কিস্তি ১

ছফামৃত

নূরুল আনোয়ার | ২৮ জুলাই ২০০৯ ৬:৪২ পূর্বাহ্ন
লাইফ ইজ এ কম্প্রোমাইজ তত্ত্বে ছফার আস্থা নেই। আজকের বাংলাদেশে এমনি পষ্ট ও অপ্রিয়ভাষী আরো কয়েকজন ছফা যদি আমরা পেতাম, তাহলে শ্রেয়সের পথ স্পষ্ট হয়ে উঠত।
আহমদ শরীফ, ১৯৭২

04.jpg
আহমদ ছফা (জন্ম. চট্টগ্রাম ৩০/৬/১৯৪৩ – মৃত্যু. ঢাকা ২৮/৭/২০০১)

[২০০৯-এর জুলাই ২৮ তারিখে আহমদ ছফার মৃত্যুর আট বছর পূর্ণ হলো। জীবিত অবস্থায় আহমদ ছফাকে নিয়ে লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে নানান বিতর্ক ছিল। মৃত্যুর পরে তিনি এক অর্থে সে সব বিতর্ক ছাপিয়ে গুরুতর হয়ে উঠছেন। তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তাঁকে নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে ও হচ্ছে। প্রায় সকলেই তাঁকে কাছে থেকে দেখেছেন এবং অন্তরঙ্গ ভাবে লিখেছেন। একই ছফা নানারূপে আবির্ভূত হয়েছেন সেসব লেখালেখিতে। আহমদ ছফার ভ্রাতুষ্পুত্র নূরুল আনোয়ার তাঁর সঙ্গে ছিলেন ১৭ বছর। কাছ থেকে তিনি পিতৃব্য আহমদ ছফাকে যেভাবে দেখেছেন তা তুলে ধরেছেন ছফামৃত লেখাটিতে। আর্টস-এ আট থেকে দশ কিস্তিতে লেখাটি প্রকাশিত হবে। বি. স.]

কিস্তি ১
ছোটকাল থেকে আমি ছফা কাকাকে একজন অভিভাবক হিসেবে পেয়েছিলাম। তিনি আমাকে বাবা হয়ে শাসন করেছেন, গুরু হয়ে শিক্ষা দিয়েছেন এবং বন্ধু হয়ে আমাকে ভালবাসার গল্প শুনিয়েছেন। সুতরাং তিনি একাধারে আমার বাবা, আমার শিক্ষাগুরু এবং আমার বন্ধু। আজকের ছোটখাটো আমার যা অর্জন সবই ছফা কাকার বদৌলতে। তিনি পরিবারের একজন বলেই আমার প্রতি কর্তব্য করেছেন একথা আমি বলব না, খোঁজ নিলে দেখা যাবে পরিবারের ভেতরে বাইরে এ ধরনের দায়িত্ব তিনি আরও অনেকের নিয়ে থাকবেন। এসব কথা এ লেখার মুখ্য বিষয় নয়। তারপরেও ঘটনার প্রেক্ষিতে কিছু অপ্রাসঙ্গিক কথা হয়ত এসে যেতে পারে, যেগুলো না হলে লেখার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা আমার পক্ষে সম্ভব না-ও হতে পারে।

sofa_sultan.jpg……..
শিল্পী এস এম সুলতানের সঙ্গে
……..
ছফা কাকার জন্ম চট্টগ্রাম জেলার গাছবাড়িয়া গ্রামে ঊনিশ শ’ তেতাল্লিশ সালের ত্রিশে জুন। তাঁর মেট্রিকুলেশন সার্টিফিকেটে উল্লেখ পাওয়া যায় তাঁর জন্ম ঊনিশ শ’ বিয়াল্লিশ সালে। মেট্রিক পরীক্ষার সময়ে বয়স কম হওয়ার জন্য এক বছর কমিয়ে ঊশিশ শ’ বিয়াল্লিশ সাল দেখানো হয়েছিল বলে ছফা কাকা তাঁর এক লেখায় উল্লেখ করেছেন।

এক সম্ভ্রান্ত কৃষক পরিবারে ছফা কাকার জন্ম। তাঁর বাবার নাম হেদায়েত আলি। মা আসিয়া খাতুন। তাঁর সাত আট পুরুষ আগে শ্রীমল্ল নামের একজনের পরিচয় পাওয়া যায়। তারই নামানুসারে পরিবারটি শ্রীমল্ল বংশ নামে পরিচিত। শ্রীমল্লের কী পেশা ছিল বলা মুশকিল। তবে তাঁর পরের বংশধরদের কারও কারও নামের পাশে সওদাগর খেতাবটির উল্লেখ আছে। অনুমান করা যায় তাঁদের কেউ কেউ হয়ত ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। তাঁরা যা-ই করুন, তাঁদের আদি পেশা যে কৃষি ছিল তাতে কোনো ভুল নেই।
—————————————————————–
তাঁর পূর্ব-পুরুষ লাঙল ব্যবহার করে নিজেদের উন্নতির পথটি প্রশস্ত করেছিলেন। ঊনিশ শ’ চুরান্নব্বই সালে আমার বড় ভাইকে স্থানীয় বাজারে একটি বইয়ের দোকান দিয়ে বসিয়ে দিয়েছিলেন ছফা কাকা। তিনি ওই দোকানটির নামকরণ করেছিলেন ‘লাঙল গ্রন্থালয়’।…আমি তাঁর পালকপুত্র সুশীলকে নিয়ে ফার্মগেটের দোকান থেকে একটি বড় আকারের সাইন বোর্ড লিখিয়ে এনেছিলাম এবং এটি ঢাকা থেকে বাসে করে চট্টগ্রামের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। গ্রামের লোক এ সাইন বোর্ডের মর্মার্থ বুঝতে না পারলেও একটা জিনিস ভালভাবে অনুমান করেছিল আহমদ ছফা এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছেন, তা নইলে দোকানের নাম ‘লাঙল গ্রন্থালয়’ হবে কেন?
—————————————————————-
ছফা কাকার এক পূর্ব-পুরুষ আল্লাহর সাধনা করতেন। তাঁর নাম ছিল আজিজ ফকির। তিনি চিরকুমার ছিলেন। ছফা কাকার বাড়ি থেকে তিন মাইল পুবে জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ে তিনি বাস করতেন। শোনা যায় তখন সেখানে বড় বড় বৃরে সমারোহ ছিল। বাঁশ, বেত ইত্যাদি সংগ্রহ করতে মানুষকে ওই পর্যন্ত গেলেই চলত। সেখানে বন্যপ্রাণীর উৎপাতও কম ছিল না। এখন সে জঙ্গলও নেই, বন্যপ্রাণীও নেই। মনুষ্যবসতি এতদূর প্রসারিত হয়েছে যে আগে যে ঘন বন ছিল সেটা অনুমান করা এক রকম দুষ্কর। তবে এখনও ছোট ছোট পাহাড়ের অস্তিত্ব বিদ্যমান। এই পাহাড়গুলো স্থানীয় ভাষায় টিলা নামে পরিচিত।

যুগ যুগ ধরে এ সাধক পুরুষটির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধের কমতি ছিল না। শ্রদ্ধাবোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পাহাড়ে তাঁর একটা মাজার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই মাজারে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসে নানা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। প্রতি বছর তাঁর নামে ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন করা হয়। মাজারে ফকিরের ব্যবহৃত একটি পাটা এবং বাটনা রয়েছে যেগুলোকে মানুষ এখনও ভক্তিভরে স্পর্শ করে। এই সাধক পুরুষের নামে অনেক আজব গল্প প্রচলিত আছে। একটি ঘটনা এই রকম:

আজিজ ফকির বাঘ পুষতেন। তিনি বাঘের গলায় ডোলা ঝুলিয়ে পাশের বরুমতি নদীতে মাছ ধরতেন এবং সেই মাছ সাধক সাহেব বাঘকে নিয়ে খেতেন। একদিন বাঘ আজিজ ফকিরের মুখের কাছে মুখ এনে গন্ধ নিতে আরম্ভ করল। বাঘের এ কাণ্ড দেখে তিনি আহত হলেন। তিনি বললেন, এই যে বাঘ, আমি তোদের রেখে কোনোদিন কিছু খাইনি। আজ তোদের না জানিয়ে নদীতে ভেসে আসা একটা পেয়ারা খেয়েছিলাম, এতে যদি তোরা আমার দোষ ধরিস আমাকে খেয়ে ফেল? বাঘেরা কাল বিলম্ব না করে তাঁকে খেয়ে ফেলেছিল।

এগুলো তো শোনা কথা। এসবের মধ্যে বাস্তবতা কতখানি বলা মুশকিল। হয়ত একটুও নেই। তিনি যে বাঘকে খেয়ে ফেলার জন্য আদেশ করলেন সেই কথা তো কারও জানার কথা নয়। তারপরেও ধর্ম যারা মানেন, যারা বিশ্বাস করেন তাদের কাছে যুক্তি-অযুক্তি পরখ করার সময় কোথায়। সবচে বড় সত্য যেটি সেটি হল আজিজ ফকির নামের একজন সাধক পুরুষ ছিলেন, যা সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে এখনও গেঁথে আছে।

আমার ধারণা, এ সাধক পুরুষটির প্রভাব ছফা কাকার ওপর কোনো না কোনোভাবে পড়েছিল। আমার বিশ্বাস, তাঁর বৈরাগ্যভাব, চিরকুমার থাকার যে ব্রত তিনি গ্রহণ করেছিলেন এটা পূর্ব-পুরুষের কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন। আমি যখন মিরপুরের বাসায় তাঁর সঙ্গে থাকতাম, দেখতাম তিনি পাহাড়ে ছুটে যাবার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতেন। কেন জানি না, ছফা কাকা নিজেকে একজন আজিজ ফকির কিসিমের লোক ভাবতে পছন্দ করতেন।

একবার ছফা কাকা আমাকে চিঠি লিখেছেন। তখন আমি গ্রামে ছিলাম। আবদুল হাফিজ নামে আমাদের গ্রামের এক ডাক্তার পাহাড় বিক্রি করবেন। ছফা কাকার খুব ইচ্ছে তিনি ওই পাহাড় কিনবেন। যুক্তি একটাই, তাঁর পূর্ব-পুরুষ পাহাড়ে বসে আল্লাহর ধ্যান করেছেন। তাঁর পিতা পাহাড়ের ছন নিলাম ডেকে পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করেছেন। সুতরাং তাঁর এখানে পড়ে থাকা কেন? তাঁর ভেতরে একটা চিন্তা উৎপাত করতে থাকল, তিনি ঢাকা থেকে চলে যাবেন এবং পাহাড়ে ঘর করে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবেন। পরে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। টাকার অংকটা এত বিশাল ছিল যে পরে তিনি মত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

ছফা কাকার দু’ পুরুষ আগে যাঁরা ছিলেন তাঁরা কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু কৃষিই তাঁদের একমাত্র পথ ছিল না। শুনতে পাই তাঁরা বছরের একটা সময় আকিয়াব, রেঙ্গুনে কাটিয়ে আসতেন। বর্তমানে মানুষ যেভাবে মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য দেশে ছুটে যাচ্ছেন তখন সে সুযোগ ছিল না। তখন আকিয়াব, রেঙ্গুনে শ্রম বিক্রি করে তাঁরা টাকা আয় করতেন। ছফা কাকার পিতামহ মুহম্মদ মুনসি এবং তাঁর ভাই বেরাদার যাঁরা ছিলেন অনেকে বছরের বড় অংশ আকিয়াবে কাটাতেন।

ছফা কাকার বাবারা দু’ ভাই। বড় ভাইয়ের নাম মোশাররফ আলি, অপরজন হেদায়েত আলি। হেদায়েত আলি হলেন ছফা কাকার বাবা। তাঁদের বাবা মুহম্মদ মুনসি মারা যাবার পর দুই ভাই মিলে পরিবারের হাল ধরেন। তাঁদের বাবার জমিজিরাত বিশেষ ছিল না। তিনি মাত্র দু’ কানি (আশি শতক) জমি ছেলেদের জন্য রেখে যান। এই সামান্য জমির ওপর ভর করে দু’ ভাই জীবন-সংগ্রাম শুরু করেন। এটুকু জমির ওপর ভরসা করে বেঁচে থাকা তাঁদের পক্ষে কোনোমতে সম্ভব ছিল না। ফলে জমি চাষের পাশাপাশি তাঁরা কাঠমিস্ত্রির কাজকে বাড়তি আয়ের উৎস হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। কাঠ দিয়ে বানানো যত রকম কাজ আছে তাঁরা জানতেন। ঘর-বাড়ি, চেয়ার-টেবিল, খাট-পালং, সিন্দুক, লাঙল ইত্যাদি তৈরি করতেন। তাঁরা বিশেষ ধরনের সিন্দুক তৈরিতে পারদর্শী ছিলেন, যেটি কোনো ডাকাতের পক্ষে ভাঙা সম্ভব হত না। এ সিন্দুক ওই এলাকার কোনো কোনো অভিজাত পরিবারে খোঁজ করলে এখনও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু কাঠের এ কাজ বেশিদিন তাঁরা ধরে রাখেননি। ছফা কাকার জেঠা মোশাররফ আলি লাঙল বানানোর কাজটি অনেকদিন ধরে রেখেছিলেন। শুনতে পাই, একেকটা লাঙল দু’ পয়সা দামে বিক্রি করতেন। ওই সময় যাঁরা লাঙল বানাতেন তাদের বারুই বলা হত। ওই বারুই থেকে বাড়িটার পরিচিতি পেয়ে গেল বারুইয়ার বাড়ি। শ্রীমল্ল বংশের লোক হিসাবে যাঁদের পরিচয় ছিল তাঁরা রাতারাতি হয়ে গেল বারুই।

ছফা কাকার বাবা হেদায়েত আলি বোধহয় একাজে বিশেষ সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি একাজ ছেড়ে দিয়ে কীভাবে পরিবারের আয়-রোজগার আরও বাড়ানো যায় সেদিকে মনোনিবেশ করেন। তিনি কৃষির দিকে বেশি করে মনযোগী হয়েছিলেন। পাশাপাশি একটা ব্যবসায়ী ধ্যান-ধারণাও তাঁর মধ্যে কাজ করত। তিনি জানতেন, কোন শাক-সবজি মৌসুমের আগে বাজারে তুলতে পারলে তার দাম বেশি পাওয়া যায়। তাই তিনি শাক-সবজির চাষটা অগ্রিম করে বেশি অর্থ মুনাফা করতেন। আরেকটা কাজ করে তিনি বিজ্ঞের পরিচয় দিয়ে ছিলেন। তখন টিনের বাড়ির চল তেমন ছিল না। হয়ত কোনো ধনী লোকের ঘরের চালে টিনের ব্যবহার হয়ে থাকবে। তখন ছনের ছাউনি বাড়িই ছিল বেশি। কেউ কেউ ধানের খড়কে ঘরের ছাউনি হিসাবে ব্যবহার করত। ছনের ব্যবহারটা এত বেশি ছিল যে ছফা কাকার বাবা হেদায়েত আলি ছনের ব্যবসার দিকে ঝুঁকলেন। তিনি পাহাড়ের ছন নিলাম ডেকে ডেকে প্রভূত অর্থকড়ির মালিক হয়েছিলেন এবং পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে এনেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি একজন মধ্যম শ্রেণীর জোতদারে পরিণত হতে পেরেছিলেন।

হেদায়েত আলি নিজে জমিজমা গড়ে তুললেও তিনি তাঁর ভাইকে অর্থ-সম্পদের অর্ধাংশের ভাগীদার করেছিলেন। ফলে দুই ভাইয়ের মধ্যে সুসম্পর্ক মৃত্যু অবধি বহাল ছিল। হেদায়েত আলির প্রতিপত্তি এত বেড়ে গিয়েছিল যে তিনি প্রতি বছর গরু জবাই করে দু’বার মেজবান দিতেন। দূর-দূরান্তের মানুষ এসব মেজবানে আমন্ত্রিত হয়ে আসতেন। তাছাড়া ক্ষেতের উৎপাদিত সবজি দিয়েও তিনি মানুষ খাওয়াতেন। এটাকে তিনি এক ধরনের পুণ্য মনে করতেন।

ছফা কাকা একজন কাঠমিস্ত্রি এবং চাষার ছেলে। কিন্তু এ নিয়ে তাঁকে কখনও হীনম্মন্যতাবোধে ভুগতে আমি দেখিনি। তাঁর বাবারা লাঙল বানাতেন। সেই লাঙল দিয়ে এলাকার মানুষ চাষাবাদ করতেন। এটা নিয়ে তিনি অহংকার করতেন। তিনি মনে করতেন, লাঙল আমাদের উন্নতির প্রথম হাতিয়ার। তাঁর পূর্ব-পুরুষ সেই লাঙলকে ব্যবহার করে নিজেদের উন্নতির পথটি প্রশস্ত করেছিলেন। ঊনিশ শ’ চুরান্নব্বই সালে আমার বড় ভাইকে স্থানীয় বাজারে একটি বইয়ের দোকান দিয়ে বসিয়ে দিয়েছিলেন ছফা কাকা। তিনি ওই দোকানটির নামকরণ করেছিলেন ‘লাঙল গ্রন্থালয়’। আমি ছফা কাকাকে নামটি অপছন্দের কথা জানিয়েছিলাম। তিনি আমার ওপর ভয়ানক রকম খেপে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, লাঙল বানানো ছিল আমার বাবার পেশা। আমরা ভাইয়েরা তা ধরে রাখতে পারিনি। তোমরা কোনো ভাই যদি এ কাজে নিয়োজিত হও আমি খুবই খুশি হব।

আমি আর কথা বাড়ালাম না। তিনি বোধহয় আমার ওপর আশ্বস্ত হতে পারছিলেন না, যদি আমি তাঁর কথা রা না করি? ‘লাঙল গ্রন্থালয়’ না লিখে অন্য নাম ব্যবহার করি? আমার সেই সুযোগ যাতে না থাকে তিনি সাইন বোর্ডের কথাগুলো লিখে একটা কাগজ আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। আমি তাঁর পালকপুত্র সুশীলকে নিয়ে ফার্মগেটের দোকান থেকে একটি বড় আকারের সাইন বোর্ড লিখিয়ে এনেছিলাম এবং এটি ঢাকা থেকে বাসে করে চট্টগ্রামের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। গ্রামের লোক এ সাইন বোর্ডের মর্মার্থ বুঝতে না পারলেও একটা জিনিস ভালভাবে অনুমান করেছিল আহমদ ছফা এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছেন, তা নইলে দোকানের নাম ‘লাঙল গ্রন্থালয়’ হবে কেন?

ছফা কাকার আরেকটা বিষয় আমার মনের মধ্যে খুব করে হানা দেয়। তিনি চাষা-ভূষার ছেলে হিসেবে নিজের পরিচয় দিতেন। এ চাষা-ভুষার ঘর থেকে কোনো সন্তান বেরিয়ে আসলে তিনি তাঁদের কদর করতেন। আমি তিনজন মনীষীর নাম উল্লেখ করতে পারি তাঁরা ছফা কাকার একই গোত্রের না হলেও শূদ্র শ্রেণীর ছিলেন একথা হলফ করে বলা যায়। এই তিনজন মনীষীর প্রতি ছফা কাকার এক ধরনের পপাতিত্ব কাজ করত। আমি একজনের নাম করব যাঁর নাম শিল্পী এস এম সুলতান। সুলতানের বাবা একজন রাজমিস্ত্রি ছিলেন। এই রাজমিস্ত্রির পোলা সুলতান একজন বড় মাপের মানুষ, ছফা কাকা মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত এ ধারণায় স্থির ছিলেন।

ছফা কাকা আরেকজনকে তাঁর গোত্রভুক্ত করেছিলেন, তিনি হলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খা। তিনিও কোনো এলিট শ্রেণীর সন্তান ছিলেন না। রাগ-অনুরাগ বইতে উল্লেখ পাই তাঁর পূর্ব-পুরুষ ছিলেন ডাকাত। এ ডাকাতের ঘরে জন্মেছিলেন গর্বের ধন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খা। ছফা কাকা এ মহামনীষীকে মাথায় তুলে রাখতেন। তাঁকে নিয়ে একটি উপন্যাস লেখার চিন্তা তাঁর মাথায় সব সময় কাজ করেছে। উপন্যাসের শেষের অধ্যায়টি তিনি রচনাও করেছিলেন। আয়ুতে কুলোয়নি বলে উপন্যাসটি অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। শেষের যে মনীষীর নাম বলব তিনি হলেন আরজ আলী মাতুব্বর। মাতুব্বর সাহেবের জীবন-কাহিনী সকলের জানা। তিনি খেটে খাওয়া ঘরের সন্তান ছিলেন। আমীনগিরি করে তাঁকে দিনাতিপাত করতে হত। এ মানুষটির প্রতি ছফা কাকার তত উচ্ছ্বাস ছিল না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে মানুষটিকে পছন্দ করতেন। তাঁর রচনাবলির প্রথম খণ্ডটি এনে ছফা কাকা আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, এ মানুষটিকে বুঝতে শেখো। আমরা এঁর ব্যতিক্রম নই।

মাতুব্বর সাহেবকে ছফা কাকা কতখানি পছন্দ করতেন আরেকটি ঘটনা থেকে তা অনুমান করা যায়। কেরানীগঞ্জের ঋষিপাড়ায় ডক্টর হোসেন জিল্লুর রহমান অবহেলিত মা ও শিশুদের নিয়ে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্কুলটি বেশ কয়েক বছর চলেছিল। এ স্কুলের সঙ্গে আমিও জড়িত ছিলাম। স্কুলটির শুরুর দিকে একদিন ডক্টর জিল্লুর আমাকে বললেন, আনোয়ার, স্কুলটির একটি সুন্দর নাম দরকার। তুমি ছফা ভাইকে একটি নাম ঠিক করে দিতে বল।

আমি ছফা কাকার কাছে ছুটে গিয়েছিলাম। আমার ধারণা ছিল, ছফা কাকাকে এ কথাটি বললে তিনি বেশ খানিকটা ভাববেন এবং ভেবে কাব্যিক ঢং-এর একটি নাম আমাকে বলবেন। কিন্তু আমি যখন তাঁর কাছে বিষয়টি উত্থাপন করলাম তিনি আমার ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে দিলেন। তিনি এক সেকেন্ড সময়ও বিলম্ব না করে বললেন, এই স্কুলের নাম হবে ‘আরজ আলী মাতুব্বর পাঠশালা’। ইতোমধ্যে আমি মাতুব্বর সাহেবকে ভালবেসে ফেলেছিলাম। তাই নামটা আমারও পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য এ নামটি ডক্টর জিল্লুরের পছন্দ হয়নি। তিনি হয়ত ভেবেছিলেন আরজ আলী মাতুব্বরের মত একজন নাস্তিকবাদী বিতর্কিত মানুষের নাম স্কুলের সঙ্গে জড়ালে সমাজ তা গ্রহণ করতে চাইবে না। তাঁর নামের কারণে স্কুলটির ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়–ক এমনটি তো হতে দেয়া যায় না।

থাক সেসব কথা। একটা কথা ধ্রুবের মত সত্য, ছফা কাকা খেটে খাওয়া মানুষের সন্তান ছিলেন। তাই খেটে খাওয়া মানুষের সন্তানরা কিছু করলে তাঁদের সমাদর করতে তিনি পিছ পা হতেন না। তবে তাঁর অর্থ এই নয় যে অন্যদের তিনি কদর করতেন না।
—————————————————————–
ছফা কাকার খুব ইচ্ছে তিনি ওই পাহাড় কিনবেন। যুক্তি একটাই, তাঁর পূর্ব-পুরুষ পাহাড়ে বসে আল্লাহর ধ্যান করেছেন। তাঁর পিতা পাহাড়ের ছন নিলাম ডেকে পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করেছেন। সুতরাং তাঁর এখানে পড়ে থাকা কেন? তাঁর ভেতরে একটা চিন্তা উৎপাত করতে থাকল, তিনি ঢাকা থেকে চলে যাবেন এবং পাহাড়ে ঘর করে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবেন। পরে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। টাকার অংকটা এত বিশাল ছিল যে পরে তিনি মত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
—————————————————————-
তাঁর জীবন নিয়ে কথা বলার আগে আমি এ লেখাতে তাঁর রচনার একটি অংশ সংযোজন করতে চাই। এ অংশটি ইচ্ছে করলে আমি নিজের ভাষায় লিখতে পারতাম, কিন্তু ভেতর থেকে সায় পাচ্ছি না। ছফা কাকা জীবদ্দশায় তাঁর জীবন-জীবিকা, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে নানা জায়গায় বিপ্তিভাবে অনেক কথা লিখে গেছেন, আমি সেইসব কথাকে এ লেখায় উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করতে চাই। কোনো কোনো উদ্ধৃতি কয়েক পৃষ্ঠাও হয়ে যেতে পারে। এ ধরনের উদ্ধৃতি হয়ত কোনো মানসম্পন্ন লেখার উপাদান হতে পারে না। তারপরেও আমি নিরুপায়। ছফা কাকার জীবনকে সঠিকভাবে তুলে ধরার জন্য এর চে’ অন্য কোনো পথ খোলা আছে বলে আমার জানা নেই। যে লেখাটি আমি এখানে স্থান দিতে যাচ্ছি ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালের রোগশয্যায় বসে তিনি এটি রচনা করেছিলেন। সালটি ছিল ঊনিশ শ’ নিরানব্বই। আমেরিকা যাবার প্রাক্কালে বিশেষ প্রয়োজনে তাঁকে এ লেখাটি লিখতে হয়েছিল। পরে লেখাটি তাঁর উপলক্ষের লেখা বইতে স্থান পেয়েছিল। লেখাটি ছিল এ রকম :

“আমার পিতার নাম মরহুম হেদায়েত আলি ওরফে ধন মিয়া। তিনি নিতান্ত সাধারণ অবস্থা থেকে শ্রম, ধৈর্য, সাহস ও সততার বলে নিজেকে একজন ভূমিবান সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং একটি প্রাচীন পরিবারের সম্মান অনেকাংশে ফিরিয়ে আনতে সম হন।

আমার মরহুম পিতা একদিকে যেমন জেদী এবং তেজস্বী ছিলেন অন্যদিকে তাঁর প্রাণ ছিল পুষ্পের মত কোমল। আমার পিতার জীবদ্দশায় তাঁর শত্রুর অভাব ছিল না। তথাপি আমাদের অঞ্চলের এমন অনেক মানুষের সাক্ষাৎ আমি এখনও পেয়ে থাকি যাঁরা মুক্তকণ্ঠে আমার পিতার সাহস, সরলতা এবং পরের উপকার করার গল্প বয়ান করেন।

আমার পিতা পরের হিতে জীবন উৎসর্গ করতে কুণ্ঠিত হতেন না। আমাদের অঞ্চলে তিনি অনেক জনহিতকর কাজ করেছিলেন। তিনি মানুষের পানি খাওয়ার জন্য পুষ্করিনী খনন করেছিলেন। রাস্তা-ঘাট এবং পুল-সাঁকো ইত্যাদি করে তিনি নির্মল আনন্দ অনুভব করতেন। যদিও লেখাপড়া করার বিশেষ সুযোগ তাঁর ঘটেনি, তথাপি তিনি অত্যন্ত বিদ্যোৎসাহী মানুষ ছিলেন। তিনি নিজের জমিতে মসজিদ এবং মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি আমাদের অঞ্চলে তাঁর বন্ধুদের নিয়ে যে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আমি সে বিদ্যালয়ের তৃতীয় ব্যাচের ছাত্র। আমার পিতার অনেক গরিব ছাত্রের স্কুলের পরীক্ষার ফিস গোপনে পরিশোধ করতেন। এমন কি আমাদের চরমতম অর্থনৈতিক সংকটের সময়ও গরিব ও এতিম ছাত্রদের বাড়িতে এনে জায়গির রাখতেন।

আমার বাবার একজন সৎভাই [মোশাররফ আলি] ছিলেন। তিনি বয়সে আমার বাবার চাইতে বড় ছিলেন। আমার জেঠা এবং পিতার মধ্যে খুব সদ্ভাব ছিল। একে অন্যের পরামর্শ ছাড়া কোনো কাজ করতেন না। পৃথক অন্নের সংসার হলেও এক বাড়িতে ভাল কিছু রান্না হলে অন্য বাড়িতে তার অংশ যেত। আমার একজন জেঠাতো ভাই ছিলেন। তাঁর বিয়ে হয়েছিল এবং দুটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। কোনো অজ্ঞাত রোগে আমাদের জেঠাতো দাদা মা-বাবা বেঁচে থাকতেই অকালে প্রাণ ত্যাগ করেন। মুসলিম আইন অনুসারে সে সময়ে মা-বাবা বেঁচে থাকতে সন্তানের যদি মৃত্যু হত, সেই সম্পত্তির উত্তরাধিকার কনিষ্ঠ ভ্রাতা এবং তার ওয়ারিশদের ওপর বর্তাতো। সম্পতি নিয়ে আমাদের পরিবার ও জেঠাদের পরিবারের মধ্যে অনেক মনোমালিন্য এবং আইন আদালত হয়েছে, তার ধারাবাহিকতা অদ্যাবধি দুটি ভ্রাতার বংশধরদের মধ্যে চলছে। আমি জ্ঞাতিবিরোধে শিশুকাল থেকে এই পর্যন্ত যেহেতু কোনো পইে অংশগ্রহণ করিনি তাই পারিবারিক এ কালো অধ্যায়টি সম্পর্কে বলব না।

আমার বাবা দু’বার বিয়ে করেছিলেন। আমার বড় মা অর্থাৎ সৎমাকে আমি চোখে দেখিনি। আমাদের গ্রামের মহিলাদের কাছে তাঁর অনেক সুনাম শুনেছি। আমার মা এবং সৎমা মামাতো-ফুফাতো বোন ছিলেন। আমার সৎমা একটি পুত্র এবং দুটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। তার মধ্যে এক কন্যা শিশু বয়সে মারা যায়। আমার সৎভাইটি ছিল রাতকানা। আমার বাবার একটি সুস্থ স্বাভাবিক সন্তানের খুব আকাক্সা ছিল। তবে আমার সৎবোনটি একটু পাগলাটে হলেও খুব ভাল ছিল। সৎবোন হলেও এখনও পর্যন্ত সে আমার আপন মায়ের বোনের চাইতে বেশি প্রিয় এবং আদরের।

আমার বড় মায়ের মৃত্যুও পর আমার বাবার সঙ্গে আমার মায়ের [আসিয়া খাতুন] বিয়ে হয়। আমার নানা ছিলেন আমার বাবার মামা। তিনি সাধক প্রকৃতির ছিলেন। আমার মায়ের বংশের সঙ্গে বান্দরবানের কোনো এক সম্পর্কিত রাজকন্যার রক্তের সম্পর্ক থাকাতে আমাদের নানার পরিবারকে ‘নয়া রাজার বংশ’ বলা হত।

আমার নানার মৃত্যুর অব্যবহিত পরে আমার মায়ের জন্ম হয়। আমার বাবার সঙ্গে বিয়ের আগে আমার মায়ের আরেকবার বিয়ে হয়েছিল। সে ঘরে আমার এক বোন জন্মায়। আমার সেই বোনটিও এখন পর্যন্ত বেঁচে আছে। তাঁর সাতটি কন্যা এবং কোনো পুত্র সন্তান নেই। সুখে-দুঃখে কাল কাটাচ্ছে। আমার মায়ের ঘরে আমার একটি বড় বোনের জন্ম হয়। তাঁর দু’বার [তিনবার] বিয়ে হয়, একটি পুত্র সন্তান এবং কয়েকটি কন্যাসন্তান রেখে অকালে প্রাণ ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি আমাদের কাছ থেকে তাঁর প্রাপ্য সম্পত্তির মূল্য আদায় করলেও আমি তাঁর ছেলেমেয়েদের বিষয়ে নানা রকম সহায়তার প্রশ্ন উঠলেই সে কথা মনে করিনে। করতে পারিনে।

তারপরে আমার জন্ম হয়। আমার জন্মকে একই সঙ্গে পরিবারের সৌভাগ্য এবং দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হত। আমার জন্মের পর থেকে আমাদের পারিবারিক সম্পদ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। অন্যদিকে মায়ের শারীরিক অবস্থা দুর্বল হতে থাকে এবং তাঁর শরীরে নানা রকম রোগ জন্ম নেয়। আমার পরে আরও দুটি বোনের জন্ম হয়। ছোট বোনটির নাম ছিল সুখ। সে ছিল সকলের বড় স্নেহ, আদরের। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। এটা আমাদের একটা বিরাট পারিবারিক বেদনার বিষয়। আমার অন্য বোনটি এখনও বেঁচে আছে। তাঁর জীবন জীবিকার ব্যয়ভারের অংশ আমি বহন করে থাকি।

আমার বাবা অত্যন্ত বিদ্যোৎসাহী মানুষ ছিলেন। তিনি আমার সুশিার সম্ভাব্য সকল রকম সুবন্দোবস্ত করেছিলেন। বাড়িতে মাওলানা রেখে কোরান পাঠ করিয়েছিলেন। কোরান শরিফ পাঠ করার এবং অংশবিশেষ মুখস্থ [ছফা কাকার মুখ থেকে শোনা আঠারো পারা কোরান তিনি মুখস্থ বলতে পারতেন – লেখক] করার পর অল্প-স্বল্প উর্দু এবং ফার্সিভাষা শেখার ব্যবস্থাও তিনি করেন।

আমাদের গ্রামে হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি মিলেমিশে বাস করতেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের সঙ্গে আমাদের অনেক সদ্ভাব ছিল। যে বয়সে আমি কোরান মুখস্থ করেছিলাম একই বয়সে আমাদের একটু দূরের প্রতিবেশী মনমোহন আচার্যের মায়ের কণ্ঠে পাঠ শুনতে শুনতে রামায়ণ, মহাভারত-ভাগবতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমার মুখস্থ হয়ে যায়। স্মৃতি থেকে সেগুলো এখনও উদ্ধৃত করতে পারি। হাই স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর আমাকে হিন্দু হোস্টেলের হেডমাস্টার শ্রী বিনোদবিহারী দত্তের তত্ত্বাবধানে রেখে আমাকে পড়াশুনার ব্যবস্থা করা হয়। হেডমাস্টার মশায়ের কাছ থেকে তিনটি বিশেষ গুণ আমি অনুকরণ করতে চেষ্টা করেছি। তার একটা সকালে শয্যাত্যাগ, দ্বিতীয়টা মিথ্যা না বলা, তৃতীয়টা সবকিছু সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবেলা করা।

স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার আগে আত্মীয়দের অনুরোধে আমি মুসলিম হোস্টেলে চলে আসি। অংকের শিক মুহম্মদ ইসহাক বিএসসি, মাওলানা আবু সায়ীদ আমার অভিভাবক হন। অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে এই শিক দু’জনের স্মৃতি আমি এখনও লালন করি। ইসহাক সাহেবের কবিতা লেখার রোগ ছিল, কিন্তু অন্ত্যমিল দিতে তাঁর ভয়ানক অসুবিধা হত। মাওলানা আবু সায়ীদ আমাকে নবী-কাহিনী পাঠ করে শোনাতেন। তিনি একটি পকেট ঘড়ি পরতেন, সেটা চুরি করার খুব ইচ্ছে হয়েছিল, কিন্তু সুযোগ আসেনি। আমার বাংলার শিক শিবপ্রসাদ সেন, বিজ্ঞান শিক সারদা শঙ্কর তালুকদার এবং মাওলানা আবদুস সবুর এই সমস্ত পুত-চরিত্রসম্পন্ন শিকদের চরিত্রের মহৎ প্রভাব সামান্য হলেও আমার জীবনে ক্রিয়াশীল হতে পেরেছে বলে আমি বিশ্বাস করি। হেডমাস্টারকে তখন আমি দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ বলে মনে করতাম। … … আমার পিতার কাছে আমি আরও একটা বিশেষ কারণে ঋণী। আমাদের এলাকায় কমিউনিস্ট পার্টির কর্মতৎপরতা শুরু হলে তিনি ঝুঁকি নিয়ে আমাকে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের সঙ্গে কাজ করতে উৎসাহিত করতেন। দূরে সভা হলে আমার হেঁটে যেতে কষ্ট হত। তখন বাস-রিকশা ছিল না। তিনি অনেক সময় আমাকে ঘাড়ে করে সভাস্থানে পৌঁছে দিয়ে আসতেন। আমার দুই-পাঁচ মিনিট বক্তৃতা শোনার জন্য তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপো করতেন। সভা শেষ হলে সঙ্গে করে নিয়ে আসতেন। হাঁটতে অসুবিধে হলে ঘাড়ে করে তুলে নিতে হত।

আমি যখন খুব ছোট তখন সাতবাড়িয়া গ্রামের আবদুল কাদিরের কন্যা জোবাইদা খাতুনের আমার বড় ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়। যতদূর মনে পড়ে বিয়ের রাতে খুব ঝড়-বৃষ্টি হয়েছিল এবং আমার বড় ভাই শাল, ধুতি এবং থোবাওলা ফেজটুপি পরে কাহারদের পিঠে চড়ে শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল। সঙ্গে আমিও ছিলাম। বড় ভাইয়ের বিয়েতে আমি প্রথম বিড়ি খেতে শিখি। আরও মনে পড়ে গোলাবাজি পোড়াতে গিয়ে এক ব্যক্তির দুটি আঙুল উড়ে যায়।

আমার কোলেই আমার বড় ভাইয়ের একটি নয় মাসের শিশুপুত্র মারা যায়। সে স্মৃতিটি আমি ভুলতে পারিনি। আমার পিতা বেঁচে থাকতেই আমার বড় ভাই তিন পুত্র এবং দুই কন্যার জনক হন। আর পিতার মৃত্যুর পর আরও দুই কন্যা এক পুত্রের জন্ম হয়। আমার বড় ভাই ছিলেন দুর্বল চরিত্রের নিশ্চেষ্ট বিলাসী ধরনের মানুষ। তাঁর বিচিত্র রকমের সখ ছিল–প্রায় সময় স্ত্রীর কথায় উঠতেন বসতেন। এ সময় থেকে আমাদের পরিবারের অবস্থা দুর্বল হতে থাকে। আমার পিতার সঙ্গে ভ্রাতার অমত, মানসিক সংঘাত, পরিবারের নৈতিক এবং অর্থনৈতিক ফাটলগুলো স্পষ্ট করে তুলতে থাকে। আমি কমিউনিস্টদের নিয়ে মহাসুখে আন্দোলন করছি, বড় ভ্রাতা লড়াই দেয়ার বৃষ কিনে অর্থ ধ্বংস করছেন। এ সময় আমাদের পরিবারের আরও একটি বিপর্যয় ঘটে যায়। পেছনের পুকুরের ঘাটে পা ফসকে গিয়ে সারাজীবনের জন্য আমার পিতা পঙ্গু হয়ে যান এবং পঙ্গু অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। সেই সময়ে আমি জেলে ছিলাম।

আমার পিতার মৃত্যুর পর আমরা তাঁর রেখে যাওয়া ভূ-সম্পত্তির মালিক হয়ে পড়ি। আরও একটি ব্যাপার আমাদের সম্পত্তির চার ভাগের তিন ভাগের মালিক ছিলাম আমি। কারণ নানা এবং মামাদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার আমি লাভ করি। সুতরাং ভূ-সম্পত্তি বিক্রির প্রথম কর্মটিও আমার হাত দিয়ে শুরু হয়। প্রথমে প্রায় চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকার সম্পত্তি বিক্রি করে ঢাকা চলে আসি এবং নানা হোটেলের আরাম এবং খাবারের স্বাদ ভণ করে নয় মাস সময়ের মধ্যে একেবারে কপর্দকহীন হয়ে পড়ি। সে অবস্থায় বাড়ি যেতে পারিনি অনেকদিন। আমার বড় ভাই আমার শুরু করা সম্পত্তি বিক্রির প্রক্রিয়াটি চালু রাখেননি শুধু, বড় ভাই প্রতিবেশীদের সঙ্গে মামলা-মোকদ্দমাও শুরু করেছিলেন। আমার মায়ের দুঃখ-কষ্ট বাড়তে থাকে। আমি একমাত্র সস্তান বাড়ি যাইনে। মেয়েদের কাছে গিয়ে থাকতে আত্মসম্মানে বাধে। এদিকে আমার ভ্রাতার অবস্থাও শোচনীয় হয়ে এসেছে। মামলা-মোকদ্দমা করে অর্থনৈতিকভাবে কাহিল হয়ে পড়েছেন। শরীর মনের সমস্ত উদ্যম নিঃশেষিত। তাঁর শরীর ব্যাধি-মন্দিরে পরিণত হল। তাঁর প্রকৃত অসুখটা কী তা জানার আগেই তিনি চারটা নাবালক ছেলে, চারটা নাবালক মেয়ে এবং অর্ধবৃদ্ধা স্ত্রীকে রেখে ভবলীলা সাঙ্গ করেন। আমার ধারণা তাঁর ক্যান্সার বা লিউকেমিয়া হয়েছিল। বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর অন্য কোনো পুরুষ না থাকাতে আমি পরিবারের দিকে তাকাতে বাধ্য হই। তখন ঊশিশ শ’ সাতষট্টি সাল। বাড়িতে খাবার নেই। প্রতিবেশিদের সঙ্গে মামলা, সকলে হতাশায় জর্জর, দীর্ঘদিনের একটি পুরনো পরিবার ধ্বসে যাচ্ছে, কেউ আনন্দ করছে, কেউ আন্তরিকভাবে বেদনা অনুভব করছে। আমি জীবনে পারিবারিক দায়িত্ব পালন করিনি, আমাদের সম্পত্তিগুলো কোন কোন জায়গায় আছে তাও ভাল করে জানতাম না। তাছাড়া বিশেষ একটা উপলে আমার বিদেশ যাওয়ার কথা হচ্ছিল। এই ধরনের একটা অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বিশাল একটা পরিবারের দায়িত্ব, যার সদস্য সংখ্যা ষোলজন। কেন আমি এগিয়ে এসে বুক চিতিয়ে গ্রহণ করলাম তার পেছনে একটা মনস্তাত্ত্বিক কারণ বর্তমান ছিল।

আমার অপদার্থ ভাইটির অনেক দোষ ছিল। ব্যবসা করলে গুনাহগারি দিতেন, মামলা করলে হারতেন, কিন্তু একটা জায়গায় অন্তরের বিশ্বাস ধ্রুব নত্রের মত স্থির ছিল। কী কারণে জানিনে তিনি বিশ্বাস করতেন আমি একজন বাঘের মত মানুষ। আমি তাঁর অবর্তমানে পরিবারের সম্মান রা করব, ছেলেমেয়েদের মানুষ করব। মজার কথা হল তিনি অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করতেন এসব অলৌকিক কাণ্ড ঘটাবার মতা আমার আছে। আমার বোকাসোকা ভাইটির মৃত্যুকালীন বিশ্বাসের সম্মোহনী শক্তিতে আমি অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। ছোটবেলা থেকেই আমি অল্প-স্বল্প লেখালেখি করতাম। এ জন্য পাড়ার মানুষ আমাকে ঠাট্টা করত, ভ্যাঙ্গাত। আমার এই ভাইটি তাদের সঙ্গে মারামারি করত এবং অনেক সময় নিজে জখম হত। সন্ধ্যা অন্ধতার কারণে বেশিদূর লেখাপড়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি পদ্মাবতী, শহীদে কারবালা, সয়ফুল মূল্লুক বদিউজ্জামানের নির্বাচিত অংশ মুখস্থ গান করে পড়তেন। আমাদের চট্টগ্রামের বিরাট একটা অংশ মনে করত ‘আলাওল’ শব্দের অর্থ কবি। কেউ কবিতা লিখতে চেষ্টা করলে লোকে ঠাট্টা করে বলত অমুকের ছেলে আলাওল বনার চেষ্টা করছে। আমার বড় ভাই মনে করতেন আমি একজন সত্যিকারের আলাওল। যেসব লোক আলাওল হয়, তারা সামান্য নয়, একেকজন নবী পয়গম্বরের মত মানুষ।” (আহমদ ছফা রচনাবলি, ২০০৮, খ.৪, পৃ.২১০)

২.
ওপরের লেখাটি ছফা কাকা লিখেছিলেন বিশেষ প্রয়োজনে। এ লেখাটি আত্মজীবনী হিসেবে লিখলে হয়ত অন্য রকম দাঁড়াত। হতে পারে তিনি লেখাটি ভাসা ভাসা ভাবে লিখে গেছেন। তথাপি আমাদের কাছে এ লেখাটির মূল্য একেবারে কম নয়।

ছফা কাকার ছেলেবেলা সম্পর্কে দু’ চারটি কথা বলা দরকার। এ ব্যাপারে তিনিও তেমন কিছু লিখে যাননি। তাঁর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিনি সকলের আদরের ছিলেন। ছোটবেলায় সকলের ভালবাসার সুযোগ নিয়ে সব সময় দুষ্টুমি করে বেড়াতেন। তখন তাঁর ছিল চিকন লিকলিকে শরীর। তিনি যে-কোন গাছে অনায়াসে উঠতে পারতেন। পাখির বাসা খোঁজা ছিল তাঁর বড় শখ। বাসা থেকে পাখির ছানা পেড়ে এনে খাঁচায় পুষতেন। তাঁর এক সাক্ষাৎকারে জানতে পারি ছোটবেলায় তাঁর একটা পোষা শালিক মারা যায়। সে মৃত্যুটা তাঁকে ভয়ানক রকম নাড়া দিয়েছিল। এই শালিক পাখিটাকে তিনি মানুষের মত করে কবর দিয়েছিলেন। বইরগুনি নদীতে মাছ ধরা, বর্ষাকালে নদীতে সাঁতার কাটার বিষয়টিও তিনি ভুলতে পারেননি।

ছফা কাকা এমন একটা সময় জন্মেছিলেন ও-সময় তাঁর বাড়ির চারপাশে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে উচ্চ শিক্ষিত লোক বিশেষ ছিলেন না, যাঁরা ছিলেন তাঁরা বাল্যশিক্ষা থেকে শিক্ষা নেয়া। তাঁর বাবার সঙ্গে কয়েকজন মিলে এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, তিনি ছিলেন ওই স্কুলের তৃতীয় ব্যাচের ছাত্র। তাঁর জেঠাতো ভাইয়ের মেয়ে হাবিয়া খাতুন প্রথম তাঁকে স্কুলে নিয়ে ভর্তি করিয়ে দেন। হাবিয়া খাতুনও ওই স্কুলে পড়তেন। সুতরাং দু’জনের মধ্যে খুবই সখ্য ছিল। হাবিয়া এখনও দাবি করেন আহমদ ছফাকে তিনি স্কুলে না নিয়ে গেলে হয়ত তাঁর পক্ষে লেখাপড়া করা সম্ভব হত না। এটা অবশ্য কথার কথা। যাঁর বাবা শিক্ষা প্রসারে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি তাঁর ছেলেকে স্কুলে দেবেন না, তা কি হয়? যা হোক, ছোটবেলা থেকে ছফা কাকা পড়াশুনাকে ভালবেসে গ্রহণ করেছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

(কিস্তি ২)

nurulanwar1@gmail.com

free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Syed — আগস্ট ১৩, ২০০৯ @ ৮:১৪ অপরাহ্ন

      আহমদ ছফার উপর লিখা শুরু করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আহমদ ছফা হচ্ছেন একটি অনগ্রসর সমাজের জন্য কালাপাহাড়। দুর্ভাগ্য এই, এই দেশে কখনই বিদগ্ধ মানুষের সংখ্যা প্রতুল নয়, বরং শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের জন্যই অধিকাংশ মানুষ বৈদগ্ধের ভাব দেখান।

      – Syed

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আসিফ আহমেদ — আগস্ট ২৩, ২০০৯ @ ৭:২৫ পূর্বাহ্ন

      পড়ে ভাল লাগল। ওনার সম্পর্কে কিছু জানতে পারলাম।

      – আসিফ আহমেদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Safaet — জুন ১৬, ২০১০ @ ৮:৩৮ পূর্বাহ্ন

      অনেকদিন থেকে এরকম একটি লেখার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তাই পড়া শুরু করার আগেই ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছা হলো…।

      – Safaet

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তরিকুল সুজন — ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৫ @ ১১:২০ অপরাহ্ন

      এই লোকটার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা অশেষ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com