কবি ও সরস্বতী

ফরহাদ মজহার | ১৭ আগস্ট ২০০৯ ২:৩৭ পূর্বাহ্ন

saraswati.jpg
ইন্দোনেশিয়ার বালিতে দেবী সরস্বতীর মূর্তি। উল্লেখ্য বালিতে জ্ঞানের দেবী হিসাবে সরস্বতীর মূর্তি প্রায় সব স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শোভা পেয়ে থাকে।

গাজী রকিব আমাকে দুটো প্রশ্ন করেছেন। খুবই কঠিন প্রশ্ন। কবিতায় বিবর্তন কী? আমি কী করে জানি? প্রশ্ন করেছেন নিজের কবিতায় আমি যেভাবে বিবর্তিত হই সেই সব কথা যেন বলি। হই কি? কে জানে? আমি উত্তর দেবার ভয়ে দীর্ঘদিন পালিয়ে বেড়িয়েছি। কিন্তু রকিবের প্রশংসা না করে উপায় নাই। আমার জীবনে লেখা আদায় করবার জন্য হাজার বার টেলিফোনের স্মৃতি ভুলবার নয়। আমি এখানে কি আসলে তার প্রশ্নের উত্তর দিলাম? নাকি শুধু টেলিফোনের সাড়া দিয়েছি মাত্র? কিন্তু কিছু যদি এখন লিখে থাকি উত্তর দিয়েছি আন্তরিকভাবেই। কোনো ভনিতা না করে।

প্রশ্ন, ‘কবিতায় বিবর্তন কী?’ খুবই গুরুগম্ভীর প্রশ্ন। মাথা চুলকিয়ে আমি ভাবছিলাম আমি কি ‘কবি’ হিশাবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেব, নাকি কাব্যতত্ত্বের জায়গা থেকে? কাব্যতত্ত্ব কবিতা বানায় না কবিতাকে কবিতা
—————————————————————–
কবি ভাষা ব্যবহার করে—আর দশজন যে-বাংলা ব্যবহার করে—শিক্ষিত, নিরক্ষর, জ্ঞানী অজ্ঞানী কবি বা অকবি—সেই সামাজিক ভাষাটাই কবি ব্যবহার করে, কিন্তু একই সঙ্গে কবিতা মানে সেই ভাষাকে নাকচ করে দেওয়া। অথচ কবির ট্রাজেডি হচ্ছে ওখানে যে বিদ্যমান ভাষা বা অন্য সব কবিরা যে ভাষায় লেখেন সেই ভাষার ইতিহাসের মধ্যে দাঁড়িয়েই কাব্যভাষা কোনো একটা অর্থ, প্রতিক্রিয়া বা ইংরেজিতে যাকে বলে ইফেক্ট—সেটা তৈরি করে। ভাষার মধ্যে থেকেও কাব্য ভাষার বাইরে কী যেন একটা ব্যাপার হয়ে যতটুকু হাজির থাকতে সক্ষম হয় ততটুকুই কাব্য।
—————————————————————-
হিশাবে বুঝতে সাহায্যও করে না, তবে কবিতার সমাজতত্ত্ব, অর্থনীতি, কবিতার গঠনবর্ণনা ইত্যাদি বুঝতে সহায়ক হয়। পদ্যের পয়দা হওয়ার কারণ অন্যত্র। কিছু কিছু জীব আছে সমাজে, যারা সমাজে বাস করে অবশ্যই, কিন্তু আবার ঠিক সমাজে ‘বাস’ করে না। বরং বাস করে জর্মন দার্শনিক হেইডেগার যেমন বলেছিলন—ভাষার মধ্যে। চিহ্নব্যবস্থায়। অবশ্য মানুষ আদৌ ভাষার বাইরে ‘বাস’ করতে পারে কিনা সেটা দর্শনের জগতে একটা বড়সড় তর্ক হয়ে রয়েছে। সমাজের মধ্যে থেকে সেই জীব ইন্দ্রিয়পরায়ণ জগতের মধ্যে নিজেকে নিজে রক্তমাংসের ফাঁদ বানিয়ে বসে থাকে, বড়ই বিচিত্র এই প্রাণী। তার সাধ এখনও যেসব নিরাকার বিষয়াদি শব্দ, অক্ষর বাক্য ইত্যাদিতে ধরা পড়ে নি, সে সেই অধরাকে ভাষায় বা কোনো না কোনো চিহ্নে, দাগে, বর্ণে, বিন্যাসে ধরবে। এই প্রাণীকুলেরই সাধারণ নাম ‘কবি’। বাংলার সাধনার জগতে এটা হচ্ছে কাব্য সম্বন্ধে খুবই প্রাথমিক একটা ধারণা যেখানে কবি এবং সাধক একাকার হয়ে থাকেন। একটা পর্যায়ে উভয়ের পথ আলাদা হয়ে যায়—সেটা অবশ্য ভিন্ন প্রশ্ন। যা এখনো ধরা হয় নি, তাকে কী করে ধরা যায়? এই কায়কারবারের মধ্যে কাব্য এবং ভাব উভয়েরই বিবর্তন ঘটতে থাকে।

হেইডেগারের সঙ্গে বাংলার ভাবের ফারাকটা নোক্তার মতো বলে রাখলে আগামিতে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সিন্ধান্তে যাবার দরকার নাইএখন। প্রশ্ন হিশাবেই তুলে রাখা যাক। যেমন,ফারাকটা কি সম্ভবত ওখানে যে বাংলা অধরাকে ধরবার কায়কারবারকে শুধু ভাষার ব্যাপার বলে গণ্য করে না। অধরাকে ধরা শেষাবধি ভাষাসম্পন্ন শরীরের কীর্তি নয় কি? মানুষের বাইরে তো ভাষা নাই। কিম্বা ভাষার বাইরেও ‘মানুষ’ নামক কোনো ধারণা তৈয়ার হওয়ার সম্ভাবনা নাই। হয়তো মনুষ্য শরীরের মধ্য দিয়ে আদতে প্রকৃতি নিজেই কথাবার্তা বলে? তাই না? অথচ ‘ধরা’ দেয় না। দেখা যাচ্ছে মানুষ ভাষায় ‘বাস’ করে শুধু এতটুকু বললে বাংলার ভাবান্দোলনে চলছে না। ভাষা ও শরীরের সম্পর্ক বিচারের একটা কর্তব্য থেকেই যায়। এই ‘শরীর’-কে আবার শুধু ব্যক্তির শরীর ভাবলেও চলে না, এমনকি সামাজিক শরীর ভাবাও যথেষ্ট নয়। ভাণ্ডে যা আছে ব্রহ্মাণ্ডেও তাই। এই এক অখণ্ড ‘শরীর’ নিয়ে আমাদের গল্প। ভাবান্দোলনের বয়ান। নইলে কে কোথায় কীভাবে বাস করে তার মীমাংসা হচ্ছে না। বাংলার ভাবচর্চা বা সাধারণ ভাবে যাকে আমি ‘ভাবান্দোলন’ বলে থাকি সেই দিক থেকে যদি বিচার করি তাহলে ‘মানুষ’ অধরাকে শুধু কাব্যভাষা চর্চা দিয়ে ধরতে পারে না। সেটা ভাষার ওপর দখল বা ভাষায় দক্ষতা অর্জনের ব্যাপার, কাব্যের বিষয় নয়। বরং অধরার আবির্ভাবের জন্য শরীর তৈরি করা চাই। অর্থাৎ এমন একটা জীবনাচার চাই যা ভাবচর্চার জন্য উপযুক্ত। ভাবুকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বা সাধকের উপযুক্ত চলা ফেরার নিয়ম, খাদ্যব্যবস্থা, করণকর্ম ইত্যাদি। মানুষে মানুষে সম্পর্ক রচনার বিধিবিধান দরকার।

কুস্তিগিরকে যেমন ব্যায়াম করতে হয় নইলে সে কুস্তিগির হয় না, খেলোয়াড় শরীরচর্চা ছাড়া যেমন খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারে না, ঠিক তেমনি কাব্যের জন্যও বিশেষ শারিরীক চর্চা চাই। মনুষ্য শরীরের বাইরে ‘ভাব’ বা ‘ভাষা’ নাই। ঠিক যে যিনি শুধু কবি হতে চান শুধু ভাষাশিল্পী—তাঁর কায়কারবার ভাষার মধ্যে সীমিত রাখাকে আমরা স্বাভাবিক মনে করি এই কারণে যে ভাষা ও শরীরের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে এটা আমরা মনে করি না। কিম্বা পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতাপে আমাদের নিজেদের শরীর নিজেদেরই আর নজরে পরে না। শরীর নিয়ে কথাবার্তা বলতে আমরা শরমিন্দা বোধ করি। কাব্য ও শরীরের সম্পর্ক আমাদের অনুমানের বাইরে থেকে যায়। ভাষাচর্চা ও ভাবচর্চা একই কথা। অথচ ভাষাচর্চা শরীরচর্চা ছাড়া চলে না। বাংলার সাধনা বা ভাবুকতার এটাই কি প্রধান বৈশিষ্ট্যসূচক দিক। কবি যদি শুধু ভাষায় অধরাকে ধরবার সাধ করে থাকেন, তাহলে তিনি বাংলার সাধনার ধারার বাইরে থেকে যাবেন। বড়জোরে হেইডেগার হতে পারবেন তিনি, সেটাও, বলাবাহুল্য, কম কীর্তি নয়। কিন্তু ফকির লালন শাহ হতে পারবেন না। যে কারণে ভাবান্দোলনে সাধক মাত্রই কবি, কিন্তু কবি মানেই সাধক নয়। ঠিক না?
ফকির লালন শাহ থেকে একটা উদ্ধৃতি দিয়ে নোক্তাটা আপাতত কমপ্লিট করে রাখি।

‘অমাবস্যায় পূর্ণিমা হয়
মহাজন সেই দিনে উদয়
লালন বলে তাহার সময় দণ্ডেক রয় না
সময় গেলে সাধন হবে না’

কাব্যের উদয় একই সঙ্গে শরীরে ও ভাষায়। এই কাব্য-মুহূর্ত দণ্ডেক রয় না। এতটুকু বুঝলে এখন আপাতত আমাদের চলবে।

কাব্যতত্ত্ব কবিতা তৈরি করে না। কাব্যের ওপর যখন কাব্যতত্ত্ব হুকুমদারি চালায় তখনও এক ধরনের পদ্য রচিত হতেই পারে। সেই সব তৈয়ারি জিনিসকে কারখানার জিনিসপত্র বলে আমরা উপেক্ষা করি না, কারণ প্রতিটি যুগেই কবি এক ধরনের নন্দনতাত্ত্বিক হুকুমদারির অভিশাপ মাথায় নিয়ে কবিতা লিখতে বসেন। কাব্যতত্ত্বের দিক থেকে কবিতার বিবর্তন বিচারের মানে দাঁড়ায় এই হুকুমদারি—বা কবিতা সম্পর্কে এককটা যুগের অনুমান ও ধ্যানধারণাকে ফাঁকি দিয়ে কবিরা ভাষাকে কীভাবে নতুন ভাবে ‘বসবাসযোগ্য’ করে গড়ে তুলছেন তার ইতিহাস। কবিদের শুধু হুকুমের অধীনে রাখা হলে কবি আর কবি থাকে না। কবি নন্দনতাত্ত্বিক হুকুমদারির প্রজা হয়ে উঠলে সেটা ষোল আনা কবিতারই ক্ষতি। সেটা অকাব্যের যুগ। কাব্যতত্ত্ব কাব্যের মা বা বাবা—কোনোটাই নয়। হতে পারে না, কখনই।

কাব্যতত্ত্বের দিক থেকে কবিতার বিবর্তন সংক্রান্ত সওয়ালের উত্তর অতএব খুঁজতে হবে অন্যত্র। যথেষ্ট কবিতা আছে বলেই, কবিরা আছেন বলেই এই প্রশ্ন ওঠে যে, কবিতা কী? কবিতায় বিবর্তন কী? এইসব। কবিতা হাজির বলেই ‘এটা কী?’—এই প্রশ্ন ওঠে এবং তখন কাব্যতত্ত্বের পয়দা হতে থাকে। হাজার বছরের কবিতার ইতিহাস পড়ে ও গবেষণা করে তাত্ত্বিকরা তখন বলেন, হুঁম, কবিতা বলিতে আমরা পণ্ডিতেরা ইহাই হয় বলিয়া সাব্যস্ত করিলাম—আমার তত্ত্বের নাম কাব্যালংকার শাস্ত্র, কিম্বা আমার থিওরির নাম উপমাবাদ কারণ আমি এই মাত্র প্রমাণ করিলাম উপমাই কবিতা। বিভিন্ন সময়ে বা কালে নানান ধরনের কবিতা বিচার করে কবিতার বিবর্তন হল কীভাবে সেই সকল আদ্ধেক কেচ্ছা আদ্ধেক বানোয়াট কথাবার্তা বলে আরেক ধরনের সাহিত্য রচিত হয়। আলবৎ কবিতার বিবর্তন নিয়ে মোটাসোটা বই লেখা যায়। কবিতার ‘বিবর্তন’ জানবার জন্য যে কেউই উৎসুক হতে পারে। সে সম্পর্কে বিপুল বইপত্র লেখা হোক। সেই সকল ইতিহাস পাঠ ভাষায় বসবাস রপ্ত করবার জন্য কবির কতোটা কাজে লাগে সেটা আজ অবধি তর্ক হয়েই রয়েছে।

দুই.
এর পরের প্রশ্ন, ‘নিজের কবিতায় আপনি যেভাবে বিবর্তিত হন।’ আমার কবিতায় আমি কীভাবে বিবর্তিত হই, নাকি কবিতা আমার মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়? দুই ভাবে দুই দিক থেকে এই প্রশ্ন মোকাবিলা করা যায়। একেকটি প্রশ্ন নিয়েই এককটি বই হয়ে যেতে পারে।

আমি যখন কবিতা লিখতে শুরু করি তখন কবিতা কী সে সম্পর্কে কোনো ধারণা মাথায় নিয়ে লিখেছি মনে পড়ে না। বয়স তখন কত হবে? বারো কি চৌদ্দ। রবীন্দ্রনাথ পড়েছি। ‘কর্ণকুন্তি সংবাদ’ পুরাটাই মুখস্থ। ভানুসিংহের পদাবলীর বেশ কয়েকটা পদ্য মুখস্থ। গান শুনেছি। কীভাবে কবিতা লিখতে শুরু করেছি মনে পড়ে না। তবে একটা স্মৃতি মনে আছে।

আমি বড় হয়েছি এক অর্থে অজ পাড়াগাঁয়—সবে মাত্র ছোটখাট লক্ষণ নিয়ে মফস্বলের শহর গড়ে উঠছে—তার প্রান্ত সীমায়। নোয়াখালি মাইজদি কোর্ট আমার বাড়ি। আমাদের বাড়ির পেছনে কয়েক কদম হাঁটলেই ছিল বন, ওর মধ্য দিয়ে মানুষের হাঁটাপথ চলে গিয়েছে। আমরা কিশোরকুল হাঁটতে হাঁটতে গুলতি খেলতে খেলতে এবং খামাখা মারামারি করতে করতে এই ধরনের বনের অবশিষ্ট অন্ধকার নির্জনের মধ্যে প্রায়ই অনধিকার প্রবেশ করতাম, কিছুদূর হাঁটলে হঠাৎ বড় বড় গাব গাছের ফাঁক দিয়ে চোখের সামনে দড়াম করে তীক্ষ বল্লমের মতো চোখে বিঁধত রেললাইন।

এই যে হঠাৎ চোখের সামনে একদমই অপরিচিত ধাতুর চিৎকার—সবুজের বিপরীতে লোহালক্কড়ের আবির্ভাব—আমাকে এই আকস্মিকতা দারুণ বিচলিত করত। বনের মধ্যে আমার ভয় নাই। বন আমি চিনি। কিন্তু যা চিনি না, অপরিচিত, এবং যা চিনি তার সম্পূর্ণ বিপরীত জগতকে ভয় লাগত কিনা জানি না, কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য রকম এক আশংকা আমার মধ্যে কাজ করত। তার কারণে আমি রেল লাইন চোখে পড়লেই সেই বয়সে শেখা ছড়াগুলো জোরে জোরে চিৎকার করে আবৃত্তি করতে থাকতাম। যখন ছড়া মনে পড়ত না, তখন নিজে বহুবিচিত্র জগাখিচুড়ি ও অর্থহীন শব্দ দিয়ে ছড়া বানাতাম। সেই সবের অর্থ কী আমাকে জিজ্ঞাসা করে লাভ নাই। আমার খেলার সঙ্গীরা যাদের সঙ্গে আমার মারপিট ওদের গালি দেবার ভাষা তৈরি হয়েছে এখানে হয়তো।

কিন্তু সেই প্রায়অর্থহীন—বিস্ময়, ভয় ও আবিষ্কার থেকে উঠে আসা বালকোচিত ধ্বনিসকল আজো আমার কানে বিঁধে আছে। ভয়, বিস্ময় আবিষ্কারের যে ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাকে কী ভাবে ভাষায় ধরব সেই কারিগরি আমি তখনো রপ্ত করি নি। ফলে যা ব্যবহার করতাম সেটা বিচিত্র সব ধ্বনি ও দুর্বোধ্য উচ্চারণ। ঐ ধ্বনির মধ্য দিয়ে ইন্দ্রিয়পরায়ণ জগতকে আমি ধরতে পেরেছি দাবি করতে পারব না। কিন্তু যখন কবিতা লিখতে শুরু করেছি তখন থেকেইে মনে করি কবির কাজ হচ্ছে ভাষাকে ফাঁকি দেওয়া। সেই বিস্ময়-আবিষ্কার-ছমছমানির স্বাদটা কীভাবে কবিতার ধ্বনি ও ভাবের মধ্যে ধরা যায় তাকেই কবির সাধনা বলে মেনে এসেছি।

ds2.jpg…….
কাঠখোঁদাইয়ে দেবি সরস্বতী
…….
আমার কবিতার বিবর্তন? সম্ভবত আমি বিদ্যমান বা অধিপতি ভাষা বা ভাষার ব্যবহারকে কতোটা ফাঁকি দিতে পেরেছি তারই বিবর্তন। কারণ একবার যা ‘ধরা’ পড়ে গিয়েছে তাকে নতুন করে ধরবার পরিশ্রম করে কী লাভ? কবি ভাষা ব্যবহার করে—আর দশজন যে-বাংলা ব্যবহার করে—শিক্ষিত, নিরক্ষর, জ্ঞানী অজ্ঞানী কবি বা অকবি—সেই সামাজিক ভাষাটাই কবি ব্যবহার করে, কিন্তু একই সঙ্গে কবিতা মানে সেই ভাষাকে নাকচ করে দেওয়া। অথচ কবির ট্রাজেডি হচ্ছে ওখানে যে বিদ্যমান ভাষা বা অন্য সব কবিরা যে ভাষায় লেখেন সেই ভাষার ইতিহাসের মধ্যে দাঁড়িয়েই কাব্যভাষা কোনো একটা অর্থ, প্রতিক্রিয়া বা ইংরেজিতে যাকে বলে ইফেক্ট—সেটা তৈরি করে। ভাষার মধ্যে থেকেও কাব্য ভাষার বাইরে কী যেন একটা ব্যাপার হয়ে যতটুকু হাজির থাকতে সক্ষম হয় ততটুকুই কাব্য। ততটুকুই সামাজিক চিহ্নব্যবস্থার মধ্যে কবির নিজের দাগ এঁকে দেওয়া। ভাষাটা সমাজের অথচ কবিতাটা কবির—আশ্চর্য নয় কি? এই পারাডক্সের মধ্যে কবি এবং কবিতা উভয়েরই নিরন্তর আহাজারি চলতে থাকবে। মানুষ যতদিন বেঁচে আছে।

আমি কবিতায় আদৌ কোনো দাগ দিতে পেরেছি কিনা কে জানে? যদি দিয়েও থাকি সেই দাগগুলো আমি নিজেও কি পড়তে পারি? যিনি পড়তে পেরেছেন বা পড়বেন তাঁকেও কি আমি চিনি?

তিন.
আমাদের বাড়ি থেকে কিছু দূরেই মাইজদি কোর্ট শহরের বিখ্যাত দীঘি। এখন আর তার সেই চেহারা নাই। দিনের একটা বড় অংশ আমাদের পানির মধ্যে দাপিয়ে কাটত। দীঘিতে যেতে হোত ধানের ক্ষেত পেরিয়ে। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় চতুর্দিক ফক ফক করত। দারুণ। আর ঠিক সেই সময় দীঘি দখলে চলে যেত পাড়ার মেয়েদের। মেয়েরা সব দল বেঁধে দীঘিতে গোসল করতে যেত।

একবার ভরা জ্যোৎস্নায় দেখি—একদমই একা একজন যাচ্ছেন, নারী, কলসি কাঁখে নিয়ে সেই দীঘিতে। আমি তাঁর পিছু নিলাম দূর থেকে। আমি হাঁটছি, কিন্তু সেই জ্যোৎস্নায় যিনি যাচ্ছেন তাঁর ভয় ডর কিছু নাই। আমি তাঁর পিছু ছাড়ছি না। তিনি দীঘিতে নামলেন। অল্পসময়। এরপর ভেজা কাপড় জড়িয়ে কলস ভর্তি পানি নিয়ে চাঁদের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকালেন আমার দিকে। কতো বয়স আমার? বয়ঃসন্ধিক্ষণ কি?

আমি লুকাতে চাইলাম। কিন্তু খালি মাঠ খাঁ খাঁ। চাঁদ হাসছে। চতুর্দিকে। ভয় নাই। শুধু সবুজে আর হলুদে মাখামাখি করে আলো শুয়ে আছে মাঠে মাঠে।

আমি সেই মুখ দেখলাম। প্রতিটি শিশু যে মুখ জীবনের শুরুতে দেখে।

আমি শুধু বলেছিলাম, ‘আম্মা, আমি।’

তৎক্ষণাৎ সরস্বতীর রাজহাঁস ঝাপট মারল পাখায়। চাঁদ হঠাৎ ফর্শা হয়ে উঠল। ধবধবে। হাতে বীণার বদলে ভরাকলসি বেজে উঠল নদীর কণ্ঠস্বরে।

তিনি, জগজ্জননী, শুধুই হাসলেন।

এই প্রথম আমি সরস্বতীকে। এরপর কতদিন যায়, মনে নাই, তিনি কবিতা হয়ে দেখা দিতে শুরু করলেন।

আম্মা। আমার কবিতা। ইত্যাদি। বুঝতে পারি কবিতার সঙ্গে মা জননীর একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু কোথায় আমি তা গদ্যে ত লিখে বোঝাতে পারব না। গদ্যের এই অক্ষমতাও হয়তো আমার কবিতা লিখবার কারণ। কোথায় আমার কবিতার বিবর্তন? বড়জোর তাঁর রাজহাঁস কয়বার পাখা সাপ্টে দিয়ে আমার অক্ষর ও বাক্য এলেমেলো করতে সক্ষম হয়েছে। অতটুক্টুই।

ব্যস !

৯ চৈত্র ১৪১৫। শ্যামলী

farhadmazhar@hotmail.com

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পরিমল মজুমদার — আগস্ট ১৮, ২০০৯ @ ৪:৩৬ পূর্বাহ্ন

      অসাধারণ। চারবার পড়েছি।

      – পরিমল মজুমদার

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মহসীন রেজা — আগস্ট ১৯, ২০০৯ @ ৮:৫৮ পূর্বাহ্ন

      পড়তে পড়তে আচমকাই শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছে কী যেন থেকে গেল। প্রথম পাঠেই ভাল লেগেছে। আরো বেশ কয়েকবার পড়তে হবে।

      – মহসীন রেজা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাইমন জাকারিয়া — সেপ্টেম্বর ১২, ২০০৯ @ ৫:৫০ পূর্বাহ্ন

      কবি ও ভাবুক ফরহাদ মজহার-এর ‘কবি ও সরস্বতী’র একেবারে শেষাংশে উদ্ধৃত রাজহাঁস, সরস্বতি, কবি ও তার কবিতার অপূর্ব সমন্বয়গাথা পাঠ করে মনের থেকে অকৃত্রিম অবাঁধে বেরিয়ে এলো ‘সদানন্দের সংসারে’র কয়েকটি পঙতি:

      “ওই দেখো একটি রাজহাঁস
      পাখা ঝাপটিয়ে জলের শরীরে
      লিখে যাচ্ছে অনন্ত আনন্দের জয়গান
      তাকে অনুভব করো

      এখান থেকে শহুরে কোলাহল বহুদূর

      তোমাকে পেতে হবে মোহহীন
      অপরূপ জীবন মাধুরী
      যে মাঝি বৈঠা বেয়ে ধেয়ে যাচ্ছে উজানে
      তার কাছ থেকে শিখে নাও গান
      তুমি সাধুর সন্তান ॥”

      বাণীমাতা সরস্বতীর যে রাজহাঁস জলের শরীরে কবিতা লিখতে জানে তা পাঠ করতে যথার্থ কবিরা পারে, তথাকথিত কবিরা কখনোই পারে না। কবি ফরহাদ মজহার তাঁর নিজের কাব্য রচনার পূর্বাপর ইতিহাস বয়ানের সুযোগে নিজের জন্মভুবন, বাল্যের প্রকৃতি, গ্রাম, দীঘি, সন্ধ্যা, দুপুর, রাত্রি, জ্যোৎস্না ও রেললাইনের ধাতুর চিৎকারে ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া যে কবিত্বের জন্মলীলাকে ব্যক্ত করেছেন, তার সঙ্গে আমার নিজের শৈশবের বহু কথা সমুদ্রের উথাল ঢেউয়ের আবেগে আছলে পড়ল।

      আমার শৈশবের চারদিক ঘিরে ছিল সবুজ, বৃক্ষ, লতা-পাতা, বন, নদী, মাঠ, আম, কাঁঠাল, তাল, শিমূল-মান্দার, অশ্বত্থ ও তেঁতুল গাছ। শেষের দিকের গাছগুলো নিয়ে সারা গ্রাম জুড়ে এক রহস্য ছড়িয়ে ছিল, শুনেছিলাম তেঁতুল গাছের পেটের ভেতর জিন-পরীদের বাস, মাঝে মাঝে জিন-পরীরা কাউকে কাউকে ধরে নিয়ে গিয়ে পরীদের রাজ্যে স্থান দিয়ে থাকে। আর আমাদের বাড়ির পূর্ব-উত্তর কোণের একেবারে সীমান্ত ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকা তাল গাছটাই গভীর রাতে জিন এসে বসতো, গ্রামের সবচেয়ে উঁচু শিমূল গাছটাতেও জিনদের আবাস ছিল, আর অশ্বত্থ গাছের মাথা ও শরীর জুড়ে ছিল নানান রকম রহস্য। এই সব রহস্যের কারণে গ্রামের কাউকে বহুদিন ওই গাছগুলোর গায়ে আঘাত করতে দেখিনি। তাই বলে গাছগুলোকে গ্রামের মানুষ যে খুব ভয় করতো তাও নয়, ঠিকই তো দেখেছি গ্রামের মানুষ সারাদিন ওই সব গাছের ছায়ার নিচে বসে বাঁশের চটা দিয়ে গুরুর গোড়া, বাড়ির বেড়া ইত্যাদি তৈরি করছে, এমনকি ক্লান্ত পথিক বিশ্রাম করছে। আমরা শিশুরাও তো ঋতু ঋতুতে ওই রহস্যঘেরা তেঁতুল গাছের নিচ থেকে তেঁতুল, শিমূল গাছের নিচ থেকে শিমূলফুল, আর তাল গাছের নিচ থেকে পাকা তাল কুড়িয়ে আনতাম। বাড়ির পাশের কালী নদীকে নিয়েও রহস্য ও অন্তরঙ্গতা ছিল। আমিও তো বাণীমাতা সরস্বতীর দেখা জলের দেশেই পেয়েছি, এমনকি তাঁর রাজহাঁসের প্রতিও আমার প্রীতির কারণ এই। তাই যখন কাউকে লিখতে দেখি: ‘মানুষ কবিতা লেখে রাজহাঁস লেখে না।’ এ কথা আমি বিশ্বাস করি না। আর কবিতার মতো মর্মবস্তু তো গ্রাম-দেশের ওই রহস্যঘেরা প্রকৃতির মতোই— অর্থাৎ সে আছে খুব কাছাকাছি, তার সঙ্গে কত চেনাজানা, দৈনন্দিন কাজের সম্পর্ক আবার তাকে নিয়েই যত রহস্য, যত দূরত্বের পাঠ। ফরহাদ মজহারের লেখাটা আমার ভেতরে এই অনুভব জাগালো বলে তাঁকেই প্রণাম।

      – সাইমন জাকারিয়া

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আসাদুল আমিন — সেপ্টেম্বর ১৫, ২০০৯ @ ৮:৫০ অপরাহ্ন

      বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে একজন লিখক ‘মেঘ-মল্লার’ নামে একখান গল্প লিখসিলেন। তক্ষশিলার ঘটনা। সেইখানে সুরদাস নামীয় এক আজীবক সন্ন্যাসী দেবি সরস্বতীকে তন্ত্র বলে বন্দিনী কৈরতে চাইসিলেন। প্রদ্যুম্ন নামীয় এক কিশোর বংশীবাদকরে দিয়া মেঘ-মল্লার রাগ বাজাইয়া সরস্বতীকে আনসিলেন। তারে বন্দিনীও কৈরছিলেন। প্রদ্যুম্ন তো সরস্বতকে চিনত না। কিন্তু সরস্বতীকে দেইখা যে বর্ণনা দিসিলেন—তার লগে কবি ফরহাদ মজহারের বর্ণনার অনেকই মিল-ঝিল আইসা পড়তাসে।

      এইডা কি বিভূতিবাবুর পরভাব? নাকি নকল?

      -আসাদুল আমিন

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com