নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯
নিজের একটি বই নিয়ে হার্টা ম্যুলার
…….
হার্টা ম্যুলার (জন্ম. রুমানিয়া ১৭/৮/১৯৫৩)
…….
হার্টা ম্যুলার জার্মান কবি। ঔপন্যাসিক। জন্ম ১৯৫৩ সালে রুমানিয়ার ট্রান্সিলভেনিয়ায়। তাঁর পরিবার ছিল রুমানিয়ায় সংখ্যালঘু জার্মান সম্প্রদায়। পড়াশোনা করেছেন জার্মান ভাষা ও রোমান সাহিত্যের উপর। রুমানিয়ার রাজনৈতিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার কারণে চাকরি হারান। চসেস্কুর আমলে। তারপর জীবিকার জন্য বাচ্চাদের স্কুলে চাকরি নেন। ম্যুলারের বাবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসীদের অঙ্গসংগঠন ওয়াফেন এস এসে ছিলেন। তাঁর মাকে পাঁচ বছরের জন্য তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার শ্রমশিবিরে পাঠানো হয়। নিজে কমিউনিস্টদের চর না হতে চাওয়ায় পুলিশ কর্তৃক অনেকবার হেনস্থা হন। প্রথম বই প্রকাশ পায় ১৯৮২ সালে। বইয়ের নাম ‘নিদারুনজেন’ বা Lowlands। বইটি সেন্সরশিপের তোপে পড়ে। ১৯৮৭ সালে রুমানিয়া থেকে জার্মানি চলে যান। তারপর থেকে নির্বাসিত জীবন বার্লিনে। ম্যুলারের সাহিত্যে জীবনের টানাপোড়েন গভীরভাবে প্রকাশ পায়। তাঁর কাব্যিক গদ্যে রয়েছে তীব্র শ্লেষ আর হাস্যরস। লিখেন জার্মান ভাষায়। ইংরাজীতে অনুদিত তাঁর বইয়ের মধ্যে রয়েছে Lowlands, The Passport, The Land of Green Plums, Traveling on One Leg, The Appointment, Breath Swing ইত্যাদি। রুমানিয়ার লেখক রিচার্ড ভাগ্নার তাঁর স্বামী। অনেক সাহিত্যের পুরস্কার পেয়েছেন। সর্বশেষ সংযোগ ২০০৯ সালের সাহিত্যের নোবেল। কম্যুনিজমের পতনের বিশ বছর পূর্তির সময়ে তিনি পেলেন এই সন্মাননা। নোবেল কমিটির ভাষ্য: “ম্যুলারের কবিতার গভীরতায় আর সহজ গদ্যে বঞ্চিতদের বয়ান নিঁখুত ফুটে ওঠে।” নাম ঘোষণার সময় সুইডিশ একাডেমির কর্মকর্তা পিটার এনগ্লান্ড জানান: “একদিকে যেমন ম্যুলারের রয়েছে স্বতন্ত্র গদ্যভঙ্গী তেমনি তাঁর লেখায় রয়েছে স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে বেড়ে ওঠার হাহাকার…।”
জার্মান পত্রিকা Frankfurter Rundschau-এর নিকোল হানবার্গ হার্টা ম্যুলারের সাক্ষাৎকারটি নেন। বিষয় ছিল তাঁর সাম্প্রতিক বই Breath Swing; বইটি জার্মান বুক পুরস্কারের জন্য মনোনীত।
অনুবাদ: শুভাশীষ দাশ
নিকোল হানবার্গ: জার্মান সংখ্যালঘুদের রুমানিয়ায় চলে যাওয়ার ব্যাপারটা এক ধরনের নিষিদ্ধ আলোচনা হয়ে উঠলো কীভাবে?
হার্টা ম্যুলার: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রুমানিয়া কিছুটা জার্মানির পক্ষে ছিল। সেসময় থেকে শুরু। তবে যুদ্ধ শুরুর পর রুমানিয়া সোভিয়েতের পক্ষ নেয়। যুদ্ধশেষে সোভিয়েতের পক্ষে থাকার বিষয়টা কেবল বলা হয়। অন্যটা বেমালুম চেপে যাওয়া হয়। যুদ্ধের জন্য রুমানিয়ার সীমান্তে জার্মান সংখ্যালঘুদের জন্য সাহায্যের আবেদন হয়। তখনো রুমানিয়ার সেনাবাহিনী স্টালিনগ্রাদে। ইতিহাস মুছে ফেলায় বেশির ভাগ রুমানিয়ার লোক আসল কথা জানে না। ইউক্রেনের অনেক লোক বিশ্বাস করেন না শ্রমশিবিরের অস্তিত্ব। সাবেক সোভিয়েতরা যাবতীয় চিহ্ন মুছে ফেলেছে।
নিকোল হানবার্গ: কবি অস্কার পেস্ত্ররের সাথে মিলে বইটি লেখার কথা বলুন? আপনাদের মাঝে কোন বিষয়ে মতৈক্য হয় নাই?
হার্টা ম্যুলার: অস্কার বলেছে আমি লিখে গেছি। ওই সময়কার একজন পুরুষের অনুভূতি আমি তুলে ধরতে চেয়েছি। অস্কার ছোটখাট ব্যাপার পর্যন্ত অনেক বিশদে বলেছে। কল্পনাশক্তির জোর ছিল বলে শ্রমশিবিরে টিকে যেতে পেরেছে। ওর সহ্যশক্তি ছিল অসীম। শ্রমশিবির থেকে যারা বেঁচে ফিরেছে তাঁদের সাথে কথা বলতে গিয়ে দেখেছি কিছুই মনে করতে পারে না। সব কেমন জানি গুলিয়ে বসে থাকে।
তবে আমাদের দুজনের বলার ভঙ্গির পার্থক্য আছে। অস্কারের বলার পর আমি নিজের মত লিখছি নিজের ভাষায়। অস্কার সব কিছু লিখে প্রকাশ পাক সেটা খুব একটা চায় নাই। গদ্য লেখা কী কঠিন—ও আমাকে মাঝে মাঝে বলতো।
নিকোল হানবার্গ: অস্কার সমকামিতা নিজের মধ্যে রাখতে চেয়েছিলেন। এখানে মূল চরিত্র সমকামী। এটা কতটা প্রভাব ফেলেছে?
হার্টা ম্যুলার: অস্কার বেশি বলতে চায় না। আমি তাঁর ভেতর থেকে সব বের করে আনার চেষ্টা করেছি। শ্রমশিবির থেকে এটার শুরু। রুমানিয়ায় সমকামিতার জন্য জেলে যেতে হয়। শ্রমশিবির থেকে বেরিয়ে ও পারতপক্ষে লুকিয়েই ছিল। দেশ থেকে নির্বাসিত হয়ে সে মুক্তি পেল। নিজের সমাজ নিজের দেশ থেকে পালিয়ে বাঁচল ।
নিকোল হানবার্গ: ২০০৪ সালে আপনি ইউক্রেনে গিয়েছিলেন গবেষণার কাজে। কেমন হল?
হার্টা ম্যুলার: অস্কার শ্রমশিবিরকে সহ্য করতে পারত না। কিন্তু বলার সময় বলতো ‘আমাদের শিবির’, কখনো বলে ফেলত ’আমার’। ও ঘুরে ঘুরে আমাদের সব দেখিয়েছে। আমরা যেপেলিন পর্যন্ত গিয়েছি। অবশ্য সব চিহ্ন নষ্ট করে ফেলা হয়ছে। অস্কার বলতো, আমার সব কষ্ট বৃথা গেছে। তবে সেখানে সে নিজেকে অনুভব করতে পারত। ডায়াবেটিস সত্ত্বেও অনেক খেতো। প্রচুর চকোলেট খাচ্ছিল সেখানে। কিছু বললে বলতো, আমার আত্মাকে তৃপ্ত করছি। এত ছোটাছুটির পরও ক্লান্ত হতো না।
আমার জন্য অনেক কাজ হয়েছে। আমি জায়গাটা নিজে দেখে আসলাম। ঘটনাগুলা কীভাবে হয়েছে তার অনুভূতিও নিলাম। অস্কার তো গাছ চেনে না। বলতো সুগন্ধীগাছ, পরে দেখি ওটা কলাইগাছ। বলার সময় বলতো পাহাড় পাহাড়। গিয়ে দেখে ঢিবিও না।
নিকোল হানবার্গ: সব লেখার পর কেমন লাগছে?
হার্টা ম্যুলার: অস্কার এখানে আমার সহলেখক। ওর মৃত্য আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আমার লেখা নোটগুলার দিকে আমি তাকাতে পারতাম না। কারণ সব ওর অবর্ণনীয় কষ্টের কথা। প্রায় নয় মাস আমি এসব ছুঁইনি। পরে ভাবলাম কিছু একটা করতে হবে। অস্কার বেঁচে থাকলে হয়ত দুটা বই বের করা লাগত। মাঝে মাঝে বলতো আমাকে, এখন তুমি বই করে ফেল, পরে আমরা দুজনে আবার আর একটা বের করবো। মতৈক্যের চেয়ে আমাদের দুজনার বর্ণনভঙ্গি এর কারণ। অন্যের অভিজ্ঞতা নিজের মত করে লেখা অনেক দুরূহ। মাঝে মাঝে আমার লেখা আর এগোতো না। থমকে যেতাম। সব মিলিয়ে ছোটখাট একটা লেখা আমি দাঁড় করালাম। বড় আঙ্গিকে লিখতে গিয়ে দেখলাম বেশ কঠিন। আমার কাছে কেবল টুকরা টুকরা নোট আছে। কোনো ধারাবাহিক বর্ণনা নাই। পরে আমি কাহিনীর বুনট বানাতে চরিত্রের মধ্যে নানান উত্তেজনা ঢোকালাম।
নিকোল হানবার্গ: আপনার এই উপন্যাস অনেক বেশি কাব্যিক, গাঁথুনী অনেক দৃঢ়। আর পেছনে রয়েছে অস্কার পেস্ত্ররের গলা।
হার্টা ম্যুলার: তা ঠিক। আমি শুধু একজনের বয়ান সাজিয়ে গুছিয়ে আপনাদের দেখিয়েছি। এর বেশি না। এই লেখার সাথে আমার কোনো সরাসরি যোগাযোগ নাই। আমাকে একজনের অনুভূতি একদম কাছাকাছি থেকে বুঝে লিখে যেতে হয়েছে। মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা বলতে গিয়ে আপনাকে ভেতরের মানুষটাকে বের করে আনতে হবে তার চারপাশের পাশবিকতার বর্ণনা থেকে। ভাষা সুদৃঢ় থাকা লাগবে। আমার পক্ষে যতটা সম্ভব আমি করেছি। কাছাকাছি যেতে পেরেছি। অস্কারের মুখ থেকে এটুকু শুনতে পারলেই আমার আর কিছু লাগতো না।
বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:




প্রাঞ্জল অনুবাদ। পড়ে বেশ ভাল লাগল।
- নীহার রঞ্জন সাহা
অনুবাদ মনে হচ্ছিল না। হেয়ার্টা ম্যুলার বিষয়ে বেশ তাড়াতাড়ি কিছু জানা হলো। অনুবাদক শুভাশীষকে ধন্যবাদ। বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকমকেও।
- আলতাফ হোসেন
চমৎকার একটি অনুবাদ। অনেক কিছুই জানা হলো। অনুবাদককেও অনেক ধন্যবাদ।
- আশরাফ
পড়ে খুব ভাল লাগল… নতুন কিছু জানতে কার না ভাল লাগে।
-সাব্বিহ্ হোসেন
বেশ কিছু অজানা তথ্য জানা গেল। ধন্যবাদ অনুবাদককে। বিডিনিউজকেও।
- সাইফুল্লাহ দুলাল