অনুবাদ, আদর্শ ও অবহেলা

রাজু আলাউদ্দিন | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ৬:১৪ অপরাহ্ন

মোগল সম্রাট শাহজাহানের বড় ছেলে দারাশুকো সংস্কৃত এক পণ্ডিতের সাহায্য নিয়ে ১৬৫৭ সালে ফার্সী ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন উপনিষদের। এরও প্রায় দেড়শ’ বছর পর প্রাচ্যবিদ ফরাসী এক পরিব্রাজক আকেতিল দ্যু পেরোঁ (Anquetil Du peron) এই ফার্সী অনুবাদের ভিত্তিতে লাতিনে তা অনুবাদ করেন। ইউরোপে উপনিষদের ওটাই প্রথম অনুবাদ। দারাশুকো যদি এই অনুবাদ না করতেন তাহলে ইউরোপকে হয়তো আরো বহু বছর অপেক্ষা করতে হতো উপনিষদের আলোয় মানবজীবনের তাৎপর্য ও গভীরতা অবলোকনের।

দারাশুকোর এই ফার্সী অনুবাদের প্রভাব কতটা গভীর ছিলো পশ্চিমের মননশীল জগতে তা ছোট্ট একটি উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। ১৮০১ ও ১৮০২ সালে (দুই খণ্ডে) আকেতিল কর্তৃক অনূদিত উপনিষদের একটি কপি পৌঁছেছিলো জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ারের হাতে। তাঁর বাকি জীবন কেটেছিলো এই ভারতীয় দর্শনের আত্মার উষ্ণতায়। জীবনের প্রশান্তি হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন উপনিষদের উক্তিসমূহ। শুধু শোপেনহাওয়ারই নন, উপনিষদের প্রভাব পড়েছিলো আরেক জার্মান দার্শনিক ফ্রেডারিখ নীটশের উপরেও। দার্শনিক গভীরতায় আচ্ছন্ন মার্কিন লেখক এমার্সনের লেখায়ও আমরা প্রাচ্যের এই মহৎ সৃষ্টির ছায়া দেখতে পাবো। এসবই সম্ভব হয়েছিলো অনুবাদের কারণে। এই মুহূর্তে আমাদের মনে পড়বে স্পেনের সেই আরব লেখক-অনুবাদকদের কথা যারা পশ্চিমের দার্শনিক ধারার সূত্র গ্রীক দর্শনকে সম্ভাব্য বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন আরবী ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে।

আজ গোটা মুসলিম বিশ্বে চিন্তা এবং মননশীলতার ক্ষেত্রে সীমাহীন দেউলিয়াত্ব দেখে এটা কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব যে আট থেকে পনের শতকের আগে পর্যন্ত স্পেনে মুসলিম বুদ্ধিজীবিরা জ্ঞানের প্রায় সব শাখাতেই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পৃথিবীর যে কোনো জাতির তুলনায় দীর্ঘতম সময়। এই দীর্ঘ সময় জ্ঞানচর্চার ফলে আমরা তাঁদের কাছ থেকে চিকিৎসা জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে অসাধারণ সব মৌলিক চিন্তা ও আবিষ্কার যেমন পেয়েছি, তেমনি পেয়েছি গ্রীক দর্শন ও বিজ্ঞানের অমূল্য সব গ্রন্থের অনুবাদ।

মানব জাতির পরম সৌভাগ্য যে সেকালের মুসলিম লেখকরা মূল গ্রীক থেকে আরবীতে সে-সব গ্রন্থের অনুবাদ করে রেখেছিলেন। তা না হলে তা চিরকালের জন্য বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারতো। কারণ গ্রীক সংস্করণে মূল গ্রন্থের হদিস মেলেনি পরবর্তী কালে। শুধু আরবীতে অনুবাদই নয়, এমনকি ইউরোপের গ্রীক দর্শনই আবার যখন ইউরোপীয় ভাষায় প্রবেশ করছে, আরবী অনুবাদের ভিত্তিতে তখনও আরব মুসলিম বা ইহুদীরাই মধ্যস্থতা করে গেছেন। বার শতকের শুরুর দিকে স্পেনের তলেদোতে আরবী থেকে লাতিন ভাষায় অনুবাদের জন্য অনুবাদকদের একটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। তলেদোর আর্চবিশপ দোন রাইমুন্দো ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা। রাইমুন্দো বুঝেছিলেন যে আরিস্ততলকে বুঝতে আরব দার্শনিকদের গুরুত্ব অপরিসীম। দোমিংগো গুন্দিসাল্বো নামে সেগোবিয়ার এক আর্কডেকনকে অনুবাদক নিয়োগ করে একের পর এক অনুবাদ করান ইব্ন সিনার কিতাব আল শিফা (নিরাময় গ্রন্থ), আল গাজ্জালীর মাক্সিদ আল-ফালাসিফা (দার্শনিকের লক্ষ্য) এবং আল ফারাবীর ইহ্শা আল-উলুম (বিজ্ঞানের গ্রন্থপঞ্জী) সহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। মজার ব্যাপার হচ্ছে গুন্দিসালবো আরবী জানতেন না মোটেই। আরবী থেকে কাস্তিলীয় এবং পরে কাস্তিলীয় থেকে লাতিন ভাষায় অনুবাদের জন্য ব্যবহার করেছিলেন ইহুদী বা মুসলিম কোনো মধস্থতাকারী। তখনকার তলেদোর সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদকদের একজন ছিলেন জেরার। আরবী ভাষায় রক্ষিত মানবজাতির অমুল্য জ্ঞানভাণ্ডার ইউরোপের সামনে তুলে ধরার জন্য আরবী ভাষা শিখে পরে তা তিনি লাতিন ভাষায় অনুবাদ করেন। সেকালের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদক মাইকেল স্কট যিনি জেরার-এর মতই একইভাবে আরবী শিখে তখনকার মুসলিম লেখকদের গ্রন্থগুলো লাতিন ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। এসবই ঘটেছিলো রাইমুন্দোর প্রতিষ্ঠিত তলেদোতে অনুবাদকদের কলেজ প্রতিষ্ঠার ফল হিসেবে। তলেদোর অনুবাদকদের অসাধারণ এই অর্জনের পেছনে ছিলেন আরব মুসলিম, ইহুদী এবং লাতিন জানা খৃষ্ঠান পণ্ডিতরা। এদের সম্মিলিত উদ্যোগ এবং কর্মযজ্ঞই আজকের এই জেল্লাদার ইউরোপীয় সভ্যতার উত্থান ও বিকাশকে নিশ্চিত করে তুলেছিলো। মধ্যযুগ বিশেষজ্ঞ মার্কিন পণ্ডিত চার্লস হোমার হাসকিন্স পরিষ্কার ভাবে বলেছেন: ”পশ্চিম ইউরোপ কর্তৃক জ্ঞানের এই পরিগ্রহণ ইউরোপের চিন্তার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনে দেয়।” অনুবাদ প্রসঙ্গে আমাদের মনে পরবে আরেকটি যুগান্তকারী ঘটনা।

১৭০৭ থেকে ১৭১৭ সালের মধ্যে জাঁ আন্তেনিও (নাকি আঁতোয়ার?) গালার ফরাসী অনুবাদে সহস্র এক আরব্য রজনী যখন প্রথমবারের মতো কোনো ইউরোপীয় ভাষায় প্রকাশিত হয় তখন এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কথা কেউ কল্পনাও করেন নি। কিন্তু আজ সাহিত্যের সমালোচক এবং ঐতিহাসকিরা কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই এ কথা স্বীকার করেন যে আরবী সাহিত্যের এই অসামান্য কীর্তির অনুবাদই সম্ভব করে তুলেছিলো ইউরোপীয় সাহিত্যের সবচেয়ে বর্ণময় দীর্ঘস্থায়ী রোমান্টিক আন্দোলন। আজকের ফরাসীরা গালার এই অনুবাদ কতটা কদর করেন জানি না। তবে সেকালে ফরাসীদের কাছে এই অনুবাদকর্মই সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলো। আর কেবল ফরাসী ভূখন্ডে এবং সাধারণ্যেই নয়, এর বাইরে সেকালের যোদ্ধা ও সৃজনশীল চক্রেও এর আলো ঠিকরে পড়েছিলো। কোলরিজ, ডি-কুয়েন্সী, স্তাঁদাল, টেনিসন, অ্যাডগার অ্যালান পো, নিউম্যান — এরা সবাই গালার হাত ধরেই ‘সহস্র এক আরব্য রজনী’ পরিক্রম করেছেন।

আমার ধারণা ফরাসী লেখক ভলতেয়ারের ওপরও এর প্রভাব কিছুটা পড়েছিল। তাঁর প্রাচ্য রোমান্স — যার মধ্যে অন্যতম জাদিগ — তা আসলে আরব্য রজনীর দ্বারা অনেকটাই অনুপ্রাণিত। সে যাই হোক, আজকাল, পণ্ডিতজনরা যদিও — যথার্থ কারণেই — অনুবাদের আদর্শ হিসেবে তাঁকে মোটেই গ্রহণযোগ্য মনে করেন না। কারণ মূল থেকে যে-দূরত্ব রয়েছে এই অনুবাদে, গালা তা অনেক সময় ঘোচানোর চেষ্টা করেছেন প্রতারণাময় অলীক শব্দপুঞ্জে ও উদ্ভাবিত অনুষঙ্গের সমাবেশে। এমন নয় যে এই অভিযোগ কেবল গালার বিরুদ্ধেই তোলা হচ্ছে। গালার পরেও অন্য ভাষায় এডওয়ার্ড লেন, ক্যাপ্টেন রিচার্ড বার্টন এবং ড. জে. সি. মার্দ্রুস এই অসামান্য সাহিত্য কীর্তির অনুবাদ করেছেন। অনুবাদের বিশ্বস্ততার প্রশ্নে অভিযোগ উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধেও অল্পবিস্তর। এঁদের মধ্যে মার্দ্রুস অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি মূলানুগ বলে প্রমাণিত। যদিও বিশ্বব্যাপী বার্টন-এর অনুবাদই সম্ভবত আজ বেশি পরিচিত। সেটা কি এই জন্যে যে প্রাচ্য বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা অনেক বেশি সরাসরি, অনেক বেশি গভীর এবং একাধিক ভাষায় তাঁর অনায়াস যাতায়াত? সন্দেহ নেই, ভালো অনুবাদের লক্ষ্যে এইসব বাড়তি গুণাবলী সহায়ক হতে পারে। কিন্তু তা-ও তো নির্ভর করে আসলে অনুবাদক আদর্শ হিসেবে কোন ধরনটিকে বেছে নেবেন তার ওপর। এখানেই সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তোলা অনিবার্য হয়ে ওঠে: অনুবাদ আসলে কী এবং ভালো বা আদর্শ অনুবাদ বলতে আমরা কী বুঝি। কিংবা আরও গভীরে গিয়ে এই প্রশ্নও তো তোলা সম্ভব যে অনুবাদ আদৌ সম্ভব কিনা। ‘বিশ্বস্ততা’ এবং ‘আদর্শ’-এর প্রশ্নে আমরা এই মুহূর্তে না গিয়ে প্রথমে এই মৌলিক প্রশ্নের ফয়সালা করা জরুরী বলে মনে করি। ফরাসী চলচ্চিত্রকার জাঁ লুক গদার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে ‘সব কিছুই হচ্ছে অন্য কিছুর অনুবাদ।’ বোঝাই যাচ্ছে যে এই বক্তব্যে তিনি যা ইঙ্গিত করছেন তা হলো অনুবাদ হয় পুরোপুরি এক সৃষ্টি, নয়তো আদৌ এর কোনো অস্তিত্ব নেই।

সত্যি সত্যিই কি কোনো অসামান্য সাহিত্যকীর্তির অনুবাদ অন্য ভাষায় সম্ভব? অনুবাদের প্রশ্নে সবচেয়ে রক্ষণশীল শিল্পমাধ্যম কবিতার কথাই ধরা যাক। সেই ক্লিশে, পুরোনো, রদ্দি প্রশ্ন দিয়ে আমরা এগোনোর চেষ্টা করতে পারি: কবিতার অনুবাদ সম্ভব কিনা কিংবা তা কতটুকু সম্ভব। রবার্ট ফ্রাস্টের সেই উক্তি কে না জানেন যিনি বলেছিলেন যে “অনুবাদে যা হারিয়ে যায় তা-ই হচ্ছে কবিতা (Poetry is what gets lost in translation)” কবিতা কী — তা বোঝাতে গিয়েই তিনি এইভাবে অনুবাদের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তার মানে কবিতার অনুবাদ সম্ভব নয়। অনুবাদ সম্পর্কে ফ্রস্টের এই অভিমত সত্ত্বেও কিন্তু আমাদের ভাষায় এবং পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায়ও তাঁর কবিতার অনুবাদ হয়েছে এবং সেসব অনুবাদের মাধ্যমে ফ্রস্টের মহান কাব্যকৃতির স্পর্শে পাঠকদের আত্মা শিহরিত হয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ব্যাপারটা স্ববিরোধাত্মক নিশ্চয়ই। কিন্তু এই স্ববিরোধের মধ্যে বেঁচে আছে পরস্পর-বিরোধী এক সত্য। ফ্রস্ট যা বলেছেন তা সত্য। আবার অসত্যও কিছুটা। আমাদের পরিচিত এক অভিজ্ঞতা থেকে একটি উদাহরণ নিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। পরস্পর-বিরোধী দুটি সত্যকেই জীবনানন্দ দাশের দুই ধরনের কবিতা দিয়ে আমরা ব্যাখ্যা করে দেখতে পারি। তাঁর রূপসী বাংলা থেকে যেকোনো কবিতা, আলোচনার সুবিধার্থে ‘বাংলার মুখ আমি’ ‘যতদিন বেঁচে আছি’ ‘আকাশে সাতটি তারা’ কিংবা ‘জীবন অথবা মৃত্যু’ কবিতার কথাই ধরা যাক। রূপসী বাংলার অন্যসব কবিতার মতোই এইসব কবিতাতেও গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক অনুষঙ্গ, উপকথা, ইতিহাস, রূপকথা এত বেশি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে যে তার আক্ষরিক অনুবাদ সম্ভব হলেও এসব অনুষঙ্গের মাধ্যমে কবিতাগুলো বাঙালি পাঠকদের যে-ভাবে আলোড়িত করে — আমার ঘোরতর সন্দেহ — তা একইভাবে বিদেশী পাঠকদের করবে কি না।

রূপসী বাংলার কবিতাগুলোর আঞ্চলিক অনুষঙ্গ বা স্থানিক বর্ণময়তা (Local Color) এত বেশি মাত্রায় রয়েছে যে তা বিদেশী পাঠকদেরকে টিকাভাষ্য দিয়ে বোঝানো গেলেও তারা একই ভাবে আমাদের মতো শিহরিত হবেন কিনা সন্দেহ। এই ধরনের কবিতার ক্ষেত্রে ফ্রস্টের সেই উক্তি পুরোপুরি সত্য। কিন্তু জীবনানন্দ দাশের আবার এমন কিছু কবিতা রয়েছে যে-গুলোতে আঞ্চলিক অনুষঙ্গ বা স্থানিক বর্ণময়তার উপস্থিতি তেমন একটা নেই। যার ফলে যে কোনো ভাষায় তার অনুবাদ বিশ্বস্ততার সাথেই সম্ভব। যেমন ‘বেড়াল’ কিংবা ‘নির্জন হাঁসের ছবি’। এই কবিতাগুলোর যে-সব উপমা এবং অনুষঙ্গ রয়েছে তা যে-কোনো দেশে যেকোনো ভাষাতেই সুপরিচিত। ফলে তা সহজেই বোধগম্য। এই ধরনের কবিতার অনুবাদ যেকোনো ভাষাতেই টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এখনেই ফ্রস্টের উক্তির অসত্যতা আমরা টের পাই। যদিও মূল ভাষায় কবিতার যে সঙ্গীতময়তা, শব্দবন্দের যে দ্যোতনা তা অন্য ভাষায় হুবহু এক রকম থাকবে না। অনুবাদক এই শূন্য জায়গাগুলো তার ভাষায় কীভাবে পূরণ করেন এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সামনে আদর্শের প্রশ্নটি হাজির না হয়ে পারে না। কেমন হওয়া উচিৎ অনুবাদকের আদর্শ?

অনুবাদের আদর্শ এবং ধরন নিয়ে এত তত্ত্ব এবং বিতর্ক রয়েছে যে সেই গোলকধাঁধায় না ঢুকে বরং জার্মান লেখক ওয়াল্টার বেনজামিনের অনুবাদ বিষয়ক একটি প্রবন্ধের সাথে পাঠকদের মোলাকাত করিয়ে দিতে চাই। অনুবাদ বিষয়ে আমি যে সব লেখা পড়েছি তার মধ্যে এই লেখাটি আমার বিশেষভাবে প্রিয়। প্রবন্ধটির শিরোনাম ‘অনুবাদকের কাজ’ (The Task of the Translator)। এই প্রবন্ধে বেনজামিন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন অনুবাদ প্রসঙ্গে। “এটা সত্যি যে মূলের তুলনায় কোনো অনুবাদেরই — তা যত ভালোই হোক না কেন — কোনো গুরুত্ব নেই।” খুবই খাঁটি কথা। কারণ অনুবাদ তার নিজস্ব স্বাধীনতার বদগুণের জন্যে মূলের প্রতি চিরকাল অবিশ্বস্ত থেকে যাবে। কিন্তু তারপরও বেনজামিন বলতে ভোলেননি যে “সত্যিকারের (Real) অনুবাদ স্বচ্ছ; তা মূলকে আড়াল করে না, ব্যহত করে না তার আলো।” বাংলা ভাষার এর উদাহরণ আমরা দেখতে পাবো প্রথমবারের মতো বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদ কর্মে। বুদ্ধদেবের অনুবাদের এই অনন্য গুণের কারণেই সম্ভবত পরবর্তী প্রজন্মকে তিনি তাঁর অনুবাদ কর্ম দিয়ে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। কিন্তু বেনজামিন এই প্রবন্ধে অনুবাদের ভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝাতে গিয়ে জার্মান এক অখ্যাত লেখক রুডল্ফ প্যানভিৎজ-এর একটি চমৎকার উদ্ধৃৃতি হাজির করেছেন। রুডল্ফের বক্তব্য: “আমাদের অনুবাদগুলো, এমনকি শ্রেষ্ঠতম অনুবাদকর্মও, এক ভুল ধারণা থেকে উৎসারিত। জার্মান ভাষাকে হিন্দি গ্রীক ইংরেজী ভাষার আদলে রূপান্তরিত না করে বরং তারা হিন্দি, গ্রীক, ইংরেজী ভাষাকে জার্মানিতে রূপান্তরিত করতে চান। বিদেশী সাহিত্যকর্মের আত্মার প্রতি যতটা না শ্রদ্ধাশীল তার চেয়ে অনেক বেশি শ্রদ্ধাশীল আমাদের অনুবাদকরা তাদের নিজেদের ভাষার ব্যবহারের প্রতি।”

ভাষার বৈচিত্রের কথা ভাবলে রুডল্ফের এই মন্তব্য আমাদেরকে সত্যি সত্যি ভাবিত না করে পারে না। অনুবাদকদের কাছে রুডল্ফের প্রত্যাশাটা এই যে অনুবাদের মাধ্যমে সে ভাষার অভিঘাতকে যত দূর সম্ভব গ্রহণ করেন যাতে করে নিজের ভাষার বাক্যরীতি, চলন ও গড়নের মধ্যে একটি নতুন বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। নিজের ভাষার বৈচিত্র ও বিকাশের প্রশ্নেই তিনি এমনটা আশা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মতে, জার্মান ভাষার কোনো অনুবাদকই তাঁর সে আশা পূরণে এগিয়ে আসেন নি। তিনি মনে করতেন, নিজের ভাষার আদলে অনুবাদ করাটাই হচ্ছে “অনুবাদকদের এক মৌলিক ভ্রান্তি।” স্বীকার্য যে আমাদের ভাষার অনুবাদকরাও এই ভ্রান্তির শিকার। বাংলা ভাষার কোনো অনুবাদকই ভাষার প্রশ্নে এই ‘ভ্রান্তি’ না-করার ঝুঁকি খুব একটা নিয়েছেন বলে মনে পড়ে না। অনুবাদকে স্বচ্ছ, প্রাঞ্জল এবং নিজের ভাষায় পুরোপুরি বোধগম্য করার চিন্তাই অনুবাদককে ভাষা নিয়ে খেলা বা ভাষার সৃষ্টিশীল বিকাশের ভাবনা থেকে বিরত রাখে। দুর্বোধ্য, অপাঠ্য, অস্বচ্ছ, অর্থহীন ও অপ্রাঞ্জল হয়ে ওঠার ঝুঁকির চেয়ে বরং ‘মৌলিক ভ্রান্তি’র প্রতিষ্ঠিত ও আরামদায়ক পথই আমাদের নিয়তি। তাছাড়া আমাদের ভাষায় ইংরেজী এবং মার্কিন সাহিত্য বাদে অন্য যে সব বিদেশী সাহিত্য অনুবাদ হয়েছে বা হচ্ছে তা মূলত ইংরেজী অনুবাদের ভিত্তিতেই আমাদের ভাষায় প্রবেশ করছে। ফলে, মূল ভাষার আদল ও অভিঘাত গ্রহণ করতে চাইলেও অনুবাদকের পক্ষে তা আর পেয়ে ওঠা সম্ভব নয়। ফলে, অনুবাদকদের কাছে রুডল্ফের যে প্রত্যাশা তা চিরকালই এক সোনার পাথরবাটি হিসেবেই থেকে যাবে। কারণ যখনই কোনো লেখক বিদেশী সাহিত্য অনুবাদ করেন তখন সেই অনুবাদে তাঁর ব্যক্তিত্বের ছাপ কোনো না কোনো ভাবে পড়বেই। উপরক্ত তাঁর নিজের ভাষারীতির প্রতি আনুগত্য তো আছেই। এসব নেতিবাচক দিক সত্ত্বেও অনুবাদ মৌলিক সাহিত্যচিন্তার ক্ষেত্রে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যে-কথা আমি প্রবন্ধের শুরুতেই দুটি অসামান্য সাহিত্য কীর্তির ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছি।

আমাদের ভাষাও দীর্ঘদিন থেকেই বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদ হয়ে আসছে। মূল আরবী ফার্সী, ফরাসী ইংরেজী এবং স্প্যানিশ থেকেও অনুবাদ হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তবে মূলত ইংরেজী অনুবাদই থেকেছে প্রধান নির্ভর। ইদানীং অনুবাদ প্রায় জোয়ারের রূপ ধারণ করেছে। কিন্তু আমাদের সৃষ্টিশীল লেখক সাহিত্য-সমালোচকরা এসব অনুবাদের গুরুত্ব বা গুরুত্বহীনতা সম্পর্কে মোটামুটি নির্বাক। অনুবাদ কোনো সৃজনশীল সাহিত্য ধারা নয়। অতএব তা গুরুত্বহীন — এই আদিম ধারণায় বন্দি থাকার ফলে বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদের প্রতি এক অবহেলা পোষণ করেন। আমরা এটা কখনোই বুঝতে চাইনি যে অনুবাদ হয়ে উঠতে পারে আমাদের মুখশ্রী দেখার এক বিশ্বস্ত আয়না। অনুবাদের মাধ্যমে বিদেশী সাহিত্যের যে মৌলিক ভাবনাগুলোর মুখোমুখি হচ্ছি তা নিয়ে আমাদের এখানে কোনো আলোচনা-বিতর্ক তৈরি হয় না। প্রতিভাবান বিদেশী লেখকদের মৌলিক রচনাগুলো আমাদের চিন্তাজগতকে কোনোভাবে আলোড়িত করছে বলে মনে হয় না। মোটামুটি কাছাকাছি সময়ের দু’একটি অনুবাদকর্মের উদাহরণ দিয়ে আমি বিষয়টি একটু পরিষ্কার করতে চাই। জি এইচ, হাবীর-এর অনুবাদে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস-এর নিঃসঙ্গতার একশ বছর বেরিয়েছিলো ফেব্র“য়ারি ২০০০ সালে। বইটি সাধারণ পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার পর এর আরও কয়েকটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে পরবর্তীতে। মূল স্প্যানিশ থেকে না হলেও হাবীবের এই বাংলা অনুবাদটি সত্যি এক অসামান্য কাজ। সাহিত্যকর্ম হিসেবে যেমন তেমনি অনুবাদ হিসেবেও এটি অনন্য। দন কিহোতের পর নিঃসঙ্গতার একশ বছর স্প্যানিশ সাহিত্যে সেই মহত্তম উপন্যাস যা সার্বিক বিবেচনায় সফলতার শীর্ষ ছুঁয়ে গেছে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, কল্পনা ও বাস্তবতার এক সমন্বিত বিস্ফোরণের নামই হচ্ছে নিঃসঙ্গতার একশ বছর। মারিও বার্গাস ইয়োসা একে অভিহিত করেছেন এক ’সামগ্রিক উপন্যাস’ (Novela Total) হিসেবে। কারণ এই উপন্যাসে মার্কেস সাহিত্যিক এবং জাতিগত ঐতিহ্য ও আধুনিকতা, স্থানিকতা ও সার্বজনীনতা, কাল্পনিকতা ও বাস্তবতাকে যুগপৎ ধারণ করেছেন। পাথিব জীবনের সকল স্তরে যা-কিছু ঘটে তার সামাগ্রিক রূপটিকেই যেন মার্কেস এই উপন্যাসে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। যে সাহিত্যকর্ম জীবনের এত কিছু আগলে ধরার চেষ্টা করে তার পক্ষে জটিল হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্যি যে নিঃসঙ্গতার একশ বছর বুদ্ধিমান ও নির্বোধ উভয় শ্রেণীর পাঠকের কাছেই হয়ে উঠেছে বোধগম্য এবং প্রবেশযোগ্য। জয়েস-এর ফিনেগানস ওয়েক বা ইউলিসিস কিংবা কমলকুমার মজুমদারের সাহিত্যকর্মের মতো এই উপন্যাস প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করে দেয় নি কেবল বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী পাঠকদের জন্য। মানবজীবনের প্রায় সব ধরনের প্রকাশের শিল্পিত রূপ হয়ে ওঠার কারণেই একে ‘সামগ্রিক উপন্যাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বার্গাগ ইয়োসা। আর কী সব অদ্ভুত ঘটনা ও চরিত্রে ঠাসা এই উপন্যাস: “হোসে আর্কাদি বুয়েন্দিয়ার মতো অসাধারণ কৌতূহলী উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন দুঃসাহসী ও বুদ্ধিমান চরিত্র, যে নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি খাটিয়েই আবিষ্কার করে ফেলে যে পৃথিবী গোল।” অন্য দিকে সারা দুনিয়া ঢুঁড়ে বেড়ানো বিদগ্ধ, রহস্যময় বেদে মেলকিয়াদিস” যিনি ঘোষণা করেন যে “সব জিনিসেরই নিজস্ব প্রাণ আছে, এ-হচ্ছে স্রেফ তাদের আত্মাকে জাগিয়ে তোলার ব্যাপার।” গভীর ও বিস্ময়কর অনুভূতির পাশাপাশি রয়েছে কৌতুকরসের মিহি ধারও। বিস্মৃতি-ব্যাধির কবলে পরে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া পরিচিত জিনিসের এক অভিধান রচনা করে বসেন। মার্কেস আসলে এই উপন্যাসের মাধ্যমে স্প্যানিশ সাহিত্যে মহাকাব্যিক উপন্যাস রচনার দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছেন।

অনুবাদের প্রভাব, প্রতিপত্তি ও গুরুত্ব প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে আমি কেন এই বইয়ের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব নিয়ে এই দীর্ঘ আলোচনা করছি? পাঠকদের কাছে যেটা বলতে চাচ্ছি তা হলো অনুবাদের মাধ্যমে আমরা বাংলা ভাষার এমন এক অসাধারণ উপন্যাস পেলেও তা নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় নি। এমনকি মূল স্প্যানিশ থেকে রফিক-উম-মুনীর চৌধুরীর অনুবাদে মার্কেসের সর্বশেষ উপন্যাস আমার দুঃখ ভারাতুর বেশ্যাদের স্মৃতিকথা ২০০৬ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হলেও এ নিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা বা প্রতিক্রিয়া আমাদের জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে বলে মনে পড়ে না। অথচ এটি উপন্যাস হিসেবে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অনুবাদ হিসেবেও এর অর্জন অসামান্য। সম্ভবত বাংলাদেশে এটিই প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ যা সরাসরি স্প্যানিশ থেকে বাংলায় অনূদিত হলো। স্প্যানিশ এবং বাংলা উভয় ভাষাতেই রফিকের দখল যে কতটা গভীর তার এক উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত এই অনুবাদগ্রন্থ। অনুবাদকর্ম মানে অনুবাদক এবং যে-ভাষায় অনূদিত হচ্ছে সে-ভাষার জন্য এক জটিল পরীক্ষা। অনুবাদকের জন্য পরীক্ষার ব্যাপারটি এই মুহূর্তে ব্যাখ্যার সূত্রে এই গ্রন্থের প্রধান এক চরিত্র বেশ্যার সর্দারনি রোসা কাবার্কাসের সংলাপের কথাই ধরা যাক। মূল স্প্যানিশে কিন্তু আঞ্চলিক ভাষার কোনো ব্যাবহার নেই। আমাদের দেশে অঞ্চল-ভেদে যেমন আঞ্চলিক ভাষা রয়েছে স্প্যানিশে সে ধরনের আঞ্চলিক ভাষা আছে বলে আমার জানা নেই। অঞ্চল-ভেদে পরিবর্তন যেটা রয়েছে তা আঞ্চলিক টান নয় বরং ভিন্ন প্রতিশব্দের ব্যবহার। একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা পরিষ্কার করা যেতে পারে। আমাদের দেশের হাটের মত একটা ব্যাপার মেহিকোতে আছে। সপ্তাহের নির্দিষ্ট একটা দিনে নির্দিষ্ট একটা অঞ্চলে এই হাট বসে। ওরা এই হাটকে বলে ‘ছব্রে রোয়েদাস’। মেহিকোর উত্তরাঞ্চলে সবাই ছব্রে রোয়েদাস বললেও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ একে চেনে ‘তিয়াঙ্গিস’ হিসেবে। কিংবা আপনি যদি কাউকে কৃপণ বলে চিহ্নিত করতে চান তাহলে বাহা কালিফোর্নিয়ার লোকজন ‘কদো’ শব্দটা ব্যবহার করবে। আবার অন্য অঞ্চলের লোকজন তাকে বলবে ‘তাকান্যো’ বা ‘পিওহো’। অর্থাৎ শব্দচয়নের ভিন্নতাই আঞ্চলিকতাকে চিহ্নিত করে, ক্রিয়াপদের আঞ্চলিক রূপ নয় যেটা আমাদের ভাষায় রয়েছে। কিন্তু রফিক যখন রোসা কাবার্কাস-এর সংলাপে আমাদের দেশের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করছেন (‘একবার জেলে ভইর‌্যা দিলে তিন বছর থাকতে হইব… হেইডার পয়সা কে দিব?”) তখন কি আমরা একে অনুবাদক হিসেবে তাঁর বিচ্যুতি বলবো, আমার মনে হয় তিনি ঠিক কাজটিই করেছেন। কারণ আমাদের ভাষায় রোসার মতো একটি চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে হলে এই আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার অনিবার্য।

রফিক এই ব্যাপারে সচেতন বলেই মূল ভাষায় না-থাকা সত্ত্বেও সাহসের সাথে তিনি বাংলা অনুবাদে আঞ্চলিক সংলাপ ব্যবহার করেছেন। সংলাপ ব্যবহারের এই মুন্সিয়ানা ছাড়াও রফিকের আরেকটি অর্জন মার্কেসের এই অসাধারণ উপন্যাসটির অনুবাদের সাফল্য। সাফল্য এই অর্থে যে অনুবাদ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোথাও হোঁচট খায়নি বা টলে যায়নি। এ প্রসঙ্গে ভাষার পরীক্ষার প্রশ্নটিও ব্যাখ্যা করতে চাই। মার্কেসের বইয়ের অনুবাদ পৃথিবীর নানান ভাষায় হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। কিন্তু সব ভাষাতেই যে তাঁর সাহিত্যকর্ম উৎরে গিয়েছে তা বলা যাবে না। ফরাসীর মতো বনেদী ভাষাতে মার্কেসের গ্রন্থের সাফল্য যে নেই তা স্বয়ং লেখকই আমাদের জানিয়েছেন তাঁর পেয়ারার সুবাস গ্রন্থে: “ফরাসী এবং ইতালীয় ভাষার অনুবাদকদের সঙ্গে আমি বেশ কিছুটা কাজ করেছি। দুটো অনুবাদই ভালো হয়েছে। তবু ফরাসীতে বইয়ের মেজাজ ঠিক আসে না, অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে।” অর্থাৎ সফল অনুবাদ সত্ত্বেও ফরাসী ভাষার মেজাজ এবং বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতার কারণেই বইটি তার সমগ্র প্রাণশক্তি নিয়ে হাজির হতে পারে নি। অন্য দিকে বাংলা ভাষার গ্রহণক্ষমতা আশ্চর্য রকমের সীমাহীন। মার্কেসের এ পর্যন্ত যতগুলো গ্রন্থের ভালো অনুবাদ বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে তা রচনার প্রাণশক্তি নিয়েই হাজির হতে পেরেছে। অথচ ভুলে গেলে চলবে না যে বাংলা ভাষা এবং স্প্যানিশ ভাষার বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। ভালো অনুবাদক বৈশিষ্ট্যের এই ভিন্নতা সম্পর্কে সচেতন থেকেই ভাষার গ্রহণ-ক্ষমতাকে বিস্তৃত করতে পারেন। জি. এইচ. ঘাবীব, রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী সেটা প্রমাণ করেছেন তাঁদের মার্কেস অনুবাদে। আমাদের আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ মার্কেস অনুবাদকের কথাও এ প্রসঙ্গে স্মরণ করতে চাই। তিনি খালিকুজ্জামান ইলিয়াস। ১৯৮৫ সালে খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের অনুবাদে যখন উত্তরাধিকার পত্রিকায় মার্কেসের পেয়ারার সুবাস প্রকাশিত হয় তখন মার্কেসের কথা বলার যাদুই শুধু নয়, একইভাবে মুগ্ধ হয়েছিলাম অনুবাদের দক্ষতায়। আলাপচারিতার ঘরোয়া মেজাজ এবং অন্তরঙ্গতা বাংলা অনুবাদে তিনি এতটাই বিশ্বস্ততার সাথে এনেছেন যে মনে হয় মার্কেস যেন বাংলা ভাষারই কোনো লেখক। পেয়ারার সুবাস ব্যক্তি এবং লেখক মার্কেসের বেড়ে ওঠার এক প্রাঞ্জল ও বিশ্বস্ত দলিল। আবার এটি একই সাথে ক্যারিবিয়া এবং লাতিন আমেরিকার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে বোঝার জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। আমরা যারা লেখালেখির সাথে জড়িত তাদের উচিত গুরুত্বপূর্ণ এইসব গ্রন্থের প্রতি আরো বেশি মনোযোগী হওয়া। বিদেশী লেখকদের কাছ থেকে লেখার কলাকৌশলগুলো শেখা মানে নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করা এবং নতুন সব উদ্ভাবনায় উদ্দীপ্ত হওয়া। ধন্যবাদ আমাদের অনুবাদকদের যারা আমাদের সামনে এই সুযোগকে উম্মুক্ত করে রেখেছেন।

সব শেষে আমি অনুবাদকদের সম্পর্কে বোর্হেসের প্রথাবিরোধী সেই ধারণাটি পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। অনুবাদ এবং অনুবাদকদের সম্পর্কে প্রথাবিরোধী ধারণাটির উৎস বোর্হেসের অসামান্য এক মৌলিক প্রবন্ধ: ‘এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ডের ধাঁধা’। বোর্হেস এই প্রবন্ধে ওমর খৈয়াম এবং তাঁর অনুবাদক ফিটজেরাল্ড সম্পর্কে আমাদেরকে প্রাচীন বিশ্বাস থেকে মুক্ত করেন এই বলে: “যে-কোনো যৌথ (Colaboration) কাজই রহস্যময়। এই ক্ষেত্রে একজন ইংরেজ এবং একজন ইরানীর মধ্যে সেটা ছিলো আরও বেশি। কারণ উভয়ই ছিলেন খুব ভিন্ন প্রকৃতির এবং জীবনে তাদের কোনো বন্ধুত্ব হয় নি। মৃত্যু, নিয়তির উত্থান-পতন এবং সময়ই একজনের সাথে আরেকজনের পরিচয় ঘটিয়েছিলো এবং উভয়ে মিলে পরিণত হয়েছিলেন একজন কবিতে।”

razualauddin@hotmail.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (8) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরজু — ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০০৯ @ ৫:৫২ অপরাহ্ন

      ‘দারাশুকো লিখছেন’। এতকাল দেখে আসছি ‘দারাশিকো’।

      -আরজু

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হোসেন মোফাজ্জল — ফেব্রুয়ারি ২০, ২০০৯ @ ৪:৩২ অপরাহ্ন

      রাজু আলাউদ্দিনের অনুবাদ নিয়ে লেখাটি পড়লাম। ভাল লাগল তবে কিছু বিষয়ে বলার দরকার আছে –

      এক.
      ১৭০৭ থেকে ১৭১৭ সালের মধ্যে জাঁ আন্তেনিও গালার…………………এবং এর পরের অনুচ্ছেদের অনেক তথ্য এমনকি সরাসরি লাইনও বোর্হেস কর্তার রচনা Translation of The Thousand and One Nights (Jeorge Luis Borges – Selection of Non Fictions – Penguin 1999) থেকে নেয়া। এক্ষেত্রে বোর্হেসের নাম রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখের আবশ্যকতা দেখি।

      দুই.
      উপরের লেখাতেই বোর্হেস স্যার রিচার্ড বার্টন সা’ বের অনুবাদটিকে অতখানি পাত্তা দেন নাই। তার মতে রিচার্ড সাহেব গালাকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিলেন ব¯ত্তত যদিও রিচার্ড সাহেব নিশ্চিহ্ন করেছিলেন সমগ্র আরবজাহানকে।

      তিন.
      অনুবাদ নিয়ে রবার্ট ফ্রস্টের যে মোলায়েম মার্কা কোটেশন আপনি উল্লেখ করেছেন ব্যাপারটা আসলে একটা হোক্স ছাড়া কিছুই না। ফ্রস্ট সা’ব কোথায় কখন এবং কী উপলক্ষে কথাটি বলেছিলেন বা কোন বইতে লিখেছিলেন তার কোনো হদিস এখনও কেউ জানে না। এমন কি ওয়েবের বাজারে ঘুরেও এর পাত্তা পাওয়া যায় না। তবে কোটেশনটা আছে! এবং কোটেশনটার কয়েকটা ভেরিয়েশনও বাজারে চালু আছে। যদিও কবিতা কী এই প্রসঙ্গেই এটা বলা। অনুবাদ বা কবিতার অনুবাদ নিয়ে নয়। এধরনের গায়েবি কোটেশন ব্যবহার করাটাতে একটা ঝুঁকি সব সময়ই থেকে যায়। এক্ষেতত্রে পরিহার করাটাই যথেষ্ট। তবে এ বিষয়ে আপনার কোনো তথ্য জানা থাকলে আশা করি জানাবেন।

      চার.
      রূপসী বাংলা বইটি জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। জাপানি অনুবাদক সেক্ষেত্রে জাপানের প্রচলিত উপকরণ এবং অনুষঙ্গের ব্যবহার করেছন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি সফলও হয়েছেন।

      পাঁচ.
      মেন্দোজা এবং মার্কেজের পেয়ারের সুবাস বইটি কবের থেকে কেবল মাত্র মার্কেজের হলো জানতে ইচ্ছে করে। অর্থলোভী মার্কেজ হয়তো টাকার লোভ ছাড়তে পারেন নাই!

      ছয়.
      জি এইচ হাবীবের অনূদিত মাকের্জের নিঃসঙ্গতার একশ বছর বইটি রিপ্রিন্ট বেরিয়েছে জেনে ভাল লাগল। মনে পড়ে ১৫-২০ বছর আগে কোনো এক লিটল ম্যাগাজিনে ফারুক আহমেদ (শেষ নামটি ভুলও হতে পারে!) ‘The Tale of Innocent Erendira and Her Heartless Grandmother’ বড় গল্পটি অনুবাদ করেছিলেন। চমৎকার হয়েছিল সেই অনুবাদটি।

      হোসেন মোফাজ্জল
      সিডনি
      hossain_mofazzal@ymail.com

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাসুদ খান — ফেব্রুয়ারি ২১, ২০০৯ @ ৫:৫৯ পূর্বাহ্ন

      তথ্যপূর্ণ ও বিশ্লেষণী একটি লেখা। অনুবাদ-সাহিত্যের গুরুত্ব, তার বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত ও অনুষঙ্গ উঠে এসেছে লেখাটিতে। ভালো লাগল। অনুবাদ-সম্পর্কিত নানা বিবেচনা ও ভাবনাসূত্র উন্মোচনের এই প্রয়াসের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ, কবি রাজু আলাউদ্দিন।

      – মাসুদ খান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজু আলাউদ্দিন — মার্চ ১১, ২০০৯ @ ১০:০২ পূর্বাহ্ন

      হোসেন মোফাজ্জল-এর প্রতি

      বিডিনিউজের আর্টস আমার প্রিয় পত্রিকাগুলোর একটি এই কারণে যে এতে লেখা প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নানান জনের মন্তব্য এবং অভিমত স্বাধীনভাবে প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এই সুযোগটির কেউ কেউ অপব্যবহার করেন। অপ-পাণ্ডিত্য এবং দিগভ্রান্ত বাচালতা দিয়ে।

      আমার বক্তব্যকে পরিষ্কার করার লক্ষ্যে আমি পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে আমার প্রবন্ধটির নাম ছিলো ‘অনুবাদ, আদর্শ ও অবহেলা’। আমি মোটামুটিভাবে যা বলতে চেয়েছি তা সংক্ষেপে এ রকম: অনুবাদ আদৌ কোনো সৃজনশীল কাজ কিনা, অনুবাদের ক্ষেত্রে আমরা কী আদর্শবোধ দ্বারা উদ্ধুদ্ধ হবো এবং সবশেষে ভালো অনুবাদ কর্মের প্রতি আমাদের নিরবতা…। অনুবাদ বিষয়ক আমার বক্তব্য শেষ করতে গিয়ে নানান গুণীজনের মত ও মন্তব্য আমার লেখায় বা বক্তব্যে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। আমি লেখাটির কোথাও এ দাবি নিয়ে হাজির হই নি যে এই প্রবন্ধের ধারণাবলী এবং মতামত আমিই প্রথম ক্রিস্তোবাল কোলন-এর মতো আবিষ্কার করেছি।

      হোসেন মোফাজ্জল সাহেব প্রবন্ধটির উদ্দেশ্য এবং বক্তব্য সম্পর্কে উদাসীন থেকেছেন। আমি কেন বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বক্তব্যের বা বিভিন্ন মতের উৎস স্বীকার করিনি এটাই তাঁর মাথাব্যাথার প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। সহস্র এক আরব্য রজনীর অনুবাদের গুরুত্ব এবং সুদূর-প্রসারী প্রভাবের কথা বলেছি এই প্রবন্ধের এক জায়গায়।

      যে কোনো পাঠক বুঝবেন আমি যা বলেছি তা ওহির মতো আমার উপর নাজেল হয় নি। নিশ্চয়ই কারো না কারোর লেখা পড়েই আমি এ কথা বলছি। কথাগুলো যে আমার নিজের নয়—তা বুদ্ধিমান পাঠকদের বোঝানোর জন্য নির্বোধের মতো প্রতিটি বাক্যের, বক্তব্যের এবং মতের উৎস নির্দেশ করে টিকা টিপ্পনীর উচু-নিচু দেয়াল তুলে দিতে হবে? আমি তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের মতো কোনো থিসিস লিখতে বসিনি যেখানে ঠিক ঠিক উৎস নির্দেশ পরীক্ষা পাশের জন্য আবশ্যকীয়। আমি তো অনুবাদ নিয়ে কোনো গবেষণা করতে বসিনি, আমি শুধু দেখাতে চেয়েছি অনুবাদ কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং অনুবাদের প্রতি আমাদের অন্যায় অবহেলা।

      সত্য বটে এই প্রবন্ধের কোনো কোনো বাক্যাংশ বিদেশী কোনো কোনো লেখকের রচনার অনুকরণ যেমনটি তিনি বোর্হেসের লেখাটি উল্লেখের মাধ্যমে জাহির করেছেন। আমি কেন রেফারেন্স হিসেবে বোর্হেসের উল্লেখ করিনি—এটাই তাঁর প্রধান অভিযোগ। আগেই বলেছি আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বা গবেষক নই বলে রেফারেন্স এবং টিকা-টিপ্পনী দিয়ে পাঠকের কাছে নিজেকে ভূয়োদর্শী পণ্ডিত হিসেবে এক হাস্যকর প্রাণী বানাতে চাই নি। যেখানে প্রাসঙ্গিক ভেবেছি দিয়েছি। যেমন, প্রবন্ধের শেষ উদ্ধৃতি বোর্হেসের লেখা থেকে এসেছে।

      এবার দেখা যাক তাঁর দ্বিতীয় অভিযোগটি। তিনি বলেছেন “উপরের লেখাতেই বোর্হেস স্যার রিচার্ড বার্টন সাবের অনুবাদটিকে অতখানি পাত্তা দেন নাই। তার মতে রিচার্ড সাহেব গালাকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিলেন, যদিও রিচার্ড সাহেব নিশ্চিহ্ন করেছিলেন সমগ্র আরবজাহানকে।” আমি ইংরেজী সংস্করণ থেকে এখানে প্রাসঙ্গিক অংশটুকু উদ্ধৃত করছি: “One of the secret aims of his work was the annihilation of another gentleman … that gentleman was Edward Lane … Lane translated against Galland, Burton against Lane. (Page -92)”

      বিদেশী ভাষা সম্পর্কে ভাসা ভাসা ধারণার কারণে স্বচ্ছ এবং সুনির্দিষ্ট ইংরেজী বাক্যের এমন ভুল তর্জমা করেছেন তিনি। এই লেখায় বোর্হেস বলতে চান নি যে বার্টন নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছেন গালাকে। ইংরেজী উদ্ধৃতিতে বলা হচ্ছে “তাঁর (অর্থাৎ বার্টন-এর) রচনার গোপন একটি লক্ষ্য ছিলো অন্য এক ভদ্রলোককে নিশ্চিহ্ন করা… সেই ভদ্রলোকটি ছিলেন এডওয়ার্ড লেন। লেন অনুবাদ করেছিলেন গালার বিরুদ্ধে, বার্টন লেন-এর বিরুদ্ধে।” বক্তব্যটি কি এ রকম নয় বাংলার অনুবাদ করলে?

      এবার তৃতীয় অভিযোগ: “অনুবাদ নিয়ে রবার্ট ফ্রস্টের যে মোলায়েম মার্কা কোটেশন আপনি উল্লেখ করেছেন ব্যাপারটা আসলে একটা হোক্স ছাড়া কিছু নয়। ফ্রস্ট সা’ব কোথায় কখন এবং কী উপলক্ষ্যে কথাটি বলেছেন বা কোন বইতে লিখেছিলেন তার কোন হদিস এখনও কেউ জানে না।”

      “কেউ জানে না” কথাটা ঠিক নয়, নিজের অজ্ঞতা দিয়ে সবাইকে ঢেকে ফেলার অপচেষ্টা না করে বইপত্র ঘাটলেই এর হদিস পাওয়া সম্ভব। সব কিছু ‘ওয়েব’-এ থাকে না আর ‘ওয়েব’-এ না থাকলেই তা ‘গায়েবি’ হয়ে যায় না।

      ওয়েব পতঙ্গদের অবগতির জন্য বলি, প্রবাদ-প্রতিম এই উদ্ধৃতিটি (Poetry is what gets lost in translation) লুইস আনটার্মেয়ার-এর Robert Frost : a Backword look গ্রন্থের (১৯৬৪ সালের সংস্করণ) ১৮ নং পৃষ্ঠায় আপনারা খুঁজে পাবেন। আর ফ্রস্টের এই উক্তি মোটেই ‘হোক্স’ নয়, এটি সত্য। এটা ‘গায়েবি’ নয়, এটা ক্যাঙ্গারুর মতোই সত্য। হ্যাঁ আমি তাঁর উক্তিটি অনুবাদ প্রসঙ্গে ব্যবহার করেছি, কিন্তু তাতে কি তাঁর এই বক্তব্য বদলে যাচ্ছে? কবিতা অনুবাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা প্রসঙ্গে কি এই বক্তব্য ব্যবহারে কোনো বাধা আছে?

      চতুর্থ অভিযোগে মোফাজ্জল সাহেব বলেছেন: “রূপসী বাংলা বইটি জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। জাপানি অনুবাদক সেক্ষেত্রে জাপানের প্রচলিত উপকরণ এবং অনুষঙ্গের ব্যবহার করেছন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি সফলও হয়েছেন।”

      এই কথা তিনি কীসের ভিত্তিতে আমাদেরকে বিশ্বাস করতে বলছেন আমি জানি না। তিনি কি জাপানি অনুবাদটি পড়েছেন? আমি পড়িনি কারণ আমি জাপানি জানি না। জানলেও, একথা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে রূপসী বাংলা স্থানিকতার (local color) দ্বারা এতটাই স্পৃষ্ট যে অন্য ভাষায় এর মূলের ব্যঞ্জনা ও শিহরণটুকু অনুবাদ করা প্রায় অসম্ভব। অনুবাদ কেবল এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় স্থানান্তর করার ব্যাপার নয়। সেটা যে নয়, সেই কারণেই অনুবাদ সৃষ্টির সহোদর। ভুলে গেলে চলবে না যে আমরা নিজের ভাষার কোনো কবিতা যখন পাঠ করি তখন সে কবিতার প্রতিটি শব্দ, শব্দ-বন্ধ, বাক্যাংশ কিংবা যে কোনো বাক্য আমাদের সংস্কৃতির সাংকেতিক চিহ্ন এবং স্মৃতিবাহিত আবেগে আমাদের উদ্দীপ্ত করে। আমরা ছোটবেলা থেকে এই সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠি বলে এইসব শব্দ বা বাক্যগুলো আমাদের অনুভূতির গভীরতম স্তরকে শিহরিত করে। ‘পরণ-কথা’ ‘বেহুলা’ ‘শ্যামার নরম গান’, ‘রামপ্রসাদের সেই শ্যামা’ ‘ভাসানের গান’, ‘চাঁদ সদাগর’ ‘মধুকর ডিঙা’ ‘সীতরাম রাজারাম রামনাথ রায়, ‘কঙ্কাবতী শঙ্খামালা’—এইসব পুরাণ, রূপকথা কিংবা গ্রামীণ উপকরণগুলো অন্য ভাষায় টিকা-টিপ্পনীসহ হাজির করলেই সফল অনুবাদ বলে গ্রাহ্য করা যাবে? জাপানি সংবেদনশীল পাঠক কি বাঙালী কোনো পাঠকের মতো একই ভাবে শিহরিত হবেন রূপসী বাংলা পাঠ করে?

      তবে, তাই বলে আমি অনুবাদের বিপক্ষে নই মোটেও।

      তিনি আরো অভিযোগ তুলেছেন আমি কেন পেয়ারার সুবাস বইটিকে মার্কেসের বলে উল্লেখ করেছি, কেন মেন্দোজার কথা বলিনি। সত্য বটে, বইটি মেন্দোজার কিন্তু ক’জন পাঠক মেন্দোজাকে চেনেন? মার্কেসের বললেই কি আমরা দ্রুত স্মরণ করতে পারি না।

      ষষ্ঠত: সরলা এরেন্দিরা অনুবাদ করেছিলেন ফারুক মেহেদী, ফারুক আহমেদ নন।

      ২.
      কবি মাসুদ খান-এর প্রতি

      প্রিয় কবি মাসুদ খান আমার এই প্রবন্ধটি সম্পর্কে সময় করে মন্তব্য করেছেন দেখে আমি আনন্দিত। প্রবন্ধটির ভাবনা এবং লক্ষ্য সম্পর্কে তাঁর সংবেদনশীল এবং সুগভীর মন্তব্য আমাকে আস্থা ফিরিয়ে দিয়েছে। তাঁর প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা।

      – রাজু আলাউদ্দিন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হোসেন মোফাজ্জল — মার্চ ১১, ২০০৯ @ ৬:১৬ অপরাহ্ন

      আমার মন্তব্য নিয়ে রাজু আলাউদ্দিনের এতখানি এগ্রেসিভ (না কি এক্সপ্লৌডেড!) হবার কিছু ছিল কি-না বুঝতে পারছি না। মুশকিল হচ্ছে রাজু আলাউদ্দিন বারবারই তাঁর লেখাটিতে যে সব অযুক্তি দিয়ে অন্য লেখকের সরাসরি রেফারেন্স না নেয়াটাকে জায়েজ করাতে চাচ্ছেন, তাতে এটা পরিষ্কার লেখাটা কিছুটা হলেও প্লেইজারিজমের দোষে যে আক্রান্ত তিনি সেটা ধরেও ধরতে পারছেন না।

      এটা সত্যি যে রাজু আলাউদ্দিনের পাণ্ডিত্য নিয়ে আমার নিজেরও কোনো সংশয় নেই! কিন্তু তাঁর লেখা পড়ে কি বোঝার উপায় আছে তিনি অপাণ্ডিত্য করতে বসেছেন। খালি থিসিস লেখলেই কি সব নিয়ম কানুন মেনে চলতে হবে অন্য সময় না। নাকি একজন পাঠক রাজু আলাউদ্দিন কি ভেবে লেখছেন সেটাও তাঁকে আগে বুঝে নিয়ে পড়তে বসতে হবে।

      কেপ্টেন বার্টনের অনুবাদ নিয়ে যে বিষয়টির উপর আমি ফোকাস দিতে চেয়েছিলাম, সেটা অনুবাদ কী ভাবে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার হতে পারে, কী ভাবে পুরো আরব জাতিকে একটা মাত্র অনুবাদ দিয়ে ভালগার জাতিতে পরিণত করে সে ব্যাপারটা বোঝাতে। এক্ষেত্রে গালা, লেইন এবং বার্টন কেউই বিশ্বস্ত না। কেউ ভণ্ড, কেউ বা ব্যবসায়ী আর কেউ বা বিগোটেড।

      ফ্রস্ট-এর কোটেশন নিয়ে আপনি যে তথ্য দিয়েছে সেটা সেকেন্ডারি রেফারেন্স। আমার আগ্রহ ছিল ফ্রস্ট সাহেব তার কোন লেখায় বা বক্তব্যে এই কোটেশনটা ব্যবহার করেছেন সেটা জানার।

      পেয়ারার সুবাস বইটিতে মেন্দোজার নাম না উল্লেখ করার যে কারণ দেখিয়েছেন সেটাও গ্রহণযোগ্য না কারণ আমপাবলিক মার্কেজ-এর নাম জানেন বলে আদি বইয়ের লেখকের নাম অর্ধেক করে ফেলবেন সেটা একটা বাজে দৃষ্টান্ত।

      ভাল থাকবেন।

      – হোসেন মোফাজ্জল

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন D.A.Toufique — আগস্ট ১৯, ২০১৫ @ ৯:৪৫ অপরাহ্ন

      ওয়াল্টার বেনজামিনের টাস্ক অফ দা ট্রান্সলেটর সম্পর্কে আরো বিস্তারিত লিখলে খুশি হব পরবর্তিতে। আর আমাদের দেশের ভালমানের কয়েকজন অনুবাদকের তালিকা দিবেন দয়া করে। ধন্যবাদ সুন্দর একটি গবেষনামূলক লিখনির জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আফসানা বেগম — সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৫ @ ১১:৩১ অপরাহ্ন

      অসাধারণ এক আলোচনা পড়লাম! অনুবাদ সম্পর্কে জমে থাকা বহু প্রশ্নের উত্তর মিলে গেল। অনুবাদের পথে এমন চমৎকার একটি দিক নির্দেশনাধর্মী লেখার জন্য রাজু আলাউদ্দিনকে ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com