রৌরব (কিস্তি ৯)

লীসা গাজী | ২৮ এপ্রিল ২০০৯ ৬:১৩ পূর্বাহ্ন

কিস্তি ১কিস্তি ২কিস্তি ৩কিস্তি ৪কিস্তি ৫কিস্তি ৬কিস্তি ৭কিস্তি ৮

(কিস্তি ৮-এর পর)

l9_7.jpgআপাত দৃষ্টিতে ওদের সংসারে কোনো খুঁত ছিলো না। সারা দিন ফরিদার কেটে যেতো সরল স্বাভাবিক জীবন নিখুঁতভাবে চালাতে। দিনের বেলা নাস্তা বানানো, নাস্তা খেয়ে মুখলেস সাহেব আর আবদুল বশির সাহেব বেরিয়ে যাওয়ার পরে পনেরো মিনিটে গোসল সারা, সাহেবদের ছেড়ে যাওয়া কাপড় গুছিয়ে রাখা, ঘরবাড়ি সামলানো, কাপড় ধোওয়া তারপর রান্নার যোগাড় করা, রান্না সেরে বাগানে হাঁটাহাঁটি, শখ করে কখনও চা খাওয়া এবং সাহেবদের জন্য অপেক্ষা করা। তারা ফিরলে ভাত বেড়ে দেয়া, যত্ন করে খাওয়ানো, আবার বিকালে চায়ের পানি বসানো,
—————————————————————–
বিউটি বিশ্বাস করতে পারে না রিয়াজ তাকে ফেলে কোন দুঃখে লাভলির জন্য ছোঁক ছোঁক করত। আহারে, কী বেদিশা অবস্থা দু’জনের। রিয়াজ নোট নিয়ে আসতো, ওরা সব সময় বিউটির ঘরের পড়ার টেবিলে বসত। দরজা তখন হাট করে খোলা থাকতো। আম্মা যেকোনো সময় ঢুকে যেতেন।… ওদের প্রেমাচার সব চলতো টেবিলের নিচে। বিউটি যেদিন প্রথম টের পেলো ভয়ে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল।
—————————————————————-
নাস্তা দেয়া, ঘর ঝাঁট দেয়া… সংসারধর্ম পালন। রাতের বেলাও কেটে যেতো সরল স্বভাবিক তালে-বেতালে। শুধু কোনো কোনো রাতের মধ্য প্রহরে, যে সময় পেঁচা একটানা ডাকে আর বাদুরের রক্ত পিপাসা বেড়ে যায়, ফরিদা জ্ঞানশূন্য বিছানা থেকে নেমে পড়েন, ভূতে পাওয়া মানুষের মতো দরজা খোলেন—ক্যাঁচ শব্দে প্রতিবারই ভীষণ চমকে ওঠেন, তারপর উত্তরমুখী ঘরের দিকে অবিচল হেঁটে যান। উত্তরমুখী ঘরের দরজা খোলাই থাকে।

ফরিদা বিছানা ছাড়া মাত্র মুখলেস সাহেব এক ঝটকায় উঠে ঠায় বসে থাকেন। তখন তাকে ঘন ঘন শ্বাস টানতে দেখা যায়। ফরিদা না ফেরা পর্যন্ত প্রবল নিঃশ্বাসের কষ্ট নিয়ে তিনি ঘাড় গুঁজে বসে থাকেন, ঘোড়ার ডাকের মতো শ্বাস টানার তীক্ষ্ণ শব্দ ছাড়া তাকে মৃত মনে হয়। ফিরে আসা ফরিদার পায়ের শব্দ কানে আসা মাত্র মুখলেস সাহেবের মৃত শরীরে প্রাণের সঞ্চার হয়, তিনি লক্ষী বাচ্চার মতো গুটিসুটি মেরে আবার ঘুমিয়ে পড়েন এবং সঙ্গে সঙ্গে গভীর ঘুমে তলিয়ে যান। একটু আগ পর্যন্ত যে তার মরণ দশা চলছিলো সেটা তখন দেখে বোঝার কোনো উপায় থাকে না।

তবে একটা বিষয় ফরিদা নির্দ্বিধায় বলতে পারেন আর তা হলো দিনের বা রাতের জাগ্রত-সময়ে ফরিদা এবং আবদুল বশির সাহেবকে কখনও এক মুহূর্তের জন্যও বেচাল হতে দেখা যায় নাই; নিজেদের মধ্যে প্রগলভ হতে দেখা যায় নাই, এমনকি মুখলেস সাহেবের অনুপস্থিতিতেও না। মুখলেস সাহেবের প্রতি এই সম্মানটুকু তারা সচেতনভাবেই দেখাতেন এবং এই একটা বিষয় মেনে চলার ব্যাপারে ফরিদা যার পর নাই কঠোর ছিলেন।

কতোক্ষণ মাটিতে বসে আছেন ফরিদার হিসাব নাই—এক ঘণ্টা দুই ঘণ্টা? ঘাড় উঁচু করলেই জানা যাবে, কিন্তু ইচ্ছা করলো না। ভাঁজ করে রাখা মিনার সমান কাপড়ের স্তূপের মতো স্মৃতি তার ভিতরে জমাট হয়ে আছে। হঠাৎ কোনো একটা স্মৃতি ভাঁজ ভেঙে খুলে পড়লে মুশকিল—পুরনো গন্ধ, যন্ত্রণা, বিবমিষা বেরিয়ে আসবে আর পুরো শরীর পাক দিয়ে উঠবে। স্মৃতিকে ফরিদা ভয় পান, ধারে কাছে ঘেঁষতে দিতে চান না। আবার কী মনে পড়ে যায়—চোখ মোছেন ফরিদা। কান্নাকাটি অনেক হয়েছে, এভাবে জীবন চলবে না। তাকে আবার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। লাভলিকে যদি বশির সব বলেই থাকে তো বলুক। আসুক সব কিছু সামনে। তিনিও দেখবেন উড়ে এসে জুড়ে বসা কেউ তার তিলতিল করে গড়ে তোলা সংসারে চোট লাগাতে পারে কি না? আর যদি পারে তাহলে এমন সংসার থাকলেই কী আর না থাকলেই কী। ভাবলেন বটে কিন্তু এক মনে ‘সুবাহানাল্লাহ’ ‘সুবাহানাল্লাহ’ পড়ে গেলেন। এই মুহূর্তে ফরিদা চাইছেন লাভলি যাতে দেরি করে আসে, তাহলে তিনি সামলে নেবার সময় পাবেন। তাকে নরম দেখালে চলবে না। এই পৃথিবী নরমের যম।

ঘরে ঢুকে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো বিউটি। গত পরশু দিন সে প্রথম মাথায় পাকা চুলের হদিস পেয়েছে। কানের লতির কাছে একটা নিরাপরাধ সাদা চুল! দৈর্ঘ্য বেশি না। বেশ কিছু সময় সে সাদা চুলের দিকে তাকিয়ে ছিলো। তার মানে সায়াহ্ন প্রায় এসেই গেলো। কোন এক বিচিত্র কারণে তার একটুও মন খারাপ হলো না বরং এক ধরনের স্বস্তিবোধ হলো। সুন্দর-বান্দরে এখন আর কিছু যায় আসে না। দিনের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সে যে বত্রিশ ঘণ্টা শুধু রূপচর্চায় কাটায় সেটা নিছক সময় পার করা, আর কিছু না। সময় অবশ্য পার হয়েই যায়। গান শোনা, সিনেমা দেখা, ম্যাগাজিন পরা, রূপচর্চা আর ঘুম… বরং দিনের দৈর্ঘ্য হিসাবে চব্বিশ ঘণ্টা মাঝে মধ্যে কম মনে হয়। তবে আজকে সময় কাটছে না, কিছুতেই না। যা যা সে প্রতিদিন করে তার কিছুই করতে ইচ্ছা করছে না। এই আয়না দিয়ে যদি বাইরের পৃথিবীটা দেখা যেতো—আপা কী করছে, কোথায় আছে, কার সাথে আছে? বিউটি ভেবেই পাচ্ছে না এতটা সময় লাভলির কেন লাগছে। জানা মতে বাইরের পৃথিবীতে সময় কাটাবার মতো ওর কেউ নাই। সত্যিই কী নাই? কারণ লাভলি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে কিছুই বলা যায় না। অন্তত বিউটি বলতে পারবে না। কারণ দু’ একটা যা বিপজ্জনক কাণ্ড তাদের সংসারে ঘটেছে তার প্রায় সবগুলিই আপাত দৃষ্টিতে এই বোকাসোকা মেয়েটাই করেছে। সুতরাং বাইরের পৃথিবীতে ওর কোনো রসের মানুষ থাকলেও থাকতে পারে। অবশ্য বিউটির মন এতে একেবারেই সায় দিচ্ছে না।… অ্যাকসিডেন্ট হলো না তো? কথাটা শুধু মনে এলো, কিন্তু কোনো দুশ্চিন্তাবোধ করলো না সে। বিউটি সবচেয়ে অবাক হচ্ছে ফরিদার প্রতিক্রিয়ায়। আপা যে এখনও বাসায় ফিরলো না তা নিয়ে কোনো উচ্চাবাচ্য নাই, মাথা কুটাকুটি নাই, শাসানো নাই—কোনো কিন্তু আছে, অবশ্যই এর মধ্যে কোনো কিন্তু আছে! হয়তো আম্মা-ই আপাকে কোথাও পাঠিয়েছে এবং ভালো করেই জানে আপার আসতে দেরি হবে। তাহলে সকালে যে বিউটির ঘর প্রায় ভেঙেই ফেলছিলো যাতে সে লাভলির সাথে যায়। না, কিছুই মেলাতে পারছে না বিউটি। মাথা জট পাকিয়ে যাচ্ছে, পরিষ্কার করা দরকার। এখন অবশ্য নিশ্চিন্ত মনে বাথরুমে ঢুকে গাঞ্জা টানা যায়। সেই বরং ভালো। গাঞ্জা টানবে আর শিস দিবে… সুখচিন্তায় নিজের মনে হাসলো বিউটি।

আবার আয়নার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। এখনও দেখতে খারাপ না, অন্তত আপার চাইতে ঢের ভালো। এই এতদিন পরেও বিউটি বিশ্বাস করতে পারে না রিয়াজ তাকে ফেলে কোন দুঃখে লাভলির জন্য ছোঁক ছোঁক করত। আহারে, কী বেদিশা অবস্থা দু’জনের। রিয়াজ নোট নিয়ে আসতো, ওরা সব সময় বিউটির ঘরের পড়ার টেবিলে বসত। দরজা তখন হাট করে খোলা থাকতো। আম্মা যেকোনো সময় ঢুকে যেতেন। কোনো রকম আগাম জানান দেয়ার তোয়াক্কা করতেন না। ওদের প্রেমাচার সব চলতো টেবিলের নিচে। বিউটি যেদিন প্রথম টের পেলো ভয়ে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল। বিউটির সময়টা স্পষ্ট মনে আছে। দুপুর আড়াইটা। ওরা সবে ভাত খেয়েছে। নোট-ফোট নিয়ে লাভলি আর রিয়াজ বিউটির ঘরে এসে উপস্থিত।

—আমার ঘরে কী? এখন ঘুম দিব। আপা, তুমার ঘরে যাও তো।

—দুইদিন আমি আসতে পারবো না বিউটি। আজকে শুধু দেখায় দিয়া যাই। নোট-টাও যার কাছ থেকে আনছি তারে ফিরত দিতে হবে।

—আজকেই ফিরত নিয়া যাও, আমাদের নোটের দরকার নাই।

—আমার আছে। বেশিক্ষণ লাগবে না, সত্যি। একবার বুইঝা নেই পরে টুইকা রাখবো।

—তুমার ঘরে যাইতেছ না কেন?

—আম্মা তোর ঘরে বসতে বলছেন।

দুপুর বেলার ঘুম মাটি হবে ভেবে বিউটি খুব বিরক্ত হয়েছিলো। গজ গজ করতে করতে সে বাথরুমে ঢুকলো। বাথরুম থেকে বের হবার সময় তার কী মনে হলো সে যতটা সম্ভব নিঃশব্দে বাথরুমের দরজা একটু খুলে তেরছা চোখে ওদেরকে দেখলো। দেখামাত্র তার পা হীম হয়ে গেলো—আপা মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে বসা ওর হাতে একটা বলপেন আর রিয়াজ ঝুঁকে সেকেন্ডের মধ্যে আপার ঠোঁটে চুমু খেলো তারপর কোনো শব্দ না করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজার কাছে গিয়ে ভালো করে আশপাশ দেখলো। ফিরে এসে দ্বিতীয়বার কঠিন চুমু খেলো আর তারপর বিউটি যা দেখলো সেটা মনে করলে এখনও তার গা গুলিয়ে ওঠে। জঘন্য!

l9_5.jpgদেখলো, রিয়াজের হাত অবলীলায় লাভলির কামিজের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে, আর বেহায়া মেয়েটা তখনও নামাজের ভঙ্গিতে বসা। বিউটির পক্ষে আর বেশিক্ষণ দেখা সম্ভব হয় নাই। সে দরজা লাগিয়ে দিলো, তারপর বেসিনের সামনে গিয়ে একবার, দু’বার, তিনবার ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিলো মুখে ঘাড়ে। শরীরের মধ্যে কোনো শিহরণ অনুভব করলো না বিউটি, একটা জ্বালা অনুভব করলো, আর ঘৃণা। প্রায় বমি এসে গিয়েছিলো আর কি। বের হয়ে ওদের চেহারার দিকে কীভাবে তাকাবে সেটাই ভেবে পাচ্ছিলো না। অনেকক্ষণ বাথরুমে বসে ছিলো। যখন বেরিয়ে এলো বিউটির নাক বিশ্রীরকম কুঁচকে ছিলো। যেন সে মরা ইঁদুর দেখেছে বা পচে গলে যাওয়া ইঁদুরের গন্ধ কেউ ওর নাকের সামনে ধরে আছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে ওদের দিকে না তাকিয়ে সোজা ঘর থেকে বের হয়ে গেল। কোথায় যাবে, কী করবে ভাবতে গিয়ে বিউটির জিদ উঠে গেলো। আরে ঘরটা আমার, আমি বার হইছি কেন, দরকার হইলে ওই দুইটারে লাত্থি দিয়া বার করব। বদমাইশির একটা সীমা আছে—অবিকল ফরিদার মতো করে ভাবলো বিউটি তারপর বীরদর্পে আবার নিজের ঘরে ফিরে গেলো।

—তোমাদের নোট চালাচালি হইছে?

—এই তো প্রায় শেষ।

রিয়াজ ঢোক গিলে কথা শেষ করলো। লাভলির মাথা নিচু, নোটের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে।

—বিউটি এক গ্লাস পানি আইনা দিবি?

—না।

—আচ্ছা, আমি আনতেছি।

রিয়াজ পানি আনতে গেলো। বিউটি শব্দ করে ডান পাশের চেয়ারটায় থপ করে বসলো। চার কোণা টেবিলের তিন দিকে তিনটা চেয়ার। একটা দিক দেয়ালের গায়ে লাগানো। মাঝখানের চেয়ারে রিয়াজ বসেছে। রিয়াজের বাম পাশে লাভলি বসা। সুতরাং লাভলি আর বিউটি তখন মুখোমুখি। ওই সময়ের ভাবনা আর অনুভূতি স্পষ্ট মনে পড়লো তার। দাঁত কিড়মিড় করে শুধু বলেছিলো—কত বড় আস্পর্দা, কত বড় আস্পর্দা। লাভলি এর কিছুই শুনতে পেলো না। ও তখন এই জগতে নাই।

l9_6.jpgভূতগ্রস্ত মানুষের মতো রিয়াজ এক গ্লাস পানি নিয়ে ঢুকল, আলতো করে লাভলির সামনে রাখলো—রাখার সময় কিছু বললো কি না এখন আর তা মনে পড়ছে না বিউটির, শুধু মনে আছে কাঁপা কাঁপা হাতে গ্লাস তুলতে গিয়ে ওর হাত ফসকে গ্লাস পড়ে ছত্রখান। সেই শব্দে ফরিদা আসলেন, কিছুক্ষণ বকাবকি করলেন এবং আর দিগ্গজ হওয়ার দরকার নাই বলে রিয়াজকে বিদায় করলেন।

তারপর সেই ভয়ঙ্কর খেলা চললো কিছুদিন। টেবিলের নিচে চুমাচুমি, পায়ে-পা ঘষাঘষি, হাতাহাতি—কিছুই বাকি ছিল না। এইসব ঘটনা যেদিন ঘটত সেদিন রাতে বিউটি এক সেকেন্ডও ঘুমাতে পারত না। পিপাসায় গলা কাঠ হয়ে থাকত। ঢোকে ঢোকে পানি খেয়েও সেই পিপাসা মেটে না এমন। বিউটির সবচেয়ে অবাক লাগে ভাবতে যে দুই গর্দভ মনে করত সে কিছুই টের পাচ্ছে না। বিউটি কি কাঠের দরজা না কি ফুল-লতাপাতা আঁকা প্লাস্টিকের টেবিল ক্লথ—বোধবুদ্ধিহীন জড় পদার্থ? এসব ভাবলে তার শুধু অবাকই লাগে না এক ধরনের তীব্র অপমানবোধ হয়। অপমানের জ্বালায় শরীর চিড়বিড় করতে থাকে। তার চেয়ে লাভলি যদি এসে তাকে অকপটে ওদের সম্পর্কের কথা বলতো তাহলে হয়তো এরকম অসহ্য জ্বলুনি হতো না। কিন্তু লাভলি ভান করতে থাকল যেন কিছুই ঘটছে না আবার অন্যদিকে টেবিলের নিচের নাটক চলতে থাকল বহাল তবিয়তে।

একদিনের ঘটনা—প্রেমপর্ব সবে সাঙ্গ হয়েছে। রিয়াজ চলে গেছে। লাভলি নোটের ছদ্মবেশে তার হাতে দিয়ে গেল রসময় গুপ্ত। সেদিন বিউটির মনে হলো তার আপাত ভোলাভালা বোন তার চাইতে কয়েক শ’ গুণ সরেস। তাকে এক ঘাট থেকে কিনে অন্তত চার ঘাটে বিক্রি করতে পারবে। গ্লানি আর হতাশার ভয়ঙ্কর রূপ দেখল সে নিজের মধ্যে। সেদিন সেই মুহূর্তে বিউটি সীদ্ধান্ত নিলো ফরিদাকে রিয়াজ আর লাভলির ঘটনা বলে দিবে এবং সেজন্য তার কোনো রকম অনুতাপ হল না। মনে মনে সে ভেবেও রাখল ফরিদাকে কী বলা হবে। ধানাই পানাইয়ের দরকার নাই কম কথায় কাজ সারা হবে।

সন্ধ্যাবেলা ফরিদা পিছনের বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে চা খাচ্ছিলেন। বুয়া পায়ের আঙুল মটকে দিচ্ছিল। বিউটি দেখে এলো লাভলির ঘর ভেজানো, আলতো করে দরজা খুলে দেখল ও গল্পের বই পড়ছে। ওকে জানান না দিয়ে আবার আস্তে দরজা ভিজিয়ে দিল। সোজা উপস্থিত হলো পিছনের বারান্দায়।

—-আম্মা, আপনেকে একটা কথা বলব। বুয়া, তুমি আমারে এক কাপ চা দেও।

ফরিদা বুঝলেন বুয়াকে বিউটি সরাতে চাইছে। এইসব ব্যাপারে তিনিও যথেষ্ট সচেতন। চাকর-বাকরের সামনে ঘরের কথা যেন কোনো অবস্থাতেই না বের হয় সেদিকে তার দৃষ্টি সজাগ। তিনিও চোখের ইশারায় তাকে চলে যেতে বললেন। বুয়া যথেষ্ট অনিচ্ছা নিয়ে বারান্দা ছাড়ল। বিউটি চট করে দেখে এল সে সত্যিই চলে গেছে না দরজার পিছনে লটকে আছে।

—এত ঢং করতেছিস কেন? কী বলবি?

ইচ্ছাকৃতভাবে কিছুক্ষণ সময় নিল বিউটি। যেন তার বলতে খারাপ লাগছে বা আদৌ বলবে কি না সেই দ্বিধা এখনও ভিতরে কাজ করছে। যদিও বাস্তব মোটেও তা না। বলবার জন্য আসলে সে মরীয়া হয়ে উঠেছে।

—হা কইরা শ্বাস ফেলতেছিস কেন? কী হইছে?

—আম্মা, আপারে দেখলাম…

ফরিদা বেশ আয়েস করে চা খাচ্ছিলেন। তার দু’পা টেবিলে সোজাসুজি রাখা। বিউটির ইতস্তত ভাব দেখে সোজা হয়ে বসলেন আর লাভলির সম্পর্কে কথা বুঝতেই আরও সজাগ হলেন। খরগোশের মতো চকিতে তার কান খাড়া হয়ে গেল।

“আপারে দেখলি, কী দেখলি?” প্রায় হিসহিসিয়ে উঠলেন।

—কালকে আপারে দেখলাম রিয়াজের হাত ধইরা বইসা আছে।

এই কথা বলার পর বিউটি আর এক মুহূর্তও ফরিদার সামনে দাঁড়ালো না। যদিও সে মায়ের মুখের কারুকাজ দেখার জন্য মরে যাচ্ছিলো।

* * *

বিউটি এখনও আয়নার সামনে ঠায় দাঁড়ানো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে কত কিছু চোখের সামনে ফুটে উঠে মিলিয়ে গেল। মাঝে মাঝে বিউটির মনে হয় সেদিন ফরিদাকে কথাটা না বললেও হত, অন্তত সে না বললেও পারত। যে বেপরোয়া গতিতে এগুচ্ছিল তাতে দু’একদিনের মধ্যে ফরিদা নিজে থেকেই টের পেতেন। সেটাই বরং ভালো হত।

বিউটি নিজেকে এক রকম জোর করেই আয়নার সামনে থেকে সরাল। দিনটা আজকে খাপছাড়া, সকাল থেকেই কী রকম একটা লাগছে। কিছুতেই শান্তি পাওয়া যাচ্ছে না। আবার লাভলির বিষয় মাথায় ঘোরাফেরা করার আগেই একটা ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিল। জাহান্নামে যাক সব। তার কী! মরুক!

বিউটি ধীরেসুস্থে বাথরুমে ঢুকল। আবার কী মনে করে বের হয়ে রান্নাঘরের দিকে রওয়ানা হল। রাবেয়ার মা ঝাঁট দিচ্ছে। ইলিশ মাছের হালকা-পাতলা গন্ধ বাতাসে পাক খাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেই বোধহয় খাওয়া শেষ করেছে ওরা।

—পিচ্চি কই?

—খালুজানের ধারে, ঘাড় টিপে। আজকে হেরে কোনো কামে পাই নাই।

—আম্মা তুমারে ডাইল বাটতে বলছিলেন?

—না, বলেন নাই।

—শেষ হয়ে গেছে। বাইটা রাইখো।

—আইচ্ছা।

বিউটি ঘরে ফিরে গিয়ে দরজার ছিটকিনি লাগাল, আয়নার পিছন থেকে দু’টা পোটলার একটা হাতে নিয়ে সোজা বাথরুমে ঢুকল, কাঠি বানাল তারপর ব্রেসিয়ারের ভিতর থেকে ম্যাচ বের করে ধরালো, আচ্ছাসে দম নিয়ে একটা টান দিলো। সাথে সাথে ঝিম ভাব পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। আহা কী সুখ! কমোডের সিট ফেলে দিয়ে তার উপর আরাম করে বসলো বিউটি। ছোট বড় টানে প্রায় অর্ধেকটা শেষ করে ফেলল। জিনিসটা ভাল। অনেকক্ষণ সিটের উপর নিশ্চুপ বসে রইল।

মুখলেস সাহেবকে অপছন্দ করার কোনো কারণ বিউটির জানা নাই। কিন্তু যতদূর মনে পড়ে সেই ছোটবেলা থেকেই এক ধরনের তীব্র বিতৃষ্ণা সে অনুভব করে। এই বিতৃষ্ণার জন্ম কোথায় সে জানে না। অথচ যে রকমের নির্বিরোধী জীবন মুখলেস সাহেব যাপন করেন সন্তান হিসেবে বিউটির তার প্রতি মায়া হওয়াই স্বাভাবিক। সারাটা জীবন ভদ্রলোক স্ত্রীর আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে কাটিয়ে দিলেন। ঈশ্বরের আদেশ পালনের মতো অন্ধ বিশ্বাসে। প্রশ্নহীন, অভিযোগহীন। হয়তো সে কারণেই এত ঘৃণা। নাকি অন্য কোনো কারণ আছে, জানার বাইরের কোনো কারণ কিন্তু বোধের মধ্যে। কমোডের সিটে বসে বিউটি এই বিপুল প্রশ্নের মুখোমুখি হল আর এই নিয়ে ভাবতে তার খুব ভাল লাগল। মনে হল ভাবতে ভাবতে সে অনায়াসে আরও ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে দিতে পারে।

* * *

মাটিতে এক ঠায় বসে থেকে ফরিদার ঝিমুনি এসে গেছে। আসরের নামাযের সময় পার হয়ে গেছে কি না মনে হতেই সচেতন হলেন, ঠেলেঠুলে উঠে দাঁড়ালেন। চা খেতে হবে নইলে মাথা ধরে যাবে—এরকম তুচ্ছ কথাও মনে এল। যথেষ্ট মনোযোগের সাথে ওযু করলেন, নামায পড়লেন। অন্যদিন নামাযে দাঁড়ালেই তার রাজ্যের কথা মনে পড়ে, রাবেয়ার মাকে কাপড় ধোয়ার সাবান বের করে দেয়া হয় নাই, পিচ্চি ডিম কিনে ভাঙতি পয়সা ফেরত দেয় নাই, চড় দিয়ে শয়তানের দাঁত ফেলে দেয়া দরকার, কালকে অনেক রাতে লাভলির ঘরের বাতি জ্বালানো দেখেছেন—বিষয় কী জানতে হবে। এইসব হাবিজাবি কথা জায়নামাযে খেয়াল হয়। আজকে সমস্ত মনোযোগ একাট্টা করে নামায পড়লেন। নামায পড়বার পরও ফরিদার মন শান্ত হলো না।

চায়ের কথা বলতে ঘর থেকে বের হলেন। অভ্যাস বশে ঘড়ির দিকে তাকালেন আর তাকিয়েই রইলেন। পাঁচটা বিশ—কী ভয়ঙ্কর কথা!

—রাবেয়ার মা, চায়ের পানি চড়াও।

—খালাম্মা, পিচ্চি আইজ কুনু কাম করে নাই কইলাম। সারাদিন খালুজানের ধারে।

রাবেয়ার মা’র কথায় ফরিদা কান দিলেন না। তিনি রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করলেন বিউটির ঘর বন্ধ।

—খালুজানরে চা দিছিলা?

—না দেই নাই।

—আমারে না জিজ্ঞাসা কইরা দিবা না। দিনে দুইবারের বেশি চা খাওয়া উনার জন্য ঠিক না।

—জি।

—এখন সবার জন্য বানাও।

ফরিদা ডিপ ফ্রিজ খুলে হাতে বানানো সিঙ্গারা গুনে গুনে ছয়টা বের করলেন।

—চায়ের সাথে এই সিঙ্গারা কয়টা ভাইজা দিও।

—জি।

বিউটির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফরিদা একবার ভাবলেন ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলতে বলবেন, কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ না করেই দরজার সামনে থেকে সরে গেলেন। এখন যদি বিউটি অযথা তর্ক শুরু করে দেয় তিনি মাথা ঠিক রাখতে পারবেন না। সবচেয়ে ভাল কাউকে না ঘাটানো। পিচ্চি আজকেও জানালার গ্রিল মোছে নাই—মনে পড়তে হন হন করে বারান্দার দিকে গেলেন। মুখলেস সাহেব মাথা নিচু করে ঘুমাচ্ছেন। তার থুতনি প্রায় বুকে ঠেকেছে আর পিচ্চি বারান্দার শেষ মাথায় গুটিশুটি মেরে ঘুমাচ্ছে। চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও গলা নামালেন।

—পিচ্চি, পিচ্চি…

ফরিদার ডাক অত্যন্ত চাপা গলায় হলেও পিচ্চি ধড়ফড়িয়ে উঠলো। তিনি ঠোঁটের উপর আঙুল দিয়ে পিচ্চিকে কথা বলতে নিষেধ করলেন। ইশারায় বাইরে আসতে বললেন আর নিজেও বেরিয়ে এলেন।

—সারাদিন কোনো কাজ-কাম নাই, না?

—খালুজানের ধারে ছিলাম খালাম্মা।

—খালুজানও ঘুমাইতেছে, তুইও ঘুমাইতেছিস—নবাব হইছস?

—জি না, ঘুমাইছি না।

—যা, সাবান পানি দিয়া জানালার গ্রিল মুছ গিয়া। কয়বার বলতে হয়?

ফরিদার সামনে থেকে যেতে পেরে পিচ্চি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। ফরিদা আবার খেই হারিয়ে ফেললেন। কী কাজে যে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন মনে করতে পারলেন না। এক পা দুই পায়ে বারান্দায় গেলেন। মুখলেস সাহেব ঘুমাচ্ছেন। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব একা লাগলো ফরিদার। আজকে তার জীবনে একটা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে, কঠিন জটিলতা। তার বড় মেয়ে প্রথম একা বাড়ির বাইরে গিয়ে এমন একজন মানুষের খপ্পরে পড়েছে, যে মানুষ শুধুমাত্র একটা মুখের কথায় এই সংসার ধূলিস্মাৎ করে দিতে পারে। ফরিদা ঠিক করলেন লাভলি যখন ফিরে আসবে তিনি কিছুই বলবেন না বা জিজ্ঞেস করবেন না। অন্তত আজকে তো নাই-ই। আর আল্লাহ করুন লাভলিও যেন তাকে কিছু জিজ্ঞেস না করে। জিজ্ঞেস করলে তিনি কী বলবেন বা বলা উচিৎ এই বিষয়ে ফরিদা আদতেই ভাবার কোনো সময় পান নাই। মুখের উপরে অস্বীকার করা যেতে পারে কিন্তু তাতে জটিলতা আরও বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। কোনো কারণ ছাড়া একটা লোক তো শুধু শুধু এরকম দাবি করতে পারে না। সত্য মিথ্যা মিলিয়ে বিশ্বাসযোগ্য একটা কিছু বলতে হবে, কিন্তু সেটা যে কী সেই বিষয়ে তার কোনো ধারণা নাই। নিজের পরিবারের সামনে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এবং তিনি কারও কাছে এতটুকু সহানুভূতিও প্রত্যাশা করতে পারছেন না।

(কিস্তি ১০)

রচনাকাল: ২০০৮, লন্ডন

অলঙ্করণ: রনি আহম্মেদ

leesa@morphium.co.uk

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shahanaz sultana — মে ৭, ২০০৯ @ ১:১৪ অপরাহ্ন

      উপন্যাসটির প্রতিটি চরিত্রই আমাদের সমাজে ঘুরপাক খাচ্ছে। গল্পের শুরু থেকে এ পর্যন্ত আমি গল্পটি এক নিঃশ্বাসে শেষ করলাম। এর ফলাফল কী দাঁড়ায় তা জানার জন্য অপেক্ষা করছি। প্রতিটি চরিত্রকেই তাদের নিজ নিজ পাপের জন্য প্রকৃতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আর তার ফলাফল কী ঘটবে, কার অবস্থান কোথায় দাঁড়াবে এই অপেক্ষায় রইলাম…

      – shahanaz sultana

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com