রৌরব (কিস্তি ১২)

লীসা গাজী | ৭ নভেম্বর ২০০৯ ৮:৫০ অপরাহ্ন

শুরুর কিস্তি

(কিস্তি ১১-এর পর)

rourob-12.jpgদরজা উড়িয়ে নিয়ে যাবে এমন, ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে এমন। তারপর এক সময় সমস্ত ঝড় ঝাপ্টা থেমে যায়। শান্তি! লাভলি দুই পায়ের গোড়ালি দিয়ে চেয়ারটা কিঞ্চিৎ পিছনে ঠেলে দেয়। কাজের কাজ কিছুই হয় না চেয়ারটা একদিকে শুধু সূঁতাখানেক সরে যায় আর বিউটির চুল ওর কনুইয়ে এসে লাগে। নরম মসৃণ চুল। সান সিল্কের ভালো বিজ্ঞাপন হতে পারতো, ভাবে লাভলি। একবারও বিউটির দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দেয় না। এক সময় টের পায় মাথার পিছনে টিউব লাইটের হলদে আলো অসহ্য তীব্রতায় গলে গলে পড়ছে—দেয়াল চুঁইয়ে চটচটা গলন্ত আলো চুল পোড়া গন্ধে লাভলির দিকে গড়িয়ে আসে। লাভলি অনেকক্ষণ বুঝতেই পারে না পায়ের নিচে চটচট করছে কী। বাম পায়ের বুড়া আঙুলে ঠাণ্ডা ধাতব-তরল স্পর্শের সাথে সাথে গা গুলিয়ে ওঠে ওর। সেই তরল দারুণ নিষ্ঠায় দুই পায়ের পাতা ছুঁয়ে থাকে। গা ঘিনঘিন করে ওঠে ওর, নাকের ডগা ইষৎ কুঁচকে যায়—কেমন অসহায় লাগে লাভলির। এই মুহূর্তে পানির খুব দরকার ছিলো।
—————————————————————–
পরবর্তী চুয়ান্ন মিনিট একইভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে লাভলি; আর ওর সমগ্র বেঁচে থাকা চুয়ান্ন মিনিট ধরে ওকে ঘিরে পাক খায়। পাকটা পায়ের পাতা থেকে চক্রাকারে মাথার দিকে ধাবিত হয় কিন্তু তালু পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না, গলার কাছে এসে চেপে ধরে। দমটা যখন প্রায় বেরিয়ে যাবে যাবে অবস্থা ঠিক তখনই বেমক্কা ছেড়ে দেয় তারপর পাক খেতে খেতে আবার নিচে নামতে থাকে। তারপর আবার উপরে তারপর নিচে তারপর উপরে, নিচে, উপরে…
—————————————————————-
বিউটির দিকে তাকিয়ে থাকে অল্পক্ষণ অথবা বহুক্ষণ। বাতাসে ঝুলতে থাকা বিউটির হাত আলগোছে টেবিলের উপর রাখে। ডাল বাটার গুণাগুণ টের পায়। কী শান্ত ভঙ্গিতে টেবিলের উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। খুব আদর লাগে লাভলির।

যথেষ্ট পারঙ্গমতার সাথে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। মাথা একটুও টলে না, হাত দু’টা নিয়ে অবশ্য মুশকিলে পড়ে যায়। শুরুতে শরীরের দুই পাশে লম্বালম্বি ঝুলতে থাকে, পরক্ষণেই ডান হাত বুকের কাছে উঠে আসে। ডান হাতের দেখাদেখি বাম হাত একই কাজ করতে গিয়ে বিপদে পড়ে যায়। বুকের ধড়ফড়ানি এমন হাস্যকর রকম বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে বেচারা হাত দু’টা সেখানে স্বস্তি পায় না। লাভলি ভাবে এই দু’টাকে কোমড়ের উপর রাখবে। তাহলে বেশ একটা সটান ভাবও আসবে, এই মুহূর্তে ভাবটাই জরুরি। কিন্তু কিছুতেই পারা যাচ্ছে না—হাত দু’টা কোমড়ের উপর রাখছে আর পিছলে পড়ে যাচ্ছে। চারবারের মাথায় হাল ছেড়ে দেয় ও, শেষমেশ দুই হাত পিছনে নিয়ে ডান হাতের মুঠিতে বাম হাতের তর্জনি এবং মধ্যমা শক্ত করে ধরে থাকে। পরবর্তী চুয়ান্ন মিনিট একইভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে লাভলি; আর ওর সমগ্র বেঁচে থাকা চুয়ান্ন মিনিট ধরে ওকে ঘিরে পাক খায়। পাকটা পায়ের পাতা থেকে চক্রাকারে মাথার দিকে ধাবিত হয় কিন্তু তালু পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না, গলার কাছে এসে চেপে ধরে। দমটা যখন প্রায় বেরিয়ে যাবে যাবে অবস্থা ঠিক তখনই বেমক্কা ছেড়ে দেয় তারপর পাক খেতে খেতে আবার নিচে নামতে থাকে। তারপর আবার উপরে তারপর নিচে তারপর উপরে, নিচে, উপরে…

চুয়ান্ন মিনিটে লাভলির জন্ম হয়, ওর তিন বছর বয়সে এক মাথা চুল নিয়ে বিউটির জন্ম। কী ফর্সা! সকাল বেলা পর্দা টানা অন্ধকার ঘরে হঠাৎ রোদের আলো যেমন বেআরাম, তেমনটা। ঘরের বাইরে ফরিদা খানমের চাবি ঘুরাবার শব্দ, বিউটির চুলে ডিমের গন্ধ, দরজা খুলে হুড়মুড় করে ছাদে ঢোকা, গানের তালে মুখলেস সাহেবের হালকা দুলুনি ‘কাভি কাভি মেরা দিল মে খায়াল আতা হ্যয়…।’ আর রিয়াজ, আর লাল মাফলার আর মাথার ভিতরের লোকটা।

মাথার ভিতরের লোকটাকে লাভলি ওর পুরা শরীরে আতিপাতি করে খোঁজে, একবার ফিসফিস করে ডাকেও, ‘আপনে আছেন, শুনতেছেন?’ লোকটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। একদিন যেমন স্বেচ্ছায় এসেছিলো তেমনি স্বেচ্ছায় চলে গেছে। প্রথম ধাক্কায় খুব মন খারাপ লাগে পরে একটু বিরক্তই হয়—আজকের রাতটা অন্তত থেকে যেতে পারতো!

লাভলি আর দাঁড়িয়ে থাকে না, ঘরের দরজা খুলে বাইরে আসে। দরজার ফাঁক গলে যা একটু আলো খাবার ঘরে এসে জুটেছে নইলে জায়গাটা বেশ অন্ধকার। জিরো পাওয়ারের বাতি অবশ্য একটা জ্বলছে। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকায়। নিজের ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে ভালো লাগে, অন্যরকম একটা ভরসা হয়, নাহ্ ভয়ের কিছু নাই! খুব সতর্কতার সাথে লাভলি ওর শোবার ঘরের দরজাটা ভিড়িয়ে দেয় তারপর ফরিদার ঘরের দিকে ফেরে। এক কী দু’পা এগিয়েও যায় আবার ফিরে আসে, রান্নাঘরের দরজার কাছে কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকে, বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়।

এখন লাভলি ফরিদা খানমের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে খুব আস্তে টোকা দিচ্ছে, একটা নির্দিষ্ট ছন্দ অনুসরণ করছে। টকটক টকটকটক টকটক।

খুট করে দরজা খুলে যায়। ফরিদার ঘরেও জিরো পাওয়ারের আলো জ্বলছে। কারো মুখই ঠাহর হয় না। ফরিদা প্রথমে বুঝতে পারেন না কে, কথা বলতে গিয়ে আবিষ্কার করেন গলা দিয়ে যথেষ্ট স্বর বের হচ্ছে না।

—কে? কী? এতো রাতে কী লাভলি?… ঘুমাইতে যা।

—আজকে রাতরে আর ঘুম হবে না আম্মা।

—না হইলেও শুয়ে থাক। যা।

—বাগানের কোদালটা কী সিঁড়ি ঘরে আছে? চাবিটা দেন।

—হ্যাঁ?

—বিউটিরে মাইরা ফেলসি আম্মা। আপনের আসতে লাগবে না, আমি একাই পারবো।

(শেষ)

রচনাকাল: ২০০৮, লন্ডন

অলঙ্করণ: রনি আহম্মেদ

leesa@morphium.co.uk

free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মনসুর-উল-হাকিম — নভেম্বর ৮, ২০০৯ @ ১২:২১ অপরাহ্ন

      লীসা গাজীকে অনেক ধন্যবাদ সুন্দর একটি উপন্যাস লেখার জন্য। বারো মাসের কম সময়ে বারো কিস্তির লেখা। একটু বোধহয় তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। অন্তত একটি চরিত্রকেও “রৌরব” থেকে বাঁচানোর চেষ্টা থাকলে ভালো হত। আরেকটু জীবন ঘনিষ্ঠ মনে হত। ভবিষ্যতে আরো সুন্দর লেখা আশা করছি। জয়তু লীসা।

      – মনসুর-উল-হাকিম

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com