমাদের সমস্ত প্রবন্ধে খাট্টা মতামত প্রকাশ করেছিলাম বাংলাদেশ স্বাধীন হতে যাচ্ছে এবং সে লক্ষে একটি যুদ্ধ তাকে ঘাড়ে তুলে নিতে হবে।

ঐ সভায় যাঁরা অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁদের প্রায় সকলেই অনেক জ্ঞানগর্ভ মতামত প্রকাশ করেছিলেন। বাঙালি জাতির ঠিকুজিকুলজি নিয়ে এন্তার আকর্ষণীয় বক্তব্যের ধুম্রজাল সৃষ্টি করেছিলেন, কিন্তু মোক্ষম তত্ত্বটি সকলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। এত বড় বড় বাঘা বাঘা পণ্ডিত যাঁরা বাংলাদেশ সম্পর্কে এত জানেন, বাংলাদেশকে এত ভালবাসেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হবে কি না এই প্রশ্নে সকলে যেন একরকম চুপ মেরে গিয়েছিলেন। আমরা সেদিন তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ জানাজানি করিনি। কারণ সেটা মান-অভিমান, নালিশ-প্রতিনালিশ করার সময় নয়। প্ররিস্থিতি দাবি করেছিল দ্রুত তড়িৎ এ্যাকশন। আমরা তিনজনে পণ্ডিত ব্যক্তিদের সামনে বাংলাদেশ স্বাধীন হতে যাচ্ছে একথা যখন জানালাম সেমিনারে উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলী আমাদের অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। আমরা ধরে নিয়েছিলাম আমাদের জিত হয়েছে, কারণ শ্রোতাবৃন্দ আমাদের মতামতের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। সেইদিন সেমিনারের শেষে উপস্থিত পণ্ডিত ব্যক্তিদের কেউ কেউ আমাদের গোয়ার্তুমির জন্য ভয়ঙ্কর বকাঝকা করেছিলেন। অনেকেরই সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আমাদের বিরুদ্ধে মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস ছিল না। তাঁরা আমাদের বক্তব্যের সঙ্গে সায় না দিলেও প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেননি একমাত্র সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ছাড়া। আমার স্পষ্ট মনে আছে, চৌধুরী সাহেব বলেছিলেন, আমরা সকলকে হঠাৎ করে কসাইখানায় থাকবার ব্যবস্থা করছি। দেশ স্বাধীন হোক, না-হোক আমাদের আগে ভাগে ঘোষণা দেবার কী দরকার ছিল।” (ছফা, খ. ৭, পৃ. ৩৫৯)

এই সেমিনার আয়োজনের দু’দিনের মাথায় পঁচিশে মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী পূর্ব-পাকিস্তানের ঘুমন্ত মানুষের ওপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞের আয়োজন করে। এতে ঢাকা শহরের অসংখ্য মানুষের লাশ পড়ে যায়। এক রাতের ব্যবধানে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাস এক নাটকীয় রূপ লাভ করে। যৌবনোদ্দীপ্ত ছফার মধ্যে তখন এক অস্থিরতা কাজ করছিল। ইচ্ছে করলেই যে কারও পক্ষে গা বাঁচিয়ে চলা সম্ভব ছিল না। ওই রাতে তিনি তোপখানা রোডের সাবেক ‘লেখক সংঘ’ কার্যালয়ে ছিলেন, যেটি ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের পরে ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’-এ রূপান্তরিত হয়েছিল। এই সংগঠনের পেছনেও স্মরণ করার মত ছফা কাকার উদ্যোগী ভূমিকা ছিল। পরের দিন ছফা কাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে গিয়েছিলেন এবং তাঁর শিক্ষক ডক্টর নীলিমা ইব্রাহিম, ডক্টর আহমদ শরীফ ও অন্যান্যের খোঁজ নিতে তিনি তৎপর হয়েছিলেন। কবি ফারুক আলমগীর লিখেছেন:

“একটা দুর্বিনীত, জেদি ও সাহসী মনোভাব ছিল আহমদ ছফার। তা না হলে মার্চের কালরাতের পরের দিন সারা বিশ্ববিদ্যালয় কাঁপিয়ে নাকি তারই কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়েছিল, ‘সবাইকে মেরে ফেলেছে, সবাইকে মেরে ফেলেছে’ তাঁর শিক্ষিকা এবং আমারও শিক্ষিকা এখনও কথায় কথায় সবাইকে বলেন, এমনকি টেলিভিশনেও সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সকালে উঠেই আমরা ছফার চিৎকার শুনতে পেলাম: ‘মিলিটারিরা সবাইকে মেরে ফেলেছে।’ ২৬ মার্চের কারফ্যুর সময় মিলিটারির একটা গুলি তখন ছফার কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিতে পারত।” (ছফা, স্মা., পৃ. ৮৮)

কবি ফারুক আলমগীরের কথার প্রতিধ্বনি কিছুটা অন্যভাবে শোনা যায় নুরুল করিম নাসিমের লেখায়। তিনি লিখেছেন:

“১৯৭১-এর ভয়ংকর কালরাত্রি ২৫ মার্চ এল। ছফা ভাই সেদিন সেক্রেটারিয়েটের উল্টোদিকের সেই পুরনো পল্টনের বাড়িতে ছিলেন। মধ্যরাতে সেদিন শহরে সৈন্য নেমেছিল, সারা শহরে হত্যাযজ্ঞ চলল, কিন্তু তিনি আলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেন। পরদিন সকালে পাকিস্তানি সৈন্যের মুখোমুখি পড়ে গেলেও (পরে ছফা ভাইয়ের মুখে শোনা) তাঁর সাদামাটা আনইম্প্রেসিভ চেহারাসুরত দেখে সৈন্যরা ধরে নিয়েছিল তিনি হয়ত ঝাড়ুদার হবেন। সেদিনই সন্ধ্যায় তিনি নারিন্দার বেগমগঞ্জ লেনের আমাদের বাসায় এসে হাজির। তিনি সীমান্ত পাড়ি দেয়ার জন্য বদ্ধপরিকর। একটা ব্যাগ গুছিয়ে দিলাম এবং বিক্রমপুর দিয়ে তাঁকে পার করে দিলাম।” (ছফা, স্মা., পৃ. ১০৩)

ছফা কাকার ডায়েরি থেকে জানা যায় পয়লা বৈশাখ অর্থাৎ এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় তিনি দেশ ছেড়ে আগরতলা গিয়েছিলেন। অর্থাৎ সময়টি এপ্রিলের মাঝামাঝি হবে। তাঁর ইচ্ছে হয়েছিল তিনি অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধ করবেন। কিন্তু তাঁর শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে জানালেন, অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার জন্য অনেক যুবক এক পায়ে খাড়া। তাঁরা অস্ত্র হাতে পেলেই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে। সুতরাং অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করার জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি একজন ক্রিয়েটিভ মানুষ। কলমই হতে পারে তোমার যুদ্ধাস্ত্র। যুক্তিটা কাকার মনে ধরেছিল। তিনি এ কাজের জন্য ভারতকে নিরাপদ স্থল হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন এবং সেখানে চলে গিয়েছিলেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু জাফর সাক্ষ্য দিয়েছেন:

“সেখানে (আগরতলা) লঙ্গরখানার খাদ্যে যখন প্রাণ ধারণ করছি তখন হঠাৎ একদিন দেখা হল তার (ছফা) সঙ্গে। প্রবাসে তার মত সদা-আশাবাদী এক বন্ধুকে পেয়ে বড়ই খুশি হলাম। প্রায় এক সঙ্গে ঘোরাফেরা করতে থাকলাম। বিশেষ করে আগরতলার সস্তা আটার মিষ্টি পাউরুটি দিয়ে যখন সকালে বা দুপুরের খাওয়া সারতে হতো মাঝে মধ্যে, তখন তার সঙ্গ ছিল একটি অনিবার্য আশ্রয়। ওখানকার শিক্ষক ও সাংবাদিকদের সঙ্গেও আমাদের নানাভাবে যোগাযোগ ঘটে। তবে আমরা সব সময় যে একসঙ্গে সময় কাটাতে পারতাম, তা কিন্তু নয়। সাফা প্রায়ই নিজের মত করে কোথায় কোথায় যেন চলে যেত। আবার চলে আসত হুট করেই।… সাফার সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক হয় যে, আমরা একসঙ্গে স্থলপথে ধর্মনগর, গৌহাটি হয়ে কলকাতা যাব। যাওয়া প্রায় ঠিকঠাক। এমন সময় মায়ের কথা মনে করে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকল সাফা। কখনও তাকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখিনি। তার আত্মীয়-স্বজনের কথা সে কখনও আমাদের বলত না। কেবল মাকে সে যে ভালবাসত অপরিমেয় সেটা আমি জানতাম। সাফা বলা শুরু করল যে, তার মাকে খানসেনারা মেরে ফেলবে। অতএব, সে চট্টগ্রামে ফিরে যাবে মাকে আনার জন্য। এবারও তাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে, পেছনে চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি জায়গায় যমদূতের মত খাড়া খানসেনারা। তারা সব খুনির শিরোমণি। সুতরাং ফিরে যাওয়া আর মারা পড়া একই কথা। কিন্তু কে শোনে কার কথা? ফিরে সে যাবেই। মাকে রক্ষা সেই করবেই। এর অতিরিক্ত বলা শুরু করল যে, সে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। জাফর সাব, আপনারা যান, আমি যাইতাছি লড়াই করনের লাইগ্যা। তাকে বললাম, লড়াই করার জন্য যে বহু তরুণই এক পায়ে খাড়া এবং কেবল অস্ত্র পেলেই যে তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে খানসেনাদের ওপর, তা তো আপনি চারপাশেই দেখছেন। আপনাকে তো কেউ বলছে না স্টেনগান হাতে নিয়ে যুদ্ধ করতে। আপনি তো মুক্তিযুদ্ধ করবেন লিখে, সেটাই করুন জোরেশোরে।’ কথা যখন বলি তখন সাফা মন দিয়ে শোনে, ভাব দেখায় যে, ভালভাবেই বুঝছে এবং মেনেও নেবে সবটা। কিন্তু পরক্ষণেই সে ফিরে যায় পুরনো বোলে।” (ছফা, স্মা., পৃ. ৮৮)

যা হোক, ছফা কাকা কোলকাতা গিয়েছিলেন। ম্যারি ডানহ্যামকে লেখা এক চিঠিতে ছফা কাকা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের বর্ণনা দিয়েছেন:

“আমার এমএ পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরের দিন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী রাতের অন্ধকারে বন্দুক, ট্যাংক, কামান নিয়ে ঘুমন্ত ঢাকা মহানগরীরও ওপর হামলা করে বসল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অন্যান্য প্রতিরোধকামী গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে মিলে আমরা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পাড়ি দিলাম। প্রথমে আগরতলা, তারপর কোলকাতা। আমি কোথাও বিশেষ সুবিধে করতে পারলাম না। আওয়ামী লীগের কর্তাব্যক্তিরা তাদের দলের লোক ছাড়া অন্য কাউকে ফ্রন্টে যেতে দিচ্ছিল না। আমি মুখ আলগা স্বভাবের লোক। কখন কী বলে ফেলি তার কোন স্থিরতা ছিল না। আমাকে নিয়ে বন্ধু-বান্ধবেরা মুশকিলে পড়ে গেলেন। ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা প্রবাসী বাঙালিদের ভেতর থেকে পাকিস্তানি গুপ্তচরদের খুঁজে খুঁজে বের করতে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছিল। এককথায় যদি কারও ওপর তাদের নেকনজর পড়ে আমরা ধরে নিতাম, তার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। এখন কথা হচ্ছে লাশটা পাওয়া যাবে কি না। আমি যেভাবে চলাফেরা করতাম এবং বেপরোয়া কথাবার্তা বলতাম, অনায়াসে আমাকে পাকিস্তানি স্পাই হিসেবে চিহ্নিত করা যেত। সেই সময়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কাজী নজরুল ইসলামের বন্ধু কমরেড মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে সে যাত্রায় জানে বেঁচে গেলাম। তখন কাকাবাবু ছিলেন একেবারে থুত্থুরে বুড়ো। শ্বেতীরোগে সারা শরীর ছেয়ে গিয়েছিল। চলাফেরা করতে পারতেন না। কিন্তু তখনও তিনি ছিলেন সিপিএমের অফিসিয়াল প্রেসিডেন্ট। তাঁর কাছে জ্যোতিবসু, আবদুল্লাহ রসুল, প্রমোদ দাশগুপ্ত, হরেকৃষ্ণ কোঙার উনারা নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন। তাঁদের কারও কারও সঙ্গে আমি পরিচিতও হয়েছিলাম। মুজফ্ফর সাহেব মাসে মাসে আমাকে চলাফেরা করার জন্য কিছু টাকা দিতেন। পরে জেনেছি, আমি একা নই, আরও অনেকে এ টাকায় ভাগ বসাত। আমার ধারণা আমি কাকাবাবুর স্নেহদৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলাম। তিনি সকলকেই আপনি বলে সম্বোধন করতেন। একবার আমাকে বলেছিলেন, কাজী নজরুলের পর একমাত্র আমাকেই তিনি তুমি বলে ডাকছেন। সেবার আমার খুব অসুখ হয়েছিল। বাঁচব এমন ধারণা আমার ছিল না। মৃত্যুর পূর্বে শরীরের সর্বশেষ প্রাণশক্তিটুকু দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের গতিবেগ যেন ত্বরান্বিত করা যায়, এ নিয়ে একটা বই লেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভাগ্যক্রমে মুক্তধারার স্বত্বাধিকারী চিত্তবাবুর সঙ্গেও দেখা হয়ে যায়। তিনি কথা দিলেন, আমি যেটুকু লিখব সঙ্গে সঙ্গে প্রুফ করে দেবেন। আমি জ্বরের ঘোরের মধ্যে একটানা লিখে যেতাম। লিখে লিখে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বন্ধুদের ডিকটেশন দিতাম। তারা শুনে শুনে লিখে নিতেন। অল্পদিনের মধ্যে বইটি প্রকাশিত হয়ে গেল। ওটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রথম লেখা। কিন্তু আমার বইটি আশানুরূপ প্রচার পাচ্ছিল না। এই ব্যাপারটি আমি একদিন কাকাবাবুর কাছে খুলে বলেছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, তুমি আগামীকাল এসে আমাকে গোটা লেখাটি পড়ে শোনাবে। পরের দিন গিয়ে আস্ত লেখাটি পড়ে শোনালাম। তিনি দুদিন পর যেতে বললেন। দুদিন পর যখন গেলাম তিনি মুখে মুখে আমার বইটার ওপর একটা আলোচনা ডিকটেট করে বললেন, যাও, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ পত্রিকায় দিয়ে এস। ওই পত্রিকার মালিক ছিলেন অরুণ রায়। লালবাজার থেকে কাগজটি বের হত। কাকাবাবুর আলোচনাটি বের হওয়ার পর আমার বইয়ের কাটতি বেড়ে যায়। কোলকাতার বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের একাংশের মধ্যে আমি পরিচিত হয়ে উঠলাম।” (ছফা, খ. ৪, পৃ. ২২১)

যেই বইটির কথা ছফা কাকা বয়ান করলেন তার নাম জাগ্রত বাংলাদেশ। এই বইটির মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা প্রথম বই হিসেবে যেমন স্বীকৃতি রয়েছে, তেমনি চিত্তবাবু এই বই দিয়ে তাঁর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘মুক্তধারা’ শুরু করেছিলেন। সুতরাং বইটির ঐতিহাসিক মূল্য ছিল অনেক বেশি।

কাকা কলকাতার মাটিতে গিয়ে সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি সংগঠনের বিষয়েও নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তাঁর পুরনো কাগজপত্রের বরাতে জানা যায়, তাঁরা ক’জন মিলে কলকাতায় ‘বাঙলাদেশ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম শিবির’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করিয়েছিলেন। সংগঠনটির ঠিকানাটি এরকম—প্রবাস কার্যালয়: ৪২/এ ফ্রি-স্কুল স্ট্রিট, কলিকাতা। এই সংগঠনের সভাপতি ছিলেন ডক্টর অজয় রায় এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আহমদ ছফা। সহসভাপতি ছিলেন যথাক্রমে মামুনুর রশীদ, অধ্যাপক নরেণ বিশ্বাস, অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী, অধ্যাপক আসাদ চৌধুরী, তরু আহমেদ। সহ-সম্পাদক হিসেবে ছিলেন পিনাকী দাস, মুহাম্মদ রাশেদ, হায়াত হোসেন খান। কোষাধ্যক্ষ রফিক রওশাদ। সদস্য হিসেবে যাঁরা যুক্ত ছিলেন—মোস্তফা আজীজ, দেবদাস চক্রবর্তী, মুস্তাফা মনোয়ার, সালেহা চক্রবর্তী, বালু শংকর হাজরা, রণজিত নিয়োগী, অভিনয় কুমার দাস, নাজমুল হোসেন, নিবেদিতা দাশ পুরকায়স্থ, মঞ্জুশ্রী নিয়োগী প্রমুখ।

একাত্তরে কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে ছফা কাকা একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাও বের করেছিলেন। পত্রিকাটির নাম ছিল সাপ্তাহিক দাবানল। তিনি নিজে এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ঊনিশ শ’ বাহাত্তর সালে দেশে ফিরে পত্রিকাটি ঢাকা থেকে পুনরায় প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কবি শিহাব সরকারের লেখা থেকে জানা যায়:

“আমাকে নেয়া হয়েছিল মূলত অনুবাদের জন্য। সাহিত্য এবং অন্যান্য ফিচার বিভাগের দায়িত্ব পেলাম আমি এবং সুমন ভাগাভাগি করে। পত্রিকার বেতনভুক্ত সাংবাদিক ছিলাম আমরা দুজন এবং প্রুফরিডার। নিয়মিত লিখতেন ছফা ভাই এবং বামঘেঁষা বুদ্ধিজীবীরা। এ কাগজেই সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদের প্রথম সাহিত্যকর্ম (কাফকার ‘মেটামরফসিস’-এর ধরনের লেখা একটা ছোট গল্প) ছাপা হয়। এনেছিলেন ছফা ভাই। আমি তখনও কাফকা পড়িনি। গল্পটি প্রুফ দেখতে দেখতে শিহরিত হয়ে উঠেছিলাম, মনে পড়ে।” (ছফা, স্মা., পৃ. ৮৮)

শিহাব সরকারের মতে, ‘সাপ্তাহিক দাবানল বছর দেড়েক চলেছিল। এর কয়েকটি নিউজ কমেন্ট্রি ওই সময় দেশে দারুণ আলোড়ন তোলে। এসবের বেশ কিছু ছফা ভাইয়ের লেখা।’

একাত্তরে ছফা কাকাকে কলকাতায় থাকতে হলেও এই প্রবাস জীবনে তাঁর অর্জন ছিল বিশাল। শিল্প-সাহিত্য-সংগঠনসহ নানা কাজে নিজেকে প্রসারিত করার মত দুর্নিবার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন। সুযোগ তো কেউ কাউকে দেয় না, নিজেকে তৈরি করে নিতে হয়। ছফা কাকা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে থেকে অনেকগুলো সুযোগ তৈরি করে নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ওখানকার লব্ধ অভিজ্ঞতা তিনি তাঁর জীবন ও সাহিত্যে নানাভাবে কাজে লাগিয়েছেন।

ছফা কাকা তরু নামে এক মেয়েকে ভালবাসতেন। এই তরুকে ঘিরে ছিল অনেক স্বপ্ন। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী অনেক মানুষের মত তরুও ভারতে গিয়েছিলেন। ভারতে গিয়ে তরুর সঙ্গে ছফা কাকার দেখা হলেও এক সময় তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তাঁকে ছফা কাকা আবিষ্কার করেন কলকাতার পিজি হাসপাতালে, তখন তিনি মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত। কোলকাতাতে একটা দীর্ঘ সময় ছফা কাকাকে তরুর পেছনে ব্যয় করতে হয়েছে। একটু সুযোগ পেলেই তিনি তরুর কাছে ছুটে যেতেন। কাছে থেকে সেবা করেছেন রোগাক্রান্ত প্রেমিকাকে। কিন্তু মরণব্যাধি ক্যান্সার তরুকে বাঁচতে দেয়নি। একাত্তরের চার ডিসেম্বর। সেদিন পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কোলকাতা শহরে বিমান হামলার ভয়ে সারারাত বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়েছিল। সেই অন্ধকার রাতে তরুকে একাকী থাকতে হয়েছিল। সেই ফাঁকে যমদূত তাঁর প্রাণ ছিনিয়ে নিয়েছিল।

ছফা কাকার তিনটি আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস রয়েছে। উপন্যাসগুলো হল, অলাতচক্র, পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণঅর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী। এই উপন্যাসগুলোতে তিনি কল্পনার চেয়ে সত্যকে বেশি প্রাধান্য দেয়া দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করতেন এই উপন্যাসগুলোতে একটুও মিথ্যার ছোঁয়া নেই। অলাতচক্র উপন্যাসটিতে তরু সম্পর্কে একটি নির্ভেজাল কাহিনী বিধৃত হয়েছে। এই উপন্যাসটি রচিত হয় ঊনিশ শ’ চুরাশি সালে এবং ওই বছর নিপুণ পত্রিকায় তা ছাপা হয়েছিল। ওই সময় উপন্যাসের চরিত্রগুলো ছিল তরু, ফ্লোরা, বুলা, মা, বড়দা, সত্যেনদা, ওয়াহিদুল, সনজীদা, আহমদ (ছফা) ইত্যাদি নামে। পরে শুনতে পাই এই নামগুলো উল্লেখ করার কারণে অনেকে কাকাকে নালিশ করেছিলেন। ফলে ঊনিশ শ’ তিরানব্বই সালে উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে ছাপার প্রাক্কালে পরিমার্জন করার সময় নামগুলো তিনি পরিবর্তন করে দেন। এতে তরুর নাম পাল্টিয়ে লেখা হয়েছিল তায়েবা এবং আহমদের নাম দানিয়েল। এই তরু ছফা কাকার মনোজগতে কতটুকু স্থান করে নিয়েছিল অলাতচক্র উপন্যাসের প্রারম্ভিক কথাগুলো পড়লেই তা বোঝা যায়। তিনি লিখেছেন:

“তরুর এই গল্পটা আমাকে চব্বিশ তারিখের মধ্যে শেষ করতে হবে। যে বাসর আমার রচিত হয়নি এই গল্পটির মধ্যেই সে বাসর আমি পাতব। মানুষের আত্মা বলতে কিছুর অস্তিত্ব আছে কিনা আমার কাছে প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। তবু দোষ কি বিশ্বাস করতে, মানুষের আত্মা আছে। আমি মনে মনে প্রার্থনা করছি তরুর আত্মা আমাকে সাহায্য করে, যাতে জীবনবৃত্ত আমি মেলে ধরতে পারি।

এক সময় তো তাকে সব দিয়ে ভালবেসেছি। সে ভালবাসার বেদনা ঘনগাহন কাহিনীটি আমি প্রকাশ করতে উদ্যত হয়েছি। আমি প্রার্থনা করব সূক্ষ্ম চেতনারূপী তরুর আত্মার সকাশে আমার অনুভবে সত্য যেন প্রকাশমান হয়, যতই নিষ্ঠুর হোক আমার বিশ্বাসে স্থির নিশ্চিত এবং অটল থাকতে পারি।

আল্লাহর কাছে মুনাযাত, তিনি যেন ক্রিয়াশীল শক্তির অপার করুণাবলে আমার চেতনাকে রাগ-দ্বেষ-ঈর্ষা থেকে মুক্ত করে একটি সমুন্নত দিগন্তের পথে চালিত করেন। আমার পূর্বসুরী মহান লেখকদের যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে এই দীন প্রয়াসকে সফলতার দ্বারদেশে পৌঁছে দেন।” (ছফা, খ. ৮, পরিশিষ্ট)

একাত্তরের একত্রিশ ডিসেম্বর ছফা কাকা কলকাতা ছেড়ে দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন কলকাতায় থেকে ছেড়ে আসতে তিনি বুকের ভেতর এক বেদনাদায়ক পীড়া অনুভব করেছিলেন। একাত্তরের ডিসেম্বরের একত্রিশ তারিখে লেখা ডায়েরি থেকে জানা যায়:

“পহেলা বোশেখ অর্থাৎ বাংলা বছরের পয়লা তারিখ আগরতলা এসেছিলাম। গতকাল ডিসেম্বর মাসের ত্রিশ তারিখ। দেশের দিকে যাচ্ছি। কলকাতা এসেছিলাম সহায়হীন, সম্বলহীন, বন্ধুহীন। চলে যাবার সময় ঢাকার মত কলকাতাকেও আপন মনে হচ্ছে। সুনন্দা, অর্চনা, সুনীলদা, মযহার ভাই সকলের স্মৃতি বড় মধুময়। প্লেন ছাড়তে দেরি হল। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে দেড় ঘণ্টায় আগরতলা এলাম। আগরতলায় বন্ধুরা স্বাগত জানালেন। বিজনদাদের বাসায় যেয়ে বিকচের সঙ্গে ঘুমোলাম।” (ছফা, খ. ১, পৃ. ২৭১)

একদিন পর বাহাত্তরের জানুয়ারির তিন তারিখ ছফা কাকা আগরতলা সীমানা পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছিলেন। ঢাকা পৌঁছার আগে তাঁকে আরও একদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকতে হয়েছিল। জানুয়ারির চার তারিখ ঢাকাতে এসে তিনি শুভাকাঙ্ক্ষীদের খোঁজে লেগে যান। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, মাহফুজউল্লাহ, এখলাসউদ্দিন, মোরশেদ, আহমেদ হুমায়ুন, ফরহাদ, হেলাল, হুদা, নওয়াব, ডক্টর মনিরুজ্জামান, ডক্টর মফিজ চৌধুরী, মিসেস হোসনে আরা, ডক্টর শাহনূর, মামুন, ডক্টর আহমদ শরীফ, প্রফেসর কবীর চৌধুরী এবং আরও অনেকের সঙ্গে তিনি দেখা করতে গিয়েছিলেন। এঁদের সঙ্গে দেখা করার সৌজন্য সাক্ষাৎ ছাড়া বিশেষ কোনো কারণ ছিল না।
জানুয়ারির বারো তারিখে ছফা কাকার সঙ্গে ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হকের দেখা হয়েছিল। তিনি তাঁকে পুত্রজ্ঞানে গ্রহণ করেন। বাংলা একাডেমীর সঙ্গে তাঁর গবেষণার চুক্তিপত্রটিও ওইদিন সই করতে হয়েছিল। ডক্টর আহমদ শরীফ এবং ডক্টর বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ছফা কাকার জামিন হয়েছিলেন। প্রফেসর কবীর চৌধুরী সঙ্গে কথা হয় বাংলা একাডেমী থেকে তিনটি বই প্রকাশের ব্যাপারে। তিনি রাজি হয়েছিলেন। বই তিনটি ছিল ‘হে স্বদেশ’ শিরোনামের গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধের ভিন্ন ভিন্ন সংকলন। এই সংকলনগুলোর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন ছফা কাকা স্বয়ং। এ ব্যাপারে ভাষাবিজ্ঞানী মনসুর মুসার সাক্ষ্য:

“দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর ছফা দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে তাঁর উদ্যোগে ‘হে স্বদেশ’ শীর্ষক তিনটি বই প্রকাশিত হয়। তার মধ্যে একটি প্রবন্ধ-সংকলন। সেখানে ‘বাংলা ভাষাতত্ত্বের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ আমাকে দিয়ে লেখানো হয়। আহমদ ছফা আমাকে ভাষাবিজ্ঞানের শূন্য প্রান্তরের দিকে ঠেলে দেন। শুধু তা-ই নয়, একটি বাংলা অভিধান প্রণয়নের প্রকল্প কার্যকর করার যে-আর্থিক ঝুঁকি তা নেওয়ার মত অবস্থা উদ্যোক্তাদের কারও ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশ নতুন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কলকাতায় প্রকাশিত পুরাতন অভিধানগুলোর বাজারের পরিবর্তে নতুন অভিধানের বাজারের চাহিদা দেখা গেছে, সেটা আহমদ ছফা উপলব্ধি করেছিলেন। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন উপলব্ধির একটি ষষ্ঠ-ইন্দ্রিয় তাঁর ছিল।” (ছফা, স্মা., পৃ. ৫৩)

বাহাত্তর সালে ছফা কাকার বিখ্যাত প্রবন্ধের বই বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস প্রকাশ পায়। তার আগে বইটি সতের কিস্তিতে দৈনিক গণকণ্ঠে ছাপা হয়েছিল। প্রবন্ধটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাওয়ার পর পাঠকমহলে ভীষণ রকম সাড়া জাগিয়েছিল। বইটির ক’টি বাক্য এখনও পাঠকদের মুখে মুখে। ‘বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হত না। এখন যা বলছেন শুনলে বাংলাদেশে সমাজ-কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হবে না। আগে বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানি ছিলেন বিশ্বাসের কারণে নয়—প্রয়োজনে। এখন অধিকাংশ বাঙালি হয়েছেন—সেও ঠেলায় পড়ে।’ ছফা কাকার এই বইটি পড়লে মনে হয় তিনি বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে কথা বলে নিজে বুদ্ধিজীবী হয়েছিলেন। তাঁর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চিন্তা-ভাবনা তিনি বইটিতে ঢেলে দিয়েছিলেন। বইটির প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন:

“আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যখন রক্ত দিয়েই চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছি। চারদিকে এত অন্যায়, অবিচার, মূঢ়তা এবং কাপুরুষতা ওঁৎ পেতে আছে যে এ ধরনের পরিবেশে নিতান্ত সহজে বোঝা যায় এমন সহজ কথাও চেঁচিয়ে না বললে কেউ কানে তোলে না। এই স্বল্পপরিসর গ্রন্থে যা বলেছি সব আমার কথা নয়। হামেশাই যা আলোচিত হতে শুনেছি তাই-ই একটু জোর দিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে বলবার চেষ্টা করেছি। তাও সব সময় পেরেছি তেমন দাবি করতে পারব না। সৎ সাহসকে অনেকে জ্যাঠামি এবং হঠকারিতা বলে মনে করে থাকেন, কিন্তু আমি মনে করি সৎ সাহস হল অনেক দূরবর্তী সম্ভাবনা যথাযথভাবে দেখতে পারার ক্ষমতা।” (ছফা, খ. ৬, পৃ. ১৯৪)

এই বইটির জন্য ছফা কাকার গর্ব ছিল। তবে এটির জন্য তিনি এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর বিরাগভাজনও হয়েছিলেন। বইটির বর্ধিত সংস্করণের ভূমিকায় তাঁর কিছু উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন:

“মাঝে মাঝে এমন চিন্তাও আমার মনে আসে, লেখাটি যদি না লিখতাম, হয়ত আমার জীবন অন্যরকম হতে পারত। এই লেখাটির জন্যই আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীভুক্ত এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর রোষ আমাকে পেছন থেকে অভিশাপের মত তাড়া করছে। অদ্যাবধি আমি জীবনে সুখ কি বস্তু তার সন্ধান পাইনি। আগামীতে কোনদিন পাব, সে ভরসাও করিনে। তথাপি এই রচনাটি লেখার জন্য এক ধরনের গর্ব অনুভব করি। (ছফা, খ. ৬, পৃ. ১৫৪)

এই রচনাটি পড়ে বইয়ের প্রচ্ছদলিপিতে ডক্টর আহমদ শরীফ ছফা কাকা সম্পর্কে কিছু ভাল ভাল কথা লিখে দিয়েছিলেন। তাতে ড. শরীফের একটি বাক্য ছিল, ‘আজকের বাঙলাদেশে এমনি পষ্ট ও অপ্রিয়ভাষী আরও কয়েকজন ছফা যদি আমরা পেতাম, তাহলে শ্রেয়সের পথ স্পষ্ট হয়ে উঠত।’

ছফা কাকাকে ডক্টর আহমদ শরীফ খুব স্নেহ করতেন এবং সম্মানও করতেন। তাঁর মেধার প্রতি ছিল ডক্টর শরীফের অগাধ বিশ্বাস। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর পদের জন্য আবেদন করেছিলেন। তখন আবেদনপত্রে তিনজনের সুপারিশ লাগত। ডক্টর শরীফের পছন্দের তিনজন সুপারিশকারীর মধ্যে একজনের নাম ছিল আহমদ ছফা। এ ঘটনার পর কাকা নিজেকে মহান ব্যক্তি হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিলেন। তিনি লিখেছেন:

“আমি যখন কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরলাম এক সন্ধ্যায় ড. শরীফের বাড়িতে খেতে গেলাম। তিনি জানালেন, এবার তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর পদের জন্য দরখাস্ত করতে যাচ্ছেন। প্রতিটি পদের জন্য আলাদা আলাদা দরখাস্ত করতে হয় আমি জানতাম না। যা হোক তিনি গোটা দরখাস্তটি বের করে এনে দেখালেন। বিশাল ব্যাপার, বিরাট একটা চ্যাপ্টা ফাইল। তিনি আমাকে জানালেন, তাঁর দরখাস্তের সঙ্গে তিনজন বিশেষ ব্যক্তির মতামত সংযুক্ত করে দিয়েছেন। তার একজন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অন্যজন ড. মুহম্মদ এনামুল হক আর তৃতীয় মানুষটি আমি। আমার অবস্থাটি বুঝে দেখুন। এমএ-এর রেজাল্ট বের হওয়ার আগে আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরাসরি পিএইচ-ডি করার অধিকার শর্তসাপেক্ষে আদায় করে নিয়েছি। এখন দেখতে পাচ্ছি, আমার ছাত্র জীবন শেষ হওয়ার পূর্বে একজন শিক্ষককে প্রফেসর হওয়ার সুপারিশও আমি করতে পারি।” (ছফা, খ. ৪, পৃ. ২২৩)

অবশ্য ডক্টর শরীফ দরখাস্ত পেশ করলেও তাঁকে প্রফেসর করা হয়নি। কারণ তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের একজন বিরাগভাজন ব্যক্তি ছিলেন। এর পেছনে ডক্টর নীলিমা ইব্রাহিমের একটা বড় ভূমিকা কাজ করেছিল, ছফা কাকার লেখাতে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বাহাত্তরে ছফা কাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে থাকতেন। পিএইচ-ডি কোর্সের ছাত্র হিসেবে তিনি এখানে স্থান করে নিয়েছিলেন। ছাত্রাবাসের ২০৬ নম্বর কামরায় তিনি উঠেছিলেন। তখন তিনি মাসিক বৃত্তি পেতেন চার শ’ টাকা। এই টাকাতে হয়ত তাঁর দিন চলত না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে থাকার কারণে নানা ঘরানার মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই সময় শামীম শিকদারের সঙ্গে তাঁর একটা আন্তরিকতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়। শামীম শিকদারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটি যেমন আতঙ্কের ছিল, মধুময়ও ছিল। ছিয়ানব্বই সালে তাঁর প্রকাশিত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরীতে শামীম শিকদার সম্পর্কে একটি বড় অংশ স্থান পেয়েছে। এ বইতে শামীম শিকদারের নামটি পাল্টে লিখেছেন ‘দুরদানা’। এই বইয়ে বর্ণিত কাহিনী সম্পর্কে ছফা কাকা সকলকে বলতেন, আমি একটুও মিথ্যে লিখিনি। একই কথা আমি শামীম শিকদারকেও বলতে শুনেছি। শামীম শিকদারের সঙ্গে তাঁর পরিচয়টা কিভাবে হয়েছিল অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরীতে তাঁর একটা বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন:

“এই দুরদানার কথা আমি প্রথম শুনেছিলাম কোলকাতায় স্মৃতিকণা চৌধুরীর কাছে ঊনিশ শ’ একাত্তর সালে। তখন তো মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। আমরা কোলকাতায় পালিয়েছিলাম। তখন স্মৃতিকণার সঙ্গে আমার পরিচয়। উপলক্ষ বাংলা-সাহিত্য। স্মৃতিকণা আমার কাছে দুরদানার কথা জানতে চেয়েছিল। আমি চিনি না বলায় অবাক হয়ে গিয়েছিল—ঢাকায় থাকি অথচ দুরদানাকে চিনিনে। এ কেমন করে সম্ভব! প্রথম স্মৃতিকণার কাছেই শুনেছিলাম দুরদানা কি রকম ডাকসাইটে মেয়ে। সে সাইকেল চালিয়ে কলেজে আসে। ছেলেদের সঙ্গে মারামারি করতেও তার বাধে না। প্রয়োজনে ছুরি চালাতেও পারে। স্মৃতিকণার কাছে শুনে শুনে দুরদানার একটা ভাবমূর্তি আমার মনে জন্ম নিয়েছিল। মনে মনে স্থির করে ফেলেছিলাম এই যুদ্ধ যদি শেষ হয়, ঢাকায় গিয়ে তত্ত্বতালাশ করব। (ছফা, খ. ৬, পৃ. ১৯)

ছফা কাকা ঢাকায় এসে অনেক খোঁজ-খবর করে শামীম শিকদারকে আবিষ্কার করেছিলেন। কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করে যেভাবে চমৎকৃত হয়েছিলেন শামীম শিকদারের সন্ধান লাভও ছফা কাকার কাছে বোধহয় অনুরূপ ছিল। উপন্যাসের এক জায়গায় তিনি লিখেছেন:

“গতানুগতিক নারীর বাইরে দুরদানার (শামীম) মধ্যে আমি এমন একটা নারীসত্তার সাক্ষাৎ পেলাম, সর্বান্তকরণে তাকে আমাদের নতুন যুগের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করতে একটুও আটকাল না। দুরদানা যখন সাইকেল চালিয়ে নাখালপাড়া থেকে আর্ট ইনস্ট্যুটে আসত, আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতাম। আমার মনে হত দুরদানার প্রতিটি প্যাডেল ঘোরানোর মধ্যদিয়ে মুসলিম সমাজের সামন্ত যুগীয় অচলায়তনের বিধি-নিষেধ ভেঙে নতুন যুগ সৃষ্টি করছে।” (ছফা, খ. ৬, পৃ. ২০)

শামীমকে নিয়ে ছফা কাকা এক রকম দোদুল্যমানতায় ভুগেছিলেন। তাঁর প্রতি ছফা কাকার যে একটা ভালবাসা ছিল, সেটাকে চিরস্থায়ী রূপ দিতে তাঁর বাধছিল। তিনি শামীমের মধ্যে কী চেয়েছিলেন তা বোঝা মুশকিল। কবি অসীম সাহার লেখায় শামীমের কথা এসেছে। তিনি লিখেছেন:

“একদিন সন্ধ্যায় ছফা ভাইয়ের ওখানে যেতেই তিনি আমাকে বললেন, চল অসীম, শামীমের ওখানে যাই। আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসের পূর্বদিক দিয়ে তখন আর্ট কলেজে যাবার রাস্তা ছিল। আমরা বেরিয়ে পড়ি। হাঁটার এক ফাঁকে ছফা ভাই আমাকে হঠাৎ করেই বলে ফেললেন, বুঝলে অসীম, আমি বোধহয় শামীমকে ভালবেসে ফেলেছি। আমি বললাম, ভাল কথা। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, না না, কিন্তু ওকে আমি বিয়ে করব না। আমি বললাম, কেন? তিনি বললেন, ও আমাকে মেরে ফেলবে।” (ছফা, স্মা., পৃ. ৮৫)

শামীম শিকদার সম্পর্কে ছফা কাকা তাঁর ডায়েরিতেও অনেক কথা লিখেছেন। তিয়াত্তর সালের আঠার মার্চের ডায়েরিতে লেখা:

“তরুদের বাসা, সনজীদা খাতুন এবং সালেহা খাতুনদের বাসায় করুণ অভিজ্ঞতার পর আমার অবস্থা এমন হয়েছে যে, ঘরপোড়া গরু সিন্দুর মেঘ দেখলে ভয় পায়।

আমি কি মনে মনে দুর্বল? না হলে এসব আবোল তাবোল বিষয়ে এত ভাবছি কেন? নোংরা কথা চিন্তা করলে মনটাও নোংরামিতে ভরে উঠে। সন্ধেবেলা মেয়েদের হলগুলোর সামনে দিয়ে যেতে-আসতে আমার কষ্ট হয়। ছেলেমেয়ের প্রেম আরও উন্নত, আরও সুন্দর এবং আরও পরিশীলিত কোন বস্তু বলে মনে হয়। আমার চারদিকে লাভ, লোভ এবং রিরংসার স্রোত বইছে। আমি কিভাবে মুক্ত থাকব বুঝতে পারব না। আমাকে বোঝে, আমার মার প্রতি সহানুভূতিসম্পন্না এবং ছেলেমেয়েদের প্রতি দায়শীল কোন মহিলার দেখা কি জীবনে পাব না? শামীম কি এরকম একজন মহিলা হতে পারবে? মেয়েদের আমি যৌনযন্ত্রের অধিক কিছু মনে করি।” (ছফা, খ. ১, পৃ. ২৮৭)

শামীম শিকদারের পাশাপাশি আরও কজন নারীর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তাঁরা সকলে সমসাময়িক। তাঁদের কথা ছফা কাকার ডায়েরিতে নানাভাবে এসেছে এবং সকলের প্রতি তিনি কম-বেশি দুর্বল ছিলেন। শ্যামা নামের একটি মেয়ের কথা তাঁকে লিখতে হয়েছে বারবার। শামীমের সঙ্গে যখন তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তখন শ্যামা তাঁর গোটা হৃদয় জুড়ে বাস করছিলেন। আবার তাঁর চে বয়সে ভারি ‘র’ নামের একজনের প্রতি তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছেন ভীষণভাবে। ‘র’ একটি সাংক্ষেতিক নাম। পুরো নামটি যেহেতু লেখক নিজে এড়িয়ে গেছেন এটা নিয়ে টানা-হেঁচড়া না করাই ভাল। সেটি থাক। তারপর সুরাইয়া খানমের আবির্ভাবটা এমনভাবে হল যেন পুরো ব্যাপারটাই তছনছ হয়ে গেল। শ্যামা সম্পর্কে ছফা কাকা তিয়াত্তরের মার্চের তের তারিখ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন:

“কলেজে যেয়েই শ্যামাকে পেলাম। মেয়েটাকে দেখে মনে হল এই প্রথম দেখলাম। অনেক বদলে গেছে। প্রতিটি স্পর্শেই কেঁপে ওঠে। আর্ট কলেজের চত্বরে বসেছিলাম দুজন। শিশুসূর্য একটু একটু বিস্ফারিত হতে লেগেছে, লতা-গুল্মগুলো দুলে দুলে যাচ্ছিল, একটানা কোকিল ডাকছিল, সর সর হাওয়া বইছিল। এই ধরনের পরিবেশে একটা যৌবনবতী নারীর সঙ্গে বসে গভীর গাঢ়কথা উচ্চারণ, তার কি আবেশ, কি পুলক আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। শ্যামাকে বলতে ইচ্ছে করেছিল—কথাটা জিভের ডগায় অনেকক্ষণ ঝুলছিল, আমার বৌ হবে? শেষ পর্যন্ত বলা হয়নি। সেকি আমার বৌ হবে?” (ছফা, খ. ১, পৃ. ২৮৫)

ডায়েরির আরেক পাতায় তিনি লিখেছেন:

“শ্যামার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কি আমি জানিনে। সে মেয়ে নয়, মেয়ের ক্যারিকেচার। ‘র’-এর আমার পরিচয়টা বেশ কিছুদূর গড়িয়েছে। এ পর্যন্ত তিনি দুবার আমাকে স্পর্শ করেছেন। কাল তাঁর ভাইটির জন্য প্রচণ্ড স্নেহবোধ করেছি এবং ছেলেটিকে ভারি ভাল মনে হয়েছে। আর কোন লোকের ভাইকে এত ভাল মনে হয়নি। দু’ তিনদিন আগে ‘র’-এর রোগা, ক্লান্ত মুখমণ্ডল এবং অনুচ্চ স্বর তরুর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। ক্রমাগত অনেকদিন তাঁর কথা চিন্তা করেছি। যতই দেখি দেখার ইচ্ছে তীব্র হয়। কি করব জানিনে। তিনি যদি নিজে থেকে না এগিয়ে আসেন, আমার এগুবোর উপায় নেই। অন্যান্যদের মত সহজ হতে পারছিনে। গেলে মনে হয় কিছু একটা জামার তলায় লুকিয়ে রেখেছি। কেউ যদি দেখে ফেলে লজ্জার সীমা থাকবে না। সে বস্তুটি কি ভালবাসা?

আগুন নিয়ে খেলছি। যদি অন্যথা হয় অপমানের একশেষ। কি করে যে নিজের মনকে প্রবোধ দেই। এমন অস্বাভাবিক ঘটনাও ঘটে মানুষের জীবনে? কিন্তু আমি ঘটিয়েছি। (ছফা, খ. ১, পৃ. ২৯৮)

সুরাইয়া খানমের সঙ্গে পরিচিত হবার পর ছফা কাকা অন্যদের কাছ থেকে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছিলেন তাঁর বিক্ষিপ্ত লেখা থেকে তা সহজে অনুমান করা যায়। অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরীতে ছফা কাকা সুরাইয়া সম্পর্কে অনেক কাহিনী বয়ান করেছেন। এ উপন্যাসটি যেহেতু আত্মজীবনীমূলক, তাই কাহিনী নির্মাণে কল্পনার চেয়ে বাস্তবতাকে তিনি বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়। ছফা কাকা তো নানা জায়গায় বলেছেন, এ উপন্যাসটিতে তিনি একটুও মিথ্যে লিখেননি। যা ঘটেছে, যা জেনেছেন, যা দেখেছেন তাকে তিনি তাঁর লেখনি শক্তি দিয়ে গুছিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন। ব্যত্যয় ঘটেছে শুধু নামের ক্ষেত্রে। এখানে তিনি সুরাইয়া নামটি বিসর্জন দিয়ে ব্যবহার করেছেন ছদ্মনাম কন্যা শামারোখ।

সুরাইয়া খানমের সঙ্গে পরিচয়টা ছফা কাকার লেখায় দু’ জায়গায় এসেছে। প্রথম লিখেছিলেন তিনি ডায়েরির পাতায়, তারপর অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী উপন্যাসে। দুই জায়গায় কাহিনী বিন্যাস দু রকম হলেও ঘটনা এক। তিয়াত্তর সালের পনের সেপ্টেম্বরের ডায়েরির পাতায় তিনি লিখেছেন:

“বেশ কদিন আগে শামীমের মাধ্যমে সুরাইয়া খানমের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। মহিলার নামে অজস্র অপবাদ। এক শ’ পুরুষের সঙ্গে নাকি তাঁর খাতির। এসব কথা এখন হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। এ জাতীয় খারাপ বলে কথিত মহিলাদের প্রতি আমার তীব্র আকর্ষণ রয়েছে। হুমায়ুনের স্মৃতি পুরস্কারের চাঁদা তুলতে যেয়ে বাংলা একাডেমীতে এই অনুপম সুন্দর মহিলাকে দেখি। তাঁকে বোধহয় খোঁচা দিয়ে কথা বলেছিলাম। সে যাক, মহিলা দু’ দু’বার শামীমসহ আমার এখানে এসেছিলেন। একবেলা খেয়েছিলেন। দু’বার শামীমের হোস্টেলে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। টুকরো টুকরো কথাবার্তা হয়েছে। গতকাল মনে মনে প্রার্থনা করেছিলাম যেন উপযুক্ত কোন মহিলার সঙ্গে দেখা হয়। ঠিক তিনটের দিকে সুরাইয়া এসে উপস্থিত। গোটা দিন অভুক্ত। ভদ্রমহিলা দৈনিক বাংলার শাহাদত চৌধুরী নামে এক ভদ্রলোককে চড় লাগিয়ে দিয়ে এসেছেন। আমার মনে হল তিনি আমার সঙ্গে অত্যন্ত পক্ষপাতের সুরে কথা কইলেন। প্রকারান্তরে বললেন, কাউকে বিয়ে করতে চান। বিগত স্বামীর দোষ বললেন। তাঁকে শামীমের হোস্টেল অবধি দিয়ে এলাম। যেতে যেতে War and Peace-এর সেই যে আঁদ্রের মৃত্যুর দৃশ্যটার কথা বললেন, জীবনে আমি ভুলব না। ভদ্রমহিলা চরিত্রহীন হোন, মাথা খারাপ হোন তাঁর প্রতি সুগভীর আকর্ষণ বোধ করছি। (ছফা, খ. ১, পৃ. ২৯৮)

পাশাপাশি একটা চিন্তাও তাঁর মাথায় ভর করেছিল, সেই সঙ্গে দ্বিধাও, ‘র’-এর আর কোন মূল্য রইল না। তিনি আনমনে বলে ফেলেছেন, “‘র’ কি আমার জীবন থেকে বাতিল হয়ে গেল? কি জানি। তাঁর সাথে কাল কবীর চৌধুরীর বাড়ি যাবার কথা। আসবেন কিনা কে জানে।” (ছফা, খ. ১, পৃ. ২৯৮)

যা হোক, ছফা কাকা শেষ পর্যন্ত সুরাইয়া খানমের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন। তাঁদের নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানারকম গুজব এমনভাবে ডালপালা ছড়িয়েছিল যে তার একটা মূল্য ছফা কাকাকে দিতে হয়েছিল। তাঁর উপন্যাস অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী যাঁরা পড়েছেন তাঁদের কাছে বিশদ বলার দরকার নেই, যারা পড়েননি তাদের পড়ে নিতে অনুরোধ করি।

শামীম শিকদার, শ্যামা, ‘র’, সুরাইয়া খানমসহ এ পর্যন্ত হয়ত আরও অনেক নারী ছফা কাকার জীবনে এসে থাকবেন, কিন্তু কেউ তাঁকে আঁচলে বেঁধে রাখতে পারেননি। তাঁরা স্রোতের শ্যাওলার মত এসেছিলেন, আবার ভাটির টানে ভেসে গেছেন। ছফা কাকাও চেষ্টা করেননি কাউকে ধরে রাখতে। ইচ্ছে করলে কি তিনি পারতেন না? খুব পারতেন। কিন্তু সেটা ধাতে সয়নি। সারাজীবন নারীর ব্যাপারে তিনি দোদুল্যমানতায় ভুগেছেন। যখন কেউ তাঁকে বিয়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি জবাব ছুঁড়ে দিয়েছেন, আহমদ ছফাকে ধারণ করার মত নারী তিনি পাননি। আবার বলেছেন, যাদের সঙ্গে শারীরিক শেয়ার করা যায় তাদের সঙ্গে মানসিক শেয়ার করা যায় না, মানসিক যাদের সঙ্গে শেয়ার করা যায় তাদের সঙ্গে শারীরিক শেয়ার করা যায় না। কথাগুলো কতটুকু সত্য জানি না। তবে আমার কাছে ঘুরে ফিরে একটা কথা মনে হয়েছে, তিনি নারীদের প্রতি যতটা দুর্বল তার চেয়ে কঠিন এবং যতটা কঠিন তার চেয়ে অধিক তরল। তাঁর ডায়েরিতেও একই রকম ভাষ্য পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন:

“আমার জীবনটা দুঃখময়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, এই দুঃখটাকেই আমি ভুলে থাকি। বৈজ্ঞানিক নির্লিপ্ততা এবং অনপেক্ষতা নিয়ে বেশিরভাগ সময় কাজ করতে পারিনে। তাই চরিত্রের দুই বিপরীতমুখী শক্তির মধ্যে একটা মাঝবিন্দু আবিষ্কার করা প্রায়ই ঘটে না। একদিকে অংক, শীতল চুলচেরা যুক্তি, বিতর্ক, বিচার এবং অন্যদিকে অপরিমিত আবেগ—এই দুয়ের একটা সমতা সাধন করতে পারিনি—না জীবনে, না শিল্পে। তাই আহমদ ছফা বলতে ক্ষেপা, একগুঁয়ে, কালাপাহাড় ধরনের একটা ধারণা সকলের মনে উদয় হয়। অথচ নির্জন মুহূর্তে, দুঃখের সময়ে আমি নিজের মধ্যেই কত মহত্বের সমাবেশ দেখতে পাই। আমার সম্বন্ধে সবচাইতে ট্রাজেডি হল, আমি ডুবতে পারিনি। কম বয়সে যে রকম তন্ময়তা অনুভব করতাম, যার প্রসাদে বাস্তবের বিষদাঁতের স্পর্শ ভুলে থাকতাম, ইদানীং মনে হচ্ছে হারিয়ে ফেলেছি। এভাবে যদি দীর্ঘদিন চলে মানসিক সমস্ত সৌন্দর্য হারিয়ে বসব। নিজেকে বারেবারে প্রশ্ন করি, আমি কি সত্যিকার অর্থে নারী বিদ্বেষী? নাকি মনের মত মেয়ে মানুষ পাইনে বলেই এরকমের হাসফাঁস করছি। মেয়েদের মধ্যে স্থিরতা এবং সরলতা এ দুটো গুণকেই আমি দাম দেই। অথচ যাদের সঙ্গে দেখি, কথা বলি, এমনকি যারা স্বপ্নে এসে চরিত্র হনন করে, তাদের কেউ যেন আমার যোগ্য নয়। আমার ভেতরে কি প্রচণ্ড অহংকার শিলাময় পর্বতের মত জমাট বেঁধে আছে? নিজেও টের পাইনে। কখনও কখনও তার ঋজু চেহারা দেখে নিজেই ভয় পেয়ে যাই। যতগুলো মানুষ দেখেছি আমার চাইতে দুঃসাহসী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও জেদি কোন মানুষ এপর্যন্ত দেখিনি। কখন, কি করে যে আমার মনের মধ্যে আকাশে মাথা তুলে দাঁড়াবার ধারণা গেঁথে গেছে নিজেও জানিনে। যখনই কোন মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় এসেছি আমার সে উদ্ধত অহঙ্কৃত আত্মবিশ্বাসে ঘা লাগে, প্রেম-টেম সব কোথায় চলে যায়। নেপোলিয়ানের জীবন আমাকে সবচাইতে প্রভাবিত করেছে। বিশাল আকাশের মত মনসম্পন্না একজন মহিলা আমার চাই। যতদিন না পাই, চলতি মহিলাদের পায়ে দলেই যাব। তার মানে এই নয় যে, মহিলাদের আমি অসম্মান করি বা নারীত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নই। কিন্তু কি করব, মনের সঙ্গে মেলে না, তাই ছেড়ে যাই। ব্যথা নিজে পাই না? খুবই ব্যথা পাই। পাঁজর ভেঙে যেতে চায়। কাউকে শখ করে ব্যথা দেইনি, অনেকে ব্যথা পেয়েছে। সব সময়ে এমনকি ঘুমে, আধঘুমেও আমার আশা-আকাঙ্ক্ষা আমার লক্ষ্যের দিকে কম্পাসের মত এমনভাবে হেলে থাকে যে তারা যে রকমটি প্রত্যাশা করে সে রকম আচরণ করতে পারিনে। আমি কিছু অসাধারণ না করতে পারি—এই না করার ব্যথা বুকে নিয়ে মারা যাব। নিজেকে নিচে নামাতে পারব না। জীবনের কাছে আমার প্রার্থনা, হে জীবন, তুমি যদি দ্রুত পক্ষ ঈগলের মত অভীষ্ট অভিমুখে বাতাসে ভর করে ছুটতে না পার, সেইখানে থেমে যেও। কর্মহীন, গর্বহীন আমাকে কেউ যেন জীবিত দেখতে না পায়। আমি যেন লোভের কাছে, মোহের কাছে, হীনতা, পরবশ্যতা এবং আলস্যের কাছে পরাজিত না হই। প্রতিদিন জীবনের দিকে এই যে ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দিয়ে তাকাচ্ছি, এতে একটি লাভ হচ্ছে। নিজেকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে চিনতে পারছি। দায়িত্ব এবং লক্ষ্যের চেহারা আর মাঝপথের ধাপগুলো স্পষ্ট আকার নিচ্ছে। লোকে যা-ই বলুক, যা-ই অনুভব করুক নিজের কাছে আমি অনন্য। দুঃখগুলো হজম করতে পারি বলে, ব্যথাকে অপমান করিনে বলেই আমার সবটাই আমার। আমার জীবন আমারই নির্দেশ মেনে চলবে—এ রকম ভরসা অন্তত করতে পারি। (ছফা, খ. ১, পৃ. ২৮১)

(কিস্তি ৬)

nurulanwar1@gmail.com

free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফাহিমা — জানুয়ারি ১৩, ২০১০ @ ৭:৩৮ অপরাহ্ন

      চমৎকার লাগছে।

      ছফার আত্মজীবনীমূলক আরেকটা আছে, যদ্যপি আমার গুরু…।

      – ফাহিমা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shoaib gibran — জানুয়ারি ২২, ২০১০ @ ৬:২৪ অপরাহ্ন

      লেখাটি ভাল লেগেছে। নিজেদের সময়ের সাথে মিলিয়ে নিচ্ছি।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com