74

আগুনপাখি: ব্যক্তিনির্মাণযজ্ঞ

ইমতিয়ার শামীম | ১৮ জুলাই ২০০৮ ১১:১০ পূর্বাহ্ন

আগুনপাখির কারও আধুনিক ব্যক্তিসত্তা নেই, ব্যক্তিমনন নেই। কিন্তু তারপরও, শেষপর্যন্ত, আধুনিক ব্যক্তিসত্তার উদ্বোধনই এর মূল গল্প, agun-p.jpg
…….
আগুনপাখি/হাসান আজিজুল হক/প্রকাশক: গাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদ, সন্ধানী প্রকাশনী/প্রথম প্রকাশ: ফাল্গুন ১৪১২, ফেব্রুয়ারি ২০০৬/প্রচ্ছদ: কাইয়ুম চৌধুরী/১৫৮ পৃষ্ঠা/১৬০ টাকা/উৎসর্গ: মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
…….
ব্যক্তিমননের বিকাশই এর মূল সত্য। আগুনপাখির গল্প অবিরাম বিশ্বস্ত থাকতে চায় সংসার ও সমাজের প্রতি, ধর্ম ও দেশের প্রতি। কিন্তু তারপরও গল্পের সংসার ও সমাজ, ধর্ম ও দেশ ভেঙে যায়; তার বদলে আমরা আভাস পাই ব্যক্তির উদ্বোধনের, ব্যক্তির বিকাশের। এই ব্যক্তি তার সমগ্র অতীত নিয়ে তারই সংসার, সমাজ, ধর্ম ও দেশের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠে দাঁড়ায়। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে দিয়ে নয়, ব্যক্তিত্বকে নাকচ কিংবা খর্ব করে নয়, আগুনপাখিতে ব্যক্তিকে আমরা উঠে দাঁড়াতে দেখি সংসার, ধর্ম ও রাষ্ট্রের সত্যকে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে দিয়ে।

এরকম গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যক্তি, আরও এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা — নাম নেই তাঁর। অথবা নাম আছে কোনওখানে, কিন্তু এমনই অযত্নে যে আমরা তা খুঁজে পাই না। সে-যে নারী তা অবশ্য আমরা কাহিনীর শুরু থেকেই বুঝতে পারি; কিন্তু নামহীন হওয়ার মধ্যে দিয়ে সে কেবল নারীর নয়, চিহ্নিত করে সমগ্র সাধারণ মানুষের কালীন অবস্থান। একটি চরিত্রের একটি নাম দেয়া নিশ্চয়ই কঠিন ব্যাপার ছিল না; আবার এরকমও নয় যে, সচেতনভাবেই হাসান আজিজুল হক তার নাম দেন নি। আমরা যা দেখতে পাই — নাম না থাকার পরও তার অবয়ব ফুটে উঠছে, ফুটতে ফুটতে সে কেবল নারীদের নয়, সমগ্র সাধারণের ব্যক্তিকৃত রূপ হয়ে উঠছে। আবার সমগ্র সাধারণের ব্যক্তিকৃত রূপ হওয়ার পরও যে-সে নারীও হয়, তার কারণ বোধহয় এই, সবচেয়ে শোষিত হওয়ার পরও নারীই আধার সৃষ্টিশীলতার, নারীই ইতিবাচক উৎস মানুষের প্রবহমানতার। নামহীন এ নারী মুখোমুখি হয় ইতিহাসের, কেননা নামহীন মানুষদের সৃষ্টিশীলতাই প্রতিনিয়ত ইতিহাসকে খণ্ডন করতে করতেও এগিয়ে নিয়ে যায় ইতিহাসকে।

অবশ্য কেবল এই নারী — যাকে আমরা আগুনপাখিতে পাই মেজ বউ হিসেবে — শুধু সে কেন, প্রায় কারও নামই উচ্চকিত হয় না এ কাহিনীতে। কারণ যে-ভাঙন ও নির্মাণের মধ্যে দিয়ে এ-কাহিনী এগোয়, তার শুরু হয় সামন্ততান্ত্রিকতা ও ঔপনিবেশিকতা থেকে; আর সামন্তসংস্কৃতি অনায়াসে লোপাট করে ফেলতে পারে ব্যক্তির নাম, তা সে ব্যক্তি যত ক্ষমতাধরই হোক না কেন। ক্ষমতাধর ব্যক্তি থেকে শুরু করে আশপাশের প্রতিটি মানুষকে ডাকতে হয় অন্য কোনও সাংকেতিক শ্রদ্ধাবোধক পদে সামন্তসংস্কৃতির কল্যাণে। ‌’তেনাদের নাম মুখে আনা বারণ’ — তাই মেজ বউয়ের স্বামীরও কোনও নাম আমরা খুঁজে পাই না, খুঁজে পাই না ভাশুরের নাম, দেবরের নাম এমনকি সন্তানদের নাম। ডাক্তার আসে, তারও কোনও নাম নেই, ডাক্তারবাবু নামেই পরিচিত সে। সামন্ততান্ত্রিক সমাজ প্রধানত সম্পর্কযুক্ত সম্বোধনের সমাজ, শ্রেণিনির্ধারিত সম্মানসূচক সম্বোধনের সমাজ। আর সেই সম্বোধনসূচক পদটি আসল নামকে লুকিয়ে ফেলে, ব্যক্তির নামের ওপর আরোপ করে সামাজিকতার পোশাক। এই পোশাক পুঁজিবাদী সমাজেও পরিবর্ধিত হয় বটে, কিন্তু তার দায় এত বেশি নয় যে সব সময়েই পরে বেড়াতে হয়। কিন্তু সামন্তবাদে সামাজিকতার এই পোশাক পরে যাবতীয় কাজ করতে হয় প্রতিটি মানুষকে, যেন সে আলাদা মানুষ নয়, যেন আলাদা কোনও অস্তিত্ব নেই তার। তাই সংসারের কর্তা হওয়ার পরও মেজ বউয়ের স্বামী পারে না একজন ব্যক্তি হতে। ধ্বংসের মুখ থেকে সে সংসারকে টেনে তোলে এবং একান্নবর্তী সংসারের জন্যে অপরিহার্য সব ট্যাবু প্রতিষ্ঠা করে। তাই অন্দরমহলের সর্বসময় কর্ত্রী তাঁর বিধবা মা, যে-অন্দরমহলে আঁচড় কাটার ক্ষমতাটুকুও সে আর হাতে রাখে না। একজন বড় ভাই আছে তার, সংসারের হাল ধরতে যত ব্যর্থই হোক না কেন, তবু বড় ভাই সে। অতএব সিদ্ধান্ত নিলেও তাকে জানায় সে প্রতিটি সিদ্ধান্ত। এরকম সব ট্যাবুর মধ্যে দিয়েই নিশ্চিত করা হয় সংসারের শৃংখলা ও শ্রমপ্রকরণ। এবং সেই শৃংখলা ও শ্রমপ্রকরণ একটু থিতু হলে উদ্বৃত্ত সময় আসে, সংসারের ট্যাবুগুলো কর্তার জন্যে উদ্বৃত্ত সময় বয়ে নিয়ে আসে এবং কর্তা নিজেকে প্রসারিত করে সমাজের মধ্যে, উপনিবেশিক কাঠামোর রাজনৈতিক ও সামাজিক তরঙ্গের মধ্যে। গ্রামের মানুষদের সংগঠিত করে সে, নির্মাণ করে এমন এক রাস্তা যা তাঁকে নীরবে বাঁচিয়ে রাখবে পৃথিবী লয় হওয়ার দিনঅবধি, রাস্তা আঁকাবাঁকা হয়ে যায়, কেননা গরিব মানুষের একচিলতে চাষের জমি বাঁচানোর দিকেও লক্ষ্য রাখে সে, শহরের রাজনীতিকদের সঙ্গেও গড়ে ওঠে তার এক ধরনের সম্পর্ক, দশ গাঁয়ে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে, বাড়িতে সংবাদপত্র পড়ে, স্ত্রীকে লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা করে বাড়িতে ফিরে অত রাতে, বলে দেশে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা একটু পড়ে দেখতে; এবং এইসব কারণে আমরা নিশ্চিত হই, সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে থেকেও সে ওসবের ঠিক উপযোগী নয়। আবার একান্নবর্তী সংসার সংরক্ষণ ও প্রবহমান রাখার প্রতি কী এক মোহে ঘুরে ফেরে সে, এমনকি ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়েও। তার পক্ষে তাই সম্ভব হয় না আলাদা এক ব্যক্তি হয়ে ওঠা। তাই সে শেষপর্যন্ত লীন হয়ে যায় ইতিহাসের পথে, ব্যক্তি হওয়ার যাবতীয় শক্তিশালী প্রাণশক্তি থাকার পরও সে পারে না ব্যক্তিমনন বিকশিত করতে। পাতার পর পাতা জুড়ে আমরা এ কর্তার জয়জয়াকার শুনি, মেজ বউ নিজেই শোনায় তা। এমনকি পরম নিবেদিতার মতো এ কথাও বলে, কর্তা সারা জীবন হেনস্তা করেছে তাকে দুনিয়ার সব মানুষের সামনে, তাকে শুনিয়েছে রাজ্যের সব খারাপ কথা, হাত ধরে বের করে দিতে চেয়েছে ঘরের মধ্যে থেকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাকে দিয়েছে প্রচণ্ড সম্মান। ব্যক্তিসম্পর্ক এরকমই হয়, বাইরের মানুষের কাছে যা মনে হতে পারে চরম অপমান, মনে হতে পারে চরম স্খলন, সম্পর্কে আবদ্ধ মানুষের কাছে তা এক বিশেষ সংকেতের মতো। তাদের সম্পর্কের অধরা সে মাধুরী, ভেতর থেকে উদ্গীরিত সে নির্ভরমান সম্মান ও দূরত্ব একবারমাত্রই আমরা বুঝতে পারি, যখন কর্তা দেশবিভাগের পর পাড়ি জমান পূর্ব পাকিস্তানের দিকে। তখন সে আর কোনোই জোর করে না তার স্ত্রীর ওপরে, সংসারের একেবারে শুরুতে যে-জমি কেনা হয়েছিল স্ত্রীর গয়নাবিক্রির টাকা দিয়ে সেসব আর বাড়িটা তার জন্যে রেখে সব কিছু বিক্রি করে চলে আসে সে সন্তানদের সঙ্গে। এরকম চলে আসার কারণ তো একটাই, যত মুক্ত মনের মানুষ হওয়ার চেষ্টাই করুক না সে, তার শেষ লক্ষ্য ডালপালা মেলা সংসার আগলে রাখা। পুরুষতন্ত্রকে সে সংশোধন করতে পারে, পরিশীলিত করতে পারে, কিন্তু তা থেকে বাইরে বের হয়ে আসার সাধ্য কি তার আছে? তাই শেষপর্যন্ত চলে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে সে আসলে শেষ চেষ্টা করে নিজের ক্ষমতার পরিকেন্দ্র পরিস্ফূট করার। পুরুষতন্ত্রের মোহে পরাজিতের মতো নতুন একটি রাষ্ট্রের দিকে প্রস্থান করাটাই নিজেকে রক্ষা করার শেষ পথ তার। সারা কাহিনীতে যে-নিজেকে মেলে ধরেন অফুরান হিসেবে, যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখনই ব্যক্তি হিসেবে গুটানো সে, কুণ্ঠিত সে, ব্যক্তি হয়ে ওঠার যে-টুকু সম্ভাবনা ছিল, তাও সে শেষ করে দেয় এই কুণ্ঠার মধ্যে দিয়ে, এই গুটিয়ে নেয়ার মধ্যে দিয়ে। কিন্তু তার স্ত্রী, সংসারের এককোণে জীবনযাপন করতে করতেও অতীতের অভিজ্ঞানে শেষমেশ এক পরিণত ব্যক্তি, তাই কুণ্ঠিত নয়, গুটানো নয়। নিজের অস্তিত্বের হিসেবটুকু বুঝে নেয়ার জন্যে কেবল সে-ই তাই রয়ে যায় নিজের দেশে।

পুরো উপন্যাসে কথা বলে এই নারী। শৈশব থেকে শুরু হয় তার কথা বলা। শেষ হয় দেশভাঙনের পর একা হয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে। নিজের কথাই শুরু করে সে। কিন্তু নিজের কথা তো খুব বেশি নেই যে বলা যাবে। তার কথা মানেই তার বাবার কথা, নতুন মা আসার কথা, বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা, একান্নবর্তী এক সংসারের মধ্যে তার লীন হয়ে যাওয়ার কথা। বাবার সংসারে যাও বা একটু নিজের কথা ছিল, স্বামীর সংসারে সেটুকুও থাকে না। বড় সংসারে সে থই পায় না, পাওয়ার কথাও নয়। তাই তার মনে হয়, ‘জেবনের কুনো কাজ নিজে নিজে করি নাই, নিজের ইচ্ছা কেমন করে খাটাতে হয় কুনোদিন জানি নাই। আমি কি মানুষ, না মানুষের ছেঁয়া? তা-ও কি আমার নিজের ছেঁয়া?।’ অবশ্য চায়ও নি সে সেরকম হয়ে উঠতে। নিশ্চিন্তে থাকা যাবে, কোনও কিছু নিজেকে ঠিক করতে হবে না, যা করবার, যা বলবার তা সংসারের গিন্নিই করবে, শাশুড়িই করবে, এই নিশ্চিন্তিই আশ্বস্ত করেছে তাকে। এরকম আশ্বস্ত হয়ে ওঠার কথাই সে বলতে চায় সারা জীবন ধরে, কিন্তু এই আস্বস্তির আত্মমন্থনের মধ্যে দিয়ে কেবল তাকেই আমরা দেখি গল্পের শেষে অন্যতর হয়ে উঠতে।

প্রচল বাংলা কথাসাহিত্যে নারীর ব্যক্তিত্ব ধরা পড়ে এবং ক্রমশ ফুটে ওঠে মূলত তার প্রেম ও যৌনতাসংক্রান্ত সংকট, পারিপার্শ্বিকতা এবং দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু প্রেম কিংবা যৌনস্বাধীনতার বোঝাপড়া থেকে আগুনপাখির কেন্দ্রীয় ব্যক্তির ব্যক্তিসত্বা ফুটে ওঠে না। আগুনপাখি এদিক থেকে বিরাট ব্যতিক্রম। কেননা ব্যক্তির মনন গ্রন্থিত, জাগ্রত ও বিকশিত হওয়ার পথটি আসলে আরও অনেক সুদীর্ঘ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরোপুরি অন্যরকম; যৌনতার কেন্দ্র থেকে বিকাশের এই দ্বন্দ্ব শুরু হতে পারে বটে, কিন্তু সে-ক্ষেত্রেও এর পরিকেন্দ্রগুলিই কালক্রমে মূল হয়ে উঠতে থাকে। এরকম অন্যতর দ্বন্দ্বাত্মক পরিধির মধ্যে থেকে শুধু বাংলা কথাসাহিত্যে কেন, পৃথিবীর তাবৎ কথাসাহিত্যেই কোনও নারীকে আমরা ব্যক্তি হয়ে উঠতে দেখি না। কিন্তু আগুনপাখিতে আমরা সে-নারীর দেখা পাই। ইবসেনের নোরা আর হাসান আজিজুল হকের মেজ বউয়ের পথ এক নয়, কিন্তু গন্তব্য একইখানে। একঅর্থে মেজ বউয়ের গন্তব্য আরও সামনে, কেননা ব্যক্তি হওয়ার পরও তার সত্তা পুঁজিতাড়িত সংস্কৃতির নয়। একান্নবর্তী সংসারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে অভিযোজিত ও সম্পৃক্ত নারীর সবটুকু পথ হেঁটে হেঁটে সে এক ব্যক্তি হয়ে ওঠে। কেননা কেবলমাত্র সে-ই প্রত্যাখ্যান করে তার সময়ের সত্য, করতলে তুলে নেয় অতীত আর সুদূর সামনের সত্য। প্রত্যাখ্যানের এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ভোরের আলোর মতো ফুটে ওঠে তার নিজস্ব সত্য, ব্যক্তির সত্য এবং সেই সত্যকেই আঁকড়ে ধরে সে। জীবনভর সে যা অর্জন করে চলে, তার কোনও কিছুই সে আলাদা করতে পারে না সংসার, ধর্ম, সমাজ ও দেশ থেকে, দেখতে পারে না নিজের করে। কিন্তু তারপর তার জীবনে এমন এক সময় আসে, যখন সে দেখতে পায় ওইসব অর্জন পড়ে আছে মাটির ওপর; সংসার, ধর্ম, সমাজ ও দেশ আর রাজি নয় সেসবের স্বীকৃতি দিতে। আর ঠিক তখনই সে বুঝতে পারে, এসব আসলে তার, কেবলই তার, আর কারও নয়, এসবই তার নিজস্ব, একান্ত, এসবই তার অর্জন। এখন এসব ফেলে দিয়ে সে কোনখানে যাবে আবার নতুন করে, আবার কোথায় যাবে ওই সংসার, ধর্ম ও দেশের ডাকে! অতএব তার জীবনে নতুন এক সময় আসে, নিজেকে উপলব্ধি করার সময়, নিজের জায়গাটুকু চেয়ে দেখার সময়। সে দেখে, সংসার-ধর্ম-সমাজ-দেশ আসলে প্রত্যাখ্যান করছে তাকে, সত্যের মতো নতুন এক জোয়াল তুলে দিতে চাইছে তার কাধের ওপর। তন্ন তন্ন করে তার সারা জীবন দিয়ে সে তখন প্রত্যাখ্যানের শক্তি তৈরি করে। সে প্রত্যাখ্যান করে তার সংসার ও ধর্মের সত্য, রাষ্ট্র ও সমাজের সত্য, কেননা অতীতকে তো বটেই, তার ভবিষ্যতকেও দুর্দমনীয় নিষ্ঠুরতায় ভেঙে চুরমার করে ফেলছে সেইসব সত্য। একা-একা সে তার একাগ্রতা ও সমগ্রতা নিয়ে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করে আশপাশের নতুন নতুন অনিবার্য সব সত্য। পুরো পরিবার পাকিস্তানে চলে গেলেও সে রয়ে যায় ভারতে।

এইভাবে আগুনপাখি শেষ পর্যন্ত এক ব্যক্তির সারা জীবনের মধ্যে দিয়ে এক রাষ্ট্র ও সমাজের ধারাবাহিক ইতিহাস হয়ে ওঠে। সেই ইতিহাসে রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তির প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির তৃপ্তি ও অতৃপ্তির বয়ান থাকে, কিন্তু তারও চেয়ে বেশি থাকে রাষ্ট্র, ধর্ম ও সমাজের দিকে শেষমেশ চোখ তুলে তাকানো এক বোধিপ্রাপ্ত নারীর হিমচাউনি। হিমশীতল সেই চাউনি আমাদের বলে, কী ভীষণ ফাঁকি দিয়েছে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের ইতিহাসের দীর্ঘ এক পর্ব, কী ভীষণ ফাঁকি এখনও আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি সেই সময় থেকে। ব্যক্তিকে এইভাবে হাসান আজিজুল হক ইতিহাসের অন্তর্গত করেছেন, ইতিহাসের শিকার (ভিকটিম) করেছেন, কিন্তু তারপরও এই ব্যক্তি ইতিহাসের বাইরে বেরিয়ে এসেছে, ইতিহাসের নতুন এক ধারা হয়ে উঠেছে, কেননা ইতিহাসের বাস্তবতা সে তার জীবনের প্রাপ্তি ও ক্ষরণ দিয়ে সক্ষম হয়েছে অস্বীকার করতে। ব্যক্তি গতানুগতিক অর্থে ইতিহাসের অন্তর্গতই থাকে, কিন্তু কোনও কোনও ব্যক্তি ইতিহাসের গতিধারাকে জীবন ও সমাজের প্রাপ্তি দিয়ে, চারপাশের মানুষের প্রাপ্তি দিয়ে অন্যায্য মনে করে এবং তখন সে চায় ওই ইতিহাসের সমান্তরালে বয়ে বেড়াতে, অনাগতের জন্যে বিকল্প সে ইতিহাস রেখে যেতে, একদিন না একদিন ইতিহাসকে তার শাশ্বত গতিপথে ফিরিয়ে আনতে। আগুনপাখির ব্যক্তিজন্ম ঘটে এরকম সত্যের স্বার্থে।

দুই.
বলেছি, আগুনপাখিতে আধুনিক ব্যক্তিসত্তা নেই, কেননা সেটি থাকার কথাও নয়; রেলপথ নির্মাণের মধ্যে দিয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকেরা একক, স্বয়ম্ভূ গ্রামসমাজগুলোর মধ্যে একধরনের সম্পর্ক গড়ে তোলে বটে, তাতে বাণিজ্যপুঁজি এমনকি একপর্যায়ে শিল্পপুঁজিও বিকশিত হতে থাকে; কিন্তু এসবের শক্তি এত বেশি ছিল না যে তা হুমকি হয়ে উঠবে পুরানো সমাজ ও সংস্কৃতির। শ্রমের উপকরণ না পাল্টালে, শ্রমশক্তি নিয়োজনের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি না হলে নতুন শ্রমসম্পর্ক তৈরি হবে কোথা থেকে, জীবনযাপনের সংস্কৃতি পাল্টাবে কেমন করে! কিন্তু ভারতবর্ষীয় সমাজে ওখানেই ছিল সবচেয়ে বড় সংকট। তা ছাড়া তাকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছিল বর্ণপ্রথা, এমন এক বর্ণপ্রথা শ্রম ও পেশাভিত্তিক বিভাজনের সঙ্গেও যা জড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি বর্ণপ্রথা সম্প্রসারিত হচ্ছিল ভারতের মুসলিম সমাজেও। দেখা দিচ্ছিল আশরাফ, আতরাফ। তবে বর্ণপ্রথা যদি নাও থাকত, তা হলেও কী সাধ্য ছিল সামন্ততন্ত্রের দাপট কাটিয়ে ব্যক্তির মাথা তোলার? চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পুরানো জমিদারতন্ত্রকে বিপর্যস্ত করেছিল। উৎপাট করে নি, বরং বিন্যস্ত করেছিল নতুন এক জমিদারতন্ত্র। এরকম সমাজে ব্যক্তিমনন গড়ে ওঠার সুযোগ কোথায়, ব্যক্তিসত্তাই বা গড়ে ওঠার সুযোগ কোথায়? বিশেষ করে সেই মানুষটি যদি উঠে আসে শাসিতের দল থেকে, নিম্নবর্গের জগত থেকে, উঠে আসে নারীদের মধ্যে থেকে?

এমনকি শোষণের নানা রূপ দেখা গেলেও আগুনপাখির সাতচল্লিশের আগেপরের ওই সমাজে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তিচরিতার্থতার দানবীয় আকাক্সক্ষা থেকে কোনও শোষণ ঘটতে দেখা যায় না। সামন্ততান্ত্রিক সমাজকাঠামোর উপর উপনিবেশিক শাসনের চাপ, কাঠামোর মধ্যে পুঁজির অস্বাভাবিক অনুপ্রবেশ ও প্রকাশ ওই আকাক্সক্ষাকেও বিকৃত করে। সামন্ত মন সম্পদ ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে, কেন্দ্রীকরণের মধ্যে দিয়ে তা সম্প্রসারিত করতে চায় সামন্তীয় সম্পর্কের পরিধি, চায় রক্তসম্পর্কের কোলাহল ও সচলতা বাড়াতে। নিজে সে রক্তচোষাই বটে, কিন্তু রক্তচোষা হয়েও সে চায় নিজের শরীরে অসংখ্য পরজীবী বয়ে বেড়াতে। কর্তার অবস্থা তাই যত ভালো হতে থাকে ততই সেখানে এসে ভিড় জমাতে থাকে এরকম সব পরজীবী, যেমন অসংখ্য পরজীবী ছিল একসময় রায়বাড়িতেও। আশি-নব্বই বিঘে জমি হয়, গরুর গাড়ির নতুন টপ্পর হয়, ফিরে আসে বাপের আমলের তাজি ঘোড়া আর ছয় বেহারার পালকি, এইসব দেখে তার মায়ের খুশিতে ‘জিরি জিরি শাদা দাঁত’ বেরিয়ে পড়ে। বোঝাই যায়, সামন্ত মনের পছন্দ নয় ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে, অবিরাম চিন্তা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়ে এগিয়ে চলার রীতি; একইভাবে পছন্দ নয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য থেকে উপচে পড়া বিচ্ছিন্নতা মেনে নেয়া এবং উপভোগ করে চলা। তাই আগুনপাখিতে উপনিবেশিক হলাহলের মধ্যে পুঁজিপ্রবিষ্ট হলেও সামন্ত ধাঁচের সমাজকে আঘাত করতে পারে আহত করতে পারে এমন কোনও মানুষ, বেড়ে ওঠা দূরে থাক, জন্মই নেয় না। একান্নবর্তী সংসার-নির্মাণের নায়ক কর্তাও আসলে উপভোগ করতে চায় তার সামন্ত মনকে। ছেলেকে সে পাঠায় বোর্ডিং-এ লেখাপড়া করবার জন্যে, তারপর খোঁজ নিতে গিয়ে দেখে তার বয়ে নেয়া হাড়িভর্তি মিষ্টির পাতিল ছেলে বিলিয়ে দিচ্ছে বোর্ডিং-এর আর সবার মাঝে, তা দেখে তার মন ভরে যায়; হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত হচ্ছে দেখে সে উদ্বিগ্ন হয়, কাতর হয়, ক্ষুব্ধও হয়; কিন্তু তাতেও সামন্ত মন দূর হয় না। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে শ্বশুরের গোলা থেকে ধান বের করে বেচে দিয়ে শালার জন্যে লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করে সে, শালার নির্ভরতাটুকু উপভোগ করার সুখ ছাড়তে একটুও রাজি নয় তার সামন্ত মন, তাতে শ্বশুর যতই আহত হোক না কেন। এমনকি নিয়তি নির্ধারিত পরাজয়ও উপভোগ করে তার এই সামন্ত মন। ছেলে যখন মারা যায়, তখন শ্বশুর খবর পেয়ে এসে তাদের উত্তর-দুয়োরি ঘরের পশ্চিমধারে বসে। তখন সে ভীষণ শান্তমূর্তি নিয়ে শোনায় শ্বশুরকে, ‘সে ছিল আপনার যোগ্য নাতি, আপনি বলেছিলেন আপনার ছেলেকে আপনার কাছ থেকে পর করে দিচ্ছি বলে আমার ছেলেকেও বেশি দিন স্কুলে যেতে হবে না। আপনার নাতি আপনার কথার মান রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। আপনার কথাকে সে মিছে হতে দেয় নাই।’

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নানাভাবে ভাঙচুর করে এ সমাজকে, যদিও তাতে মূল জায়গায় কোনও আঁচড় পড়ে না, ফাটলও ধরে না। বরং শ্রেণিকাঠামোয় পরজীবী মধ্যস্তর এত বেশি সম্প্রসারিত হয় যে এমনকি শাসক ব্রিটিশরাও বিস্মিত হয় তাতে। বিস্মিত হয় বটে, কিন্তু খুশিও হয় মেঘ না চাইতেই জল পাওয়াতে। মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরির নতুন নতুন সূত্র খুঁজে পায় তারা এই ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে, কাজে লাগাতে শুরু করে সেগুলোকে। আর তার জের চলতেই থাকে আরও বহুদিন। ব্যক্তিমনন গড়ে উঠল কি উঠল না, পরিবার ভাঙল কি ভাঙল না, পুঁজির বিকাশ বিশুদ্ধ পথে ঘটল কি ঘটল না, সেসবের চেয়েও অনেক বেশি অর্থবহ এই ভাঙাগড়া। গাঁয়ের জমিদার রায়দের ২৫/৩০ বিঘা জমি নিলামে ওঠে। মানুষের দুর্দিনের সুযোগ নিতে নেই এই ন্যায়বোধ আছে কর্তার; কিন্তু এটাও জানে সে, রায়রা পারবে না ওই জমি রক্ষা করতে, সে না কিনলেও আর কেউ কিনবে। অতএব সে-ই তা কেনে। সে কেনে, কিন্তু নিজের টাকায় নয়, স্ত্রীর গয়নাবেচা টাকায়। এইভাবে একান্নবর্তী পরিবার নতুন করে উজ্জীবিত হয়, আসলে কর্তা নয়, এই উজ্জীবনে বড় ভূমিকা রাখে কর্তার স্ত্রী। নিজেই নিজেকে শোনায় সে, মেয়েমানুষের গয়না ছাড়া আর কী আছে! স্বামী চলে গেলেও গয়না থাকবে। এই বোধে সামন্ত সংস্কৃতি থাকতে পারে, কিন্তু তারও বেশি থাকে অর্থনৈতিক বিবেচনা। সংসার পরিত্যক্ত করলে, দুঃসহ দিন এলে আর কী থাকে নারীর গয়না ছাড়া? তবু সে তার মায়া ত্যাগ করে। পুরুষতন্ত্রের চাপই কি ধাত্রীর কাজ করে পেছনে থেকে? নিশ্চয়ই কিছুটা করে, কর্তা সন্তানের প্রসঙ্গ তোলাতেই তো ত্বরান্বিত হয় মেজ বউয়ের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া। আবার এও ঠিক, খানিকটা থাকে নিজের তাগিদ, কেননা রাগ নয়, স্বামীর চোখের মধ্যে সে দেখতে পায় নির্ভরতা। একেবারে টায়-টায় হিসেব করে কি এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে পারি আমরা? কিন্তু এর ফলে যা হয়, সম্প্রদায়গত অর্থে হিন্দুর জমি মুসলমানের হাতে আসে। উপরিকাঠামোর এই সত্য নিয়েই চলে টানাহেঁচড়া। কিন্তু কেউ আর মূল ও গভীর নতুন এক সত্যের দিকে ফিরে তাকায় না, বলে না, মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যেও এবার জন্ম নিলো নতুন এক জমিদার। আর যত নতুনই হোক, যত মুসলমানই হোক, জমিদার চিরদিনই জমিদার। হিন্দুর জমি মুসলমানের হাতে এলো, মুসলমানের জমি হিন্দুর হাতে গেলো, এরকম আসাযাওয়া নেহাৎই উপরিব্যাপার; যুগের পর যুগ ধরে এরকম হয়ে আসছে। রায়দের জমি কেন তাদের হাতে আসছে, তা নিয়ে মেজ বউ নিজের মতো একটি ভাবনা তৈরি করে। রায়রা খুবই ঠাণ্ডা মানুষ, অত ঠাণ্ডা হলে তো রাজ্যপাট রাখা যায় না। যে যা চাইত, তা-ই দিয়ে দিতো, এইভাবে কি সম্পত্তি আগলে রাখা যায়? মেজ বউ ভাবছে, এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই ভাবনা — রায়দের ছেলেপেলেদের কেউ গ্রাম ছাড়ে নি, লেখাপড়া শেখে নি, তাই চোখের সামনে ২৫/৩০ বছরের মধ্যে তারা ফতুর হয়ে গেল। তার মানে মেজ বউয়ের মধ্যে দিয়ে আমরা আসলে দেখতে পাচ্ছি, সামন্ততন্ত্র নতুন একদিকে মোড় নিচ্ছে, শাসনশোষণ করার মেজাজ না থাকলে আগের ঠাটবাট বজায় রাখা যাবে না, এমনকি খালি শাসনশোষণেও কাজ হবে না। গ্রাম ছাড়তে হবে। লেখাপড়া শিখতে হবে। নগরের অনুপ্রবেশ ঘটেছে গ্রামের ভেতর, গড়ে উঠেছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উপযোগিতা। আর এসবই মিলেমিশে নানা মিথষ্ক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নির্মাণ করছে শাসনশোষণের নতুন নতুন ভিত। ব্যাপারটা তাই হিন্দু কিংবা মুসলমানের নয়; এইসব ভিত সম্পর্কে নিস্পৃহ ছিল বলেই রায়রা পারল না তাদের সম্পদ ধরে রাখতে।

তবে ওই ভিত যারা গড়ে তুলছিলেন কিংবা যারা ওই ভিতকে আশ্রয় করে বেড়ে উঠছিলেন, তারা অবশ্য চেয়েছেন ব্যাপারটাকে হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্ব হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করতে। তারা এরকম চেয়েছেন, কেননা তারা চান নি রাজনৈতিক ক্ষরণ ও পুনর্গঠনের মধ্যে দিয়ে সামাজিক ও বর্ণশৃঙ্খল ভেঙে নিম্নবর্গের মানুষরা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দাবি করার মতো শ্রেণিবর্গ হয়ে উঠুক। অতএব নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গ করতে চেয়েছেন তারা। টের পেয়েছেন তারা, ঝড় উঠলে কেউই নিরাপদ নয়, তবু তারা সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ঝড় চেয়েছেন। বুঝেছেন তারা ওই ঝড়ে দু’একটা ঘর হয়তো ভেঙে পড়বে, কিন্তু পৃথিবীটা তবু তাদেরই রয়ে যাবে। যদিও চিড় ধরা পৃথিবী, তবু তা তাদেরই পুরানো পরিচিত পৃথিবী। কর্তা যখন মেজ বউয়ের সঙ্গে মাঝেমধ্যে এসব নিয়ে কথাবার্তা বলে তা থেকেও বোঝা যায়, চারপাশে কৃত্রিম এই দ্বন্দ্বটিকেই অকৃত্রিম করে তোলার যাবতীয় আয়োজন দেখে ভীষণ আহত সে। হিন্দু মুসলমানের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, তা নিয়ে তার চেয়ে আহত আর কেউ হয় না, তার ছোটভাইরা তো আনন্দিতই হতে থাকে।

সামন্তপর্বে ব্যক্তির উত্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে মধ্যশ্রেণি, নিপীড়িত শ্রেণি। পুনরুত্থানের মতো বিভিন্ন সৃজনশীলতা থাকার পরও কর্তা তাই পথ হারান, মেজো বউ তাকে লতিয়ে পথ খুঁজে নেয়। এটা তো প্রথমেই বোঝা যায় পদানত মেজ বউ, অধীনত মেজ বউ, এমনকি সংসারের অন্দরমহলেরও সে সিদ্ধান্তদানকারী কেউ নয়। কিন্তু এই মেজ বউই আমাদের আগুনপাখির গল্প বলে, বলে এবং শোনায়, অথবা একা-একা শোনাতে শোনাতে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে সমাজ আর সংসারের মধ্যে দিয়ে, অনেক ব্যক্তি তার আশপাশে থাকে বটে, কিন্তু তারা কোনও না কোনওভাবে সেই সমাজ আর সংসারের প্রতিভূ, নিবাসী কিংবা শিকার; অতএব সত্যিকার অর্থে তারাও ব্যক্তি নয়, সমাজ ও সংসারের উৎপাদমাত্র। তাদের মধ্যেই এই মেজ বউয়ের বালিকাজীবনের শুরু হয়। মা’র মৃত্যু মনে থাকে তার, কিন্তু মা’র স্পর্শ তার জীবনে কোনও স্থায়ী স্মৃতি রেখে যায় না। তবু মায়ের স্নেহে সে তার কাখালে বয়ে বেড়ায় ছোটভাইকে। যদিও সৎমা আসার পর সেই ভাইকে বড় করার জন্যে নিয়ে যায় তার মামারা। ভাগ্নেকে নিয়ে যায় তারা, কিন্তু ভাগ্নীকে যে কেন নিয়ে যায় না এও এ সমাজের এক গূঢ়, জ্ঞাত কিন্তু অনালোচিত নিয়ম। পুরুষ তো পরিবারের পুরোধা নায়ক, বংশের ধারাবাহিক নায়ক, এই নায়ক যত নাবালকই হোক, যত অবুঝই হোক, নীরবে সে প্রতিদ্বন্দ্বী সৎমার অনাগত ছেলেদের, নতুন পুরুষদের। এই দ্বন্দ্বের রাশ টেনে ধরতে হয়, কেননা অনাগত সন্তান তো ছেলে না-ও হতে পারে! কিন্তু ভাগ্নীর প্রতিপালক হওয়ার দরকার নেই, সে তো অন্য কোনও ঘরে চলে যাবে; সেটা তার সৎমারও জানা আছে, কেন সে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে অনর্থক আপাতসংকট ডেকে আনবে সংসারটিতে?

তবে ধর্মও বয়ে বেড়ায় মানুষের সাংস্কৃতিক-যোগ; ইরান-ইরাকে আমরা তার নজির দেখি, দেখি ইন্দোনেশিয়াতে, দেখি ভূÑভারতেও। ভারতবর্ষের সম্ভ্রান্ত ও সম্মানকামী বর্গের মুসলমানরা চান সংসারেই বিধবাদের সংরক্ষণ করতে, যেন বিধবা মেয়েটি রীতিমতো এন্টিক; যেমন আগুনপাখির কর্তার পরিবারও চায়। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে মেজো বউ দেখতে পায় শাদা ধূতিপরা শাশুড়িকে, লাজ-কাড়া কপালঅবধি। তা শাশুড়ি বিধবা থাকলেই কি, আর সধবা থাকলেই কি, সে তো আসলে গিন্নী এ সংসারটির। কিন্তু পাশাপাশি আরও এক সত্য খুঁজে পায় সে, এ গিন্নীর পর সংসারের সব ক্ষমতা বিধবা এক ননদের। তখন মনে হয় তার, ‘এ বাড়ির নিয়ম ঠিক হিঁদুদের মতো, এ বংশে বিধবার বিয়ে হয় না।’ হয় না, কারণ শ্রেণির সংস্কৃতিই বড় সংস্কৃতি, এইখানে হিন্দু-মুসলমানে কোনও ভেদ নেই, বনেদি আর সম্মানিত হওয়ার জন্যে পুরানো সংস্কৃতির জোয়াল টানতে হয় শ্রেণিতে ঠাঁই পাওয়া নতুন মানুষটিকেও। সংসারের প্রতি রন্ধ্রে-রন্ধ্রেও খেলা করে এই সংস্কৃতি, নারীও চর্চা করে এ সংস্কৃতির, চর্চিত হয় এ সংস্কৃতির মাঝে। অন্দরমহলও হয়ে ওঠে শ্রেণিসংস্কৃতির আর এক বলয়।

অন্দরমহলের এই সংস্কৃতির কাছে, এমনকি পুরুষতন্ত্রও শক্তিহীন অধিকাংশ সময়। সেটি আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাই একান্নবর্তী সংসারটি ভেঙে যাওয়ার সময়। দুর্ভিক্ষের মধ্যে দিয়ে একক পরিবারের প্রতি যাবতীয় ঝোঁক দানা বাধতে থাকে এবং তাতে মূলত নেতৃত্ব দেয় বউয়েরা। আবার এটাও মনে হয়, পুরুষতন্ত্রও কখনও কখনও চায় অন্দরমহলে ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত বলয়। এইভাবে সে নিশ্চিত করে নিজের অবস্থান, কুক্ষীগত করে রাখে অন্দরমহলটিকেও। একান্নবর্তী সংসারের এই গিন্নী ওই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতারই একপিঠ। পরিবারের কর্তা খুব ভালো করেই জানিয়ে দেন সংসারের প্রতিটি মানুষকে, অন্দরমহলের কেন্দ্রীভূত এ-আধারটিকে অগ্রাহ্য করলে তাকে মাশুল দিতে হবে। নারীর ক্ষমতাতন্ত্র এখানে পুরুষতন্ত্রের সঙ্গে মিলে তৈরি করে সুবিন্যস্ত ক্ষমতার রাজনীতির জাল, শৃঙ্খলার জাল। গিন্নী যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে, মৃত্যুঅবধি বিছানায় শক্তিহীন অবস্থায় শুয়ে থাকে, তখনও তার ক্ষমতা নিঃশেষ হয় না, তাই একদিন কোনও এক পুত্রবধূ হঠাৎ ঠক করে গ্লাস নামিয়ে রাখলে ছেলেকে ডেকে সে জানায়, মন না হলে তার কাজ যেন কেউ করতে না আসে। বলে সে নম্র স্বরে, আক্ষেপের মধ্যে দিয়েই। কিন্তু ওই আক্ষেপের স্বরই নিশ্চিত করে তার ক্ষমতা এখনও শেষ হয় নি।

এরকম সব সাংস্কৃতিক-যোগের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতার লড়াইয়ে নারীর ভূমিকা সংযুক্ত হয়। যদিও মেজ বউয়ের মুখেই শুনি আমরা, রাধাবাড়া আর ছেলেমেয়ে মানুষ করা ছাড়া আর কোনও কাজ ছিল না তাদের। এমনকি মেয়েদের বিয়ে বংশের বাইরে হতো না, বাইরের বংশের মেয়েকেও তেমন একটা আনা হতো না। বর্ণসমাজেরই আর-এক প্রকরণ তৈরি করে মুসলমান বাঙালিরা এরকম যাচাই-বাছাইয়ের মধ্যে দিয়ে। একান্নবর্তী সংসার, যেন সংসার নয়, মৌমাছির চাক, রাণী মৌমাছির কথাই চূড়ান্ত সেখানে। কর্তাগিন্নীর স্বামী বেঁচে থাকলে ক্ষমতার এ রূপ কেমন হতো সেটা জানা নেই আমাদের; তবে মেজ বউ যে বলেন, তা থেকে এই ক্ষমতার অবয়ব একটু হলেও ফুটে ওঠে। এই গিন্নীমায়ের বিচারক্ষমতা খুবই সূক্ষ্ম, নিশ্চিত করে মেজ বউ, কোনও কিছু নিয়েই দুই দুই করে না সে, সেজন্যেই টিকে আছে এত বড় সংসার আর এ জন্যেই তার মনে হয় যে শাশুড়ি মনে হয় ঠিক পৃথিবীর কেউ নয়!

তবে, আগুনপাখির কোনও নারীই নিষ্ঠুর নয়, যেমন নিষ্ঠুর হতে দেখা যায় না নতুন সৎমাকে, ঠিক তেমনি নিষ্ঠুর হতে দেখা যায় না কর্তা-মাকেও। সংসারের যজ্ঞ এত বিশাল যে সেখানে নিষ্ঠুরতার দেখানোর কোনও সময় মেলে না যেন। বাপের সংসারে নিঃসঙ্গ থাকে বালিকা। কেননা তার মা ছিল না, আর দাদী থাকলেও সে তো ঠিক আপনার নয়, সংসারেরও নয়, বাপজির খালা সে। তারপর আবারও মা আসে বালিকার জীবনে, কিন্তু মা কি আর হতে পারে বালিকা-সে-মা? বাল্যজীবনের নির্ধারিত অনিবার্য সব নির্জনতা আর নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিয়ে তারা তাই জড়িয়ে পড়ে নির্ভরতায়। সৎমা ও সৎমেয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং বন্ধুতার এক প্রকরণ তৈরি হয় তাদের ভেতর। কিন্তু তাও আর কয়দিনের, বিয়ে হয় বালিকার, অন্তঃসত্ত্বা সৎমা কাঁদতে কাঁদতে বিদায় দেয় তার সইয়ের মতো সৎ-মেয়েকে আর সে গিয়ে ওঠে বিশাল এক একান্নবর্তী পরিবারে। বড় অথচ কেন্দ্রীভূত সেই একান্নবর্তী পরিবারে কোনও দায় নেই তার, সেখানে সে কেবল হাবুডুবু খায়, তবে নিঃশ্বাস নিতে পারে। আর দায় যে নেই, সে জন্যে তার ভালোই লাগে, মনে হয় এত বড় সংসারের দায়িত্ব নিতে গেলে হাঁপিয়ে উঠত সে। তারচেয়ে অনেক ভালো হুকুম তামিল করা। অতএব নতুন সংসারেও সে কারও সঙ্গে ঘোরতর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়ে না। নতুন এ-সংসারে তার এতটুকু ফুরসুত মেলে না নিজেকে নিয়ে চিন্তা করার। আর সময়ের আকাল হলে সম্ভব হয় কি নিঃসঙ্গ হওয়া? অতৃপ্ত হওয়া? আগুনপাখির মেজ বউ সময় পায় না দম ফেলার, যেমন দম ফেলতে পারে না মানুষের রাজনীতি আর ইতিহাস, সমাজ আর রাষ্ট্র; একান্নবর্তী এ সংসারটির সঙ্গে লীন হয়ে থাকে সেই রাজনীতি আর ইতিহাস; মিশে থাকে সমাজ আর রাষ্ট্র।

তিন.
কিন্তু ওই যে রাজনীতি আর ইতিহাস, ওই যে সমাজ আর রাষ্ট্র, তার অনিবার্য লক্ষ্য তো পুঁজির জন্ম দেয়া, ব্যক্তির জন্ম দেয়া। হোক উপনিবেশিক কালের রাষ্ট্র সেটি, কারবার তার পুঁজি নিয়ে। আর শেষ বিচারে, পুঁজি চায় না সামন্ততন্ত্র টিকে থাকুক। পুঁজি চায় বাজারের সম্প্রসারণ। সামন্ততন্ত্র কখনোই পারে না তা নিশ্চিত করতে। অমন রাষ্ট্রের রাজনীতি ও ইতিহাস তাই কেন বহন করবে সামন্তকে, সামন্ততন্ত্রকে? এইসব জিনিস প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ব্যবহারের জন্যে গুদামে তুলে রাখা যায়, কিন্তু বহন আর কতদিন করা যায়? এই অস্বীকৃতির সূত্রেই সমস্ত আবরণ সরিয়ে, সমস্ত আবরণ ছিঁড়ে আগুনপাখির ব্যক্তিসত্তা বেরিয়ে আসতে থাকে। আধুনিক ব্যক্তিসত্তা মুৎসুদ্দী পুঁজির আবরণ সরাতে থাকে। ব্যক্তি গ্রামকে পিছে রেখে শহরে যেতে থাকে, ব্যক্তি শিক্ষাকেই বড় মনে করতে থাকে।

হাসান আজিজুল হক অবশ্য পুঁজির পিছে ছুটে বেড়ানো ব্যক্তির নির্মাণপ্রক্রিয়ার দিকে চোখ রাখেন নি; বরং শুরু থেকেই তিনি তাঁর মনযোগ নিবদ্ধ করেন গ্রামীণ নিম্নবর্গের মানুষের জীবনযাপনের দিকে, তাদের ব্যক্তি¯ত্তা বিকাশের দিকে। তবে নিম্নবর্গের মানুষের জীবনযাপনের মধ্যে দিয়ে গেলেও শোষণের চূড়ান্ত চালচিত্র বলতে যা বোঝা যায়, মানুষের দানব হয়ে ওঠার চালচিত্র বলতে যা বোঝা যায় তা আমরা পাই না হাসানের লেখাতে। কেননা তিনি বিশ্বাস করেন, ‘চোখের নিচের দিকে একটু কোমলতা থাকা ভালো।’ তাই বোধহয় কোনও জমিদার দানবের আমরা দেখা পাই না, কিংবা নতুন কর্তাও ঠিক দানব হয়ে উঠতে পারে না। কিন্তু পরিপ্রেক্ষিত কীভাবে দানব হয়ে ওঠে, মানুষকেও দানব করে তোলে, সেটি তিনি বেশ ভালো করেই মেলে ধরেন আমাদের সামনে। দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ আর দাঙ্গার বর্ণনা তারই সাক্ষী। এইসব দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ আর দাঙ্গা একান্নবর্তী সংসারটিকেও জড়িয়ে ফেলে। ঝর ঝর সেই বৃষ্টির দিনটির কথা মনে করা যাক, এত বৃষ্টি যে মেজ বউয়ের মনে হচ্ছে চারপাশে শাদা চাদর টাঙিয়ে দিয়েছে কেউ। ওরই মধ্যে হেঁসেলঘরে চুরি করতে এসেছে খিড়কির কোণের বাড়ির আকলি নামের মেয়ে। ভেজা জবজবে মোটা একটা চট বুক থেকে পা পর্যন্ত ডান হাত দিয়ে ধরে আছে সে। কী করে যে শরীরও এক বড় শত্র“ হয়ে ওঠে নারীদের! তাই চটের মধ্যে দিয়ে যেমন অভাব, তেমনি উগড়ে পড়তে থাকে আকলির শরীর। দেখে আর ভাবে নাকি বলে মেজ বউ, ‘‘খেতে পায় না, তবু এত বড়ো বড়ো দুটো বুক ক্যানে যি তার, কি কাজে লাগবে আল্লা জানে! অমন করে চটটো হাত দিয়ে ধরে আছে মেয়েমানুষের শরম বাঁচাইতে কিন্তুক তবু ঢাকা পড়ে নাই ঐ পব্বতের মতুন বুক।’’ এই ভাত চুরি করতে আসা মেয়েটিকে দেখে কী যে হয় মেজ বউয়ের, দুর্ভিক্ষ আর যুদ্ধের ওপর এতদিন ধরে জমে ওঠা ক্ষোভ আর রাগের প্রতিশোধ নেয়ার স্পৃহা জেগে ওঠে। তাই নিজের ঘরের অভাবঅনটনের কথা জানা থাকার পরও সে একটি মাটির হাঁড়িতে থাবা থাবা চাল তুলে একদম ভর্তি করে নিয়ে আসে, তারপর তুলে দেয় আকলির হাতে। এইভাবে প্রতিশোধ নিতে পেরে সে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। কিন্তু তারপরও অভাব কি সরে যায় অত সহজে? তারপরও তো একদিন বাড়ির বাইরে এসে খামারে দাঁড়িয়ে সে দেখতে পায়, সাঁঝরাতে পুকুরের ঢাল ধরে মাঠের মধ্যে জড়ো হচ্ছে ন্যাংটো সব অভাবী মানুষরা। এখন গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে তারা। এইসব মানুষদের দেখতে দেখতে সেই প্রথম উপলব্ধি করে মেজ বউ, রাতের অন্ধকারও মানুষের কত দরকার! একান্নবর্তী পরিবারটিকে একক পরিবার করে তোলার পথ তৈরি করে দিয়ে যায় এই দুর্ভিক্ষ আর যুদ্ধ। বিছানায় পড়ে যাওয়া গিন্নীর অসুস্থতার সময়েই এর ক্ষীণ সূত্রপাত, পরে তা আরও বাড়ে, অভাবের তাড়নায় একান্নবর্তী সংসারে যে দ্বন্দ্বের শুরু হয়, তার প্রথম প্রকাশ ঘটে অন্দরমহলে, মায়েরা ছেলেপুলেদের খাওয়ার সময় বসে থাকতে শুরু করে, এই খাওয়াদাওয়া তদারকির কথা বিধবা ননদটির, কিন্তু সেখানে হাজিরা দিয়ে মায়েরা চেষ্টা করে তাদের সন্তানদের ভাগ বাড়ানোর। তারপর বাড়িতে কন্ট্রোলের শাড়ি আসে, ননদ তা বিলি করে ভাবীদের সবার মাঝে, কিন্তু সেই বিলিবন্টন পছন্দ হয় না কারও, যদিও সবার কাপড় একই জাতের, পাড়ের ওই রংটি ছাড়া। তারপর একদিন অন্দরমহলের সেই দ্বন্দ্বে মুখোমুখি হয় দু’ ভাই। মারামারি হয় তাদের, রক্তপাতও। আর ভাতের চাল ফুরিয়ে আসতে থাকে। কিন্তু সংসারের সবাই গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতে থাকে, যেন ব্যাপারটি তাদের কারোর জানা নেই। তারপর একদিন আর চুলো জ্বলে না। কিন্তু একান্নবর্তী সংসারটিতে এই নিয়ে কেউ এগিয়ে যায় না কর্তার সঙ্গে কথা বলতে। ভাত রাধা হয় না। কিন্তু আশ্চর্য, ছেলেপেলেরাও কেউ হেঁশেলে খেতে যায় না, যেন তাদের জানাই ছিল আজ আর রান্না হবে না, যেন তাদের বাপ-মা তাদের আগে থেকেই বলে দিয়েছিল হেঁশেলঘরে খেতে না যেতে। কর্তা চুপচাপ বসে অপেক্ষা করে, অপেক্ষার মধ্যে নিরীক্ষা করে তার কর্তৃত্ব সত্যিই বহাল আছে কি না। তারপর বউকে না করে মাথা ঠুকতে। বলে, এই দিনটির জন্যেই অপেক্ষা করছিল সে। দেখতে চাইছিল, কেউ আসে কি না? ভাই আর ভাই আছে কি না? তারা এসে বলে কি না, চিরকাল তো তুমিই দেখভাল করেছো, এই সংকটে তোমাকেই তো হাল ধরতে হবে। তারপর সে আরও বলে, কাল সকালে বের হবে সে, যেখান থেকে পারা যায় এক গাড়ি ধান আনা হবে, তবে ওই ধান শেষ হওয়ার আগেই ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই হয়ে যাবে।

এইভাবে একান্নবর্তী পরিবারটির ভাঙন নির্ধারিত হয়ে যায়। দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ আর অভাব এর অন্যতম কার্যকারণ বটে, কিন্তু সবটাই কি? সংসারবিভক্তির ঘোষণা দেয়ার সময় কর্তা যা বলেন, তা থেকে আমরা এরও বেশি কিছু অনুভব করি বোধহয়। তিনি বলেন:

যুদ্ধু চলছে সারা দুনিয়ায়, এখনো শেষ হয় নাই যুদ্ধু, সেই যুদ্ধ একরকম করে পার হয়ে এইছি। দুর্ভিক্ষ আকাল মারী কিছুই ভেদ করতে পারে নাই এই সংসারের। কতো সংসার ছারখার হয়ে গেল, কতো মানুষ দুনিয়া ছেড়ে গেল, আমাদের কিছু হয় নাই। আর কিছু নয়, বাড়ির ছোটরা যেদিন না খেয়ে উপোস করে দিন কাটালে, আমার মাথায় বাজ পড়ল না, তাদের বাপ-চাচাদের মাথাতেও বাজ পড়ল না। পড়া উচিত ছিল, সংসার ভাঙার জন্যে যে বাপ-চাচারা ছেলেমেয়েদের উপোস করিয়ে অপেক্ষা করতে পারে তাদের মরাই ভালো। সেইদিনই আমি ঠিক করেছি, সকলের মনোবাঞ্ছা আমি পূরণ করব। মানুষ না হয়ে স্ত্রৈণ হয়েছে যে পুরুষমানুষ তার আর এক সংসারে থাকার কোনো দরকার নাই।

তা হলে আমরা কি বলব, পুরুষতন্ত্রের পরাজয় ঘটে ওইদিন, আর অন্দরমহলের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এতই উলঙ্গ হয় যে তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ ক্ষিপ্ত কর্তার গলা থেকে বের হয়ে আসে এ আর্তনাদ? এ কি কেবলই ক্ষমতার লড়াইয়ের বহিঃপ্রকাশ, না এক হাহাকারেরও? এইখানে হাসান আমাদের মুখোমুখি করান মানুষের এবং মানুষের সত্তার দ্বৈত-র সামনে। ভাইদের স্ত্রৈণ আখ্যা দেয়ার মধ্যে দিয়ে কর্তা তার পুরুষতান্ত্রিক ক্ষিপ্রতাই প্রকাশ করেন, কিন্তু নির্ভর সব মানুষদের অরক্ষণীয় থাকার বেদনায় বিচ্ছুরিত তার ওই হাহাকার সামন্তীয় গর্ভ থেকে উঠে এলেও আপ্লুত করে আমাদের। প্রতিটি সংস্কৃতিরই নিজস্ব মাধুরী থাকে, সামন্ত সংস্কৃতির মাধুরীও আমরা টের পাই এর মধ্যে থেকে। পুরো উপন্যাসে হাসান ভিক্টোরীয় শুচিতা দেখিয়েছেন। একের পর এক সন্তান হয়েছে বিভিন্নজনের, কিন্তু তারপরও মনে হয়েছে, স্বয়ংক্রিয় পন্থায় এই বংশবৃদ্ধি ঘটে চলেছে, মানুষের ভালোবাসার, মানুষের যৌন আকাক্সক্ষার যেন কোনও সম্পর্ক নেই এই বংশবৃদ্ধির সঙ্গে। তবে সংসারের ভাঙনপর্বে এসে টের পাই, পরিবারটির কেউ যৌনদাস, কেউ আবার যৌনদাসী। যৌনতার দাসত্ব পাকাপোক্ত করতেই তাদের এত আয়োজন। মুখে মুখে ‘আমি ভাগাভাগি চাই নাই’ বললেও তাই তাদের পক্ষপাত সংসার ভাঙনের পক্ষে।

সংসার ভাগ হয়ে যাওয়ার পর বিধবা ননদ যখন কাঁদতে কাঁদতে বলে, জমি দেয়া হলেও তার সব কিছু কেড়ে নেয়া হয়েছে, তার কবরের জন্যেও তো ওই জমি কোনও কাজে লাগবে না, তখন কি মনে হয় না, শেষ হাসি ওই পুরুষতন্ত্রই হাসল? শ্বাসরুদ্ধকর অভাব থেকে বাঁচবার জন্যে মায়েরা হয়তো আলাদা হতে চেয়ে ভুলই করেছিল, হয়তো তাতে যৌনদাসত্বেরও বড় দায় ছিল; কিন্তু সেজন্যে সবকিছু ছত্রখান করে দেয়ার আয়োজন পুরুষতন্ত্রের পক্ষেই সম্ভব। কর্তা যখন তখন তার বিধবা বোনকে বলে, ‘এখন তোর একার একটি বাড়ি নয়, সব ভাইয়ের বাড়িই তোর বাড়ি’, তখন সে নিজেও কি অনুভব করে না, কী ভীষণ এক মিথ্যা কথা বলছে?

তবে একান্নবর্তী পরিবার যখন ছত্রখান হয়ে যায়, ব্যক্তি ও বিচ্ছিন্নতার উত্থান তখন আর বেশি দূরে থাকে না। আধুনিক ব্যক্তিমনন তৈরি হয় একদিকে সামন্তীয় সমাজের ভাঙন ও পুঁজিবিকাশের উন্মত্ততার সওয়ার হয়ে, অন্যদিকে সহায়সম্পদ সব হারাতে হারাতে মুক্ত ও উন্মূল হওয়া মানুষের মধ্যে দিয়ে। এইবার একটু-একটু করে সেই ব্যক্তির চেহারা দেখতে থাকি আমরা। দেখি, কর্তাকে প্রশ্ন করছে মেজ বউ, সব বাঙালি মুসলমানদেরই যদি একসঙ্গে এক দেশের মধ্যে না রাখতে পারে, তা হলে আর আলাদা দেশের কথা উঠছে কেন? দেখি, সংসারের এক তুচ্ছ গৃহিনীর মধ্যে যে-প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে, সে প্রশ্নের জবাব দিতে না পারলেও এগিয়ে চলছে দেশভাঙনের উদ্যোগ। তখন কর্তাই তার বউয়ের প্রশ্নের জবাব দেয়ার চেষ্টা চালায়, যদিও নিজেও সে ক্ষুব্ধ ভীষণ, আর ওই ক্ষোভ চাপাও থাকে না তার কথাতে, মহাবিরক্ত হয়ে সে বলে, ‘এই জিন্না লোকটা একটা দিন জেল খাটলে না, একটা দিন উপোস করলে না গান্ধীর মতো, মুসলমানের কিছুই নাই তার, জামাকাপড় আগে পরত সাহেবদের মতো, এখন মুসলমানদের নেতা হয়েছে, সেরওয়ানি পরে, মাথায় পরে তার নিজের কায়দায় টুপি।’ তবে তার ভাইরা লাফাতে থাকে, বলতে থাকে, ‘তৌহিদের ক্ষ্যমতা জানো? তৌহিদি শক্তির সামনে হিদুঁ মালাউন দাঁড়াইতে পারবে না। এক মোসলমান, সত্তরজনা কাফের!’ তারপর দেশ ভাঙলে কর্তা আরও ক্ষুব্ধ হয়, কিন্তু বছরদশেক পর সেও চলে যায় নতুন দেশে।

জীবনের যে বয়ান হাসান শুরু করেছিলেন, তাতে শেষমেশ এই কালটিই যাবতীয় জটিলতার সৃষ্টি করে, আবার জটিলতার মধ্যে দিয়ে জীবনের গাঢ়তর সুসমাচারটি ব্যক্ত করে। আমরা দেখতে পাই, রায়বাড়িতে যাচ্ছে সেই মেজ বউ, বছরান্তে যে-কেবল যেত বাপের বাড়ি। কিন্তু তাও আর কয় বছর? জীবন গড়িয়ে যায়, শৈশব-কৈশোর হয়ে ওঠে স্মৃতিঘরের বিষয় এবং তখন ভয়ও জমতে থাকে, মনে হয় ফিরে গেলে স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠার সুখটুকু নষ্ট হয়ে যাবে। বাপের ওই বাড়ি বাদে মেজ বউকে যেতে দেখি শুরুতে প্রথম শ্বশুরবাড়িতে আসার পর রাজবাড়ির কর্তামায়ের কাছে আর একবার দেখি মোষের গাড়িতে করে গ্রামের নতুন সড়ক দিয়ে রেলস্টেশন দেখতে যেতে। সংসার ভাঙনের পর অবশ্য হেঁটে হেঁটে মাঝেমধ্যে বিধবা ননদের বাড়ি যায় সে; কিন্তু তাও আর কয়দিন! কিন্তু দাঙ্গার ভয়াবহকাল তাকে আরও পরিণত করে। তাকে দেখি, রায়বাড়িতে যেতে। সেই রায়দের বাড়ি, যে রায়দের জায়গাজমি কেনার মধ্যে দিয়ে তাদের একান্নবর্তী সংসারটি ভরে উঠেছিল। সেই রায়দের বড় ছেলে মারা যায় কলকাতায় হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার সময়। তার খুব ইচ্ছে জাগে একবার সেই সন্তানহারা মায়ের কাছে যেতে। তার নিজের ছেলেও তো মারা গেছে, যদিও অমন বিভৎসতার মধ্যে দিয়ে নয়, তারপরও সে তো জানে সন্তানের মৃত্যুযন্ত্রণা!

কিন্তু এই যে যাওয়া, এর মধ্যে দিয়েই মেজ বউ আরও ভালো করে জেনে গেল, কত বড় ফাটল তৈরি হয়েছে তাদের সবার মধ্যিখানে। মর্মস্পর্শী এই সাক্ষাৎকারপর্বটুকু মৃত্যুস্মৃতিকে আরও ভারী করে তোলে। দাঙ্গায় মৃত্যুর যন্ত্রণাকর বর্ণনা, কিন্তু তারও চেয়ে যন্ত্রণাকর ওই অনুভূতি, কোথায় ছেলেটি মরে পড়ে থাকল, লাশটির দাহ হলো না, গঙ্গা না পেলে কারও মুক্তি হয় না, কারও পাপক্ষয় হয় না, ছেলেটি রয়ে গেল সেই মুক্তির বাইরে, পাপপঙ্কের মধ্যে। তখন এত যে ইচ্ছে করে মেজ বউয়ের রায়গিন্নীকে জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু ওই ইচ্ছেই তার মনে এই বোধ জাগিয়ে তোলে, আর সম্ভব নয়; সম্ভব যে নয়, তার কারণ তারা দুজন হিন্দু-মুসলমান। আর হিন্দু-মুসলমান এখন একজন আরেকজনকে খুন করে ফিরছে। কেবল এক প্রগাঢ় হাহাকার উঠে আসতে দেখি তার হৃদয় থেকে : ‘আঃ হায় রে! মানুষ লিকিন বুদ্ধিমান পেরানি।’ সে রায়গিন্নীর চোখে পানির বদলে ধক ধক আগুন দেখে, সে রায়গিন্নীকে মাটিতে লুটিয়ে কাঁদতে দেখে আর অতীতে পরিভ্রমণ করে — বিয়ের পর নতুন বউ হয়ে কর্তা-মার সামনে যাওয়ার কথা, তার গড়ানো গয়নায় নিজের সর্বাঙ্গ ভরে ওঠার কথা, বড়খোকা মারা গেলে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে ভচ্চায্যির বুকে টেনে নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার কথা।
বোধকরি মেজ বউয়ের এইদিনই বোধিপ্রাপ্তি ঘটে, যদিও তার বহিঃপ্রকাশের জন্যে আমাদের অপেক্ষা করতে হয় আরও দশ-দশটি বছর।

চার.
হাসানের এই আগুনপাখি, এক নারীর অন্তর্গত বয়ান আর জনপদে লীন প্রাত্যহিকতা যার বড় অবলম্বন, প্রায় পুরো সময়ই দাঁড়িয়ে থাকে রাষ্ট্র ও রাজনীতির তোপের মুখে। একেবারে শুরুর দিকে হাসান যখন আমাদের মেহমান আপ্যায়নে কেতাদুরস্ত জিনের গল্প শোনান, মিষ্টি আনতে মানা করায় যে-জিন টিনের চালে খুব শব্দ করতে থাকে, ওই জিন তারপর ভেগে যায় এই রাষ্ট্র ও রাজনীতির আক্রমণে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামেরই একটি দিক দেখি আমরা, তবে খুব নগ্ন সে-দিক। সেখানে কোনও নায়ককে খুঁজে পাওয়া যায় না, সেখানে কোনও আশা খুঁজে পাওয়া যায় না, সেখানে মানুষ কেবলই স্বাধীনতা নামের এক ঘোরের মধ্যে হিন্দু আর মুসলমান হয়ে যেতে থাকে। এইভাবে যে-সব চরিত্র আমাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে, তারা সবাই একেকটি বড় শিকার, রাজনীতির শিকার, সাম্প্রদায়িকতার শিকার, দুর্ভিক্ষের শিকার, ক্ষুধার শিকার, যুদ্ধের শিকার, ভাঙনের শিকার। এরা হতে চেয়েছিল ইতিহাসস্রষ্টা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের অসহায় বলি ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।

আগুনপাখি উপন্যাসের উৎস হাসানেরই লেখা ‘একটি নির্জল কথা’ গল্প, যেটি সংকলিত হয়েছে ২০০৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প বইটিতে। একই কাজ করেছিলেন গল্পকার কায়েস আহমেদ, টেনেটুনে তাঁর দেশবিভাগকেন্দ্রিক একটি গল্পকে উপন্যাস বানিয়েছিলেন, যার কোনও প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু হাসান আজিজুল হকের ক্ষেত্রে ওই মন্তব্য করা সম্ভব নয়। ‘একটি নির্জল কথা’ গল্পে নারীটি বাধ্য হয় পূর্বপাকিস্তানে চলে আসতে, কিন্তু আগুনপাখি উপন্যাসে সে চলে আসার যাবতীয় আয়োজন প্রত্যাখ্যান করে। নতুন এক উপসংহার তৈরির জন্যে হাসান আজিজুল হককে আগুনপাখিতে যেতে হয়েছে নতুন নতুন বিবেচনা ও ঘটনার মধ্যে দিয়ে। তাই বর্ণনাভঙ্গি যদিও বা একই থাকে, নারীটি তার কথা শোনাতে থাকে, কিন্তু আগুনপাখির নারীর গন্তব্য হয় অন্যখানে। প্লেটো ও অ্যারিস্টটল যে রেপ্রিজেন্টশনাল দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিয়েছিলেন, হাসান তাঁরই প্রতিনিধিত্ব করেন দু উপসংহার দিয়ে, কিন্তু একই শ্রেণিবর্গের মানুষকে অবলম্বন করে। ‘একটি নির্জল কথা’ গল্পের পরিণতিকে আগুনপাখি উপন্যাসে পাল্টে ফেলার মধ্যে দিয়ে ফলত দু’রকম হাহাকারকেই বের হয়ে আসতে সাহায্য করেন তিনি, যারা রয়ে গেছে তাদের হাহাকার, যারা চলে এসেছে তাদের হাহাকার। দু’রকম সত্যকে দুমড়ে মুচড়ে বের করে আনেন তিনি: যারা চলে এলো তাদের জীবনের অনিবার্য সত্য, আর যারা রয়ে গেল তাদের জীবনের অনতিক্রম্য সত্য। কিন্তু উপসংহার যাই হোক না কেন, দেশবিভাগের যন্ত্রণাময় অথচ নিষ্ফলা দিকগুলোই অনবরত চুলোচুলি করতে থাকে দুটো লেখাতেই। তবে আগুনপাখি এগিয়ে যায় জীবনের সুগভীর ব্যপ্তি নিয়ে; কেননা হাহাকার, যন্ত্রণা, রক্তপাত, নিষ্ফল দেশভাগ সব কিছুর পর সেখানে অসংখ্য ব্যক্তির অন্তর্নিহিত অনুভবকে এক ব্যক্তির মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখি আমরা। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন গ্রামীণ জনপদে কতটুকু সঞ্চারিত হয়েছিল, কীভাবে সঞ্চারিত হয়েছিল সেটিরও ভিন্নতর এক অবলোকন ও আখ্যান হয়ে ওঠে এ-কাহিনী।

এরকম একটি কাহিনী দাঁড় করানোর জন্যে ভাষা ব্যবহারের প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, না চাইলেও। হাসানের ক্ষেত্রেও সেটি হয়েছে। ভাষাকে মাটি থেকে সর্বশক্তি দিয়ে টেনে তুলেছেন তিনি, ভাঙচুর করেছেন, প্রতিস্থাপন করেছেন বাস্তবতার আলোবাতাসে। ভারতবিভাগের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীণ বাঙালি এক নারীর আধুনিক ব্যক্তিসত্তা উদ্বোধনের বাস্তবতাটিকেই বড় করে দেখেছেন তিনি, তাই একদিকে তাঁকে বইতে হয়েছে সমসাময়িকতার সর্বসাধারণত্ব, আবার একইসঙ্গে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে হয়েছে সেই সর্বসাধারণত্বের দিকে। এইভাবে ভাষার সর্বসাধারণত্বও চ্যালেঞ্জের সামনে পড়েছে তাঁর এ লেখায়। মানুষের মুখের ভাষার সাহিত্য-প্রকরণ তৈরি করেন তিনি গোটা উপন্যাস জুড়ে, ভাষার সর্বসাধারণত্বকে ধারণ করার পরও তা সর্বসাধারণত্বকে প্রতি মুহূর্তে খর্ব করে চলে। ভাষা, এমনকি মুখের ভাষাও, লিখিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রত্যক্ষ রূপটি হারায়, শৈল্পিকতা সৃষ্টি ও যুক্ত করার মধ্যে দিয়ে সে অনবরত তার নিজের প্রত্যক্ষ রূপ তৈরি করতে থাকে, যে-প্রক্রিয়ার কোনও শেষ নেই; এদিক থেকে দেখতে গেলে অবশ্য বিষয়টিতে নতুনত্ব নেই। কিন্তু শৈল্পিকতা কতটুকু নিরাভরণভাবে সৃষ্টি ও যুক্ত করা সম্ভব হলো, বাস্তবতাকে সে কতটুকু অকৃত্রিমভাবে শৈল্পিক করে তুলতে পারল সেটিই বোধকরি এর নতুনত্বের দিক। আর তা পুরোপুরি নির্ভর করে লেখকের সামগ্রিক দর্শনের ওপর, বোধের ওপর। হাসানের শৈল্পিকীকরণ তাই শুরু হয় লিখতে বসার আগেই, কেননা নিজের দর্শন ও বোধ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নিয়েই তিনি লিখতে বসেন। আগুনপাখিতে ভাষার অন্তঃস্থ জীবনপ্রবাহের চিরন্তনতা ভাষারীতিকে সংযুক্ত করেছে সর্বসাধারণত্বের সঙ্গে, কিন্তু তীক্ষè অনুভূতিময়তা ভাষারীতিকে আবার করে তুলেছে সর্বসাধারণত্বের প্রতিদ্বন্দ্বী। শরৎচন্দ্রের যেসব গল্পউপন্যাস একদা হাসানের চোখের সবটুকু জল শুষে নিয়েছে, সেইসব কাহিনীর নারীরা পরিশীলিত হয়ে উঠেছে আগুনপাখির গিন্নী, বিধবা ননদ, দাদী, রায়গিন্নী, কর্তা-মা এবং মেজ বউদের মধ্যে দিয়ে। এবং এরকম বিবিধ পরিশীলনের কারণে ভাষারীতিতে যুক্ত হয়েছে তীক্ষè অনুভূতিময়তা। বোধহয় হাসানের এই শরৎ পাঠঅভিজ্ঞতার কারণেই, সচেতনভাবে তিনি যতই ভিক্টোরিয়ান শূচিতার বিরোধী হোন না কেন, তাঁর লেখার নারী-পুরুষ সব চরিত্রই যৌনতার প্রত্যক্ষ তাড়না থেকে মুক্ত থাকে। আবার এ-ও হতে পারে, যেমন তিনি নিজেই বলেছেন তাঁর এক সাক্ষাৎকারে, সৈয়দ শামসুল হকের পথটা ঠিক তাঁর পথ নয়, এই সচেতন ঘোষণাই তাঁকে বিরত রাখে মনজ-দৈহিক জটিলতাগুলোর বয়ান থেকে। কিন্তু একেবারেই যে তিনি নিস্পৃহ থাকেন, সেরকমও নয়; সংসার যখন ভেঙে যাচ্ছে, ভাইদের তখন ‘স্ত্রৈণ’ বলে আখ্যায়িত করছে কর্তা, ওই সম্বোধনের মধ্যে দিয়েই তিনি নির্মাণ করে দেন যৌনতার প্রাদুর্ভাব, যৌনতার উৎপাত!

হাসানের আগুনপাখি আরও এক কারণে উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে, এটিই আমাদের কথাসাহিত্যের একমাত্র উপন্যাস, যেখানে ভারতবিভক্তিকে দেখা হয়েছে নারীর আত্মা দিয়ে, নারীর শরীর দিয়ে, নারীর বুকজোড়া তৃষ্ণা দিয়ে। এবং এই নারী একেবারেই সাধারণ এক নারী, কোনও অনুকুল প্রতিবেশ কিংবা আন্দোলন থেকে নয়, তার যা শিক্ষা তা একেবারে জীবনযাপন থেকে পাওয়া, পুরুষতন্ত্রের খরখরে তাপ শুষে নিতে নিতে সে তৈরি করেছে তার নিজস্ব দীপ্তি, নিস্ফলা রাজনীতির রক্তপাতে ভিজতে ভিজতে সে তৈরি করেছে নিজস্ব অবয়ব। জীবনের গভীরতর দর্শনের মুখোমুখি হয় সে জীবন থেকে এবং তাই হয়ে ওঠে আধুনিক এক ব্যক্তি। তাকে আমরা বলতে শুনি:

মানুষ কিছুর লেগে কিছু ছাড়ে, কিছু একটা পাবার লেগে কিছু একটা ছেড়ে দেয়। আমি কিসের লেগে কি ছাড়লম? অনেক ভাবলম। শ্যাষে একটি কথা মনে হলো, আমি আমাকে পাবার লেগেই এত কিছু ছেড়েছি। আমি জেদ করি নাই, কারুর কথা অবাধ্য হই নাই। আমি সবকিছু শুদু নিজে বুঝে নিতে চেয়েছি। আমাকে কেউ বোঝাইতে পারলে না ক্যানে আলেদা একটো দ্যাশ হয়েছে গোঁজামিল দিয়ে যিখানে শুদু মোসলমানরা থাকবে, কিন্তুক হিঁদু কেরেস্তানও থাকতে পারবে। তাইলে আলাদা কিসের? আমাকে কেউ বোঝাইতে পারলে না যি সেই দ্যাশটো আমি মোসলমান বলেই আমার দ্যাশ আর এই দ্যাশটি আমার লয়। আমাকে আরো বোঝাইতে পারলে না যি ছেলেমেয়ে আর জায়গায় গেয়েছে বলে আমাকেও সিখানে যেতে হবে। আমার সোয়ামি গেলে আমি আর কি করব? আমি আর আমার সোয়ামী তো একটি মানুষ লয়, আলেদা মানুষ, খুবই আপন মানুষ, জানের মানুষ কিন্তুক আলেদা মানুষ।

যেন অনেক আগে মরে যাওয়া সন্তানের হৃদয়ের কাছে সে দাঁড়িয়ে থাকে আর পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে ঘোষণা করে :


সকাল হোক, আলো ফুটুক, তখন পূবদিকে মুখ করে বসব। সুরুজের আলোর দিকে চেয়ে আবার উঠে দাঁড়াব আমি।
আমি একা। তা হোক, সবাইকে টানতে পারব আমি।
একা।

এবং আমরা ভোরের আলোয় দেখতে থাকি একজন আধুনিক ব্যক্তির জন্ম, ব্যক্তিমননের জন্ম, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যতাময় নারীসত্তার জন্ম। একা এক ব্যক্তি সে, কিন্তু একা হলেও সে ধারণ করে সমগ্রকে। আবার সে পুঁজিতন্ত্রের ব্যক্তিও নয়, আগুনপাখির প্রেক্ষাপট থেকে যে-পুঁজিতন্ত্র সামনের দিনগুলোতে রাষ্ট্র ও সমাজে আরও বড় দানব হয়ে উঠবে, সাম্প্রদায়িকতা ও দেশবিভাগের রাজনীতিকে দোর্দণ্ড প্রতাপে আরও বহু বছর বয়ে বেড়াবে সেই পুঁজিতন্ত্রেরও প্রতিদ্বন্দ্বী সে। আর প্রতিনিধি সুচেতনার, নিম্নবর্গের মানুষের।

যুক্তরাজ্য; ০৮ আষাঢ়-২৯ আষাঢ় ১৪১৫/ ২২ জুন-১৩ জুলাই ২০০৮

imtiar@gmail.com

প্রতিক্রিয়া (১) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গিয়াস আহেমদ — জুলাই ১৯, ২০০৮ @ ৩:০১ অপরাহ্ন

      আগুনপাখি নিয়ে ইমতিয়ার শামীমের আলোচনা-বিশ্লেষণ বেশ চমৎকার হয়েছে। তিনি উপন্যাসটির গভীরে প্রবশে করতে পেরেছেন। সম্প্রতি আমিও এই উপন্যাসটি নিয়ে একটা আলোচনা লিখেছি। সেই আলোচনা ইমতিয়ার শামীমের আলোচনার কাছে নস্যি! জয়তু ইমতিয়ার শামীম!

      আগুনপাখি নিয়ে আমার লেখাটির একটি সংশোধিত ভার্সন পোস্ট করতে পারি। যদি কারো আগ্রহ থাকে…কিংবা সম্পাদক যদি অনুমোদন করেন তাহলে…।

      আর্টস পাতার পক্ষ থেকে
      আপনি আপনার প্রকাশিত লেখার লিংক এখানে দিতে পারেন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 

মাউস ক্লিকে বাংলা লেখার জন্য ত্রিভুজ প্যাড-এর 'ভার্চুয়াল কীবোর্ড' ব্যবহার করুন

 
Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us  |  Bangla Font Help

© bdnews24.com

free counters wordpress com stats