গোলাপের নাম

উম্‌বের্তো একো

জি এইচ হাবীব | ২ ফেব্রুয়ারি ২০১০ ১:২৮ অপরাহ্ন

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১
———————————————————————————
[ইতালির ঔপন্যাসিক উমবের্তো একোর বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস The Name of the Rose। আর্টস-এর জন্য বিশালকায় (আনুমানিক ৫০০ পৃষ্ঠা) এই উপন্যাসের অনুবাদ করছেন অনুবাদ পত্রিকা তরজমা-র সম্পাদক ও পেশাগত জীবনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক
rose2.jpg জি এইচ হাবীব। আশা করা যাচ্ছে প্রতি সপ্তাহের মঙ্গল বারে আর্টস-এর পাতায় এই উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে। এবারে অনুবাদের সঙ্গে মধ্যযুগের একটি সংক্ষিপ্ত কালপঞ্জি থাকছে, যা উপন্যাস পাঠে পাঠককে সুবিধা দেবে। এ ছাড়া লেখার নিচে প্রয়োজনীয় টীকাও থাকছে। আর্টস-এ আগে প্রকাশিত একটি রচনা (উপন্যাস যথা মহাকালিক আয়োজন/হোসেন মোফাজ্জল) আগ্রহীদের উপকারে আসতে পারে।

উল্লেখ্য হাবীব এর আগে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অভ্ সলিচিউড (নিঃসঙ্গতার একশ বছর), ইয়স্তাইন গার্ডারের সোফি’য ওয়ার্ল্ড (সোফির জগৎ ), আইজাক আসিমভের ফাউন্ডেশন, আমোস তুতুওলার দ্য পাম-ওয়াইন ড্রিংকার্ড (তাড়িখোর), ইতালো কালভিনোর ইনভিযিবল সিটিয (অদৃশ্য নগর) এবং রুপার্ট ক্রিস্টিয়ানসেনের হু ওয়ায উইলিয়ম শেক্সপীয়র (উইলিয়ম শেক্সপীয়র কে ছিলেন) অনুবাদ করেছেন। – বি. স.]
louvre-museum-in-paris-wed.jpg
উম্‌বের্তো একো

অনুবাদকের নোট
বিশ্বখ্যাত ইতালীয় দার্শনিক, চিহ্নবিজ্ঞানী, ঐতিহাসিক এবং সাহিত্য সমালোচক উম্‌বের্তো একো-র (জ. ১৯৩২) প্রথম উপন্যাস Il nome della rose ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হলে সাহিত্যাঙ্গনে একটি সাড়া পড়ে যায়; বছর তিনেক পর উইলিয়াম উইভারের ইংরেজি অনুবাদ The Name of the Rose-এর প্রকাশ সেই সাড়াকে প্রায় বিশ্বব্যাপী একটি আলোড়নে পরিণত করে৷আরো তিন বছর পর গ্রন্থটি চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়, এবং তাতে প্রধান চরিত্রে রূপদান করেন বিখ্যাত অভিনেতা শন কনোরি৷

ফুকো’য পেন্ডুলাম (১৯৮৮),দি আইল্যান্ড অভ্‌ দ্য ডে বিফোর (১৯৯৫), বাউদোলিনো (২০০০), দ্য মিস্টেরিয়াস ফ্লেইম অভ্‌ কুইন লোয়ানা (২০০৫) নামে আরো চারটি উপন্যাসও রচনা করেছেন একো৷ এছাড়াও রয়েছে তাঁর পাঠক সমাদৃত প্রবন্ধ সংকলন মিসরিডিংস, ট্র্যাভেলস ইন হাইপাররিয়ালিটিহাউ টু ট্র্যাভেল উইদ আ স্যামন অ্যান্ড আদার এসেজ৷ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে পাঠক নন্দিত আরো তিনটি গ্রন্থ: অন লিট্‌রেচার, অন বিউটি, এবং অন আগলিনেস৷ শিশু-কিশোরদের জন্যেও রচনা করেছেন দুটি গ্রন্থ, ইউজেনিও কার্মির সঙ্গে যৌথভাবে, দ্য বম্ব এন্ড দ্য জেনারেলদ্য থ্রী অ্যাস্ট্রনট্‌স্‌৷ বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিওটিক্স-এর অধ্যাপক একো-র নিবাস মিলান৷

১৩২৭ খৃষ্টাব্দের নভেম্বর মাসের শেষাশেষি ইতালির একটি বেনেডিক্টীয় মঠে এসে উপস্থিত হয়েছেন মধ্যবয়স্ক ফ্রান্সিসকান সন্ন্যাসী বাস্কারভিলের উইলিয়াম ও তাঁর সঙ্গী শিক্ষানবিস অ্যাড্‌সো, যীশু খৃষ্টের দারিদ্র্য বিষয়ক একটি বিতর্কে পোপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অংশ নেয়ার জন্যে৷ তাঁরা মঠে পৌঁছে দেখেন সেখানে এক সন্ন্যাসীর রহস্যজনক মৃত্যু ঘটেছে৷ উইলিয়ামের ওপর দায়িত্ব পড়ে এই মৃত্যু- রহস্য উদ্‌ঘাটনের৷ দেখতে দেখতে, সাতদিনের মধ্যে অত্যন্ত বীভৎসভাবে মৃত্যুবরণ করে প্রায় আধডজন সন্ন্যাসী৷ উইলিয়াম কীভাবে এই হত্যারহস্য উন্মোচন করলেন তা যেমন অত্যন্ত আকর্ষণীয়, সেই সঙ্গে আকর্ষনীয় ‘গোলাপের নাম’ নামক এই বুদ্ধিবৃত্তিক রহস্যোপন্যাসে যেভাবে লেখক উম্‌বের্তো একো চিহ্নবিজ্ঞান, সাহিত্যতত্ত্ব, বাইবেলের নানান ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, মধ্যযুগের দর্শন, ইতিহাস, ইত্যাদির চমকপ্রদ মিশ্রণ ঘটিয়েছেন৷

উপন্যাসটি বিশেষত মধ্যযুগীয় নানান ঐতিহাসিক ঘটনা এবং গুরুত্বপূর্ণ-অগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের উল্লেখে ভরপুর৷ এখানে উল্লিখিত হয়েছেন অসংখ্য সন্ত [যেমন এজিলাফ (Agiluf), আলদেমার (Aldemar), ফলিনো-র অ্যাঞ্জেলা (Angela of Foligno), মন্টেফাল্‌কো-র ক্লেয়ার (Clare of Montefalco)], বিভিন্ন হেরেটিক বা ধর্মদ্বেষী ব্যক্তি বা দল [আর্নল্ডিস্ট (Arnoldist), বেগার্ড (Beghards), বিতোচি (Bizochi), ভালদেনসীয় (Waldensians), উইলিমাইট (Williamites)]; রয়েছে ককেইন (Cockaigne), কিমেরীয় কুয়াশা (Cimmerian fog), ব্লেমীয়ে (Blemmyae) আর ফ্যালারিসের ষাঁড়ের (Bull of Phalaris) মতো নানান পৌরাণিক উল্লেখ৷ উপন্যাসের গোলকধাঁধাময় গ্রন্থাগারের তাকগুলোতে মুখ গুঁজে থাকা অনেক নিতান্ত তুচ্ছ এবং অখ্যাত লেখকের নাম আর গ্রন্থের কথাও উল্লেখ করেছেন একো৷ আর আছে, অসংখ্য লাতিন, ফরাসী এবং জার্মান শব্দ, শব্দবন্ধ, বাক্য ও অনুচ্ছেদ, যেসবের অনুবাদ লেখক ইচ্ছাকৃতভাবেই সরবরাহ করেননি৷ ফলে, সব মিলে পাঠকের জন্যে তৈরি হয় এক দুস্তর বাধা৷ এই বাধা দূর করতে অ্যাডেল জে হ্যাফট, জেন জি. হোয়াইট এবং রবার্ট জে হোয়াইট ১৯৮৭ সালে প্রকাশ করেন তাঁদের যৌথ গ্রন্থ দ্য কী টু দ্য নেইম অভ্‌ দ্য রোয, যেখানে তাঁরা উপন্যাসটিতে উল্লিখিত নানান ঘটনা, ব্যক্তিত্ব, এবং অ-অনূদিত লাতিন, ফরাসী এবং জার্মান শব্দ, শব্দবন্ধ, বাক্য ও অনুচ্ছেদ ইত্যাদির টীকা-ভাষ্য আর অনুবাদই উপস্থিত করেননি, উপন্যাসটির পটভূমি, বিষয়বস্তু, মর্মার্থ ইত্যাদি সম্পর্কে কয়েকটি প্রবন্ধ এবং মধ্যযুগের একটি প্রাসঙ্গিক কালপঞ্জিও জুড়ে দিয়েছেন৷

এখানে, দ্য নেইম অভ্‌ দ্য রোয-এর অনুবাদ গোলাপের নাম-এর পাশাপাশি, পাঠক (এবং আমার) সুবিধার্থে দ্য কী টু দ্য নেইম অভ্‌ দ্য রোয-এর সাহায্য নিয়ে সেসব টীকা-ভাষ্য, কালপঞ্জি এবং লাতিন, ফরাসী ও জার্মান শব্দ, শব্দবন্ধ, বাক্য ও অনুচ্ছেদ, ইত্যাদির বঙ্গানুবাদও দেয়া হলো মূল অনুবাদের নিচে, যদিও খানিকটা সংক্ষিপ্তাকারে৷

অনুবাদ: জি এইচ হাবীব

moth.jpg
মঠ

এডিফিসিয়াম বা বিশাল ভবন
গির্জা
ক্লয়স্টার
ডমিট্রি
যাজকসভাগৃহ বা চ্যাপটার হাউস
বাল্‌নিয়ারি বা স্নানঘর
শুয়োরের খোঁয়াড়
আস্তাবল
কামারশালা


ভূমিকা:

১৯৬৮ সালের ১৬ই আগস্ট জনৈক অ্যাবে ভ্যালেট-এর লেখা একটি বই হস্তগত হয় আমার: Le Manuscrit de Dom Adson de Melk, traduit en français d’après l’édition de Dom J. Mabillon (Aux Presses de l’Abbaye de la Source, Paris 1842) বইটিতে দাবি করা হয়েছে যে—যদিও সে-দাবির সমর্থনে ছিল নিতান্তই সামান্য কিছু ঐতিহাসিক তথ্য—সেটি চতুর্দশ শতকের একটি পাণ্ডুলিপির বিশ্বস্ত প্রতিলিপি, যে-পাণ্ডুলিপিটি পাওয়া গিয়েছিল মেল্ক-এর একটি মঠে, এবং সেটি এমন একজন ব্যক্তি পেয়েছিলেন যাঁর কাছে বেনেডিক্টীয় সম্প্রদায়ের ইতিহাস সম্পর্কিত অসংখ্য তথ্যের জন্যে আমরা প্রভূতভাবে ঋণী৷ এই বিদ্বজ্জনোচিত আবিষ্কারটি যখন ঘটলো (মানে, আমি আমারটির কথা বলছি) তখন আমি প্রাগে, অপেক্ষা করছি একজন প্রিয় বন্ধুর জন্যে৷ ছ’দিন পর, সোভিয়েত সেনাবাহিনী আগ্রাসন চালায় সেই অসুখী নগরে। নানান ঘটনা-দুর্ঘটনার পরে তবেই লিঞ্জ-এর অস্ট্রীয় সীমান্তে পৌঁছোই আমি, তারপর সেখান থেকে যাই ভিয়েনা৷ সেখানে সাক্ষাৎ ঘটে আমার প্রেয়সীর সঙ্গে, তারপর দু’জনে জাহাজে পাড়ি জমাই দানিউবের উজান ধরে৷

বুদ্ধিবৃত্তিক এক উত্তেজনার বশে মুগ্ধ হয়ে পড়ে ফেলি আমি মেল্ক-এর অ্যাড্‌সোর ভয়ানক কাহিনীটি, এতোই নিমগ্ন হয়ে যাই সেটাতে যে উদ্যমের প্রায় এক আকস্মিক বিস্ফোরণে ওটার একটা অনুবাদও সম্পন্ন করে ফেলি প্যাপাতেরি জোসেফ গিলবার্টের কিছু বড় বড় নোটবই ব্যবহার করে; ফেল্ট-টিপ কলম দিয়ে ওই নোটবইগুলোতে লিখে বড় সুখ৷ অনুবাদটি করার এক পর্যায়ে গিয়ে হাজির হই মেল্ক-এ, সেখানে একটি নদীর বাঁকের ওপর আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে চমৎকারদর্শন স্টিফ্‌টটি, শতাব্দী পরম্পরায় বেশ কয়েক দফা মেরামতির পর৷ পাঠক নিশ্চয়ই অনুমান করতে পেরেছেন, সঅল্‌জ্‌বার্গে আমরা পৌঁছোনোর পর মঠের পাঠাগারে অ্যাড্‌সোর পাণ্ডুলিপির কোনো চিহ্নই খুঁজে পাইনি আমি৷ মন্ডসির তীরে একটা ছোট্ট হোটেলে এক ট্র্যাজিক রাতে আমার ভ্রমণ-সখ্যে হঠাৎই ছেদ পড়ল, এবং যিনি আমার সফরসঙ্গী ছিলেন তিনি সহসা উধাও হয়ে গেলেন—সঙ্গে নিয়ে গেলেন অ্যাবে ভ্যালেট-এর বইটা, বিদ্বেষবশত নয় অবশ্য, বরং যে আকস্মিক ও অগোছালোভাবে আমাদের সম্পর্কের ইতি ঘটলো তারই ফলস্বরূপ৷ কাজেই, দেখা গেল আমার হাতে রয়েছে কেবল পাণ্ডুলিপি ধরনের কয়েকটা নোটবই আর হৃদয়ে এক বিশাল শূন্যতা৷ মাস কয়েক পর, প্যারিসে বসে আমি ঠিক করলাম যে আমার গবেষণার একটা হেস্তনেস্ত না করলেই নয়৷ ফরাসী বইটা থেকে গুটি কতেক যে তথ্য পেলাম তার উৎস সম্পর্কিত অসাধারণ রকমের পুঙ্খানুপুঙ্খ আর সঠিক রেফারেন্সটি আমার কাছে তখনো ছিল:

Vetera analecta, sive collectio veterum aliquot opera & opus culorum omnis generis, carminum, epistolarum, diplomaton, epitaphiorum, &, cum itinere germanico, adaptationibus & aliquot disquisitionibus R.P.D. Joannis Mabillon, Presbiteri ac Monachi Ord. Sancti Benedicti e Congregatione S. Mauri — Nova Editio cui accessere Mabilonii vita & aliquot opuscula, scilicet Dissertatio de Pane Eucharistico, Azymo et Fermentatio ad Eminentiss. Cardinalem Bona. Subiungitur opusculum Eldefonsi Hispaniensis Episcopi de eodem argumentum Et Eusebii Romani ad Theophilum Gallum epistola, De cultu sanctorum ignotorum, Parisiis, apud Levesque, ad Pontem S. Michaelis, MDCCXXI, cum privilegio Regis.

Bibliothèque Sainte Geneviève-এ Vetera analecta আমি চটজলদি-ই পেয়ে গেলাম৷ কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম যে, যে-সংস্করণটা আমি পেয়েছিলাম সেটার বর্ণনার সঙ্গে দুটো তথ্যে গরমিল রয়েছে: প্রথমত, প্রকাশক-এর ব্যাপারটা; তাকে এখানে “Montalant, ad Ripam P.P. Augustinianorum (prope Pontem S. Michaelis)’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে; আর সেই সঙ্গে তারিখটিও ভিন্ন, এখানে সেটা দু’বছর পরে৷ একথা উল্লেখ অপ্রয়োজনীয় যে, এসব analecta অ্যাড্‌সো বা মেল্ক-এর অ্যাড্‌সো-র কোনো পাণ্ডুলিপির অস্তিত্ব স্বীকার করে না; উল্টো —আগ্রহী যে কেউ-ই এটা পরীক্ষা ক’রে দেখতে পারে—ওগুলো হচ্ছে কিছু মাঝারি বা সংক্ষিপ্ত দৈর্ঘ্যের টেক্সট-এর একটি সংগ্রহ, অন্যদিকে ভ্যালেট-এর প্রতিলিপি করা গল্পটির দৈর্ঘ্য কয়েকশ পৃষ্ঠা৷ একই সঙ্গে আমি বিখ্যাত সব মধ্যযুগ-বিশারদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের মধ্যে সুহৃদ এবং অবিস্মরণীয় Étienne Gilson-ও রয়েছেন, কিন্তু এটা পরিষ্কার বোঝা গিয়েছিল যে Vetera analecta-ই দেখেছিলাম আমি Sainte Geneviève-এ৷ Passy অঞ্চলে, Abbaye de la Source-এ একটি ত্বরিত সফরের সময় আমার বন্ধু Dom Arne Lahnestedt-এর সঙ্গে কথা বলে আমি নিশ্চিত হলাম যে অ্যাবে ভ্যালেট নামে কেউ মঠের ছাপাখানা থেকে কোনো বই প্রকাশ করেন নি (যার মানে, তার অস্তিত্ব নেই)৷ ফরাসী পণ্ডিতরা জীবনীসংক্রান্ত তথ্য সন্নিবেশ করার ব্যাপারে উদাসীনতার জন্যে কুখ্যাত; কিন্তু এই ক্ষেত্রে ব্যাপারটি যেন সব ধরনের যৌক্তিক হতাশাবাদকেও ছাড়িয়ে গেল৷ মনে হতে লাগল আমি একটি জালিয়াতির স্বীকার হয়েছি৷ এ-পর্যন্ত অ্যাবে ভ্যালেট-এর গ্রন্থটি উদ্ধার করা যায়নি৷ (কিংবা অন্তত এটুকু বলা যায় যে, যিনি বইটি আমার কাছ থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন তার কাছে গিয়ে বইটি ফেরত চাইবার সাহস আমার হয়নি৷) আমার হাতে ছিল কেবল আমার নিজের নোটপত্তর, যদিও ততোদিনে সেগুলোর ব্যাপারে আমার মনে সন্দেহ ঢুকে গেছে৷

কিছু কিছু ঐন্দ্রজালিক মুহূর্ত রয়েছে যার সঙ্গে ভীষণ শারীরিক অবসন্নতা আর তীব্র পেশীসঞ্চালক উত্তেজনা জড়িত, যা মনশ্চক্ষে এমন কিছু মানুষজনের ছবি তৈরি করে যাঁরা অতীতে প্রখ্যাত ছিলেন (“en me retraçant ces détails, j’en suis à me demander s’ils sont réels, ou bien si je les ai rêvés”) Abbé de Bucquoy-এর সঙ্গে কথা বলে আমি বুঝেছিলাম, এখনো লেখা হয়নি এমন কিছু বই-এরও এরকম ছবি রয়েছে৷

নতুন করে যদি কিছু না ঘটত, তাহলে মেল্ক-এর অ্যাড্‌সোর গল্পের উৎস কোথায় তাই নিয়ে এখনো উথাল পাথাল ভেবে যেতাম আমি৷ কিন্তু ১৯৭০ সালে যখন বুয়েন্স আইরিসে, সেই বিখ্যাত রাস্তায় আরো বিখ্যাত Palio del Tango থেকে কাছেই, করিয়েন্তেস-এর ছোট্ট একটা পুরনো ও প্রাচীন বইয়ের দোকানের তাকগুলো ঘাঁটছিলাম তখন মিলো তেমেসভার-এর ছোট্ট একটি রচনা দাবা খেলায় আয়নার ব্যবহার-এর একটি ক্যাস্টিলীয় সংস্করণ নজরে পড়ে আমার৷ ওটা ছিল মূলের ইতালীয় তর্জমা; মূলটি ছিল জর্জীয় ভাষায় লেখা (Tbilisi, ১৯৩৪), যেটা আর এখন পাওয়া সম্ভব নয়৷ আর এই রচনাটিতেই তাজ্জব হয়ে আবিষ্কার করলাম আমি অ্যাড্‌সোর রচনা থেকে এন্তার উদ্ধৃতি, যদিও তার উৎস ভ্যালেট বা ম্যাবিলন কেউই নন; বরং ফাদার আথানাসিয়াস কিরচার (কিন্তু কোন রচনা?) একজন পণ্ডিত—যাঁর নামটা এখানে উল্লেখ করতে চাইছি না—পরে আমাকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে (এবং তিনি স্মৃতি ঘেঁটে গ্রন্থসূচীও উল্লেখ করেছিলেন), সেই মহান জেসুইট ভদ্রলোক কোথাও মেল্ক-এর অ্যাড্‌সোর উল্লেখ করেননি৷ কিন্তু তেমেসভারের লেখা তো আমার চোখের সামনেই ছিল, আর তিনি যেসব ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন সেগুলো ভ্যালেট-এর পাণ্ডুলিপির ঘটনাগুলোর অনুরূপ, (বিশেষ ক’রে, গোলকধাঁধাটির বর্ণনার পরে সন্দেহের আর কোনো অবকাশই থাকে না)৷

তো, আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছুলাম যে, অ্যাড্‌সো যেসব ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন সেগুলোর প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর স্মৃতিকথাটি সঙ্গতিপূর্ণ (অসংখ্য, কুহেলিকাময় রহস্যে ঢাকা, শুরু হয়েছে লেখকের পরিচিতি দিয়ে, শেষ হয়েছে মঠের অবস্থান জানিয়ে, যেটার ব্যাপারে অ্যাড্‌সো একগুঁয়ের মতো দ্বিধাগ্রস্তভাবে নীরব৷ অনুমানের ওপর নির্ভর করলে পম্পোসা আর কংকেস-এর মধ্যবর্তী অনির্দিষ্ট একটা এলাকা চিহ্নিত করা যায়, এই যৌক্তিক সম্ভাবনা দেখিয়ে যে, সম্প্রদায়টি ছিল অ্যাপেনাইন্‌য্‌ (Apennines)-এর কেন্দ্রীয় শৈলশিলা বরাবর কোনো একটা এলাকায়, লিগিরিয়ার পীড্‌মন্ট আর ফ্রান্সের মধ্যেখানে৷ বর্ণিত ঘটনাবলীর সময়কাল সম্পর্কে বলতে হয়, আমরা রয়েছি ১৩২৭ খৃষ্টাব্দের নভেম্বরের শেষাশেষি; লেখাটির রচনাকাল অবশ্য অনিশ্চিত৷ ১৩২৭ খৃষ্টাব্দে যেহেতু তিনি শিক্ষানবীশ ছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন যখন তিনি লিখছেন তখন তিনি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে, সেক্ষেত্রে আমরা মোটামুটি একটা হিসেব ক’রে বলতে পারি যে পাণ্ডুলিপিটি রচিত হয়েছিল চতুর্দশ শতকের অন্তিম বা তার আগের দশকে৷

ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখলে, চতুর্দশ শতকের শেষ দিকে এক জার্মান সন্ন্যাসীর লাতিন ভাষায় রচিত একটি লেখার সপ্তদশ শতকের লাতিন সংস্করণের দুর্বোধ্য, নব্য-গথিক ফরাসী সংস্করণের মদীয় ইতালীয় সংস্করণটি ছাপানোর সেরকম কোনো কারণই খুঁজে পাই না আমি৷

প্রথম কথা, কোন রচনারীতি প্রয়োগ করা উচিত হবে আমার? নিতান্ত যৌক্তিক কারণেই সে-সময়কার ইতালীয় নমুনা অনুসরণ করার প্রলোভনটা ত্যাগ করতে হলো: অ্যাড্‌সো কেবল লাতিনেই লেখেননি, রচনার সমস্ত ক্রমপরিণতি থেকে এটা পরিষ্কার যে তাঁর সংস্কৃতি (বা মঠের-ই সংস্কৃতি, যা তাকে স্পষ্টতই প্রভাবিত করেছে) আরো সাবেক কালের; স্পষ্টত সেটা কয়েক শতাব্দীসঞ্চিত জ্ঞান ও কৌশলগত খামখেয়ালির একটা যোগফল যেটাকে সহজেই মধ্যযুগের শেষ পাদের লাতিন ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করা যায়৷ অ্যাড্‌সো এমন একজন সন্ন্যাসীর মতো চিন্তা করছেন এবং লিখছেন যাঁকে তাঁর মাতৃভাষায় ঘটে যাওয়া বিপ্লব ছুঁতে পারেনি, যিনি যে-পাঠাগারের কাহিনী তিনি বলেন সেটারই বই-পত্তরের পাতায় তখনো আবদ্ধ, এবং যিনি প্যাট্রিস্টিক-স্কলাস্টিক বই-পত্তর প’ড়ে মানুষ; আর তাঁর কাহিনী (প্রচণ্ড হতবুদ্ধিতা, আর সবসময়ই শোনা-কথা থেকে অ্যাড্‌সোর দেয়া চতুর্দশ শতকের নানান রেফারেন্স ও ঘটনাবলী বাদে) দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতকেও লেখা হয়ে থাকতে পারে; সেটার ভাষা আর পাণ্ডিত্যভরা উদ্ধৃতি থেকে সেরকমই অনুমান হয়৷

অন্যদিকে, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে, অ্যাড্‌সোর লাতিনকে নব্য-গথিক ফরাসীতে অনুবাদ করার সময় ভ্যালেট খানিকটা স্বাধীনতা নিয়েছিলেন, এবং তা কেবল শৈলীগত স্বাধীনতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না৷ উদাহরণস্বরূপ, চরিত্রগুলো মাঝে মধ্যে লতাপাতার বৈশিষ্ট্য নিয়ে কথা বলে, স্পষ্টতই অ্যালবার্টাস ম্যাগনাসের রচিত বলে কথিত বুক অভ সিক্রেট্‌স্‌-এর দোহাই দিয়ে, যে বইটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অগুনতিবার সংশোধিত হয়েছে৷ এটা নিশ্চিত যে, অ্যাড্‌সো এই রচনাটির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন৷ কিন্তু কথা হচ্ছে, এটা থেকে যে-সমস্ত অনুচ্ছেদের উদ্ধৃতি তিনি দিয়েছেন সেগুলোতে প্যারাসেল্‌সাসের উভয় ফর্মুলা আর নিশ্চিতভাবেই টিউডর যুগে প্রকাশিত অ্যালাবার্টাসের একটি সংস্করণ (Liber aggregationis seu liber secretorum Alberti Magni, Londinium, juxta pontem qui vulgariter dicitur Flete brigge, MCCCCLXXXV) থেকে নেয়া সুনিশ্চিত প্রক্ষিপ্ত অংশগুলোর অতি আক্ষরিক প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় ৷ পরে আমি আবিষ্কার করি যে, ভ্যালেট যখন অ্যাড্‌সোর পাণ্ডুলিপি নকল করছিলেন তখন প্যারিসে গ্র্যান্ড আর পেটিট অ্যালবার্ট-এর১০ একটি অষ্টাদশ শতকীয় সংস্করণ (Les Admirables Secrets d’Albert le Grand, A Lyon, Chez les Héritiers Beringos, Fratres, à l’Enseigne d’Agrippa, MDCCLXXV; Secrets merveilleux de la magie naturelle et cabalistique du Petit Albert, A Lyon, Chez les Héritiers Beringos, Fratres, à l’Enseigne d’Agrippa, MDCCXXIX)১১ লোকের হাতে হাতে ঘুরছিল, যেটা এখন সংশোধনাতীত ভাবে বিকৃত হয়ে গেছে৷ সেক্ষেত্রে আমি কীভাবে নিশ্চিত হতাম যে অ্যাড্‌সো বা সন্ন্যাসীরা যে টেক্সট-এর সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং যেসবের আলোচনা তিনি লিপিবদ্ধ করে গেছেন তাতে ব্যাখ্যা, ভাষ্য এবং নানান পরিশিষ্টের সঙ্গে টীকা-টিপ্পনীও ছিল না যা কিনা উত্তরকালীন বিদ্যাচর্চাকেও সমৃদ্ধ করে যাবে?

আর সবশেষে, অ্যাবে ভ্যালেট যেসব লাতিন অনুচ্ছেদ অনুবাদ করা উপযুক্ত বলে মনে করেননি আমি কি সেগুলো ওভাবেই রেখে দেবো, যাতে করে, সম্ভবত সেই সময়ের চরিত্র এবং আবহটুকু বজায় থাকে? সেটা করার এমন কোনো কারণ ছিল না, শুধু আমার উৎসের প্রতি অপাত্রে স্থাপিত বিশ্বস্তততার বোধ ছাড়া৷… অতিরিক্ত অনেক কিছু আমি বাদ দিয়েছি, তবে রেখে দিয়েছি খানিকটা৷ এবং আশংকা করছি আমি সেই সব মন্দ ঔপন্যাসিককে অনুকরণ করেছি যাঁরা কোনো ফরাসী চরিত্র উপস্থাপন করে তার মুখে ‘Parbleu! La femme, ah! la femme!’১২ এসব সংলাপ জুড়ে দেন।

মোদ্দা কথা, আমি সংশায়চ্ছন্ন৷ আমি আসলেই জানি না কেন আমি সাহস সঞ্চয় করে মেল্ক-এর অ্যাড্‌সোর পাণ্ডুলিপিটি এমনভাবে উপস্থাপন করছি যেন সেটা নির্ভরযোগ্য৷ বরং বলা যাক, এটা এমন একটা কাজ যা করা হয়েছে ভালোবাসার টানে৷ অথবা বলতে পারি, এটা হচ্ছে নিজেকে এন্তার নাছোড়বান্দা এক আবেশ থেকে মুক্ত করার একটা পন্থা৷

সময়োচিততার প্রতি কোনো পরোয়া না করে আমি আমার টেক্সটির প্রতিলিপি তৈরি করে রাখছি৷ যখন আমি অ্যাবে ভ্যালেটের রচনাটি আবিষ্কার করি তখন একটি ধারণা বহুল প্রচলিত ছিল যে, যদি কেউ কিছু লেখে তো তা কেবল বর্তমানের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণেই লেখা উচিত, যাতে করে জগতের পরিবর্তন সাধন করা যায়৷ তো, এখন দশ বছর বা তার চাইতে বেশি সময় পর, একজন লেখক (তার সর্বোচ্চ সম্মান ফিরে পেয়ে) মনের সুখে কেবল লেখার আনন্দেই লিখে যেতে পারেন৷ কাজেই স্রেফ বর্ণনার খুশিতেই মেল্ক-এর অ্যাড্‌সোর কাহিনীটি বয়ান করার ক্ষেত্রে এখন আর কোনো বাধাই নেই আমার, আর আমি স্বস্তি ও সান্ত্বনা লাভ করছি কাহিনীটিকে সময়ের দিক থেকে অপরিমেয়রকমের দূরবর্তী হিসেবে আবিষ্কার করে, আমাদের সময়ের সঙ্গে চমৎকারভাবে যার কোনো প্রাসঙ্গিক সম্পর্ক একেবারেই নেই, আমাদের আশা ও পরম নির্ভরতার সঙ্গে যা চিরকালীনভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ৷ কারণ, এটা হচ্ছে কিছু গ্রন্থের একটি কাহিনী, দৈনন্দিন দুঃশ্চিন্তার নয় এবং এটা পড়ে আমরা মহান অনুকরণকারী আ কেম্পিস-এর১৩ এর মতোই উচ্চারণ করতে পারি “In omnibus requiem quaesivi, et nusquam inveni nisi angulo cum libro.”১৪

জানুয়ারী ৫, ১৯৮০

নোটস:

অ্যাড্‌সোর পাণ্ডুলিপি সাত দিনে বিভক্ত, প্রতিটি দিন আবার এমন কিছু সময়ে বিভক্ত যা গীর্জার বিধিবদ্ধ উপাসনা সম্পৃক্ত প্রহরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ৷ তৃতীয় পুরুষে লেখা উপশিরোনামগুলোগুলো সম্ভবত ভ্যালেট যোগ করেছিলেন৷ কিন্তু সেগুলো যেহেতু পাঠককে দিকনির্দেশনা পেতে সাহায্য করে, আর যেহেতু এধরনের ব্যবহার সেসময়কার ভার্নাকুলার সাহিত্যের বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই অপরিচিত কিছু ছিল না, কাজেই আমি সেগুলোকে অপসারণ করার প্রয়োজন অনুভব করিনি৷

অ্যাড্‌সোর এই ক্যাননিকাল সময়ের উল্লেখ আমাকে খানিকটা হতভম্ভ করেছে, কারণ স্থান এবং ঋতুভেদে সেগুলোর অর্থের পরিবর্তন ঘটে; তাছাড়া, এটা খুবই সম্ভব যে চতুর্দশ শতাব্দীতে ‘নীতি’- েসন্ত বেনেডিক্ট-এর১৫ দেয়া নির্দেশাবলী অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হতো না৷

তা সত্ত্বেও, পাঠকের জন্যে একটি দিক নির্দেশনা হিসেবে নিম্নলিখিত শিডিউলটি, আমার ধারণা, বিশ্বাসযোগ্য৷ এর খানিকটা এই টেক্সট থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে, বাকিটা Les Heures bénédictines (প্যারিস, গ্রাসেত, ১৯২৫)-এ১৬ এডুয়ার্ড স্নেইডার-এর দেয়া সন্ন্যাস জীবনের বর্ণনার সঙ্গে মূল নীতির তুলনা করে রচিত।

ম্যাটিন্‌‌য্‌ (যেটাকে অ্যাড্‌সো কখনো কখনো প্রাচীন শব্দ ‘ভিজিলে’ বলে উল্লেখ করেছে) রাত ২:৩০ থেকে ৩ টার মধ্যবর্তী সময়৷

লঅড্‌স (অতি প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসারে যেটাকে মাতুতিনি বা ম্যাটিনয বলে উল্লেখ করা হতো) ভোর ৫ টা এবং ৬টার মধ্যবর্তী সময়৷

প্রাইম ৭টা ৩০ মিনিটের কাছাকাছি সময়, দিনের আলো ফোটার খানিকটা আগে৷

টার্স প্রায় ৯টা৷

সেক্সট দুপুর৷ (যে-মঠে সন্ন্যাসীরা মাঠে কাজ করত না, সেখানে শীতকালে শব্দটি দিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজন-ও বোঝান হতো৷

নোন্‌য বিকেল ২টা থেকে ৩ টার মধ্যবর্তী সময়৷

ভেসপার্স সূর্যাস্তের সময়, প্রায় ৪টা ৩০ মিনিট৷ (বিধি অনুযায়ী, অন্ধকার হয়ে আসার আগেই খাওয়ার বিধান ছিল৷)

কমপ্লিন প্রায় ৬টা (৭টার আগেই সন্ন্যাসীরা ঘুমোতে যায়৷)

এই হিসেবটি করা হয়েছে এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যে উত্তর ইতালিতে নভেম্বরের শেষে সূর্য ওঠে প্রায় সকাল সাড়ে সাতটার দিকে আর অস্ত যায় ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে৷

প্র স্তা ব না

বাক্যই ছিল আদিতে, আর বাক্য ছিল ঈশ্বরের সঙ্গে, আর বাক্যই ছিল ঈশ্বর৷ ঈশ্বরের সঙ্গেই সূত্রপাত ঘটছিল সেটার, আর বিশ্বস্ত প্রত্যেক সন্ন্যাসীরই কর্তব্য মন্ত্রোচ্চারিত বিনম্রতার সঙ্গে সেই এক চির অপরবির্তনীয় ঘটনার কথা বারে বারে বলা যেটার অখণ্ডনীয় সত্যতার কথা জোরের সঙ্গেই ব্যক্ত করা যায়৷ কিন্তু হাল জমানায় আমরা সব কিছুই দেখি একটা ঘষা কাচের ভেতর দিয়ে, আর সবার সমুখে একেবারে নগ্নভাবে প্রকাশিত হওয়ার আগে সত্যকে আমরা দেখতে পাই খণ্ড খণ্ডভাবে (হায়, কী দুষ্পাঠ্য) জগতের ভ্রমের মধ্যে, কাজেই সেটার প্রতিটি নির্ভরযোগ্য সংকেতকে আমাদের খোলাসা করে দিতে হবে এমনকী তখনো যখন সেটা আমাদের কাছে দুর্বোধ্য ঠেকবে আর যখন সেটাকে মনে হবে যেন মিশে আছে পুরোপুরি পাপাচারের জন্যে মুখিয়ে থাকা কোনো ইচ্ছের সঙ্গে৷

আমার নিঃসম্বল পাপী জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে – যখন আমার চুল পেকে গেছে – আমিও বুড়ো হচ্ছি জগতের মতো, অপেক্ষা করছি নীরব ও পরিত্যক্ত ঐশ্বরিকতার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার জন্যে, ভাগ করে নিচ্ছি দেবোদূতোপম বুদ্ধিমত্তার আলো; যৌবনে যে পরমাশ্চর্য ও ভয়ংকর ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করেছিলাম সে-সম্পর্কে আমার এই সাক্ষ্য আমি আমার ভারি, অসুস্থ শরীর নিয়ে মেল্ক-এর প্রিয় মঠের এই কুঠুরিতে অবরুদ্ধ অবস্থায়, এই পার্চমেন্টে রেখে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, যা যা দেখেছিলাম, শুনেছিলাম তার সবই হুবহু পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছি, সেসবের মধ্যে কোনো উদ্দেশ্য খোঁজার চেষ্টা না করে, যেন যারা পরে আসবে তাদের কাছে {যদি না খৃষ্টবৈরী (antichrist)আগেই এসে পড়ে} চিহ্নের চিহ্ন রেখে যাওয়া যায়, যাতে করে তাদের কাছে এর অর্থোদ্ধারের আবেদনটি রেখে যাওয়া সম্ভব হয়৷

পরম শক্তিমানের পরিকল্পনা অনুযায়ী এবং অ্যাপসল-এর পবিত্র নামে কলংলেপনকারী (বেদ্বীনরা যাকে শ্রদ্ধাভরে দ্বাদশ জন নামে ডাকে, ক্যাহর-এর সেই পাপাত্মা জ্যাকের কথা বলছি), সেই বদমায়েশ, ঘুষখোর আর বিধর্মীচূড়ামণিকে হতভম্ব করে দিয়ে ১৩২৭ খৃষ্টাব্দে যখন সম্রাট লুই পবিত্র রোমক সাম্রাজ্যের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে ইতালিতে এসেছিলেন, তখন সেই মঠটিতে – যেটার নামোল্লেখ এখন আর না করাটাই সঙ্গত এবং ধর্মনিষ্ঠ হবে – সেখানে যেসব ঘটনা ঘঠেছিল সেসবের অকপট সাক্ষী হওয়ার ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণা যেন ঈশ্বর আমাকে দান করেন৷

যেসব ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িয়ে পড়েছিলাম সেগুলো আরো বোধগম্য করার জন্যে সম্ভবত আমার উচিত সেই শতাব্দীর অন্তিম বছরগুলোয় যা ঘটেছিল তার স্মৃতিচারণ করা, সেসবের মধ্যে জীবনযাপন করে আমি যা বুঝেছিলাম আর তার যতটুকু আমার স্মরণে আছে, অন্যান্য যেসব কথা আমি পরে শুনেছিলাম সেগুলো আগেরটার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে সবটা বলা – অবশ্য এখনো যদি আমার স্মৃতির এতো অসংখ্য এবং বিশৃঙ্খল ঘটনার সূত্র জোড়া দেবার সামর্থ্য থেকে থাকে৷

সেই শতাব্দীর গোড়ার দিকে পোপ পঞ্চম ক্লেমেন্ট রোমকে স্থানীয় ভূস্বামীদের উচ্চাশার খোরাক হিসেবে ফেলে রেখে পোপের অধিষ্ঠানক্ষেত্র অ্যাভিনিয়ন-এ স্থানান্তরিত করেছিলেন: এবং খৃষ্টধর্মের পবিত্র নগরটি সেখানকার নেতাদের মধ্যেকার ঝগড়া-বিবাদে ছিন্নভিন্ন হয়ে ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল একটা সার্কাসে, একটা বেশ্যালয়ে; প্রজাতন্ত্র বলা হলেও আসলে কিন্তু নগরটি তা ছিল না, আর সেটা নানান সশস্ত্র দলের উত্পাতে সহিংসতা ও লুটতরাজের শিকার হয়ে পড়েছিল৷ যাজকেরা ধর্মনিরপেক্ষ বৈধ কর্তৃত্ব এড়িয়ে, বিচারের চৌহদ্দী বাঁচিয়ে দুষ্কৃতির দল পুষত আর তরবারি হাতে লুটতরাজ চালাত, আইনভঙ্গ করত এবং আয়োজন করত যতো অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের৷ কাপুট মান্ডিকে১৭ কী করে আবারো, এবং ন্যায্যত, সেই মানুষটির লক্ষ্যে পরিণত হওয়া থেকে বিরত রাখা সম্ভব হলো যিনি পবিত্র রোমক সাম্রাজ্যের মুকুট পরতে চেয়েছিলেন এবং সেই অস্থায়ী রাজত্বের সম্মান পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলেন যে-সম্মান একসময় সীজারদের ছিল?

এভাবেই ১৩২৪ খৃষ্টাব্দে ফ্র্যাংকফুর্টের জার্মান রাজপুত্ররা বাভারীয় লুইকে সাম্রাজ্যের প্রধান শাসক হিসেবে নির্বাচিত করেন৷ কিন্তু সেই একই দিনে মেইন-এর১৮ বিপরীত তীরে রাইনের কাউন্ট ফ্রালাটাইন আর কোলনের আর্চবিশপ অস্ট্রিয়ার ফ্রেডেরিককে একই উচ্চপদে নির্বাচিত করেন৷ এক সিংহাসনে দু’জন সম্রাট এবং দু’জরে জন্যে একজন পোপ: এমন এক পরিস্থিতে যা আসলেই ভয়ংকর বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করল৷

এর দুই বছর পর, অ্যাভিনিয়নের নতুন পোপ হিসেবে নির্বাচিত হলেন ক্যাহর-এর জ্যাক, বাহাত্তর বছরের এক বৃদ্ধ, যিনি – আগেই বলেছি – দ্বাদশ জন নাম ধারণ করেন, এবং ঈশ্বর করুন যেন কোনোদিন কোনো পোপ নীতিপরায়ণের কাছে ঘৃণ্য এরকম কোনো নাম আর গ্রহণ না করে৷ একজন ফরাসী, ফ্রান্সের রাজার প্রতি নিবেদিত (ঐ নীতিভ্রষ্ট দেশের মানুষ সব সময়ই তাদের নিজেদের দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে বড্ড উত্সাহী; সমস্ত জগত্টাকে নিজেদের আধ্যাত্মিক দেশ হিসেবে গণ্য করতে তারা অক্ষম), দ্বাদশ জন সুদর্শন ফিলিপকে সমর্থন যুগিয়েছিলেন নাইট টেম্পলারদের বিরুদ্ধে যাদেরকে রাজা (আমি মনে করি অন্যায়ভাবে) সবচেয়ে লজ্জাজনক অপরাধে অপরাধী বলে অভিযুক্ত করেছিলেন, যাতে করে তিনি সেই দলত্যাগী যাজকের যোগসাজশে তাদের সম্পত্তি হাত করতে পারেন৷

১৩২২ খৃষ্টাব্দে বাভারীয় লুইস তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রেডেরিককে পরাস্ত করেন৷ দু’জন সম্রাটকে যতটা না ভয় পেতেন তার চেয়ে একজনকে বেশি ভয় পেয়ে, জন বিজয়ীকে খৃষ্টসমাজ থেকে বহিষ্কার করলেন, ওদিকে তিনিও পোপকে ধিক্কার জানালেন হেরেটিক বা বিধর্মী বলে৷ আমাকে আরো স্মরণ করতে হচ্ছে কী করে ঠিক সেই একই বছরে সমস্ত ফান্সিসকান যাজক সম্প্রদায়কে পেরুজিয়ায় আহ্বান করা হয়েছিল এবং মিনিস্টার জেনারেল, সেস্‌নার মাইকেল স্পিরিচুয়ালদের অনুরোধ রক্ষা করে (তাঁদের সম্পর্কে পরে কথা বলার অবকাশ পাবো আমি) বিশ্বাস এবং নীতিগত দিক থেকে যীশু খৃষ্টের দারিদ্র্যের ঘোষণা দিলেন, বললেন যীশু যদি তাঁর বারো শিষ্যের সঙ্গে যুক্তভাবে কোনো কিছুর অধিকারী হয়ে থাকতেন তবে তা কেবল usus facti১৯ হিসেবেই৷ সম্প্রদায়ের নৈতিক উত্কর্ষ আর বিশুদ্ধতা সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে নেয়া এই যথোপযুক্ত সিদ্ধান্তটিতে নিদারুণ নাখোশ হলেন পোপ; তিনি এটার মধ্যে এমন একটি নীতি লক্ষ করলেন যা ঠিক সেই সব দাবিকে হুমকির সম্মুখিন করবে যেগুলো তিনি নিজে উত্থাপন করেছিলেন, সাম্রাজ্যর বিশপ নির্বাচিত করার অধিকার অস্বীকার ক’রেএবং উল্টো এই কথা জোরের সঙ্গে দাবি ক’রে যে, পোপের তক্তের অধিকার রয়েছে সম্রাট নিয়োগ করার৷ এইসব বা অন্য কিছু কারণে বিচলিত হয়ে জন ১৩২৩ খৃষ্টাব্দে ফ্রান্সিসকান প্রস্তাবনার অবসান ঘোষণা করলেন Cum inter nonnullos২০ ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে৷

আমার ধারণা, ঠিক এই সময়টাতেই পোপের বর্তমান শত্রু ফ্রান্সিসকানদেরকে লুইস তাঁর সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে দেখতে পেলেন৷ খৃষ্টের দারিদ্র্যের স্বীকৃতী দেয়ার মাধ্যমে তারা এক অর্থে রাজকীয় ধর্মতাত্ত্বিকদের – যেমন পাদুয়ার মার্সিলিয়াস আর জানদুন-এর জনের – ধারণাগুলোকেই শক্তিশালী করছিলেন৷ আর শেষ অব্দি, আমি যেসব ঘটনার কথা বলছি তার খুব একটা আগে নয় অবশ্যি, বিজিত ফ্রেডেরিকের সঙ্গে একটা চুক্তিতে উপনীত হলেন লুইস, ইতালি আক্রমণ করলেন, এবং মিলানের রাজপদে অভিষিক্ত হলেন৷

এই হলো পরিস্থিতি যখন আমি – মেল্ক-এর মঠের এক তরুণ বেনেডিক্টীয় শিক্ষানবিশ- আশ্রমজীবনের প্রশান্তি থেকে বিতাড়িত হলাম আমার বাবার কারণে, যখন তিনি লুইসের পিছু পিছু ব্যারনদের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলেছেন৷ তিনি ভেবেছিলেন তাঁর সঙ্গে আমাকে নেয়াটাই বিচক্ষণের কাজ হবে যাতে করে ইতালির বিস্ময়গুলোর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে আর সম্রাট যখন রোমে অভিষিক্ত হলেন তখন সেখানে উপস্থিত থাকতে পারি৷ কিন্তু পিসার অবরোধ তাঁকে সামরিক বিষয়ে ব্যতিব্যস্ত করে ফেলে৷ একা একাই তাস্কেনির নগরে নগরে ঘুরে বেড়ালাম আমি, খানিকটা আলস্যের কারণে, খানিকটা শিক্ষার আগ্রহে৷ কিন্তু আমার পিতামাতা ভাবলেন এই লাগামছাড়া স্বাধীনতা চিন্তাশীল জীবনের জন্যে নিবেদিত কিশোরের জন্যে উপযুক্ত নয়৷ মার্সিলিয়াস আমাকে খানিকটা পছন্দ করতেন, তাঁর উপদেশে তাঁরা আমাকে একজন পণ্ডিত ফ্রান্সিসকান বাস্কারভিলের উইলিয়ামের তত্ত্বাবধানে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন, যিনি কিছুদিনের মধ্যেই এমন এক মিশনে রওনা হবেন যা তাঁকে বিখ্যাত সব নগর আর প্রাচীন মঠে নিয়ে যাবে৷ এভাবেই আমি উইলিয়ামের লিপিকর এবং শিষ্য দুই-ই হলাম; তা নিয়ে কোনো খেদ রাখিনি আমি মনে, কারণ তাঁর সঙ্গে আমি এমন সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি যা পরবর্তী প্রজন্মকে জানিয়ে যাবার যোগ্য, ঠিক যা এখন আমি করছি৷

ব্রাদার উইলিয়াম কীসের সন্ধান করছিলেন আমি তখন জানতাম না, সত্যি বলতে কী, আজও জানি না, এবং অনুমান করি, তিনি নিজেও জানতেন না যে একটি নির্দিষ্ট সময়ে সত্য তাঁর কাছে যা বলে প্রতিভাত হতো সত্য আসলে তা নয় – যদিও কেবল সত্যলাভের আগ্রহ আর সন্দেহ দ্বারাই চালিত হয়েছেন তিনি, আর তিনি যে তা সর্বদা লালন করতেন তা তো আমি দেখতেই পেতাম৷ আর সম্ভবত সেই বছরগুলোতে তিনি ইহজাগতিক কর্তব্যপালন করতে গিয়ে তাঁর প্রিয় অধ্যয়ন থেকে বিচ্যুত হয়েছিলেন৷ উইলিয়ামের ওপর কোন দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল সেকথা আমাদের সফরের সময় আমি জানতে পারিনি, কিংবা বলা যায়, তিনি কখনো সেকথা বলেননি আমাকে৷ পথে আমরা যেসব মঠে যাত্রা বিরতি করেছিলাম সেসব জায়গায় মহান্তদের সঙ্গে তার যেসব কথা হয়েছে তার টুকরো-টাকরা শুনেই তার অ্যাসাইনমেন্ট সম্পর্কে যা কেবল খানিকটা ধারণা হয়েছে আমার, যার কথা এখনই বলতে যাচ্ছি আমি৷ আমাদের গন্তব্য ছিল উত্তরে, কিন্তু আমাদের সফর সরলরেখা ধরে চলেনি, পথে বেশ কিছু মঠে থেমেছিলাম আমরা৷ কাজেই ব্যাপারটা এমন ঘটল যে আমাদের শেষ লক্ষ্য যখন পুব দিকে, আমরা তখন রওনা হয়েছি পশ্চিম বরাবর, প্রায় সেই পর্বতরেখা ধরে যা পিসা থেকে সান্তিয়াগো অব্দি তীর্থযাত্রীদের পথের দিকে চলে গেছে, একটা জায়গায় বিরতি দিয়ে, যে-জায়গাটাকে আরো ভালোভাবে চিহ্নিত করতে আমাকে অনাগ্রহী করে তুলছে সেখানে ঘটা ভয়ংকর ঘটনাগুলো, তবে সেখানকার শাসকেরা সাম্রাজ্যের ভূস্বামী ছিলেন এবং সেখানে আমাদের সম্প্রদায়ের মহান্তরা একযোগে বিরোধিতা করেছিলেন বিধর্মী দুর্নীতিগ্রস্ত পোপের৷ নানান ঘটনা-দুর্ঘটনার সাক্ষী আমাদের সফরটা ছিল দু’হপ্তা স্থায়ী, আর সেই সময়টায় আমার সুােগ ঘটেছিল আমার নতুন প্রভুকে জানবার (যদিও যথেষ্টরকম নয়, আমি এখনো নিশ্চিত)৷

পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে আমি লোকজনের বর্ণনাতে মাতবো না, কেবল যখন মুখমণ্ডলের একটি অভিব্যক্তি বা কোনো অঙ্গভঙ্গি একটি নির্বাক কিন্তু প্রাঞ্জল ভাষার চিহ্ন হিসেবে প্রতিভাত হবে সেটুকু ছাড়া, কারণ, সেই যে বোয়েথিয়াস২১ বলেছিলেন, বাহ্যিক রূপ যা হেমন্তের আগমনের সাথে সাথে ফুলের মতোই শুকিয়ে যায়, বদলে যায়, তার চেয়ে ক্ষণস্থায়ী আর কিছুই নেই; তাছাড়া, আজ আর একথা বলে কী লাভ যে মোহন্ত অ্যাবোর নজরটা ছিল বড় কড়া আর গালদুটো পাণ্ডুর, যখন তিনি আর তার চারপাশের সবাই এখন ধুলো আর তাদের দেহগুলোতে ধুলোর নশ্বর ধূসরতা (কেবল তাদের আত্মাগুলো, ঈশ্বরের কৃপায়, এমন এক আলোয় জ্বলছে যা কখনো নির্বাপিত হবে না)? তবে অন্তত একবারের জন্যে হলেও উইলিয়ামের বর্ণনা দিতে চাই আমি, কারণ তাঁর অসাধারণ চেহারা আমার নজর কেড়েছিল এবং আর এটাই তরুণদের বৈশিষ্ট্য যে তারা বয়স্ক এবং অপেক্ষাকৃত জ্ঞানী কারো প্রতি শুধু তাঁর কথাবার্তা আর বুদ্ধির তীক্ষ্ণতার মোহেই আকৃষ্ট হয় না, তাঁর দেহের বাহ্যিক রূপের কারণেও হয় যা খুবই প্রিয় হয়ে ওঠে, ঠিক পিতার দেহের মতোই, যাঁর অঙ্গভঙ্গি আমরা পর্যবেক্ষণ করি, আর যার ভ্রূকুটি, যাঁর হাসি আমরা লক্ষ করি-শরীরী প্রণয়ের এই রূপটিকে (সম্ভবত একমাত্র যা প্রকৃতপক্ষেই খাঁটি) দূষিত করার মতো কোনো লালসার লেশমাত্র ছাড়াই৷

অতীতে মানুষ ছিল সুদর্শন আর মহত্ (বর্তমানে তারা শিশু ও বামুন), কিন্তু একটি বার্ধক্যগ্রস্ত জগতের বিপর্যয়ের ইঙ্গিতবহ অসংখ্য তথ্যের মধ্যে এটি নেহাতই একটিমাত্র৷ তরুণ প্রজন্ম এখন আর কোনো কিছু অধ্যয়নে ইচ্ছুক নয়, বিদ্যাচর্চা নিম্নগামী, গোটা জগত্টা হাঁটছে হেঁটমুণ্ডু উর্ব্ছপদ হয়ে, অন্ধজনে পথ দেখাচ্ছে তারই মতো অন্ধজনকে, ফলে অতল গহ্বরে হুড়মুড় করে পড়ে যাচ্ছে তারা, উড়তে শেখার আগেই নীড় ছাড়ছে পাখিরা, বীণা বাজাচ্ছে গাড়ল, নাচছে বৃষের দল৷ চিন্তাশীল জীবন আর পছন্দ নয় মেরির, কর্মময় জীবন আর ভালো লাগছে না মার্থার, লিয়া বন্ধ্যা, র্যা চেলের দৃষ্টিতে লালসা, ক্যাটো বেশ্যালয় গমন করছে, লুক্রেশিয়াস পরিণত হচ্ছে নারীতে৷ সবকিছুই চলছে ভুল পথে৷ ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, সেসময়ে আমি আমার প্রভুর কাছ থেকে জ্ঞানার্জনের ইচ্ছা সঠিক পথের একটা বোধ অর্জন করেছিলাম, যা, পথ যখন বন্ধুর তখনো থাকে মসৃণ৷

সবচেয়ে অমনোযোগী লোকেরও নজর কাড়ার মতো চেহারা ছিল তখন ব্রাদার উইলিয়ামের৷ মাথায় গড়পড়তা লোকের চেয়েও উঁচু, আর এতো রোগাপাতলা যে তাকে আরো লম্বা লাগত৷ চোখ দুটো তীক্ষ্ণ, মর্মভেদী; তার পাতলা আর খানিকটা পাখির ঠোঁটের মতো নাক তার চেহারায় অনুসন্ধানী এক মানুষের অভিব্যক্তি এনে দিয়েছিল, কেবল অলসতার কয়েকটি মুহূর্ত ছাড়া, সেসবের কথা পরে বলব আপনাদের৷ কিন্তু তাঁর চিবুকেও ছিল অনমনীয় ইচ্ছাশক্তির ছাপ, যদিও ঈষত্ হলদে ফুটকিতে ভরা লম্বা মুখটায় – হাইবার্নিয়া আর নর্দাম্ব্রিয়ার মাঝামাঝি এলাকায় জন্মগ্রহণকারী লোকজনের মধ্যে যেমনটা দেখেছি আমি – মাঝে মধ্যে দ্বিধা আর বিহ্বলতার ভাব ফুটে উঠতো৷ কিছুদিন পর আমি উপলব্ধি করলাম, যেটাকে আত্মবিশ্বাসের অভাব বলে মনে হতো সেটা ছিল আসলে কেবলই কৌতূহল, কিন্তু গোড়ার দিকে আমার প্রায় জানাই ছিল না এই গুণটির কথা, যেটাকে আমি বরং অর্থলোলুপ আত্মার একটি গভীর আসক্তি বলে ভাবতাম৷ আমি বরং বিশ্বাস করতাম বিবেচক আত্মার পক্ষে এ-ধরনের গভীর আসক্তিকে প্রশ্রয় দেয়া অনুচিত, বরং তা কেবল কেবল সত্য নিয়ে বাঁচবে, যা সম্পর্কে (আমি মনে করতাম) লোকে গোড়া থেকেই অবহিত৷

বালক হলেও প্রথমত আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল তার কান দুটো থেকে বেরিয়ে থাকা হলদেটে কয়েক গুচ্ছ চুল আর তাঁর পুরু, সোনালী দুই ভুরু৷ সম্ভবত পঞ্চাশ বছর বয়স তখন তার, কাজেই তখনই বেশ বৃদ্ধ ছিলেন তিনি, কিন্তু তাঁর ক্লান্তিহীন শরীর এমন এক দ্রুতছন্দে নড়াচড়া করত আমার মধ্যেও যার ঘাটতি পড়তো প্রায়ই৷ যখন কোনো প্রচেষ্টার প্রবল, আকস্মিক স্ফূরণ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলত তখন তার শক্তিকে মনে হতো যেন অনিঃশেষ৷ কিন্তু আবার মাঝে মাঝে, যেন তার প্রাণশক্তিকে কোনো গলদা চিংড়িতে পেয়ে বসেছে, গুটিয়ে যেতেন তিনি জড়তার মুহূর্তগুলোতে, দেখতাম আমার কুঠুরিতে খড়ের গদিতে শুয়ে আছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা মামুলি একটা হুঁ হ্যাঁ-ও না ক’রে, মুখের একটা পেশীতেও ভাঁজ না ফেলে৷ এসময় ফাঁকা, উদাসীন একটা অভিব্যক্তি ফুটে উঠত তাঁর চোখে, আর আমি হয়ত সন্দেহই করে বসতাম যে তিনি বিভ্রম সৃষ্টিকারী কোনো উদ্ভিজ্জ পদার্থের প্রভাবে আছেন কিনা যদি না তাঁর জীবনের সুষ্পষ্ট মিতাচার আমাকে চিন্তাটাকে বাতিল করে দিতে বাধ্য না করত৷ অবশ্য অস্বীকার করব না, আমাদের সফরের সময় মাঝেমধ্যে কোনো তৃণভূমির প্রান্তে এসে থেমে দাঁড়াতেন বনভূমি থেকে কিছু ভেষজ লতাপাতা জোগাড় করতে (আমার ধারণা, সবসময়ই একই লতাপাতাই সংগ্রহ করতেন তিনি); তারপর একটা আচ্ছন্ন দৃষ্টি নিয়ে চিবুতে থাকতেন সেগুলো৷ সেটার খানিকটা তিনি সঙ্গে রাখতেন এবং প্রচণ্ড চাপা উত্তেজনার মুহূর্তে তা সেবন করতেন (আর, মঠটাতে এ-ধরনের মুহূর্তের অভাব ঘটেনি)৷ একবার, জিনিসটা কী সেটা তাকে আমি জিগ্যেস করায় তিনি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন যে এমন সুশীল খৃষ্টানেরও কিছু কিছু শেখার আছে বিধর্মীদের কাছ থেকে, আর যখন আমাকে একটু চেখে দেখার সুযোগ দেবার কথা বললাম তাঁকে তিনি উত্তর দিলেন এক বুড়ো ফ্রান্সিসকানের জন্যে যেসব লতাপাতা হিতকর, সেগুলো একজন তরুণ বেনেডিক্টীয়র জন্যে কিন্তু তা নয়৷

একত্রে আমরা দু’জন কিন্তু খুব একটা স্বাভাবিক জীবন যাপন করার ফুরসত পাইনি: এমনকি মঠেও আমরা গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থেকেছি, আর ঘুমে ঢলে পড়েছি দিনের বেলা, প্রার্থনা অনুষ্ঠানগুলোতে অংশ নিতে পারিনি সবসময়৷ অবশ্য, আমাদের সফরের সময় কমপ্লিন-এর পর তিনি জেগে থাকতেন না বললেই চলে, আর ছিলেন খুবই মিতব্যয়ী স্বভাবের লোক৷ মাঝে মধ্যে, ওই মঠেই, সব্জিবাগানের ভেতরই হেঁটে কাটাতেন সারাদিন, এমনভাবে গাছগাছড়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন যেন ওগুলো ক্রিসোপ্রেস বা পান্নার মতো দামি পাথর বুঝি; কখনো দেখতাম, তিনি রত্নভাণ্ডারের চারপাশে ঘোরফেরা করছেন, পান্না আর ক্রিসোপ্রেস ভরা পেটিকাগুলোর দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছেন যেন ওগুলো ধুতরা ফল৷ আবার কখনো সারাটা দিন কাটিয়ে দিতেন তিনি পাঠাগারের বিশাল হলঘরটায়, এমনভাবে পাণ্ডুলিপিগুলোর পাতা উল্টে যেতেন যেন একান্তই ব্যক্তিগত আনন্দ লাভই তার মোক্ষ (ওদিকে, আমাদের চারপাশে তখন ভয়ংকরভাবে খুন হওয়া লাশের স্তূপ জমে উঠছে)৷ একদিন, ফুলের বাগানে আপাত উদ্দেশ্যহীনভাবে পায়চারী করতে দেখতে পেলাম আমি তাঁকে, যেন নিজের কৃতকর্মের জন্যে ঈশ্বরের কাছে জবাবদিহি করার বালাই নেই তাঁর৷ আমার সম্প্রদায়ে সময় ব্যয় করার একেবারেই ভিন্ন পদ্ধতি শেখানো হয়েছে আমাকে; আর, সেকথা তাঁকে বললামও আমি তখন৷ তখন তিনি জবাব দিলেন মহাজগতের সৌন্দর্য শুধু যে বৈচিত্রের মাঝে ঐক্যেই পাওয়া যায় তা নয়, বরং ঐক্যের মধ্যে বৈচিত্রেও পাওয়া যায়৷ উত্তরটাকে আমার নেহাতই অপরিণত কাণ্ডজ্ঞানপ্রসূত বলে মনে হল, কিন্তু পরে আমি জানতে পারি তাঁর দেশের লোকেরা এমনভাবে জিনিসের সংজ্ঞার্থ নির্ণয় করে যাতে মনে হয় যুক্তিবুদ্ধি বা প্রজ্ঞার (reason) ভূমিকা নগণ্যমাত্র৷

মঠে আমাদের অবস্থানকালীন অষ্টপ্রহরই তাঁর হাত দুটো আবৃত থাকত বই-পুস্তকের ধুলো, তখনো-কাঁচা অলংকরণের স্বর্ণরেণু বা সেভেরিনাসের হাসপাতালে তিনি যেসব হলদেটে পদার্র্থ নাড়াচাড়া করতেন সেগুলোতে৷ মনে হতো, নিজের হাতদুটো ছাড়া তিনি চিন্তা করতে পারেন না, যে গুণটা একজন মেকানিককেই মানায় ভাল: কিন্তু তারপরেও তাঁর হাত দুটো যখন সবচেয়ে ভঙ্গুর জিনিসটি স্পর্শ করত, যেমন সদ্য অলংকৃত হাতে-লেখা পুঁথি, বা কালজীর্ণ ও খামি না-বানানো রুটির মতো ভঙ্গুর পৃষ্ঠা, আমার কাছে মনে হতো, তিনি ছিলেন অসাধারণ সংবেদনশীল স্পর্শেন্দ্রিয়ের অধিকারী, ঠিক যেমনটি কাজে লাগাতেন তিনি তাঁর যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সময়৷ সত্যি বলতে কী, আমি বলব কী করে এই আশ্চর্য মানুষটি তাঁর থলের ভেতর এমনসব যন্ত্রপাতি বয়ে বেড়াতেন যা আমি তার আগে দেখিনি, আর ওগুলোকে তিনি বলতেন আজব যন্ত্রপাতি৷ তিনি বলতেন যন্ত্র হচ্ছে শিল্পেরই ফলস্বরূপ, আর শিল্প হল প্রকৃতির অনুকরণকারী এবং যন্ত্র প্রকৃতির রূপ বা আকারকে নয় বরং খোদ কাজটিকে ফুটিয়ে তোলে৷ এভাবে তিনি ঘড়ি, অ্যাস্ট্রোলেব এবং চুম্বকের রহস্য মেলে ধরতেন আমার কাছে৷ কিন্তু গোড়ার দিকে এসবকে ডাকিনী বিদ্যা বলে ভয় পেতাম আমি, এবং যে সমস্ত পরিষ্কার রাতগুলোতে তিনি (হাতে একটা অদ্ভুত ত্রিভুজ নিয়ে) দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করতেন আমি তখন ঘুমের ভান করে পড়ে থাকতাম৷ ইতালি বা আমার দেশে আমি যেসব ফ্রান্সিসকানদের চিনতাম তাঁরা সবাই ছিলেন সাধারণ মানুষ, বেশিরভাগই অশিক্ষিত, এবং তাঁর পাণ্ডিত্য দেখে আমি তাঁর কাছে বিস্ময় প্রকাশ করতাম৷ কিন্তু তিনি মৃদু হেসে আমাকে বলতেন তাঁর দেশের ফ্রান্সিসকানরা অন্য ধাতুতে গড়া৷ ‘রজার বেকন২২, যাঁকে আমি আমার গুরু বলে মানি, তিনি বলে গেছেন, ডিভাইন প্ল্যান বা স্বর্গীয় পরিকল্পনা একদিন যন্ত্রের বিজ্ঞানকে পরিবেষ্টন করবে, যা প্রাকৃতিক এবং সুস্থ জাদুবিদ্যা৷ এবং একদিন প্রকৃতির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নৌপরিচালনার যন্ত্রপাতি তৈরি করা সম্ভব হবে আর সেগুলোর সাহায্যে জাহাজ যাত্রা করবে unico homine regent২৩, এবং পাল বা দাঁড়-টানা জাহাজের চেয়ে ঢের বেশি দ্রুত বেগে; শুধু তাই নয়, স্বচালিত ওয়াগন আর ‘এমন ধরনের উড়ন্ত যন্ত্রও তৈরি হবে সেটার ভেতর বসে কেউ একটি কল ঘুরিয়ে কৃত্রিম ডানাও ঝাপটাতে পারবে, ad modum avis volantis২৪৷ তাছাড়া, ক্ষুদে ক্ষুদে যন্ত্র দিয়ে তোলা যাবে অতীব ভারি ভারি জিনিস, আর এমন সব যান তৈরি হবে যার সাহায্যে ভ্রমণ করা যাবে সাগর তলে৷’

যখন তাঁ েশুধোলাম সেসব যন্ত্রপাতি এখন কোথায় রয়েছে, তিনি বললেন প্রাচীনকালেই সেগুলো তৈরি হয়েছিল, এবং আমাদের কালেও তৈরি হয়েছে কিছু কিছু: “কেবল উড়ন্ত যন্ত্রটি ছাড়া, যেটা আমি দেখিনি কখনো বা কেউ দেখেছে বলেও জানি না, তবে একজন জ্ঞানী মানুষের কথা জানি যিনি ওটার কথা কল্পনা করেছেন৷ আবার, কোনো স্তম্ভ বা কলাম বা অন্য কোনো অবলম্বনহীন সাঁকোও নির্মাণ করা যাবে নদীর ওপর দিয়ে, আর তাছাড়া, এমন সব হাজার হাজার নানান যন্ত্রও বানানো সম্ভব হবে যেগুলোর কথা কেউ কেনো দিন শোনেনি৷ তবে এখনো যদি সেগুলো না থেকে থাকে তাতে তোমার ঘাবড়ানোর কিছু নেই, কারণ এর অর্থ এই নয় যে পরে সেগুলো আসবে না৷ আর আমি তোমাকে বলছি, ঈশ্বরই চান সেগুলো হোক, আর অবশ্যই সেগুলো তাঁর মনের মধ্যে বিরাজ করছে, যদিও আমার ওকাম-এর২৫ বন্ধু মনে করেন না যে আইডিয়া বা ভাব সেভাবে থাকতে পারে; আর আমি সেকথা বলি না যেজন্যে তা হলো আমরা স্বর্গীয় প্রকৃতি সঠিভাবে চিহ্নিত করতে পারি না কারণ আমরা সেটার কোনো সীমা নির্দেশ করতে অক্ষম৷” তার মুখ থেকে উচ্চারিত এটাই যে একমাত্র স্ববিরোধী কথা আমি শুনেছিলাম তা কিন্তু নয়, কিন্তু এখনো যখন আমি বৃদ্ধ এবং পূর্বের তুলনায় অপেক্ষাকৃত জ্ঞানী, আমি পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি কী করে তিনি তাঁর বন্ধু ওকাম-এর ওপর এমন আস্থা রাখতে পারেন এবং একই সঙ্গে বেকনের দিব্যি দিয়ে কথা বলতে পারেন, যা তিনি প্রায়ই করতেন৷ আর এটাও সত্যি যে তখনকার সেই অন্ধাকারাচ্ছন্ন সময়ে একজন জ্ঞানী মানুষকে পরস্পরবিরোধী সব কথাবার্তা বিশ্বাস করতে হতো৷

তো, ব্রাদার উইলিয়াম সম্পর্কে সম্ভবত আমি অর্থহীন কথা বলে ফেলেছি, যেন তখন তাঁর সম্পর্কে আমার যে বিক্ষিপ্ত ধারণা হয়েছিল তার একেবারে গোড়া থেকে সব কিছু শুরু করতে৷ তিনি কে ছিলেন এবং তিনি কী করছিলেন, সুশীল পাঠক আমার, তা হয়ত আপনারা আরো ভালো করে বের করতে পারবেন তাঁর তখনকার কাজকর্ম থেকে যখন এক সঙ্গে মঠে ছিলাম আমরা৷ কোনো সুচারু পরিকল্পনা যে ছিল সেকথা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না, আশ্চর্য এবং ভয়ংকর কিছু ঘটনার একটি কাহিনী (হ্যাঁ, তা বটে) ছাড়া৷

আর তাই, দিনের পর দিন আমার প্রভুকে জানবার পর, দীর্ঘ কথোপকথনে অতিবাহিত আমাদের সফরের সময়টুকুর পর, যার কথা আমরা একটু একটু করে বলব আপনাদের, আমরা সেই পর্বতের পাদদেশে পৌঁছুলাম যে পর্বতের ওপর মঠটি অবস্থিত ছিল৷ এবং আমার কাহিনীর সময় হয়েছে সেই মঠের দিকে অগ্রসর হওয়ার, যেমনটি আমরা হয়েছিলাম তখন, আর তখন যা ঘটেছিল সে কাহিনী বয়ান করার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছি যখন তখন আমার হাত রয়েছে সুস্থির৷

(কিস্তি ২)

(মূল ইতালীয় উপন্যাসের উইলিয়াম উইভারকৃত ইংরেজী অনুবাদ থেকে বাংলায় ভাষান্তরিত)

মধ্যযুগের একটি সংক্ষিপ্ত কালপঞ্জি

এই সংক্ষিপ্ত কালপঞ্জিতে সেসব ঘটনার তারিখ উল্লিখিত হয়েছে যেসব ঘটনার গুরুত্ব গোলাপের নাম উপন্যাসটি বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
আনুমানিক ৪৮০-৫৪৭ খৃষ্টাব্দ > নার্সিয়ার সন্ত বেনেডিক্ট
৫২০ > বেনেডিক্টীয় সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা
আনু. ৬১২ > বব্বিও-র মঠের প্রতিষ্ঠা
৮৭২-৮৮২ > পোপ অষ্টম জন-এর কার্যকাল
৯০৯ > ক্লুনি-র মঠের প্রতিষ্ঠা
৯৯৯-১০০৩ > পোপ ২য় সিলভেস্টারের কার্যকাল
১০৭৯-১১৪২ > পিটার অ্যাবেলার্ড
আনু. ১১৭১-১২২১ > সন্ত ডমিনিক
১১৭৯ > ১১৭৯ খৃষ্টাব্দের ল্যাটেরান কাউন্সিল
আনু. ১১৮১ > আসিসি-র সন্ত ফ্রান্সিস
১২০৯ > ফ্রান্সিসকান সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা
আনু. ১২১৪-আনু. ১২৯২ > রজার বেকন
১২১৫ > ডনিকান সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা
১২২৪/২৫-১২৭৪ > সন্ত টমাস অ্যাকুইনাস (ও. পি. অর্ডার অভ দ্য প্রীচার্স)
১২৬৫ > ফ্লোরেন্সের দান্তে আলিগিরি-র জন্ম
১২৭১-১২৭৬ > পোপ দশম ব্লেসিড গ্রেগরির কার্যকাল
১২৭৪ > লিয়ন্স-এর দ্বিতীয় কাউন্সিল
১২৭৯ > পোপীয় হুকুমনামা বা পেপাল বুল এক্সিত কুই সেমিনাত Exiit qui seminat —ফ্রান্সিসকান নীতির সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা
আনু. ১২৯৫-আনু. ১৩৪৯ > উইলিয়াম অভ্ ওকাম (অকহ্যাম)
১২৯৪ > (মর্রোনে-র পিটার) পোপ সন্ত ৫ম সেলেস্তিন-এর কার্যকাল
১২৯৪-১৩০৩ > পোপ অষ্টম বনিফেস-এর কার্যকাল (বেনেডিক্ট গেতানি)
১৩০১ > বাভারিয়ার কিশোর চতুর্থ লুই-এর রাজত্ব শুরু
১৩০৩-১৩০৪ > পোপ একাদশ ব্লেসিড বেনেডিক্ট-এর কার্যকাল (নিকোলো বোক্কাসিনি)
১৩০৫-১৩১৪ > পোপ পঞ্চম ক্লেমেন্ট-এর কার্যকাল
১৩০৫-১৩১৫ > ফ্রা ডলচিনো-র মৃত্যু
১৩০৯ > পোপের কর্মস্থল রোম থেকে অ্যাভিননে স্থানান্তরিত, যা পশ্চিমা খৃষ্টীয় বিশ্বের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাবিলনীয় বন্দিত্ব নামে পরিচিত কালপর্বের এটাই সূচনা বর্ষ।

১৩১১-১৩১২ > ভিয়েন-এর কাউন্সিল।
১৩১২ > পোপীয় হুকুমনামা এক্সিভি ডি পারাদিসো Exivi di Paradiso
১৩১৬-১৩৩৪ > পোপ দ্বাবিংশ জন-এর কার্যকাল (Jacques d’Euse of Cahors)
১৩১৭ (১৩ই এপ্রিল) > পোপীয় হুকুমনামা কোরান্ডাম এক্সিগিট –Quarundam Exigit
১৩১৭ (৩০ শে ডিসেম্বর) > পোপীয় হুকুমনামা স্যাংকটা রোমানা –Sancta Romana
১৩২১ > ফ্লোরেন্সের দান্তে আলিগিরি-র মৃত্যু
১৩২২ (মে) > পেরুজিয়ায় ফ্রান্সিকানদের জেনারেল চ্যাপ্টার
১৩২২ (ডিসেম্বর)> পোপীয় হুকুমনামা এড কন্ডিটোরেম ক্যানোনাম – Ad conditorem canonum
১৩২৩ > সন্ত অ্যাকুইনাসের ক্যানোনাইজেশন বা গির্জা থেকে তাঁকে সন্ত বলে ঘোষণা
১৩২৩ > পোপীয় হুকুমনামা কাম ইন্টার নোন্নাল্লস – Cum inter nonnullos
১৩২৩ > দ্বাবিংশ জন চতুর্থ লুইকে সিংহাসন ছেড়ে দিতে বললেন।
১৩২৩ (২২ শে মে) > Sachsenhausen Appellation
১৩২৪ (১০ই নভেম্বর) > পোপীয় হুকুমনামা কিয়া কোরান্ডাম – Quia quorundam
১৩২৬ > পোপীয় হুকুমনামা সুপার ইলিয়াস স্পেকুলা – Super illius specula ১৩২৭ (নভেম্বরের শেষাশেষি) > গোলাপের নাম-এর ঘটনাকাল
১৩২৮-১৩৩০ > পবিত্র রোমক সম্রাট হিসেবে চতুর্থ লুই-এর অভিষেক। পঞ্চম নিকোলাসের অ্যান্টি প্যাপাসি (পিয়েত্রো রাইনালদুচ্চি)
১৩৩৪ (৪ঠা ডিসেম্বর) > দ্বাবিংশ জন-এর মৃত্যু
১৩৪৭ (১১ই অক্টোবর) > বাভারিয়া-র চতুর্থ লুই-এর মৃত্যু
১৩৬২-১৩৭০ > পোপ ব্লেসিড পঞ্চম আরবানের কার্যকাল।
১৩৬৭ > পোপের অধিষ্ঠান অ্যাভিনন থেকে রোমে প্রত্যাবর্তন। তথাকথিত ব্যাবিলনীয় বন্দিত্বের অবসান।

টীকা:
১. Le Manuscrit de Dom Adson de Melk, traduit en français d’après l’édition de Dom J. Mabillon (Aux Presses de l’Abbaye de la Source, Paris 1842)
অনুবাদ: Abbé,* Vallet মেল্ক-এর ডম** অ্যাড্সো-র পাণ্ডুলিপি, ফরাসী ভাষায় অনূদিত এবং জে ম্যাবিলন-এর সংস্করণের ওপর ভিত্তি করে রচিত (সোর্স-এর মঠের মুদ্রণালয়, প্যারিস, ১৮৪২)
Abbé* (যাজক বা মঠাধ্যক্ষ) ঠধষষবঃ
Dom** (বেনেডিক্টীয় উপাধি, Dominus বা প্রভুর সংক্ষিপ্ত রূপ)

২. মেল্ক: অস্ট্রিয়ায় অবস্থিত।

৩. Vetera analecta, sive collectio veterum aliquot opera & opus culorum omnis generis, carminum, epistolarum, diplomaton, epitaphiorum, &, cum itinere germanico, adaptationibus & aliquot disquisitionibus R.P.D. Joannis Mabillon, Presbiteri ac Monachi Ord. Sancti Benedicti e Congregatione S. Mauri — Nova Editio cui accessere Mabilonii vita & aliquot opuscula, scilicet Dissertatio de Pane Eucharistico, Azymo et Fermentatio ad Eminentiss. Cardinalem Bona. Subiungitur opusculum EldefonsiHispaniensis Episcopi de eodem argumentum Et Eusebii Romani ad Theophilum Gallum epistola, De cultu sanctorum ignotorum, Parisiis, apud Levesque, ad Pontem S. Michaelis, MDCCXXI, cum privilegio Regis.
অনুবাদ: একটি প্রাচীন সংকলন বা অনেক প্রাচীন রচনার একটি সংগ্রহ, সঙ্গে কবিতা, চিঠি, নথিপত্র, এপিটাফ ইত্যাদি সব ধরনের ছোট রচনার সংকলন; আরো রয়েছে জার্মান ভ্রমণ বৃত্তান্ত, সঙ্গে রেভারেন্ড ফাদার ডম জাঁ ম্যাবিলন, সন্ত বেনেডিক্ট-এর সম্প্রদায়ের যাজক ও সন্ন্যাসী, ও সন্ত মাউর-এর ধর্মসভার ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ (নতুন সংস্করণ); যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ম্যাবিলনের জীবনী ও আরো কিছু অপেক্ষাকৃত ছোট রচনা যেমন তাঁর মোস্ট এমিনেন্ট কার্ডিনাল বোনা-র জন্যে রচিত Discussion on the Eucharist Bread, Unleavened and Leavened, টহষবধাবহবফ ধহফ খবধাবহবফ। এর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে একই বিষয়ের ওপর হিস্পানী বিশপ এল্ডেফনসাসের লেখা একটি, এবং গলের থিওফিলাস-এর কাছে লেখা রোমক ইয়ুসিবিয়াস-এর পত্র, অজ্ঞাতপরিচয় সন্তদের কাল্ট প্রসঙ্গে। প্যারিস, লেভেস্ক, সন্ত মাইকেল-এর সেতুর কাছে, ১৭২১ (রাজার অনুমতি সাপেক্ষ)।

টীকা: প্রকৃতপক্ষে এটি জাঁ ম্যাবিলনের { Jean Mabillon (১৬৩২-১৭০৭ খৃ.): বেনেডিক্টীয় পণ্ডিত এবং হ্যাগিওগ্রাফার (hagiographer) বা সন্তদের জীবনীকার} প্রধান রচনাগুলোর একটি সঠিক তালিকা।

৪. “Montalant, ad Ripam P.P. Augustinianorum (prope Pontem S. Michaelis)’’

অনুবাদ: “Montalant, অগাস্টিনীয় ফাদারদের ব্যাংকের কাছে, সন্ত মাইকেল-এর সেতুর পাশে)”

৫. “en me retraçant ces détails, j’en suis à me demander s’ils sont réels, ou bien si je les ai rêvés”
অনুবাদ: এসব খুঁটিনাটির ওপর নজর বুলিয়ে আমি ভাবছি সেগুলো কি সত্যি নাকি আমি সেসব স্বপ্ন দেখেছিলাম।

৬. Athanasius Kircher (১৬০১-১৬৮০): জেসুইট বিজ্ঞানী, প্রতœতত্ত্ববিদ্ এবং ভাষাবিদ্। মহাপ্রতিভাধর এই বিজ্ঞানী আধুনিক ফিল্ম প্রোজেক্টরের একটি আদিম সংস্করণ ও বিশ্বের প্রথম ক্যালকুলেটরের আবিষ্কারক; নির্মাণ করেছিলেন একটি শক্তিশালী মেগাফোন; এবং তিনিই সর্বপ্রথম পারদের প্রসারণকে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা পরিবর্তন মাপার জন্যে ব্যবহার করেন। তাঁর প্রধান দুটো রচনা তাঁর নানাবিধ কৌতূহলের উজ্জ্বল প্রমাণ: Ars magna lucis et umbrae (আলো ও ছায়ার মহান শিল্প, ১৬৪৫) এবং Lingua aegyptica restitute (পুনরুদ্ধার-করা মিশরীয় ভাষা) – চিত্রলিপি-র অর্থোদ্ধারের প্রসঙ্গে রচিত একটি প্রবন্ধ।

৭. Saint Albertus Magnus (১২০৬-১২৮০): ডমিনিকান শিক্ষক ও বিজ্ঞানী আলবার্টাস ম্যাগনাস বা মহৎ আলবার্ট শিক্ষালাভ করেন ইতালির পাদুয়ায়, এবং শিক্ষকতা করেন প্যারিসে, যেখানে অবিসংবাদিতভাবে তাঁর সবচাইতে মেধাবী ছাত্র ছিলেন টমাস অ্যাকুইনাস। আলবার্টাস বিশ্বাস করতেনপ্রতিটি মানুষের একটি সক্রিয় এবং আরেকটি নিষ্ক্রিয় বুদ্ধিমত্তা রয়েছে, যা কিনা আবু রুশদপন্থীদের বিরুদ্ধমত। দান্তে আলবার্টাসকে স্বর্গে টমাস অ্যাকুইনাসের পাশে ঠাঁই দিয়েছেন (প্যারাদিসো ১০)।

৮. Paracelsus (১৪৯৩-১৫৪১): সুইস পদার্থবিদ্ এবং আলিকিমিয়াবিদ্। তাঁর আসল নাম Theophrastus Philippus Aureolus Bombastus von Hohenheim । তিনি প্রচলিত মধ্যযুগীয় এই মত খারিজ করে দেন যে রোগ-বালাইয়ের কারণ হচ্ছে শরীরের কিছু হিউমর বা রসের ভারসাম্যহীনতা; বরং তিনি মনে করতেন অসুখ হচ্ছে পৃথক সত্তা যা বাইরের কোনো শক্তি বা পদার্থের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে।

৯. Liber aggregationis seu liber secretorum Alberti Magni, Londinium, juxta pontem qui vulgariter dicitur Flete brigge, MCCCCLXXXV
অনুবাদ : পুঞ্জীভূত চিন্তারাজির গ্রন্থ বা মহান আলবার্টের রহস্যের গ্রন্থ, লন্ডন (ফ্লিট ব্রিজ নামে সুপরিচিত সেতুর পাশে), ১৪৮৫

১০. the Grand and the Petit Albert

অনুবাদ: বড় আর ছোট অ্যালবার্ট

১১. Les Admirables Secrets d’Albert le Grand, A Lyon, Chez les Héritiers Beringos, Fratres, à l’Enseigne d’Agrippa, MDCCLXXV; Secrets merveilleux de la magie naturelle et cabalistique du Petit Albert, A Lyon, Chez les Héritiers Beringos, Fratres, à l’Enseigne d’Agrippa, MDCCXXIX

অনুবাদ: মহান অ্যালবার্টের চমৎকার রহস্যাবলী, লিয়ন্স ( বেরিঙ্গো পরিবারের উত্তরাধীকারীদের, ভ্রাতাদের বাড়ি, এগ্রিপ্পা চিহ্নের কাছে ), ১৭৭৫; ছোট অ্যালবার্টের প্রাকৃতিক ও ক্যাবলিস্টিক জাদুর অসাধারণ রহস্যাবলী, লিয়ন্স (বেরিঙ্গো পরিবারের উত্তরাধীকারীদের, ভ্রাতাদের বাড়ি, এগ্রিপ্পা চিহ্নের কাছে), ১৭২৯।

১২. “Parbleu!Ó and ÒLa femme, ah! la femme!”
অনুবাদ: “ওহ্ ঈশ্বর, হ্যাঁ!” এবং “মেয়েটি, আহা! মেয়েটি!”

১৩. Thomas à Kempis (১৩৮০?-১৪৭১): জার্মান পাদ্রী এবং ভক্তিমূলক সাহিত্যের রচয়িতা। সম্ভবত তিনি বিখ্যাত দি ইমিটেশন অভ্ ক্রাইস্ট (১৪২৬)-এরও লেখক।

১৪. “In omnibus requiem quaesivi, et nusquam inveni nisi angulo cum libro.”

অনুবাদ: “সব জায়গায় প্রশান্তি খুঁজেছি আমি, কিন্তু একটি বইসহ এক কোণায় ছাড়া কোথাও তা পাইনি।”

টীকা: In omnibus requiem quaesivi কথাগুলো পাওয়া যাবে – Ecclesiasticus 24:7-এ (Ecclesiasticus হচ্ছে বাইবেলের ওল্ড টেস্টমেন্ট-এর আদি হিব্রু রচনায় অনুপস্থিত কিন্তু গ্রীক ও লাতিন বাইবেলে উপস্থিত অংশগুলো, যা Apocrypha বা বাইবেলের অপ্রামাণিক রচনাবলী নামে পরিচিত, তার একটি। রোমান ক্যাথলিক বা অর্থডক্স ক্যাননে এই অপ্রামাণিক অংশ গ্রহণযোগ্য হলেও, প্রটেস্টান্টদের কাছে তা গ্রহণীয় নয়। অনুবাদক)। কেবল টমাস আ কেম্পিস-ই নন, মেইস্টার একহার্ট নামে পরিচিত জার্মান ডমিনিকান ঈশ্বরতত্ত্ববিদ্ এবং মরমী দার্শনিক জোহান্নেস একহার্ট (১২৬০-১৩২৮)-ও প্রায়ই কথাটির উদ্ধৃতি দিতেন। টমাস আ কেম্পিস-এর যে এই কথাটি প্রিয় ছিল তার নিদর্শন মিলবে সমসাময়িককালে আঁকা তাঁর একটি প্রতিকৃতিতে, যেখানে বৃদ্ধ কেম্পিসকে তাঁর পড়ার ঘরে দেখা যাচ্ছে, উল্লিখিত কথাগুলো লেখা পৃষ্ঠা খোলা একটি বইয়ের পাশে। চিত্রটির ১৪৭১ খৃষ্টাব্দে আঁকা একটি নকল এখনো পাওয়া যায়।

১৫. পশ্চিমা সন্ন্যাসীদের কুলপতি, জন্ম আম্ব্রিয়ার সার্সিয়া-তে, ৪৮০ খৃষ্টাব্দে, মৃত্যু ৫৪৭ খৃষ্টাব্দে, মন্টি কাসিনোতে। পশ্চিমা দুনিয়াতে তাঁর মঠসংক্রান্ত রীতিনীতি এবং যেসব সন্ন্যাসী সেসব পালন করতেন তাঁরা এতো প্রভাবশালী হওয়া সত্ত্বেও বেনেডিকেক্টর জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। ৫৩০ খৃষ্টাব্দে প্রথম খৃষ্টীয় সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা বেনেডিক্টের নীতিতে তিনটি প্রতিজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত ছিল: দারিদ্র্য, কৌমার্য ও বাধ্যতা। স্থায়ীভাবে মঠকেই আবাসস্থল হিসেবে গণ্য করা এই নীতির একটি আবশ্যকীয় শর্ত। অনুবাদক

১৬. Les Heures bénédictines

অনুবাদ: বেনেডিক্টীয় সময়সূচী

১৭. Caput Mundi

অনুবাদ: পৃথিবীর রাজধানী (আক্ষরিক অর্থে, “মাথা”)

টীকা: ”Caput Mundi” কথাটা একাদশ এবং দ্বাদশ শতকের অসংখ্য কবিতাতেই পাওয়া যাবে, বিশেষ ক’রে, Carmina Burana-য় এবং কেম্ব্রিজ সংগীতে। Carmina Burana 19:4 Caput Mundi বা পৃথিবীর রাজধানী হিসেবে রোমের একটি ব্যাঙ্গাত্মক বর্ণনা এবং সেখানে দুটো শব্দ নিয়েই খেলা করা হয়েছে, যা শব্দবন্ধটির জনপ্রিয়তারই সাক্ষ্যবাহী।

১৮. Main: মধ্য পশ্চিম জার্মানির ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী, ফ্র্যাঙ্কফুর্টের ভেতর দিয়ে বহমান, মাইনতস-এ গিয়ে যুক্ত হয়েছে রাইন নদীর সঙ্গে। অনুবাদক

১৯. Usus facti

অনুবাদ: তাঁর ব্যবহারের জন্যে (আক্ষরিক অর্থে, প্রকৃত ব্যবহার)

টীকা: পোপ তৃতীয় নিকোলাস তাঁর ১২৭৯ খৃষ্টাব্দের Exiit qui seminat হুকুমনামা বা পেপাল বুল-এ usus facti বা বাস্তবিক প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবহার এবং usus iuris বা ব্যবহারের বা ভোগদখল করার অধিকারের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। ফ্রান্সিসকান দারিদ্র্য প্রশ্নের এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ; গোলাপের নাম উপন্যাসের মাঝামাঝি একো বিষয়টির ওপর আরো আলোকপাত করেছেন।

২০. Cum inter nonnullos

অনুবাদ: যেহেতু অসংখ্য (বিদ্বান মানুষের) মধ্যে

টীকা: পোপীয় হুকুমনামা বা পেপাল বুল-এর শিরোনাম হিসেবে সাধারণত স্রেফ সেটার টেক্সট-এর প্রথম দু’ তিনটে শব্দ ব্যবহার করা হয়। এই হুকুমনামাটির শুরু এভাবে: “Cum inter nonnullos scolasticos viros…” (যেহেতু অসংখ্য বিদ্বান মানুষের মধ্যে…)। হুকুমনামাটির প্রধান বক্তব্য এই যে যারা যীশুর দারিদ্র্যের কথা সমর্থন করে, (বিশেষ করে, পেরুজীয়া সম্মেলনের ফ্রান্সিসকানগণ) তারা হেরেটিক বা ধর্মদ্বেষী বা বিধর্মী। গোলাপের নাম উপন্যাসের মাঝামাঝি একো বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন।

২১. বোয়েথিয়াস: (৪৮০-৫২৪ খৃ.): রোমান দার্শনিক এবং খৃষ্টান ধর্মতাত্ত্বিক। বোয়েথিয়াসই সম্ভবত শেষ গুরুত্বপূর্ণ রোমান লেখক যিনি গ্রীক ভাষা জানতেন। অস্ট্রগথ সম্রাট থিওডোরিক-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা এবং গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার কারণে অপবিত্রকরণের অভিযোগে অভিযুক্ত বোয়েথিয়াসকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় এবং প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে কারাগারে বসেই বোয়েথিয়াস রচনা করেন তাঁর সবচেয়ে মৌলিক গ্রন্থ—দর্শনের সান্ত্বনা —পাঁচ খণ্ডের একটি রূপক যেখানে দর্শন এক সুন্দরী রমণীর বেশে তাঁর কাছে আসে তাঁকে সান্ত্বনাদানের জন্যে এবং তাঁকে বলে যে, নিজের প্রকৃতি এবং নিয়তি বোঝার ব্যাপারে অক্ষমতার কারণেই মানুষ প্রধানত অসুখী হয়। বোয়েথিয়াস নিজে অ্যারিস্টটলের রচনা অনুবাদ করেছিলেন, সেই সঙ্গে ট্রিনিটি বিষয়ে প্রবন্ধ লেখেন এবং যুক্তিবিদ্যা, পাটীগণিত ও সঙ্গীত বিষয়ে ম্যানুয়াল রচনা করেন।

২২. রজার বেকন (আনুমানিক ১২১৪-আ. ১২৯২ খৃ.): ফ্রান্সিসকান পণ্ডিত ও বিজ্ঞানী। জন্ম ইংল্যান্ডে। পড়াশোনা অক্সফোর্ড বিশ্বদ্যিালয়ে। প্যারিসে অ্যারিস্টটলীয় এবং ছদ্ম-অ্যারিস্টটলীয় রচনার ওপর বক্তৃতাদানের সময় তিনি মারিকোর্টের পিয়ের-এর সাক্ষাৎলাভ করেন, চুম্বক এবং অ্যাস্ট্রোলেব বিষয়ে আর গুরুত্বপূর্ণ কিছু লেখা রয়েছে, সেই সঙ্গে তিনি পরিচিত হন ছদ্ম-অ্যারিস্টটলীয় Secretum Secretorum (রহস্যের রহস্য)-র সঙ্গে। সম্ভবত এই দুটো ঘটনাই বেকনকে পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান এবং ভাষার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলে। ১২৫৭ খৃষ্টাব্দে বেকন ফ্রান্সিকানদের দলে যোগ দিলেও গোড়া থেকেই তাদের সঙ্গে খুব একটা সখ্য তাঁর ছিল না।
বেকন তিনটি বিজ্ঞান বিশ্বকোষ রচনা করেন বেকন: Opus maius, Opus minus, Opus tertium বা, যথাক্রমে, বৃহত্তর রচনা ক্ষুদ্রতর তৃতীয় রচনা। বেকনের সেরা কাজগুলোর বেশিরভাগই আলোকবিজ্ঞান সম্পর্কিত। ক্রমেই তিনি আরো বেশি গাণিতিক ডেমন্সট্রেশান এবং পরীক্ষামূলক সুলুক-সন্ধান নির্ভর হয়ে ওঠেন। জাদুকর হিসেবে তিনি খ্যাতিলাভ করেন মূলত তাঁর মৃত্যুর পর।

২৩. unico homine regente

অনুবাদ: মাত্র একজন মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীনে

২৪. ad modum avis volantis

অনুবাদ: উড়ন্ত পাখির মতো করে

২৫. William of Occam (আ. ১২৮৫-১৩৪৯ খৃ.): ফ্রান্সিসকান দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক। তিনিও অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করেন এবং ১৩১৫ থেকে ১৩১৯ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত বাইবেল ও পিটার লম্বার্ড রচিত বাক্যাবলী-র ওপর বক্তৃতাদান করেন। তিনিও খৃষ্টধর্মীয় দারিদ্র সংক্রান্ত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৩২৮ খৃষ্টাব্দের মে মাসে ফ্রান্সিকান জেনারেল সেসনার মাইকেল-এর সঙ্গে অ্যাভিনিয়ন থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পিসা-য় বাভারিয়ার রাজা চতুর্থ লুই-এর সঙ্গে যোগ দেন, এবং তাঁর সঙ্গে মিউনিখে যান। এরপর থেকে তিনি ক্রমেই লুই এবং পোপের মধ্যেকার সেকুলার ও যাজকীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন, যার ফলে তাকে ফ্রান্সিকান সম্প্রদায় থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১৩২৭ খৃষ্টাব্দে লুই মারা গেলে ওকাম পোপের সঙ্গে সমঝোতায় আসার চেষ্টা করলেও তাতে তিনি সফল হয়েছিলেন কিনা তা জানা যায় না।

(কিস্তি ২)

ghhabib67@yahoo.com

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আনিস — জানুয়ারি ১, ২০১১ @ ৩:২১ অপরাহ্ন

      শুভ উদ্যোগ। নিয়মিত প্রকাশ আশা করছি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সালিম অর্ণব — এপ্রিল ২৩, ২০১৬ @ ১:৩৯ অপরাহ্ন

      হাবিব ভাইয়ের লেখা পড়তে শুরু করেছিলাম বেশ আগে। বলা যায় আমার প্রিয় অনুবাদক বলতে যাদের নাম আসে তাঁর নাম সামনের সারিতেই থাকবে। বিশেষ করে সোফির জগৎ পড়ার পর উনার সম্পর্ক ধারণা আরো উচ্চে গেছে। নিঃসঙ্গতার একশ বছরও নিঃসন্দেহে একটা ভালো চেষ্টা। সবমিলিয়ে সময়ের অপেক্ষা, শুভকামনা নিরন্তর। লিখতে থাকুন ভাই। পড়ার জন্য আমরা আছি।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com