পঞ্চাশতম জন্মদিনে শুভেচ্ছা
মাসুদ খানের সঙ্গে আলাপ, ১৯৯৩

| ২৯ মে ২০০৯ ৫:০৫ অপরাহ্ন

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাজ্জাদ শরিফব্রাত্য রাইসু

centre-island-toronto.jpg
মাসুদ খান (জন্ম. জয়পুরহাট ২৯/৫/১৯৫৯), কানাডার টরন্টোর সেন্টার আইল্যান্ডে; ছবি: শরীফ উদ্দিন

[বাংলা ভাষার এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন মাসুদ খান। নিজের ও তাঁর অনুসারীদের জন্য মৃদু ও বুদ্ধিদীপ্ত একটি কবিতার ধারা নির্মাণ করে নিয়েছেন তিনি। বাংলা কবিতায় এখন কিছু শব্দ ও শব্দবন্ধের ব্যবহার একান্তই মাসুদ খানের পরিচয়ে পরিচিত হয়ে গেছে। আজ ছিল এই কবির পঞ্চাশতম জন্মদিন। সে উপলক্ষে মাসুদ খানের দেওয়া এই সাক্ষাৎকারটি আর্টস-এ প্রকাশিত হলো। সাক্ষাৎকারে, ভেতরে ভেতরে কবির আগে লেখা কিছু প্রাসঙ্গিক কবিতা উপস্থাপিত হলো। উল্লেখ্য এ পর্যন্ত তাঁর তিনটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে: পাখিতীর্থদিনে (নদী, ১৯৯৩); নদীকূলে করি বাস (একুশে, ২০০১); সরাইখানা ও হারানো মানুষ (একুশে, ২০০৬)। কবি মাসুদ খান বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে প্রবাস জীবন যাপন করছেন। সাক্ষাৎকারের শুরুতে থাকছে ব্রাত্য রাইসুর ভূমিকা—‘বগুড়ায় মাসুদ খান’। —বি. স.]

বগুড়ায় মাসুদ খান / ব্রাত্য রাইসু

বগুড়াদেশের কবি আন্ওয়ার আহমদ মইরা যাওয়ার আগে বহু দিন বগুড়ায় আস্তানাগাড়া কবি মাসুদ খানের পিছে লাইগা ছিলেন। সম্ভবত তরুণ কবিদের দখলদারিত্ব নিয়া ক্যাচাল। আন্ওয়ার আহমদের স্নেহভুক্ত তরুণ কবিরা তখন ধীরে মাসুদ খানের কূলে ভিড়তে শুরু করছেন। মাসুদ ভাই তাঁর বগুড়াদশায় বহু তরুণ কবিরে শিক্ষিত করার দায়িত্ব নিছিলেন। (এইটা এখনো তাঁর আছে আশা রাখি। হয়তো কানাডায় বইসা ইন্টারনেটে কোনো তরুণ কবিরে কবিতা কেমনে কেমনে ভালো লাগাইতে হয়, কার কার কবিতা

—————————————————————–
কবিতা লিখে—বা লিখতে গিয়ে—যে-আনন্দ আমি পাই ওটাই সর্বপ্রথম বিবেচ্য।… কবিতা লিখি—লিখে প্রকাশ করার চেয়ে নিজেই বারবার পড়ি—যে, এর ভিতরে কী লিখলাম! মাঝে মাঝে কোনো কোনো অংশ পড়ে আমার নিজেরই রোম শিহরিত হয়—লজ্জার কথা, তবুও হয়। নিজে নিজে পড়ি। পরিমার্জনা করি। পরিমার্জনাগুলি করতে ইচ্ছা করে। এখানে এরকম হলে আরেকটু ভাল্লাগতো…নিজে নিজেই। কাউকে টার্গেট করে…মনেই হয় না। অনেক সময়ই বাইরে প্রকাশ করতে ইচ্ছা করে না।

—————————————————————-
ভালো লাগতে হবে তার টিপস দিতেছেন তিনি, এমন ভাবতে মন চায়।)

বগুড়ায় তখনকার সাহিত্য কর্মকাণ্ডে তাঁর প্রভাব গুরুতর। অন্যদিকে জন্মভূমি বগুড়ায় আপন ক্ষমতা হারাইতে আছেন আন্ওয়ার আহমদ। যে কারণে মাসুদ ভাইয়ের উপরে নিরতিশয় ক্রুদ্ধ আছিলেন তিনি। পোষ্য লেখকগো দিয়া মাসুদ ভাইরে নিয়া অসম্মানজনক কথা লেখাইতেছেন তাঁর ছোট কাগজে। মাসুদ ভাই সেসবে কান না দিয়া সরকারি চাকুরির পাশাপাশি সবেগে সাহিত্য চর্চা করতেছেন। আমরা রাজধানী থিকা তার দাওয়াতে বগুড়ার মাটি পাড়াইতে যাই। (কবি আদিত্য কবির তো একবার আমগো লগে খালি পায়েই বগুড়ার মাটি মায় পাকা রাস্তা বাড়িঘর সব পাড়াইয়া দিয়া আসলো!) বগুড়ার সাহিত্য সম্প্রদায় আমাদেরকে ভালোবাসা সহই বরণ করতো। তো বিবিধি সাহিত্য উছিলায় আমাদের বগুড়াগমন ঘটতো। এই রকমই এক ভ্রমণে আমি আর সাজ্জাদ ভাই গিয়া পৌঁছাইলাম মাসুদ ভাইয়ের বৃন্দাবনপাড়ার সরকারি কলোনিতে। তিন তলায় উনি থাকতেন। যেদিন যাই সেদিনই রাত্রিবেলা নিছিলাম সাক্ষাৎকারটা। আগেই ঠিক কইরা রাখছিলাম যে এম. কে.-র লগে একটা আলাপ রেকর্ড করমু। ওনার প্রস্তুতি আছিল না। সাজ্জাদ ভাইরেও বলি নাই আগে। ওনার ড্রইংরুমে মেঝের মইধ্যে তিনজনে বইসা ছোট মাইক্রো রেকর্ডারে কথা বলতেছিলাম। অল্প আলোয়। কত আগে!

পরে এইটা কাগজে তুইলা নানা জায়গায় ছাপনের উদযোগ নিলাম। কিন্তু মাসুদ খানের তখন কেবলি তেত্রিশ পার হইছে! ফলে কেউ ছাপতে চায় না সাক্ষাৎকার। লিটলম্যাগ বা ছোট কাগজ এই রকম জিনিস ছাপায় বটে, কিন্তু এমনকি আমি যে প্রান্ত পত্রিকার সহ সম্পাদক আছিলাম সেই পত্রিকাও এইটা ছাপবে না—সম্পাদক মঈন চৌধুরী (ভাই) জানাইয়া দিলেন এইটা উনি ছাপতে রাজি না। আমার তখন মনে হইছিল, ঈর্ষা। এখন বুঝি এইটারে বলে সম্পাদকের রুচি। ওনার পত্রিকায় কী ছাপবেন না ছাপবেন তা তো উনিই ঠিক করবেন, না? না ছাপতে চাওয়ার মনোবৈজ্ঞানিক কারণ অনুসন্ধান অসাহিত্যিক ব্যাপার।

দৈনিক পত্রিকায়ও চেষ্টা করছি ছাপানোর। তাদের কথা আর নাইবা বললাম। ওইখানে জাতীয় ব্যক্তিত্ব আর ভুক্তভোগী জনতা ছাড়া অন্যদের ইন্টারভিউ ছাপানো হয় না।

দুই বছর পরে রন নামের এক কলিকাতাওয়ালা (তার দাঁতের সব এনামেল নষ্ট আছিল। গিটার বাজাইতেন।) এই ইন্টারভিউ লইয়া গেলেন পশ্চিমবঙ্গে। অয়ন চক্রবর্তীর গান্ধার পত্রিকায় সাক্ষাৎকার ছাপা হইল ১৯৯৬ সালের বইমেলা সংখ্যায়। আমার কাছে রহস্য, এই বাংলায় যাদের পাত্তা নাই ওই বাংলায় তারা গুরুত্ব পান কী কারণে? পশ্চিমের এই স্নেহের কারণ কী? নিশ্চয়ই ওইখানকার পাঠকরা আমগো পাঠকগো থিকা আগাইয়া আছে! অবশ্য এখন, এইখানকার হরেদরের সাহিত্যিকদেরকে যেইভাবে ওইখান থিকা পুরস্কার ছিটকাইতেছে আমি ঠিক করছি যদি মাসুদ ভাইয়ের আরেকটা ইন্টারভিউ কোনোদিন নেইও, আর তা যদি এইখানে কেউ নাও ছাপায়, ওই বাংলায় আর ছাপতে দিমু না।

ইন্টারভিউটার মোটামুটি ষোলো বছর পূর্ণ হইল। কম কি!

***

মাসুদ খানের সঙ্গে আলাপ

ব্রাত্য রাইসু : ‘কুড়িগ্রাম’ কবিতায় আপনি বলতেছেন, কুড়িগ্রামের লোকজন নাকি সন্ধ্যাবেলা আকাশে চইলা যায়। এসব আপনি কীভাবে বলেন? কুড়িগ্রাম আকাশে চইলা যায় এইটা আপনারে কে বলছে?

মাসুদ খান : একদিন স্বপ্নে দেখছিলাম।

রাইসু : সত্যি না আসলে?

মাসুদ : আসলে সত্যি না।

সাজ্জাদ শরিফ : কবিতায় আপনি মিথ্যা কথা বলেন?

মাসুদ : বলি তো বটেই। ইয়ের মিথ্যা আর কি—স্বপ্নের মিথ্যা। স্বপ্নের মিথ্যা তো সত্যের চেয়েও সুখকর। বাস্তবের চেয়েও সুখকর।

সাজ্জাদ : সত্য ও বাস্তব আপনার কাছে তেমন সুখকর নয়?

মাসুদ : যে-বাস্তবতা, তার চেয়ে আরো প্রসারিত বাস্তবতা হলে সুখকর।

সাজ্জাদ : প্রসারিত বাস্তবতা!

——————————————————

কুড়িগ্রাম

কোনোদিন আমি যাইনি কুড়িগ্রাম।

রাত গভীর হ’লে আমাদের এই প্রচলিত ভূপৃষ্ঠ থেকে
ঘুমন্ত কুড়িগ্রাম ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যায়।
অগ্রাহ্য করে সকল মাধ্যাকর্ষণ।
তারপর তার ছোট রাজ্যপাট নিয়ে উড়ে উড়ে
চ’লে যায় দূর শূন্যলোকে।

আমরা তখন দেখি ব’সে ব’সে অকাশ কত না নীল
ছোট গ্রাম আরো ছোট হয়ে যায় আকাশের মুখে তিল।

অনেকক্ষণ একা একা ভাসে নিখিল নভোভারতের রাজ্যে রাজ্যে।
দক্ষিণ আকাশে ঐ যে একনিষ্ঠ তারাটি
একসময় কুড়িগ্রাম তার পাশে গিয়ে চিহ্নিত করে তার অবস্থান।
তখন নতুন এই জ্যোতিষ্কের দেহ থেকে মৃদু মৃদু লালবাষ্পঘ্রাণ ভেসে আসে।

সেই দেশে, কুড়িগ্রামে, ওরা মাছরাঙা আর পানকৌড়ি দুই বৈমাত্র ভাই
কুড়িগ্রামের সব নদী শান্ত হয়ে এলে
দুই ভাই নদীবুকে বাসা বাঁধে
স্ত্রীপুত্রকন্যাসহ তারা কলহ করে।

নদী শান্ত হয়ে এলে
শাস্ত্রবাক্যে বাঁধা যতো গৃহনারী
প্রাচীর ডিঙিয়ে এসে নদীকূলে করে ভিড়
প্রকাণ্ড স্ফটিকের মতো তারা সপ্রতিভ হয়।

হঠাৎ বয়নসূত্র ভুলে যাওয়া এক নিঃসঙ্গ বাবুই
ঝড়াহত বৃদ্ধ মাস্তুলে ব’সে
দুলতে দুলতে আসে ঐ স্বচ্ছ ইস্পাত-পাতের নদীজলে।
কুড়িগ্রাম, আহা কুড়িগ্রাম!

পৃথিবীর যে জায়গাটিতে কুড়িগ্রাম থাকে
এখন সেখানে নিঃস্ব কালো গহ্বর।

কোনোদিন আমি যাইনি কুড়িগ্রাম
আহা, এ মরজীবন!
কোনোদিন যাওয়া হবে না কুড়িগ্রাম।

——————————————————

মাসুদ : প্রসারিত বলছি এই জন্যে যে, বাস্তবতা যা ধারণ করে তার চেয়েও বেশি বা অন্যরকম হলে সুখকর হতো, স্বস্তিকর হতো। এরকম বলতে পারি যে, বাস্তবতার অতৃপ্তি থেকে, বাস্তবের নানা অসঙ্গতি-বিসঙ্গতির ফলে মনের ভেতরে কিছু একটা জগৎ, দ্বিতীয় একটা প্রকৃতি গড়ে ওঠে, যে-জগতের, যে-প্রকৃতির বিন্যাস আলাদা, লজিক আলাদা, শূন্যতাও আলাদা-অচেনা।

রাইসু : মনের মইধ্যে যা যা তৈরি করেন, সব কিছুতেই তো আর সুখ পান না নিশ্চয়ই?

মাসুদ : সুখ যেগুলোয় পাই সেগুলো হয়তো অবচেতনে তৈরি হতে থাকে। ইচ্ছা করেও মাঝে মাঝে করি। আর তৈরি করি ফ্যান্টাসি, মনে মনে, কল্পনায়, নানান বিষয় নিয়ে—আমরা সবাই-ই করি হয়তো—কোনো একটা বিষয় নিয়ে মাকড়শার মতো ফ্যান্টাসির জাল ছড়াতে থাকি চুপচাপ শুয়ে শুয়ে; কিংবা কোথাও কোনো দূরের ভ্রমণে বাসে কিংবা ট্রেনে যেতে যেতে জানালার ধারে বসে চুপচাপ একা-একা। তখন সুখ-সুখ লাগে। শান্তি-শান্তি লাগে।

সাজ্জাদ : যে কবিতাগুলোয় বেদনা বা অতৃপ্তির ব্যাপার আছে—যে কবিতার মূল স্রোতটাই একেবারে করুণ আবহের আর কি—সেগুলোকে কীভাবে দেখেন? সেগুলোও কি আপনার সুখের ব্যাপার?

মাসুদ : না, বিষয়টি করুণ আবহের মানেই সুখের বিপরীত, তা মনে হয় না। এমন তো হতে পারে যে, করুণ আবহের ভেতরেই সুখ—সুখপ্রদ করুণার আবহ।

রাইসু : কুড়িগ্রাম না হয় উপরের দিকে চইলা যাওয়ায় সুখ পাইছেন, কিন্তু নদীতীরে একটা বিড়াল ঘুরতেছে, এইটা তো বাস্তব একটা জিনিস। আমরা দেখতেও পাই, বিড়াল অনেক ঘুরতেও পারে নদীতীরে। এখন বিড়াল ঘুরতে দেইখা আপনার যেই সুখ তা তো নিশ্চয়ই আর কুড়িগ্রামের উপরে উইঠা যাওয়ার—মানে প্রসারিত বাস্তবতার—সুখ না?

——————————————————

মানুষ

প্রাণিশূন্য নদীচরে নির্বাসিত একটি বেড়াল।
কালো ও নিঃসঙ্গ।
(চুরি ক’রে পাত্র ভেঙে দুধ আর মাছ খেয়ে ফেলে,
উপরন্তু ইঁদুরও ধরে কম,
তাই উত্যক্ত প্রতিপালক
বস্তাবন্দী ক’রে এনে ছেড়ে দিয়ে গেছে বালিচরে, আজ ভোরে।
বেড়াল বারবার লাফিয়ে লাফিয়ে উঠতে চেয়েছিলো
প্রভুর প্রত্যাবর্তনকারী নৌকায়।)

পানির কিনার ধরে হাঁটে।
দু’একটি উচ্চিংড়ে, ব্যাঙ, লম্ফমান মাছ
কৌতূহলে আড়চোখে দ্যাখে—
এ জমিনে নতুন মাখলুকাতের আবির্ভাব ঘন চৈত্রদুপুরে।

পানির কিনার ধরে হাঁটে।
বামাবর্তে সমগ্র চরটি ঘুরে আসে।
একবার দাঁড়ায় উপদ্রুত মনীষীর মতো দৃষ্টি মেলে দূরে—
প্রসারিত পলিথিনের মতো টানা জল, মরুরঙ;
তীব্র ফড়িং-শিহরণসহ ভেসে ওঠে
পরপারে প্রবাহিত সবুজ সিরামিকস ব্যাণ্ড, ঘনবসতির;
ছায়া
শিশু-ইঁদুরের মায়াকরুণ চাহনি
প্রভুর সর্বশেষ মুখভঙ্গি
নিরিবিলি উঞ্ছজীবিকার স্মৃতি।

খুব ম্রিয়মাণ হয়ে ধরা দেয় প্রভুর দূরনিয়ন্ত্রণী সংকেত—
এখন এতোটা দূরে, প্রাক্তন।

——————————————————

মাসুদ : না না না। তা-ও না। কুড়িগ্রাম জিনিসটাও তো বাস্তব। আমি তো বাস্তবের বাইরের জিনিস নিয়ে চিন্তা করি না। উপাদানগুলো বাস্তব থেকেই আহরিত। কিন্তু বাস্তবের সেই উপাদানগুলো নিয়েই এরকম একটা বিন্যাস, যা প্রচলিত বাস্তব থেকে আলাদা, অনুভূতির এমন কিছু কেন্দ্রে আঘাত করে যেটা…

সাজ্জাদ : সেক্ষেত্রে ব্যাপারটা এভাবে বলা যায় যে, একটা সুখপ্রদ অনুভূতি তৈরি করার জন্যে, বাস্তব এবং বাস্তবের বাইরের জিনিস, এ দুটো মিলিয়ে আপনি কবিতা তৈরি করেন।

মাসুদ : বাস্তবের বাইরে! এটা অ্যাবসার্ড ব্যাপার।

সাজ্জাদ : বাস্তবের বাইরে বলতে বোঝাতে চাইছি, আপনার কল্পনা…

মাসুদ : বাস্তব থেকে আমি বস্তু আহরণ করছি; বা বাস্তবে অবস্থিত বস্তুগুলোই হচ্ছে…। কিন্তু একটা বিশেষ বিন্যাসে, আলাদা অচেনা কিছু সূত্রে, অচেনা কিছু যুক্তিতে বিন্যস্ত হচ্ছে। খুব সুখপ্রদ। প্রশান্তিজনক। যে-বিন্যাসটা সচরাচর এই বাস্তবতায় পাওয়া যায় না।

সাজ্জাদ : যেমন, ‘কুড়িগ্রাম’ কবিতায় আমরা দেখছি এর বহু চিত্ররচনাই মোটামুটি বাস্তবানুগ। কিন্তু কুড়িগ্রামের এই যে উড়ে যাওয়া, এখানে আপনি বাস্তবকে পেরিয়ে গেলেন। দুইয়ে মিলে কুড়িগ্রাম নতুন কিছু হয়ে উঠল।

mk2.jpg……
টরন্টোর সেন্ট্রার আইল্যান্ডে; ছবি: শরীফ উদ্দিন।
…….
মাসুদ : উড়ে যাওয়া, তারপর ওই যে নতুন জ্যোতিষ্ক হয়ে মৃদু-মৃদু লালবাষ্পঘ্রাণ ছড়ানো, ভূপৃষ্ঠে কুড়িগ্রামের যে-জায়গাটা, সেখানে গহ্বর পড়ে থাকা; তারপর আরও ব্যাপার, ওই যে সেখানে আর কোনোদিন যাওয়া হবে না, এই আর্তি; তারপর সেখানকার বাস্তবসদৃশ বর্ণনার মধ্যে যে যুক্তিগুলো, সেই মাছরাঙা আর ইয়ে—কী যেন?—দুই বৈমাত্রেয় ভাই। মাছরাঙা আর…কী বলেছিলাম? ও হ্যাঁ, মাছরাঙা আর পানকৌড়ি। কিন্তু বাস্তবে ওরা তো আর বৈমাত্রেয় ভাই হয় না, কিন্তু ওখানে ওরা বৈমাত্রেয় ভাই। মানে এরকম হলে ভালো হতো মনে হয়। তারপর, সব নদী যখন শান্ত হয়ে আসে তখন ওই বৈমাত্রেয় ভাইয়েরা নদীবক্ষে বাসা বাঁধে। পরে স্ত্রীপুত্রকন্যাসহ কলহ করে। অবশ্য একটা ওয়েস্টার্ন রূপকথায় এমন একটা ব্যাপার ছিল বোধহয় যে, সমুদ্র শান্ত হয়ে আসলে সেখানে মাছরাঙা বাসা বাঁধে। হয়তো অবচেতনের কোনো রিফ্লেক্স থেকে এগুলো এসেছে ‘কুড়িগ্রাম’-এ। মানে এরকম একটা কুড়িগ্রাম হলে…

রাইসু : আপনার খুব ভাল্লাগে?

মাসুদ : বেশ মজা। সুখপ্রদ জিনিস একটা। স্বপ্ন দেখতে থাকলে ঘুম যেন না ভাঙে এরকম ইচ্ছা করে না?

রাইসু : কল্পনা? ভাববিলাস?

মাসুদ : ‘বিলাস’ কথাটা কেন আবার?

রাইসু : বিলাস খারাপ কী? বিলাস কী দোষ করল?

মাসুদ : না, হয় কি বিলাসিতা করতে করতে এরকম কল্পনা করি, তা না কিন্তু।

রাইসু : বিলাস পছন্দ করেন না আপনি?

মাসুদ : বিলাসিতা তো কোনো কোনো অর্থে নেতি বটেই।

রাইসু : কেন নেতি?

মাসুদ : আমরা খুব… কীসের দিকে যাচ্ছি?

রাইসু : আমরা পলিটিক্সের দিকে যাচ্ছি। বলেন, বিলাসিতা খারাপ কেন?

সাজ্জাদ : এত উদ্ভাবন আর আয়োজন তো উত্তরোত্তর নানা বিলাসের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে আমাদের। মানুষকে আরো সুখ দেয়ার জন্যে, আরো বিলাস দেয়ার জন্যেই তো সব হয়ে চলেছে বলে মনে হয়…

মাসুদ : ভাববিলাস বোধহয় সভ্যতার অন্বিষ্ট না।

রাইসু : আপনি সভ্যতার পথে চলতে চান কিনা সেটা আগে বলেন। সভ্যতা যেদিকে যেতে চায় আপনি সেদিকে যেতে চান কিনা?

মাসুদ : সভ্যতা যেদিকে যেতে চায়!

সাজ্জাদ : মানে আপনি কি সভ্যতার অভিমুখী?

মাসুদ : হ্যাঁ। যদিও বর্তমান ঘোর যুক্তিবাদী, ঘোর ভোগবাদী সভ্যতার অনেক অন্ধকার দিক আছে।

রাইসু : সভ্যতা যদি ভাববিলাস চায় সেক্ষেত্রে কি আপনিও চান?

মাসুদ : না, মানে…

রাইসু : আপনি সভ্যতার বিরুদ্ধে যেতে চাচ্ছেন?

মাসুদ : না। গেলেও টিকতে পারব না তো।

রাইসু : আপনি এরকম ভাবছেন কেন, সভ্যতার বিরুদ্ধে যায় না মানুষ, গিয়ে জঙ্গলে বসে থাকে না?

মাসুদ : না না না, এটা সমস্যা। অনেক সমস্যা। আমার মতো ব্যক্তির পক্ষে জঙ্গলে গিয়ে থাকা অসম্ভব। জঙ্গলে গিয়ে থাকা যাবে না।

রাইসু : ব্যক্তি! আপনি কি আসলেই ব্যক্তি?

মাসুদ : হ্যাঁ। সেই আর কি। আসলে…

রাইসু : আসলের আগে শেষ করে নিন, আপনি বস্তু না ব্যক্তি?

মাসুদ : ব্যক্তি। ব্যক্তি।

রাইসু : তাহলে কিন্তু মনে রাখবেন, ব্যক্তি আপনি, বস্তু নন। বস্তুর কোনো উপাদান নেই আপনার মধ্যে।

মাসুদ : আছে তো। বস্তু-উপাদান আছে। বস্তুর উপাদান দিয়েই তো ব্যক্তি। বস্তুর বিন্যাসের বিশেষ বিকশিত অবস্থায় আছি।

রাইসু : আপনি আছেন! মানে প্রথমত আপনি আছেন। আপনি কি আছেন?

মাসুদ : আছি।

রাইসু : আপনি নাই যে তা তো না?

মাসুদ : না।

রাইসু : কীভাবে বুঝলেন যে আপনি আছেন?

মাসুদ : এই যে আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি। একজন শূন্যতা তো আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে পারে না।

সাজ্জাদ : এমন কি হতে পারে না, পুরো ঘটনাটি অন্য কারো স্বপ্নের মধ্যে ঘটছে?

মাসুদ : পুরো ঘটনা অন্য কারো স্বপ্নে?

সাজ্জাদ : অন্য কারো একটা বিশাল স্বপ্নের মধ্যে হয়তো আমরা আছি!

মাসুদ : আমরা এই বাস্তবে আছি এরকম মনে করলেই অধিকতর ভালো হয় আর কি।

রাইসু : আমরা কোন জায়গায় ছিলাম?

মাসুদ : ছিলাম যে, ওই ইয়ে আর কি… কী যেন… ভুলেই তো গেলাম।

সাজ্জাদ : আচ্ছা, বলেন মাসুদ খান, এই যে আপনি বস্তু নিয়ে লেখেন, সিলিকন নিয়ে লেখেন, কার্বন নিয়ে লেখেন—আপনি লিখেছেন, ‘বস্তুর থেকে বিকশিত ফের বস্তুতে ফিরে যাওয়া…’। আপনি বেশ বস্তুবাদী, তাই না?

——————————————————

সার্কারামা

আজ এক রুগ্ণ অগ্নিকুণ্ডের কিনারে বসে আছি জবুথবু
চারদিকে চলমান সার্কারামা
ছবিগুলো খুব দ্রুত নাচতে নাচতে আসে আর যায়।

কুড়ি লক্ষ বর্ষ আগে প্রকৃতির লোহিততন্ত্রে-তন্ত্রে তীব্র দাহ
অণ্ডআত্মা থেকে প্লাবনের বেগে ঢেলে ফেলে জন্মশুক্র
এতো বাঁধ, এতো যে বিন্যাস
শুক্রগতি থামছে না তবু
উর্ধ্ব থেকে প্রতিহত হয়ে আসে প্রতিনিধি, অগ্নিকোণে।
রেতঃস্রোতে অবিরল তাপ ঢালে সপ্তবহ্নিজাল
অসহ্য অসহ্য এতো বর্ণবিকিরণ, এতা বহুতল হীরকের সন্ত্রাস
এতো বাষ্প, গন্ধ, পঞ্চভূতের এতোটা পচন ও মন্থন!
স্রোতে ঘোরে মহাচক্র
চক্রে চক্রে পাপ, পুঞ্জীভূত ফেনা
ফেনা থেকে প্রাচীন ডুবোপাহাড়ের মতো
তীব্র জলধ্বনিসহ ঘুরে ঘুরে উঠে আসে নতুন কিরণ
গনগনে নতুন কীটাণু
সদ্যোজাত ছেচল্লিশ লাল ক্রোমোজমের উল্লাস।

বনবৃক্ষে বাড়বাগ্নি জ্বলে
ধুম্রপাকে হারিয়ে ফেলে পথ
উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকে ব্যাঘ্র ও ম্যামথ।

নদীর জলে ওড়ে ভস্ম, ওরে মৎস, কোথায় যাবি তুই
বাইসনেরা ধুলোয় গড়ায়
পক্ষীরা সব পক্ষ গুটায়
দিসনে ঠোকর, পুড়বে কেবল পুড়বে রে চঞ্চুই।

হিংস্র নখরা বিকট দন্তুর
অতিকায় সব প্রাচীন জন্তুর
চিৎকার শোনা যায়
কাতরায়, তারা কাতরায়
শুধু আলকাতরার জলাশয়।

অরেঞ্জ নদীর তীরে নামলো রাঙা প্রমিথিউস
মৃত্তিকাস্তর কাঁপলো মৃদু মৃদু
অরেঞ্জ নদীর তীরে
ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত রঞ্জিত সব মানুষ।

রাত্রিগ্রস্ত দুই ঈশ্বর মাদুরে ঝিমোতে থাকে
মাটির পাত্রে অস্থিপোড়ানো অঙ্গার, কার্বন
বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে এক নারী, বৈতরণীর বাঁকে
ঐ অবিনাশী পৃথিবীর মতো আইবুড়ো, কার বোন?

হাম্মুরাবি ভেসে ভেসে আদিকৃত্যে যায়
উঁচিয়ে রাখা তর্জনীতে তার
একটি ফড়িং উড়ে উড়ে শুধু বসতে চায়।

ঝাঁক বেঁধে মাঠে ভ্যাণ্ডালদল নামে
দষ্ট ফসল চিৎকার ছোঁড়ে দীর্ঘে এবং বামে
শাদা হিংসায় গতি থমকায়
প্রবাহিত মানুষের।
শস্যকীটের লালা থেকে ঝরে তেজ
পানকৌড়ির দিকে তেড়ে আসে বন্যবহ্নিলেজ।

সহসা শূন্যে সালফার মুঠে উড়ে যায় ক্রীতদাস
বায়ুমণ্ডল পুড়ছে খুব তখন
আকাশে আকাশে রক্তকাণ্ড, হঠাৎ বিস্ফোরণ
ক্রীতদাস ফেটে বীজাণুর মতো অসংখ্য ক্রীতদাস
আকাশের থেকে হাঁস ভেসে আসে হাঁস।

আকাশের থেকে হাঁস নেমে আসে হাঁস
মধ্যরাত্রে বুদ্ধ জড়ায় গাত্রে
পশমীর মতো ছাইরঙা সন্ন্যাস।
আকাশের থেকে হাঁস ভেসে আসে হাঁস।

সার্কারামায় আসে উপসংহার
স্থিত গৌতমও গতির আহার, বোধির পাশেই অগ্নিপাহাড়
জ্বালামুখে জ্বলে মানুষের স্নায়ু, মগজ এবং স্নেহ
নিথর রেটিনা ধরে রাখে সাত রশ্মির মৃতদেহ।

গড়িয়ে নেমে আসে খঞ্জ লুসিফার
কাঁধের ডানে বামে আণব শীতকাল
চুলের হিসহিসে পতিত ইতিহাস
অন্ধকার দিয়ে গঠিত প্রস্তর।
জাগছে কালে কালে ইচ্ছা অদ্ভুত
ধাতব মুদ্রার, বিরামচিহ্নের।
মেঘের কশ বেয়ে গড়িয়ে নেমে আসে
গড়িয়ে নেমে আসে খঞ্জ লুসিফার
অন্ধকার দিয়ে গঠিত শিলাকাল
প্রতিদ্বন্দ্বিতা টোটেম ও মনীষার।

এইবার এই অবেলায়, হে জ্ঞাতি, হে রহস্যের উপজাতি,
অন্তহীন শিবলিঙ্গের প্রহরী,
গলমান গ্রাফাইট স্তরের ওপর গড়াগড়ি দাও
পুনর্বার পাপ ক’রে ফিরে এসো
পুনর্বার মুদ্রণযন্ত্র ভেঙে ভূমিসাৎ ক’রে দাও হে অর্জুন
স্মৃতিভ্রষ্ট ব্যাধ, স্মরণকালের হে অবিস্মরণীয় ব্যাধি।

পঞ্চভূতের শাসিত নিয়তি
পৃষ্ঠদেশের ক্ষত আর ক্ষতি
তীব্র ক্ষুধা ও খাদ্যের গতি
বিস্মৃত হও, বিস্মৃত হয়ে যাবে।

বৃত্ত ঘোরে মহাবৃত্ত
বিনাশ, মহামারী নৃত্য
মনুকুলের শেষকৃত্য
প্রাণী এবং পতঙ্গের সাথে।

শ্রবণ বধির ক’রে দিয়ে বয় মহাবৃত্তের হাওয়া
বস্তুর থেকে বিকশিত ফের বস্তুতে ফিরে যাওয়া!
শ্রবণ বধির ক’রে দিয়ে বয় মহাবৃত্তের হাওয়া
শ্রবণ বধির ক’রে দিয়ে বয় মহাবৃত্তের হাওয়া
শ্রবণ বধির ক’রে দিয়ে বয় … … … …
শ্রবণ বধির … … … … … … … … …
শ্রবণ … … … … … … … … … … …

——————————————————

মাসুদ : এটা তো ঠিক বস্তুবাদ না।

রাইসু : বস্তুবাদ না? তাইলে আপনি কবিতা লেখেন কেন?

মাসুদ : ভাল্লাগে। বেশ মজা লাগে। এছাড়া, ব্যাপারটা হলো কি, মনে হয় একটা জিনিস আমি একদিন চিন্তা করেছি যে…

সাজ্জাদ : আবার চিন্তা?

মাসুদ : কবিতা লিখে—বা লিখতে গিয়ে—যে-আনন্দ আমি পাই ওটাই সর্বপ্রথম বিবেচ্য। আমার তো তাই মনে হয়। আমার এরকম মনে হয় যে, আমাকে যদি কোনো দ্বীপে পাঠিয়ে দেয়া হয়, যদি যেতে বাধ্য হই আর কি, সেখানে অন্যান্য পরিবেশ যদি টিকে থাকার পক্ষে অনুকূল হয়—অনুকূল না হলে তো হবে না—তাহলে মনে হয় ওখানেও আমি কবিতা লিখব। আমি এখনও তা-ই করি। কবিতা লিখি—লিখে প্রকাশ করার চেয়ে নিজেই বারবার পড়ি—যে, এর ভিতরে কী লিখলাম! মাঝে মাঝে কোনো কোনো অংশ পড়ে আমার নিজেরই রোম শিহরিত হয়—লজ্জার কথা, তবুও হয়। নিজে নিজে পড়ি। পরিমার্জনা করি। পরিমার্জনাগুলি করতে ইচ্ছা করে। এখানে এরকম হলে আরেকটু ভাল্লাগতো…নিজে নিজেই। কাউকে টার্গেট করে…মনেই হয় না। অনেক সময়ই বাইরে প্রকাশ করতে ইচ্ছা করে না।

সাজ্জাদ : তাহলে ছাপান কেন?

মাসুদ : এর সঙ্গে যদি আরও কিছু যুক্ত হয়! অন্যের যদি ভালো লাগে! প্রাথমিক ব্যাপার হলো আমি নিজেই মনে মনে পড়ি। মাঝে মাঝে খিলখিল করে হাসি। শিহরিত হই। রোমাঞ্চিত হই। খেলা করি।

সাজ্জাদ : তাহলে অন্যের কবিতা পড়েন কেন?

মাসুদ : অন্যের কবিতায় এ-মজাটা পাই। নিজের কবিতায় পাই সৃষ্টি করার মজা। অন্যের কবিতায় পাই…কী মজা পাই? স্বাদ গ্রহণ করার মজা।

সাজ্জাদ : আপনার কী মনে হয়, সভ্যতার মধ্যে কবিতা কোনো ভূমিকা পালন করে?

মাসুদ : আসলে কবিতার ভূমিকাটা আমার কাছে প্যাসিভ মনে হয়। এগুলো কোনো একটা সম্ভাবনাকে শুধু হয়তো উজ্জীবিত করতে পারে। এখন সভ্যতার একটা সম্ভাবনাকে উজ্জীবিত করা বলতে কী বোঝায়? সভ্যতায় কাজ করে বটে, কিন্তু সেটা মেইনস্ট্রিম বা ইমপালসিভ কিছু নয়।

রাইসু : পাঠকরা কি আপনার কবিতা বুঝতে পারে? একটা, দুইটা বা তিনটা পাঠক—বুঝতে পারে বলে মনে করেন কিনা?

মাসুদ : সব তো পারেই না মনে হয়।

রাইসু : বেশিরভাগ পারে কিনা, কম্যুনিকেট করতে, আপনার কবিতা?

মাসুদ : পারে তো মনে হয়। কিন্তু কম্যুনিকেট বলতে আমি যা বোঝাতে চাইলাম তা বুঝতে…

রাইসু : আপনি কী বোঝাতে চাইলেন তা আপনি নিজে জানেন কি?

সাজ্জাদ : কবিতায় কী বলতে চান তা আপনার কাছে সবসময় স্পষ্ট? কবিতায় আপনি আসলেই কিছু বোঝাতে চান কিনা, সুনির্দিষ্ট কিছু?

মাসুদ : সেই যে, ভবন তৈরি করার সময় যেমন ভিত্তি তৈরি করা হয়, গাঁথুনি হয়ে তারপর একটা দাঁড়ায়। নির্মাণ করতে করতে তারপরে কবিতায় একটা বক্তব্য দেয়ার যে চূড়ান্ত…সেরকম আমার কবিতায় কখনোই হয় না মনে করি।

সাজ্জাদ : পাঠকের সমস্যাকে আপনি কোনো সমস্যা মনে করেন?

মাসুদ : হ্যাঁ, কিছুটা তো করিই। আমি মনে করি যে-পরিপ্রেক্ষিতে, যে-অবস্থানে আমি আছি—আমার নিজের কাছে যদি কিছু একটা ভালো লাগে, ঠিক অনুরূপ কোনো উপলব্ধি বা মানসিক ঝোঁক যদি কারো থেকে থাকে তো তারও ভালো লাগবে। তার আগে নিজের কাছে ভালো লাগাটা জরুরি মনে হয় আমার ।

সাজ্জাদ : এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনি একবার বলেছিলেন, প্রাইমেট বা নরবানরের দশা থেকে বিবর্তিত ও বিকশিত হয়ে নানা পথ উজিয়ে আমরা হোমো স্যাপিয়েন্স বা মানুষ হয়ে উঠেছি। সেভাবেই হয়তো ধীর বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষেরা ভবিষ্যতে এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছবে যখন মানুষকে আর মানুষ বলা যাবে না। হোমো স্যাপিয়েন্সের বদলে সে হয়তো তখন হয়ে উঠবে—ধরা যাক—হোমো হেমিস্ফেয়ার। আপনি বলেছিলেন, মানবজাতির এই নীরব বিনাশের কথা ভেবে আপনার কষ্ট হয়। তা হলে বলেন তো, এই যে লেজ খসিয়ে দু পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমরা মানুষ হয়ে উঠলাম, সেই হারানো লেজের জন্য আপনার কষ্ট বোধ হয়?

মাসুদ : লেজ?

সাজ্জাদ : আপনার পূর্বপুরূষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন যে লেজটির কারণে।

মাসুদ : নাহ্, লেজ তো খুব একটা দৃষ্টিনন্দন না।

সাজ্জাদ : এটা কীভাবে বলেন? ধরুন ছাগলের লেজ নেই, তা হলে কি কুৎসিত লাগবে না?

রাইসু : তারপরে ধরেন আমার ফ্রেন্ড আদিত্য কবিরের যে লেজ নাই। বা ধরেন মঈন চৌধুরীর যে লেজ নাই।

মাসুদ : মানুষের লেজ না থাকলেই ভালো। থাকলে অনেক অসুবিধা…

রাইসু : সেক্ষেত্রে আপনার কবিতায় তো দেখছি বারবার ছাতিম গাছ নিয়ে আসছেন।

মাসুদ : শৈশব থেকেই আমার কাছে ছাতিম গাছকে একটা হাস্যকর চরিত্র মনে হতো।

সাজ্জাদ : কেন?

মাসুদ : সে কী এক অদ্ভুত গাছ! রোদের ভেতরে জন্মে, আবার ছায়াতেও জন্মে। হা হা হা। ছাতিম গাছ বেশ বড় হয়। তার কাঠে কোনো আসবাব হয় না। লাঠি বা খড়ি ছাড়া কাঠগুলি আর কোনো কাজে লাগে না। জ্বালানি হয়, দেশলাইয়ের কাঠি হয়। এক ধরনের গন্ধ বের হয় ছাতিম গাছ থেকে, বিশেষ করে রাত্রিবেলা। কেমন আনস্মার্ট গন্ধ!

রাইসু : তো কবিতা লেখায় প্রথমে আপনি উদ্বুদ্ধ হন ছাতিম গাছ দেখে?

মাসুদ : না। এটা তো কোনো দেখে-টেখে না। আমার প্রথম কবিতার নাম ‘আমি স্বতন্ত্র’।

সাজ্জাদ : আপনার একটা কবিতায় আছে যে, এক লোক আÍহত্যা করেছে ছাতিম গাছে।

মাসুদ : এই ব্যাপারটিই তো আমার জন্যে সবচেয়ে…

সাজ্জাদ : মৃত্যুর সময় একটা মানুষ হাস্যকর এক চরিত্রের কাছে নিজেকে সমর্পণ করল। এর পেছনে একটা ঘটনা আছে।

মাসুদ : আÍহত্যা, বিশেষ করে ফাঁসি দিয়ে ঝুলে আÍহত্যার ব্যাপারটা আমার কাছে অনেক সময় বেশ ফানি লাগে। ঠিক ফানি নয়, মানে কেমন যে লাগে। আÍহত্যাকারীর প্রতি বেশ করুণা…মনে হয় যে, মৃত্যুর ঠিক আগ পর্যন্ত লোকটা হয়তো ছিল জেদি, দাঁত কিড়মিড় করে মাটি কামড়ে আগুয়ান এক অসমসাহসী যোদ্ধা। মুক্তির জন্য উদ্বেলিত, অসম্ভব প্রাণিত এক যোদ্ধাপুরুষ। ঠিক কয়েক মুহূর্ত পরেই সে হয়ে গেল হাস্যকর ভঙ্গিমায় পোজ দেওয়া এক নিরীহ ক্লাউন। ফ্রিজ হয়ে যাওয়া। সমস্ত সংগ্রাম থেকে আচমকা অবমুক্ত, স্খলিত। বেশ কৌতুকপ্রদ, তা-ই না? ঝুলন্ত দেহ, দেহটা দুলছে, ঘাড় কাৎ, জিহ্বাটা মোটামুটি বের হয়ে আছে, তা-ও আবার দাঁতে কাটা, তা-ও…

সাজ্জাদ : হেগেও হয়তো দিয়েছে, তা-ই না?

মাসুদ : হ্যাঁ, হ্যাঁ, এরকমও হয়, কী অদ্ভুত একটা…

সাজ্জাদ : আপনি একবার বলেছিলেন, একটা লোককে আপনি আÍহত্যা করতে দেখেছিলেন। লোকটা বেশ ব্যক্তিত্ববান ছিলেন জীবিত অবস্থায়। আÍহত্যার পর জিভ বের হয়ে আছে তার, বিষ্ঠা গড়িয়ে পড়ছে পা দিয়ে। মরে যাওয়ার পর কী হাস্যকর একটা অবস্থা!

মাসুদ : সেটাই আর কি। আমার একটা কবিতার সঙ্গে এমন ব্যাপার জড়িত ছিল। কবিতার নাম ‘ক্লাউন’। ব্যাপারটা হলো কি, যে-ছাতিম গাছকে চিরকালই এক অদ্ভুত চরিত্র ভেবে এসেছি, শেষপর্যন্ত কিনা ঘটনাটা ঘটল সেই ছাতিম গাছেই! কী একটা রেয়ার কো-ইনসিডেন্স! রাশভারি, সম্মানীয় এক শিক্ষক-ছাত্র-অছাত্র গ্রামের সবার কাছ থেকেই যিনি সম্মান পেয়ে আসছেন। বেশ ব্যক্তিত্ববান পুরুষ। মরে ঝুলে আছেন, ঘাড় একদিকে কাত করে। দাঁতে জিহ্বাটা কাটা, যেন ভেংচি কাটছেন। ভাবেন তো, রাশভারি শিক্ষক ভেংচি কাটছেন; আর ঝুলছেন তো ঝুলছেনই, ছাতিমের ডালে। পা বেয়ে মরা রক্তের রেখা, তরল মলের রেখা আর ভনভন মাছি।

——————————————————

ক্লাউন

ঠায় ঝোলানো মুখটা যেন
খেজুর গাছে ভাণ্ড
ছাতিম গাছে দোদুল্যমান
কলা গাছের কাণ্ড।

চক্ষু দু’টি চড়কগাছে
ঘাড় গিয়েছে বেঁকে
একটু-আধটু রস পড়ছে
বকযন্ত্র থেকে।

আগুন কাঁখে আটটি দিকে
উলঙ্গ জিপসি
ন্যাংটো নর-নারী দেখে
কাটলো কী জিভ, ছি!

ছাতিমের ঐ ছোট অপ্রতিভ শাখা
তার এতো ক্যারিশ্‌মা! প্রজ্ঞায় বাঁকা!
লোভনের লোল চাকু লাল ফলে বেঁধা
শিশুর সামনে ঝোলে পুতুলের মেধা।

কেউ বলে, সে অলবড্ডে
হ্যাংলা বেশি। ভুল পদ্যে
মঞ্চে মাতে। এরই মধ্যে
নেপথ্যে সেই সুতোশুদ্ধে
টান।

সেই সাথে সেই নটমোড়ল
লাল হলুদ আর শাদা তরল
নাক মুখ কান গুহ্য দিয়ে
লাল-কালচে জিভ দেখিয়ে
ফ্রিজ।

ঝুলন্ত ঐ দারুমূর্তি ছিলো চক্রবালে
ঝুলতে ঝুলতে ঠেকলো এসে হাবা গাছের ডালে।
মোচনের লাল লগ্ন এনে দেয় ঢেকে মা শচী
যুগলবন্দী একটি ফ্রেমে উভয় পত্রমোচী।

চন্দ্রের মন্থরা ছোট মেয়ে হাওয়া
অর্ধেক অধরা সে, অর্ধেক পাওয়া
অর্ধেক লুপ্ত সে ছিলো গতকাল
তার দিকে ছুটে গেছে সারাটা সকাল।

দেহভর্তি মাখামাখি রাত্রি এবং আগুন
জড়বুদ্ধ সিদ্ধপুরুষ স্থিরচিত্রে ক্লাউন।

——————————————————
সাজ্জাদ : ব্যাপারটা আসলেই এরকম। নাকি আত্মহত্যার সেই দৃশ্য দেখার পর থেকে ছাতিম গাছ আপনার বিশেষভাবে নজর কাড়তে শুরু করে?

মাসুদ : আগে থেকেই ছাতিম গাছ নজরে পড়ত। কতগুলো বিশেষ মুহূর্তে, জীবনের বিশেষ বিশেষ ক্রান্তিলগ্নে এসে ঘুরেফিরে ছাতিম গাছ দাঁড়িয়ে থাকে এবং মুচকি মুচকি হাসে। এই তো সেই ছোটবেলায় এত গাছগাছড়ার মধ্যে সবার দৃষ্টিতে অবহেলিত একটা গাছ দৃষ্টিতে এসে দাঁড়াবে। এরকম হয় কেন যে সবসময় আমি ছাতিম নিয়ে আবর্তিত হই।

সাজ্জাদ : আপনার কেন্দ্রীয় থিমগুলোর একটি কিন্তু ছাতিম।

মাসুদ : এসে যায়, বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে ছাতিম গাছ আসে। তারপর ওই যে বিড়াল, তারপর ওই যে…কী যেন…এসে দাঁড়িয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে রাখে। তাদের দেখি বিশেষ বিশেষ সময়ে।

রাইসু : আচ্ছা, ছাতিম গাছ ছাড়া এরকম আর কী কী আসে আপনার কবিতায়?

সাজ্জাদ : এই যেমন ধাতব বস্তু? এই লোহা, কার্বন, সিলিকন।

মাসুদ : এ ব্যাপারটার একটা মজা আছে। দ্যাখেন, এই যে আপনার পাশে যে অংশটুকু, এই যে আপনার চামড়া, পশম…

সাজ্জাদ : এটা কিন্তু ধাতু না।

মাসুদ : আমার কবিতায় ধাতব শব্দ আসে এটা ঠিক না। আসে এলিমেন্ট। মৌলিক পদার্থ আর কি।

রাইসু : কেন আসে?

মাসুদ : আমার ভাবতে ভাল্লাগে যে, এই যে এত বস্তুপরিবৃত অবস্থায় আমরা আছি—এর সবই তো কিছু মৌলিক বস্তুর বিচিত্র ও বর্ণাঢ্য বিন্যাস। বস্তুর এত বিচিত্র বিন্যাস কীভাবে যে ঘটছে! এত বিবর্তন, এত সাইকেল, রি-সাইকেল! মানে রীতিমতো…

সাজ্জাদ : অবিশ্বাস্য ব্যাপার?

মাসুদ : না, মানে ঈশ্বরের প্রতি যেমন একজন ভক্ত…ঈশ্বরের যে লীলা…তার লীলার এত যে ব্যাপ্তি, এটা তার ভক্তকে যেভাবে অবাক করে দেয়, আমার মধ্যেও বিষয়টা সেভাবে কাজ করে।

সাজ্জাদ : আপনার বেশ ধার্মিকতা আছে। বিজ্ঞানের প্রতি সংশয়ও আছে আপনার। যেমন একটা প্রবন্ধে আপনি লিখেছেন, বিশ্ব অসীম। আইনস্টাইনের সসীম বিশ্বের ধারণাটি আপনি মানেননি।

মাসুদ : না, আমি বলেছি যে সেটি আমার পারসেপশনে আসে না।

সাজ্জাদ : পারসেপশনে তো আপনার অনেক কিছুই আসে না। কিন্তু সেগুলো নিয়ে তো সংশয় প্রকাশ করেননি।

মাসুদ : মানি না, আবার মানি—এরকম আর কি। কিন্তু পারসেপশনে আসে না। একটা অবাক কাণ্ড।

সাজ্জাদ : আপনি লিখলেন, বিশ্ব অসীম। তো অসীমের ধারণাটি আপনি পারসেপশনের মধ্যে কীভাবে আনলেন?

মাসুদ : আসলে ব্যাপার হলো কি, যখনই কোনো কিছুকে আমরা পারসিভ করতে পারি না তখন তাকে অসীমের দিকে ঠেলে দিতে ইচ্ছা করে। এটা হলো, কী বলব, অসীম তো একটা গাণিতিক ধারণা, বুদ্ধিগত একটা অবস্থার পরিভাষা।

সাজ্জাদ : আপনার কি মনে হয় বিশ্ব সসীম হলে কবিতার ভাষ্য যেরকম হয়, বিশ্ব অসীম হলে সেটা অন্য রকম হতো?

মাসুদ : এসব কথাবার্তার মধ্যে ঠিক পারম্পর্য খুঁজে পাচ্ছি না। কী নিয়ে যেন বলতে ছিলাম?

রাইসু : মৌলিক পদার্থ, বিশ্বের উপাদান যে মৌলিক পদার্থ সেটা নিয়ে।

মাসুদ : সেই তো, আমি বিস্মিত হয়ে যাই। ব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় এই যে ছোট্ট অংশটুকু—যেখানে আমরা বসে আছি—এই যে আপনার চামড়া, এই যে লোম, এখানে কী এটা—কার্পেট, এটা বই, এই কলম, এই কাগজ, এই যে এটা কী? ক্যাসেট। তারপরে এটা কী—সিনথেটিক কী যেন, এইটা ধাতব, তারপরে এই যে একটু পানি; তারপর এই যে বিস্কুটের গুঁড়া, চানাচুর। লক্ষ করে দেখেন, এই অংশটুকুর ভিতরে মৌলিক পদার্থের কতো ধরনের বিন্যাস! কী এক বিষ্ময়কর ঘটনা! জড়েরই অবাক বিন্যাসে তৈরি হলো জীবকোষ। জীবকোষ থেকে জীব। এটা কার্বন, আবার রং আছে! রঙের আবার বিভিন্ন রূপ। এটা পানি…হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন দিয়ে তবে এই পানি। এইটুকু অংশের ভিতরেই বিচিত্রভাবে বিন্যস্ত হয়ে কত পদার্থ তৈরি হয়ে আছে। বিচিত্র লীলাখেলার মতো মনে হয়। এগুলিই আমাকে বেশি বিস্মিত করে। সে জন্য আমার কবিতায় মাঝেমধ্যে মৌলিক পদার্থ আসে। এগুলোর বিস্ময় আমি ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারি না।

রাইসু : আপনি বিস্ময় প্রকাশ করতে খুব আগ্রহী?

মাসুদ : বিস্ময় ঘটলে তো প্রকাশ করতে আগ্রহীই হই।

রাইসু : কার কাছে?

মাসুদ : সেগুলি নিয়ে তো আলাপ হয়েই গেল। বস্তুর বিন্যাসের মূলে অবস্থান করছে এগুলো। অনেকগুলি মৌলিক পদার্থ মিলে যৌগিক পদার্থ এবং জটিল যৌগ তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে বিবর্তনের প্রক্রিয়ায়। আগে কত সরল যৌগিক ছিল। এখন এত বেশি বিচিত্র বিন্যাস ও সমাবেশ, এত পারম্যুটেশন কম্বিনেশন হয়েছে যে…

রাইসু : বিরক্ত হয়ে যান?

মাসুদ : না, বিরক্ত না। খালি বিস্ময়। বিস্ময় বোধ করার বাতিক। হা হা হা।

সাজ্জাদ : হ্যাঁ, এবার যৌনতা বিষয়ে আসি।

রাইসু : উনি তো যৌনতা করেন না। উনার খালি বস্তুকাম। বস্তুকে নিয়ে আসেন উনি।

সাজ্জাদ : সে ব্যাপারেই আসছি। আপনার কি মনে হয়, এসব আপনার ম্যাটার-ফেটিশিজমের লক্ষণ?

মাসুদ : আপনার কি তাই মনে হলো? ভাবি যখন, কথা বলি যখন, তখন যাই করি তখন এরকম মনে হয়। আবার কবিতায় দেখি অন্যরকম হয়ে গেছে। এই যে মানুষের কথা থাকে—কী বলব—এটা আমি বুঝি না।

রাইসু : মানুষের কথা যে কবিতার মধ্যে আনেন, আপনার লজ্জা করে না? আপনার মনে হয় না যে খুব খারাপ একটা কাজ করলেন?

মাসুদ : কেন? নাহ্!

সাজ্জাদ : আপনাকে কেউ দায়িত্ব দিয়েছে মানুষের কথা বলার?

মাসুদ : কেউ দেয় নাই তো।

রাইসু : সেক্ষেত্রে কেন লেখেন? আপনার সংকোচ হয় না যে মানুষেরে নিয়া লিখতেছেন?

সাজ্জাদ : আরো কতগুলি ব্যাপার আছে তো। মানুষ আপনাকে অধিকার দিয়েছে নাকি যে তাদের নিয়ে লিখবেন আপনি। এটা তো অনধিকার চর্চা। অন্য মানুষদের নিয়ে লিখতে পারেন আপনি?

রাইসু : মানুষ তো ব্যক্তি। ব্যক্তিকে আপনি ডিসটার্ব করতে পারেন? আপনি ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না?

মাসুদ : ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাস তো করি। এটায় তো ব্যক্তিস্বাধীনতাকে কোনো প্রকার…

রাইসু : সেই ব্যক্তিকে তো আপনি নিজের মতো কইরা ফেললেন। এইটা তো আপনি করতে পারেন না।

মাসুদ : এখন আমাকে যদি না লিখতে দেন তাহলে তো আমার ব্যক্তিস্বাধীনতা আপনি হরণ করবেন।

রাইসু : না, আমি তো আর ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাস করি না।

সাজ্জাদ : আপনার তো অনেক সমস্যা। আপনি মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করেন, তারপরে কবিতায় মিথ্যা কথা বলেন : আপনি বলেছেন, ‘নদীতীরে করি বাস’।

রাইসু : এটা তো শহর। ধারে-কাছে কোনো নদী নাই। একটা খাল আছে অবশ্য। আপনি বলতে পারেন, খালতীরে করি বাস।

মাসুদ : না, ঠিক ‘নদীতীরে করি বাস’ না, ‘নদীকূলে করি বাস’।

রাইসু : নদীকূলও তো না এটা।

মাসুদ : নদীর ‘তীর’ আর ‘কূল’-এ কিন্তু পার্থক্য আছে।

রাইসু : নদীকূল বলতে কি নদীবংশ? এই যে মৌলিক পদার্থ, এদিকে আসেন। আপনার বংশ কি নদী? আপনার বংশের লোকেরা কি নদী নামে পরিচিত? আপনার নাম কি মাসুদ খান নদী? অনর্গল মিথ্যা কথা বলতেছেন কবিতার মধ্যে।

সাজ্জাদ : ওই যে মঈন চৌধুরীর তত্ত্ব : কবি মিথ্যাকে দেখিয়ে সত্য প্রকাশ করেন।

মাসুদ : মিথ্যাকে দেখিয়ে সত্য প্রকাশ করেন! মানে?

সাজ্জাদ : কবি নাকি বলেন মিথ্যা কিন্তু প্রকাশ করেন সত্য।

রাইসু : মিথ্যা হচ্ছে তার সত্য প্রকাশের একটা হাতিয়ার।

মাসুদ : আমার কাছে ধোঁয়াশা লাগে…

সাজ্জাদ : মঈন চৌধুরীকে ধোঁয়াশা বললেন? তাকে তো আপনি বলতে পারেন না ধোঁয়াশা।

মাসুদ : তার ব্যাপারটা না। অনেক আপ্তবাক্যই ধোঁয়াশা মনে হয় না, সে রকম।

সাজ্জাদ : আপনার কবিতায় তাহলে যৌনতা নেই কেন? ব্যাপারটা কী? আপনার যৌন অভিজ্ঞতা নেই?

মাসুদ : যৌন অভিজ্ঞতা নেই মানে? যৌনতার বিষয় আসে না কবিতায়? আরো অনেক কিছুই তো আসে না কবিতায়।

সাজ্জাদ : এ অভিজ্ঞতা আপনার কবিতায় আসে না কেন?

মাসুদ : সত্যের অপলাপ কইরেন না তো।

রাইসু : আপনি যৌনতায় বিশ্বাস করেন কি? তার আগে বলেন, আপনি কি ধর্মে বিশ্বাস করেন?

মাসুদ : ধর্ম বলতে কী আপনি বোঝান?

রাইসু : কী বোঝান বললেন। তার মানে ধর্ম সম্পর্কে আপনি অজ্ঞ।

সাজ্জাদ : আপনি ধর্ম জানেন না, সেক্ষেত্রে কবিতা কীভাবে লেখেন?

রাইসু : তো যৌনতায় বিশ্বাস করেন আপনি?

মাসুদ : এটা তো বিশ্বাস না, ধারণ করার ব্যাপার।

রাইসু : ঠিক আছে, যৌনতা ধারণ করেন আপনি!

মাসুদ : এই সারছে। সাক্ষাৎকারে খোলামেলা আলাপ মানে কি আমি কীভাবে মলমুত্র ত্যাগ করি সেগুলা বলা?

রাইসু : তার মানে কোনো কোনো জিনিস প্রকাশ করায় আপনি মজা পান না। খুশি হওয়া নাকি কী যেন বলেন?

মাসুদ : সুখ। সুখবোধ করা।

সাজ্জাদ : আপনার কিছু কবিতায় পৃথিবীকে এরিয়াল ভিউ থেকে দেখার একটা ব্যাপার আছে। আপনি কি ইউরোপ-ভ্রমণের পর এভাবে লিখতে শুরু করলেন?

মাসুদ : আমি বলব না যে এটা একেবারেই অসত্য। জীবনে প্রথম প্লেনে উঠেছি। আল্পস পর্বতের ওপর দিয়ে এপার-ওপার হয়ে প্লেন যাচ্ছিল, ভোরের দিকে। তখন অনেক বড় বড় শহরকে গ্রামের ছোট ছোট বটমেলার মতো—বটগাছের নিচে যে মেলা বসে এবং মেলা শেষ হওয়া আগে যে নিষ্করুণ প্রদীপ জ্বলতে থাকে—ওরকম লাগছিল। নেহাৎ শিশু-শিশু লাগছিল, শিশুরা যেমন দিয়াশলাই বাক্স সাজিয়ে রাখে, খেলাচ্ছলে—সার-সার, আবার একটার উপর একটা—সেরকম লাগছিল এইসব বিশাল বর্ণাঢ্য শহরগুলোকে।

সাজ্জাদ : এরিয়াল ভিউ থেকে—মানে একটা দূরত্ব থেকে—কোনো একটা কিছু দেখার মাধ্যমে প্রথমত আপনি তার নৈকট্য থেকে বিযুক্ত হচ্ছেন। দ্বিতীয়ত সবকিছুকে একটা দূরবর্তী সৌন্দর্যের মধ্যে, একটা বিন্যাসের মধ্যে আবিষ্কার করতে চাচ্ছেন। এভাবে তো আপনি ট্রু-অবজেক্ট যেটা সেটা পাচ্ছেন না।

মাসুদ : এরিয়াল ভিউ আমি পছন্দ করি যা দেখছি তাকে তার সামগ্রিকতাসহ, তার পরিপ্রেক্ষিতসহ পরখ করার জন্য। অবশ্য আমি ছোট বা সূক্ষ্ম জিনিসও দেখতে চাই—তার পরিপ্রেক্ষিতসহ, তার ইতিহাসসহ, তার অনুষঙ্গসহ।

সাজ্জাদ : আপনার গ্রামের অভিজ্ঞতা কী রকম বলেন তো।

মাসুদ : গ্রামের অনেক মারাÍক মারাÍক অনুষঙ্গ তো আমাকে রীতিমতো শিহরিত করে দেয়। একদিন আমি ভাবছি প্রতিষ্ঠান কী? তো আমার অনেকটা এরকম মনে হলো : বেশ দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারের এক মহিলা—মহিলাটি গর্ভবতী—সন্ধ্যাবেলায় ঘুম থেকে উঠে শিশুর মতো আব্দার করে বসল যে সে মিষ্টি খাবে। তার স্বামী সারাদিন কাজ করে পরিশ্রান্ত অবস্থায় বসে আছে। বিভূতিভূষণের উপন্যাসের নায়কের মতো একটু অন্যমনস্ক হয়ে কথাটা শুনল বটে, কোনো ধমক দিল না, পাত্তাও দিল না। অথচ মেয়েটা শিশুর মতো বলেই যেতে থাকল, মিষ্টি খাইতে খুব ইচ্ছা করতেছে। সে গর্ভবতী, সে ধারণ করে আছে, সে বহন করছে। যে-কারণে বোধহয় তার এই বালখিল্যতা মাফ করে দেওয়া যায়। টেনে-টুনেও দিন চলে না এরকম সংসারে অন্য সময় হলে এ-ধরনের ন্যাকা আব্দারের জন্য বউকে কড়া ধমক খেতে হতো। বেশি ঘ্যানর-ঘ্যানর করলে চড়-চাপাটি। কিন্তু সম্ভাবনাময় অবস্থায় আছে মহিলাটি। তার এই যে সান্ধ্য ইচ্ছা তাকে লোকটা অন্যভাবে নিল এবং মাফ করে দিল। ইচ্ছা কিন্তু পূরণ করল না, তবে সেবারের মতো ধমক বা চড়-চাপাটিটুকু মাফ করে দিল। এই যে, গর্ভিনী বিকালে ঘুম থেকে উঠে সান্ধ্য ইচ্ছা প্রকাশ করছে প্রতিষ্ঠানের কাছে, এটা এভাবে চলে এসেছে আমার এক কবিতায়, ‘এপ্রিলের সমান উঁচু ঐ মনুমেন্ট/দুলে দুলে মাথা নাড়ে/গর্ভিনীর সান্ধ্য ইচ্ছার মতো, দূরে।’

——————————————————

প্রতিষ্ঠান

এপ্রিলের সমান উঁচু ঐ মনুমেন্ট
দুলে দুলে মাথা নাড়ে
গর্ভিণীর সান্ধ্য ইচ্ছার মতো, দূরে।

বীজায়ন প্রক্রিয়া, তারও পূর্বপার থেকে
জন্মদিন ভেঙেচুরে, দেহ তো হয়ইনি, দৌড়ে আসে সীমারেখা।
প্রকল্পের প্রভাবে জোরালো সোডিয়াম জ্বলে।

আলজিভ ভূতপূর্ব ঘনত্বে উঠে আসে
হিক্কায় ন্যক্কারে, রাত্রির।

ঐ সটান প্রত্যালীঢ় ভঙ্গি তোর প্রধান নিষাদ
জাফরান ওড়ে চূর্ণ চূর্ণ রৌদ্রের সিলিকন।
মনুমেন্ট, তেজকম্প্র তোর চুলের ইতিবৃত্ত।

কোন্ বর্গে জন্ম তবে এই শুষ্ক নিষাদের?

অসংখ্য রেখা, কতো নীবিবন্ধ, জাহাজযন্ত্রণা…

প্রতিষ্ঠান উপচে উপচে প’ড়ে যায়
টুপটাপ জিরাফ ও যজ্ঞডুমুর।

——————————————————

সাজ্জাদ : আপনাদের গ্রামে নদীর মাঝখানে একটা চর ছিল। সেই বিরান চরে একটি পরিবার থাকত…

মাসুদ : আমাদের গ্রামের নদী ছিল যমুনা। অনেক প্রশস্ত। বর্ষাকালে তো কূল দেখা যায় না। আমরা সেখানে যেতাম নৌকায় চড়ে। আমাদের জমি ছিল, বাথান ছিল। সেই বাথানবাড়িতে রান্না করে খাওয়ার মজাই আলাদা। শুকনা মৌশুমে নদীর কিছু কিছু অংশে পানি থাকত। কিছুদূর চর, আবার কিছুদূর নদীর অংশ। তো সেই চরে একদিন দেখা গেল একটা কুঁড়েঘর। অনেকে ধান লাগানোর জন্যে অনেক সময় অস্থায়ী বাথান করে, সেরকমও না। কিছুদিন পর দেখা গেল একটা লাউয়ের গাছ। ওরা বেড়া দিল। মাঝে মাঝে অনেক দূর থেকে দেখা যায়, নদীর ওইপার থেকে। এটা তো কোনো ব্যাপারই ছিল না যে আমরা গিয়ে জিজ্ঞেস করি, তোমাদের কোন গ্রামে বাড়ি? কিন্তু কোনোদিন যাওয়া হয়নি। দূর থেকে শুধু তাদের গৃহিনীর চালধোয়া পানি ফেলে দেওয়া ইত্যাদি দেখা যেত। মনে হতো, ওরা কোথায় বাজার করতে যায়? চাল আনতে যায় কোথায়? ওদের মেয়েরা কোথায় যায় পাতা কুড়াতে? ওদের কুঁড়েঘরের পরে আর কোনো বসতিই দেখা যাচ্ছে না। শুধু বালু, বালু, বালুচর দেখা যাচ্ছে। সেখানে একেবারে দিগন্তের কাছাকাছি একটাই কুঁড়েঘর—বেড়া-দেওয়া, নিঃসঙ্গ। একটা পরিবার সেখানে থাকে। তাদের সাথে কারো সংশ্রব নেই। তারপর বর্ষা আসলো—বর্ষার সময় তো ওই এলাকা ডুবে যায়—তো ওরা কোথায় জানি চলে গেল, কেউ জানলও না! কেন যে ওখানে বসত করার ইচ্ছা হলো ওদের!
—————————————————————–
তো সেই চরে একদিন দেখা গেল একটা কুঁড়েঘর। অনেকে ধান লাগানোর জন্যে অনেক সময় অস্থায়ী বাথান করে, সেরকমও না। কিছুদিন পর দেখা গেল একটা লাউয়ের গাছ। ওরা বেড়া দিল।… দূর থেকে শুধু তাদের গৃহিনীর চালধোয়া পানি ফেলে দেওয়া ইত্যাদি দেখা যেত। মনে হতো, ওরা কোথায় বাজার করতে যায়? চাল আনতে যায় কোথায়? ওদের মেয়েরা কোথায় যায় পাতা কুড়াতে?… তারপর বর্ষা আসলো—বর্ষার সময় তো ওই এলাকা ডুবে যায়—তো ওরা কোথায় জানি চলে গেল, কেউ জানলও না! কেন যে ওখানে বসত করার ইচ্ছা হলো ওদের!
—————————————————————-
সাজ্জাদ : এ জাতীয় একটি প্রশ্ন জীবনানন্দ দাশের কবিতার মধ্যে আছে এভাবে যে, ‘ও বাড়িতে কারা থাকে?’ দূরে, অ¯পষ্ট একটা পরিত্যক্ত বাড়ি। বলা যায়, জীবনানন্দের মতো কৌতূহল আপনার আছে। কিন্তু আপনার সঙ্গে কোনো মিল নেই জীবনানন্দের। কবিতায় দুজনের প্রবণতা একেবারেই আলাদা। তাঁর শব্দ আটপৌড়ে, সরল। আপনার প্রবণতা জমকালো ধ্বনি আর তৎসম ও ধ্বন্যাÍক শব্দ ব্যবহার করার প্রতি।

মাসুদ : তৎসম শব্দ অনেক সময় বেশ ঋজু মনে হয়। শব্দ হয় টং করে। কোনো কোনো জায়গায় এমন হয় যে ‘চন্দ্র’ না বললে ভালোই লাগে না। আবার অনেক জায়গায় ‘চাঁদ’ বললে ভালো লাগে। যখন যেটা, তখন সেটা।

সাজ্জাদ : গ্রামে আপনার বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ পর্বের প্রভাব কিন্তু আপনার কবিতায় সেভাবে দেখি না। আপনার কবিতায় গ্রাম আসে একজন শহুরে কবি যেভাবে গ্রামকে তুলে ধরে সেভাবে।

মাসুদ : না, আমি তো বর্ণনা দেই না। একটা ফ্ল্যাশ আসে। যখন যেভাবে আসে। তাছাড়া এমন প্রচুর ঘটনা ঘটে আপনারা যারা নাগরিক জীবনে বেড়ে উঠেছেন তাদের কাছে হয়তো বেশ চমকপ্রদই মনে হবে, কিন্তু ফ্ল্যাট লাগে বলে সেগুলো আনা হয় না। নদীকূলে গামছা গায়ে দিয়ে একজন লোক ঘোরে। রাইসু যেমন তার কবিতায় লিখেছে, ‘যদিবা হারায় পুত্র নদীতীরে’; এটা কিন্তু আমার কাছে বেশ চমকপ্রদ লেগেছে। এই যে দূর নদীতীরে পুত্র হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা, এগুলো তো আমি দেখেছি। সেই গ্রাম থেকে এসে বাবা পুত্রকে খুঁজছে একেবারে ফাঁকা নদীতীরে, যেখানে হারানোর বা লুকানোর কোনো জায়গাই আসলে নাই।

সাজ্জাদ : ভাবে যে কুমিরে নিয়ে গেছে নদীতে?

মাসুদ : না, তা নেয়নি। নদীর ধার দিয়ে এমনি-এমনিই খোঁজে। হয়তো নদীকূলে হারায়ইনি। হারিয়েছে অন্য কোথাও, অন্য কোনো মেলায়। তবু ছেলেকে খুঁজে বেড়ায় নদীকূলে। নদীর তীরভূমি খুব উদার, অবারিত। তাই দিগন্ত পর্যন্ত তার বিস্তার!

রাইসু : নদী তো আসলে গ্রামবাংলার ভাই।

সাজ্জাদ : নদীকে আপনার সহোদর মনে হয়েছে কখনো।

মাসুদ : নদী আসলে বিচিত্ররূপে এসেছে আমাদের জীবনে। নদীতে আমাদের বাড়ি ভেঙেছে চার-চার বার। তখন যে কী একটা অবস্থা! এদিকে টাকা নাই নতুন জায়গায় বাড়ি বানানোর। কেমন যে লাগে না তখন! তবু যতবারই আবার ঘরবাড়ি তুলেছি, নদী থেকে বেশ দূরে, নদী ভাঙতে ভাঙতে আবার ঠিক বাড়ির কাছে এসে হাজির। নদী আর আমাদের বাড়ির মাঝখানে—অর্থাৎ নদী আর আমার মাঝখানে—কোনো মাঠ, গাছগাছালি, বাঁশঝাড় বেশিদিন থাকেনি। নদী ও আমার মাঝখানে কোনোদিনই কোনো আড়াল এসে বেশিক্ষণ দাঁড়ায়নি। তা ছাড়া মাঝে-মধ্যেই দেখা যেত একটা চুলঅলা দৈত্য ভেসে উঠছে নদীতে।

সাজ্জাদ : নদী থেকে দৈত্য ওঠে।

মাসুদ : দৈত্য ওঠে, কারণ সে-সময় সংকট চলে। কারিগরবাড়ির জালু কারিগরের মা—তাদের বাড়ি ভেঙে যাচ্ছে, চাষের জমি ভেঙে যাচ্ছে—দৌড়ে দৌড়ে নদীর দিকে যায়। বলে, ওই দ্যাখো কী উঠতেছে! কেউ দেখতে পায় না। সে-ই শুধু দেখতে পায়, পানির ভিতরে একটা দৈত্য, তার চুল ভাসছে। তখন সবাই মিলে ওঝা ডেকে নিয়ে আসে। ওঝা এনে তার ছেলেমেয়েরা মন্ত্রতন্ত্র-সহযোগে মাকে আচ্ছামতো পেটায়। নদীভাঙা যখন বহুদিন ধরে বন্ধ—সবাই কিছু-না-কিছু করে খাচ্ছে, একটা স্থিতিশীল অবস্থা—তখন কিন্তু ওই ভূতে ধরাধরি খুব একটা হয় না। যে-অনুষঙ্গগুলোর কথা বললাম সেগুলো তো রীতিমতো বিশাল এক মহাকাব্যে আনা যায়। আমি পারি না, আমার শক্তি কম।

রাইসু : আর কী কী আসে গ্রামের?

মাসুদ : একবার এক ষাঁড়ের মুষ্কচ্ছেদ করা হলো। তার কী অদ্ভুত আচরণ সে সময়! ষাঁড়েরা জড়বুদ্ধি হয়। ষাঁড়ের গোবর তো জানেনই। তার গোবরেও কোনো সার হয় না। পরীক্ষায় আমি লিখেছি তো—ক্লাস এইটে—‘ষাঁড়ের গোবর’ মানে ‘অপদার্থ’। এটা বাছুরের গোবর হতে পারত, বলদের গোবর তো হতে পারত—বলদও তো পুংজাতীয়। একটা জিনিস কিন্তু বেশ মজাই লাগে, একমাত্র মানুষের বেলায় পুরুষের চেয়ে নারীকে, নারীর সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বকে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়। অন্যদিকে দ্যাখেন, ছাগীর চেয়ে ছাগ আকর্ষণীয়, ময়ূরীর চেয়ে ময়ূর। তেমনই গাভীর চেয়ে বৃষ, কুকুদঅলা বৃষ। কিংবা কী যেন বলে? ধর্মবৃষ, সেটা আরও আকর্ষণীয়। এটা কেন হয়? কুকুদবৃষের কুকুদ দেখলে মনে হয় যে ঠিক ওখান থেকেই যেন সূর্যোদয় হচ্ছে। ষাঁড় কী তেলচুকচুকে কালো হয়! রশ্মি পিছলায় যেন।

রাইসু : শেষ প্রশ্ন, আপনি কবি হয়ে কীভাবে চাকরি করেন? এই যে সমাজের মধ্যে কাজ করছেন, আপনার স্বাধীনতা তো খর্ব হয়, নাকি?

মাসুদ : অ্যাঁ, কী বলছে! জঙ্গল তো সবচেয়ে স্বাধীন জায়গা। ও রকম স্বাধীনতায় ভালো ক্রিয়েটিভিটি হয় নাকি! বনে বনে ওখানে সাধুসন্ত ফল খায়, ইঁদুর খায়। সভ্যতার মধ্যে থেকেই তো আমরা সৃজনশীলতা ভালো করতে পারি। বনের মধ্যে ইঁদুর খেয়ে, ফল খেয়ে ভালো ইয়ে হয় নাকি? স্বাধীনতা তো কবি নিজেই তৈরি করে নেয়। আকাশ আর দিগন্ত মাঝে মধ্যে চেপে ধরে আসে, মাঝে-মধ্যে দমবন্ধ হয়ে ওঠে আবহাওয়া, পরিপার্শ্ব। কবি ওসবের ভিতরে থেকেই আবার ওগুলোকে প্রসারিত করে নেয়। এই সাজ্জাদ শরিফ, সাজ্জাদ শরিফ, এইটা কোনো সাক্ষাৎকার হইতেছে? বাল, আপনি তো ঘুমায়া গেলেন। সাক্ষাৎকারের চোটে দেখি ঘুম আসতেছে!

masud_khan@yahoo.com
sajjadsharif_bd@yahoo.com
bratya_raisu@hotmail.com

—-
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

প্রতিক্রিয়া (8) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুজিব মেহদী — মে ৩১, ২০০৯ @ ১:২৩ পূর্বাহ্ন

      কবি মাসুদ খানের সারল্য আর যুক্তিনিষ্ঠা মিলেমিশে এক বিরল ও অসাধারণ সৌন্দর্য সৃজিত হয়েছে এ আলাপচারিতায়। এই টেক্সট পাঠ করে আমি যারপরনাই মুগ্ধ।

      “এই সাজ্জাদ শরিফ, সাজ্জাদ শরিফ, এইটা কোনো সাক্ষাৎকার হইতেছে? বাল, আপনি তো ঘুমায়া গেলেন। সাক্ষাৎকারের চোটে দেখি ঘুম আসতেছে!”

      মাসুদ খানের মুখে ‘বাল’ শব্দের উচ্চারণ প্রায় অবিশ্বাস্য। কিন্তু এখানে এত সিরিয়াস কথাবার্তার শেষে যবনিকাপতনের লগ্নে শব্দটা, আই মিন বালটা, এমনই এক জৌলুস এনে দিল পাঠক আমার মধ্যে যে, এটি পাঠের আনন্দ অনেকখানি বেড়ে গেল। এরচেয়ে চমকপ্রদ সমাপ্তি, কোনো টেক্সটের, হতেই পারে না!

      – মুজিব মেহদী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অগ্নি — জুন ২, ২০০৯ @ ৯:০৩ অপরাহ্ন

      অসাধারণ সাক্ষাৎকার। বারবার পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ।

      – অগ্নি

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এহসানুল কবির — জুন ৩, ২০০৯ @ ৭:৩১ পূর্বাহ্ন

      শেষটা অভূত-ও-অভাবনীয়পূর্ব! মান আচরণ ও এর অংশ হিসাবে মান ভাষার যে নিম্নমুখী উটকো চাপ আমাদের মতো মান-আকাঙ্ক্ষী (এই আকাঙ্ক্ষাটাও, ওগুলোর মতোই, ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া) ঊন’মান’বদেরকে বিবিধ অবদমনের বাধিত শিকার বানায়, তার বিরুদ্ধে অবাধ্যতা প্রকাশের জুতসইতম ভাষিক উপায় বলে মনে হল এই ‘বাল’ শব্দটাকে।

      – এহসানুল কবির

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Jamil Ahammed — জুন ৪, ২০০৯ @ ৪:৩২ পূর্বাহ্ন

      কবি’র কাছে করা প্রশ্ন আর উত্তরের বহর দেখে মনে হলো না যে এরা এই দুনিয়ার’ই বাসিন্দা। এরা খায়, দায়, ঘুমায় আর আর বিষয়াদির সাথে যুক্ত। মানুষ এত ফাঁকা হয় কী করে…!!!
      দুঃখিত, এর চেয়ে বেশি কিছু মনে এলো না।

      – Jamil Ahammed

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mansur aziz — জুন ৫, ২০০৯ @ ৮:২০ পূর্বাহ্ন

      ভাল। আমি মনে করি যিনি কবি তিনি কাজের মধ্যেও কবিতার বিষয় খুঁজে পান। ‘জঙ্গলে বসে কবিতা হয় নাকি’ কবির এ বিশ্বাস মুগ্ধ করেছে। তাঁর সরলতাপূর্ণ কথাবার্তা সক্ষাৎকারকে আর সাক্ষাৎকার মনে হয় না। মনে হয় একসাথে বসে আড্ডা দিচ্ছি…।

      – mansur aziz

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তৈমুর রেজা — জুন ২৯, ২০০৯ @ ৪:৩৭ পূর্বাহ্ন

      শিল্পের আস্বাদনের নানাবিধ চর আছে, কবির সাথে আলাপ তার একটি। কবির শুধু আপনার একটা ভাষা থাকে না, তার ভাব-মনোভঙ্গী-চিন্তা-সমস্যাও নিজস্ব।
      এ সাক্ষাৎকার কবির ভাষায় প্রণীত। প্রশ্নকর্তাদের প্রায় অ্যানার্কিস্ট ভঙ্গীর মুখে কবির প্রগাঢ়, বিনম্র আসন ভাষা ও ভঙ্গীর এই প্রাণবন্ত দশার জন্য দায়ী। আলাপে কবির বাড়ন্ত হবার একটা ঠিকুজি মিলছে, যেন কবির একটা রূপক জীবনী; সেই বেড়ে ওঠার সন্দেশ থেকে নতুন স্রষ্টারা রসদ পাবেন নিশ্চয়ই।

      চিন্তার সামর্থ্য অনেক বীজ আলাপের পথে ছড়ানো। আলাপকে তবে বিশিষ্ট বলি না কেন?

      আরেকটি উল্লেখের ব্যপার। আলাপের পথে কবি বা সওয়ালকারীর ইমেজ একটা মূর্তিমান বিঘ্ন। এই সাক্ষাৎকারে সে মহাবিঘ্নের চলার পথটি খুব সরু, ফলে পাঠকের সামনে পর্দা তেমন ছিলো না।

      ফলতঃ আমার আস্বাদনের আনন্দ হলো, তাই তিনজনের কাছেই প্রাপ্তিস্বীকার করছি।

      – তৈমুর রেজা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সিদ্ধার্থ হক — জুলাই ২২, ২০১০ @ ৩:২৯ পূর্বাহ্ন

      এটি একটি দারুণ উপভোগ্য ইন্টারভিউ। ফ্রি ফ্লোয়িং বলে আনন্দ হলো।

      – সিদ্ধার্থ হক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শাহেদুজ্জামান লিংকন — জুন ১৩, ২০১২ @ ১২:২০ পূর্বাহ্ন

      হা হা হা হা। সাক্ষাৎকারটি পড়ার সময় জায়গায় জায়গায় হাসি পাচ্ছিলো খুব। কবিকে কোণঠাসা করার জন্য অনেক ফাজলামো টাইপ কথাবার্তা বলা হয়েছে। কবি সরল ভাষায় কখনো প্রতিউত্তর দিয়েছেন, কখনো এড়িয়ে গেছেন। কবির বয়স যে তখন কম ছিলো, আর বয়সের সাথে অভিজ্ঞতার যে একটা যোগসূত্র আছে তা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। বেশ উপভোগ্য। আর যে কবিতাগুলো যুক্ত হয়েছে, সেগুলোও ভালো লেগেছে; বিশেষ করে ‘কুড়িগ্রাম’ শিরোনামের কবিতাটি।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com