এডওয়ার্ড সাঈদের সাথে সংলাপ / তারিক আলী

হোসেন মোফাজ্জল | ২৪ মার্চ ২০০৯ ১১:০৯ পূর্বাহ্ন

es_1.jpg
এডওয়ার্ড সাঈদ (জন্ম. জেরুসালেম ১/১১/১৯৩৫, মৃত্যু. নিউ ইয়র্ক সিটি ২৫/৯/২০০৩)

[এডওয়ার্ড সাঈদ (Edward Said) ছিলেন এ জমানার অন্যতম একজন সেলিব্রেটেড এবং প্রভাববিস্তারকারী পাবলিক বুদ্ধিজীবী। ২০ টির বেশি বই তিনি লিখেছেন যার বেশির ভাগই প্রায় ৩৬ ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে Orientalism(1979), Culture and Imperialism (1993) এবং Freud and the Non–European (2003) ইত্যাদি। তিনি ১৯৬৩ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং পরে সেখানে ইংরেজী এবং তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক হন ১৯৯২ সালে। প্যালেস্টাইন আন্দোলনের মুখপাত্র এবং সক্রিয় কর্মী হিসেবে কাজ করেন। তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার যার মধ্যে রয়েছে ২০টি সম্মানসূচক ডক্টরেট।

tariq-ali2.jpg……..
তারিক আলী (জন্ম. লাহোর ২১/১০/১৯৪৩)
…….
তারিক আলী (Tariq Ali) লেখক, সমালোচক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। বিশ্ব ইতিহাস এবং রাজনীতি বিষয়ে তিনি ডজনখানেক বই লিখেছেন, পাশাপাশি মঞ্চ এবং চলচ্চিত্রের জন্য স্ক্রীপ্টও তৈরি করেছেন। তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস Shadows of the Pomegranate Tree (Islam Quarter) কয়েকটি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে, যা ১৯৯৪ সালে স্পেনে প্রকাশিত বিদেশী ভাষায় রচিত সবচে’ উল্লেখ্যযোগ্য বই হিসেবে Archbishop San Clementedel Instituto Rosalia de Castro পুরস্কার লাভ করে। তাঁর চতুর্থ উপন্যাস A sultan in Palermo প্রকাশিত হয় ভার্সো থেকে ২০০৫ সালে।

এডওয়ার্ড সাঈদের সাথে এই সংলাপটি ১৯৯৪ সালের জুন মাসের দিকে সাঈদের ন্যূইয়র্কের রিভারসাইড ড্রাইভ অ্যাপার্টমেন্টে ধারণ করা হয়। যা পরে A Conversation with Edward Said নামে বানদুং ফিল্ম প্রোডাকশনের পে ব্রিটেনের চ্যানেল ফোর টেলিভিশনে প্রচার করা হয়। পরে ইউকে প্রকাশক Seagull books থেকে ২০০৬ সালে Conversations with Edward Said – Tariq Ali বইটি ছাপানো হয়। বর্তমান অনুবাদটি সেখান থেকে নেওয়া।

লেখাটি অনুবাদের আগে তারিক আলীর অনুমতি নেয়া হয়েছে গত বছরের মাঝামাঝিতে। কয়েকটি পর্বে লেখাটি শেষ করার ইচ্ছে রইল। – অনুবাদক]

অনুবাদ: হোসেন মোফাজ্জল

তারিক আলী: এডওয়ার্ড, আপনি যে অসুস্থ এটা পহেলা টের পেলেন কবে?

এডওয়ার্ড সাঈদ: একানব্বই-এর শুরুর দিকে। একটা রুটিন চেকআপ করাতে যেয়ে ধরা পড়ে আমার এধরনের লিউকেমিয়া রয়েছে।

সে সময় ডাক্তার কী বলেছিলেন?

edward-said-and-sister-1940.jpg…….
এডওয়ার্ড ও তার বোন, ১৯৪০ সালে, মিশরে।
……..
স্বাভাবিক ভাবেই তারা চেষ্টা করেন কোনো পাত্তা না দেবার, এবং বলেন আরে এটা কিছু না একটা ক্রনিক অবস্থা মাত্র, নামটা যত না ভারি মনে হচ্ছে ততটা সিরিয়াস হবার মতো তেমন কিছুই না। অবশ্য আমি বেশ মুষড়ে পড়েছিলাম, তারপর আমি ছয় মাস ধরে মেলা ডাক্তারের কাছে ধর্না দেই। অসংখ্য টেস্ট করাই, কমবেশি করে হলেও ডায়গোনোসিসটা নিশ্চিত হতে চাই। হয় কী, সেই সময়টাতে আমি এসব নিয়েই বাঁচতে অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। শেষমেশ যেয়ে একটা বেশ ভাল ডাক্তারের দেখা মেলে, খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেটা, কারণ এটা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী একটা রোগ। যার আসলে কোনো প্রকারের সত্যিকারের নিরাময় নেই, অনেকটা ডায়েবেটিসের মত। আমার ডাক্তারটা ছিলেন চমৎকার। আমার কোনো চিকিৎসার দরকার পড়ে নি, সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ছাড়া কোনো কেমোথেরাপির দরকার পড়ে নি। প্রায় বছর দু’ কি আড়াই ধরে এ রোগে থাকার পরে আমার কেমোর দরকার পড়ে।

কেমোথেরাপী দিলে অবস্থা কী দাঁড়ায়?

সাধারণত লোকজন যেমন বাজে মনে করে আসলে তেমনটা কিছু না, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দুর্বল করে ফেলে। আমি খুবই কান্ত হয়ে পড়তাম। মাঝে মাঝে বমি বমি লাগত এটুকু বাদে আমি আমার সিডিউলের একটা তারিখও বাতিল করি নি এবং আমি আমার সিডিউলের তারিখ ঠিকমতই রেখেছি। অবশ্য এখন মনে হচ্ছে সব কমিয়ে আনতে হবে কারণ কেমোর কামড় ধরতে শুরু করেছে।

বেড়ে ওঠা

এডওয়ার্ড, আমরা আপনার ছেলেবেলায় চলে যাই, জেরুসালেম নিয়ে আপনার প্রথম স্মৃতিটা কেমন?

বেশ, প্রধানত বাসাটার কথা মনে পড়ে। কারণ আমি হয়েছিলাম বাড়িতে, হাসপাতালে না। ইহুদি একজন দাইমা যাকে আমাদের ফ্যামেলি নিয়ে এসেছিল তার হাতে আমি জন্মেছিলাম, কারণ আমার মায়ের হাসপাতাল নিয়ে বেশ নাখাস্তা একটা অভিজ্ঞতা ছিল। তার আগের বাচ্চাটা হাসপাতালে মারা গিয়েছিল। তাই আমি জন্মেও ছিলাম, এমন কি কথাও বলেছিলাম বাড়ি থেকেই।

আমার শুরুর দিককার স্মৃতি বলতে এই বাড়িটা যেখানে আমাদের পরিবার ১৯৪৭ শেষের দিকে ফেলে আসার আগে পর্যন্ত বসবাস করতো। সেটা ছিল পশ্চিম জেরুসালেমের দিকে, যা দখল করে নেয়া হয় ১৯৪৮-এর শীতে। এখন যেটা ইসরায়েল। তারপর আমার জীবনের একেবারে গোড়ার দিকে আমাদের পরিবার চলে আসে মিশরে। আমার বাবার ব্যবসা ছিল কায়রো এবং জেরুসালেমে, তাই আমার ছোটবেলার স্মৃতি কায়রো এবং জেরুসালেমের ভেতরে জড়িয়ে আছে। তারপর আমি যখন আরো বড় হতে থাকি, তখন জেরুসালেমের থেকে কায়রোই বেশি জুরে থাকে।

আপনি যখন বড় হয়ে উঠতেছিলেন তখন টাউন হিসেবে জেরুসালেম কেমন ছিল?

বেশ, যদিও আসলে এসবে আমার কিছুই যায় আসতো না। আমার মনে হয়েছে শহর হিসেবে যা না আনন্দমুখর ছিল তার থেকে বেশি ছিল হুজুরান্তি। সে সব দিনগুলোতে আমার মনে যা গেঁথে আছে তা হলো মৃত্যু আর ধর্ম, বিশেষ করে যে সবে আমি কোনো কালেই মজা পেতাম না। অগুনতি চার্চ আর সানডে স্কুল সার্ভিস। শয়ে শয়ে কালো পোশাক পরা মহিলা। যার বেশির গুলোতেই লেকচার দেয়া হতো একজন কী ভাবে আচরণ করবে, ধর্মনুরাগ আর কৃচ্ছ্রতা এসব। আর ছিল আরবদের উপর ব্যাপক ভাবে ইংরেজদের প্রভাব। আমরা ছিলাম খ্রীশ্চান মাইনরিটি—

সেটা কি ম্যারোনাইট—

book-ta-2.jpg…….
Conversations with Edward Said (Hardcover), by Edward W. Said (Author), Tariq AlI (Editor) 128 pages, Publisher: Seagull Books (April 27, 2006)
…….
না, না, এপিসকোপালিয়ান, এক্কেবারে উল্টোটা, এপিসকোপালিয়ান। আমাদের পরিবারটা আদিতে ছিল গ্রীক অর্থোডক্স, বেশির ভাগ প্যালেস্টাইন খ্রীশ্চানরাই তাই ছিল, কিন্তু আমার দাদা, আমার বাবার দিককার দাদারা অ্যাঙলিকানিজমে ধর্মান্তরিত হন উনিশ শতকের শেষের দিকে। তাদের বলা হতো এমন যারা কনগ্রিগেশনে আসতো মূলতঃ পাত্তির জন্যে, কারণটা বলি, যে সব মিশনারিরা প্যালেস্টাইনে এসেছিল তারা আসলে মুসলমান এবং ইহুদিদের ধর্মান্তরিত করতে ফ্যানটাসটিকভাবে ধরা খেয়েছিল, ফলে তারা অন্যান্য খ্রীস্টানদের ধরে ধরে কনভার্ট করত! আমরা ছিলাম গ্রীক অর্থোডক্স, এক ধরনের উচ্ছিষ্ট (rump) তারা চলে যায় অ্যাঙলিকান চার্চে এবং এটা তারা করেন লাভের বিনিময়ে। আর অ্যাঙলিকানদের বেলায় সেটা হলো—শিক্ষা ব্যবস্থা।

তাই আমার বাবা পড়েছেন জেরুসালেমের এক ব্রিটিশ কলোনিয়াল বয়েস পাবলিক স্কুলে যেটাকে বলা হতো সেন্ট যর্জেস। সেখানে আমাকেও পাঠানো হয়েছিল। আমি আসলে বেড়ে উঠছিলাম, বেশ ভালভাবেই যা আমাদের জীবনের একটা অংশ হয়ে উঠেছিল—সেটা ছিল ইংলিশ সিস্টেম, আপনি হয়তো জানেন… সে সময় আমি খুবই পিচ্চি ছিলাম, কিন্তু আমাদের আর সব আত্মীয়দের ছেলেরা, যেমন চাচাতো মামাতো ভাইরা, আর সবাই ওই একই স্কুলেই পড়েছে। আমাকেও তাই অনুসরণ করতে হয়েছিল, অই দীর্ঘ ঐতিহ্যে বলা চলে আমি তেমন কোনো চোখে পড়ার মত ছিলাম না। সত্যি বলতে কী স্কুলে হাজিরার একেবারে প্রথমদিনেই আমাকে বেত মারা হয়, কারণ প্রার্থনার সময় আমি বকবক করেছিলাম। মধ্যপ্রাচ্যের যতগুলো স্কুলে আমি পড়েছি, এমন কি যে সব ইংরেজী স্কুলেও আমি গিয়েছি তার সবগুলোতেই অতিমাত্রায় দৈহিক শাস্তির ব্যবস্থা ছিল।

ওটাই মডেল ছিল—

হ্যাঁ, ইংলিশ পাবলিক স্কুলগুলোতে ওরকমই মডেল ছিল, কিন্তু এমন ভাবে যেন মনে হতে পারে সেটা স্কুলগুলোর একটা প্যারোডি আর কি! কারণ স্কুলগুলোতে কোনো ইংরেজ স্টুডেন্ট ছিল না। মাষ্টাররা ছিলেন সব ইংরেজ। এবং সবগুলো স্কুলই ছিল সিঙ্গেল সেক্স-এর স্কুল, সবগুলোই ছিল ছেলেদের স্কুল। সেন্ট যর্জেস ছিল বলা চলে শাসক শ্রেণীর স্কুল। প্যালেস্টাইনের সবগুলো নামিদামি পরিবারের সন্তানদের সেখানে পাঠানো হতো। মিশরে যে স্কুলে আমি গিয়েছি সেই ভিক্টোরিয়া কলেজও ছিল মধ্যপ্রাচ্যের শাসক শ্রেণীর স্কুল। সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান এবং সাউদি আরব থেকে সেখানে ছাত্ররা আসতো, সে সময়ে সেখানে সবাই ছিলো ফেলো স্টুডেন্ট। অনেকটা মিশাল খাওয়া কুকুরদের মত একটা শ্রেণী আর কি। তাই স্কুলে অন্তত পে এক ধরনের অনুতূতি কাজ করতো—যথার্থ অর্থে যতটা না স্বাধীনতা ছিল তারচেয়ে যা ছিল সেটা হলো বৈচিত্র্য।

এটা কি বোডিং স্কুল?

জ্বী, এগুলো বোডিং স্কুল এবং ডে স্কুল ছিল। কিন্তু আমি সবসময়েই ছিলাম দিনের বেলার ছাত্র।

কিন্তু ছাত্রদের উপর এর প্রভাব ছিল অনেক আলাদা, বিশেষ করে আবাসিক ছাত্রদের বেলায়…

বেশ, আবাসিক ছাত্রদের ছিল আরও খারাপী সময়, আমি এটুকু তো ভাবতে পারতাম, যাক অন্তত আমি বাড়িতে ফিরবো। জেরুসালেম এবং কায়রো দু’ জা’গাতেই আমার স্কুল শুরু হতো সকাল সাতটা বা সাড়ে সাতটায় আর চলতো বিকাল অব্দি, প্রায় সাঁঝের আগ পর্যন্ত। কিন্তু আবাসিক ছাত্রদের বেলায় আমার ধারণা এমন যে তাদের আরও অনেক ঝক্কি সামলাতে হতো। পহেলা তো তাদের খেতে হতো যতসব ইয়াকী খাবার, আর ছিল ডরমেটরিগুলোর কঠোরতা যার বেশিরভাগই যুক্ত ছিল শারীরিক শাস্তিতে আর ছিল পারফেক্ট হবার প্রয়াস—আমিও এইসব নিখুঁতদের দলে মাঝে মধ্যেই ঢুঁ দিয়ে দিতাম, এগুলোই আমার জীবনের সর্বনাশ ডেকে এনেছে।

আপনার পরিবারকে জেরুসালেম ছাড়তে হলো কেন?

আমাদের পরিবারের বেশির ভাগ লোককেই জেরুসালেম ছাড়তে হয়েছিল কারণ এটাই তাদের করতে হতো। আমাদের বাসাটা এমন একটা জায়গায় পড়েছিল যেটা পুরোপুরি অরক্ষিতই ছিল। হাগানায়েনের মধ্যে আমাদের এলাকাটা পড়েছিল, মনে হয় ১৯৪৮ এর ফেব্রুয়ারির দিকে। যদ্দুর মনে পড়ে, কোনো মিলিশিয়া আসে নি, কোনোপ্রকার সম্মিলিত প্রতিরোধও কেউ করে নি। আমরা বাস করতাম পশ্চিম জেরুসালেমের এক খান্দানি কিন্তু অঘন বসতি আরব সাবার্বে। সত্যি বলতে পুরো পশ্চিম জেরুসালেমই ছিল আরবদের বাস। কী কারণে তা জানি না। আমরা এখন পূর্ব জেরুসালেমের কথা শুনি কিন্তু সে সময়ে পশ্চিম জেরুসালেমের চারটা বড় জেলাতেই থাকত আরবরা। এবং আমরাই বাস করতাম সবচে অঘন বসতি এলাকাতে। ১৯৪৭ শেষের দিকে যখন সংঘাত শুরু হয় সেখানে বাস করা রীতিমত অসম্ভব হয়ে পড়ে। এবং মানুষজনের মধ্যে সাধারণত শঙ্কাও কাজ করতে থাকে। আমাদের পরিবার ১৯৪৭-এর ডিসেম্বরের শেষের দিকে এলাকা ত্যাগ করে। আমরা ইতিমধ্যেই কায়রোতেও বসবাস করছিলাম তাই বলা চলে একধরনের কাকতালীয় ভাবে হলেও যেমন করে হোক আমরা কায়রোতে ফিরে আসি। কিন্তু আমাদের পরিবারের বাকিরা, যারা আমাদের পারিবারিক বাড়িতেই থাকতো তাদের পক্ষেও সেখানে থাকা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না, ১৯৪৮ এর বসন্তের শুরুতেই আমাদের পুরো পরিবারই মানে আমার বাবার এবং মায়ের দু’ দিকেরই সদস্যরা রিফিউজি হয়ে যায়। এবং তাদের কেউ কেউ মিশরে, কেউবা জর্ডানে এবং অনেকেই লেবাননে যেয়ে পৌঁছে।

এই জেরুসালেম থেকে কায়রো আসাটাকে আপনি কী ভাবে নিলেন? আপনি কায়রোকে টাউন হিসেবে পছন্দ করেছিলেন কি?

আমি কায়রো পছন্দ করি। মানে কায়রো আমার কাছে প্রথমত একটা অনেক বিরাট শহর। এটা এমন একটা শহর যেটাকে আমি অনেক বেশি নিজের বাড়ির মত করে ভাবতে পারি। এখানকার ভাষা আমার কানে মধুর লাগে—মানে মিশরে যে আরব ডায়েলেক্টে লোকজন কথা বলে—এবং আমি এখনও অন্য যে কোনো ভাষার থেকে এটাকেই বেছে নেব। কায়রো কসমোপলিটান সেন্টার। জেরুসালেম একটা প্রাদেশিক রাজধানী। আমাদের আত্মীয়রা, আমাদের ফ্যামেলির লোকজন যদি কোনো সিরিয়াস কেনাকাটা করতে চাইতেন তাহলে তারা চলে যেতেন কায়রোতে।

জেরুসালেম যুদ্ধে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্রিটিশ এবং জায়োনিস্টদের উপস্থিতিতে ক্ষুদ্র আরব কমিউনিটির লোকজন তুলনামূলকভাবে বেশি বিছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই কায়রো আমার কাছে অনেক আনন্দের ছিল, যদিও আমি ছিলাম ভিক্টোরিয় ব্যবস্থারই উল্লেখ্যযোগ্য অংশ, স্কুলে তাই অত জায়গা ছিল না কিন্তু জেরুসালেমের তুলনায় অনেক বেশি ছিল।

মানে কোন দিক থেকে?

বেশ, বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে ব্যাপারটা আরও বেশি মজার। যতটা মনে করতে পারি জেরুসালেমে কোনো ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন ছিল না—যদিও আমি খুব পিচ্চি—কিন্তু কায়রোতে যে কেউ ভাবতে পারবেন যে তিনি বিরাট একটা সংস্কৃতির, বৃহৎ একটা সভ্যতার অংশ। এরা অনেকখানি ইউরোপীয় আবার পাশাপাশি আরবও। এবং এটাও বুঝতে পারি কায়রোতেই আমি বেশি বড় হতে পারবো। নগরের সভ্যতার বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে, আর স্কুলগুলোও ছিল অনেক বিশাল, এবং ছাত্রদের মধ্যেও ছিল নানা রকমের বৈচিত্র্য। শিক্ষকরা ছিলেন অনেক উঁচু মানের। এসব কারণে জায়গাটা আমার কাছে মনে হয়েছে অনেক তৃপ্তিদায়ক।

ভিক্টোরিয়া কলেজের কোনো শিক্ষক কি আপনার উপর বিশেষ কোনো প্রভাব ফেলতে পেরেছিল?

না। সি, আই, আর জেমস একবার আমাকে এই প্রশ্ন করেছিলেন এবং আমি অবশ্যই বলেছিলাম পুরো স্কুলের জীবনে আমার কোনো শিক্ষক ছিলেন না যার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আমি এসেছি বা কারুর প্রশংসা করেছি বা এ জাতীয় কোনো কিছু ঘটেছে। কেন জানি আমি সবসময়ই শিক্ষক এবং আমার মধ্যে একটা শত্রুতা ভাব পোষণ করতাম। হলফ করে যা মনে করতে পারি তা হলো—যে কয়টা স্কুলে আমি গিয়েছি সেখানকার শিক্ষকরাই আমার দিকে বিশেষ করে নজরে দিতেন। যেন আমি ছিলাম সত্যিকারের অপরাধী, তারা আমার নফসটাকে পরিষ্কার করতে চাইতেন। তাই আমি যা বেশি করে মনে করতে পারি তাহলো তারা হয় আমার উপর দয়া ফলাতেন বা হয়তো বিশেষ ভাবে আগ্রহ দেখাতেন।

বা হয়তো তারা আপনাকে উদ্বুব্ধ করতেন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে—

গোল্লা। আমি তো মনে করি সাচ্চা করে বললে স্কুল জীবনটাতে বেশিরভাগ বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্দীপনা বস্তুত আমার নিজের থেকেই এসেছে, স্কুল থেকে না। আমি বলতে চাচ্ছি তারা আমার জন্যে সব হাজির করে রেখেছেন। কিন্তু আমার পড়াটা আমি নিজেই তৈরি করেছি। আমার পড়াটা বাস্তবিকভাবেই কাসরুমের কোনো কাজ ছিল না, আমার মনে হয়েছে এই পুরো ব্যাপারটাই ছিল যারপর নাই বোরিং। বেশির ভাগ শিক্ষকের দেখেছি নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা, এমন কি অনেক ছাত্রদের থেকেও তাদের অবস্থা বাজে ছিল।

খেলাধুলা করতেন? টেনিস, ক্রিকেট?

এগুলো সবই করতে হয়েছে। এসব ব্যাপারে আমার বাবা ছিলেন ভয়ানক রকমের কঠোর, আপনার মাথায় জগতের যত প্রকারের খেলধুলার কথা মনে আসবে তার সবগুলোই চৌদ্দ-পনের বয়সের মাথায় আমাকে শিখে ফেলতে হয়েছে, মানে, সবগুলোই আমাকে জানতে হয়েছে, সবগুলো শেখার জন্যে টিউটর, ট্রেইনার এবং পেশাদার ইত্যাদি লোকজন রেখে শেখানো হয়েছে। আমি শিখেছি বক্সিং, ক্রিকেট, টেনিস, ফুটবল, সাঁতার, রাইডিং। সব ধরনের রাইডিং করেছি যার মধ্যে পোলোও ছিল এবং ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব আমি অনেক করেছি। যদিও এর কোনোটাতেই আমি অন্যদের থেকে তেমন ভালো করি নি। আবার আমি বিদ্রোহীও ছিলাম বিশেষ করে দলগত খেলাধুলার ব্যাপারে। কিন্তু আমি এগুলো উপভোগ করেছি, যতণ না আমার কাছে কঠোর রকমের শৃংখলাবদ্ধ বা অসহনীয় হয়ে ওঠেছে।

এডওর্য়াড, এবার আপনি আমাদের আপনার বাবা সম্পর্কে কিছু বলুন। কী ধরনের মানুষ তিনি ছিলেন, কী করতেন এবং আপনার উপরে তিনি কি ধরনের প্রভাব ফেলেছেন—

আমার বাবা বেশ নামিদামি লোক ছিলেন যার সম্পর্কে আমি খুব একটা জানি না। আমি যখন জন্মাই তখন তিনি যথেষ্ট বয়স্ক ছিলেন। তখন তার বয়স ছিল চল্লিশ। আমার মা ছিলেন উনার থেকে বিশ বছরের ছোট। আমার বরং তাকে সবসময়ই বেশ রহস্যময় মনে হতো। অত অভিব্যক্তিপূর্ণ ছিলেন না তিনি। ১৯১১ সালে তিনি প্যালেস্টাইন থেকে আমেরিকায় আসেন উসমান ড্রাফট এড়ানের জন্যে, তিনি এখানে থাকেন নয় বা দশ, সম্ভবত দশ বছর, এরমধ্যে কয়েক বছর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে, ফ্রান্সে পাঠানো আমেরিকান এক্সপিডিশোনারি ফোর্স-এর সাথে কাজ করেন। তিনি আমেরিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, যদ্দুর মনে হয় ১৯২০ সালে আবার প্যালেস্টাইনে ফিরে আসেন।

তিনি কি নিউইয়র্কেই থাকতেন?

না। তিনি বেশির ভাগ সময়ই কাটিয়েছেন কীভল্যান্ডে। কিন্তু তিনি তার অতীত নিয়ে খুব সামান্যই কথা বলতেন। মানে তিনি যে এখানে নয়-দশ বছর কাটালেন তার খুব সামান্যই আমি জানতাম। তারপর তিনি প্যালেস্টাইনে ফিরে আসেন এবং পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন। এবং বিশশতকের শেষ দিকে ব্যবসার পার্টনার হিসেবে তিনি মিশরে শাখা খোলেন যা খুব তাড়াতাড়িই প্যালেস্টাইনের ব্যবসাকে ডিঙিয়ে পেছনে ফেলে দেয়।

ব্যবসা?

ব্যবসা।

কীসের ব্যবসা ছিল?

তার ব্যবসা ছিল প্রয়োজনীয় অফিস যন্ত্রপাতির। কিন্তু প্রশাসনকে বোঝানোর ব্যাপারে তিনি ছিলেন বেশ জিনিয়াস। দৃষ্টান্ত হিসেবে—আমার বাবা যখন মিশরে আসেন, তখন পর্যন্ত মিশরের অফিস আদালতে অনুলিপি করতে পেন্সিলই ব্যবহার করা হতো, কোনো ফাইলিং সিস্টেম ছিল না, সেখানে আমার বাবা ফাইলিং সিস্টেমের প্রচলন করেন, তিনি আরবী টাইপরাইটার চালু করেন—যে সব জিনিস আমলাতন্ত্র এবং ব্যবসাকে আধুনিক করে তার সব তিনি করেছেন এবং এসব ব্যাপারে তিনি ছিলেন প্রতিভাবান। যতজন ব্যবসায়ীর সাথে আমার পরিচয় হয়েছে তারমধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে মেধাবী। তিনি ছিলেন টাইকুন!

বাবা হিসেবে কেমন ছিলেন তিনি?

আমার সাথে যে ধরনের সম্পর্ক ছিল সেটা বরং বলা চলে—খবুই—কঠোর। আমার ছিল চার বোন। আমার বোনদের ব্যাপারে তিনি বেশি রকমের পক্ষপাতিত্ব করতেন। আমার বেলায় হচ্ছে, আমাকে সবসময় গঠিত হতে হবে। বিভিন্ন ভাবে তিনি আমার শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অংশের প্রতি নজর দিতেন। যেমন ধরেন—আমার মেরুদণ্ড। তার মেজাজ বিগরে যায় যখন তিনি জানতে পারেন যে আমার কোনো মেলেটারি পস্চার নাই, ফলে আমাকে শৈশবের মেলা সময় ধরে ট্রেনিং নিতে হয়েছে মেরুদণ্ডের জন্যে। তিনি বলতেন ট্রেনিং করো—এইটা করো সেইটা করো! এসব ছিল এন্তার। যদিও তিনি অত কথার বলার লোক ছিলেন না। মানে কথাই বলতেন কদাচিৎ। কিন্তু যখন তিনি মুখ খুলতেন—এটা আসলে ভিক্টোরিয়ান ফরমুলা। যেমন ‘ক্রিকেটা খেলো।’ তার মানে, মনে হতে পারে তিনি হয়তো টম ব্রাউন’স স্কুল ডে! মনে রেখেছেন! এরকমের হাজারোটা।

সোজ কথায় আমার ছেলেবেলাতে প্রচণ্ড রকমের মনযোগ দেয়া হয়েছে আমার স্বেচছাচারী চরিত্রটাকে মানুষ করতে। আমাকে ধারণা করা হতো আমি খুবই দুর্বল। আমাকে মনে করা হতো আমি হয়তো সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার বেলায় বেশি রকমের অক্ষম। আমার হয়তো কোনো উইল পাওয়ার নেই। আমার নিজের কোনো সেলফ ডিটারমিনেশন নাই। আমার নিজস্বতা বলেই তেমন কোনো কিছুই নেই। তাই তিনি এসবের উপরে বেশি ফোকাস দিতেন। এসবের জন্য আমার সাথে তার বেশ ভাল রকমের একটা দূরত্ব তৈরি হয়।

তারপর হয় কী—আমার মনে হয় এটাও তারই মাথা থেকেই এসেছে, আমার যখন পনের বয়স আমাকে বাইরে পাঠানোর, এবং আমাকে বাইরে পাঠিয়েও দেয়া হয়। আমার জীবনের সবচে ভয়ানক অভিজ্ঞতা হচ্ছে পনের বছর বয়েসে আমাকে আমেরিকা পাঠাবার আয়োজন। এবং তিনি যা সবসময় বুঝতেন, যেহেতু উনি বলেছেন, এবং আমাকে বাইরে পাঠানো নিয়ে তিনি যাই বুঝে থাকুন না। আমি আমেরিকার এক বোডিং স্কুলে চলে আসি।

আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, যদিও তার উত্তর আপনি একভাবে না একভাবে দিয়ে ফেলেছেন, কারণ আমি একটা বিষয়ে খুবই হতভম্ব হয়ে পড়ি কেন আপনার পরিবার, তারা যেখান থেকেই আসুক না কেন, বা তারা এখন কোথায় আছেন, কিন্তু তারা কেন আপনাকে ব্রিটেন না পাঠিয়ে আমেরিকাতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।

হু। দুটো কারণ রয়েছে তার। প্রথমটা আমার বাবা, এটা ভুলবেন না তিনি হচ্ছেন আমেররিকার নাগরিক এবং তিনি মনে করেন যেহেতু তার উত্তরাধীকার সূত্রে আমরাও তার থেকে আমেরিকার নাগরিকত্ব পেয়েছি এবং আমেরিকা সেই স্থান—যদিও তার এর সাথে আমার বাবার কোনো যোগযোগই ছিল না। মানে, আমি যেহেতু কোনোদিনই এখানে আসি নি—তাই আমাকে এখানেই পাঠাতে হবে। আরেকটা কারণ যা কোনো অংশেই কম না এবং খুবই সিরিয়াস সেটা হলো আমি ইংরেজী সিস্টেমে প্রকৃত অর্থে পুরোদমেই ব্যর্থ হয়ে পড়েছিলাম। সে সময়ে মানে আমরা বলছি চল্লিশের শেষের দিকের কথা, দি ইংলিশ স্কুল, দ্য ব্রিটিশ কাউন্সিল স্কুল, যেমন কায়রোর ভিক্টোরিয়া কলেজ, প্যালেস্টাইনের সেন্ট যর্জ-এর সবগুলোরই নাড়ির যোগ ছিল GCE-এর সাথে, অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রিজ স্কুল সার্টিফিকেটের সাথে, এবং আমি একাডেমিক ভাবে এবং মনমেজাজের বেলায় এই সিস্টেমের বিরুদ্ধেই ছিলাম। ১৯৫১ সালের প্রথম দিকে ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ডিসিপ্লিনারি কারণে আমাকে বের করে দেয়া হয়। এবং তখন ভাবনা আসে, সঠিক ভাবেই, আমি এই সিস্টেমে থাকলে আমার ভবিষ্যৎ পুরাপুরি ঝুরঝুরা। তাই আমেরিকার সিটিজেনশিপ ফ্যাক্টর এবং সত্যিকার অর্থেই আমি যে ইংরেজী সিস্টেমে পুরাপুরি ধরা খাওয়া এ দুটোর সম্মিলিত কারণই আমাকে এখানে পাঠাবার জন্য বিবেচনা করা হয়।

এখানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলে আপনার কেমন লাগে?

ভয়ানক। আমার তো মনে হয় সত্যিকার অর্থে আমি কোনোদিনই এর থেকে উদ্ধার পাবো না, কারণ এটাই ছিল চূড়ান্ত… আমার কাছে এটা ছিল সবচে’ জঘন্য যা আমি এ যাবৎ জেনেছি বা যা আমি পছন্দ করেছি। এমনকি আমার ছেলেবেলার দুগর্তি সত্ত্বেও, বলবো এটা মারাত্মক যে আমেরিকার গোঁড়া নিউ ইংল্যান্ড বোডিং স্কুলে পড়তে আসা—জন্মেও আমি তুষার দেখিনি—সম্পূর্ণ একটা অপরিচিত পরিবেশ, একদিকে গোঁড়া পাশাপাশি অন্য দিকে আমার কাছে ভণ্ডামিপূর্ণও বটে, যেসব লোকের সাথে আমার কোনো কাম নাই, তাই না, যে আমেরিকানদের আমি কোনো দিনই মোকাবিলা করিনি, এটা মারাত্মক এবং অসঙ্গতিপূর্ণ। জীবনে এই প্রথমবারের মত আমি ভাবি যদিও আমার চরিত্র নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে, আমার যত ধরনের নৈতিক খুঁত, পাশাপাশি যত ধরনের শারীরিক খুঁত রয়েছে, তা এই পরিমাণে রয়েছে। আমেরিকাতে আমি এক্কেবারে একজন আলাদা মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করি এবং আমাকে আবারও এমন ভাবে তৈরি হতে হবে যা এই সিস্টেম দাবি করে, এবং শুরু হয় নতুন লড়াই।

আর আপনি এগুতে থাকেন বোডিং স্কুল থেকে প্রিন্সটনে, প্রিন্সটন থেকে হার্ভাডে—

হ্যাঁ। যেভাবে ঘটেছে সেটা বলা চলে ধারাবাহিক ভাবেই। আমি লেখাপড়ায় খুবই ভাল করেছিলাম। ইংরেজি সিস্টেমের তুলনায় এটা আমার কাছে বেশ সহজই ছিল। কারণ এখানে অনেক চাপ ছিল। এখানে আসার সবচে ভাল দিকটা হচ্ছে, বোডিং স্কুলে না, আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই তখন, তুলনামলূক ভাবে অনেক স্বাধীনতা পেয়েছি। মানে আমাকে আমার রুমে বিশেষ সময়ে ফিরে আসতে হবে না। আমাকে বিশেষ সময়ে ঘুম থেকে উঠতে হবে না। এসব ব্যাপারগুলো। আমার ছেলেবেলাটা ওরকমটা চলেছে, অনেকটা সেনাশৃঙ্খলার মতো। অনেকটা মেলেটারি স্কুলের মত। আমার ছোটবেলার স্মৃতি বলতে ওই ধরনের ব্যাপারগুলো। যেমন ধরেন আমার বাবার কথা, তিনি ছুটি কাটানোর ধারণাটাই নিষিদ্ধ করেছিলেন। আমাকে একমিনিটের জন্যে অলস বসে থাকতে দিতেন না। তার একটা প্রিয় বাণী হচ্ছে ‘অলস মস্তিস্ক ইবলিশের ওয়ার্কশপ’। এমন কি আমার বাবা বাসায় ড্রেসিং গাউন পড়াটা পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছিলেন।

এডওয়ার্ড, এটা অনেকটা ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডের প্যারোডি তাই না?

তিনি ভয়ঙ্কর স্বভাবের ছিলেন, এটা খুবই কঠিন ছিল। কিন্তু সবজা’গাতেই ছিলেন আমার মা, তিনি অবশ্যই সব ক্ষেত্রেই কাউন্টার দিতেন ব্যালেন্স করতে এবং তিনিই আমাকে নষ্ট করতেন। কিন্তু সবসময়ই আমার বাবাই জিততেন। এবং বস্তুত তারই সিদ্ধান্ত আমাকে বাইরে পাঠানোর—আমার কী মনে হয়, তিনি চেয়েছিলেন আমার মায়ের প্রভাব থেকে আমাকে দূরে রাখতে।

কেন? আপনার মা কে তিনি কেমন মনে করতেন?

বেশ। আমার মনে হতো আমার স্বেচ্ছাচারিতাকে আমার মা একধরনের প্রশয় দিতেন। আজ আমার কাছে যে সব জিনিস দরকারি মনে হয়—মিউজিক, সাহিত্য, আইডিয়া, সত্যিকার অর্থে এসবের জন্যে আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী। আমার মা ছিলেন আমার তারুণ্যের সবচে’ কাছের সঙ্গী। আপনি জানেন, এখনও যদি আমি সেসব সময়ের কথা মনে করি মজার ব্যপার যে প্রকৃতঅর্থে আমার কোনো বন্ধু ছিল না। মাঝেমাঝে আমি সেসব আগের দিনের কথা ভাবি। আমি খুবই সামান্য সময় মিশেছি আমার জেনারেশনের লোকজনদের সাথে, আমার সমকদের সাথে। মানে স্কুল বাদে আমার কোনো আফটার-স্কুল বন্ধু ছিল না। তাই আমার মা বাসায় সেই ঘাটতিটা পূরণ করতে এগিয়ে আসেন, সেই সব সম্ভাবনার দিকগুলো উন্মোচন করেন যেগুলোর আমার কাছে খানিকটা মূল্য আছে, যেমন ধরেন মিউজিক। আমি যখন রেওয়াজ করতাম তিনি তখন আমার পাশে বসে থাকতেন।

আপনার মা নিজেও কি বাজাতেন?

হ্যাঁ, তিনি বাজাতেন। ধরা যাক আমার বাবাকে—আমাদের পরিবারের পুরো বাপের দিকটাকে যদি ধরি—আস্তটাই সঙ্গীতের ধারেকাছেও নেই, মিউজিকের বেলায় তারা হলো পুরো পাথরকালা বধির, কিন্তু আমার মায়ের পরিবারের দিকটা যদি ধরি তাহলে তারা যেমন শিক্ষিত তেমনই সঙ্গীতপ্রিয়। তাই আমার মা আমাকে সবসময়ই সঙ্গীতের জন্যে উৎসাহিত করতেন। এবং আমার মনে হয়েছে আমার মা আমার কথাও প্রায় সময় শুনতেন, অন্যদিকে আমার বাবা যখন রেগে যেতেন তখন তাকে সামলানো কঠিন হতো কিম্বা তিনি হয়তো শুরু করে দিতেন সেই শাস্তিমূলক প্রোগাম।

আপনার মায়েব প্রচেষ্টায় আপনার জন্যে মিউজিকের শিক্ষক রেখে দেয়া হয়?

অবশ্যই। তাই। আমার মা খালি একজন শিক্ষককে মাত্র খুঁজে পান নি, বলতে পারেন আমার ছেলেবেলার সব শিক্ষকই আমার মায়ের আবিষ্কার। শেখার সময় তিনি নিজে উপস্থিত থাকতেন, আমাকে বোঝাতেন… কেননা মাত্র ছয় কিংবা যাই হোক না কেন ওরকম একটা বয়সে সঙ্গীতের স্কেল শেখা নিয়ে আমার অতটা ভয়ানক রকমের মাথাব্যথা থাকার কথা না। এবং সাধারণ ভাবে আমার আবার মিউজিকের ব্যাপারে ছিল একধরনের অকালপরিপক্কতা। সত্যিকার অর্থে এসব ঘটেছে মিশরে থাকার সময় রেডিও শুনে, রেকর্ড শুনে আর অপেরায় যেয়ে। কৌশলগত দিক দিয়ে আমার বয়সের দিক থকে আমি অনেক এগিয়ে ছিলাম। আমার আঙুল হয়তো না… কিন্তু আমাকে অবশ্যই রেওয়াজ করতে হতো। এবং আমার মা এদের একজন যিনি আমার পাশে বসে থেকে আমাকে বুঝিয়ে এই চর্চা এবং ট্রেনিং করাতেন—

এবং আপনার কোন এক বইতে লিখেছিলেন এই শিক্ষকটি ছিলেন পোল্যান্ডের এক ইহুদি?

তিনি এসেছিলেন পরে। আসলে আমার প্রথম শিক্ষক ছিলেন তার এক ছাত্র। আমি তার কাছেই প্রথমে উনার নাম শুনি। তারপরে আমার টিনএজ বয়সের শেষের দিকে আমি তার কাছে তালিম নিতে শুরু করি। তার নাম ছিল ইগনায টাইজারমান। তিনি ছিলেন পোলান্ডের ইহুদি, ত্রিশ দশকের দিকে তিনি মিশরে আসেন।

নাজিদের হাত থেকে পালাতে?

হ্যাঁ। আমার মনে হয়—তখনও নাজিরা আসলে জাল বিস্তার করতে শুরু করেনি, তবে তারা যে আসছে তিনি সেটা বুঝতে পেরেছিলেন—তিনি আমাকে বলেছিলেন। এবং তিনি মিশরের জীবনযাত্রা খুব পছন্দ করতেন। মূলত তিনি ছিলেন এক মহা আইলসা গোছের লোক। কিন্তু যতগুলা বিস্ময়কর সঙ্গীত ব্যক্তি আমি এযাবত দেখেছি তার মধ্যে তিনি ছিলেন সবচে’ গুণের অধিকারী। আমরা খুব কাছের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। তিনি ছিলেন অবিবাহিত। এবং মিশরে তার একটা কনসারভেটোরি ছিল। সমাজের সবাইকে তিনি শিখাতেন। তিনি নিজেই মহান পিয়ানোবাদক ছিলেন, যদিও কোনো সময়ই রেওয়াজ করতেন না। তিনি আমার মধ্যে দেখতে পান আমি খুবই সঙ্গীতপ্রিয়, আমার মহা রকমের ইচ্ছে আছে এবং তার সাথে মেলা সময় কাটিয়েছি, শুধু যে তার কাছে শিখেছি তা নয় শুনেছিও তার কাছে অনেক, তার সঙ্গে কথাও বলেছি অনেক। তাই আমার সাথে তার সম্পর্কটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আর এইসব সম্পর্কগুলোতে চির ধরতে শুরু করে যখন আপনি যুক্তরাষ্ট্র্রে চলে আসেন?

হ্যাঁ, বলা চলে ব্যাহত হতে থাকে। টাইজারমানের বেলায় অবশ্যই। গ্রীষ্মকাল এলে তার সাথে দেখা করতে পারতাম।

মানে আপনি যেতে পারতেন—

আমি যেতে পারতাম, তার কাছে শিখতে পারতাম। এরপর আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয় মানে প্রিন্সটন থেকে গ্রাজুয়েট শেষ করি সে সময় বছরখানেকের জন্যে মিশরে থাকি, এই সময়টাতে আমি যা সবচে’ বেশি করেছি তা হলো পিয়ানো বাজিয়েছি। আর তার কাছে লেখাপড়া শিখেছি। তারপর থেকে আমাদের দেখার পরিমাণ বেড়ে যায় এবং তারপর তিনি করেন কী আমেরিকার এক গুরুর কাছে আমাকে সুপারিশ করেন। বস্টনে আসার পরে আমি জুলিয়ার্ড-এ শিক্ষা নিয়েছি। কিন্তু এদের কারুরই আমার কাছে বাস্তবিকই তেমন কোনো মানে নেই একমাত্র উনি ছাড়া। আমি বলতে পারি সেই সময়ে আমার উপর বেশি রকমের যে বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক এবং নান্দনিক প্রভাব পড়েছিল সেটা সম্ভবত তারই।

আপনি বুঝি তাই. কায়রোতে থেকেছেন, ক্যাসিক্যাল মিউজিক শিখেছেন আর পাশাপাশি আপনার পেছনে ব্যাকগ্রাউন্ডে যে মিউজিক বাজতো সেটা কায়রোর নিজেরই মিউজিক—

নিঃসন্দেহে—

উম্মে খলদুম-এর কনসার্ট

হ্যাঁ! জীবনে প্রথম যে কনসার্টে আমি গিয়েছিলাম, অন্তহীন একটা কনসার্ট। এবং বলতে কী আমি তাকে আজও সেই ভাবেই অনুভব করি। আমার মনে হয় আমি সে সময় নয় বছরের। আমার কাছে লেগেছে এটা যেন একটা রহস্যময়। লেগেছে কেমন একটা অনুরণনশীল, এবং একটা পর্যায়ে এসে মনে হয়েছে যেন এটা একটা ফর্মহীন ব্যাপার। আরেকটা ব্যাপার আমার বেশি মনোযোগ কেড়েছে সেটা হলো ক্যাসিক্যাল ওয়েস্টার্ন মিউজিক-এর ফর্মটা আসলে টের পাওয়া যায়, কোনোভাবে খাপ খেয়ে যায়—

এর জন্যে তো জ্ঞানের শাখা রয়েছে—

হ্যাঁ সেটা তো রয়েছেই, আছে ফ্রেমওয়ার্ক, এবং আমি উম্মে খলদুম-এর কনসার্টকে সময়ের সাথে তুলনা করে দেখেছি এটা চলেও অনেকণ, আবার তারা শুরুও করেন অনেক দেরিতে। সেই কনসার্ট নিয়ে সবচে’ বেশি করে মনে পড়ে কনসার্টটা হচ্ছিল কায়রোর ডাউনটাউনে একটা সিনেমা হলে। আমি এটা কোনোদিনই ভুলবো না, আমরা যখন কায়রোতে সেই কনসার্ট হলে দেখি রাত সাড়ে ন’টা বেজে গেছে এবং তখনও কনসার্ট শুরুই হয় নাই, শুরু হতে হতে সেই রাত এগারটা। ফলে আমাদেরকে মেলাক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে। তারপর তিনি যখন শুরু করলেন, তার কোনো গানই কমছে কম চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের নিচে না! কেমন অবাক লাগতে পারে কী পরম নন্দন রয়েছে এর পিছে যা কিনা হলের পুরো শ্রোতাদের নেশাগ্রস্ত করে ছাড়ে—তাই না! আমি কোনোভাবেই এর ফয়সলা করতে পারিনি। আমি এখনও পারি না। সামান্যতর তারতম্য ঘটিয়ে এই ধরনের সীমাহীন পুনরাবৃত্তিতে সেসময়ে আমি তেমন আনন্দ পাইনি, কিন্তু যতই আমি বড় হতে থাকি ততই আমি বুঝতে পারি, আমি সেই শিল্পটাকে সামন্য করে করে হলেও উপলব্ধি করতে শুরু করেছি।

এটাই পরমানন্দের বিষয়।

তাই। আসলে, এটাই পরমানন্দের বিষয়, কিন্তু এর ভেতরে এই ফুটে ওঠার ব্যাপারটার কোনো ভাবেই টের পাওয়া যায় না, এটাই হচ্ছে তার সৌন্দর্যের অংশ। আমার কী মনে হয়—এটাই খুঁজে পেতে আমার বেগ পেতে হয়।

কিন্তু আপনি এখন তার মূল্যটা বেশি করে বুঝতে পারেন, বিশেষ করে পরবর্তী বছরগুলোতে?

সত্যি, কারণ এটা এখন নস্টালজিক ব্যাপার। তার উপর এটা এমন একটা অতীতের কণ্ঠ যা সহজে হারিয়ে গেছে। মিশরে এর কোনো ঐতিহ্য নেই, লক্ষ্য করার মত বা নিদেন পক্ষে চলমান কোনো ট্রাডিশনও নেই। অবশ্য তার নকলকারীরা রয়েছে। সাম্প্রতিক যখন আমি কায়রোতে যাই, একরাতে টেলিভিশন খুলে দেখি এক মহিলা তার মতো করে গাইছে। যে তার নকল গান করে নাম কামিয়েছে, বরং সে ওই ঐতিহ্যের বিস্তার না ঘটিয়ে নকল উম্মে খলদুন সেজে বসেছে। এভাবে দেখলে ব্যাপাটার ভেতর আমি একটা মজা খুঁজে পাই।

(কিস্তি ২)

free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:

hossain_mofazzal@ymail.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ন্যান্সি খান — মার্চ ২৯, ২০০৯ @ ৪:৩০ পূর্বাহ্ন

      আর্টস-এ অসাধারণ কিছু ফিচার ছাপা হয়, এটি তার মধ্যে ১টি। ভাল লাগলো।

      – ন্যান্সি খান

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com