বেগম রোকেয়ার রচনায় লোকজ জীবন অভিজ্ঞতা

গীতা দাস | ২৪ নভেম্বর ২০০৯ ১১:৫০ পূর্বাহ্ন

brokeya.jpg

১.
বেগম রোকেয়ার সাথে আমার প্রথম পরিচয় প্রাইমারীতে পড়ার সময়। তাঁর জীবনী পাঠ্য ছিল। রাতের অন্ধকারে বড় ভাইয়ের কাছে মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়ার কাহিনী আমাকে রোমাঞ্চিত করেছিল, নিজের পাঠের প্রতিও আগ্রহী করেছিল নিশ্চয়ই এবং ‘স্ত্রী-শিক্ষার’ উন্নতির বিষয়টিই গুরুত্ব দিয়েছিলেন আমার শিক্ষকেরা—নারীর অধিকার নয়।

মাধ্যমিক অথবা উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে পড়েছি সুলতানার স্বপ্ন কাহিনীর অংশ বিশেষ ‘নারীস্থান’। এটি পড়ানোর সময়ও শিক্ষকরা নারীর বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও কল্পকাহিনীকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন—নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ণকে নয়।

বাংলা সম্মান শ্রেণীতে পাঠ্য ছিল বেগম রোকেয়ার অবরোধবাসিণী। পর্দা প্রথার খণ্ড খণ্ড ঘটনা। শিক্ষকরা অবরোধবাসিনী পড়াতে গিয়ে প্রাসঙ্গিকভাবেই এর সামাজিক প্রেক্ষাপটের কথা বলেছেন; কিন্তু নারীবাদ পড়াননি। রোকেয়া ও তার সৃষ্টি বুঝতে ও বোঝাতে যা পড়ানো ছিল অবধারিত ও অপরিহার্য।

বড়বেলায় রোকেয়া সম্পর্কিত অনেক প্রবন্ধ, নিবন্ধ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় পড়েছি, তবে নারীপক্ষের রোকেয়া বিষয়ক একটি পোস্টার ও হুমায়ূন আজাদের রোকেয়া বিষয়ক বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা আমাকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রোকেয়া পাঠে উদ্ধুদ্ধ করে। হুমায়ূন আজাদের রোকেয়া বিষয়ক প্রবন্ধ তাঁর নারী গ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত।

এখন রোকেয়া পড়তে গিয়ে এখন আমার আশ মিটছে না। নারীবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, লোক অভিজ্ঞতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরূদ্ধে দ্রোহ—এ সবের সমাহার তার রচনায়।

বেগম রোকেয়া রংপুরের অন্তঃপুরে বড় হয়েছেন আনুমানিক ১৬ বৎসর বয়স অর্থাৎ বিয়ের আগ পর্যন্ত। পরে স্বামীর সাথে বাংলাদেশের বাইরে। আরও পরে কলকাতায় উর্দু ভাষায় স্কুল চালিয়েছেন। কাজেই বাংলার লোকজীবনের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা খোঁজার চেষ্টাকে অনেকের কাছে হয়তো মনে হতে পারে অপ্রাসঙ্গিক, অপরিপক্কতার পরিচায়ক এবং অরণ্যরোদন তো বটেই।

কিন্তু আপাতঃদৃষ্টিতে তাঁর বসবাস বাংলার লোক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল বলে মনে হলেও তাঁর রচনাসমূহ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির ভেতরের ধ্যান ধারণা সম্বন্ধে সম্যক অভিজ্ঞতা ছিল রোকেয়ার। বেগম রোকেয়া প্রবাদ প্রবচন ব্যবহারে ফুটিয়ে তুলেছেন নারীর যাপিত জীবনকে। লোকজ জীবনাভিজ্ঞতা প্রতিবিম্বিত ও বিচ্ছুরিত তাঁর রচনায়। প্রাকৃত জীবনের রীতি-নীতি,জীবনধারণ কৌশল তাঁর অবিদিত ছিল না।

বেগম রোকেয়া অন্তঃদৃষ্টি দিয়ে আতস্থ করেছিলেন পরিপার্শ্বকে। আরবী, ফারসী আর উর্দু ছিল তাঁর বাবার পরিবারের লালিত ভাষা এবং ইংরেজি ছিল পালিত ভাষা। আর বাংলাদেশের গ্রামে বাস করলেও বাংলা ভাষাই ছিল তাঁর পরিবারে অবহেলিত। যে বাবার কাছে বাংলা ভাষার লালন-পালন ছিল না, মর্যাদা ছিল না সে পরিবারের মেয়ে রকু বাংলা ভাষায় রচনা করেছেন নারী অধিকার বিষয়ক শ্রেষ্ঠতম কিছু প্রবন্ধ। বাংলার লোক সংস্কৃতিকে প্রতিফলন করেছেন তাঁর রচনায়।

স্বল্প পরিচিত মহিলা পর্যন্ত পায়রাবন্দের বাড়িতে আসলে পাঁচ বছরের রোকেয়াকে পর্দা করতে হতো; সেখানে কোন উৎস থেকে পেয়েছেন লোকজ জীবনের প্রবাদ, প্রবচন ও লোকোক্তি। জন-জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন রোকেয়ার চেতনায় লোকসংস্কৃতি কোত্থেকে অংকুরোদ্গম হয়ে চারায় পরিণত হয়েছিল তা গবেষকদের আগ্রহী করে তুলবে বলেই আশা করি। একজন অনুসন্ধিৎসু রোকেয়া পাঠক হিসেবে সেই গবেষকদের জন্যে অপেক্ষায় রইলাম।

ডঃ গোলাম মুরশিদ ‘প্রথম বাঙালি নারীবাদী বেগম রোকেয়া” প্রবন্ধে বলেছেন:

‘অবরোধের দারুণ যন্ত্রণা ব্যক্তিগত জীবনেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। সে তো করিমুন্নেসা এবং সেকালের লক্ষ লক্ষ মহিলারাও করেছিলেন। কিন্তু অবরোধ মোচন করতে হবে, তার চেয়েও বড়ো কথা নারী সমাজকে মুক্ত করতে হবে বহু শতাব্দীর দৃঢ়মূল বন্ধন থেকে—এ চেতনা তিনি কোথায় পান, তা বলা শক্ত । যে অকিঞ্চিৎকর তথ্য আমার হাতে আছে, তা থেকে নিশ্চিত হদিস দেওয়া অসম্ভব। অনুমান হয়তো সম্ভব। রোকেয়া সম্পর্কে কয়েকখানা বই এবং তার কিছু চিঠিপত্র প্রকাশিত হলেও, তার ব্যক্তিগত জীবনের প্রধান অংশই এখনো অজ্ঞাত। বর্তমান রচনা মূলত রোকেয়ার রচনাবলীর উপর নির্ভরশীল।’

আমিও সর্বতোভাবে ডঃ গোলাম মুরশিদ এর সাথে দ্ব্যর্থহীনভাবে এক কণ্ঠ। রোকেয়ার ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে তার মা সম্পর্কেই তো আমাদের পর্যাপ্ত জানা নেই। শুধু পদ্মরাগ উপন্যাসের উৎসর্গ-পত্রে তাঁর দাদা আবোল আসাদ ইব্রাহিম সাবেরকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন—‘জননী সময়ে সময়ে শাসন করিয়াছেন,—তুমি কখনও শাসন কর নাই।’ ‘ধ্বংসের পথে বঙ্গীয় মুসলিম’ নামক লেখায় বলেছেন—‘ছেলে-বেলায় আমি মা’র মুখে শুনতুম।—“ কোরআন শরীফ ঢাল হয়ে আমাদের রক্ষা করবে।”

রোকেয়া রচনা সমগ্র ঘেঁটে এ দুইবার তাঁর মায়ের কথা পাই। তাই নারী সমাজকে মুক্ত করার চেতনা তিনি কোথায় পেয়েছিলান এর যেমন খোঁজ পাওয়া কষ্টকর তেমনি লোকায়ত জীবনের বনালী ফুল কীভাবে চয়ন করলেন তাও আমাদের ধাঁধায় ফেলে বৈকি।

রোকেয়ার লেখা পর্যালোচনা করলে লোকজ জীবনের জলচিত্র ও চালচিত্র পাওয়া যায়। তাঁর প্রবাদ, প্রবচন, জনরব ও রূপকথা ব্যবহারের উদাহরণ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে তিনি ছিলেন মাটির কাছাকাছি, লোকজ জীবনের পাশাপাশি, অর্থাৎ তাঁর ছিল বাঙালী জীবনবোধের সাথে ঘেষাঘেষি।

মতিচুর ১ম খণ্ড

বেগম রোকেয়ার লেখায় তিনি সচেতনভাবে উর্দু কাগজে পড়া অভিজ্ঞতাকে অনেক বার উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যেমন, বিহারের (তাঁর ভাষায় “বেহারের”) ধনী মুসলমানের ঘরের বউ-ঝি নামধেয় জড়পদার্থ দেখার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। (স্ত্রীজাতির অবনতি)। কিন্তু তাঁর চেতনার গহীনে বাংলার সংস্কৃতি এমনই শেকড় গেড়েছিল যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বার বার তাঁর রচনায় প্রকাশ ঘটেছে বাংলার লোক সংস্কৃতির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের।

‘জামাতা আর দেবতা’ বলে প্রবাদ আছে এবং তা বেগম রোকেয়ার অভিজ্ঞতার মধ্যে ছিল বলে ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ প্রবন্ধে লিখেছেন ‘এদেশে জামাতা খুব আদরণীয়—এমনকি ডাইনীও জামাই ভালবাসে। ‘ অন্যদিকে ঘর জামাই থাকা সামাজিকভাবে অসম্মানের এবং এতে জামাই এর চেয়ে মেয়েটিকে তার বাবার বাড়ির সুদৃঢ় অবস্থানকে ঠুনকো করার জন্যেই এ সামাজিকীকরণ। তাও রোকেয়ার রচনায় রয়েছে। যেমন, “তবু ‘ঘরজামাইয়ের’ সেরূপ আদর হয় না।“ কাজেই বাংলার সামাজিক মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাস সম্বন্ধে বেগম রোকেয়ার গভীর পর্যবেক্ষণ ছিল।

যেমন ইংরেজি প্রবাদ Might is Right না শুনেই গ্রামীণ জনপদের জনমানুষ ‘জোর যার মুলুক তার’ প্রবাদটি সৃষ্টি করেছিলেন এবং তা ব্যবহার করে আসছেন। প্রতাপ-প্রতিপত্তির কাছে হেরে যাওয়া অভিজ্ঞতাই এ প্রবাদটির জননী। নারী জীবনের দুর্ভোগের বর্ণনা দিতে গিয়ে বেগম রোকেয়া ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ নামক নিবন্ধে জনমানুষের কাছ থেকে পাওয়া ‘জোর যার মুলুক তার’ প্রবাদটি ব্যবহার করেছেন। যদিও জন মানুষের সাথে সম্পৃক্তির বিষয়টি তাঁর জীবনীতে স্পষ্ট নয় বলে আগেই উল্লেখ করেছি।

আমাদের বাংলার সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষদের পোশাক পরিচ্ছদ, চাল-চলন, ভাব প্রকাশ সবই পুরুষতান্ত্রিক দম্ভে পুরুষালী। এর ব্যত্যয় ঘটলেই অপবাদ—মাইগ্যা বা মেয়েলি বলে। যে চুড়ি পরা মেয়েদের জন্য অলংকার সে চুড়ি পরা পুরুষের জন্য অপমান। পুরুষের কণ্ঠে অহরহ “আমার কথা প্রমাণিত করিতে না পারিলে আমি চুরি পরিব।” ( স্ত্রীজাতির অবনতি) এ ধারণা বেগম রোকেয়ার অভিজ্ঞতা এড়ায়নি।

সচরাচর ব্যবহৃত লোকোক্তি অবলীলায় প্রাসঙ্গিকভাবে চয়িত হয়েছে তাঁর লেখায়। যেমন, ‘উল্টা বুঝলি রাম’। (স্ত্রীজাতির অবনতি)। কম কথায় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে।

পৌরাণিক কাহিনী হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে লালন করলেও ঐতিহাসিক কারণে তা গ্রাম বাংলার মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত। পৌরাণিক চরিত্রের প্রভাবেও প্রভাবিত তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, চাল-চলন, রীতি-নীতি। জন জীবনের আশা-হতাশার সাথেও ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে আছে পৌরাণিক কাহিনীর পরিণতি। বেগম রোকেয়াও “অর্ধাঙ্গী” নামক প্রবন্ধে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা চেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন পৌরানিক কাহিনীর প্রসঙ্গ টেনে। যেমন, দুইবার রামায়ণের রাম ও সীতার উদাহরণ ব্যবহার করেছেন।

স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্ক, তাদের অবস্থা ও অবস্থানকে বুঝাতে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী পুরুষের সহাবস্থানকে অস্বীকার করে স্বামীত্ব ও প্রভূত্বকে প্রতিষ্ঠার যে মহড়া তা ব্যাখ্যা করতে লোকসমাজে প্রচলিত রাম ও সীতার কাহিনী যথার্থ বৈ কি!

তোতা বা টিয়া পাখির মতো শিখানো বুলি বলা নিয়ে টিপ্পনি কাটা আমাদের নৈমিত্তিক ব্যাপার। বিষয়টি বেগম রোকেয়ার শ্রুতিতেও ছিল বলেই “অর্ধাঙ্গী” নিবন্ধে শিক্ষা প্রসঙ্গে বলেছেন—“প্রথমে আরবীয় বর্ণমালা, অতঃপর কোরআন শরীফ পাঠ। কিন্তু শব্দগুলির অর্থ বুঝাইয়া দেওয়া হয় না, কেবল স্মরণশক্তির সাহায্যে টিয়াপাখির মত আবৃত্তি কর”। বাঙালী সমাজের আচার-আচরণকে প্রাত্যহিক পর্যবেক্ষণের ফলই এ টিয়া পাখির উদাহরণ।

‘সুগৃহিণী’ প্রবন্ধে বেগম রোকেয়া নিজেই বলেছেন—“একটা মেয়েলী প্রবাদ আছে, ‘সেই ধান সেই চাউল, গিন্নি গুণে আউল ঝাউল’ (এলো মেলো)।” যার তাৎপর্য হচ্ছে সুগৃহিণীর গুণে গৃহ সজ্জিত থাকে। অর্থাৎ বাংলার লোক জীবনের ‘মেয়েলী’ প্রবাদের সাথে বেগম রোকেয়ার ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের আভাস পাওয়া যায়। এ প্রবন্ধে তিনি আরও লিখেছেন
—“অন্যত্র প্রবাদ আছে, ‘মূর্খের উপাসনা ও বিদ্ধানের শয়নাবস্থা সমান’।” এই যে বেগম রোকেয়া উদ্ধৃতি দিয়ে নিজেই প্রবাদ বলে উল্লেখ করেছেন এর উৎস কোথায়? লোকজ ঐতিহ্যের কোন ভাণ্ডার থেকে এ সব সংগ্রহ করেছেন?

‘চোরা না শুনে ধরম কাহিণী ’গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে বহুল প্রচলিত প্রবাদ যা বেগম রোকেয়া ‘বোরকা’ প্রবন্ধে ব্যবহার করেছেন। মজ্জাগতভাবে খারাপ লোক কখনো ধর্মের তথা ভাল কথা মানে না। অন্যদিক, রোকেয়ার লেখায় যে লোকজ উপাদানের গড়াগড়ি ও ছড়াছড়ি তা শহরের নাগরিক পাঠকদের বোঝার কথা নয়।

শুধু বাংলার নয়—পৃথিবীর সকল নারীরই নিজের অবস্থানের কথা বলতে গেলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সমালোচনা করতে হয় যা বাংলাদেশের প্রবাদে চমৎকারভাবে বিধৃত। রোকেয়া তা চয়ন করেছেন তার ‘গৃহ’ প্রবন্ধে—“ঐ যে কথায় বলে, ‘বলিতে আপন দুঃখ পরনিন্দা হয়”, এ ক্ষেত্রে তাহাই হইয়াছে—ভগ্নীর দুঃখ বর্ণনা করিতে ভ্রাতৃনিন্দা হইয়া পড়িয়াছে।” সামাজিক বলয়ে কথায় কী বলে তা জানা রোকেয়ার গভীরভাবে লোক সমাজ নিরীক্ষণেরই ফলাফল।

মতিচুর ২য় খণ্ড

মতিচুর ১ম খন্ণ্ডে বেগম রোকেয়া যতটা প্রবাদ বা লোকোক্তি ব্যবহার করেছেন, মতিচুর ২য় খন্ণ্ডে ততটা করেননি। তবে যেটুকুই করেছেন তাতেই তার সমৃদ্ধ লোকাভিজ্ঞতার পরিচয় পাওয়া যায়।

শুধুমাত্র দু’একটি উদাহরণ কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে, যেমন, ধরাকে সরা জ্ঞান করার প্রবাদটি ইতিবাচক অর্থে ব্যবহার করেছেন। সাধারণত এটি উন্নাসিক কোনো চরিত্র বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এখানে একটি স্থান থেকে (প্রথম বেঞ্চ) পুরো কারসিয়ঙ্গ শহরটা এক নজরে দেখা যাওয়া বোঝাতে এ প্রবাদের ব্যবহার করেছেন ‘সৌর জগৎ’ নামক গল্পে।

পরবর্তীতে, ‘বায়ুযানে পঞ্চাশ মাইল’ নামক লেখায় উড়োজাহাজে তিন হাজার মাইল উপরে ওঠার অভিজ্ঞতায় ‘ধরাখানা সত্যই সরা তুল্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ রূপক নয়, আক্ষরিক অর্থেও দেখেছেন এ প্রবাদটিকে।

এক স্ত্রী তার স্বামীর womanishness (স্ত্রী ভাব) শব্দ ব্যবহারের প্রতিবাদ করায় স্ত্রীর এক প্রতিক্রিয়াশীল ভাই বোনকে উদ্দেশ্যে বলে ‘পিপীলিকার পক্ষ হইলে শূন্যে উড়ে’। স্ত্রীলোক শিক্ষা পাইলে পুরুষদের কথার প্রতিবাদ করে,—সমালোচনা করে। ‘পিপীলিকার পাখা উঠে মরিবার তরে’— এরই পূর্বতন সংস্করণই বোধ হয় উপরোক্ত সংলাপটি।

“মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত”— বহুল ব্যবহৃত প্রবাদটিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে যে,— মোল্লাদের যতই ধর্মীয় পরিচয় থাকুক না কেন গ্রামীণ জনগোষ্ঠী তাদের ক্ষমতার পরিমাপ করেই রেখেছে—যা বড়জোর মসজিদ পর্যন্ত। আর বেগম রোকেয়া তা অবলীলায় ‘সৌর জগৎ’ নামক গল্পে জাফর মামার গতিপথের সীমাবদ্ধতা বোঝাতে এ প্রবাদটির ব্যবহার করেছেন।

“যেহেতু তিনি আপন ধর্মের কোন তত্ত্বই অবগত নহেন। কেবল টিয়া পাখীর মত নমাজ পড়েন, কোন শব্দের অর্থ বুঝেন না।” বেগম রোকেয়া টিয়া পাখির রূপকে সমাজের ধর্মের নামে কিছু অন্ধ লোকের চরিত্র রূপায়ণ করেছেন। টিয়া পাখি শিখানো বুলি বলে বা বলতে পারে—লৌকিক এ ধারণাটি তিনি “অর্ধাঙ্গী” নামক প্রবন্ধেও ব্যবহার করেছিলেন। তাছাড়া, পরবর্তীতেও টিয়া পাখির মতো মুখস্ত করার বৈশিষ্ট্যটি বার বার ব্যবহার করেছেন।

“সুলতানার স্বপ্ন” ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ ও বাঙালী সমাজ ব্যবস্থা তো বটেই ভারত বর্ষের বাইরের কাল্পনিক কোনো স্থানকে কেন্দ্র করে লিখিত। সেজন্যেই হয়তো বা একটি মাত্র প্রবাদ “জোর যার মুলুক তার” ব্যবহার করেছেন যা আবার ইংরেজিতেও অধিক পরিচিত Might is Right বাক্যে। এ ছাড়া লৌকিক জীবনের আর কোনো স্বাদ দেননি। সারা ও তার মহারানী আমাদের শিক্ষা সংস্কৃতির বাইরের চরিত্র। কাজেই কী সচেতনভাবেই না লোক সংস্কৃতির কোনোরূপ ছোঁয়া তিনি এ রচনায় দেননি! সযত্নে লোকায়ত জীবনকে এড়িয়ে গেছেন। “সুলতানার স্বপ্ন” লেখাটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ও তা নারীকে সার্বভৌম সত্ত্বা হিসেবে বিকশিত করতে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। এতে বাংলার লোকায়ত জীবনের প্রতিফলনের সুযোগ ছিল না এবং রোকেয়া সে সুযোগ সৃষ্টি করারও চেষ্টা করেননি। এখানেই তাঁর সচেতন লেখক সত্তার প্রমাণ মেলে।

ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে রচিত “ডেলিশিয়া হত্যা” নামক গল্পটিতে বেগম রোকেয়ার লোক প্রবাদের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য নয়। একটি মাত্র প্রবাদ “যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা” যেন আরোপিত উচ্চারণ। স্যুটের সাথে যেন শান্তিপুরি চপ্পল।

শুধুমাত্র ডেলিশিয়ার সাথে মজলুমা চরিত্রের তুলনায় বাংলার লোকজ জীবনে নারীর অবস্থানকে ফুটিয়ে তুলেছেন।

ইউরোপীয় আবহে লিখিত বলেই হয়তো বা বেগম রোকেয়া সচেতনভাবে “ডেলিশিয়া হত্যা” নামক গল্পে ‘বঙ্গদেশের’ চেয়ে বিহার অঞ্চলে ব্যবহৃত অলংকারের উদাহরণ দিয়েছেন। সেজন্যেই হয়তো বাংলাদেশের লোকজীবনের প্রবাদ প্রবচন বেশি ব্যবহার করেননি। তিনি নিজেই ’যুগনু’ নামক অলংকার শব্দ ব্যবহার প্রসঙ্গে পাদটীকায় বলেছেনঃ
———
“আমাদের দেশে পাচনরি বা সাতনরি মুক্তামালার মধ্যস্থলে যে জড়াও “ধুকধুকি” থাকে, তাহাকে pedant বলা যাইতে পারে, কিন্তু pedant বলিতে যাহা বুঝায় তাহাকে বেহার অঞ্চলে “যুগনু” বলে। বঙ্গদেশে কেবল “ধুকধুকি” নিজে কোন অলঙ্কার নয়; বেহারে কিন্তু “যুগনু” নিজেই একটি অলঙ্কার। এইজ্যা আমরা “যুগনু” শন্দ ব্যবহার করিলাম।” এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে তিনি লোক জীবনের অভিজ্ঞতার প্রায়োগিক দিক নিয়ে সচেতন ছিলেন।

লোকসাহিত্য মানেই লোকের মুখে মুখে জনসমাজে যা বিস্তৃত হয়ে থাকে। যে সব রচনার রচয়িতার নামসহ লিখিত রূপ পাওয়া যায় না। লোকজ স্মৃতি এবং শ্রুতিকে নির্ভর করে এ সব রচিত। লৌকিক কাহিনীতে বর্ণিত চরিত্রকে ব্যবহার করে লোকায়ত সমাজে প্রচলিত উপমা বা উদাহরণের যে ব্যবহার তা বেগম রোকেয়ার রচনায়ও পাওয়া যায়।

যেমন, সাহিত্যিক ডেলিশিয়ার সাথে সৈনিক বিভাগের উইলফ্রেড কারলীয়ন-এর বিয়েকে তুলনা করেছেন— “এ বিবাহকে কার্তিক এবং সরস্বতীর মিলন বলা যাইতে পারে।” রূপবান এবং রণাঙ্গনে চৌকষ কোনো পুরুষকে আর বিদ্যা-বুদ্ধিতে গুণান্বিতা কোনো নারীকে আজও আমাদের সমাজে যথাক্রমে কার্তিক এবং সরস্বতীর সাথে তুলনা করা হয়। রোকেয়াও এর ব্যতিক্রম নন। এ সব উপমা তিনি লোক জীবনের ভাণ্ডার থেকে দিয়েছেন যা লোকসংস্কৃতি নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার পরিচয় বহন করে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠির মানের, মনের, মনোবলের ও মননের কথাই লোক কথায় গাথায় ও গানে। আর এ সবের ঝালমলে টুকরো রোকেয়া তাঁর লেখায় সুচারুরূপে গেঁথে দিয়েছেন।

তিনি এ সব কোথা থেকে বা কার কাছে শিখেছেন—কীভাবে আয়ত্ত করেছেন, সংগ্রহ করেছেন এর উৎস পথ আমাদের জানা নেই। অর্থাৎ শুধু জানি তিনি লোকপথে হেঁটেছেন তবে তাঁর ব্যবহৃত যানবাহনের বা মাধ্যমের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

মহাভারত সংস্কৃত মহাকাব্য হলেও ভারতীয় উপমহাদেশের লোকজীবনে এর প্রভাব অপরিসীম। ‘জ্ঞানফল’ নামক রূপকথা বেগম রোকেয়া মহাভারত মহাকাব্যের অনুসরণে শেষ করেছেন— –
“কনকের রূপ কথা অমৃত সমান,
মৃত ব্যক্তি যদি শুনে পায় প্রাণদান।”

মহাভারত লিখিত— ‘মহাভারতের কথা অমৃত সমান
— কাশীরাম দাস কহে শুনে পূণ্যবান।‘

এ অভিজ্ঞতা আমাদের বিস্ময়াভূত করে বৈ কি! হিন্দুদের রচিত পৌরাণিক মহাকাব্যের রচনাশৈলীতে যে তিনি মুগ্ধ ছিলেন এরও প্রমাণ বহন করে উপরের লাইন দু’টি।

‘নারী-সৃষ্টি’ নামক রচনাকে নিজেই পৌরাণিক উপাখ্যান বলে উল্লেখ করেছেন। আর পৌরাণিক উপাখ্যানের সাথে লৌকিক জীবনের সম্পৃক্ততা তো স্বীকৃত সত্য। বেগম রোকেয়া অবশ্য পৌরাণিক উপাখ্যানের সাথে আধুনিক নারীবাদী চেতনের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন।

‘নারী-সৃষ্টি’ লেখার পাদটীকা থেকে— “নারীও যেমন প্রাণমনহীন, বুদ্ধি বিবেকহীন একটা কাঠের পুতুল বিশেষ— পুরুষ তাহাকে প্রত্যাখ্যান করিলেও সে নিজেকে অপমানিতা বোধ করে নাই, আবার ফিরাইয়া লইতে আসিলেও গৌরব অনুভব করে নাই। ত্বস্তিদেব অবশ্যই জানিতেন, এইরূপ নির্বাক ‘কাঠের পুতুল’ গৃহিণীই পুরুষের বাঞ্ছনীয়া।”

নারী তো সংসার জীবনে আবেগহীন, আকাঙ্ক্ষাহীন কাঠের পুতুলের মতো অস্তিত্ত্ব নিয়েই আজও বাস করে। লোক সমাজে নিরীহ, গোবেচারা আর প্রতিবাদহীন মানুষকে কাঠের পুতুলের সাথে তুলনা করা এখনো স্বাভাবিক ঘটনা।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত ‘নার্স নেলী’ গল্পটি এক বাঙালী মুসলিম নারীর খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণের কাহিনী। ‘মাথায় রাখলে যদি উকুনে খায় আর মাটিতে রাখলে যদি পিঁপড়ায় খায়’ বাঙালী জীবনে স্নেহ মমতার আড়ম্বর আর আতিশয্যের প্রকাশে প্রচলিত এ প্রবাদটি ব্যবহৃত হয়েছে ‘নার্স নেলী’ গল্পটিতে। এতে আরও রয়েছে বাংলার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা করার মতো চিরাচরিত অভ্যাসের বিষয়টি বোঝাতে ‘ধান ভানতে শিবের গীত’-এর মতো প্রবাদ।

লোকাচার গ্রাম বাংলার এক অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য যা জনজীবনকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে। এ লোকাচারও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেগম রোকেয়ার রচনায়। ‘শিশু পালন’ প্রবন্ধে— “যেমন দিদিমার আমলে হিন্দু পোয়াতিকে ৯ দিন থেকে ২১ দিন আর মুসলমান পোয়াতিকে ৪০ দিন আঁতুর ঘরে বন্ধ থাকতে হতো,”— প্রসূতি মায়ের জন্যে বিধি ব্যবস্থায় লোকাচারের বহিঃপ্রকাশ তাঁর অভিজ্ঞতার সীমানায় আবদ্ধ।

‘মুক্তি ফল’ রূপকথাটি রূপকাশ্রয়ী রচনা। লোক কাহিনীর ‘চৌদ্দ পুত-এত দুখ’ পাখির ডাকের উল্লেখ রয়েছে— যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কল্পনাপ্রসূত। এ পাখি ছাড়াও বিভিন্ন পাখির ডাকের সাথে বিভিন্ন কাহিনী রয়েছে। যেমন, ইষ্টি কুটুম, চাতক, চোখ গেল ও বউ কথা কও। রোকেয়া চৌদ্দ পুত-এত দুখ, চোখ গেল ও বউ কথা কও পাখির ডাকের উল্লেখ করেছেন। নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া সমাজ এবং জাতির মুক্তি যেমন সম্ভব নয় তেমনি এখানে মায়ের শাপমুক্তির জন্যে ছেলে ও মেয়ের যৌথ অংশগ্রহণের মাধ্যমে মুক্তি ফল সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে।

“যাহাতে সাপ মরে, লাঠিও না ভাঙে, তদ্রূপ ব্যবস্থে হওয়া চাই।” বেগম রোকেয়া ‘মুক্তি ফল’ রূপকথায় মায়াপুর রাজ্যে মানবগোষ্ঠির প্রবেশ ঠেকাতে এ কৌশলী অর্থবোধক প্রবাদ ব্যবহার করেছেন। এ চালাকি, কূটকৌশল অন্য অর্থে উদ্দেশ্য সফল করার কলাকৌশল বিষয়ক প্রবাদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের প্রমাণ মেলে; যা বাংলার সামাজিকজীবনের প্রাত্যহিক ঘটনা।

প্রবীণ খাগড়া দিয়ে মানকচু পাতায় চিঠি লিখেছে মায়াপুরের রাজাকে। খাগড়া দিয়ে হাতে খড়ি দেয়ার ইতিহাস আর অভিজ্ঞতা তো গ্রামীণ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। শুধু কচু পাতার সাথে কলা পাতায়ও অ আ লেখার চর্চা হতো। খাগড়া দিয়ে কচু পাতায় লেখার অভিজ্ঞতা বাংলার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর তথা লৌকিক জীবনের যা রূপকথার সাথে সমন্বিত হয়েছে।

“আপনি বাঁচিলে বাপের নাম।” আপাত স্বার্থপর উক্তি মনে হলেও অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ সমাজের এর চেয়ে বাস্তবধর্মী জীবন দর্শন আর কী ই বা হতে পারে! এরই প্রতিধ্বনি শুনি ‘মুক্তি ফল’ রূপকথায় প্রবীণের সংলাপে।

‘মুক্তি ফল’ রূপকথায় পাদটীকায়ও রোকেয়া নিজেই প্রবাদ আছে বলে উল্লেখ করে লোক কাহিনী বলেছেন। রূপকথা শুনিয়েছেন। জিন নিয়ে গল্প বলেছেন। তবে কী রোকেয়ার লোক কাহিনী বা রূপকথা এবং প্রবাদের পৃথকীকরণ ধারণায় অস্পষ্টতা ছিল? জানার উপায় খোঁজা প্রয়োজন। ‘কথিত’ আছে না বলে দুইবার ‘প্রবাদ আছে’ বলে ‘মুক্তি ফল’ রূপকথায় পাদটীকায় উল্লেখ করেছেন। প্রবাদ ও প্রবচনে অনেকে অনেক সময় পার্থক্য করতে পারে না, কিন্তু প্রবাদ ও লোক কাহিনী বা রূপকথার পার্থক্য তো সুস্পষ্ট।

পাদটীকায় ব্যাসদেবের প্রসঙ্গসহ দেবী দূর্গার কথাও বলেছেন যা ধর্ম নির্বিশেষে বাংলার বৃহত্তর জন জীবনের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততারই পরিচায়ক।

নিজের দোষ অন্যের কাঁধে চাপানো আমাদের স্বভাব সিদ্ধ বৈশিষ্ট্য। ‘মুক্তি ফল’ রূপকথায়ও বড় ভাই প্রবীণ দোষ করে ছোট ভাই নবীনের উপর চাপাচ্ছে দেখে নবীন প্রবাদ বলে: “উল্টা চোর কোটাল শাসে!” কম শব্দে একটি কুটিল চরিত্রের বিশ্লেষণ।

লোকজীবন থেকে শব্দ চয়ন পদধূলি— পায়ের ধূলি। ত্বস্তি দেবের আগমনকে উদ্দেশ্য করে ’সৃষ্টি-তত্ত্ব’ নামক রচনায় তিনি বাঙালী সমাজে বহুল ব্যবহৃত প্রবাদ গরীবের বাড়িতে ধনীর পদধূলিকে স্মরণ করে লিখেছেন— “অসময়ে নরলোকে পদধূলি’।

’সৃষ্টি-তত্ত্ব’ রচনায় ‘চোরা না শুনে ধরম কাহিনী’ প্রবাদটি তিনি আগে ‘বোরকা’ নামক নিবন্ধেও ব্যবহার করেছিলেন। দ্বিতীয়বার ব্যবহারের কারণ প্রবাদটির প্রাসঙ্গিকতা, অধিক শ্রুত হওয়া এবং সাধারণ যাপিত জীবনের প্রাত্যহিক চর্চা বলে ধারণা করা যায়—যার সাথে যে কোনো সূত্রে রোকেয়া পরিচিত ছিলেন।

অন্যান্য প্রবন্ধাবলী
‘রসনা-পূজা’ নামক রম্য রচনায় তিনি সমৃদ্ধ খাবারের কথা বলেছেন এবং হাস্যোদ্রেকের সাথে কিছু পরামর্শ পাই, আরও পাই রন্ধনশালার বাইরের নোংরা পরিবেশের সাথে ভেতরের রসনার জল উদ্রেককারী আয়োজনের খবর— যা দেখে ‘ব্রাহ্মণের পৈতা ছিঁড়িতে ইচ্ছা হইবে!’ মানে খাওয়ার লোভ হবে। উল্লেখ্য যে আমাদের তৎকালীন সমাজে ব্রাহ্মণরা অন্যের বাড়িতে খেতো না এবং ব্রাহ্মণদের এ লোকাচার রোকেয়ার অজানা ছিল না। তাছাড়া, গ্রাম বাংলার অবস্থাপন্ন-স্বচ্ছল বাড়ির রান্নাঘরের চিত্র আজও অপরিবর্তিত রয়েছে। ভেতরে জিহ্বায় জল উদ্রেককারী খাবারের সামগ্রী আর বাইরে আবর্জনার অপরিচ্ছন্ন স্তূপ।

বেগম রোকেয়া তাঁর রচনায় ‘প্রবাদ আছে’ শব্দ দু’টি বহুবার উল্লেখ্য করে বিভিন্ন প্রবাদ ব্যবহার করেছেন। ‘রসনা-পূজা’ নামক রম্য রচনায়ও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

লোক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন “যা না করে বৈদ্যে, তা করে পৈথ্যে।” অর্থাৎ রসনা বা জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অনেক রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়; রোগের আক্রমণ থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। তিনি আরও বলেছেন— “একটা বচন আছে; মৃত্যুর পূর্বে মরিয়া থাক।”

রসনা-পূজা নামক রম্য রচনার সারমর্ম আজও আমাদের পরিবারে বিরাজমান এবং এতে আমাদের চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য রোকেয়া যে নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন তার প্রতিফলন পাই।

“কবে মুসলমান “মানুষ” হইবে। রসনা পূজা ছাড়িয়া ঈশ্বর পূজা করিতে শিখিবে।” এরই সারমর্ম ধ্বনিত নীচের প্রবচনটিতে— –
“মুসলমান করে হাঁড়ি
হিন্দু বানায় বাড়ি
আর ব্রিটিশ কিনে গাড়ি।”
এখানে হাঁড়ি বলতে খাবারের সরঞ্জাম বুঝানো হয়েছে। মুসলমান খেয়ে সব ধন সম্পদ মজিয়ে ফেলে বলে বাংলার লোক সমাজের ধারণা রয়েছে। বেগম রোকেয়ার রচনায়ও যার প্রতিফলন।

ঈদ ও দূর্গা পূজা বাংলার লোক সমাজে সর্বজনীন উৎসব হিসেবেই পরিচিত। সর্বজনীন মানে সকলের জন্যে মঙ্গলকর এ সব উৎসব। আর আবহমান আমেজে উদ্দীপ্ত বেগম রোকেয়া সর্বজনীনতার মূলমন্ত্রটি তাঁর অন্তরে ধারণ করতেন। তাই তো ‘ঈদ-সম্মিলন’ নিবন্ধে লিখেছেন— “এমন শুভদিনে আমরা আমাদের হিন্দু ভ্রাতৃবৃন্দকে ভুলিয়া থাকি কেন? ঈদের দিন হিন্দু ভ্রাতৃগণ আমাদের সহিত সম্মিলিত হইবেন, এরূপ আশা কি দুরাশা? সমুদয় বঙ্গবাসী একই বঙ্গের সন্তান নহেন কি?” লোকজ অসাম্প্রদায়িক চেতনার সাথে রোকেয়ার উদাত্ত একাত্মতা। অসাম্প্রদায়িকতা লোক সংস্কৃতির প্রধানতম আদর্শ ও আকাঙ্ক্ষা,ভাব ও ভাবনা, সুর ও সারবস্তু যা বেগম রোকেয়ার রচনায় উল্লেখযোগ্যভাবে প্রতিয়মান।

ডঃ আহমদ শরীফ ‘বিচিত চিন্তা’ প্রবন্ধ গ্রন্থের ‘জাতীয় জীবনে লোক-সাহিত্যের মূল্য’ নামক প্রবন্ধে বলেছেন— ‘আমাদের ছড়া, প্রবাদ, প্রবচন,গান, গাথা ও রূপকথা নিশ্চিতই প্রাকৃতজনের সৃষ্টি।’ বেগম রোকেয় প্রাকৃতজনের সে সব সৃষ্টিকে অবলীলায় ও অনায়াসে প্রাসঙ্গিকভাবে ব্যবহার করেছেন—দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া। তাঁর রচনায় প্রবাদ, প্রবচন, লোকগাথা ও রূপকথার ব্যবহার লোকজীবন তথা গ্রামীণ বাঙালীর ঐতিহ্যবোধের সাথে একাত্মতার বহিঃপ্রকাশ বৈ তো নয়!

মুসলমান সমাজ বেগম রোকেয়া থেকে ১০/১২ বৎসর পরে স্ত্রী শিক্ষার গুরুত্ব বুঝেছেন। তাই তিনি সখেদে “সিসেম ফাঁক” রচনায় বলেছেন— ‘গরীবের কথা বাসি হইলে ফলে; আমার কথাও (১০/১২ বৎসরের) বাসি হইয়া ফলিয়াছে।’ এতে একদিকে বাংলার সামন্ত সমাজে গরীবের মতামতের মূল্যহীনতার তথ্য আর অন্যদিকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অবস্থানগত চিত্র যা প্রবাদের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। বহুল প্রচলিত কাঙাল শব্দের পরিবর্তে গরীব শব্দটি ব্যবহার করেছেন মাত্র।

হাজার বছরের চাষীর যাপিত জীবন ও জগতের চিত্র রোকেয়ার “চাষার দুক্ষূ” প্রবন্ধে:

“ক্ষেতে ক্ষেতে পুইড়া মরি, রে ভাই,
পাছায় জোটে না ত্যানা।
বৌ -এর পৈছা বিকায় তবু
ছেইলা পায় না দানা।”

তিনি ‘ধান ভানিতে শিবের গান কেন’ প্রবাদটি বলে নিজেই এর কৈফিয়ৎ দিলেও এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে কোন প্রশ্ন করার ফুসরৎ নেই। চাষার দীন হীন অবস্থার সুর পাই ‘পাছায় জোটে না ত্যানা’ বলে যখন আক্ষেপ করেন। ‘ত্যানা’ শব্দটিও লোক জীবনাচারের অংশ। আর ‘ছেইলা পায় না দানা’ তো চাষার পরিবারের অপরিবর্তিত দৃশ্য। আজও ফসল উৎপাদনকারী চাষীর ঘরে দানা অর্থাৎ খাবারের অভাব। অভাবগ্রস্থ এ যাপিত জীবন চিরায়ত গ্রামীণ সমাজের কাঠামো।

“একটি চাউল পরীক্ষা করিলেই হাঁড়ি ভরা ভাতের অবস্থা জানা যায়।” “চাষার দুক্ষূ” প্রবন্ধে ব্যবহৃত এ প্রবাদের মতো আমারাও বেগম রোকেয়ার প্রবাদ, প্রবচন, গান ও গাথা ব্যবহারের দু’একট নমুনা পড়েই তাঁর জীবনে এ সবের প্রভাব, প্রতিফলন ও প্রভূত্ব করার উত্তাপ পাই।

‘রংপুর জেলার কোন কোন গ্রামের কৃষক এত দরিদ্র যে, টাকায় ২৫ সের চাউল পাওয়া সত্ত্বেও ভাত না পাইয়া লাউ, কুমড়া প্রভৃতি তরকারী ও পাট-শাক, লাউ শাক ইত্যাদি সিদ্ধ করিয়া খাইত।’ এ লাইন কয়টিতে শত বছর যাবৎ ‘উত্তর বঙ্গে মঙ্গার’ উপস্থিতির ইতিহাস পাই। জমিদার কন্যা রকু অন্তঃপুরবাসিনী হয়েও উত্তর বঙ্গে মঙ্গার ক্ষুধার জ্বালা কীভাবে উদরে অনুভব করলেন তা নিয়ে গবেষোণার প্রয়োজন বৈ কি! রংপুরের মাটির সাথে তাঁর অস্তিত্ত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশদারিত্বের প্রথম উল্লেখও পাই “চাষার দুক্ষূ” প্রবন্ধে।

‘বঙ্গীয় নারী- শিক্ষা সমিতি’ প্রবন্ধটি বঙ্গীয় নারী- শিক্ষা সম্মেলনে সভানেত্রী হিসেবে লিখিত অভিভাষণ। এ ভাষণে নিজেই বলেছেন— –
‘আমি আজীবন কঠোর সামাজিক ‘পর্দার’ অত্যাচারে লোহার সিন্দুকে বন্ধ আছি —-ভালরূপে সমাজে মিশিতে পারি নাই—–’; কিন্তু সিন্দুকে বন্ধ থেকে — বন্দী থেকে কী করে মুক্ত জীবনাভিজ্ঞতার এতো আস্বাদন আমাদের দিলেন! এ লিখিত ভাষণ তিনি সাজিয়েছিলেন বিভিন্ন প্রবাদ, প্রবচন ও পুঁথি থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে। যেমনঃ ‘বলিতে আপন সুঃখ পরনিন্দা হয়”,
“মাতা যদি বিষ দেন আপন সন্তানে
বিক্রয়েন পিতা যদি অর্থ প্রতিদানে”—

অথবা

“ বহুদিন হইল একটি বটতলার পুঁথিতে পড়িয়াছিলাম:
“আপনি যেমন মার খাইতে পারিবে,
বুঝিয়া তেয়ছাই মার আমাকে মারিবে।”
আর লোক সাহিত্যের উপাদানে বটতলার পুঁথি যে ভরপুর তা তো সর্বজন স্বীকৃত।

বেগম রোকেয়ার বড় বোন করিমুন্নেসা খানমকে নিয়ে লিখিত ‘লুকানো রতন’ স্মরনিকায় ‘শাপেই বর’ বাগধারা ব্যবহার করে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছেন বেগম রোকেয়ার লেখা বাংলার ঐতিহ্য থেকে উপাদান নিয়েই রচিত। রামায়ণের রাজা দশরথের উপরে বর্ষিত অভিশাপ আশীর্বাদ হিসেবেই দেখা দিয়েছিল— যা হয়তো কালান্তরে শাপে বর বাগধারা সৃষ্টিতে অবদান রেখেছে।

করিমুন্নেসা লোক সাহিত্যেরই শাখা বটতলার পুঁথি পড়তে গিয়েই বাবার কাছে ধরা পড়ে বাংলা পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। এখানে অবশ্য রোকেয়ার সাথে লোক জীবিনাভিজ্ঞতার যোগসূত্রের ক্ষীণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

‘ধ্বংসের পথে বঙ্গীয় মুসলিম’ নামক লেখায় সাখাওয়াত মেমোরিরিয়াল গার্লস স্কুল নিয়ে বেগম রোকেয়ার আশা-হতাশা, রাগ- ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছিল লোকজ জীবনের চেতনার সাথে একাকার হয়ে:
‘ঘুঘু চরবে আমার বাড়ী,
উনুনে উঠবে না হাঁড়ী,
বৈদ্যেতে পাবে নে নাড়ী –
অন্তিম দশায় খাবি খাব!”

জৈব বংশধরদের জন্যেই ব্যক্তিগত মালিকানার উন্মেষ এবং তাদের ভবিষ্যতের আর্থিক নিশ্চয়তা নিশ্চিন্ত করতেই দুর্নীতির সৃষ্টি।কাজেই “আমার কোন বংশধর নাই’ বলে রোকেয়া তাঁর নিঃস্বার্থ কাজের— উদ্যোগের কথা বলেছেন। এতে বাংলার সমাজ ব্যবস্থায় চর্চিত রীতি নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির সাথে তাঁর গভীর পরিচয়ের ইঙ্গিত মেলে।

রোকেয়া বলেছেন যে তাঁর কোন জৈব বংশধর নেই, কারণ তৎকালীন শুধু নয় এখনো বংশধর বলতে বংশের বাতি দেয়ার জন্যে জৈব উত্তরাধিকারকেই— বাইলজিক্যাল সম্পর্ককেই বুঝানো হয়— যা আমাদের দেশের আম জনতার ধারণা। একদিক থেকে বেগম রোকেয়ার ধারণা ও চেতনায় সে সুরই চর্চিত হয়েছে। তবে বর্তমান নারী আন্দোলনের অনেক নারী কর্মী ও নেত্রী রোকেয়ার চাওয়া ও চেতনার, ভাব ও আদর্শের,ধ্যানের ও ধারণার, কীর্তি ও কর্মের ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক বংশধর ও উত্তরাধিকার।

ঊনবিংশ শতাব্দীর ইয়ংবেঙ্গলদের প্রভাবে ও হুজুকে অনেকের নিজস্ব সংস্কৃতি, আচার-আচরণে এমনকি ভাষা ব্যবহারেও এসেছিল পরিবর্তন যা রোকেয়া তৎকালীন প্রচলিত প্রবচন ব্যবহার করে দেখিয়ে দিয়েছেন— ‘বলেন বিলাতি বুলি; চাকরকে বলেন বেহারা আর মুটেকে বলেন কুলী।”
লোকগাঁথা ‘সোনাভান’ পুঁথি পড়ার তথ্য সহ মুসলমানদের সম্পর্কে যে সব নেতিবাচক ছড়া ছিল তা ও রোকেয়ার জানা ছিল এবং সে সব অবলীলায় উদ্ধৃত করেছেন।
‘মুসলমান বে- ইমান।
মারো জুতা, পাকড়ো কান!’

অথবা:
‘নেড়ে মুসলমান। –
তার না আছে ধন, না আছে মান!’

‘হজের ময়দানে’ রচনায় তিনি হজ ময়দানে তীর্থযাত্রীর মনের কথা প্রকাশ করতে লোকসাহিত্যের আশ্রয় নিয়েছেন:
‘কি যেন স্বপনে হারাই আপনে
মনেই থাকে না এ যে ধরাতল।’

বটতলার পুঁথি থেকে উদ্ধৃত করেছেন:
‘বেহেশতে না যাব মোরা, মেওয়া না খাইব,
দেখিয়া তোমার রূপ এইখানে র’ব।’

‘হজের ময়দানে’ হাজীদের অন্তরের সুর প্রকাশে অজানা কবির কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন,
‘নাহি চাহি ধন –জন- মান, –
নাহি প্রভূ! অন্য কাম!
আহা! এ ময়দান ছাড়িয়া আর কোথাও যাইব না!’

নারী পুরুষভেদে প্রায় প্রত্যেক মুসলিমের এ আকাঙ্ক্ষা। আর তিনি পুরুষের সাথে নারীকেও হজ প্রান্তরে দেখার প্রার্থনা করছেন।

‘নারীর অধিকার’ নামক অসম্পূর্ণ লেখাটি রোকেয়ার মৃত্যুর পরদিন তাঁর টেবিলে পেপার ওয়েটের নীচে পাওয়া যায়। এতে উত্তর বঙ্গের গ্রামে তালাকের যে চিত্রপট এঁকেছেন তা আজও সমগ্র বাংলাদেশের চিত্র।
আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অধঃস্তন অবস্থানের চিত্র বুড়ার বিয়ে করার শখ যা লোক ছড়ার মাধ্যমে প্রকাশিত-—&

“হুকুর হুকুর কাশে বুড়া
হুকুর হুকুর কাশে।
নিকার নামে হাসে বুড়া
ফুকুর ফুকুর হাসে।।‘

এ ছড়াটি ‘নারী অধিকার’ লেখায় ব্যবহার করে দেখিয়েছেন দাম্ভিক পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এমন অনেক আচার- আচরব, রীতি-নীতি হাস্যরসের উদ্রেক করে। তবে তা অবশ্য অনেক নারীর জীবনে নামিয়ে দেয় ঘন অমানিশা।

পদ্মরাগ
বেগম রোকেয়ার লেখা একমাত্র উপন্যাস ‘পদ্মরাগ’ নারীবাদের বিভিন্ন ভাবনার প্রতিফলনের সাথে বাংলার লোক সংস্কৃতির অনেক স্বাক্ষর রয়েছে। সিদ্দিকা তথা পদ্মরাগ— যার আসল নাম জয়নব বেগম রোকেয়ার নারীবাদী চেতনার এক বলিষ্ঠ্য প্রকাশ। এ উপন্যাসের পরিণতি পাঠককে ভাবায়, কাঁদায় ও চিন্তায় ভাসায় বৈকি? পদ্মরাগ ভাঙ্গে তবু মচকায় না। সে নিয়তিকে জয় করে রোকেয়ারই ইচ্ছা শক্তির জোরে। এ উপন্যাসে বিভিন্ন পরিচ্ছেদে ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে গেছে লোক জীবনের রীতি-নীতি, আদব- কায়দা, অভিজ্ঞতা ও চিন্তা-চেতনা।

‘গঙ্গাস্নান’ করে পবিত্র হওয়া আবহমানকাল ধরে হিন্দু ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস। এ বিশ্বাসের খবর অসাম্প্রদায়িক বেগম রোকেয়ার জানা ছিল বলেই সপ্তম পরিচ্ছেদে লিখেছেন —- “ ‘তারিণী-ভবন’ গঙ্গা—ইহাতে এক ডুব দিলেই সকলে পবিত্র হইয়া যায়।‘ গঙ্গাস্নানের সাথে সেবাশ্রমকে তুলনা করে লৌকিক জীবনবোধের জয়গান গেয়েছেন।

‘মহাভারত অশুদ্ধ করা’ নিয়ে প্রচুর লোকোক্তি রয়েছে যার প্রতিফলন দশম পরিচ্ছেদেঃ ‘ তুমি দ্বিতীয় বিয়ে করিলে মহাভারত অশুদ্ধ হইবে না’।

বাংলার সামন্ত সমাজের বলির শিকার লতীফ। লতীফের দ্বিতীয় বিয়েতে রাজি হওয়ার অবস্থা বুঝাতে রোকেয়া বলিদানের ছাগল শব্দটি ব্যবহার করেছেন । কোরবানীর খাসী ও বলিদানের ছাগল সমার্থক শব্দ হলেও সচেতনভাবে বলিদানের ছাগল শব্দটি লেখার পেছনে তাঁর পাঠক হিসেবে কী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কথাই বিবেচনায় ছিল? অথবা তখনকার লোকজ সমাজ ধর্মভিত্তিক ভাষা চর্চা হয়তো আত্মস্থ করেনি।

পদ্মরাগের একাদশ পরিচ্ছেদে মনোবিশ্লেষণে প্রবাদ ব্যবহার করেছেন— ‘বেল পাকিলে কাকের বাপের কি?’ য়ার আমরা বলি “গাছে বেল পাকিলে কাকের কি?’

বিভিন্ন অবস্থা বুঝাতে বিস্তৃত বর্ণনা না দিয়ে বহুল প্রচলিত বাগধারা ও প্রবাদ ব্যবহার করে সংক্ষেপেই পরিস্থিতি বুঝিয়েছেন, যেমন দ্বাদশ পরিচ্ছেদেঃ ‘ দিদির কথাই বেদবাক্য’, ‘শাপে বর।’ অথবা ‘দশচক্রে ভগবান ভূত’ ।
চতুর্দশ পরিচ্ছেদে— স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন যাপনেও ঊষা রাণীর শাঁখা পরা নিয়ে “ছাড়ব না হাতের শাঁখা, ঐটি সধবার নিশানা!” লোক বিশ্বাসের নমুনা; যা আরেকটি প্রবচন মনে করিয়ে দেয়— –
‘স্বামী নাই পুত্র নাই কপাল ভরা সিঁন্দুর
বেড়া নাই দুয়ার নাই ঘর ভরা ইঁন্দুর।‘

মতিচুর দ্বিতীয় খন্ডের ‘জ্ঞানফল’ নামক রূপকথায় মতো বেগম রোকেয়া মহাভারতের রচনাশৈলীর অনুকরণে ‘পদ্মরাগ’ উপন্যাসে দুই লাইন পয়ার লিখেছেনঃ

‘ হেলেন- বিবাহ কথা অনল যেমতি
ব্যথিতা সকিনা ভণে শুনে দয়াবতী।’

এখানকার ‘ আরসী আনছি, কাঁকই আনছি। চুল বান্ধনের ফিতা আনছি!’ আরসী (আয়না), কাঁকই (চিরূণী) আর বান্ধন (বাঁধার) আঞ্চলিক শব্দত্রয় দিয়ে তৈরী বাক্যটিতে বেগম রোকেয়ার লোকভাষা ব্যবহারের নমুনা পাই ‘পদ্মরাগ’ উপন্যাসে।

‘রাঁধা- উননে ফু-পাড়া আর কাঁদার’ চিত্র গ্রামীণ জীবনের প্রাত্যহিকতার সাথে সম্পৃক্ত।

বেগম রোকেয়া তাঁর সৃষ্ট চরিত্রের সংলাপে প্রবাদ, প্রবচন ব্যবহার করে চর্রিত্রগুলোকে আমাদের আপন করিয়ে ছেড়েছেন। যেমন, ষোড়শ পরিচ্ছেদে: ‘উদোর বোঝা বুদোর ঘাড়ে’ চাপানোর চর্চার উদাহরণ তো আমাদের সমাজে যত্রতত্র।

তাছাড়াও,রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিণী লোকজীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত বলেই রোকেয়া তাঁর উপন্যাসের সপ্তদশ পরিচ্ছেদের চরিত্রের সংলাপ –
চারুঃ ‘ আমি দশভুজা দূর্গা হইলে বেশ হইত!’’
পাল্টা সংলাপ –
ঊষাঃ ‘আমি কিন্তু দশমুন্ড রাবণ হইতে চাই – তাহা হইলে এক একটা মাথাকে এক একটা বিষয় চিন্তা করিবার ভার দিতাম!’

অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ রোকেয়ার যাপিত জীবনের আশপাশ থেকেই নেয়া প্রবচনঃ
‘পন্ডিতে বুঝিতে পারে দু’ চারি দিবসে,
মুর্খেতে বুঝিতে নারে বৎসর চল্লিশে।‘

লোকোক্তিতে সংস্কৃত ব্যবহারও ছিল পরিচিত প্রচলন। দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদে একটি লোকোক্তির ব্যবহার— ‘মৌনং সম্মতি- লক্ষণং’ বলিয়া ধরা পড়িবেন।’
চতুর্বিংশ পরিচ্ছেদে নদীমাতৃক বাংলাদেশের লোকের নদীর জল পরিমাপের লোকাভিজ্ঞতার ফলাফল “হরে দরে হাঁটু জল’ বাক্যটি।

“ঢেঁকির আর অন্য কাজ কি আছে?’— সংলাপটি ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানা ছাড়া যে কাজ নেই প্রবাদটিই মনে করিয়ে দেয়।

সপ্তবিংশ পরিচ্ছেদে বেগম রোকেয়া তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ইহজাগতিক চেতনার পরিবর্তে লৌকিক জীবনাচারকে— লোক বিশ্বাসকে তুলে ধরেছেন। এটি হয়তো বা চরিত্র উপস্থাপনের স্বার্থে –সৃষ্ট চরিত্রকে বাস্তবানুগ করতেই করেছেনঃ

‘সতীর দেবতা, পতি জীবনের সার,
তেঁই যাচি পূজিবারে চরণ তোমার’

অন্যান্য লেখা

‘ভ্রাতা- ভগ্নী’ লেখাটি সংলাপ নির্ভর। এক ভাই ও দুই বোনের কথোপকথনে অনেকগুলো প্রবাদ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনঃ
“ টাকা হইলে বাঘের দুধ পাওয়া যায়।“
“ গোষ্ঠির নিকট ফষ্ঠি’’
‘পুত্রের স্নেহ ততদিন পর্যন্ত, যে পর্যন্ত সে স্ত্রীলাভ না করে, আর কন্যার স্নেহ কখনও হ্রাস হয়না।’
‘যেখানে বাঘের ভয়, সেইখানে রাত হয়’
“তুমি আর ক্ষীরে লুন দিও না।“
‘এ নেড়ামাথা লইয়া বেলতলায় আর যাইব না।‘
‘ধরাখানা সরা হেন দেখ’
‘বাহুবলই বল’
‘পড় বাবা মতীজান’
‘নীলকন্ঠের ন্যায় সে বিষ কণ্ঠে ধারণ করিতে হইবে’ শেষেরটি পৌরাণিক কাহিনীর উদাহরণ।

তাছাড়া, ‘তিন কুড়ে’ নামক গল্প যে আমাদের লোক গল্প তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

‘পরী ঢিবি’ গল্পে রূপকথার মোড়কে রকউড কলেজের ছাত্রীদের পরী হিসেবে উপস্থাপন করে বেগম রোকেয়া পাহাড়ের উপত্যকায় তাদের স্বাধীনভাবে পিকনিক উপভোগের চিত্র এঁকেছেন। এও তাঁর নারীর স্বাধীন সত্ত্বা প্রকাশের এক ধরণের কলা কৌশল যা লোকসাহিত্য ভান্ডারের রত্নের আভা নিয়ে নিজের অলংকারে বসিয়েছেন।

লোক সাহিত্য মাত্রই ব্যক্তির সৃষ্টি সমষ্টির সম্পদে পরিণত হয়। ব্যক্তির মালিকানা জাতীয় ঐতিহ্যে বিলীন হয়ে জাতীয়ভাবেই এর অংশীদারিত্ব থাকে। এর অস্তিত্ত্ব মৌখিকভাবে জন থেকে জনে বিস্তৃতি ঘটে। লোক অনুষ্ঠানে লোকের মুখে মুখে ব্যবহৃত হয়,গীত হয়, লোকের অন্তরে অন্তরে প্রীত হয় এ সাহিত্য। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে এ সব সংগ্রহের ও এর লিখিত রূপ দেয়ার উদ্যোগ চলছে। বিশেষ করে ঊনিশ শতকে এর জোয়ার এসেছিল। আর জোয়ারের জল বেগম রোকেয়ার মনও হয়তো বা ভিজিয়েছিল।

অনেক লেখক নিজেদের রচনায় প্রাসঙ্গিকভাবে লোক প্রবাদ, প্রবচন, ছড়া,গাঁথা, গল্প, লোকোক্তি ব্যবহার করে এদের শাশ্বত আবেদনকে প্রাকৃত জীবন থেকে নাগরিক সমাজে ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে দিয়েছেন। বেগম রোকেয়ারও তাঁদেরই একজন এবং এ সবের বিস্তৃততে তাঁর অবদান আমাদের অন্তরে বিরাজমান থাকবে। তিনি লোক সংস্কৃতি ও লোক জীবনের জারিত রসে আন্দোলিত ও উদ্বেলিত হয়েছিলেন।

gitadas2009@gmail.com

free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com