রৌরব (কিস্তি ২)

লীসা গাজী | ৩০ জানুয়ারি ২০০৯ ১০:১৮ পূর্বাহ্ন

কিস্তি ১

(গত কিস্তির পর)

rourob-2a.jpgদোকানদার লোকটা এবার একটু কৌতূহলের সাথে ওকে লক্ষ্য করছে। কতো আজব পাবলিক যে আসে। এই বেটিরে মনে হইতেছে কার লগে যেন ফিসফিস কইরা কথা কয় আবার আতখা চমকাইয়া উঠে। মাথার ইস্ক্রুপ সব ঢিলা নাকি?

— আপা, আর কিছু লাগবে?

— আপা না ভাবি, ভাবি ডাকতেছিলেন। না আর কিছু লাগবে না।

লাভলী হালকা পায়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এলো। বেশ ফুরফুরে লাগছে। একটা কাজের মতো কাজ হয়েছে। বিউটি বিশ্বাসই করতে পারবে না। বাসায় গিয়ে খুব কায়দা করে ছুরিটা দেখাতে হবে ওকে। অবশ্য মহারানীর দরজা যদি খোলা থাকে তবেইসেন। খাবার সময় তো খুলবেই, তখনই দেখানো যাবে। এমনভাবে দেখাবে যেন ব্যাগের ভিতরে একটা ধারালো ছোরা থাকা কোনো ব্যাপারই না। গল্প করতে করতে আলগোছে বের করা।

চকিতে পিছন ফিরে তাকালো লাভলী, দোকানদার বেটা দোকান থেকে বের হয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। ঝট করে আবার মাথা ঘুরিয়ে নিলো লাভলী। এখান থেকে সরে পড়তে হবে, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব। কিন্তু কেন? ও তো অন্যায় কিছু করেনি। একটা নিষ্পাপ ছুরি কিনেছে মাত্র। আবার হাঁটার গতি স্বাভাবিক হয়ে এলো লাভলীর।

—————————————————————–
– আফা, ঐ যে একটুক দূরে বড় গাছটার ছেমায় একটা বেটা খাড়ায় আছে, হে আপনের লগে কথা কইতে চায়।

মেয়েটা কথা কয়টা বলতেই লাভলির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। বড় গাছটার ছেমায় নাকি একটা বেটা খাড়ায় আছে আর সেই বেটা নাকি ওর সঙ্গে কথা কইতে চায়, এর মানে কী? ওর সঙ্গে কেন কথা বলতে চাইবে! চকিতে লাভলী গাছটার দিকে তাকিয়ে আবার মাথা ঘুরিয়ে ফেললো। সে প্রায় কিছুই দেখতে পেলো না। গাছের পিছনে লোকটা গা ঢাকা দিয়ে আছে। শুধু লোকটার লাল রঙের মাফলার চোখে পড়লো।
—————————————————————-
ধীরে সুস্থে জায়গাটা পার হলো। নিউ মার্কেটের গেট দিয়ে বের হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, কী করবে এখন? মাথার লোকটা জীবনের প্রথম এক ধমক খেয়ে সত্যি সত্যি চুপ মেরে গেছে। এই মুহূর্তে একটা বুদ্ধির দরকার। কোথায় যাবে সে। বাসায় এতো তাড়াতাড়ি ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

ছুরিটাকে ঝোলা থেকে বের করে আরেকবার দেখতে খুব লোভ হলো। চেইন খুললো, ঝোলা থেকে বের হয়ে এলো ছুরিটা। প্লাস্টিকের মোড়কের ভিতর ছুরি, তারপর আবার একশ’ বত্রিশটা টেপ লাগানো। খেয়ে দেয়ে কোনো কাজ পায় না। প্লাস্টিক না এখন ব্যবহার করা নিষেধ। ছুরিটাকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখার জন্য হা পিত্যেশ করে উঠলো মন। টেনেটুনে প্লাস্টিকের মোড়কটার বারোটা বাজালো লাভলী। ছিঁড়ে ফেলে দিলো গাড়িপার্কের ড্রেনের ভিতর। ছুরিটা চলে এলো হাতে আর সাথে সাথে শীতের রোদের আদুরে তেজ মসৃণ স্টেনলেস স্টিলের গায়ে পিছল খেলো। আলোর বিচ্ছুরণ আতশবাজির মতো ছিটকে পড়লো লাভলীর চোখে মুখে। সে যে কী সুখ!

( — দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করবেন নাকি রমনা পার্কে যাবেন?)

যাবো যাবো, রমনা পার্কে যাবো। লোকটার কথায় চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছা করলো। এতো খুশি কি তার কখনও লেগেছে? হ্যাঁ লেগেছে। যেদিন রিয়াজ…

— এই যে ভাই যাবেন? রমনা পার্ক?

লাভলীর গলায় ফূর্তি নেচে ওঠে।

— যামু, মিটার থিকা দশ টেকা বাড়ায় দিয়েন।

— দিবো, দিবো, মিটার থিকা দশ টাকা বাড়ায় দিবো।

নিজেকেই নিজে চিনতে পারছে না লাভলী, চল্লিশ বছরের মনে আঠারো বছরের ছোপ।

সিএনজি ঘুরে ওর পায়ের সামনে এসে দাঁড়ালো। আরাম করে উঠে বসলো লাভলী, ঝোলাটা কোলের উপর রাখলো। তাহলে আসলেই রমনা পার্কে যাচ্ছে, এই জীবনে এও সম্ভব হবে কখনও কি তা ভেবেছিলো! কিন্তু কাপড়ের প্যাকেটটা? কাপড়ের প্যাকেটটা কই? চট করে আবার নেমে পড়ে ও। এদিক সেদিক খোঁজে, রাস্তায়, ঝোলার ভিতর, এমনকি এক নজরে ড্রেনটাও দেখে নেয়। না কোত্থাও নেই। ইশ, কোনো মানে হয়! এইজন্য এইজন্যই আম্মা কখনও একা ছাড়েন না। ছাড়ার উপযুক্ত হলেই না ছাড়বে! কিন্তু গেলো কোথায়? নিশ্চয়ই ছুরির দোকানে ফেলে এসেছে। ফিরে যাবে নাকি? দ্বিধায় পড়ে যায় লাভলী।

‘টোকান কী?’ সিএনজিওয়ালা জানতে চায়।

— একটা ছোট্ট প্যাকেট, কাপড়ের।

— মনে হয় দোকানেই ফালায় আসছেন। দোকানে গিয়া খোঁজ করেন, দামি কাপড় নাকি?

এরমধ্যে একজন ড্রাইভার এগিয়ে আসে, তার পিছনে আরেকজন। “কী হারাইছে? বিষয় কী?”

ছোকরা মতন একজন তৎক্ষণাৎ ফোড়ন কাটলো। “আমি দেখলাম এই আপায় একটা ছুরি ব্যাগ থিকা বার করলো, হেরপরে আকাশের পাইল তাকায় থাকলো।”

— ছুরিটা আছে নাকি গেছে?

— ছুরি যাইবো কই? ছুরি তো দেখলাম আবার ব্যাগে রাখলো।

ব্যাগ হারানো সংক্রান্ত এই জটিল জটলায় লাভলী অসহায় বোধ করে। ওর এখান থেকে ছুটে চলে যেতে ইচ্ছা করছে। কী আশ্চর্য, লোকটা ছুরির সাথে ওর একান্ত মুহূর্তটাও দেখে ফেলেছে। এখন ও কী করবে? ফিরে যাবে সেই দোকানে, গিয়ে দেখবে ওখানে ও সত্যিই প্যাকেটটা ফেলে এসেছে কিনা। অথবা রাস্তা পার হয়ে আবার চাঁদনী চকে ফিরে যেতে পারে এবং আবার কাপড়টা কিনতে পারে। একেবারে খালি হাতে বাসায় ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে না। আম্মার সেই চেনা ‘বলেছিলাম না’ টাইপ হাসিটা দেখতে ইচ্ছা করছে না একটুও। তাহলে কী আসলেই ওরা দুই বোন ফরিদা খানমকে ছাড়া কিছুই ঠিক মতো করতে পারে না। নাকি লাভলীই শুধু অচল। বিউটি হয়তো ওর মতো এতটা অপদার্থ না। বিউটি হয়তো ঠিকই কাপড় কিনে ঠিকঠাক মতো বাড়ি ফিরে যেতে পারতো।

লাভলী আবারও আতাপাতা করে আশপাশটা দেখলো। জটলার প্রতি জোড়া চোখ পরম ধার্মিকের মতো ওকে অনুসরণ করলো।

“আপা আর কতোক্ষণ খাড়ায়া থাকুম, গেলে চলেন!”

লাভলী হাল ছেড়ে দিলো। নিজেকে টেনেটুনে উঠে পড়লো সিএনজিতে। এতো শিঘ্রী রসভঙ্গ হওয়ায় কেউ কেউ খেদ ঝাড়লো সিএনজিওয়ালার উপর।

— আরে মিয়া আপারে খুজার টাইম দিবা না। আপা সিএনজি আরও পাইবেন, চিন্তা নিয়েন না।

লাভলী প্রায় দৌড়ে গিয়ে সিএনজিতে উঠে পড়ে। “এইখান থেকে চলেন, তাড়াতাড়ি।”

সিএনজিওয়ালা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। এই হঠাৎ তাড়া খাওয়ার কারণটা ধরতে পারলো না। স্টার্ট দিলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। চলতে শুরু করলো এবং সিএনজি চালক নিয়ম করে একটুক্ষণ পর পর সামনের আয়না দিয়ে পিছনের প্যাসেনজারকে দেখে নিচ্ছে। একবার চোখে চোখ পড়ে গেলো। দিবে নাকি একটা ভেংচি কেটে।

মাথার ভিতরের লোকটা খিকখিক শব্দে হাসতে শুরু করেছে। এই হাসির মানে কী? অসহ্য! হাসির শব্দ বাড়তে বাড়তে পুরো সিএনজির ভিতর ফেটে পড়লো। লাভলীর ভয় করলো, এই শব্দ সিএনজিয়ালা না শুনেই পারে না। বাইরের হর্ন, নিত্য চেঁচামেচি সব ছাপিয়ে বিশ্রী হাসিটা কান মাথা জ্বালিয়ে ফেললো।

“চুপ করো, আল্লার ওয়াস্তে একটু চুপ করো।” ও ফিসফিস করে বললো।

( — ঝোলার ভিতরটা দেখেন আপুমনি, মুহূর্তে দিলখুশ হয়ে যাবে।)

কথা শেষ হওয়ার আগেই কোলের উপর রাখা ঝোলার চেইন ঝটিতে খুলে ফেললো লাভলী। ভিতরে পানির বোতল, প্লাস্টিকে মোড়ানো ছুরি, কালো পার্স, হলুদ রঙের ডায়রি, একটা ছোট ছাতা গোলাপি রঙের। বড় মামা ব্যাংকক থেকে এনে দিয়েছিলেন সেই কত্তো বছর আগে। এই শীতকালে আম্মা যে কী মনে করে ছাতাটা ঝোলার ভিতর ভরে দিয়েছেন কে বলতে পারে।

( — উপরের জঞ্জাল সব সরান না, কী মুশকিল!)

হালকা ধমক খেয়ে ঝোলার ভিতর হাত ঢুকিয়ে দেয় লাভলী। ওমা দিব্যি সবকিছুর নিচে খয়েরি রঙের কাপড়ের প্যাকেটটা চুপ করে বসে আছে।

— ঝোলার ভিতর প্যাকেটটা আছে তুমি জানতা, তখন বলো নাই ক্যান?

( — বললে মজা দেখতো কে?)

এই উত্তরে রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেললো লাভলী। পাওয়া যে গেছে এতেই তার বত্রিশ পাটির দাঁত বের হয়ে যাচ্ছে। উফ কী বাঁচাটাই না বাঁচলো। নইলে বাসায় গিয়ে আম্মার চোদ্দশো পঞ্চাশটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হতো। আর এই প্রশ্নোত্তর পর্ব চলতো কম করে হলেও এক মাস।

* * *

না, এই মুহূর্তে বাসা বা আম্মা বা বিউটি, কোনো কিছু নিয়েই ও ভাবতে রাজি না। লাভলী কালো কার্ডিগেনের উপরের বোতাম দু’টা লাগালো আর শালটা ভালো করে জড়িয়ে নিলো। একটু শীত শীত লাগছে। সিএনজির দু’পাশ থেকে হু হু করে বাতাস ঢুকছে। সিটের ঠিক মাঝখানে ঘাড় গুঁজে বসে রইলো লাভলী, বক যেমন করে দুই ঘাড়ের মাঝখানে মাথা ডুবিয়ে দেয় সেইরকম। এই জগত-সংসার কোনো কিছুরই আর সাতে পাঁচে থাকতে চায় না ও। চল্লিশ বছর বয়সে আমাদের নবীজী নবুয়ত প্রাপ্ত হন। তার মানে খোদাতায়ালার দৃষ্টিতেও চল্লিশ বছরের একটা অন্য রকম মরতবা আছে। চল্লিশে বিশেষ কিছু ঘটবে, বিশেষ কিছু ঘটে।

এইসব তত্ত্ব কথা ভাবার সাথে সাথে লাভলী এও খেয়াল করলো যে আল্লাহতায়ালার নাম নিলেই ওর মনে অটোমেটিক আরবী আর উর্দু শব্দ এসে ভিড় করে। কেন কে জানে! মনে হয় আল্লাহ বাংলা শব্দ ততো পছন্দ করেন না আর এই খবরটা আমরা জানি। আজকে আবার ফযরের নামাযখানও পড়া হয় নাই। ঘুম থেকে উঠে চল্লিশ বছরের শরীরটাকে এতো ভারি লাগলো যে টেনে হিঁচড়ে বিছানা থেকে ওঠাতে পারলো না। ‘চার শূন্য চল্লিশ’ এই বোধ ওকে অনেকক্ষণ অসাড় করে রাখলো। কিন্তু তারপরও নামায ক্বাযা করা উচিৎ হয় নাই। এই জীবনে তো হলোই না, পরের জীবনটাও যদি ফসকে যায় সেটা কোনো কাজের কথা হবে না। রিয়াজ ছাড়া ওর জীবনে আর কোনো আলো বাতাস ঢোকে নাই।

আচ্ছা, আজ এতোদিন পরে হঠাৎ করে রিয়াজের কথা কেন মনে পড়ছে বারবার। রিয়াজ ওদের খালাতো ভাই। ছোটো খালার তিন ছেলে, সবচেয়ে বড় রিয়াজ। লাভলীদের বাসার কাছেই বিজ্ঞান কলেজে পড়তো সে। সবে তখন কলেজে পা দিয়েছে, নাকের নিচে হালকা সরু গোঁফের রেখা দেখা যায় কি যায় না। মাথা ভর্তি চুল, হালকা কোঁকড়া, ঘন ভ্রু, বাঁ চোখের কোণায় একটা কাটা দাগ। শুকনা, পলকা — কী যে আলাভোলা ছিলো দেখতে! কাটা দাগটা প্রায়ই ছুঁয়ে দেখতো লাভলী। খুব মায়া লাগতো। খালারা থাকতেন সেই পল্লবীতে। দুপুরে বাসায় গিয়ে খাওয়াটা তাই প্রশ্নের বাইরেই ছিলো।

খালাতো ভাই বা চাচাতো ভাই-বোনদের সাথে কখনোই খুব মাখামাখি ছিলো না ওদের। আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে ওরা খুব একটা যেতোও না, আর গেলেও মা-বাবার কাছ ঘেঁষে বসে থাকতো দুই বোন। বয়স পঁচিশ ছাব্বিশ পেরুবার পর মা গেলেও ওরা বাবার সাথে বাড়িতেই থাকতো। যদিও লাভলীর খুব ইচ্ছা হতো মা’র সঙ্গে যেতে। কতোবার যেতে চেয়েছে, যেহেতু বিউটি কোথাও যেতে চাইতো না, তাই বাধ্য হয়ে লাভলীকেও বাসায় থাকতে হতো। ততোদিনে ফরিদা খানম বেশ সহজভাবেই ওদের দুই বোনকে বাড়িতে রেখে যেতে পারতেন। আর তিনি বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই মুখলেস সাহেব গম্ভীর মুখে সামনের দরজা লক করে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতেন। ফরিদা খানম বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন, চাবি লাগাবার শব্দ কানে যাওয়ার পর ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যেতেন। এর অন্যথা কখনও হয় নাই। তার অনুপস্থিতিতে কেউ বাড়িতে এলে মুখলেস সাহেব চাবি খুলে তাদের ভিতরে আসতে দিতেন। চাবি সব সময় সাদা শার্টের পকেটে ভারি হয়ে ঝুলে থাকতো। শুধু তো আর একটা চাবি ছিলো না। গোটা দশেক চাবির তোড়া। সামনের দরজার চাবি, দোতালায় উঠবার সিঁড়ির গোড়ায় লোহার গ্রিলের চাবি, ছাদের চাবি, ওদের দুই বোনের শোবার ঘরের চাবি, দু’টা আলমারির চাবি, স্টোর রুমের চাবি, আরও কীসব হাবিজাবি চাবি। দুই সেট চাবি, এক সেট ফরিদা খানমের এক সেট মুখলেস সাহেবের।

সেই চোদ্দ বছর বয়সে চুরি করে ছাদে যাবার পর থেকে জীবন কতো পাল্টে গেলো। মনিপুরি পাড়ার বাড়ি তৈরি হলো, এই বাড়ি তৈরি না হওয়া অব্দি ওদের দুই বোনের ছিলো কঠিন বন্দিদশা। প্রথম দিকে স্বামী-স্ত্রী একসাথে বাইরে গেলে মেয়েদের বুয়াসুদ্ধো তালা মেরে যেতেন, কিন্তু তবুও দু’জনের কেউই শান্তি পেতেন না। কখনও অর্ধেক গিয়ে ফিরে আসতেন, আবার কখনও বা গেলেও ফিরে না আসা পর্যন্ত অস্থির বোধ করতেন। জীবনপণ করে এই বাড়ি শেষ করলেন কি করলেন না –উঠে এলেন এখানে। এখানে এসেও সেই আগের রুটিনে কঠিনভাবে বেঁধে দিলেন মেয়েদের। কিন্তু স্বস্তি নেই কোথাও। শেষমেশ এর একটা সমাধান খুঁজে পেলেন — মেয়েরা যেখানে যাবে না সেখানে স্বামী-স্ত্রী দু’জনের একসাথে যাওয়া চলবে না। এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি খুশি হলেন মুখলেস সাহেব। তার এমনিতেই কোথাও যেতে ইচ্ছা করে না। অফিস থেকে বাড়িতে আসার পর শোবার ঘরে বেতের চেয়ারে বসে টিভি দেখেন আর ঝিম মেরে থাকেন। রাতের খাবারের সময় ডাক পড়ে, সবার সাথে বসে ভাত খান, তাও প্রায় নিঃশব্দে। খাবার নিয়ে কখনওই কোনো উচ্চবাচ্য করেন না। পোলাও কোরমা যে নির্লিপ্ততায় খান বাসি ডাল ভাতও একই নির্লিপ্ততা নিয়ে খান। ফরিদা খানম একাই রাজ্যর কথা বলতে থাকেন। মেয়েরাও তখন কম যায় না। টিভির নাটকের চুলচেরা বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে বুয়ার কতোটা বাড় বেড়েছে সবই আলোচনার বিষয়বস্তু হয়। টিভি প্রসঙ্গে মুখলেস সাহেব অবশ্য কখনও সখনও তার মতামত ব্যক্ত করেন, তাও খুব একটা জোরের সঙ্গে না। কথাবার্তা সবচেয়ে বেশি তুঙ্গে ওঠে যখন আত্মীয় স্বজনদের গুষ্টি উদ্ধার করা হয়। সবার মন ভালো হয়ে যায় মুহূর্তে।

রিয়াজ আর বিউটি প্রায় ছয় মাসের ছোট বড়; আর লাভলীর চেয়ে রিয়াজ তিন বছরের ছোট। তাই একদিন দুপুরবেলা, কলেজ শুরু হওয়ার পর পরই ছোট খালার সাথে যখন রিয়াজ বাসায় এলো ফরিদা খানম তখন বেশ দরাজ গলাতেই তাকে মাঝেমধ্যে দুপুরে এসে খেয়ে যেতে বললেন। রিয়াজ দেখতে খুব ছোটখাটো ছিলো, বয়স তখন বোধহয় তার সতেরো কিন্তু দেখতে তেরো-চোদ্দ’র বেশি লাগতো না। আর লাভলীরা দুই বোনই বেশ লম্বা চওড়া। বিউটিকে তো মোটাই বলা যায়। সে কারণেই নাকি কে জানে ফরিদা খানমের মাথায় অন্য কোন চিন্তা আসে নাই। চিন্তা যে এলো না সেও এক অবাক করা ব্যাপার বটে। যে মানুষ তিলের মধ্যে তাল দেখেন সেই মানুষ ঘি আর আগুন নির্বিঘ্নে পাশাপাশি থাকার ব্যবস্থা করলেন। ফরিদা খানম বোধহয় তার সমগ্র জীবনে দুই মেয়েকে ঘিরে সেটাই সবচেয়ে কাঁচা কাজ করেছিলেন।

( — আর করলেন আজকে।)

বলেই একদম চুপ মেরে গেলো মাথার ভিতরের লোকটা। লাভলী মুখ ফসকে বলে ফেললো, মানে?

কিন্তু এর আর কোনো উত্তর পাওয়া গেলো না।

এখন লাভলীর ভাবতেও কী অদ্ভুত লাগে। এতো সাহস ওর কোথা থেকে এসেছিলো। আম্মা সুর করে বলতেন, ‘পীপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে!’ তাই তো, এছাড়া আর কী!

তখন থেকেই শুরু। কলেজের পর প্রায়ই হুটহাট করে রিয়াজ লাভলীদের বাসায় চলে আসতো, ভাত খেতো, দুই বোনকে বড় আপু আর ছোট আপু বলে ডাকতো, ওদের সাথে চুটিয়ে লুডু খেলতো। বিজ্ঞান কলেজে পড়তো সে আর দু’বোনের কাছে পাশের হলিক্রস কলেজের মেয়েদের গল্প করতো। লাভলী আর বিউটি রূপকথার গল্প শোনার মতো করে সেইসব গল্প শুধু শুনতো না গিলতো। বাইরের পৃথিবীর এইটুকু বাতাসের আশায় ওরা চাতক পাখির মতো রিয়াজের জন্য অপেক্ষা করতো। আম্মা কিছু মনে করতেন না, রিয়াজ আসলে বরং খুশিই হতেন। চট করে হয়তো বেগুন ভাজা করে দিতেন বা ডাল ভর্তা। লুডু খেলার সময় কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ পাতা আর টমেটো দিয়ে ঝাল মুড়ি বানিয়ে দিতেন। মাঝে মধ্যে আগ্রহ নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতেন।

কবে থেকে যে এই খেলার রঙ একটু একটু করে বদলাতে শুরু করলো এখন আর তা স্পষ্ট করে মনে পড়ে না লাভলীর। একদিন এক ভোরে ঘুম থেকে উঠেই সে আবিষ্কার করলো আজ রিয়াজ না আসলে ও মরেই যাবে। এই আবিষ্কারের আনন্দ আর ধাক্কা দুই-ই এতো প্রচণ্ড ছিলো যে, বোঝা মাত্র মাথার উপর কাঁথাটা টেনে দিয়ে মরার মতো পড়ে থাকলো আর বুকের ধ্বকধ্বক শব্দে কানে তালা লেগে গেলো। শরীর ম্যাজম্যাজ করছে এই অজুহাতে সারাটা দিন সেদিন বিছানাতেই কাটলো ওর। রিয়াজ যেন সেদিন না আসে সেজন্য দোয়া পড়তে পড়তে মুখে ফেনা তুলে ফেললো লাভলী আর মনে মনে মাথা কুটে মরলো যেন আসে!

ঘ্যাঁচ করে থেমে গেলো সিএনজি আর তার সাথে সাথে চিন্তার জট। থেমে যাওয়ার বদলে বরং হোঁচট খেলো বলা যায়। আর একটু হলে চিন্তার সাথে লাভলীর ঘাড়ে গোঁজা মাথাও সামনের লোহার গ্রিলে বাড়ি খেতো। যে গ্রিল ওকে আর সিএনজি চালককে একটা নিরাপদ বেষ্টনীতে ঘিরে রেখেছে, সেখানে আবার একটা ছোট তালা ঝুলছে।

( — ধ্যাঁৎ তেরি মাইরে বাপ! সরি আপুমনি। একটা গালি দিলাম। আপনের দিল দরিয়ায় রিয়াজ সাহেব তো ভালো রকম খাবি খাচ্ছেন। শালা, গরম জিনিসপত্র আসার আগেই পানি ঢাইলা দিলো। নামেন, নামেন পার্কের হাওয়া খান আর রিয়াজ সাহেবের কথা ভাবেন, আমিও শুনি ব্যাপার কতদূর গড়াইছিলো!)

–এই যে আপা, ঘুমান নাকি? আইসা পড়ছি… চোট লাগছে মনে হয়। গাড়ি চলার সুময় শক্ত কইরা বইসা থাকনের দরকার।

— না, না, ব্যথা লাগে নাই। ভাড়া কতো?

আসলে বেশ জোরেই বাড়ি লেগেছে লাভলীর। এখনও বাঁ হাতের তালু দিয়ে কপাল ঘষছে। এখনই হয়তো ফুলে আলু-টালু হয়ে যাবে। বিপদের উপর বিপদ। ফুলে গেলে তো বাসায় আরেক দফা জেরা শুরু হবে।

( — রিমান্ডেও নিতে পারে। ক্রস ফায়ারে মারাও যাইতে পারেন।)

–৮২ টেকা।

ইশ কপালটা টনটন করছে। মাথা ধরে যাবে এক্ষুনি। লাভলীর আছে ভয়াবহ মাথাব্যথা রোগ। একবার শুরু হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকতে হয়। এখন যদি ব্যথা শুরু হয়ে যায় কী করবে ও? রমনার খোলা ঘাসে চিৎপাৎ হয়ে শুয়ে পড়তে হবে, আর কী!

ধীরে সুস্থে ঝোলার চেইন খুললো লাভলী। পার্স বের করে ১০০ টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিলো।

— আপা নেন।

— কতো দিলেন?

— ১৫ টেকা।

— ১৫ টাকা কেন? মিটারে উঠছে ৭১ টাকা ৫০ পয়সা, আপনাকে ১০ টাকা বাড়ায় দেওয়ার কথা… বড় জোর নিবেন ৮২ টাকা, আপনে তো চাইলেনও সেইটাই। এখন আবার বেশি নিচ্ছেন কেন?

— তিন টেকা ভাংতি নাই।

— আমি বসে আছি আপনি যান ভাংতি নিয়া আসেন।

— ভাংতি কই পামু?

— ভাংতি কই পাবেন সেইটা তো আমার বিষয় না। আপনে যান।

( –খা খা খা বক্ষিলারে কাঁচা ধইরা খা!)

— চুপ!

— চুপ কারে কন?

— আমার মাথার ভিতরের লোকরে কই। যান, বইসা আছেন কেন, নিয়া আসেন।

সিএনজিওয়ালা মুহূর্তক্ষণ লাভলীর দিকে তাকিয়ে থাকে, মনস্থির করতে পারছে না ঝামেলা করবে নাকি করবে না। একটার মতো বাজে। দু’টার মধ্যে আরও অন্তত দু’টা খ্যাপ নিয়ে তারপর গাড়ি জমা দিয়ে খেতে যাবে। এর মধ্যে ঝামেলা করলে সময়টাই নষ্ট হবে আর কিছু না। এই মহিলাকে আজকে ঘাটানো ঠিক হবে না, একদম তেড়িয়া হয়ে আছে। কথা বলা মাত্র নখ বসাবে।

— আপা ধরেন, আরও পাছ টেকা ধরেন, নামেন। আমার দুই টেকার কাম নাই।

লাভলী খুশি মনে কুড়ি টাকা নিয়ে সিএনজি থেকে নামলো। নামা মাত্র শীতের রোদ ওর গা চুঁইয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। এতো আরাম, ওর ঘুম পেয়ে গেলো, মনে হলো চোখ বন্ধ করে অনন্তকাল দাঁড়িয়ে থাকে। আস্তে চোখ খুলে দেখলো সামনেই রমনা পার্কের বিশাল গেট। লোকটার পাল্লায় পড়ে শেষমেশ চলেই আসলো, এটা কি ঠিক হলো? এরকম জায়গায় একা তো দূরের কথা কারো সাথেই কখনও আসে নাই আগে। বিসমিল্লাহ বলে গেটের দিকে পা বাড়ালো লাভলী। ওড়না আর শালটা গায়ে ভালো করে জড়াতে গিয়ে উত্তুরে বাতাসে হাবুডুবু খেলো। তাহলে সুখ কী এই!

বিউটি আজকে ওকে দেখলে অবাক হয়ে যেতো। চিরদিনের ভীতু ভীতু মেয়েটার ইটচাপা ফ্যাকাশে সাহস আজ শীতের রোদে ডালপালা মেলেছে। শুধু ডানা দু’টা নাই এই যা আফসোস।

পার্কের গেট দিয়ে মাথা উঁচু করে সামনে এগোলো লাভলী, দু’পাশের বিশাল বিশাল আকাশ-কাতুরে গাছগুলি ছায়া দিচ্ছে। ছায়ার ফাঁক দিয়ে অনেক সাধ্য সাধনায় রোদ গলে ওর গায়ে পড়ছে। এমনিতেই আকাশের দিকে তাকিয়ে মাথাটা পিছনে হেলিয়ে দিলো লাভলী। টুপ করে একটা পাতা খসে পড়লো ওর মুখের উপর। অন্ধকার রাতে হঠাৎ যেমন তারা খসে পড়ে! খুব যত্নে ঝোলার চেইন খুলে পাতাটা ভিতরে রাখলো। কী গাছের পাতা কে জানে, গাছ টাছ সে একেবারেই চেনে না। এই গাছটা চিনতে পারলে ভালো হতো।

সোজা নাক বরাবর হাঁটছে লাভলী। অনেকটা পথ এসে একটু দূরের পুকুরটা চোখে পড়লো ওর, পুকুরের পাশে বেন্চ পাতা। বেশ বড় পুকুর, একেই কী দীঘি বলে! ঠিক করলো একটা বেঞ্চে গিয়ে চুপ করে বসে থাকবে। সারা দুপুর, সারা বিকাল, সারা সন্ধ্যা কাটিয়ে বাড়ি ফিরলে কেমন হবে?

( — কেমন হবে?… তৃতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হবে।)

লোকটার কথায় মজা পেলো। এলোমেলো পায়ে বেঞ্চের কাছে এগিয়ে গেলো, দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলো চারপাশে, আরাম করে হাত-পা ছড়িয়ে বসতেই ‘আহ্’ ধ্বনি বেরিয়ে এলো বুকের গহীন কুয়া থেকে। এরই মধ্যে জোড়া জোড়া মানুষের অসংলগ্ন মুহূর্ত চোখে পড়ছে। গাছের আড়াল থেকে একটা মেয়ের কচি হাসি ছিটকে ওর পায়ের কাছে এসে খানখান হয়ে ভেঙে পড়লো। নিঝুম বেঞ্চিতে বসে এই হাসির শব্দে ওর গায়ে কাঁটা ধরে যায়। এক অশরীরী অনুভূতি জাপটে ধরে। নির্জন দুপুর, দূরে কোথাও থেকে যানবাহন আর নাগরিক জীবনের অস্পষ্ট কোলাহল, এক-আধটা হাসির টুকরো-টাকরা, ভালোবাসার ফিসফাস উচ্চারণ, বাদাম-ওয়ালা আর আমড়া-ওয়ালার জবরদস্তি … এইসব কিছুকে ছাপিয়ে শীতের রোদের আরামটাই মুখ্য হয়ে ওঠে লাভলীর কাছে। এই বেঞ্চির উপর সটান হয়ে শুয়ে পড়লে কি খুব অদ্ভুত দেখাবে দৃশ্যটা। দূর থেকে কেউ দেখলে দেখবে, একটা পুরনো কাঠের বেঞ্চির উপর সাধারণ সাদাসিধা একজন মহিলা জলপাই রঙের লম্বা ঝুলওয়ালা জামা পড়ে শুয়ে আছে। ওর ডান পাশের বেণীটা বেঞ্চি থেকে ছলকে পড়ে প্রায় মাটি ছুঁই ছুঁই অবস্থা হয়েছে। কিন্তু শুয়ে থেকে থেকে ঘুমিয়ে যায় যদি, গভীর ঘুম। আর যদি না জাগে, বা জাগলেও এই পার্কটাকে যদি ভালোবেসে ফেলে ততোক্ষণে, তারপর আর যদি বাসায় ফিরে যেতে মন না চায়।

ঝটিতে ঝিমুনি ঝেড়ে ফেলে টানটান হয়ে বসলো লাভলী। কীসব আবোল তাবোল ভাবছে।

— আপা পানি খাইবেন।

বছর দশেকের একটা মেয়ের হাতে এনামেলের ছোট জগ আর একটা গ্লাস। এতোক্ষণ পিপাসা পাচ্ছিলো না কিন্তু পানি দেখার সাথে সাথে গলা পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ।

— হ্যাঁ, খাবো।

— এক গেলাশ পাঁছ টেকা।

— ঠিক আছে।

rourob-2b.jpgমেয়েটা কাঁপা হাতে গ্লাসে পানি ঢালে। এক চুমুকে পানিটা শেষ করে ফেলে লাভলী তারপর মেয়েটার দিকে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিয়ে আর এক গ্লাস পানি দিতে ইঙ্গিত করে।

— দুই গেলাশ খাইলে কিন্তুক দশ টেকা।

— জানি। তুমি আর এক গ্লাস দাও।

মেয়েটা খুশি হয়ে যায়, খুব আগ্রহভরে আরেক গ্লাস পানি ঢেলে লাভলীর দিকে বাড়িয়ে ধরে। গ্লাসটা হাতে নিতেই মেয়েটা একটা ছোট্ট লাফ দিয়ে বেঞ্চিতে উঠে বসে।

— দুফরে কিছু খাইবেন না আফা? আমার মায় খুব ভালা ডিম-পুলাও রান্ধে। রিকশাওয়ালা আর সিএনজিওয়ালারা মায়ের বান্ধা কাস্টমার। একজন ঠেলাওয়ালাও আসে, গফুর চাচা। রোজ দুইবেলা পিছনের গেইটে আমার মায় হাঁড়ি নিয়া বসে।

— তোমার নাম কী?

— লাবলী।

মেয়েটার উত্তরে লাভলীর হাত কেঁপে যায়, পানি ছলকে গড়িয়ে পড়ে। অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকে।

— কী নাম বললা?

— লাবলী।

— বয়স কতো?

— জানি না।

— তুমি রোজ পানি বিক্রি করো?

“হ। আফা আমি যাই, আমার মেলা কাম।” বলেই ছুট লাগায় মেয়েটা। তখনও পানির গ্লাস লাভলীর হাতে ধরা। কিছু দূর গিয়ে আবার জিহ্বায় কামড় দিয়ে ফিরে আসে। গ্লাস ফেরত নেয়, লাভলী ঝোলা থেকে পার্স বের করে ১৫ টাকা দেয়।

— আফা দশ টেকা তো।

— কিচ্ছু হবে না, তুমি এক ঘণ্টা পরে আবার আমার জন্য এক গ্লাস পানি নিয়ে আসবা। মনে থাকবে?

— হ থাকবো।

মেয়েটা চলে যেতেই লাভলী চঞ্চল বোধ করলো। কেমন মেয়েটার জীবন কে জানে। ওর নামে নাম। আচ্ছা, মেয়েটার কি কোনো বোন আছে, বোনটার নাম কি বিউটি? ইশ, জিজ্ঞেস করা হলো না। কী স্বাধীন মেয়েটা, সারাদিন বোধহয় পার্কে ঘুরে বেড়ায় আর খিদে পেলে মায়ের কাছে দৌড়ে গিয়ে ডিমপোলাও খায়। ওর জীবনটা তো এরকমও হতে পারতো। যাবে নাকি পিছনের গেটের দিকে, তারপর এক প্লেট ডিমপোলাও কিনে রিকশাওয়ালা আর সিএনজিওয়ালাদের পাশে বসে আরাম করে খাবে। ভাবছে আর হাসছে লাভলী, ফরিদা খানমের চেহারা মনে করে হাসির বেগটা বেড়ে যাচ্ছে ক্রমশ। এই মহিলা চাকর শ্রেণীর মানুষজনের সাথে মাখামাখি একদম বরদাস্ত করেন না। নিজের অবস্থান নিয়ে তার ধারণা খুবই স্পষ্ট। আর তার মেয়ে কিনা রিকশাওয়ালার পাশে বসে গপ গপ করে ডিমপোলাও খাবে!

হাসি বাড়তে বাড়তে বড় রকমের খাবি খায় লাভলি।

( — আপুমনি, কয়টা বাজে খবর আছে?)

— খবর নাই আর খবরের দরকারও নাই।

( — সত্যি লাভলি আপু, এতোদিন পরে, আমার মনের মতোন একখান কথা বললেন আপনে। তবে জানতে না চাইলেও বলি, এখন বাজে একটা দশ। আপনের কারফিউ শুরু হবে দুইটা থেকে। দুইটার পরে দেখা মাত্র গুলি।)

— ফালতু কথা বলবা না, আমার বয়স আজকে চল্লিশ হইছে, চল্লিশ মানে জানো? আজকে আমার ইচ্ছামতো আমি বাসায় ফিরবো।

( — হ্যাঁ, তা তো বটেই!)

আবার হেঁচকি তুলে হাসতে শুরু করেছে লোকটা। এই হাসির শব্দ মাথায় যাওয়া মাত্র লাভলীর মনটা টিনখোলা মুড়ির মতো মিইয়ে গেলো। কথা সত্যি, ওর বয়স একশো হলেও ও কি আর নিজের খুশিমতো বাড়ি ফিরতে পারবে। বরঞ্চ একা বাইরে যাবার সুযোগ ওকে আর কখনই দেয়া হবে না এই গ্যারান্টি চোখ বুজে দেয়া যায়।

( — আপুমনি একটা কথা বলি মন দিয়ে শুনেন। আপনে কি এখন বাসায় যেতে চান?)

— না।

( — এখনই যদি উঠেন তাইলেই যে বিপদ কাটানো যাবে তা বলা যায় না। দুইটার মধ্যে বাড়ি পৌঁছাইতে পারবেন ঠিকই কিন্তু এতোক্ষণ কী করছেন এই প্রশ্নের কোনো জুতসই উত্তর দিতে পারবেন বলে তো মনে হয় না। বাজার-সদাই কিছুই করেন নাই। আর যদি দেরি করেন তাইলে মোটামুটি ধরা যায় যে কর্ম সাবাড়, মানে আপনের বারোটা আজ বাজবে। আমি বলি কী, এক ঘণ্টা দেরি হইলেও যা হবে তিন ঘণ্টা দেরি করলেও তাই হবে… তাইলে আর এত ভাইবা লাভ কী! জীবনের মতো বার হইছেন, একটু হাওয়া বাতাস খান, গল্পগুজব করেন, তারপর ধীরে সুস্থে বাড়ি যান। না গেলেও কোনো ক্ষতি নাই।)

— গল্পগুজব করেন মানে? কার সাথে গল্পগুজব করবো?

( — আমার সাথে করতে পারেন, মজা পাবেন। আর সেইটা যদি না চান ডান দিকে তাকান, লাল কালো চেক লুঙ্গি আর ঘিয়া রঙের গেঞ্জি পরা এক লোক আরাম করে কান পরিষ্কার করাচ্ছে, আরামে চোখ বুজে আসতেছে, তাও তাকানে মাফ নাই। আমার তো মনে হয়, সে আপনের সাথে গল্পগুজব করতে খুবই আগ্রহী হবে।)

— আপা, বাদাম খাইবেন?

পিছন থেকে বাদামওয়ালা প্রায় ফিসফিস করে বললো। মুহূর্তের জন্য লাভলির মনে হলো মাথার ভিতরের লোকটাই বুঝি জিজ্ঞেস করছে। ঘটনা তা না বুঝতে পেরে ধীরে পিছন ফিরে দেখলো একটা ছোকরা মতো লোক বাদামের ঝুড়ি গলায় ঝুলিয়ে ঠিক ওর মাথার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। কতোক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে কে বলতে পারে। মাথার ভিতরের লোকটার সাথে এতোক্ষণ যে কথাবার্তা চলছিলো তাও নিশ্চয়ই সব শুনেছে… শুনুক। বাসায় যখন লোকটার সাথে কথা চালাচালি হয় তখন ব্রেনের মধ্যেই ঘটনা ঘটতে থাকে। বাইরে থেকে কেউ বুঝতেও পারে না যে লাভলী কারও সাথে আলাপে ব্যস্ত। সময় সময় একটু আনমনা দেখা যায়, এই যা। কিন্তু আজকে লাভলী হাওয়ায় ভাসছে। কাউকে তোয়াক্কা করছে না, দুই পয়সার পাত্তা দিচ্ছে না। ওর যদি ইচ্ছা হয় ও মাথার ভিতরের লোকটার সাথে চীৎকার করে কথা বলবে, দেখি ঠেকায় কে!

লাভলী বাদামওয়ালার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো, তারপর বললো, “হ্যাঁ খাবো।”

— পাঁচ টাকা ঠোঙ্গা।

এই পার্কে সব কিছুর দামই কি পাঁচ টাকা নাকি? ঠোঙ্গার সাইজ দেখে মনে হচ্ছে বাদামও ওকে দশ টাকার কিনতে হবে। খিদা লেগেছে। সেই সকালে লুচি আর অর্ধেকটা ডিম খেয়েছে। কবে হজম হয়ে গেছে! এখন বাসায় গেলে অবশ্য ইলিশ পোলাও, দই বেগুন আর হাঁসের ঝাল মাংস খাওয়া যাবে। সাথে থাকবে টমেটোর সালাদ। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ আর ধনে পাতা দিয়ে চটকে মাখানো। হাঁসের মাংস খাওয়ার জন্য লাল চালের ভাত। এই মেনুর কোনো মাফ নাই। ওদের দুই বোনের জন্মদিনে ফরিদা খানম প্রতি বছর ধর্মানুষ্ঠান পালনের একাগ্রতা নিয়ে এই মেনু রেঁধে চলেছেন। শুধু তাই না, খাওয়ার পর সুন্নত হিসাবে পায়েস আর হাতে বানানো দই। অবশ্য একবার বিউটির জন্মদিনে এই নিয়মের কিছুটা ব্যতিক্রম হয়েছিলো। হাঁসের মাংস রান্না হয় নাই। হাঁস বাজারে পাওয়া যায় নাই। ওদের বাড়ির কাছের কলমিলতা বাজারে তো পাওয়া যায়-ই নাই, মুখলেস সাহেব কাওরান বাজারে গিয়েও হাঁসের ব্যবস্থা করতে পারেন নাই। তিনি অত্যন্ত ব্যাজার মুখে বাড়ি ফিরে এই দুঃসংবাদ ফরিদা খানমকে জানান। ফরিদা খানম স্বজন হারানোর সমান শোক নিয়ে মেয়ের জন্মদিনের রান্নায় মন দেয়ার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত হাঁসের মাংসের বদলে গরুর গোশ ভূনা রান্না হয়, সাথে ছিলো চালের আটার রুটি। বিউটি আর লাভলিও ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে’ টাইপ মুখ নিয়ে খেতে বসে আর নিজেদের অজান্তেই অত্যন্ত তৃপ্তি নিয়ে গরুর গোশ আর চালের আটার রুটি খায়। বেচারা মুখলেস সাহেব একবার মনের ভুলে বলে ফেলেছিলেন, “ফরিদা, গরুর গোশও খারাপ লাগতেছে না। চালের রুটির সাথে ভালোই লাগতেছে।”

— কথার ছিরি দেখো! চালের রুটি আর গরুর গোশ হইলো ঈদের নাস্তা। হাঁস পাইলা না, কী রানমু আন্দাজ না পাইয়া রানলাম। এই মেয়েরা, আমারে খুশি করার জন্য শুধু গোশ আর রুটি খাওনের দরকার নাই, ইলিশ পোলাও দিয়া খাওয়া শেষ করো।

লাভলী দুই হাতের তেলোয় বাদাম ভাঙছে আর মুখে দিচ্ছে, একটু পর পর আঙুলের ডগা দিয়ে ঝাল লবণ জিহ্বায় ছোঁয়াচ্ছে। খুব ভালো লাগছে খেতে। বাসায় গিয়ে ইলিশ পোলাও খেতে হবে চিন্তা করে গা গুলিয়ে উঠলো লাভলির। অবশ্য এটা না বললে খুব অন্যায় হবে যে ফরিদা খানম রাঁধেন খুব ভালো। কিন্তু তবুও আর কাঁহাতক ইলিশ পোলাও খাওয়া যায়।

লাভলী গভীর মনোযোগে বাদাম খেয়ে যাচ্ছে। খেতে খেতে সে চারদিকটা মাথা ঘুরিয়ে দেখে নিলো। সেই কান চুলকানো লোকটা এখন পলক না ফেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কান মালিশওয়ালা দুই কান শেষ করে এখন লোকটার মাথা বানিয়ে দিচ্ছে। মাথা বানাতে গিয়ে যেভাবে ঘাড়-মাথা দাবড়াচ্ছে তাতে মনে হয় যেকোনো সময় অঘটন ঘটতে পারে, ঘাড় মটকে যেতে পারে। লোকটা আবার দেখি হাসেও, লাভলি চোখটা সরিয়ে নিলো।

— আফা, এই নেন আপনের পানি। ফুচকা খাইবেন?

লাবলী এক গ্লাস পানি হাতে ফিরে এসেছে। জগটা ওর হাতে আর নাই। তার বদলে বাঁ হাতের কব্জিতে তিনটা শিউলি ফুলের মালা দুলছে। শীতের বাতাস ভর করে শিউলি ফুলের গন্ধ লাভলির নাকে লাগে। সে আগ্রহ নিয়ে পানিটা শেষ করে।

— না ফুচকা খাবো না।

— আফনে বাড়িত যাইতেন না? বাড়ি কই?

— বাড়ি নাই।

— আফা, ঐ যে একটুক দূরে বড় গাছটার ছেমায় একটা বেটা খাড়ায় আছে, হে আপনের লগে কথা কইতে চায়।

মেয়েটা কথা কয়টা বলতেই লাভলির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। বড় গাছটার ছেমায় নাকি একটা বেটা খাড়ায় আছে আর সেই বেটা নাকি ওর সঙ্গে কথা কইতে চায়, এর মানে কী? ওর সঙ্গে কেন কথা বলতে চাইবে! চকিতে লাভলী গাছটার দিকে তাকিয়ে আবার মাথা ঘুরিয়ে ফেললো। সে প্রায় কিছুই দেখতে পেলো না। গাছের পিছনে লোকটা গা ঢাকা দিয়ে আছে। শুধু লোকটার লাল রঙের মাফলার চোখে পড়লো। বাতাসে মাফলারটা উড়ছে, গাছের আড়াল-টাড়াল মানছে না। লাভলী টের পেলো রাজ্যের কৌতূহল নিয়ে মেয়েটা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ও এখন কী বলবে; ও যে ভয় পেয়েছে এটা কোনোভাবেই প্রকাশ করা যাবে না। হয়তো ওর ঝোলাটার দিকেই সবার নজর। সেটা হলে কোনো ভয় নাই; ঝোলাটা ও চোখ বন্ধ করে দিয়ে দিতে পারে। অবশ্য ছুরিটা কায়দা করে রেখে দিতে হবে। ছুরি কেনার সুযোগ আর ও কোনো দিনই হয়তো পাবে না, হয়তো বলছে কেন, অবশ্যই আর কোনোদিনই পাবে না। সুতরাং ছুরিটা বাঁচাতে হবে। এখনই ঝোলা খুলে ছুরিটা বের করা যায় তারপর বেঞ্চের নিচে রেখে দেয়া যায় বা ছুরিটা রেখে তার উপর বসে থাকা যায় চুপচাপ। তারপর যখন লোকটা আসবে তখন নিশ্চিন্ত মনে ঝোলাটা তার হাতে তুলে দেবে। ‘মেঘ না চাইতেই জল’- টাইপ ব্যাপার হবে।
(কিস্তি ৩)

রচনাকাল: ২০০৮, লন্ডন

অলঙ্করণ: রনি আহম্মেদ

leesa@morphium.co.uk

free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com