কিস্তি ২

ছফামৃত

নূরুল আনোয়ার | ২৮ আগস্ট ২০০৯ ২:০৭ পূর্বাহ্ন

শুরুর কিস্তি

(কিস্তি ১-এর পর)
sofa-23.jpg…….
আহমদ ছফা (জন্ম. চট্টগ্রাম ৩০/৬/১৯৪৩ – মৃত্যু. ঢাকা ২৮/৭/২০০১)
…….
আমাদের মূল বাড়িটা ছিল দোতলা। তাতে রেলিং বারান্দা ছিল, যদিও ওটা ছিল মাটির ঘর। বাড়িটির ওপরে ছিল টিনের ছাউনি। তার সামনে ছিল লম্বা কাছারি ঘর। কাছারি ঘরের একটা কক্ষে থাকতেন ছফা কাকা। শুনতে পাই, তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি এক সময় ভেঙে গেলে বেশ কয়েক বছর এ কাছারি ঘরটিকে স্কুল হিসেবে ব্যবহার করা হত। মূল বাড়িটা এখন আর নেই। ঊনিশ শ’ একান্নব্বই সালের ঘূর্ণিঝড়ে সেটি ভেঙে গিয়েছিল। পরে ঠিকঠাক করা হলেও ১৯৯৩ সালে বাড়িটি সম্পূর্ণভাবেই নষ্ট হয়ে যায়। যা হোক, মূল ঘর এবং কাছারি ঘরের মাঝখানে ছিল সুবিশাল উঠোন। আমরা ছোটকালে দেখেছি এই উঠোনের একপাশে নানা জাতের ফুলের গাছ। সাধারণত ওই এলাকায় কোনো মুসলিম পরিবার ফুলের গাছ লাগানো হত না। ফুলগাছ লাগাত হিন্দুরা। হয়ত পূজা-অর্চনার জন্য ফুলের দরকার ছিল বলে তারা ফুলগাছ লাগাত। মুসলমানদের পূজাও করতে হয় না, তাই ফুলেরও দরকার পড়ে না। কিন্তু ফুলগাছের জন্য আমাদের বাড়িটা ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এ সকল ফুলের গাছ কাকা হিন্দুপাড়া থেকে এনে লাগিয়েছিলেন। তিনি কারও কাছে গাছ চেয়ে না পেলে পরদিন মালিকের অগোচরে তা উঠিয়ে নিয়ে আসতেন। গাছ লাগানোর যে বাতিক সেটা তাঁর ছোটবেলা থেকে ছিল।

ফুলের পাশাপাশি তাঁর আরেকটা জিনিসের প্রতি আগ্রহ ছিল সেটি হল বই। কোনো বই পছন্দ হলে সেটি হাতে না পাওয়া পর্যন্ত নিস্তার ছিল না। একটা ঘটনা এরকম :

sofa-jonmo-bari.jpg…….
যে বাড়িতে আহমদ ছফা জন্মেছিলেন। আড়াই তলা এই মাটির বাড়িটি এখন আর নেই। ছবি: আহমদ ছফা ১৯৯১
……..
কাকা হিন্দুপাড়ার কালি মন্দিরে গিয়ে দেখতে পান রামায়ণ, মহাভারত। তাঁর ইচ্ছে তিনি বই দুটি এনে পড়বেন। কিন্তু মন্দিরের ঠাকুর মশায় তাঁকে বই দুটি দিতে রাজি নন। পরের দিন ছফা কাকা কোন ফাঁকে গিয়ে বই দুটি নিয়ে আসেন। ঠাকুর মশায় তাঁর বই না পেয়ে ধারণা করেছিলেন এটা ছফারই কাণ্ড। তিনি হন্তদন্ত হয়ে আমাদের বাড়িতে ছুটে এসেছিলেন। হিন্দুদের সঙ্গে আমাদের পরিবারের একটা সুন্দর সম্পর্ক ছিল। ফলে আমার দাদা তাঁকে বসতে দিয়ে আপ্যায়ন করিয়েছিলেন। নানা কথা বলতে বলতে তিনি সবিশেষ জানতে পেরেছিলেন ছফা কাকা কালি মন্দির থেকে বই চুরি করেছেন। ছেলের এমন অপকর্মের কথা শুনে আমার দাদা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন। ইতোমধ্যে ঠাকুর মশায়ের আগমন টের পেয়ে ছফা কাকা আগেই সরে দাঁড়িয়েছেন। দাদার অক্ষরজ্ঞান বিশেষ ছিল না। তাই কোন বই চুরি করেছেন তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। পরে ছফা কাকার পড়ার ঘরে ঢুকে ঠাকুর মশায়ই বইগুলো নিজের হাতে বিচরিয়ে বের করে নিয়ে গিয়েছিলেন। ঘটনাটি এখানে থেমে থাকলে ভাল হত। কিন্তু ছফা কাকা দমবার পাত্র ছিলেন না। পরের দিন তিনি আরেকটা অঘটন ঘটিয়ে বসলেন। শুনতে পাই তিনি কোথা থেকে একটা মরা গরুর হাঁড় এনে মন্দিরে টানিয়ে দিয়েছিলেন। ঠাকুর মশায় উপায়ন্তর না দেখে আবারও আমার দাদার কাছে নালিশ করতে এসেছিলেন। এবার তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি ছফা কাকাকে ধরে খুব করে পিটিয়েছিলেন। পরে দাদা নাকি নিজেই গিয়ে এ হাঁড়খানা মন্দির থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। একটা কথা বলে রাখা ভাল, ছফা কাকা এই কর্ম হিন্দু ধর্মের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে করেছেন সেটা ঠিক নয়। তাঁর রাগটা ছিল ঠাকুরের ওপর। পরবর্তীতে আমরা তো তাঁর লেখায় দেখতে পাই তিনি মনমোহন আচার্যের মায়ের কাছে গিয়ে রামায়ণ-মহাভারত মুখস্থ করেছেন। আবার পার্বত্যচট্টগ্রামের আদিবাসীদের রামায়ণ-মহাভারত শিক্ষা দিয়েছেন।

ছফা কাকার স্মরণশক্তি ছিল খুবই প্রখর। একবার তিনি আমাকে বললেন, হিন্দুপাড়ার সেই কালি মন্দিরটি টিকে আছে?

আমি বললাম, মন্দিরটিতে এখন পূজো দেয় না। দেয়ালে বিশাল ফাটল। ফাটলের কারণে একটা দেয়াল খাত হয়ে আছে। দেয়ালগুলো বট আর অশ্বত্থ বৃক্ষ দখল করে নিয়েছে।

তিনি বললেন, সংস্কার করতে কত টাকা লাগবে?

সংস্কার করে লাভ হবে না। করলে নতুন করে করতে হবে।

তিনি স্বভাবসুলভ একটা শিস দিলেন। কোনো কিছু মনে না ধরলে তিনি এ রকম শিস দিতেন। আমি ঠাকুর মশায়কে নিয়ে যে ঘটনাটি ঘটেছিল তার সত্যতা জানতে চাইলাম। তিনি শিশুসুলভ একটা হাসি দিলেন।

ছফা কাকার এক বন্ধুর কাছে জানতে পেরেছিলাম ছফা কাকা ঘর থেকে নানা জিনিসপত্র নিয়ে বিক্রি করে দিতেন। একবার তিনি ধানের বস্তা বিক্রি করে ধরা পড়ে যান। দু’হাতে পয়সা খরচের বিষয়টি তাঁর ছোটকাল থেকে ছিল। হাতে টাকা না থাকলে দোকান থেকে বাকি চেয়ে নিতেন। অনেক সময় সেই টাকা আমার দাদা অথবা বাবাকে পরিশোধ করতে হত। যতদূর জানতে পারি, আমার দাদার চাইতে আমার বাবার কাছে তিনি বেশি প্রশ্রয় পেতেন। দাদা তাঁর এসব কর্মে মাঝে মাঝে অধৈর্য হয়ে উঠতেন।

আমার দাদা ছফা কাকাকে রৌশন্যা বলে ডাকতেন। আমাদের এলাকায় রৌশন্যা নামে এক সিঁধেল চোর ছিল। দাদা বলতেন, আহমদ আমার বংশের কলঙ্ক। আহমদ বড় হয়ে রৌশন্যার মত চোর হবে। সে আমার বংশের কলঙ্ক।

sofa-kachari-ghor-jekhane-thakten.jpg……
কাছারি ঘরের পেছন দিক; এ ঘরের একটি কামরায় ছফা থাকতেন মেট্রিকুলেশন পর্যন্ত। ছবি: আহমদ ছফা ১৯৯১।
……..
ছফা কাকার যাঁরা বড় ছিলেন সকলে তাঁকে আহমদ বলে ডাকতেন। এখনও অনেকের মুখে এই আহমদ শব্দটি শুনতে পাই। ছফা কাকা রৌশন্যার মত চোর হবেন এটা বোধকরি দাদার মনের কথা ছিল না। কোনো বাবা তো চান না তাঁর ছেলে চোর হোক। মনের রাগ-ঝাল মেটানোর জন্য তিনি কাকাকে হয়ত নানাভাবে অপবাদ দিতেন। একথা সত্য ছফা কাকা মিথ্যা কথা এবং চুরি বিদ্যাটি সমান তালে করতেন। তবে চুরি জিনিসটি নিজের ঘর ছাড়া বাইর থেকে নয়। তাঁর লেখা থেকে জানা যায় তিনি খুব মিথ্যা বলতেন। তাঁর স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্রী বিনোদ বিহারীবাবু তাঁকে এই মিথ্যা থেকে সরিয়ে এনেছিলেন।

আরও একটা নিষ্ঠুর খেলায় তিনি মেতে থাকতেন। তাঁর পকেটে সব সময় একটা দিয়াশলাই থাকত। আগুন নিয়ে খেলা করা তাঁর খুব পছন্দ ছিল। কারও ক্ষেতের বেড়ায় কিংবা খড়ের পাড়ায় সুযোগ পেলে আগুন লাগিয়ে দিতেন এবং দূরে বসে বসে তা উপভোগ করতেন। এ নিয়ে দাদার কাছে প্রায় সময় নালিশ আসত। এমন কি তার জন্য দাদাকে ক্ষতিপূরণও দিতে হত।

আমি আরও একটা ঘটনার কথা জানি। ছফা কাকা নিজের মুখে আমাকে শুনিয়েছিলেন। ঘটনাটি এ রকম: তখন রমজান মাস। সময়টি ছিল বর্ষাকাল। বাড়ির উত্তরে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে আবদুল হামিদ তালুকদারের মসজিদ। তখন ওই মসজিদে অনেকে দিনের বেলায় একা যেতেও সাহস করত না। মাটির দেয়ালের মসজিদ, ওপরে ছিল টিনের ছাউনি। এক পাশে বিশাল পুকুর এবং তিন পাশ জুড়ে ছিল কবরস্থান। কবরস্থানে বাঘ লুকিয়ে থাকতে পারে এমন ঝোপ-ঝাঁড়। বড় বড় বটবৃক্ষ। বেশিদিন আগের কথা নয় এ সকল বৃক্ষ কর্তন করে ইট পোড়ানো হয়েছে। সে ইট দিয়ে মসজিদ পাকা করেছে। এ মসজিদ ভিটি নিয়ে এখনও অনেকে গল্প করে সেখানকার বড় বড় বৃক্ষগুলো ছিল জ্বীন-পরীর আস্তানা।

ছফা কাকা মেট্রিক দেয়ার পর একবার গভীর রাতে সে মসজিদে গিয়েছিলেন। সে রাতটি ছিল ভয়ানক আতঙ্কের। ঝড়-বৃষ্টি একসঙ্গে নেমেছিল। ছফা কাকার উদ্দেশ্য মসজিদে গিয়ে কোরান পড়বেন। মসজিদের পাশে তাঁর নানাকে কবর দেয়া হয়েছিল। তিনি কবরটিও জেয়ারত করবেন। নানা ছিলেন পরহেজগার লোক। লোকমুখে প্রচারিত ছিল তিনি আউলিয়া হয়ে গেছেন। ছফা কাকার ইচ্ছে হল তিনি এক মনে নানার কাছে কিছু প্রার্থনা করবেন। নানা তো আর নাতিকে কিছু না দিয়ে ফিরিয়ে দিতে পারবেন না।

যাক, ছফা কাকা মসজিদে ঢুকলেন। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে কোনো কিছুই আঁচ করা যাচ্ছিল না। তিনি কোনো রকমে মসজিদের এক কোণা থেকে দিয়াশলাই আর মোমবাতি খুঁজে বের করেছিলেন বটে, কিন্তু আলো জ্বালানো তাঁর পক্ষে এক রকম কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মসজিদের তিন পাশে ছিল জানালা। কিন্তু জানালাগুলোতে কোনো কপাট ছিল না। হু হু বেগে বাতাস একদিক দিয়ে ঢুকে অন্যদিকে বেরিয়ে যেতেছিল। বাতি জ্বালানো তো দূরের কথা, নিজেকে রক্ষা করাটাই যেন এক রকম মুশকিল হয়ে পড়েছিল। এ পরিস্থিতিতে বাতি জ্বালানোর চেষ্টা না করে তিনি অন্ধকারে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলেন। হঠাৎ দেয়াল থেকে একটি মাটির দলা ভেঙে তাঁর পায়ের কাছে পড়ল। তিনি চমকে উঠলেন। পরক্ষণে আরেকটা। এভাবে আরও। তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। নিজেকে স্থির রাখার মত অবস্থা তাঁর ছিল না। ভয়ে তিনি মসজিদ থেকে বেরিয়ে পড়লেন। বাইরে সাপ-বিচ্ছুর ভয়ও কম নয়। কিন্তু উপায় কী। মসজিদ ভিটির পাশে বইরগুনি নদী (এ নদীকে ঘিরে তিনি সূর্য তুমি সাথী উপন্যাসের পটভূমি তৈরি করেছিলেন), পাহাড়ি ঢলে তখন দু’পাড় ডুবে যাবার মত অবস্থা। এ ভয়াল রাতে কোনো রকম উপায় না দেখে তিনি নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তারপর স্রোতের অনুকূলে ভাসতে ভাসতে বাড়ির সামনে গিয়ে পাড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

এত রাতে এ ভেজা শরীরে বাড়ির কেউ তাঁকে সহজে মেনে নেবেন না, ব্যাপারটি তিনি ভাল করে আঁচ করতে পেরেছিলেন। এমন কি মার খাওয়ার ভয়ও ভেতরে ভেতরে কাজ করছিল। তখন সেহরির সময় হয়ে গেছে। বাড়ির সকলে খানাপিনায় ব্যস্ত। কোনদিকে কী ঘটছে সেদিকে খেয়াল রাখার অবকাশ কারও নেই। ছফা কাকা কেউ যাতে টের না পায়, বিড়ালের মত ধীর পায়ে ঘরে ঢুকেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য সিন্দুক খুলে টাকা নেবেন। সিন্দুক খুলেছিলেন বটে, কিন্তু সেখানে কোনো টাকা তিনি পেলেন না। বহুকাল আগে থেকে সিন্দুকে একটি সোনার মোহর রাখা ছিল, সেটি নিয়ে তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। মোহরটির বিনিময়ে তিনি বানিয়ার কাছ থেকে বিশেষ টাকাও পাননি। বানিয়া হাতে তোলা কিছু টাকা তাঁকে দিয়েছিলেন। তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন, তাঁর ধারণা, এ মোহরটি আউলিয়া নানাই তাঁকে দিয়েছেন।

মোহর বিক্রির টাকা নিয়ে তিনি চট্টগ্রাম শহরে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি একটা বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। একা পথ হাঁটছিলেন তিনি। হঠাৎ অল্প বয়সী একটা ছেলে তাঁর পা ধরে কান্নাকাটি আরম্ভ করে দিল। ছেলেটি সারাদিন কিছু খায়নি। সে তাঁকে এমনভাবে বলল, একটি কাজ যোগাড় করে দিতে পারলে তার খুব উপকার হয়। তিনি ছেলেটির সব কথা বিশ্বাস করে তাঁকে একটি পরিচিত হোটেলে নিয়ে গেলেন। সেখানে তাকে নিজের পয়সায় খাইয়েছিলেন। তারপর মালিককে অনুরোধ করেছিলেন তার হোটেলে যেন ছেলেটিকে একটি কাজের ব্যবস্থা করে দেন। হোটেল মালিক প্রথমে না করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে রাজি হতে হয়েছিল। ছেলেটি কোনো অপরাধ করলে সেজন্য ছফা কাকা দায়ী থাকবেন–এ শর্তে ছেলেটিকে কাজ দিলেন দোকান মালিক। কিন্তু ওই রাতে ছেলেটি ড্রয়ার ভেঙে বেশ কিছু টাকা নিয়ে চলে যায়। এ অপকর্মের দায়ভার হোটেল মালিক স্বাভাবিকভাবে ছফা কাকার ওপর চাপিয়েছিলেন এবং টাকা দিতে বাধ্যও করেছিলেন। কিন্তু উপস্থিত মুহূর্তে চুরি যাওয়া অত টাকা তাঁর পকেটে ছিল না। এ টাকার জন্য হোটেল মালিক তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। প্রায় পনের দিন তাঁকে জেল খাটতে হয়েছিল। আমাদের গ্রামে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নামে একজন খ্যাতনামা উকিল ছিলেন। তিনি সংবাদ পাঠালে বাবা গিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে এনেছিলেন।

ছফা কাকা যে ডানপিটে ছিলেন একথা তিনি স্বীকার করেছেন তাঁর এক সাক্ষাৎকারে এভাবে–

“মীজান: আপনি কৈশোরে খুব ডানপিটে ছিলেন? যেমন আপনি বলেছেন, ছেলেবেলায় আপনি হুট করে বৌদ্ধমন্দিরে চলে গেলেন। ওখানে থাকলেন।

ছফা: ডানপিটে একটুখানি ছিলাম তো বটে। কিন্তু ছেলেবেলায় আমার খুব অসুখ থাকত। হ্যাঁ, বৌদ্ধমন্দিরে আমি গিয়েছিলাম, কিন্তু থাকা হয়নি। ভগবান বুদ্ধের প্রতি আমি এখনও একটা গভীর টান অনুভব করি। খুবই সৌভাগ্যের কথা, লালন ফকির তাঁর গানগুলোতে বুদ্ধের শিক্ষার কিছু অংশ বাঁচিয়ে রেখেছেন। কখনও আমার প্রাণ চায় আমি ধর্মকর্ম করি। আমি মন্দিরে প্রার্থনা করেছি, গীর্জায় অংশ নিয়েছি। বৌদ্ধমন্দিরে প্রার্থনা করেছি। মসজিদ তো বলাই বাহুল্য। আমি ধর্ম বলতে এমন একটা জিনিসকে বুঝি, আমার নিজের অস্তিত্বের চাইতে বড় এবং স্থায়ী একটা ক্রিয়াশীল শক্তি সমস্ত কিছুকে বেষ্টন করে রয়েছে। এ মহাশক্তির প্রতি প্রণিপাত করার মানসিকতা, এটাকেই আমি ধর্ম বলতে চাই। যে উপলক্ষটির উদ্দেশ্যে মানুষের চিন্তা ঊর্ধ্বগামী হয় সেই বোধটিকে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি।” (আহমদ ছফা সাক্ষাৎকার সমগ্র, ২০০৯, পৃষ্ঠা ৬৮)

ছফা কাকাকে কেউ আস্তিক, কেউ নাস্তিক বলে জ্ঞান করতেন। কেউ তাঁকে ঘোর মৌলবাদী বলতে পিছ পা হননি। আসলে তিনি কী ছিলেন বলা মুশকিল। কোনো বিশেষ ধমের্র প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্ব ছিল না। তিনি ধর্মপ্রবর্তকদের সম্মান প্রদর্শন করে কথা বলতেন। তাঁর ধর্মবিশ্বাস সম্রাট আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহির মতও নয়। ঊনিশ শ’ তিয়াত্তর সালে মার্চের পাঁচ তারিখ তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিখছেন:

“… তবু চিন্তা এবং কথা, কথায় ও কাজে বিরাট একটা হাঁ রয়ে গেল। মানুষ কি এই পার্থক্য খুঁজতে পারে? বুদ্ধের যে ইতিহাস, খ্রীস্টের যে বর্ণনা, মুহম্মদের (সা.) যে কাহিনী জানতে পারি, পড়ে, শুনে, দেখে মনে হয়, তাঁরা মন এবং মুখ এক করে ফেলেছিলেন। এটি আমাকে অন্তত চেষ্টা করে দেখতে হবে। নিজের মধ্যে একটা পরিবর্তন যদি না আনতে পারি, অন্য সবাইকে পরিবর্তিত হতে বলার কোন অর্থই থাকে না।” (আহমদ ছফার ডায়েরি, ২০০৪, পৃষ্ঠা ২২)

তাঁর সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে ছোটখাট আলাপ আমার হত। আমি প্রথমে মনে করতাম তিনি গোঁড়া মুসলমান। আবার মনে হত তিনি ধর্মের ধার ধারেন না। এ ধরনের চিন্তা মাথায় আসার পেছনে যথেষ্ট কারণ আছে। আমার মনে আছে ছফা কাকা একবার বাড়িতে গিয়েছিলেন। ওইদিন আমাদের বাড়িতে এক বিরাট মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। আমাদের বড় উঠোনে মানুষ দাঁড়ানোর ঠাঁই ছিল না। পুরো উঠোন জুড়ে প্যান্ডেল করা হয়েছিল। উঁচু গাছের ডালে দু’ দুটো মাইক বসানো হয়েছিল। দুজন মাওলানা তশরিফ আনবেন এ খবর আগে থেকে গোটা গ্রাম ঘুরে ঘুরে মাইকিং করা হয়েছে। সারা রাত ধরে এ ওয়াজ মাহফিল চলবে। সময় মত মাওলানা সাহেবরা এসেছিলেন। তাঁরা তাঁদের মত করে ওয়াজ শুরু করেছিলেন। তাঁরা ওয়াজ শুরু করলে আর থামতে চাইতেন না। বেহেশত-দোজখ, স্বামী-স্ত্রী, নামাজ-দোয়া এসব নিয়ে তাঁরা কথা বলছিলেন। মাঝে মাঝে দরুদ শরীফও চলছিল। মাইকের আওয়াজ কান অতিষ্ঠ করে তুলছিল। ছফা কাকা ঘরের ভেতরে ছিলেন। তিনি যে ভেতরে ভেতরে বিরক্তবোধ করছিলেন সেই কথা কে জানত। এক পর্যায়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। বেরিয়ে তিনি মাওলানাদের উদ্দেশে বললেন, হযরত, বেহেশত-দোজখ অনেক পরের ব্যাপার। দুনিয়াতে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। সুতরাং দুনিয়ার মানুষ কীভাবে সুখে বাস করবেন সেসব কথা বলেন। তাঁরা কী নিয়ে ওয়াজ করবেন ছফা কাকা তাঁর বিষয়বস্তুটিও ঠিক করে দিতে পিছপা হননি। তিনি বললেন, আপনারা শুধু যৌতুকের ওপর কথা বলবেন, আর কোনো বিষয়ে তশরিফ আনার দরকার নেই। আমি তখনও এসএসসি পরীক্ষা দেইনি। কদিন বাদে আমার পরীক্ষা আরম্ভ হবে। কী জানি আমার পরীক্ষাকে উপলক্ষ করে এই মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল কিনা। আমাকেও ওই মাহফিলে থাকতে হয়েছিল। ছফা কাকা সেখানে আমাকে দেখে খুবই ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। বললেন, ‘তুমি এখানে কেন, ভেতরে গিয়ে পড়তে বস?’

ছফা কাকার আদেশ অমান্য করার মত আস্পর্দা আমার কখনও ছিল না। আমি ভেতরে চলে গেলাম। মাওলানা সাহেবরা যৌতুকের ওপর ওয়াজ আরম্ভ করে দিলেন। কিন্তু সেই ওয়াজ বেশি সময় স্থায়ী হল না। মনে হল যৌতুকের ওপর বলার মত কথা তাঁদের ঝুলিতে বিশেষ নেই। সেদিন ছফা কাকাকে আমার খুব নিষ্ঠুর মানুষ মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল ধর্মকর্মকে তিনি বিশেষ সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু পরদিন দেখলাম তিনি মাওলানাকে দিয়ে মা-বাবার কবর জেয়ারত করাচ্ছেন, কোরান তেলওয়াত করাচ্ছেন। কবর জেয়ারত এবং কোরান তেলওয়াতের কাজটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে পালন করতেন। আহমদ ছফার চিঠি বইটিতে আমাকে লেখা চিঠিগুলো ঘাটলে তার অনেক তথ্য পাওয়া যাবে। তাঁর মা মারা যাবার তিনদিন পর তিনি বাড়ি গিয়েছিলেন। ওইদিন তিনি খুব কান্না করেছিলেন। মাটিতে গড়াগড়ি করেছিলেন। কবর খুঁড়ে মৃত মায়ের মুখ দেখতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি এ কান্নাকে বলেছেন লোক দেখানো, যাতে আত্মীয়-স্বজনরা মনে করে মায়ের প্রতি ছেলেটার দরদ আছে। এ কথাও তিনি বলেছেন, জীবনে কারও জন্য তিনি চোখের পানি ঝরাননি। কান্না কী জিনিস তিনি জানতেন না। তবে তিনি ভেতরে ভেতরে খুব কষ্ট পেতেন। আহমদ ছফার সাক্ষাৎকার সমগ্র বইটিতে কয়েকবার এ কথাগুলো এসেছে। সেসব কথা থাক। আমি তাঁকে প্রথম মায়ের কবরকে সামনে রেখে কোরান পড়তে দেখেছিলাম। তারপর তাঁকে কোরান পড়তে দেখেছিলাম মিরপুরের বাসায়। প্রতিদিন সকালে একনাগাড়ে অনেকদিন তিনি কাজটি করেছেন। তারপর এক সময় দেখা গেল মাথায় টুপি দিয়ে কোরান হাতে ছুটে যেতে চিড়িয়াখানার কাছাকাছি কুমির শাহ্ মাজারে। শাহ্ আলি মাজারে। এ কাজটিও বেশ কিছুদিন করেছেন। তারপর একদিন এক মাওলানা ডেকে এনে বললেন, আমাকে নামাজটি শিখিয়ে দিন। আমি নামাজ পড়া ভুলে গিয়েছি। মাওলানা সাহেবের কাছে নামাজের ওপর কয়েকদিন তালিমও নিলেন। ছিয়াশি সালের দিকে হবে। তিনি প্রথম জার্মানি যাবেন। ফাউস্ট অনুবাদ তাঁর এ বিদেশযাত্রাকে প্রশস্ত করে দিয়েছিল। যাবার প্রাক্কালে তিনি আমাকে ষোল শ’ টাকা দিয়ে কুমির শাহ্ মাজারে পাঠিয়েছিলেন। মাজারের লোকদের সঙ্গে কথা হয়েছে তারা খিচুড়ি রান্না করে আগত লোকদের খাওয়াবেন। ওইদিন আমাকে সারাদিন কুমির শাহ্ মাজারে থাকতে হয়েছিল। আমি চট্টগ্রামের ছেলে। খিচুড়ি রান্নার চল ওই অঞ্চলে নেই। সুতরাং খিচুড়ির অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। আমি যখন দেখলাম চাল, ডাল, মাংশ, সবজি এক সঙ্গে রান্না করছে আমার কেমন জানি লাগল। এক পর্যায়ে রান্নাটা আমার রুচিতে বাধল। আমার কাছে এটাকে এঁটো ভাতের মত মনে হয়েছিল। এসব অখাদ্য মানুষে খায় কী করে? তাছাড়া যারা রান্না করছিলেন তারাও বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিলেন না। তারা রান্নার ফাঁকে ফাঁকে গাঁজার কল্কিতে দম নিচ্ছিলেন। আমাদের চট্টগ্রামে মাজারে মসজিদে কিছু রান্না হলে খাবার আগে একটু দোয়া-দরুদ পড়ে। এখানে দেখলাম তার কোনো বালাই নেই। রান্না যখন হয়ে গেল সকল গাঁজাখোর একসঙ্গে বসে বড় একটা বাসনে খাওয়া শুরু করে দিলেন। তারা আমাকেও খেতে আহ্বান করেছিলেন। আমি মন থেকে সাড়া পাইনি। বাসায় আনার জন্যও খাবার দিতে চাইলে আমি রাজি হলাম না। আমার মন বলছিল এসব খাবার বাসায় নিয়ে গেলে ছফা কাকা ছুঁড়ে ফেলে দেবেন।

তোপখানা রোডে ছফা কাকার একটা প্রেস ছিল। নাম ছিল ‘সম্ভাবনা মূদ্রায়ন’। তখন উত্তরণ নামের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাও ওখান থেকে বের হত। তিনি ওসব নিজে দেখাশুনা করতেন। সুতরাং বাড়ি ফিরতে তাঁর রাত হয়ে যেত। ওইদিন তিনি একটু আগে আগে চলে এলেন। তাঁর সঙ্গে আরও দু’ তিনজন ছিলেন। উদ্দেশ্য তাঁদের তিনি খিচুড়ি খাওয়াবেন। তিনি আমাকে বললেন, আনু, তাবারুক এনেছ?

আমি বললাম, ওসব খাবার আপনি খাবেন না। তাই আনিনি।

আমি পুরো ব্যাপারটি তাঁর কাছে বয়ান করেছিলাম। তাঁর কাছে ওটি কোনো ব্যাপারই মনে হল না। বললেন, আউলিয়া সাহেব যদি ওদের সহ্য করতে পারেন তোমার এত লাগবে কেন?

এই হল ছফা কাকার ধর্ম-বিশ্বাস।

ধর্মের বাইরে যে জিনিসটিকে তিনি বড় করে দেখতেন তা হল মানুষ।

নাস্তিক্যবাদে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। যাঁরা মনে-প্রাণে নাস্তিকতা পোষণ করতেন তাঁদের তিনি অবজ্ঞাও করতেন না। নাস্তিক বলে খ্যাত ড. আহমদ শরীফকে তাঁর একজন হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে জানতেন। আরজ আলী মাতুব্বরকে তিনি সমগোত্রীয় লোক বলে শ্রদ্ধা করতেন। বার্ট্রান্ড রাসেলের বই অনুবাদ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। আরজ আলী মাতুব্বরের বই আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, লোকটি আস্তিক কি নাস্তিক ওসব বিচার করতে যেয়ো না। তিনি কথাগুলো সত্য বলেছেন কিনা সেটা বিবেচনা করবে।

একবার আমাকে রোকেয়া রচনাবলি পড়তে দিয়েছিলেন। তাঁর একটি রচনা পাঠ করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে তিনি নাস্তিক। আমি কথাটা ছফা কাকাকে বললাম, বেগম রোকেয়া নাস্তিক এটা বিশ্বাস করেন?

তিনি বললেন, হতে পারে। তিনি মানুষ হিসেবে কেমন?

আমি বললাম, অপূর্ব।

তাহলে নাস্তিক-আস্তিকের প্রশ্ন কেন?

একবার সৃষ্টিকর্তা নিয়ে কথা উঠল। তিনি বললেন, কে কীভাবে আল্লাহকে দেখে জানিনে, কিন্তু আমি আল্লাহকে দু’ হাত কাছে থেকে দেখতে পাই। এখানে হয়ত ছফা কাকার সঙ্গে একজন নাস্তিকের পার্থক্য।
কথা প্রসঙ্গ থেকে অপ্রসঙ্গে চলে গেল। ছফা কাকা তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠিত স্কুলের তৃতীয় ব্যাচের ছাত্র ছিলেন এবং এ স্কুল থেকে তিনি প্রাইমারি পাশ করেছিলেন। এ স্কুলে পড়াকালীন সময়ে তিনি কোরান পাঠ শেষ করেন। জানা যায়, এ সময়ে কোরান ছাড়াও আরও দুয়েকটি আরবি ফার্সি কেতাব পড়ার সুযোগ তাঁর হয়েছিল। উল্লেখ পাই, প্রাইমারি স্কুলে থাকাকালীন তিনি রামচন্দ্রকে নিয়ে একটা কবিতা লিখেছিলেন। ছফা কাকা দাবি করেছেন, এটা ছিল তাঁর লেখক জীবনের প্রথম রচনা। এ সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায় তাঁর মধ্যে। তিনি বয়ান করেছেন:

“নিজের সম্পর্কে অনেক অভিমান ছিল। ভাবতাম একটা কিছু হয়ে গেছি। এখন যখন পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকাই এবং আমার লেখালেখির বিষয়ে চিন্তা করি একটা লজ্জাবোধ আমাকে আঁকড়ে ধরে। নিজের সম্পর্কে মানুষের কাছে ঘটা করে জানান দেব, তেমন কীর্তি স্থাপন করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।… প্রথম আমি কবিতা দিয়ে শুরু করেছিলাম। স্পষ্ট মনে পড়ে না, তখন আমি বোধকরি প্রাইমারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। আমি কবিতাটি লিখেছিলাম রামচন্দ্রকে নিয়ে। পেছনে একটু ইতিহাস আছে। আমাদের গ্রামে এখন একজন বড় কবিয়াল রয়েছেন। তাঁর নাম বিভূতিরঞ্জন নাথ। চট্টগ্রাম বেতারে তাঁর গাওয়া জারিগান নিয়মিত পরিবেশন করা হয়। বিভূতিবাবু ছিলেন আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। তিনি হাই স্কুলে উপরের দিকে কোনো একটি ক্লাসে পড়তেন। একদিন বিভূতিবাবুর বাবা জগন্নাথবাবু তাঁর ছেলেকে নিয়ে আমার বাবার কাছে আসেন এবং জানান, দৈনিক আজাদ পত্রিকায় তাঁর ছেলের লেখা মুহম্মদ আলী জিন্নাহর ওপর একটি কবিতা ছাপা হয়েছে।
sofa-20.jpg
একটি পাঠশালায় শিক্ষার্থী শিশুদের সঙ্গে

জগন্নাথবাবু চলে যাবার পর আমার বাবা আমাকে ধমকাতে শুরু করলেন। এই যে জগন্নাথের ছেলে বিভূতি কবিতা লিখে মস্ত কাণ্ড করেছে। আমি তোমার জন্য দুটি মাষ্টার রেখেছি। তুমি কিছুই লিখতে পার না। বাস্তবিকই তিনি দুটি মাষ্টার রেখেছিলেন। একজন বাংলা-ইংরেজি পড়াতেন, আরেকজন ছিলেন মৌলভি সাহেব, তিনি আরবি-ফার্সির তালিম দিতেন। আমি ভীষণ বেকাদায় পড়ে গেলাম। বিভূতি আমার চাইতে দশ বছরের বড়। তিনি কবিতা লিখতে পারেন আমি পারি না কেন! অত ছোট মানুষের হাত দিয়ে কবিতা আসে না। সম্ভব নয়। অগত্যা বাবাকে বলতে হল আমিও লিখতে পারি। তিনি মুখ গোমড়া করে বললেন, ‘লিখে দেখাও।’ জিন্নাহ, পাকিস্তান এগুলো বড় বড় এবং ভারি ভারি বিষয়। আমি ছোট মানুষ আলগাতে পারিনি। অগত্যা রামচন্দ্রকে নিয়ে একটি কবিতা লিখে ফেললাম। রামকে নিয়ে কবিতা লেখা আমার জন্য কঠিন কাজ ছিল না। মনমোহন আচার্যের মা প্রতিদিন দুপুরবেলা গাছতলায় বসে রামায়ণ পড়তেন এবং গল্পটা আমাদের বুঝিয়ে দিতেন। গল্প শোনার লোভে-লোভে রামমোহন আচার্যের মার চারপাশে দুপুরবেলা ঘুর ঘুর করতাম। সে সময়ে রামচন্দ্রকে আমার খুব ভাল লেগে গিয়েছিল। আহা, বেচারিকে চৌদ্দ বছরের জন্য বনবাসে যেতে হল, আবার কোত্থেকে দুষ্টু দুরাচার লঙ্কার রাবণ এসে বউটা কেড়ে নিয়ে গেল। সেই কবিতার দুটি পঙ্ক্তি এখনও মনে আছে :

যেইজন পিতামাতার প্রতি নাহি করে ভক্তি
পরকালে হবে তার নরকে বসতি।

তারপর আমার বাবার কাছে এই কবিতাটি দাখিল করলাম। তিনি পুত্রের এই মহান শিল্পকর্মের প্রচার কীভাবে করা যায় তাই নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমার বাবা নিজে একটি মসজিদ করেছিলেন। এখনও আমাকে প্রতিবছর মেরামতের চাঁদা দিতে হয়। কিন্তু তিনি নামাজ-দোয়া এগুলো নিজে করতেন না। সেদিন ছিল শুক্রবার। আমাকে হুকুম দিলেন, পাঞ্জাবি পর, টুপি লাগাও, চল মসজিদে। গ্রামদেশে জনসমাবেশের উৎকৃষ্ট জায়গা খুঁজে না পেয়ে তিনি মসজিদ বেছে নিয়েছেন এবং আমাকে হাজেরান মুসুল্লি সাহেবদের সামনে রামের কবিতা পাঠ করতে হয়েছিল। সেটা অন্যরকম সময় ছিল, বর্তমান সময় হলে রক্তারক্তি কাণ্ড হয়ে যেত।” (ছফা, খ. ৩, পৃ. ২৩৩)

কিস্তি ৩

nurulanwar1@gmail.com

free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Maroon Horial — সেপ্টেম্বর ৯, ২০০৯ @ ১১:০৭ অপরাহ্ন

      ছফার মুখে কেমন যেন নজরুলী ভাব আছে। এই প্রথম লক্ষ্য করলাম। স্বভাবেও তাই। লেখককে ধন্যবাদ এই নতুন অনুভব উপহার দেওয়ার জন্য।

      – Maroon Horial

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rabbani — সেপ্টেম্বর ১০, ২০০৯ @ ২:১১ অপরাহ্ন

      লেখাটার ধরন এবং মানুষ দুটোই ভালো লেগেছে। বাকি কিস্তিগুলোর অপেক্ষায় থাকবো।

      – Rabbani

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তরিকুল সুজন — ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৫ @ ১১:৫৬ অপরাহ্ন

      ছফা পাঠ মানে কি,আমি জানি না কিন্তু আমার দ্রোহ- ভালবাসার কালে তার প্রতিআমার মনোযোগ আমাকে মানুষ করেছে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com