খাগড়াছড়ির ‘সিস্টেম হোটেল’

মীর ওয়ালীউজ্জামান | ১৬ আগস্ট ২০০৯ ১০:১০ পূর্বাহ্ন

system-2.jpg
সিস্টেম হোটেলের প্রবেশদ্বার

মাঘের প্রথমার্ধে খাগড়াছড়ি যাবার তারিখ পড়লো। মেয়ে রুবাই, জামাই সাজ্জাদ, স্ত্রী রুবি এবং আমি–যাত্রীরা সবাই পার্বত্য খাগড়াছড়িতে মাঘের শীতে পর্যুদস্ত হবার আশঙ্কায় প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র সঙ্গে নেবার বিষয়ে একমত হলাম। পার্বত্য ঐ জেলাসদরে সাজ্জাদ বেড়াতে গিয়েছিল গত বছর। আমরা এর আগে যাইনি। পর্যটন মোটেলে ঘর বুক করেছে সাজ্জাদ। ওদের পাড়াতেই পর্যটনের অফিস। কলাবাগানে সাউদিয়ার অফিস থেকে খাগড়াছড়ির কোচের টিকিট নেয়া হয়েছে। রুবাই, সাজ্জাদ আগের দিন সন্ধেয় ব্যাগ এন্ড ব্যাগেজ আমাদের বাসায় চলে এল।

সকাল সাড়ে সাতটায় আমরা কলাবাগান থেকে বাসে উঠব। ভোরে উঠে ব্যায়াম সেরে আমি ওদের ডাকলাম। রুবি, ফরিদা উঠে নাশতা তৈরি করল। ফরিদাকে ছোট শ্যালক মারুফের বাসায় রেখে এলাম আমি। ভোরে রাস্তা ফাঁকা, পুলিশ নেই, পথচারিও নেই। ভোঁ ভোঁ করে শ্যামলী যেতে আসতে মোটে কুড়ি মিনিট সময় গেল। কিছু খাবার ক্যাসারোলে নেয়া হল। ফল আর বিস্কুটও রইল সঙ্গে। ট্যাক্সি পেল না আমাদের কেয়ারটেকার। সাজ্জাদ একটা অটো রিক্‌শ’ ধরে নিয়ে এল। চার প্যাসেঞ্জার, চার ব্যাগ নিয়ে রিক্‌শ’ আমাদের কলাবাগান সাউদিয়ার ডিপোতে নামিয়ে দিল। প্রচণ্ড শীত এবং ঘন কুয়াশা। বাস ছেড়ে দিল। ঢাকা শহরের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে যাত্রী উঠিয়ে যেতে যেতে চালক ৪৫ মিনিট পার করে দিল। কুয়াশা খানিকটা পাতলা হল বটে, কিন্তু সূয্যিদেবের দেখা নেই।

কুয়াশার চাদর যেমন ভারী থেকে হালকা হল ক্রমশঃ, আমরাও তেমনি মেঘনা সেতু, দাউদকান্দি সেতু, ইলিয়টগঞ্জ পেরিয়ে গেলাম। মোটামুটি চারঘণ্টা ধীরেসুস্থে চলে ১১.৩০ মিনিটে চৌদ্দগ্রামে যাত্রা বিরতি করলাম। নেমে টয়লেট সেরে খাবারের সন্ধান করলাম। সঙ্গের খাবার আর রেস্তোরাঁর পরোটা, শাকভাজি, মুরগি ভুনা, গোরু ভুনা আর চা-কফি সহযোগে লাঞ্চ সারা গেল। বেরিয়ে এসে দেখলাম, চালক তখনো আসেননি। কাজেই ধূম্রশলাকা জ্বেলে সদ্ব্যবহারে ব্যস্ত হলাম। রুবি, ছেলেমেয়ে কুমিল্লা খাদির বুটিকে ঢুকল। যাবার সময় আমাদের সাইজের পাঞ্জাবি তুলে নেবে, এই কড়ার করে রুবি যথাসময়ে এসে বাসে উঠল। চালক এসে গেলে আমরাও উঠলাম।

রোদ উঠেছে। বেশ আরাম বোধ হচ্ছে। জ্যাকেট খুলে ভাঁজ করে ওপরের র‌্যাকে রেখে দিলাম। বারইয়ার হাট থেকে বাস বাঁয়ে ঘুরে ফটিকছড়ি, করেরহাট, হেঁয়াকো হয়ে পার্বত্য খাগড়াছড়ির পাহাড়ে উঠে পড়ল। বেশ বড় বাস হলেও টপাটপ্‌ পাহাড় ডিঙিয়ে যেতে লাগল অনায়াসে। বাঁকগুলো বেশ দ্রুতই এসে যাচ্ছে। নিচু পাহাড়ের রেঞ্জে তো এরকমই হবার কথা। বোঝা গেল, চালক এরকম রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে বেশ হাত পাকিয়ে ফেলেছেন ইতোমধ্যে। বেশ ক’বার উল্টোদিক থেকে আসা বাসট্রাক পাশ কাটাতে বেশ কসরত করতে হল। দু’এক জায়গায় একেবারে থেমে গিয়ে আগুপিছু করে অবশেষে এগোনো সম্ভব হল। মোটের ওপর, বাসযাত্রার পাহাড়ি অংশটুকু রোমাঞ্চকর বোধ হচ্ছিল। রুবাই সাজ্জাদকে বোঝাচ্ছিল, শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাবার সংক্ষিপ্ততর চড়াই রাস্তা এখানকার তুলনায় ঢের বেশি থ্রিলিং নাকি!

গুঁইমারা সেনাছাউনির বাইরে বাস দাঁড়াল। জওয়ানরা বাসে উঠে দেখল, সন্দেহজনক যাত্রী অথবা মালপত্তর আছে কিনা। মাটিরাঙাতেও চেকিং হল। কোন বিদেশী পাসপোর্টধারী আছেন কিনা খোঁজ নিল। অবশেষে বেলা ৩টে নাগাদ আমাদের বাস খাগড়াছড়ি শহরে ঢোকবার মুখে চেঙ্গি নদীর এপারে পর্যটন মোটেলের ফটকে দাঁড়িয়ে গেল। এটাই আমাদের স্টপেজ। আমরা চারজন নামলাম। লাগেজ বক্স খুলে আমাদের ব্যাগ নামিয়ে দিল। আমরা ফটকে দাঁড়ানো বন্দুকধারী আর্মড পুলিশকে আমাদের পরিচয়পত্র দেখালাম। ওরা সঙ্গীন উঁচিয়ে অভিবাদন জানাল। একজন আমার ব্যাগটা বয়ে নিয়ে যেতে চাইল। আমি ধন্যবাদ জানিয়ে তাকে তার ডিউটি পোস্ট ম্যান করতে বলে ট্রলি ব্যাগের চাকা গড়িয়ে ওপরমুখী হলাম।

porjatan.jpg…….
পর্যটন কর্পোরেশনের মোটেল
…….
বুঝলাম, মোটামুটি একই স্থাপত্য নক্‌শা অনুসরণে, একই সময়ে নির্মিত হয়েছে পর্যটন কর্পোরেশনের দু’টি মোটেল। একটি কুয়াকাটায়, অন্যটি এই খাগড়াছড়ি সদরে। ২০০৬ সালেই দু’টো মোটেলের যাত্রাশুরু হয়েছিল। ঠ্যাঙামারা মহিলা সবুজ সংঘ বর্তমানে এটি লিজ নিয়ে চালাচ্ছে। আমার মনে হল, মোটেলের দৃষ্টিনন্দন অবস্থান বাদ দিলে সেবার যে মান এরা চালু রেখেছে, সে বিচারে এদের ধার্যকরা সেবার বর্র্ধিত মূল্যতালিকা একটু ‘খবরদার, বুঝেশুনে এখানে উঠবে’ গোছের হয়ে গেছে। ফলে, মোটেলের অতিথি প্রবাহে ভাঁটা পড়েছে এবং প্রতিমাসে এরা লোকসান গুণছে। সেই মাসিক লোকসানের অংকটা পর্যন্ত মোটেলের সেবকদের ঠোঁটস্থ, এটাও বুঝে গেলাম এবং এতে আমার মনটা বেশ দমে গেল। সেটা অবশ্য কাউকে বুঝতে দেব না ভেবে জোরেশোরে উচ্চারণ করলাম, আমি ১৯৭৩ সাল থেকে পর্যটনের অতিথিসেবা নিয়ে অভ্যস্ত এবং মোটামুটি সন্তুষ্টই থেকেছি এতকাল। কাজেই… লেট্‌স ট্রাই এন্ড মেইক দ্য বেস্ট আউট অব দিস স্টেই… এই মনোভাব নিয়ে নিজেকে এবং পার্টিকে চাঙা করতে চাইলাম।

দুপুরে চৌদ্দগ্রামে খেয়ে আসাতে ওই শীত বিকেলে আমরা হালকা কিছু খাব, সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি রেস্তোরাঁ পরিদর্শনে এগোলাম। রুবি, সাজ্জাদ, রুবাই বয়দের সঙ্গে লাগেজ নিয়ে রুম দেখতে গেল। কোণের রোদেলা টেবিল দখল করে, আয়েস করে বসে সিগ্রেট ধরালাম। মারমা ওয়েটার হাসিমুখে মেন্যু এগিয়ে দিল। ওটা সরিয়ে রেখে ওরই পরামর্শে আমি থাই স্যুপ, মোগলাই পরোটা আর চা-কফি ফরমাশ করলাম। ওরা হৈহৈ করে এসে গেল। গরম, ধোঁয়া ওড়ানো স্যুপের বৌলও। একটু একটু চেখে সবাই খুশি। পরোটাও হাজির। বেশ মজা করে খাওয়া শেষ হল। বললাম, রাতে ভাত, মাছ, মুরগি, সবজি, ডাল আর স্যালাড খাব। তারপর হাঁটতে বেরোলাম।

চওড়া, ঢালু ড্রাইভওয়ে বেয়ে আমরা চারজন টিলার ওপর থেকে নিচে উপত্যকার ঢালে নেমে গেলাম। দু’ধারে মরশুমি ফুল ফুটেছে। রুবাই, সাজ্জাদ সখ মিটিয়ে ছবি তুলছে। আধাআধি নেমে বাঁয়ে তাকাতে দেখি, অনেক নিচে চেঙ্গি নদীর রোগা, শুকনো স্রোত তিরতির বয়ে চলেছে। ডানে নিচে একটি কৃত্রিম হ্রদ খোঁড়া হয়েছে, তাতে সামান্যই জল। পাড়ে ফাইবার গ্লাসের নৌকো শেকল দিয়ে আটকানো। নিচের ফটক থেকে সশস্ত্র পুলিশ এগিয়ে এসে জানালো, আমরা ইচ্ছে করলে নিচের হ্রদে নৌকো বাইতে পারি। হেসে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, কাল দেখা যাবে। তারপর নিচে নেমে ফটক পেরিয়ে হাইওয়ে ধরে চেঙ্গির ওপরে কেবল দিয়ে টানা সেতু পর্যন্ত গেলাম। গাড়ি চলাচল কমে এসেছে। দু’একটা দুরপাল্লার বাস কেবল খাগড়াছড়ি ছেড়ে বাইরে সফরে যাচ্ছে। বেশ ঠাণ্ডা লাগছিল। আমরা মোটেলে উঠে এলাম।

দোতলায় উঠে রুমে গেলাম। পোশাক বদলে আরামে গা এলিয়ে দিয়ে পাক্ষিক দেশ পত্রিকা খুলে পড়তে শুরু করব, এমনি সময় টেলিফোন বাজল ঝন্‌ঝন্‌। ভারী পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল, স্লামালেকুম স্যর, আমি কি ক্যাপ্টেন ওয়ালির সঙ্গে কথা বলছি? জ্বি, বলুন। আমি নুরুল আজম, বিডিনিউজের জেলা করেসপন্ডেন্ট ছিলাম। একটু দেখা করতে পারি, স্যর? এই রাতে? আজ থাক। আমি ভাবি, ভদ্রলোক কতদূরে থাকেন, কে জানে, এই শীতের রাতে আসবেন কষ্ট করে। আজম সঙ্গে সঙ্গে বলল, ঠিক আছে, স্যর। কাল সকালে দশটায় আসব। অলরাইট, আমি বলি, কিন্তু আপনি আমার হদিস পেলেন কীভাবে? আমাকে জেলা এনএসআই অফিসার জানালেন, আপনি সপরিবারে মোটেলে উঠেছেন বিকেলে। বাহ্‌। আমি যুগপৎ চমৎকৃত ও আনন্দিত হই এই ভেবে যে, এই প্রত্যন্ত এলাকায় সরকারি গোয়েন্দা দপ্তর বেশ তৎপর রয়েছে তো!

অতঃপর কিছুক্ষণ আড্ডা হল। আমাদের ঘরেই ডিনার সেরে রুবাই আর সাজ্জাদ ওদের রুমে ফিরল ন’টা নাগাদ। রুবি বেশ কসরৎ করে আমার মশারি টাঙিয়ে দিল। মশারির ভেতরে শুয়ে আমি কিছুক্ষণ পড়লাম। তারপর বাতি নিবিয়ে রাতবাতির সুইচ অন করে ঘুমোতে চেষ্টা করলাম। বাড়ির বাইরে আমার ভাল ঘুম হয় না। কারণ, আমার পরিচিত ঢেউ খেলানো কন্ট্যূর পিলোর অনুপস্থিতি। বাইরের প্রায় সব হোটেল-মোটেল-অতিথিশালায় যে বালিশ দেয়া হয়, সেগুলো সাধারণত অত্যন্ত তুলতুলে আর আকারে ক্ষুদ্রতর হয়ে থাকে। কাজেই এপাশ-ওপাশ করি, কিন্তু দিনের ব্যায়াম যথেষ্ট না হয়ে থাকলে ঘুম আসতে চায় না। আরেক অস্বস্তি, এই কনকনে শীতে বাথরুমে গরম পানির ব্যবস্থা নেই, কারণ আমরা প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া কবুল করে বাতানুকূল ঘর নিইনি! আমার খুবই ইচ্ছে হচ্ছিল, সকালে উঠে নাস্তা সেরে ঢাকা ফিরে যাই।

alutilar-pothe-2.jpg……
আলুটিলার পথে
…….
ভোরে ঘুম ভাঙলেও গরম পানির সরবরাহ নেই বলে মন খারাপ করে ব্যায়াম ফাঁকি দিলাম। সাতটায় বারান্দায় বেরিয়ে টের পেলাম, সাজ্জাদ পাশের বাথরুমে ঐ হিম পানির ঝরনার নিচেই স্নান সেরে নিচ্ছে। ঘরে ঢুকে ব্রেকফাস্ট দিতে বল্লাম। রুবি মেয়েকে ফোনে জানালো। সবাই মিলে খাওয়া সেরে বারান্দায় রোদে বসে আড্ডা দিতে লাগলাম। একসময় সাজ্জাদের উৎসাহে বলীয়ান বোধ করে, ফিরে যাবার পরিকল্পনা একদিন পিছিয়ে দিয়ে, বাথরুমে ঢুকে স্নান সেরে ফেললাম। বাহ্‌, তারপরই মন ভাল হয়ে গেল। পোশাক পরে কেড্‌স পায়ে গলিয়ে তৈরি হলাম। সবাই মিলে বেরিয়ে পড়া গেল রহস্যাবৃত আলুটিলার গুহা সন্দর্শনে। রাঙামাটিতে উপহার পাওয়া সেগুনের ছড়ি হাতে নিতে ভুল হয়নি এবার।

আলুটিলায় পৌঁছে বোঝা গেল, আমাদের বয়স বেড়েছে। ছেলেমেয়েরা মোটামুটি ফিট ছিল। ওখানে যে টানেল বা গুহাপথ আবিষ্কৃত হয়েছে, তেমনটি দেশের আর কোথাও নেই নাকি।

alutilar-pothe2.jpg……
আলুটিলার পথে
……
আলুটিলায় দাঁড়িয়ে পাহাড়ি শহর খাগড়াছড়ির বার্ডস আই ভিউ পাওয়া গেল। বিস্তর ছবি তোলা হল। ওখান থেকে দক্ষিণে রিছং এক বিশাল ঝর্না। সারা বছর প্রবহমান। আজমের ফোন এল। জানালাম আমাদের অবস্থান। ও বলল, কোই ফিকির নহি, আমি আপনাকে ওখান থেকেই তুলে নেব। তুলে নিয়ে যাবে কোথায়? রুবিকে বললাম, সাজ্জাদ রইল তোমাদের গাইড। আমরা দুই নিউজম্যান একটু ওদিকটা ঘুরে দেখে আসি। এত আগ্রহ নিয়ে আসছে ছেলেটা। পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাইওয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

guha.jpg……
আলুটিলা গুহা
…….
আজম এল। টগবগে যুবক। মোটর বাইকটাও ভারী। ভরসা পেলাম। জানেন আজম, আমি ওকে ভড়কে দিতে বলি, আমি যখন সেকেন্ড ল্যূটেনান্ট, তখন ট্রায়াম্ফ ৫০০ সিসি বাইক চালাতাম। শাসনগাছা বাসস্ট্যান্ডের পাশ দিয়ে যখন কুমিল্লা শহরে ঢুকতাম, রাস্তার দু’পাশে দোকানপাট বন্ধ হবার উপক্রম হত! বড় বড় চোখে আজম আমার দিকে তাকায়, বিশেষ করে আমার মধ্যদেশের মাট্‌ন টিউবের দিকে–যা কিনা জ্যাকেটেও পুরোপুরি ক্যামুফ্লাজ করতে পারেনি। বসলাম আজমের পেছনে। প্রায় উড়িয়ে নিয়ে চলল শহরের রাস্তা দিয়ে। রাঙামাটির মতোই সুন্দর শহর। শহরের মাঝখানে হোটেল শৈল সুবর্ণা। আজমের কথা হল, ওখানে উঠলে গরম পানি পাওয়া যেত, আবার ভাড়াও বেশ কম। আরো রয়েছে, জেলা পরিষদের অতিথিশালা। তাও আবার দু’দু’টো–নতুন আর পুরনো। ভাল ভাল জায়গা ফেলে আমরা যে কেন ঐ পাণ্ডববর্জিত মোটেলে উঠতে গেলাম!

mong.jpg…….
মং সাহেবের লাঞ্চসজ্জা
……..
ফুরফুরে ঠাণ্ডা বাতাসে ভালোই লাগছিল। উঁচু, নিচু পাহাড়ি রাস্তার দু’ধারে হালকা, ছড়ানো বসতি। পাকা অফিস বাড়ি বেশ অনেক ক’টাই দেখলাম। স্কুল, কলেজ দেখা হল। জেলা পরিষদ ঘুরে দেখলাম। আজমকে সকলেই চেনে, জানে, মানেও বেশ। দীঘিনালা সেনানিবাসের পথে অনেকদূর গিয়ে ফিরে এসে আমরা পানখাইয়াপাড়ায় মং মারমার ‘সিস্টেম হোটেল’-এ গেলাম চা খেতে। দরমার বেড়া, চাল, পাকা মেঝে। কোনো সাইনবোর্ড নেই। ভেতরে ঢুকতে মং হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালো, ফলের বাটি এগিয়ে দিল। চা দিতে বলল। জানালো, জেলা সদরে কর্মরত বিভিন্ন বিদেশি ও দেশি সংস্থার কর্মকর্তাদের অনেকেই ওর ‘হোটেলে’ দু’বেলা খান। কী কী রান্না হয়? জানতে চাইলাম। মং বলল, বাজারে গিয়ে যা টাটকা পাই, কিনি, সেগুলোই রান্না করি। সবাই খুশি হয়ে খায়। কিছুটি পড়ে থাকে না। তাহলে ফুডশপের নাম ‘ফ্রেশ এন্ড টেইস্টি’ নয় কেন? বেশ অবাক হলাম।

system.jpg…….
সিস্টেম হোটেলের অভ্যন্তরে
…….
দুপুরে ওখানেই খাব, বলে আজম আর আমি মং-এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এস আলমের অফিসে ঢুকে ঢাকায় ফেরার বাসটিকেট নিয়ে নিলাম। আজম আমাকে মোটেলে পৌঁছে দিল। রেস্তোরাঁয় বসে আমরা রোদে পিঠ দিয়ে কফিপান করলাম। বিকেলে আবার আসবে, বলে আজম শহরে ফিরে গেল। আমরা বেরোলাম পর্যটনের গাড়ি নিয়ে। নুনছড়ি যাব। কিছুদূর পর্যন্ত গাড়ি, বাকিটা জ্যাকেট খুলে, পায়ে চড়ে ১৫০০ ফুট উঁচুতে মাতাই পুখিরি বা ভগবানের পুকুর দেখা হল। জল শুকোয় না শীতকালেও তা নিজেরাই প্রত্যক্ষ করলাম, বেশ টলটলে জল। খিদে পেয়েছিল। নেমে সোজা সিস্টেম হোটেলে গেলাম। বেলা হয়েছে।

একটি টেবিল তখনো ফাঁকা ছিল। বোধ হয় আমাদেরই জন্য। মং সযত্নে হাঁস, মুরগি, কবুতরের মাংস ভুনা, শুঁটকি ভুনা, আলু ভর্তা, চিংড়ি ভর্তা, ডাল, সবজি সেদ্ধ আর লালচালের ভাত সাজিয়ে দিল। আমরা হাপুস-হুপুস করে খেলাম। সব রান্নাই বেশ ঝাল-ঝাল স্বাদের হয়েছিল। খেয়েদেয়ে উঠে, বিল মিটিয়ে, মং মারমাকে অজস্র ধন্যবাদ জানিয়ে, আবার আসব বলে বেরিয়ে এলাম। পর্যটনের ভ্যান ফেরত গিয়ে আমাদের জন্য জিপ পাঠিয়ে দিয়েছিল। যেমনটি ঠিক হয়েছিল, ওখান থেকে পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে ঘণ্টাখানেক চলে দীঘিনালা পৌঁছলাম। সেই ১৯৭৬ আর এই তেত্রিশ বছর পরে আবার আসা হল। তখন দীঘিনালা ছিল কেবল টিনশেড ব্যারাক বিশিষ্ট সেনাছাউনি। আমি আর মাহমুদ হেলিকপ্টারে উড়ে আসতাম চিটাগাং ক্যানটূনম্যন্ট থেকে। এখনকার আধুনিক সেনানিবাস ঘুরে দেখা হল। ত্রিপুরারাজের সেই পরিত্যক্ত দীঘিও দেখা হল। ফিরে এসে খাগড়াছড়ি শহরে উপজাতীয় কারুশিল্পালয়ে টিপরা, মারমা, চাকমা ও কুকিদের তাঁতে বোনা কাপড় আর অন্যান্য হস্তশিল্পের নমুনা দেখলাম। চা-শিঙাড়া খেয়ে মোটেলে ফিরলাম। সন্ধে নেমে গেছে।

রিসেপশ্যনে চাবি নিতে গিয়ে একটি প্যাকেট পেলাম। আজম এসেছিল, রেখে গেছে আমার জন্য। আহা, আমাদের ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে ছেলেটি ফিরে গেছে। প্যাকেট খুলে দেখি, মারমা তাঁতের চাদর। চিরকুটে লেখা, স্যর, আজমকে ভুলবেন না আশা করি। সুতি চাদরটা হালকা ঠাণ্ডায় গায়ে জড়াবেন। আজম। মৃদু হেসে, চাদরটা নিয়ে সস্নেহে গায়ে জড়িয়ে নিলাম। পারিবারিক গল্পগুজব, আগামি বেড়াবার পরিকল্পনা ইত্যাদি সেরে মাছভাত খেয়ে কম্বলের নিচে ঢুকে পড়া গেল।

sheshe.jpg
পর্যটন মোটেলের সামনে

সকালে উঠে হাঁটাহাটি, ব্রেইকফাস্ট সেরে একটা গাড়ি করে শহর পেরিয়ে খাগড়াছড়ি কৃষি উদ্যান দেখে এলাম। ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে ১১টা নাগাদ নিচে নেমে, বিল মিটিয়ে ঢাকার পথে রওনা হলাম। ওয়েটাররা আমাদের ট্রলিব্যাগগুলো গড়িয়ে নিয়ে চলল নিচে, ঢাকার বাসে তুলে দেবে। ঠিক ১১:৩০ মিনিটে বাস ব্রিজ পেরিয়ে এসে ফটকের বিপরীতে দাঁড়াল। লাগেজ হোল্ড খুলে ব্যাগ ঢোকানো হল। আমরা বাসে উঠে আসনে বসলাম। দ্বিতীয় সারির টিকেট আমাদের। বাস ছেড়ে দিল। ঝক্‌ঝকে শীতের সকালে বাসযাত্রা উপভোগ্যই মনে হচ্ছিল। রামগড় বিডিআর ক্যাম্পে যাত্রা বিরতি হল। নেমে গিয়ে গরম গরম সিঙাড়া, সামুসা আর ডিমচপ নিয়ে নিলাম। ক্ষিদে পেলে খাব সবাই। তারপর আর কি, গড়গড়িয়ে শুধু পাহাড় থেকে নেমে যাওয়ার পালা। আড়াইটের দিকে কুমিল্লা জোড়কানন রিসর্টে লাঞ্চ ব্রেইক হল। দ্রুত খাওয়া সেরে ফিরে এসে বাসে উঠলাম। ঢাকা পৌঁছতে শীত বিকেল। ঘোর সন্ধেবেলা বাড়ি পৌঁছেছিলাম সেযাত্রা। ফিরতি পথে রুবির খাদি পাঞ্জাবি তোলা হয়নি প্রতিশ্রুতি মাফিক। এমনি কত কথা আমরা দিই, রাখা হয় না এজীবনে বাস্তবের প্রতিবন্ধকতায়। কোই ফিক্‌র নেহি। চল্‌তা হ্যায়।

ঢাকা, মে-জুন ২০০৯

প্রতিক্রিয়া (8) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শুদ্ধ — আগস্ট ১৭, ২০০৯ @ ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন

      আমার খুব ভাল লেগেছে । বিশেষ করে খাবারের কথা।

      – শুদ্ধ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mintu chowdhuryP — আগস্ট ১৯, ২০০৯ @ ১২:২৯ পূর্বাহ্ন

      ধন্যবাদ আরও একটি ভ্রমণ কাহিনীর জন্য। তবে আগেরগুলোর মতো যেন খুব বেশি লাইভ হয়নি। আপনার কাছ থেকে আরও ভ্রমণ কাহিনী বেশি বেশি প্রত্যাশা করছি।

      মিন্টু চৌধুরী
      চট্টগ্রাম

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন golam sarwar — আগস্ট ২৬, ২০০৯ @ ৪:২৪ পূর্বাহ্ন

      ভালো লেগেছে, লেখককে ধন্যবাদ।

      গোলাম সরোয়ার লিটন
      তাহিরপুর

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিপ্লব রহমান — আগস্ট ২৭, ২০০৯ @ ৩:১৯ পূর্বাহ্ন

      ১। দেখলাম, খেলাম, ঘুরলাম-কথন কাহিনীটি পড়লাম।

      ২। লেখক যেহেতু পাহাড় দেখার পূর্ব অভিজ্ঞতা রাখেন, সেহেতু লেখায় পাহাড়ি জন-জীবনের কথা খানিকটা হলেও থাকবে, এটিই স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু তা না হওয়ায় লেখাটি পরিণত হয়েছে অসারে।

      ৩। দীঘিনালার ওই একদা পূজনীয় দীঘিটি সামরিক জান্তা যে জবরদখল করে সংবিধান ও মানবাধিকার লংঘন করেছে, লেখক কি তা ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেলেন কিনা, তা জানতে ইচ্ছে করছে।

      অনেক ধন্যবাদ।

      – বিপ্লব রহমান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফয়সল আরাফ — আগস্ট ২৭, ২০০৯ @ ১২:৪২ অপরাহ্ন

      খুব তাড়াহুড়ো হয়ে গেল ভ্রমণের মতই।

      – ফয়সল আরাফ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহবুব সুমন — আগস্ট ৩১, ২০০৯ @ ৬:০৭ পূর্বাহ্ন

      বরাবরের মতোই মুগ্ধতা নিয়ে পড়লাম। দারুণ সাবলীল। জানতে ইচ্ছে করছে ভ্রমণ নিয়ে লেখকের কোনো বই বের হয়েছে কি না। দীঘিনালার সেই পাহাড়ীদের কাছে পূজনীয় সেই দীঘিটি কীভাবে দখল করে রেখেছে সামরিক জান্তা সেটা জানতে ইচ্ছে করছে।

      – মাহবুব সুমন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আবদুল হক — সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯ @ ৩:২৩ অপরাহ্ন

      আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল…।

      – আবদুল হক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mirza leo — december ২৮, ২০১১ @ ১২:৪৩ অপরাহ্ন

      ভালো লাগলো ..সিস্টেম হোটেল..কবুতরের মাংস আর হাসের মাংস ..আহ! মনে পরে গেলো..

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com