মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ১২)

অদিতি ফাল্গুনী | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৮ ৬:২১ অপরাহ্ন

—————————————————————-
বশ মানা শরীরগুলো
—————————————————————–

কিস্তি: ১০১১

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

work-table-2.jpg
কাজের টেবিলে মিশেল ফুকো, ছবি:মার্টিন ফ্রাঙ্ক

খণ্ড ৩ : শৃঙ্খলা

প্রথম অধ্যায়: বশ মানা শরীরগুলো (Docile Bodies)
(পৃষ্ঠা ১৩৫-১৪৫)

(গত সংখ্যার পর)

আসুন, সপ্তদশ শতকের শুরুতে সৈন্যের যে আদর্শ মূর্তি কল্পনা করা হতো, সেই আদর্শ মূর্তিটির কথা আমরা ফিরে আর একবার ভাবি তো! গোড়ার কথা বলতে হলে, একজন আদর্শ সৈন্য হলেন তিনিই যাকে বহু দূর থেকে দেখেও চমৎকার চেনা যেত। আদর্শ সৈন্যকে চেনার কিছু সহজ লক্ষণ বা চিহ্ন ছিল। একদিকে তাঁর শক্তিমত্তা এবং সাহসের সাধারণ চিহ্ন তো ছিলই, সেই সাথে ছিল তাঁর গৌরবের কিছু লক্ষণ। তাঁর দেহসৌষ্ঠবই তাঁর শৌর্যবীর্য প্রকাশের মাধ্যম। একথা সত্য যে যুদ্ধবিদ্যা একজন সৈনিককে শিখতে হয় অল্প অল্প করে। সাধারণতঃ প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রেই এই শেখার প্রক্রিয়াটা চলে। তবু
—————————————————————–
বহুদিন ধরেই ‘পুঙ্খানুপুঙ্খতা’ ধর্মতত্ত্ব এবং তপশ্চর্যার একটি প্রণালী হয়ে দাঁড়িয়েছে। … যেহেতু ঈশ্বরের দৃষ্টিতে কোনো অসীমতাই একটি ক্ষুদ্র অনুষঙ্গের চেয়ে বড় নয় এবং কোনোকিছুই এত ক্ষুদ্র নয় যা ঈশ্বরের একটি ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা হতে তৈরি হয়নি। পুঙ্খানুপুঙ্খতার প্রতাপের এই প্রবল ঐতিহ্যে, খ্রিষ্টীয় শিক্ষা, যাজকিয় অথবা সামরিক স্কুলশিক্ষার যাবতীয় সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয়, যাবতীয় ‘প্রশিক্ষণ’ তাদের জায়গা ঠিকঠাকমতো খুঁজে পেয়েছে।
—————————————————————-
japan-trip.jpg
জাপানে ফুকো

মার্চপাস্ট করার মতো শারীরিক নড়াচড়া কিম্বা গর্বিত ভঙ্গিতে মাথা তুলে রাখার মতো মনোভাব প্রায়শঃই একজন সৈন্যের সামাজিক সম্মানের শারীরিক অলঙ্করণ হয়ে দাঁড়ায়। ‘সৈনিকের পেশার সাথে খাপ খায় এমন বিভিন্ন চিহ্নের ভেতর সজীব কিন্তু সতর্ক ভঙ্গিমা, উঁচু মাথা, টানটান পাকস্থলী, চওড়া কাঁধ, দীর্ঘ বাহু, শক্ত দেহকাঠামো, কৃশকায় উদর, পুরু উরু, পাতলা পা এবং শুকনো পায়ের পাতা উল্লেখযোগ্য। এমন দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী পুরুষটি ক্ষিপ্র এবং বলিষ্ঠ না হয়ে যায় না।’ সৈনিক যখন বর্শাধারী হবেন তখন ‘সৈনিককে মার্চপাস্টের সময় এমনভাবে পা ফেলতে হবে যেন প্রতিটি পদক্ষেপে যথাসম্ভব মহিমা ও ভাবগাম্ভীর্য ফুটে ওঠে। কেননা, বর্শা হলো একটি সম্মানজনক অস্ত্র যা কেবলমাত্র ভাবগাম্ভীর্য ও সাহসের সাথেই শুধু বাহিত হতে পারে।’ (মন্টগোমারি, ৬ এবং ৭)। আঠারো শতকের শেষ নাগাদ ‘সৈন্য’ হয়ে দাঁড়ালো এমন এক ভাবমূর্তি যা এমনকি ছিরিছাঁদহীন এক তাল কাদা থেকেও বানানো যায়। শুরুতে একটি অদক্ষ দেহ। তার দেহভঙ্গিমা ধীরে ধীরে শুধরে নেওয়া হয়। দেহের প্রতিটি অংশে একধরনের হিসেবী সংযম ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়। এই সংযম সৈনিকের দেহটিকে একসময় অধিগত করে; তাকে ইচ্ছামাফিক বদলানোর উপযোগী করে। যেন সৈনিকের দেহটি সবসময়ই হুকুম তামিলের জন্য প্রস্তুত থাকতে পারে। অভ্যাসের স্বয়ংক্রিয়তায় তার শরীর যেন নিঃশব্দে দীক্ষিত হয়। সোজা কথায়, তাকে যেন সহজেই ‘চাষীর ভাব-ভঙ্গি কাটিয়ে উঠে’ ‘সৈনিক সৈনিক ভাব’ দেখতে হয় (১৭৬৪ সালের অধ্যাদেশ ২০)। সৈন্যদের নিয়োগ ক্রমশঃই হয়ে উঠলো ‘তাদের মাথা সিধা ও উঁচু রাখা, পিঠ না বাঁকিয়ে এবং পেটে এতটুকু ভাঁজ না ফেলে টানটান দাঁড়ানো, বুক ও কাঁধ শক্ত করে রাখার মতো ক্ষমতা অর্জনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এমন শক্ত-পোক্ত ভাবে দাঁড়ানোর অভ্যাস অর্জনের জন্য সৈন্যদের দেয়ালে ঠেস দিয়ে এমন ভঙ্গিতে দাঁড়াতে বলা হতো যেন তাদের পায়ের গোড়ালি, উরু, কোমর এবং কাঁধ দেয়াল স্পর্শ করতে পারে। পিঠ এবং হাতও দেয়াল স্পর্শ করবে। এর ফলে কেউ যদি বাইরের দিকে হাত প্রসারিত করে, শরীর না নেড়েই সে হাত প্রসারিত করতে পারবে… একইভাবে, মাটির দিকে চোখ নিচু করে থাকতে তাদের কখনোই শেখানো হবে না, বরং তাদের পাশ দিয়ে যাতায়াত করা সব মানুষের চোখের দিকে তাদের সরাসরি তাকাতে শেখানো হবে… শেখানো হবে নির্দেশ না আসা অবধি মাথা, হাত ও পা না নাড়িয়ে নিশ্চল থাকতে… এবং শেষপর্যন্ত সাহসী পদক্ষেপে হাঁটু এবং উরু শক্ত রেখে মার্চ পাস্ট করবে তারা। পায়ের পাতার উপর সূচ্যগ্র টানটান ও বাইরের দিকে মুখ করা ভঙ্গিমায় এই মার্চ পাস্ট সম্পন্ন হবে।’ (১৭৬৪ সালের ২০ শে মার্চের অধ্যাদেশ)।

ধ্রুপদী যুগ শরীরকে ক্ষমতার বস্তু এবং লক্ষ্য হিসেবে আবিষ্কার করেছিল। সেসময় শরীরকে ব্যবহারোপযোগী করে তোলা, ছাঁচে ঢালাই করা, প্রশিক্ষিত করার জন্য মনোনিবেশের প্রচুর তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। এত প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য ছিল যেন মানবশরীর অনুগত হয়। যেন সে ক্ষমতার ডাকে সাড়া দেয়, দক্ষ হয় এবং তার শক্তি বৃদ্ধি করে। দুটো নিবন্ধন বা নথিতে মানব-যন্ত্র (Man the Machine) গ্রন্থটি যুগপৎভাবে রচনা করা হয়। এই দুটো নথির প্রথমটি হলো অধিবিদ্যা-অঙ্গব্যবচ্ছেদ নথি (anatomico-metaphysical register) যার প্রথম পাতাটি লিখেছেন দেকার্তে এবং পরবর্তী সময়ে পরমাণুবিদ এবং দার্শনিকেরা এই নথির পরম্পরা রক্ষা করেছেন। অপর নথিটি হলো প্রযুক্তিগত-রাজনৈতিক (technico-political) নথি যা একটি গোটা বিধি-নিয়মের ব্যবস্থা এবং সেনাবাহিনী, স্কুল ও হাসপাতালের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ব্যবহারিক ও নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি দ্বারা গঠিত ছিল। মানব শরীরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও সংশোধনের জন্যই এই নথিটি গঠিত হয়েছিল। আলোচ্য দুই নথি অবশ্য ছিল পরস্পর সম্পূর্ণ পৃথক। কারণ একটি নথি চেয়েছে মানব শরীরকে নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবহার করতে। অপর নথিটি চেয়েছে শরীরকে সক্রিয় রাখতে এবং ব্যাখ্যা করতে। সুতরাং, এই দুই নথি অনুযায়ী মানব শরীর ছিল দুই ধরনের। প্রয়োজনীয় মানব দেহ ও বুদ্ধিদীপ্ত মানব দেহ। এবং, এমন শ্রেণিকরণের পরও পরস্পর পরস্পরকে অভিক্রমণের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। লা মেত্রিসের (La Mettrie’s) মানব যন্ত্র (L’Homme-machine) একইসাথে আত্মার বস্তুগত হ্রাস (materialist reduction of soul) এবং বশ্যতা ভঙ্গের তত্ত্ব বৈকি। এই তত্ত্বের কেন্দ্রে আছে ‘বাধ্যতা’ বা ‘বশ্যতা’র ধারণা যা ‘বিশ্লেষণযোগ্য’ মানব শরীরকে ‘ব্যবহারযোগ্য মানব শরীরে রূপান্তরিত করে। একটি শরীরকে তখনি বাধ্য বা বশ বলা যায় যখন তা অধীনস্থ, ব্যবহৃত, রূপান্তরিত ও উন্নীত হতে পারে। অন্যদিক থেকে দেখলে, মানবশরীরের স্বতোনিয়ন্ত্রণ বা স্বতোশ্চলনের জনপ্রিয় ধারণা মানবসত্তার আন্তঃনির্ভরশীলতা উদাহরণযোগে বর্ণনার পন্থা মাত্র ছিল না। একইসাথে তা ছিল রাজনৈতিক পুতুল নাচ, ক্ষমতার ক্ষুদ্রায়তন নমুনা। সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক, ক্ষুদ্র যত যন্ত্র, সুশিক্ষিত সেনাবাহিনী এবং দীর্ঘ অনুশীলনের পুঙ্খানুপুঙ্খ সম্রাট, এসব নিয়েই মোহগ্রস্থ ছিলেন।

শরীরকে বশ মানানোর এই প্রকল্পে কি এমন নতুনত্ব ছিল যে গোটা আঠারো শতক এ ব্যাপারে এত আগ্রহী হয়ে পড়লো? শরীরকে এমন কর্তৃত্বব্যঞ্জক এবং কড়াকড়ি বিনিয়োগের অধীনস্থ করার প্রচেষ্টা নিশ্চিতভাবেই এই প্রথম ছিল না। প্রতিটি সমাজেই শরীর ছিল কঠোর ক্ষমতার মুঠোয় যা শরীরের উপর বাধা, নিষেধ ও দায় চাপিয়েছে। যাহোক, কৌশলগুলোতে কিছু নতুন বিষয়ও ছিল। শুরু হতে বললে, শৃঙ্খলায় অন্তর্নিহিত ছিল নিয়ন্ত্রণের কিছু নির্দিষ্ট মাত্রা। কাজেই, এটা অবিভাজ্য এককের মতো শরীরকে ‘গণহারে’ ‘পাইকারি বিক্রয়ের’ বস্তু হিসেবে দেখার মতো কোনো প্রশ্ন ছিল না। শরীরকে ব্যক্তিগতভাবে ‘খুচরা বিক্রি’র মতো কিছু হিসেবে দেখাটাই বরং নির্ধারিত ছিল। শরীরের উপর তীব্র দমনপীড়ন চালানো, নির্মাণকৌশলের স্তরেই শরীরের উপর আধিপত্য ধরে রাখা — নড়াচড়া, দেহভঙ্গিমা, মনোভাব, দ্রুততা: সক্রিয় শরীরের উপর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ক্ষমতা। অতঃপর আসে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যবস্তু। শরীরের ভাষার অথবা ব্যবহারের দ্যোতক উপকরণ হিসেবে এগুলো আর কাজ করছিল না। কিন্তু, শারীরিক গতিশীলতার পরিমিতি ও দক্ষতা, তাদের অভ্যন্তরীণ সংগঠন এবং সংযম প্রতীকের বদলে শক্তির উপরই বেশি স্বাক্ষর রাখে। অনুশীলনই হলো একমাত্র সত্যিকারের উৎসব। আর সবশেষে রয়েছে ক্রিয়াপদ্ধতি: যা মানব শরীরের উপর এক অব্যাহত ও ধারাবাহিক দমনপীড়ন চালায়। যা কিনা ফলাফলের চেয়ে শরীরের কর্মকাণ্ডের প্রক্রিয়া তদারকিতে বেশি ব্যস্ত থাকে। এবং এই অনুশীলন বিধিবদ্ধতার কিছু নিয়মানুসারে পরিচালিত হয় যা যতটা নিবিড়ভাবে সম্ভব সময়, স্থান এবং শরীরের গতিশীলতাকে পৃথক করে। এই পদ্ধতিসমূহ যা কিনা দেহের কার্যক্রমের পুঙ্খানুপুঙ্খ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব করে তুলেছিল, যা কিনা শরীরের শক্তিগুলোর লাগাতার পরাধীনতা নিশ্চিত করেছিল এবং শক্তিগুলোর উপর একধরনের বশ্যতা-উপযোগের সম্বন্ধ আরোপ করেছিল, তাদেরকেই ‘শৃঙ্খলা’ বলা যেতে পারে। সন্ন্যাসীদের মঠ, সেনাবাহিনী ও কারখানায় প্রচুর শৃঙ্খলামূলক পদ্ধতি বহুদিন ধরেই প্রচলিত রয়েছে। তবে, সতেরো ও আঠারো শতক নাগাদ শৃঙ্খলা আধিপত্যের সাধারণ নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। শৃঙ্খলা অবশ্য দাসত্ব থেকে আলাদা। যেহেতু শরীরের আত্মসাৎকরণের সম্বন্ধের উপর তা নির্ভরশীল নয়। তথাপিও মানব শরীরের সাথে তার মূল্যবান এবং ভয়ানক সম্পর্ক প্রয়োগের মাধ্যমে যথাসম্ভব বৃহৎ আকারে উপযোগের ফলাফল অর্জনেই শৃঙ্খলার আভিজাত্য নিহিত ছিল। এই শৃঙ্খলা কিšত্ত ‘সেবা’ থেকেও আলাদা ছিল। ‘সেবা’ ছিল আবার আধিপত্যের এক ধারাবাহিক, সামগ্রিক, প্রকাণ্ড, অ-বিশ্লেষণী এবং অপরিমিত সম্পর্ক যা প্রভুর ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও ‘খামখেয়ালে’র আঙ্গিকে গঠিত ছিল। জায়গিরদারি (vassalage — রাজা বা উপরওয়ালার প্রতি বশ্যতা ও আনুগত্যের শর্তে জমি ভোগকারী প্রজা; জায়গিরদার, অনুগত দাস বা ক্রীতদাস — অনুবাদক) হতেও তা পৃথক ছিল। জায়গিরদারি বা ভূমিদাসত্ব ছিল সমর্পণের চূড়ান্ত মাত্রায় বিধিবদ্ধ কিšত্ত দূরাগত এক সম্বন্ধ যা অধীনস্থের শরীরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের চাইতে শ্রমের উৎপাদন এবং আনুগত্যের আনুষ্ঠানিক চিহ্নের উপর বেশি জোর দিত। আবার, এই শৃঙ্খলা কিন্তু তপশ্চর্যা বা সন্ন্যাসী সুলভ ‘শৃঙ্খলা’ হতে আলাদা ছিল। কেননা, সন্ন্যাসী সুলভ ‘শৃঙ্খলা’র কাজ ছিল উপযোগ বাড়ানোর বদলে আত্ম-অস্বীকৃতি অর্জন। যদিও সন্ন্যাসী সুলভ ‘শৃঙ্খলা’র ক্ষেত্রেও অপরের মান্যতা অর্জনের বিষয়টি কাজ করতো, তবে এ ধরনের শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তিরই তার নিজের শরীরের উপর ‘প্রভুত্ব’ অর্জনের বিষয়টি বেশি কার্যকর ছিল। শৃঙ্খলার ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ছিল ঠিক সেই মুহূর্ত যখন মানব শরীরের শিল্প জন্ম লাভ করেছে। শুধু মাত্র শরীরের দক্ষতা বাড়ানোই কিন্তু শৃঙ্খলার লক্ষ্য ছিল না। কিম্বা, শরীরের বশ্যতা তীব্র করে তোলাটাও এর উদ্দেশ্য ছিল না কিন্তু, একটি সম্পর্কের গঠনে শৃঙ্খলার নির্মাণকৌশল নিজেকেই বেশি অনুগত করে তোলে। যেহেতু তা বিপরীত দিক থেকে অধিকতর উপযোগী হয়ে ওঠে। সেসময় যা গঠিত হচ্ছিল তা হলো দমন-পীড়নের একটি নীতি যা শরীরের উপর কাজ করে। শরীরের উপকরণ, দেহভাষা এবং ব্যবহারের এক হিসাব-নিকাশ করা ব্যবহার। মানব শরীর তখন ক্ষমতার যন্ত্রের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছিল যা শরীরকে উন্মোচন, ভাঙচুর এবং পুনর্বিন্যস্ত করে। একটি ‘রাজনৈতিক শবব্যবচ্ছেদ’ যা কিনা ‘ক্ষমতার নির্মাণপদ্ধতি’ও বটে, জন্ম নিচ্ছিল এবং এই বিষয়টিই সংজ্ঞায়িত করছিল যে কীভাবে কেউ অন্যের শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করতে পারে আর, অন্যের শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণের এই ব্যাপারটি যেন কারো ইচ্ছামাফিক না হয়। বরং কারো নির্ধারণ করে দেওয়া যাবতীয় কলাকৌশল, গতি ও দক্ষতাসহ শরীর যেন একজনের ইচ্ছানুযায়ী পরিচালিত হতে পারে এভাবেই শৃঙ্খলা অধীনস্থ এবং চর্চিত শরীর তৈরি করে, তৈরি করে ‘বশ মানা শরীর’। শৃঙ্খলা শরীরের শক্তি বাড়ায় (উপযোগের অর্থনৈতিক দিক থেকে) এবং এই একই শক্তিগুলো হ্রাস করে (বাধ্যতার রাজনৈতিক দিক থেকে)। সংক্ষেপে, শৃঙ্খলা ক্ষমতাকে শরীর হতে বিযুক্ত করে। অন্য দিকে, শৃঙ্খলা এক ধরনের ‘প্রবণতা’র বস্তুতে পরিণত হয়। পরিণত হয় ‘দক্ষতা’য়। শৃঙ্খলা দক্ষতাই বাড়াতে চায়। আবার, শৃঙ্খলা শক্তির গতিপথ উল্টে দেয়। বদলে দেয় এই গতিপথ থেকে সম্ভাব্য নির্গত ক্ষমতাকে। এবং এই শক্তিকে কঠোর অধীনস্থতার সম্পর্কেও পরিণত করতে পারে। যদি অর্থনৈতিক বঞ্চনা ক্ষমতা এবং শ্রমের উৎপাদনকে পৃথক করে, তাহলে আমাদের এ কথাই বলতে দিন যে শৃঙ্খলামূলক বলপ্রয়োগ শরীরে বর্ধিত প্রবণতা এবং বর্ধিত আধিপত্যের ভেতর একটি আঁটোসাঁটো সম্পর্ক তৈরি করে।

এই নয়া রাজনৈতিক শবব্যবচ্ছেদের ‘উদ্ভাবনা’কে একটি আকস্মিক আবিষ্কার হিসেবে দেখলে চলবে না। এটা বরং প্রায়শঃ ক্ষুদ্র নানা প্রক্রিয়ার প্রাচুর্য। বিভিন্ন পৃথক উৎস এবং ছড়ানোছিটানো বা ইতস্ততবিক্ষিপ্ত অবস্থানের এই প্রাচুর্য পরস্পর অভিক্রমণ করে, করে পুনরাবৃত্তি। অথবা, একে অপরকে অনুকরণ করে, একে অপরকে সাহায্য করে, প্রায়োগিক এলাকার পার্থক্য অনুসারে একে অপরকে আলাদা করে, সমকেন্দ্রাভিমুখী হয় এবং ধীরে ধীরে একটি স্বাভাবিক পদ্ধতির নীলনক্সা উৎপন্ন করে। ইতিহাসের প্রাথমিক সময়ে শৃঙ্খলার এই নীলনক্সা মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষায়তনগুলো থেকে কাজ শুরু করে। পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্তরেই শৃঙ্খলার কাজ শুরু হয়। ধীরে ধীরে শৃঙ্খলার এই নক্সা হাসপাতালের পরিসরেও কাজ শুরু করে। এবং কয়েক শতাব্দীর ভেতরেই শৃঙ্খলার এই কর্মপদ্ধতিগুলো সেনাবাহিনীর সংগঠনকে পুনর্গঠন করে। কিছু কিছু সময়ে তারা খুব দ্রুতই এক বিন্দু হতে অপর বিন্দুতে সঞ্চালিত হয়েছে (বিশেষতঃ সেনাবাহিনী এবং কারিগরী স্কুল ও মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে কখনো কখনো আবার তারা ধীর লয়ে এবং গোপনভাবে সঞ্চালিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বড় কারখানাগুলোর ক্ষতিকর সামরিকীকরণের কথা বলা যায়। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই কিছু বিশেষ চাহিদার প্রেক্ষিতে শৃঙ্খলা গৃহীত হয়েছে। একটি শিল্পায়িত উদ্ভাবনা, কিছু মহামারী জাতীয় রোগের পুনরাবির্ভাব ও বিস্তার, রাইফেলের আবিষ্কার বা প্র“শিয়ার বিজয়। উপরোক্ত চাহিদাগুলো অবশ্য শৃঙ্খলার সাধারণ ও বিশেষ রূপান্তরের ক্ষেত্রে কোনো বাধা দেয় নি যা এখন আমরা বর্ণনা করবো।

এখানে অবশ্য যার যার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসহ বিভিন্ন শৃঙ্খলামূলক প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস রচনার কোনো প্রশ্ন আসছে না। আমি শুধু ধারাবাহিক কিছু উদাহরণের কতিপয় জরুরি কলাকৌশলের মানচিত্র প্রণয়ন করতে চাই। যে কৌশলগুলো সবচেয়ে সহজে এক হতে অন্যতে ছড়িয়ে পড়ে। এই কৌশলগুলো সর্বদাই ছিল অনুপুঙ্খ বর্ণনা সহ বিস্তারিত কলাকৌশল। তবে তাদের নিজস্ব গুরুত্বও ছিল। কেননা, এই কৌশলসমূহ শরীরের বিস্তারিত রাজনৈতিক বিনিয়োগের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে সংজ্ঞায়িত করেছে। সংজ্ঞায়িত করেছে ক্ষমতার এক ‘নয়া পরমাণুবিদ্যা’কে। এবং যেহেতু সতেরো শতক হতেই শৃঙ্খলা বিস্তৃততর পরিসর বা এলাকাগুলোতে একনাগাড়ে পৌঁছনোর চেষ্টা করেছে, সেহেতু শৃঙ্খলা সমগ্র সমাজদেহকেই আবৃত করতে প্রয়াস পেয়েছে। চতুর্দিকে প্রসারিত হবার এক বৃহৎ ক্ষমতার সাথে দক্ষতার মিশেল দেওয়া ছোট ছোট কাজ, সূক্ষ্ম নানা ব্যবস্থাপনা (যা আপাতঃভাবে নিষ্পাপ হলেও গভীরভাবে সন্দেহজনক), নির্মাণপদ্ধতিসমূহ যা কিনা অর্থনীতিকে স্বীকার করাটা লজ্জাজনক মনে করেছে অথবা বলপ্রয়োগের তুচ্ছ আঙ্গিকগুলোকে অনুসরণ করেছে — তথাপিও এই শৃঙ্খলাই সমকালীন যুগের আঙিনায় শাস্তি ব্যবস্থার প্রসার ঘটিয়েছে। শৃঙ্খলার বিবরণ দিতে গেলে পুঙ্খানুপুঙ্খ নানা বিষয়ের প্রতি গভীর মনোযোগ দেবার প্রয়োজন হবে। ধারাবাহিক ভাবমূর্তির আড়ালে আমরা যেন শুধু অর্থ না খুঁজে বরং কোনো আগাম সতর্কতাও খুঁজি। সক্রিয়তার অমোচনীয়তাতেই শুধু নয়, আমরা যেন কৌশলের সামঞ্জস্যেও তাদের খুঁজি। ঘুমের ভেতরেও কাজ করে এবং তুচ্ছকেও অর্থ দান করে এমন বৃহত্তর যুক্তির চেয়েও শৃঙ্খলা বস্তুতঃ এক ধরনের দক্ষতাবিশিষ্ট কর্ম। যেন বা এক এক ধরনের মনোযোগী ‘মন্দ উদ্দেশ্য’-এর কাজ যা সবকিছুকেই জবাবদিহিতার মুখোমুখি করে। অনুপুঙ্খতার রাজনৈতিক অঙ্গব্যবচ্ছেদ হলো শৃঙ্খলা।

ধৈর্য্য হারানোর আগেই মার্শাল দ্যু স্যাক্সের (Marshal de Saxe) কথাগুলো স্মরণ করলে আমরা ভাল করবো: ‘যদিও পুঙ্খানুপুঙ্খতা নিয়ে যারা বাড়াবাড়ি করে তাদের মূলতঃ সীমিত বুদ্ধির মানুষ মনে করা হয়, আমার বিবেচনায় পুঙ্খানুপুঙ্খতার এই পর্বটি জরুরি। কারণ, এটিই ভিত্তি। শৃঙ্খলার পুঙ্খানুপুঙ্খতার এই ভিত্তি ব্যতীত কোনো ইমারত গড়া অসম্ভব। কিম্বা, পুঙ্খানুপুঙ্খতার নীতি না বুঝে কোনো কর্মপদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করাও কঠিন। স্থাপত্যের জন্য ভাল লাগা থাকাই যথেষ্ট নয়। একটি ইমারত গড়তে হলে আরো চাই পাথর-কাটা সম্পর্কে জ্ঞান (স্যাক্সে, ৫)। এহেন পাথর-কাটার বিষয়ে গোটা একটি ইতিহাসই রচনা করা যায়। নৈতিক জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অনুপুঙ্খ ও উপযোগবাদী যৌক্তিকতার ইতিহাস রচনা করা প্রয়োজন। ধ্রুপদী যুগ এই উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। বরং শৃঙ্খলা বাড়িয়েছে। এর মাত্রা বদলে দিয়েছে। শৃঙ্খলাকে প্রদান করেছে তার যথার্থ যন্ত্রোপকরণ। এবং হয়তো নিঃসীম ক্ষুদ্রতার পরিমাপে অথবা প্রাকৃতিক সত্তাসমূহের সবচেয়ে বিস্তারিত চরিত্র চিত্রণে কিছু প্রতিধ্বনি খুঁজে পেয়েছে। বহুদিন ধরেই ‘পুঙ্খানুপুঙ্খতা’ ধর্মতত্ত্ব এবং তপশ্চর্যার একটি প্রণালী হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেকোনো ক্ষেত্রেই, প্রতিটি অনুষঙ্গই দরকারি। যেহেতু ঈশ্বরের দৃষ্টিতে কোনো অসীমতাই একটি ক্ষুদ্র অনুষঙ্গের চেয়ে বড় নয় এবং কোনোকিছুই এত ক্ষুদ্র নয় যা ঈশ্বরের একটি ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা হতে তৈরি হয়নি। পুঙ্খানুপুঙ্খতার প্রতাপের এই প্রবল ঐতিহ্যে, খ্রিষ্টীয় শিক্ষা, যাজকিয় অথবা সামরিক স্কুলশিক্ষার যাবতীয় সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয়, যাবতীয় ‘প্রশিক্ষণ’ তাদের জায়গা ঠিকঠাকমতো খুঁজে পেয়েছে। এই শৃঙ্খলাসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য,একজন প্রকৃত বিশ্বাসীর মতোই, কোনো অনুষঙ্গই আর অপ্রয়োজনীয় নয়। তবে, ক্ষমতা গ্রাস করতে চায় সেই নিয়ন্ত্রণ যা শৃঙ্খলার আড়ালে অর্থসহ লুকিয়ে থাকে। চরিত্র-বৈশিষ্ট্য হলো ‘ছোট বিষয় সমূহ’ এবং তাদের শাশ্বত গুরুত্বের প্রতি গাওয়া বৃহৎ স্তোত্রগীতি যা জাঁ বাপ্তিস্ত দো লা সাল (Jean Baptiste de La Salle) গেয়েছেন তাঁর Traite sur les obligations des freres des Ecoles chretiennes (খ্রিষ্টীয় বিদ্যালয়ের ভাইদের দায়দায়িত্ব বিষয়ক চুক্তিনামা)-এ। প্রতিদিনের অতীন্দ্রিয়তা এখানে অনুপুঙ্খতার শৃঙ্খলা দ্বারা সংযুক্ত। ‘ছোট ছোট বিষয়কে অবেহলা করা কী বিপজ্জনক! আমার মতো এক আত্মার জন্য এ ভারি সান্ত্বনাদায়ী অনুধ্যান (consoling reflection)। বড় কর্মদ্যোগের প্রতি সামান্যই উন্মুক্ত। ছোট ছোট বিষয়ের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার মাধ্যমে অব্যাখ্যেয় প্রগতি (imperceptible progress) অর্জন করা যায়। যা আমাদের সবচেয়ে বেশি পবিত্রতার স্তরে উন্নীত করবে। কারণ, ছোট ছোট বিষয়গুলোই আমাদের বৃহত্তর বিষয়ে টেনে নিয়ে যায়…ছোট ছোট বিষয়; একথা বলা হবে যে, হায় ঈশ্বর, তোমার জন্য বড় কোন্ কাজটিই বা আমরা করতে পারি? আমরা, যত দুর্বল এবং মরণশীল প্রাণী? ছোট ছোট বিষয়; যদি বৃহৎ বিষয়গুলো নিজেদের উপস্থাপন করে, আমরা কি সেই কাজগুলো করব? আমরা কি সেই কাজগুলোকে আমাদের সাধ্যের বাইরে মনে করবো না? ছোট ছোট বিষয়; যদি ঈশ্বর সেগুলোকেই গ্রহণ করেন এবং তাদের বড় বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে চান? ছোট ছোট বিষয়। কেউ একবারও এমনটি অনুভব করেছেন? কেউ কি তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বিচার করেন? ক্ষুদ্র জিনিস। ধরা যাক, একজন নিশ্চিতভাবেই অপরাধী। কিšত্ত, একজন অপরাধী বলেই তাকে কি আমরা অস্বীকার করতে পারব? ছোট ছোট বিষয়। তবু, অন্তিমে এই ছোট বিষয়গুলো মিলেই কোনো বড় সন্তকে জন্ম দিতে পারে! হ্যাঁ, ছোট ছোট বিষয়। কিšত্ত বৃহৎ উদ্দেশ্য, বৃহৎ অনুভূতি, বৃহৎ অনুগ্রহ, বৃহৎ আবেগ এবং ফলাফল হিসেবে মহৎ মেধা, মহৎ সম্পদ, মহৎ পুরস্কার’ (লা সাল, Traite sur les obligations … ২৩৮-৯)। নিয়মকানুনের পুঙ্খানুপুঙ্খতা, পরিদর্শন ও তত্ত্বাবধানের স্নায়বিক অস্থিরতা, জীবন ও শরীরের ক্ষুদ্রতম ভগ্নাংশের তত্ত্বাবধান দ্রতই যোগাবে এক ধর্মনিরপেক্ষ আধেয়। এই চুক্তিনামা যোগানো হবে স্কুল, ব্যারাক, হাসপাতাল অথবা কারখানার প্রেক্ষিতে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রতা এবং অসীমতার রহস্যময় বীজগণিতের জন্য এক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত যৌক্তিকতা। এবং এভাবেই আঠারো শতকে দেখা দেয় পুঙ্খানুপুঙ্খতার ইতিহাস যার প্রবক্তা ছিলেন জাঁ-বাপ্তিস্ত দ্যু সাল। দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের মাধ্যমে লিবনীজ (Leibniz) এবং ব্যুফোকে (Buffon) ছুঁয়ে ও স্কুলশিক্ষা, চিকিৎসা বিদ্যা, সামরিক কৌশল এবং অর্থনীতির মাধ্যমে এই তত্ত্ব তিনি ব্যাখ্যা করেন। এই তত্ত্বে বলা হয়েছিল যে আঠারো শতাব্দী যেন তার শেষ প্রান্তে আমাদের কাছে নিয়ে আসে সেই মানুষকে যে আর একজন নিউটন হবার স্বপ্ন দেখেন। আকাশ ও গ্রহাণুপুঞ্জের অসীমতার নিউটন নন। বরং ‘ক্ষুদ্র শরীর,’ ক্ষুদ্র গতিশীলতা, ক্ষুদ্র কাজ… এসবের নিউটন। সেই মানুষটিকে দরকার যিনি মঞ্জের (Monge) মন্তব্যের (‘আমাদের আবিষ্কার করবার মতো শুধু একটি পৃথিবীই আছে)’ উত্তরে বলেছেন: ‘আমি কী শুনছি? পুঙ্খানুপুঙ্খতার পৃথিবী ব্যতীত কে আর অন্য কোন্ পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছে? সে কোন্ পৃথিবী? এই পুঙ্খানুপুঙ্খতার পৃথিবীতে আমি বিশ্বাস করে এসেছি আমার পনেরো বছর বয়স হতে। আমি তখন এ বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম এবং এই বিষয়টি আজো আমার স্মৃতিতে সক্রিয়। এ এমন এক অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ যা কখনো পরিত্যাগ করা যাবে না… সেই অন্য পৃথিবীই আজ অবধি আমি যত কিছু আবিষ্কার করেছি বলে গর্ব করি তার ভেতর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যখন আমি এই পৃথিবীর কথা ভাবি, আমার হৃদয়ে বেদনা অনুভব করি’ (সন্ত হিলেইরের নোশনস্ সিন্থেটিকস্ এ হিস্টোরিক দ্যু ফিলোসফি ন্যাচেরেল)-এর মুখবন্ধে এই কথাগুলো উৎসর্গ করা হয়েছে নেপোলিয়ন বোনাপার্টেকে)। নেপোলিয়ন এই পৃথিবী আবিষ্কার করেননি। কিšত্ত, আমরা জানি যে তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খতার এই পৃথিবী সৃষ্টির সাংগঠনিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এবং নিজের চারপাশে ক্ষমতার এক যন্ত্রকৌশল তিনি বিন্যস্ত করতে চেয়েছেন যা তাঁর পরিচালিত রাষ্ট্রে সঙ্ঘটিত ক্ষুদ্রতম ঘটনাও তাঁকে দেখতে সাহায্য করবে। বোনাপার্ট তাঁর আরোপিত কঠোর শৃঙ্খলার মাধ্যমে ‘আলিঙ্গন করতে চেয়েছেন ক্ষমতা কাঠামোর এই গোটা যান্ত্রিক ব্যবস্থাকে যাতে ক্ষুদ্রতম অনুপুঙ্খও তাঁর দৃষ্টি না এড়িয়ে যায়।’ (ত্রেইলহার্ড, ১৪)।

পুঙ্খানুপুঙ্খতার সযত্ন নিরীক্ষণ এবং একইসাথে এই ছোট ছোট বিষয়গুলোর রাজনৈতিক সচেতনতা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবহারের জন্য ধ্রুপদী যুগ হতে উদ্ভূত হয়েছে। উদ্ভবের সেই সময়ে ধ্রুপদী যুগ তার সাথে বহন করেছে বিস্তর কলাকৌশল, পদ্ধতি ও জ্ঞানের এক গোটা সমাহৃতি, বিবরণ, পরিকল্পনা ও উপাত্ত। এবং এই সঙ্কটগুলো হতে সন্দেহ নেই যে আধুনিক মানবতার মানুষ জন্ম লাভ করেছে।

বণ্টনের শিল্প
প্রথম ক্ষেত্রেই, শৃঙ্খলা পরিসর বা স্থানে ব্যক্তির বণ্টন হতে উৎসারিত হয়। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য, এই শিল্প কিছু কলাকৌশল প্রয়োগ করে।

১. শৃঙ্খলার মাঝে মাঝে চারদিকে আবদ্ধ স্থানের (enclosure) প্রয়োজন হয়। আবদ্ধ স্থান হলো এমন একটি বিশেষ এলাকা যা সবার জন্য বিপরীতধর্মী এবং নিজেই নিজের চারপাশে বদ্ধ। এটি হলো শৃঙ্খলাপরায়ণ একঘেঁয়েমি ভরা সুরক্ষিত এলাকা। ভবঘুরে ও ভিখিরিদের বড় ‘বন্দিশালা’ ছিল। ছিল আরো নানা গোপন, অনিষ্টকর ও কার্যকরী যত বন্দিশালা। ছিল বিভিন্ন কলেজ অথবা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এসব শিক্ষায়তনে ধীরে ধীরে সন্ন্যাসীদের মঠসুলভ মডেল আরোপ করা হয়। শিক্ষাক্ষেত্রে বোর্ডিং সবচেয়ে নিখুঁত (যদি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত নাও হয়ে থাকে) ব্যবস্থা হিসেবে আবির্ভূত হলো। জেসুইটদের (Ignatius Loyala নাম্নী এক স্পেনীয় যাজক ১৫৩৪ সালে Society of Jesus নামক এই ধর্মসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করেন — অনুবাদক) চলে যাবার পর লুই-লো-ঘ্রঁদে (Louis-le-Grand) বোর্ডিং ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়ালো বাধ্যতামূলক। এই বোর্ডিংকে একটি আদর্শ স্কুলে পরিণত করা হলো (আরিস, ৩০৮-১৩ এবং স্নিডার্স, ৩৫-৪১)। সেখানে ছিল সামরিক ব্যারাক। সিদ্ধান্ত হলো যে সেনাবাহিনী ও ভবঘুরে জনতাকে যার যার জায়গায় রাখতে হবে। লুটপাট ও সন্ত্রাস অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে। শহরের ভেতর দিয়ে কুচকাওয়াজ করে চলে যাওয়া সেনাবাহিনীকে যারা ভয় পায় না তেমন স্থানীয় জনতাকে শান্ত করতে হবে। বেসামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে সঙ্ঘাত অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে। পলায়ন বন্ধ করতে হবে। ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ১৭১৯ সালের অধ্যাদেশ একসাথে কয়েকশ’ ব্যারাক গঠনের রূপরেখা প্রণয়ন করে। ইতোমধ্যে ফ্রান্সের দক্ষিণে গড়ে ওঠা ব্যারাকগুলোর ছাঁচে এই ব্যারাক স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশ দেওয়া হয় যেন কঠোর বাধানিষেধ এই ব্যারাকগুলোয় মেনে চলা হয়। ‘সমগ্র ব্যারাকটি দশ ফুট উঁচু বহির্প্রাচীর বা বাইরের দেওয়াল দিয়ে আবৃত থাকবে। এই দেওয়াল সব দিক হতে ত্রিশ ফুট দূরত্বে এই ব্যারাকগুলো ঘিরে রাখবে।’ এর ফলে সৈন্যদলে ‘আদেশ ও শৃঙ্খলা বজায় থাকার পরিবেশ বিরাজ করবে যাতে সেনা অফিসারের পক্ষে সাধারণ সৈন্যদের হয়ে প্রতিনিধিত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা সম্ভব হয়।’ (সামরিক অধ্যাদেশ, IXL, ২৫ সেপ্টেম্বর ১৭১৯)। ১৭৪৫ সালে দেশের আনুমানিক ৩২০টি শহরে সেনাবাহিনীর ব্যারাক ছিল। এবং অনুমান করা হয়েছিল যে ১৭৭৫ সালে এই ব্যারাকগুলোর ধারণক্ষমতা ছিল আনুমানিক ২০০,০০০ পুরুষ (ডেইজি, ২০১-৯; ১৭৭৫-এর এক নামহীন স্মৃতিকথা যা Depot de la guerre-(অস্ত্রাগার)-এ উদ্ধৃত, ৩৬৮৯, ১৫৬; নাভের‌্যো, ১৩২-৫)। পাশাপাশি, কারখানাগুলোর বিস্তারের সাথে সাথে পণ্য উৎপাদনের জন্য বড় বড় উৎপাদন এলাকা বিকাশ লাভ করে। এই এলাকাগুলো ছিল একইসাথে সমধর্মী এবং সু-সংজ্ঞায়িত। প্রথমত, সমন্বিত উৎপাদক কারখানাগুলোর আবির্ভাব। অতঃপর আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সদর কারখানাগুলোর (factories proper) আবির্ভাব হয়। এক শোসেদ (Chaussade) লৌহ কারখানাই নিয়েভ্রে (Nievre) এবং লোয়েরের (Loire) ভেতর মেদিন উপদ্বীপের (Medine peninsula) প্রায় পুরো এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। ১৭৭৭ সালে ইন্দ্রেত (Indret) কারখানা স্থাপনের জন্য উইলকিন্সন (Wilkinson) বাঁধ ও পরিখার মাধ্যমে লোয়েরের উপর একটি দ্বীপ নির্মাণ করেন। তৌফে (Toufait) শার্বোন্নিয়েরের উপত্যকায় (valley of the Charbonniere) লো ক্রুসট কারখানা গঠন করেছিলেন। পরে তিনি লো ক্রুসটের আরো রূপান্তর ঘটান এবং কারখানার ভেতরেই শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা করেন। এটা একদিক থেকে যেমন ছিল মাত্রার বদল তেম্নি ছিল এক নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রণ। এই কারখানাকে পরিষ্কারভাবেই সন্ন্যাসীদের মঠ, দুর্গ, প্রাচীরঘেরা শহর প্রভৃতির সাথে তুলনা করা হতো। কারখানার অভিভাবক ‘শ্রমিকেরা ফিরে এলেই শুধুমাত্র দরজা খুলবেন। দরজা দ্বিতীয়বার খোলা হবে যখন পরবর্তী দিনের কাজ শুরুর ঘণ্টা আবার পড়বে।’ পনেরো মিনিটের বেশি দেরি হলে কাউকে আর ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। দিনের শেষে, কারখানার প্রধান ব্যক্তিগণ কারখানার চাবি সুইস প্রহরীর হাতে দিয়ে দেবে। সুইস প্রহরী তখন দরজা খুলবেন (এ্যাম্বোয়েস, ১২, ১৩০১)। উদ্দেশ্য হলো সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জন এবং কারখানার সমস্যা যতদূর সম্ভব কমানো। এভাবেই, উৎপাদন শক্তি যতই ঘনীভূত করা হয়, উৎপাদনের উপকরণ ও যন্ত্র সুরক্ষা ও শ্রমিক শক্তির উপর প্রভুত্ব করার জন্য শৃঙ্খলা জোরদার করা হয়। ‘আদেশ এবং পরিদর্শন ব্যবস্থা রক্ষার জন্য সব শ্রমিককে অবশ্যই এক ছাদের নিচে জমায়েত হতে হবে। যেন শ্রমিকদের ভেতর কোনো জাগরণ দেখা দেবার সাথে সাথে তাদের গ্রেপ্তার করার মাধ্যমে কারখানা রক্ষা ও ক্ষয়-ক্ষতি পূরণের দায়িত্বে নিয়োজিত কারখানার পরিচালনা অংশীদার পদক্ষেপ নিতে পারেন।’ (দ্যোফিন, ১৯৯)।

২. কিন্তু, চতুর্দিকে ‘আবদ্ধাবস্থা’র এই নীতি না ধারাবাহিক, না অবিচ্ছেদ্য, না সে শৃঙ্খলামূলক যন্ত্র ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত হিসেবে বিবেচিত। এই যন্ত্রপাতির কাজের পরিসর অনেক বেশি ঢিলাঢালাভাবে এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সম্পন্ন হয়। প্রাথমিক অবস্থান অথবা বিভাজনের নীতির উপর এটি সবচেয়ে বেশি কাজ করে। প্রত্যেক ব্যক্তিরই রয়েছে তার নিজস্ব এলাকা বা পরিসর। এবং, প্রত্যেক এলাকা বা পরিসরের রয়েছে তার নির্দিষ্ট ব্যক্তি। ছোট ছোট দলে মানুষ ভাগ করাটা এড়াও। ভঙ্গ করো সম্মিলিত বিন্যাস। বিশ্লেষণ করো সংশয়ী, বিপুল আকারের এবং ক্ষণস্থায়ী বহুত্ব। শৃঙ্খলামূলক পরিসর ঠিক ততগুলো পরিচ্ছেদেই বিভক্ত হবার প্রয়াস চালায় ঠিক যতগুলো বণ্টনযোগ্য মানব শরীর বা উপকরণ সেখানে বিদ্যমান। কাউকে না কাউকে অবশ্যই অপরিমিত বণ্টনের প্রয়াস বিনাশ করতে হবে। বিনাশ করতে হবে ব্যক্তির অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় হারিয়ে যাওয়ার সংখ্যা, তাদের চতুর্দিকে পরিব্যাপ্ত সঞ্চালন, তাদের বিপজ্জনক সঙ্ঘবদ্ধ হওয়া যা থেকে কোনো ফায়দা ওঠানো যাবে না। এ ছিল পলায়ন-বিরোধী, ভবঘুরেপনা-বিরোধী এবং সঙ্ঘবদ্ধতা-বিরোধী এক কৌশল। এর মূল লক্ষ্য ছিল শ্রমিকদের উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করা, কোথায় এবং কীভাবে ব্যক্তিকে খুঁজে পেতে বের করতে হবে তা নির্ণয় করা, ব্যবহারোপযোগী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, অন্যদের বাধা দেওয়া, প্রত্যেক ব্যক্তির প্রতি মুহূর্তের আচরণ নজরদারি করায় সক্ষম হওয়া এবং এই ব্যবস্থার গুণাগুণ বা ভাল দিকগুলো মূল্যায়ণ, বিচার ও পরিমাপ করা। জানা, প্রভুত্ব করা ও ব্যবহার করার উদ্দেশ্যেই এই প্রক্রিয়া নির্মিত হয়েছিল। শৃঙ্খলা একটি বিশ্লেষণী পরিসর তৈরি করে।

এবং সেখানেও, শৃঙ্খলার এই ব্যবস্থাকে মুখোমুখি হতে হয়েছিল পুরনো যত স্থাপত্যমূলক ও ধর্র্মীয় পদ্ধতির। যেমন, সন্ন্যাসীর কুঠুরি। সন্ন্যাসীর কুঠুরির পৃথক ভাবে ভাগ করা কামরাগুলো যদি বা ছিল বিশুদ্ধগত ভাবেই আদর্শিক বণ্টন, কিন্তু শৃঙ্খলামূলক পরিসর বাস্তবিকভাবেই সর্বদাই হাল্কা বুনন বিশিষ্ট। তপশ্চর্যার নিয়মানুসারেই নৈঃশব্দ্য ছিল শরীর ও আত্মা উভয়ের জন্যই অতি প্রয়োজনীয়। শরীর ও আত্মাকে অবশ্যই, জীবনের কোনো কোনো মুহূর্তে অন্ততঃ, প্রলোভন এবং ঈশ্বরের প্রচণ্ডতার সাথে নিঃসঙ্গভাবে মোকাবেলা করতে হবে। ‘নিদ্রা হলো মৃত্যুর প্রতিচ্ছবি, মঠের আবাসিক আশ্রয় হলো পুণ্যসমাধি (sepulcher)… যদিও মঠের এই আবাসনে সবাই ভাগাভাগি করেই থাকে, তবু প্রতিটি শয্যা এমনভাবে পাতা হয় এবং পর্দা দিয়ে এত চমৎকার ভাবে ঘেরা থাকে যে মেয়েরা এখানে ঘুম থেকে ওঠা এবং ঘুমাতে যাওয়ার সময় কেউ তাদের দেখতে পায় না।’ (মেয়েদের জন্য একটি ভাল আশ্রমের নিয়মকানুন, দেলামেয়ার, ৫০৭)। তবে, এটি আজো একটি ভয়ানক স্থূল পন্থা।

৩.সক্রিয় ক্ষেত্রসমূহের নীতি ধীরে ধীরে শৃঙ্খলামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি পরিসর বিধিবদ্ধ করে ফেলবে যা স্থাপত্য হয়তো কিছু ভিন্নধর্মী ব্যবহারের জন্য ফেলে রেখেছিল। যোগাযোগের জন্য কিছু নির্দিষ্ট স্থান সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল। এই সংজ্ঞায়ন শুধুমাত্র পরিদর্শন বা তত্ত্বাবধানের উদ্দেশ্য থেকে করা হয়নি। বরং এক ব্যক্তির সাথে অপরের বিপজ্জনক যোগাযোগের সম্ভাবনা ভেঙে ফেলবার জন্য এবং একটি ব্যবহারোপযোগী পরিসর তৈরির জন্যও এটি করা হয়েছে। হাসপাতাল বিশেষতঃ সামরিক ও নৌবাহিনীর হাসপাতালগুলোয় এই প্রক্রিয়া পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে। ফ্রান্সে রোশেফোর্ট (Rochefort) উভয়তঃ নিরীক্ষা ও নমুনা হিসেবে কাজ করেছে। একটি বন্দর, এবং একটি সামরিক বন্দর যেমন তার নিজস্ব পণ্যের সঞ্চালন, স্বেচ্ছায় বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে আসা মানুষ, যাতায়াতে ব্যস্ত নাবিকদল, অসুখ ও মড়ক — একটি পলায়নের স্থান, চোরাচালান, ছোঁয়াচে রোগ প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। বিপজ্জনক নানা মিশ্রণের মোড়, নিষিদ্ধ নানা সঞ্চালনের মিলন-স্থান। বন্দর এলাকায় নৌবাহিনীর হাসপাতালকেই মূলতঃ চিকিৎসা করার কাজ করতে হয়। কিন্তু, চিকিৎসার কাজ করার জন্য এই হাসপাতালকে অবশ্যই পরিশোধক ছাঁকনির (filter) কাজ করতে হবে। বন্দরের ভ্রাম্যমাণ ও ঝাঁকে ঝাঁকে ঘোরাফেরা করা মানুষের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য বেআইনী কাজ ও মন্দত্ব বা অশুভ সম্পর্কে সংশয় দূর করতে হবে। রোগ ও ছোঁয়াচে ব্যাধির চিকিৎসাগত তত্ত্বাবধান অন্যান্য নিয়ন্ত্রণের নানা আঙ্গিক হতে অবিভাজ্য। যেমন, সেনাবাহিনী হতে পলাতকদের উপর সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের উপর আর্থিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষতিপূরণ, রেশন, নিখোঁজ হওয়া, আরোগ্য, মৃত্যু বা ছদ্মবেশ ধারণের উপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের সাথে চিকিৎসাগত নিয়ন্ত্রণও অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এ হতেই মূলতঃ কঠোরভাবে পরিসর বণ্টন ও বিভাজনের প্রয়োজনীয়তার প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। রোশেফোর্টে গৃহীত প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোর ভেতর মানুষের চেয়ে বস্তু কিম্বা রোগীর চেয়ে দামি পণ্যের সুরক্ষার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর্থিক ও অর্থনৈতিক তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থাপনা চিকিৎসাগত পরিদর্শনের কলাকৌশলের অগ্রগামী হয়েছে। যেমন, তালাচাবির আওতায় ওষুধ রাখা, ওষুধের ব্যবহার লিপিবদ্ধ করা। অল্প কিছুদিনের ভেতরেই রোগীর প্রকৃত সংখ্যা, তাদের অস্তিত্ব, কোন ইউনিটের রোগী ইত্যাদি নিরূপণের জন্য একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। এরপর শুরু হলো হাসপাতালে রোগীদের আসা-যাওয়ার ব্যাপারটি নিয়ন্ত্রিত হওয়া। রোগীদের তাদের নিজস্ব ওয়ার্ডে অবস্থান করতে বাধ্য করা হলো। হাসপাতালের প্রতিটি শয্যার পাশে রোগীর নাম ঝুলিয়ে দেওয়া হলো। হাসপাতালের রেজিস্টার খাতায় প্রত্যেক চিকিৎসাধীন রোগীর নাম নথিবদ্ধ করা হলো। এবং ডাক্তারের পরিদর্শনের সময় এই খাতাটি দেখার নিয়মও চালু হলো। এরপর এলো ছোঁয়াচে রোগের রোগীদের আলাদা রাখা ও তাদের জন্য পৃথক শয্যার ব্যবস্থা। ধীরে ধীরে একটি রোগ নিরাময় এলাকার উপর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক এলাকা বা পরিসর আরোপ করা হলো। হাসপাতাল রোগীদের শরীর, রোগ, রোগের লক্ষণ, জীবন ও মৃত্যু প্রভৃতি ব্যক্তিকীকৃত করার প্রবণতা দেখালো। পাশাপাশি সন্নিহিত অথচ সযতœ প্রয়াসে পৃথকীকৃত একক ব্যক্তিদের তালিকা গঠন করা হলো। শৃঙ্খলা হতে এভাবেই জন্ম নিল চিকিৎসা বিদ্যাগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক পরিসর। আঠারো শতকের শেষ নাগাদ যে কারখানাগুলো দেখা দিল, সেখানে ব্যক্তিকীকৃত বণ্টনের নীতি (the principle of individual partitioning) আরো জটিল হয়ে দেখা দিল। এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট পরিসরে কিছু ব্যক্তিকে জায়গা বিতরণ ও বরাদ্দ করার প্রশ্ন। যে পরিসরে কেউ এই ব্যক্তিদের বিচ্ছিন্ন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেন। তবে, এই প্রশ্নটি একইসাথে ছিল উৎপাদন যন্ত্রে এই বণ্টনের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে সংযোজন করারও প্রশ্ন। উল্লেখ্য, এই উৎপাদন যন্ত্রের ছিল নিজস্ব চাহিদা। শরীরের বণ্টন, উৎপাদন যন্ত্রের পরিসর ভিত্তিক বিন্যাস ও ‘পদাধিকার’ বণ্টনের সক্রিয়তার নানা প্রকার আঙ্গিক পরস্পসংযুক্ত হবার প্রয়োজন ছিল। জোয়ুইয়ে ওবেরক্যাম্পফ কারখানা (The Oberkampf manufactory at Jouy) এই নীতি মেনে চলেছিল। কর্মকাণ্ডের বিস্তৃত প্রকরণ অনুযায়ী এই কারখানা ছিল বেশ কিছু ওয়ার্কশপের সম্মিলনে গঠিত। মুদ্রক, হাতল ঘোরাইকারী, রঙকরিয়ে, নক্সা স্পর্শ করা নারী, খোদাইকারী ও রঞ্জনকারীদের আলাদা আলাদা ওয়ার্কশপ। ১৭৯১ সালে নির্মিত ভবনগুলোর ভেতর বৃহত্তম ভবন নির্মাণ করেছিলেন তৌসেইয়েন্ত বারে (ঞড়ঁংংধরহঃ ইধৎৎব)। এই ভবনটি ছিল ১১০ মিটার লম্বা ও তিন তলা বিশিষ্ট। নিচের তলা মূলতঃ ব্লক ছাপাইয়ের কাজে বরাদ্দ করা হয়েছিল। দু’টি সারিতে মোট ১৩২ টি টেবিল বসানো হয়েছিল। এই ওয়ার্কশপের দৈর্ঘ্য ছিল এতটাই যে মোট অষ্টাশিটি জানালা ছিল। প্রত্যেক ছাপাইকারী টেবিলে তার ‘পুলার’ যন্ত্রটি নিয়ে কাজ করতেন। এই ‘পুলার’ই মূলতঃ রঙ প্র¯ত্তত করতো এবং রঙ ছড়িয়ে দিত। মোট ২৬৪ জন কর্মী ছিল কারখানায়। প্রতিটা টেবিলের শেষে ছিল এক ধরনের র‌্যাক যার উপর সদ্য ছাপাই করা জিনিস শুকাতে দেওয়া হতো (সেইন্ট-মোউর)। কারখানার কেন্দ্রীয় মধ্যবর্তী পথে হাঁটা-চলা করার মাধ্যমে এমন একটি নজরদারি বা পাহারা রাখা সম্ভব হতো যা একইসাথে সাধারণ ও ব্যক্তিগত। শ্রমিকদের উপস্থিতি ও কাজ লক্ষ্য করা, তার কাজের মান লক্ষ্য করা, এক শ্রমিককে অপর শ্রমিকের সাথে তুলনা করা, দক্ষতা ও গতি অনুযায়ী শ্রমিকদের শ্রেণীকরণ করা, উৎপাদন প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক স্তরগুলো লক্ষ্য করা ইত্যাদি। এই যাবতীয় ধারাবাহিকতা মিলে একটি কাজ সম্পন্ন করতো। সংশয় দূরীভূত হয়েছিলো। এক কথায় বলতে, প্রাথমিক কার্যক্রম ও স্তরবিন্যাস অনুযায়ী অনুযায়ী উৎপাদন বিভক্ত হয়েছিল এবং শ্রম প্রক্রিয়া সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অন্যদিকে, ব্যক্তি প্রেক্ষিত হতে বিবেচনা করলে, যে শরীরগুলো কাজ করতো, শ্রমশক্তির সেই প্রতিটি চলকের শক্তি, ক্ষিপ্রতা, দক্ষতা, ধারাবাহিকতা প্রভৃতি লক্ষ্য করা হবে এবং সেই অনুযায়ী চারিত্র্যমণ্ডিত, মূল্যায়িত, গণনাকৃত করা হবে। এবং সেই সব ব্যক্তির সাথে এই শরীরগুলো সংযুক্ত করা হবে যারা ছিলেন এর বিশেষ প্রতিনিধি। বৃহদায়তন কারখানার সূচনায়, উৎপাদন প্রক্রিয়ার অন্তরালে, এভাবেই কেউ খুঁজে পাবেন শ্রমশক্তির ব্যক্তিকীকৃত ভগ্নাংশ। শৃঙ্খলামূলক পরিসরের বণ্টন এই উভয় বিষয় নিশ্চিত করতো।

(চলবে)
তথ্যনির্দেশ


০১. আমি সামরিক, চিকিৎসা, শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো হতে উদাহরণ বাছাই করবো। উপনিবেশীকরণ, দাসত্ব ও শিশু পালন হতে অন্য উদাহরণগুলো গৃহীত হতে পারে।

০২. লো ক্রুসট কারখানা পরিদর্শনের পর লা মেথেরি (La Metherie) লিখেছিলেন: ‘এত চমৎকার এক প্রতিষ্ঠানের জন্য এবং এত বিভিন্ন ধরনের ও বিপুল পরিমাণ কাজের জন্য গঠিত ভবনগুলোর প্রচুর এলাকা জুড়ে নির্মিত হওয়া উচিত যাতে কাজের সময় শ্রমিকদের ভেতর কোনো সংশয় দেখা না দেয়।’ (লা মেথেরি, ৬৬)।

a_falgun@yahoo.com

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অমিয় চৌধুরী — সেপ্টেম্বর ২৩, ২০০৮ @ ৯:৩৪ অপরাহ্ন

      “বশ মানা শরীরগুলো” অধ্যায়ের শিরোনামে বশ মানা শব্দটি মুদ্রণপ্রমাদ যুক্ত নয় কি? যদি শব্দটির অর্থ আয়ত্তে আসা হয় তাহলে শব্দটি বশমানা কিংবা বশ-মানা হওয়াই কি বাঞ্ছনীয় নয়? সাধারণ পাঠক হিসেবেই প্রশ্নটি করা কারণ আমি লেখক নই।

      – অমিয় চৌধুরী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Liton — অক্টোবর ২৭, ২০১৩ @ ৩:৪৫ অপরাহ্ন

      How about part 13? When will it end mean last part will be published?

      Nice job

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com