শিবানি

ফরহাদ মজহার | ৫ মে ২০০৯ ১১:৪৪ অপরাহ্ন

শিবানি বন্দনা – ১

যখন কোনো আর্য নাই, অতএব অনার্য নাই। যখন কোনো আর্যের অধীন পরাধীনতা নাই, যখন মানুষ স্বাধীনতা শব্দ শেখে নি, স্বাধীনতার অর্থ জানে না, কারণ নিজের অধীন হয়ে থাকার কোনো অর্থ হয় না। যখন দেয়াল ছিল না, দেয়ালের লিখন ছিল না, যখন তুলি, তালপাতা, কালি কলম, বেদ, শাস্ত্র, ধর্মগ্রন্থ বিজ্ঞান বিদ্যা কিছুই ছিল না। যখন টেলিভিশান নাই কম্পিউটার নাই, বিজ্ঞাপন বিল বোর্ড কিছুই নাই—ইতিহাসের আগে বৃহৎ বাংলা যখন মেনকার কামে গিরিরাজের ঔরসে কেবলি খোয়াবে ও ঘামে হয়ে উঠছিল, শিবানি, আমি সেই অবিস্মরণীয় স্বপ্নের বন্দনা করি।

যখন কোথাও কোনো ভেদ নাই ভেদবুদ্ধি নাই কোথাও কোন দাগ চিহ্ন পার্থক্যরেখা নাই, জাত পাতের ভেদ নাই স্তর নাই শ্রেণী নাই, কিন্তু ভৃঙ্গরূপে জগতে আছেন শুধু অনাদির আদি সেই অদ্বিতীয় ‘পুরুষ’—আর ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সকলেই যাঁর দাসী—সেই দাসসমাজে কেউ কোথাও আর্যেতর জ্ঞানে অপরকে ‘অনার্য’ বলে ডাকবার দুঃসাহস করে নি, শিবানি, আমি সেই অবিভাজ্য বর্তমানের বন্দনা করি।

ঠিক। আমি মাথা তুলেছি হিমালয়ে, পলিতে কাদায় তোমার লজ্জা হয়ে ছড়িয়ে গিয়েছি সমতলে, কিন্তু বঙ্গোপসাগরে আমিই সেই নুনের ভাণ্ড—ধরে রেখেছি পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র; ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না হয়ে যে কুলকুণ্ডলিনী ধারা তোমার ভূগোলে মিলিত হয়েছে, শিবানি, আমি সেই ত্রিবেণীর বন্দনা করি।

যখন দেশ নাই কাল নাই পাত্র নাই, দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ কিছুই নাই, যখন পরিমাণ বা গুণ সকলি অবিকশিত, নিঃশব্দে সেই অপূর্ব বিন্দুর মধ্যে শব্দ হয়ে ছিলাম আমি শিবানি—আমিই সেই শুক্রবীজ, দেকার্তের বাবা, জ্যামিতির আদি: —কারণ-পদার্থ সেই বিন্দুর আমি বন্দনা করি।

যখন আমি বনবাসী, বনের মধ্যে বাঘ, ভল্লুক আর সিংহের বৃত্তের মধ্যে তৃণভোজী বুনো মোষ, হরিণ কিম্বা হনুমান, যখন খাদ্য ও খাদকের মধ্যে আমার বয়স বাড়ছে, কাটছে আমার দিন, যখন আমি সংগ্রহ করছি সবুজ ও মধুর চাক আর পরস্পরের শরীরে আমরা চাষ করে চলেছি বিশ্বনিখিল; কিম্বা যখন আমি সবে মাত্র শবর কিম্বা ব্যাধ, কাঁধে আমার ধনুক আর তীর—কুড়িয়ে শিকার করে খেয়ে দেয়ে কাটছে প্রকৃতির অক্ষরেখায় প্রাকৃতিক আমার দিন: যখন হয়ে উঠছিলাম কাঠের লাঙল, বোকা বদল আর কৃষকের হুট হাট, তারও আগে তারও বহু কোটি আলোকবর্ষ আগে আমি ছিলাম বাতাসের খুশি, নক্ষত্রের গতি আর বৃক্ষের ফটোসিনথেসিস। সূর্যের আগুন ধারণ করে যিনি সবুজ কিম্বা প্রকৃতি, শিবানি, আমি সেই আলোক সংশ্লেষণের বন্দনা করি।

নাকি ছিলাম মঙ্গলগ্রহে? ছিলাম নাকি ইউরেনাসে কিম্বা প্লুটোয়? কিম্বা ছিলাম বৃহস্পতির বাষ্প, কিম্বা কোথাও বুঝি ঘটেছিল আমাদের এনকাউন্টার অব দ্য থার্ড কাইন্ড—যখন ভেতর ও বাহির উভয় চোখে প্রথম আমাদের চোখ চাওয়া চাওয়ি হয়, সেই আমাদের প্রথম এবং শেষ দেখা, শিবানি, আমি সেই অপলক মুহূর্তের বন্দনা করি।

এরপর এল দেবতাদের যুগ, আর আমরা সকলেই দেবতাদের চোখে অসুর হয়ে উঠলাম। যখন দেবতা ও অসুরের মধ্যে মরণপণ যুদ্ধ হয় আর অসুরদের পরাজিত ও হত্যা করবার জন্য যখন দেবতারা আমাদের ‘জঙ্গি’ বলে চিহ্নিত করতে শুরু করে, শিবানি, আমি সেই ওয়ার এগেইনস্ট টেররের ভেতর থেকে পয়দা হয়ে এসেছি। আমি সেই অসুর। আমিই সেই জঙ্গি। সকল প্রকার বেদ, শাস্ত্র, আইন ও রাষ্ট্রের বাইরে যে গুয়ান্তানামো তার ঘুলঘুলির মধ্যে বসে আছি আমি বাংলাদেশের চড়ুই—সন্ত্রাস কিম্বা শান্তি, রাষ্ট্র কিম্বা নৈরাজ্যের ভেতর ও বাহির উভয় দিকই আমি উল্টেপাল্টে দেখেছি। কসম শিবানি, সকল প্রকার দেবতার বেদ, শাস্ত্র, ধর্মতত্ত্ব ও টেকনলজির জগৎ ধ্বংস করবার জন্যই আমার জন্ম, আর তুমিই সেই কসম—আমি সেই কসমের বন্দনা করি।

হাঃ হাঃ হাঃ মৃত্যু ভয়ে ভীত দেবতারা অমৃত চেয়েছিল, শিবানি, অথচ তারা নাকি ‘দেবতা’, কিন্তু তারা অমর হতে চায়। যখন সমুদ্রমন্থনে উঠে এল বিষ, ঐ কাগুজে দেবতারা প্রাণভয়ে পালাল, আর তখনই বিষ ও অমৃতের মাঝখানে ঠিকই এসে দাঁড়ালেন তোমার শিব, জগদীশ্বর মহাদেব। জগৎকে বিষ ও বিষপতনের প্রলয় ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য অমৃত জ্ঞানে তিনি পান করলেন সেই গরল। দৃশ্য ও অদৃশ্য সকল প্রাণ ও অপ্রাণীবাচক সৃষ্টি ঊভয় রক্ষার সেই অপূর্ব বিষপানের মুহূর্ত, শিবানি, আমি সেই অমর দৃশ্যের বন্দনা করি।

বিষের জ্বালায় শিব নীলকণ্ঠ, দিশেহারা, তখন নিজের হিমঠাণ্ডা শরীর দিয়ে যে সরিসৃপ তাঁর গলা লতিয়ে ধরে রেখে সেই জ্বালা উপশম করেন, আমি সেই নাগেশ্বরের ফণার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছি কোটি বছর, মোহাবিষ্ট। নীলকণ্ঠের গলায় যিনি মালা, শিবানি, আমি সেই শীতলতনু বিষধরের বন্দনা করি।

যখন মিছিল ও মিটিং, বিপ্লব ও রক্তপাত, যখন সকলে ‘মুক্তি’ দাবি করে শিবানি সেখানে আমি দাবি করি দাসত্ব। আমার ব্যানার আমি ঝুলিয়ে দিয়েছি সর্বত্র, আমি মুক্ত, অতএব স্বেচ্ছায় অপরের দাস হতে আমার বাধা কই? মনের মানুষ মনে রেখে অপরের দায় উসুল করতে গিয়ে আমি ভিখারি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমতি রাধিকার যে দাসত্ব করে গিয়েছেন, শিবানি, বঙ্গে আমি সেই দাসত্ব আস্বাদনের ফকির, আমি সেই দাসত্বের বন্দনা করি।

কে জানত যে মানুষ একদিন নিজেরই পাপে ‘স্বাধীনতা’ নামটি আবিষ্কার করবে, কিন্তু করবে পরাধীনতার বিপরীতে। কে তাদের বলবে নিজেরা পরাধীন হবার পর, পরাধীনতা-হীনতার যে আকাক্সক্ষা তার মধ্যে স্বাধীনতার সংকল্প নাই, স্বাদ নাই। এই সেই ঐতিহাসিক মানুষ যারা স্বাধীনতাকে পরাধীনতার বিপরীত শব্দ ছাড়া বুঝতে অক্ষম। কে জানত যে প্রাকৃতিকতার গর্ভ থেকে চ্যুত বিচ্ছিন্ন হয়ে মানুষকে ‘মুক্তি’ ‘মুক্তি’ বলে চিৎকার করতে হবে। যখন মুক্ত ছিল বলে ‘মুক্তি’ শব্দের অর্থ জানত না কোনো মানুষ, ‘শিবানি’, আমি সেই অনৈতিহাসিক অজ্ঞান আনন্দের বন্দনা করি।

আজ ১৪১৫ চৈত্র সংক্রান্তির দিনে জানি না কেন ‘শিবানি’-ই আমার নামমন্ত্র হয়ে উঠছে, হয়ে উঠছে আমার নামাশ্রয়। জানি যে আমি ডানে যাচ্ছি না, বামেও না, উর্ধ্বে নয়, অধোও নয়। যেখানে যাচ্ছি সেখানে আগে কি কারো পা পড়ে ছিল? পড়ে আছে কি কারো পায়ের ছাপ, কোনো চিহ্ন বা দাগ? যাচ্ছি পিছলে, হামাগুড়ি দিয়ে, ডিগবাজি খেয়ে, যেন কেউ আমার পিছু নিতে না পারে। যারা আমাকে অনুসরণ করবে তারা যেন পথের ভয়ে আমাকে ত্যাগ করে, পথের তকলিফ মেপে নিয়ে ফিরে যায় যার যার গোপন গর্তে। যাচ্ছি কারণ এই সেই যাত্রা যা কবি মাত্রেরই একান্ত নিজের। মৃত্যুর মতো ভারি অথচ মধুর এই গমন। যারপরনাই নিঃসঙ্গ অথচ প্রেমে আনন্দিত। আমি যাচ্ছি, শিবানি, আমার চোখে জল, কিন্তু আমি নির্ভয়—আমি সেই অচিহ্নিত গন্তব্যের বন্দনা করি।

বাংলাদেশ নিজেকে নিজে ধ্বংস করবার আগে আমাকে শোনাতে হবে সেই গান যা ছিল অনার্য দেবতা শিবের অপূর্ব ধর্মসঙ্গীত। এই সেই শিব যার কোনো ধর্ম ছিল না, স্যেকুলারিজম ছিল না, ছিল না ফ্যাসিজম, গণতন্ত্র কিম্বা সমাজতন্ত্র; এমনকি শিব শ্মশানবাসী হয়েও কমিউনিজমের অর্থ জানত না, জ্যান্তে-মরা হয়েও মহাদেব সাধুর মতো সাদা পোশাক পরল না শিবানি, বরং গায়ে মাখল ছাই, আর হয়ে রইল দিগম্বর—বৈদিক পুরোহিতগণ তার হাতে ত্রিশূল আর পরনে বাঘছাল তুলে দেবার আগের যে দিকবসন মুহূর্ত, সেই আপাদমস্তক নগ্নতার আমি বন্দনা করি।

আমি শিশুর মতো ন্যাংটা হয়ে তোমার কাছেই ফিরে এসেছি আবার, শিবানি, কী আছে আমার কাব্য ছাড়া! আছে দুই একটি চিহ্নসর্বস্ব শব্দ ও অক্ষর যাদের ভাঁজের মধ্যে আমি বামন হয়ে চাঁদ ধরার সাধ করি, ধরে ফেলতে চাই তোমাকে। তোমার নাম ও অস্পষ্ট সব গল্প শুনে পথে বেরিয়ে পড়েছি আবার। গল্পের ভেতর গল্প হয়ে হেঁটে যাচ্ছি, চলে যাচ্ছি পুরাণ থেকে পুরাণে। আমাকে সংগ্রহ করতে হবে সেই সব রক্ত, হাড় ও করোটির অবশিষ্ট যাতে বাংলাদেশ শতখণ্ডে বিভক্ত হবার আগে তাদের জড়ো করে বানাতে পারি তোমাকে, সবাইকে দেখাতে পারি তোমার ছবি, শোনাতে পারি অখণ্ড এক নিখিলের কেচ্ছা একমাত্র কবির পক্ষেই যা সম্ভব।

তারপর তোমার পদারবিন্দে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ব আমি, ক্লান্ত পরিশ্রান্ত শিব, একালে যাকে তুমি ‘কবি’ বলে ডাক। ধর্ম, পুরাণ ও ইতিহাস অতিক্রম করে আমাকে ফিরতে হচ্ছে বর্তমানে, যে প্রেমে কাব্যকে সম্মুখ সমরে ধাবিত করো তুমি শিবানি, আমি সেই দিব্যজ্ঞানের বন্দনা করি।

শিবানি বন্দনা – ২

এক
হাজার বছর নামাজ পূজায়
পেয়েছি ধন শিবের কৃপায়
সাক্ষী জগৎ চাঁদ সেতারা
বৃক্ষ জীব কীট পতঙ্গেরা।

সরিসৃপ ও পশু পাখি
তোমার সাক্ষ্যে উঠছে ডাকি
তোমার সাক্ষ্যে মেঘ ও বৃষ্টি
ঋতুর চক্রে প্রাণ ও সৃষ্টি।

বঙ্গে জেনো রাষ্ট্র আছে
শিব আছেন পার্বতীর কাছে
সাধু বাক্য ধার্য জানি
তুমিই সত্য ওঁ শিবানি ॥

দুই
গৌরি, বঙ্গে নদ ও নদী
বইছে বইবে নিরবধি
তোমার পায়ের ধুলা চেয়ে
সাগর পড়ছে আছাড় খেয়ে।

শঙ্খে ফেনায় সাগরবেলা
ফর্শা রোদে করছে খেলা
পিঠ দেখিয়ে তিমির মেয়ে
সালাম দিচ্ছে তোমায় পেয়ে।

তুমিই নুন আর তুমিই ফেনা
মহেশ্বর তাই তোমার কেনা।
সাধু বাক্য ধার্য জানি
তুমিই সত্য ওঁ শিবানি ॥

তিন
তুমিই বাক্য তুমিই চিহ্ন
কীই বা এক আর কীই বা ভিন্ন!
তুমিই রস আর তুমিই তত্ত্ব
গুরু যিনি, তিনিই ভক্ত!

ধার নিয়ে আজ তোমার বাণী
লিখতে আছি কাব্যখানি
যে পার্বতীর হুকুম মানে
সে এ পদ্যের মানে জানে

বঙ্গে সতির হুকুম ছাড়া
চলে না শিব কারো দ্বারা
তুমিই সত্য ওঁ শিবানি
তুমি বৈ আর আন্ না জানি ॥

যখন সংক্রান্তি

যখন সংক্রান্তি
সূর্য গমন করছেন এক রাশি থেকে আর এক রাশিতে—এই সেই সংক্রান্তি যখন তুমি শিবানিকে ডেকে বললে, গৌরি আজ যা শেষ তাই আরম্ভ। আসো, ‘দিন বদল’ কথাটির ওপর আমরা কালো কালি লেপে দেই—মোবাইল কম্পানিগুলো আমাদের শব্দ, ভাষা ও ভাবগুলো জব্দ করে নিয়ে যাচ্ছে। যেখানেই আছে ‘দিন বদল’ সেখানেই আছে বহুজাতিক লিংক, এমনকি তোমাকেও, শিবানি, ডোরাকাটা বাঘ বানিয়ে টাঙিয়ে দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী বিলবোর্ডে। দিন বদলের জন্য তারা আমাদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দিচ্ছে সিম কার্ড আর মোবাইল ফোন। আমাদের প্রেমালাপ হয়ে যাচ্ছে কী সুন্দর কমোডিটি, অপূর্ব পণ্য।

যখন সংক্রান্তি
চৈত্রের আগুনে ফুটছে সূর্যের খই, খরায় ধরিত্রী শুকিয়ে মরছে। মাটি ফেটে যাচ্ছে লাঙলের ঈশের অপেক্ষায়। এসো কোকাকোলা পেপসিকোলা আরসি কোলা আমাদের পিপাসা মেটাও। এসো, আমাদের পানীয় জলে ঢেলে দাও বিষাক্ত আর্সেনিক। তারপর আমাদের বাধ্য করো যেন আমরা বোতলজাত পানি খেয়ে সভ্য হয়ে উঠতে পারি।

যখন সংক্রান্তি
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চিঠিগুলি লিখে দিচ্ছে বহুজাতিক কম্পানির বিজ্ঞাপন বিভাগ। আহা কী মধুর বাংলাদেশ। কী মধুর আমাদের ইতিহাস, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মায়ের কাছে লেখা চিঠি হয়ে এখন মুক্তিযুদ্ধের বিজ্ঞাপন দিনরাত প্রচারিত হচ্ছে টেলিভিশন বাক্সে।

যখন সংক্রান্তি
গাবগাছের উদ্ভিন্ন শাখায় তবুও রাজমুকুটের মতো গজিয়ে উঠছে অবিস্মরণীয় কোমল লাল পাতা। একটি নাম না জানা হলুদ পাখি এসে বসেছে তার ডালে। তার বুকে ক্ষত এবং গলায় ফাঁসির দাগ। এই পাখিটি কি গুয়ান্তানামো কারাগারে বন্দি ছিল? নাকি আবু গারিব? গৌরি আমি ঠিকই তোমাকে চিনেছিলাম, কিন্তু পলকে তুমি উড়ে চলে গেলে। সম্ভবত ইরাকে, আফগানিস্তানে অথবা গাজায়।

যখন সংক্রান্তি
যবের ছাতুর মধ্যে দুধ ও গুড় দিয়ে আমাদের বরাদ্দ ছিল সাংবাৎসরিক পুষ্টি। কিন্তু ডানো ও এলডো মিল্কই আমাদের জন্য যথেষ্ট। নয় কি? এমনকি চিনারাও আমাদের মেলামাইন দেওয়া দুধ খাইয়ে মুনাফা কামাতে ভুল করেনি।

যখন সংক্রান্তি
আমরা খেতে যাবো পিৎজা হাটে, আমরা খাবো ফিংগার লিকিং গুড কেনটাকি ফ্রাইড মিউটেন্ট চিকেন। বাংলা নববর্ষে এখন আর ইলিশ আর পান্তা জমছে না, শিবানি। আমি তোমাকে শালোয়ার কামিজ বা লেহাংগা পরাবো। তারপর গান গাইব এসো হে বৈশাখ, এসো এসো…

যখন সংক্রান্তি
তবু আমি এই দুঃসময়ে গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারণ করছি শি-বা-নি। জানি না কী তার অর্থ। জানি না কে আমাকে পথ দেখাবে? শুধু জানি তুমি আছো। গৌরি, আমার ভেতরে।

আমি গায়ে ছাই মেখে কবরস্থানে লুকিয়ে আছি। যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষগুলোকে হত্যা করে তাদের লাশ গুম করে রাখা হয়েছে, এরা কেউ বুদ্ধিজীবী ছিল না, কবি সাহিত্যিক ছিল না, এরা কেউই সেনাবাহিনীর সদস্য নয়, এদের কারো মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নাই, আমি ইতিহাসে গুম হয়ে যাওয়া এই সকল লাশ নিয়ে প্রত্যাবর্তন করব আবার…

আমি আবার তোমাকে দেখতে পাচ্ছি শিবানি, তুমি আবার বাগদিনী হয়ে কৃষি প্রধান বাংলাদেশ থেকে শিবকে ফিরিয়ে নিতে এসেছ হিমালয়ে। কৃষির দেবতা শিব, অথচ কৃষিই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, শিবানি। শিবের বাংলাদেশ পুড়ে ছাই হয়ে যাবার আগে স্বরূপে প্রকাশিত হও মেয়ে।

বঙ্গে আবার প্রত্যাবর্তন করো।

৩০ চৈত্র ১৪১৫

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (15) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পিয়াস কাওসার — মে ৬, ২০০৯ @ ১:৪৭ পূর্বাহ্ন

      ধন্যবাদ ফরহাদ মজহার, মনটা খুব অস্থির ছিল। লেখাটা পইড়া আরাম পাইলাম মনে হইল। তবে কিছু জায়গায় একটু আবেগ অতিক্রম করেছে সৃষ্টিকে। এমন আমার মনে হইছে। আমার মনে ভুল অ হইতে পারে। আবারো ধন্যবাদ অসাধারণ লেখাটার জন্য।

      -পিয়াস কাওসার

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নূর সিদ্দিকী — মে ৬, ২০০৯ @ ৪:২১ পূর্বাহ্ন

      “যখন কোথাও কোনো ভেদ নাই ভেদবুদ্ধি নাই কোথাও কোন দাগ চিহ্ন পার্থক্যরেখা নাই, জাত পাতের ভেদ নাই স্তর নাই শ্রেণী নাই, কিন্তু ভৃঙ্গরূপে জগতে আছেন শুধু অনাদির আদি সেই অদ্বিতীয় ‘পুরুষ’—আর ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সকলেই যাঁর দাসী—সেই দাসসমাজে কেউ কোথাও আর্যেতর জ্ঞানে অপরকে ‘অনার্য’ বলে ডাকবার দুঃসাহস করে নি, শিবানি, আমি সেই অবিভাজ্য বর্তমানের বন্দনা করি।

      ঠিক। আমি মাথা তুলেছি হিমালয়ে, পলিতে কাদায় তোমার লজ্জা হয়ে ছড়িয়ে গিয়েছি সমতলে, কিন্তু বঙ্গোপসাগরে আমিই সেই নুনের ভাণ্ড—ধরে রেখেছি পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র; ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না হয়ে যে কুলকুণ্ডলিনী ধারা তোমার ভূগোলে মিলিত হয়েছে, শিবানি, আমি সেই ত্রিবেণীর বন্দনা করি।

      যখন দেশ নাই কাল নাই পাত্র নাই, দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ কিছুই নাই, যখন পরিমাণ বা গুণ সকলি অবিকশিত, নিঃশব্দে সেই অপূর্ব বিন্দুর মধ্যে শব্দ হয়ে ছিলাম আমি শিবানি—আমিই সেই শুক্রবীজ, দেকার্তের বাবা, জ্যামিতির আদি: —কারণ-পদার্থ সেই বিন্দুর আমি বন্দনা করি।”

      অনেকদিন পর এমন একটা লেখা পড়লাম। মনে মনে যেন এমন একটি লেখারই আমি প্রত্যাশায় ছিলাম। দেশ-কাল-ভূগোলের সীমার সাথে কাব্যময়তার সকল রূপ এইভাবে এক বয়ানে পাঠের সুযোগ দেবার জন্য আপনার প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা।

      আমি আপনার এই লেখার বন্দনা করি। দেশপ্রেম আর কাব্য মিলে যে রূপ এখানে দেখতে পেয়েছি তা আমার মধ্যে আমার মনের মধ্যে কিংবা আমার কোথায় যেন কে বাঁশি বাজিয়ে আমাকে অন্য জগতের বোধের দিকে নিয়ে যায়।

      প্রেম বলতে আমি যা বুঝি বা বুঝতাম আজ এই পাঠে আমার প্রেমের চিহ্ন ভিন্নমাত্রায় এগিয়ে যায়। আমাকে দেখায় ভক্তি ও প্রেমের নতুন। আমি দিশেহারা হই।

      “বাংলাদেশ নিজেকে নিজে ধ্বংস করবার আগে আমাকে শোনাতে হবে সেই গান যা ছিল অনার্য দেবতা শিবের অপূর্ব ধর্মসঙ্গীত। এই সেই শিব যার কোনো ধর্ম ছিল না, স্যেকুলারিজম ছিল না, ছিল না ফ্যাসিজম, গণতন্ত্র কিম্বা সমাজতন্ত্র; এমনকি শিব শ্মশানবাসী হয়েও কমিউনিজমের অর্থ জানত না, জ্যান্তে-মরা হয়েও মহাদেব সাধুর মতো সাদা পোশাক পরল না শিবানি, বরং গায়ে মাখল ছাই, আর হয়ে রইল দিগম্বর—বৈদিক পুরোহিতগণ তার হাতে ত্রিশূল আর পরনে বাঘছাল তুলে দেবার আগের যে দিকবসন মুহূর্ত, সেই আপাদমস্তক নগ্নতার আমি বন্দনা করি।”

      এই সুখ কিংবা কী যেন আমার মধ্যে বয়ে যায় আমি কাকে বলবো আমার মধ্যে প্রেমের খেলা শুরু হয়েছে। আমি শিবানিকে দেখি নি। শিবানির কোনো চিহ্ন কল্পনায় আঁকতে পারি নি। এইবার থেকে আমি শিবানির সঙ্গে বসত গাড়বো। কোথায় যাবে শিবানি আমায় ছেড়ে।

      তোমার সকল রূপমুগ্ধতা আমি ছিনিয়ে নেব। আমি তোমার বন্দনা করি কিংবা নাই করি আমি তোমার বন্দনাকারীর প্রশংসা করি।

      নূর সিদ্দিকী
      ঢাকা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপু শিকদার — মে ৬, ২০০৯ @ ১০:২৯ পূর্বাহ্ন

      সে অনেক দিন, এরকম চমৎকার কবিতা পড়ি না। ধন্যবাদ গুরু ফরহাদ মজহার। ধন্যবাদ বিডিনিউজ২৪।।

      – তাপু শিকদার

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তপন বাগচী — মে ৮, ২০০৯ @ ৩:১০ পূর্বাহ্ন

      ‘যখন কোনো আর্য নাই, অতএব অনার্য নাই।’—নতুন তত্ত্ব মনে হচ্ছে!

      আর্য না-থাকলে তো অনার্যই থাকে। ‘যখন কোনো আর্য নেই, যখন কোনো অনার্য নেই’ হলে একরকম অর্থ হতো। কিন্তু ‘অতএব’ শব্দটা আমার মনটাকে গুলিয়ে দিলো। আমি কোনো নতুন অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না।

      দ্বিতীয় কবিতায় অন্ত্যমিলের অপূর্ণতা দেখে হতাশ হলাম। ফরহাদ মজহারের মতো খ্যাতিমান কবিও কি অপূর্ণ মিলের চর্চা করে তৃপ্ত হন? আমরা পাঠকেরা কিন্তু আশাভঙ্গের বেদনা পাই।
      ‘যখন সংক্রান্তি’ কবিতাটি সুন্দর! তাঁর ভাষায়: ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চিঠিগুলি লিখে দিচ্ছে বহুজাতিক কম্পানির বিজ্ঞাপন বিভাগ। আহা কী মধুর বাংলাদেশ। কী মধুর আমাদের ইতিহাস, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মায়ের কাছে লেখা চিঠি হয়ে এখন মুক্তিযুদ্ধের বিজ্ঞাপন দিনরাত প্রচারিত হচ্ছে টেলিভিশন বাক্সে।’ দারুণ প্রতিবাদ!!!

      – তপন বাগচী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফারহানা — মে ১৩, ২০০৯ @ ১:৩৭ পূর্বাহ্ন

      কৃষ্ণচূড়া বিরহে উড়ে রাধাচূড়া চৈত্রের ধূলো… কোন শোকে পাতা ঝরে… ঝরে আমার বিষণ্ণতাগুলো… …

      – ফারহানা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rokto Gonga — মে ১৫, ২০০৯ @ ৩:৪১ পূর্বাহ্ন

      সত্যম্ শিবম্ সুন্দরম্। সময়ের সম্মেলনটা নিখুঁৎ। কাব্যরসটা সাধু। অনিবার্য। মগ্ন নিরঞ্জন প্রনাম কবি ফরহাদ মজহার, সাথে বিডিনিউজ২৪.কম-কেও।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুমন রহমান — মে ১৫, ২০০৯ @ ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন

      “যখন সংক্রান্তি” ফরহাদ মজহারীয়। চেনা যায়। কিন্তু “শিবানী বন্দনা-১” রীতিমত চমকে দেয়। এর ব্যাপ্তি, ফিউশন, দার্শনিকতা এবং সর্বোপরি, তারুণ্যের চ্ছটা। এই হলেন ফরহাদ মজহার। তাঁর অভীপ্সার পাশে তরুণতম অভিযাত্রীটিও লজ্জা পাবে।

      – সুমন রহমান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন arju — মে ১৮, ২০০৯ @ ৬:৪৪ পূর্বাহ্ন

      এমনকি শিব শ্মশানবাসী হয়েও কমিউনিজমের অর্থ জানত না!

      – arju

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মহসীন রেজা — মে ১৮, ২০০৯ @ ৮:০০ পূর্বাহ্ন

      একেবারে স্পেলবাউন্ড করে ফেলেছে তিনটি কবিতাই। অসাধারণ। প্রতিবাদী ফরহাদ মজহারকে হাজারো সালাম।

      – মহসীন রেজা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Piplu — মে ২০, ২০০৯ @ ২:৩৪ অপরাহ্ন

      ওয়ান ওয়ার্ড “মারাত্মক”।

      – Piplu

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Jamil Ahammed — মে ২৩, ২০০৯ @ ৯:০০ অপরাহ্ন

      কহা কহা বহু কথা ইতিমধ্যে কহা হইয়াছে। যা কহা হয় নাই তাহা বলি এবার, ‍‍‌‌‌‌‌

      “কৃষির দেবতা শিব, অথচ কৃষিই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, শিবানি। শিবের বাংলাদেশ পুড়ে ছাই হয়ে যাবার আগে স্বরূপে প্রকাশিত হও মেয়ে।
      বঙ্গে আবার প্রত্যাবর্তন করো।”

      এই আশাবাদ কি কারো নজরে আসে নাই…!

      অবশেষে এই লিখা আমার অন্তর জুরাইলো…।

      – Jamil Ahammed

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গৌতম দাস — মে ২৫, ২০০৯ @ ৪:১৩ পূর্বাহ্ন

      তপন বাগচি বলছেন, “আর্য না-থাকলে তো অনার্যই থাকে। ‘যখন কোনো আর্য নেই, যখন কোনো অনার্য নেই’ হলে একরকম অর্থ হতো। কিন্তু ‘অতএব’ শব্দটা আমার মনটাকে গুলিয়ে দিলো। আমি কোনো নতুন অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না”।

      আমার কথায় প্রসঙ্গে কোনদিক দিয়ে ঢুকবো তা নিয়ে ভাবছিলাম। এখানে এর উছিলা হিসাবে তপন বাগচির নাম দিয়ে শুরু করলাম। কিন্তু কোনভাবেই তিনি আমার বক্তব্যের প্রসঙ্গ নন। প্রসঙ্গ ফরহাদ মজহারের এই লেখা আমি কীভাবে বুঝেছি সেটা। একা একা বুঝে চুপ থাকতে চাই নাই। বুঝার ভুল ওতে সংশোধনের সুযোগ নাই। তাই শেয়ার করতে চাই। ভুল হলে পাঠকের সহযোগে তা সংশোধনের সুযোগ নেয়া এর উদ্দেশ্য।

      যা নয় আর্য তাই অনার্য। “আর্য না-থাকলে আর অনার্য থাকে না। আর্য ধারণার মধ্যেই ‘আর্য না হলে কী’, সেই অনার্য ধারণার জন্ম। ঠিক যেমন, সংখ্যা ধারণায় অঙ্ক (ডিজিট) ‘র ভিতরে শুন্যও একটা অঙ্ক হিসাবে জায়গা করে নিয়েছে। আর্য আগমনেরও আগে আর্য-অনার্য ভাগের বালাই থাকার কথা নাই। এরপর আর্য আসার পরবর্তীতেই কেবল আর্য-অনার্যের ভেদ শুরু হতে পারে। তবে এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, অনার্যের উৎপত্তি। “আর্যেতর জ্ঞানে অপরকে ‘অনার্য’” ভাবা। অপরকে আর্যর চেয়ে ইতর বা নীচু জ্ঞান করার ভিতর দিয়ে অনার্যের উৎপত্তি ঘটেছে। অনার্য মানে কি আর্যর চেয়ে কম, না সাদামাটা যা আর্য-না? প্রথমটা অবশ্যই।

      ফলে এত সহজে ‘অতএব’ শব্দটা তপন বাগচির “মনটাকে গুলিয়ে দিলো” কেন ধরতে পারলাম না। সে যাক, ওটা মূল বিষয় না।

      আমার মনে হয় পুরা লেখার মূল সূরটা এখানেই তবে আরও গভীরে। বহু শত সহস্র যুগ পিছনের কথা ভাবতে বা বলতে গেলে আর্য-অনার্য একটা রেফারেন্স আমাদের মনে আসে। আমরা বা বাংলার উৎপত্তি আর্য থেকে না অনার্য থেকে — কী বরাতে নিজেদের পিছনের দিক ব্যাখ্যা করব এ নিয়ে একটা তর্ক হতে দেখা যায়। আর্য ও অনার্য শব্দ দুটো তখন ওখানে ভেসে ওঠে।

      এখানে ফরহাদ মজহারের বক্তব্যের সাথে এই আর্য-অনার্যের তর্কের কোনোই সম্পর্ক নাই। তিনি বহু পিছনের আদি অতীত এক অবস্হা নিয়ে কথা বলবেন। পাঠককে তার জন্য প্রস্তুত করছেন। এটা এতই অতীত যে অতীতের কথা তুললে আমাদের মনে যে আর্য-অনার্য বলে ধারণা আসে এটা তার চেয়েও বহু বহু অতীত, পিছনের, এক আদি অতীত। তখন আর্য বলে কোন কিছু (কেবল এই এলাকায় নয় সম্ভবত দুনিয়াতেই) হাজির নাই ফলে স্বভাবতই অনার্যের বালাই নাই। এই যে আদি এক অতীতের কল্পনা তিনি পাঠককে করে নিতে বলছেন, যার মধ্যে তিনি তাঁর কথা পারবেন, সেটা আমাদের বুঝতে তাঁর আর একটা লাইনের সাহায্য নেয়া যেতে পারে।

      “………কুড়িয়ে শিকার করে খেয়ে দেয়ে কাটছে প্রকৃতির অক্ষরেখায় প্রাকৃতিক আমার দিন: যখন হয়ে উঠছিলাম কাঠের লাঙল, বোকা বদল আর কৃষকের হুট হাট, [sb] তারও আগে /sb] তারও বহু কোটি আলোকবর্ষ আগে আমি ছিলাম বাতাসের খুশি, নক্ষত্রের গতি আর বৃক্ষের ফটোসিনথেসিস। সূর্যের আগুন ধারণ করে যিনি সবুজ কিম্বা প্রকৃতি” —

      কত আগেকার কথা তিনি বলছেন? নিঃসন্দেহে হান্টিং গেদারিং সমাজেরও আগে। ফলে কেউ যেন “আদিম সমাজের” কোন ধারণা মাথায় না খেলান। “বহু কোটি আলোকবর্ষ আগে আমি ছিলাম বাতাসের খুশি, নক্ষত্রের গতি আর বৃক্ষের ফটোসিনথেসিস। সূর্যের আগুন ধারণ করে যিনি সবুজ কিম্বা প্রকৃতি” — নিঃসন্দেহে বহুবহু পিছনের কথা। সূর্যের আগুন, ফটোসিনথেসিস, বৃক্ষ অর্থাৎ বৃক্ষের স্ব-আলোক সংশ্লেষণ যেখানে শুরু ও এটা তাঁর কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

      আসলে তাঁর বন্দনার বিষয়, কাকে কাকে তিনি এখানে বন্দনা করছেন সেদিকে তাকালেই তাঁর আঁকতে চাওয়া ছবির একটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। কী চান, কোথায় তিনি পৌছাতে চান তাঁর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রসঙ্গ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বন্দনার সেই লিস্টের মধ্য আছে — সেই অবিস্মরণীয় স্বপ্নের, সেই অবিভাজ্য বর্তমানের, সেই ত্রিবেণীর, কারণ-পদার্থ (শুধু পদার্থ নয়) সেই বিন্দুর, সেই আলোক সংশ্লেষণের, সেই অপলক মুহূর্তের, তুমিই সেই কসম–আমি সেই কসমের, অপূর্ব বিষপানের মুহূর্তের, আমি সেই অমর দৃশ্যের, নীলকণ্ঠের গলায় যিনি মালা, আমি সেই শীতলতনু বিষধরের, সেই অচিহ্নিত গন্তব্যের, দিকবসন মুহূর্ত, সেই আপাদমস্তক নগ্নতার, আর সবশেষে প্রেমে কাব্যকে সম্মুখ সমরে ধাবিত করো তুমি শিবানি, আমি সেই দিব্যজ্ঞানের বন্দনা করি।

      তাঁর বন্দনার প্রতিটা বিষয়কে ধরে কথা বলা যেতে পারে। আমি কেবল — “আমি সেই অবিভাজ্য বর্তমানের বন্দনা করি: নিয়ে কিছু কথা বলব।

      ফরহাদ মজহার আমাদেরকে “আদি অতীত” কত ভাল ছিল তাঁর কোন মনোময় স্বপ্ন কল্পনা আমাদের মনে গেথে দিতে চান — আমার মনে হয়নি। তিনি এখনে দাঁড়িয়ে আদির কিছু বন্দনা সেরে নিতে চান । সেই আদি আবার “অনাদির আদি”। অনাদি — অর্থাৎ যার কোন আদি নাই, চক্রাকার। সরলরৈখিক নয়। আমাদের সময় ধারণার সাথে কোন মিল নাই। খুঁজার চেষ্টা বা মিলানোর চেষ্টা করলে ভুল হবে। বরং সংক্রান্তির মত। “সূর্য গমন করছেন এক রাশি থেকে আর এক রাশিতে” — সেই সংক্রান্তি।

      কিন্তু এখন সেই অনাদির আদির বন্দনা করতে চান কেন? কারণ, তাঁর বন্দনার ভিতর দিয়ে এখনকে তিনি কীভাবে দেখছেন, করণীয় করণ মানছেন — তা ধরা পড়বে।

      তাঁর “অবিভাজ্য বর্তমান” এর বন্দনা নিয়ে কথা তুলব। “এইটা হলো মানুষ আর ওটা প্রকৃতি” — এরকম একটা লাইন তাঁর কোন একটা কবিতার লাইন, সম্ভবত “প্রকৃতি” বইয়ের কোথায়। জগতে প্রকৃতি ও মানুষ বলে এই ভাগ করাটা ভুল — তা নির্দেশ করতেই কবিতাটা লেখা। একই কথা খাটে ভাব ও বস্তু বলে কোন দ্বিবিভাগের ভুলের ক্ষেত্রে। মানুষ ও প্রকৃতি অথবা, ভাব ও বস্তুর — এই ভাগের সমস্যাটার শুরু দর্শক আর দর্শনীয় বিষয় এভাবে ভাগ করে নেয়া থেকে। ওখানে ধরে নেয়া আছে, মানুষ কেবলই দর্শক; কিন্তু দর্শক যে সক্রিয় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তৎপরতায় সকল দর্শনীয় বিষয়ের সাথে লিপ্ত, এমন কি দেখাটাও — এই সম্পর্কটা খেয়াল করা হয় নাই। এই তৎপরতাটা “অবিভাজ্য বর্তমান” এর ইঙ্গিত — তা বেখবর। এই এ্যকটিভিটি বা তৎপরতাকে ফরহাদ এখানে এক জায়গায় বর্ণনা করেছেন, “যখন খাদ্য ও খাদকের মধ্যে আমার বয়স বাড়ছে, কাটছে আমার দিন, যখন আমি সংগ্রহ করছি সবুজ ও মধুর চাক আর পরস্পরের শরীরে আমরা চাষ করে চলেছি বিশ্বনিখিল” — বয়স বাড়ছে — না মানুষ না প্রকৃতির — বরং, বয়স বাড়ছে ওদের সবসময় অবিভাজ্য বর্তমান হয়ে থাকা সত্তার। একটা খাদ্য ও খাদকের সম্পর্ক ওদের মধ্যে আছে বলে মনে করা হয়, তবে কে খাদ্য আর কে খাদক বলা মুশকিল। বরং “পরস্পরের শরীরে আমরা চাষ করে চলেছি বিশ্বনিখিল” — এভাবে বুঝাটাই হবে বুদ্ধিমানের। এই সম্পর্কের মধ্যে ভেদবুদ্ধি নাই বলে বলছেন, “যখন কোথাও কোনো ভেদ নাই ভেদবুদ্ধি নাই কোথাও কোন দাগ চিহ্ন পার্থক্যরেখা নাই, জাত পাতের ভেদ নাই স্তর নাই শ্রেণী নাই, কিন্তু ভৃঙ্গরূপে জগতে আছেন শুধু অনাদির আদি সেই অদ্বিতীয় ‘পুরুষ’–আর ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সকলেই যাঁর দাসী–সেই দাসসমাজে কেউ কোথাও আর্যেতর জ্ঞানে অপরকে ‘অনার্য’ বলে ডাকবার দুঃসাহস করে নি, শিবানি, আমি সেই অবিভাজ্য বর্তমানের বন্দনা করি”। এই ‘পুরুষ’ মানে আমাদের পরিচিত লিঙ্গভিত্তিক পুরুষ-নারী ধারণার পুরুষ নয়। সক্রিয় তৎপরতা। একই সঙ্গে যে পুরুষ ও নারী। শিব ও পার্বতী। এই শিব আবার “পার্বতীর হুকুমে চলা ও মানা শিব”। কবি ফরহাদ জানাচ্ছেন, “বঙ্গে সতির হুকুম ছাড়া চলে না শিব কারো দ্বারা”। “পুরুষের” পার্বতী রোল ফেমিনিন রোল ছাড়া কোন সৃষ্টি অসম্ভব। সম্ভবত তাই গুরুত্বের দিক থেকে সময়ে পার্বতী বা গৌরী রোলটা একটু আগিয়ে। আবার একই “পুরুষের” শিবের রোল ছাড়া “দৃশ্য ও অদৃশ্য সকল প্রাণ ও অপ্রাণীবাচক সৃষ্টি” ঊভয়কে রক্ষা করা অসম্ভব। “জগৎকে বিষ ও বিষপতনের প্রলয় ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য অমৃত জ্ঞানে শিব, জগদীশ্বর মহাদেব পান করলেন সেই সমুদ্রমন্থনের গরল। রক্ষা করলেন ও সম্ভব করলেন জগতের প্রাণ ও অপ্রাণীবাচক সবকিছুর সৃষ্টির সম্ভবনা বা পূর্বশর্ত। অনাদির আদি এই অদ্বিতীয় ‘পুরুষ’ এর কাছে আমরা “ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সকলেই যাঁর দাসী”। কেন? সমস্ত জ্ঞানের উৎস ও সম্ভাবনা সমাজে ‘পুরুষ’ এর সক্রিয় তৎপরতার মধ্যে, তৎপরতার কারণে। এই ‘পুরুষ’ এর, সমাজের দাসত্ব ছাড়া, বিনয় ছাড়া — জ্ঞান অসম্ভব। এই দিব্যজ্ঞানের বন্দনা করছেন কবি। এই হলো শিব, পার্বতী, অসুর দাস ও কবির উপ্যাখ্যান। দেবতা যেখানে ভিলেন।

      কবি ফরহাদের সব বন্দনাগুলোকে নিয়ে একটা একটা করে আলোচনা তোলা সম্ভব। নিশ্চয় অন্যেরা তা করতে প্রলুব্ধ হতে পারেন।

      – গৌতম দাস

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হাফিজ আল ফারুকী — আগস্ট ১২, ২০১০ @ ১২:৪৮ অপরাহ্ন

      ১.
      যখন কোথাও কোনো ভেদ নাই ভেদবুদ্ধি নাই কোথাও কোন দাগ চিহ্ন পার্থক্যরেখা নাই, জাত পাতের ভেদ নাই স্তর নাই শ্রেণী নাই, কিন্তু ভৃঙ্গরূপে জগতে আছেন শুধু অনাদির আদি সেই অদ্বিতীয় ‘পুরুষ’—আর ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সকলেই যাঁর দাসী—সেই দাসসমাজে কেউ কোথাও আর্যেতর জ্ঞানে অপরকে ‘অনার্য’ বলে ডাকবার দুঃসাহস করে নি, শিবানি, আমি সেই অবিভাজ্য বর্তমানের বন্দনা করি।

      ২.
      যখন সংক্রান্তি
      চৈত্রের আগুনে ফুটছে সূর্যের খই, খরায় ধরিত্রী শুকিয়ে মরছে। মাটি ফেটে যাচ্ছে লাঙলের ঈশের অপেক্ষায়। এসো কোকাকোলা পেপসিকোলা আরসি কোলা আমাদের পিপাসা মেটাও। এসো, আমাদের পানীয় জলে ঢেলে দাও বিষাক্ত আর্সেনিক। তারপর আমাদের বাধ্য করো যেন আমরা বোতলজাত পানি খেয়ে সভ্য হয়ে উঠতে পারি।

      যখন সংক্রান্তি
      আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চিঠিগুলি লিখে দিচ্ছে বহুজাতিক কম্পানির বিজ্ঞাপন বিভাগ। আহা কী মধুর বাংলাদেশ। কী মধুর আমাদের ইতিহাস, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মায়ের কাছে লেখা চিঠি হয়ে এখন মুক্তিযুদ্ধের বিজ্ঞাপন দিনরাত প্রচারিত হচ্ছে টেলিভিশন বাক্সে।

      … শব্দগুলো, বাক্যগুলো বাজবে, বাজুক প্রাণে প্রাণে।

      – হাফিজ আল ফারুকী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গৌতম চৌধুরী — মে ৭, ২০১২ @ ৬:২০ অপরাহ্ন

      কোনও এক অভাবিত কার্যকারণে, কবিতাগুলি প্রকাশিত হওয়ার ৩বছর পরে তাদের মুখোমুখি হলাম আজ। সমস্ত তর্ক-বিতর্কের উর্ধ্বে কবিতা যে গহন পরিতৃপ্তির জায়গায় নিয়ে যায় আমাদের, সেই অব্যখ্যাত অনুভূতিরই স্পর্শ পেলাম এই পাঠে। আবার, চিন্তার জাগরূক অংশগুলি ভয়ঙ্কর শৈলশিলার মতো লবণসমুদ্র থেকে মাথা উঁচু ক’রে ‘এ শুধু অলস মায়া’ যে নয়, তা-ও মনে করিয়ে দিল।
      প্রিয় কবিকে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বুলবুল সরওয়ার — মে ১১, ২০১২ @ ১০:৩৭ অপরাহ্ন

      আজ প্রথম আমি পাতাটা খুললাম। হে ঈশ্বর, এ অধমকে মার্জনা করো। কবি ফরহাদ মজহার, আপনাকে আমি একটা বই উৎসর্গ করেও দিতে পারি না্ কি(–প্রাণ ছুঁয়ে দেখি / মিশর-বিবরণী। বানান ভুল ছিল আপনার নামের… বিদ্যান বাঙ্গালী!!)। তো যা্ই হোক, এ্ই শিবানী পড়ে মনে হলো, আরো দুটো বই আপনাকে উৎসর্গ করা দরকার…।
      লিখে যান…

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com