কিস্তি ৪

ছফামৃত

নূরুল আনোয়ার | ৯ নভেম্বর ২০০৯ ১০:১৭ পূর্বাহ্ন

শুরুর কিস্তি

(কিস্তি ৩-এর পর)

sofa_4.jpg
আহমদ ছফা

সন্তোষবাবুর ঘটনার জের ধরে ওইদিন ছফা কাকার সঙ্গে আরেক ভদ্রলোকের পরিচয় হয়েছিল। ভদ্রলোক সন্তোষবাবুর পাশের ঘরে ছিলেন। তিনি ছফা কাকার সঙ্গে তর্কাতর্কি শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন এবং ছফা কাকাকে সন্তোষবাবুর খপ্পর থেকে উদ্ধার করে নিজের ঘরে নিয়ে
—————————————————————–
“বার্ট্রান্ড রাসেলের একটা ম্যানাস্ক্রিপ্ট নিয়ে তাঁকে [মফিজ চৌধুরী] খুঁজতে এলাম।… ম্যানাস্ক্রিপটা যখন দিলাম বললেন, আহমদ ছফা সাহেব কে?… উনি মনে করেছেন আহমদ ছফা সাহেবের ম্যানাস্ক্রিপটা আমি চুরি করে নিয়ে গেছি। তখন আমি দেখি যে সব বুর্জোয়ারা একই রকম! চলে আসছি, উনি গাড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, তুমি গাড়িতে ওঠ। গাড়িতে ওঠার পরে তাঁর ইন্দিরা রোডের বাড়ির সামনে নামতে গিয়ে দেখি পকেটে শ’য়ে শ’য়ে টাকা।… আমি ভাবলাম, আমি পরীক্ষা দেব টাকা নেই, আর এই লোক পকেটে এত টাকা নিয়ে যাচ্ছে। গাড়িটা যখন গেটের কাছে থেমেছে ম্যানাস্ক্রিপটা রেখে পকেট থেকে এক শ’ টাকা যতগুলো পেয়েছি নিয়ে বললাম যে ম্যানাস্ক্রিপ্ট জমা রইল আমি টাকাটা নিয়ে যাচ্ছি।… পরীক্ষা যখন পাশ করে গেলাম, ভাল রেজাল্ট করলাম প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে, তখন তাঁর কাছে টাকা দিতে গেলাম। বললেন যে এগুলো কর্জে হাসানা।”
—————————————————————-
বসিয়েছিলেন। তাঁর কাছ থেকে নানা কথা শুনতে হয়েছিল। বোধহয় ছফা কাকাকে ভদ্রলোকের মনে ধরেছিল। ছফা কাকাকে তিনি আর কখনও আসলে সোজা তাঁর কাছে চলে আসতে বলেছিলেন। তিনি সন্তোষবাবুকে ইঙ্গিত করে বললেন, ভদ্রলোক একটু পাগলা কিসিমের, কিন্তু মানুষটা ভাল। পরে যখন চেনাজানা হবে বুঝতে পারবে। যেই ভদ্রলোক এতক্ষণ ধরে এত সুন্দর সুন্দর কথা বললেন তাঁকে ছফা কাকা কোনোদিন দেখেননি। পরে জেনেছিলেন তাঁর নাম রণেশ দাশগুপ্ত। এই রণেশ দাশগুপ্তের সঙ্গে ছফা কাকার একটা সুন্দর সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায়। তিনি লিখেছেন:

আমি রণেশদার কাছে আসা-যাওয়া শুরু করলাম। নতুন লেখালেখি শুরু করার সময় কবিতা লেখার ক্রেজ সকলের থাকে। আমারও ছিল। তিনি তিন চারটে কবিতা ছাপলেন। প্রায় তিন মাস পরে একদিন ডেকে নিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, তোমার তো বেশ ক’টা কবিতা সংবাদের সাহিত্য পাতায় গেল। তুমি খুশি? ততদিনে তাঁর সঙ্গে একটা স্নেহের সম্পর্ক দাঁড়িয়ে গেছে। আমি বললাম, আরও ছাপা হলে আরও খুশি হব। রণেশদা বললেন, ওটা লোভের কথা হল। তাঁর কথা শুনে আমাকে চুপ করে যেতে হল। রণেশদা বললেন, তোমার যখন কৃষক সমিতি করার অভিজ্ঞতা আছে বলছ শ্রমজীবী মানুষের সম্পর্কে গদ্যে কিছু লিখ না কেন?

আমি একটুখানি চমকালাম। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলাম, আপনি কি কবিতা লেখার ব্যাপারে আমাকে নিরুৎসাহিত করতে চাইছেন? রণেশদা বললেন, কবিতা অবশ্যই লিখবে। তুমি শ্রমজীবী মানুষ সম্পর্কে অনেক কিছু লিখতে পার, যারা কবিতা লেখে তাদের পক্ষে সেটা অনেক সময় সম্ভব নয়। সুতরাং গদ্যে শ্রমজীবী মানুষদের বিষয়ে কিছু লিখতে চেষ্টা কর। (ছফা, খ. ৪, পৃ. ২১৮)

ছফা কাকা রণেশবাবুর কথায় চিন্তায় পড়ে গেলেন। নানারকম ভাবনা তাঁর মাথায় হানা দিতে থাকল। তাঁর মনে হতে থাকল হয়ত তাঁর কবিতা রণেশবাবুর পছন্দ হচ্ছে না। তিনি তাঁকে কবিতার জগত থেকে কৌশলে দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্য এমন পথ বাতলে দিচ্ছেন। সন্তোষবাবুর তিরষ্কারের যন্ত্রণা তখনও তাঁর ভেতর থেকে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। কবিতার নামে যে অখাদ্য সন্তোষবাবু হজম করতে পারেননি রণেশবাবুরও একই দশা হয়নি তাঁর নিশ্চয়তা কী। কিন্তু রণেশবাবু যে তাঁকে স্নেহের চোখে দেখতেন তার মূল্য তো কম নয়। তাঁর নির্দেশ অমান্য করবেন কোন সাহসে। তিনি ভাবতে থাকলেন কী নিয়ে লেখা যায়। তাঁর মাথায় এল, তিনি যখন পুলিশের ভয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে পালিয়ে বেড়িয়েছিলেন ওই সময় শ্রমিক নির্যাতনের কিছু চিত্র তিনি স্বচক্ষে দেখেছিলেন। কর্ণফুলী কাগজের কলে বাঁশ যোগানের সুবিধার জন্য পাহাড়ের ধার কেটে রাস্তা তৈরি করা হত। এসব রাস্তা তৈরির ঠিকাদার ছিল পাঠান আর পাঞ্জাবিরা। তারা নানা জায়গা থেকে শ্রমিক ধরে এনে এখানে কাজ করাত। কিন্তু তাদের উচিত মজুরি দেয়া হত না। তদুপরি তাদের ওপর চলত নানা রকম অত্যাচার। কাকার স্বচক্ষে এসব দৃশ্য দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছিল। তিনি স্থির করে ফেললেন তাদের নিয়ে লিখবেন। লেখাটির প্রথম কিস্তি লিখে তিনি রণেশবাবুর কাছে জমা দেন। তাঁর ভেতরে একটা সংশয়ও কাজ করছিল, যদি লেখাটি ছাপার যোগ্য না হয়? এ ব্যাপারে তিনি লিখেছেন:

‘কর্ণফুলীর ধারে’ শিরোনাম দিয়ে প্রথম কিস্তির লেখাটি রণেশদার কাছে রেখে আসি। দু’দিন না যেতেই দেখলাম আমার লেখাটি একেবারে উপসম্পাদকীয় কলামে ছাপা হয়েছে। আমি ভীষণ উৎসাহিত বোধ করলাম। তার পরদিন রণেশদার সঙ্গে যখন দেখা করলাম, রণেশদা একগাল হেসে বললেন, তোমার লেখাটি দেখেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, সমস্ত লেখাটা লিখে ফেল। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে আসছিলাম, রণেশদা বললেন, একটু বসো। এক কাপ চা খাও। আমি চায়ে চুমুক দিচ্ছিলাম। রণেশদা ক্যাশিয়ার আয়ুব সাহেবের ঘরে গিয়ে চুপি চুপি আলাপ করলেন। আয়ুব সাহেব আমাকে পঁচিশটি এক টাকার নোট এনে দিলেন। রণেশদা হেসে বললেন, তোমার লেখার যৎসামান্য সম্মানী। তখনকার বাজারে পঁচিশ টাকা অনেক টাকা। ওই টাকা দিয়ে একটা হৃষ্ট-পুষ্ট খাসি কিনে ফেলা যেত। অথচ আমি দু’ঘণ্টার বেশি পরিশ্রম করিনি।

ওই লেখাটি আমি লিখতে থাকলাম। সপ্তাহে দু’দিন প্রকাশিত হত। লেখাটি অনেকেই খুব পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু আমার কাছে নগদ পঁচিশ টাকার আকর্ষণটি প্রধান হয়ে দাঁড়াল। ছয় কিস্তি পর্যন্ত আয়ুব সাহেব আমাকে লেখা ছাপা হলেই পঁচিশ টাকা দিয়ে ফেলতেন। তারপরেই ঘাপলা বাঁধল। লেখাটি দশ কিস্তি পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আয়ুব সাহেব আমাকে টাকা দিতে অস্বীকার করলেন। আগের কিস্তিগুলোর নগদ টাকা দেয়া হয়েছে, পরের চার কিস্তির টাকা কেন দেয়া হবে না – সে ব্যাপারটি নিয়ে আমি দেন-দরবার করতে থাকলাম। আমার ধারণা হয়েছিল বয়স নেহায়েত কম বলেই আয়ুব সাহেব আমার টাকাটা আটকে দিয়েছেন। আমার পীড়াপীড়িতে অবশেষে আয়ুব সাহেব বাধ্য হয়ে জানালেন, রণেশদার সে মাসের পুরো মাইনের টাকাটা আমাকে লেখার পারিশ্রমিক হিসেবে দিয়ে দিতে বলেছেন। নরেশদা সংবাদ থেকে মাসে এক শ’ পঞ্চাশ টাকা পান। ছ’ কিস্তির মাথায় সে টাকা শেষ। তিনি কোত্থেকে আমাকে টাকা দেবেন? আর সংবাদের বাইরের লোককে টাকা দেবার কোন নিয়ম নেই। দেবেও বা কেমন করে? তখন কর্মীদের মাসিক মাইনে দেয়া সম্ভব হত না। (ছফা, খ. ৪, পৃ. ১৪৫)

তারপরও ছফা কাকা সংবাদে লেখা ছাড়েননি। ওই সময় তিনি অন্য কোনো পত্রিকায় লিখতেন এ রকম কোনো উল্লেখ কোথাও পাওয়া যায়নি। সংবাদে লেখার মধ্যে একটা আত্মতৃপ্তিরও ব্যাপার ছিল। সে সময় সংবাদে কেউ লেখা ছাপাতে পারলে নিজেকে অতি ভাগ্যবান মনে করতেন। ছফা কাকা যেহেতু সংবাদে লিখে লিখে হাত পাকিয়ে ফেলেছেন এবং তাঁর লেখা দিলেই সংবাদ ছেপে দেয়, যে কারণে নিশ্চয় তাঁর মধ্যে একটা চাপা অহংকার কাজ করত।

সংবাদ অফিসের সন্নিকটে ছিল তাঁর অকৃত্রিম বন্ধু অরুণেন্দু বিকাশ দেব-এর বাসা। ওখানে নিয়মিত তাঁর যাতায়াত ছিল। ফলে ওই এলাকায় তাঁর একটা আড্ডাও গড়ে উঠেছিল। আমিনিয়া এবং সলোজা দু’টি রেস্টুরেন্টই ছিল তাঁদের আড্ডার স্থল। আড্ডার নিয়মিত সদস্য ছিলেন নরেন বিশ্বাস, জামাল খান, পবিত্র কুমার দাস, অরুণ। মাঝে মাঝে আসতেন সন্তোষ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন প্রমুখ। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেই আড্ডাটা বেশি করে জমত। তাঁদের আড্ডাটির নাম ছিল ‘নটি কর্নার’। এই নটি কর্নারের একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে ছফা কাকা সূর্য তুমি সাথী উপন্যাসটি লিখতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন:

নটি কর্নারে আমি কথাটি উঠিয়েছিলাম। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ পশ্চিমবঙ্গের যে সকল লেখকের লেখা আমরা পড়ি এবং তারিফ করি, সে ধরনের রচনা আমরা নিজেরাই আমাদের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত অবলম্বন করে লিখতে পারি। জামাল খান আমাকে চ্যালেঞ্জ করে বসল। তুমি কি সে ধরনের লেখা লিখতে পারবে? আমি বললাম, লিখতে পারি। সে বলল, লিখে দেখাও। জামাল বলল, ঠিক আছে, এক শ’ টাকার বাজি। লিখলে চলবে না সংবাদের সাহিত্য পাতায় লিখে দেখাতে হবে। আমি বাজি ধরেই আমার প্রথম উপন্যাস সূর্য তুমি সাথী লিখতে আরম্ভ করেছিলাম। প্রথম অধ্যায় লিখে যখন রণেশদাকে দেখালাম, তিনি বললেন, বেশ তো হচ্ছে, লিখে যাও। পর পর দু’টি অধ্যায় লিখেছিলাম এবং রণেশদা সংবাদে ছেপেছিলেন। আমি বাজি জিতেছিলাম, কিন্তু জামাল টাকা দেয়নি। তারপর লেখাটা আর ধরিনি। রণেশদার তাগাদায় প্রায় দু’ বছর পরে লেখাটা শেষ করি। সাতষট্টি সালে যখন বই হয়ে বেরুল রণেশদা একটি সুন্দর আলোচনা লিখেছিলেন। (ছফা, খ. ৪, পৃ. ১৪৫)

সূর্য তুমি সাথীকে আহমদ ছফার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ হিসেবে মনে করা হয়। কিন্তু আমার জানা মতে, তার আগে তিনি আরও একটি বই লিখেছিলেন এবং তা প্রকাশিতও হয়েছিল। বইটির নাম ছিল বরুমতির আঁকে বাঁকে। বইটি আমাদের এলাকায় বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এখনও বইটি অনেকের মুখে মুখে। বরুমতি নদীর দু’পাড়ের মানুষ নিয়ে বইটি রচিত হয়েছিল। বর্তমানে বইটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। ছফা কাকাকে আমি বইটির কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। বলেছিলাম, আপনি বরুমতির আঁকে বাঁকে নামের একটি বই লিখেছিলেন। মনে পড়ে? তিনি একগাল হেসে জবাব দিলেন, লিখেছিলাম তো। কিন্তু সে তো আগের কথা। এ রকম লেখা খুঁজলে আহমদ ছফার অনেক পাওয়া যাবে।

সত্যি তাই। সংবাদে যখন লিখতেন তখন অন্য কোনো পত্রিকায় তিনি লিখতেন না। সংবাদের লেখা সম্পর্কে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘সংবাদে যত লেখা আমার বেরিয়েছে বিভিন্ন সময়ে। লম্বা-চওড়া কবিতা লিখতাম, এইটা লিখতাম, সেইটা লিখতাম – এগুলো ‘সঞ্চয়িতা’র মত একটা বই হবে যোগাড় করলে। আমি তো অন্য কোন পত্রিকায় লিখতাম না।’ সংবাদের লেখার মত বরুমতির আঁকে বাঁকে বইটিও হারিয়ে গেছে। হয়ত কোনোদিন পাওয়া যাবে কারও পুরনো বইয়ের স্তূপের মধ্যে, অথবা পাওয়া যাবে না।

বরুমতির আঁকে বাঁকে যদি তাঁর প্রথম বই হয় তাহলে তাঁর অনুবাদ সাহিত্য তানিয়া দ্বিতীয় প্রকাশিত বই। সূর্য তুমি সাথী তারও পরে। তানিয়া বইটা অনুবাদ করেছিলেন ঠেকায় পড়ে। তাঁর আর্থিক দৈন্যদশা এত চরমে পৌঁছেছিল যে খাওয়া-পরার খুব কষ্ট হচ্ছিল। তখন তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে প্রাইভেটে বিএ পরীক্ষা দেয়ার মনস্থির করেছিলেন। কিন্তু ফরম পূরণের টাকা তাঁর ছিল না। ফলে তানিয়া গ্রন্থটি তিনি দু’দিনে অনুবাদ করেন। আমি একবার তাঁর কাছে আমার অনার্স পরীক্ষার ফি দাবি করেছিলাম, তখন তিনি আমাকে মনে করিয়ে দিলেন, ‘আমি আমার পরীক্ষা ফি যোগাড় করতে না পেরে কমলাপুর স্টেশনে বসে দু’দিনে তানিয়া বইটি অনুবাদ করেছিলাম। সেই অনুবাদ প্রকাশকের কাছে জমা দিয়ে অগ্রিম টাকা নিয়ে পরীক্ষা ফি দিয়েছিলাম। আমার রক্ত কি তোমার শরীরে নেই?’

আমি কোনো জবাব দিতে পারিনি।

তানিয়া কমলাপুর স্টেশনে বসে অনুবাদ করেছিলেন কি না জানি না, তবে একটা দুঃসময় তাঁকে লেখাটা লিখতে বাধ্য করেছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই।

বাপ-দাদার জন্মস্থান গ্রামকে দূরে ঠেলে দিয়ে কাকা ঢাকা শহরে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন। চাকচিক্যময় ঢাকা শহরে তিনি ছিলেন একেবারে বেমানান। তাঁর চলনে-বলনে ছিল গ্রাম্যদোষ। পোশাকে-আশাকে ছিল না সাহেবিয়ানা। নামটাও ছিল গেঁয়ো প্রকৃতির। কিন্তু তাঁর মনটা ছিল সুন্দর। কথার মাধ্যমে যে কাউকে তিনি সহজে আকৃষ্ট করতে পারতেন। তাই হয়ত এ সুন্দর মনের মানুষটির বাইরের দিকের একটা পরিবর্তন আনার কথা কেউ কেউ বলে থাকবেন। কেউ বলে দিলে তো চাল-চলন পরিবর্তন হয়ে যায় না। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার ব্যাপার। সুতরাং নামটা অনেকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সুযোগ পেলেই তারা তাঁর নাম সংশোধনের সুপারিশ করতেন। কিন্তু তিনি তাতে গা করতেন না। মা-বাবার দেয়া নামের প্রতি তাঁর একটা শ্রদ্ধাবোধ ক্রিয়াশীল ছিল। এই নামের প্রতি কেউ অমর্যাদা করুক তা তিনি চাইতেন না। তিনি বলতেন, এই নামের পেছনে অনেকে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। মা-বাবার দেয়া নামকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার জন্য আমাকে দিনে রাতে আঠার ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হয়েছে।

ফলে তাঁর নাম অন্য বানানে দেখলে তিনি খুব মর্মাহত হতেন। আমার মনে আছে, বাংলামটরের বাসায় তাঁর কাছে এক ভদ্রলোক একখানা চিঠি নিয়ে এসেছিলেন একটা সাহিত্য-সভায় দাওয়াত করতে। চিঠির খামে লেখা ছিল আহমদ সফা। ‘ছফা’র পরিবর্তে ‘সফা’ দেখে তিনি খুবই ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। তিনি ভদ্রলোককে বলেছিলেন, এখানে আহমদ সফা বলে কেউ থাকে না। আপনি অন্য কোথাও দেখেন।

ভদ্রলোক বললেন, আমি জেনেশুনে এসেছি। আমাকে যিনি পাঠিয়েছেন তার ভুল হবার কথা নয়। তার সঙ্গে আপনাকে অনেকবার আমি দেখেছি।

ছফা কাকা এবার আরও খেপলেন। তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়লে মুখ থেকে এক ধরনের গালি বেরিয়ে আসত। আমি তাঁর অদ্ভুত গালি এখানে উল্লেখ করতে চাই না। ভাগ্যগুণে ভদ্রলোককে সে গালি শুনতে হয়েছিল। বিলম্বে হিতে বিপরীত হতে পারে, তাই ভদ্রলোক চিঠিটি নিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এগুলো তো অনেক পরের ঘটনা। এই নাম নিয়ে তাঁর অনেক ঘটনা আছে। ‘সাপ্তাহিক পূর্বদেশ’-এর সম্পাদক ছিলেন কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস। ইদ্রিস সাহেব তাঁর পত্রিকায় ছফা কাকার একটি কবিতা ছেপেছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর নামে ‘ছফা’র জায়গায় ‘সফা’ শব্দটি ব্যবহার করেন। ইদ্রিস সাহেবের কাছে মনে হয়েছে ‘সফা’ শব্দটিই সঠিক। ছফা কাকা ইদ্রিস সাহেবের এ কর্মকে বাড়াবাড়ি বলে ধরে নিয়েছিলেন এবং তিনি তার প্রতিবাদও করেছিলেন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে। শুনতে পাই ঘটনাটি লোকমুখে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। লেখক আবু কায়সার বয়ান করেছেন:

এটা আপনি করেছেন?

চমকে উঠে সামনে তাকান প্রবীণ সাহিত্যিক। তাঁর মুখের দিকে একজোড়া আগ্নেয় চোখ মেলে দাঁড়িয়ে আছে চিকন চেহারার এক রাগী তরুণ। ডান হাতের মুঠোয় ভাঁজ করা পত্রিকাটি দুলিয়ে দুলিয়ে সে জানতে চাইল, কার কথা মত তার নামের বানান পাল্টে ফেলা হয়েছে।

– আপনার… মানে তোমার পরিচয়টা – ভদ্রলোক বিব্রতভাবে জিজ্ঞেস করেন উত্তেজিত আগন্তুককে।

– আমার নাম আহমদ ছফা। তরুণের ত্বরিত জবাব।

সে আর কিছু বলার আগেই ‘সাপ্তাহিক পূর্বদেশে’র সাহিত্য-সম্পাদক কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস পুরো ব্যাপারটা বুঝে ফেলেছেন। শশব্যস্তে তিনি বললেন, আরে তুমিই আহমদ সফা? আজকে সাহিত্য পাতায় তো তোমার কবিতাটি ছাপা হয়েছে। আর আমি নামের ভুল বানানটি শুধরে দিয়েছি। ছফা আবার কী। সফাই তো সঠিক! তাতে এমন খেপে যাবার কী আছে, বল তো! বস, চা খাও।

আহমদ ছফা দাঁড়িয়ে রইলেন। আবারও বসতে বলায় বললেন, বসতে পারি এবং চা-ও খেতে পারি। তবে একটা শর্ত আছে। কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস এবার বিরক্ত হলেন। বিস্মিতও। তাঁর সামনে উদ্ধত ভাষায় কেউ কথা বলতে পারে, তা তিনি তো বটেই; যে কারও জন্যে ছিল অভাবনীয় ব্যাপার। তবু তিনি জানতে চাইলেন, শর্তটা কী?

এ ব্যাপারে একটি সংশোধনী ছাপতে হবে। এবার ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিসের। সঙ্গে সঙ্গে তিনি অপরাগতা প্রকাশ করলেন এবং টেবিলে ঘাড় গুঁজে লেখাপত্র এডিট করতে শুরু করলেন। কিন্তু নিপাট এ ভাল মানুষটির কপালে দুর্ভোগ ছিল। আহমদ ছফা বললেন, ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। তবে মনে রাখবেন, যে ছেলের নামকরণ উপলক্ষে সাতটা গরু জবাই করে লোকজনকে খাওয়ানো হয়েছিল, কলমের এক খোঁচায় তার নাম পাল্টে ফেলা যায় না। কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে মুঠোয় ধরা ‘পূর্বদেশ’টা কুটি কুটি করে ছিঁড়ে মেঝের ওপর ছুঁড়ে ফেললেন আহমদ ছফা। (ছফা. স্মা., পৃ. ৪৭)

ওপরের ঘটনাটি ছফা কাকার লেখাতেও উল্লেখ পাওয়া যায়। নাম পাল্টানোর ব্যাপারটি নিয়ে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন:

নামটা আমাকে পাল্টাতে বলেছিল। অনেকেই নাম পাল্টিয়েছে। ফরহাদও পাল্টিয়েছে। আমাকে আবদুল হাই সাহেব নাম পাল্টাতে বলেছিলেন, আমি তাঁকে জবাবও দিয়েছিলাম। উনি বলেছেন ছ-ট চলবে না, দন্ত্য-স দিয়ে লিখতে হবে। আমি বলেছিলাম, স্যার, আমি সাত বোনের পরে একটা ছেলে, ভাই জন্মাইছি এবং জন্মের পরে আমার আঁকিকাতে সাতটা গরু জবাই করা হয়েছে, সুতরাং আপনার অপছন্দের জিনিস বলে এইটা কাটা যাবে না। (ছফা, সা., পৃ. ২৫)

ছফা কাকা নিজের নাম পাল্টাননি বটে, কিন্তু তাঁর কথায় প্রফেসর মুনতাসির মামুন নিজের নাম সংক্ষিপ্ত করেছিলেন। শুনতে পাই, প্রফেসর মুনতাসির মামুনের পুরো নাম ছিল মুনতাসিরুদ্দিন খান মামুন। মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেছেন আহমদ ছফা তাঁর নামটি ঠিক করে দিয়েছেন। তিনি আগে ‘মুহম্মদ’-এর জায়গায় ‘মোহাম্মদ’ লিখতেন। আমিও আমার নামের আগে ‘মোহাম্মদ’ শব্দটি ব্যবহার করতাম। ছফা কাকা নিজ হাতে তা কেটে দিয়ে ‘মুহম্মদ’ করে দেন। এমন কি, তিনি আমাকে আহমদ হানিফ নামে লেখক হিসেবে পরিচিত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি মন থেকে সাড়া দিতে পারিনি।

ছফা কাকা এমন এক ব্যক্তি, যাঁর কথা বলতে গেলে হাজার কথা ভিড় করে। তাঁর কোনো ঘটনাকে ছোট করে দেখার অবকাশ যেমন নেই, আবার কোনো ঘটনাকে বড় করে দেখিয়ে হিরো বানাবার অপপ্রয়াস চালানোও ঠিক হবে না। তাই ছফা কাকার নানা ঘটনাকে আমি সাধারণ চোখে দেখার চেষ্টা করছি এবং সেভাবেই লিখে যাচ্ছি।

ঊনিশ শ’ চৌষট্টি সালে ছফা কাকা ইসলামী একাডেমী প্রকাশিত এবং শাহেদ আলী সম্পাদিত ছোটদের পত্রিকা সবুজ পাতার লেখক ছিলেন। তিনি দাবি করতেন এ পত্রিকায় তাঁর প্রথম লেখা ছাপা হয়। লেখাটি ছিল ছোটদের জন্য লেখা একটি ছোট গল্প। গল্পটি রচিত হয়েছিল সোলায়মান নবীর কাহিনী অবলম্বনে ‘অপূর্ব বিচার’ নামে। পরে এই গল্পটি মিন্নাত আলী সম্পাদিত অষ্টম শ্রেণীর বাংলা বইয়ে তা সংকলিত হয় এবং সম্পাদক সাহেব গল্পটিতে নিজের নাম ব্যবহার করেছিলেন। ছফা কাকা মনে করতেন, এ লেখাটি তাঁর লেখক হবার পেছনে বড় ধরনের অবদান রেখেছিল। হয়ত লেখাটি পাঠ্য বইয়ে অন্তর্ভুক্তির কারণে তাঁর আত্মবিশ্বাস অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। এই সম্পর্কে ছফা কাকার বয়ান:

ইসলামিক একাডেমিতে সবুজ পাতা বলে একটা পত্রিকা বের করছিল। আমি বাচ্চাদের একটা লেখা লিখি। এটা ছাপা হয়। পরবর্তীতে এটা আবার ক্লাস এইটের টেকস্ট বইতে ইনক্লুড করে। সংকলিত করে। এটা আমার জীবনের আরেকটা মোড় ঘুরিয়ে দিল। পরবর্তী পর্যায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাবার রাস্তাটা করে দিল এই লেখা। সেটা লম্বা স্টোরি। গল্প টেক্সট বইতে ছাপা হল। মিন্নাত আলী সাহেব ছিলেন এডিটর। লেখাটা ছাপার সময় উনি ছাপলেন খোদ নিজের নামে। আমি করে দিলাম মামলা। প্রথমে আবুল হাশিম সাহেবকে বললাম, আবদুল হাই সাহেবকে বললাম, সবাইকে বললাম। তাঁরা মনে করলেন এটা কোন ঘটনা নয়। তারপরে আমি ফেরদৌসী বেগমকে ধরে ধরে মোস্তফা কামালকে দিয়ে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছিলাম। তখন লবেযান অবস্থা। তিন হাজার টাকা পাঠালেন। আর তিন হাজার টাকা আনতে গিয়েছি। আনতে গিয়ে যে করুণ অবস্থা! সে তো ভাঙা ঘরে পাঁচটা মেয়ে নিয়ে থাকে। প্রিন্সিপাল বলতে আমরা অন্য বস্তু বুঝেছিলাম। চট্টগ্রাম কলেজের প্রিন্সিপাল সোলাইমান চৌধুরী ছিলেন, তাঁর বাড়িতে টেনিস কোর্ট ছিল। গাড়ি করে রাস্তা পার হতেন। এখন এই প্রিন্সিপাল দেখছি কিনা ভাঙা ঘরে থাকেন। তাঁর পাঁচটা মেয়ে, একটাও ছেলে নেই। নিজের হাতে বাজার করেন। ওই লোকের কাছ থেকে টাকা নিতে আমার খুব খারাপ লাগল। টাকা নেই নাই আর। (ছফা, সা., পৃ. ১৬)

ইসলামি একাডেমির কথা যখন এল আবুল হাশিম সম্পর্কে দুটো কথা বলা দরকার। আবুল হাশিম সাহেব ছিলেন ইসলামি একাডেমির ডিরেক্টর। তাঁর প্রতি ছফা কাকার একটা শ্রদ্ধাবোধ আগে থেকে কাজ করত। ইসলামি একাডেমিতে যাওয়া-আসার সুবাদে কাকা হাশিম সাহেবের কাছাকাছি আসার সুযোগ পেয়েছিলেন। হাই স্কুলে পড়ার সময় তিনি আবুল হাশিমের নাম শুনেছিলেন। তাঁর শিক্ষক মশায়কে বলতে শুনেছেন, আবুল হাশিম সাহেব যখন কথা বলেন তাঁর কানা চোখ জ্বলজ্বল করতে থাকে। এই জ্বলজ্বল চোখ দেখার জন্য ছফা কাকা অনেক দিন অপেক্ষা করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর কানা চোখ দেখার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছিল। তিনি বলেছেন:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ঊনিশ শ’ চৌষট্টি সালের দিকে ‘ইসলামিক একাডেমি’ আয়োজিত একটি সেমিনারে আলোচক হিসেবে আমি অংশগ্রহণ করেছিলাম। হালের ‘ইসলামি ফাউন্ডেশন’ তখন ছিল ‘ইসলামিক একাডেমি’। আবুল হাশিম সাহেব প্রথম ডিরেক্টর। তিনি ওই সেমিনারে সভাপতির আসন অলংকৃত করেছিলেন। তাঁর সুদীর্ঘ সুললিত যুক্তিপূর্ণ ভাষণ প্রদান করার সময় ঘন ঘন তাঁর চোখে-মুখে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ পাচ্ছিল সেটা দেখেই আমার হৃদয়ঙ্গম করার সুযোগ হয় কানা চোখ কী করে জ্বলে। (ছফা, খ. ৪, পৃ. ১২৭)

এক পর্যায়ে হাশিম সাহেবের লেখা Creed of Islam বইটি তাঁর পড়ার সুযোগ হয় এবং পরে পরে এ কানা লোকটিকে তিনি গুরু মানতে শুরু করেছিলেন। একজন লোক কতটুকু ঋণী হলে আরেকজন লোককে গুরু মানে সেটা বুঝিয়ে বলার দরকার আছে বলে মনে করি না। কাকা বলেছেন:

আবুল হাশিম সাহেবের বইটা যখন পড়ার সুযোগ পেলাম, তখন তাঁর দিকে নতুন করে তাকাতে আরম্ভ করলাম। সে সময় আমার ইংরেজি ভাষায় অধিকার ছিল নিতান্তই সামান্য। তা সত্ত্বেও হাশিম সাহেবের গদ্যরীতি, যুক্তির শক্তি, পঠন-পাঠনের ব্যাপ্তি এবং সুগভীর মননশীলতা আমার মনে স্থায়ীভাবে রেখাপাত করে। আমি একেবারে স্কুল-জীবন থেকে ন্যাপ এবং কমিউনিস্ট পার্টির লোকদের সংস্পর্শে বড় হয়েছি। আমার মানস গঠনে কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবীদের অনেকখানি প্রভাব অদ্যাবধি সক্রিয়। এই পুস্তকখানি পাঠ করার পর আমি হাশিম সাহেবকে গুরু মনে করতে থাকলাম। তাঁর বড় ছেলে প্রফেসর বদরউদ্দীন উমর ‘ইসলামের মর্মবাণী’ শিরোনাম দিয়ে বইটির একটি বাংলা অনুবাদও করেছিলেন। এই বইটি পাঠ করা আমার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ইসলাম সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে সামান্য পরিমাণ লেখাপড়া করার সুযোগ আমার হয়েছে। আবুল হাশিম সাহেব তাঁর এই গ্রন্থটির মধ্যদিয়ে আমার ভেতরে সেই বীজটি চারিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর কাছে আরও একটা ব্যাপারে আমি ঋণী। মিশরীয় ক্বারী সায়দাম সাহেব ঢাকা আসার পরে খুব সম্ভবত তাঁর সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে তিনি সুরা ফাতিহার একটি তফসীর করেছিলেন। সেই ক্ষুদ্র পুস্তিকাটির নাম ছিল ‘উ¤মূল কোরান’ অর্থাৎ কোরানের জননী। এ রচনাটি পড়ে আমি অভিভূত হয়ে যাই।… হাশিম সাহেবকে যদি না চিনতাম, যদি তাঁর বই না পড়তাম, ইসলাম ধর্মের আকীদা, ঈমান এইসব বিষয়ে আমার কোন জ্ঞানই জন্মাত না। (ছফা, খ. ৪, পৃ. ১২৮)

আবুল হাশিম সাহেবের প্রসঙ্গ থাক। মিন্নাত আলী সাহেবের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য ছফা কাকাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেতে হয়েছিল সেকথা আগেই বলেছি। তখন নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে তিনি বাধা পড়ে গিয়েছিলেন। ‘উচাটন মন’ – কোন সময় কোন জিনিসটা তাঁর ভাল লেগে বসত তিনি নিজেই বুঝে উঠতে পারতেন না। ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ না করেই ক্লাস করা থেকে বিরত থাকতে শুরু করলেন। সুতরাং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকাকালীন তিনি কোনো রকম পিছুটান অনুভব করার প্রয়োজন বোধ করেননি। ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে তিনি কোনো কোনো লেখায় দ্বিতীয় মাতৃভূমি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ওই এলাকার আলো-বাতাস-মাটি-মানুষের প্রতি তিনি একটা নাড়ির টান অনুভব করতে আরম্ভ করেছিলেন। তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়:

আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া যখন গেলাম পরীক্ষা দেয়ার জন্য, তখন কম্যুনিস্ট পার্টি, কৃষক সমিতি, ছাত্র ইউনিয়ন এই মাখন টাখন যারা ছিল, তারপরে আবদুল কুদ্দুস ওদেরকে আমরা মুখ খুলতে দেইনি। ওখানে কৃষক-শ্রমিক ফ্রন্ট, মহিলা ফ্রন্ট সব কিছুর একটা, এই যাকে বলা হয় সকলের একটা যোগসূত্র হয়ে গেলাম। রেলওয়ে ওমেনস লীগ, কৃষক সমিতি, ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ মহিলা সমিতি এইসব। তখন মাঝখানে হয়ে গেল কী, পার্টি ডিভাইডেড হয়ে গেল। আমি বিপদে পড়ে গেলাম। আমি যাদের সঙ্গে কাজ করেছি তারা মস্কোপন্থী। এদিকে এরা পিকিংপন্থী। এদের প্রতি আমার আস্থা আছে, কিন্তু আমার সঙ্গে যাদের সংযোগ তারা মস্কোপন্থী। আমি কোন কূল করতে পারছিলাম না। পার্টি ভেঙে গেছে। পার্টির নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ উকিল-টুকিল ছিলেন। কেউ কেউ আমাকে বলত বাজার কর, এই কর, সেই কর। যখন-তখন। তখন আমি ডিসাইড করলাম পরীক্ষা দেব। ওখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে দেব। আসাদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার ইয়ে [সম্পর্ক] হয়ে গেল। আসাদ ভাই চাকরি করেন, ইত্যাদি করেন। আমার তখন পরিকল্পনা ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে বিপ্লব করব। বাঙালি শিক্ষকদের তো একটা সীমাবদ্ধতা আছে। আমি ভাবলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে বিপ্লব করব। মতিন ভাইয়েরা করবে ঈশ্বরদী থেকে। মাঝখানে বিপ্লব পিকিং-মস্কো ভাগ হয়ে গেল। আমি আর্টিস্টেটিক্যালি সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু চীনাপন্থীদের সঙ্গে থাকতে হল। নিজেকে দু’টুকরো করার মত অবস্থা। এবং আমার কোন সাপোর্ট বেজ নাই ওখানে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সব লোক আমার প্রতি প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে গেল। তখন আমি পরীক্ষা দেব ভাবলাম। বললাম যে আমি যাব না, এখান থেকে পরীক্ষা দিয়ে যাব। বলে তো ফেললাম, কিন্তু প্রবলেমটা হল করবটা কী। আমার এক বন্ধুর মা নতুন তাবলিগে গেছে, কোরান পড়তে চাইছে। দেখি যে ভুলভাল পড়ে। আমি বললাম, তুমি তো ভুল পড়। বলল, আমি তো বুড়ো বয়সে কোরান পড়া ধরছি। আমি বললাম যে, ঠিক আছে, আমি তোমাকে কোরান পড়াব। তুমি আমারে ভাতটা দিও। তোমাকে কোরাণ যে পড়তে শিখাই এটা আমি বলব না। তুমি যে আমাকে বিনা পয়সায় খাওয়াচ্ছ এটাও কাউকে বলবে না। (ছফা, সা. পৃ. ১৮)

ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে থাকাকালীন একজন মানুষের ওপর ছফা কাকা খুব উৎপাত করতেন, তিনি হলেন কবি আসাদ চৌধুরী। আসাদ চৌধুরী না থাকলে তাঁরও হয়ত ওখানে টিকে থাকা সম্ভব হত না। বলা যায়, কবি সাহেবকে তিনি একজন অভিভাবক হিসেবে পেয়েছিলেন। তিনি তাঁকে সম্বোধন করতেন ‘পিতাজি’ বলে। এই পিতাজি লিখেছেন:

পাশটাশ করে আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে ঢুকলাম, ‘৬৪-র ডিসেম্বরে। মাস দুয়েকের মধ্যেই ওঁর [ছফা] সঙ্গে দেখা রাস্তায়। আমি তাড়াতাড়ি রিকশায় তুলে নিলাম। সে সময় কাজিপাড়ার উকিল সাহেবের একটি ছোট্ট ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি। ছফাও উঠলেন। তিনি গিয়েছিলেন মিন্নাত আলী সাহেবের কাছে, কী একটা পাঠ্যপুস্তকে ওঁর নাকি গল্প ছাপা হয়েছে সেই জন্য।

ছফাকে পেয়ে মাশুকুর রহমান চৌধুরী, মাহবুব-উল করিম, আতিকুল ইসলাম খোকন, জাহাঙ্গীর কবির খান, মুহম্মদ সিরাজ, আবদুল খালেক, আবদুর রহিম এঁরা হাতে চাঁদ পেয়েছিলেন। ছফা ভেতরে ভেতরে যিনি মাস্টার মানুষ, নিশ্চয়ই এঁদের পেয়ে খুশি হয়েছিলেন। ‘তিতাস সাহিত্য পরিষদ’-এর ব্যাপারে মুহম্মদ মুসা, অমূল্য সরকার এঁরা সবাই আশাবাদী হয়ে উঠলেন।

কলেজ লাইব্রেরির সংগ্রহটি ছিল খুবই ভাল, রাসেলের বই এনে দিই মূহূর্তের মধ্যে শেষ। তবে একটা গুণ, একই বই ছফাকে আমি কয়েকবার পড়তে দেখেছি। যেমন রাসেলের ‘স্কেপটিকাল এসেজ’ অন্তত দশ-বারোবার পড়েছেন তিনি। অবশ্য ছফা বরাবরের মত বলতেন তিন চার শ’বার পড়েছেন। কী জানি, এ সময় সিপাহি বিদ্রোহের ওপর প্রচুর পড়াশোনা তিনি করেছিলেন। এতদিনে আমার সহকর্মীদের সঙ্গে ওঁর একটা সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বই তাঁদের মাধ্যমেও তিনি আনিয়ে নিতেন।

প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার প্রতি আমি বেশ চাপ দিয়েছিলাম, অপমানজনক কথাও বলেছি, তাছাড়া বোধহয় নিজের থেকেও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ডিগ্রির মূল্য। ফলে কলেজ থেকে পরীক্ষা দিলেন, সেকেন্ড ডিভিশন পেলেন। (ছফা, স্মা., পৃ. ৩৩)

ছফা কাকা কখনও গোছানো এবং হিসেবি মানুষ ছিলেন না। সে ব্যাপারে ঘরে বাইরে তার কোনো বাছ-বিছার ছিল না। এ ব্যাপারে কবি আসাদ চৌধুরীর কথায়ও কিছুটা সমর্থন মেলে:

ওঁর সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি—আমরা এক সময় অভাব ভাগ করে নিয়েছি, আনন্দও ভাগ করে নিয়েছি। সংসারের ক্ষেত্রে আমিও খুব একটা পাকা লোক নই। ছফা, ভাবা যায় আমার বিছানা গুছিয়ে, পড়ার টেবিল গুছিয়ে রেখেছেন? আমার আম্মার শাড়িটি পর্যন্ত পরিয়ে দিয়ে নিজে ধুয়ে দিয়েছেন। তবে টাকা-পয়সার ব্যাপারে বোধহয় বেশ বেহিসেবিই ছিলেন। কাজিপাড়ায় আমার ঘরের পাশে ছিল হুমায়ুনের মুদি-দোকান, শান্তি ধোপার পাশের ঘর, সেখানে বেশ বাকি রেখে এসেছিলেন। হুমায়ুন ছফাকে খুব পছন্দ করত।

ছফাকে লোকে পছন্দ করুন বা না-করুন মনোযোগী তাঁর প্রতি হতেই হবে। ছফার ব্যক্তিত্বের এই দিকটি আমার ভাল লাগত। (ছফা. স্মা., পৃ. ৩৭)

ছফাকে ভাল না লাগার তো কোনো কারণ নেই। তিনি ছিলেন ছোট শিশুর মত। শিশুদের আচার-আচরণে অতিষ্ঠ হওয়া যায়, কিন্তু তাই বলে তাকে মন থেকে একেবারে ঝেড়ে ফেলে দেয়া যায় না। যে কারণে মনে হয় কবি আসাদ চৌধুরীর প্রতি আবদারও খাটিয়েছেন বেশি। মোহাম্মদ আবু জাফর বলেছেন:

আসাদ ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, সাফাসহ দিন গুজরান কেমন চলছে। তিনি বললেন, সবই ভাল; কেবল একটা জায়গায় অসুবিধা হয়। গোসল করে এসে দেখি আমার ধোপাফেরত পাজামা-পাঞ্জাবি উধাও হয়েছে। তখন ময়লা কাপড় পরেই ছুটতে হয় ক্লাসে। পরে দেখতে পাই আমার পাজামা-পাঞ্জাবি রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে; তবে, তাঁর মধ্যে ঢুকে আছে সাফা। (ছফা. স্মা., পৃ. ৩৭)

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে ছফা কাকা প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়েছিলেন এবং দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করছিলেন। তাঁর স্নাতক সার্টিফিকেট থেকে জানা যায় সালটি ছিল ঊনিশ শ’ ছেষট্টি সাল।

ঊনিশ শ’ পঁয়ষট্টি সাল। বোধকরি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থাকার পাশাপাশি তখন ছফা কাকাকে ঢাকাতেও থাকতে হত। তখন নানা রকম সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। একটা চাকরির প্রয়োজনও তাঁর ছিল। কিন্তু তাঁকে চাকরি দেবে কে? ওসময় পাকিস্তানী আর্মি ভারত আক্রমণ করেছে। ‘লাহোর শেল্ড’ খবরটি তখন তিনি সংবাদে পড়েন। তখন তাঁর মনে হয়েছিল তিনি পাকিস্তানকে সাহায্য করবেন। তিনি মোনায়েম খাঁর কাগজ ‘পয়গাম’ অফিসে যান। ওখানে তাঁর জার্নালিজমের গুরু সৈয়দ আসাদুজ্জামান বাচ্চু কাজ করতেন। তিনি তাঁর কাছে গিয়ে একটা পোস্ট এডিটোরিয়াল লিখে দেখান। লেখাটি ওই পত্রিকাতে ছাপেন এবং লোকে খুব পছন্দ করে। পত্রিকাটি যখন পরের লেখা ছাপল তখন বাঁধল ঘাপলা। ছফা কাকার জবানীতে:

ঊনিশ শ’ পঁয়ষট্টি সালের কথা। আমি একটা কাগজে চাকরি পেয়েছিলাম। এটা ছিল যুদ্ধকালীন চাকরি। ভারতবষকে কড়া কড়া ভাষায় গাল দিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম। সম্পাদক সাহেব লেখাটি পড়ে ভীষণ খুশি। আমাকে বললেন, আপনি এ ধরনের লেখা লিখতে থাকেন এবং তাঁর সহকারীদের ডেকে বললেন, এই তরুণের লেখা দেখে দেয়ার প্রয়োজন নেই। সরাসরি প্রেসে দিলেই চলবে।

…পত্রপত্রিকায় রামায়ণ-মহাভারত থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সবাইকে ধোলাই করা চলছিল। প্রগতিশীল বলে আমাদের কথিত একজন শিক্ষক টেলিভিশন ও রেডিওতে এই একতরফা নির্জলা নিন্দা পাঠ করে শোনাতেন।

আমি যুদ্ধের মজা টের পেয়ে গেলাম। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়াল শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আমি একটা অপকর্ম করে ফেললাম। একটা রচনায় লিখে বসলাম শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করা ভাল; কিন্তু তার উজ্জ্বল সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে ক্রমাগত নিন্দা প্রচার এগুলো খারাপ কাজ। আমার লেখা কেউ পড়ে দেখত না, তাই লেখাটি যথারীতি ছাপা হয়ে গিয়েছিল। পত্রিকাটি সরকারি। চিন্তা করে দেখুন আমার অবস্থা! আমার থাকার কোন স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। তাই আমাকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। দুপুরবেলা যখন অফিসে এলাম দেখি এক গুরুতর কাণ্ড। বুড়ো সম্পাদকের চাকরি যায় অবস্থা। কম্পোজিটরা থরথর করে কাঁপছে। কথা বাড়াব না। আমি প্রাণে বেঁচে যেতে পেরেছিলাম।

এই রকম অসহায়, বন্ধুহীন আমার কখনও মনে হয়নি। সারাদিন ঢাকা শহরে হেঁটেও একজন লোকের সাক্ষাৎ পাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি যার কাছে আমার মনের বেদনা প্রকাশ করতে পারি।

…আমার থাকার জায়গা ছিল না। আর আমার উল্টোপাল্টা কাজ করার জন্য এই ভয়ংকর পরিস্থিতি। বন্ধু-বান্ধবেরাও আমাকে আশ্রয় দিতে রাজি ছিলেন না। উপায়ন্তর না দেখে আমি নারিন্দার গৌড়ী মঠের বিপরীত দিকে ৪৯ নম্বর বাড়িতে আমার বন্ধু রফিক সন্যামতের শরণাপন্ন হলাম। …রফিকের বাড়ির চিলেকোঠাটি ছিল তখন লেখক, কবি, গায়ক এবং রাজনৈতিক কর্মীদের স্থায়ী আড্ডাস্থল। যখন কারও মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকত না, এসে নারিন্দার ৪৯ নম্বর বাড়ির চিলেকোঠায় আশ্রয় নিত।

চিলেকোঠায় বসে বসে দিন কাটছিল না। আর পথে বের হওয়ারও সাহস পাচ্ছিলাম না। মনের মধ্যে একটা প্রচণ্ড অস্থিরতা। মনে হত আমি কূয়োর মধ্যে ডুবে গেছি। অথবা শূন্য থেকে ঝুলছি। দাঁড়াবার মত মাটি পাচ্ছি না। বার্ট্রান্ড রাসেলের Sceptical Essays বইটা আমার সঙ্গে ছিল। আগে একটা দুটা রচনার অনুবাদ করেছিলাম। এই চিলেকোঠায় থাকা অবস্থায় সময় কাটাবার জন্য আমি প্রবন্ধগুলো অনুবাদে হাত দেই। তখনকার সময়ে আমার যে বিদ্যা-বুদ্ধি তা দিয়ে এ রকম একটা অনুবাদের কাজ করা খুব সহজ ছিল না। প্রতিটি পঙ্ক্তি অনুবাদ করতে যেয়ে বারবার করে অভিধান খুলতে হত। অনুবাদের কর্মটি যথেষ্ট কঠিন এবং শ্রমসাপেক্ষ ছিল। (ছফা, আমার কথা ও অন্যান্য প্রবন্ধ, পৃ. ৩৫)

Sceptical Essays বইটার অনুবাদ শেষ করে ‘বার্ট্রান্ড রাসেলের সংশয়ী রচনাবলি’ নামে বাংলা একাডেমিতে জমা দেয়া হয়। বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ এটাকে একটা ভুলভাল অনুবাদ বলে প্রত্যাখান করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ছফা কাকা চ্যালেঞ্জ করে বসেছিলেন। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেন যে এমন কোনো ভুল তিনি করেননি, যে কারণে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়। আবু হেনা মোস্তফা কামাল ছফা কাকাকে স্নেহের চোখে দেখতেন। তিনি তাঁকে ধরে ঊনিশ শ’ বিরাশি সালে বাংলা একাডেমি থেকে বইটা প্রকাশ করতে সক্ষম হন। বইটার প্রকাশকাল ঊনিশ শ’ বিরাশি সাল হলেও লেখাটা শেষ করেছিলেন পঁয়ষট্টি সালে। তখন পাক-ভারত যুদ্ধ চলছিল। ওই সময় থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা তাঁর ছিল না। তখন তাঁকে কষ্টে-শিষ্টে দিন কাটাতে হত। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে পরীক্ষা দেয়ারও বাসনা হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষার ফি যোগাড় করা ছিল তাঁর জন্য কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
—————————————————————–
“ভদ্রলোক [আহসান হাবীব] খুব যত্ন করে এডিট করতেন এবং তরুণ কবিদের খুব পছন্দ করতেন। আমার সঙ্গে তাঁর একটা খারাপ সম্পর্ক হয়ে গেল, প্রথম চোটেই। আমি যখন বার্ট্রান্ড রাসেলের একটা অনুবাদ ছাপতে দিলাম, উনি সেটা ছাপলেন। তখন সেটা তো আয়ুব খানের পত্রিকা ছিল। তিনি যেখানে অটোক্রেটদের কথা আছে, ডিকটেটরদের কথা আছে এগুলো বাদ দিয়ে দিয়েছেন। আমি বললাম, এটা বাদ দিলেন যে? বললেন, আমার পছন্দ হয়নি। তখন আমি খুব উদ্ধত ছিলাম। বললাম, আপনার কিসের মতামত, আপনি তো আয়ুব খাঁর গ্যাজেটের কেরানী। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ফিলোসফার এই যুগের, তাঁর লেখা আপনার বাদ দেবার অডাসিটি থাকা উচিত?”
—————————————————————-
তানিয়া অনুবাদ করে কিছু টাকা পেয়েছিলেন বটে, কিন্তু ওই টাকাতে বোধহয় তিনি কুলিয়ে উঠতে পারেননি। ফলে বার্ট্রান্ড রাসেলের বইয়ের অনুবাদকর্মটি কোনো প্রকাশককে গছিয়ে কিছু টাকা আয় করার চিন্তা তাঁর মাথায় এসেছিল। কিন্তু কোনোভাবে সেটি সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তার আগে তিনি লেখাটি দৈনিক পাকিস্তানে ছাপতে দিয়েছিলেন। দৈনিক পাকিস্তানের সম্পাদক ছিলেন কবি আহসান হাবীব। কবি সাহেব কাকার লেখা সম্পাদনা করতে গিয়ে নিজে বেকাদায় পড়ে যান। ছফা কাকা লিখেছেন:

আহসান হাবীব ভাই, উনি এটা এডিট করতেন। ভদ্রলোক খুব যত্ন করে এডিট করতেন এবং তরুণ কবিদের খুব পছন্দ করতেন। আমার সঙ্গে তাঁর একটা খারাপ সম্পর্ক হয়ে গেল, প্রথম চোটেই। আমি যখন বার্ট্রান্ড রাসেলের একটা অনুবাদ ছাপতে দিলাম, উনি সেটা ছাপলেন। তখন সেটা তো আয়ুব খানের পত্রিকা ছিল। তিনি যেখানে অটোক্রেটদের কথা আছে, ডিকটেটরদের কথা আছে এগুলো বাদ দিয়ে দিয়েছেন। আমি বললাম, এটা বাদ দিলেন যে? বললেন, আমার পছন্দ হয়নি। তখন আমি খুব উদ্ধত ছিলাম। বললাম, আপনার কিসের মতামত, আপনি তো আয়ুব খাঁর গ্যাজেটের কেরানী। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ফিলোসফার এই যুগের, তাঁর লেখা আপনার বাদ দেবার অডাসিটি থাকা উচিত? তারপরে আমি আরও একটা হিসাব করলাম। আমি যদি এই আহসান হাবীব ভাইয়ের দরবারে যাওয়া-আসা করতে থাকি, তার যে লম্বা কিউ, হয়ত ছ’ মাসে একটা লেখা ছাপা হতে পারে আমার, খুব তোয়াজ করলে। সেটা মানে তো একটা বই নয়। তার বদলে আমি যদি একজন লেখক হতে চাই, আমি যদি বাংলাবাজারের একটা প্রকাশককে পেয়ে যাই, অনতিবিলম্বে আমার একটি বই বেরোয়। (ছফা সা., পৃ. ২৮)

বাংলাবাজার থেকে বই বের করা ওই সময় হয়ত অত সহজ ছিল না। যদি সহজই হত তাহলে তাঁর অনুবাদ বইটি কোনো না কোনো প্রকাশক ছেপে দিতেন। আমরা দেখতে পাই পরবর্তীতে সেই পাণ্ডুলিপি নিয়ে তাঁকে ড. মফিজ চৌধুরীর কাছেও ছুটতে হয়েছিল। তখনও মফিজ চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়নি, এমন কি দেখাও। তবে লোকমুখে শুনেছেন চৌধুরী সাহেব খুব ভাল মানুষ। তাঁর কাছে কোনো নতুন লেখক গেলে তিনি তাদের ফিরিয়ে দেন না, যতদূর পারেন সমাদর করেন। কাকা মফিজ চৌধুরীর কাছে গিয়েছিলেন, বোধকরি তাঁর দয়াকে কাজে লাগানো ছফা কাকার খুব দরকার ছিল। তিনি তাঁর সাক্ষাৎকারে বয়ান করেছেন:

মফিজ চৌধুরী সাহেব একটা পত্রিকা বের করতেন তখন এখানে। তাঁর সাইকেল ইন্ডাস্ট্রি ছিল। বলল যে উনি নতুন লেখকদের খুব ইয়ে করেন। আমার আর কিছু নেই। বার্ট্রান্ড রাসেলের একটা ম্যানাস্ক্রিপ্ট নিয়ে তাঁকে খুঁজতে এলাম। জিপিও-র অপজিটে, বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে। …উনি আমাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলেন। ম্যানাস্ক্রিপটা যখন দিলাম বললেন, আহমদ ছফা সাহেব কে? তখন আমি এত ছোট যে বিশ্বাস করেন নাই উনি। উনি মনে করেছেন আহমদ ছফা সাহেবের ম্যানাস্ক্রিপটা আমি চুরি করে নিয়ে গেছি। তখন আমি দেখি যে সব বুর্জোয়ারা একই রকম! চলে আসছি, উনি গাড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, তুমি গাড়িতে ওঠ। গাড়িতে ওঠার পরে তাঁর ইন্দিরা রোডের বাড়ির সামনে নামতে গিয়ে দেখি পকেটে শ’য়ে শ’য়ে টাকা। তখন পাঁচ শ’ টাকার নোট চালু হয়নি; সব এক শ’ টাকা। আমি ভাবলাম, আমি পরীক্ষা দেব টাকা নেই, আর এই লোক পকেটে এত টাকা নিয়ে যাচ্ছে। গাড়িটা যখন গেটের কাছে থেমেছে ম্যানাস্ক্রিপটা রেখে পকেট থেকে এক শ’ টাকা যতগুলো পেয়েছি নিয়ে বললাম যে ম্যানাস্ক্রিপ্ট জমা রইল আমি টাকাটা নিয়ে যাচ্ছি। তখন উনি আমাকে ডাকলেন। আমি খুব দূরে দূরে, যেন পিস্তলের রেনজের মধ্যে না পড়ি; শুনেছি ধনী লোকদের কাছে পিস্তল থাকে! আস তোমাকে কিছু বলব না। আমি বললাম যে, না, আমি ওখানে ম্যানাস্ক্রিপ্ট রেখেছি, ওটার দাম দশ হাজার টাকা। তখন তাঁর স্ত্রী বেরিয়ে এলেন। স্ত্রী বেরিয়ে এসে ডাকলেন, আস, একবেলা খাওয়াই তোমাকে। আমার কেমন জানি বিশ্বাস এল। তারপর তাঁর সঙ্গে বাড়িতে খেলাম। এবং টাকাও আমার কাছে চাইলেন না আর। পরীক্ষা যখন পাশ করে গেলাম, ভাল রেজাল্ট করলাম প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে, তখন তাঁর কাছে টাকা দিতে গেলাম। বললেন যে এগুলো কর্জে হাসানা। তার পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর সঙ্গে এই যোগাযোগটা তৈরি হল। (ছফা, সা., পৃ. ২৮)

একটা কথা বলে রাখা দরকার। কাকা যখন Sceptical Essays অনুবাদ করেন ওই সময় বার্ট্রান্ড রাসেলের সঙ্গে তাঁর একটা সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। রাসেলের সঙ্গে কাকার পত্র যোগাযোগ ছিল। বার্ট্রান্ড রাসেলের দু’খানা চিঠি আমি ছফা কাকার জীবদ্দশায় দেখেছি। ছফা কাকা মারা যাবার পর চিঠি দু’টি অনেক খোঁজ করেছি, হদিস পাইনি। হয়ত বাড়ি পাল্টানোর সময় অথবা অন্য কোনো কারণে চিঠিগুলো হাতছাড়া হয়ে গেছে।

(কিস্তি ৫)

nurulanwar1@gmail.com

free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অনুপ বিশ্বাস — নভেম্বর ১৫, ২০০৯ @ ২:১৫ পূর্বাহ্ন

      ভালো লাগলো, পরবর্তী কিস্তির জন্যে অধীর অপেক্ষায় রইলাম। প্রতিটি কিস্তি প্রকাশিত হওয়ার পর যখন তন্ময় হয়ে পড়তে শুরু করি, তখনই দেখি লেখা শেষ, ধারাবাহিক লেখার এই এক অসুবিধা। দুই কিস্তির মাঝখানের সময়ের ব্যবধান ভালোলাগার ছন্দপতন ঘটায়।

      অনুপ বিশ্বাস
      mr.biswas83@yahoo.com

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন খান আহমেদ তানভীর — december ১৯, ২০০৯ @ ৩:০৩ অপরাহ্ন

      খুবই ভাল লাগল। ছফা একটি প্রতিষ্ঠান, যে যাই বলুক। আমার মতে ছফা একজন দার্শনিক। নূরুল আনোয়ার, আপনার কাছে এ রকম আরো লেখা চাই।

      – খান আহমেদ তানভীর

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সৈয়দ আলি — december ২২, ২০০৯ @ ১:০০ অপরাহ্ন

      নূরুল আনোয়ারের রচনাভঙ্গী এলোমেলো এবং সরল। আর এটিই সম্ভবত আহমদ ছফাকে সবচাইতে বেশি উদ্ভাসিত ও প্রকাশিত করেছে। একজন প্রকৃত প্রতিভাবান মানুষ গ্রাম্য হাটের পাইকার হন না। তাঁর যা আর্থিক প্রয়োজন তা পেলেই তিনি তাঁর রচনার আর্থিকমূল্য পেয়েছেন বলে সন্তুষ্ট হয়ে পড়েন। এইসব প্রতিভাবানদের প্রধান চরিত্র হয় তাঁদের সৃষ্টিকে প্রকাশ করা এবং সে সৃষ্টি যে সর্বকালের শ্রেষ্ট সৃষ্টি এ বিষয়ে তাঁর কোনোই সন্দেহ থাকে না।

      – সৈয়দ আলি

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাব্বির হোসাইন — আগস্ট ১৩, ২০১৪ @ ৬:২১ পূর্বাহ্ন

      গুরু ছফার উপর লেখা চমৎকার জীবনী।
      লেখককে ধন্যবাদ।

      -সাব্বির হোসাইন।
      আহবায়ক সদস্য, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি (চট্টগ্রাম)।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com