নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৮ বিজয়ী

জ্যঁ-মারি গুস্তাভ ল্য ক্লেজিও’র সাক্ষাৎকার

অবনি অনার্য | ১১ অক্টোবর ২০০৮ ৫:৪৪ অপরাহ্ন

jean-1.jpg
জ্যঁ-মারি গুস্তাভ ল্য ক্লেজিও (জন্ম:১৩/৪/১৯৪০)

মরিশিয়ান বংশোদ্ভুত ফরাসী ঔপন্যাসিক জ্যঁ-মারি গুস্তাভ ল্য ক্লেজিও-র নাম সম্ভাব্য নোবেল সাহিত্য বিজয়ীর তালিকায় আগেই উঠেছিলো, যদিও তাঁর লেখালেখিকে সমালোচকগণ চলতি-সাহিত্যের কোনো ঘরানার অন্তর্ভুক্ত করতে পারেননি। তাঁর নোবেল সাহিত্য বিজয়ের বিষয়টা এতটাই সম্ভাবনাময় ছিলো যে, সাক্ষাতকারগ্রহণকারী একবার প্রশ্নই করেছিলেন, নোবেল বিজয়ী হিসাবে ঘোষিত হবার পর তিনি কী বলবেন। যাহোক, এবার ২০০৮ সালের নোবেল সাহিত্য বিজয়ী হিসাবে তাঁর নামই চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। ল্যাবেল ফ্রান্সের কাছে তাঁর দেয়া সাক্ষাৎকারটি এখানে অনূদিত হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন লে ম্যাগাজিন লিটারেয়ার-এর অ্যাকাডেমিক অ্যান্ড কন্ট্রিবিউটর তীর্থঙ্কর চন্দ।

অনুবাদ: অবনি অনার্য

তীর্থঙ্কর চন্দ: রহস্যময়, দার্শনিক এবং এমনকি বাস্তুবাদী হিসেবে আপনার সাহিত্যকর্মগুলোকে আখ্যায়িত করা হয়। আপনি নিজের মতামতও কি তাই?

জ্যঁ-মারি গুস্তাভ ল্য ক্লেজিও: আপনি যা বলছেন সেভাবে বর্ণনা করা কঠিন। নিজের বইগুলো সম্পর্কে আমাকে বলতে বলা হলে, আমি বরং বলবো যে, ওগুলো ঠিক আমারই মতো। অন্য কথায়, আদর্শ প্রকাশ করার চাইতে আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই — আমাকে এবং আমার বিশ্বাসকে
—————————————————————–
পশ্চিমা সংস্কৃতি বড্ড দানবিক হয়ে উঠেছে। শাহরিক এবং প্রাযুক্তিক দিকগুলোর প্রতি এতটা গুরুত্ব দিচ্ছে যে, এর মধ্য দিয়ে ধর্মীয় বা আনুভূতিক প্রকাশমাধ্যমের সম্ভাবনাকে দমিয়ে রাখছে এই সংস্কৃতি। যুক্তিবাদের নাম করে মানুষের অজ্ঞাত ব্যপ্তিকে উপেক্ষা করা হচ্ছে এর মধ্য দিয়ে। আর এ-সচেতনতাই আমাকে অন্যান্য সভ্যতার প্রতি আকৃষ্ট করেছে।
—————————————————————-
তুলে ধরা। যখন লিখি, তখন মূলত প্রতিদিনকার যাবতীয় ঘটনাবলির সঙ্গে আমার সম্পর্কের অনুবাদই আমি করি। আদর্শ আর চিত্রকল্পের বিশৃঙ্খল ঝনঝনানির মধ্যে আমাদের বাস। আর এ-সময়ের সাহিত্যের ভূমিকা বোধ করি এসব বিশৃঙ্খলার প্রতিধ্বনি করা।

তীর্থঙ্কর: সাহিত্য কি এসব বিশৃঙ্খলাকে প্রভাবিত করতে পারে, বা এসবের কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারে?

গুস্তাভ: এটা তো সাঁর্ত্রের সময় নয় যে, আমরা দম্ভ করে বলবো, একটা উপন্যাস সমাজ বদলে দিতে পারে। আজকাল, সাহিত্যিকরা কেবল তাঁদের রাজনৈতিক নপুংসকতা লিপিবদ্ধ করতে পারেন। সাঁর্ত্র, কামু, দোস প্যাসোস বা স্টেইনবেক পড়বার সময় আপনি পরিষ্কার দেখতে পাবেন, মানবেতিহাসের ভবিকাল এবং লিখিত শব্দের শক্তির প্রতি এসব নিবেদিত লেখকদের কী সীমাহীন বিশ্বাস ছিলো। মনে পড়ে কামু, সার্ত্র এবং মোরিয়াকের লেখা লা’এক্সপ্রেস-এর সম্পাদকীয়গুলো। তখন আমার বয়স সবে আঠারো। ওসব নিবেদিত এডিটোরিয়ালগুলোতে পরিষ্কার পথরেখার হদিস থাকতো। এ-সময়ের এমন কোনো পত্রিকার এডিটোরিয়ালের কথা কি ভাবা যায়, যা আমাদের জীবন-বিধ্বংসী কোনো সমস্যার সমাধানে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে? সমসাময়িক সাহিত্য মূলত নৈরাশ্যসূচক।

তীর্থঙ্কর: আপনাকে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত করা সম্ভব নয় — এমনটা যদি ভাবা হয়, তাহলে সেটার কারণ বোধ করি এই যে, ফ্রান্স আপনার প্রণোদনার একমাত্র উৎস কখনোই ছিলো না। আপনার উপন্যাসগুলো এক বৈশ্বিক কাল্পনিক জগতের অংশ। অনেকটা র‌্যাবো বা সেগালেনের সাহিত্যকর্মের মতো, ফরাসী সাহিত্যের সমালোচকগণ যেগুলোকে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীভূক্ত করতে হিমশিম খেয়েছেন।

গুস্তাভ: প্রথমত, আমাকে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীবদ্ধ করা যাচ্ছে না বলে আমি মোটেও হতাশ নই। আমি মনে করি, গোষ্ঠীছুট উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি বহুপ্রকরণমুখী, নানাবিধ আদর্শ-ভাবনার স্মারক, যা শেষতক বহুধা-মেরুতে-বিভক্ত পৃথিবীরই প্রতিফলন।

jean-2.jpgচলতি ফরাসী সাহিত্য বোদ্ধারা তথাকথিত সর্বজনীন আইডিয়া তথা এনসাই ক্লোপিডিয়ার যোগ্য উত্তরসূরীর আদলে নতুন আইডিয়া গুলোকে “বৈদেশি” বলে আখ্যা দেবার কূটকৌশল অবলম্বন করেন। র‌্যাবো এবং সেগালেন তাঁদের জীবদ্দশাতেই তার মূল্য দিয়ে গেছেন। এমনকি এখনও পর্যন্ত, দক্ষিণের সাহিত্যিকগণ তাঁদের সাহিত্যকর্ম “বৈদেশি” শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে একমত হলেই কেবল সেসব এখানে প্রকাশিত হয়। এই মুহূর্তে আমার যে-নামটি মনে আসছে, তিনি হচ্ছেন মরিশিয়ান লেখক আনন্দ দেবি। গালিমার্ডস প্যানেল অব রিডার্স-এ থাকাকালীন তাঁর লেখার বিশেষ প্রশংসা করেছিলাম আমি। কিন্তু বাকিদের মন্তব্য হচ্ছে, তাঁর পাণ্ডুলিপি যথেষ্ট “বৈদেশি” নয়।

তীর্থঙ্কর: অন্যান্য সংস্কৃতির প্রতি আপনার এতো মুগ্ধদৃষ্টি কেন?

গুস্তাভ: পশ্চিমা সংস্কৃতি বড্ড দানবিক হয়ে উঠেছে। শাহরিক এবং প্রাযুক্তিক দিকগুলোর প্রতি এতটা গুরুত্ব দিচ্ছে যে, এর মধ্য দিয়ে ধর্মীয় বা আনুভূতিক প্রকাশমাধ্যমের সম্ভাবনাকে দমিয়ে রাখছে এই সংস্কৃতি। যুক্তিবাদের নাম করে মানুষের অজ্ঞাত ব্যপ্তিকে উপেক্ষা করা হচ্ছে এর মধ্য দিয়ে। আর এ-সচেতনতাই আমাকে অন্যান্য সভ্যতার প্রতি আকৃষ্ট করেছে।

তীর্থঙ্কর: অন্যান্য যেসব সভ্যতা-সংস্কৃতির কথা বললেন, তার মধ্যে বিশেষভাবে আছে মেক্সিকোর কথা, সাধারণ অর্থে আমেরিন্ডিয়ান জগতের কথা। মেক্সিকোকে জানলেন কীভাবে?

গুস্তাভ: সামরিক প্রশিক্ষণ নেবার উদ্দেশে আমাকে মেক্সিকো পাঠানো হয়েছিলো। দু’বছর ওখানে কাটিয়েছি আমি। ঘুরে দেখবার সুযোগ হয়েছে। পানামাতে আমি এমবেরাদের সংস্পর্শে আসি। ইন্ডিয়ান ফরেস্টের ওই মানুষজনদের সঙ্গে আমি চার বছর (১৯৭০-৭৪) কাটিয়েছি। সে-অভিজ্ঞতা আমাকে বড্ড নাড়া দিয়েছিলো, কেননা ওখানে আমি এমন এক জীবনাচারের সন্ধান পাই, যার সঙ্গে আমার ইয়োরোপ-জীবনের অভিজ্ঞতার কোনো সম্বন্ধ নাই, এমনকি ওই জীবনের মুখাপেক্ষীও নয়। এমবেরা জনগোষ্ঠী তাঁদের প্রকৃতি, পরিবেশ এবং নিজেদের মধ্যে এমন অনুপম ঐকতান বজায় রেখে জীবনযাপন করেন যে, কোনোরূপ ধর্মীয় বা আইনী কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন হয় না তাঁদের। ফেরার পথে সেই অসাধারণ সামাজিক সংসক্তি প্রসঙ্গে বলছিলাম আমি, আর অমনি সমালোচকেরা আমার বিরুদ্ধে সরলীকরণের অভিযোগ আনলেন, “পবিত্র বর্বরতা”র লোককথায় পর্যবসিত বলে আমাকে গালমন্দ করলেন। অথচ আমি এভাবে বলতে চাইনি। আমি কিন্তু তাঁদেরকে পবিত্র বা মহান গোছের কিছু বলে উল্লেখ করিনি। আমি কেবল বলতে চেয়েছি যে, তাঁদের জীবনযাপনপদ্ধতি ভিন্ন, ভিন্ন তাঁদের মূল্যবোধ।

তীর্থঙ্কর: আপনার পরিবার উঠে এসেছে মরিশাসের নিউ মেক্সিকোর আলবাকারেক থেকে, আর আপনার মা এখনো থাকছেন নাইসে। ইদানীং আপনার জীবন এ-দুটো জায়গায় ভাগাভাগি হয়ে গেছে। আপনার নিজেরই মতো, আপনার ফিকশনের চরিত্রগুলোও দেখা যায় একাধিক মহাদেশ বিহারে ছিন্নবিচ্ছিন্ন। যেমন ধরা যাক, কিওর ব্রুলে এট অত্রেস রোমান্সেস-এর আখ্যানের একটা অংশ জুড়ে আছে মেক্সিকো। প্রথম ভাগে আছে দুজন রমণীর কথা, যাঁদের ছোটবেলা কেটেছে ওই দেশে। ছিন্নবিচ্ছিন্ন ছেলেবেলার কাহিনী। এবং তাদের দুজনকেই ছেলেবেলার ঘটনাবলী নিয়ে মোহাচ্ছন্ন বলে মনে হয়। তাঁদের দুজনকে কি তবে যাযাবর জীবনের ভুক্তভোগী বলা যায়?

গুস্তাভ: তাঁদের ভোগান্তির মূল কারণ একইসঙ্গে দুটো সংস্কৃতির ধারক হওয়া। ছোট একটি বাচ্চার পক্ষে দুটো সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটানো খুবই কঠিন, বিশেষত যেখানে আছে মেক্সিকান সংস্কৃতির মতো প্রত্যক্ষ, দেহাতী এবং বহির্মুখী, আর তার বিপরীতে আছে গৃহভিত্তিক, অন্তর্মুখী এবং স্কুলের নিয়মরীতিভিত্তিক পরিচালিত ইয়োরোপিয়ান সংস্কৃতি। আমি মূলত সংস্কৃতির দ্বন্দ্বটাই তুলে ধরতে চেয়েছিলাম ওখানে।

তীর্থঙ্কর: তাহলে আবার “রোম্যান্স” কেন?

গুস্তাভ: বিয়োগান্ত কিছু পরিস্থিতি বর্ণনার জন্য এ-শব্দটা কিন্তু সত্যিই খানিকটা কর্কশ হয়ে গিয়েছিলো। বইটিতে সাতটি ডার্ক শর্ট স্টোরি ছিলো। রোম্যান্টিক ফিকশনে সামাজিক সত্যের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানবিক অনুভূতি। আমার মনে হয়, ফিকশনের কাজ হচ্ছে ব্যক্তিক অনুভূতি আর সামাজিক তথা বাস্তব পৃথিবীর মধ্যকার এসব চড়াই উৎরাই তুলে ধরা। অন্যদিকে, ওই সংকলনটির সবক’টা গল্পই আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতালব্ধ প্রকৃত ঘটনার প্রেক্ষিতে লেখা। ফলে ওগুলো সত্যিকারের গল্প। গল্পগুলোতে “ভাবাবেগ” পাবেন, যা আপনি পত্রিকার “নিউজ ইন ব্রিফ” বিভাগেও পাবেন।

তীর্থঙ্কর: আপনার বইগুলোতে প্রকরণের সীমারেখা বেশ অস্পষ্ট। প্রথাগত ফিকশনাল ন্যারেটিভ থেকে ঢের দূরে। আপনার কি মনে হয়, ১৯-শতকী উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে বর্তমানকালেও রচিত উপন্যাসগুলো এতোটাই তাদের উৎসমূল তথা বুর্জোয়া ভাবধারা-নিয়ন্ত্রিত যে, ওগুলো উত্তরাধুনিক এবং উপনিবেশোত্তর পৃথিবীর জটিল ধারার প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না?

গুস্তাভ: উপন্যাস তো বুর্জোয়া ঘরানারই। গোটা ঊনিশ শতক ধরেই বুর্জোয়া পৃথিবীর ভালো-মন্দ সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছে উপন্যাস। এরপর এলো সিনেমা। ফলে সে উপন্যাসের চরিত্রগুলোর জায়গা দখল করে বুঝিয়ে দিলো যে, পৃথিবীটাকে তুলে ধরবার ক্ষেত্রে সিনেমা আরো বেশি কার্যকর। ওদিকে লেখকরাও উপন্যাসের ঘরানা থেকে খানিকটা সরে এসে আদর্শবাদ বা অনুভূতির ছোঁয়া দিতে চাইলেন তাতে। তখনই তারা বুঝতে পারলেন, কতোটা নমনীয় এবং তরল হয়ে গেছে নবতর এ-রূপটি, যেখানে এক্সপেরিমেন্ট করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। তারপর থেকে প্রত্যেক প্রজন্মই তাদের মতো করে নতুন নতুন রূপে উপন্যাস লিখতে চেয়েছে, নতুন নতুন উপাদান যোগ করেছে এতে। আমার মনে পড়ছে মরিশিয়ান ঔপন্যাসিক আভিম্যান্যু উনুথ-এর কথা। সম্প্রতি তাঁর উপন্যাসের অনুবাদ, লাল প্যাসিনা, প্রকাশিত হলে তাঁকে আমি জানতে পারি। এ-উপন্যাসটি আপনাকে ইউজিন স্যু-র কথা মনে করিয়ে দেবে। উনুথ গতানুগতিক উপন্যাসের আঙ্গিকই ব্যবহার করেছেন, কিন্তু এরই সঙ্গে যুক্ত করেছেন মহাকাব্যিক উপাদান, আর ইন্ডিয়ান কাব্যঘরানার গান এবং ছন্দ। ফলে আপনি দ্য ওয়ান্ডারিং জিউ, লেস মিসটেরেস দে প্যারিস এবং রামায়ণের পুনর্পাঠের রসাস্বাদন করতে পারবেন।

তীর্থঙ্কর: আপনার উপন্যাসে আত্মজীবনীরও সংযুক্তি আছে। আপনি কি আপনার ইতিহাস এবং নিজের জীবন-অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করবার ইচ্ছা থেকে এটা করছেন?

গুস্তাভ: আমার প্রিয় ঔপন্যাসিকের তালিকায় আছেন স্টিভেনসন এবং জয়েস। তাঁদের প্রণোদনার উৎস ছিলো নিজ নিজ জীবনের গোড়ার দিককার অভিজ্ঞতা। নিজেদের লেখার মধ্য দিয়ে তাঁরা তাঁদের অতীতকে পুনর্জীবিত করেছেন, এবং এর অর্থ উদ্ঘাটনের প্রয়াস নিয়েছেন। জয়েসের ইউলিসিস পড়লে আপনি বুঝতে পারবেন, জয়েস তাঁর সমসাময়িক সময় ধরতে চাননি, বরং তাঁর অতীত অভিজ্ঞতা ধরতে চেয়েছেন, ধরতে চেয়েছেন সেসব উপাদান যার বদৌলতে তিনি জয়েস হয়েছেন। রাস্তার প্রায়-অস্ফূট শব্দাবলী, কথোপকথনের ছেঁড়া অংশবিশেষ, বিদ্যালয়ের শারীরিক শাস্তিসমূহ, যা তাঁকে তখনো পর্যন্ত তাড়িত করেছে। নাইপলও তাঁর জীবনের গোড়ার দিককার ঘটনাবলী তুলে ধরেছেন। সাহিত্য তখনই শক্ত জমিন পায়, যখন সে প্রকাশ করতে পারে প্রথম অনুভূতি, প্রথম অভিজ্ঞতা, প্রথম দর্শন আর প্রথম হতাশাবোধের বয়ান।

তীর্থঙ্কর: আপনার বই পড়ে পাঠকদের ধারণা হয় যে, আপনার চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে, চরিত্রগুলো একটি মাতৃভূমির সন্ধান করে, যা প্রথাগত এবং জাতিগত প্রচল ধারণার ঊর্ধ্বে। সালমান রুশদিও ‘কাল্পনিক মাতৃভূমি’র কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, নির্বাসিত লেখক ফের তাঁর জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন। আপনার কাল্পনিক মাতৃভূমি কেমন?

গুস্তাভ: নিজেকে আমি নির্বাসিত মনে করি এজন্য যে, আমার পরিবার পুরোপুরি মরিশিয়ান। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আমরা বেড়ে উঠেছি মরিশিয়ান লোকগাথা, খাদ্যদ্রব্য, কিংবদন্তী আর সংস্কৃতির নির্যাস শুষে। এটি ইন্ডিয়া, আফ্রিকা আর ইয়োরোপের সম্মিলিত সংস্কৃতি। আমার জন্ম ফ্রান্সে, তার সংস্কৃতির হাত ধরেই আমার বেড়ে ওঠা। নিজেই নিজেকে বলতাম, আমার নিশ্চয়ই অন্য-একটা প্রকৃত জন্মভূমি আছে। একদিন আমি ঠিকই পৌঁছাবো সেখানে, দেখবো কেমন দেখতে ছিলো ওটা। ফলত, ফ্রান্সে নিজেকে আমি সবসময়ই “বৈদেশি” বলে মনে করেছি। অন্যদিকে আমি ফরাসী ভাষা ভীষণ ভালোবাসি, যা সম্ভবত আমার একমাত্র প্রকৃত দেশ। কিন্তু ফরাসী জাতির কথা ভাবলে নিজেকে আমার একাত্ম মনে হয় না।

তীর্থঙ্কর: আমার ধারণা আপনার পূর্বসূরীরা ফ্রেঞ্চ ছিলেন, ঘটনা সত্যি?

গুস্তাভ: লে ক্লেজিওসদের উৎসভূমি ব্রিটানির মরবিহান। বিপ্লবের সময়, বিপ্লবী সেনাবাহিনী আমার এক পূর্বসূরীকে তাঁর লম্বা চুল ছেঁটে ফেলতে বললে, তিনি সেনাবাহিনীতে নাম লেখাতে নারাজ হন। পরে, তিনি বাধ্য হয়ে ফ্রান্সে চলে আসেন। লক্ষ্য ছিলো তাঁর ইন্ডিয়া যাওয়া, এবং সে-উদ্দেশে তিনি লে ক্যুরিয়ার দেস ইনদেস নামক বড়নৌকায় চেপে বসেন পুরো পরিবারসুদ্ধ। কিন্তু মরিশাসে এসে তিনি নৌকা থেকে নেমে পড়েন, কেননা তাঁর স্ত্রীর আত্মীয়স্বজনদের কেউ কেউ তখনো দ্বীপে রয়ে গেছেন। এই দুঃসাহসী এবং বিপ্লবী পূর্বসূরীর হাত ধরেই লে ক্লেজিও পরিবারের মরিশিয়ান বাহিনীর গোড়াপত্তন। তিনিই আমার পরবর্তী উপন্যাসের নায়ক। এ-মুহূর্তে মরিশাসে তাঁর স্থায়ী হবার গল্প লিখছি। একটা কিছু থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে পৃথিবীর অন্য একটা প্রান্তে পাড়ি জমানো এ-ব্যক্তির সঙ্গে নিজেকে আমি একাত্ম মনে করি। আমি তাঁকে বুঝতে পারি বলে আমার বিশ্বাস।

তীর্থঙ্কর: আপনাকে সম্ভাব্য নোবেল সাহিত্য বিজয়ী হিসাবে গণ্য করা হয়। ধারণা করা যাক, আগামীকাল আপনি নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেলেন। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে আপনি কী বলবেন?

গুস্তাভ: এটা বেশ হাইপোথেটিক্যাল একটা প্রশ্ন। নোবেল বিষয়ে কী বলবো জানি না, তবে জনসম্মুখে আমি কী বলতে চাই সেটা আমি জানি। আমি সেসব যুদ্ধের কথা বলতে চাই যেখানে অজস্র শিশুর মৃত্যু হয়। আমার মতে এটিই আমাদের সময়ের সবচাইতে দুঃখজনক ঘটনা। জনগণকে এ-বিষয়টা মনে করিয়ে দেয়া, এবং এর গতিরোধ করার একটি উপায় সাহিত্য। আফগানিস্তানের নারীদের স্বাধীনতা দেয়া হয়নি বলে সম্প্রতি প্যারিসের নারীমূর্তিগুলো ঢেকে দেয়া হয়েছে। ভালো। একইভাবে, পৃথিবীর তাবৎ শিশু-প্রতিকৃতির বুক বরাবর লালদাগ দিয়ে সবাইকে মনে করিয়ে দেয়া দরকার যে, প্রতি মুহূর্তে প্যালেস্টাইন, দক্ষিণ আমেরিকা বা আফ্রিকার কোনো-না-কোনো শিশু বুলেটের আঘাতে নিহত হচ্ছে। মানুষজন এসব নিয়ে কখনোই কথা বলতে চায় না।

aunarjo@gmail.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরাফাত — অক্টোবর ১১, ২০০৮ @ ৭:১৬ অপরাহ্ন

      খুব ভাল লেগেছে…। ধন্যবাদ।

      – আরাফাত

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Zubair Hossain — অক্টোবর ১২, ২০০৮ @ ৬:৩২ অপরাহ্ন

      ভালো লাগল। ধন্যবাদ।

      – Zubair Hossain

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রানা আশরাফ — অক্টোবর ১২, ২০০৮ @ ৯:২৯ অপরাহ্ন

      এইমাত্র সাক্ষাৎকারটি পড়লাম। লেখকের কিছু কথা খুব ভাল লাগল। সাক্ষাৎকারটি তাঁর নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগে দেয়া। এবার পুরস্কার পাওয়ার পরের অনুভূতিটা জানতে চাই। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া অবশ্য এর আগেই পেয়েছি। আরেকটি সাক্ষাৎকারের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। অপেক্ষায় রইলাম। সাক্ষাৎকার অনুবাদ ও প্রকাশের জন্য ধন্যবাদ।

      – রানা আশরাফ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dhreeti Ranjan Basu — অক্টোবর ১৩, ২০০৮ @ ৪:০৭ অপরাহ্ন

      অসাধারণ! ধন্যবাদ।

      – Dhreeti Ranjan Basu

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইমতিয়ার — অক্টোবর ১৪, ২০০৮ @ ৩:২২ পূর্বাহ্ন

      ”সাহিত্য তখনই শক্ত জমিন পায়, যখন সে প্রকাশ করতে পারে প্রথম অনুভূতি, প্রথম অভিজ্ঞতা, প্রথম দর্শন আর প্রথম হতাশাবোধের বয়ান।”

      ”আমি সেসব যুদ্ধের কথা বলতে চাই যেখানে অজস্র শিশুর মৃত্যু হয়। আমার মতে এটিই আমাদের সময়ের সবচাইতে দুঃখজনক ঘটনা। জনগণকে এ-বিষয়টা মনে করিয়ে দেয়া, এবং এর গতিরোধ করার একটি উপায় সাহিত্য। আফগানিস্তানের নারীদের স্বাধীনতা দেয়া হয়নি বলে সম্প্রতি প্যারিসের নারীমূর্তিগুলো ঢেকে দেয়া হয়েছে। ভালো। একইভাবে, পৃথিবীর তাবৎ শিশু-প্রতিকৃতির বুক বরাবর লালদাগ দিয়ে সবাইকে মনে করিয়ে দেয়া দরকার যে, প্রতি মুহূর্তে প্যালেস্টাইন, দক্ষিণ আমেরিকা বা আফ্রিকার কোনো-না-কোনো শিশু বুলেটের আঘাতে নিহত হচ্ছে। মানুষজন এসব নিয়ে কখনোই কথা বলতে চায় না।”

      এই প্রথম গুস্তাভের কোনও সাক্ষাৎকার পড়লাম, আর সেজন্যে ধন্যবাদ অবনি অনার্যকে। তাঁর কোনও লেখাও পড়িনি, আশা করছি অবনি সে অভাবটুকু ঘুচানোর সুযোগ করে দেবেন গুস্তাভের কোনও লেখা অনুবাদ করে।

      – ইমতিয়ার

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com