কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

রাজু আলাউদ্দিন | ২৬ অক্টোবর ২০০৮ ১১:৪৫ অপরাহ্ন

almahmud.jpg
নাসির আলী মামুনের কবিতার জীবন (১৯৯৬, অপ্রকাশিত) প্রামাণ্য চিত্রের চিত্রগ্রহণকালে তিতাস নদীতে তোলা আল মাহমুদের (জন্ম: মোড়াইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ১৯৩৬) ছবি

[কবি আল মাহমুদের এই সাক্ষাৎকারটি আমি গ্রহণ করেছিলাম আজ থেকে নয় বছর আগে উনিশ শ’ নিরানব্বই সালের ১৪ জানুয়ারি বিকেল বেলায় মানবজমিন পত্রিকার কার্যালয়ে। সাক্ষাৎকারটি ট্রান্সক্রাইব করার আগেই আমি হঠাৎ করেই ঐ একই বছর দেশের বাইরে চলে যাওয়ার কাজটি শেষ করা হয়নি। যদিও ক্যাসেটে ধারণকৃত সাক্ষাৎকারটি আমার সঙ্গে ছিলো। নানান রকম ঝক্কি-ঝামেলার কারণে এটি ট্রান্সক্রাইব করেতে দেরি হয়ে গেছে। দেরিতে হলেও শেষ পর্যন্ত যে এর লিখিত রূপটি দাঁড় করানো গেল এতে আমি নিজেই বেশি আনন্দিত। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণের সময় লেখকবন্ধু মশিউল আলম এবং তৎকালে আমার সহকর্মী সিরাজুল ইসলাম কাদির সঙ্গে ছিলেন। — রাজু আলাউদ্দিন]

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজু আলাউদ্দিন

রাজু আলাউদ্দিন: মাহমুদ ভাই, আপনার একটা বই আছে যে ভাবে বেড়ে উঠি, সেখানে আপনি আপনার বংশ পরিচয়ের কথা বলেছেন। এই বই পড়ে জানতে পারলাম যে আপনার আদি পুরুষ বহিরাগত।

আল মাহমুদ: আমি আমার নয় পুরুষের নাম জানি। এঁদের আগমন সম্পর্কে যেটুকু জানি, আমাদের বাড়িতে একটা কুরসিনামা ছিলো। তা থেকে আমি জানি যে এঁরা বাইরে থেকে এসেছিলেন। এঁরা সব ধর্মপ্রচারক। দিল্লীতে এসেছিলেন। রাষ্ট্রীয় উত্থান-পতনে এঁরা নানান দিকে ছিটকে ছড়িয়ে পড়েছেন। এঁদের মধ্যে ধর্মপ্রবণ একজন ভাটি অঞ্চলে চলে আসেন। এখানে থেকেছেন। এদেশের সাথে মিশে গেছেন।
—————————————————————–
নজরুল যখন লিখলেন: ‘গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা,/ আম্মাগো পানি দাও ফেটে গেলো ছাতি মা,’ আশ্চর্য হয়ে গেলাম ‘আম্মা’ শব্দের ব্যবহার দেখে। এটা সম্ভব তাহলে। আমি চেষ্টা করলাম এর মধ্যে আমার অভ্যেস-আচরণ, আমার খাসলত — এটা প্রবেশ করানোর। আমার প্রথম কবিতা থেকেই এটা লক্ষ্য করা যাবে।
—————————————————————-
রাজু: আপনার বলার ধরন দেখে মনে হলো আপনি এতে বেশ শ্লাঘা বোধ করছেন।

মাহমুদ: না, আমি মোটেই শ্লাঘা বোধ করিনি। কারণ আমি মানব সমাজের ইতিহাস তো জানি।

রাজু: আপনি কি মুসলমান হিসেবে শ্লাঘা বোধ করেন না?

মাহমুদ: না মুসলমান হিসেবে করি। কিন্তু তুমি মুসলমান হিসেবে বংশলতিকার উপর নির্ভর করে দেখছ। মুসলমানরা কিন্তু এটাকে নাকচ করার জন্যই এখানে এসছেন।

রাজু: আমি আপনাকে এই প্রশ্নটা এই জন্যে করছি যে… যেমন হুমায়ুন আজাদ (আমার সাথে) এক ইন্ট্যার্ভ্যুতে বলেছেন, “আমার মুসলমান পরিচিতির কোনো দরকার নেই।”

মাহমুদ: আমার মনে হয় যে আমার সেই পরিচিতির দরকার আছে।

রাজু: মুসলমান হওয়াটা কোনো বাধা কিনা আন্তর্জাতিক বোধ অর্জন করার ক্ষেত্রে?

মাহমুদ: আমি তো কোনো বাধা দেখি না। পৃথিবীতে এখন প্রায় একশ’ বিশ কোটি মুসলমান বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে। এটা আন্তর্জাতিকতার বাধা কী করে হতে পারে? এত বড় একটা বিশ্বাস এত বড় করে ছড়িয়ে আছে, এটার একটা মূল্য তোমাকে দিতেই হবে। এটাও এক ধরনের আন্তর্জাতিকতা। আমি একজন মুসলমান, মরক্কোতে একজন মুসলমান আমার মতো, কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একজন মুসলমান আছে — এটাও তো পরস্পরকে জানার একটা আন্তর্জাতিকতা।

রাজু: হ্যাঁ, কিন্তু আপনার আন্তর্জাতিকতা বোধ তো কেবল মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এর বাইরে তো আপনি গেলেন না।

মাহমুদ: এটা কী ভাবে তুমি বলো? তুমি যদি আমার লেখা-টেখা পড়ে থাকো তাহলে দেখবে যে এরকম একটা বাধা আমি বা মুসলমানরা মানে — এটা কিন্তু ঠিক না। যেমন পবিত্র কোরানকে আমি আল্লার বাণী বলে মনে করি। তুমি যদি একটিবার মাত্র কোরান শরিফ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করো তাহলে তুমি দেখবে কোথাও বলা হয়নি “ও আরব। ও বাঙালী।” সব সময় বলা হয়েছে মানব সভ্যতা বা মানব সমাজ।

এই বইটি যখনই তুমি পড়বে মনে হবে বাইরে থেকে কেউ বলছে — এটা আমার বোধ, তোমার মনে নাও হতে পারে। মোটামুটি একজন পড়ুয়া লোক হিসেবে যখন আমি কোরান শরিফ পাঠ করেছি মনে হয়েছে কমান্ড-এর মতো বলছে। এটা না কোনো কবিতা না কোনো ভাষাগত আর্টের বই। এটার যেন কেমন একটা আলাদা ভয়েস। যখনই বলা হচ্ছে বাইরে থেকে বলা হচ্ছে, একটু উঁচু জায়গা থেকে বলা হচ্ছে। এবং আকাশ সম্পর্কে যখন বলা হচ্ছে তখন বলছে না ‘একটি আকাশ’, যখনই বলা হচ্ছে মনে হচ্ছে যেন অনেকগুলো আকাশ। আমি এই বই পড়েই তো মুসলমান। যে বই নিজেই এতটা আন্তর্জাতিক যে কোনো জাতরেখা মানছে না, কোনো দেয়াল স্বীকার করছে না এবং সমস্ত জাতিগত সম্প্রদায়গত দেয়াল ভেঙে সে প্রবেশ করতে চাচ্ছে।

রাজু: সেটা তো মাহমুদ ভাই, ক্লাসিক লিটারেচারের স্বভাবও এ রকম, সে তো ঐ গণ্ডিগুলো পেরিয়ে যেতে চায়। তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?

মাহমুদ: এখানে পার্থক্যটা ধরতে হবে। যখনই তুমি কোনো ধর্মগ্রন্থ পাঠ করো, যখনই তুমি বাইবেল পাঠ করো বা তালমুদ, তোরাহ্ বা কোরান পাঠ করো দেখবে যে সবগুলোর কোথায় যেন একটা দূর-সম্পর্ক রয়েছে।

রাজু: কিন্তু ঐটা তো আপনি বললেন না ঠিক কোথায় পার্থক্যটা ক্লাসিক লিটারেচারের সাথে?

মাহমুদ: একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। তুমি যদি বাইবেল পাঠ করো বা নিউ টেস্টামেন্টনিউ টেস্টামেন্ট কি কোনো ক্লাসিক্যাল কাব্য? তুমি যদি ওল্ড টেস্টামেন্ট পাঠ করো বা ‘সলোমনের গান’ তুমি দেখবে ক্লাসিক্যাল লিটারেচারের সাথে কোনো মিল নাই। কোথায় যেন আলাদা। এর ভাষাই যেন আলাদা। তারপর কোরান যদি পাঠ করো দেখবে তখন সামন্ত ব্যবস্থার শেষ, দাসপ্রথার উপর সামন্ততান্ত্রিক সমাজ দাঁড়িয়েছিলো, সে তখন এসে অত্যন্ত মৃদু ভাষায় বলছে দাসের সাথে তোমার কোনো পার্থক্য নাই আর তুমি যা খাও তাই তাকে খেতে দিতে হবে। এসব দাবি করছে। কিন্তু দাসপ্রথাকে একেবারে উচ্ছিন্ন করে নিয়েও যাচ্ছে না কারণ দাসপ্রথা ভেঙে পরলে পুরা সমাজই ভেঙে পরবে। তুমি যদি তখনকার অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং সামাজিক অবস্থা পাঠ করো তখন তুমি কোরানের ভয়েস খানিকটা বুঝতে পারবে।

রাজু: আমি ক্লাসিক্যাল লিটারেচার বলতে ধর্মগ্রন্থগুলো বোঝাতে চাচ্ছি না।

মাহমুদ: আমি তো বলছি ধর্মগ্রন্থগুলো ক্লাসিক্যাল লিটারেচার না। ক্লাসিক্যাল ধর্মগুলোর চরিত্র আলাদা।

রাজু: কিন্তু আপনি গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়ার যে অ্যাপিলিং চরিত্রের কথা বললেন সেটা তো ক্লাসিক্যাল লিটারেচারের মধ্যেও আছে। সে তার লোকাল বাউন্ডারি পেরিয়ে যেতে চায়।

মাহমুদ: যে-ক্লাসিক লিটারেচার ধর্ম-নির্ভর তাতে ধর্মের কিছু অনুভাব আসতে পারে। কিন্তু ধর্মগ্রন্থ এবং ক্লাসিক্যাল লিটারেচার সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জিনিস।

রাজু: সেই স্বাতন্ত্র্যটা কোন জায়গায়?

মাহমুদ: সবক্ষেত্রে। ধর্মগ্রন্থ তো নির্দেশ। যেমন ধরো, মুসা আলায়হে ওয়াসাল্লাম-এর টেন কমান্ডমেন্টস। লিটারেচারের সাথে এর মিল কোথায়? এটা তো মানব সমাজকে সভ্য করার কথা বলছে। এটা করিও না, ওটা করিও না। অন্য দিকে লিটারেচার হলো মানব সমাজের দুঃখকষ্টের কাহিনী, ভালোবাসার কাহিনী, যুদ্ধের কাহিনী, মানব-সংঘর্ষের কাহিনী। ধর্ম গ্রন্থ কি মানব-সংঘর্ষের কাহিনী?

মানবসমাজের যে-গতি যে-কালে মানব সমাজ পদচারণা করে চলে আসছে তার মোড়ে মোড়ে ধর্মগ্রন্থগুলো তাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছে। কোনো সময় কোনো নবীর উপর একটি আস্ত গ্রন্থ এসেছে, কোনো নবীর উপর আস্ত একটি ধর্মগ্রন্থ আসেনি, হয়তো কয়েকটা মাত্র নির্দেশ এসেছে। নবীরা মানব সমাজকে একটা সভ্যতার দিকে নিয়ে এসেছেন এবং সর্বশেষ আমরা যেটা পাই সেটা হলো পবিত্র কোরান। এটা এমন এক জায়গায় নাজেল হয়েছে যেখানে মানুষ একেবারে পশুস্তরে ছিলো। সেখানে অক্ষর-জ্ঞানহীন একজন লোকের উপর এটা নাজেল করা হয়েছে। শ্রুতিধর হিসেবে তিনি এটা ধরেছেন এবং তা মানুষের কাছে বলেছেন।

কোরান এসছে এই বাক্য দিয়ে: “ইকরা বিসমে রাব্বিকা আল… — আল্লাহর নামে পাঠ করো।” আর কোনো ধর্মগ্রন্থ পাঠের নির্দেশ দেয়নি। কারণ পাঠের শুরু হয়েছে সামন্ততন্ত্রের ধ্বংসের পর যখন ধনবাদের উত্থান ঘটছে। এবং কোরান কতটা সচেতন তা তুমি লক্ষ্য করবে ধনতন্ত্রকে নাকচ করার ধরনের মধ্যে। সে সুদকে হারাম করে দিচ্ছে। কারণ সুদ ছাড়া ধনতন্ত্র দাঁড়াতে পারে না।

রাজু: এখন এই মহাগ্রন্থ থেকে আপনার কাব্যগ্রন্থে চলে আসি। আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে লোকলোকান্তর তারপরে হচ্ছে কালের কলস, সোনালি কাবিন। এই বইগুলোর মধ্য দিয়ে আপনার যে কাব্য ব্যক্তিত্ব বা চরিত্র তৈরি হয়েছে পরবর্তীকালে তা ক্রমশ বদলে যাচ্ছে।

মাহমুদ: অবনতি ঘটছে বলে মনে করছ?

রাজু: না, না, আমি অবনতি বা উন্নতি বলছি না, বলছি বদলে যাচ্ছে। এই যে পরিবর্তন ঘটলো এর ক্ষেত্রে আপনার রাজনৈতিক মতাদর্শের পরিবর্তন একটা বড় উদ্দীপক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। এক সময় আপনি জাসদের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন।

মাহমুদ: আমি মার্কসিস্ট ছিলাম।

রাজু: হ্যাঁ, মার্কসবাদে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু পরে যে এই বিশ্বাস থেকে সরে এলেন, তার পেছনে কি ঐ ধর্মগ্রন্থই মূল কারণ ছিলো ?

মাহমুদ: সামগ্রিকভাবে ধর্মগ্রন্থই যে মূল কারণ তা আমি বলবো না। তবে ধর্মগ্রন্থ একটা বিরাট ব্যাপার ছিলো। তুমি তো জানো এবং বললে আমি রক্ষণশীল ধর্মের পরিবার থেকে এসেছি। খুব ছোট সময়ে আমার মধ্যে ধর্ম-প্রবণতা ছিলো। তবে ব্যাপারটা সহসাই ঘটেনি। পড়াশুনার মধ্য দিয়েই ঘটেছে। আমি যে শহরে জন্মেছি সে-শহরে তৎকালীন কম্যুনিস্টদের একটা লাইব্রেরি ছিলো ‘লালমোহন পাঠাগার’, সেই পাঠাগারেই আমি বস্তুতান্ত্রিক জগৎ সম্পর্কে একটা ধর্ম-দৃষ্টিভঙ্গীর বাইরেও যে একটা অন্য দৃষ্টিভঙ্গী আছে সেটার সাথে পরিচিত হই।

তখন আমার বয়স কম ছিলো। ক্লাস এইট নাইনে পড়ি। কবিতা লিখতে শুরু করি ক্লাস সেভেন থেকে। কবি হিসেবে আমি কখনো খুব সিরিয়াসলি আমার সমাজতান্ত্রিক ধারণা কাজে লাগাতে পেরেছি তা আমি বলবো না। খানিকটা হয়েছে, যেমন ধরো সোনালি কাবিন এবং আমার প্রথম দিককার কবিতা। রোমান্টিক চিন্তা-চেতনার মধ্য দিয়েই ঘটেছে। তবে কী হলে কবিতা হয় সেটা আমি ব্যাখ্যা করতে পারবো না। আমি কবিতা করে তোলার চেষ্টা করেছি। যদিও আমাদের ধর্মীয় পরিবার তবে আমাদের পরিবারে বাবা-চাচারা কাব্যচর্চা সঙ্গীত চর্চা তাদের যৌবন কালে শুরু করেছিলেন। তারা কাব্যপাঠ করতেন যদিও ধর্মীয় পরিবার হিসেবে খ্যাতি ছিলো। বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় বক্তৃতা করতে গেলে ফার্সি বয়াত আবৃত্তি করতেন। কাব্যপাঠের যে রীতি থেকে গেছে তা পরবর্তী প্রজন্ম গ্রহণ করেছে। রবীন্দ্রনাথের বই আমি ছোট সময়েই আমার বাড়িতে দেখেছি এবং যখন নজরুলকে নিয়ে বাংলায় হইচই পড়ে গেলো তখন নজরুলের অগ্নিবীণা আমি বাড়িতে দেখেছি। সওগাত, মাহে নও এসব পত্রিকা আমাদের বাড়িতে আসতো। একটা সাহিত্যের পরিবেশ আমাদের বাড়িতে ছিলো।

রাজু: আপনার সম্পর্কে বিভিন্ন জন লিখেছেন, নানা ভাবে মূল্যায়ন করেছেন। কিন্তু আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয় গোটা বাংলা সাহিত্যের মধ্যে বিভিন্ন প্রবণতা রয়েছে, এর মধ্যে আপনি কোথায় আলাদা?

মাহমুদ: আমাদের সাহিত্যে অখণ্ড বাংলা সাহিত্যে আধুনিক কালে মুসলমানদের সাহিত্যচর্চার প্রমাণ আমরা খুব কমই দেখেছি। আমার একটা চেষ্টা ছিলো এই যে… তখন ধর্ম নিয়ে যতটা না ভেবেছি তার চেয়ে বেশি ভেবেছি কবিতা নিয়ে। আমি যে শহরে জন্মেছি সেখানকার সাধারণ মানুষের অভ্যেস-আচরণ, প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা এবং ঘৃণা, তাদের লড়াই এবং সংগ্রাম এসব আমি কবিতায় আনার চেষ্টা করেছি। তখনকার আধুনিক সাহিত্য বলতে যা বুঝেছি তার মধ্যে মুসলমানদের অভ্যেস-আচরণ, প্রেম-ভালোবাসার কথা আমি কোনো বইয়ে পড়িনি। সব সময় আমার চেষ্টা ছিলো আমি যেমন ঠিক তেমনই লিখবো। মূলত আমরা তিরিশের কবিদের কবিতা পড়ে আধুনিকতার ধারণা পেয়েছি। এটা অস্বীকার করলে ঠিক হবে না। এর সাথে আমি আমার দেশপ্রেম, সমাজ, পরিবার, ধর্ম ইত্যাদি যুক্ত করেছি। আমি আমার পরিবেশ থেকে শব্দ ব্যবহার করেছি। এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেছি যা আগে ব্যবহার করেনি। ইচ্ছাকৃতভাবে যে করেনি তা নয়। সাহিত্যে স্ট্যান্ডার্ড-এর মধ্যে এই ধরনের শব্দ…

রাজু: প্রবেশ্য ছিলো না।

মাহমুদ: প্রবেশ্য ছিলো না। বা প্রবেশ্য ছিলো কিন্তু প্রবেশ করাননি। এটা শুরু হলো নজরুল থেকে। নজরুল যখন লিখলেন: ‘গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা,/ আম্মাগো পানি দাও ফেটে গেলো ছাতি মা,’ আশ্চর্য হয়ে গেলাম ‘আম্মা’ শব্দের ব্যবহার দেখে। এটা সম্ভব তাহলে। আমি চেষ্টা করলাম এর মধ্যে আমার অভ্যেস-আচরণ, আমার খাসলত — এটা প্রবেশ করানোর। আমার প্রথম কবিতা থেকেই এটা লক্ষ্য করা যাবে।

রাজু: আপনি শুধু শব্দ ব্যবহারের বৈশিষ্ট্যের কথা বলছেন। এর পাশাপাশি আরও কিছু ছিলো।

মাহমুদ: উপমা এবং ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আমি বলছি।

রাজু: কবিতার বিষয়-আশয় সম্পর্কেও কিছু বলেন। যেমন ধরেন আপনার সোনালি কাবিন-এ যৌনতা এবং সারল্যের মিশ্রণ লোকজ জীবনের প্রেক্ষিতে এটা তো সে সময় অভিনব। তিরিশের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যার কোনো মিল নেই।
—————————————————————–
আমি সব সময়ই বলে এসছি যে তিরিশের কবিরা প্রকৃতপক্ষে বাঙালী কবি নন; তারা বাংলা ভাষার ইউরোপীয়ান কবি। আমি যখন ইংরেজী কবিতা পড়ি বা ইউরোপীয় কবিতা পড়ি তখন দেখতে পাই তিরিশের কবিদের লিংকেজ তাদের সাথে।
—————————————————————-
মাহমুদ: তিরিশের কবিদের নিয়ে একটা তর্ক হয়েছে — কোলকাতাতেও এটা নিয়ে আমার সাথে তর্ক হয়ছে। তারা শঙ্কিত হয়েছে আমার মন্তব্যে। আমার মন্তব্য তারা যে পছন্দ করেছে তা নয়, তবে শুনেছে তারা। আমি সব সময়ই বলে এসছি যে তিরিশের কবিরা প্রকৃতপক্ষে বাঙালী কবি নন; তারা বাংলা ভাষার ইউরোপীয়ান কবি। আমি যখন ইংরেজী কবিতা পড়ি বা ইউরোপীয় কবিতা পড়ি তখন দেখতে পাই তিরিশের কবিদের লিংকেজ তাদের সাথে।

রাজু: আপনি জীবনানন্দ দাশের কথা মনে রেখেই এই কথা বলছেন।

মাহমুদ: হ্যাঁ, জীবনানন্দ দাশের কথাও মনে রেখে বলছি।

রাজু: আমার মনে হয় এখানে আপনার সঙ্গে অনেকেই একমত হবেন না।

মাহমুদ: আমার মনে হয় যদি ভালোভাবে জীবনানন্দকে পরীক্ষা করা হয় তাহলে অনেকেই আমার সাথে একমত হবেন।

রাজু: দু’একটা উদাহরণ দেবেন?

মাহমুদ: যদি সমসাময়িক ইংরেজী কবিতা পড়া থাকে তাহলে সহজেই ধরে ফেলা যাবে যে তিনি বাঙালী নন। যদিও তিনি দেশজ, স্থানিক সৌন্দর্য প্রস্ফূটিত করেছেন। জীবনানন্দ দাশের প্রথম বই ঝরা পালক — নজরুল দ্বারা আপ্লুত একজন কবি।

রাজু: এবং সত্যেন দত্ত…?

মাহমুদ: হ্যাঁ, ছন্দ-টন্দের দিক দিয়ে সত্যেন দত্ত। হঠাৎ এসে তিনি যখন বনলতা সেন লিখলেন — যদি আপনার অনেক পড়া থাকে — তাহলে দেখবেন ইউরোপীয় প্রভাব। যদিও জীবনানন্দ দাশ বড় কবি। তাঁর কবিতায় স্থানিক সৌন্দর্য বিভূষিত হয়ে আছে। কিন্তু তবুও অ্যালান পোর ‘ও হেলেন’ কবিতার কথা মনে পড়ে যাবে। তিনি ধারাবাহিকতার দ্বারা অগ্রসর হয়ে আসেননি। সাহিত্যের বিরাট পঠন-পাঠনের দ্বারা প্রাণিত হয়ে এ ধরনের কবিতা লিখেছেন। বাংলা কবিতায় এটা নিশ্চয় অভিনব সম্পদ। কিন্তু বাংলা ভাষার ইউরোপীয়ান কবি তিনি।
—————————————————————–
জীবনানন্দ দাশ বড় কবি। তাঁর কবিতায় স্থানিক সৌন্দর্য বিভূষিত হয়ে আছে। কিন্তু তবুও অ্যালান পোর ‘ও হেলেন’ কবিতার কথা মনে পড়ে যাবে। তিনি ধারাবাহিকতার দ্বারা অগ্রসর হয়ে আসেননি। সাহিত্যের বিরাট পঠন-পাঠনের দ্বারা প্রাণিত হয়ে এ ধরনের কবিতা লিখেছেন। বাংলা কবিতায় এটা নিশ্চয় অভিনব সম্পদ। কিন্তু বাংলা ভাষার ইউরোপীয়ান কবি তিনি।
—————————————————————-
রাজু: এটা মেনে নেয়া বেশ কঠিন। এটা সত্যি যে তাঁর মনঃগঠনে ইয়েটস এবং অ্যাডগার অ্যালান পো-র অবশ্যই অবদান আছে। কিন্তু তারপরেও এই সমস্ত কিছুকে অতিক্রম করে তিনি বাঙালী এই অর্থে যে আপনি তাঁর ঝরা পালক বাদ দেন, কিন্তু তাঁর ধূসর পাণ্ডলিপিতে লোকজ জীবন এবং সেটা কেবল বৃহত্তর বাংলার লোকজ জীবন নয় — বিশেষ করে আমাদের এই পূর্ববাংলা, একেবারে বরিশালের ঘ্রাণ পাওয়া যার। ‘বাসমতি চাল-ধোয়া কিশোরীর সাদা হাত’ কিংবা মনসার যে-উল্লেখ যে-ভাবে আসছে। আর রূপসী বাংলাতে সে তো দুর্মরভাবে বাঙালী।

মাহমুদ: যাই হোক এই প্রশ্নটা যখন তুলেছেন তখন আমি আপনাকে একটা কথা বলি। জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থটি তাঁর জীবৎকালে প্রকাশিত হয় নি।

রাজু: তা হয় নি।

মাহমুদ: এবং আমিই এটা প্রথম বলেছি যে জীবনানন্দ দাশ এটা বন্ধুদের ভয়ে বের করেননি। পাছে তাঁকে কেউ জসীমউদ্দিন বলে — এই ভয়ে জীবনানন্দ দাশ রূপসী বাংলার মতো অমর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেননি। খাটের নিচে লুকিয়ে রেখেছিলেন।

রাজু: সেটা হতে পারে। কিন্তু উনি যেই স্পিরিট থেকে লিখলেন সেই স্পিরিটটা তো সত্য।

মাহমুদ: আপনার এই কথা খানিকটা আমি মেনে নেই, কিন্তু সর্বক্ষেত্রে মেনে নেই না। একজন বিদেশীও বাংলা ভাষায় কবিতা লিখে অবদান রাখতে পারে। বুদ্ধদের বসু, সুধীন দত্ত, জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী — এঁরা সবাই একটা সময়ে অধ্যাপক ছিলেন। এবং ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। আপনি যে বলছেন জীবনানন্দ দাশ বরিশাল, শিশির মাখা এক স্তব্ধতার বর্ণনা ইত্যাদি ইত্যাদি — এটা তিনি পেলেন কোথায়? এটা কি তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবনা? ইয়েটস-এর কবিতায় আয়ারল্যান্ডের যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তা দ্বারা তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এ কথাটা গ্রাহ্য করাতে যে প্রবন্ধ লেখা দরকার সেটা আমি কখনোই লিখতে যাবো না। আপনি খোলাখুলি জানতে চেয়েছেন। আমার খোলাখুলি জবাব হলো, জীবনানন্দ দাশ ইংরেজী সাহিত্যের ভালো ছাত্র, ইংরেজী সাহিত্যের দ্বারা দারুণভাবে শিক্ষিত একজন লোক যিনি ইংরেজী ভাষার চর্চার মধ্য থেকে বাংলা কবিতায় আধুনিকতার সঞ্চার করেছেন।

রাজু: আমি বুঝতে পারছি না মাহমুদ ভাই, আপনি কেন তাঁকে বারবার ইউরোপীয়ান করার চেষ্টা করছেন।

মাহমুদ: ইউরোপীয়ান করার তো চেষ্টা করিনি। আমি বলছি যে তিনি বাংলা ভাষার একজন বড় কবি কিন্তু মানস গঠনে বাঙালী বৈশিষ্ট্য অপেক্ষাকৃত কম।

রাজু: আমার তো মনে হয় তাঁর মধ্যেই সবচেয়ে প্রবলভাবে আছে। এই পর্যন্ত আপনার কবিতায় এই অঞ্চলের লোকজ-জীবন, ভূদৃশ্য — ভূদৃশ্য অবশ্য আপনার কবিতায় তেমন ভাবে নাই, লোকজ-জীবন আছে; কিন্তু জীবনানন্দ দাশে এই অঞ্চলের ভূদৃশ্য এবং লোকজ জীবনের কাব্যময় উপস্থাপন অনেক বেশি পাওয়া যাবে। আপনার এই কথাবার্তা থেকে গুয়াতেমালার এক লেখকের মন্তব্য মনে পড়ে যাচ্ছে। মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াস বোর্হেস-এর বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছিলেন তিনি ইউরোপীয় ঘরানার লেখক। আমার মনে হয় এটা আস্তুরিয়াসের বিভ্রান্তি। আপনিও জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে একই রকম বিভ্রান্তিকর মূল্যায়ন করছেন।

মাহমুদ: আমি যেটা ভাবি সেটা আমি বলেছি। আমি নিজে জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যের, কাব্যের এবং তাঁর উপন্যাসের খুবই ভক্ত পাঠক। ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে খুব বড় কবি মনে করি। কোথায় যেন এক ইন্টারভ্যুতে তাঁকে মহাকবিও বলেছি।

রাজু: আমার মনে হয় ব্যাপারটা এ রকমও তো হতে পারে যে ঐ প্রবণতাগুলো তাঁর মধ্যে আগে থেকেই ছিলো, ইয়েটস এবং অ্যালান পো পড়ার পর ওনার কনফিডেন্স আরো বেড়েছে।

মাহমুদ: হতে পারে।

রাজু: কিন্তু এটা কখনো সম্ভব হতে পারে না যে একজন বিদেশী কবির দ্বারা প্রাণিত হয়ে একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য অর্জন করবে। কোনো কবির ক্ষেত্রে এটা সম্ভব নয়। প্রবণতাগুলো আগেই থাকতে হয়।

মাহমুদ: কিন্তু তাঁর ঝরা পালক পড়ে কি সেটা মনে হয়?

রাজু: ঝরা পালক তো, মাহমুদ ভাই বাদ দেয়া হচ্ছে, ওটাকে তো খারিজ করেই দিচ্ছেন। কিন্তু তাঁর ধূসর পাণ্ডুলিপি, বনলতা সেন কিংবা তার পরবর্তী কবিতাতেও যখন তিনি অনেক বেশি রাজনীতি ও সমাজ সচেতন হয়ে উঠছেন সেখানেও ঐ লোকাল কালার আছে।

মাহমুদ: তাঁর সমস্ত কবিতাতেই স্থানিক সৌন্দর্য আরোপিত হয়েছে।

রাজু: ‘আরোপিত হয়েছে’ বলছেন কেন?

মাহমুদ: তিনি দিয়েছেন; তিনি দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু তার প্রেরণা পেয়েছেন ইউরোপ থেকে।

রাজু: অনুপ্রেরণা মানে ঐ অর্থে — তাঁর কনফিডেন্স বাড়িয়ে দেয়া।

মাহমুদ: যে-কোনো অর্থেই হোক কিন্তু অনুপ্রেরণা পেয়েছেন পাশ্চাত্য থেকে। এবং কবিতার স্থানিক সৌন্দর্যের জোরে তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। আমি যেটা বলতে চেয়েছি তা হলো মনঃগঠনে মানসগঠনে জীবনানন্দ দাশ ইউরোপীয় কবিতার দ্বারা অনুপ্রাণিত। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন, মাইকেলও অনুপ্রাণিত ছিলেন। দোষটা কী? আমি শুধু সত্যটা বললাম।

রাজু: জীবনানন্দ দাশের কবিতায় দোষের কিছু কিংবা বলা যাক এমন কিছু আছে কিনা যা আপনাকে ডিস্টার্ব করে?

মাহমুদ: তেমন কিছু আমাকে ডিস্টার্ব করে না, সবই মধুর। তবে জীবনানন্দ দাশের মধ্যে একটা না-বাচক বিষয় আছে। তিনি হ্যাঁ-এর কবি নন।

রাজু: আমার মনে হয় এটা ঠিকই আছে। এটা আমি নিজে ফিল করি যে এই বিশ্বজগত বা মানুষের সভ্যতা সমস্ত কিছু সম্পর্কে যদি সত্যি সত্যি গভীরভাবে জানা যায় তাহলে আশাবাদী হওয়ার মতো আসলে খুব কম কিছু আছে। দেখেন, সেই আদিম যুগ থেকে মানুষ মানুষকে মারা শুরু করেছে এবং তা এখনও চলছে। আপনি আশাবাদী কী করে হবেন? এখনও জাতি-বিদ্বেষ আছে। মানুষ নানান রকম আবিষ্কার-উদ্ভাবন করেছে কিন্তু পরস্পরের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ এখনও ত্যাগ করতে পারেনি। তাহলে আশাবাদী হওয়ার কী আছে, মাহমুদ ভাই?

মাহমুদ: এইসব বিষয় একজন কবিকে যদি না-বাচক কবিতা লিখতে অনুপ্রাণিত করে তাকে আমি দোষণীয় ব্যাপার বলছি না। আমি শুধু বলছি যে জীবনানন্দ দাশের কবিতার একটা বৈশিষ্ট্য হলো তিনি আশাবাদী নন, তিনি একজন না-বাদী।

রাজু: আপনার সমকালের, আরও পরবর্তী লেখকদের প্রবণতা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।

মাহমুদ: খোলাখুলিই বলেন।

রাজু: খোলাখুলি মানে আপনাকে মুগ্ধ করতে পারে বা অভিভূত করতে পারে এ রকম লেখক কি আপনি পেয়েছেন?

মাহমুদ: অখণ্ড বাংলা কবিতায় তিরিশের পরবর্তী কবি হলাম আমরা। চল্লিশের দশকের কবিদের আমি ধরি না খুব একটা।

রাজু: চল্লিশের কবি আহসান হাবীব কিংবা আবুল হোসেন — এদেরকে আপনি ধরছেন না কেন? কিংবা ফররুখ আহমদ?

মাহমুদ: ফররুখ আহমদের কথাই বলতে চাচ্ছিলাম। চল্লিশ দশকের দু’জন কবিকে খুব ইমপোর্টেন্ট মনে করি আমি। একজন হলেন ফররুখ আহমদ আরেকজন হলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। আরেকজন হলেন — আমি বলি মঙ্গলাচরণ (চট্টোপাধ্যায়?) এই কয়েকজন কবিকে আমি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। কিন্তু বিচার যেটা হবে, তাদের বিচার হবে তিরিশের সাথে।

রাজু: সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন? ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব বা আবুল হোসেনের তুলনায়?

মাহমুদ: বাংলা ভাষার প্রথম শ্লোগানমুখর কবিতা লিখতে শুরু করলেন, যেটা বিষ্ণু দে’রা পারলেন না মার্কসিস্ট হওয়া সত্ত্বেও। সুভাষ মুখোপাধ্যায় এসে সে সময় লাল ইশতেহার ছুঁড়ে দিলেন বাংলা কাব্যে। আর তারই অপজিট কাজ করলেন ফররুখ আহমদ, তাঁর কবিতাকে একদম ঘুরিয়ে নিয়ে আসলেন সাত সাগরের মাঝিতে যেখানে সিন্দাবাদ, হাতেম তাঈ, ধর্মীয় অনুষঙ্গ, ঐতিহ্যের প্রতি প্রীতি, ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি প্রীতি। একই সময়ে দুই কবি দুই ধারার দুই নিশান উড়িয়ে দিলেন। পঞ্চাশ দশকে এসে দুই বাংলার কবিরা বুঝলো যে তিরিশের স্টাইলের বাইরে অন্যভাবেও কবিতা লেখা যায়। যেমন পশ্চিমবঙ্গে শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমাদের এখানে শামসুর রাহমান, আমিও যৎসামান্য লিখেছি। পঞ্চাশে এসে বাংলা কবিতা সম্পূর্ণ আলাদা চরিত্র ধারণ করলো এবং আমি তার একজন অংশীদার।

রাজু: এর পরের দশক যেমন ষাট সত্তর…?

মাহমুদ: ষাটের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কবি রয়েছেন। আমি তাঁদের নাম উচ্চারণ করতে চাই না।

রাজু: নাম উচ্চারণ করতে চান না কেন?

মাহমুদ: নাম উচ্চারণ করতে চাই না এই জন্যে যে তাঁরা এখনও লিখছেন।

রাজু: সুভাষ মুখোপাধ্যায় তো এখনও লিখছেন, তাঁর নাম তো উচ্চারণ করলেন। [সুভাষ মুখোপাধ্যায় তখনও বেঁচে আছেন। — বি. স.]

মাহমুদ: সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে। ফররুখ ভাইয়েরও কাজ শেষ হয়েছে। পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, আশি এবং নব্বই দশক — এরা সবাই একই হাওয়ার নিঃশ্বাস নিচ্ছেন — এবং একই সমাজের বাসিন্দা।

রাজু: এখন যাদের কাজ শেষ হয়নি কিন্তু ইতিমধ্যে যে-টুকু কাজ করেছেন সে সম্পর্কে কি আপনি বলতে পারবেন না?

মাহমুদ: হ্যাঁ, আমরা আলোচনা করতে পারি। আমি তো বলছি যে ষাটের অনেকের কবিতা আমার ভালো লাগে আবার অনেকে থেমে গেছেন। অনেকে আবার যেখানে শুরু সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন।

রাজু: আপনি নাম বলতে চাচ্ছেন না?

মাহমুদ: বলতে চাচ্ছি না তা নয়, আপনি সুনির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন করলে অবশ্যই আমি জবাব দেবো।

রাজু: আমি আপনার পছন্দ জানতে চাচ্ছি, আমি আসলে আমার পছন্দ চাপিয়ে দিয়ে আপনার কাছ থেকে জানতে চাচ্ছি না।

মাহমুদ: সামগ্রিকভাবে ষাটের কবিতা সম্পর্কে আমি বলতে পারি কিন্তু কোনো ব্যক্তিবিশেষ সম্পর্কে আমি বলতে চাই না।

রাজু: কারণ কী, বললে কী সমস্যা?

মাহমুদ: সমস্যা হলো… কবিদের সম্পর্কে কে-ই-বা বলতে চায়। আপনি দেখেন অনেকই বলেন না।

২.
রাজু: ঠিক আছে। আপনার সম্পর্কে ভুল বা সঠিক যেটাই হোক না কেন তা হলো আপনি জামায়াতের সক্রিয় সদস্য কিনা?

মাহমুদ: না। আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য না।

রাজু: তাহলে জামায়াত আপনার পৃষ্ঠপোষক কেন?

মাহমুদ: আমি দৈনিক সংগ্রামে চাকুরি করি। আপনি তো জানেন আমি সরকারী কর্মচারী হিসেবে রিটায়ার করেছি। লিখে-টিখে খেতে হয় আমাকে। সংগ্রামে লিখি, পালাবদলে লিখি এবং আরও কয়েকটা পত্রিকায় লিখে-টিখে খাই। এখন আপনি বলছেন যে তারা পৃষ্ঠপোষক কিনা। হতে পারে। আমি যেহেতু ধর্মে বিশ্বাস করি, ধর্মের কথা বলি; শুধু এখানেই নয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ভাবে। তারা আমাকে সমর্থন করে।

রাজু: তারা ভাবে যে আপনি তাদের লোক।

মাহমুদ: তারা হয়তো ভাবতে পারে। তাদের লোক বলে আমাকে ভাবে কিনা সেটা তো আমি আর তাদের মনের কথা জানি না।

রাজু: তাদের মনের মানুষ ভাবে আপনাকে।

মাহমুদ: আমাকে তারা ভালোবাসে।

রাজু: ভালোবাসে? সাধারণত ভালোবাসা তখনই ঘটে — একটা লোককে আমরা ভালোবাসি কেন? কিংবা আপনার কবিতা আমার ভালো লাগে কেন? ভালো লাগে এই কারণে যে মনে হয় যেন এটা আমার মনের কথা। তো ওরা যে আপনাকে ভালোবাসে, তার মানে ওদের মনের সঙ্গে আপনার মনঃগঠনের কোনো ঐক্য আছে বলেই কি ভালোবাসে?

মাহমুদ: আমি আগেই বলেছি যে আই অ্যাম নট এ পলিটিশিয়ান। আমি যেহেতু ইসলামে বিশ্বাস করি ইসলামের কথা বলি…

রাজু: ইসলামের নাকি ‘জামায়াতে ইসলামী’র?

মাহমুদ: না, এই ধরনের প্রশ্ন করা সঠিক নয়। দলকে নিয়ে একজন কবিকে এই ধরনের প্রশ্ন করা কি সঠিক? আমি তো আগেই বলেছি আমি রাজনীতিক নই।

রাজু: কিন্তু আপনাকে তো জামায়াতে ইসলামীর অনেক দলীয় কর্মকাণ্ডে দেখা গেছে।

মাহমুদ: না, এটা আপনি ঠিক বলেন নি।

রাজু: অনেক অনুষ্ঠানে দেখা গেছে; আপনি সভাপতিত্ব করছেন বা গেস্ট হিসেবে আছেন।

মাহমুদ: আমি হয়তো তার কোনো ছাত্র সংগঠনের কালচারাল অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছি। অনেক ছাত্র সংগঠনেই আমি করে থাকি। কিন্তু যেহেতু আমি কোনো একসময় বা কোনো একবার বা দুইবার বা তিনবার তাদের একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছি তাতে আমাকে এভাবে চিহ্নিত করা ঠিক না।

রাজু: আপনি জামায়াতের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন কিনা?

মাহমুদ: জামায়াতের রাজনীতি কী — সেটা আমার কাছে প্রথম ব্যাখ্যা করতে হবে। তাহলে আমি বুঝতে পারবো আমি সমর্থক কিনা। জামায়াতে ইসলাম ইসলামী রাষ্ট্র, ইসলামী শরিয়ত প্রচলনের জন্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। আমি একজন সাংস্কৃতিক কর্মী, আমি একজন কবি। কোথাও যদি তাদের সাথে আমার মিল হয় সেটা তো ভালো কথা আমি মনে করি, অসুবিধা কী? এবং তারা যদি সে-কারণে আমাকে খানিকটা পৃষ্ঠপোষকতা দেয় তাহলে সেটা আমার লভ্য; এটাকে বলি না যে এটা দোষনীয়। যেহেতু তারা আদর্শগতভাবে আমার কবিতা বা আমাকে সমর্থন দেয় তাহলে এটা দোষণীয় মনে করি না। এ কারণে আমাকে রাজনীতি করতে হবে বা রাজনৈতিক দলের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে — এটা জরুরী না।

রাজু: না, কিন্তু ওদের রাজনীতিতে আপনি বিশ্বাস করেন কিনা?

মাহমুদ: আমি ইসলামে বিশ্বাস করি। জামায়াতে ইসলাম দেশের নানান ঘটনায় নানা রকম রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চালায়, এটার সাথে ইসলামের সম্পর্ক থাকতেও পারে। নিশ্চয় থাকবে, কারণ তারা তো ইসলামী দলই।

রাজু: এটা কোন ইসলাম? কারণ হচ্ছে, সেভেনটি ওয়ানে ওরা যখন স্বাধীনতার বিপক্ষে কাজ করলো তখনও কিন্তু তারা বলছে যে ইসলাম রক্ষা হলো তাদের মূল দায়িত্ব। সেখানেও কিন্তু তারা ‘ইসলাম’কে ব্যবহার করছে।

মাহমুদ: জামায়াতে ইসলাম ইসলামের স্বার্থেই কোনো এক সময়ে মানে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে ছিলো শেখ মুজিবের বা আওয়ামী লীগের অপজিট দল।

রাজু: এখানে আমি একটু বলি: সেভেনটি ওয়ানে ওদের ভূমিকা কেবল আওয়ামী লীগের, শেখ মুজিবের বিপক্ষে নয়, ওটা প্রকারান্তরে গোটা জাতির স্বার্থের বিপক্ষে চলে গেছে।

মাহমুদ: এটা আমি… ঠিক… সম্পূর্ণভাবে সঠিক মনে করি না।

রাজু: যদি এটা সঠিক না হয় তাহলে সেভেনটি ওয়ানের যে-অর্জন সেটা কি আওয়ামী লীগের অর্জন নাকি এই জাতির অর্জন?

মাহমুদ: মনে রাখতে হবে যে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা।

রাজু: সে-জন্যেই তো আপনি এর উত্তর দেবেন।

মাহমুদ: তখনকার জামায়াতে ইসলামীর — আমার যেটা ধারণা; আমি কিন্তু রাজনীতির লোক নই আগেই বলে নিচ্ছি। আমার ধারণা যেটা পাকিস্তানের যে-ঐক্য, যে ভাব-কল্পনা — এটার অনুসারী ছিলো তারা, সেটা তারা রক্ষা করতে চেয়েছে। এবং সেই জন্যে শেখ মুজিবের রাজনীতির বিরোধিতা করেছে। এবং বিরোধিতার পরিণাম তারা ভোগ করেছে।

রাজু: কী পরিণাম ভোগ করেছে? আমি তো কোনো পরিণাম দেখি না।

মাহমুদ: তাদের অসংখ্য লোক মারা গেছে।

রাজু: আর তারা যে অসংখ্য লোক হত্যা করছে, অসংখ্য নারীকে ধর্ষণে সহযোগিতা করছে, অনেক লুটপাট করছে…

মাহমুদ: এ বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন না করাই ভালো…

রাজু: আপনি মুক্তিযোদ্ধা, ফলে আপনি এসব বিষয়ে বলতে পারেন।

মাহমুদ: এ ব্যাপারে আমাকে প্রশ্ন না করাই ভালো।

রাজু: আপনি বলতে অনাগ্রহী কেন?

মাহমুদ: অনাগ্রহী না, আমি যে-বিষয়টা কম জানি সেটা বলতে চাই না। এটা একটা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড…

রাজু: না আপনি কম জানেন — এই ব্যাপারটা ঠিক না।

মাহমুদ: একজন কবির কী সম্পর্ক… এখন কথা হলো আমি একজন কবি মাত্র।

রাজু: একজন কবির সাথে রাজনীতির সম্পর্ক তো হয়।

মাহমুদ: না, আমার সাথে রাজনীতির সম্পর্ক তেমন ঘটেনি। আমি আরাম কেদারায় বসে রাজনীতির চর্চা করি না। আমি কাব্যচর্চা করি, কবিতা নিয়েই কথা বলতে চাই।

রাজু: ঠিক আছে, ব্লাসফেমী আইন কি আপনি সমর্থন করেন?

মাহমুদ: ব্লাসফেমী হলো একটা বৃটিশ আইন। তাদের দেশে যীশুখৃষ্টের বিরুদ্ধে… যদিও তারা খুবই গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ বলে, কিন্তু তাদের একটা আইন আছে: সরাসরি কেউ যদি খৃষ্টবিরোধী কোনো আচরণ করে তাহলে তাকে ব্লাসফেমী আইনে সাজা দেয়া হবে। এ ধরনের আইন তাদের আছে। এখন একই রকম ব্লাসফেমী আইন আমাদের নাই তবে ধর্মীয় কতগুলো আজ্ঞা-অনুজ্ঞা আছে: কেউ মুসলমান হয়ে যদি ইসলামের বিরোধীতা করে, রাসুলুল্লাহ আলায়হে সাল্লামের নিন্দা রটনা করে তাহলে আমাদের ধর্মে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে, আমাদের শরিয়ত মতে সে মৃতুদণ্ডের যোগ্য।

রাজু: এবং আপনি সেটা সমর্থনযোগ্য মনে করেন?

মাহমুদ: আমি সমর্থনযোগ্য অবশ্যই মনে করি।

রাজু: এটা কী করে হয় যে বারশ’ বছর আগের একটি ধর্মীয় আইন বারশ’ বছর পরের মানুষের সৃষ্টিকে চিন্তাকে রোধ করার কাজে ব্যবহার করা হবে।

মাহমুদ: এক শ’ বিশ কোটি মানুষ যাকে পথপ্রদর্শক বলে মনে করে তাকে গাল দেবার অধিকার কারো নাই। আমরা মুসলমানরা সব সময় মনে করি যে রসুলের নিন্দা আমরা সহ্য করিনি, এটা আমাদের ঐতিহ্য, এটা আমাদের ইতিহাস। আমরা আল্লাহর নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসসালামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করাকে দণ্ডযোগ্য অপরাধ বলে ধারণা করে এসছি।

রাজু: কিন্তু এই আইনগুলো যারা প্রয়োগ করবে ইসলামের নামে তারা হয়তো এক সময় যৌনতার অপরাধে সোনালি কাবিন ব্যান্ড করে দেবে। এই যৌনতা নৈতিকভাবে বিপদগামী করে দিতে পারে।

মাহমুদ: ইসলাম একটা সহনশীল ধর্ম। আপনি জানেন যে ইসলামের আগের যুগের এক ইমরাউল কায়েস অসাধারণ কবিত্ব শক্তির অধিকারী ছিলেন…

রাজু: কিন্তু কবিদের সম্পর্কে ইসলাম ধর্মে তো…

মাহমুদ: খুব বেশি বলা হয়েছে।

রাজু: স্বীকৃতিমূলক কিছু?

মাহমুদ: খুবই। এত বেশি স্বীকৃতিমূলক কথা ইসলামে আছে যে তা দিয়ে একটি পুরো গ্রন্থ হতে পারে। ইসলামের নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিসাল্লাম সব সময় কবিদের আদর করেছেন। নিজের গায়ের পিরহান খুলে দিয়ে দিয়েছেন কবিকে। নানা ভাবে পুরস্কৃত করেছেন। কবিদের সম্পর্কে কোরানে একটা সুরাই আছে… সেখানে পরিষ্কার বলা আছে কবিদের সম্বন্ধে। শয়তান কবিদের কীভাবে বিভ্রান্ত করে এবং বিশ্বাসী কবিদের কাজটা কী। এটা ঠিক না যে কবিতাকে ইসলাম নিরুৎসাহিত করে। আমি যেটা বলতে চেয়েছিলাম সেটা হচ্ছে ইমরাউল কায়েস বলে এক কবি যিনি আইয়ামে জাহেলীয়া যুগে জন্মেছিলেন। মুসলমানরা এত দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে পড়িয়ে আসছে। কারণ তিনি আরবী ভাষার খুব গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসিক পোয়েট।

রাজু: তো, জামায়াতে ইসলাম সম্পর্কে আপনি পরিষ্কার কিছু বললেন না, মাহমুদ ভাই।

মাহমুদ: জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে আমার যেহেতু আদর্শগত একটা মিল আছে সে জন্যে জামায়াতে ইসলামের সমস্ত কৃতকর্ম — অতীতে যা করেছে এবং ভবিষ্যতে যা করবে সে জন্যে আমাকে … [অস্পষ্ট] করার কোনো কারণ আমি দেখি না।

রাজু: আপনার একটি কবিতা যেখানে আপনি বলছেন — ‘জায়নামাজে বসে তসবি ঘুরিয়ে বলি দাও তাকে ফিরিয়ে আমার।’ জায়নামাজে বসে আপনি নারীর প্রার্থনা করতে পারেন কিনা?

মাহমুদ: করতে পারি, করতে পারি।

রাজু: কোথায় বসে?

মাহমুদ: জায়নামাজে বসে, প্রার্থনা তো জায়নামাজে বসেই করে। হাঃ, হাঃ, হাঃ।

রাজু: তাহলে ব্লাসফেমীর সমর্থকরা যদি বলে জায়নামাজে বসে ইশ্বরের বন্দনা করা, আল্লাহর বন্দনা করা নবীর বন্দনা করা হচ্ছে মূল কাজ…?

মাহমুদ: জায়নামাজে বসে মানুষ আল্লাহর কাছে সমস্ত আকাঙ্ক্ষা বাসনা লোভ লালসা সব সমর্পণ করে দিয়ে কথা বলে মানুষ — হে আল্লাহ, অনুগ্রহ করে আমাকে এটা দান করো, ওটা দান করো।

রাজু: আপনি যে একবার এক ইন্টারভ্যুতে বললেন যে ‘আমিই একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা লেখক’ — এটা আপনি কেন বললেন?

মাহমুদ: আমি যখন মুক্তিযুদ্ধে অশংগ্রহণ করেছি তখন সহযোগী হিসেবে খুব একটা কাউকে দেখতে পাইনি।

রাজু: আপনি কোথায় ছিলেন তখন?

মাহমুদ: কোলকাতায় ছিলাম।

রাজু: দেখতে পাননি মানে এই যে ড. আনিসুজ্জামান, সৈয়দ আলী আহসান… এই মুহূর্তে আমি সবার নাম মনে করতে পারছি না তবে আমি নিশ্চিতভাবে জানি যে আরো অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ করেছেন এবং তাঁরা লেখালেখিও করেছেন। সে ক্ষেত্রে আপনি নিজেকে একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা লেখক বলে কীভাবে দাবি করেন?

মাহমুদ: কথাটা যে ভাবে ছাপা হয়েছে সে ভাবে বলতে চাইনি।

রাজু: না মাহমুদ ভাই, আপনি যে ভাবে বলেছেন সে ভাবেই ছাপা হয়েছে। আমাদেরকে ‘মিথ্যেবাদী রাখাল’ বানাবার চেষ্টা করবেন না।

মাহমুদ: আমি বলতে চেয়েছিলাম যে আজকে যারা মুক্তিযুদ্ধের দাবি করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা পর্যন্ত করেছে।

রাজু: সেটা কে করেছে? এভাবে বললে তো হবে না, মাহমুদ ভাই। পারটিকুলারলি যদি নাম বলতে না পারেন তাহলে বুঝতে হবে যে এটা মিথ্যে কথা।

মাহমুদ: নাম আমি কারো বলতে চাই না।

রাজু: বলতে চান না কেন? সাহস এবং সততার অভাব?

মাহমুদ: সাহস এবং সততার অভাবের জন্য না। সে সময় এবং বর্তমান সময় একই রকম পরিস্থিতি আর রক্ষা করছে না। যুদ্ধরত অবস্থায় আমি যাকে দায়ী করতে পারতাম এখন এই দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর আমি তাকে সেভাবে আঙুল তুলে দায়ী করতে পারি না।

রাজু: কেন পারেন না ?

মাহমুদ: সময় সেটা খেয়ে ফেলেছে। সময় পুরো পরিবেশটাকে পাল্টে অন্যরকম করে দিয়েছে। আমি একজন দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন লোক, চট করে একটা কথা বলে দেব — সেটা আমি করবো না।

রাজু: কবি হিসেবে এবং একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আপনার তো এটাও দায়িত্ব যে রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী লোকগুলোকে চিহ্নিত করা।

মাহমুদ: যারা তখন রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী ছিলো তারা তো আজকে রাষ্ট্রের পরিপোষক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজু: সেটাকে আপনি স্পষ্টভাবে বলতে পারছেন?

মাহমুদ: এটা তো আমার কাজ না।

রাজু: তৃতীয় বিশ্বের লেখকদের এটাও একটা দায়িত্ব যে শুধুমাত্র লেখালেখি না, যেহেতু সে তৃতীয় বিশ্বে জন্মেছে ফলে তাকে কতগুলো ইতিহাসের বোঝা বহন করতে হয়। পাবলো নেরুদার ভাষাতেই বললাম।

মাহমুদ: ইতিহাসের বোঝা আমি অযথা ঘাড়ে পেতে নেবো কেন?

রাজু: আপনি তাহলে মুক্তিযুদ্ধ করতে গেলেন কেন, শুধু কবিতাই তো লিখতে পারতেন?

মাহমুদ: আমি তো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি এবং কবিতাও লিখেছি।

রাজু: আপনি তো সেটা এখনও করতে পারেন।

মাহমুদ: মুক্তিযুদ্ধের দুই যুগ শেষ হয়ে গেছে, এখন আমি কারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না তাদের নাম বলে…

রাজু: বিরাগভাজন?

মাহমুদ: বিরাগভাজন না বিভ্রান্তি এবং ইয়ের শিকার হতে চাই না।

রাজু: বিভ্রান্তির শিকার না, আপনি এই বিভ্রান্তি মোচন করতে পারেন। কিন্তু আপনি করছেন না।

মাহমুদ: আমার কাজ বিদ্বেষ প্রচার করা না। কবি হিসেবে আমার কাজ প্রীতির প্রচার করা।

রাজু: অনেক মিথ্যা জিনিসও প্রীতিকর হতে পারে।

মাহমুদ: না, মিথ্যা জিনিস প্রীতিকর হয় না।

রাজু: মিথ্যা জিনিসই প্রীতিকর হয় বেশি, সত্য হয় ভীতিকর।

razualauddin@hotmail.com

—-
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (26) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আনোয়ার শাহাদাত — অক্টোবর ২৭, ২০০৮ @ ৪:১২ পূর্বাহ্ন

      রাজু আলাউদ্দিনের প্রশ্নের সামনে আল মাহমুদকে খুব সীমিত জ্ঞানের অসহায় একটি মানুষ মনে হইছে। তাঁর কথাবার্তার ধরন ছিল খুবই ‘অকবি’ (অবুদ্ধিজীবী) ধরনের। জ্ঞানের সঙ্গে বিশ্বাসের একটা সম্পর্ক আছে সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়। আসলে তাঁর ইন্টারভিউ পড়লে তাঁর ইন্টিলিজেন্স সম্পর্কে একটা প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ধন্যবাদ রাজু আলাউদ্দিন।

      – আনোয়ার শাহাদাত

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শেহাব — অক্টোবর ২৭, ২০০৮ @ ৯:৪২ পূর্বাহ্ন

      ধর্ম সম্পর্কে ওনার মন্তব্যগুলো অনেক বেশি আবেগপ্রসূত। রিঅ্যাকটিভ মনে হল। কিন্তু সাহিত্য সংক্রান্ত মন্তব্যগুলো মনে হল সুচিন্তাপ্রসূত।

      – শেহাব

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তপন বাগচী — অক্টোবর ২৭, ২০০৮ @ ১১:০৭ পূর্বাহ্ন

      রাজু আলাউদ্দিনকে ধন্যবাদ কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার প্রকাশের জন্য। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, আমিও আল মাহমুদের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলাম। অল্প কিছুদিনের জন্য কবি অসীম সাহা দৈনিক বাংলার বাণীর সাহিত্য-সম্পাদক হয়েছিলেন। তিনি আমাকে কিছু সাক্ষাৎকার নিতে অ্যাসাইন করেছিলেন। আমি একই প্রশ্নের ভিত্তিতে ‘আপাতবিরোধী’ কয়েকজন লেখককের সাক্ষাৎকার গ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। ‘শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ’, ‘আহমদ ছফা ও হুমায়ুন আজাদ’ এইরকম আর কি! তখন কেবল আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। ইতোমধ্যে অসীম সাহা বাংলার বাণীতে যাওয়া বন্ধ করেন। ফলে পরিকল্পনাটি আর আলোর মুখ দেখেনি। আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার আছে আমার স্মৃতিতে এবং নোটবুকে। এটি গুছিয়ে লেখা হয়নি। তাতে ষাট-সত্তর-আশির কবিদের নাম বলেছিলেন। রাজু আলাউদ্দিনের সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের পরে মনে হলো, স্মৃতি থেকে এখনো লিখতে পারি। প্রয়োজনে আল মাহমুদের অনুমোদন নেয়া যেতে পারে। মগবাজারের বাসায় সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময়ে আমার সঙ্গে ছিলেন কবি জাহাঙ্গীর হাবীবুল্লাহ। তবে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে তাঁর কিছু বক্তব্যের বিরোধিতা করে আমি কৌরব পত্রিকায় লিখেছিলাম। ‘সত্তর প্রশ্নের জবাবে আল মাহমুদ’ নামের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন কাজী জহিরুল ইসলাম। আমার প্রতিক্রিয়া পাঠ করলে আল মাহমুদ ভাই রুষ্ট হয়ে থাকতে পারেন। তাই নতুন করে তাঁর সাক্ষাৎকারে অনুমোদন দেবেন কিনা সেটিও আশঙ্কার বিষয়।

      রাজু আলাউদ্দিনের নেয়া সাক্ষাৎকারটিতে আল মাহমুদের বিশেষ এক চেহারা ফুটে উঠেছে। দুজনকেই ধন্যবাদ।

      – তপন বাগচী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আখতার-উজ-জামান — অক্টোবর ২৭, ২০০৮ @ ১২:৫৯ অপরাহ্ন

      আমার মনে হয়েছে আল মাহমুদের এই দাবি — জীবনানন্দসহ তিরিশের কবিরা ইয়ুরোপীয় ধারায় শিক্ষিত ও গঠিত বাঙলা ভাষার কবি‌‌, দেশের কবি নন — একটি ভ্রান্ত ধারণায় নিমজ্জিত। এই ধারণা অনুযায়ী ইয়ুরোপের সঙ্গে আমাদের যে অভিজ্ঞতা — যথা আক্রমণকারী বিজেতা ও নিপীড়িত জনতা — তা মোটামুটি মানব ইতিহাসে বিচ্ছিন্ন এবং পারম্পর্যহীন একটি ঘটনা। আমরা এই অভিজ্ঞতার কোনো নির্যাস আমাদের জীবনবোধের সঙ্গে যুক্ত করব না এবং ফল হিসাবে আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে নতুন সংবদ্ধতা অর্জন করেছি তার কোনো তাৎপর্য আমাদের জীবনে থাকবে না। কাজে কাজেই আমাদের মধ্যে যাকে ইয়ুরোপীয় ধারায় প্রভাবিত দেখব তাকে দেশীয় তালিকা থেকে বাদ দেয়া দরকার হবে। জীবনানন্দ তাই বাঙলা ভাষায় ইয়ুরোপের কবি। সোনার পাথর বাটি আর কি।

      তাঁর এই ধারা দাবি আরও সরেস হয় যখন তিনি এসলামের ঝাণ্ডা তোলেন এবং মনে করেন নিজের মুসলিম পরিচয়টি যথেষ্ট তুলে ধরা দরকার। যেন আমাদের আরব তুর্কি অভিজ্ঞতাটি যথেষ্ট মনোরম এবং এতে দেশীয় মার্কার কোনো হানি হয় না।

      হায় রে এই যুগে অধঃপতিত বাংলাদেশে আমরা নন্দলাল না হোক তাঁর কাছাকাছি একজন পরোপকারী কোথায় পাব যিনি আমাদের একজন বয়ঃবৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা কবিকে সময় দিতে পারবেন যাতে আমাদের কবি বাংলার মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম ও তার ফলাফল নিয়ে আলোচনা করে তাঁর মাথার কিছু পুরানো কোষ আবার সজীব করে নিতে পারেন।

      – আখতার-উজ-জামান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাহিদ — অক্টোবর ২৭, ২০০৮ @ ৪:২৫ অপরাহ্ন

      আমি একটি বিষয়ে মোটামুটি ধারণা পেয়েছি যে, যারা ইসলামকে ভালবাসেন ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা করেন তারা একধরনের দোদুল্যমনতায় ভোগেন কারণ তারা ইসলাম বলতে অনেক সময় আমাদের ইসলামপ্রিয় আবেগতাড়িত মানুষগুলোকে নিয়ে ভাবেন। কিন্তু ইসলাম কখনই এরকম নয় তার নিজস্ব একটি দর্শন আছে। এখনে ব্লাসফেমি নিয়ে বলা হয়েছে — কিন্তু ইসলাম কখনই এ ধরনের নীতিতে বিশ্বাসী নয়। তাহলে আমাদের নবী তার উপর সমস্ত অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করতেন না — ক্ষমাও করতেন না। ইসলামের বিরূদ্ধে, নবীর বিরূদ্ধে যারা বলে তাদের ক্ষেত্রে অবশ্যই সহনশীল নীতি গ্রহণ করতে হবে — ইসলাম এমন শিক্ষাই দেয়।

      ইসলামের দুটি প্রধান ভিত্তি হচ্ছে — ন্যায়বিচার ও মানবতা; আরবীতে বললে আদল ও ইহসান। এর কোনো একটির অভাব যদি কোথাও দেখা যায় বুঝতে হবে সেখানে ইসলাম নেই। একই কথা মুক্তিযুদ্ধ ও এদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীতাকারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এমনকি যারা আমাদের দেশে অন্য ধর্মালম্বীদের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে অবশ্যই তারা ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়েই তা করেছে। এমনকি ইসলাম নাস্তিকতাকেও তার আপন মহিমায় সহ্য করে গিয়েছে যখন ইউরোপ এরকম বিজ্ঞানীদেরকে পুড়িয়ে মেরেছে। কিন্তু আমাদের সেই সভ্যতা এখন বিলীন। স্পেন, বাগদাদ একসময় মুসলিম দার্শনিকদের চারণভূমি ছিল। বিভিন্ন দার্শনিক মতবাদ সেখানে উৎপত্তি লাভ করেছে। কিন্তু মুসলিম সমাজ তাদের সমাদর করতে ভোলেনি। কিন্তু আজ আমরা চিন্তাজগতের অন্তঃসারশূন্যতা সকল ক্ষেত্রেই উপলব্ধি করি মুসলিম সমাজে — কী মুক্তবুদ্ধি চর্চা, দর্শন চর্চা, সাহিত্য চর্চা সব ক্ষেত্রেই।

      – জাহিদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কেশব অধিকারী — অক্টোবর ২৮, ২০০৮ @ ৭:৫৪ পূর্বাহ্ন

      সাক্ষাৎকারটি পড়ে মনে হলো কবি আল মাহমুদ বিভ্রান্তিতে আছেন।

      – কেশব অধিকারী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নাসিরুদ্দীন খোকন — অক্টোবর ২৮, ২০০৮ @ ২:২১ অপরাহ্ন

      সোনালী কাবিনের কবিকে রাজু আলাউদ্দিনের কাছে এতো অসহায় দেখতে খারাপ লেগেছে সত্যি। তবে বখতিয়ারের ঘোড়াকে রাজু যেভাবে বধ করেছেন তা উপভোগ্য। রাজুকে ধন্যবাদ।

      – নাসিরুদ্দীন খোকন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শামস শামীম — অক্টোবর ২৮, ২০০৮ @ ৮:২৮ অপরাহ্ন

      আল মাহমুদেক একবার প্রশ্ন করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। বলিছলাম জামাতের মঞ্চে কেন যান? তিনি বলেছিলেন জামাত ডাক দেয় বলেই যান। অন্য যে কোনো রাজনৈতিক দল ডাকলে তিনি যাবেন। তিনি বলছিলেন একজন কবিরও মঞ্চের প্রয়োজন রয়েছে। তাই তাদের ডাকে সারা দেন। তিনি নানান যুক্তি তুলে ধরেন সেদিন। তবে তিনি বেশ জোর দিয়ে বলেছিলেন তিনি জামাত ইসলামীর লোক নন। তিনি বলছিলেন, ধমের্র কথা বলেন বলেই কিছু লোক তাকে জামাতি বলে।

      – শামস শামীম

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আবু আবেদ মু.শোয়াইব — অক্টোবর ২৮, ২০০৮ @ ১১:৫৬ অপরাহ্ন

      আল মাহমুদকে ধন্যবাদ তাঁর ইন্টিলিজেন্ট ইন্টারভিউর জন্য। সাক্ষাৎকারে রাজু আলাউদ্দিনের বিশেষ এক চেহারা ফুটে উঠেছে। তবুও ধন্যবাদ এতদিন পর কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার প্রকাশের জন্য।

      – আবু আবেদ মু.শোয়াইব

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন লীনা — অক্টোবর ২৯, ২০০৮ @ ২:৫৮ অপরাহ্ন

      আল মাহমুদ যখন বলেন, ‘মনে রাখতে হবে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা’, তখন এটা বোধকরি তাঁকে পরিষ্কার করে বলতেই হবে তিনি কেন জামায়াত করেন। ‘এখন কথা হলো আমি একজন কবি মাত্র’ এই কথা বলে আল মাহমুদ রাজাকার তেষনের দায় এড়াতে পারেন না।

      – লীনা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরিফুল হোসাইন — নভেম্বর ১, ২০০৮ @ ১২:২৫ অপরাহ্ন

      অনেকদিন পর কবি আল মাহমুদের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার পড়লাম। এ সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য জনাব রাজু আলাউদ্দিনকে ধন্যবাদ।
      তবে রাজু সাহেবের প্রশ্নের ধরন ভীষণ রকম একপেশে মনে হয়েছে। তিনি মনে হয় আল মাহমুদকে ঘায়েল করার মানসিকতা নিয়েই এ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। হ্যাঁ, আল মাহমুদের কিছু কথা আমারও একটু ব্যাতিক্রমী মনে হয়েছে। এটা সম্ভবত তাঁর বয়সের কারণে।
      জনাব রাজু যেভাবে আল মাহমুদকে জামায়াতের সদস্য হিসেবে চিত্রিত করতে চেয়েছেন তা নিন্দনীয়। আমাদের দেশের প্রায় সকল কবি-সাহিত্যিকই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা তাদের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী। কেউ কেউ রাজনৈতিক দলে খুবই সক্রিয়। সে ধারাবাহিকতায় আল মাহমুদও এককালে জাসদে সক্রিয় ছিলেন। যে কোনো কারণেই হোক আজ তিনি তাঁর আদর্শ এবং বিশ্বাস পরিবর্তন করেছেন। এটা দোষের হতে পারে না। আদর্শ এবং বিশ্বাস পরিবর্তনের কারণে কেউ কারো কীর্তিকে অস্বীকার করতে পারে না বা তাঁকে অবমূল্যায়ন করতে পারে না। কিন্তু আল মাহমুদের বেলায় তা ঘটেছে। এখানেই তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। তারা তাদের পক্ষের লোকজন ছাড়া অন্য কাউকেই মূল্যায়ন করতে জানে না।

      আল মাহমুদকে যদি জামায়াতে ইসলামীর কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেখা যায় তা কি দোষের হতে পারে? কবি শামসুর রাহমানসহ অন্যন্য আওয়ামী বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ঘরানার কবিরা কি আওয়ামী লীগ সহ অন্যন্য রাজনৈতিক দলের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেননি বা এখনো করে যাচ্ছেন না? জনাব রাজু এটাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

      জামায়াতে ইসলামী বিশেষ এক প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। শুধু জামায়াত নয় অন্যন্য অনেক ব্যক্তি ও দলও পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন। গত ১৩ নভেম্বর ২০০৭ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদের ভাষায়, “এখনকার পত্রিকা পড়লে মনে হবে, শুধু মুসলিম লীগ, জামায়াত বা নেজামে ইসলামীর লোকেরাই পাকিস্তানের দালাল ছিল। বস্তুত সব শ্রেণী ও গোষ্ঠীর মধ্যেই পাকিস্তানের সহযোগী ছিল। আবদুল হক তাঁর কমিউনিস্ট পার্টির নামের সঙ্গে বাংলাদেশ হওয়ার পরও ‘পূর্ব পাকিস্তান’ই রেখে দেন। অত্যন্ত ‘প্রগতিশীল’ বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ পাকিস্তানিদের সহযোগীতা করেছেন। ১৬ ডিসেম্বর দেশ শত্রুমুক্ত না হলে, আর বছরখানেক টিক্কা খাঁরা বাংলাদেশ দখল করে রাখতে পারলে অনেক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে আজ মানুষ ভিন্ন পরিচয়ে জানত।” সেই ‘শ্রদ্ধেয় ব্যাক্তি’রা কারা? তাঁদের ব্যাপারে জনাব রাজুর মতামত কী? জনাব রাজুরা কি শামসুর রাহমান সহ সেই ‘শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি’দের ব্যাপারে কখনো কোনো প্রশ্ন তুলেছেন।

      জনাব রাজু কীভাবে জানলেন যে, জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে অসংখ্য ব্যক্তিকে হত্যা করেছে, অসংখ্য নারীকে ধর্ষণ করেছে বা অনেক লুটপাট করেছে? প্রমাণ কী? আবার সেই ‘অসংখ্য’ মানে কত? ত্রিশ লাখ না তিন লাখ? কিছুদিন আগে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল বলেছে ১৯৭১ সালে সব মিলিয়ে (স্বাধীনতাকামীদের হাতে নিহত হাজার হাজার বিহারীসহ) মোটামোটি ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। কোনটা সত্য?

      সর্বশেষ বলব, আজকের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী কবি-সাহিত্যিকরা আল মাহমুদকে মূল্যায়ন করতে চান না। কারণ তিনি এখন কালজয়ী আদর্শ ইসলামের কথা বলেন। প্রকৃতপক্ষে এটাই তাঁদের মনোকষ্টের প্রধান কারণ। কিন্তু বাংলাদেশে সহ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে কবি আল মাহমুদ রয়েছেন এবং থাকবেন অনন্তকাল। আল মাহমুদের দীর্ঘায়ু কামনা করি।

      – আরিফুল হোসাইন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুহাম্মদ সানাউল্লাহ — নভেম্বর ২, ২০০৮ @ ৫:৩৬ পূর্বাহ্ন

      রাজু আলাউদ্দিনকে ধন্যবাদ যথাসময়ে নিজের সঞ্চিত রত্নভাণ্ডারের গভীর তলদেশ থেকে মোক্ষম অস্ত্রটি বের করে এনে বাংলাভাষার এ প্রবীণ কবিকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার হীন চেষ্টার জন্য।

      অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ। রাজু আলাউদ্দিন নিশ্চয়ই তাঁর রাজনৈতিক প্রভুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন দশবছরের পুরনো এই সাক্ষাৎকারটি এই সময়ে এনে রাজনৈতিক-প্রজ্ঞা ব্যবহার করে নিজেকে মহাজ্ঞানী সাজিয়ে একজন ইসলামপ্রিয় কবিকে স্বল্পজ্ঞানী ও বিব্রত করে তুলে ধরার কৃতিত্বের জন্য ।

      কবি আল-মাহমুদকে তাঁর অবদানের জন্য সার্বিকভাবে বিচার করার সময় এখনো আসেনি। কিন্তু রাজু আলাউদ্দিন তার চেষ্টা-প্রচেষ্টার বখশিষ যে নগদ চেয়েছেন তা সহজে অনুমেয় ।

      ইসলাম সংশ্লিষ্ট কোনো স্থান-কাল-পাত্র-দল-সাহিত্যকে বিতর্কিত করা, হেয় করা, অতিরঞ্জিত করা, অথবা বিরোধিতা করা যেন আধুনিকতা, সুসভ্যতা অথবা মহা বুদ্ধিজীবী হওয়ার লক্ষণ। আর তা করতে পারাটা তো এমন সাহসের কাজ যার পুরস্কার হয় অগ্রিম নয় যেন প্রস্তুত।

      কারো সম্মানের বস্তুকে হেয় করার চেষ্টা কি মত প্রকাশের স্বাধীনতা না অভদ্রতা এটা সহজেই বোধগম্য। ব্রিটিশ ব্লাসফেমী আইনের বিরোধিতা করার মাধ্যমে ইসলামের বিরোধিতা করার গ্যারান্টি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন রাজু আলাউদ্দিন।

      কবি আল মাহমুদকেও ধন্যবাদ নিজের ধর্ম-বিশ্বাস-অনুভূতিকে বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরার জন্য।

      মুহাম্মদ সানাউল্লাহ
      লন্ডন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আবদুর রাজ্জাক শিপন — নভেম্বর ২, ২০০৮ @ ৫:১৬ অপরাহ্ন

      আল-মাহমুদের সাক্ষাৎকারগুলোতো একটি বিষয় প্রকটভাবে ধরা খায়, সেটি হলো তিনি ঈর্ষাকাতর কবি । জীবনানন্দ সম্পর্কে আল মাহমুদের মূল্যায়ান দেখে এই ধারণা আরো প্রগাঢ় হলো।

      – আবদুর রাজ্জাক শিপন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরিফ জেবতিক — নভেম্বর ৪, ২০০৮ @ ১:১০ পূর্বাহ্ন

      রাজু আলাউদ্দীনের প্রশ্নের জবাবে (এবং আরো অসংখ্য জায়গায়) আল মাহমুদ নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। সাম্প্রতিককালে জামাতে ইসলামীর সাথে অতি ঘনিষ্ঠ এই কবি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দেয়ার কালে ভবিষ্যতের কোনো প্রশ্নকর্তা যদি তাকে প্রশ্ন করেন, তিনি কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন অথবা মুক্তিযুদ্ধকালীন ৯ মাসে মুক্তিযুদ্ধে উনার কন্ট্রিবিউশন কী, তাহলে বিষয়টি অনেক খোলাসা হয়।

      উনার আত্মজীবনীর একটা অংশ কালের খেয়াতে উনি প্রকারান্তরে স্বীকার করেছেন যে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস কলকাতায় ঘোরাঘুরি করা ছাড়া উনি মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোনো সংশ্রব রাখেন নি।

      উনার কাব্য বিচারের দায় ও যোগ্যতা আমার নেই। পাঠক হিসেবে আমি তার কবিতা পছন্দ করেছি এবং তার গদ্যের আমি একজন ভক্ত।

      কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় বলে উনি যেভাবে সবাইকে বিভ্রান্ত করছেন, সেটার জন্য উনার নিন্দা জানাই।

      – আরিফ জেবতিক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরিফ জেবতিক — নভেম্বর ৪, ২০০৮ @ ১:১৩ পূর্বাহ্ন

      আমার আগের কমেন্টে অসাবধানতাবশতঃ একটি তথ্যগত ভুল হয়েছে। আল মাহমুদের আলোচ্য বইটির নাম বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ। প্রকাশক, একুশে বাংলা ।

      – আরিফ জেবতিক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অমিয় চৌধুরী — নভেম্বর ৪, ২০০৮ @ ৯:০৬ অপরাহ্ন

      কবি যখন তার কাব্যকে শুধু কাব্য করে তোলেন তখন তার সৃষ্টিকর্ম সাধারণ পাঠকের হৃদয় জয় করে নিতে সক্ষম হয়। কিন্তু আল মাহমুদ তার বর্তমান রচনায় বিশেষ ধর্মীয়গোষ্ঠীর মাঝে উদ্দীপনা জাগানোর হাতিয়ার করে তুলেছেন। ‘জামায়াতে ইসলামি’র সাথে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে তার দ্বিধা কি তাঁর সম্পৃক্ততার আভাস দেয় না?

      আল মাহমুদকে প্রাক এবং উত্তর দুই পর্বে ভাগ করে দেখলে তাঁর সত্যিকারের পরিচয় পাওয়া যাবে মনে হয়। সেখানে আমরা সাহিত্যস্রষ্টাকে যেমন পাবো, তেমনি একজন ধর্মীয় চেতনায় আবেগাপ্লুত দুর্বলচিত্ত মানুষ পাওয়া যাবে। একজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে সঙ্গে একজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনালুপ্ত অভাবি মানুষের পরিচয়ও সুষ্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাই নয় কি?

      – অমিয় চৌধুরী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহাবুবুর রাহমান — নভেম্বর ৭, ২০০৮ @ ৭:৫৫ অপরাহ্ন

      আল মাহমুদের অসহায়ত্বের কারণ তাঁর জ্ঞানের স্বল্পতা নয়, তাঁর অসততা। সাক্ষাৎকারের দুটি অংশ পরখ করলেই তা বোঝা যায়।

      – মাহাবুবুর রাহমান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নজরুল ইসলাম — নভেম্বর ৭, ২০০৮ @ ৯:১৮ অপরাহ্ন

      আল মাহমুদকে ধন্যবাদ তাঁর সাহসী বক্তব্যের জন্য। তাঁর সাথে একদিন সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছিল আমার। তখনই তাঁর নির্ভিকতা ও উদার মানষিকতার পরিচয় পেয়েছিলাম। তিনি আমাদের সমসাময়িক অন্য কবিদের থেকে একটু আলাদাই বটে — যারা কবি হবার জন্য নাস্তিকতা বা ধর্মনিরপেক্ষতার লেবাস ধারন করেন বা ধর্মীয় পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করেন। সাক্ষাৎকারে ধর্ম সম্পর্কে কবির বক্তব্যে তাঁর গভীর জ্ঞানের ও চিন্তাশীলতার পরিচয় পাওয়া যায় এবং তিরিশের দশকের কবিদের সম্পর্কে কবির যুক্তি এ সম্পর্কে নতুন চিন্তার খোরাক যুগিয়েছে। পক্ষান্তরে রাজু আলাউদ্দিন তার সংকীর্ণ ও সীমিত চিন্তাধারার পরিচয় দিয়েছেন। তারপরও দেরিতে হলেও সাক্ষাৎকারটি প্রচার করায় তাঁকে ধন্যবাদ।

      – নজরুল ইসলাম

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রেজওয়ান — december ২৮, ২০০৯ @ ৪:৪৩ অপরাহ্ন

      আপনার সাক্ষাৎকারটা বানোয়াট ও অসত্য মনে হল।

      – রেজওয়ান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rayhan — december ২৪, ২০১০ @ ২:২৯ পূর্বাহ্ন

      ভালো লাগলো! যে যাই বলুক, আল মাহমুদ একজন উচূ মাপের লেখক এবং কবি। তার ধারে কাছে যারা যেতে পারে না, তারাই শুধু তার বিষোদগার করতে ব্যতিব্যস্ত। আমাদের সমস্যা একটাই, কেউ ধর্মের কথা বল্লেই অবস্থা নাচার, হয় আপনি জামাতি, নাহয় অন্য দেশের চর। এ গোড়ামী কোনদিনই কোন ভাল ফল বয়ে আনবে না। আজ যদি আল-মাহমুদ আগের সেই আল মাহমুদ থাকতেন- তবে তো পোয়া বারো। মাথায় তুলে নাচো। ধন্যবাদ আল-মাহমুদকে তার সত্য ভাষনের জন্যে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সৈয়দ জিয়াউদ্দীন — december ২৫, ২০১০ @ ৯:১৪ অপরাহ্ন

      রাজু সাহেবকে ধন্যবাদ যে উনি একজন কবি ও স্বঘোষিত একজন মুক্তিযোদ্ধ্বার ভিতরের মানুষটিকে তুলে ধরার প্রচেষ্টায় সক্ষম হয়েছেন। আল মাহমুদ সাহেব তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কিত উত্তরগুলো সরাসরি দিলে আরেকটু পরিস্কার ভাবে বুঝতে সুবিধা হতো। উনি খোলামনের মানুষ নন উত্তর পড়ে অনেকটা সেরকমই প্রতীয়মান হয়েছে। সোজাকথায় লুকোচুরি অবস্থা। একজন প্রথম শ্রেনীর কবি সাথে একজন অকুথভয় মুক্তিযোদ্ধ্বার এই ধরনের মানসিকতা দেখে নিরাশ হয়েছি।

      একজন কবির রাজনিতি করার অধীকার অবশ্যই আছে যদি তিনি চান। কিন্তু দুঃখের বিষয় জামাতে ইসলামি আমাদের জাতীয় জীবনে সেরকম কোন রাজনৈতিক ঐতিহ্য বহন করেনি এবং করেওনা। ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে কেউ অনাচার করলে তাকে ইসলামি আদর্শিক বলে গ্রহনযোগ্যতা দেয়া কতটুকু যায়েজ? ৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধ্বে রাতের আঁধারে অতর্কিতে মারণাস্ত্রে সুসজ্জিত সুপরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনি নিরস্ত্র অসহায় বাঙ্গালী জনগোষ্টির (সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম) উপর ঝাপিয়ে পড়ে। নির্বিচারে হত্যা করে। এই অসম যুদ্ধ্ব এবং অমানবিক হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ বা বিরোধিতাতো দূরে থাক জামাত যুদ্ধ্বকালিন দীর্ঘ নয়টি মাস ধরে মরার উপর খরার ঘায়ের মত খুনিদের চেয়েও জঘন্যভাবে খুন হত্যা ধর্ষন তথা হেন হীন দুষ্কর্ম ছিলনা যা দেশের নিরীহ মানুষের উপর চালায়নি। ইসলামতো দুরে থাক ন্যুনতম মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে এই জঘন্যতার দৃষ্টান্ত দুনিয়াতে বিরল। নয় মাসের অন্তস্বত্বা মা ও পাশবিকতা থেকে মুক্তি পায়নি। শুধু তাই নয় যুদ্ধ্বের পরও বর্ষ পরিক্রমায় বিদেশে বসে বিদেশী পয়সায় তারা নির্লজ্জভাবে তথাকথিত “পুর্ব পাকিস্তান” পুণরোদ্ধার কার্য্যক্রম চালিয়ে গেছে। মীরজাফর, হিটলার বা নাজি বাহিনির মত পৃথিবীতে আজ জামাতে ইসলামের পরিচয়ও শুধুমাত্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ্বপরাধী ও মানবতাবিরোধী সংগঠন হিসাবেই চিহ্নিত হয়ে আছে এবং থাকবে।

      কবিরা স্বভাবতইঃ মুক্তমনের অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে থাকেন তাই সবিনয়ে আল মাহমুদ সাহেবকে অনুরোধ ঊনি যখন পবিত্র কোরান শরীফের কথা এনেছেনই তাই সুরা আল বাকারার আয়াত নং – ৮ থেকে ১৮ পর্য্যন্ত স্বকথিত মুমিনদের পরিচয়, তাদের ধরন এবং পরিণতি সম্পর্কে যেন দয়া করে পড়ে দেখেন। বিশ্লেষনে ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু চরীত্র ও কর্মের নিরীখে জামাতের পরিচয় এই পবিত্র আয়াত সমুহে পাওয়া যাবে সন্দেহ নেই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রোহান — জানুয়ারি ৪, ২০১১ @ ১১:২৩ পূর্বাহ্ন

      একজন লেখকের মূল্যায়ন হয় তার রচনা দিয়ে। জামাত করেন কি আওয়ামী লীগ করেন সেটা বিবেচ্য নয়। শামসুর রাহমান দৈনিক পাকিস্তানে চাকরী করলে তাতে সমস্যা হয় না,আল মাহমুদ সংগ্রামে লিখলেই সমস্যা। সদ্যপ্রয়াত আবদুল মান্নান সৈয়দকেও কেউ কেউ জামাতি বানিয়ে দিয়েছে। এটা আমাদের চিন্তার দৈন্য।

      ইংরেজি সাহিত্যের আদি কবি জেফ্রি চসার যখন তীর্থযাত্রা নিয়ে কবিতা লিখেন তখন তাকে কেউ মৌলবাদী কবি বলে না। মহাকবি মিল্টন যখন বেহেস্ত-দোযখ নিয়ে মহাকাব্য লিখেন বা পিউরিটানিক বিশ্বাস লালন করেন তখন তাকে কোনো সাহিত্য সমালোচক প্রতিক্রিয়াশীল কবি বলেনি; অথবা এজরা পাউন্ড যখন নাৎসিদের পক্ষ নিয়েছিল তখন তাকে কেউ নাৎসি বলেনি। একজন সাংবাদিকের উদ্দেশ্য-বিধেয় পরিষ্কার হয় যখন শামসুর রাহমানকে প্রশ্ন করা হয়, ‘আওয়ামী লীগ তো বাকশাল কায়েম করেছিল, লেখার স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়েছিল, ওদের সাথে আপনার বন্ধুত্ব কেন?’ ঠিক একইভাবে রাজু আলাউদ্দিনের উদ্দেশ্যও বোঝা যায়।
      শামসুর রাহমান বেঁচে থাকবেন কবিতায়, আল-মাহমুদ ও তাই, তবে কিছু বিদ্বেষ ছড়ানো লোক হারিয়ে যাবে, সন্দেহ নাই।

      – রোহান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন zunnu rien — জুন ১৪, ২০১৪ @ ৫:৪৮ অপরাহ্ন

      একজন লেখকের সাক্ষাৎকার নিতে হলে ঠিক সেই মানের একজন দরকার হয়। তাহলে পাঠকরা অনেক কিছু পায়। এই সাক্ষৎকারে অন্তত আমি অনেক কিছুই পেয়েছি…
      ধন‌্যবাদ রাজু ভাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সরোজ মেহেদী — মার্চ ১২, ২০১৫ @ ১২:০১ অপরাহ্ন

      আমরা রাজনৈতিক কারণে সবকিছুকে খণ্ড বিখণ্ড করে ফেলছি।এমনকি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকেও। এখানে দেখলাম বিশ্বাসের দোহাইয়ে কবি ও কাব্যকে অস্বীকার করার একটা প্রচেষ্টা! আদতে যার শিকার হচ্ছে বাংলা সাহিত্য।

      আল মাহমুদকে আমাদের মিডিয়াগুলো বিশ্বাসগত কারণে সঠিক মূল্যায়নের প্রয়োজন মনে করেনি কখনো। পৃথিবীর অন্যকোনো দেশে এই অপসংস্কৃতি আছে কি না জানি না? কবিতার বাইরে আল মাহমুদ তার সাহসের জন্য অমর হবেন বলে আমি মনে করি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Hafizur Rahim — জানুয়ারি ২৯, ২০১৭ @ ৪:০৩ পূর্বাহ্ন

      All religious, scientific and social beliefs and knowledge are of human creation. But there is a tendency to undermine Islam as against other religions, by most of the secular intellectuals.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Hafizur Rahim — জানুয়ারি ২৯, ২০১৭ @ ৪:০৬ পূর্বাহ্ন

      All religious, scientific and social beliefs and knowledge are of human creation. But there is a tendency to undermine Islam as against other religions, by most of the secular intellectuals. It is not correct that I have made this remark earlier. If you do not like it, do not publish it. It is OK. But anything not liked by you is a duplicate is not a correct remark.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com