কিস্তি ৩

এডওয়ার্ড সাঈদের সাথে সংলাপ / তারিক আলী

হোসেন মোফাজ্জল | ৭ নভেম্বর ২০০৯ ২:১৩ অপরাহ্ন

কিস্তি ২
null
শিকাগোতে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সিনেটর বারাক ওবামার সঙ্গে প্রফেসর সাঈদ; সঙ্গে মিশেল ওবামা ও মরিয়ম সাঈদ; মে ১৯৯৮; ছবি: আলী আবুনিমাহ

অনুবাদ: হোসেন মোফাজ্জল

(কিস্তি ২-এর পর)

আপনি ইংরেজী সাহিত্যের সাথে কী ভাবে জড়িয়ে গেলেন, আর কী ভাবেই বা সেটা আপনার প্রবল অনুরাগে পরিণত হলো?

আমার তো মনে হয় এটা একটা দুর্ঘটনা। মানে শিশু বয়সে আমি অনেক বই পেয়েছি। আমি ছিলাম একলা একটা শিশু, যার ফলে আমি সহজে যেসব বইগুলোতে গলে যেতে পারতাম তা হলো ইংরেজী উপন্যাস, প্রথম যা আমি পড়েছিলাম সেটা হলো রবিনসনস্ ক্রুশো, বইটা পড়ার ব্যাপারটা আমার খুবই ভাল ভাবেই মনে আছে, চমৎকার একটা সচিত্র সংস্করণ ছিল সেটা, এবং আমি যখনই শুরু করতাম শেষ না করে উঠতাম না। চৌদ্দ বছর বয়সের মধ্যে আমি স্কট এর মেলা বই পড়ে ফেলি—হতে পারে আমি স্কট এর সবগুলো বইই পড়ে ফেলেছিলাম, অতটা মনে করতে পারছি না—আমি সবসময়ই পড়তাম, আর পড়তাম মূলতঃ উপন্যাস, যাই হাতের কাছে পেয়েছি।

মজার ব্যাপার হলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সে সময় খুব সামান্যই নজর দেয়া হতো উপন্যাস পড়ার ক্ষেত্রে। যে কারণেই হোক না কেন স্কুলে তেমন কোনো উপন্যাস আমি পড়ি নি। মনে আছে শেক্সপিয়রের নাটক-কবিতা পড়েছি, কিন্তু তেমন কোনো মহা উপাখ্যান পড়ি নি যা আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার বলে মনে হতে পারতো। তারপর আমি অন্য ভাষার অনুবাদগুলো পড়তে শুরু করি, জর্মন এবং ইতালি ভাষায়, যে ভাষাগুলো আমি পরবর্তী জীবনে শিখেছি—যা কি-না সারা জীবনের জন্যে আমার সাথেই রয়ে গেছে।

আপনি কখন সিদ্ধান্ত নিলেন এরকম একটা ক্ষেত্রে আপনি বিশেষজ্ঞ হবেন?

ওহ্, হতে পারে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মাঝামাঝি সময়ে এসে, প্রিন্সটনে আমি কিন্তু শুরু করেছিলাম প্রি-মেডিকেল স্টুডেন্ট হিসেবে। আমি মেডিসিন পড়তে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি নিয়েছিলাম অনেকগুলো সাহিত্য বিষয়ক কোর্স। এবং তৃতীয় বর্ষের শুরুর দিকে আমি পুরোপুরো সাহিত্য পাঠে মনোনিবেশ করি। মূলতঃ উপন্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়ি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বছরটায়, মানে ১৯৫৭ সালে যখন গ্র্যাজুয়েট শেষ করি, আমি নিশ্চিত যে আমি গ্র্যাজুয়েট স্কুলেই পড়াবো। যদিও সাহিত্যের প্রফেসার হবার মতো আমার কোনো বাস্তব ভাবনাই ছিল না। আমি স্রেফ চেয়েছিলাম পড়তে। আর তাই করেছি।

আপনি কোনো রুশ উপন্যাস অনুবাদ পড়েছেন কি?

জ্বী। আমি পড়েছি। আমার মা আমাকে পরিচয় করে দিয়েছিলেন। তিনি তলস্তয় এবং দস্তয়েভ্‌স্কির সমঝদার ছিলেন, এবং এ দুজনকেই সবচে বেশি পড়েছি আমি। তূর্গেনিভ অতটা পড়ি নি, যাও পড়েছি অনেক পরে। আমাদের বাড়িতে তলস্তয় এবং দস্তয়েভ্‌স্কির উল্লেখ্যযোগ্য রচনাগুলো ছিল, আমার উঠতি বয়সে আমি ওদের উল্লেখযোগ্য কাজগুলো পড়ে ফেলেছিলাম। আমার খুব স্পষ্ট মনে পড়ে যখন আমার মধ্য টিনয়েজ, আমার মা আমাকে আনা কারিনিনা পড়তে দিয়েছিলেন।

পরবর্তী সময়ে আপনি এদের কাছে আবার ফিরে এসেছিলেন কি?

সিনিয়র স্টুডেন্ট হিসেবে আমাকে আবার এসব পড়তে হয়েছে। আবার সবগুলো বই পড়তে হয়েছে, সত্যি বলতে কি একই সাথে এখানে এবং হার্ভাড গ্র্যাজুয়েট স্কুলের বিভিন্ন মানবিক বিভাগের কোর্সে আমাকে আবার সেসব পড়াতেও হয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো কেউ যখন একটা বই দ্বিতীয় বারের মত পড়েন তখন আগের পড়ায় আপনি কতটুকু ধরতে পারেন নি বলে আপনার মনে হয়েছে।

কিম্বা হয়তো আপনি কতটুকুই বা ধরতে পেড়েছিলেন! আসলে আমি দুটোই দেখতে পেয়েছি। দ্য ব্রাদার্স কারামাযোভ-এর কত কিছুই না আমার মনে এখনও স্পষ্ট আচড় কেটে আছে। কত বিভিন্ন কিসিমের অ্যাকশন, বিশেষ করে তলস্তয়ের পুরোপুরি শারীরিক অ্যাকশনগুলো, যেমন ধরি আনা যখন ট্রেনে যাচ্ছে তার বর্ণনাগুলো, তার ছোট লাল রংয়ের ব্যাগটার কথা ইত্যাদি ব্যাপারগুলো আমি কখনও ভুলতে পারবো না। আবার উল্টো দিকে উপন্যাসের জটিল সামাজিক এবং নান্দনিক প্যাটার্নগুলো হয়তো একজন ধরতেই পারেন নি। কিšত্ত আমি সব সময়ে যে তীব্র ক্ষুধা নিয়ে পড়েছি সেটা হলো প্লট আর গল্পের জন্যে। বলতে গেলে তথ্যের জন্যে।

তিনজন লেখক আপনার কাছে বিরাট কিছু মনে হয়েছে, এবং যাদের নিয়ে আপনি লিখেছেনও মেলা—কনরাড, কিপলিং এবং কামু—এরা সবাই ছিলেন আউটসাইডার, এমন একটা সমাজ নিয়ে ওনারা লিখেছেন যেখানে তারা এসেছেন বিভিন্ন প্রয়োজনে, এটাকে কি কাকতালীয় বলব?

আমার তেমনটাই মনে হয়। সে সময়ে এ নিয়ে আমি তেমন সচেতন ছিলাম না। প্রথম লেখকের যে বইটি আমি পেয়েছি এবং পড়েছি—যা আমি বাল্যকালে পড়েছি, সেটা হলো—দ্য জাঙ্গাল বুকস্, কিন্তু বইটা পড়তে যেয়ে আমার একটা বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, কারণ আমি আমার স্কাউট জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে বইটাকে গুলিয়ে ফেলেছিলাম, আমার স্কাউট জীবনও ছিল আবার বড় রকমের অপরাধে ভরা। আমি ছিলাম মিশরের ইংলিশ স্কাউট। সবসময় যে কি-না আবার শাস্তি পেত।

কায়রোর এক ইংলিশ বয় স্কাউট—

কায়রোর এক ইংলিশ বয় স্কাউট, আলবৎ ঠিক! আমার মনে আছে লেডি ব্যাডেন পাওয়েল মাঝে মাঝে আমাদের ভিজিট করতে আসতেন, জাম্বুরী ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি সবগুলো মেরিট ব্যাজে গোল্লা মারি। আমি সব সময়ই শাস্তি পেতাম আর আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো সবার বাইরে। আমার মনে নেই কীসের কারণে এমনটা ঘটত, তবে মনে পড়ে বেশির ভাগ সময়ই আমাকে যা করতে দেয়া হতো তার কিছুই সঠিক ভাবে আমি করতে পারতাম না। আমার মনে হয় এটাকেই আমেরিকান ভাষায় বলা হয়—আই হ্যাড অ্যান অ্যাটিচ্যুড প্রবলেম! আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারতাম না আমি ওখানে আসলে কী করতে এসেছি। অবশ্যই আমার বাবা যিনি আমার স্কাউট হবার ব্যাপারে খুবই উৎসাহী ছিলেন, মুগলি এবং আর যেসব জঙ্গলের বিষয়গুলো ছিল তার সবই এর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। স্কাউটিং এ আমি তেমন কোনো আনন্দ পাই নি কারণ যা আমাকে আরও অনেক কিছুর কথা মনে করিয়ে দিত। পরে আমার চোখ খুলে যায় যখন আমি ঔপন্যাসিক হিসেবে কিপলিংকে পড়ি, বিশেষ করে কিম্, আমার প্রিয় বইগুলোর একটি। কিন্তু কনরাড হচ্ছে প্রথম সারির একজন যার ভেতরে আমি ডুবে যেতাম। মনে হয় আমার বয়স সতেরো বা ষোল আমি তখন হার্ট অব ডার্কনেস পড়ি। আমি কনরাড সম্পর্কে কিছুই জানতাম না. এবং অবাক যে আমি তার ব্যাকগ্রাউন্ড কী তাও জানার চেষ্টা করি নি, এমন কি পাঁচ ছয় বছর পরেও। কিন্তু হার্ট অব ডার্কনেস আমাকে পরাভূত করে ফেলে, আমি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ি এবং উনার গদ্যকে গ্রহণ করি।—যা কি-না অবশ্যই কোন ইংরেজী না—আমি কখনই বিশ্বাস করি না কনরাড ইংরেজিতে লিখেছেন। এবং আমি সেটা সত্য হিসেবেই গ্রহণ করেছি। আমি যতই পড়তে থাকি ততই কনরাডকে আবিষ্কার করতে থাকি, বিশ কিম্বা হতে পারে একুশ বছর বয়সে আমি সত্যিকার অর্থেই তার সবগুলো লেখা পড়ে ফেলি—তারপর থেকেই আমার মনে হয়েছে আসলে তিনি ইংরেজ ছিলেন না, ছিলেন বাইরের লোক। আমি উনাকে আমার সাথে গুলিয়ে ফেলতে চাইছি না, তবে তিনি অবশ্যই আমার অনেক গভীর জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়েছেন যেসব তার মত আমিও ভাবতাম।

কিšত্ত এডওয়ার্ড, আপনি কেন বলছেন যে তিনি ইংরেজীতে লিখেন নি?

বটে, একটা কিছু ছিল… মানে, এটা আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমাদের জগতের এই অংশে যেসব লোকজন যারা ইংরেজীতে লেখালেখি করেন তাদের। ইংরেজরা যেরকমটা ইংরেজি লেখেন সে রকম না, তাই না? ঘাওরা টাইপের আর কি, বাক্যগুলো ঢের লম্বা… প্রথম তো আমার মনে হয়েছিল বোধহয় ফরাসী থেকে কোনো অনুবাদ—আমি বিশ্বাসও করতাম তাই—

আসলেই?

জ্বী, আপনি যদি তার কয়েকটা কাঠামো দেখেন যেগুলোতে তিনি বারবার ফিরে এসেছেন, লম্বা লাইন গুলো… প্রুস্তীয়! তার গদ্যে একধরনের প্রুস্তের গুণাবলী পাবেন। পয়েন্টে না পৌঁছার অক্ষমতা! মানে এটা একটা কমিকের মত। ফর্স্টার এটা নিয়ে মজাও করেছেন—বেশি বেশি বিশেষণ, ভূরি ভূরি—জেমস্, এরা সবাই উনাকে নিয়ে একধরনের ঠাট্টাই করতেন আবার একই সাথে তার প্রশংসাও করতেন। বুঝতে হবে ‘সরাসরি বক্তা’ জাতীয় একটা কিছু তিনি নিশ্চিত উওরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন ফিল্ডিং, দোফো হয়ে ডিকেন্সের থেকে, আসলে তেমনটি না, তিনি তেমন বৈশিষ্ট্যের বা ধাঁচের ছিলেন না। কনরাড, তিনি যে ভাষায় বলতেন সেটা আসলে বাইরের ভাষা, তাকে যেদিন আমি পড়ি সেই প্রথম দিন থেকে আমাকে বিষয়টা আঁচড় কেটেছে।

উপন্যাস যেমন ধরেন দ্য সিক্রেট এজেন্ট, যা বেশ মজার, আবার বেশ রক্ষণশীলও—

ভয়ানক। তার রাজনীতিও জঘন্য! আসলে যে সব উপন্যাস সাম্রাজ্য নিয়ে আবর্তিত হয়নি সে সব আমার কাছে খুব সামান্যই মজা লেগেছে। দ্য সিক্রেট এজেন্ট এবং আন্ডার ওয়েস্টার্ন আইস্, যে গুলোতে তার বড় রকমের প্রভাব পড়েছে—আবার একই সাথে যাকে তিনি প্রতিহতও করেছেন—তিনি হলেন দস্তয়েভস্কি। কিন্তু দ্য সিক্রেট এজেন্ট, আমি সব সময় ভেবেছি এটা একধরনের দায়িত্বসম্পন্ন নভেল।

যা হয়তো তার পাঠকদের স্বস্তি দেয়—

সন্তুষ্ট করে, হ্যাঁ, তিনি আসলে বেকুব ইউরোপিয়ানদের নিয়ে মজা করেছেন। কিন্তু ব্যাপারটায় আমি কখনই সমঝে উঠতে পারি নি। আমার মনে হয়েছে তিনি যখন তার স্মৃতি থেকে লিখেছেন তখনই তিনি সবচে ভাল করেছেন। আর কনরাডের স্মৃতি বলতেই তো—বিদেশের। পূর্ব এশিয়া, আফ্রো আমেরিকার এবং আফ্রিকার।

কিপলিং ছিলেন বিভিন্ন কারণেই আউটসাইডার, বড় একটা কারণ হচ্ছে তিনি বাইরে থেকে অনুপ্রবেশ করেছেন, বৃটিশ রাজ, এবং আবার এটাও মনে হয়েছে যখন আমি টিনয়েজ-এ কিম পড়ি, সবকিছু বাদ দিয়ে আমি তার অ্যাডভেঞ্চারটাকেই ভালবাসি, অনেক বছর পরে যখন আমি বইটা আবার পড়ি তাকে আরও বেশি তারিফ করি। এ বইটা আপনার কাছে কেমন আবেদন তৈরি করে?

প্রথম যখন আমি কিম পড়ি, তখন আমি একেবারে পিচ্চি। আর কিম-এর সবচে যেটা আমাকে বেশি মজা দিয়েছে সেটা হলো ছদ্মবেশী সাজাটা। সে কোন সাজটাই বা নেয় নি। বিশেষ করে কিম। কিম হচ্ছে উজবুক প্রকৃতির ছেলে, আইরিশ পোলা (আমি ধারণা করেছিলাম সে হয়তো ইংরাজ, যদিও আমি কোন ফারাক খুজেঁ পাই নি: সে হয়তো ইউরোপীয়)। সে গোয়েন্দা, সে সাদা আদমি হিসেবে, আবার ভারতীয় হিসেবেও ঘুরতে পারতো। আমার মনে হয়েছে কিম একটা বিরাট ট্রাভালগ, আসলেই তাই, আর সেটা হলো পুরো ভারত ঘুরে বেড়ানোর এমন একটা ভাব যেন “এটা আমাদের ” (মানে বৃটিশদের) আবার পাশাপাশি এটা ভারতীয়দের। বইটার ভেতরে শেয়ারিং করার মত একটা ব্যাপার আছে, উপনিবেশ অব¯হাকে ব্যাখা করার ক্ষেত্রে অদ্বিতীয় একটা কাজ বলে আমি মনে করি। আমার মনে হয় কিপলিং একমাত্র লোক যে কি-না সেটা অর্জন করছেন। যথেষ্ট রকমের প্রেমও ছিল সেখানে—আমি পেয়েছি। এবং এটা এমন একটা চমৎকার উপন্যাস, আমি কী ভাবে যে বলব, ঠিক পুনর্জন্ম এভাবে বলা যাবে না, কিšত্ত নবজন্মলাভ তো বটেই। এটা হচ্ছে পতিত আকাঙ্ক্ষার পুনপ্রাপ্তি আর কিম হচ্ছে সেই ছেলেটা যে কি-না তারই একটা অংশ।

ভারতকে নিয়ে তার লেখাগুলোতে আপনি কী পান, তার ছোট গল্পগুলোতে, তিনি কি সত্যিকারেই জায়গাটাকে পছন্দ করতেন—

জ্বী, তিনি পছন্দ করতেন।

এবং সেখানেকার লোকজনদের—

সেখানকার লোকজনদেরও। এবং তিনি চমৎকার ভাবে সেখানকার বিভিন্ন মনুষজনদের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরতে পারতেন। কিশোরদের এবং বয়স্কদের তিনি চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। যদিও আমি অতটা নিশ্চিত না তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের বেলায় কতটা ভাল করছেন—

না, কিছু কি বাদ পড়লো. . .

কিছু একটা বাদ পড়েছে, তবে নিশ্চিত ভাবে বলা যায় কিশোর এবং বয়স্করা ভালভাবে এসেছে। এমন একটা কিছু তার বেলায় স্বীকার করে নেয়া যায়। আমার মনে হয়েছে আমি যে ভাবে কায়রোকে মনে করি তিনিও সেরকম ভাবেই ভারতকে মনে করতেন: যদিও আমি মিশরীয় ছিলাম না। আমার মনে হয় কি, আমি ওখানে থাকতেই পারতাম রাজনীতি নিয়ে অতটা না ভাবলেই চলতো। অবশ্যই এটা ঠিক আপনি যতো বেশি করে তাকাবেন ততই টের পাবেন রাজনীতি সেখানে কী পরিমাণ ভূমিকা রেখেছে, আর তিনিও তো একটা ব্যব¯হারই অংশ ছিলেন, ইত্যাদি। তারপরও সাধারণভাবে বললে কি আপনি কিপলিং পাঠ করতে পারবেন যদি নির্দিষ্ট কিছু পরিমাণে রাজনীতির মত ব্যাপারগুলো ভুলে থাকতে পারেন, কারণটা হচ্ছে সেখানকার লোকজনদের প্রতি তার ভালবাসা।

যে কণ্ঠ তিনি ফিরে পেয়েছেন! এটা কার্যত প্রায় নজিরবিহীন—

নজিরবিহীন। আমি আর কাউকে মনে করতে পারি না… গল্পের বিভিন্ন স্তরের চরিত্রগুলো এক কথায় বলা চলে লা জবাব, আপনি কি জানেন, এটা আসলে ডিকেন্সীয়। আপনি এরকম মর্ম উদ্ধার আর কোথাও করতে পারবেন না, যেমনটি আপনি কনরাডে পারবেন। এমন একটা মৌলিক ব্যাপার সেখানে রয়েছে যাকে বলা যেতে পারে মানব প্রকৃতি। কিপলিং-এ আপনি কোনো উপলব্ধিই পাবেন না। আপনার এমন ধারণা হবে তিনি যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন। তিনি যে কোনো মাত্রায় সেটা করতে পারবেন। এটাই হলো তার বিশালত্ব।

এডওয়ার্ড, তার লেখা অভারতীয় বইগুলোয় কিন্তু তিনি ঠিক সেরকমটা অর্জন করতে পারেন নি, তাই না?

না, দ্য লাইট দ্যাট ফেইলড্-এর মত কিছু একটা যদি ভাবেন সেখানে হয়তো সেন্টিমেন্টাল কিছু পাবেন এবং তার ব্যক্তিগত কিছু লেখাতেও হয়তো… যদিও আমি অনেক বেশি পেয়েছি ওর অটোবায়োগ্রাফিতে—

যার অনেকটাই হৃদয়স্পর্শী

মুভিং, এবং নিজের ব্যাপারেও তিনি অনেক পরিষ্কার। এবং আপনি দেখতে পাবেন তার বেবাক আজিব সংশয়, ঘোরপ্যাঁচ। তিনি ছিলেন জটিল এবং আস্বাভাবিক রকমের একটা মুশকিলে লোক। তার পদ্যগুলো… আমার মনে হয় না যা নিয়ে অনেকে বড় কিছু একটা ভাবেন। যার অনেকগুলো আমি বাল্যকালে পড়েছি, ডিটিস, ব্যালাড এবং ডগিরেল। আমার মনে হয় এলিয়ট কনরাডের কবিতার বদলে তার পদ্যের উল্লেখ করেছেন। একটা পর্যায় পর্যন্ত, কনরাডের মত, বিশেষ করে তার বড় কাজগুলোতে যেমন ধরুন কিম-এর মধ্যে একধরনের অপ্রত্যাশিত ভাবে প্রাপ্তির একটা ভাব রয়েছে। এটাই একমাত্র নভেল। আর ক্যাপ্টেন কারেজিয়াসকে তো সেই অর্থে কোনো নভেলই বলা যায় না।

যদিও যে সময়টাতে তিনি লিখেছেন খুবই জনপ্রিয় ছিলেন, তার বইয়ের হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়েছে, তাকে গোর দেয়া হয়েছে ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবি তে—তবুও দূরে তাকালে দেখতে পাই, সাধারণ ডমিনেন্ট সংস্কৃতি হিসেবে ইংরেজী সাহিত্যে তাকে কখনই জোরাল কণ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয় নি।

না, কারণটা মনে হয় তিনি ছিলেন একধরনের শরমের ব্যাপার। একটা কারণ হচ্ছে তার ঔপনেবিশক ব্যাকগ্রাউন্ড। আরেকটা কারণ হচ্ছে কিপলিংকে নিয়ে বলাটা আসলেই দুরূহ ব্যাপার, বিশেষ করে তার উপন্যাসগুলো নিয়ে, ইংরেজী বাস্তবতা রক্ষণে তার অবদান কতটুকু। তিনি কখনই স্থির ছিলেন না যেমনটা দেখবেন জেইন অস্টিন বা এমন কি ডিকেন্স-এর বেলায়। স্থানীয় ব্যাপারগুলো নিয়ে তার কোনো স্থিরতা ছিল না। এসব নিয়ে তিনি পরোয়া করতেন না। সত্যি বললে তিনি থাকতেন এসবের উল্টো দিকে। তার লেখায় একধরনের উন্মূলতা লক্ষ্য করা যাবে, যা কি-না খুবই খেলোয়াড়সুলভ, কিপলিং-এর ক্ষেত্রে এসবই তাকে কানুনের বাইরে রেখেছে এবং সহজ শ্রেণীকরণের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। আমার মনে হয়েছে সামাজিক শ্রেণীর মধ্যে পার্থক্য তৈরিতে তিনি তেমন কোনো আগ্রহী ছিলেন। যার কিছুটা কারণ হচ্ছে তার ভারত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা, যা আপনি কিম-এর মধ্যে পাবেন, একটা রুমের মধ্য থেকে লোকজন যাচ্ছে আবার বেরুচ্ছে, বাইরে—

সব কিছুই অস্থির—

সবকিছুই অস্থির, এবং আমার মনে হয়েছে এটাই শ্রেণীকরণে একধরনের বাধা সৃষ্টি করছে।

মজার ব্যাপার জীবনের শেষ বছরের প্রায় পুরোটাই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছিলেন।

বেশ, এটা একটা ক্রেজি জায়গা (হাসি)। তিনি হয়তো পছন্দ করতেন। কারণটা বের করা যায় নি।

সাম্প্রতিক ফ্রান্সে কামুকে নিয়ে বড় একটা বিষয় উদঘাটিত হয়েছে। একটা অসমাপ্ত নভেল, এখন প্রকাশিত হয়েছে এবং মেলা প্রশংসাও কুড়িয়েছে, আচানক একটা ব্যাপার এখন আমরা যে সময় অতিক্রম করছি সেই সময়ের স্পৃহাটিকে একটা বিপরীত স্টাইলে তুলে ধরেছেন। যিনি ফ্রান্সে পুনরায় বড় রকমের কাল্ট হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এটাকে আপনি ব্যাখ্যা করবেন কী ভাবে?

আমি তাকে কখনও অন্য কিছু না ভাবলেও অšতত কাল্ট হিসেবে ভাবি নি। নিশ্চিত ভাবে তিনি হয়তো এখানে বিবেচিত হন কাল্ট হিসেবে। সাধারণত পশ্চিমে। তিনি যুক্ত করেছেন উদভাবনাময় বিবেকের, একাকিত্বের, একজনের দুরূহতাকে এবং এর সাথে যুক্ত করেছেন ইউরোপীয় দার্শনিকতাকে, যা কি-না আমার মতে তৈরি করেছে চূড়ান্ত রকমের ভুল বোঝাবুঝির। আমার ভাবনায় কামু সবসময় কোশেশ করেছেন একটা মানবিক ভূমিকা রাখার বেলায়, যদিও প্রথম শব্দ লেখা থেকে শেষ শব্দ লেখা পর্যন্ত তার লেখা আস্বাভাবিক মাত্রায় ঔপনেবিশকতা দ্বারা আরোপিত। বছরখানেক আগে যখন শেষ বারের মত আমি ফ্রান্সে যাই তখন টের পাই সবকিছু কেমন ঔপনেবেশিক আমলের নস্টালজিয়াতে আচ্ছন্ন। মারগারিতে ডুরাসের কাল্ট বা ওই জাতীয় লোকজনদের কথা ভাবুন, ইন্দোচীন ছবির কথা ভাবুন। কোনো না কোনো ভাবে ওইসব গুণাবলী রয়েছে—তাই না, অনেকটা আমেরিকার মতো। রালফ লরেন, পোলো, ঔপনিবেশক আমলের ড্রেস, পিথ্ হেলমেট, শর্টস্ এবং আর বাকি সবকিছু, তারাও ঐ একই রকমটা করছে। ঔপনেবেশিক নস্টালজিয়া। এর সবই একই জায়গার থেকে আসা বলে আমার মনে হয়।

এটা আসলে খুবই কমন, সব জা’গাতেই। ইউরোপের অন্যান্য জা’গাতেও।

ইয়াহ, ফ্রান্স আলজেরীয় (Algerie Francaise) চিন্তাটা একটা বড় রকমের ভুল, আমরা কোনো ভাবেই এটা মেনে নিতে পারি না, দেখেন কেমন ভয়ানক হয়ে উঠেছে জায়গাটা। সেখানে ভয়ানক অবস্থা এখন। কিন্তু এটা একটা উপায়ে ঔপনিবেশিক আমলের অতীত, তার গৌরবগাথাকে পুনরায় নতুন করে লেখা এবং তার উপরে অগাধ আস্থা রাখার মত। স্বস্তি, সহজ এবং বিলাসবহুল জীবন এসব ভিত্তি করেই তো তার উপন্যাস। নর্থ আফ্রিকা নিয়ে কামুর লেখায় এ ধরনের একটা কিছু রয়েছে, আপনি হয়তো জানেন… সূর্য, ভৌগলিক সৌন্দর্য, সাগর ইত্যাদি ইত্যাদি।

আপনি কেন মনে করেন পশ্চিমা সংস্কৃতি, বিশেষ করে আমি বলতে চাচ্ছি ইংরেজী সংস্কৃতি, বড় রকমের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নন্দন এবং রাজনীতির মধ্যে একটা চীনের প্রাচির তোলার?

আমার মনে হয় না এমন একটা কিছু, বেশ অনেক পরে… ব্যাপারটা ঘটেছে, আমি বলতে চাই, সম্ভবত প্রায় মধ্য উনিশ শতকের দিকে এবং তারপর থেকে এটা বাড়তে থাকে। এবং যেটাকে ইংরেজী সাহিত্যপাঠে রীতিমত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এটা হয়তো তুলনামূলক ভাবে নতুন—একশ’ বছর, একশ’ বিশ বছরের পুরোনো। এখান থেকেই ভাবনাটা আসে যেভাবেই হোক ইংরেজী সাহিত্য বেঁচে গেছে এবং ইত্যকার আবর্জনার হাত থেকে দূরে থাকতে পেরেছে যেমন সুইফট, জনসন এবং ডিকেন্স এরা যার ভেতর গলা পর্যন্ত সেঁধিয়ে দিয়েছিলেন! আমার মনে হয় এটা বলা ভুল হবে যদি বলি সাহিত্যচর্চার বেলায় তা পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল। আমার বিশ্বাস এটা সবসময়ই ছিল। ইংরেজী রাজনৈতিক জীবন এবং ইংরেজী সাহিত্যের মধ্যে, সরাসরি, দরকারী এবং রাজনৈতিক বন্ধন সবসময়ই ছিল অথবা সাধারণভাবে ইংরেজী সাংস্কৃতিক এবং ইংরেজী সাহিত্যের মধ্যে। এবং সাম্প্রতিক কালে—আমি বলতে চাই, ম্যাথু আর্নল্ড আসার পরে, যে কিনা আমার মতে সবচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এই তালাক প্রক্রিয়ায়—এ সময় থেকে লোকজন তার আইডিয়াকে সিরিয়াসলি নিতে শুরু করেন এবং বিশ্বাস করতে শুরু করেন, সংস্কৃতি সত্যিকার অর্থে স্বায়ত্বশাসিত এবং রাজনৈতিক সত্তায় (পলেটি) যার পুরোপুরি অর্থেই কোনো অস্তিত্ব নেই এবং এ ধরনের প্রভাব থেকে এটাকে রক্ষা করা উচিত। আমার মনে হয় এটা একটা মিথ্যা আইডিয়া এবং এমন একটা আইডিয়া যার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তিও নেই।

কিšত্ত এখনও তো দেখি অনেক সমালোচক এটাকে শক্ত করে ধরে আছেন—

আহ্, আমার মনে হয়, কেবল মাত্র ইংল্যান্ডেই নয় এটা অনেকখানি সত্য ফ্রান্সেও। যেমন ধরুন ফরাসী সংস্কৃতিতে এখন একটা সবচে’ প্যাথেটিক ব্যাপার হলো এটা রাজনীতি এবং সংস্কৃতির মধ্যে পুরোপুরি তালাক ঘটিয়ে দিয়েছে। সেখানে সাংস্কৃতিক আইকন, সাংস্কৃতিক আইডিয়া এবং সাংস্কৃতিক টেক্সট সবকিছুই বিবেচনা করতে হবে শুধুমাত্র নান্দনিক দিক থেকে, এবং রাজনীতি এবং সংস্কৃতির মধ্যে বন্ধন পুরোপুরি যেন নিষিদ্ধ, সোজা কথায় ওটা নেই। আমি মনে করি যা ইংল্যান্ডে সত্য, এবং আমি মনে করি এটা আমেরিকাতেও সত্য। এটা হয়তো সে সব উচ্ছৃঙ্খল শক্তির জন্যে যারা কি-না এখনও চেষ্টা করে চলেছেন এর মধ্যে একটা যোগসূত্র তৈরিতে। আমার তো মনে হয় এ তালাক পুরোপুরি আলাদা হবার জন্যেই।

(চলবে)

hossain_mofazzal@ymail.com

free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন omar kaiser — নভেম্বর ৮, ২০০৯ @ ৯:৩৬ অপরাহ্ন

      ফেসবুকের মাধ্যমে এই লেখার খবর পেয়ে পড়লাম| বিডিনিউজ ২৪ ডটকমকে ধন্যবাদ|

      – omar kaiser

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Enamul Khair — আগস্ট ২২, ২০১২ @ ৭:৪০ অপরাহ্ন

      দারুন চমৎকার একটা সাক্ষাৎকার অনুবাদ করার জন্য অনুবাদক কে এবং bdnews24.com কে তা প্রকাশ করার জন্য ধন্যবাদ ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com